পরিবার ও পারিবারিক জীবন

গ্রন্থকারের কথা

১৯৬২ সনের কথা। ঢাকাস্থ অধুনালুপ্ত ‘মজলিসে তামীরে মিল্লাত’ আয়োজিত ইসলামী সেমিনারে ‘ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থা’ পর্যায়ে ভাষণ দেয়ার জন্য আমাকে আহবান জানানো হয়। বক্তৃতা দিতে রাজি হয়ে আলোচ্য বিষয়ের তথ্য সংগ্রহের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। অবশ্য পরবর্তীকালে বিশেষ কারণে সেমিনার অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় ও ভাষণ দেয়ার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করি। কিন্তু প্রস্তাবিত আলোচনাটি আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুভূত হওয়ায় এ বিষয়ে আমার পড়াশোনা, চিন্তা-গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ অতঃপর অব্যাহত ও অবিশ্রান্তভাবে চলতে থাকে। মাঝখানে ১৯৬৪ সনের প্রায় সবকটি মাস কারাবরণ ও কারামুক্তির নিষ্কর্মতায় অতিবাহিত হয়ে যায়। অতঃপর এ পর্যায়ে সংগৃহীত বিশাল তথ্যাদি গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করি এবং ১৯৬৭ সনের শেষ নাগাদ এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সম্পূর্ণরূপে তৈরী হয়ে যায়।

গ্রন্থখানি তৈরী হয়ে যাওয়ার পর এর প্রকাশণার জন্যে ঐকান্তিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইতিপূর্বে এর কোন ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। বর্তমানে গ্রন্থখানি ঢাকাস্থ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত হতে পাছে, এজন্যে আল্লাহ তা’আলার লাখো শুকরিয়া আদায় করছি।

এ গ্রন্থে পারিবারিক জীবন, তার সুষ্ঠুতা, সুস্থতা, শান্তি ও শৃঙ্খলা এবং পবিত্রতা ও মাধুর্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হয়েছে। পারিবারিক জীবনের ভাঙন ও বিপর্যয়ের দিকগুলো বিস্তারিতভাবে প্রতিভাত করে তোলা হয়েছে এবং সর্বশেষে বর্তমান বিপর্যস্ত পারিবারিক জীবন পুনর্গঠন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উপায় ও ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাও পেশ করা হয়েছে। যেখানে যা কিছু বলেছি, তা আমার নিজের মত বলে যাহির করিনি বরং সংশ্লিষ্ট অকাট্য যুক্তি ও দলীল-প্রমাণে যা কিছু প্রতিভাত হয়েছে, তা-ই আমি যুক্তির ফয়সালা বলে মেনে নিয়েছি এবং তা-ই পরিবার ও পারিবারিক জীবনের জন্যে কল্যাণ মনে করেছি। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ বিপরীত মত পোষণ করেন, তাহলে বলতে হবে, সে বৈপরীত্য আমার মতের সঙ্গে নয়, তা একান্তই যুক্তি-প্রমাণ ও অকাট্য দলীলের সাথে। তাই আমার উপস্থাপিত যুক্তি ও দলীল-প্রমাণের কোনরূপ দুর্বলতা কিংবা অসামঞ্জস্যতা কেউ দেখাতে চাইলে তা সাদরে গৃহীত এবং যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে।

এ গ্রন্থ পাঠে কোনো উপকার হলে এবং এর আলোকে পারিবারিক জীবনে পুনর্গঠন প্রচেষ্টা চালানোর ফলে কোনো কল্যাণ সাধিত হলে আমার শ্রম সার্থক হবে।

-গ্রন্থকার

নভেম্বর ১৯৮৩

মোস্তাফা মনযিল

১৭৩, নাখালপাড়া,

তেজগাঁও, ঢাকা, বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গ কথা

পরিবার মানব সমাজের মৌল ভিত্তি। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ইত্যাদি পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার উপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। যদি পারিবারিক জীবন অসুস্থ ও নড়বড়ে হয়, তাতে ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়, তাহলে সমাজ জীবনে নানা অশাস্তি ও উপদ্রব সৃষ্টি হতে বাধ্য। এ কারণে সমাজ-বিজ্ঞানীরা পারিবারি জীবনের সুস্থতা ও সুষ্ঠুতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন সভ্যতার ঊষাকাল থেকেই। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত এই সুস্থতা ও সুষ্ঠুতা আসবে কিভাবে? এ-ব্যাপারে সমাজ-বিজ্ঞানীরা কোনো যুক্তিযুক্ত, সুসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা দিতে পারেন নি। ফলে সুখী-সুন্দর পরিবার ও পারিবারিক জীবন গঠনের স্বপ্ন কার্যত স্বপ্নই থেকে গেছে বিশ্বের মানব সমাজের এক বিশাল অংশে।

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র কল্যাণময় জীবন বিধান। জীবনের অন্য সকল দিকের ন্যায় পরিবার ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কেও ইসলামের রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। একটি পুরুষ ও একটি নারী কিভাবে দাম্পত্য জীবন শুরু করবে, তাদের একের প্রতি অন্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি হবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ ও বিসস্বাদ দেখা দিলে কিভাবে তার নিষ্পত্তি করবে ইত্যাকার সকল বিষয়েই ইসলাম দিয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের সেই নির্দেশনা যথাযথ অনুসৃত না হওয়ায় আজ বিশ্বের মুসলিম সমাজই ভুগছে নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে। আর সে ব্যাধির প্রকোপে দিশেহারা হয়ে তারা এর নিরাময় খুঁজছে অধিকতর ব্যাধিগ্রস্থ পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থার কাছে।

বর্তমান শতকের মহান ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হযতর আল্লামা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) মুসলিম সমাজের এই দুর্নীতি অবলোকন করে ‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন’ সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন ষাট দশকের গোড়ার দিকে। তারপর দীর্ঘ কয়েখ বছরের অক্লান্ত সাধনা ও অশেষ পরিশ্রমের ফসল রূপে আলোচ্য গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত হয় ১৯৬৭ সালে। এই গ্রন্থে তিনি পরিবার গঠনের অপরিহার্যতা, নর-নারী সম্পর্কের ভিত্তি, যৌন-জীবনের সীমা ও স্বাধীনতা, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা ইত্যাকার বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিই শুধু বিশদভাবে তুলে ধরেননি, পরিবার ও পারিবারিক জীবনে ভাঙন ও বিপর্যয়ের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার বৈজ্ঞানিক পন্থাও নির্দেশ করেছেন। এ দিক থেকে ইসলামী সাহিত্যে গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে এক অমূল্য সংযোজন।

১৯৮৩ সালে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ-এর সৌজন্যে গ্রন্থটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করলে দেশের সুধী পাঠক মহলে এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে বামপন্থী মহল গ্রন্থটি ও তার প্রকাশনা সংস্থার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এক সমালোচনার ঝড় তোলে। এর পরিণতিতে প্রকাশনা সংস্থা বাজার থেকে গ্রন্থটি প্রত্যাহার করে নেন। অবশ্য তার আগেই গ্রন্থটির প্রায় সমুদয় কপি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং সুধী পাঠক মহলে এর চাহিদাও অভাবনীয়রূপে বৃদ্ধি পায়। অবশ্য নানা কারণে গ্রন্থটির পুনর্মুদ্রণ বিলম্বিত হয়। এর পর ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে নতুন অঙ্গসজ্জাসহ গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রিত হয় এবং পূর্বের মতই পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদর লাভ করে। এরপর উন্নত পারিপাট্যসহ গ্রন্থটির বর্তমান সংস্করণ সুধী পাঠকদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা নিজেদের গৌরবান্বিত বোধ করছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই অনন্য ইসলামী খেদমতের বিনিময়ে গ্রন্থকারকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন, এই প্রার্থনা করি।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

চেয়ারম্যান

মওলানা আবদুর রহীম ফাউণ্ডেশন

২০৮ পশ্চিম নাখালপাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫

ফোনঃ ৯১১৯৪৪৬

উৎসর্গ

আমার দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন ও গবেষণার ফসল ‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন’ আমার জীবন সঙ্গিনী ও সহধর্মিনী বেগম খায়রুন নিসাকে

আজ আমাদের পরিবার ও পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত। অথচ মুসলিমদের পরিবার ছিল এক-একটি দুর্গ। আর পারিবারিক জীবন পবিত্র প্রেম-ভালবাসা, স্নেহ-মমতা এবং পরম শান্তি ও স্বস্ত্বির কেন্দ্রবিন্দু; সে শুভ ও কল্যাণময় অবস্থা ফিরিয়ে আনা ও সুষ্ঠু পরিবার ও পারিবারিক জীবন গড়ে তোলা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। -মওলানা আবদুর রহীম

 

সূচীপত্র

মুখবন্ধ

প্রথম অধ্যায়

পরিবার

পরিবারের অপরিহার্যতা

পরিবারের ভিত্তি

সমাজ পরিসরে পারিবারিক গুরুত্ব

মানব জীবনের লক্ষ্য

নারী ও পুরুষ

সুখ-দুঃখের সাথী

স্থায়ী সম্পর্ক

তামাদ্দুনিক প্রয়োজনে নারী-পুরুষের স্থায়ী সম্পর্ক

পরিবার ও বর্তমান সভ্যতা

পরিবার বিরোধী যুক্তিধারা

পরিবার-বিরোধী যুক্তির জবাব

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার

পরিবার-স্থায়ী সংস্থা

প্লেটোর অভিমত

এ্যারিস্টটলের অভিমত

পরিবার ও বিশ্বপ্রকৃতি

পরিবারের ইতিবৃত্ত

যৌন স্পৃহার সুষ্ঠু পরিতৃপ্তি ও বিয়ে

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ

নারী-পুরুষের একত্ব

ইসলামে নারী ও পুরুষের আদর্শ

ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী

ইসলামের নারীর মর্যাদা

কন্যারূপে নারী

স্ত্রীরূপে নারী

মা-রূপে নারী

সমাজ-সংস্থার সদস্যা হিসেবে নারী

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

পরিবার গঠন

ইসলামের পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব

বিয়ে এবং তার গুরুত্ব

বিয়ের উদ্দেশ্য

বিয়ের তাগীদ

বিয়েতে কুফুর প্রশ্ন

কনের জরুরী গুণাবলী

দারিদ্র্য বিয়ের ব্যাপারে বাধা নয়

যেসব মেয়ে-পুরুষের পারস্পরিক বিয়ে হারাম

কাফের ও আহলি কিতাব মেয়ে

বদল বিয়ে জায়েয নয়

বিয়ের প্রস্তাব

বিয়ের এক প্রস্তাবের উপর নতুন প্রস্তাব দেয়া

বিয়ের পূর্বে কনে দেখা

পরে প্রকাশিত ত্রুটির কারণে বিয়ে প্রত্যাহার

ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যাপারে পিতামাতার দায়িত্ব

বিয়ের বয়স

বর-কনের পারস্পরিক বয়স-পার্থক্য

জুড়ি গ্রহণের ব্যাপারে বর-কনের প্রতি উপদেশ

বিয়েতে মতামত জ্ঞাপনের অধিকার

মতবিরোধের মীমাংসা

বিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচার

বিয়ের সময় বর-কনেকে সাজানো

দেন-মোহর

দান-জেহাজ

ওয়ালীমার যিয়াফত

দাম্পত্য জীবনের শর্ত

প্রেম ভালবাসা

ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা

স্ত্রীদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলবেন না

স্ত্রীদের প্রতি ভাল ব্যবহার ঈমানের লক্ষণ

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক উপহার বিনিময়

স্ত্রীর অধিকারের গুরুত্ব

স্ত্রীর বিপদে সহানুভূতি প্রদর্শন

স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ না করা

স্ত্রীর খোরপোষ সরবরাহের দায়িত্ব স্বামীর

নারী-প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখার নির্দেশ

গুরুতর বিষয়ে স্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ

স্ত্রীর কর্তব্য ও অধিকার

স্ত্রী ঘরের রাণী

জিদ ও হঠকারিতা পরিহার

সহাস্যবদনে স্বামীর অভ্যর্থনা

স্বামীর গুণের স্বীকৃতি

যৌন মিলনের দাবি পূরণ

আল্লাহর ইবাদত আদায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা

স্বামী পরিচর্যায় মহিলা সাহাবী

পারিবারিক জীবনের সংস্থা

পরিবার পুরুষের প্রাধান্য

অধিকার সাম্য

স্বামীর সন্তুষ্টি বিধান ও তার আনুগত্য

নিজের ও স্বামীর ধন-সম্পদে স্ত্রীর অধিকার

একাধিক স্ত্রী গ্রহণ

সমতা বিধানের শর্ত

সুবিচার ও সমতা রক্ষার প্রকৃত তাৎপর্য

ভুল ধারণা অপনোদন ইতিহাসে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ

মানব প্রকৃতি ও একাধিক স্ত্রী গ্রহণ

একাধিক স্ত্রী গ্রহণের সামাজিক গুরুত্ব

একটি হাস্যকর প্রশ্ন

একাধিক স্ত্রী গ্রহণের খারাপ দিক

 

তৃতীয় অধ্যায়

পরিবার সংরক্ষণ

স্বামী-স্ত্রীর লজ্জাশীলতা

দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ

দৃষ্টি চালনা সম্পর্কে রাসূলের নির্দেশ

পর্দার ব্যবস্থা

প্রথম পর্যায়

ঘরের অভ্যন্তরে পর্দা

ভিন স্ত্রী-পুরুসের গোপন সাক্ষাতকার

ঘরের অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা সংরক্ষণ

দ্বিতীয় পর্যায়

ঘরের বাইরে পর্দা

নামাযের জন্যে মেয়েদের ঘরের বাইরে পর্দা

নামাযের জন্যে মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া

মেয়েদের হজ্জ-যাত্রা ও বিদেশ সফর

মেয়েদের পোশাক ও প্রসাধন

মহিলাদের সামাজিক দায়িত্ব

অর্থোপার্জনে নারী

রাজনীতি ও নারী সমাজ

ভোটদানের অধিকার

জন-প্রতিনিধি হওয়ার অধিকার

নারী-প্রতিনিধিত্বের সঠিক পন্থা

চতুর্থ অধ্যায়

পারিবারিক জীবনে বৃহত্তর লক্ষ্য

সন্তানের বিপদ

আজল ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ

পারিবারিক জীবনে সন্তানের গুরুত্ব

সন্তানের প্রতি পিতামাতার কর্তব্য

আকীকাহ

ইসলামী জ্ঞান ও চরিত্র শিক্ষাদান

হযরত লুকমানের নসীহত

পাশ্চাত্য সভ্যতার বীভৎস রূপ

সন্তানের অধিকার

সন্তানদের মধ্যে সুবিচার স্থাপন

সন্তানের উপর পিতামাতার হক

পিতামাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা কবীরা গুনাহ

সন্তানের ধনসম্পদে পিতামাতার অধিকার

পিতামাতার খেদমত ও জিহাদে যোগদান

 

পঞ্চম অধ্যায়

পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় ও পুনর্গঠন

প্রাচীন সমাজে তালাক

খৃষ্টান সমাজে তালাক

তালাক ব্যবস্থার আবশ্যকতা

আমেরিকায় তালাক

ইসলাম ও তালাক

পারিবারিক স্থিতির ইসলামী সংরক্ষণ

বিরোধ মীমাংসার পন্থাত

তিন তালাকের পরিণতি

তালাক দানের ক্ষমতা কার?

তালাক দানের কয়েকটি পন্থা

বিভিন্ন প্রকারের তালাক কেন

‘হিলা’ বিয়ে জায়েয নয়

খুলা তালাক

এক সঙ্গে তিন তালাক

এক সঙ্গে তিন কালাক সম্পর্কে বিভিন্ন মত

উপসংহার

পারিবারিক জীবনের পুনর্গঠন

গ্রন্থপঞ্জী

 

মুখবন্ধ

বর্তমান দুনিয়ার লোকসংখ্যা কত?... পাঁচ শত কোটিরও বেশি! কিন্তু এত মানুষ দুনিয়ায় কোত্থেকে এল? তারা কি আসমান থেকে টপকে পড়েছে, না জমিন ভেদ করে উঠে এসেছে কিংবা দুনিয়ায় জন্তু-জানোয়াররা একে একে মানবাকৃতি ধারণ করে অথবা কোনো এক সময় মানব শিশুর জন্ম দিয়ে মানুষের সংখ্যা এত বিপুল করে দিয়েছে? … সকলেই স্বীকার করবেন যে, এর কোনোটিই হয়নি।

এ সংখ্যা বৃদ্ধি কি হঠাৎ করেই ঘটেছে? …তা-ও তো নয়! দুনিয়ার লোকসংখ্যা বৃদ্ধি একটা ক্রমিক পদ্ধতিতে হয়ে আসছে এবং হচ্ছে। যেমন বলা যায়, আজকের এ সংখ্যাটি বিগত বছরের এ দিনটিতে নিশ্চয়ই ছিল না।–[বানের পানির মতই বাড়ছে মানুষ –কোনভাবেই যেন এর বান বাঁধ মানে না। আমেরিকান আদমশুমারী ব্যুরোর হিসাব মতে গত বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ কোটি ২০ লক্ষ। আর গত এক দশকে পৃথিবীর লোকসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় একশ’ কোটি। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৩রা সেপ্টেম্বর-১৯৮৩)]

আজ থেকে একশ’ দুশ’ চারশ’, পাঁচশ’ হাজার, দেড় হাজার, দু’হাজার, চার হাজার বছর পূর্বে লোকসংখ্যা নিশ্চয়ই আজকের তুলনায় অনেক-অনেক কম ছিল। তাহলে যতই দিন যাচ্ছে –কালের অগ্রগতি হচ্ছে, ততই লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে অমোঘ গতিতে। আর যতই পিছনের দিকে যাওয়া যায়, লোকসংখ্যা ততই কম ছিল বলে নিঃসন্দেহে ধরে নিতে হয়। এ এমন এক অকাট্য সত্য যা অস্বীকার করার সাধ্য কারোরই নেই।

তাহলে লোকসংখ্যার এ ক্রমবৃদ্ধি কি করে সম্ভব হলো, -সম্ভব হচ্ছে? ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় কত দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক-অর্থনীতিবিদ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধ করার জন্য কতই না যুক্তি-পরামর্শ-প্রস্তাবনা পেশ করেছে আর কত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তি ও সরকারই না সে মন্ত্রকে অকাট্য সত্য মনে করে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগে জনসংখ্যা প্রতিরোধের কার্যকর (?) পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেজন্য আবিস্কৃত কতই না প্রক্রিয়া অবলম্বিত হয়েছে। কত মানুষই না নিজেদের সদ্যোজাত সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করেছে, কত সহস্র ভ্রূণ হওয়ার পর কিংবা তার পূর্বে সংহার করেছে অমানুষিক নির্মমতা সহকারে –তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কি আশ্চর্য, এত সব উপায় অবলম্বন সত্ত্বেও জনসংখ্যা কোনো বিন্দুতে প্রতিরুদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে দ্রুতগতিতে বাঁধভাঙ্গা বন্যার পানির ন্যায় বৃদ্ধিই পেয়ে গেছে ও যাচ্ছে। হাজার রকমের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া –রাজা-মায়া-ওভাকন-ভেসেকটমি-লাইগেশন একদিকে এবং অপরদিকে আণবিক বোমা, নাপাম বোমার ফলে ব্যাপক নরহত্যা সম্পন্ন করা হয়েছে –যে সম্পূর্ণ ও নির্লজ্জভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যাচ্ছে, কোনোক্রমেই তার ক্রমবৃদ্ধি রোধ করা যায় নি বা যাচ্ছে না, তার কারণ কি?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তার একটা কারণ আছে এবং সে কারণটি এতই প্রবল যে, দুনিয়ার মানুষ যদ্দিন থাকবে, তদ্দিন সে কারণটিও অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকবে। পরিভাষায় তাকে বলা হয় মানবীয় (আরবী***********) –দৈহিক ও মানসিক প্রকৃতি ও মেজাজ বা Nature। মানুষের প্রকৃতি সন্তান জন্মদান, সন্তানের মা বা বাবা হওয়ার প্রচণ্ড আকুলতা একান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। মানব বংশের ধারা এই প্রকৃতির বলেই স্থায়ী হয় ও অব্যাহত ধারায় সম্মুখের দিকেই চলতে থাকে। আর সে জন্যে স্রষ্টা প্রদান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন ও করছেন মানব প্রকৃতি নিহিত যৌন আসক্তি, প্রবৃত্তি ও যৌনাঙ্গকে। মানুষ দুভাগে বিভক্ত –পুরুষ ও নারী। উভয়ই জন্মগতভাবে নিজ নিজ যৌন আসক্তি, প্রবৃত্তি এবং মানসিক প্রবণতা চরিতার্থ করার উপযোগী হাতিয়ার নিয়েই ভূমিষ্ট হয় মায়ের গর্ভ থেকে। এ হানিয়ারের প্রয়োগে যথাসময়ে উদ্যোগী হওয়া মানুষের –পুরুষ ও নারীর উভয়েরই –অতীব স্বাভাবিক তাড়না। এ তাড়নার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় প্রত্যেকটি মানুষ। তা না করা পর্যন্ত মানুষের স্বস্তি লাভ বা স্বাভাবিক (Normal) থাকা কখনই সম্ভব হতে পারে না। তাই যৌনতা মানব সমাজে একটা বিরাট কৌতুহলোদ্দীপক, আকর্ষনীয়, আলোচ্য ও চিন্তা-গবেষণার বিষয় হয়ে রয়েছে প্রথম মানব সৃষ্টির সশয় থেকেই। আর সেই সাথে একে কেন্দ্র করে কতগুলো মৌলিক জটিল দার্শনিক প্রশ্নও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চিন্তাশীল মানুষ মাত্রেরই মনে। সেই দার্শনিক প্রশ্নকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কত না মতবাদ ও দর্শন! এই পর্যায়ে উত্থিত প্রশ্নগুলো সংক্ষেপে এইঃ

(ক) Sex বা যৌনতার প্রকৃত নিগূঢ় তত্ত্ব (Reality) কি?

(খ) মানব শিশুর মধ্যে যৌন আবেগ কি অনাদিকাল থেকেই সংরক্ষিত রাখা হয়েছে? –যদি তা-ই হয়, তাহলে তার ক্রমবিবর্তন কি করে ঘটে? আর যদি তা না-ই হয়ে থাকে, তাহলে যৌন চেতনা বা আবেগ কি সমস্ত যৌন দাবি সম্পর্কে ব্যক্তিকে অবহিত ও সচেতন বানায়?

(গ) পরিবেশ, প্রেক্ষিত ও জীবনের সাথে যৌনতার সম্পর্ক কি?

পাশ্চাত্য সমাজের চিন্তাবিদরা মনে করে, যৌন আবেগ চরিতার্থতার পথে সামান্য প্রতিবন্ধকতাও ব্যক্তির মনে প্রবল অনুসন্ধিৎসা (Curiosity) জাগিয়ে দেয়। সে কৌতূহল চরিতার্থ হতে না পারলে এর-ই ফলে মানসিক অস্বাভাবিকতার (Abnormalities) সৃষ্টি হয়। কিন্তু পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের এ মত কতটা যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য?

প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। বর্তমান নাস্তিকতাবাদী বিশ্ব সভ্যতার অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে এসব প্রশ্নের বিশদ জবাব আলোচিত হওয়া একান্তই আবশ্যক। এ পর্যায়ে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার খুবই প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। ‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন’ গ্রন্থে সবিস্তারে যে মূল তত্ত্বটি উপস্থাপিত করা হয়েছে, বর্তমান প্রসঙ্গের আলোচনা তাই ‘মুখবন্ধ’ হিসেবে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছি।

উপরে যে প্রশ্নগুলোর উল্লেখ করেছি, আগেই বলেছি, পাশ্চাত্য সমাজ-দর্শনে সেগুলো বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কেননা পাশ্চাত্যের মানুষ যখন স্বাভাবিক পথ হারিয়ে ফেলেছে, তখন শয়তানে রাজীম তাদের আগে আগে আলোকবর্তিকা লয়ে অগ্রসর হতে হতে নানা দার্শনিক মতের আলোকস্তম্ভ গড়ে তুলেছে। যে ভুলই তারা করেছে, যেখানেই তাদের বিচ্যুতি বা পদস্খলন ঘটেছে, তাকে সঙ্গত ও বৈধ পমাণের জন্য সভ্যতার অপরিহার্য অঙ্গ সাব্যস্ত করার লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে। ফলে তারা জীবনের প্রতিটি বিভাগের পুনর্গঠন করেছে এমন এক একটি মতাদর্শের ভিত্তিতে যার সাথে গভীর সূক্ষ্ম চিন্তা-গবেষণা সম্পৃক্ত রয়েছে। পাশ্চাত্যের উপস্থাপিত বিশ্ব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বস্তুবাদী দর্শন (Materialism), সমাজ বিপ্লব মতাদর্শ (Social Evolution Theory), ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Material Conception of History), নৈতিকতার সুবিধাবাদী মতবাদ (Utilitarianism) এবং যৌন দর্শন (Theory of Sex) প্রভৃতি। এ যেন এক একটি বিষয়বৃক্ষ। পাশ্চাত্য সভ্যতার পংকিলতার বিষক্রিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে উক্ত প্রত্যেকটি বিষবৃক্ষেরই মূলোৎপাটন একান্তই অপরিহার্য। সেগুলোর শুধু মূলোৎপাটনের একতরফা কাজই যথেষ্ট নয়; সাথে সাথে তার বিকল্প পূর্ণাঙ্গ সমাজ-দর্শন পেশ করার দায়িত্বও অবশ্যই স্বীকার্য করতে হবে। ইতিবাচকভাবে ইসলামের যৌন দর্শনের ভিত্তি রচনার জন্য কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতসমূহকে কেন্দ্র করেই আমরা চিন্তা-গবেষণার সূচনা করতে চাইঃ

(আরবী******************************************************************)

হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রব্বকে ভয় করো যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে, তা থেকেই সৃষ্টি করেছেন তাঁর জুড়িকে এবং সেই দুইজন থেকেই (বিশ্বময়) ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিপুল পুরুষ ও নারী।

(আরবী****************************************************)

তিনি তোমাদের স্বজাতিয়দের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জুড়ি বানিয়েছেন এবং অনুরূপভাবে জন্তু-জানোয়ারের মধ্যেও তাদেরই স্বজাতীয় জুড়ি বানিয়েছেন এবং এভাবেই তিনি তোমাদের বংশ বৃদ্ধি ও বিস্তার করেন।

(আরবী************************************)

তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে ক্ষেতস্বরূপ

(আরবী**********************************************)

তিনিই আল্লাহ তিনিই তোমাদিগকে একজন মাত্র ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তারই স্বজাতি থেকে তার জুড়ি বানিয়েছেন, যেন তার কাছে পরম শান্তি ও স্থিতি লাভ করতে পারে।

(আরবী************************)

স্ত্রীরা তোমাদের পোশাকস্বরূপ, আর তোমরা ভূষণ হচ্ছ তাদের জন্যে।

(আরবী*******************************************)

তোমাদের জন্যে তোমাদের স্বজাতীয়দের মধ্য থেকে জুড়ি সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা তাদের কাছে পরম শান্তি-স্বস্তি লাভ করতে পারে এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও দয়া অনুকম্পাও জাগিয়ে দিয়েছেন।

(আরবী********************************************************)

এবং তিনিই আল্লাহ, যিনি পানির উপাদান দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। পরে মানুষকে বংশ ও শ্বশুর সম্পর্ক জাতরূপে ধারাবাহিক বানিয়ে দিয়েছেন।

(আরবী*********************************************)

হে মানুষ! আমরা নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক থেকে এবং তোমাদের সজ্জিত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্ররূপে, যেন তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার।

উদ্ধৃত প্রথম আয়াতটি প্রমাণ করেছে যে, মানবতার জয়যাত্রা এ পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল একজন মাত্র মানুষ দিয়ে। পরে তারই অংশ থেকে তার জুড়ি (স্ত্রী) সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর এ দু’জনের পারস্পরিক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ফলশ্রুতি হিসেবেই দুনিয়ায় এত অসংখ্য পুরুষ ও নারীর অস্তিত্ব লাভ সম্ভবপর হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, বংশ বা লোকসংখ্যা বৃদ্ধি একটি অপ্রতিরোধ্য স্বাভাবিক প্রবণতা।

দ্বিতীয় আয়াতটি জানাচ্ছে যে, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক বা যৌনতার (Sex) স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে বংশ বৃদ্ধি ও বংশধারার স্থায়িত্ব। প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতেরই অধিক ব্যাখ্যা দান করেছে তৃতীয় আয়াতটি। বলছে, স্ত্রীলোক মানব বংশের উৎসস্থল। ক্ষেত বা খামার এবং তাতে চাষাবাদ ও বীজ বপনের লক্ষ্য হচ্ছে ফসল উৎপাদন, বিশেষ একটি ফসলের বংশ বৃদ্ধি ও বংশের ধারা রক্ষা। অনুরূপভাবে স্ত্রীলোকেরা মানব বংশ ফসলের জন্য ক্ষেত-খামার বিশেষ। মানুষ-ফসল কেবলমাত্র স্ত্রী-ক্ষেত থেকেই লাভ করা যেতে পারে। অন্য কোথাও থেকে তা পাওয়ার উপায় নেই। এসব কয়টি আয়াতই এক সাথে উদাত্ত ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দুই লিঙ্গে বিভক্ত এবং এই বিভক্তি কিছুমাত্র উদ্দেশ্যহীন নয়। আর সে একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষা ও বিস্তার সাধন।

কিন্তু উদ্ভিদ ও জীব জগতে প্রজাতি রক্ষার জন্যে সে স্বভাবগত আবেগ সংরক্ষিত, তার তুলনায় মানবীয় যৌন তাদীকের (urge) সাথে বংশ রক্ষা ছাড়া আরও অনেকগুলো দিক এমন সংশ্লিষ্ট রয়েছে যা জীবনের ও দুটি পর্যায়ে (উদ্ভিদ ও জীবজন্তু) সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। উদ্ভিদ ও জীব জগতে পুরুষ ও স্ত্রীর যৌন মিলনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বংশ রক্ষা। কিন্ত মানুষের দুই লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক যৌন মিলনের উক্ত নিম্নতম লক্ষ্যকে অতিক্রম করে অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ৪ ও ৫ নম্বরে উদ্ধৃত আয়াতদ্বয় মানবীয় যৌন আবেগের ভিন্নতর এক দাবির দিকে ইঙ্গিত করছে। আর তা হচ্ছে , যৌন সম্পর্ক স্থাপনে শান্তি-স্বস্তি-পরিতৃপ্তি লাভ। নিছক দেহকেন্দ্রিক (Biological) শান্তি-স্বস্তি-পরিতৃপ্তি অত্যন্ত ব্যাপক, গভীর-সূক্ষ্ম মানসিক ও আবেগগত ব্যাপার। মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যে সংঘবদ্ধ সাহচর্য-সহৃদয়তা-সহানুবূতি-অনুকম্পায় উদগ্র পিপাসা নিহিত, উক্ত পরিতৃপ্তি শান্তি-স্বস্তি তাঁরই জবাব, তারই পরিপূরক। এক্ষেত্রে পুরুষ যেমন বিশেষভাবে নারীর মুখাপেক্ষী সেই পুরুষের প্রতি নারীর মুখাপেক্ষিতাও কিছুমাত্র সামান্য নয়। তবে পুরুষের মুখাপেক্ষিতা অধিক তীব্র। সম্ভবত সেই কারণেই কুরআনে উদ্ধৃত আয়াতসমূহে পুরুষকে বলা হয়েছে স্ত্রীর নিকট কাঙ্ক্ষিত শান্তি-স্বস্তি-তৃপ্তি লাভের কথা। এর বাস্তব কারণ রয়েছে বিশ্ব প্রকৃতিই পুরুষদের স্কন্ধে যে সব কঠিন ও দুর্বহ দায়িত্ব কর্তব্যের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, তা হৃদয়াবেগে যে তীব্রতা, মন-মানসিকতায় যে অস্থিরতা এবং অনুভূতিতে যে প্রচণ্ডতা উন্মত্ততার সৃষ্টি করতে থাকে অবিরামভাবে, তদ্দরুন পুরুষ জীবনের গোটা পরিমণ্ডলকেই সাংঘাতিকভাবে প্রভাবান্বিত ও উদ্বেলিত করে। পুরুষ জীবন সংগ্রামে ‘লৌহ প্রকৃতির প্রদর্শন করার পর প্রেম-ভালোবাসার কুসুমাকীর্ণ কাননে রূপ-পিয়াসী মুক্ত বিহঙ্গ হওয়ার জন্যে বিপরীত লিঙ্গের নিকট ঐকান্তিকভাবে নিবেদিত-উৎসর্গিত হওয়ার জন্যে আকুল হয়ে ওঠে। এটা মানব স্বভাবের অমোঘ অনস্বীকার্য দাবি। পুরুষ জীবনের ‘ঊষর-ধূসর মরুভূমি’তে লু-হাওয়ার চপেটাঘাত খেয়ে খেয়ে উত্তম জীবন অর্ধাংশের বুকে শীতল মধুর পানীয় পান করে তার স্বভাবের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্যে উদগ্র হয়ে ওঠে।

শান্তি-স্বস্তি-পরিতৃপ্তি লাভের এ উদগ্র কামনা স্থায়ী বন্ধনজনিত সাহচর্যের আকাংঙ্ক্ষী, শুধু সাহচর্যই তো নয়, তার জন্যে প্রয়োজন প্রেম ভালোবাসাপূর্ণ সংস্পর্শ, সাহচর্যের কুসুমাস্তীর্ণ শয্যা। ৫ নম্বর আয়াতে বলছে, উভয় লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত আন্তরিক ও আগ্রহপূর্ণ হতে হবে। এমন সম্পর্ক দুনের মধ্যে থাকতে হবে, যার ফলে উভয়ই উভয়ের জন্যে সর্বদিক দিয়ে পরিপূরক হতে পারবে। একজনের অসম্পূর্ণতা অন্য জনে পূরণ করবে, অন্য জন সে একজনকে কানায়-কানায় পূর্ণ করে তুলবে। উভয়ের মধ্যে থাকবে এক স্থায়ী নৈকট্য, একমুখিতা, একাত্মতা। উভয়ের মধ্যে স্থাপিত হবে এক পরম গভীর নিবিড় সৌহৃদ্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক। মানুষকে দুই লিঙ্গে বিভক্ত করে সৃষ্টি করার মূলে যে রহস্য, তা এখানেই নিহিত।

৬ নম্বর আয়াতটি এ সত্যকে অধিকতর স্পষ্ট করে তুলেছে। উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক শান্তি-তৃপ্তি-স্বস্তি লাভের জন্যে দাবি হচ্ছে, তাদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা-দয়ার্দ্রতা-কল্যাণ কামনা ও পরম বিশ্বস্ততা-নির্ভরযোগ্যতার সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠা।

৭ ও ৮ নম্বর আয়াতদ্বয় আমাদেরকে আরও সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানব প্রজাতি সংরক্ষণের জন্যে অন্যান্য উপায়-পন্থার পরিবর্তে প্রকৃতি যদি যৌনতার (sex) পথকেই অবলম্বন করে থাকে, যদি উভয় লিঙ্গের মধ্যে এক পরম আবেগপূর্ণ ও মানসিক শান্তি-স্তস্তি-তৃপ্তির পিপাসার সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে স্থায়ী অব্যাহত সম্পর্ক স্থাপনের কারণ বা উদ্বোধক সৃষ্টি করে দয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে, তার চরম লক্ষ্য হচ্ছে এই যে, ব্যক্তি ও ব্যক্তিতে দাদা-নানা-শ্বশুর-শাশুড়ীর আত্মীয়তার বন্ধন আত্মীয়তার সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে জড়িত পাবে, যেন তার ফলে মানুষের সামষ্টিক জীবন, সুসংবদ্ধ জীবন, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক জীবন গড়ে উঠতে পারে এবং নৈরাজ্যের পরিবর্তে জীবন-পথের পথিকরা সুসংগঠিত এক-একটি কাফেলারূপে অগ্রগতি ও বিকাশের দিকে অগ্রসর হতে পারে। ৭ নম্বরের আয়াতে দাদা ও শ্বশুর-শাশুড়ীর সম্পর্ক সৃষ্টির যে অসাধারণ কল্যাণের কতা ইঙ্গিতের মধ্যে আবৃত করে দেয়া হয়েছে, ৮ নম্বর আয়াত সেই কথাটিকেই অধিকতর ব্যক্ত ও প্রাঞ্জল করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে যে, প্রকৃতিই এ আত্মীয়তার যৌগিকতার দ্বারা এক-একটা সুসংবদ্ধ পরিবার গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। এ পরিবাসমূহের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে গোত্র বা সমাজ এবং এই সমাজই রূপান্তরিত হবে এক-একটি বৃহত্তম জাতিতে। তা মানবতার এ কাফেলাকে সুসভ্য ও সংস্কৃতিসম্পন্ন জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

এ বিশ্লেষণ থেকে আমাদের সামনে একটি অতিবড় তত্ত্ব উদঘাটিত হচ্ছে। ইসলামী যৌন-দর্শনের এ মহাসর্তকে কারো পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব নয় যে, যৌন আবেগ মানুষের সাথে মানুষকে সম্পর্কিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ আবেগ থেকেই কত শত আবেগ অনুভূতির উপধারা প্রবাহিত হয়, তা গুণেও শেষ করা সম্ভব নয়। এ ধারা যদি কখনও শুষ্ক হয়ে যায়, তা হলে মানবতার ও সভ্যতা-সংস্কৃতির বিশাল ক্ষেতের ফসল শুকিয়ে মূল্যহীন হয়ে যাবে। নৈকট্য, একাত্মতা, ভালোবাসা, বন্ধুত্বের কত যে অগণিত শাখা-প্রশাখা সে বৃক্ষমূল থেকে নির্গত হয়, তার কোনো শেষ নেই; কিন্তু এখানে যৌনতাই একমাত্র জিনিস, তা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা মানুষের বুকে প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার আরও অনেক নদী-খালের প্রবাহ চলে, যেগুলোর উৎস যৌনতা (sex) থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। যৌনতার সাথে তার কোন সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাছাড়াও মানুষের জন্যে অসংখ্য প্রেরণা উৎস রয়েছে, যা হয়ত সহসাই মানুষের চোখে পড়ে না।

ইসলামী দৃষ্টিকোণে যৌন আবেগের গুরুত্ব কতখানি, তা উপরিউক্ত বিশ্লেষণে প্রকাশমান হয়েছে। অতএব এ আবেগের পূর্ণমাত্রার চরিতার্থতার জন্যে সুষ্ঠু-বিশুদ্ধ-পবিত্র প্রবাহপথ অবাধ ও উন্মুক্ত থাকা একান্ত আবশ্যক। অন্যথায়, এই প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গেলে এ উৎস থেকেই মানব সমাজের যে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে, তা অত্যন্ত মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পথে প্রবাহিত হতে থাকবে। সেই সাথে মানবীয় মহান মূল্যমানের আরও যে সব গুরুত্বপূর্ণ অংশ বইয়ে নিয়ে যাবে, তা জানা ও চিহ্নিত করাও হয়ত সম্ভব হবে না। যৌন আবেগের স্বভাবসম্মত প্রবাহ পথ উন্মুক্ত করে না দিলে তার অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে মানসিক বিপর্যয়ের (Mental disorders) সৃষ্টি হবে এবং গোটা সমাজ সংস্থা ভেঙ্গে পড়বে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও, তাতে সন্দেহের অবকাশ খুব সামান্যই থাকতে পারে।

উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা কোনোক্রমেই মনে করা যেতে পারে না যে, মানবীয় যৌন আবেগের প্রবাহিত হওয়ার সঠিক পথ তাই হতে পারে, যা জীব-জন্তু ও উদ্ভীদের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটি দেহতাত্ত্বিক বা দেহগত দাবি পূরণের জন্যে রাখা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে দেহগত তাগিদ-দাবিকে অসংখ্য আবেগ ও নৈতিক দাবিসমূহের সংমিশ্রণে একত্রিত করে প্রকৃত সম্পূর্ণ ভিন্নতর একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এখানে নৈরাজ্যের কোনো অবকাশ নেই, নেই নির্বিচারে প্লাবনের ন্যায় অন্ধভাবে প্রবাহিত হওয়ারও কোনো সুযোগ। তাকে অবশ্যই সুনিশ্চিত ও সীমাবদ্ধ নিয়ন্ত্রিত নালার (Channel) মধ্যে প্রবাহিত হতে হবে। ইসলাম এ কারণেই সে প্রবাহকে বৈরাগ্যবাদ ও ব্রহ্মচর্য বা কুমারিত্ব দ্বারা শুকিয়ে ফেলার চেষ্টার প্রতি তীব্র অসম্মতি ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু সেই সাথে অপরদিকে তার সর্বপ্লাবী সয়লাভ হয়ে প্রবাহিত হওয়ারও কোনো অনুমতিই দেয়নি, কোনো সুযোগ বা অবকাশই রাখা হয়নি তার। বরং তার সুষ্ঠু ও সুনিয়ন্ত্রিত অথচ অবাধ প্রবাহকে অব্যাহত রাখার জন্যে বিবাহের ‘চ্যানেল’কে কার্যকর করে তুলেছে। বস্তুর ইসলামের দৃষ্টিতে ‘বিয়ে’ই হচ্ছে যৌন আবেগ প্রবাহিত হওয়ার স্বভাবসম্মত সুষ্ঠু ও পরিমার্জিত উন্মুক্ত পথ। আবেগের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত ও মানব প্রকৃতি নিহিত সমস্ত দাবি ও প্রবণতার সম্পূর্ণরূপে ও এক সাথে চরিতার্থ হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে তাতে। ‘বিয়ে’ মানব প্রজাতি রক্ষার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। উভয় লিঙ্গের আবেগ নিহিত ও আনুভূমিক শান্তি-তৃপ্তি-স্বস্তিরও কার্যকর ব্যবস্থা তাই, তাতে প্রেম-ভালোবাসা, দয়া-সহানুভূতি-প্রীতি-বাৎসল্যের স্থায়ী বন্ধনও কায়েম হয়ে যায়। দাদা-শ্বশুর পর্যায়ের আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার, বংশ-গোত্র ও জাতীয় অস্তিত্ব গড়ে তোলাও তারই মাধ্যমে সম্ভব। আর এরই সাহায্যে একটা সুস্থ-নিষ্কলুষ সামাজিক জীবন প্রাসাদ নির্মাণ করা যায়। পক্ষান্তরে যিনা-ব্যভিচার প্রজাতি রক্ষার পাশবিক পন্থা হয়তো হতে পারে এবং তাছাড়া দেহগত চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়াও সম্ভব। কিন্তু মানব প্রকৃতির পরবর্তী ও অন্যান্য দাবি –প্রবণতা যা যৌন আবেগের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে –পূরণ হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। কেননা যিনা-ব্যভিচার পরিবার ও সমাজ-জীবনকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। বস্তুত বিয়ে সুষ্ঠু-সুসংবদ্ধ সমাজ জীবনের পবিত্র প্রশস্ত রাজপথ। আর যিনা নৈরাজ্যের সর্বধ্বংসী উচ্ছৃঙ্খলতা ও পংকিলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কোনো সমাজে ‘বিয়ে’র স্বাভাবিক পথে যদি নানারূপে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তথায় যৌন আবেগ অনিবার্যভাবে ব্যভিচারের পথ উন্মুক্ত করবেই। আর এ আবেগটি যদি একবার তার নিয়ন্ত্রিত পথ অতিক্রম করে দু’কূল ছাপিয়ে অন্ধভাবে বইতে শুরু করে দেয়, তাহলে ক্রমশ ‘বিয়ে’র বাধ্যবাধকতাকে সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। এ কারণে ইসলাম বিয়েকে যেমন বাধ্যতামূলক করেছে তেমনি তার সমাজে এ কাজকে সহজতর এবং ব্যভিচারকে অসম্ভব বানানোর জন্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছে।

মনে রাখতে হবে, মানুষের যৌন আবেগকে অবদমন ও প্রতিরুদ্ধ করা একদিকে, আর অপরদিকে তাকে স্বভাবসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত চ্যানেলের দু’কূল ছাপিয়ে প্রবাহিত হতে দেয়া অন্যদিকে –এ দু’টি ব্যাপারেই ব্যক্তিজীবনে ও সমাজের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও সর্বাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার বৈধ পথে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করা হলেও তা ব্যক্তির মানসিক বিপর্যয় (Mental Discorder) এবং সামাজিক ব্যাপক ভাঙ্গন নিয়ে আসবেই। আরতাকে যদি নির্বিচার প্লাবন হয়ে প্রবাহিত হতে দেয়া হয়, তাহলেও এ আবেগ একদিকে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতাকে এবং অপর দিকে সমাজের নৈতকি পবিত্রতাকে একেবারে বরবাদ করে দেবে –ইসলাম এ সত্যকে নৈতিক প্রশিক্ষণ ও আইনের শাসন ব্যবস্থায় চমৎকার ও পুরাপুরিবাবে সম্মুখে রেখেছে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য সহকারে।

বাচ্চাদের মধ্যে যৌন প্রবৃত্তি জন্মগতভাবেই বর্তমান থাকে, যেমন থাকে অন্যান্য প্রবৃত্তিও। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে তাকে যা কিছু নিয়ে উঠতে হবে তার সব কিছুরই মৌলিক ভাবধারা তার মধ্যে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত থাকে। এমন কি যুক্তিবিদ্যা ও গাণিতিক জ্ঞানের বীজও প্রকৃতিই বপন করে তার মধ্যে। যৌন আবেগ একটা আবেগই, কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, বাচ্চা জন্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই কি তার যৌন আবেগ কাজ করতে শুরু করে দেয়? পাশ্চাত্য দার্শনিক বিজ্ঞানীরা –বিশেষ করে ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদরা এ প্রশ্নের জবাবে দাবি করেছেন যে, হ্যাঁ, বাচ্চার যৌন আবেগ জন্মের সাথে সাথে ও তাৎক্ষণিকভাবেই কাজ করে শুরু করে দেয়। কিন্তু এ পর্যায়ে যে সব সাক্ষ্য প্রমাণের উল্লেখ তারা করেছে, তা যেমন নিছক অনুমান মাত্র, তেমনি নিতান্তই গোজামিলের সাহায্য গ্রহণ করা হয়েছে, বলতে হবে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় মা’র স্তন চোষণে –ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদের মতে –শিশুর যৌন আবেগের তৃপ্তি-স্বস্তি সাধিত হয়। আর তা থেকেই সে প্রথম খাদ্য বা প্রাথমিক উত্তেজনা লাভ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু দুগ্ধ সেবনে যে স্বাদ আস্বাদন হয় তা-ই যদি ভিত্তি হয় এই যুক্তির, তহলে আমরা যদি এই স্বাদ আস্বাদনের অন্য কোন সরল-সহজ ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করি তাহলে তখন এই যুক্তির কোথায় থাকবে? সোজা কথা, শিশুর কামনায় সবচাইতে বলিষ্ঠ উৎস হচ্ছে তার ক্ষুধা আর প্রকৃতির গোপন ইঙ্গিতে সে তার হাতিয়ারসমূহের মধ্যে কেবল সেইটিই সর্বপ্রথম কাজে লাগাতে পারে, যেটিকে সে খাদ্য গ্রহনের জন্য ব্যবহার করতে পারে। এ কারণে তার স্বাদ ও বেদহার কেন্দ্রবিন্দু এই ক্ষুধা ও খাদ্য ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। পরবর্তীতে এ শিশু যখন বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে, তখন তার প্রাথমিক অভিজ্ঞতার সব কিছুই কেবল তার মুখকে কেন্দ্র করেই হয়। সে তার খেলনা, কাপড়, মাটি ও পাথর খণ্ড তুলে মুখে পুরতে থাকে। কেননা তার চেতনা এখনও ঘুমন্ত। আর আরাম-বিশ্রামের নেতিবাচক কামনা ছাড়া ক্ষুধা ব্যতীত অপর কোনো ইতিবাচক কামনা কার্যকর থাকে না বলেই সে অন্য কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারে না। ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ যাচাইয়ের তার এখনকার মানদণ্ড কেবলমাত্র তার মুখ। তার সমস্ত স্বাদ আস্বাদনের ব্যাপারও ঘটে এ মুখকে কেন্দ্র করেই। তখন তার মুখের পেশীসমূহ তীব্রভাবে ‘লালা’ বের করতে থাকে। সেজন্যও যা-ই পাওয়া বা ধরা তার পক্ষে সম্ভব, সে সেটিতেই মুখ লাগিয়ে দেবে। অতএব দুগ্ধ চোষার আস্বাদন সম্পূর্ণটাই প্রকৃতির এ ব্যবস্থার ওপরই ভিত্তিশীল যে, শিশু তার অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক দাবি –খাদ্য গ্রহণ –পূরণ করতে সক্ষম হবে। -এর সাথে যৌন আবেগের সংযোগ কোথায় পাওয়া গেল, এ পর্যায়ে তার প্রশ্নই বা উঠছে কেন?

দ্বিতীয় যুক্তি এই দেখানো হয়েছে যে, শিশুর জীবনের প্রাথমিক কয়েকটি বছর নিজের মন ও নিজ দেহের নিম্ন পর্যায়ের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের প্রতি তার খুম বেশী কৌতূহল থাকে। এ কৌতূহলকে যৌন-আবেগের চরিতার্থতা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করা চলে না।

সন্দেহ নেই –দেহের নিম্নদেশীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে মল-প্রস্রাব ত্যাগের মাধ্যম বানানোর সাথে সাথে তাকে যৌনতার সাথে জুড়ে দিয়ে বড়ই বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়া হয়েছে। অন্যথায় দেহের আবর্জনা নিষ্কাশনের মাধ্যমে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সারাটি জীবন নিজ দেহের সাথে যুক্ত রেখে বহন করে চলা মানুষের পক্ষে সম্ভবই হত না। কিন্তু একটি শিশুর যেমন ময়লা-আবর্জনা ও পরিচ্ছন্নতার পার্থক্য বোধ থাকে না, তেমনি তার মধ্যে এ উদ্দেশ্যের জন্য যৌন আবেগের বর্তমান থাকাও কিছু মাত্র জরুরী হয় না। দেহের নিম্নদেশীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি শিশুর আগ্রহের অপর একটি সহজ-সরল বিশ্লেষণও সম্ভব। বস্তুত প্রকৃতি দেহ ব্যবস্থাকে হৃদয় ও  মনের সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত করে দিয়েছে যে, দেহ যেসব জিনিসের প্রয়োজন বোধ করে তাকে অর্জন করে এবং যেগুলোকে প্রতিরোধ করতে চায় সেগুলোকে প্রতিরোধ করে মন-হৃদয় স্বাদ ও আরাম অনুভব করে। এ কারণে মল-প্রস্রাব যখন দেহের নিম্ন প্রদেশে পৌঁছে যায়, তখন তাকে বাইরে ঠেলে দেয়ার জন্য একটা চাপের সৃষ্টি হয়। আর তার নিষ্কাশন সম্পন্ন হয়ে গেলে ‘ক্ষতি প্রতিরোধ’ নীতির অধীন স্বাদ বা তৃপ্তি অনুভূত হওয়া একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তৃপ্তি বা স্বাদের এ অনুভূতিই নিম্নদেশীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি শিশুর কৌতূহল সৃষ্টির কারণ হয়ে থাকে। -নিম্ন দেশীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি শিশুর কৌতূহলের ব্যাখ্যাস্বরূপ এতটুকু বলা কি যথেষ্ট নয়?

ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদরা সকল প্রকারের মানসিক বিপর্যয়কে যৌন আবেগের অধীনে নিয়ে আসার জন্যে নানা অসংলগ্ন কথাবার্তা ও প্রলাপ পর্যায়ের যুক্তির জাল ব্সিতার করেছে। চুরি, পকেট কাটা ও হত্যা ইত্যাদির অপরাধীদের মনে যৌন-আবেগের তীব্র তাড়নার প্রভাব প্রমাণ করার জন্যও তাদের চেষ্টার অন্ত নেই। দৃষ্টান্ত দিয়ে দিয়ে দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, একজন চোরের চৌর্যবৃত্তির অভ্যাস হওয়ার সূচনাতে নিশ্চয়ই একটি যৌন আবেগ তার সাথে যুক্ত হয়েছিল। অথচ এসব অসৎ কার্যকলাপের অভ্যাস হওয়ার আরও বহু প্রকারের কারণ সমাজে-পরিবারে বর্তমান থাকতে পারে। যেমন শিশুর আগ্রহের দ্রব্যাদ যদি পিতামাতা তার সম্মুখেই লুকিয়ে রাখে, তা হলে এ আচরণ তার মধ্যে একটা বিদ্রোহাত্মক প্রবণতা এবং তার ফলে চুরি করার প্রবল ইচ্ছা তার মধ্যে জাগিয়ে দিতে পারে। অনুরূপভাবে শিশুর ওপর যেসব কামনা-বাসনার চাপ এটা পরিবেশের মধ্যে পড়ে স্বয়ং পিতামাতা তা পূরণ করে না দিলে শিশু টাকা বা দ্রব্যটি চুরি করে নিজের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করতে পারে। এভাবে অন্যান্য প্রবণতাও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পরিবেশ হতে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও এ সব কিছুকে যৌন আবেগের সাথে যুক্ত করে দেয়া হাস্যকর নয় কি?

এ পর্যায়ের একটা যুক্তিকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুভূতি’ বা Oedipus Complex বলে দাঁড় করানো হয়েছে। আর এটা ফ্রয়েডীয় যৌন দর্শনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগও বটে। কিন্তু স্বয়ং ফ্রয়েডপন্থী চিন্তাবিদরা এর প্রতি একবিন্দু আস্থা স্থাপন করতে পারে নি। কেউ কেউ বলেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই অনুভূতি প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের প্রকৃতির গভীরে শিকড় হয়ে বসেছে। অপর কতিপয় ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদদের মতে তা এমন একটা স্বভাবগত আবেগ যা কেবল মনস্তাত্ত্বিক রোগেই স্বীয় প্রভাব দেখায় না, ব্যক্তির সঠিক ঠিকানা এবং আরও সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে সামাজিক রসম-রেওয়াজ, সামষ্টিক প্রতিষ্ঠান এবং ধর্ম ও নৈতিকতার বিকাশেও বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।

ফ্রয়েড নিজেও এই দার্শনিক মতের ব্যাখ্যাদানে খুব একটা যথার্থ কথাবার্তা বলতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তাঁর Three Contributions to Sexual Theory (১৯০৫ খৃ.) গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে য, শিশু যখন একেবারে সুবোধ মাসুম থাকে, তখন তার যৌন তাড়না (Urge) নিজের পথ জানে না এবং একজন পুরুষ শিশু যখন মায়ের স্তন চুষতে থাকে, ঠিক সেই অবস্থায়ই তার যৌন-কামনা মা’র ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে (নিতান্ত লজ্জাস্কর হওয়া সত্ত্বেও আবরণ খুলে ফেলার জন্য আমাকে এর উল্লেখ করতে হচ্ছে বলে দুঃখিত) পড়ে। সে মাকে পিতার দিকে এবং পিতাকে মা’র দিকে কৌতুহলী দেখতে পেয়ে পিতাকে তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে লক্ষ্য করে এবং তার মনে পিতার বিরুদ্ধে নিতান্তই অবচেতনভাবে যৌন প্রতিদ্বন্দ্বীতা জেগে উঠে, যা উত্তরকালেও তার মধ্যে পুরোপুরি কাজ করতে থাকে।

অতঃপর Totem and Taboo এবং Psychology গ্রন্থে বোঝাতে চেয়েছে যে, (তার দৃষ্টিতে পাপ অনুভূতিই হল সমস্ত ধর্ম ও নৈতিক ব্যবস্থার মূল) সেই পাপ অনুভূতি ‘ঈডিপাস কমপ্লেকস-এরই কার্যক্রমের ফলশ্রুতি হয়ে থাকে। আর এ কারণে গোটা বংশে –অন্তর তার এক-অর্ধ পুরুষ শ্রেণীর লোকদের মধ্যে ‘পাপ অনুভূতি’ স্বভাবগত হয়ে দাঁড়ায়। তার লেখা পরবর্তী এক প্রবন্ধে (The passing of Oedipus Complex) বলেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগ প্রত্যেক নিষ্পাপ শিশুর মধ্যেও থকে। কিন্তু শিশু কি তা জন্মগত স্বভাবরূপে পায় কিংবা সে নিজ স্বভাবে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে নেয় –এই প্রশ্নের কোনো জবাব ফ্রয়েডের নিকট পাওয়া যায়নি।

আরও সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলতে চেয়েছে যে, এই ‘যৌন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগ’ বাল্যকালে স্বতঃই মরে যায়। এ কথাটির ফলশ্রুতি তো এই দাঁড়ায় যে, এই আবেগপূর্ণ বয়স্কদের মধ্যে হলে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে মনস্তাত্ত্বিক রোগী  হবে। মোটকথা এখানে ফ্রয়েডের ‘ঈডিপাস কমপ্লেক্স’-এর ভিত্তিতে ও নৌতিকতার সব নির্মাণ কার্য হয় নিষ্পাপ শিশুদের মগজ নিঃসৃত অথবা তা নির্মিত মনস্তাত্ত্বিক রোগীদের দ্বারা। কেননা ‘ঈডিপাস কমপ্লেক্স’-এর সব মাল-মসলা তো কেবল এ দু’জনের নিকটই পাওয়া যায়। এই দর্শনটি অন্য একটি দিক দিয়েও ত্রুটিপূর্ণ –ফ্রয়েড নিজেও সেজন্যে নিরুপায়। তা হচ্ছে, এ দর্শনের গঠন কেন্দ্র। কেবল পুরুষ শিশু –স্ত্রী শিশুর কোনো স্থান নেই এ মতাদর্শের বেষ্টনীতে। একটি স্ত্রী-শিশুর মধ্যে এই অনুভূতি ও আবেগ কিভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে?

ফ্রয়েড নিজের নির্বুদ্ধিতাসমূহকে বিজ্ঞান নামে চালিয়ে দুনিয়ার কত মানুষকে যে বিভ্রান্ত করেছে, তা গুণেও হয়ত শেষ করা যাবে না!

সোজা কথায় বলা যায়, শিশুর দু’টি প্রাথমিক স্বভাবগত-জন্মগত প্রবৃত্তি হচ্ছে ‘ক্ষুধা’ ও ‘বিশ্রাম লাভ’। আর এ দু’টির জন্য মা-ই হচ্ছে তার লীলা-কেন্দ্র। ‘ভয়’-এর ক্ষেত্রে আবারসেই মা-ই হচ্ছে তার আশ্রয়। ফলে মা অতি স্বাভাবিক ও অবচেতনভাবে শিশুর ভালোবাসার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। আর ভালোবাসা এমনই একটা আবেগ, যা নিজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বীজও জিইয়ে রাখে।

ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রবণতা বা প্রকৃতি হচ্ছে একত্ব –অংশীদারত্বহীনতা। ধন-সম্পদ ও দ্রব্য-সামগ্রীর প্রতি ভালোবাসা ব্যক্তি কালিকত্ব সংরক্ষণের আবেগরূপে মানব সমাজে সক্রিয় থাকে। শিশুর স্বাভাবিক ইচ্ছা হচ্ছে স্বীয় ভালোবাসা-কেন্দ্রের ভালোবাসা পর্যায়ের যাবতীয় তৎপরতা ও কার্যকলাপের একমাত্র অধিকারী হবে সে, তাতে অন্য কারো অংশীদারিত্বকে সে স্বতঃই অপছন্দ করে। পুরুষ-স্ত্রী উভয় শিশুই পিতার প্রতিকূলে নিকট বয়সী ভাইবোনদের বিরুদ্ধে অধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পোষণ করে। নবজাতকের জন্মগ্রহণের পরই তার চাইতে বয়সে বড় শিশুদের মনে এ অনুভূতি জেগে ওঠে যে, তার ভালোবাসা কেন্দ্রকে একজন নতুন প্রতিদ্বন্দি সহসাই এসে দখল করে নিয়েছে। পরে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাবধারা নবজাতকের মধ্যে ধীরে ধীরে তার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে অর্থাৎ তার সূচনা হয় সম্পূর্ণ বিপরীত দিক থেকে। বহু পরিবারেই তার মহড়া অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই বোন, দুই ভাই বা দুই ভাইবোনের মধ্যেও হতে পারে। অনেক সময় তা বেশি বয়স পর্যন্তও কাজ করতে থাকে। তাছাড়া শিশুর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাবধারা কেবল মা’র সাথেই বা মাকে নিয়েই তো হয় না। খেলনা, বিশেষ শয্যা, নিজের জন্য নির্দিষ্ট থালা-বাটি-বই ইত্যাদি নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে। আর তা যেমন মা’র ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে হয়, তেমনি হয় পিতার স্নেহ-বাৎসল্য পাওয়ার জন্যেও। অন্য কথায়, ভালোবাসা সহজ-সরল ধারণানুযায়ী স্বতঃই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বীজের ধারক হয়। সকল প্রকারের ভালোবাসা সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। চাকর-চাকরানীদের মধ্যেও স্নেহদৃষ্টি লাভের জন্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সমাজকর্মী বা একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও নেতার প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্যে এরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। প্রেমিক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে অপরাপর প্রেমিকাদের বিরুদ্ধে প্রিয়তমার প্রেম লাভের জন্যে, যেন সে অন্যদের বাদ দিয়ে কেবল তাকেই গ্রহণ করে।

এটা একটা সাধারণ আবেগ। এ সাধারণ আবেগকে ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’ নাম দিয়ে একটি দার্শনিক মতাদর্শ বানিয়ে দেয়া এবং তাতে ‘পাপ’ অনুবূতির ভাবধারা সৃষ্টি করে দাবি করা যে, এ ভাবধারাকে কেন্দ্র করেই ধর্ম ও নৈতিকতার ব্যবস্থা আবর্তিত হয়, -একটি অসামঞ্জস্য প্রতারণামাত্র এবং এ সামস্যহীন প্রতারণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ফ্রয়েডীয় দার্শনিকতার সুরম্য প্রাসাদ। ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদদের আসল ভুল এখানে নিহিত যে, তারা মনে করে নিয়েছে যে, All love is a manifestation of the sex listinct –যৌন আবেগের প্রকাশনাই সমস্ত প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার উৎস। যারা যারাই এ বিশ্বাস মনে বদ্ধমূল করে যৌন-দর্শনের ক্ষেত্রে পদচারণা শুরু করেছে, তারা তো সকল পবিত্র-নিষ্কলুষ আবেগ-ভাবধারাকে কলুষতায় আকীর্ণ করে দেবেই, এ ছাড়া তারা আর কিই-বা করতে পারে।

আমরা মনে করি, ব্যাপারটিকে সহজ-সরলভাবেই গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়, জটিল দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে সহজকে জটিল বানানো চিন্তাবিদদের একটা ফ্যাশনই বলতে হবে। সোজা কথা, মানব চরিত্রের অভ্যন্তর থেকে প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার বহু কয়টি ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। তার মধ্যে একটি স্বীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির জন্যে, একটি নিজের ভাই বোন মা-বাপ থেকে শুরু করে রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়ে দেশ, জাতি ও গোটা বিশ্ব মানবতা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ে। আর একটি ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন স্বয়ং বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর রাসূল (স)। অপর একটি ধারা উত্তম জীবনাদর্শ ও নৈতিকতার দিকে প্রবহমান আর একটি সৌন্দর্য প্রীতির দিকেও। কিন্তু ভালোবাসা প্রীতির এ ধারাসমূহকে যৌন আবেগের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া কলুষ-পংকিল দৃষ্টিভঙ্গীরই উপস্থাপিত করে, সৎ ও স্বচ্ছ মনোভাবের নয়।

বস্তুত মানব প্রকৃতির নিহিত ভালোবাসার বিভিন্ন দিককে যদি স্বতন্ত্র মর্যাদা দেই, তাহলেই যৌন-ভালোবাসাকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়ে আমরা খুঁজে দেখতে পারি, কোথায় কোথায় তা পাওয়া যায়।

যৌন-প্রেম হচ্ছে কেবল তা, যা যৌন-অনুভূতির অঙ্গগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে কর্মমুখর হওয়ার দরুন একটা বিশেষ ধরনের আবেগের রূপ ধরে সম্মুখে উপস্থিত হয়। পরিবেশ এই অনুভূতিকে কখনও কখনও নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই সক্রিয় বানিয়ে দিতে পারে। কেননা তা বাইরের আন্দোলন ও তার বিকাশ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু এটা বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট অনুভূতি। তা যতক্ষণ পর্যন্ত সুনির্দিষ্টরূপে কাজ করতে শুরু না করছে ততক্ষণ তার প্রকাশ লাভের পূর্বেই শিশুর প্রত্যেকটি ভালোবাসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগে সেই যৌন-অনুভূতির অস্তিত্ব প্রমান করতে চাওয়ার বা সেজন্য চেষ্টা করার কোনো অধিকারই কারো থাকতে পারে না –বিশেষ করে এজন্যেও যে, তার ভালোবাসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যান্য বহু কয় সহজ ব্যাখ্যা দান খুই সম্ভব।

সকল জন্মগত প্রকৃতিরই নিয়ম হলো, তা স্বীয় কাজ প্রকৃতির নিয়মানুযায়ীই সম্পন্ন করে থাকে –যৌন আবেগ এ নিয়মের বাইরে নয়। তা সেই গতিতেই কাজ করে যে গতিতে যৌন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পূর্ণত্ব হতে থাকে। একদিকে যৌন অঙ্গের বিকাশ অভ্যন্তরীণ দিক থেকে ধাক্কা দেয় আর অপরদিকে মানবতার দুই লিঙ্গে বিভক্ত হওয়াটাই একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায় বাইরে থেকে আন্দোলনের। আর লিঙ্গদ্বয়ের পার্থক্যপূর্ণ দিকসমূহই পারস্পরিক এক তীব্র আকর্ষণ (Attraction) সৃষ্টি করে। তারপর ধীরে ধীরে সে আকর্ষণের জন্যেই সেই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কেন্দ্র বানিয়ে দেয়, যা লিঙ্গদ্বয়ের মাঝে একটি চূড়ান্ত সীমানা বানিয়ে দেয়। তার সাথে সাথে প্রকৃতির গোটা শিল্প, রঙ ও গন্ধের তরঙ্গমালা ও দিন-রাতের মনোরম মনোহর দৃশ্যাবলী সবই মানবীয় যৌন আবেগের ওপর প্রভাবশালী হয়ে থাকে। এমনি করেই তা তার বিকাশকে সম্পূর্ণ করে নেয়।

যৌন আবেগ অন্যান্য সব আবেগের মতোই মানুষের মন ও মানবীয় স্বভাব চরিত্রের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। এই আবেগের স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকা, তার অবদমিত হওয়া এবং তার সীমাকে লংঘন করে যাওয়া –এ তিনওটি অবস্থা মানব জীবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তার করে থাকে। নীতিগতভাবে একথা সকল প্রকারের আবেগ সম্পর্কে বলা চলে। বাড়াবাড়ি, প্রয়োজনের চাইতে কম এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা –যে কোন আবেগের ন্যায় যৌন-আবেগের ওপর উক্ত তিনটি অবস্থায় যে কোনো একটি আবর্তিত হলে গোটা সমাজ কাঠামোই তাতে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

পাশ্চাত্য সমাজে যৌন দর্শন যে পরিবেশের মধ্যে উৎকর্ষ লাভ করেছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিন্তা-বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। সেখানকার সমাজকে ধর্ম, নৈতিকতা ও আবহমান কাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য ও নিয়ম-আইনের সীমালংঘন করার অবাধ সুযোগ করে দেয়া হলো। যৌন-বিপ্লবের পর পরিবার ব্যবস্থার ভিত্তি উৎপাটিত হলো। পাশবিক দাম্পত্য জীবনের প্রচলন হলো এবং যিনা-ব্যভিচারের একটা সর্বগ্রাসী প্লাবন সূচিত হয়ে গেল। তখন কিছু সংখ্যক নব্য দার্শনিক বেশধারী এই সর্বাত্মক বিপর্যয়কে ‘চরম উন্নতি ও প্রগতি’র সনদে ভূষিত করেছিল, তখন মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণকারীও-[‘মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ’ নামে মনোবিজ্ঞানের একটা স্বতন্ত্র School of Thought রয়েছে। কিন্তু ‘মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়’ পর্যায়ে মনস্তাত্ত্বিক School-উভয়ের মধ্যে যে মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে মিঃ উইলিয়ম ম্যাগডোগল তা বিশেষ যত্ন সহকারে উদঘাটিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মনস্তাত্ত্বিক School-এর লোকদের দর্শন চিন্তার একমাত্র ক্ষেত্র হচ্ছে Normal Psychology আর অপর দিকে Psycho-Analysis School সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ Normal Psychology-র ক্ষেত্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের (Abnormal Psychology)-এর গবেষণায় আত্মনিয়োগ করে অর্থাৎ দার্শনিকদের একটি দল সুস্থ মনস্তত্ত্বের অধ্যয়ন করে। কিন্তু রোগীদের অধ্যয়ন থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ থাকে। আর অপর দলটি রোগীদের অধ্যয়ন করে তাদের রোগাক্রান্ত থাকা অবস্থায়; কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না। ফলে উভয়ই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট বিদ্যা নিয়ে যৌন বিকৃতি সম্পর্কে যেসব তত্ত্ব পরিবেশন করেছে, তা স্বাভাবিকভাবেই অসম্পূর্ণ, অপরিপক্ক ও অপরিসর হয়ে রয়েছে।] এদের মধ্যে শামিল ছিল। তারা ব্যভিচারের পক্ষে পরিবেশ অনুকূল বানানোর লক্ষ্যে যৌন আবেগকে মানবীয় মনস্তত্ত্বের বিশাল ক্ষেত্রে বিস্তীর্ণ করে দিয়েছে এবং ব্যভিচারকে মানসিক বিকৃতিরূপে চিহ্নিত করার পরিবর্তে ব্যভিচার বিরোধী প্রাচীন বিধি-নিষেধ ও বাধা-প্রবিন্ধকতাকেই মানসিক বিকৃতির কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। ফ্রয়েডই হচ্ছে এ চিন্তাগত ও বাস্তব বিপর্যয়ের আসল হোতা। সে তো চরম নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়েছে এই বলে যে, মানসিক বিকৃতি বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড়, আসল ও মৌলিক কারণ হচ্ছে পরিবেশগত বাধা-প্রতিবন্ধকতার দরুন অবদমিত যৌন-আবেগ। ভুলে গেলে চলবে না, ফ্রয়েডের সম্মুখে যে সমাজ ছিল তাতে একদিকে এই আবেগের ওপর অবাঞ্ছনীয় বিধি-নিষেধের কুপ্রভাব প্রতিফলিত ছিল এবং অপরদিকে তাতে ব্যভিচার ও যৌন নৈরাজ্য এবং নগ্নতা ও পর্দাহীনতার অন্ধ নির্বিচার সয়লাব মাথা উঁচু করে এসেছিল। এ দু’টির পরস্পর বিরোধী কার্যকারণ একই সময় মুখোমুখি দ্বন্দ্ব করছিল এবং এ দু’টিরই দিক থেকে ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য ও সমাজের নৈতিক সুস্থতার অবক্ষয় সাধিত হচ্ছিল। ফ্রয়েড আসলে একটি রোগী সমাজের অধ্যয়ন করেছে। তখন তা এ রোগাক্রান্ত অবস্থা থেকে বের হয়ে অপর একটি রোগের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিল। ফলে সে স্বাভাবিক চাহিদা অপূরণের পুরাতন রোগকে ‘রোগ’ বলে চিহ্নিত করছিল এবং অমিতাচার অযৌক্তিকতার (Extravagance) নতুন রোগকে সুস্থতা-স্বাভাবিকতার মানদণ্ডই বানিয়ে দিয়েছিল। তার দৃষ্টিভঙ্গীই বানিয়ে নিয়েছিল যে, যৌন আবেগ চরিতার্থতার পথে যে-কোন বাধা –তা পর্দা, পোশাক, মুহাররম আত্মীয়দের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধাবোধ কিংবা ব্যভিচার নিষিদ্ধকারী আইন-কানুন অথবা বিয়ের বন্ধন যা-ই হোক, যেরূপেই হোক, সবই উৎপাটিত করা এবং তাকে এ সব কিছু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করাই প্রকৃতির চাহিদার সাথে পুরমাত্রায় সঙ্গতিপূর্ণ। ফ্রয়েড মানবীয় মনস্তত্ত্বের অনাবিল-নির্ভেজাল অধ্যয়ন ও গবেষণার পরিবর্তে সমসাময়িক সমাজের যৌন প্লাবনের স্রোতে ভেসে গেছে এবং তাঁর সমস্ত মেধা ও  প্রতিভাবে ধর্ম ও নৈতিকতার বিধি-বন্ধনের বিরুদ্ধে নাস্তিকতা, অশ্লীলতা, যৌন অনাচার ও উচ্ছৃংখলতাকে ব্যাপক ও দৃঢ়মূল করে তোলার অপচেষ্টার সর্বাত্মক ব্যবহার করেছে।

ফ্রয়েডীয় চিন্তাবিদদের দাবি হচ্ছে, পর্দা লোকদের মনে কৌতুহল (Curiosity) বা অনুসন্ধিৎসার সৃষ্টি করে। এই কারণে যৌন আবেগের প্রতিক্রিয়া (Reaction) তাদের জন্য মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়। ফ্রয়েডীয় চিন্তার পূর্বোক্ত পরিবেশের প্রেক্ষিতে এরূপ দাবির কারণ সহজেই বোধগম্য হয় এবং তা যে বিকৃত পরিবেশের অসুস্থ প্রতিক্রিয়ারই প্রকাশ, তাতে কোনোই সংশয় থাকে না। উক্তরূপ বিকৃত ও কলংক-কলুষ সমাজ-পরিবেশে মানবীয় যৌন আবেগ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা না করলে যে উক্তরূপে দাবি উত্থাপিত হত তা-ও অতি সহজেই বুঝতে পারা যায়। আমরা বলতে পারি, ফ্রয়েডীয় যৌন দর্শনের যে কৌতুহলের ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে তা শুধু মুখাবয়ব উন্মুক্ত হলেই তো চরিতার্থ হবে না। বরং মুখাবরণ অপসারিত হওয়ার পর তা আরো উদগ্র হয়ে উঠবে। অতঃপর পুরুষ-নারীর পরনের কাপড় অপসারিত করার প্রবল দাবিও উত্থাপিত হবে। পাশ্চাত্য সমাজে যে Bottomless বা Topless পোশাক, নগ্নদের সমিতি ও ক্লাব ঘর –ইত্যাদি ব্যাপক হয়ে গেছে তা কি সে ‘উদগ্র যৌন কৌতূহলে’রই ফলশ্রুতি নয়? পাশ্চাত্য সমাজ লোকদের সে কৌতূহল নিবৃত্ত করার জন্যেই তো প্রায় উলংগ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নানা প্রকারের নৃত্য কলা ও নাটক-অভিনয়ের প্রভাবে অনুরূপ শত শত হাজার-হাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সিনেমা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সেই কৌতূহলেরই নিবৃত্তি চলছে! উইলিয়াম ম্যাকডোগালের একটা উদ্ধৃতি এই প্রক্ষিতে খুবই সামঞ্জস্যশীল মনে হচ্ছে। তা হচ্ছেঃ

In every society in which custom permits of every free intercourse of the sexes, inverted sexual practices commonly flourish amonh the men –In this way also we understand how, in all societies some men of middle age who have led a life of free indulgence with the opposite sex turn to members of their own sex in order to obtain the stimuls of novelty.

একটি পর্দাহীন বন্ধনহীন নির্লজ্জ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাপূর্ণ সমাজ যে কি সাংঘাতিক পরিণতির সম্মুখীন হয় তা উপরোদ্ধৃত কথার আলোকে সহজেই বুঝতে পারা যায়। বস্তুত কোনো সমাজে যখন পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা সাধারণ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন যৌন আবেগ নিত্য নব বচিত্র দাবির অধীন নতুন নতুন দুষ্টামির উদ্ভাবন করে। পাশ্চাত্যের বে-পর্দা নগ্ন সমাজে যৌন আবেগ চরিতার্থ করার জন্যে স্বভাবসম্মত পন্থা অবলম্বনের বিপুল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কি সব বিচিত্র ধরনের উপায় উদ্ভাবন করেছে এবং কি কি নতুন নতুন ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জন করেছে –নিতান্তই নির্লজ্জতার প্রশ্রয় দিতে পারি না বলেই তার উল্লেখ থেকে বিরত থাকতে হলো। আমাদের বক্তব্য হলো, ‘কৌতূহলে’র দোহাই দিয়ে পাশ্চাত্য সমাজে এবং তার অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে প্রাচ্যদেশীয় সমাজরে পর্দাহীনতা ও পুরুষ নারীদের অবাধ মেলামেশার যে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে তার পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে সর্বত্রই। -এ সবেরই ফলে যৌন আকর্ষনই নিঃশেষ হয়ে যায়, যৌন আবেগ এতটা শীতল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে যে, তাকে সক্রিয় রাখার জনে অসংখ্য ধরনের কৃত্রিম পন্থা অবলম্বন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য সমাজ আজ সে মারাত্মক অবস্থারই সম্মুখীন। প্রশ্ন হচ্ছে, পর্দাহীনতা, নগ্নতা, যৌন নৈরাজ্য ও ব্যভিচারের পূর্ণ স্বাধীনতার মানদণ্ড বানানো হচ্ছে যে সমাজকে, সেখানকার ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক বিকৃতি-[‘মানসিক বিকৃতির’ বিভিন্ন কারণের উল্লেখ ও সে সম্পর্কে বিশদ আলোচনা বর্তমান গ্রন্থে প্রাসঙ্গিক নয়। এ পর্যায়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে মানসিক বিকৃতি বিপর্যয়ের মৌলনীতি হচ্ছে ‘বৈপরীত্য’। মনস্তাত্ত্বিক জগতে বৈপরীত্য –তা যৌন ঝোঁক প্রবণতা সম্পর্কিত হোক, অথবা অপর কোনো ঝোঁক-আবেগ। কামনা-ইচ্ছা বা প্রকৃতিগত প্রবৃত্তিই হচ্ছে মানসিক বিকৃতির মৌল কারণ। কুরআন মজীদ বিশেষভাবে মুনাফিকদের বিস্তারিতভাবে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে, মনের ও মুখের, বিশ্বাসের ও কাজের বৈপরীত্যই তাদের চারিত্রিক সর্বনাশ সাধন করেছে। আমার লিখিত ‘পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি’ গ্রন্থে ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে।] ও তাদের সামষ্টিক জীবনে নৈতিক বিপর্যয় সে অনুপাতেই বাড়ছে না কি, যে অনুপাতে তাদের মধ্যে ব্যভিচারের প্লাবন বৃদ্ধি পাচ্ছে? মানসিক বিকৃতির সবচাইতে বেশি দৃষ্টান্ত তো উক্তরূপ সমাজেই লক্ষণীয়। সমকামিতা, পুরুষদের নারীসুলভ ও নারীদের পুরুষসুলভ আচার-আচরণ ও চলাফেরা কি এ সমাজেই বেশি দেখা যাচ্ছে না? সবচাইতে বেশি অপরাধ প্রবণতা ও ঘটনা-দুর্ঘটনাও কি এ সমাজে বেশি পাওয়া যাচ্ছে না? –এসব প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এবং তা-ই অকাট্যবাবে প্রমাণ করে যে, পাশ্চাত্য ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তারই বিভ্রান্তিতে পড়ে যেসব সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও নীতি গৃহীত হয়েছে, তা সবই সম্পূর্ণরূপে ভুল ও মারাত্মক।

এ ভুল চিন্তা ও দর্শন ইউরোপে যখন সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়, তখন অনতিবিলম্বে ইউরোপীয় সভ্যতার প্রভাবাধীন প্রাচ্য দেশসমূহেও তা ব্যাপক প্রচার লাভ করে এবং তারই প্রভাবে পড়ে প্রাচ্যের মুসলিম দেশ ও সমাজের পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ম-নীতিকে ভংগ করে পর্দাহীনতা ও নগ্নতার সয়লাব বইয়ে দেয়া হয়। আর তারই প্রচণ্ড আঘাতে মুসলিম দেশসমূহেও পরিবার ভেঙ্গে যায়, নারীরা ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে পড়ে; কিংবা তাদের টেনে বাইরে নিয়ে এসে পুরুষদের পাশে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। ফলে ইউরোপে যে ব্যাপক নৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, প্রাচ্যেও অনুরূপ কাজে অনুরূপ পরিণতিই দেখা দিয়েছে অনিবার্যভাবে। আজ আমাদের পরিবার ও পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত। অথচ মুসলিমদের পরিবার ছিল এক-একটি দুর্গ। আর পারিবারিক জীবন পবিত্র প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এবং পরম শান্তি ও স্বস্তির কেদ্রবিন্দু। সে শুভ ও কল্যাণময় অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সুষ্ঠু পরিবার ও পারিবারিক জীবন গড়ে তোলা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিবদ্ধ; বর্তমান ‘পরিবার প্রায় চার বছরকালীন ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার ফসল। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার বিচারের ভার সূধী পাঠকদের ওপরই থাকল। তবে আমার জীবন লক্ষ্য যে অতীব মহান, তাতে কোনোই সন্দেহের অবকাশ নেই।

-মুহাম্মদ আবদুর রহীম

 

প্রথম অধ্যায়

পরিবার

পরিবার রাষ্ট্রের প্রথম স্তর, সামগ্রিক জীবনের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর (First Foundation Stone)। পরিবারেরই বিকশিত রূপ রাষ্ট্র। স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, মাতা-পিতা, ভাই-বোন প্রভৃতি একান্নভুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে পরিবার। বৃহদায়তন পরিবার কিংবা বহু সংখ্যক পরিবারের সমন্বিত রূপ হচ্ছে সমাজ। আর বিশেষ পদ্ধতিতে গঠিক সমাজেরই অপর নাম রাষ্ট্র। একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রের মূলে নিহিত রয়েছে সুসংগঠিত সমাজ রাষ্ট্র, সমাজ। ও পরিবারের ওতপ্রোত এবং পারস্পরিকভাবে গভীর সম্পর্কযুক্ত। এর কোন একটিকে বাদ দিয়ে অপর কোনো একটির কল্পনাও অসম্ভব।

পরিবার সমাজেরই ভিত্তি। রাষ্ট্র সুসংবদ্ধ সমাজের ফলশ্রুতি। পরিবার থেকেই শুরু হয় মানুষের সামাজিক জীবন। সামাজিক জীবনের সুষ্ঠুতা নির্ভর করে পারিবারিক জীবনের সুষ্ঠুতার ওপর। আবার সুষ্ঠু পারিবারিক জীবন একটি সুষ্ঠু রাষ্ট্রের প্রতীক। পরিবারকে বাদ দিয়ে যেমন সমাজের কল্পনা করা যায় না, তেমনি সমাজ ছাড়া রাষ্ট্রও অচিন্তনীয়। তিন তলাবিশিষ্ট প্রাসাদের তৃতীয় তলা নির্মাণের কাজ প্রথম ও দ্বিতীয় তলা নির্মাণের পরই সম্ভব, তার পূর্বে নয়।

একটি প্রাসাদের দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্ব তার ভিত্তির দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের উপর নির্ভরশীল। তাই সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাথমিক ভিত্তি এই পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও সমাজের সুসংবদ্ধ দৃঢ়তার উপর রাষ্ট্রের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব তেমনি নির্ভরশীল।

পরিবারের অপরিহার্যতা

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবারের মধ্যেই হয় মানুষের এ সামাজিক জীবনের সূচনা। মানুষ সকল যুগে ও সকল কালেই কোনো না কোনোভাবে সামাজিক জীবন যাপন করেছে। প্রাচীনতমকাল থেকেই পরিবার সামাজিক জীবনের প্রথম ক্ষেত্র বা প্রথম স্তর হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সোজা কথায় বলা যায়, বর্তমান যুগে রাষ্ট্রের যে গুরুত্ব, প্রাচীনতম কালে –মানুষের প্রথম পৃথিবী পরিক্রমা যখন শুরু হয়েছিল, মানবতার সেই আদিম শৈশবকালে পরিবার ছিল সেই গুরুত্বের অধিকারী। বংশ ও পরিবার সংরক্ষণ এবং তার সাহায্য-সহায়তার লক্ষ্যে দুনিয়ার বড় বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনও চিরকাল সুনাম-সুখ্যাতি ও গৌরবের বিষয়রূপে গণ্য হয়ে এসেছে। আর নীচ বংশে ও নিকৃষ্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ বা আত্মীয়তা লাভ মানুষের হীনতা ও কলংকের চিহ্নরূপে গণ্য হয়েছে চিরকাল। যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের হেফাযত, উন্নতি বিধান ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে বড় বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে, সে চিরকালই বংশের গৌরব, -Hero রূপে সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করতে সমর্থ হয়েছে পরিবারস্থ প্রত্যেকটি মানুষের নিকট।

পরিবারের ভিত্তি

প্রাচীকাল থেকেই পরিবার দু’টি ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়ে এসেছে। একটি হচ্ছে মানুষের প্রকৃতি-নিহিত স্বভাবজাত প্রবণতা। এই প্রবণতার কারণেই মানুষ চিরকাল পরিবার গঠন করতে ও পারিবারিক জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে এবং পরিবারহীন জীবনে মানুষ অনুভব করেছে বিরাট শূন্যতা ও জীবনের চরম অসম্পূর্ণতা। পরিবারহীন মানুষ নোঙরহীন নৌকা বা বৃন্তচ্যুত পত্রের মতোই স্থিতিহীন।

আর দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে সমসাময়িককালের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় পরিবার ছিল বিশাল বিস্তৃত ক্ষেত্র। সমাজ ও জাতি গঠনের জন্যে তা-ই ছিল একমাত্র উপায়। এ কারণে প্রাচীনকালের গোত্র ছিল অধিকতর প্রশস্ত; এতদূর প্রশস্ত যে, নামমাত্র রক্তের সম্পর্কেও বহু এক-একটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকতে পারত। এমন কি বাইরে থেকে যে লোকটিকে পরিবারের মধ্যে শামিল করে নেয়া হতো, তাকেও  সকলেই উক্ত পরিবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে নিত। পরিবারের নিজস্ব একান্ত আপন লোকদের জান-মাল ও ইযযতের যেমন রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, সেই বাইরে থেকে আসা লোকটিরও হেফাযত করা হতো অনুরূপ গুরুত্ব সহকারে। ইসলাম পূর্ব আরব সমাজে ‘মুতাবান্না’ –পালিত পুত্র গ্রহণের রীতি ছিল, একথা সর্বজনবিদিত। ইউরোপে এই সেদিন পর্যন্তও পালিত পুত্রকে আইন সম্মতভাবেই বংশোদ্ভূত সন্তানের সমপর্যায়ভুক্ত মনে করা হতো। রোমান সভ্যতার ইতিহাস এর চেয়েও অগ্রসর। সেখানে জন্তু-জানোয়ারকে পর্যন্ত পরিবারের অংশ বলে মনে করা হতো; মর্যাদা তার যত কমই হোক না কেন। এ থেকে এ সত্য জানতে পারা যায় যে, প্রাচীনকালে অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও পরিবারের পরিধি অধিকতর প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছিল।

সেকালে জীবন-জীবিকার বেশির ভাগই নির্ভরশীল ছিল চতুষ্পদ জন্তু ও কৃষি উৎপাদনের ওপর। এজন্যে প্রত্যেকটি পরিবারই এক বিশেষ ভূখণ্ডের ওপর প্রাচীন নির্মাণ করে নিজেদের এলাকা নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত করে রাখত। সে সীমার মধ্যে অপর কোনো পরিবারের লোক বা জন্তু-জানোয়ার পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারত না। এর ফলে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ ও দ্বন্দ্ব-কলহের সৃষ্টি হওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর তাদের বিশেষ কোনো স্থানে একত্রিত ও সম্মিলিত হওয়ার মতো কেন্দ্র বলতে কিছুই ছিল না। তাদের মধ্যে ঐক্যের কোনো সূত্র বর্তমান থাকলেও উপায়-উপাদানের অভাব ও গোত্রীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি এদিকে অগ্রসর হওয়ার পথে কঠিন বাঁধা হয়ে দাঁড়াত। এমনকি এক ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে যে-সব গোত্র বাস করত এবং যাদের মধ্যে জীবনের মূল্যমান ছিল এক ও অভিন্ন, তারাও পরস্পরের শত্রু এবং যুধ্যমান ও দ্বন্দ্ব-সংগ্রামশীল হয়ে থাকত। প্রতিটি গোত্র অপর গোত্রকে চরম শত্রুতার দৃষ্টিতে দেখত, পরস্পরের ক্ষতি সাধনের জন্যে সম্ভাব্য সকল প্রকার চেষ্টাই তারা চালাত। মানবতার এই প্রাথমিক স্তরে নিজেও নিজ পরিবার-গোত্রের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কোনো বিষয় ও সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করাও সম্ভব হত না কারো পক্ষে। আর চিন্তা ও কর্মের শত-সহস্র যোজন পার হয়ে আসার পর আজ মানুষও পারছে না আন্তর্জাতিক ও বিশাল মানবতার দৃষ্টিতে চিন্তা করার অভ্যাস করতে।

মানুষের নিকট নিজের জান ও মাল চিরকালই অত্যন্ত প্রিয় সম্পদ। এসবের জন্যেই মানুষ চেষ্টা ও শ্রম করত; সকল প্রকার বিপদ ও ঝুঁকির মুকাবিলা করত এবং তার সংরক্ষণের জন্যে সম্ভাব্য সকল রক্ষা-ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হতো। তাদের প্রিয় জান-প্রাণ সুরক্ষিত রাখার সব উপায় ও পথ অবলম্বন করা হতো। আর এবাবেই তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন-জীবিকার দ্রব্য সামগ্রী সংরক্ষিত হতো।

মানুষ যখন দেখতে পায় যে, তার জান মালে সংরক্ষণ তার পরিবার ও পারিবারিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বিপদ-মুসিবতে ভারাক্রান্ত সমগ্র পরিবেশের মধ্যেতার পরিবারই হচ্ছে তার একমাত্র আশ্রয় –এ পরিবারই তাকে সর্বতোভাবে সংরক্ষণ করছে, শত্রুদের মুকাবিলায় সব সময়ে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তার দুঃখ-দরদ ও বিপদ-মুসিবতের বেলায় তার সাথে সমানভাবে পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তখন তার পক্ষে পরিবারের সাথে পূর্ণমাত্রায় জড়িত ও একাত্ম হয়ে থাকাই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এক আরব কবি এ কারণেই বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

বিপদ-মুসিবতে তার ভাই যখন ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসে, আওয়াজ তোলে, তখন সে তার এ কাজের কোনো যুক্তি খুঁজে বেড়ায় না।

তখন শুধু বলেঃ

(আরবী****************************************************************)

আমি নিকটাত্মীয়তার হক আদায় করেছি, তোমার ভাগ্যের শপথ, যখন কোনো বিপদের ব্যাপার ঘটবে, তখন আমি অবশ্যই উপস্থিত থাকব।

(আরবী*********************************************************)

কোনো কঠিন বিপদকালে আমাকে ডাকা হলে আমি তোমার মর্যাদা রক্ষাকারীদের মধ্যে থাকব, শত্রু তোমার ওপর হামলা করলে আমি তোমার পক্ষে প্রতিরোধ করব।

গোত্র ও পরিবারের এক-একটি ব্যক্তি যখন তার এতখানি সাহায্যকারী ও সংরক্ষক হয়, তখন সে নিজেও পরিবার ও পরিবারের প্রত্যেকের জন্য নিজের সব কিছু কুরবান করতে প্রস্তুত না হয়ে কিছুতেই পারে না। তার বিপদের সময় নিজের জীবন ও প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে সে অবশ্যই প্রস্তুত হবে। আর এ ভাবধারা থেকেই গোত্র ও পারিবারিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সাহায্য  ও সহযোগিতার ভাবধারা উৎসারিত হয়; আপন ও পরের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়; তখন নিজ পরিবারের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সুখ্যাতি প্রচার করা হয়; এ হচ্ছে মনের স্বাভাবিক ভাবধারার মূর্ত প্রকাশ। তাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে গৌরব করা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করাক নিজের সৌভাগ্যের বিষয় বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানকালের রাজনৈতিক ও দলীয় নেতার প্রতি যেরূপ আনুগত্য ও ভক্তি-শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি ঘটে, তারই তাগিদে তাদের কীর্তিগাঁথাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়, তাদের ভুল-ভ্রান্তিকে ভালো অর্থে গ্রহণ করে তাকে সুন্দর ব্যাখ্যার চাকচিক্যময় বেড়াজালে লুকিয়ে রাখার জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা করা হয়; সেকালে বংশীয় নেতা ও গোত্রপতিদের সম্পর্কেও গ্রহণ করা হতো অনুরূপ ভূমিকা। কেননা তাদের স্বপ্ন-সাধের বাস্তব প্রতিফলন তারা তাদের মধ্যেই দেখতে পেত। তাদের সাথে বন্ধন স্থাপন করেই তারা নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করে তুলত।

এক কথায় বলা যায়, প্রাচীনকালে পরিবার ছিল এ কালের এক-একটি রাজনৈতিক দলের মতোই। এজন্যে সেকালের রাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত রূপ আমরা দেখতে পাই সেকালের এক-একটি পরিবার-সংস্থার মধ্যে। সেকালের পরিবার অপর কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য পালনের বাহন ছিল না; বরং পরিবারই ছিল সেখানে মুখ্যতম প্রতিষ্ঠান। মানুষের পরস্পরের মধ্যে সেখানে সম্পর্ক স্থাপিত হতো ‘রেহেম’ ও রক্ত ন্যায়ের ভিত্তি ছিল বংশীয় সম্পর্ক, সেখানে বংশ ও পরিবারের গুরুত্ব যে কত দূর বেশী হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা চলে। এরূপ অবস্থায় মানুষ নিজেকে রক্ষা করার জন্যে আলোচ, পানি ও হাওয়ার মতো পরিবার ও পারিবারিক জীবনের সাথে জড়িত হয়ে থাকতে বাধ্য হবে –এটাই স্বাভাবিক। অন্যথায় সে হয় নিজেকে আপন লোকেরই জুলুম-নির্যাতনের তলে নিষ্পিষ্ট করবে অথবা অপর লোকদের দ্বারা হবে সে নির্যাতিত, নিগৃহীত এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে চিরবঞ্চিত।

কিন্তু সভ্যতার যখন ক্রমবিকাশ সংঘটিত হলো, জীবন-জীবিকা ও জীবনযাত্রা নির্বানের জন্য অপরিহার্য অন্যান্যা উপায়-উপাদান ও দ্রব্য-সামগ্রী যখন মানুষ করায়ত্ত করতে সমর্থ হলো তখন বিভিন্ন পরিবার ও গোত্রের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা স্থাপনের নানা পথ ও উপায় উদ্ভাবিত হলো। বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের মধ্যে বংশ ও রক্তের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের একই কেন্দ্রে মিলিত ও একত্রিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হলো। এ অবস্থায় মানুষের মধ্যে একতা ও ঐক্য বিধানের জন্যে কেবল আত্মীয় ও রক্ত সম্পর্কই একমাত্র ভিত্তি হয়ে থাকল না, স্বাভাবিক ও জৈবিক উপায় উপাদানের ঐক্য, ভৌগোলিক সীমা, ভাষা ও বর্ণের অভিন্নতা প্রভৃতি তার স্থান দখল করে বসল। ফলে পরিবার ও গোত্র সম্পর্কিত প্রাচীন ধারণা তলিয়ে যেতে লাগল, আর তার স্থানে জাতীয়তার বীজ বপিত ও অংকুরিত হয়ে ক্রমশ তা বর্ধিত হতে থাকল। পরিবার ও পারিবারিক ব্যবস্থা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। জাতি ও স্বদেশের প্রতি মানুষের লক্ষ্য আরোপিত হলো। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং ঘৃণা শত্রুতার মানদণ্ডও তখন পুরাপুরিভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল।

এ কারণে পরিবার আজকের দুনিয়ার সমাজ-বিজ্ঞানীদের নিকট অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, পরিবারের বাস্তবিকই কোনো গুরুত্ব আছে কি? আর গুরুত্ব থাকলেও তা কতখানি?

মূলত এ প্রশ্ন অত্যন্ত গভীর সমাজতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত। এর জবাব না পাওয়া গেলে সমাজের অন্যান্য সমস্যারও কোনো সমাধান লাভ করা সম্ভব হতে পারে না। কাজেই বিষয়টিকে নিম্নোক্তভাবে কয়েকটি দিক দিয়ে বিবেচনা করে দেখতে হবেঃ

১. সমাজের সাফল্য ও উন্নতি লাভের জন্যপরিবার কি সত্যিই জরুরী?

২. পুরুষ ও নারীর মাঝে সম্পর্কের সাধারণ রূপ কি এবং উভয়ের কর্মক্ষেত্রের সীমা কতদূর প্রসারিত?

৩. পরিবারের ক্ষেত্রই বা কতখানি প্রশস্ত?

৪. পরিবারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি?

সমাজ পরিসরে পরিবারের গুরুত্ব

পরিবার গঠন ও রূপায়ণ এবং তার সাফল্য ও ব্যর্থতার কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে কথা বলার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করে নিতে হবে; আর তা হচ্ছে সমাজ ও সামাজিক জীভনের সাফল্যের জন্যে পরিবার কি সত্যই অপরিহার্য?  সুষ্ঠু রীতি-নীতির ভিত্তিতে পরিবার গঠন না করে সামগ্রিক কল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়া কি সমাজের পক্ষে –সমাজের ব্যক্তিদের পক্ষে সম্ভব? পারিবারিক জীবন ও পারিবারিক জীবনের সমস্যা কি আমাদের জীবনে এতই গভীর ও জটিল যে, তাকে উপেক্ষা করলে জীবন মহাশূন্যতায় ভরে যাবে? ….কিংবা এ বিষয়গুলো তেমন গুরুতর কিছু নয়; এবং সহজেই তাকে উপেক্ষা করা চলে? পরিবার ভেঙ্গে দেয়ার পর রাষ্ট্র ও সরকার কি সুষ্ঠু সামাজিক জীবন গঠনের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারবে?

যেহেতু সমাজের উন্নতি কিংবা পতনের ব্যাপারে পরিবার ও পারিবারিক জীবন যদি সত্যিই কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে, তাহলে তা নিয়ে মাথা ঘামানো অর্থহীন। আর যদি সমাজের সাফল্য ও সামাজিক জীবনের কল্যাণ লাভের ওপর নির্ভরশীলই হয়ে থাকে, তাহলে তাকে উপেক্ষা ও অবহেলা করা গোটা সমাজের পক্ষেই মারাত্মক। কাজেই প্রশ্নটির জবাব নির্ধারনের গুরুত্ব অপরিসীম। জীবন সংগ্রামের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী –স্বামী ও স্ত্রী –সঠিক মর্যাদা ও স্থান নির্ধারন-ও এ প্রশ্নের জবাবের ওপরই নির্ভরশীল।

মানব জীবনের লক্ষ্য

শান্তি, সুখ, তৃপ্তি, নিশ্চিন্ততা ও নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দ লাভই হচ্ছে মানব-জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য, মানব মনের ঐকান্তিক কামনা ও বাসনা। এদিক দেয় সব মানুষই সমান। উচ্চ-নীচ, ছোট-বড়, গরীব-ধনী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রামবাসী-শহরবাসী এবং পুরুষ ও নারীর মধ্যে এদিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই। সিংহাসনারূঢ় বাদশাহ আর ছিন্নবস্ত্র পরিহিত দীনাতিদীন কুলি-মজুর সমানভাবে দিন-রাত্রি এ উদ্দেশ্যেই কর্ম নিরত হয়ে রয়েছে। কর্মপ্রেরণার এ হচ্ছে উৎসমূল। এ জিনিস যদি কেউ সত্যিই লাভ করতে পারে তাহলে মনে করতে হবে, সে জীবনের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ লাভ করেছে। তার জীবন সত্যিকারভাবে সাফল্য ও চরম কল্যাণ লাভে ধন্য হয়েছে।

নারী ও পুরুষ

সমাজের নারী এ সম্পদ লাভ করতে পারে একমাত্র পুরুষের নিকট থেকে, আর পুরুষ তা পেতে পারে কেবল মাত্র নারীর নিকট থেকে। দুই ব্যক্তির পারস্পরিক বন্ধুত্ব-ভালোবাসা, দুই সঙ্গীর সাহচর্য, দুই পথিকের মতৈক্য, দুই জাতির মৈত্রীবন্ধন, ব্যক্তির মনে তার মতবাদ-বিশ্বাসের প্রতি প্রেম, পেশা ও শিল্পের প্রতি মনোযোগিতা প্রভৃতি –যে সব জিনিস জীবন সংগঠনের জন্যে অত্যন্ত জরুরী এর কোনটিই মানুষকে সে শান্তি, সুখ ও নিবিড়তা-নিরবচ্ছিন্নতা দান করতে পারে না, যা লাভ করে নারী পুরুষের কাছ থেকে এবং পুরুষ নারীর নিকট থেকে। এজন্যই আমরা দেখতে পাই যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে অতি স্বাভাবিকভাবেই পারস্পরিক অতীব গভীর আকর্ষণ বিদ্যমান। এ আকর্ষণ চুম্বকের চাইতেও তীব্র। স্বতঃস্ফুর্তভাবেই একজন অপরজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রত্যেকেই নিজের সে হারানো সম্পদ অপর প্রতিক্ষায় উন্মুখ হয়ে কাটিয়েছে যুগের পর যুগ। প্রত্যেক নারীর মধ্যে পুরুষের জন্যে অপরিসীম ভালোবাসা ও আবেগ উদ্বেলিত প্রেম-প্রীতির অফুরন্ত ভাণ্ডার সিঞ্চিত হয়ে আছে। তেমনি আছে প্রত্যেক পুরুষের মধ্যে স্ত্রীর জন্য। এ এমন এক মহামূল্য নেয়ামত, যার তুলনা এই বিশ্ব প্রকৃতির বুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সুখ-দুঃখের সাথী

এ দুনিয়া এক বিরাট-বিশাল কর্মক্ষেত্র। এখানে বসবাসের জন্যে গতি, কর্মোদ্যম ও তৎপরতা-একাগ্রতা একান্তই প্রয়োজনীয়। এ ক্ষেত্রে মানুষ কখনো আনন্দ লাভ করে, কখনো হয় দুঃখ-ব্যথা-বেদনার সম্মুখীন। আর মানুষ যেহেতু অতি সূক্ষ্ম ও অনুভূতিসম্পন্ন সেজন্যে আনন্দ কিংবা দুঃখ তাকে তীব্রভাবে প্রভাবান্বিত করে। ফলে তার প্রয়োজন হচ্ছে সুখ-দুঃখের অকৃত্রিম সঙ্গী ও সাথীর, যেন তার আনন্দে সে-ও সমান আনন্দ লাভ করে আর তার দুঃখ-বিপদেও যেন সে হয় সমান অংশীদার। নারী কিংবা পুরুষ উভয়ই এ দিক দিয়ে সমান অভাবী। প্রত্যেকেরই সঙ্গী ও সাথীর প্রয়োজন। আর এ ক্ষেত্রে নারীই হতে পারে পুরুষের সত্যিকার দরদী বন্ধু ও  খাঁটি জীবন-সঙ্গিনী। আর পুরুষ হতে পারে নারীর প্রকৃত সহযাত্রী, একান্ত নির্ভরযোগ্য ও পরম সান্ত্বনা বিধায়ক আশ্রয়।

স্থায়ী সম্পর্ক

মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখের এ আবর্তন সব সময়ই ঘটতে পারে –ঘটে থাকে। ফলে তার প্রয়োজন এমন সঙ্গী ও সাথীর, যে সব সময়ই –জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল সময় ও সব রকমের অবস্থায়ই তার সহচর হয়ে থাকবে ছায়ার মতো এবং অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে করবে সব দায়িত্ব পালন। মানুষের জীবনব্যাপী সংগ্রাম অভিযানের ক্ষেত্রে এ এক স্থায়ী, মৌলিক ও অপরিহার্য প্রয়োজন।

এ প্রয়োজন পূরণের জন্যেই নারী ও পুরুষের মাঝে স্থায়ী বন্ধন সংস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরফলে নারী ও পুরুষ উভয়ই জীবনের তরে পরস্পরের সাথে যুক্ত হতে পারে, যুক্ত হয়ে থাকে। আজীবন এ বন্ধনের সুযোগেই নারী ও পুরুষের জীবন সার্থক হতে পারে এবং তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হতে পারে কার্যকর। বিয়ের বন্ধনই হচ্ছে এক অকাট্য দৃঢ় সূত্র। এ বন্ধন ব্যতীত আর কোনো প্রকার সংযোগে এ উদ্দেশ্য লাভ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু যে সম্পর্কের পিছনে শুধু ক্ষণস্থায়ী হৃদয়াবেগই হয় একমাত্র ভিত্তি, যার পশ্চাতে কোনো নৈতিক, সামাজিক –তথা আইনানুগ শক্তির অস্তিত্ব থাকে না, তা অনিশ্চিত, ক্ষণ-ভঙ্গুর। যে কোন মুহুর্তে তা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। নিছক আবেগ-উচ্ছ্বাস, পানি-স্রোতের ওপরে পুঞ্জিভূত ফেনারাশি মাত্র, দমকা হাওয়ার মসৃণ চাপেও তা নিমেষে চূর্ণ হতে পারে, উড়ে যেতে পারে, মহাশূন্যে মিলিয়ে যেতে পারে প্রণয়-প্রেমের এ বন্ধুত্ব। কেননা নিছক আবেগ উচ্ছাসের বশে সাময়িক উত্তেজনা চরিতার্থ করার জন্যে কোনো নারী কিংবা পুরুষকে চিরদিতের তরে গলগ্রহ করে রাখা মানব স্বভাবের পরিপন্থী।

তামাদ্দুনিক প্রয়োজনে নারী-পুরুষের স্থায়ী সম্পর্ক

আরো এক দৃষ্টিতে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রেম-ভালোবাসা এবং ঘৃণা-উপেক্ষার দুই বিপরীত ভাবধারা বিদ্যমান। মানুষ কাউকে ভালোবাসে সাদরে বুকে জড়িয়ে ধরে; আবার কাউকে ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করে দূরে ঠেলে দেয়। কারো জন্যে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত হয়, আবার কারো নাম পর্যন্ত শুনতে রাজি হয় না। মানুষের এ স্বভাব এবং এ স্বাভাবিক ভাবধারার ফলেই মানুষের সমাজ ও সভ্যতা গড়ে ওঠে, ক্রমবিকাশ লাভ করে। মানব প্রকৃতির মধ্যে এমন সব উপাদান রয়েছে, যা থেকে মানুষের প্রকৃতি নিহিত এ ভাবধারা আলোড়িত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।

নারী ও পুরুষ উভয়ের এ স্ববাবসম্মত ভাবধারার সংযোগ কেন্দ্র হয়ে থাকে। একজন অপরজনকে ভালোবাসে, আর একজনের মনে অপরজনের কারণে অন্য কারো বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হয়। পুরুষ নারীকে নিয়ে ঘর বাঁধে আর নারী হয় পুরুষের গড়া এ ঘরের কর্ত্রী। উভয়ই উভয়ের কাছ থেকে লাভ করে পারস্পরিক নির্ভরতা, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিকট থেকে পায় কর্মের প্রেরণা এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে অগ্রসর হয়ে যায় উদ্যমপূর্ণ গতিতে। নারী ও পুরুষের এ সংযোগ ব্যতীত মানবতার অগ্রগতি আদৌ সম্ভব নয়।

 

পরিবার বর্তমান সভ্যতা

বর্তমান পাশ্চাত্য প্রভাবিত সমাজ ও সভ্যতায় নারী ও পুরুষ সম্পর্ক মানবীয় নয়, নিতান্ত পাশবিক। পাশবিক উত্তেজনা ও যৌন-লালসার পরিতৃপ্তিই হচ্ছে তথায় সাধারণ নারী-পুরুষের সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি। এর ফলে বর্তমান সমাজ ও সভ্যতা বিপর্যয় ও ব্যর্থতার সম্মুখীন। অথচ নারী-পুরুষের মিলন ও একাত্মতাকে সভ্যতার অগ্রগতির কারণ ও বাহনরূপে গণ্য করা হয়েছে চিরকাল। সেজন্যই দেখতে পাই, নারী-পুরুষের মিলনে জীবনে যে শান্তি ও তৃপ্তি লাভ হওয়া বাঞ্ছনীয় বর্তমান মানুষ তা থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত। বর্তমান সভ্যতা পরিবারকে চূর্ণ করে, পরিবারের গুরুত্ব হ্রাস করে দিয়ে তার স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে রাষ্ট্রকে। অথচ পরিবার হচ্ছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ। দ্বিতল বা চারতল প্রাসাদ গড়ে তোলা, -তা নির্মাণ না করেই উপরের তলা নির্মাণের চেষ্টা পাগলামী ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক তেমনি বর্তমান সভ্যতা সভ্যতার প্রথম স্তর অর্থাৎ পরিবারকে প্রায় অস্বীকার করেই, তার গুরুত্ব হ্রাস করেই গড়ে উঠতে চাচ্ছে। কিন্তু হাওয়ার ওপর যেমন প্রাসাদ গড়া যায় না, তেমনি পরিবারকে ভিত্তি না করে –ভিত্তি হিসেবে পরিবারকে গড়ে না তুলে –সত্যিকারভাবে স্থায়ী কোনো সভ্যতা কিংবা মজবুত কোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। সুস্থ চিন্তার অধিকারী প্রত্যেকটি মানুষের নিকট একথা অত্যন্ত প্রকট।

বর্তমানে ব্যক্তির কাছেও পরিবারের গুরুত্ব যেন অনেকখানিই কমে গেছে। পরিবারের প্রতি কোনো আকর্ষণই সে বোধ করে না। স্বামী স্ত্রীর, স্ত্রী স্বামীর, পুত্র পিতার, পিতা পুত্রের, ভাই ভাইয়ের, ভাই বোনের, বোন ভাইয়ের প্রতি কোনো দরদ অনুভব করছে না। কেউ কারোর ধার ধারে না, পরোয়া করে না। অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে সমাজ জীবনের যে ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা  দিয়েছে, তা শুধু সভ্যতাকেই ধ্বংস করছে না, মনুষ্যত্ব ও  মানবতাকেও দিচ্ছে প্রচণ্ড আঘাত।

পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক সরোকিন বর্তশান দুনিয়ায় পরিবারের গুরুত্ব কম হওয়ার ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তার বর্ণনা দিয়ে বলেছেনঃ

আমরা বর্তমানে খাবার খাই হোটেল রোঁস্তোরায়, আমাদের রুটি বেকারী-কনফেকশনারী থেকে তৈরী হয়ে আসে আর আমাদের কাপড় ধোয়া হয় লণ্ড্রীতে। পূর্বে মানুষ আনন্দলাভ ও চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে ফিরে যেত পরিবারের নিভৃত আশ্রয়ে; কিন্তু বর্তমানে মানুষ তার জন্যে চলে যায় সিনেমা-থিয়েটার, নাচের আসর ও ক্লাব ঘরের গীতমুখর পরিবেষ্টনীতে। পূর্বে পরিবার ছিল আমাদের আগ্রহ ঔৎসুক্য ও আনন্দ-উৎফুল্লতার কেন্দ্রস্থল, পারিবারিক জীবনেই আমরা সন্ধান করতাম শান্তি, স্বস্তি, তৃপ্তি ও আনন্দের নির্মলতা; কিন্তু এখন পরিবারের লোকজন হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত। কিছু লোক একত্রে বাস করলেও তার মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়ে গেছে, হারিয়ে ফেলেছে সকল প্রীতি, মাধুর্য, অকৃত্রিমতা, আন্তরিকতা ও পবিত্রতা। দিনের বেশির ভাগ সময়ই মানুষ জীবিকার চিন্তায় অতিবাহিত করে, রাত্রিবেলা অন্তত পরিবারের সব লোক একত্রিত হতো। কিন্তু এখন তারা রাত্রি যাপন করে বিচ্ছিন্নভাবে, যার যেখানে ইচ্ছে –সেখানে। এখন আমাদের ঘর আমাদের আরাম বিশ্রামের স্থান নয়, ঘরে রাত্রিদিন অতিবাহিত করার তো এ যুগে কোনো কথাই উঠতে পারে না। একটি গোটা রাত্রি এখন লোকেরা নিজেদের ঘরে যাপন করবে, তা কেউই পছন্দ  করে না।

সরোকিনের একথা কেবল পুরুষ ও যুবকদের সম্পর্কেই সত্য নয়, অবিবাহিতা যুবতী ও বিবাহিতা বয়স্কা নারীরাও এক্ষেত্রে কিছুমাত্র কম যায় না।

পরিবার-বিরোধী যুক্তিধারা

যারা পরিবার ও পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব অস্বীকার করে, তারা কিছু কিছু যুক্তিও তার অনুকূলে পেশ করে থাকে। সে যুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ

১. মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাই সকল প্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই তার স্বাভাবিক দাবি –স্বভাবের প্রবণতা। পরিবারের সুদৃঢ়-সুরক্ষিত পরিবেষ্টনীতে বন্দী করে তার এ আযাদীর অধিকার হরণ করা জুলুম বৈ কিছুই নয়।

২. পরিবার মানুষের স্বভাবের দাবি নয়। পারিবারিক জীবনে স্ত্রীকে পুরুষের অধীন হয়ে প্রায় ক্রীতদাসী হয়ে থাকতে হয়, অথচ স্বাধীনভাবে থাকা তার মানবিক অধিকার। পারিবারিক জীবনে তা নির্মমভাবে হরণ করা হয়। একমাত্র পুরুষই সেখানে উপার্জন করে, স্ত্রীকে তার জীবন-জীবিকার জন্যে পুরুষের মুখাপেক্ষী –তথা গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয়।

৩. আগের কালে রাষ্ট্র বর্তমানের ন্যায় সর্বাত্মক ও ব্যাপক ভিত্তিক ছিল না। তখন মানুষের পরিবারের মুখাপেক্ষী ছিল, মানুষের জন্যে তা ছিল প্রয়োজনীয়। এখন রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা থেকেই তার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ হতে পারে। কাজেই আগের কাছে পরিবারের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে তা ফুরিয়ে গেছে।

৪. পূর্বে সম্মিলিত পারিবারিক জীবন (Joint family life) থাকার কারণে পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজনের গুরুত্ব অসাধারণ, কিন্তু এখন সে অবস্থা বদলে গেছে। এখন শিশু পালনের জন্যে নার্সারী হোম ও কিন্ডারগার্টেন এবং কর্মক্ষেত্র হচ্ছে কারখারা ও অফিস। কাজেই আজ পারিবারিক সম্বন্ধ অপ্রয়োজনীয়। এবং

৫. বর্তমানে রাষ্ট্র শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাত্রার জন্যে যেরূপ সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সমর্থ হচ্ছে, পিতা-মাতার পক্ষে তা করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই আজ পরিবার ভেঙ্গে গেলে রাষ্ট্র থেকেই সব প্রয়োজন অনায়াসেই পূরণ করা যেতে পারে। এতে মানুষের কোনোরূপ অনিষ্ট হওয়ার আশংকা থাকতে পারে না।

পরিবারের গুরুত্ব অস্বীকার করতে গিয়ে মোটামুটি এই কথাগুলোই বলা হয়ে থাকে। আমাদের পরবর্তী আলোচনা এসব কথারই বিস্তারিত জবাব সম্বলিত। তাতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে যে, এ সব কথা একবারেই মূল্যহীন ও অন্তঃসারশূন্য।

 

পরিবার-বিরোধী যুক্তির জবাব

পরিবার-বিরোধীদের উক্ত রূপ কথাগুরোর বিস্তারিত জবাব তো এ গ্রন্থের প্রতি পৃষ্ঠায়ই দেয়া হবে।তবে এখানে একত্রে ও  সংক্ষেপে এক-একটি যুক্তির জবাব দেয়া হচ্ছে।

১.প্রথম যুক্তি হিসেবে বলা কথাগুলো প্রকৃত ব্যাপার ভুল দৃষ্টি-ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণের মারাত্মক ফল, সন্দেহ নেই। নিজেরই ঘর ও পরিবারের কাজে-কর্মে ব্যতিব্যস্ত থাকা  যে নারীর অসহায়তার প্রমাণ নয়, তা সকলেই বুঝতে পারেন। এজন্যে সমাজ-পরিবেশে নারীর কোনো লাঞ্ছনা হতে পারে না, না এজন্যে তাকে ঘৃণা করা যেতে পারে। মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে যেমন রুজী-রোজগারের উদ্দেশ্যে চেষ্টা করতে বাধ্য, অনুরূপভাবে তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, তৃপ্তি ও নিশ্চিন্ততা সুষ্ঠু নিরবচ্ছিন্ন জীবন যাপন ও উপার্জিত ধন-সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যয়-বণ্টন করতে পারার ওপর নির্ভরশীল। এক ব্যক্তি কেবল উপার্জন করতে সক্ষম, কিন্তু সে উপার্জিত অর্থ ব্যয় করার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ, অবুঝ। আর এক ব্যক্তির অর্থ উপার্জন করার কোনো যোগ্যতাই নেই। পরিণামের দৃষ্টিতে দু’জনার মধ্যে কোনো পার্থক্যই খুঁজে পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় ব্যক্তি যেমন উপার্জনহীন হওয়ার কারণে নিজের প্রয়োজন পূরণে অক্ষম, প্রথম ব্যক্তিও ঠিক তেমনি স্বীয় অযোগ্যতা ও কু-অভ্যাসের কারণে বিপদ আপনের সম্মুখীন হতে বাধ্য।

পরিবার সংস্থা মূলত নারী ও পুরুষের সম্মিলিত ও পরস্পরের সম-অধিকারসম্পন্ন এক যৌথ প্রতিষ্ঠান। এখানে উভয়ই একত্রে সম্মিলিত জীবন যাপন করে। এ সম্মিলিত জীবনে পুরুষ ঘরের বাইরের কাজ-কর্মের জন্য দায়িত্বশীল, আর স্ত্রী ঘরের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক –ঘরের রানী। এখানে একজনের ওপর অপরজনের মৌলিক শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যের কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। একটি প্রাসাদ রচনার জন্যে যেমন দরকার ইঁটের, তেমনি প্রয়োজন চুনা-সুরকি বা সিমেন্ট-বালির। যদি বলা যায়, ইঁট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান; তাহলে জিজ্ঞাস্য হবে, কেবল ইঁটই কি পারবে বিরাট বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করতে? …..পারিবারিক জীবন প্রাসাদ রচনায় নারী ও পুরুষের ব্যাপারটি ঠিক এমনি। একটি সুন্দর পরিবার গঠনে যেমন পুরুষের যোগ্যতা-কর্মক্ষমতার একান্ত প্রয়োজন, তেমনি অপরিহার্য নারীর বিশেষ ধরনের যোগ্যতা ও কর্ম-প্রেরণার –যা অন্য কারো মধ্যে পাওয়া যাবে না।

২. দ্বিতীয় যুক্তি সম্পর্কে বলা যায়, যে-সমাজ নারীর পক্ষে অর্থোপার্জনের সকল দ্বারই চিররুদ্ধ কেবল সে-সমাজ সম্পর্কেই একথা খাটে। কেননা সেখানে নারীর অস্তিত্ব কেবলমাত্র পুরুষের পাশবিক বৃত্তির চরিতার্থতার উদ্দেশ্যই একান্তভাবে নিয়োজিত থাকে। নারী সেখানে না কোনো জিনিসের মালিক হতে পারে, না পারে কোনো ব্যাপারে নিজের মত খাটাতে। কিন্তু এখানে আমরা যে সমাজ-পরিবারের ব্যবস্থা পেশ করতে যাচ্ছি, তার সম্পর্কে একথা কিছুতেই সত্য ও প্রযোজ্য হতে পারে না। কেননা ইসলাম নারীকে ধন-সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার দেয়, মীরাসের অংশও সে আইনত লাভ করে থাকে। কিন্তু নারীর দৈহিক গঠন ও মন-মেজাজের বিশেষ রূপ ও  ধরন রয়েছে, যা পুরুষ থেকে  ভিন্নতর। এ কারণে অর্থোপার্জনের মতো কঠিন ও কঠোর কাজের দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়নি। পুরুষই তার যাবতীয় আর্থিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে  দায়ী হয়ে থাকে। বিশেষত ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থায় নারী এক দায়িত্বপূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিতা। অর্থোপার্জনের চিন্তা-ভাবনা ও খাটা-খাটনীর সাথে তার কোনো মিল নেই, শুধু  তাই নয়, তা করতে গেলে নারী তার আসল দায়িত্ব পালনেই বরং ব্যর্থ হতে বাধ্য।

অন্য এক দিক দিয়েও বিষয়টির পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রকৃত ব্যাপারকে ভুল দৃষ্টিতে বিচার করলে সঠিক ফল লাভ সম্ভব হতে পারে না। অতীতে নারী অর্থনৈতিক ব্যাপারে পুরুষের মুখাপেক্ষী ছিল বলেই যে সে পুরুসের অধীন বা দাসী হয়ে থাকতে বধ্য হতো এমন কথা বলা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয় –পারিবারিক জীনের বহুতর ঘটনা এর তীব্র প্রতিবাদ করছে।

চিন্তা করা যায়, যে নারীর স্বামী পঙ্গু, অন্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, পরিবারের প্রয়োজনীয়  অর্থ উপার্জনের সম্পূর্ণ অক্ষম, তাকে কোন জিনিস প্রেম-ভালোবাসা ওসেবা-যত্নের বন্ধনে বেঁধে রাখে? কেন সে এমন অপদার্থ স্বামীকে ফেলে চলে যায় না, এ হেন স্বামীর জন্যকেন সে নিজ জীবনের আরাম আয়েশপূর্ণ উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে পর্যন্ত অকাতরে কুরবান করছে? একটি নারী দুনিয়ার সব ধন-দৌলত, সুখ-সম্ভোগ ও আরাম-আয়েশের ওপর পদাঘাত করেও বিয়ে সম্পর্ককে কেন বাঁচিয়ে রাখে, স্বামীকেই গ্রহণ করে? যে-সমাজ নারীকে আনন্দ স্ফুর্তি সুখ-সম্ভোগের গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়ার সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধে করে দিচ্ছে, সেখানেও কেন এরূপ ঘটনা সাধারণভাবেই ঘটছে? –কি তার ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে?

বাস্তব দৃষ্টিতে চিন্তা করলে দেখা যাবে, স্বামী-স্ত্রীর মিলনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের তত বেশী ভূমিকা নেই, যত আছে অন্যান্য কার্যকারণের। তা না হলে দাম্পত্য জীবনে এমন সব ঘটনা নিত্য ঘটছে, যার দরুন এ সম্পর্কই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া ছিল অতি স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানে অর্থনৈতিক ভিত্তিতে দুজনকে একত্রিত করার কোনো কারণই দৃষ্টিগোচর হয় না বলে সে দাম্পত্য জীবন অটুটই থেকে যায়।

স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আসল কারণ হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসা, অন্তরের স্বতঃস্ফুর্ত দরদ ও প্রণয়-প্রীতি, যা স্বভাবতই দুজনার মধ্যে বিরাজ করছে। স্বামী ও স্ত্রী উভয় পরস্পরের জন্যে যে  অপরিসীম ভালোবাসাও তীব্র আকর্ষণ বোধ করে, পারিবারিক জীবন-সংস্থা তারই স্থিতিস্থাপকতা বিধান করে। তারা এ জিনিসকে সাময়িকভাবে একত্রিত হওয়ার ভিত্তি বানাতে কখনো রাজি হতে পারে না। বরং তাদের জীবনে এমন কতগুলো লক্ষ্যও উদ্দেশ্য উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হতে থাকে, যার পরিপূরণের জন্যে তাদের সমগ্র জীবনকে অকাতরে ও ঐকান্তিকভাবে  লাগিয়ে দেয়। তারা একটি নবতর বংশ সৃষ্টি করাই দায়িত্বই পালন করে না, তাদের লালন-পালন ও শিক্ষাদীক্ষা দান করে, সমাজের একটা কল্যাণকর অংশে পরিণত করার কাজও তারা-ই করে। এসব উদ্দেশ্য স্বামী-স্ত্রীকে নিছক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও অনেক ঊর্ধ্বে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

৩. তৃতীয় যুক্তিটি মানবীয় অনুভূতি ও আন্তরিক ভাবধারার ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। সন্তানের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যের পশ্চাতেও কোন অর্থনৈতিক স্বার্থবোধ নিহিত রয়েছে বলে ধরে নিলে বলতে হয়, ধনী লোকদের মনে সন্তান কামনা বলতে কিছুই থাকা উচিত নয়। আর সন্তান হলে তাদের জন্যে কোন স্নেহ-মায়াও থাকা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তো তা নয়। যে শিশু পঙ্গু, অন্ধ, যার থেকে কোনো প্রকারের অর্থনৈতিক স্বার্থ লাভের একবিন্দু আশা থাকে না, বরং বাপ-মায়ের ওপর যে কেবল বোঝা হয়েই রয়েছে, এমন সন্তানকে বাপ-মা কেন বুকে জড়িয়ে রাখে? তার খবরাখবরের জন্যে তার সেবা-শুশ্রূসা ও তাকে আদর-যত্ন করার জন্যে পিতা মাতা কেন সতত উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে? সে অনেক টাকা রোজগার করে বাপ-মাকে সাহায্য করবে, এমন কোন আশা কেউ পোষণ করে কি? –বিবেকের কাছে এ যুক্তিটি আদৌ টিকে না।

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, সৃষ্টিকর্তা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানব বংশকে ও গোটা সৃষ্টিলোককে বাঁচিয়ে রাখতে চান, এজন্যে প্রত্যেকটি সৃষ্টির মধ্যেই এমন কিছু স্বাভাবিক দাবি ও প্রবণতা রেখেছেন, যা তাকে আত্মসচেতন করে বাঁচিয়ে রাখে এবং তার নিজের ধ্বংসের পূর্বেই তার স্থলাভিষিক্ত, তার বংশধর তৈরী করতে তাকে বাধ্য করে। এই স্বাভাবিক ভাবধারা নিঃশেষ হয়ে গেলে কোনো সৃষ্টিকেই তার চূড়ান্ত নিশ্চিহ্নতা থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়। শূন্যলোকের স্বাধীন মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায় যে পাখি, তাকেও এই স্বভাবগত দাবির জন্যেই খড়কুটো আহরণ করে নীড় রচনা করতে হয় এবং স্বাভাবিক কারণেই স্বীয় বংশধরের জন্যে আবাসকেন্দ্র গড়ে তুলতে সাধ্য হতে হয়। তার পরও তাকে সে বংশধরদের বাঁচিয়ে রাখা –লালন পালন করার জন্যে, শত্রুদের হামলা থেকে তাদের রক্ষা করার জন্যে সতত ব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়। গোটা সৃষ্টিলোকেরই এই অবস্থা। আর এই সবই যদি নিতান্ত স্বভাবগত প্রবণতার কারণেই হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের এ স্বাভাবিক প্রবণতা ও তৎপ্রসূত কাজকে অর্থনৈতিক কারণমূলক মনে করা হবে কেন, -কোন যুক্তিতে?

৪. চতুর্থ যুক্তির জবাবে বলতে হচ্ছে, পারিবারিক ব্যবস্থা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত। এ উদ্দেশ্যের বাস্তবিকই যদি কোন গুরুত্ব থেকে থাকে আর মানবতার কল্যাণের জন্যেই তার বাস্তবায়ন জরুরী হয়ে থাকে, তাহলে এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয় যেসব অবস্থা, তা মানবতার পক্ষে কিছুতেই কল্যাণকর হতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠান (Institution) কায়েম করাই কোনো উদ্দেশ্য হতে পারে না, মানবতার দুঃখ-দরদ ও যন্ত্রণা-লাঞ্ছনা বিদূরণই হচ্ছে আসল লক্ষ্য। কোনো প্রতিষ্ঠান এ উদ্দেশ্যের প্রতিবন্ধক হলে তার মূলোৎপাটনই বাঞ্ছনীয়। সন্তান ও পিতা-মাতার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করা ও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ এনে দেয়ার জন্যে আজ যে-সব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করা হয়েছে, পারিবারিক ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে কায়েম রেখে সে সব প্রতিষ্ঠানকে কল্যাণকর ভূমিকায় নিয়োজিত করা যায় কিনা, তাও তো গভীরভাবে ভেবে দেখা আবশ্যক। এ যদি সম্ভবই না হয়, তাহলে বলতে হবে, মানুষ প্রথমে পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, তারপরে তার কৃত্রিম বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে –শূন্যস্থান পূরণের জন্যে মাত্র –এসব প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানো হয়েছে। বস্তুত পরিবার ব্যবস্থাকে যথাযথ কায়েম রেখেও এসব প্রতিস্ঠানকে ভবিষ্যৎ মানব বংশের জন্যে কল্যাণকর বানানো যেতে পারে –কিংবা পরিবার ব্যবস্থার অনুকূলে এ ধরনের নবতর আরো অনেক প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যেতে পারে –তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

৫. পঞ্চম যুক্তিটি এমন যা পেশ করতে আধুনিক যুগের লজ্জাবনত হওয়া উচিত বলেই মনে করি। বর্তমান যুগে যেভাবে শিশু-সন্তানদের লালন-পালন করা হচ্ছে, তার বীভৎস পরিণতি দুনিয়ার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্বের দিকে এগিয়ে দেয়ার পরিবর্তে নিতান্ত পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়েছে। আজকের মানুষের হিংস্রতা ও বর্বরতা জঙ্গলের রক্তজীবী পশুকেও লজ্জা দেয়। আজকের মানব সমাজ জাহান্নামে পর্যবসিত হয়েছে। তার একটি মাত্রই কারণ এবং তা হচ্ছে এই যে, মানুষকে ভালোবাসা, দরদ, প্রীতি, সহানুভূতি প্রভৃতি সুকোমল ভাবধারা থেকে বঞ্চিত করে দিলে তখন আর মানুষ মানুষ থাকবে না, জংগলের হিংস্র জন্তু ও তার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না –এই কথাটি আজ সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত। অথচ মানুষের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না –এই কথাটি আজ সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত। অথচ মানুষের স্বভাবগত এই প্রেম-ভালোবাসা, দরদপ্রীতি স্বাভাবিকভাবে লালিত-পালিত হলে তা মানুষকে ফেরেশতার চেয়েও অধিক মহিমান্বিত বানিয়ে দিতে পারে। আইনের কঠোর শাসন দিয়ে মানুষকে বন্দী জানোয়ার তো বানানো যেতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব নয়। মায়ের মমতা ও স্নেহময় ক্রোড়ই তা জাগাতে পারে। মা তার মমতাসিক্ত দৃষ্টি দিয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মনুষ্যত্বের এমন উচ্চতর জ্ঞান শিক্ষা দিতে পারে, এমন সব মহৎ গুণে তাকে ভূষিত করতে পারে, যা এখনকার কোনো ট্রেনিং কেনদ্র আর কোনো গবেষণাগারও করতে পারবে না। বস্তুত মা শিশুকে কেবল স্তনই দেয় না, প্রতি মুহুর্তের সাহচর্যে অলক্ষ্যে এমন সব ভাবধারা মগজে বসিয়ে দেয়, যার দরুন এক ক্ষীণ, দুর্বলপ্রাণ শিশু জীবিত থাকে, লালন-পালনে ক্রমশ বর্ধিত হয়ে ওঠে। মায়ের ঘুমপাড়ানি গান শিশুর চোখে কেবল ঘুমই এনে দেয় না, শত্রুতা, ঘৃণা, হিংসা ও মানসিক কুটিলতাকেও স্নেহ-মমতার নির্মল স্রোতধারায় ভাসিয়ে দেয়।

আজকের মা-বাপ খুব ব্যস্ত –এতদূর ব্যস্ত যে, নিজ ঔরসজাত আর গর্ভজাত সন্তানেরও লালন-পালন করার একবিন্দু অবসর পায় না –এ একটি ভিত্তিহীন কথা। মানুষ আজ প্রকৃতই ব্যস্ত নয়, ব্যস্ততার বিলাসিতায় দিগভ্রান্ত মাত্র, যার কারনে মানুষের আসল কর্তব্য আজ উপেক্ষিত হচ্ছে, পাশ কাটাতে চেষ্টা করা হচ্ছে নিতান্ত অবহেলায়। মানুষ আজ দুনিয়ায় অমূলক ভোগ-সম্ভোগের গড্ডালিকা প্রবাহে নিরুদ্দেশের পানে ছুটে চলছে। সকলকে বঞ্চিত করে সকলের ভাগের সব কিছু একাই লুটে পুটে নেয়ার উদ্দাম নেশায় আজকের মানুষ দিশেহারা। ফলে তার আসল মানবীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্যায়ভাবে বর্জিত, অবহেলিত। পরিবার ও পারিবারিক জীবনের প্রতি আজকের মানুষের বিরাগের মূল কারণই হচ্ছে এই। বিবাহিত হয়ে দায়িত্বশীল জীবনের বোঝা আজকের মানুষ মন-মেজাজের কাছে যেন একান্তই দুর্বহ হয়ে পড়েছে। তাই সে পরিবারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ আযাদ ও মুক্ত দিনাতিপাত করতেই অধিকতর আগ্রহী। এজন্যেই সে নিজ ঔরসজাত –গর্ভজাত সন্তানকে নার্সারী হোমে পাঠিয়ে দিয়ে সব ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে চাচ্ছে। একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার দায়িত্ব না নিয়ে রক্ষিতা আর পতিতা দ্বারা –পাশবিক বৃত্তি চরিতার্থ করে যাচ্ছে।

একটু সহজ দৃষ্টিতে বিচার করলেই দেখা যাবে, পরিবার অতি ক্ষুদ্র ও হালকা একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র। তার অবশ্য কিছু বাধ্যবাধকতা আছে, আছে কিছু দাবি ও দায়দায়িত্ব। লালন-পালন ও সংগঠনের জন্যে তার নিজস্ব কতগুলো বিশেষ নিয়ম-প্রণালীও রয়েছে। যারা পারিবারিক জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত, তারা সেসব সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম। আর তারাই সেসবের মনস্তাত্ত্বিক ও অভ্যন্তরীণ ভাবধারাকে যথাযথ রক্সা করে তার লালন-পালনের কর্তব্যও সঠিকভাবে পালন করতে পারে। পক্ষান্তরে রাষ্ট্র হচ্ছে একটি ব্যাপক বড় ও ভারী প্রতিষ্ঠান, যাকে প্রধানত আইন ও শাসনের ভিত্তিতেই চলতে হয়। এখন পরিবারকে ভেঙ্গে দিয়ে যদি গোটা রাষ্ট্রকে একটি পরিবারে পরিণত করে দেয়া হয়, তাহলে পরিবারের লোকদের মধ্যে পারস্পরিক যে আন্তরিকতা ও দরদ-প্রীতির ফল্গুধারা প্রবাহিত তা নিঃশেষে ফুরিয়ে যাবে। রাষ্ট্র পরিবারের আইন-বিধানের প্রয়োজন তো পূরণ করতে পারে; কিন্তু নিকটাত্মীয় ও রক্ত সম্পর্কের লোকদের পারস্পরিক আন্তরিক ভাবধারার বিকল্প সৃষ্টি করতে সক্ষম নয় কোনক্রমেই।

মানুষের প্রকৃতিই এমনি যে, তাকে যতদূর সীমাবদ্ধ পরিবেশের মধ্যে রেখে লালন-পালন করা হবে, তার অভ্যন্তরীণ যোগ্যতা-প্রতিভা তত বেশী বিকাশ স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা লাভ করতে সক্ষম হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়েই মানুষ বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের যোগ্য হতে পারে। পরিবার ব্যবস্থাকে খতম করে দিয়ে মানব সন্তানকে যদি রাষ্ট্রের বিশাল উন্মুক্ত পরিবেশে সহসাই নিক্ষেপ করে দেয়া হয়, তাহলে তার পক্ষে সঠিক যোগ্যতা নিয়ে গ ওঠা কখনই সম্ভব হবে না। পরন্তু পরিবারকে রাষ্ট্রীয় প্রভাবের বাইরে যথাযথভাবে রক্ষা করা হলে তা মানব বংশের জন্যে এক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ-কেন্দ্র (Training centre) হতে পারে, যার ফলে উত্তরকালে তারাই রাষ্ট্রের বিরাট দায়িত্ব পালনের যোগ্যতায় ভূষিত হবার সুযোগ পাবে।

 

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার

পূর্বের আলোনা থেকে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিবার হচ্ছে একিট ছোট্ট সমাজ-সংস্থা (Small Community)। কেননা বৃহত্তম সমাজ-সংস্থার পৌরহিত্যে সাধারণ জীবনের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপন করে দেয় এই পরিবার। এর ফলেই সাধারণ ঐতিহ্য ও সাধারণ ভাবধারাকে বৃহত্তর সমাজে উপস্থাপিত করার সুযোগ হয়ে থাকে।

সেই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, পরিবার হচ্ছে একটি যৌন সংস্থা (association of sex), সন্তান প্রজননের একটি স্থায়ী কারখানা। আর তা সংস্থাপিত রয়েছে বিয়ে সম্বন্ধের (Contract of marriage) ওপর। তার অর্থ, পরিবার একই সঙ্গে একটি সম্প্রদায় (Community) এবং একটি মহাসম্মিলন (association)। অন্তত এ দুয়ের মাঝখানে পরিবার হচ্ছে একটি অপরিহার্য সোপান (Bridge)।

পরিবার স্থায়ী সংস্থা

পরিবার কি কোনো কৃত্রিম ও ইচ্ছানুক্রমে উদ্ভাবিত প্রতিষ্ঠান? তার কি অক্ষয় ও স্থায়ী হয়ে থাকা উচিত? তার কি একটি বিশ্বজনীন, সর্বদেশের ও সর্বকালের প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নয়? বস্তুত মানব ইতিহাসের অতিপ্রাচীন কালেও এ পরিবারের অস্তিত্ব দেখা গেছে এবং মানুষ যদ্দিন এ ধরিত্রীর বুকে থাকবে, তদ্দিন পরিবার অবশ্যই টিকে থাকবে। কালের কুটিল গতি তাকে কিছুতেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে পারবে না। প্লেটো থেকে এইচ.জি. ওয়েলস পর্যন্ত দার্শনিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী সন্তান-সন্ততিকে বাপ-মা’র সংস্পর্শে ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা যেতে পারে বটে, কিন্তু এ পদ্ধতিতে সত্যিকার মানুষ তৈরীর জন্যে কোনো সফল প্রচেষ্টা আজো কার্যকর হতে দেখা যায়নি। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, পরিবার হচ্ছে এক স্থায়ী ও অক্ষয় মানবীয় সংস্থা (Human institution) এবং এর এই স্থিতিস্থাপকতার কারণ মানব প্রকৃতির গভীর সত্তায় নিহিত। অন্য কথায় পরিবার স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যবর্তী কোনো ক্ষণস্থায়ী যোগাযোগের ব্যাপারে আদৌ নয়।

প্লেটোর অভিমত

দার্শনিক প্লেটো পরিবারকে একটি স্বাভাবিক (natural institution) বলে স্বীকার করে নিতে পারেন নি। তাঁর মতে পরিবারই হচ্ছে সমাজ জীবনের সব অনৈক্যের (Discord) মূলীভূত কারণ। কেননা এই পরিবারই মানুষকে শিক্ষা দেয়ঃ আমি ও তুমি, আমার ও তোমার। অতএব, তাঁর মতে পরিবার প্রথার উচ্ছেদই বাঞ্ছনীয়। তখন সব নারী-পুরুষ রাষ্ট্রের ব্যবস্থাধীন ব্যারাকে বসবাস করবে এবং রাষ্ট্রকর্তাদের পর্যবেক্ষণাধীন শ্রেষ্ঠ নর শ্রেষ্ঠ নারীকে গ্রহণ করবে তাদের যৌন-লালসা নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে। তাদের এই যৌন মিলনের ফলে যখন কোনো নারীর সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, তখন-তখনই সে সন্তানকে সরকারী নার্স অন্যত্র তুলে নিয়ে যাবে, যেন সে সন্তান তার পিতামাতাকে জানতে না পারে এবং পিতামাতাও যেন চিনতে না পারে তাদের ঔরসজাত –গর্ভজাত সন্তানকে। এরূপ কার্যক্রমের সর্বশেষ ফল দাঁড়াবে এই –এক দিনে প্রসূত সকল সন্তানকে সব বাবা-মায়ের নিজের সম্মিলিত সন্তান বলে মনে করতে থাকবে। আর কোনো  পিতামাতা কোনো সন্তানকেই নিজের সন্তান বলে দাবি করার এবং অন্যদের থেকে পৃথক করে দেখবার সুযোগ পাবে না। এর ফলে রাষ্ট্র সর্ব দিক থেকেই সুরক্ষিত থাকতে পারবে। অন্যথায়, প্রত্যেকটি পরিবারের প্রয়োজন নির্বাহের জন্যে আলাদা আলাদা সম্পত্তি সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেবে এবং রাষ্ট্রের সমগ্র এলাকা ‘আমার’ ও ‘তোমার’ মধ্যে বণ্টিত ও খণ্ডিত হয়ে পড়বে। কিন্তু প্রস্তাবিত পন্থায় পরিবারও যেমন নির্ভুল হবে, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বিলুপ্ত হবে। আর এর দরুন সমাজের সব বিভেদ ও অনৈক্য বিদূরিত  হবে এবং সব অসামঞ্জস্যও বিলীন হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত এর দরুন গোটা রাষ্ট্রই পরিণত হবে একটি মাত্র পরিবারে, আর সে পরিবারের সদস্যরূপে গণ্য হবে  দেশের সমস্ত মানুষ।

এ্যারিস্টটলের অভিমত

কিন্তু এ্যারিস্টটল প্লেটোর সাথে এ ব্যাপারে মোটেই একমত নন। তাঁর মতে পরিবার একটি অতি স্বাভাবিক মানবীয় সংস্থা। কেননা এর মূল নিহিত রয়েছে মানুষের নৈত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনের গভীর তলে। কোনো মানুষই ব্যক্তিগতভাবে তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনাবলী পরিপূরণের জন্যে তার প্রয়োজন একজন সহকারীর, সাহায্যকারীর, সহকর্মীর। আর স্ত্রী-ই যে হতে পারে তার সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রকার সহকারী, সাহায্যকারী, তা স্বীকার না করে উপায় নেই। এ কারণে নারী পুরুষ পরস্পরের যোগাযোগে আসে কেবল পছন্দের মাধ্যমেই নয়, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আবেগের তাড়নায়ও। অতএব গার্হস্থ্য সমাজ –অন্য কথায় পরিবার হচ্ছে প্রথম স্বাভাবিক সমাজ, জনসম্মিলন। কেননা এই সম্মিলন স্ত্রী-পুরুষের অন্তঃস্থিত স্বাভাবিক তৃপ্তির অনুভূতির ফলশ্রুতি।

দ্বিতীয়ত, কেবল সন্তান লাভের কামনায়ই নারী-পুরুষ পরস্পরের সংস্পর্শে আসে না, গার্হস্থ্য জীবনের প্রথম প্রয়োজন –খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের দাবি পূরণের জণ্যেও তাদের এই সম্মিলন কাম্য। কাজেই দৈনন্দিন আর্থিক প্রয়োজন পূরণের তাড়নাও গড়ে তোল পরিবার, পারিবারিক জীবন। আর উভয়ের থাকে এই পারিবারিক জীবনে।

তৃতীয়ত, মানুষ স্বভাবের দিক দিয়েই সামাজিক জীব এবং নর ও নারী নিজ নিজ প্রজাতির গুণের কারণে একত্রিত ও সম্মিলিত জীবন যাপনে বাধ্য। এ কারণেই তাদের মিলন অস্থায়ীও যেমন নয়, তেমনি নিছক কার্যকারণ ঘটিতও নয়; বরং এ হচ্ছে একান্তই স্থায়ী ও স্বাভাবিক ব্যবস্থা। এজন্যে পরিবারকে বলা যায়ঃ

A Moral Friendship rejoicing in each other’s goodness. পরস্পরের কল্যাণ কামনাপূর্ণ নৈতিক বন্ধুত্ব।

বস্তুত স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে এক সুখ ও পরিতৃপ্তি সমাজের প্রথম ধাপ। আর সন্তান লাভ হচ্ছে এ সুখী সমাজের চতুর্থ স্তর। এ কথা প্রমাণ করে যে, পরিবার কেবল যৌন ও পাশবিক জৈবিক জীবন রক্ষার জন্যেই প্রয়োজনীয় নয়, স্বভাবতই এর লক্ষ্য  হচ্ছে এক উন্নত নৈতিক পবিত্র ও নির্দোষ জীবন যাপন।

এ সব বাস্তব (Natural) কারণ ছাড়াও –এ্যারিস্টটল বলেনঃ প্রকৃত প্রেম ভালোবাসা ও প্রীতি-প্রণয় অল্প সংখ্যক মানুষের খুবই ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ পরিবেষ্টনীর মধ্যেই উৎকৃষ্ট ও বিকশিত হতে পারে। পরিবেশের লোকসংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাবে, ভালোবাসার মাত্রাও ঠিক সেই অনুপাতে হ্রাস (decreases) প্রাপ্ত হবে। এ কারণেই বলা যায়, পরিবারের একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে ভালোবাসা বেশ দানা বেঁধে, ফুলে ফলে সুশোভিত ও শাখায়-প্রশাখায় বিকশিত হয়ে উঠতে পারে। আর তারই ফলে সাধারণ স্বার্থের ব্যাপারে তা-ই হতে পারে একটি বৃহত্তম ও শক্তিসম্পন্ন মানসিকতা (Strong sentiment)। এখানে প্রেম-ভালোবাসার এ জন্মভূমিকেই যদি –প্লেটোর মত অনুযায়ী –বিনষ্ট করে দেয়া হয়, তাহলে গোটা সমাজ সংস্থাই বিশ্লিষ্ট ও শিথিল হয়ে পড়বে। আর শেষ পর্যন্ত সাধারণ জীবনের অনুকূলে কোনো জোরালো মানসিকতা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন কি, মানসিকতার যে পবিত্র সুকুমার ও সুন্দরতম অনুভূতি তাও নিঃশেষে মিলিয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে শেষ কথা এই যে, পরিবার ভেঙ্গে দিলে মানব-সন্তান তার নৈতিক উর্দ্বতন হারিয়ে ফেলবে। কেননা তারা পিতামাতার স্বাভাবিক স্নেহ-বাৎসল্য থেকে হবে বঞ্চিত। একজন নার্স বা ধাত্রী কি কোনো দিক দিয়েই মা’র স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, -যে মা দশমাস কাল যাবত স্বীয় গর্ভে বত্রিশ নাদী দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তার সন্তানকে! আর বড় কষ্ট ও মর্মান্তিক বেদনা-যন্ত্রণা ভোগ করে তাকে প্রসব করেছে? –এসব কারণে মা সন্তানের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই যতখানি দরদ ও রক্তের টান অনুভব করবে, ধাত্রী বা নার্স কি তার এক লক্ষ ভাগের একভাগও অনুভব করতে পারে? –অথচ মানব শিশুর মানুষ হয়ে গড়ে উঠবার জন্যে তা একান্তই অপরিহার্য।

তাছাড়া প্রত্যেকটি মানুষই স্বাভাবিকভাবে নিজস্ব সম্পত্তি গড়ে তুলতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। এ তার নিজেরই স্বার্থ, নিজেরই উৎসাহ-উদ্দীপনা। তা যদি সাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রতি সাধারণের অযত্ন ও অনাসক্তি হওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। শিশু সন্তানদের ব্যাপারেও একথা অনস্বীকার্য। তাই বলতে হচ্ছে, প্লেটোর কল্পিত সমাজে শিশু-সন্তান যখন কারো নিজস্ব হবে না, হবে সকলের সর্বসাধারণের সমান আপন(?) তখন প্রকৃতপক্ষে সে শিশু কারোরই নিজের হবে না। তাদের প্রতি সকলের ও সর্বসাধারণের অবজ্ঞা ও অবহেলা হওয়াই স্বাভাবিক। এভাবে একটি মহামূল্যে সেবা ও দানের কাজ তার সব মূল্য ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে। সকলেরই ‘আপন’  বানাবার চেষ্টা কারোই ‘আপন’ বানাবে না, মনস্তত্ত্বের এ সত্য কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পৌরবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও বলা যায়, একটি সুষ্ঠু পরিবার সুস্থ নাগরিক জীবন গড়ে তোলার জন্যে অপরিহার্য। বরং বলা যায়, সুষ্ঠু নাগরিক জীবনের জন্যে পরিবারই হচ্ছে প্রথম স্বাভাবিক জীবকেন্দ্র। এর ফলে যদিও একজন নাগরিক পরিবারকেন্দ্রিক এবং সাধারণ সমাজ বিমুখ হয়ে পড়তে পারে; কিন্তু তবুও তার ক্ষতির পরিমাণ পরিবার ধ্বংস করার অনিবার্য পরিণতির তুলনায় নিশ্চয়ই অনেক কম। সত্য বলতে কি মায়ের বাৎসল্যপূর্ণ চুম্বন এবং পিতার স্নেহপূর্ণ সেবাযত্নের পবিত্র পরিবেশেই জন্ম নিতে পারে মানুষের ভবিষ্যৎ সমাজ। নাগরিকত্বের প্রথম শিক্ষা মায়ের ক্রোড়ে আর বাবার স্নেহছায়াতেই হওয়া সম্ভব। যে দেশে পরিবার নেই কিংবা নেই পারিবারিক শৃঙ্খলা পবিত্রতা সেখানকার বংশধর বা ভবিষ্যত সমাজ যে কতখানি উচ্ছৃঙ্খল ও চরিত্রহীন –অতএব দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে গড়ে উঠেছে, বর্তমান ইউরোপ-আমেরিকা তথা চীন ও রাশিয়া তার সুস্পষ্ট নিদর্শন। এ দৃষ্টান্ত দেখার পরও যারা পরিবারকে অস্বীকার করার দুঃসাহস করে, তাদেরকে মানবতার শত্রু বলাই শ্রেয়।

 

পরিবার বিশ্বপ্রকৃতি

একজন পুরুষ ও একজন নারী বিবাহিত হয়ে যখন একসঙ্গে জীবন যাপন করতে শুরু করে, তখনি একটি পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এখানে পুরুষ হয় স্বামী আর নারী হয় স্ত্রী। এ দুয়ের সম্মিলিত ভালোবাসাপূর্ণ যৌন জীবনকেই বলা হয় দাম্পত্য জীবন।

নারী-পুরুষের এ দাম্পত্য জীবনের উদগাতা হলো বিয়ে। এর প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য, নির্দিষ্টভাবে স্বাভাবিক যৌন প্রবৃত্তির অবাধ ও নিঃশংক চরিতার্থতা। স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরকি নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও ঐকান্তিকতা দাম্পত্য জীবনের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। মনের মিল ও পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি এ বন্ধনকে দুশ্ছেদ্য করে তোলে। এর দ্বিতীয় মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে বংশের ধারা অব্যাহত রাখা –উত্তরাধিকারী উৎপাদন। পূর্ব পুরুষের মৃত্যু ও উত্তর পুরুষের মধ্যবর্তীকালে নিজেকে জীবন্ত করে রাখার স্বাভাবিক প্রবণতা মানুষকে এজন্যে সর্বতোভাবে উদ্যোগী ও তৎপর বানিয়ে দেয়। তখন এ হয় এক চিরন্তন সত্য, এক চিরস্থায়ী বংশ-প্রতিষ্ঠান।

বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন বিশ্বপ্রকৃতির এক স্বভাবসম্মত বিধান। এ এক চিরন্তন ও শাশ্বত ব্যবস্থা, যা কার্যকর হয়ে রয়েছে বিশ্ব প্রকৃতির পরতে পরতে, প্রত্যেকটি জীব ও বস্তুর মধ্যে! আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী****************************************)

প্রত্যেকটি জিনিসকেই আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।

বস্তুত সৃষ্ট জীব, জন্তু ও বস্তুনিচয় জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করার তাৎপর্যই এই যে, সৃষ্টির মূল রহস্য দুটো জিনিসের পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে থাকাতেই নিহিত রয়েছে। যখনই এভাবে দুটো জিনিসের মিলন সাধিত হবে, তখনই তা থেকে তৃতীয় এক জিনিসের উদ্ভব হতে পারে। সৃষ্টিলোকের কোনো একটি জিনিসও এ  নিয়মের বাইরে নয়, একটি ব্যতিক্রমও কোথাও দেখা যেতে পারে না। তাই কুরআন মজীদে দাবি করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************************)

মহান পবিত্র সেই আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিলোকের সমস্ত জোড়া সৃষ্টি করেছেন –উদ্ভিদ ও মানবজাতির মধ্য থেকে এবং এমন সব সৃষ্টি থেকে, যার সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না।

এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, ‘বিয়ে’ ও ‘সম্মিলিত জীবন যাপন’ এবং তার ফলে তৃতীয় ফসল উৎপাদন করার ব্যবস্থা কেবল মানুষ, জীব-জন্তু ও উদ্ভিদ গাছপালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ হচ্ছে গোটা বিশ্বপ্রকৃতির অন্তর্নিহিত এক সূক্ষ্ম ও ব্যাপক ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক জগতের কোনো একটি জিনিসও এ থেকে মুক্ত নয়। গোটা প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই এমনিভাবে রচিত যে, এখানে যত্রতত্র যেমন রয়েছে পুরুষ তেমনি রয়েছে স্ত্রী এবং এ দুয়ের মাঝে রয়েছে এক দুর্লংঘ্য ও অনমনীয় আকর্ষণ, যা পরস্পরকে নিজের দিকে প্রতিনিয়ত তীব্রভাবে টানছে। প্রত্যেকটি মানুষ –স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যেও রয়েছে অনুরূপ তীব্র আকর্ষণ এবং এ আকর্ষণই স্ত্রী ও পুরুষকে বাধ্য করে পরস্পরের সাথে মিলিত হতে –সম্মিলিত ও যৌথ জীবন যাপন করতে। মানুষের অন্তর –অভ্যন্তরে যে স্বাভাবিক ব্যাকুলতা, আকুলতা ও সংবেদনশীলতা রয়েছে বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তভাবে মিলিত হওয়ার জন্যে, তারই পরিতৃপ্তি ও প্রশমন সম্ভবপর হয় এই মধু মিলনের মাধ্যমে। ফলে উভয়ের অন্তরে পরম প্রশান্তি ও গভীর স্বস্তির উদ্রেক হয় অতি স্বাভাবিকভাবে।

মানুষের অন্তর্লোকে যে প্রেম ভালোবাসা প্রীতি ও দয়া-অনুগ্রহ, স্নেহ-বাৎসল্য ও সংবেদনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই বিরাজমান, তার কার্যকারিতা ও বাস্তব রূপায়ণ এই বৈবাহিক মিলনের মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। এজন্যে হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************)

আল্লাহ বলেছেনঃ আমিই আল্লাহ, আমারই নাম রহমান, অতীব দয়াময়, করুণা নিধান, আমিই ‘রেহেম’ (রক্ত সম্পর্কমূলক আত্মীয়তা) সৃষ্টি করেছি এবং আমার নিজের নামের মূল শব্দ দিয়েই তার নামকরণ করেছি।

অন্য কথায়, প্রেম-প্রীতি, দয়া-সংবেদনশীলতা ও স্নেহ-বাৎসল্য মানব-প্রকৃতির নিহিত এক চিরন্তন সত্য। আর এ সত্যের মুকুর পুষ্পাকৃতি লাভ করতে পারে না এবং এ পুষ্প উন্মুক্ত উদ্ভাসিত হতে পারে না মানব-মানবীর মিলন ব্যতিরেকে। এ মিলনই সম্ভব হতে পারে পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে।

পরিবারের ইতিবৃত্ত

বস্তুত বিয়ে নারী ও পুরুষের মাঝে এমন এক একত্ব ও একাত্মতা স্থাপন করে, যা ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক সমর্থিত হয়ে থাকে। এ ঐক্য (Unification) ও একাত্মতার ভিত্তি হচ্ছে নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক। বিয়ের মাধ্যমেই নারী পুরুষের মাঝে এ একত্ব ও একাত্মতা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। তখন নারী-পুরুষের মাঝে কেবল দৈহিক মিলনই অনুষ্ঠিত হয় না, মন ও প্রাণেরও গভীর সূক্ষ্ম মিলনসূত্র গ্রথিত হয়। মন, প্রাণ ও দেহ –এ তিনের মিলন ও একাত্মতা ব্যতীত ‘বিবাহ’ কিংবা পারিবারিক জীবন কল্পনাতীত। আর দৈহিক মিলন ব্যতীত মন ও প্রানের একাত্মতা সৃষ্টি হতে পারে না, পারে না তা পূর্ণত্ব লাভ করতে। অন্য কথায় দৈহিক মিলন অর্থ যৌন জীবনের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব। নারী ও পুরুষের যৌন-জীবন নির্ভুল রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী কায়েম না হলে কিংবা এ ব্যাপারে পারস্পরিক যৌন ক্ষুধা ও পিপাসা অতৃপ্ত থেকে গেলে না দৈহিক মিলন সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে, না মানসিক ও আত্মিক মিলন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে।

আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান –যার উৎপত্তি হয়েছে নাস্তিকতাবাদী ইউরোপীয় সমাজে –বিয়ের ও পারিবারিক জীবনের এক অদ্ভূত ইতিহাস উপস্থাপিত করেছে। এ ইতিহাস অনুযায়ী অতি প্রাচীনকালে মানব সমাজে বিয়ের আদৌ কোনো প্রচলন ছিল না। মানুষ নিতান্ত পশুর স্তরে ছিল এবং পশুদের ন্যায় জীবন যাপন করত। তখনকার মানুষের একমাত্র লক্ষ্য ছিল খাদ্য সংগ্রহ ও যৌন প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তি লাভ। যৌন মিলন ছিল নিতান্ত পশুদের ন্যায়। তখনকার সমাজে বিষয়-সম্পত্তির ওপর ছিল না ব্যক্তিগত স্বত্ত্বাধিকার, ছিল না কোনো বিশেষ নারী বিশেষ কোনো পুরুষের স্ত্রী বলে নির্দিষ্ট। ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তির জন্যে তাদের সম্মুখে ছিল খাদ্য পরিপূর্ণ বিশাল ক্ষেত্র, তেমনি যৌন প্রবৃত্তির নিবৃত্তির জন্যে ছিল নির্বিশেষে গোটা নারী সমাজ। উত্তরকালে মানুষ যখন ধীরে ধীরে সভ্যতা ও সামাজিকতার দিকে অগ্রসর হলো, বিস্তীর্ণ ও ব্যাপক হতে থাকল তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনাশক্তি; তখন নারী পুরুষের মাঝে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনের এবং বিশেষ পুরুষের জন্যে বিশেষ নারীকে নির্দিষ্ট করার প্রম্ন দেখা দিল। সন্তান প্রসব, লালন-পালনের ও সংরক্ষণের যাবতীয় দায়িত্ব যেহেতু স্বাভাবিকভাবেই নারীদের ওপর বর্তে সেজন্যে সেই প্রাথমিক যুগে নারীর গুরুত্ব অনুভূত এবং সমাজ ক্ষেত্রে এক বিশেষ মর্যাদা স্বীকৃত হলো। সেকালে সন্তান পিতার পরিবর্তে মা’র নামে পরিচিত হতো। কিন্তু এ রীতি অধিক দিন চলতে পারেনি। নারীদের সম্পর্কে পুরুষদের মনোভাব ক্রমে ক্রমে বদলে গেল। নারীদের স্বাভাবিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুরুষরা তাদের স্থাবর সম্পত্তির ন্যায় দখল করে বসল এবং দখলকৃত বিত্ত-সম্পত্তির উপযোগী আইন-কানুন নারীদের ওপরও চালু করল। কিন্তু সমাজ যখন ক্রমবিবর্তনের ধারায় আরো কয়েকটি স্তর অতিক্রম করে গেল, তখন পরিবার ও  গোত্রের ভিত্তি স্থাপিত হলো। রাষ্ট্র ও সরকার সংস্থা গড়ে উঠল। আইন ও নিয়ম-নীতি রচিত হলো। তখন বিয়ের জন্যে নারীদের তার পিতা-মাতার অনুমতিক্রমে কিংবা নগদ মূল্যের বিনিময়ে লাভ করার রীতি শুরু হল। যদিও মূল্যদানের সে আদিম রীতি আজকের সভ্য সমাজেও কোনো না কোনো রূপ নিয়ে চালু হয়ে আছে। বস্তুত পাশ্চাত্য সমাজতত্ত্বে মানুষকে পশুরই অধঃস্তন মনে করে নেয়া হয়েছে, তাই মানব জীবন ও সমাজের এই পাশবিক সূচনার ইতিহাসও সম্পূর্ণ মনগড়াভাবে রচনা করে নিতে হয়েছে! কিন্তু তাই মানুষের প্রকৃত ইতিহাস হবে –এমন কথা সত্য নয়।

একজন স্ত্রী স্বামীর প্রতি চরম মাত্রার অভিমানে বিক্ষুব্ধ নিজ স্বামী ও সন্তানদের পরিত্যাগ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েও তার সেই স্বামী সন্তান ও সংসারের একান্ত নিজস্ব পরিমণ্ডলের মায়ায় সে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা এবং পুনরায় স্বামী সন্তান নিয়ে স্ত্রীত্ব ও মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার –এবং অনুরূপ কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে পুনরায় গৃহে ফিরিয়ে আনার নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনাবলী অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই প্রকৃতিগতভাবে পারিবারিক জীবন যাপনে একান্তভাবে আগ্রহী। বাইরের অন্যান্য ব্যস্ততার আকর্ষণ যত তীব্র ও দুর্দমনীয় হোক, স্ত্র বা স্বামীর সন্তান ও সংসারের বিনিময়ে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হওয়া কোনো সুস্থ প্রকৃতির নারী বা পুরুষের পক্ষেই সম্ভব নয়, চিন্তনীয়ও নয়।

কিন্তু কুরআন মজীদে মানব-সৃষ্টি ও সমাজ-সভ্যতার ইতিহাস যেমন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে পেশ করা হয়েছে, বিয়ে ও পারিবারিক জীবনের সূচনা সম্পর্কেও তার উপস্থাপিত ইতিহাস চলেছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারায়। আধুনিক ইতিহাস যাকে সূচনা ও আদিম বলে ধরে নিয়েছে এবং যা কিছু ভালো ও কল্যাণময়, তাকে ক্রমবিবর্তনের ফলে রূপে তুলে ধরেছে, ইসলামের পারিবারিক ইতিহাস যেহেতু তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এজন্যে সে সূচনা ও আদিকে পরবর্তী কালের কোনো মনুষ্যত্ববোধহীন এক স্তরের ব্যাপার বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তা-ই যে একমাত্র সূচনা ও আদি, তা স্বীকার করে নেয়া সম্ভব নয়।

কুরআন অনুযায়ী প্রথম মানব যেমন আদম তেমনি মানব জাতির প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল আদম ও হাওয়াকে কেন্দ্র করে। উত্তরকালে তাদের সন্তানদের মধ্যে ও এ পরিবারিক জীবন পূর্ণ মাত্রায় ও পূর্ণ মর্যাদা সহকারেই প্রচলিত ছিল। এই প্রথম পরিবারের সদস্যদ্বয় –স্বামী ও স্ত্রীকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তা’আলা বলেছিলেনঃ

(আরবী**********************************************)

হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে একত্রে বসবাস গ্রহণ করো এবং যেখান থেকে মন চায় তোমরা দুজনে অবাধে পানাহার করো।

বস্তুত মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম পরিবার যেমন সর্বতোভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবার ছিল, তেমনি তাতে ছিল পারিবারিক জীবনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ এবং তার ফরে সেখানে বিরাজিত ছিল পরিপূর্ণ তৃপ্তি, শান্তি, স্বস্তি ও আনন্দ। এ সূচনাকালের পরও দীর্ঘকাল ধরে এ পারিবারিক জীবন-পদ্ধতি ও ধারা মানব সমাজে অব্যাহত থাকে। অবশ্য ক্রমবিবর্তনের কোনো স্তরে মানব-সমাজের কোনো শাখায় এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, তেমন কথা বলা যায় না। বরং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কোনো স্তরে মানব জাতির কোনো কোনো শাখায় পতনযুগের অমানিশা ঘনীভূত হয়ে এসেছে এবং সেখানকার মানুষ নানাদিক দিয়ে নিতান্ত পশুর ন্যায় জীবন যাপন করতে শুরু করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ পর্যায়ে এসেতারা ভুলেছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানবীয় কর্তব্য। নবীগণের উপস্থাপিত জীবন-আদর্শকে অস্বীকার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে ধাবিত হয়েছে এবং একান্তভাবে নফসের দাস ও জৈব লালসার গোলাম হয়ে জীবন যাপন করেছে। তখন সব রকমের ন্যায়নীতি ও মানবিক আদর্শকে যেমন পরিহার করা হয়েছে, তেমনি পরিত্যাগ করেছে পারিবারিক জীবনের বন্ধনকেও। এই সময় কেবলমাত্র যৌন লালসার পরিতৃপ্তিই নারী-পুরুষের সম্পর্কের একমাত্র বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ অবস্থা ছিল সাময়িক। বর্তমান সময়েও এরূপ অবস্থা কোথাও-না-কোথাও বিরাজিত দেখতে পাওয়া যায়। তাই মানব সমাজের সমগ্র ইতিহাস যে তা নয় যেমন ইউরোপীয় চিন্তাবিদরা পেশ করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। বর্ণিত অবস্থাকে বড় জোর সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমই বলা যেতে পারে। অথচ এই ব্যতিক্রমের কাহিনীকেই ইউরোপীয় ইতিহাসে গোটা মানব সমাজের ইতিহাস নয়, তা হলো ইতিহাসের বিকৃতি, মানবতার বিজয় দৃপ্ত অগ্রগতির নিরবচ্ছিন্ন ধারবাহিকতায় নগণ্য ব্যতিক্রম মাত্র।

বস্তুত ইসলামী সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার এবং পারিবারিক জীবন হচ্ছে সমাজ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। এখানেই সর্বপ্রথম ব্যষ্টি ও সমষ্টির সম্মিলন ঘটে এবং এখানেই হয় অবচেতনভাবে মানুষের সামাজিক জীবন যাপনের হাতেখড়ি। ইসলামের শারীর-বিজ্ঞানে ব্যক্তি দেহে ‘কলব’ (আরবী**********) এর যে গুরুত্ব, ইসলামী সমাজ জীবনে ঠিক সেই গুরুত্ব পরিবারের, পারিবারিক জীবনের। তাই কলব সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************)

দেহের মধ্যে এমন একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, তা যখন সুস্থ ও রোগমুক্ত হবে, সমস্ত দেহ সংস্থাও হবে সুস্থ ও রোগশূন্য। আর তা যখন রোগাক্রান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন সমগ্র দেহ জগত চরমভাবে রোগাক্রান্ত ও বিষ-জর্জরিত। তোমরা জেনে রাখ যে, তাই হলো কলব বা হৃদপিণ্ড।

পরিবার সম্পর্কেও একথা পুরোপুরি সত্য। তাই সমাজ জীবনে, সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগকে সুস্থ করে তোলা যাদের লক্ষ্য, পারিবারিক জীবনকে সুস্থ ও সর্বাঙ্গসুন্দর করে গড়ে তোলা তাদের নিকট সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যথায় সমাজ সংস্কার ও আদর্শিক জাতি গঠনের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হতে পারে না। সুস্বাস্থ্য ও আয়ুর দৃষ্টিতেও বিবাহিত ও পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত। ১৯৫৯ সনের ৬ই জুনের পত্রিকায় জাতিসংঘের একটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিলঃ বিবাহিত নারী পুরুষ অবিবাহিতদের তুলনায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেঁচে থাক না কেন।

নদীর যে কেন্দ্রস্থল থেকে বহু শাখা-প্রশাখা নানাদিকে প্রবাহিত, সেই সঙ্গম-স্থলের পানি যদি কর্দমাক্ত হয়, যদি হয় বিষাক্ত ও পংকিল, তাহলে সে পানি প্রবাহিত হবে যত উপনদী, ছোট নদী ও খাল-বিলে তা সবই সে পানির সংস্পর্শে তিক্ত ও বিষাক্ত হবে অনিবার্যভাবে। অতএব পারিবারিক জীবন যদি আদর্শভিত্তিক, পবিত্র ও মাধুর্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সমগ্র জীবন –জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগও বিপর্যস্ত, বিষাক্ত ও অশান্তিপূর্ণ হবে,  এটাই স্বাভাবিক এবং এর সত্যতার কোনোই সন্দেহ থাকতে পারে না।

দুনিয়ার ইতিহাসে বিভিন্ন সমাজ ও জাতির ধ্বংস ও বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার যেসব কাহিনী লিখিত রয়েছে, তার যে-কোনটিরই বিশ্লেষণ ও তত্ত্বানুসন্ধান করে দেখলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে যে, পরিবার ও পারিবারিক জীবনের বিপর্যয়-ই হচ্ছে তার মূলীভূত কারণ। মুসলিম জাতি সংগঠনকালীন ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সুস্থ ও সুন্দর পরিবার গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল এবং উত্তরকালে মুসলিম জাতির যে অভ্যুদয় ঘটে তার মূলেও ছিল পারিবারিক দৃঢ় ভিত্তি ও পারিবারিক জীবনের সুস্থতা, পবিত্রতা। মুসলিম জাতির বর্তমান দুর্বলতা ও অধোগতির মূল কারণও যে এই পরিবার ও পারিবারিক জীবনই হলো ইসলামী সমাজের রক্ষাদুর্গ। এ দুর্গের অক্ষুণ্ন ও সুরক্ষিত থাকার ওপরই একান্তভাবে নির্ভর করে ইসলামী সমাজ ও জাতীয় জীবনের পবিত্রতা, সুস্থতা এবং বলিষ্ঠতা ও স্থিতি। মুসলিম জাতির এ দুর্গ এখনো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় নি, যদিও ঘুণে ধরে একে অন্তঃসারশূন্য করে দিয়েছে অনেকখানি। উপরন্তু পাশ্চাত্যের নাস্তিকতাবাদ, নগ্ন ও নীতিহীন সভ্যতার ঝঞ্ঝা বায়ু এর উপর প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে প্রচণ্ডভাবে। আল্লাহ না করুন, এ দুর্গও যদি চূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে মুসলিম জাতির সামষ্টিক অবলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী সন্দেহ নেই। এ প্রেক্ষিতে এ পর্যায়ের আলোচনা, গবেষণা ও বিচার বিশ্লেষণ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা বলাই বাহুল্য।

 

যৌন স্পৃহার সুষ্ঠু পরিতৃপ্তি বিয়ে

বিবাহিত হয়ে পারিবারিক জীবন-যাপন ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেকটি বয়স্ক স্ত্রী-পুরুষের জন্যে অপরিহার্য কর্তব্য। এতে যেমন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন সম্ভব, তেমনি যৌন মিলনের স্বাভাবিক অদম্য ও অনিবার্য স্পৃহাও সঠিকভাবে এবং পূর্ণ শৃঙ্খলা, নির্লিপ্ততা ও নির্ভেজাল পরিতৃপ্তি সহকারে পূরণ হতে পারে কেবলমাত্র এ উপায়ে।

বস্তুত মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যে যৌন মিলনের স্পৃহা বিদ্যমান, তার পরিপূরণ ও চরিতার্থতার সুষ্ঠু ব্যবস্থা হওয়া একান্তই আবশ্যক। বর্তমান দুনিয়ায় যৌন মিলন স্পৃহা পরিপূরণের জন্যে বিয়ের বাইরে নানাবিধ উপায় অবলম্বিত হতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও হস্তমৈথুন গ্রহণ করা হয়েছে এবং স্বীয় হস্তদ্বয়ের সাহায্যে নিজের যৌন উত্তেজনা প্রশমিত করার দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। আধুনিক সভ্য সমাজের এক বিরাট অংশ আজ এ মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর ফলে ব্যাপক হয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রকারের অভিনব যৌন ও মানসিক রোগ। এ রোগ একবার যাকে ভালোভাবে পেয়ে বসে, তার পক্ষে এ থেকে নিষ্কৃতি লাভ যেমন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তেমনি বিয়ে করে সাফল্যজনকভাবে পারিবারিক জীবন-যাপন করা তার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভবপর হয় না। কেননা তার অন্যান্য বহু রকমের রোগের সঙ্গে দ্রুত বীর্য-বীর্য-স্খলনের রোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে সে কোনো দিনই স্বীয় স্ত্রীকে যৌন তৃপ্তি দিতে সক্ষম হতে পারে না। আর তা না হলে কোনো স্ত্রীই তার সঙ্গে বিবাহিতা হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে রাজি হবে না।

কোথাও কোথাও দেখা যায়, যৌন মিলন স্পৃহা পরিপূরনের জন্যে সমমৈথুন (homo sexuality) বা পুংমৈথুনের পথ অবলম্বন করা হচ্ছে। এর ফলে নারী বা পুরুষ তারই সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার স্ত্রী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর লোকদের মধ্যেই এই রোগ বর্তমানে মারাত্মক ও সংক্রামক হয়ে দেখা দিয়েছে। আমেরিকার ডঃ কিনসে এ সম্পর্কে দীর্ঘকালীন গবেষণা ও অনুসন্ধান পরিচালনার পর ১৯৪৮ সনে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেন, তাতে তিনি বলেনঃ আমেরিকার পুরুষদের এক-তৃতীয়াংশেরও অধিক লোকদের মধ্যে এ রোগ অতি সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বৃটেনে তো এই কুকর্মকে আইনসিদ্ধই করে নেয়া হয়েছে প্রবল আন্দোলনের মাধ্যমে।

বস্তুত ছোট বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যদি উচ্ছৃঙ্খল যৌন লালসা দেখা দেয়, তাহরে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অনাসক্ত হয়ে পড়ে। বরং তার প্রতি তাদের মনে জাগে ঘৃণা ও বিরাগ। আর সমলিঙ্গের প্রতি তারা হয় আকৃষ্ট। ধীরে ধীরে এ রোগই উৎকর্ষ হয়ে সমমৈথুনের মারাত্মক  কুঅভ্যাস শক্তভাবে গড়ে ওঠে। সূচনায় যদিও তা এক বালকসূলভ চপলতা মাত্র, কিন্তু ক্রমে তা দৃঢ়মূল অভ্যাসে পরিণত হয়। আর তাই শেষ পর্যন্ত এক অবাঞ্ছিত সামষ্টিক রোগের রূপ পরিগ্রহ করে।

এসব রোগের মনস্তাত্ত্বিক কারণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকগণ বলেছেন, যে সব ছেলে মায়ের অসদাচরণ দেখতে পায়, স্ত্রী জাতির প্রতি তাদের মনে তীব্র অশ্রদ্ধা ও ঘৃণার উদ্রেক হয়। এ কারণে তারা সমলিঙ্গের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। মা বাপকে কিংবা কোনো নিকটাত্মীয় পুরুষ স্ত্রীলোককে তার যা কিছু করতে দেখে অথবা করে বলে তাদের মনে ধারণা জন্মে, তারা তাই সমলিঙ্গের ছেলেমেয়েদের সাথে করতে শুরু করে। ফলে এরা কোনোদিনই বিবাহিত হয়ে বিপরীত লিঙ্গের সাথে স্থায়ী যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয় না। বরং বহু দিনের এ কুঅভ্যাসের ফলে বিপরীত লিঙ্গ সম্পর্কে তাদের মনে এক প্রকারের ভীতির সঞ্চার হয়। বিয়ে করা তাদের পক্ষে আর কখনও সম্ভব নয় না কিংবা বিয়ে করে দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়া তাদের ভাগ্যে জুটে না।

প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক সিগমণ্ড ফ্রয়েড তাঁর Psychology of Everyday Life গ্রন্থে লিখেছেনঃ

এই সমমৈথুন নিষ্ফল ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। এর ফলে মানুষের মনুষ্যত্ব চরমভাবে লাঞ্ছিত হয়, মানুষের জীবনীশক্তি ও প্রজনন ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। যে উদ্দেশ্যে মানুষকে নারী ও পুরুষ করে সৃষ্টি করা হয়েছে, এসব কাজে তা বিনষ্ট ও ব্যর্থ হয়ে যায়। এ ধরনের কাজে মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে নিতান্ত পশুতে পরিণত হয়ে যায়। বিবাহিত হয়ে সুস্থ পবিত্র জীবন যাপন করা ও স্থায়ী যৌন মিলন ব্যবস্থায় পরিতৃপ্ত হওয়া এ কুঅভ্যাসের লোকদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিয়ে করে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণ করাকে তারা অবাঞ্ছিত ঝামেলা মনে করে থাকে। বর্তমান জগতে এ ধরনের স্ত্রী-পুরুষের সংখ্যা কিছুমাত্র কম নয়।

ঠিক এই কারণেই ইসলামে এ সব কাজ –যৌন স্পৃহা পূরণের এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি খুঁজা ও বাঁকা চোরা পথ অবলম্বন –চিরতরে হারাম করে দেয়া হয়েছে। সমমৈথুন সম্পর্কে কুরআন শরীফে কঠোর বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। লুত নবীর সময়কার এ বদ-অভ্যাসের লোকদের জিজ্ঞেস করা হয়েছেঃ

(আরবী***************************************************)

 তোমরা পুরুষেরা দুনিয়ায় পুরুষদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছ, আর পরিত্যাগ করছ তোমাদের জন্যে সৃষ্ট তোমাদের স্ত্রীদের? –তোমরা হচ্ছ সীমালংঘনকারী লোক।

এ আয়াত পুরুষদের দ্বারা পুরুষদের (এবং মেয়েদের দ্বারা মেয়েদের)-কে যৌন উত্তেজনা পরিতৃপ্ত করা (লেওয়াতাত)-কে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করে দিয়েছে। যৌন উত্তেজনা পরিতৃপ্তির জন্য আল্লাহ তা’আলা স্ত্রী-পুরুষ প্রত্যেকের জন্যে বিপরীত লিঙ্গের সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্যে নির্দিষ্ট স্থান বা দেহাংশ রয়েছে। আর এ উদ্দেশ্যে কেবল তাই গ্রহণ করা কর্তব্য, উভয়ের পক্ষে বাঞ্ছনীয়। এ হচ্ছে সকলের প্রতি আল্লাহ তা’আলার বিশেষ নেয়ামত। এ নেয়ামত গ্রহণ না করে যারা এর বিপরীত সমমৈথুন মনোযোগ দেয় তারা বাস্তবিকই আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমা লংঘন করে, তারা মানবতার কুলাংগার। কুরআন মজীদে এজন্যে কঠোর দণ্ডের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

তোমাদের মধ্যে যে দুজন পুরুষ (বা স্ত্রী) এ অন্যায় কাজ করবে, তাদের দুজনকেই শাস্তি দাও। তার পরে যদি তারা তওবা করে ও নিজেদের চরিত্র সংশোধন করে নেয়, তবে তাদের ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব তওবা কবুলকারী দয়াবান।

অর্থাৎ দুজন পুরুষ কিংবা একজন পুরুষ একজন নারী অথবা দুজনই নারী যদি চরিত্রহীনতার কাজ করে বসে, তবে সে দুজনকেই কঠোর শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সদুপদেশ ও ভারো নসীহতও করতে হবে। এ আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন (হিজরীর তৃতীয়-চতুর্থ বছর পর্যন্ত) যিনা ও লেওয়াতাত উভয়-রকম পাপেরই শাস্তি ছিল এই। জ্বিনার শাস্তির হুকুম পরে নাযিল হয়; কিন্তু লেওয়াতাতের শাস্তিস্বরূপ অন্য কিছু নাযিল হয়নি। ফলে কুরআনবিদদের মধ্যে আয়াতটির প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে কিছুটা মতভেদের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন দেখা দেয়, জ্বিনার এই শাস্তি লেওয়াতাতের ব্যাপারে প্রযোজ্য, না পূর্বশাস্তিই এ ব্যাপারে বহাল রাখা হয়েছে! এর অপরাধীকে কেবল হত্যা করা হবে, না অপর কোনো রকম শাস্তি দেয়া হবে? –অনেক এ আয়াতকে যিনার ব্যাপারেই প্রযোজ্য বলেছেন, অনেকে বলেছেন, লেওয়াতাতের ব্যাপারে প্রযোজ্য। আবার অনেকে এই উভয় প্রকারের অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে এ আয়াত প্রযোজ্য বলে মনে করেছেন।

হাদীস শরীফে এ অপরাধের দণ্ড হিসাবে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************)

যে দুজনকেই তোমরা লেওয়াতাতের (সমমৈথুন) কাজ করতে দেখতে পাবে, তাদেরকেই তোমরা হত্যা করবে।

লেওয়াতাতকারী বিবাহিত কোন কি অবিবাহিত, ইমাম মালিক, ইমাম শাফয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহওয়ায় ও অন্যান্য ফিকাহবিদের মতে তাদের ওপর রজম –পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলার দণ্ড –কার্যকর করতে হবে। হাসান বসরী, ইবরাহীম নখয়ী, আতা ও আবূ রিবাহ প্রমুখ মনীষী বলেছেনঃ

(আরবী************) –জ্বিনাকারীর জন্যে দণ্ডই লেওয়াতাতকারীর দণ্ড।

সুফিয়ান সওরী ও কুফার ফিকাহবিদদের মতও এই। (তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ১৮৯ পৃঃ)

(আরবী*************************************)

আমার উম্মতদের সম্পর্কে যেসব বিষয় আমি আশংকা বোধ করি ও ভয় পাচ্ছি, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশংকার বিষয় হচ্ছে লেওয়াতাতের পাপে লিপ্ত হওয়া।

বস্তুত তিরমিযী শরীফের এক হাদীসের ঘোষণানুযায়ী লেওয়াতাতকারী আল্লাহর অভিশপ্ত, আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। হযরত আলী (রা) লেওয়াতাতকারী দুই ব্যক্তিকে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করেছিলেন। নবী করীম (স) বলেছেনঃ ‘নারী যখন অপর নারীর সংস্পর্শে যৌন তৃপ্তি গ্রহণ করে, তখন তারা দুজনই ব্যভিচারিণী’।

হস্তমৈথুনকারী সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ হস্তমৈথুনকারী অভিশপ্ত।

এ দীর্ঘ আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, প্রত্যেক নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌন স্পৃহা পরিতৃপ্তির জন্যে আল্লাহ তা’আলা সুষ্ঠু ও পবিত্র পথ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর সে পথ হচ্ছে বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রী-পুরুষের মিলিত হওয়া। এ ছাড়া অন্য যত পথই রয়েছে –মানুষ ব্যবহার করছে –সবই স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ, মনুষ্যত্বের পক্ষে অন্য সব পথই হচ্ছে সর্বতোভাবে মারাত্মক। এজন্যে আল্লাহ তা’আলা নারী-পুরুষের নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে সাবধান ও সতর্ক হতে বলে বিয়ের একমাত্র পথ পেশ করেছেন এবং বিয়ে ছাড়া অন্যান্য সব পথকেই সীমালংঘনকারী বলে ঘোষণা করেছেন। বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

আর সফলকাম হবে সে-সব মু’মিন, যারা তাদের যৌন-স্থানকে পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। তারা নিষ্কলংকের সাথে যৌন সম্ভোগ করে কেবলমাত্র তাদের বিয়ে করা স্ত্রীদের সঙ্গে কিংবা ক্রীতদাসীদের সঙ্গে। আর যারা এ নির্দিষ্ট ছাড়া অন্য পথে যৌন অঙ্গের ব্যবহার করবে, তারা নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারী।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, বান্দার কল্যাণ নির্ভর করে তার যৌন অঙ্গের সংরক্ষণ ও ঠিক ব্যবহারের ওপর। এ না হলে বান্দাহর কল্যাণ লাভের আর কোন পথ বা উপায় নেই।

এ আয়াত মোটামুটি তিনটি কথা প্রমাণ করে। যে লোক স্বীয় যৌন অঙ্গের সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার করে না, সে কখনই কল্যাণ প্রাপ্ত হতে পারে না। সে অবশ্যই ভৎসিত ও ধিকৃত হবে, সে হবে সীমালংঘনকারী। আর সীমালংঘনকারী মাত্রই কল্যাণ থেকে হবে বঞ্চিত। বরং সে সীমালংঘনের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হবে।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেনঃ

(আরবী********************************************)

নরহত্যার পর জ্বিনা-ব্যভিচার অপেক্ষা বড় গুনাহ আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) একদা নবী করীম (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবী**********) –সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? রাসূলে করীম (স) বললেনঃ (আরবী********) –আল্লাহ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে কাউকে মেনে নেয়াই হলো সবচেয়ে বড় গুনাহ’। তিনি আরো বললেনঃ তারপরে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে খাদ্যাভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা করা এবং তার পরের বড় গুনাহ হচ্ছেঃ (আরবী*********) –তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তোমাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।

এ থেকে জানা গেল, জ্বিনা মূলতই কবীরা গুনাহ। তবে প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তা করা সবচেয়ে বড় গুনাহ। (আরবী***********)

সূরা আহযাব-এর এক আয়াতাংশৈ যৌন অঙ্গের হেফাযত করা –জায়েয পথে তার ব্যবহার করা এবং অন্য পথে তার ব্যবহার না করা সম্পর্কে অনুরূপ তাগিদ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন।

(আরবী********************************************)

যারা নিজেদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে, তারা পুরুষ হোক কি স্ত্রীলোক –আর যারা খুব বেশী আল্লাহর স্মরণ করে স্ত্রীলোক কি পুরুষ –আল্লাহ তাদের জন্যে বহু বড় সওয়াবের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

যৌন অঙ্গের অর্থনৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখা এবং যৌন অঙ্গকে খারাপ পথে ও হারামভাবে ব্যবহার না করা। এ চরিত্র যারা গ্রহণ করবে আর যেসব নারী-পুরুষ স্বামী-স্ত্রী –আল্লাহর স্মরণ করবে, বিশেষ করে যৌন অঙ্গের ব্যবহারের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ পালন করবে তাদের জন্যে আল্লাহ তা’আলা বড় পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন। ইসলামে নৈতিক চরিত্রের যা মূল্যমান, দুনিয়ার পাপের কোনো ধর্ম বা জীবন বিধানেই তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং বলা যায়, অন্য কোন মানবিক বিধানেই তার দৃষ্টান্ত নেই। এ কারণে রাসূলে করীম (স) সব সময়ই নও-মুসলিম নারীর নিকট থেকে যিনা না করার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতেন। কুরআন মজীদের সূরা ‘আল-মুমতাহিনা’য় এই প্রতিশ্রুতির কথা নিন্মোক্ত ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছেঃ

(আরবী************************************)

এবং তারা প্রতিশ্রুতি দিত এই বলে যে, তারা ব্যভিচার করবে না আর তাদের সন্তান হত্যা করবে না।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী পুরুষ

দুনিয়ার বিভিন্ন ধর্মে, মতাদর্শে, সমাজে ও সভ্যতায় নারী ও পুরুষকে কি দৃষ্টিতে দেখা হয় –বিশেষত নারী সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করা হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা একান্ত জরুরী। এই পর্যায়ে প্রথমে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী পেশ করা হচ্ছে। পরে অন্যান্য দিক নিয়েও পর্যালোচনা করা হবে।

নারী-পুরুষের একত্ব

ইসলামে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করা হয়, তা কুরআন মজীদে নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************************)

হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই আর্লাহকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক জীবন্ত সত্তা  থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জুড়ি। আর এই উভয় থেকেই অসংখ্য পুরুষ ও নারী (সৃষ্টি করে) ছড়িয়ে দিয়েছেন।

এ আয়াতে সমগ্র মানবতাকে সম্বোধন করা হয়েছে, তার মধ্যে যেমন রয়েছে পুরুষ, তেমনি নারী। এ উভয় শ্রেণীর মানুষকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, পুরুষ ও নারী একই উৎস থেকে প্রবাহিত মানবতার দুটি স্রোতধারা। নারী ও পুরুষ একই জীবন-সত্তা থেকে সৃষ্ট, একই অংশ থেকে নিঃসৃত। দুনিয়ার এই বিপুল সংখ্যক নারী ও পুরুষ সেই একই সত্তা থেকে উদ্ভুত। নারী আসলে কোনো স্বতন্ত্র জীবসত্তা নয়, না পুরুষ। নারী পুরুষের মতোই মানুষ, যেমন মানুষ হচ্ছে এই পুরুষেরা। এদের কেউ-ই নিছক জন্তু জানোয়ার নয়। মৌলিকতার দিক দিয়ে এ দুয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষের মধ্যে যে মানবীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে, নারীর মধ্যেও তা বিদ্যমান। এ সব দিক দিয়েই উভয়ে উভয়ের একান্তই নিকটবর্তী, অতীব ঘনিষ্ঠ। এজন্যে তাদের যেমন গৌরব বোধ করা উচিত, তেমনি নিজেদের সম্মান ও সৌভাগ্যের বিষয় বলেও একে মনে করা ও আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া কর্তব্য।

প্রথম মানবী হাওয়াকে প্রথম মানব আদম থেকে সৃষ্টি করার মানেই হচ্ছে এই যে, আদম সৃষ্টির মৌলিক উপাদান যা কিছু তাই হচ্ছে হাওয়ারই। আয়াতের শেষাংশ থেকে জানা যায়, মূলত নারী-পুরুষ জাতির বোন আর পুরুষরা নারী জাতির সহোদর কিংবা বলা যায়, নারী পুরুষেরই অপর অংশ এবং এ দুয়ে মিলে মানবতার এক অভিন্ন অবিভাজ্য সত্তা।

সূরা আল-হুজরাত-এ আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও বংশ-শাখায় বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় লাভ করতে পার।

তবে একথা নিশ্চিত যে, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহ ভীরু ব্যক্তিই হচ্ছে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানার্হ।

এ আয়াত থেকে আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বড় বড় যে কয়টি কথা জানা যায়, তা হচ্ছে এইঃ

১. দুনিয়ার সব মানুষ–সকল কালের, সকল দেশের, সকল জাতের ও সকল বংশের মানুষ-কেবলমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি।

২. আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে দুনিয়ার সব মানুষ সমান, কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়; কেউ উচ্চ নয়, কেউ নীচ নয়। সৃষ্টিগতভাবে কেউ শরীফ নয়, কেউ নিকৃষ্ট নয়। উভয়ের দেহেই একই পিতামাতার রক্ত প্রবাহিত।

৩. দুনিয়ার সব মানুষই একজন পুরুষ ও একজন নারীর যৌন-মিলনের ফল হিসেবে সৃষ্ট। দুনিয়ার এমন কোনো পুরুষ নেই, যার সৃষ্টি ও জন্মের ব্যাপারে কোন নারীর প্রত্যক্ষ দান নেই কিংবা কোনো নারী এমন নেই, যার জন্মের ব্যাপারে কোনো পুরুষের প্রত্যক্ষ যোগ অনুপস্থিত। এ কারণে নারী-পুরুষ কেউই কারো ওপর কোনোরূপ মৌলিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে না এবং কেউই অপর কাউকে জন্মগত কারণে হীন, নীচ, নগণ্য ও ক্ষুদ্র বলে ঘৃণা করতেও পারে না। মানবদেহের সংগঠনে পুরুষের সঙ্গে নারীরও যথেষ্ট অংশ শামিল রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে নারীর অংশই বেশি থাকে প্রত্যেকটি মানব শিশুর দেহ সৃষ্টিতে।

নারী ও পুরুষ যে সবদিক দিয়ে সমান, প্রত্যেকেই যে প্রত্যেকের জন্যে একান্তই অপরিহার্য –কেউ কাউকে ছাড়া নয়, হতে পারে না, স্পষ্টভাবে জানা যায় নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় থেকেঃ

(আরবী*********************************************************)

নিশ্চয়ই আমি নষ্ট করে দেই না তোমাদের মধ্যে থেকে কোন আমলকারীর আমলকে, সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তোমরা পরস্পর পরস্পর থেকে –আসলে এক ও অভিন্ন।

তাফসীরকারগণ ‘তোমরা পরস্পর থেকে, আসলে এক ও অভিন্ন’ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, এ বাক্যটুকু ধারাবাহিক কথার মাঝখানে বলে দেয়া একটি কথা। এ থেকে এ কথাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এখানে আল্লাহ তা’আলা যে বিষয়ের ওয়াদা করেছেন, তাতে পুরুষদের সাথে নারীরাও শামিল। কেননা পরস্পর পরস্পর থেকে হওয়ার মানেই হচ্ছে এই যে, এরা সবাই একই আসল ও মূল থেকে উদ্ভূত এবং তারা পরস্পরের সাথে এমনভাবে জড়িত ও মিলিত যে, এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যের প্রাচীর তোলা কোনোক্রমে সম্ভব নয়। দ্বীনের দৃষ্টিতে তারা সমান, সেই অনুযায়ী আমল করার দায়িত্বও দু’জনার সমান এবং সমানভাবেই সে আমলের সওয়াব পাওয়ার অধিকারী তারা। এক কথায় নারী যেমন পুরুষ থেকে, তেমনি পুরুষ নারী থেকে কিংবা নারী-পুরুষ উভয়ই অপর নারী-পুরুষ থেকে প্রসূত।

(আরবী**************************************************)

মেয়েরা হচ্ছে পুরুষদের পোশাক, আর তোমরা পুরুষরা হচ্ছ মেয়েদের পরিচ্ছদ।

এ আয়াতেও নারী ও পুরুষকে একই পর্যায়ে গণ্য করা হয়েছে এবং উভয়কেই উভয়ের জন্যে ‘পোশাক’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আয়াতে উল্লিখিত ‘লেবাস’ (আরবী******) শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘লেবাস’ মানে পোশাক, যা পরিধান করা হয়, যা মানুষের দেহাবয়ব আবৃত করে রাখে। প্রখ্যাত মনীষী রবী ইবনে আনাস বলেছেনঃ স্ত্রীলোক পুরুষদের জন্যে শয্যাবিশেষ আর পুরুষ হচ্ছে স্ত্রীলোকদের জন্য লেপ। স্ত্রী পুরুষকে পরস্পরের ‘পোশাক’ বলার তিনটি কারণ হতে পারেঃ

১. যে জিনিস মানুষের দোষ ঢেকে দেয়, দোষ-ত্রুটি গোপন করে রাখে, দোষ প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাই হচ্ছে পোশাক। স্বামী-স্ত্রীও পরস্পরের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখে –কেউ কারো কোনো প্রকারের দোষ দেখতে বা জানতে পারলে তার প্রচার বা প্রকাশ করে না –প্রকাশ হতে দেয় না। এজন্যে একজনকে অন্যজনের ‘পোশাক’ বলা হয়েছে।

২. স্বামী-স্ত্রী মিলন শয্যায় আবরণহীন অবস্থায় মিলিত হয়। তাদের দুজনকেই আবৃত রাখে মাত্র একখানা কাপড়। ফলে একজন অন্যজনের পোশাকস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। এদিক দিয়ে উভয়ের গভীর, নিবিড়তম ও দূরত্বহীন মিলনের দিকের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।

৩. স্ত্রী পুরুষের জন্যে এবং পুরুষ স্ত্রীর জন্যে শান্তিস্বরূপ। যেমন অপর এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************)

এবং তার থেকেই তার জুড়ি বানিয়েছেন যেন তার কাছ থেকে মনের শান্তি ও স্থিতি লাভ করতে পারে।

ইবনে আরাবী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

পুরুষের জন্য স্ত্রীরা কাপড় স্বরূপ। একজন অপর জনের নিকট খুব সহজেই মিলিত হতে পারে। তার সাহায্যে নিজের লজ্জা ডাকতে পারে, শান্তি ও স্বস্তি লাভ করতে পারে।

তিনি আরো বলেছেন যে, এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর কেউ নিজেকে অপর জনের থেকে সম্পর্কহীন করে ও দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না, কেননা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মিল-মিশ ও দেখা-সাক্ষাত খুব সহজেই সম্পন্ন হতে পারে।

অন্যরা বলেছেনঃ

(আরবী*****************************************************************)

প্রত্যেকেই অপরের সাহায্যে স্বীয় চরিত্র পবিত্র ও নিষ্কলুষ রাখতে পারে। স্ত্রী ছাড়া অপর কারো সামনে বিবস্ত্র হওয়া হারাম বলে এ অসুবিধা থেকেও এই স্ত্রীর সাহায্যেই রেহাই পেতে পারে।

রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

মেয়েলোকেরা যে পুরুষদেরই অর্ধাংশ কিংবা সহোদর এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বস্তুত নারী ও পুরুষ যেন একটি বৃক্ষমূল থেকে উদ্ভূত দুটি শাখা।

অন্যান্য ধর্মমত অন্যান্য মতাদর্শ

কিন্তু দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মমত ও মতাদর্শের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের এ সমান মর্যাদা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকৃত।

ইহুদী ধর্মে নারীকে ‘পুরুষের প্রতারক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ওল্ড টেষ্টামেন্ট (আদি পুস্তক)-এ হযরত আদম ও হাওয়ার জান্নাত থেকে বহিস্কৃত হওয়ার ব্যাপারটিকে এভাবে পেশ করা হয়েছেঃ

তখন সদাপ্রভু ঈশ্বর আদমকে ডাকিয়া কহিলেন, তুমি কোথায়? তিনি কহিলেন, আমি উদ্যানে, তোমার রব শুনিয়া ভীত হইলাম। কারণ আমি উলঙ্গ, তাই আপনাকে লুকাইয়াছি। তিনি কহিলেন, তুমি যে উলঙ্গ উহা তোমাকে কে বলিল? যে বৃক্ষের ফল ভোজন করিতে তোমাকে নিষেধ করিয়াছিলাম, তুমি কি তাহার ফল ভোজন করিয়াছ? তাহাতে আদম কহিলেন, তুমি আমার সঙ্গিনী করিয়া যে স্ত্রী দিয়াছ, সে আমাকে ঐ বৃক্ষের ফল দিয়াছিল, তাই খাইয়াছি। তখন সদাপ্রভু ঈশ্বর নারীকে কহিলেন, তুমি এ কি করিলে? নারী কহিলেন, সর্প আমাকে ভুলাইয়াছিল, তাই খাইয়াছি। (আদি পুস্তক –মানব জাতির পাপের পতন ১০-১১ ক্ষেত্র)

এর অর্থ এই হয় যে, বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হওয়া আদম তথা মানব জাতির পক্ষে অভিশাপ বিশেষ এবং এ অভিশাপের মূল কারণ হচ্ছে নারী –আদমের স্ত্রী। এজন্যে স্ত্রীলোক সে সমাজে চিরলাঞ্ছিত এবং জাতীয় অভিশাপ, ধ্বংস ও পতনের কারণ। এজন্যে পুরুষ সব সময়ই নারীর ওপর প্রভুত্ব করার স্বাভাবিক অধিকারী। এ অধিকার আদমকে হাওয়া বিবি কর্তৃক নিষিদ্ধ ফল খাওয়ানোর শাস্তি বিশেষ এবং যদ্দিন নারী বেঁচে থাকবে, ততদিনই এ শাস্তি তাকে বোগ করতে হবে।

ইহুদী সমাজে নারীকে ক্রীতদাসী না হলেও চাকরানীর পর্যায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে বাপ নিজ কন্যাকে নগদ মূল্যে বিক্রয় করতে পারত, মেয়ে কখনো পিতার সম্পত্তি থেকে মীরাস লাভ করত না, করত কেবল তখন, যখন পিতার কোনো পুত্র সন্তানই থাকত না।

প্রাচীনকালে হিন্দু পণ্ডিতরা মনে করতেন, মানুষ পারিবারিক জীবন বর্জন না করলে জ্ঞান অর্জনে সমর্থ হতে পারে না। মনু’র বিধানে পিতা, স্বামী ও সন্তানের কাছ থেকে কোনো কিচু পাওয়ার মতো কোনো অধিকার নারীর জন্যে নেই। স্বামীর মৃত্যু হলে তাকে চির বৈধব্যের জীবন যাপন করতে হয়। জীবনে কোনো স্বাদ-আনন্দ-আহলাদ-উৎসবে অংশ গ্রহণ তার পক্ষে চির নিষিদ্ধ। নেড়ে মাথা, সাদা বস্ত্র পরিহিতা অবস্থায় আতপ চালের বাত ও নিরামিষ খেয়ে জীবন যাপন করতে হয় তাকে।

প্রাচীন হিন্দু ভারতীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছেঃ

মৃত্যু, নরক, বিষ, সর্প, আগুন –এর কোনোটিই নারী অপেক্ষা খারাপ ও মারাত্মক নয়।

যুবতী নারীকে দেবতার উদ্দেশ্যে –দেবার সন্তুষ্টির জন্যে কিংবা বৃষ্টি অথবা ধন-দৌলত লাভের জন্যে বলিদান করা হতো। একটি বিশেষ গাছের সামনে এভাবে একটি নারীকে পেশ করা ছিল তদানীন্তন ভারতের স্থায়ী রীতি। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সহমৃত্যু বরণ বা সতীদাহ রীতিও পালন করতে হতো অনেক হিন্দু নারীকে।

অনেক সমাজে নারীকে সকল পাপ, অন্যায় ও অপবিত্রতার কেন্দ্র বা উৎস বলে ঘৃণা করা হতো। তারা বলত, এখনকার নারীরা কি বিবি হাওয়ার সন্তান নয়? আর হাওয়া বিবি কি আদমকে আল্লাহর নাফরমানীর কাজে উদ্ধুদ্ধ করেনি? –পাপের কাজকে তার সামনে আকর্ষনীয় করে তোলেনি? ধোঁকা দিয়ে পাপে লিপ্ত করেনি? আর মানব জাতিকে এই পাপ পংকিল দুনিয়ার আগমনের জন্যে সেই কি দায়ী নয়? সত্যি কথা এই যে, হাওয়া বিবিই হচ্ছে শয়তান প্রবেশের দ্বারপথ, আল্লাহর আনুগত্য ভঙ্গ করার কাজ সেই সর্বপ্রথম শুরু করেছে। এ কারণে তারই কন্যা বর্তমানের এ নারী সমাজেরও অনুরূপ পাপ কাজেরই উদগাতা হওয়া স্বাভাবিক। তাই নারীরা হচ্ছে শয়তানের বাহন, নারীরা হচ্ছে এমন বিষধর সাপ, যা পুরুষকে দংশন করতে কখনো কসুর করেনি।

এসব মতের কারণে দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজ ও সভ্যনায় নারী জাতির মর্মান্তিক অবস্তা দেখা গিয়েছে। এথেন্সবাসীরা হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য প্রাচীনতম জাতি। কিন্তু সেখানে নারীকে পরিত্যক্ত দ্রব্য-সামগ্রীর মতো মনে করা হতো। হাটে-বাজারে প্রকাশ্যভাবে নারীর বেচা-কেনা হতো। শয়তান অপেক্ষাও অধিক ঘৃণিত ছিল সেখানে নারী। ঘরের কাজকর্ম করা এবং সন্তান প্রসব ও লালন-পালন ছাড়া অন্য কোনো মানবীয় অধিকারই তাদের ছিল না। স্পার্টাতে আইনত একাধিক স্ত্রী গ্রহন নিষিদ্ধ থাকলেও কার্যত প্রায় প্রত্যেক পুরুষই একাধিক স্ত্রী রাখত। এমনকি নারীও একাধিক পুরুষের যৌন ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে সেখানে বাধ্য হতো। সমাজের কেবল নিম্নস্তরের মেয়েরাই নয়, সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা-বৌ’রা পর্যন্ত এ জঘন্য কাজে লিপ্ত থাকত। রুমানিয়ায়ও এর রেওয়াজ ছিল ব্যাপকভাবে। শাসন কর্তৃপক্ষ দেশেল সব প্রজা-সাধারনের জন্য একাধিক বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সমাজের কোনো লোক –পাদ্রী-পুরোহিত কিংবা সমাজ-নেতা কেউই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেনি।

ইহুদী সমাজে নারীদের অবস্থা আরো মারাত্মক। মদীনার ‘ফিতুম’ নামক এক ইহুদী বাদশাহ আইন জারী করেছিলঃ “যে মেয়েকেই বিয়ে দেওয়া হবে, স্বামীর ঘরে যাওয়ার আগে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে এই রাত্রি যাপন করতে হবে”। (আরবী**********************)

খ্রিষ্টধর্মে তো নারীকে চরম লাঞ্ছনার নিম্নতম পংকে নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছে। পোলিশ লিখিত এক চিঠিতে বলা হয়েছেঃ নারীকে চুপচাপ থেকে পূর্ণ আনুগত্য সহকারে শিক্ষালাভ করতে হবে। নারীকে শিক্ষাদানের আমি অনুমতি দেই না; বরং সে চুপচাপ থাকবে। কেননা আদমকে প্রথম সৃষ্টি করা হয়েছে, তার পরে হাওয়াকে, আদম প্রথমে ধোঁকা খায় নি, নারীই ধোঁকা খেয়ে গুনাহে লিপ্ত হয়েছে।

জনৈক পাদ্রীর মতে নারী হচ্ছে শয়তানের প্রবেশস্থল। তারা আল্লাহর মান-মর্যাদার প্রবিন্ধক, আল্লাহর প্রতিরূপ, মানুষের পক্ষে তারা বিপজ্জনক। পাদ্রী সন্তান বলেছেনঃ নারী সব অন্যায়ের মূল, তার থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। নারী হচ্ছে পুরুষের মনে লালসা উদ্রেককারী, ঘরে ও সমাজে যত অশান্তির সৃষ্টি হয়, সব তারই কারণে। এমন কি, নারী কেবল দেহসর্বস্ব, না তার প্রাণ বলতে কিছু আছে, এ প্রশ্নের মীমাংসার জন্যে পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দে বড় বড় খ্রীষ্টান পাদ্রীদের এক কনফারেন্স বসেছিল ‘মাকুন’ নামের এক জায়গায়।

ইংরেজদের দেশে ১৮০৫ সন পর্যন্ত আইন ছিল যে, পুরুষ তার স্ত্রীকে বিক্রয় করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একন একটি স্ত্রীর দাম ধরা হয়েছিল অর্ধশিলিং। এক ইটালীয়ান স্বামী তার স্ত্রীকে কিস্তি হিসেবে আদায়যোগ্য মূল্যে বিক্রয় করেছিল। পরে ক্রয়কারী যখন কিস্তি বাবদ টাকা দিতে অস্বীকার করে, তখন বিক্রয়কারী স্বামী তাকে হত্যা করে।

অষ্টাদশ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে ফরাসী পার্লামেন্টে মানুষের দাস প্রথার বিরুদ্ধে যে আইন পাস হয়, তার মধ্যে নারীকে গণ্য করা হয় নি। কেননা অবিবাহিতা নারী সম্পর্কে কোনো কিছু করা যেতো না তাদের অনুমতি ছাড়া। (আরবী*****************************) ৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বহু চিন্তা-ভাবনা, আলোচনা-গবেষণা ও তর্ক-বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, নারী জন্তু নয় –মানুষ। তবে সে এমন মানুষ যে, পুরুষের কাজে নিরন্তর সেবারত হয়ে থাকাই তার কর্তব্য। কিন্তু তাই বলে তাকে শয়তানের বাহন, সব অন্যায়ের উৎস ও কেন্দ্র এবং সার সাথে সম্পর্ক রাখা অনুচিত প্রভৃতি ধরনের যেসব কথা বলা হয় তার প্রতিবাদ বা প্রত্যাহার করা হয়নি। কেননা এগুলো ছিল তার স্থির ও মজ্জাগত আকীদা।

(আরবী*****************************************)

গ্রীকদের দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা কি ছিল, তা তাদের একটা কথা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। সেখানে বলা হতোঃ

আগুনে জ্বলে গেলে ও সাপে দংশন করলে তার প্রতিবিধান সম্ভব; কিন্তু নারীর দুষ্কৃতির প্রতিবিধান অসম্ভব।

পারস্যের ‘মাজদাক’ আন্দোলনের মূলেও নারীর প্রতি তীব্র ঘৃণা পুঞ্জীবূত ছিল। এ আন্দোলনের প্রভাবাধীণ সমাজে নারী পুরুষের লালসা পরিতৃপ্তির হাতিয়ার হয়ে রয়েছে। তাদের মতে দুনিয়ার সব অনিষ্টের মূল উৎস হচ্ছে দুটি –একটি নারী দ্বিতীয়টি ধন-সম্পদ। (আরবী******************)

প্রাচীন ভারতে নারীর অবস্থা অন্যান্য সমাজের তুলনায় অধিক নিকৃষ্ট ছিল। প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত আইন রচয়িতা মনু মহারাজ নারী সম্পর্কে বলেছেনঃ

‘নারী –নাবালেগ হোক, যুবতী হোক আর বৃদ্ধা হোক –নিজ ঘরেও স্বাধীনভাবে কোন কাজ করতে পারবে না’।

‘মিথ্যা কথা বলা নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা বলা, চিন্তা না করে কাজ করা, ধোঁকা-প্রতারণা, নির্বুদ্ধিতা, লোভ, পংকিলতা, নির্দয়তা –এ হচ্ছে স্বভাবগত দোষ’।

ইউরোপে এক শতাব্দীকাল পূর্বেও পুরুষগণ নারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত। পুরুষের অত্যাচার বন্ধ করার মতো কোনো আইন সেখানে ছিল না। নারী ছিল পুরুষের গোলাম। নারী সেখানে নিজ ইচ্ছায় কোনো কাজ করতে পারত না। নিজে উপার্জন করেও নিজের জন্যে তা ব্যয় করতে পারত না। মেয়েরা পিতামাতার সম্পত্তির মতো ছিল। তাদের বিক্রয় করে দেয়া হতো। নিজেদের পছন্দসই বিয়ে করার কোন অধিকার ছিল না তাদের।

প্রাচীন আরব সমাজেও নারীর অবস্থা কিছুমাত্র ভালো ছিল না। তথায় নারীকে অত্যণ্ত ‘লজ্জার বস্তু’ বলে মনে করা হতো। কন্যা-সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে পিতামাতা উভয়ই যারপর নাই অসন্তুষ্ট হতো। পিতা কন্যা-সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করে ফেলত। আর জীবিত রাখলেও তাকে মানবোচিত কোনো অধিকারই দেয়া হতো না। নারী যতদিন জীবিত থাকত, ততদিন স্বামীর দাসী হয়ে থাকত। আর স্বামী মরে গেলে তার উত্তরাধিকারীরাই অন্যান্য বিষয় সম্পত্তির সাথে তাদেরও একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসত। সৎমা –পিতার স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী বানানো সে সমাজে কোনো লজ্জা বা আপত্তির কাজ ছিল না। বরং তার ব্যাপক প্রচলন ছিল সেখানে। আল্লামা আবূ বকর আবুল জাসসাস লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

জাহিলিয়াতের যুগে পিতার স্ত্রী –সৎ মা বিয়ে করার ব্যাপক প্রচলন ছিল।

সেখানে নারীর পক্ষে কোনো মীরাস পাওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। আধুনিক সভ্যতা নারীমুক্তির নামে প্রাচীন কালের লাঞ্ছনার গহবর থেকে উদ্ধার করে নারী স্বাধীনতার অপর এক গভীর গহবরে নিক্ষেপ করেছে। নারী স্বাধীনতার নামে তাকে লাগামহীন জন্তু জানোয়ার পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে। আজ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্পের নামে নারীর লজ্জা-শরম-আবরু ও পবিত্রতার মহামূল্য সম্পদকে প্রকাশ্য বাজারে নগণ্য পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে। পুরুষরা চিন্তার আধুনিকতা উচ্ছলতা ও শিল্পে অগ্রগতি ও বিকাশ সাধনের মোহনীয় নামে নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছে এবং ক্লাবে, নাচের আসরে বা অভিনয় মঞ্চে পৌঁছিয়ে নিজেদের পাশবিক লালসার ইন্ধন বানিয়ে নিয়েছে। বস্তুত আধুনিক সভ্যতা নারীর নারীত্বের সমাধির ওপর লালসা চরিতার্থতার সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছে। এ সভ্যতা প্রকৃতপক্ষে নারীকে দেয়নি কিছুই, যদিও তার সব অমূল্য সম্পদই সে হরণ করে নিয়েছে নির্মমভাবে।

বিশ্বনবীর আবির্ভাবকালে দুনিয়ার সব সমাজেই নারীর অবস্থা প্রায় অনুরূপই ছিল। রাসূলে করীম (স) এসে মানবতার মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে বিপ্লবী বাণী শুনিয়েছেন, তাতে যুগান্তকালের পংকিলতা ও পাশবিকতা দূরীভূত হতে শুরু হয়। নারীর প্রতি জুলুম ও অমানুষিক ব্যবহারের প্রবণতা নিঃশেষ হয়ে গেল। মানব সমাজে তার সম্মান ও যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলো। জীবনক্ষেত্রে তার গুরুত্ব যেমন স্বীকৃত হয়, তেমনি তার যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদাও পুরাপুরি বহাল হলো। নারী মানবতার পর্যায়ে পুরুষদের সমান বলে গণ্য হলো। অধিকার ও দায়িত্বের গুরুত্বের দিক দিয়েও কোনো পার্থক্য থাকল না এদের মধ্যে। নারী ও পুরুষ উভয়ই যে বাস্তবিকই ভাই ও বোন, এরূপ সাম্য ও সমতা স্বীকৃত না হলে তা বাস্তবে কখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

নারী ও পুরুষ পিতামাতার উত্তরাধিকারের দিক দিয়েও সমান। একটি গাছের মূল কাণ্ড থেকে দুটি শাখা বের হলে যেমন হয়, এও ঠিক তেমনি। কাজেই যারা বলে যে, নারী জন্মগতভাবেই খারাপ, পাপের উৎস, পংকিল –তারা সম্পূর্ণ ভুল কথা বলে। কেননা বিবি হাওয়া স্ত্রী পুরুষ সকলেই আদি মাতা, তার বিশেষ কোনো উত্তরাধিকার পেয়ে থাকলে দুনিয়ার স্ত্রী-পুরুষ সকলেই তা পেয়েছে। তা কেবল স্ত্রীলোকেরাই পেয়েছে, পুরুষরা পায় নি –এমন কথা বলাতো খুবই হাস্যকর। আর বেহেশত আল্লাহর নিষিদ্ধ গাছের নিকট যাওয়া ও তার ফল খাওয়ায় দোষ কিছু হয়ে থাকলে কুরআনের দৃষ্টিতে তা আদম ও হাওয়া দুজনেরই রয়েছে। শুরুতে দুজনকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছিলঃ

(আরবী**************************************************************)

হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং সেখান থেকে তোমরা দুজনে প্রাণভরে পানাহার করো –যেখান থেকেই তোমাদের ইচ্ছা। আর তোমরা দুজনে এই গাছটির নিকটেও যাবে না –গেলে তোমরা দুজনই জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।

পরবর্তী কথা থেকেও জানা যায়, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে তাঁদের যে ভুল হয়েছিল, তা এক সঙ্গে তাঁদের দুজনেরই হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর দুজনই সেজন্যে আল্লাহর নিকট তওবা করে পাপঙ্খালন করেছিলেন। একথাই বলা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াত কয়টিতেঃ

(আরবী*****************************************************************)

অতঃপর তারা দুজনই যখন সে গাছ আস্বাদন করল, তাদের দুজনেরই লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে পড়ল। এবং তারা দুজনই বেহেশতের গাছের পাতা নিজেদের গায়ে লাগিয়ে আবরণ বানাতে থাকে এবং তাদের দুজনের আল্লাহ তাদের দুজনকে ডেকে বললেনঃ আমি কি তোমাদের দুজনকেই তোমাদের (সামনের) এই গাছটি সম্পর্ক নিষেধ করিনি? আমি বলিনি যে, শয়তান তোমাদের দুজনেরই প্রকাশ্য দুশমন? তখন তারা দুজনে বললঃ হে আমাদের রব্ব, আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি রহমত নাযিল না করো, তাহলে আমরা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

কুরআন মজীদের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে নারী সম্পর্কে যাবতীয় অমানবিক ও অপমানকর ধারণা ও মতাদর্শের ভ্রান্তি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। বস্তুত দুনিয়ায় কুরআনই একমাত্র কিতাব, যা নারীকে যুগযুগ সিঞ্চিত অপমান-লাঞ্ছনা ও হীনতা-নীচনার পূঞ্জীভূত স্তূপের জঞ্জাল থেকে চিরদিনের জন্যে মুক্তি দান করেছে এবং তাকে সঠিক ও যথোপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। মুছে দিয়েছে তার ললাটস্থ সহস্রাব্দকালের মসিরেখা।

ইসলাম নারীকে সঠিক মানবতার মূল্য দান করেছে। নারী স্বাভাবিক সুকুমার বৃত্তি ও সহজাত গুণাবলীর বিকাশ সাধনই ইসলামের লক্ষ্য। এজন্যে ইসলাম নারীকে ঘরের বাইরে মাঠে-ময়দানে হাটে-বন্দরে, অফিসে-বাজারে, দোকানে-কারখানায়, পরিষদে-সম্মেলনে, মঞ্চে-নৃত্যুশালায়-অভিনয়ে টেনে নেয়ার পক্ষপাতী নয়। কারণ এসব যোগ্যতা সহকারে পুরোমাত্রায় অংশ গ্রহণের জন্যে  যেসব স্বাভাবিক গুণ ও কর্মক্ষমতার প্রয়োজন, তা নারীকে জন্মগতভাবেই দেয়া হয়নি। নারীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজের যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা দান করা হয়েছে এবং ইসলাম নারীর জন্যে যে জীবন-পথ ও যে কাজের দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে, তা সবই ঠিক এ দৃষ্টিতেই করা হয়েছে। ইসলাম নারীর স্বাভাবিক যোগ্যতার সঠিক মূল্য দিয়েছে, দিয়েছে তা ব্যবহার করে তার উৎকর্ষ সাধনের জন্যে প্রয়োজনীয় বিধান ও ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান সভ্যতায় নারীদের দ্বারা যে সব কাজ করানো হচ্ছে কিংবা যেসব কাজ করতে তাদের নানাভাবে বাধ্য করা হচ্ছে, তা সবই তার প্রকৃতি পরিপন্থী, প্রলোভন বা জোর জবরদস্তিরই পরিণতি মাত্র। সে সব কাজের জন্যে মূলতই নারীদের সৃষ্টি করা হয়নি, তা নিঃসন্দেহেই বলতে চাই। ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক জীবন যাপনই হচ্ছে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যে চিরকল্যাণের উৎস। এ জীবনের বিস্তারিত ব্যবস্থার যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণই এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য।

 

ইসলামে নারী পুরুষের আদর্শ

ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কেই যেমন সৃষ্টিকুলের মধ্যে বিশেষ সম্মানিত মর্যাদায় ভূষিত করেছে তেমনি নারী ও পুরুষের মধ্যে বিশেষ কতগুলো গুণের বর্তমানতাও ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য। এ গুণগুলোই তাদের পূর্ণ আদর্শবাদী বানিয়ে দেয় এবং এ আদর্শবাদ চিরউজ্জ্বল ও বাস্তবায়িত রাখতে পারলেই ইসলামের দেয়া সে মর্যাদা নারী ও পুরুষ পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করতে পারে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও তাদের পারিবারিক জীবনের বিস্তারিত বিধান পেশ করার পূর্বে আমরা এখানে সে বিশেষ গুণাবলী সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করতে চাই। আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

আল্লহার অনুগত পুরুষ ও স্ত্রীলোক, ঈমানদার পুরুষ ও স্ত্রীলোক, আল্লাহর দিকে মনোযোগকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক, সত্য ন্যায়বাদী পুরুষ ও স্ত্রীলোক, সত্যের দৃঢ়তা প্রদর্শনকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক, আল্লাহর নিকট বিনীত নম্র পুরুষ ও স্ত্রীলোক, দানশীল পুরুষ ও স্ত্রীলোক, রোযাদার পুরুষ ও স্ত্রীলোক, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক, আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক –আল্লাহ তা’আলা এদের জন্যে স্বীয় ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। কোনো ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার স্ত্রীলোকের জন্যে –আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো বিষয়ে চূড়ান্তভাবে ফায়সালা করে দেন, তখন সেই ব্যাপারে তার বিপরীত কিছুর ইখতিয়ার ও স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করার কোনো অধিকার নেই। আর যে লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে, সে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হয়।

এই দীর্ঘ আয়াত থেকে যে গুণাবলী প্রমাণিত হচ্ছে –সেসব গুণাবলী নর-নারীর মধ্যে বর্তমান থাকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হতে পারে –তা এখানে খানিকটা ব্যাখ্যাসহ সংখ্যানুক্রমিক উল্লেখ করা যাচ্ছে, যেন পাঠকগণ সহজেই সে গুণাবলী সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারেন।

১. মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম স্ত্রীলোক। ‘মুসলিম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণকারী, আনুগত্য, বাধ্য। আর কুরআনী পরিভাষায় এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী, আল্লাহর অনুগত ও বাধ্য। ব্যবহারিকভাবে আল্লাহর আইন পালনকারী।

২. মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন মঞিলা। ‘মু’মিন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঈমানদার। ঈমান অর্থ কোনো অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস স্থাপন, আর কুরআনী পরিভাষায় কুরআনের উপস্তাপিত অদৃশ্য বিষয়সমূহকে সত্য বলে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করে নেওয়াই হচ্ছে ঈমান। এই অনুযায়ী মু’মিন হচ্ছে সে পুরুষ ও স্ত্রী, যারা কুরআনের উপস্থাপিত অদৃশ্য বিষয়সমূহের প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাসী। মুসলিম-এর পরে মু’মিন বলার তাৎপর্য এই যে, দুনিয়ার মানুষকে কেবল আল্লাহর বাহ্যিক আইন পালনকারী হলেই চলবে না, তাকে হতে হবে তাঁর প্রতি মন ও অন্তর দিয়ে ঐকান্তিক বিশ্বাসী।

৩. আল্লাহর দিকে মনোযোগকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক। এর অর্থ সেসব লোক, যারা সর্বপ্রকার মিথ্যাকে পরিহার করে আন্তরিক নিষ্ঠা সহকারে আল্লাহর হুকুম পালন করে চলে। ফলে তাদের আমলে কোনো প্রকার রিয়াকারী বা দেখানোপনা থাকে না।

৫. সত্যের পথে দৃঢ়তা প্রদর্শনকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক। মূল শব্দ (আরবী*******) সবর। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নিজেকে বেঁধে রাখা, ধৈর্য ধারণ করা। এখানে সেসব পুরুষ-স্ত্রীলোককে বোঝানো হয়েছে, যারা আল্লাহর দ্বীন পালন ও তাঁর বন্দেগী অবলম্বন করতে গিয়ে সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট অকাতরে সহ্য করে, তার ওপর দৃঢ় হয়ে অচল অটল হয়ে থাকে। শত বাধা-প্রতিকূলতার সঙ্গে মুকাবিলা করেও দ্বীনের ওপর মজবুত থাকে এবং কোনোক্রমেই আদর্শ বিচ্যুত হয় না।

৬. আল্লাহর নিকট বিনীত নম্র পুরুষ ও স্ত্রীলোক অর্থাৎ যারা অন্তর, মন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব কিছু দিয়ে আল্লাহর বিনীত বন্দেগী করে। মূল শব্দটি হচ্ছে (আরবী**********) ‘খুশূয়ূন’, অর্থ প্রশান্তি, স্থিতি, প্রীতি, শ্রদ্ধা-ভক্তি, বিনয়, ভয়মিশ্রিত ভালোবাসা এবং আল্লাহর প্রতি আগ্রহ-উৎসাহ।

৭. দানশীল পুরুষ ও স্ত্রীলোক অর্থাৎ যারা গরীব-দুঃখী ও অভাবগ্রস্তদের প্রতি অন্তরে দয়া অনুভব করে উদ্ধৃত্ত মাল ও অর্থ কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অভাবগ্রস্ত লোকদের দেয়।

৮. রোযাদার পুরুষ ও স্ত্রীলোক অর্থাৎ যারা আল্লাহর হুকুম-মুতাবিক রোযা রাখে, যে রোযার ফল হচ্ছে তাকওয়া পরহেযগারী লাভ এবং যার মাধ্যমে ক্ষুৎপিপাসার জ্বালা ও যন্ত্রণা অনুভব করা যায় প্রত্যক্ষভাবে ও  তার জন্যে ধৈর্য ধারনের শক্তি অর্জন করতে পারেন।

৯. লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক অর্থাৎ যারা নিজেদের লজ্জাস্থান অন্য লোকদের সামনে প্রকাশ করে না –তাতে লজ্জাবোধ করে এবং নিজেদের লিঙ্গস্থানকে হারামভাবে ও হারাম পথে ব্যবহার করেনা। ঢেকে রাখার যোগ্য দেহে –দেহের কোন অঙ্গকে ভিন-পুরুষ-স্ত্রীর সামনে উন্মুক্ত করে না।

১০. আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণকারী পুরুষ ও স্ত্রীলোক অর্থাৎ যাঁরা আল্লাহকে কস্মিনকালেও এবং মুহুর্তের তরেও ভুলে যায় না, আর মুখ ও কলব ক্ষেত্রেই আল্লাহকে চিরস্মরণীয় রাখে।

এই দশটি মৌলিক গুণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হোক এবং এ গুণধারী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সমাজ গঠিত হোক, কুরআনের এ ভাষণের মূল লক্ষ্য তাই। এ মৌলিক গুণাবলী নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই কাম্য। কেবল পুরুষদেরই নয়, নারীদেরও এই গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে। আর তা হতে পারলেই এই পুরুষ ও নারী সমন্বয়ে গঠিত হবে আদর্ম সমাজ যা কুরআন গড়ে তুলতে চায়।

কুরআনের অপর একটি ছোট্ট আয়াতে বিশেষভাবে মুসলিম মহিলার গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*********************************)

অতএব যারা নেককার স্ত্রীলোক, তারা তাদের স্বামীদের ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম পালনকারী এবং স্বামীদের অনুপস্থিতিতে গোপনীয় বা রক্ষণীয় বিষয়গুলোর হেফাযতকারী হয়ে থাকে; কেননা আল্লাহ নিজেই তার হেফাযত করেছেন। (যদি কেউ সে-সবের হেফাযত করতে চায়, তবে তার পক্ষে তা সম্ভব ও সহজ হবে)।

এ আয়াতের তাফসীরে লেখা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************************)

অর্থাৎ নারীদের জন্যে কর্তব্য করে দেয়া হয়েছে যে, তারা তাদের স্বামীদের অধিকার রক্ষা করবে এর বিনিময়ে যে, আল্লাহ নিজেই তাদের অধিকার তাদের স্বামীদের ওপর সংস্থাপন ও তার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এজন্যেই তিনি স্ত্রীদের প্রতি ন্যায়নীতি ও সুবিচার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন পুরুষদেরকে। তাদেরকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলেছেন এবং আদেশ দিয়েছেন পুরুষদেরকে তাদের মোহরানা আদায় করতে।

ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী

কুরআন মজীদে মহিলাদের দুটি আদর্শ নারীর চরিত্র পেশ করা হয়েছে এবং দুনিয়ার ঈমানদার নারীদেরকে তাদের আদর্শ চরিত্রের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

তার মধ্যে একটি আদর্শ হচ্ছে ফিরাঊনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুজাহিম। ফিরাঊন ছিল আল্লাহ ও আল্লাহর দ্বীনের প্রকাশ্য দুশমন। কিন্তু তার স্ত্রী ছিলেন আল্লাহ ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি পূর্ণ ও মজবুত ঈমানদার। ফিরাঊনের ন্যায় প্রচণ্ড প্রতাপশালী সম্রাটের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও এবং অত্যন্ত কুফরী পরিবেশে থেকেও তিনি আন্তরিক নিষ্ঠা সহকারে আল্লাহকে ভয় করতেন, তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন করে চলতেন। এত বড় সম্রাটের স্ত্রী হওয়াকে তিনি নিজের জন্যে সামান্য গৌরবের বিষয় বলেও মনে করতেন না। বরং রাতদিন আল্লাহর নিকট এই আল্লাহ-বিরোধী সম্রাটের আধিপত্য থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্যে কাতর কণ্ঠে দো’আ করতে থাকতেন। ফিরাঊনের নাফরমানীর কারণে গোটা জাতির ওপর আল্লাহর যে গজব ও অভিশাপ বর্ষিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল, তা থেকেও তাঁর নিকট পানাহ চাইতেন। কুরআন মজীদে এই আল্লাহ বিশ্বাসী মহিলাকে দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী**************************************)

আল্লাহ তা’আলা ঈমানদার লোকদের জন্যে ফিরাঊনের স্ত্রীকে দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করেছেন। সে (স্ত্রী) দো’আ করলঃ ‘হে আল্লাহ! আমার জন্যে তোমার নিকট জান্নাতে একখানি ঘর নির্মাণ করো এবং ফিরাঊন ও তার কার্যকলাপ থেকে আমাকে মুক্তি দাও, মুক্তি দাও জালিম লোকদের নির্যাতন থেকে’।

এ দৃষ্টান্ত সম্পর্কে আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

মু’মিন লোকদের প্রকৃত অবস্থা কি হতে পারে তা দেখার ও তার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা ফিরাঊনের স্ত্রীকে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করেছেন। সেই সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ়তা দেখানো, দ্বীন ইসলামকে সর্বাবস্থায় আঁকড়ে ঘরে থাকার এবং কঠোর দুর্বিষহ অবস্থায়ও ধৈর্য ধারণ করার উৎসাহ দান করা হয়েছে এ উপমা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। পরন্তু দেখানো হয়েছে যে, কুফরী শক্তির যতই দাপট ও প্রতাপ হোক, তা ঈমানদার লোকদের একবিন্দু ক্ষতি করতে পারবে না, যেমন ফিরাঊনের মতো একজন বড় কাফেরের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও সে তার স্ত্রীর একবিন্দু ক্ষতি করতে পারে নি, বরং তিনি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান সহকারেই নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে চলে যেতে পেরেছেন।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হচ্ছে, হযরত মরিয়মের চরিত্র। তিনি ছিলেন পবিত্রতা, সতীত্ব এবং আল্লাহ-ভীরুতার জ্বলন্ত প্রতীক। আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************************)

আল্লাহ তা’আলা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইমরান-কন্যা মরিয়মের কথা। সে তার সব শংকাপূর্ণ স্থান (যৌন অঙ্গ) সমূহের পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। তখন আমি (আল্লাহ) তার মধ্যে আমার থেকে রূহ ফুঁকে দিলাম এবং সে তার আল্লাহর সব কথা ও তাঁর কিতাবসমূহের সত্যতা মেনে নিয়েছে। বস্তুত সে ছিল তার আল্লাহর আদেশ পালনকারী বিনয়ী লোকদের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহর হুকুম পালন, বিনয় ও আল্লাহ-ভীরুতার বাস্তব প্রতীক হিসেবে ওপরের আয়াতদ্বয়ের যেমন দুটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে, অনুরূপভাবে উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে দুটি খারাপ চরিত্রের নারীর দৃষ্টান্তও  উল্লেখ করা হয়েছে অপর আয়াতে। তাদের এক দৃষ্টান্ত প্রসঙ্গে হযরত নূহ ও হযরত লতু নবীর স্ত্রীদ্বয়ের উল্লেখ হয়েছে। দুজনের প্রতিই আল্লাহর অপরিসীম অনুগ্রহ ছিল, দুজনকেই আল্লাহর বিধান মুতাবেক জীবন যাপন করতে এবং তাদের স্বামীদ্বয় যে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাতে যদি তারা তাঁদের সাহায্য ও সহযোগিতা করত –সব রকমের দুঃখ-কষ্টে তাঁদের অকৃত্রিম সহচারী ও সঙ্গিনী হত, তাহলে তাদের স্বামীদ্বয়ের মতো আল্লাহর নিকট তাদেরও মর্যাদা হতো। কিন্তু তারাতা করেনি। তারা বরং এ ব্যাপারে নিজ নিজ স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কাজকে তারা অতি হীন ও নগণ্য মনে করেছে। তাদের দুশমনদের সাথে তারা গোপনে হাত মিলিয়েছে। ফলে নবীদ্বয়ের দুঃখ ও বেদনার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই কারণে জাতির ফাসিক-ফাজির লোকেরা আল্লাহর যে আযাবে নিমজ্জিত হয়েছে, তারাও সেই আযাবে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************************)

আল্লাহ কাফেরদের অবস্থা বোঝাবার জন্যে নূহ ও লুতের স্ত্রীদ্বয়ের দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছেন। এই দুজন মেয়েলোক ছিল আমার দুই নেক বান্দার স্ত্রী। তারা দুজনই নিজ নিজ স্বামীর সাথে খেয়ানতের অপরাধ করেছে। কিন্তু নেক স্বামীদ্বয় তাদের জন্যে আল্লাহর আযাবের মুকাবিলায় কোনো উপকারে আসেনি। বরং তাদে দুজন (স্ত্রীদ্বয়)-কেও আদেশ করা হলোঃ তোমরা অন্যান্যদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করো।

কুরআন মজীদে এ পর্যায়ে তৃতীয় যে দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো আবূ লাহাবের স্ত্রীর কথা। আবূ লাহাব ছিল ইসলাম-বিরোধী কুফরী আদর্শের একজন বড় নেতা। আর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের সে ছিল অতি বড় দুশমন। তার স্ত্রী ছিল বড় খবীস প্রকৃতির, হীন ও নিকৃষ্ট চরিত্রের এক দুর্দান্ত মেয়েলোক। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে রাসূলে করীম (স)-এর বিরোধিতা করত প্রাণপণে। তাদের এ বিরোধীতা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণের ওপর ভিত্তিশীল ছিল না, ছিল না কোনো নীতির ভিত্তিতে। বরং এ বিরোধিতা ছিল অনেকটা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও আক্রোশ পর্যায়ে। অপরদিকে আবূ লাহাবের স্ত্রী ছিল অত্যন্ত আধুনিক। তার বিলাস-ব্যসনের জন্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে দেয়ার জন্যে সে স্বামীর ওপর প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করত। আবূ লাহাব নিতান্ত বোকার মতো স্ত্রীর যাবতীয় দাবি-দাওয়া পূরণের জন্যে ন্যায়-অন্যায় নির্বিচারে নানাবিধ উপায় অবলম্বন করত। এতবড় একজন সমাজপতি হওয়া সত্ত্বেও হাজীদের পরিচর্যার জন্যে সংগৃহিত অর্থ বিনষ্ট ও আত্মসাত করত। এমন কি, আল্লাহর ঘরে রক্ষিত স্বর্ণ চুরি করত বলে অনেকেই তার প্রতি সন্দেহ পোষণ করত। তার এসব অসদাচরণের একমাত্র কারণ ছিল তার প্রিয়তমা স্ত্রীর অবাঞ্ছিত বিলাস-ব্যসনের আবদার রক্ষা। এ ধরনের একটি নারী গোটা জাতির পক্ষেও বিপজ্জনক হতে পারে। এ কারণে কুরআন মজীদে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে এ নারীর উল্লেখ করা হয়েছে। আর তার দুষ্কৃতকারী স্বামীর মর্মান্তিক পরিণতির ব্যাপারে তাকেও সমানভাবে অংশীদার বানানো হয়েছে। কুরআনে তার নির্মম পরিণতির যে চিত্র অংকন করা হয়েছে, তা হচ্ছে এমন এক নারী, যে গলায় রশি ঝুলিয়ে বনে-জঙ্গলে কাষ্ঠ আহরণ করে বেড়াচ্ছে এবং সে ইন্ধন সংগ্রহ করে আগুনকে দ্বিগুণভাবে তেজস্বী করে জ্বালিয়েছে। এ আগুনেই জ্বলছে তার নিজের স্বামী। কেননা আবূ লাহাবের জাহান্নামে যাওয়ার যাবতীয় কারণ এ দুনিয়ায় সেই উদ্ভাবন করেছিল। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************)

আবূ লাহাব ধ্বংস হোক, -আর তার সব ক্ষমতা প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হলো সে নিজে ধ্বংস হলো। না তার ধন-সম্পদ তাকে রক্ষা করতে পারল, না তার হারাম-হালাল উপার্জন। সে শীঘ্রই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে। তার স্ত্রীও তারই সঙ্গে –যার কাজ ছিল কেবল ইন্ধন সংগ্রহ করা –তার গলদেশে ঝুলতে থাকবে মোটা পাকানো রশি।

অর্থাৎ ঘুষ খেয়ে পরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে হরণ করে এবং খেয়ানত করে আব লাহাব যে সব মূল্যবান অলংকার বানিয়ে তার স্ত্রীকে দিত, কিয়ামতের দিন তা-ই তার গলায় বড় বড় রশি হয়ে ঝুলতে থাকবে। বস্তুত মরণকালেও যে পাকানো রশি দ্বারা জালানী কাঠ বেঁধে আনতো তার গলায় ঐ রশির ফাঁস লেগে তার মৃত্যু হয়েছিল।

কুরআন মজীদে উল্লিখিত বিভিন্ন নারীর এ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার নারীকুলের জন্যে যেমন বিশেষ অনুসরণীয় ও উপদেশ গ্রহণের স্থল, তেমনি দুনিয়ার স্বামীকুলের জন্যেও এর মধ্যে রয়েছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, রয়েছে উপদেশ গ্রহণের উন্নত শিক্ষা। এ আলোচনার মাধ্যমে কুরআন নারীকুরের সামনে নৈতিকতার একটি মান –একটি নৈতিক লক্ষ্য সংস্থাপন করেছে। যে সব মহিলা দ্বীনদার, কিন্তু স্বামীরা ফাসেক-ফাজের –দ্বীন-ইসলামের বিরোধী কিংবা তার পক্ষে নয়, তাদের জন্যেও যেমন এখানে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি সব কাফের, চরিত্রহীন ও আল্লাহ-দ্রোহী নারীদের জন্যেও এতে রয়েছে নিজেদের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করে কল্যাণের পথ এ দুনিয়ায়ই গ্রহণ করার উপযুক্ত শিক্ষা, যাদের স্বামীরা বড় দ্বীনদার পরহেযগার। দুনিয়ার স্বামীকুল সম্পর্কেও এই একই কথা।

স্বামী যদি বেঈমান হয়, আর স্ত্রী হয় ঈমানদার, আল্লাহভীরু, তাহলে এ কারণেই স্বামীর পক্ষে পরকালীন মুক্তি লাভ সম্ভব হবে না। আর এরূপ অবস্থায়ও যে স্ত্রীলোকদের পক্ষে দ্বীন পালন করা উচিত, স্বামীর অন্যায় কাজের সমর্থন করতে গিয়ে নিজেদেরকেও জাহান্নামী করা স্ত্রীর পক্ষে উচিত কাজ নয়, আর তা যে সম্ভব, তার বাস্তব দৃষ্টান্ত হচ্ছে কুরআনে উল্লিখিত ফিরাউনের স্ত্রী –আছিয়া।

পক্ষান্তরে বেঈমান স্ত্রীদের স্বামীরা যদি নবীও হয়, তবু কেবলমাত্র এই বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দেবেন –এরূপ ধারণা বাতুলতা ছাড়া কিছুই নয়।

 

ইসলামে নারীর মর্যাদা

ইসলামে নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নারীকে প্রথম মর্যাদা দেয়া হয়েছে কন্যারূপে। দ্বিথীয় মর্যাদা দেয়া হয়েছে বধুরূপে, তৃতীয় মর্যাদা ‘মা’ রূপে এবং চতুর্থ সমাজ-সংস্থার সমান গুরুত্বপূর্ণ সদস্যারূপে।

কন্যা-রূপে নারী

পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, কন্যারূপে নারীর বড়ই অমর্যাদা ছিল আরব জাহিলিয়াতের সমাজে। সেখানে কন্যা-সন্তানকে অকথ্যভাবে ঘৃণা করা হতো। তাকে জীবন্ত প্রোথিত করা হতো। কন্যা-সন্তানের মুখ দেখতেও রাযি হতো না স্বয়ং কন্যার পিতা। কুরআন মজীদে এ নারী অপমানের চিত্র অংকন করা হয়েছে নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী************************************************************)

সে সমাজের কাউকে তার কন্যা-সন্তান জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হলে সারাদিন তার মুখ কালো হয়ে থাকত। সে ক্ষুব্ধ হতো এবং মনে মনে দুঃখ অনুভব করত। এ সুসংবাদেরলজ্জার দরুন সে অন্য লোকদের থেকে মুখ লুকিয়ে চলত। সে চিন্তা করত, অপমান সহ্য করে মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখবে, না তাকে মাটির তলায় প্রোথিত করে ফেলবে! –কতই না খারাপ সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করত!

ইসলাম মানবতা-বিরোধী ভাবধারার প্রতিবাদ করেছে। এ কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং কন্যা সন্তানকে পুরুষ ছেলের মতো জীবনে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে। আর কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করা হলে কিয়ামতের দিন যে তার পিতাকে আল্লাহর দরবারে কঠোরভাবে জবাবাদিহি করতে হবে, তা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************)

জীবন্ত প্রোথিত কন্যা-সন্তানকে কেয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে –কোন অপরাধে তোমাকে হত্যা করা হয়েছিল?

এ কারণে নবী করীম (স) বলেছেনঃ যে লোকের কোনো কন্যা-সন্তান রয়েছে এবং সে তাকে জীবন্ত প্রোথিত করেনি এবং তাকে ঘৃণার চোখেও দেখেনি, তার ওপর নিজের পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকারও দেয়নি, তাকে আল্লাহ তা’আলা বেহেশত দান করবেন। (আবূ দাউদ, কিতাবুল আদব)

আরব জাহিলিয়াতের সমাজে নারী ও কন্যাকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চরমভাবে পঙ্গু করে রাখা হতো। তাকে পিতার মীরাস লাভের অধিকার মনে করা হতো না। বরং সেখানে মীরাস দেয়া হতো সেসব পুত্র-সন্তানকে, যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর সঙ্গে মুকাবিলা করতে পারত। নারীদের মীরাসের অংশ দেয়া তো দূরের কথা, স্বয়ং এই নারীদেরও মীরাসের মাল মনে করা হতো এবং পুরুষরা তাদের নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিত। কন্যা-সন্তানের প্রতি চরম অমানবিক অবজ্ঞা এই বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও সভ্যতার চরম উন্নতির যুগেও যত্রতত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক চীনের দুজন নারীকে আত্মহত্যঅ করতে হয়েছে শুধু এ অপরাধে যে, তারা কেবল কন্যা সন্তানই প্রসব করেছে, স্বামীকে কোনো পুত্র সন্তান উপহার দিতে পারেনি।

কিন্তু ইসলাম মানবতার পক্ষে এই চরম অবমাননাকর রীতি চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। কুরআনে নারীকে –কন্যাকেও পুরুষদের মতোই মীরাসের অংশীদার করে দেয়া হয়েছে। যদিও পুরুষদের তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব কম বলে পুরুষদের অপেক্ষা তাদের অংশ অর্ধেক রাখা হয়েছে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***************************************)

আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক বিধান দিচ্ছেন। তিনি আদেশ করেছেন, একজন পুরুষ দুজন মেয়েলোকের সমান অংশ পাবে। কেবল মেয়ে-সন্তান দুজন কিংবা ততোধিক হলে তারা পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি মাত্র একজন কন্যা হয়, তাহলে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক পাবে।

এ আয়াতে মেয়েদেরকেও পুরুষ ছেলেদের সমান সম্পত্তির অংশীদার বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাধারণ লোক এ আইনকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা বলল, এদের মধ্যে কেউ তো এমন নয় যে, যুদ্ধে গিয়ে শত্রুর মুকাবিলা করতে পারে। এ মনোভাবের প্রতিবাদ করে কুরআন উপরিউ্কত আয়াতে কন্যা-সন্তানকে বিয়ের পূর্বেই এমন পরিমাণ মীরাস লাভের অধিকার দেয়া হয়েছে, যা তার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।

পিতা জীবিত থাকলে ছেলের বালেগ হওয়া পর্যন্ত তার লালন-পালন করা যেমন পিতার কর্তব্য, মেয়ের বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তার জন্যেও পিতার অনুরূপ কর্তব্য রয়েছে। উপরন্তু ছেলে বড় হলে পিতা তাকে কামাই-রোজগার করার জন্যে বাধ্য করতে পারে; কিন্তু কন্যা সন্তানকে তা পারে না।

স্ত্রী-রূপে নারী

তদানীন্তন আরব সমাজের স্ত্রী হিসেবেও নারীদের চরম অমর্যাদা ও অপমান ভোগ করতে হত। তাদেরকে স্বামীর ঘরে যথাযোগ্য মর্যাদা বা অধিকার দেয়া হতো না। তাদেরকে হীন, নগণ্য ও দয়ার পাত্রী মনে করা হতো। নিতান্ত দাসী-বাঁদীর মতো ব্যবহার করা হতো তাদের সাথে।

ইসলাম স্ত্রী হিসেবে নারীদের এ অপমান দূর করে তাদেরকে সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। প্রথমত ঘোষণা করা হয়েছে, তারা নারী বলে মৌল অধিকারের দিক দিয়ে পুরুষদের তুলনায় কিছুমাত্র কম নয়। বলা হয়েছেঃ

(আরবী************************************************************)

স্ত্রীদেরও তেমনি অধিকার রয়েছে যেমন স্বামীদের রয়েছে তাদের ওপর এবং তা যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

অন্য কথায়, স্ত্রী ও স্বামী উভয়েই আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণ সমান। তাদের অধিকারও অভিন্ন এবং দুয়ের মাঝে এক্ষেত্রে কোনোই পার্থক্য করা যেতে পারে না। মৌল অধিকারের দিক দিয়ে কেউ কম নয়, কেউ বেশী নয়।

আরব সমাজে স্ত্রীদের ওপর নানাভাবে অকথ্য জুলুম ও পীড়ন চালান হতো। কোনো কোনো স্বামী তাদের মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখত, না পেত তারা স্ত্রীত্বের পূর্ণ অধিকার, না পেত তাদের কাছ থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি। স্বামী একদিকে যেমন তাদের পুরাপুরি স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকার দিত না, অন্যদিকে তেমনি তালাক দিয়ে মুক্ত করে অন্য স্বামী গ্রহণের সুযোগও দিত না। বরং এভাবে আটকে রেখে তাদের নিকট থেকে নিজেদের দেয়া ধন-সম্পদ ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাত এবং সেজন্যে নানা কৌশল অবলম্বন করত। কুরআন মজীদ এর প্রতিবাদ করেছে তীব্র ভাষায়। বলেছেঃ

(আরবী**************************************************)

তোমরা –হে স্বামীরা –তাদের (স্ত্রীদের) বেঁধে আটকে রাখবৈ না এ উদ্দেশ্যে যে, তাদের নিকট থেকে তোমাদের দেয়া ধন-সম্পদের কিছু অংশ কেড়ে নেবে।

সেকালে স্ত্রীদের ঘরের অন্যান্য মাল-সামানের মতোই অস্থাবর সম্পত্তি বলে মনে করা হতো এবং স্বামী মরে গেলে তার স্ত্রীকেও পরিত্যক্ত মাল-সম্পত্তির ন্যায় উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো।এ প্রথা প্রথমকালে মুসলমানদের মধ্যেও চালু ছিল মনে হয়। কুরআন মজীদে এ সম্পর্কে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************)

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মেয়েদেরকে অন্যায় জবরদস্তি করে নিজেদের মীরাসের সম্পদ বানিয়ে নিও না-তা তোমাদের পক্ষে আদৌ হালাল হবে না।

নবী করীম (স) বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বলেছিলেনঃ

(আরবী*****************************************************)

তোমরা স্ত্রীলোকদের ব্যাপারে আল্লাহকে অবশ্যই ভয় করে চলবে। তোমাদের মনে রাখতে হবে যে তোমা তাদের গ্রহণ করেছ আল্লাহর নামে এবং এভাবেই তাদের হালাল মনে করেই তোমরা তাদের উপভোগ করেছ।

এই পর্যায়ে হযরত উমর ফারূক (রা)-এর একটি কথা উল্লেখ্য। তিনি বলেছিলেনঃ

(আরবী*****************************************************)

আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, জাহিলিয়াতের যুগে আমরা মেয়েলোকদের কিছুই মনে করতাম না –কোনোই গুরুত্ব দিতাম না। পরে যখন আল্লাহ তা’আলা তাদের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট অকাট্য বিধান নাযিল করলেন এবং তাদের জন্যে মীরাসের অংশ নির্দিষ্ট করে দিলেন, তখন আমাদের মনোভাব ও আচরণের আমূল পরিবর্তন সাধিত হলো।

মা-রূপে নারী

ইসলামে মা হিসেবে নারীকে যে উঁচু মর্যাদা ও সম্মান দেয়া হয়েছে, দুনিয়ার অপর কোনো সম্মানের সাথেই তার তুলনা হতে পারে না। নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

বেহেশত মা’দের পায়ের তলে অবস্থিত।

অর্থাৎ মাকে যথাযোগ্য সম্মান দিলে, তার উপযুক্ত খেদমত করলে এবং তার হক আদায় করলে সন্তান বেহেশত লাভ করতে পারে। অন্য কথায় সন্তানের বেহেশত লাভ মা’য়ের খেদমতের ওপর নির্ভরশীল। মা’য়ের খেদমত না করলে কিংবা মা’র প্রতি কোনোরূপ খারাপ ব্যবহার করলে, মা’কে কষ্ট ও দুঃখ দিলে সন্তান যত ইবাদত বন্দেগী আর নেকের কাজই করুক না কেন, তার পক্ষে বেহেশত লাভ করা সম্ভবপর হবে না।

হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেছেনঃ নবী করীম (স)-এর সময়ে আল-কামা নামক এক যুবক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। তার রোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত সেবা-শুশ্রূষাকারীরা তাকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ কালেমা পাঠ করার উপদেশ দেয়। কিন্তু শথ চেষ্টা করেও সে তা উচ্চারণ করতে পারে না। রাসূলে করীম (স) এই আশ্চর্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরে জিজ্ঞেস করলেনঃ তার মা কি জীবিত আছে? বলা হলো, তার পিতা মারা গেছে, মা জীবিত আছে, অবশ্য সে খুবই বয়োবৃদ্ধা। তখন তাকে রাসূল (স)-এর দরবারে উপস্থিত করা হলো। তার নিকট তার ছেলের এ অবস্থার উল্লেখ করে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। সে বলল, আল-কামা বড় নামাযী, বড় রোযাদার ব্যক্তি এবং বড়ই দানশীল। সে যে কত দান করে, তার পরিমাণ কারো জানা নেই। রাসূলে করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সাথে তার সম্পর্ক কিরূপ?’ উত্তরে বৃদ্ধা মা বলল, ‘আমি ওর প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট’। তার কারণ জিজ্ঞেস করায় সে বলল, ‘সে আমার তুলনায় তার স্ত্রীর মত যোগাত বেশী, আমার ওপর তাকেই বেশী অগ্রাধিকার দিত এবং তার কথামতোই কাজ করত’। তখন রাসূলে করীম (স) বললেন, ‘ঠিক এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা তার মুখে কালেমার উচ্চারণ বন্ধ করে দিয়েছেন’। অতঃপর রাসূলে করীম (স) হযরত বিলালকে আগুনের একটা কুণ্ডলি জ্বালাতে বললেন এবং তাতে আল-কামাকে নিক্ষেপ করার আদেশ করলেন।

আল-কামার মা একথা শুনে বলল, ‘আমি মা হয়ে তা কেমন করে হতে দিতে পারি! সে যে আমার সন্তান, আমার কলিজার টুকরা’।

রাসূলে করীম (স) বললেন, “তুমি যদি চাও যে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দিন তাহলে তুমি তার প্রতি খুশী হয়ে যাও। অন্যথায় আল্লাহর শপথ, তার নামায, রোযা ও দান-খয়রাতের কোনো মূল্যই হবে না আল্লাহর দরবারে।

অতঃপর আল-কামার জননী বললো, “আমি আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাকে মাফ করে দিলাম”। এরপর খবর নিয়ে জানা গেল যে, আল-কামা অতি সহজেই কালেমা উচ্চারণ করতে সমর্থ হয়েছে।

এ একটি ঘটনা এবং নির্ভুল বর্ণনাভিত্তিক বলে এর সত্যতায় কোনোই সন্দেহ নেই। যদিও বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিতে এর সত্যতা স্বীকৃত নয় এবং এ সব ঘটনার কোনো মূল্যও নেই। কিন্তু ইসলাম যে নৈতিক ও আদর্শিক বিধান উপস্থাপিত করেছে, তাতে এ ধরনের ঘটনা মানুষের চোখ খুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

সমাজ-সংস্থার সদসা হিসেবে নারী

নারী কেবল কন্যা, বধু এবং মা’ই নয়, ইসলামের সমাজ-সংস্থায় সে সমাজ মর্যাদা সম্পন্না একজন সদস্যাও বটে। ইসলামে পুরুষের মর্যাদা যেমন স্বীকৃত, তেমনি তার ওপর অনেক গুরু দায়িত্বও অর্পিত। অনুরূপভাবে নারীকে সমাজ ক্ষেত্রে যেমন মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তেমনি তারও রয়েছে অনেক মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। দ্বীনী আমল-আখলাকের নিয়ম-কানুন পালন করা যেমন পুরুষের কর্তব্য, তেমনি নারীরও এবং কর্তব্য পালনের ফল লাভের অধিকারও উভয়ের সম্পূর্ণ সমান। ইসলামে এ ব্যাপারে নারী-পুরুষের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।

কুরআন মজীদের ঘোষণা হলঃ

(আরবী*********************************************************)

পুরুষ বা স্ত্রী –যে লোকই নেক আমল করবে ঈমানদার হয়ে, সে-ই বেহেশতে দাখিল হতে পারবে এবং এদের কারো উপর একবিন্দু জুলুম করা হবে না।

বস্তুত ইসলামী শরীয়ত নারী-পুরুষ উভয়কেই সমান সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকার দিয়েছে। অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, জ্ঞান অর্জন ও চর্চা –প্রভৃতি মানসিক, জ্ঞানগত ও বুদ্ধিগত, শারীরিক ও দ্বীনী কল্যাণ সম্পর্কিত যাবতীয় ক্ষেত্রেই উভয়ের মাঝে পূর্ণ সমতা স্থাপন করেছে। কোনো নারী যদি আশ্রয়হীন বা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তাহলে সে তার জীবন-জীবিকার প্রয়োজন পূরণ ও স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে যে-কোন হালাল উপায়ে কামাই-রোজগার করতে পারে। এজন্যে সব রকমের বিধিসম্মত উপায়ও সে অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু তার এ দায়িত্ব খতম হয়ে যায় তখন, যখন তার এ দায়িত্ব পালনের জন্যে কোনো পুরুষ স্বামী হিসেবে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। তখন এ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গোটা পারিবারিক দায়িত্ব ভাগ হয়ে যাবে। একটি গোটা পরিবারে একদিকে যেমন আয় করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, তেমনি অপরদিকে সে আয়ের সুষ্ঠু বণ্টন ও বিলি-ব্যবস্থার প্রয়োজন। পরিবারে কর্মবণ্টন এভাবে হতে পারে যে, পুরুষ আয় করবে, স্ত্রী তা ব্যয় করে ঘরের ব্যবস্থাপনা চালাবে। এর ফলে উভয়ের সামাজিক মর্যাদা সমান ও অভিন্ন থাকে।

বস্তুত নারী জীবনের আবাহন, পুলকের সঙ্গীত, পবিত্র স্নেহ-মমতার প্রতীক, প্রতিমূর্তি, বিশ্ব নিখিলের প্রাণ-সম্পদ। আল্লামা ইকবাল নারীর প্রশংসায় বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

বিশ্ব নিখিলের ছবিতে যা কিছু চাকচিক্য তা সবই কেবলমাত্র নারীর কারণেই।

সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বন্ধুত্ব, প্রেম-প্রীতি, সহানুভূতি আত্মদানই হচ্ছে নারীর ভূষণ-বৈশিষ্ট্য। অনন্তকাল পর্যন্ত নারীর এ ভূষণ স্থায়ী থাকবে। সে মৃত মনে নব জীবনের স্পন্দন জাগিয়েছে সতত –সর্বত্র। বিপদ-কাতর ব্যক্তিকে সে দিয়েছে জীবনের মন্ত্র, ভীরু কাপুরুষের মধ্যে জাগিয়েছে সাহস, বিক্রম ও বীরত্ব। বিপদের প্রচণ্ড ঞঞ্ঝা-বাত্যায় বৃক্ষের কচি শাখার মতোই সে রয়েছে অটুট স্থায়ী সামান্য আনন্দেই তার আননে খেলেছে হাসির উদ্বিতল লহরী, দুঃখ ভারাক্রান্ত মানসে জ্বালিয়েছে আশার আলো।

বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তি, তারা সবাই নারীর গর্ভে অস্তিত্ব লাভ করেছে, নারী কর্তৃক প্রসবিত এবং নারীর ক্রোড়েই লালিত-পালিত হয়েছে। মানব জাতির মর্যাদা সে বাড়িয়েছে। পুরুষের মনোরাজ্যে সে স্থাপন করেছে স্বীয় সিংহাসন, বিস্তার করেছে রাজত্ব –পুরুষের সমগ্র জীবনব্যাপী। গোটা মানবতাই নারীর কাছে ঋণী। তাই নারীর গুরুত্ব ও মর্যাদা কেউ অস্বীকার করতে পারে না, পারেনি, পারবেও না কোনো দিন। জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ মূল্যমান নারীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। পবিত্রতা, সতীত্ব ও প্রেম-ভালোবাসা প্রভৃতি শব্দ তারই জন্যে হয়েছে রচিত। এ সব রক্ষা করার মাধ্যমে কন্যা, বধূ ও জননীর ভূমিকায় সার্থকভাবে দায়িত্ব পালন করবে সে, ইসলামী আদর্শের তাই একমাত্র লক্ষ্য।

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

পরিবার গঠন

ইসলামে পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব

ইসলামে পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব যে কতোখানি, তা পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লা তা’আলা মানুষের জন্যে যে পূর্ণাঙ্গ জীবনের বিধান নাযিল করেছেন, তাতে নানাভাবে ও নানা প্রসঙ্গে এ গুরুত্বের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।

কুরআনে পরিবারকে দুর্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং পারিবারিক জীবন যাপনকারী নারী-পুরষ ও ছেলে-মেয়েকে বলা হয়েছে ‘দুর্গ প্রাকারের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত (আরবী************) লোকগণ’। দুর্গ যেমন শত্রুর পক্ষে দুর্ভেদ্য, তার ভিতরে জীবনযাত্রা যে রকম নিরাপদ, ভয়-ভাবনাহীন, সর্বপ্রকারের আশংকামুক্ত; পরিবারের নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়ে নৈতিকতা বিরোধী পরিবেশ ও অসৎ-অশ্লীল জীবনের হাতছানি বা আক্রমণ থেকে তেমনিই সর্বতোভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে। বস্তুত পরিবারস্থ ছেলেমেয়ের পক্ষে পিতামাতা, ভাই বোনের তীব্র শাসন ও নিকটাত্মীয়দের সজাগ দৃষ্টির সামনে পথভ্রষ্ট হওয়া বা নৈতিকতা বিরোধী কোনো কাজ করা খুব সহজ হতে পারে না।

আল্লামা রাগেব ইসফাহানী কুরআনে উদ্ধৃত (আরবী***********) শব্দের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

কারো সম্পর্কে (আরবী*******) বলা হয় তখন (আরবী************) ‘যখন সে দুর্গকে বসবাসের স্থানরূপে গ্রহণ করে’। (আরবী***********)

আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী**************************************)

দুর্গবাসী হওয়ার আসল মানে হচ্ছে প্রতিরোধ শক্তিসম্পন্ন হওয়া।

যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

যেমন তোমাদেরকে তোমাদের ভয়-ভীতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

এ কারণেই ঘোড়াকে বলা হয় (আরবী******)

(আরবী****************************************************)

কেননা সে তার মনিবকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

আর এই দৃষ্টিতেই (আরবী***********) বলা হয়ঃ

(আরবী*****************************************************)

পবিত্র চরিত্রসম্পন্না নারীকে, কেননা সে নিজকে সর্বতোভাবে রক্ষা করে রাখে।

এখান থেকেই বলা হয়ঃ

(আরবী*******************************************************)

আল্লাহর অসন্তোষজনক কাজ থেকে নিজকে বিরত রাকাকে বলা হয় ‘ইহসান’।

কুরআনে বিবাহিতা মহিলাকে এ কারণেই বলা হয়েছে (আরবী*****) অর্থাৎ পরিবারের দুর্গস্থিত সুরক্ষিত মহিলাগণ। শাওকানী বলেছেনঃ (আরবী**************************) এখানে ‘মুহসানাত’ মানে বিবাহিতাগণ। স্বামীসম্পন্না মেয়েলোক; এমন মেয়েলোক, যাদের স্বামী রয়েছে। এজন্যে যেঃ

(আরবী******************************************************)

তারা তাদের যৌন অঙ্গকে স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষদের থেকে সুরক্ষিত করে রেখেছে।

আল্লামা আলূসী লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

মুহসানাত মানে স্বামীসম্পন্না মেয়েলোক, বিয়ে কিংবা স্বামী অথবা অলী –অভিভাবক তাদের গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।

পারিবারিক জীবনের এই দুর্গপ্রাকার রক্ষা করা ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্যে সর্বপ্রথম অপরিহার্য কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করা আবশ্যকঃ

(আরবী************************************************************************)

তোমার আল্লাহ চূড়ান্তভাবে ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই দাসত্ব করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তাদের একজন কিংবা দুজনই যদি তোমার নিকট বৃদ্ধাবস্থায় জীবিত থাকে, তবে তাদের জন্যে কোনো কষ্টদায়ক ও দুঃখজনক কথা বলো না, তাদের ভৎসনা করবে না এবং তাদের জন্যে সম্মাজনক কথাই বলবে। তোমার দুই বাহু তাদের খেদমতে অপরিসীম বিনয় ও দয়া-মায়া সহকারে বিছিয়ে দাও এবং তাদের জন্যে সব সময় এই বলে দো’আ করতে থাকোঃ হে আল্লাহ পরোয়ারদেগার! তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করো, যেমন করে তাঁরা আমাকে লালন-পালন করেছেন আমার ছোট্ট শিশু অবস্থায়। তোমাদের আল্লাহ ভালোভাবেই জ্ঞাত আছেন তোমাদের মনের অবস্থা সম্পর্কে। তোমরা যদি বাস্তবিকই নেককার হতে চাও, তাহলে আল্লাহ তওবাকারী ও আশ্রয় ভিক্ষাকারীদের জন্যে সব সময়ই ক্ষমাশীল রয়েছেন।

এ আয়াতের শুরুতেই আল্লাহর একত্বের কথা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলা হয়েছে এবং কেবলমাত্র এক আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর সঙ্গে সঙ্গেই পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালনের হুকুম অনেকটা বিস্তারিত করে পেশ করেছেন।

সূরা আল-আন’আম-এ বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************)

আল্লাহর সাথে কোনো কিছুই শরীক বানাবে না এবং পিতামাতার সাথে অবশ্যই ভালো ব্যবহার করবে।

এ আয়াতেও পূর্বোল্লিখিত আয়াতের মতোই প্রথমে আল্লাহর সাথে শিরক করতে নিষেধ –এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁরই আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করার হুকুম দেয়া হয়েছে।

সূরা আল-বাকারায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী*********************************************************************)

তোমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব কবুল করবে না এবং পিতামাতার সাথে অবশ্যই ভালো ব্যবহার করবে।

কুরআন মজীদের এসব আয়াতের বর্ণনাভঙ্গী থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মানুষের ওপর সর্বপ্রথম হক হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার এবং তার পর পরই ও সেই সঙ্গে সঙ্গেই হক হচ্ছে পিতামাতার। অনুরূপভাবে মানুষের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর প্রতি এবং তার পরই কর্তব্য হচ্ছে পিতামাতার প্রতি। আরো অগ্রসর হয়ে বলা যায়, প্রত্যেকটি মানুষের সর্বাধিক কর্তব্য রয়েছে আল্লাহ তা’আলা এবং পিতামাতার প্রতি। এ দুয়ের মাঝে যদি কখনও বিরোধ বাধে, একটি ছেড়ে অপরটি গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে আল্লাহর হক –আল্লাহর প্রতি কর্তব্য অগ্রাধিকার পাবে। তার পরে হবে পিতামাতার হক –পিতামাতার প্রতি কর্তব্য।

বিশেষ লক্ষ্য করার বিষয়, এসব আয়াতেই আল্লাহর হক ও আল্লাহর প্রতি কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে খুবই সংক্ষিপ্ত –একটি মাত্র শব্দে আর পিতামাতার প্রতি কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে অনেকটা বিস্তারিতভাবে। এ থেকে একদিকে যেমন একথা প্রমাণিত হয় যে, যে লোকই আল্লাহর বন্দেগী কবুল করবে, সে অবশ্যই পিতামাতার প্রতি তার কর্তব্য আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ীই পালন করবে। অনুরূপভাবে একথাও প্রমাণিত হয় যে, পিতামাতার প্রতি সঠিক কল্যাণমূলক ব্যবহার করা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব –তারাই তা করে ও করতে  পারে –যারা একমাত্র আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব কবুল করেছে, যারা শপথ নিয়েছে সমগ্র জীবন ভরে এক আল্লাহর বন্দেগী করার।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পিতামাতার প্রতি কর্তবের ওপর এখানে এতখানি গুরুত্ব আরোপ করা হলো কেন? আল্লাহর বন্দেগী কবুল করার নির্দেশ দেয়ার সঙ্গে-সঙ্গে কেন পিতামাতার প্রতি ভালো ব্যবহার করার হুকুম দেয়া হলো এবং কেনই বা তা অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত করে বলা হলো?

এ প্রশ্নের জবাব এই যে, আল্লাহ তা’আলার দেয়া জীবন-ব্যবস্থায় আকীদার দিক দিয়ে প্রথম ভিত্তি তওহীদ –আল্লাহর একত্ব; এবং সমাজ জীবনের ক্ষেত্রে প্রথম ইউনিট হচ্ছে পরিবার। আর এ পরিবার গড়ে ওঠে পিতামাতার দ্বারা। একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোকের বিবাহিত হয়ে একত্র বসবাস শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে স্থাপিত হয় একটি পরিবারের প্রথম ভিত্তি-প্রস্তর। এ আয়াতের বিশেষ বর্ণনাভঙ্গী ও পরস্পরা থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের মূল লক্ষ্য এক আল্লাহর প্রভুত্ব ও তাঁর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বাস্তবায়িত করা, তার জন্যে পরিবার গঠন ও পারিবারিক জীবন যাপন না করলে এক আল্লাহর বন্দেগী কবুল করা ও তদনুরূপ বাস্তব জীবনধারা পরিচালিত করা সম্ভব নয়। ৱ

দ্বিতীয়ত, এ পারিবারিক জীবনকে সুষ্ঠু, সুন্দর, স্বচ্ছন্দ ও শান্তিপূর্ণ করে গড়ে তোলার জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালনে সতত প্রস্তুত ও তৎপর হয়ে থাকা। সন্তান-সন্ততি যদি পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালনে প্রস্তুত না হয়, বিশেষ করে তাদের কর্তব্য ও অক্ষমতার অসহায় অবস্থায়ও যদি তাদের বোঝা বহনকারী পৃষ্ঠপোষক আশ্রয়দাতা ও প্রয়োজন পূরণকারী হয়ে না দাঁড়ায় –বরং যৌবনের শক্তি-সামর্থ্যের অহমিকায় অন্ধ হয়ে যদি তারা পিতামাতার প্রতি কোনো রূপ খারাপ ব্যবহার করে, জ্বালা-যন্ত্রণা দেয়, তাদের খেদমত না করে, তাদের সাথে বিনয় ও নম্রতাসূচক ব্যবহার না করে, যদি তাদের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাভক্তি ও অন্তরের অকৃত্রিম দরদ পোষণ না করে, তাহলে সে অবস্থা পিতামাতার পক্ষে চরম দুঃখ, অপমান ও লাঞ্ছনার ব্যাপার হয় দাঁড়ায়। তার ফলে পরিবার ও পারিবারিক জীবনের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে জাগে চিরন্তন অশ্রদ্ধা। এরপর অপর কোনো পুরুষ ও স্ত্রী পারিবারিক জীবন যাপবে –তথা সন্তান জন্মদান করে পিতামাতা হতে এবং সন্তানের জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম ও দুঃসহ কষ্ট স্বীকার করতে আর কেউ রাজি নাও হতে পারে। তাহলে আল্লাহর একত্ববাদের বাস্তব রূপায়ণের প্রথম ভিত্তি এবং ইসলামী সমাজ-জীবনের প্রথম ঐকিক পরিবার গড়ে উঠতে পারবে না। আর তাই যদি না হয় তাহলে সেটা যে বড় মারাত্মক অবস্থা  হয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমান কর যায়।

পরিবার ও পারিবারিক জীবনের এ অপরিসীম গুরুত্বের কারণেই ইসলামে সেইসব বিধি-ব্যবস্তা ইতিবাচকভাবে দেয়া হয়েছে, যার ফলে পরিবার দৃঢ়মূল হতে পারে, হতে পারে সুখ-শান্তি ও মাধুর্যপূর্ণ এবং সেসব কাজ ও ব্যাপার-ব্যবহারকে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করে দেয়া হয়েছে যা পরিবারকে ধ্বংস করে, পারিবারিক জীবনকে তিক্ত ও বিষময় করে তোলে। আর তারই বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হয়েছে বর্তমান গ্রন্থে।

 

বিয়ে এবং তার গুরুত্ব

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে বিয়েই হচ্ছে একমাত্র বৈধ উপায়, একমাত্র বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। বিয়ে ছাড়া অন্য কোনো ভাবে –অন্য পথে –নারী-পুরুষের মিলন ও সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিয়ে হচ্ছে পুরুষ ও নারীর মাঝে সামাজিক পরিবেশে ও সমর্থনে শরীয়ত মুতাবেক অনুষ্ঠিত এমন এক সম্পর্ক স্থাপন, যার ফলে দুজনের একত্র বসবাস ও পরস্পরে যৌন সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়ে যায়। যার দরুন পরস্পরের ওপর অধিকার আরোপিত হয় এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

(আরবী*******************************************************)

বস্তুত এ বিয়েই হচ্ছে ইসলামী সমাজে পরিবার গঠনের প্রথম প্রস্তর। একজন পুরুষ ও এক বা একাধিক স্ত্রী যখন বিধিসম্মতভাবে বিবাহিত হয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস ও স্থায়ী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত করে, তখনই একটি পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয় –হয় পারিবারিক জীবন যাপনের শুভ সূচনা।

কুরআন মজীদে এই বিয়ে ও স্ত্রী গ্রহণের ব্যবস্থাকে নবী ও রাসূলগণের প্রতি আল্লাহ তা’আলার এক বিশেষ দান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা ‘আর-রায়াদ’-এ বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি অনেক নবী-রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের জন্যে স্ত্রী ও  সন্তানের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।

সূরা আন নূর এ বয়স্ক ছেলেমেয়ে ও দাস-দাসীদের বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্যে আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী***********************************************)

এবং বিয়ে দাও তোমাদের এমন সব ছেলে-মেয়েদের, যাদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, বিয়ে দাও তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য হয়েছে।

প্রথমোক্ত আয়াতে নবী ও রাসূলগণের জন্যে স্ত্রী গ্রহণ ও সন্তান লাভের সুযোগ করে দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তার মানে, বিয়ে করা ও সন্তান-সন্ততি লাভ করা নবী-রাসূলগণের পক্ষে কোনো অস্বাভাবিক বা অবাঞ্ছনীয় কাজ নয়। কেননা তাঁরাও মানুষ আর মানুষ হওয়ার কারণেই তাঁদের স্ত্রী গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে এবং বিয়ে করলে বা স্ত্রী গ্রহণ করা হলে তাদের সন্তান-সন্ততিও হতে পারে। আবার জাহিলিয়াতের সময়কার লোকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, আল্লাহর নবী বা রাসূল হলে তাঁর আর বিয়ে-শাদী ও সন্তান হওয়া প্রভৃতি ধরনের কোনো বৈষয়িক বা জৈবিক কাজ করা অবাঞ্ছনীয় এবং অন্যায়। এ কারণে হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তারা উপযুক্ত বা সঠিক নবী বলে মানত না। এরই প্রতিবাদ করে আল্লাহ তা’আলা প্রথমোক্ত আয়াতে বলেছেনঃ বিয়ে করা, স্ত্রী গ্রহণ করা, আর সন্তান-সন্ততি হওয়া হযরত মুহাম্মদের বেলায় নতুন কোনো ব্যাপার নয়। তাঁর পূর্বেও বহু নবী ও রাসূল দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের প্রায় সকলেই বিবাহিত ছিলেন, তাঁদের স্ত্রী ছিল আর ছিল সন্তান-সন্ততি –যেমন হযরত মুহাম্মাদের রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিয়ে করা, স্ত্রী গ্রহণ করা ও সন্তান লাভ হওয়ার ব্যবস্থা করা –আল্লাহ তা’আলার এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তাঁর নবী ও রাসূলগণের প্রতি এ নেয়ামত দিয়েছিলেন বিপুলভাবে। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-ও আল্লাহর এ বিশেষ নেয়ামতের দান থেকে বঞ্চিত থেকে যান নি।

নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

চারটি কাজ নবীগণের সুন্নাতের মধ্যে গণ্য; তা হচ্ছেঃ সুগন্ধি ব্যবহার করা, বিয়ে করা, মিসওয়াক করা এবং খাতনা করানো।

উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতটিতে বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্যে ছেলেমেয়ের অভিভাবক মুরুব্বীদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ আয়াতের আরবী তরজমা আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাশেমীর ভাষায় এরূপঃ

(আরবী****************************************************************************)

তোমাদের স্বাধীন ছেলেমেয়েদের মধ্যে যার যার স্বামী বা স্ত্রী নেই, তাদেরকে বিয়ে দাও। আর তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যেও যাদের বিয়ের যোগ্যতা রয়েছে, তাদেরও বিয়ে দাও।

‘যার স্বামী বা স্তী নেই’ মানে যাকে আদৌ বিয়ে দেয়া হয়নি –যারা কুমার বা কুমারী, তাদের সকলেরই বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার মানে, একবারও যাদের বিয়ে হয়নি তাদের জন্য বিয়ের ব্যবস্থা তো করতেই হবে; তেমনি যাদের একবার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু তালাক কিংবা মৃত্যু যে-কোন কারণে এখন জুড়িহারা তাদেরও বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একবার বিয়ে হলে পরে কোনো কারণে স্বামীহারা বা স্ত্রীহারা হলে পুনরায় তার বিয়ের ব্যবস্থা না করা কিংবা বিয়ে করতে রাজি না হওয়া আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী। আমাদের সমাজে এরূপ প্রায়ই দেখা যায় যে, কোনো মেয়ে হয়ত একবার স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছে অথবা স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা হয়ে গিয়েছে, অনুরূপভাবে কোনো ছেলের স্ত্রী মরে গেছে কিংবা তালাক দিতে বাধ্য হয়েছে, এরূপ অবস্থায় তারা পূনর্বিবাহে প্রস্তুত হয় না। সমাজের শালীনতা ও পবিত্রতা এবং মানুষের জৈব প্রবণতা ও ভাবধারার দৃষ্টিতে এরূপ কাজ কল্যাণকর হতে পারে না।

মোটকথা, বিয়ের যোগ্য হয়েও কেউ যাতে অবিবাহিত ও অকৃতদায় হয়ে থাকতে না পারে, তার ব্যবস্থা করাই ইসলামের লক্ষ্য। কেননা অকৃতদার জীবন কখনই পবিত্র ও পরিতৃপ্ত জীবন হতে পারে না। অবশ্য যে লোক বিয়ে করতে সমর্থ নয়, তার কথা স্বতন্ত্র।

একবার কিছু সংখ্যক সাহাবী সারা রাতদিন ধরে ইবাদত করার, সারা রাত জেগে থেকে নামায পড়ার, সারা বছর ধরে রোযা রাখার এবং বিয়ে না করার সংকল্প গ্রহণ করেন। নবী করীম (স) এসব কথা শুনতে পেয়ে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং রাগত স্বরে বলেনঃ

(আরবী**************************************************************)

তোমরাই কি এ  ধরনের কথাবার্তা বলনি? আল্লাহর শপথ, একি সত্যি নয় যে, আমিই তোমাদের তুলনায় আল্লাহকে বেশি ভয় করি, আমিই তোমাদের চেয়ে বেশি আল্লাহর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকি? …..কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি রোযা থাকি, রোযা ভঙ্গও করি, নামায পড়ি, শুয়ে নিদ্রাও যাই এবং রমণীদের পানিও গ্রহণ করি। এই হচ্ছে আমার নীতি-আদর্শ; অতএব যে লোক আমার এই নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়। (বুখারী, মুসলিম)

এ হাদসের ব্যাখ্যায় আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী****************************************************************)

এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে করা নবীর সুন্নাত বিশেষ। মনীষী মহলাব বলেছেনঃ বিয়ে ইসলামের অন্যতম রীতি ও বিধান। আর ইসলামে বৈরাগ্যবাদের কোনো অবকাশ নেই। যে লোক রাসূলের সুন্নাতের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কারণে বিয়ে পরিত্যাগ করবে, সে অবশ্যই ভৎসনার যোগ্য বিদয়াতী। তবে যদি কেউ এজন্যেবিয়ে না করে যে, তাহলে তার নিরিবিলি জীবন ইবাদতে কাটিয়ে দেয়া সহজ হবে, তবে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। ইমাম দায়ূদ জাহেরী এবং তার অনুসারীদের মতে বিয়ে করা ওয়াজিব।

রাসূলের বাণী ‘সে আমার উম্মতের মধ্যেই গণ্য নয়’-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে এই যে, যে লোক রাসূলের আদর্শের অনুসরণ না করবে, সে ইসলামেরসহজ ঋজু ও একনিষ্ঠ পথের পথিক হতে পারে না, বরং রাসূলের আদর্শ অনুসরণ না করবে, সে ইসলামে সহজ ঋজু ও একনিষ্ঠ পথের পথিক হতে পারে না, বরং রাসূলের আদর্শের সত্যিকার অনুসারী হবে সে ব্যক্তিঃ

(আরবী***************************************************)

যে লোক নির্দিষ্টভাবে ইফতার করবে (রোযা ভঙ্গ করবে) রোযা পালনের সামর্থ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, নিদ্রা যাবে রাতে ইবাদতের জন্যে দাঁড়াবার শক্তি লাভের উদ্দেশ্যে এবং বিয়ে করবে দৃষ্টি ও যৌন-অঙ্গকে কলুষমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে।

প্রসঙ্গত বলা যায়, যদি কেউ রাসূলের এ আদর্শের বিরোধিতা করে এই ভেবে যে, রাসূলের আদর্শ অপেক্ষা অন্য আদর্শ উত্তম ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, তাহলে রাসূলের এ বাক্যাংশের অর্থ হবেঃ

(আরবী**********************************************************_

সে আমার মিল্লাত ও জাতির মধ্যে গণ্য নয়।

অন্য কথায় সে পূর্ণ অর্থে মুসলিম নয়। কেননা এরূপ ধারণা পোষণ করা সুস্পষ্ট কুফরী।

হযরত আনাস (রা) বলেনঃ

(আরবী*****************************************************)

নবী করীম (স) আমাদেরকে বিয়ে করতে আদেশ করতেন, আর অবিবাহি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করা থেকে খুব কঠোর ভাষায় নিষেধ করতেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) নবী করীমের নিম্নোক্ত বাণী বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

কুমারিত্ব ও অবিবাহিত নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের কোনো নিয়ম ইসলামে নেই।

নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************************)

যে লোক য়ে করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করে না, সে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল নয়।

‘ইবনে মাজাহ’ কিতাবে হযরত আয়েশা (রা) থেকে রাসূলেরর নিম্নোক্ত বাণী বর্ণিত হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************************)

রাসূলে করীম (স) বলেছেন, বিয়ে করা আমার আদর্শ ও স্থায়ী নীতি, যে লোক আমার এ সুন্নাত অনুযায়ী আমল করবে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।

বস্তুত বিয়ে স্বভাবের দাবি, মানব প্রকৃতির নিহিত প্রবণতার স্বাভাবিক প্রকাশ, মানব সমাজের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত জরুরী। এজন্যে রাসূলে করীম (স) সমাজের যুবক-যুবতীদের সম্বোধন করে বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

 হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণকারী, যৌন অঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোযা রাখে, যেহেতু রোযা হবে তার ঢাল স্বরূপ।

ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব যে কতখানি, তা উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মে ও সমাজে বিয়ের তেমন কোনো গুরুত্ব স্বীকার করা হয়নি। বর্তমানে প্রাচীন কালের মানব সমাজের যে ইতিহাস প্রচলিত রয়েছে –আমার মতে তার প্রায় সম্পূর্ণটাই কল্পিত। তাতে ধারণা দেয়া হয়েছে যে, আদিম সমাজে বিয়ের প্রচলন ছিল না, বিয়ে হচ্ছে পরবর্তীকালের বিকাশমান সভ্যতার অবদান। খ্রিষ্টধর্মে বিয়েকে একভাবে নিষেধই করে দেয়া হয়েছিল। ক্রীনথিওনের নামে লিখিত চিঠিতে উল্লিখিত রয়েছেঃ

আমি অবিবাহিত ও বিধবাদের সম্বন্ধে মনে রি যে, তাদের এরকমই থাকা উচিত। কিন্তু যদি সংযম রক্ষা করতে না পারে, তবেই বিয়ে করবে।

উক্ত চিঠির অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

তোমার স্ত্রী না থাকলে তুমি স্ত্রীর সন্ধান করো না। আর যদি বিয়ে করই তবু তাতে গুনাহ নেই।

মার্টিন লূথার সর্বপ্রথম বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে বিয়ে হচ্ছে সম্পূর্ণ দুনিয়াদারীর কাজ। প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমতের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও একে ধর্ম সম্পর্কহীন একটি কাজ মনে করতেন। বিয়ের স্বপক্ষে তারা কোন স্পষ্ট রায় দেন নি। কিন্তু বিয়ে করা যে মানুষের –স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই –স্বভাবের এক প্রচণ্ড ও অনমনীয় দাবি, তা দুনিয়ার সব বিজ্ঞানীই স্বীকার করেছেন। গ্রীক-বিজ্ঞানী জালিনুস বলেছেনঃ

প্রজনন ক্ষমতার ওপর আগুন ও বায়ুর প্রভাব রয়েছে, তার স্বভাব উষ্ণ ও সিক্ত। এর অধিকাংই যদি অবরুদ্ধ হয় এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত অবরুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে নানা ধরনের মারাত্মক রোগ জান্মিতে পারে। কখনো মনে ভীতি ও সন্ত্রাসের ভাব সৃষ্টি হয়, কখনো হয় পাগলামীর রোগ। আবার মৃগী রোগও হতে পারে। তবে প্রজনন ক্ষমতার সুস্থ বহিষ্কৃতি ভালো স্বাস্থ্যের কারণ নয়। বহু প্রকারের রোগ থেকেও সে সুরক্ষিত থাকতে পারে।

প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আল্লামা নফীসী বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************************)

শুক্র প্রবল হয়ে পড়লে অনেক সময় তা অত্যন্ত বিষাক্ত প্রকৃতি ধারণ করে বসে। দিল ও মগজের দিকে তা এক প্রকার অত্যন্ত খারাপ বিষাক্ত বাষ্প উত্থিত করে দেয়, যার ফলে বেহুঁশ হয়ে পড়া বা মৃগী রোগ প্রভৃতি ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি হয়।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দিহলভী বিয়ে না করার অনিষ্টাকারিতা সম্পর্কে লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

জেনে রাখো, শুক্রের প্রজনন ক্ষমতা যখন দেহে খুব বেশী হয়ে যায়, তখন তা বের হতে না পারলে মগজে তার বাষ্প উত্থিত হয়।

কিন্তু বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা বিয়ের গুরুত্বকে নষ্ট করে দিয়েছে। পারিবারিক জীবনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। পাশ্চাত্য মনীষীদের বিচারে ইউরোপীয় সমাজে বিয়ে ও পারিবারিক জীবনের ব্যর্থতার কতগুলো কারণ রয়েছে। কারণগুলোকে নিম্নোক্তভাবে আট-নয়টি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারেঃ

১. বিয়ে এবং পারিবারিক জীবন সম্পর্কে খ্রিষ্টধর্মের অননুকূল দৃষ্টিভঙ্গি;

২. আধুনিক সভ্যতার চোখ জলসানো চাকচিক্য ও ব্যাপক কৃত্রিমতা;

৩. শিল্প বিপ্লবোত্তর নারী স্বাধীনতার আন্দোলন;

৪. নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে ভুল ধারণা;

৫. নারী-পুরুষের সাম্য ও সমানাধিকারের অবৈজ্ঞানিক দাবি;

৬. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ববোধ না থাকা;

৭. পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ভাবধারা এবং নৈতিকতা ও মানবিকতা ও মানবিকতার পতন;

৮. পারিবারিক জীবনে সুষ্ঠুতা, সুস্থতা ও সফলতা লাভের জন্যে অপরিহার্য নিয়ম বিধানের অভাব; এবং

৯. সাধারণভাবে জনগণের ধর্মবিমুখতা, ধর্মহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতা।

পরিবার ও পারিবারিক জীবনে আধুনিক ইউরোপে যে ব্যর্থতা এসেছে, তার অন্তর্নিহিত কারণসমূহ ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের আলোচনার দৃষ্টিতেই এখানে উল্লেখ করা হলো। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের বিধান এই গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে। তার ফলে উভয় সমাজ ব্যবস্থা ও আদর্শের মৌলিক পার্থক্য যেমন সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, তেমনি বিশ্বমানবতার পক্ষে কোন ব্যবস্থাটি  কল্যাণময় –মানবোপযোগী, তাও প্রতিভাত হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে ও পরিবার সম্পূর্ণরূপে একটি দেওয়ানী চুক্তির ফল। নারীর নিজেকে বিয়ের জন্যে উপস্থিত করা এবং পুরুষের তা গ্রহণ করা –এই ‘ঈজাব’ ও ‘কবুল’ দ্বারাই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এরই ফলে স্বামী ও স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি পরস্পরের কতগুলো অধিকার নির্দিষ্ট হয়। দু’হাজার বছরের ধারাবাহিক ও ক্রমাগত চেষ্টা সাধনা সত্ত্বেও ইউরোপীয় সমাজ বিয়ে ও পরিবারকে অতখানি স্থান ও মর্যাদা দিতে পারেনি, যতখানি চৌদ্দশ বছর আগে ইসলাম দিয়েছে।

বিয়ের উদ্দেশ্য

বিয়ে এবং বিবাহিত জীবন যাপনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। দুনিয়ার কোনো কাজই সুস্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সম্পাদিত হয় নি। কুরআন মজীদে বিয়ের উদ্দেশ্যের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে। কুরআনের এতদসম্পর্কিত আয়াতসমূহকে সামনে রেখে চিন্তা করলে পরিস্কার মনে হয়, কুরআনের দৃষ্টিতে বিয়ের উদ্দেশ্য নানাবিধ। এর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাশী নৈতিক চরিত্র, পবিত্র পরিচ্ছন্ন ও কলুষমুক্ত রাখতে পারা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে মনের গভীর প্রশান্তি ও স্থিতি লাভ এবং তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে পারিবারিক জীবন যাপন করে সন্তান জন্মদান, সন্তান লালন-পালন ও ভবিষ্যত সমাজের মানুষ গড়ে তোলা। নিম্নোক্ত কুরআন ভিত্তিক আলোচনা থেকে এসব উদ্দেশ্যের কথা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

সূরা আন-নিসা’র এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************************)

এই মুহাররম মেয়েলোক ছাড়া অন্য সব মেয়েলোক বিয়ে করা তোমাদের জন্যে জায়েয –হালাল করে দেয়া হয়েছে এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তোমাদের ধন-মালের বিনিময়ে তাদের লাভ করতে চাইবে নিজেদের চরিত্র দুর্জয় দুর্গের মতো সুরক্ষিত রেখে এবং বন্ধনহীন অবাধ যৌন চর্চা করা থেকে বিরত থেকে।

এ আয়াত থেকে প্রথম জানা গেল যে, নির্দিষ্ট কতকজন মেয়েলোক বিয়ে করা ও তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম। সেই হারাম বা মুহাররম মেয়েলোক কয়জন ছাড়া আর সব মেয়েলোকই বিয়ে করা পুরুষের জন্যে হালাল। দ্বিতীয়ত এসব হালাল মেয়েলোক তোমরা গ্রহণ করবে ‘মোহরানা’ স্বরূপ দেয়া অর্থের বিনিময়ে বিয়ে করে। তৃতীয়ত মোহরানা ভিত্তিক বিয়ে ছাড়া অন্য কোনোভাবে এই হালাল মেয়েদের সাথেও যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারা যায় না এবং পঞ্চমত এভাবে বিয়ে করে নৈতিক চরিত্রের এক দুর্জয় দুর্গ –পরিবার-রচনা করা যায় এবং অবাধ যৌন চর্চার মতো চরিত্রহীনতার কাজ থেকে নিজকে বাঁচানো যায়। আর বিয়ের উদ্দেশ্যও এই যে, তার সাহায্যে স্বামী-স্ত্রীর নৈতিক চরিত্রের দুর্গকে দুর্জয় করতে হবে এবং অবাধ যৌন চর্চা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে।

সূরা আন-নিসা’র অপর এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

তোমরা মেয়েদের অভিভাবক মুরুব্বীদের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে করো, অবশ্য অবশ্যই তাদের দেন-মোহর দাও, যেন তারা তোমাদের বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে এবং অবাধ যৌন চর্চায় লিপ্ত হয়ে না পড়ে। আর গোপন বন্ধুত্বের যৌন উচ্ছৃংখলতায় নিপতিত না হয়।

এ আয়াত যদিও ক্রীতদাসদাসীদেরকে বিয়ে দেয়া সম্পর্কে, কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে এ আয়াত থেকে বিয়ের উদ্দেশ্য জানা যায়। আর তা হচ্ছে, বিয়ে করে পরিবার-দুর্গ রচনা করা, জ্বেনা-ব্যভিচার বন্ধ করা, গোপন বন্ধুত্ব করে যৌন স্বাদ আস্বাদন করার সমস্ত পথ বন্ধ করা। আর এসব কেবল বিয়ে করে পারিবারিক জীবন যাপনের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। পূর্বোক্ত আয়াতে পুরুষদের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে আর এ আয়াতে সাধারণভাবে সকল শ্রেণীর মেয়েদের নৈতিক চরিত্র রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে এবং দুটো আয়াতেই পরিবারের দুর্জয় দুর্গ রচনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************************)

বিয়েকে দুর্গ বলা হয়েছে, কেননা তা স্বামী-স্ত্রীকে সকল প্রকার লজ্জাজনক কুশ্রী কাজ থেকে দুর্গবাসীদের মতোই বাঁচিয়ে রাখে।

নারী-পুরুষ কেবলমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই পরস্পর মিলিত হবে। তাহলেই উভয়ের চরিত্র ও সতীত্ব পূর্ণ মাত্রায় রক্ষা পাবে। এ দুটো আয়াতেই বিয়েকে (আরবী******) ‘দুর্গ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দুর্গ যেমন মানুষের আশ্রয়স্থল, শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, বিয়ের ফলে রচিত পরিবারও তেমনি স্বামী-স্ত্রীর নৈতিক চরিত্রের পক্ষে একমাত্র রক্ষাকবচ। মানুষ বিবাহিত হলেই তার চরিত্র ও সতীত্ব রক্ষা পেতে পারে –অবশ্য যদি সে পরিবার সুরক্ষিত দুর্গের মতোই দুর্ভেদ্য ও রুদ্ধদ্বার হয়। মোটকথা, নৈতিক চরিত্র সংরক্ষণ ও পবিত্রতা –সতীত্বের হেফাযত হচ্ছে বিয়ের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য।

নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

যে লোক কিয়ামতের দিন পাক-পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন চরিত্র নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবার বাসনা রাখে, তার কর্তব্য হচ্ছে (স্বাধীন মহিলা) বিয়ে করা।

অর্থাৎ বিয়ে হচ্ছে চরিত্রকে পবিত্র রাখার একমাত্র উপায়। বিয়ে না করলে চরিত্র নষ্ট হওয়ার আশংকা প্রবল হয়ে থাকে। মানুষ আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমা লংঘন করে পাপের পংকিল আবর্তে পড়ে যেতে পারে যেকোনো দুর্বল মুহুর্তে।

বাস্তবিকই যে লোক তার নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখতে ইচ্ছুক, বিয়ে করা ছাড়া তার কোনোই উপায় নেই। কেননা এই উদ্দেশ্যে বিয়ে করলে সে এ ব্যাপারে আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্য লাভ করতে পারবে। নিম্নোক্ত হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত হয়। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

তিন ব্যক্তির সাহায্য করা আল্লাহর কর্তব্য হয়ে পড়ে। তারা হলোঃ

১. যে দাস নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায় (আজকাল বলা যায়, কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি তার ঋণ আদায় করতে দৃঢ়সংকল্প);

২. যেলোক বিয়ে করে নিজের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করতে চায়; আর

৩. যে লোক আল্লাহর পথে জিহাদে আত্মসমর্পিত।

বস্তুত নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করা কিছুমাত্র সহজসাধ্য কাজ নয়। বরং এ হচ্ছে অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসাধ্য ব্যাপার। কেননা এজন্যে  প্রকৃতি নিহিত দুষ্প্রবৃত্তিকে –যৌন লালসা শক্তিকে –দমন করতে হবে। আর এ যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সে লোক পাশবিকতার নিম্নতম পঙ্কে নেমে যাবে। কাজেই যদি কেউ এ থেকে বাঁচতে চায়, আর এ বাঁচার উদ্দেশ্যেই যদি বিয়ে করে –স্ত্রী গ্রহণ করে, তবে আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা সে অবশ্যই লাভ করবে। আর আল্লাহর এই সাহায্যেই সে লোক বিয়ের মাধ্যমে স্বীয় নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করতে সফলকাম হবে।

কেবলমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই যে সতীত্ব ও নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করা যেতে পারে, কুরআন মজীদে তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ, আর তোমরা হচ্ছ তাদের জন্যে পোশাকবৎ।

অর্থাৎ পোশাক যেম করে মানবদেহকে আবৃত করে দেয়, তার নগ্নতা ও কুশ্রীতা প্রকাশ হতে দেয় না এবং সব রকমের ক্ষতি-অপকারিতা থেকে বাঁচায়, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্যে ঠিক তেমনি। কুরআন মজীদেই পোশাকের প্রকৃতি বলে দেয়া হয়েছে এ ভাষায়ঃ

(আরবী********************************************************)

নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের জন্যে পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখে।

পূর্বোক্ত আয়াতে স্বামীকে স্ত্রীর জন্যে পোশাক বলা হয়েছে। কেননা তারা দুজনই দুজনের সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ঢাকবার ও যৌন-উত্তেজনার পরিতৃপ্তি সাধনের বাহন। ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

পোশাক বলতে স্ত্রীর পক্ষে স্বামীকে (আর স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে) মনে করা হয়েছে। কেননা এ স্বামী ও স্ত্রী একদিকে নিজে নিজের জন্যে পোশাকবৎ আবার প্রত্যেকে অপরের জন্যেও তাই। এরা কেউই কারো দোষ জাহির হতে দেয় না –যেমন করে পোশাক লজ্জাস্থানকে প্রকাশ হতে দেয় না।

বিয়ের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে নারী-পুরুষের হৃদয়াভ্যন্তরস্থ স্বাভাবিক প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসারদাবি পূরণ এবং যৌন উত্তেজনার পরিতৃপ্তি ও স্তিতি বিধান। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************************)

এবং আল্লাহর একটি বড় নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদেরই মধ্য থেকে জুড়ি গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যেন তোমরা সে জুড়ির কাছ থেকে পরম পরিতৃপ্তি লাভ করতে পার। আর তোমাদের মধ্যে তিনি প্রেম-ভালোবাসা ও দরদ-মায়া ও প্রীতি-প্রণয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

‘তোমাদেরই মধ্য থেকে’ অর্থঃ

(আরবী**********************************************)

তোমাদেরই স্বজাতির মধ্য থেকে; অপর জাতির লোককে নয়।

অর্থাৎ মানব-মানবীরজুড়ি মানব-মানবীকে বানাবার নিয়ম করে দেয়া হয়েছে। নিম্নস্তরের বা উচ্চস্তরের অপর কোনো জাতির মধ্য থেকে জুড়ি গ্রহণের নিয়ম করা হয়নি।

এ আয়াতে জুড়ি গ্রহণের বা বিয়ে করার উদ্দেশ্যস্বরূপ বলা হয়েছেঃ যেন তোমরা সে জুড়ির কাছ থেকে পরম পরিতৃপ্তি ও গভীর শান্তি-স্বস্তি লাভ করতে পার। তার মানে, স্বামী-স্ত্রীর মনের গভীল পরিতৃপ্তি –শান্তি স্বস্তি লাভ হচ্ছে বিয়ের উদ্দেশ্য। আর এ বিয়ের মাধ্যমেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব-ভালোবাসা জন্ম নিতে পেরেছে। আয়াতের শেষাংশের ব্যাখ্যা করে ইমাম আলূসী লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

অর্থাৎ তোমাদের জন্যে আল্লাহ তা’আলা শরীয়তের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা –বিয়ের মাধ্যমে তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব-প্রেম-প্রণয় এবং মায়া-মমতা দরদ-সহানুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন, অথচ পূর্বে তোমাদের মাঝে না ছিল তেমন কোন পরিচয়, না নিকটাত্মীয় বা রক্ত-সম্পর্কের কারণে মনের কোনোরূপ সুদৃঢ় সম্পর্ক।

হযরত হাওয়া ও হযরত আদমের প্রথম সাক্ষাত হয়, তখন হযরত আদম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবী*****) ‘তুমি কে?’ তিনি বললেনঃ

(আরবী**********************************************************)

আমি হাওয়া, আমাকে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি করেছেন এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি আমার নিকট পরিতৃপ্তি ও শান্তি লাভ করবে। আর আমি পরিতৃপ্তি ও শান্তি লাভ করব তোমার কাছ থেকে।

অতএব এ থেকে আল্লাহর বিরাট সৃষ্টি ক্ষমতা ও অপরিসীম দয়া-অনুগ্রহের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা আল আ’রাফ-এর নিম্নোক্ত আয়াতেও এ কথাই বলা হয়েছে গোটা মানব জাতি সম্পর্কেঃ

(আরবী*******************************************************************)

সেই আল্লাহই তোমাদেকে সৃষ্টি করেছেন একটিমাত্র মানবাত্মা থেকে এবং তার থেকেই বানিয়েছেন তার জুড়ি, যেন সে তার কাছে পরম সান্ত্বনা ও তৃপ্তি লাভ করতে পারে।

এখানে পরম শান্তি ও তৃপ্তি বলতে মনের শান্তি ও যৌন উত্তেজনার পরিতৃপ্তি ও চরিতার্থতা বোঝানো হয়েছে। বস্তুত মনের মিল, জুড়ির প্রতি মনের দুর্নিবার আকর্ষণ এবং যৌন তৃপ্তি হচ্ছে সমগ্র জীবন ও মনের প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি লাভের মূল কারণ। তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মানে চরম অতৃপ্তি ও অশান্তির ভিতরে জীবন কাটিয়ে দেয়া। মনের প্রশান্তি ও যৌন তৃপ্তি যে বাস্তবিকই আল্লাহর এক বিশেষ দান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্যে ঈমানদার স্ত্রী-পুরুষের কর্তব্য হচ্ছে এ প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তিকে আল্লাহর সন্তোষ এবং তাঁরই দেয়া বিধান অনুসারে লাভ করতে চেষ্টা করা। এ আয়াতেও আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির সৃষ্টি ও প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এই দুনিয়ায় মানুষের সৃষ্টি ও অস্তিত্ব যেমন এক স্বাভাবিক ব্যাপার, জুড়ি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও তেমনি এক প্রকৃতিগত সত্য, এ সত্যকে কেউই অস্বীকার করতে পারে না। এজন্যে প্রথম মানুষ সৃষ্টি করার পরই তার থেকে তার জুড়ি বানিয়েছেন। এ জুড়ি যদি বানানো না হতো, তাহলে প্রথম মানুষের জীবন অতৃপ্তি আর একাকীত্বের অশান্তিতে দুঃসহ হয়ে উঠত। আদিম মানুষের জীবনে জুড়ি গ্রহনের এ আবশ্যকতা আজও ফুরিয়ে যায় নি। প্রথম মানুষ যুগলের ন্যায় আজিকার মানব-দম্পতিও স্বাভাবিকভাবে পরস্পরের মুখাপেক্ষী। আজিকার স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের কাছ থেকে লাভ করে মনের প্রশান্তি ও যৌন তৃপ্তি, পায় কর্মের প্রেরণা। একজনের মনের অস্থিরতা ও উদ্বেগ ভারাক্রান্ততা অপরজনের নির্মল প্রেম-ভালবাসার বন্যাস্রোতে নিঃশেষ ধুয়ে মুছে যায়। একজনের নিজস্ব বিপদ-দুঃখও অন্যজনের নিকট নিজেরই দুঃখ ও বিপদরূপে গণ্য ও গৃহীত হয়। একজনের যৌন লালসা-কামনা উত্তেজনা অপরজনের সাহায্যে পায় পরম তৃপ্তি, চরিতার্থতা ও স্থিতি।

এসব কথা থেকে প্রমাণিত হলো যে, মানুষের –সে স্ত্রী হোক কি পুরুষ –যৌন উত্তেজনা পরিতৃপ্তি লাভ এবং তার উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতিবিধানের একমাত্র উপায় হচ্ছে জুড়ি গ্রহণ বা বিয়ে ও বিবাহিত জীবন। যৌন উত্তেজনা মানুষকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট করে। এই সময় পুরুষ নারীর দিকে এবং নারী পুরুসের দিকে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকে পড়ে। তখন একজন অপরজনের নিকট স্বীয় স্বাভাবিক শক্তি ও বৈশিষ্ট্যের দরুন মনোবাঞ্ছা পূরনের নিয়ামত হয়ে থাকে। এজন্যে রাসূলে করীম (স) নির্দেশ দিয়েছেন যে, এরূপ অবস্থায় পুরুষ যেন স্বীয় (বিবাহিতা) স্ত্রীর কাছে চলে যায়।

তিনি বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

কোনো নারী যখন তোমাদের কারো মনে লালসা জাগিয়ে দেয়, তখন সে যেন তার নিজের স্ত্রীর কাছে চলে যায় এবং তার সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় উত্তেজনার উপশম করে নেয়। এর ফলে সে তার মনের আবেগের সান্ত্বনা লাভ করতে পারবে এবং মনের সব অস্থিরতা ও উদ্বেগ মিলিয়ে যাবে।

ইমাম নববী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************************)

যে লোক কোনো মেয়েলোক দেখবে এবং তার ফলে তার যৌন প্রবৃত্তি উত্তেজিত হয়ে উঠবে, সে যেন তার স্ত্রীর কাছে আসে এবং তার সঙ্গে মিলিত হয়। এর ফলে তার যৌন উত্তেজনা সান্ত্বনা পাবে, মনে পরম প্রশান্তি লাভ হবে, মন-অন্তর তার বাঞ্ছা ও কামনা লাভ করে এককেন্দ্রীভূত হতে পারবে।

বিয়ে এবং বিবাহিত জীবনের তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্তান লাভ।

কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

এখন সময় উপস্থিত, স্ত্রীদের সাথে তোমরা এখন সহবাস করতে পার –তাই তোমরা করো এবং আল্লাহ তোমাদের জন্যে যা কিছু নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তাই তোমরা সন্ধান করো, তাই লাভ করতে চাও।

এখানে যে (আরবী*****) ‘মুবাশিরাত’-এর অনুমতি দেয়া হয়েছে, তার মানে হচ্ছে (আরবী************************) একজনের শরীরের চামড়ার সাথে অপরজনের দেহের চামড়াকে লাগিয়ে দেয়া, মিশিয়ে দেয়া। আর এর লক্ষ্যগত অর্থ হচ্ছেঃ (আরবী***************) স্ত্রী সহবাস –সঙ্গম, যার জন্যে স্বামীর দেহের চামড়াকে স্ত্রীর দেহের চামড়ার সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে দিতে হয়’। আর ‘আল্লাহ যা তোমাদের জন্যে নির্ধারণ করেছেন’ বলে দুটি কথা বরতে চাওয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে রমযান মাসের রাত্রি বেলায় স্ত্রী-সহবাসের অনুমতি দান। কেননা এ আয়াত সেই প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়েছে। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে সন্তান লাভ। কেননা স্ত্রী-সহবাবের মূল লক্ষ্য হলো সন্তান তোমার জন্যে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে, স্ত্রী-সহবাসের মূলে নিছক যৌন উত্তেজনার পরিতৃপ্তি আর লালসার চরিতার্থ তাই কখনো স্ত্রী সহবাসের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। এজন্যে যে ধরনের যৌন-উত্তেজনা পরিতৃপ্তির ফলে সন্তান লাভ হয় না যেমন পুংমৈথুন বা হস্তমৈথুন –তাকে শরীয়তে হারাম করে দেয়া হয়েছে। আর যে ধরনের স্ত্রী-সহবাসের ফলে সন্তান লাভ সম্ভব হয় না কিংবা সন্তান হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে কিংবা স্ত্রী-সহবাস হওয়া সত্ত্বেও সন্না হতে পারে না, শরীয়তে তাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এজন্যেই সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***************************************************************)

তোমাদের স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের ক্ষেতস্বরূপ, অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেতে গমন করো –যেভাবে তোমরা চাও –পছন্দ করো।

এ আয়াতে স্ত্রীদেরকে কৃষির ক্ষেত বলা হয়েছে। অতএব স্বামীরা হচ্ছে এ ক্ষেতের চাষী। চাষী যেমন কৃষিক্ষেতে শ্রম করে ও বীজ বপন করে ফসলের আশায়, তেমনি স্বামীদেরও কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রী-সহবাস করে এমনভাবে বীজ বপন করা, যাতে সন্তানের ফসল ফলতে পারে –সন্তান লাভ সম্ভব হতে পারে।

কুরআনের এ দৃষ্টান্তমূলক কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রণিধানযোগ্য। চাষী বিনা উদ্দেশ্যে কখনো কষ্ট স্বীকার করে ও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জমি চাষ করে না, কেবলমাত্র মনের খোশ খেয়ালের বশবর্তী হয়ে কেউ এ কাজে উদ্যোগী হয় না। এ কাজ করে একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে আর তা হচ্ছে ফসল লাভ। কুরআনের ভাষায় স্বামীরাও এমনি উদ্দেশ্যপূর্ণ চাষী –সন্তান ফসলের চাষাবাদকারী। স্ত্রীদের যৌন অঙ্গ হচ্ছে তার কাছে চাসের জমিস্বরূপ আর স্ত্রীর যৌন অঙ্গে শুক্র প্রবেশ করানো হচ্ছে চাষীর জমিতে শস্য বীজ বপন করার মতো। চাষী যেমন এই সমস্ত কাজ ফসলের আমায় করে, স্বামীদেরও উচিত সন্তান লাভের আশায় স্ত্রী-সঙ্গম করা। কেবল যৌন স্পৃহা পরিতৃপ্তির উদ্দেশ্যে এ কাজ হওয়া উচিত নয়। বরং এই সন্তান-ফসল লাভের উদ্দেশ্যেই বিয়ে করতে হবে। স্ত্রী গ্রহণ ও তার সাথে সঙ্গম করতে হবে। অতএব বিয়র একটি চরমতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্তান লাভ। এ কথাই আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে আয়াতের পরবর্তী অংশেঃ

(আরবী*****************************************)

এবং তোমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্যে কাজ করো।

অর্থাৎ এ স্ত্রী-সহবাস দ্বারা সন্তান লাভ করার আশা মনে মনে পোষণ করতে থাকো।

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, স্ত্রীলোক কেবলমাত্র যৌন লালসা পরিতৃপ্তির মাধ্যম বা উপায় নয়, স্ত্রী গ্রহণ ও তার সাথে মিলে পারিবারিক জীবন যাপনের এক মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। আর সে উদ্দেশ্যর মধ্যে সন্তান লাভ –ভবিষ্যৎ মানব বংশকে রক্ষা করা –হচ্ছে অন্যতম। মানব সমাজের কুরআন ভিত্তিক ইতিহাস থেকেই জানা যায়, স্ত্রীলোক গ্রহণ করে বিবাহিত ও পারিবারিক জীবন যাপন করার ফলেই দুনিয়ায় মানব জাতির এই বিপুল বিস্তার সম্ভব হয়েছে। এ কারণেই স্বাভাবিকভাবে রমনীর মনে সন্তান লাভের দুর্বার আকাঙ্খা বিদ্যমান থাকে। এমন কি আজকাল বন্ধ্যা নারীরাও টেষ্ট টিউবের সাহায্যে সন্তান লাভের চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকার খবরে প্রকাশ, ব্রিস্টলের লেসলী ব্রাউন নামের জনৈক বন্ধ্যা রমণী টেষ্ট টিউবের সাহায্যে দুই বার গর্ভবতী হয়ে দুটি সন্তানের জননী হয়েছে। আর মানব বংশের এই ধারা বৃদ্ধির স্থায়িত্বের জন্যেই বিয়ে করাকে অপরিহার্য কাজ বলে ঘোষিত হয়েছে। বিয়ে ব্যতীত নারী পুরুষের যৌন মিলন নিষিদ্ধ –হারাম করে দেয়া হয়েছে। কেননা তা মানুসের নৈতিক চরিত্রের পক্ষে যেমন মারাত্মক, তেমনি  তার ফলে মান বংশের পবিত্রতা রক্ষা ও সুষ্ঠুভাবে ভবিষ্যত সমাজ গঠন বিঘ্নিত হয়ে পড়ে। ইউরোপে মেয়েদের ‘বয় ফ্রেণ্ড’ ‘ছেলে বন্ধু’ ও ছেলের ‘গার্ল ফ্রেণ্ড’ ‘মেয়ে বান্ধবী’ গ্রহনের এবং রক্ষিতা রাখার অবাধ সুযোগ দিয়ে যেমন সুস্পষ্ট ব্যভিচারের পথ খুলে দেয়া হয়েছে, তেমনি তা ভবিষ্যত বংশের পবিত্রতাকেও বিনষ্ট করে ফেলেছে। এর ফলে সাময়িকভাবে যৌন পরিতৃপ্তি লাভ হতে পারে বটে, কিন্তু একজন নারীর পক্ষে একজন পুরুষের স্থায়ী জীবন সঙ্গীনি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ সম্ভব হয় না, বংশের ধারাও সুষ্ঠুভাবে রক্ষা পেতে পারে না। এর ফলে তাই ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব এত বেশি। ইসলামের বিয়ে হচ্ছে নারী-পুরুসের এক স্থায়ী বন্ধন। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী পুরুষের মিলন এমন কোনো ক্রীড়া নয়, যা দু’দিন খেলা হলো, তারপর যে যার পথে চম্পট দিয়ে চলে গেল। এ জন্যে কুরআনে বিবাহিতা স্ত্রীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************)

এবং বিবাহিতা স্ত্রীলোকেরা তাদের স্বামীদের নিকট থেকে শক্ত ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে।

ইসলামে বিয়ে এমনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব অনুষ্ঠান। এ প্রতিশ্রুতি সহজে ভঙ্গ করা যেতে পারে না।

 বিয়ের তাগিদ

ওপরের আলোচনা থেকে একদিকে যেমন বিয়ের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, অপর দিকে ঠিক তেমনি বিয়ের আবশ্যকতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিকোণ উজ্জ্বল ও  প্রতিভাত হয়েছে। বস্তুত বিয়ে করা ইসলামে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বিয়ের তাগিদও করা হয়েছে কুরআন ও হাদীসে।

বিয়ের তাগিদ সম্পর্কে কুরআন মজীদে নিম্নোক্ত আয়াত আমরা আবার পড়তে পারি। তাতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************************)

এবং বিয়ে দাও তোমাদের মধ্যের জুড়িহীন (স্বামী বা স্ত্রীহীন) ছেলে-মেয়েদের আর তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য তাদের।

আয়াতে উদ্ধৃত (আরবী*******) শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী**************************************************************)

‘আয়ামা’ বলতে বোঝায় এসব মেয়েলোক, যাদের স্বামী নেই এবং সেসব পুরুষকে যাদের স্ত্রী নেই, একবার বিয়ে হওয়ার পর বিচ্ছেদ হওয়ার কারণে এরূপ হোক কিংবা আদৌ বিয়েই না হওয়ার ফলে।

সংশ্লিষ্ট আয়াতাংশের অর্থ করা হয়েছে এ ভাষায়ঃ

(আরবী*****************************************************)

হে মু’মিন লোকেরা! তোমাদের পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের মধ্যে যাদের স্বামী নেই, তাদের বিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য তাদেরও।

ইমাম ইবনে কাসীর এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

এ আয়াতে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়ার আদেশ করা হয়েছে। ইসলামের মনীষীদের মতে প্রত্যেক সামর্থ্যবান ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব।

এ শ্রেণীর মনীষীরা উপরিউক্ত আয়াতের পরে নিম্নোদ্ধৃত হাদীসটিও একটি দলীল হিসেবে উল্লেখ করেন। হাদীসটি পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে। রাসূলে করীম (স) যুবক বয়সের লোকদের সম্বোধন করে এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

হে যুবক-যুবতীগণ! তোমাদের মধ্যে  যারাই বিয়ের সামর্থ্যবান হবে, তাদেরই বিয়ে করা উচিত। কেননা বিয়ে তাদের চোখ বিনত রাখবে, তাদের যৌন অঙ্গ পবিত্র ও সুরক্ষিত রাখবে। আর যাদের সে সামর্থ্য নেই, তাদের রোযা রাখা কর্তব্য। তাহলে এই রোযা তাদের যৌন উত্তেজনা দমন করবে।

হাদীসে ‘যুবক-যুবতী’ কাদের বোঝানো হয়েছে, তার জবাবে ইমাম নববী লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************************************)

আমাদের লোকদের মতে যুবক-যুবতী বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, যারা বালেগ –পূর্ণ বয়স্ক হয়েছে এবং ত্রিশ বছর বয়স পার হয়ে যায় নি –তাদের।

আর এই যুবক-যুবতীদের বিয়ের জন্যে রাসূলে করীম (স) তাগিদ করলেন কেন, তার কারণ সম্পর্কে বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

হাদীসে কেবলমাত্র যুবক-যুবতীদের বিয়ে করতে বলার কারণ এই যে, বুড়োদের অপেক্ষা এই বয়সের লোকদের মধ্যেই বিয়ে করার প্রবণতা ও দাবি অনেক বেশি বর্তমান দেখা যায়।

আর

(আরবী************************************************)

যুবক-যুবতীর বিয়ে যৌন সম্ভোগের পক্ষে খুবই স্বাদপূর্ণ হয়, মুখের গন্ধ খুবই মিষ্টিহয়, দাম্পত্য জীবন যাপন সুখকর হয়, পারস্পরিক কথাবার্তা খুব আনন্দদায়ক হয়, দেখতে খুবই সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়, স্পর্শ খুব আরামদায়ক হয় এবং স্বামী বা স্ত্রী তার জুড়ির চরিত্রে এমন কতগুলো গুণ সৃষ্টি করতে পারে, যা খুবই পছন্দনীয় হয় আর এ বয়সের দাম্পত্য ব্যাপারে প্রায়শই গোপন রাখা ভালো রাগে।

যুবক বয়স যেহেতু যৌন সম্ভোগের জন্যে মানুষকে উন্মুখ করে দেয়, এ কারণে তার দৃষ্টি যে কোন মেয়ের দিকে আকৃষ্ট হতে পারে এবং সে যৌন উচ্ছৃঙ্খলতায় পড়ে যেতে পারে। এজন্যে রাসূলে করীম (স) এ বয়সের ছেলেমেয়েকে বিয়ে করতে তাগিদ করেছেন এবং বলেছেনঃ বিয়ে করলে আর চোখ যৌন সুখের সন্ধানে যত্রতত্র ঘুড়ে বেড়াবে না এবং বাহ্যত তার কোন ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকবে না। এ কারণে রাসূলে করীম (স) যদিও কথা শুরু করেছেন যুবক মাত্রকেই সম্বোধন করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ের এ তাগিদকে নির্দিষ্ট করেছেন কেবল এমন সব যুবক-যুবতীদের জন্যে, যাদের বিয়ের সামর্থ্য রয়েছে। বিয়ের সামর্থ্য মানে রাতিক্রিয়া, যৌন, সম্ভোগ স্ত্রী সঙ্গম। আর যারা যুবক বয়সেও নানা কারণে তার সামর্থ্য রাখে না, যারা রাতিক্রিয়া ও স্ত্রী সঙ্গমেও অক্ষম, তাদেরকে রাসূল (স) বলেছেন রোযা রাখতে। যেনঃ

(আরবী**********************************************)

তার যৌন উত্তেজনা দমিত হয়, দমিত হয় তার বীর্যশক্তির দাপট।

(আরবী**************************************************)

রোযা রাখলে পানাহার কম হয়। আর পানাহারের মাত্রা কম হলে যৌন প্রবৃত্তি দমিত হয়।

উপরিউক্ত হাদীসে যদিও বাহ্যত কোনো যৌন সঙ্গম কার্যে অক্ষম লোকদেরকে রোযা রাখতে বলা হয়েছে; কিন্তু আসল কথা কেবল তাদের সম্পর্কেই নয়; বরং তাদের সম্পর্কেও যারা বিয়ের ব্যায় বহনের সঙ্গতি রাখে না, এ শ্রেণীর লোককেও রোযা রাখতে বলা হয়েছে। এ কথার সমর্থনে অপর দুটো বর্ণনায় উল্লেখ করা যায়।

একটি ইসমাঈলীয় বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************)

তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করতে সমর্থ, তাদের বিয়ে করা উচিত।

আর অপরটিতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

যে-ই বিয়ের ব্যয়ভার বহনে সামর্থ্যবান, সে যেন অবশ্যই বিয়ে করে।

ফল কথা, বিয়ে করার ব্যয়ভার বহন এবং যৌন সঙ্গম কার্যে সক্ষম যুবক-যুবতীর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই বিয়ে করা উচিত।

এই প্রসঙ্গে মনীষীগণ নিম্নোক্ত হাদীসটিকেও উল্লেখ করে থাকেন। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

তোমরা সব অধিক সন্তানবতী মেয়েলোকদের বিয়ে করো এবং বংশ বাড়াও; কেননা কিয়ামতের নি আমি তোমাদের সংখ্যা বিপুলতা নিয়ে অপর নবীর উম্মত সংখ্যার মুবাকিলায় গৌরব করব।

 

বিয়েতে কুফু প্রশ্ন

বিয়েতে কুফু’র কোনো গুরুত্ব আছে কি? এ সম্পর্কে ইসলামের জবাব সুস্পষ্ট ও যুক্তিভিত্তিক।

‘কুফু’ মানে (আরবী**************) ‘সমতা ও সাদৃশ্য’। অন্য কথায়, বর ও কনের ‘সমান-সমান হওয়া’, একের সাথে অপরজনের সামঞ্জস্য হওয়া। বিয়ের উদ্দেশ্যে যখন স্বামী-স্ত্রীর মনের প্রশান্তি লাভ, উভয়ের মিলমিশ লাভের পথে বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টির সামান্যতম কারণও না ঘটতে পারে, তার ব্যবস্থা করা একান্তই কর্তব্য।

কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************)

সেই সমান আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘পানি’ থেকে, তার পরে তাকে পরিণত করেছেন বংশ ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্কে। আর তোমার আল্লাহ বড়ই শক্তিমান।

ইমাম বুখারী ‘বুখারী শরীফ’-এ এ আয়াতটিকে ‘কুফু’ অধ্যায়ের সূচনায় উল্লেখ করেছেন। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তার কারণ উল্লেখ করে বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

এ আয়াতটিকে এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা জানিয়ে দেয়া যে, বংশ ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক এমন জিনিস, যার সাথে কুফু’র ব্যাপারটি সম্পর্কিত।

এ আয়াতে মানুষকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগ হচ্ছে বংশ রক্ষার বাহন –মানে পুরুষ ছেলে, বংশ তাদের দ্বারাই রক্ষা পায়, ‘অমুকের ছেলে অমুক’ বলে পরিচয় দেয়া হয়। আর দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষার বাহন –মানে কন্যা সন্তানকে অপর ঘরের ছেরের নিকট বিয়ে দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। আর এ বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে যাতে করে ভবিষ্যত বংশ রক্ষার ব্যবস্তা হয় সেই দৃষ্টিতে কুফু’ রক্ষা করা একটা বিশেষ জরুরী বিষয়।

কুফু’র মানে যদিও (আরবী************) –সমান-সদৃশ, তবু বিয়ের ব্যাপারে কোন কোন দিক দিয়ে এর বিচার করা আবশ্যক, তা বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ।

এ পর্যায়ে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

‘কুফু’ –যা ইসলামের বিশেষজ্ঞদের নিকট সর্বসম্মত ও গৃহীত –তা গণ্য হবে দ্বীন পালনের ব্যাপারে। কাজেই মুসলিম মেয়েকে কাফিরের নিকট বিয়ে দেয়া যেতে পারে না।

আল্লামা মুহাম্মাদ ইসমাইল সায়য়ানী লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

কু’ফুর হিসেব হবে দ্বীনদারীর দৃষ্টিতে। আর এ হিসেবেই কোনো মুসলিম মেয়েকে কোনো কাফির পুরুসের নিকট বিয়ে দেয়া যেতে পারে না –ইজমা’র সিদ্ধান্ত এই।

কুরআন মজীদের সুস্পষ্ট ঘোষণায় এ ইজমা’র ভিত্তি উদ্ধৃত হয়েছে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************)

ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী কিংবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে, পক্ষান্তরে ব্যভিচারী নারীকে অনুরূপ ব্যভিচারী কিংবা মুশরিক পুরুষ ছাড়া আর কেউ বিয়ে করবে না। মু’মিনদের জন্যে তা হারাম করে দেয়া হয়েছে।

কুরআন এর পূর্ববর্তী আয়াতে জ্বেনাকারীদের জন্যে কঠোর শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ আয়াতে জ্বেনাকারী পুরুষ স্ত্রীর সঙ্গে কোনরূপ বিষয়ে সম্পর্ক স্থাপন করাকে ঈমানদার স্ত্রী পুরুষের জন্যে হারাম করে দেয়া হয়েছে। আল্লামা আল-কাসেমী লিখেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

এ আয়াত থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, ব্যভিচারী মোটামুটি ঈমানদার নয়, যদিও তাকে মুশরিক বলা যায় না।

আর আয়াতটির শেষ শব্দ থেকে জানা যায় ঈমানই ব্যভিচারী পুরুষ স্ত্রীকে বিয়ে করতে ঈমানদার লোকদের বাধা দেয় –নিষেধ করে। যে তা করবে সে হয় মুশরিক হবে, নয় ব্যভিচারী। সে ধরনের ঈমানদার সে নয় অবশ্যই, যে ধরনের ঈমান এ ধরনের বিয়েকে নিষেধ করে, ঘৃণা জাগায়। কেননা জ্বেনা-ব্যভিচার বংশ নষ্ট করে আর জ্বেনাকারীর সাথে বিয়ে সম্পর্ক স্থাপনে পাপিষ্ঠের সঙ্গে স্থায়ীভাবে একত্র বাস –সহবাস করা অপরিহার্য হয়। অথচ আল্লাহ এ ধরনের সম্পর্ক-সংস্পর্শকে চিরদিনের তরে নিষেধ করে দিয়েছেন।

অন্য কথায়, ব্যভিচারী পুরুষ ঈমানদার মেয়ের জন্যে এবং ব্যভিচারী নারী ঈমানদার পুরুষের জন্যে কুফু নয়। কেননা স্বভাব-চরিত্র ও বাস্তব কাজের দিক দিয়ে এ দুশ্রেণীর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, এ দুয়ের মধ্যে মনের মিল, চরিত্র ও স্বভাবের ঐক্য হওয়া, হৃদয়ের সম্পর্ক দৃঢ় হওয়া, নৈতিক চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং প্রাণের শান্তি ও স্বস্তি লাভ –যা বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য –কখনো সম্ভব হবে না। তাই কুরআন মজীদের অপর এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************)

মু’মিন কি কোনোক্রমেই ফাসিকদের সমান হতে পারে? না, এরা সমান নয়।

মানে, মু’মিন ও ফাসিক এক নয়, নেই এদের মধ্যে কোনো রকমের সমতা ও সাদৃশ্য। অতএব মু’মিন স্ত্রী বা পুরুষ কখনোই ফাসিক বা কাফির স্ত্রী বা পুরুষের জন্য কুফু নয়।

কুরআনের উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ের সমর্থনে রাসূলে করীম (স)-এর নিম্নোক্ত বাণী উল্লেখযোগ্য। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী****************************************)

দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যভিচারী তারই মতো দণ্ডপ্রাপ্তা ব্যভিচারীনি ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে না।

উম্মে মাহজুল নাম্মী কোনো ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করা হলে রাসূলে করীম (স) বললেনঃ

(আরবী****************************************************)

ব্যভিচারিনীকে ব্যভিচারী বা মুশরিক ছাড়া অন্য কেউ বিয়ে করবে না।

বলা বাহুল্য, হাদীসদ্বয়ের সনদ সহীহ এবং বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। তাবারানী ও মজমাওয যওয়ায়িদ গ্রন্থেও এ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। (আরবী*********)

সূরা আন-নূর-এর নিম্নোক্ত আয়াতটিও এই পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচ্য। বলা হয়েছেঃ

(আরবী***************************************************)

দুশ্চরিত্রশীলা মেয়েলোক দুশ্চরিত্র পুরুসের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা মেয়েদের জন্যে আর সচ্চরিত্রবতী মেয়েলোক সচ্চরিত্রবান পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্রবান পুরুষ সচ্চরিত্রা মেয়েদের জন্য।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

চরিত্রহীনা মেয়ে চরিত্রহীন পুরুষদের জন্যে, তাই চরিত্রহীনা মেয়েলোক চরিত্রবান পুরুষদের জন্যে বিবাহযোগ্য হতে পারে না। কেননা তা কুরআনে বর্ণিত চূড়ান্ত কথার খেলাফ। অনুরূপভাবে সচ্চরিত্রবান পুরুষ সচ্চরিত্রবতী মেয়েদের জন্যে। অতএব কোনো চরিত্রবান পুরুষই কোনো চরিত্রহীনা মেয়ের জন্যে বিয়ের যোগ্য হতে পারে না। কেননা তাও কুরআনের বিশেষ ঘোষণার পরিপন্থী। (আরবী****************************)

অন্য কথায় নেককার পুরুষ নেকাকর স্ত্রীলোকই গ্রহণ করবে, বদকার ও চরিত্রহীনা নারী নয়। কেননা তা তার জন্যে কুফু নয়। এমনিভাবে কোনো নেককার চরিত্রবতী মেয়েকে বদকার চরিত্রহীন পুরুষের নিকট বিয়ে দেয়া যেতে পারে না। কেননা তা তার জন্যে কুফু নয়। সারকথা এই যে, বিয়ের ব্যাপারে স্ত্রী পুরুষের মধ্যে কুফুর বিচার অবশ্যই করতে হবে। আর সে কুফু হবে নৈতিক চরিত্র ও দ্বীনদারীর দিক দিয়ে।

তাই নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী**************************************************************************)

তোমরা যখন বিয়ের জন্যে এমন ছেলে বা মেয়ে পেয়ে যাবে যার দ্বীনদারী চরিত্র ও জ্ঞান-বুদ্ধিকে তোমরা পছন্দ করবে, তো তখনই তার সাথে বিয়ের সম্বন্ধ স্থাপন করো।

ইমাম শাওকানী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

এ হাদীস প্রমাণ করে যে, দ্বীনদারী ও চরিত্রের দিক দিয়ে কুফু আছে কিনা বিয়ের সময়ে তা অবশ্য লক্ষ্য করতে হবে।

ইমাম মালিক (রহ) সম্পর্কে ইমাম শাওকানীই লিখেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

ইমামা মলিক দৃঢ়তা সহকারে বলেছেন, কেবলমাত্র দ্বীনদারীর দিক দিয়েই কুফু বিচার করতে হবে –অন্য কোনো দিক দিয়ে নয়।

আল্লামা খাত্তাবী সুনানে আবূ দাঊদ-এর ব্যাখ্যায় ইমাম মালিকের নিম্নোক্ত কতাটি উদ্ধৃত করেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

কুফু কেবলমাত্র দ্বীনদারীর দিক দিয়েই লক্ষণীয় ও বিবেচ্য। আর ইসলামী জনতার সকলেই পরস্পরের জন্যে কুফু।

এ ছাড়া ধন-সম্পদ ও বংশমর্যাদা ইত্যাদির দিক দিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে কুফুর কোনো প্রশ্নই নেই। কেবলমাত্র ইমাম শাফিঈ (রহ) ধন-সম্পত্তির দৃষ্টিতেও কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা প্রমাণ করতে পারেনি যে, ধনী ও গরীবের সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে হলে দাম্পত্য জীবনে তাদের প্রেম ও ভালোবাসার সৃষ্টি হতে পারে না। তবে এক তরফের ধন-ঐশ্বর্য ও বিত্ত-সম্পদের প্রাচুর্য অনকে সময় দাম্পত্য জীবনে তিক্কতারও সৃষ্টি করতে পারে, তা অস্বীকার করা যায় না।

ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম শাফিঈ একটি হাদীসের ভিত্তিতে বংশীয় কুফু’র গুরুত্বও স্বীকার করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে এই –নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

আরবের লোকেরা পরস্পরের জন্যে কুফু। আর ক্রীতদাসেরাও পরস্পরের কুফু।

কিন্তু এ হাদীসের সনদ ও তার শুদ্ধতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। কেননা এর সনদে একজন বর্ণনাকারী এমন রয়েছে, যার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ইমাম ইবনে আবূ হাতিম তাকে অপরিচিত লোক বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি তাঁর পিতাকে এ হাদীসটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ

(আরবী**************************)

এ হাদীসটি মিথ্যা, এর কোনো ভিত্তি নেই।

অপর এক জায়গায় বলেছেন, এ হাদীসটি বাতিল। ইমাম দারে কুতনী বলেছেনঃ (আরবী***************) ‘হাদীসটি সহীহ নয়’। ইবনে আবদুর বাররয় বলেছেনঃ (আরবী**********) ‘এ হাদীসটি গ্রহণ অযোগ্য, এটি কারো নিজস্ব রচিত’। (আরবী************) আল্লামা শাওকানী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেনঃ (আরবী*******************) এ হাদীসের সনদ দুর্বল’। (আরবী***************)

হাদীসটিকে যদি সহীহ বলে ধরা যায়, তবে তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, আরবের সাধারণ অধিবাসী যদিও পরস্পরের জন্যে কুফু, কিন্তু ক্রীতদাস তাদের জন্যে কুফু নয়। কিন্তু এ কতা কুরআন ও অন্যান্য সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ খেলাফ। কুরআনের ঘোষণা (আরবী********************) ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মুত্তাকী –আল্লাহ ভীরু ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তোমাদের সকলের অপেক্ষা অধিকতর সম্মানিত’। এতে যেমন বংশের দিক দিয়ে মানুষের পার্থক্য স্বীকৃত হয়নি, তেমনি পার্থক্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে পেশ করা হয়েছে তাকওয়া –আল্লাহ-ভীরুতা, দ্বীনদারী ও পরহেযগারীকে। আর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীস (আরবী****************) –“সমস্ত মানুষই আদমের সন্তান”। এ মানুষে মানুষে বংশের দিক দিয়ে কোনো পার্থক্য স্বীকার করা হয়নি। দ্বিতীয় হাদীসঃ

(আরবী***********************************************)

মানুষ চিরুনীর দাঁতের মতোই সমান, কেউ কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, তবে পার্থক্য হতে পারে কেবলমাত্র তাকওয়ার কারণে। (ঐ)

ওপরের আলোচনা থেকে কুফুর ব্যাপারে ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং জানা গেছে যে, মানুষে মানুষে তাকওয়া পরহেযগারী এবং দ্বীনদারী ও নৈতিক চরিত্র ছাড়া অপর কোনো দিক দিয়েই পার্থক্য করা উচিত নয়, কুফুর বিচারও কেবলমাত্র এই দিক দিয়েই করা যেতে পারে।

এ হলো ইসলামের আদর্শিক দৃষ্টিকোণ। কিন্তু এই আদর্শিক দৃষ্টিকোণের বাইরে বাস্তব সুবিধে-অসুবিধের বিচার ও বিয়ের ব্যাপারে অগ্রাহ্য বা উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়। কেননা বিয়ে বাস্তবভাবে দাম্পত্য জীবন যাপনের বাহন। এজন্যে স্বামী ও স্ত্রীর বাঝে যথাসম্ভব সার্বিক ঐক্য ও সমতা না হলে বাস্তব জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ইসলামে বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গিও যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে গণ্য ও গ্রাহ্য। ইসলামের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ মনীষীও এর অনুকূলে মত জানিয়েছেন।

ইমাম খাত্তাবী তাই লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

বহু সংখ্যক মনীষীর মতে চারটি কুফুর বিচার গণ্য হবেঃ দ্বীনদারী, আযাদী, বংশ ও শিল্প-জীবিকা। তাদের অনেকে আবার দোষত্রুটিমুক্ত ও আর্থিক সচ্ছলতার দিক দিয়েও কুফুর বিচার গণ্য করেছেন। ফলে কুফু বিচারের জন্যে মোট দাঁড়াল ছয়টি গুণ।

হানাফী মাযহাবে কুফুর বিচারে বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থাও বিশেষভাবে গণ্য। এর কারণ এই যে, বংশমর্যাদার দিক দিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে পার্থক্য হলে যদিও একজন অপরজনকে ন্যায়ত ঘৃণা করতে পারে না, কিন্তু একজন অপর জনকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে অসমর্থ হতে পারে তা অস্বীকার করা যায় না। অনুরূপভাবে একজন যদি হয় ধনীর দুলাল আর একজন গরীবের সন্তান তাহলেও –যদিও সেখানে ঘৃণার কোনো কারণ থাকে না, কিন্তু একজন যে অপরজনের নিকট যথেষ্ট আদরনীয় না-ও হতে পারে, তা-ই বা কি করে অস্বীকার করা যেতে পারে? এ সব বাস্তব কারণে দ্বীনদারী ও নৈতিক চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে বংশমর্যাদা, জীবিকার উপায় ও আর্থিক অবস্থার বিচার হওয়াও অন্যায় কিছু নয়।

কনের জরুরী গুণাবলী

কনে বাছাই করার সময় ইসলামের দৃষ্টিতে বিশেষ একটি গুণের যাচাই করে দেখা আবশ্যক। সে গুণটি হচ্ছে কনের দ্বীনদার ও ধার্মিক হওয়া। এ সম্পর্কে নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী**************************************************************)

চারটি গুণের কারণে একটি মেয়েকে বিয়ে করার কথা বিবেচনা করা হয়ঃ তার ধন-মাল, তার বংশ গৌরব –সামাজিক মান-মর্যাদা, তার রূপ ও সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারী। কিন্তু তোমরা দ্বীনদার মেয়েকেই গ্রহণ করো।

যে সব কারণে একজন পুরুষ একটি মেয়েকে স্ত্রীরূপে বরণ করার জন্যে উৎসাহিত ও আগ্রহান্বিত হতে পারে তা হচ্ছে এ চারটি। এ গুণ চতুষ্টয়ের মধ্যে সর্বশেষে উল্লেখ করা হয়েছে দ্বীনদারী ও আদর্শবাদিতার গুণ। হাদীসেও উল্লিখিত চারটি গুণ স্বতন্ত্র গুরুত্বের অধিকারী। এর প্রতিটি গুণই এমন যে, এর যে কোনো একটির জন্যে একটি মেয়েকে বিয়ে করা যেতে পারে, যদিও এ গুণ চতুষ্টয়ের মধ্যে মেয়ের দ্বীনদার তথা ধার্মিকতা ও চরিত্রবতী হওয়ার গুণটিই ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বাগ্রগণ্য ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

নবী করীম (স)-এর আলোচ্য নির্দেশের সারকথা হলোঃ

(আরবী*****************************************************************)

দ্বীনদারীর গুণসম্পন্না কনে পাওয়া গেলে তাকেই যেন স্ত্রীরূপে বরণ করা হয়, তাকে বাদ দিয়ে অপর কোনো গণসম্পন্না মহিলাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হওয়া উচিত নয়।

দ্বীনদার ও ধার্মিক কনেকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত –অন্য কথায় বিয়ের জন্যে চেষ্টা চালানো পর্যায়ে কনের খোঁজ-খবর লওয়ার সময় –রাসূলে করীম (স)-এর নির্দেশ হলো, কেবল দ্বীনদার কনেই তালাশ করবে। বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে কনে সম্পর্কে প্রথম জানবার বিষয় হলো কনের দ্বীনদারীর ব্যাপার। অন্যান্য গুণ কি আছে তার খোঁজ পরে নিলেও চলবে অর্থাৎ কনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হচেছ তার দ্বীনদার হওয়া। ধনী, সদ্বংশজাত ও সুন্দরী রূপসী হওয়াও কনের বিশেষ গুণ বটে; এবং এর যে-কোন একটি গুণ থাকলেই একজন মেয়েকে স্ত্রীরূপে বরণ করে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এসব গুণ মুখ্য ও প্রধান নয় –গৌণ। রাসূল (স)-এর নির্দেশ অনুযায়ী কেবল ধন-সম্পত্তি, বংশ-মর্যাদা ও রূপ-সৌন্দর্যের কারণেই একটি মেয়েকে বিয়ে করা উচিত নয়। সবচাইতে বেশি মূল্যবান ও অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য গুণ হচ্ছে কনের দ্বীনদারী।

চারটি গুণের মধ্যে দ্বীনদারী হওয়ার গুণটি কেবল যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা-ই নয়, এ গুণ যার নেই তার মধ্যে অন্যান্য গুণ যতই থাক না কেন, ইসলামের দৃষ্টিতে সে অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য কনে নয়। রাসূল (স)-এর হাদীস অনুযায়ী তো দ্বীনদারীর গুণ-বঞ্চিতা নারীকে বিয়েই করা উচিত নয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেনঃ

(আরবী***************************************************)

তোমরা নারীর কেবল বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না। কেননা তাদের এ রূপ সৌন্দর্য তাদের নষ্ট ও বিপথগামী করে দিতে পারে। তাদের ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখেও বিয়ে করবে না। কেননা ধন-সম্পদ তাদের বিদ্রোহী ও দুর্বিনীত বানিয়ে দিতে পারে। বরং বিয়ে করো নারীর দ্বীনদারীর গুণ দেখে। মনে রাখবে, কৃষ্ণকায়া দাসীও যদি দ্বীনদার হয় তবু অন্যদের তুলনায় উত্তম।

এ হাদীসটির ভাষা অপর এক বর্ণনায় এরূপ উদ্ধৃত হয়েছেঃ

(আরবী**************************************************************)

তোমরা স্ত্রীদের কেবল তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না –কেননা এ রূপ-সৌন্দর্যই অনেক সময় তাদরে ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাদের ধন-মালের লোভে পড়েও বিয়ে করবে না –কেননা এ ধন-মাল তাদের বিদ্রোহী ও অনমনীয় বানাতে পারে। বরং তাদের দ্বীনদারীর গুণ দেখেই তবে বিয়ে করবে। বস্তুত একজন দ্বীনদার কৃষ্ণাঙ্গ দাসীও কিন্তু অনেক ভালো।

রাসূলে করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল (আরবী*************) ‘বিয়ের জন্য কোন ধরনের মেয়ে উত্তম?’ জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ

(আরবী*******************************************************)

যে মেয়েলোককে দেখলে বা তার প্রতি তাকালে স্বামীর মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তাকে যে কাজের আদেশ করা হবে তা সে যথাযথ পালন করবে এবং তার নিজের ও স্বামীর ধন-মালের ব্যাপারে স্বামীর মত ও পছন্দ-অপছন্দের বিপরীত কোনো কাজই করবে না।

অপর এক হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে –সাহাবায়ে কিরাম একদিন বললেনঃ

(আরবী****************************************************)

সর্বোত্তম মাল-সম্পদ কি, তা যদি আমরা জানতে পারতাম, তাহলে তা আমরা অবশ্যই অর্জন করতে চেষ্টা করতাম। একথা শুনে নবী করীম (স) বললেনঃ সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে আল্লাহর যিকর-এ মশগুল মুখ ও জিহবা, আল্লাহর শোকর আদায়কারী দিল এবং সেই মু’মিন স্ত্রীও সর্বোত্তম সম্পদ, যে স্বামীর দ্বীন-ইমানের পক্ষে সাহায্যকারী হবে।

এ সব হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়ঃ

(আরবী*************************************************************)

সর্ব পর্যায়ে দ্বীনদার লোকদের সাহচর্য অতি উত্তম। কেননা দ্বীনদার লোকদের সঙ্গী-সাথীগণ তাদের চরিত্র, উত্তম গুণাবলী ও ধরন-ধারণ, রীতিনীতি থেকে অনেক কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। বিশষ করে স্ত্রী তো দ্বীনদার হওয়া একান্তই অপরিহার্য এবং এদিক দিয়ে যে ভালো সেই উত্তম। কেননা সে-ই তার শায়িনী, সে-ই তার সন্তানের জননী, গর্ভধারিনী, সে-ই তার ধন-মাল, ঘর-বাড়ি ও তার (স্ত্রীর) নিজের রক্ষণাবেক্ষণের একমাত্র দায়িত্বশীল ও আমানতদার।

বস্তুত রূপ-সৌন্দর্য ও ধন-মাল যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব দানে তার ক্রিয়া গভীর ও সুদূরপ্রসারীও নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এ রূপ-সৌন্দর্য ও ধন-মাল পারিবারিক জীবনে অনেক তিক্ততা ও মনোমালিন্যের সৃষ্টি করে থাকে –করতে পারে। সুন্দরী-রূপসী নারীদের মধ্যে –বিশেষত যাদের রূপ-সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কোন মহৎ গুণ নেই –অহমিকা ও আত্মম্ভরিতা প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে। আর তার ফলে হয়ত তারা স্বামীর কাছে নতি স্বীকার করতে বা তার প্রতি নমনীয় হতে কখনও প্রস্তুত হয় না। উপরন্তু তাদের রূপের আগুনে আত্মহুতি দেয়ার জন্যে অসংখ্য কীট-পতঙ্গ চারদিকে ভীড় জমাতে পারে আর তারা পারে ওদের আত্মহুতি দেয়ার জন্যে অনেক অবাধ সুযোগ করে দিতে। তখন এ রূপ ও সৌন্দর্যই হয় তার ধ্বংসের কারণ। ধন-মালের প্রাচুর্যও তেমনি নারী জীবনের ধ্বংস টেনে আনতে পারে। যে নারী নিজে বা তার পিতা বিপুল ধন-সম্পত্তির মালিক তার মনে স্বাভাবিকভাবেই একটা অহংকার ও বড়ত্বের ভাব (Superiority Complex) থেকে থাকে। তার বিয়ে যদি হয় এমন পুরুষের সাথে, যার আর্থিক মান তার সমান নয় বরং তার অপেক্ষা কম কিংবা সে যদি গরীব হয়, তাহলে এ দুজনের দাম্পত্য জীবন সুখের হতে পারে না বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা ধনী কন্যা বা ধনশালী স্ত্রী সব সময়ই তার গরীব স্বামীকে হেয়, হীন ও নীচ মনে করতে থাকবে। তার ফলে স্বামী নিজেকে তার স্ত্রীর নিকট ক্ষুদ্র, অপমানিত ও লাঞ্ছিত মনে করবে। আর এ কারণেই এ ধরনের স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন না হবে স্থায়ী, না হবে সুখের ও মাধুর্যময়।

কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতও হাদীসের ঘোষিত নীতিরই সমর্থক। সূরা আন-নূর এ বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

এবং বিয়ে দাও তোমাদের জুড়িহীন ছেলেমেয়েকে, আর তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা নেককার –যোগ্য, তাদের।

অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহ-ভীরু ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানার্হ।

এরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************)

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদের ইলম দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের সম্মান ও মর্যাদা অধিক উচ্চ ও উন্নত করে দেবেন।

এজন্যে নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

দুনিয়ার সব জিনিসই ভোগ ও ব্যবহারের সামগ্রী। আর সবচেয়ে উত্তম ও উৎকৃষ্ট সামগ্রী হচ্ছে নেক চরিত্রের স্ত্রী।

কেননা নেক চরিত্রের স্ত্রী স্বামীকে সব পাপের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে এবং দুনিয়া ও দ্বীনের কাজে তাকে পূর্ণ সাহায্য ও তার সাথে আন্তরিক সহযোগিতা করে থাকে। এ হাদীসের অর্থ হচ্ছেঃ

(আরবী*************************************************)

স্ত্রী যদি নেক চরিত্রের না হয়, তাহলে সে হবে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও বেশি খারাপ সামগ্রী।

আর নেক চরিত্রের স্ত্রী বলতে বোঝায়ঃ

(আরবী************************************************)

নেককার, পরহেযগার, আল্লাহ-ভীরু ও পবিত্র চরিত্রের স্ত্রী –যে তার স্বামীর জন্যে সর্বাবস্থায় কল্যাণকামী, তার ঘরের রানী এবং তার আদেশানুগামী, তাকেই নেক চরিত্রের স্ত্রী মনে করতে হবে।

উপরোদ্ধৃত আয়াত ও হাদীস থেকে যে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়া, পরহেযগারী, দ্বীনদারী ও উন্নত মর্যাদার চরিত্রই হচ্ছে মানুষের বিশিষ্টতা লাভের শ্রেষ্ঠ গুণ। এতদ্ব্যতীত অন্য কোনো গুণই এমন নয়, যার দরুন কোনো লোক অপরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হতে পারে। একথা যেমন নারীদের ব্যাপারে সত্য, তেমনি পুরুষদের ক্ষেত্রেও তা অনুরূপ গুরুত্ব সহকারে প্রযোজ্য। তাই দ্বীনদার ও চরিত্রবতী মেয়েই বিয়ের জন্য সর্বাগ্রগণ্যা, বিশেষত মুসলিম পরিবারে তা-ই হওয়া উচিত। দ্বীনদার চরিত্রবতী কনে বাছাই ও বিয়ে করার জন্যে ইসলামে যেমন বলা হয়েছে বরকে –বিবাহেচ্ছুক পুরুষকে, তেমনি বলা হয়েছে কনেকেও। এ সম্পর্কে ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে ফিকাহবিদদের সর্বসম্মত মতের উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************************)

নারী স্বামী গ্রহণ করবে তার উত্তম দ্বীনদারী ও উদার চরিত্রের জন্যে, সেই গুণ দেখে এবং সে কখনো ফাসিক ও ধর্মহীন ব্যক্তিকে বিয়ে করবে না।

দারিদ্র্য বিয়ের ব্যাপারে বাধা নয়

ওপরের আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইসলাম নির্বিশেষে সকল স্ত্রী-পুরুষকেই বিধিসঙ্গত নিয়মে ও শরীয়তসম্মত পন্থায় বিয়ে করার জন্যে উৎসাহ দিয়েছে। আর যৌন উত্তেনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে তখন বিয়ে করা ফরযের পর্যায়ে পৌঁছে যায় বলে ঘোষণা দিয়েছে।

কিন্তু অনেক সময় যুবক-যুবতীগণ কেবলমাত্র দারিদ্র্য কিংবা অর্থাভাবের কারণে বিয়ে করতে প্রস্তুত হতে চায় না। তারা মনে করে, বিয়ে করলে আর্থিক দায়িত্ব বেড়ে যাবে, সেই অনুপাতেই রোজগার না হলে সে দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথবা বিয়ে করলে যে আর্থিক দায়িত্ব বাড়বে, তদ্দরুন জীবন মান নিচু হয়ে যাবে।

এসব কারণে তারা বিয়েকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেই চেষ্টা করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এ মনোভাব –চিন্তার এই ধারা ও প্রকৃতি –আদৌ সমর্থণযোগ্য নয়। একে তো মানুষের রুজি-রোজগারের পরিমাণ কোনো স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় জিনিস নয়। যে আল্লাহ আজ একজনকে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছেন, সে আল্লাহই আগামীকাল তাকে একশত বা এক হাজার টাকা দিতে পারেন। তাই অর্থাভাব যেন কখনোই বিয়ের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়াতে পারে, সেজন্যে আল্লাহ তা’আলা নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

যদি তারা গরীব দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাদের ধনী করে দেবেন। বস্তুতই আল্লাহ প্রশস্ততাসম্পন্ন সর্বজ্ঞ।

ছেলে বা মেয়ে কিংবা তাদের অলী-গার্জিয়ানদের উভয়ের কিংবা কোনো এক পক্ষের দারিদ্র্য বিয়ের পথে বাধা হওয়ার আশংকা দূর করার জন্যে কুরআনের এ আয়াত স্পষ্ট ঘোষণা। এর অর্থঃ

(আরবী******************************************************)

বিয়ের প্রস্তাব আসা ছেলে বা মেয়ের পারস্পরিক বিয়ের পথ দারিদ্র্য যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কেননা আল্লাহর মেহেরবানীতে রয়েছে অর্থবিমুখতা। এজন্যে যে, আল্লাহ সকাল-সন্ধ্যা যাকে চান অভাবিতপূর্ব উপায়ে রিযিক দান করেন। কিংবা এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন (দারিদ্রকে) ধনী করে দেয়ার। অবশ্য তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন –আল্লাহ ইচ্ছার শর্তাধীন।

‘আল্লাহর ইচ্ছাধীন’ বলার কারণ এই যে, বিয়ে করলেই স্বামী-স্ত্রী ধনী হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। কাজেই আল্লাহ কোথাও ওয়াদা খেলাফী করেছেন –একথা বলা যাবে না। কেননা কত স্বামী বা স্ত্রীই তো দুনিয়ায় এমন রয়েছে, যারা দরিদ্র, বিয়ে করা সত্ত্বেও তাদের দারিদ্র্য দূর হয়ে যায় নি।

তাহলে এ আয়াতের ঘোষণার অর্থ কি? –কি এর প্রকৃত তাৎপর্য। বিয়ের সাথে আর্থিক সঙ্গতির সম্পর্ক কি? এর জবাবে বলা যায়, মানুষ সাধারণত কারণকেই বড় করে দেখে, কারণ বুঝেই নিশ্চিন্ত হয়। তারই ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সে কারণের মূলে যে ব্যাপারটি রয়েছে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ গাফিল হয়ে যায়। মানুষ মনে করে নিয়েছে যে, অধিক সন্তান হওয়াই বুঝি দারিদ্র্যের কারণ। আর কম সন্তান হলেই ধনের পরিমাণ বেড়ে যাবে। মানুষের এ অমূলক ধারণা বিদূরণের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা’আলা উপরিউক্ত ঘোষণা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, বিয়ে করলেই মানুষ আর্থিক দায়িত্ব-ভারে পর্যুদস্ত হবে –এমন কোনো কথা নেই; বরং এর উল্টোটারই সম্ভাবনা বেশি। আর তা হচ্ছে, অধিক সন্তান হলে অনেক সময় আল্লাহ তা’আলা তার ধন-মাল বাড়িয়ে দেন। এও দেখা গেছে যে, সন্তান সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে রোজগার বেশি হয়েছে, দারিদ্র্য দূরীভূত হয়ে গেছে! আসলে এ ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। বিশেষত আল্লাহ তা’আলা নিজেই যখন বলে দিয়েছেন যে, বিয়ে করলেই দরিদ্র হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, তখন বুদ্ধিমান ও জাগ্রতমনা নারী-পুরুষ বিয়েকে আদৌ ভয় করবে না, করা উচিত নয়। তাহলে আয়াতের সহজ অর্থ দাঁড়ালোঃ

(আরবী*********************************************************)

আল্লাহর অনুগ্রহে বিয়ে ধন-মালের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

হযরত আবূ বকর সিদ্দিক (রা) বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

তোমরা বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ পালনে তাঁর আনুগত্য করো। তা হলে ধনসম্পত্তি দানের যে ওয়াদা আল্লাহ তা’আলা করেছেন তা তোমাদের জন্যে পূরণ করবেন।

হযতর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

বিয়ে করে তোমরা ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো।

এই পর্যায়ে স্মরণ করা যেতে পারে, একজন সাহাবী ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র, মোহরানা স্বরূপ দেবার মতো টাকা-পয়সা তো দূরের কথা –কোনো জিনিসই তাঁর কাছে ছিল না। একটি লোহার অঙ্গুরীয় দেবার মতো সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। ছিল ছুধু তাঁর নিজের পরিধেয় একখানি বস্ত্র। তাকেও রাসূলে করীম (স) ‘মোহরানা’ স্বরূপ ধরে নিতে রাজি হলেন না। তা সত্ত্বেও সেই সাহাবীর বিয়ে সেই স্ত্রীলোকটির সাথেই করে দিলেন। আর ‘মোহরানা’র ব্যবস্থা করে দিলেন এভাবে যে, সাহাবী যতখানি কুরআন মজীদ শিখেছিলেন, তা-ই তাঁর স্ত্রীকে শিক্ষা দিবেন। আল্লামা ইবনে কাসীর এই ঘটনার উল্লেখ করে তার পরে লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

আল্লাহ তা’আলার অপরিসীম দয়া-অনুগ্রহ সর্বজনবিদিত, তিনি তাঁকে এত পরিমাণ রিযিক দান করলেন যে, তার স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যে যথেষ্ট হয়ে গেল।

অতএব কোনো মুসলিম যুবকেরই আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন অবিবাহিত কুমার জীবন যাপনে প্রস্তুত হওয়া উচিত নয়। বরং আল্লাহর রিযিকদাতা হওয়া –আল্লাহর অফুরন্ত দয়া-অনুগ্রহ ও দানের ওপর অবিচল বিশ্বাস রাখা উচিত। কেননা সকল প্রাণীরই রিযিকের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা নিজের ওপরে গ্রহণ করে নিয়েছেন। বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

যমীনের উপর বিচরণশীল সব প্রাণীরই রিযিকের ভার একান্তভাবে আল্লাহর উপর।

আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন বিয়ের দায়িত্ব গ্রহণে ভীত লোকদের উৎসাহ বর্ধনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

আল্লাহ তাকে রিযিক দান করবেন এমন সব উপায়ে, যা সে ধারণা পর্যন্ত করতে পারে নি। আর বস্তুতই যে লোক আল্লাহর ওপর ভরসা করে কাজ করবে, সেই লোকের জন্যেই আল্লাহই যথেষ্ট হবেন।

উপস্থিত আর্থিক অনটন ও অসচ্ছলতা দর্শনে কোনো যুবক বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত করতে পারে, তেমনি কোনো গরীব যুবকের তরফ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে মেয়ে পক্ষ তা শুধু এ কারণেই প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অথবা মেয়ে পক্ষ গরীব বলে তার মেয়েকে বিয়ে করতে নারাযও হতে পারে। এসব দিকে লক্ষ্য রেখে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

তোমরা যদি দারিদ্যের ভয় করো, তাহলে জেনে রাখো, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর অনুগ্রতে তোমাদের ধনী করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই জ্ঞানী ও সুবিবেচক।

এ আয়াতের আর এক তরজমা হলোঃ ‘তোমরা যদি বিয়ের পরে অধিক সন্তানের বোঝা চেপে বসবে বলে ভয় করো, তাহলে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তোমাদের নিশ্চিন্ত করে দেবেন। আল্লাহ সবই জানেন, তিনি সুবিবেচক।

এ আয়াতের আর এক তরজমা হলোঃ ‘তোমরা যদি বিয়ের পরে অধিক সন্তানের বোঝা চেপে বসবে বলে ভয় করো, তাহলে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তোমাদের নিশ্চিন্ত করে দেবেন। আল্লাহ সবই জানেন, তিনি সুবিবেচক।

বস্তুত কোনো গরীব লোক যদি বিয়ে করে, তবে কামাই-রোজগারে তার বিপুল উৎসাহ ও উদ্যম সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর এ ব্যাপারে তার স্ত্রী তার ওপর বোঝা না হয়ে বরং হবে দরদী সাহায্যকারিণী। আর সন্তান হলে তারাও তার অর্থোপার্জনের কাজে সাহায্যকারী হতে পারে। অনেক সময় স্ত্রীর ধনী নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে যথেষ্ট আর্থিক সাহায্য লাভও হতে পারে। সদিচ্ছার ওপর ফলাফল নির্ভর করে। আল্লাহ তা’আলার কথার প্রতি যার বিশ্বাস, আস্থা ও সদিচ্ছার অভাব থাকে, সে ছাড়া অপর কেউ দুর্ভোগে পড়তে পারে না। দৃঢ় বিশ্বাসই তাক সফলতার পথে আল্লাহর সাহায্য লাভের উপযুক্ত করে দেবে।

 

যেসব মেয়ে-পুরুষের পারস্পরিক বিয়ে হারাম

মানব বংশের স্থিতি ও বৃদ্ধি এবং মনের প্রশান্তি ও স্বস্তি একান্তভাবে নির্ভর করে স্ত্রী-পুরুষের যৌন মিলনের ওপর। কুরআন মজীদ এ মিলনকে সমর্থন করেছে এবং তাকে জরুরী বলে ঘোষণা করেছেন। এ মিলন স্পৃহাকে অস্বীকার করা, উপেক্ষা করা কিংবা নির্মূল করে দেয়া কুরআনের দৃষ্টিতে মানবতার প্রতি এক চ্যালেঞ্জ, এক অমার্জনীয় অপরাধ সন্দেহ নেই।

কিন্তু যৌন মিলন সংস্থাপনের ব্যাপারে ইসলাম নারী-পুরুষকে স্বাধীন, স্বেচ্ছাচারী ও বল্গাহারা করে ছেড়ে দেয়নি। বরং এজন্যে জরুরী সীমা নির্দেশ করে দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং নির্ধারিত করে দিয়েছে কতকটা বিধি-নিষেধ। কিছু কিছু নারী-পুরুষের পারস্পরিক বিয়ে এজন্যেই হারাম করে দিয়েছে ইসলাম। এ সীমা নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ বংশ, আত্মীয়তা-সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ীত্ব ও পবিত্রতা, পারস্পরিক ঐক্য ও সহযোগিতা এবং সর্বোপরি নৈতিক চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এক উন্নত ও পবিত্র সমাজ পরিবেশ গঠন করার জন্যে একান্তই জরুরী। নারী-পুরুষের যৌন মিলনের সম্ভ্রম ও পবিত্রতা রক্ষার জন্যে সর্ব প্রথম শর্ত হচ্ছে বিয়ে। কিন্তু সেই বিয়েকেও যথেচ্ছা হতে দেয়া যায় না কোনোক্রমেই। সমাজ-পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা ও স্থিতির জন্যে যেমন দরকার হচ্ছে নারী-পুরুষের পারস্পরিক যৌন-মিলনের, তেমনি জরুরী হচ্ছে ইসলাম আরোপিত এই সীমা, বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণকে পূর্ণ মাত্রায় ও বাধ্যতামূলকভাবে রক্ষা করে চলে।

কুরআন মজীদ যেসব মেয়ে-পুরুষের মাঝে বিয়ে সম্পর্ক স্থাপন হারাম করে দিয়েছে, তার ভিত্তি হচ্ছে তিনটিঃ বংশ-সম্পর্ক, দুগ্ধপানের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

১. বংশ-সম্পর্কের কারণে মা-বাপের দিক দিয়ে যেসব আত্মীয়তার উদ্ভব হয় তা মোটামুটি সাতটিঃ মা, ঔরসজাত কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইঝি, বোনঝি। যে-কোনো পুরুষের পক্ষেই তার এ ধরনের আত্মীয় মহিলাকে বিয়ে করা চিরদিনের তবে হারাম। আর এ হারামের কারণ হচ্ছে এই বংশ-সম্পর্ক (আরবী*******)। কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ

(আরবী************************************************)

বিয়ে করা হারাম করে দেয়া হয়েছে তোমাদের প্রতি তোমাদের মা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, তোমাদের ভাইয়ের কন্যা এবং বোনের কন্যা।

মা বলতে এখানে এমন সব মেয়েলোককে বুঝায়, যার সাথে প্রকৃত মা এবং বাবার দিক দিয়ে জন্ম ও রক্তের সম্পর্ক রয়েছে আর এ সম্পর্কের সূচনা হয় দাদি ও নানি থেকে। অতএব তাদের বিয়ে করাও হারাম।

কন্যা বলতে এমন সব মেয়েও বোঝাবে, যাদের সাথে স্বীয় ঔরসজাত কন্যা বা পুত্রের দিক দিয়ে সম্পর্ক রয়েছে। আর বোনের মধ্যে শামিল সেসব মেয়েও, যার সাথে বাপ কিংবা মা অথবা উভয়ের সমন্বয়ে বোনের সম্পর্ক হতে পারে। ফুফু বলতে এমন মেয়ে লোকও বোঝায়, যে বাবার কি তার বাবার –মানে দাদার বোন। আর ‘খালা’র মধ্যে এমন সব মেয়েলোকও শামিল, যার সাথে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে মা কিংবা দাদার দিক দিয়ে। বোনঝি বলতে এমন সব মেয়েই বোঝায়, যাদের মায়ের সাথে রক্তের দিক দিয়ে বোনের সম্পর্ক হতে পারে। এ মোট সাত পর্যায়ের মেয়েলোক ও পুরুষ লোক পরস্পরের জন্যে মুহাররম। এদের পারস্পরিক বিয়ে হারাম। একথা সর্বজনসমর্থিত –কোনো মতভেদ নেই এতে। কেননা কুরআন (আরবী******************) বলে এদেরকেই স্পষ্ট হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

২. দুধ পানের সম্পর্কেও কিছু সংখ্যক মেয়ে-পুরুষের পারস্পরিক বিয়ে হারাম। ছেলে বা মেয়ে দুগ্ধপোষ্য অবস্থায় যদি অপর কোনো মহিলার দুধ পান করে, তবে সে মহিলা হবে তার দুধ-মা, তার স্বামী হবে এর দুধ-বাপ। এ দুধ-মা ও বাপের সাথে বিয়ে সম্পর্ক স্থাপন দুধ পানকারী পুরুষ বা নারীর জন্য হারাম, যেমন হারাম প্রকৃত মা বোনের সাথে বিয়ে। (আরবী******************)

অনুরূপভাবে দুধ-বোনও হারাম। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে দুধ-মা ও দুধ-বোন উভয় সম্পর্কে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

এবং তোমাদের স্তনদায়িনী মা-দের এবং তোমাদের দুধ-বোনদেরকে বিয়ে করা তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে।

আল্লামা ইবনে রুশদ আল-কুরতুবী এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

মোটামুটিভাবে বংশ সম্পর্কের কারণে যাকে বিয়ে করা হারাম, দুধ পানের কারণেও তাকে বিয়ে করা হারাম হওয়া সম্পর্কে সব ফিকাহবিদই সম্পূর্ণ একমত অর্থাৎ স্তনদায়িনী আপন মায়ের সমান পর্যায়ে গণ্য হবে। অতএব বংশের দিক দিয়ে ছেলের প্রতি হারাম যাকে যাকে বিয়ে করা, দুগ্ধদায়িনীর পক্ষেও সে সে হারাম।

দুধ বোন সম্পর্কে আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

মোটামুটিভাবে বংশ সম্পর্কের কারণে যাকে বিয়ে করা হারাম, দুধ পানের কারণেও তাকে বিয়ে করা হরাম হওয়া সম্পর্কে সব ফিকাহবিদই সম্পূর্ণ একমত অর্থাৎ স্তনদায়িনী আপন মায়ের সমান পর্যায়ে গণ্য হবে। অতএব বংশের দিক দিয়ে ছেলের প্রতি হারাম যাকে যাকে বিয়ে করা, দুগ্ধদায়িনীর পক্ষেও সে সে হারাম।

দুধ বোন সম্পকে আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

দুধ-বোন সে, যাকে তোমার মা তোমার বাবার কাছে থেকে পাওয়া দুধ সেবন করিয়েছে, তা তোমার সাথে এক সঙ্গেই সেবন করুক, কি তোমার পূর্বে তোমার পরে –ছেলে হোক আর মেয়ে হোক। (আরবী**********)

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন –হযরত রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী********************************************)

দুধ পানে সে সে হারাম হয়ে যায়, যে যে হারাম হয় জন্মগত সম্পর্কের কারণে।

এজন্যে হযরত আয়েশা (রা) সব সময় বলতেনঃ

(আরবী************************************************************)

তোমরা দুধ পানের কারণে তাকে তাকে হারাম মনে করবে, যাকে যাকে হারাম মনে করো বংশের কারণে।

নবী করীম (স)-এর আর একটি কথা হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী**********************************)

রেহমী সম্পর্কের কারণে যে যে হারাম হয়, দুধ পানের দরুনও সে সে হারাম হয়।

বৈবাহিক সম্পর্কের দিক দিয়েও কোনো কোনো আত্মীয়ের সাথে বিয়ে সম্পর্ক স্থাপন হারাম হয়ে যায়। এ হারাম দু’প্রকারের। এক, স্থায়ী –যেমন স্ত্রীর মা, পুত্রের স্ত্রী, যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে এমন স্ত্রীর কন্যা এবং পিতার স্ত্রী।

পিতার স্ত্রী সম্পর্কে কুরআন মজীদে সুস্পষ্ট নিষেধবাণী উচ্চারিত হয়েছে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************)

তোমাদের পিতারা যাকে বিয়ে করেছে, তাকে তাকে তোমরা বিয়ে করো না।

এর কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বয়ং কুরআনেই বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************)

পিতার বিয়ে করা স্ত্রীকে বিয়ে করা অত্যন্ত লজ্জাকর ও জঘন্য কাজ, গুনাহের ব্যাপার এবং বিয়ের খুবই খারাপ পথ।

আল্লামা শওকানী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী***********************************************************)

(পিতার বিয়ে করা স্ত্রীকে পুত্রের বিয়ে করা সম্পর্কে) নিষেধ বাণীর যে তিনটি কারণ উদ্ধৃত হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে, এ কাজ অত্যন্ত সাংঘাতিক রকমের হারাম ও ঘৃণিত কাজ।

আর পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে কুরআনের নিষেধবাণী হচ্ছেঃ

(আরবী************************************************)

তোমাদের আপন ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরও হারাম করা হয়েছে।

স্ত্রীদের মা হারাম হওয়ার আয়াত হচ্ছেঃ

(আরবী***********************************)

তোমাদের স্ত্রীদের মা’দের হারাম করা হয়েছে।

আর স্ত্রীর গর্ভজাত মেয়েকে বিয়ে করা হারাম হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতের ভিত্তিতেঃ

(আরবী***********************************************)

এবং তোমাদের সেসব স্ত্রীদের –যাদের সাথে তোমাদের যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে –গর্ভজাত মেয়েরাও হারাম।

যৌন সম্পর্ক স্থাপিত না হলে তাদের কন্যাকে বিয়ে করা হারাম নয়।

(আরবী*****************************************)

যদি বিয়ে করা স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত না করে থাকে, তবে তার কন্যাকে বিয়ে করায় কোনো দোষ নেই।

এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে রুশদ আল-কুরতুবী লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

এ চারজনের মধ্যে দুজন হারাম হয়ে যায় বিয়ের আকদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে –তারা হচ্ছে পিতার স্ত্রী পুত্রের জন্যে ও পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্যে, আর একজন হারাম হয় স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হলে পরে –সে হচ্ছে স্ত্রীর অপর এক স্বামীর নিকট থেকে নিয়ে আসা কন্যা।

আর দ্বিতীয় অস্থায়ী ও সাময়িক। যেমন স্ত্রীর বোন, স্ত্রীর ফুফু, খালা, ভাইঝি-বোনঝি ইত্যাদি। স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় স্ত্রীর এসব নিকটাত্মীয়কে বিয়ে করা ও একত্রে এক স্থায়ী স্ত্রীত্বে বরণ করা ইসলামে হারাম। এ কথার ভিত্তি হচ্ছে নিম্নোক্ত আয়াতাংশঃ

(আরবী************************************************)

এবং দু’জন সহোদর বোনকে একত্রে স্ত্রীরূপে বরণ করা তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ।

এ আয়াতের ভিত্তিতে ফিকাহবিদগণ নিম্নোক্ত মূলনীতি নির্ধারণ করেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

যে দু’জন স্ত্রীলোকের পারস্পরিক আত্মীয়তার কারণে বিয়ে হারাম, তাদের দু’জনকে একজন স্বামীর স্ত্রীত্ব একত্রে বরণ করা হারাম।

এভাবে যেসব মেয়েলোককে বিয়ে করা একজন পুরুষের পক্ষে হারাম তাদের সংখ্যা দাঁড়াল নিম্নরূপঃ

(ক) বৈবাহিক ও রক্তের সম্পর্কের কারণে সাতজন। আর তারা হচ্ছেঃ মা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইঝি ও বোনঝি।

(খ) বৈবাহিক ও দুগ্ধপানের কারণে মোট সাতজন। তারা হচ্ছেঃ দুধ-মা, দুধ-বোন, স্ত্রীর মা, স্ত্রীর পূর্বপক্ষের কন্যা ও দুবোনকে একত্রের বিয়ে করা। এতদ্ব্যতীত পিতার স্ত্রী এবং ফুফু-ভাইঝিকে একত্রে বিয়ে করা। ইমাম তাহাভী বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

এ কয়জনকে বিয়ে করা যে-কোনো পুরুষের পক্ষে স্থায়ী ও সর্ববাদীসম্মতভাবে হারাম। এ বিষয়ে কারো কোন মতভেদ নেই।

এরপর আল্লাহ তা’আলা সেসব স্ত্রীলোককে হারাম করে দিয়েছেন, যারা বিবাহিতা –যাদের স্বামী জীবিত ও বর্তমান। বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

এবং স্বামীওয়ালী সুরক্ষিতা মহিলাদের বিয়ে করাও হারাম।

আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী************************************)

এখানে ‘মুহসানাত’ মানে সেসব মেয়েলোক, যাদের স্বামী বর্তমান –যারা বিবাহিতা।

যেসব মেয়েলোককে বিয়ে করা হারাম, তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করছেনঃ

(আরবী**************************************************)

এ হারাম –মুহাররম-স্ত্রীলোকদের ছাড়া অন্যান্য সব মেয়েলোকই বিয়ে করার জন্যে তোমাদের পক্ষে হালাল করে দেয়া হয়েছে এ উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তাদেরকে তোমাদের মাল-মোহরানা দিয়ে সুরক্ষিত বিবাহিত জীবন যাপনের লক্ষ্যে গ্রহণ করবে, উচ্ছৃঙ্খল যৌন লালসা পূরণের কাজে নয়।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

উপরে উল্লিখিত মহিলাদের ছাড়া অন্যান্য সব মেয়েলোক বিয়ে করা জায়েয –সম্পূর্ণ হালাল, তা এ আয়াতাংশ স্পষ্ট প্রমাণ করছে।

অন্য কথায়, আল্লাহ তা’আলা চান যে, মুহাররম স্ত্রীলোকদের ছাড়া অন্যান্য মেয়েলোকদের যাকেই গ্রহণ করা হোক বিয়ের জন্যে –বিয়ের মাধ্যমে রীতিমতো মোহরানা দিয়ে তাদের বিয়ে করা হোক। কেবল উচ্ছৃঙ্খল যৌন পরিতৃপ্তি লাভ ও লালসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে যেন কেউ বিয়ে বন্ধনের বাইরে কোনো নারীকে স্পর্শ পর্যন্তও না করে।

কাফের ও আহলে কিতাব মেয়ে

কিন্তু এ ছাড়া আরো দু’শ্রেণীর মেয়ে বিয়ে করা সম্পর্কে কথা বলা এখনো বাকী রয়ে গেছে। এক কাফের মেয়ে, আর দ্বিতীয় মুশরেক ও আহলে কিতাব মেয়ে। কাফের মেয়ে যেমন মুসলমানদের জন্যে বিয়ে করা জায়েয নয়, তেমনি কাফের পুরুষের নিকট মুসলিম মেয়ে বিয়ে দেয়। দ্বীনের পার্থক্যের কারণে এ ধরনের বিয়ে স্থায়ীভাবে হারাম করে দেয়া হয়েছে।

কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

তোমরা মুসলামনরা কাফের মেয়েকে বিয়ের বন্ধনে বেধে রেখো না।

এ আয়াতের ভিত্তিতে ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ

(আরবী****************************************************)

এ আয়াতে সমস্ত কাফের মুশরেক মেয়ে বিয়ে করতে স্পষ্ট নিষেধবাণী উচ্চারিত হয়েছে।

তিনি আরো লিখেছেন, পূর্বে কাফেররা মুসলিম মেয়ে বিয়ে করত আর মুসলিমরা করত কাফের মেয়ে। এ আয়াত দ্বারা এ উভয় বিয়েকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছেঃ

এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************)

মুসলিম মেয়েরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং মুসলিম পুরুষরাও অনুরূপভাবে হালাল নয় কাফের মেয়েদের জন্য।

আর এর কারণ হচ্ছে ইসলাম ও কুফরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।

আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************)

এ আয়াতে প্রমাণ করছে যে, মু’মিন-মুসলিম মেয়ে কাফের পুরুষের জন্যে হালাল নয়।

আর প্রথমোক্ত আয়াদের তাফসীরে লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

এর অর্থ এই যে, যে মুসলমানের স্ত্রী কাফের সে আর তার স্ত্রী থাকেনি। কেননা দ্বীন দুই হওয়ার কারণে এ দুয়ের বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে।

আহলে কিতাব –ইহুদী ও নাসারা বা খ্রিষ্টান-মেয়ে বিয়ে করার ব্যাপারটি বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ। এখানে তা পেশ করা যাচ্ছে।

আল্লামা আবূ বকর আল-জাসসাস লিখেছেনঃ

আহরে কিতাব মেয়ে বিয়ে করার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। একটি মত হচ্ছে এই যে, আহলে কিতাবের আযাদ বংশজাত বা জিম্মী মেয়ে হলে তাদের বিয়ে করা মুসলিম পুরুষদের জন্যে জায়েয, এতে কোনো মতভেদ নেই। যদিও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) তা পছন্দ করেন না, মকরুহ মনে করেন। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

তিনি আহলে কিতাবের খানা খাওয়ায় কোনো দোষ মনে করতেন না, তবে তাদের মেয়ে বিয়ে করাকে মকরুহ মনে করতেন।

তাঁর সম্পর্কে অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ ইহুদী ও খ্রীষ্টান মেয়ে বিয়ে করা সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ

(আরবী*************************************************************)

আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদের জন্যে মুশরেক মেয়ে বিয়ে করাকে স্পষ্ট ভাষায় হারাম করে দিয়েছেন। আর মরিয়ম পুত্র ঈসা কিংবা অপর কোনো আল্লাহর বান্দাকে রব্ব বলে মনে করা অপেক্ষা বড় কোনো শিরক হতে পারে বলে আমার জানা নেই।

আর ইহুদী-নাসারাদের বিশ্বাস ও আকীদা এমনিই, তাই তারাও মুশরিকদের মধ্যে গণ্য। অতএব তাদের মেয়ে বিয়ে করাও জায়েয নয়।

(আরবী***************************************************)

কেননা আহলে কিতাবও মুশরেক। এজন্যে ইহুদীরা বলেছেঃ উজাইর আল্লাহর পুত্র, আর খ্রিষ্টানরা বলেছেঃ ঈসা আল্লাহর পুত্র। যদিও বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেন যে, এ আয়াত মনসুখ হয়ে গেছে।

মায়মুন ইবনে মাহরান হযরত ইবনে উমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ আমরা এমন জায়গায় থাকি, যেখানে আহলে কিতাবের সাথে খুবই খোলা-মেলা হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় আমরা কি তাদের মেয়ে বিয়ে করতে পারি?

এর জবাবে তিনি নিম্নোক্ত দু’টি আয়াত পাঠ করেনঃ

(আরবী**************************************************)

এবং আহলে কিতাব বংশের সেসব চরিত্র-সতীত্বসম্পন্না মেয়ে (বিয়ে করা তোমাদের জন্যে জায়েয)।

এবং

(আরবী********************************************)

এবং মুশরেক মেয়ে যতক্ষণ না ইসলাম কবুল করছে, ততক্ষণ তোমরা তাদের বিয়ে করো না।

প্রথম আয়াতে আহলে কিতাব মেয়ে বিয়ে করা জায়েয বলা হয়েছে, আর দ্বিতীয় আয়াতে মুশরেক মেয়ে বিয়ে করতে সুস্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। অন্য কথায়, তিনি এ ব্যাপারে নিজস্ব কোনো ফয়সালা শোনালেন না। শুধু আয়াত পড়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়ে থাকলেন।

আল্লামা আবূ বকর লিখেছেন যে, একমাত্র হযতর ইবনে উমর ছাড়া সাহাবীগণের এক বিরাট জামা’আত যিম্মী আহলে কিতাবের মেয়ে বিয়ে করা জায়েয মনে করতেন। তাঁদের মতে দ্বিতীয় আয়াতটি কেবলমাত্র মুশরেকদের সম্পর্কেই প্রযোজ্য, সাধারণ আহলে কিতাবদের সম্পর্কে নয়।

হাম্মাদ বলেনঃ আমি হযরত সায়ীদ ইবনে জুবাইর (রা)-কে ইহুদী নাসারা মেয়ে বিয়ে করা জায়েয কিনা জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেনঃ (আরবী************) –তাতে কোনো দোষ নেই। তাঁকে উপরিউক্ত দ্বিতীয় আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে মূর্তিপূজক মেয়েদের সম্পর্কে নির্দেশ, তারা নিশ্চয়ই হারাম।

হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা) ফায়েলা বিনতে ফেরারা নাম্নী এক খ্রিষ্টান মহিলা বিয়ে করেছিলেন। হযরত তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা)-ও সিরীয় ইহুদী মেয়ে বিয়ে করেছিলেন। হাসান, ইবরাহী, নখয়ী ও শাবী প্রমুখ তাবেয়ী হাদীস-ফিকাহবিদও এ বিয়ে জায়েয বলে মনে করতেন।

কিন্তু এ পর্যায়ে হযরত উমর ফারূক (রা)-এর একটি নির্দেশ চমক লাগিয়ে দেয়। হযরত হুযায়ফা (রা) এক ইহুদী মেয়ে বিয়ে করলে তাকে নির্দেশ পাঠালেনঃ (আরবী************) ‘তাঁর পথ ছেড়ে দাও, তাকে ত্যাগ করো’।

তখন হুযায়ফা(রা) প্রশ্ন করে পাঠালেনঃ (আরবী****************) ‘ইহুদী মেয়ে বিয়ে করা কি হারাম?’

তার জবাবে হযত উমর (রা) লিখলেনঃ

(আরবী******************************************************)

হারাম নয় বটে, কিন্ত আমি ভয় করছি –আহলে কিতাব বলে তোমরা যদি তাদের বিয়ে করো তাহলে তোমরা তাদের মধ্য থেকে বদকার ও চরিত্র-সতীত্বহীনা মেয়েই বিয়ে করে বসবে।

হযরত উমরের উপরোক্ত নির্দেষ তাৎপর্যপূর্ণ এজন্যে যে, কুরআন মজীদে আহলে কিতাবের মধ্যে কেবলমাত্র (আরবী********************************)-দেরই বিয়ে করা জায়েয করা হয়েছে। আর তার জন্যে দুটি শর্ত অপরিহার্য। একটি হচ্ছে নাপাকীর জন্যে গোসল করা, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে যৌন অঙ্গকে পূর্ণরূপে সংরক্ষিত রাখা। কিন্তু আহলে কিতাবের কোনো মেয়ে বিয়ের পূর্বে তার যৌন অঙ্গের পবিত্রতা রক্ষা করেছে, তা বাছাই করে নেয়া খুব সহজসাধ্য কাজ নয়। আর দ্বিতীয়ত বিয়ের পর যৌন অঙ্গকে স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে ব্যবহার করতে না দেয়ার প্রতি কোনো মেয়ের মনে দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে, তা জানবার কি উপায় হতে পারে? বিশেষত এ কারণে যে, আহলে কিতাব সমাজের লোকেরা এ ব্যাপারে কড়াকড়ি করার খুব বেশী পক্ষপাতী নয়। বরং তাদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার কারণে যৌন সংরক্ষণশীলতা নেই বললেই চলে।

এ দুটি দিক সম্পর্কে যদি নিশ্চয়তা লাভ করা সম্ভব নয়, তাহলেই একজন ঈমানদার মুসলিমের পক্ষে একজন আহলে কিতাব মেয়েকে বিয়ে করা জায়েয হতে পারে। অন্যথায় তা সাধারণ কাফের মুশরেক মেয়েদের মতোই মুসলিমদের জন্যে চিরতরে হারাম। তিন আল্লাহতে বিশ্বাসী আহলে কিতাবরা মুশরেকদের মধ্যে গণ্য। তাই তাদের মেয়ে বিয়ে করাও হারাম।

বদল বিয়ে জায়েয নয়

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

নবী করীম (স) ‘শেগার’ বিয়ে নিষেধ করে দিয়েছেন।

‘শেগার’ বিয়ে কাকে বলে –তার ব্যাখ্যা করে হাদীসের বর্ণনাকারী বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

‘শেগার’ বিয়ে হয় এভাবে যে, একজন অপরজনের নিকট নিজের মেয়ে বিয়ে দেবে এ শর্তে যে, সে তার মেয়ে তার নিকট বিয়ে দেবে, আর এ দুটি বিয়েতে কোনো মোহরানা দেয়া নেয়া হবে না।

আল্লামা ‘বেন্দার’ বলেছেনঃ শেগার বিয়ের কথাবার্তা হয় এভাবে যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলবেঃ

(আরবী****************************************************************************)

তোমার মেয়েকে আমার নিকট বিয়ে দাও, আমি আমার মেয়েকে তোমার নিকট বিয়ে দেবো।

বাংলা ভাষায় আমরা এ ধরনের বিয়েকে বলে থাকি ‘বদল বিয়ে’

‘বদল বিয়ে’র নিষিদ্ধ ধরন হচ্ছে এই যে, একজন তার বোন কিংবা মেয়েকে অপর ব্যক্তির নিকট বিয়ে দেবে এ শর্তে যে, সেই অপর ব্যক্তি তার নিজের বোন কিংবা মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দেবে এবং একজনের যৌন অঙ্গ অপর জনের বিয়ের মোহরানাস্বরূপ হবে। দুটি বিয়ের কোনোটিতেই আলাদাভাবে কোনো মোহরানাই ধার্য করা হবে না।

ইমাম রাফেয়ী বলেছেনঃ

(আরবী****************************************************)

এ ধরনের বিয়েতে একটি বিয়েকে অপর একটি বিয়ের সাথে সম্পর্কিত করা হয়, একটির জন্যে অপরটি শর্ত স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। আর যৌন অঙ্গে পরস্পরকে শরীক করা হয়। এ কারণে এ বিয়ে জায়েয নয়।

কিন্তু হানাফী মাযহাব অনুযায়ী একজনের মেয়ে কিংবা বোনকে অপর জনের নিকট বিয়ে দেয়া এবং শর্তে যে, সে তার মেয়ে কিংবা বোনকে তার নিকট বিয়ে দেবে –যেন একটি বিয়ে অপর বিয়ের বদল হয় –এ বিয়ে জায়েয এবং তাতে মহরে মিসল –সম-মানের মোহরানা দেয়া ওয়াজিব।

এ সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের ফিকাহবিদদের মত হচ্ছেঃ

(আরবী*******************************************************************************)

‘শেগার’ বিয়ে নিষিদ্ধ শুধু এজন্যে যে, কেননা তাতে মোহরানা ধার্য করা হয় না। এ কারণে আমরা তাতে মহরে মিসল ওয়াজিব মনে করেছি। তাহলে তা আর ‘শেগার’ থাকবে না অর্থাৎ তখন তা নিষিদ্ধ নয়।

 

বিয়ের প্রস্তাব

ইসলামের উপস্থাপিত পারিবারিক রীতি-নীতি ও নিয়ম-কানুনের দৃষ্টিতে বিয়ের প্রস্তাব বর কনে যে কারো পক্ষ থেকেই প্রস্তাব পেশ করতে কোনো লজ্জা-শরম বা মান-অপমানের কোনো কারণ হতে পারে না। এমন কি ছেলে কিংবা মেয়ের পক্ষও স্বীয় মনোনীত বর বা কনের নিকট সরাসরিভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ইসলামী শরীয়তে এ ব্যাপারে কোনো বাধা তো নেই-ই উপরন্তু হাদীসে এমন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা থেকে এ কাজ যে সঙ্গত তা সুস্পষ্টরূ প্রমাণিত হয়।

নবী করীম (স) জুলাইবাব নামক এক সাহাবীর জন্যে এক আনসারী কন্যার বিয়ের প্রস্তাব কন্যার পিতার নিকট পেশ করেন। কন্যার পিতা তার স্ত্রী অর্থাৎ কন্যার মা’র মতামত জেনে এর জবাব দেবেন বলে ওয়াদা করেন। লোকটি তার স্ত্রীর নিকট এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে এ বিয়েতে স্পষ্ট অমত জানিয়ে দেয়। কন্যাটি আড়াল থেকে পিতামাতার কথোপকথন শুনতে পায়। তার পিতা যখন রাসূলের নিকট এ বিয়েতে মত নেই বলে জানাতে রওয়ানা হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মেয়েটি পিতামাতাকে লক্ষ্য করে বললঃ

(আরবী**************************************************)

তোমরা কি রাসূলে করীম (স)-এর প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করতে চাও? তিনি যদি বরকে তোমাদের জন্য পছন্দ করে থাকেন তবে তোমরা এ বিয়ে সম্পন্ন করো।

এ ঘটনা থেকে জানা গেল যে, মেয়ে নিজে তার বিয়ের প্রস্তাবে সম্পূর্ণ সম্মত ছিল এবং পিতামাতার নিকট তার মতামত যা গোপন ও অজ্ঞাত ছিল, যথাসময়ে সে তা জানিয়ে দিতে এবং নিজের পিতামাতার সামনে প্রস্তাবকে গ্রহণ করার জন্যে স্পষ্ট ভাষায় অনুমতি দিতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনি। আর এতে বস্তুতই কোনো লজ্জা-শরমের অবকাশ নেই।

হযরত উমরের কন্যা হাফসা (রা) বিধবা হলে পরে তাঁর পূনর্বিবাহের জন্যে তিনি [হযরত উমর (রা)] প্রথমে হযরত উসমানের সাথে সাক্ষাত করেন এবং হাফসাকে বিয়ে করার জন্যে তাঁর নিকট সরাসরি প্রস্তাব পেশ করেন। তখন হযরত উসমান (রা) বললেনঃ এ সম্পর্কে আমার মতামত শীগঘীরই জানিয়ে দেবো। কয়েকদিন পর তিনি বললেনঃ আমি বর্তমানে বিয়ে করা সম্পর্কে চিন্তা করছি না। অতঃপর হযরত উমর (রা) হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট এই প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে মতামত জানানো থেকে বিরত থাকলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত নবী করীম (স) নিজেই নিজের জন্যে বিয়ের প্রস্তাব হযরত উমরের নিকট প্রেরণ করেন।

(বুখারী, ২য় খণ্ড, ৭৬৮ পৃঃ; মুসনাদে আহমাদ, ১৬ খণ্ড, ১৪৮ পৃঃ)

এ ঘটনা থেকে জানা গেল, মেয়ে পক্ষও প্রথমেই বিয়ের প্রস্তাব পেশ করতে পারে –এতে কোনো দোষ নেই। আর ছেলে পক্ষও –কিংবা ছেলে নিজেও বিয়ের প্রস্তাব প্রথমত কন্যা পক্ষের নিকট পেশ করতে পারে। শরীয়তে এতে কোনো আপত্তি নেই কিংবা কারো পক্ষেই কোনো লজ্জা-শরমেরও কারণ নেই।

হযরত আনাস (রা) বলেনঃ একদা একটি মেয়েলোক –সম্ভবত তার নাম লায়লা বিনতে কয়স ইবনুল খাতীম –রাসূলে করীম (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁর সাথে নিজেকে বিয়ের প্রস্তাব সরাসরিভাবে পেশ করেন। সে বলেঃ

(আরবী*******************************************)

হে রাসূল! আপনি আমাকে বিয়ে করার কোনো প্রয়োজন মনে করেন?

হযরত আনাস যখন এ কথাটি বর্ণনা করছিলেন, তখন সেখানে তাঁর কন্যা উপস্থিত ছিলেন। তিনি পিতাকে সম্বোধন করে বললেনঃ (আরবী********************************) –“মেয়েলোকটি কতইনা নির্লজ্জ ছিল!”

অর্থঅৎ একটি মেয়েলোক নিজে নিজেকে রাসূলের নিকট বিয়ে দেয়ার জন্যে পেশ করেছে শুনে আনাস-তনায়া উমাইনার বিশেষ বিস্ময় বোধ হয়েছে এবং এ কাজকে তিনি নির্লজ্জতার চরম বলে মনে করেছেন। তখন হযরত আনাস (রা) কন্যাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ

(আরবী**********************************************************)

সে তোমার তুলনায় অনেক ভালো ছিল। সে রাসূলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল এবং সে নিজেই নিজেকে রাসূলের নিকট বিয়ের জন্যে পেশ করেছিল।

হযরত সহল ইবনে সায়াদ সায়েদী বলেনঃ

(আরবী**************************************************)

একটি মেয়েলোক রাসূলের নিকট এসে বললঃ আমি আপনার খেদমতে এসেছি এজন্যে যে, আমি নিজেকে আপনার নিকট সোপর্দ করব।

তখন নবী করীম (স) তার প্রতি উদার দৃষ্টিতে তাকালেন, পা থেকে মাথার দিকে দেখলেন। অনেক সময় ধরে তিনি নির্বাক হয়ে থাকলেন –কোন জবাব দিলেন না। তখন উপস্থিত একজন সাহাবী বুঝতে পারলেন যে, নবী করীম (স) স্ত্রীলোকটিকে বিয়ে করতে রাজি নহেন। তাই তিনি দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে রাসূল! এ মেয়েলোকটিতে আপনার যদি কোনো প্রয়োজন না থাকে তবে আমাকে অনুমতি দিন তাকে বিয়ে করার। (বুখারী, মুসলিম)

এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, কোনো মেয়ে যদি বিশেষ কোনো পুরুষের প্রতি মনের আকর্ষণ বোধ করে তবে সে নিজেই ছেলের নিকট বিয়ের প্রস্তাব পেশ করতে পারে। এতে না আছে কোনো দোষ, না লজ্জা-শরমের কোনো অবকাশ।

বিয়ের এক প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব দেয়া।

তবে এ ব্যাপারে একটি বিশেষ সুস্পষ্ট নিষেধবাণী উচ্চারিত হয়েছে। আর তা হচ্ছে, বিয়ের প্রস্তাবের ওপর আর একটি নতুন প্রস্তাব দেয়া। কোনো মেয়ে বা ছেলে সম্পর্কে যদি জানা যায় যে, কোথাও তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে বা কেউ বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেছে, তাহলে সে প্রস্তাব সম্পূর্ণ ভেঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনো প্রস্তাবই এক্ষেত্রে উত্থাপন করা যেতে পারে না। কেননা এতে করে সমাজে অবাঞ্ছনীয় প্রতিযোগিতার মনোভাব এবং পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার ভাব সহজেই জেগে উঠতে পারে। আর তা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে খুবই মারাত্মক। এমনকি এতে করে ছেলে বা মেয়ের এমন ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে, যার ফলে তার বিয়েই চিরদিনের তরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্যে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। রাসূলে করীম (স) এ সম্পর্কে বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

তোমাদের কেউ যেন অপর ভাইয়ের দেয়া বিয়ের প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব পেশ না করে, -যতক্ষণ না সে নিজেই সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে কিংবা তাকে নতুন প্রস্তাব পেশ করার অনুমতি দেবে।

হাদীসটির উপরোদ্ধৃত ভাষা মুসলিম শরীফের। আর বুখারী শরীফে এ হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ

(আরবী**************************************************)

কেউই তার ভাইয়ের দেয়া বিয়ের প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব দেবে না –যতক্ষণ না সে বিয়ে করে ফেলে অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।

হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************************)

মু’মিন মু’মিনের ভাই। অতএব এক মু’মিনের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর অপর মু’মিনের ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ করা হালাল হতে পারে না। অনুরূপভাবে এক ভাইয়ের দেয়া বিয়ের প্রস্তাব চূড়ান্ত না হতেই অপরের প্রস্তাব দেয়াও সঙ্গত নয়।

আল্লামা শাওকানী এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

হাদীসের শুরুতে ‘হালাল হবে না’ বলার কারণে বিয়ের প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব দেয়া হালাল হবেনা বলে এ হাদীসকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে।

বিয়ের এক প্রস্তাবের ওপর নতুন অপর একটি প্রস্তাব দেয়া –এক প্রস্তাব সম্পর্কে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাওয়ার পূর্বেই আর একটি প্রস্তাব পেশ করা যে ইসলামে জায়েয নয় বরং হারাম, এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের ইজমা –পরিপূর্ণ ঐকমত্য স্থাপিত হয়েছে। (আরবী**********************)

অবশ্য ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ এ নিষেধ শুধু নৈতিক শিক্ষা, শালীনতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে মাত্র। অন্যথায় এ এমন হারাম কাজ নয়, যাতে করে বিয়েই বাতিল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দাউদ জাহেরী বলেছেনঃ এরূপ করে দ্বিতীয়  ব্যক্তি যদি বিয়ে করে ফেলে তবে সে বিয়েই বাতিল হয়ে যাবে। (আরবী*****************)

কিন্তু এ উক্তিতে যে বাড়াবাড়ি রয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব দেয়ার অপকারিতা এবং তা নিষেধ হওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

এর কারণ এই যে, এক ব্যক্তি যখন কোনো মেয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়, তখন সেই মেয়ের মনেও তার প্রতি ঝোঁক ও আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই জাগ্রত হয় এবং এর ফলে এই উভয়ের ঘর-সংসার গড়ে ওঠার উপক্রম দেখা দেয়। এ সময় যদি সে মেয়ের জন্যে অপর কোনো ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব পেশ করে, তাহলে প্রথম প্রস্তাবককে তার মনের বাসনার ব্যর্থ মনোরথ করে দেয়া হয়, তার অধিকার থেকে তাকে করে দেয়া হয় বঞ্চিত। আর এতে করে তার প্রতি বড়ই অবিচার ও জুলুম করা হয়, তার জীবনকে করে দেয়া হয় সংকীর্ণ।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ আরো লিখেছেনঃ “বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব করা” সম্পর্কিত উপরিউক্ত হাদীসের ভিত্তিতেই আমাদের মত হচ্ছে যে, এ কাজ হারাম। ইমাম আবূ হানীফা ও হানাফী মাযহাবের সব ফিকাহবিদেরই এ মত। ‘আল-মিনহাজ’ কিতাবে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************************)

বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পর তা যদি কবুল হয়ে গিয়ে থাকে, তবে তার ওপর অপর কারো প্রস্তাব দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। তবে উভয় পক্ষের অনুমতি নিয়ে নতুন প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে। কিংবা সে প্রস্তাব যদি প্রত্যাহার করে, তাহলেও দেয়া যায়। আর যদি প্রথম প্রস্তাবের কোনো জবাব না দেয়া হয়ে থাকে, না প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন নতুন প্রস্তাব দেয়া বাহ্যত হারাম হবে না।

তবে ফিকাহর দৃষ্টিতে এখানে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, প্রথম ও দ্বিতীয় এই উভয় প্রস্তাবকারীই যদি নেক চরিত্রের লোক হয় তবেই উপরিউক্ত নিষেধ প্রযোজ্য। আর প্রথম প্রস্তাবকারী যদি অসচ্চরিত্রের লোক হয় এবং দ্বিতীয় প্রস্তাবকারী হয় দ্বীনদার ও নেক চরিত্রের তবে দ্বিতীয় প্রস্তাবকারীর প্রস্তাব সম্পূর্ণ বৈধ ও সঙ্গত। (আরবী**************)

ইবনে কাসেম মালিকী বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

ফাসিক ব্যক্তির বিয়ের প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয।

আমীর হুসাইন আশ-শিফা কিতাবে লিখেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

প্রথম প্রস্তাবকারী যদি ফাসিক হয় তাহলে তার প্রস্তাবের ওপর নতুন প্রস্তাব দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয।

বিয়ের পূর্বে কনে দেখা

দাম্পত্য জীবনে মিল-মিশ, প্রেম-ভালোবাসা ও সতীত্ব-পবিত্রতার পরিশুদ্ধ পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে এবং পারিবারিক জীবনের মাধুর্য ও সুখ-সমৃদ্ধির জন্যে বিয়ের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়া উচিত বলে ইসলামে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে সর্বপ্রথম দলীল হচ্ছে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত বাণীঃ

(আরবী*************************************************)

তোমরা বিয়ে করো সেই মেয়েলোক, যাকে তোমার ভালো লাগে –যে তোমার পক্ষে ভালো হবে।

ইমা সুয়ূতী এ আয়াতের ভিত্তিতে দাবি করে বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************************)

এ আয়াতে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, বিয়ের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়া সম্পূর্ণ হালাল। কেননা কোন্ মেয়ে পছন্দ কিংবা কোন্ মেয়ে ভালো হবে তা নিজের চোখে দেখেই আন্দাজ করা যেতে পারে।

এ পর্যায়ে নবী করীম (স) বলেনঃ

(আরবী**********************************)

তোমাদের কেউ যখন কোনো মেয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব দেবে তখন তাকে নিজ চোখে দেখে তার গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করে নিতে অবশ্যই চেষ্টা করবে, যেন তাকে ঠিক কোন আকর্ষণে বিয়ে করতে তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারে।

এ হাদীসটি বর্ণনাকারী হযতর জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) অতঃপর বলেনঃ

(আরবী********************************************)

রাসূলের উক্ত কথা শুনে আমি একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলাম। তারপর তাকে গোপনে দেখে নেয়ার জন্যে আমি চেষ্টা চালাতে শুরু করি। শেষ পর্যন্ত আমি তার মধ্যে এমন কিছু দেখতে পাই, যা আমাকে আকৃষ্ট ও উদ্ধুদ্ধ করে তাকে বিয়ে করে স্ত্রী হিসেবে বরণ করে নিতে। অতঃপর তাকে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করি।

ইমাম আহমাদ বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত জাবির একটি গাছের ডালে গোপনে বসে থেকে প্রস্তাবিত কনেকে দেখে নিয়েছিলেন। (আরবী**********)

হযরত মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমা থেকে রাসূলে করীমের নিম্নোদ্ধৃত কথাটি বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************************)

যখন কোনো পুরুষের মনে কোনো বিশেষ মেয়ে বিয়ে করার বাসনা জাগবে, তখন তাকে নিজ চোখে দেখে নেয়ায় কোনোই দোষ নেই।

এ হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, সভ্যতাত-ভব্যতা ও শালীনতা সহকারে এবং শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে কনেকে বিয়ের পূর্বেই দেখে নেয়া বাঞ্ছনীয়। তাতে করে তার ভাবী স্ত্রী সম্পর্কে মনের খুঁতখুঁত ভাব ও সন্দেহ দূর হয়ে যাবে, থাকবে না কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ। শুধু তা-ই নয়, এর ফলে ভাবী বধুর প্রতি আকর্ষণ জাগবে এবং সেই স্ত্রীকে পেয়ে সে সুখী হতে পারবে।

হযরত মুগীরা ইবন শুবাহ (রা) তাঁর নিজের বিয়ের প্রসঙ্গে রাসূল করীমের সামনে পেশ করলে তখন রাসূলে করীম (স) আদেশ করলেনঃ

(আরবী*************************************)

তাহলে কনেকে দেখে নাও। কেননা তাকে বিয়ের পূর্বে দেখে নিলে তা তোমাদের মাঝে স্থায়ী প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টির অনুকূল হবে।

এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য। রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

তোমাদের কেউ যখন কোনো মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয় তখন তার এমন কোনো কিছু দেখা যদি তার পক্ষে সম্ভব হয় যা তাকে বিয়ে করতে উদ্ধুদ্ধ করবে, তবে তা তার অবশ্যই দেখে নেয়া কর্তব্য।

এভাবে বহু সংখ্যক রেওয়ায়াতের হাদীসের কিতাবসমূহে উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, যা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, একজন পুরুষ যে মেয়ৈকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক, সে তাকে বিয়ের পূর্বেই দেখে নিতে পারে। শুধু তাই নয়, রাসূলে করীম (স) এ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন এবং না দেখে বিয়ে করাকে তিনি অপছন্দ করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা)অ বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী*************************************)

নবী করীম (স) বিবাহেচ্ছুক এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি মেয়েটিকে দেখেছ? সে বললঃ না, দেখিনি। তখন রাসূলে করীম (স) বললেনঃ যাও তাকে দেখে নাও।

এসব হাদীসকে ভিত্তি করে আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

*(আরবী***************************************************)

এসব হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, একজন পুরুষ যে মেয়েটিকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক, সে তাকে (বিয়ের পূর্বেই) দেখতে পারে –তাতে কোনো দোষ নেই।

তাউস, জুহরী, হাসানুল বাসরী, আওজায়ী, ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ, শাফিয়ী, মালিক, আহমাদ ইবনে হাম্বাল প্রমুখ মনীষী বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

পুরুষ যে মেয়েলোকটিকে বিয়ে করতে চায়, সে তাকে দেখতে পারে।

এ পর্যন্ত যা বলা হলো তা সর্বাবদীসম্মত। এতে মনীষীদের মধ্যে কারো কোনো মতবিরোধ নেই –সকলেই এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।

কিন্তু এর পর প্রশ্ন থেকে যায়, কনেকে কতদূর দেখা যেতে পারে? অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় দেখা যেতে পারে এজন্যে যে, মুখমণ্ডল দেখলেই মনের রূপ-সৌন্দর্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা করা সম্ভব। আর হস্তদ্বয় গোটা শরীরের গঠন ও আকৃতি বুঝিয়ে দেয়। কাজেই এর বেশী দেখা উচিত নয়। ইমাম আওজায়ী বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

তার প্রতি তাকানো যাবে, খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখা যাবে এবং তার মাংসপেশীসমূহ দেখা যাবে।

আর দাউদ জাহেরী বলেছেনঃ (আরবী***********************) –‘তার সর্বশরীর দেখা যাবে’।

ইবনে হাজম তো এতদূর বলেছেনঃ (আরবী*********************) –‘তার যৌন অঙ্গকেও দেখে নেয়া যেতে পারে’।

কিন্তু অপরাপর মনীষীর মতেঃ

(আরবী******************************************************)

প্রস্তাবিত মেয়েটির লজ্জাস্থানসমূহ বিয়ের পূর্বে দেখা জায়েয নয়।

এভাবে বিষয়টি নিয়ে মনীষীদের মধ্যে মতবিরোধ হওয়ার একটি কারণ রয়েছে, আর তা এই যে, এই পর্যায়ের হাদীসসমূহ শুদু দেখার অনুমতি অকাট্য ও সুস্পষ্টভাবে দেয় বটে, কিন্তু তার কোনো পরিমাণ, মাত্রা বা সীমা নির্দেশ করে না। তবে কনে সম্পর্কে সম্যক ধারনা করা যায় এবং বিয়ে করা না করা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয় যতখানি এবং যেভাবে দেখলে, ততখানি এবং সেভাবে দেখা অবশ্যই জায়েয হবে, সন্দেহ নেই।

হাদীসে উল্লেক করা হয়েছে, হযরত উমর ফারূক (রা) হযরত আলী তনয়া উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন হযরত আলী কন্যাকে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যেন তারা তাকে দেখে নিতে পারেন। তখন এই ‘দেখার’ উদ্দেশ্যেই হযরত উমর উম্মে কুলসুমের পায়ের দিকের কাপড় তুলে ফেলে দিয়েছিলেন।

তার পরের প্রশ্ন, কনের অনুমতি ও জ্ঞাতসারে দেখা উচিত, কি অনুমতি ব্যতিরেকে ও অজ্ঞাতসারেই? এ সম্পর্কেও বিভিন্ন মত দেখা যায়। ইমাম মালিক বলেছেনঃ

(আরবী************************************)

কনের অনুমতি ব্যতিরেকে তাকে দেখা যাবে না, তার প্রতি তাকানো যাবে না। কেননা তাকে দেখার জন্যে তার অনুমতি নেয়া তার অধিকার বিশেষ (বিনানুমতিতে দেখলে সে অধিকার ক্ষুণ্ন হয়)।

ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

কনে যদি বস্ত্রাচ্ছাদিতাই থাকে, তবে তার অনুমতি নিয়েই দেখা হোক কি বিনানুমতিতে, তার দুটিই সমান।

তবে এ সম্পর্কে রাসূলে করীমের একটি কথা স্পষ্ট পথ-নির্দেশ করে এবং তার দ্বারা মতবিরোধের অবসান হয়ে যায়। আবূ হুমাইন সায়েদী বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*************************************)

তোমাদের কেউ যখন কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, তখন তাকে দেখা তার পক্ষে দুষণীয় নয়। কেননা সে কেবলমাত্র এই বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার কারণেই তাকে দেখছে (অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়) যদিও সে স্ত্রীলোকটি কিছুই জানে না।

এ হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, কনেকে যদি দেখা হয় শুধু এজন্যে যে, তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এবং এ দেখার মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, পছন্দ হলেই তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে, তবে সে দেখা যদি কনের অজ্ঞাতসারেও হয়, তবুও তাতে কোনো দোষ হবে না।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা পরিস্কার বলে দেয়া ভালো। যদি কারো নিত্য নতুন যুবতী মেয়ে দেখা শুধু দর্শনসুখ লাভের বদরুচি হয়ে থাকে, তবে তাকে কোনো মেয়েকে দেখানো জায়েয নয়। এ সম্পর্কে ইসলামবিদদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেইঃ

(আরবী***********************************************)

কোনো মেয়েলোকের প্রতি যৌনসুখ লাভ, যৌন উত্তেজনার দরুন কিংবা কোনো সন্দেহ সংশয় মনে পোষণ করে দৃষ্টিপাত করা জায়েয নয়।

এজন্যে ইমাম আহমাদ বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

কনের চেহারা ও মুখমণ্ডলের দিকে দেখা যাবে, তবে যৌনসুখ লাভের জন্যে নয়। এমন কি তার সৌন্দর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করার উদ্দেশ্যে তার প্রতি বারবার তাকানো যেতে পারে।

কোনো কোনা মনীষীর মতে কনের অজ্ঞাতসারেই তাকে দেখা উচিত, যেমন হযরত যাবির (রা) দেখেছিলেন। ইমাম শাফিয়ীর মতে বিয়ের প্রস্তাব রীতিমত পেশ করার পূবেই কনেকে দেখে নেয়া বাঞ্ছনীয়, যেন প্রস্তাব কোনো কারণে ভেঙ্গে গেলে কোন পক্ষের জন্যেই লজ্জা বা অপমানের কারণ না ঘটে। (আরবী********************)

আর বরের নিজের পক্ষে যদি কনেকে দেখা আদৌ সম্ভব না হয়, তাহলেও অন্তত নির্ভরযোগ্য সূত্রে তার সম্পর্কে যাবতীয় বিষয়ে সম্যক খোঁজ-খবর লওয়া বরের পক্ষে একান্তই আবশ্যক। এ উদ্দেশ্যে আপন আত্মীয়া স্ত্রীলোককে পাঠানো যেতে পারে তাকে দেখার জন্যে। হযরত আনাস (রা) বর্ণিত একটি হাদীস থেকে এ সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়। নবী করীম (স) একটি মেয়েকে বিয়ে করার মনস্থ করেন। তখন তাকে দেখার জন্যে অপর একটি স্ত্রীলোককে পাঠিয়ে দেন এবং তাকে বলে দেনঃ

(আরবী******************************)

কনের মাড়ির দাঁত পরীক্ষা করবে এবং কোমরের উপরিভাগ পিছন দিক থেকে ভালোকরে দেখবে।

বলা বাহুল্য, দেহের এ দুটি দিক একজন নারীর বিশেষ আকর্ষনীয় দিক। দাঁত দেখলে তার বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান-প্রতিভা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা চলে। তার মুখের গন্ধ মিষ্টি না ঘৃণ্য তাও বোঝা যায়। আর পেছন দিক দিয়ে কোমরের উপরিভাগ একটি নারীর বিশেষ আকর্ষনীয় হয়ে থাকে। এ সব দিক দিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যে রাসূলে করীম (স) তাগিদ করেছেন। তার অর্থ বিয়ের পূর্বে কনের এসব দিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা করে নেয়া ভালো।

এ পর্যায়ে একটি কথা বিশেষভাবে মনে করাখা আবশ্যক যে, কনে দেখার কাজ আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পূর্বে সম্পন্ন করাই যুক্তিযুক্ত। আল্লামা আ-লুসী বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

মনীষীগণ আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পূর্বেই কনে দেখার এই কাজটি সম্পন্ন করা উচিত বলে মনে করেছেন। দেখার পর পছন্দ না হলে তা প্রত্যাহার করবে। তাতে কারো মনে কষ্ট লাগবে না বা অসুবিধা হবে না। কিন্তু রীতিমত প্রস্তাব দেয়ার পর দেখে অপছন্দ হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যান করা হলে তার পরিণাম যে ভালো নয় তা সুস্পষ্ট।

বিয়ের পূর্বে কনে দেখার অনুমতির সুযোগ নিয়ে কনের সাথে প্রেম চর্চা করা, নারী বন্ধু কিংবা পুরুষ বন্ধু সংগ্রহের অভিযান চালানো, আর দিনে রাতে ভাবী স্ত্রী (?) –কে নিয়ে যত্রতত্র নিরিবিলিতে পরিভ্রমণ করেবেড়ানো ও যুবতী নারীর সঙ্গ সন্ধানে মেতে ওঠা ইসলামে শুধু যে সমর্থনীয় নয় তাই নয়; নিতান্ত ব্যভিচারের পথ উন্মুক্ত করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা হচ্ছে ইউরোপের আধুনিক বিজ্ঞান গঠিত বর্বর সমাজের ব্যভিচার প্রথা। ইউরোপীয় সভ্যতার দৃষ্টিতে বিয়ের পূর্বে শুধু কনে দেখাই হয় না, স্বামী-স্ত্রীর ন্যায় যৌন সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রেমের আদান-প্রদানও একান্তই জরুরী। বরং তা আধুনিক সভ্যতার একটা অংশও বটে। এ সব না হলে বিয়ে হওয়ার কথাটাই সেখানে অকল্পনীয়। এ না হলে নাকি বিবাহোত্তর দাম্পত্য জীবনও মধুময় হতে পারে না। পাশ্চাত্য সমাজের এ বিকৃতি যুবক-যুবতীদের কোনো রসাতলে ভাসিয়ে নিচ্ছে, তার কল্পনাও লোমহর্ষণের সৃষ্টি করে।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এ হচ্ছে সুস্পষ্ট ব্যভিচার –ব্যভিচারের এক আধুনিকতম সংস্করণ। শুধু তাই নয়। বিয়ে পূর্বকালীন প্রেম ও যৌন মিলন মূল বিয়েকেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ করে দেয়। বিবাহোত্তর মিলন হয় বাসি ফুলের ন্যায় গন্ধহীন। কৌতুহলশূন্য। বস্তুত বিয়ে পূর্বকালীন প্রেম ও যৌন মিলন একটা মোহ –একটা উদ্বেলিত আবেগের বিষক্রিয়া। বিয়ের কঠিন বাস্তবতা সে মোহ ও উচ্ছ্বাসকে নিমেষে নিঃশেষ করে দেয় ঠুনকো কাঁচ পাত্রের মতো। এ সম্পর্কে একটি আরবী রূপকথার যথার্থতা অস্বীকার করা যায় না। তাতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************)

বিয়ে বিয়ে-পূর্ব প্রেম-ভালোবাসাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয় –ধ্বংস করে ফেলে।

বিয়ের পূর্বে কনেকে দেখার এই অনুমতি, এই আদেশ –যে কোন দৃষ্টিতেই বিচার করা হোক, সুষ্ঠু পারিবারিক জীবনের জন্যে ইসলামের এক মহা অবদান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে রাখা আবশ্যক যে, এই অনুমতি বা আদেশ কেবল মাত্র বিবাহেচ্ছু বরের জন্যেই নয়, এই অনুমতি প্রস্তাবিত কনের জন্যেও সমানভাবেই প্রযোজ্য। তারও  অধিকার রয়েছে যে পুরুষটি তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক তাকে দেখার। কেননা যে প্রয়োজনের দরুন এই অনুমতি, তা কনের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ সমানভাবে সত্য ও বাস্তব। হযরত উমর (রা) বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

তোমরা তোমাদের কন্যাদের কুৎসিৎ অপ্রীতিকর পুরুষের নিকট বিয়ে দিও না। কেননা নারীর যেসব অংশ পুরুষের জন্যে আকর্ষনীয়, পুরুষের সে সব অংশই আকর্ষনীয় হয় কন্যাদের জন্যে। অতএব তাদেরও অধিকার রয়েছে বিয়ের পূর্বে ভাবী-বরকে দেখার।

পরে প্রকাশিত ত্রুটির কারণে বিয়ে প্রত্যাহার

যথারীতি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী যদি নিশ্চিতরূপে জানতে পারে কিংবা প্রত্যক্ষ করতে পারে স্ত্রীর শারীরিক বা স্বাস্থ্যগত এমন কোনো দোষ, যা বর্তমান থাকায় সে কিছুতেই স্ত্রীকে খুশী মনে গ্রহণ করতে রাজি হতে পারে না, তাহলে স্বামী কেবল এই অবস্থায় বিয়েকে প্রত্যাহার করতে পারে –শরীয়তে তাকে এ অধিকার দেয়া হয়েছে। চিরদিনের তরে এক দুর্বহ বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেয়ার ও চাপিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রথম অবস্থায়ই তা প্রত্যাহার করা বাঞ্ছনীয়। হযরত জায়েদ ইবনে কায়াব (রা) বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

রাসূলে করীম (স) বনী গিফার গোত্রের একটি মহিলাকে বিয়ে করে ফুলশয্যার সশয় যখন তার কাছে উপস্থিত হলৈন এবং তার কাপড় উত্তোলন করে শয্যার ওপর বসলেন, তখন তিনি স্ত্রীলোকটি পাঁজরে শ্বেত রোগ দেখতে পেলেন। তিনি তখনই শয্যা থেকে উঠে গেরেন এবং বললেনঃ ‘তোমার কাপড় সামলাও’। অতঃপর তিনি তার থেকে নিজের দেয়া কোনো কিছুই গ্রহণ করলেন না।

এ হাদীসের ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, শ্বেত, কুষ্ঠ, পাগল ও মতিচ্ছিন্ন হওয়া এমন সব প্রচ্ছন্ন রোগ, যা স্বামী-স্ত্রী কারোর পক্ষেই তার নিকট সাহচর্যে আসার পূর্বে জানতে পারা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। কাজেই বিয়ের পরই এসব রোগ কারো মধ্যে উদঘাটিত হলে তাদের বিয়ে আপনা থেকেই ভেঙ্গে যাবে।

হযরত আলী (রা) ও অন্যান্য সাহাবীদের থেকে এ সম্পর্কে যে কথাটি বর্ণিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************************)

স্ত্রীদের চারটি দোষে বিয়ে ফেরত যেতে পারে –তা হচ্ছে পাগলামী, মতিচ্ছিন্ন হওয়া, কুষ্ঠ রোগ, শ্বেত রোগ এবং যৌন অঙ্গের কোনো রোগ।

বলা বাহুল্য, এ যেমন স্ত্রীর ব্যাপারে প্রযোজ্য, তেমনি স্বামীর ব্যাপারেও। যারই মধ্যে তা দেখা দিক না কেন, অপরজনের পক্ষে সে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়া শরীয়তে জায়েয।

শাফিয়ী ফিকাহবিদদের কারো কারো মতে যে-কোনো পরে-প্রকাশিত ত্রুটির কারণে বিয়ে প্রত্যাহার করা ও স্ত্রীকে ফেরত দেয়া যেতে পারে। আল্লামা ইব কাইয়্যিম এই মতই সমর্থন করেছেন।

অবশ্য ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম আবূ ইউসুফ বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

স্বামী কোনো কারণেই স্ত্রীকে প্রত্যাহার করতে পারে না। কেননা তার হাতেই রয়েছে তালাক দেয়ার ক্ষমতা। (সে ইচ্ছা করলে যে কোন সময় তালাক দিতে পারে বলে স্ত্রীকে প্রত্যাহার বা প্রত্যাখ্যানের কোনো মানে হয় না।) আর স্ত্রী স্বামীকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে কেবলমাত্র কোন সংক্রামক রোগ ও সহবাসে অক্ষমতা, নপুংসতার দরুন। ইমাম মুহাম্মাদের মতে কুষ্ঠু ও শ্বেত রোগের কারণেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

আল্লামা ইবনে রুশদ লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

উপরিউক্ত চার ধরনের ত্রুটির কারণে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে –এ সম্পর্কে ইমাম মালিক ও শাফিয়ী সম্পূর্ণ একমত।

 

ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যাপারে পিতামাতার দায়িত্ব

ছেলেমেয়ের জৈবিক স্বাস্থ্য রক্ষা ও জৈবিক পূরণ তথা সুষ্ঠু লালন-পালনের যেমন দায়িত্ব হচ্ছে পিতামাতার, তেমনি তাদের যৌন প্রয়োজন পূরণ করে তাদের নৈতিক স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বও পিতামাতার। এজন্যে বিয়ের বসয় হলেই তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা আবশ্যক এবং এ দায়িত্ব প্রধানত তাদের পিতামাতার আর তাদের অবর্তমানে অন্য অভিভাবকের।

নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী*************************************)

যার কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, তার উচিত তার জন্যে ভালো নাম রাখা এবং তাকে ভারো আদব-কায়দা শিক্ষা দেয়া। আর যখন সে বালেগ –পূর্ণ বয়স্ক ও বিয়ের যোগ্য হবে, তখন তাকে বিয়ে দেয়া কর্তব্য। কেননা বালেগ হওয়ার পরও যদি তার বিয়ের ব্যবস্থা করা না হয়, আর এ কারণে সে কোনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার গুনাহ তার পিতার ওপর বর্তাবে।

এ হাদীসে প্রথমত ছেলেমেয়ের ভালো নাম রাখা ও তাকে ভালো আদব-কায়দা শেখানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার পরই বলা হয়েছে যে, ছেলে সন্তান –ছেলে বা মেয়ে –বালেগ হলে অনতিবিলম্বে যদি তার বিয়ের ব্যবস্থা করা না হয়, তার বিয়ের ব্যাপারে যদি পিতামাতা-অভিভাবক কোনোরূপ অবহেলা ও উপেক্ষা প্রদর্শন করে আর তার ফলে তার বিয়ে বিলম্বিত হওয়ার দরুন যদি তার দ্বারা কোনো গুনাহের কাজ সংঘটিত হয়, তাহলে সে গুনাহের দায়িত্ব থেকে পিতামাতা বা অভিভাবক কিছুতেই রেহাই পেতে পারে না। মওলানা ইদরীস কান্ধেলুভী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

অর্থাৎ তার গুনাহের শাস্তি তার পিতাকে ভোগ করতে হবে। কেননা এই ব্যাপারটি তারই ত্রুটি ও অবহেলার দরূন হতে পেরেছে।

অতঃপর লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************)

এ হাদীস থেকে ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যাপারে অবহেলা করার জন্যে পিতার প্রতি অতিরিক্ত শাসন, ধমক ও কঠোর বাণী জানা যায় এবং এ সম্পর্কে যথেষ্ট তাগিদ রয়েছে বলেও বোঝা যায়।

হযতর উমর ও আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************************)

তওরাত কিতাবে লিখিত রয়েছে, যার কন্যা বারো বছর বয়সে পৌঁছেছে আর তখনো যদি তার বিয়ের ব্যবস্থা না করে, এর ফলে যদি সে কোনো গুনাহ করে বসে তবে এ গুনাহ তার পিতার ওপর বর্তাবে।

এ দুটি হাদীস থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সন্তান বালেগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সেই সঙ্গে বয়স্ক ছেলেমেয়েরও কর্তব্য হচ্ছে এজন্যে নিজেকে সর্বতোভাবে প্রস্তুত করা।

এ পর্যায়ে হাদীসে আরো কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। অপর এক হাদীসে রাসূলে করীম (ষ) পিতামাতাকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

তোমাদের নিকট যদি এমন কোনো বর বা কনের বিয়ের প্রস্তাব আসে, যার দ্বীনদারী ও চরিত্রকে তোমরা পছন্দ করো, তাহলে তাঁর সাথে বিয়ে সম্পন্ন করো। যদি তা না করো, তাহলে জমিতে বড় বিপদ দেখা দেবে এবং সুদূরপ্রসারী বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে।

অর্থাৎ বিয়ের ব্যাপারে বর বা কনের শুধু দ্বীনদারী ও চরিত্রই প্রধানত ও প্রথমত লক্ষণীয় জিনিস। এ দিক দিয়ে বর বা কনেকে পছন্দ হলে ও যোগ্য বিবেচিত হলে অন্য কোনো দিকে বড় বেশী দৃষ্টিপাত না করে তার সাথে বিয়ে সম্পন্ন করা কর্তব্য। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ এসব দিক দিয়ে যোগ্য বর বা কনে পাওয়া সত্ত্বেও যদি তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা না কর –তার সাথে বিয়ে সম্পন্ন করতে রাজি না হও, তাহলে তার পরিণাম অত্যন্ত খারাপ হবে। আর সে খারাপ পরিণামের রূপ হচ্ছে ভয়ানক বিপদ ও ব্যাপক বিপর্যয়। এর ব্যাখ্যা করে মওলানা ইদরীস কান্ধেলুভী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

যার দ্বীনদারী তোমরা পছন্দ করো, সে ছেলের বা মেয়ের সাথে যদি তোমরা বিয়ে সম্পন্ন না করো বরং তোমাদের দৃষ্টি উদগ্রীব হয়ে তাকে ধন-মাল ও সম্মান সম্ভ্রম সম্পন্ন কোনো বর বা কনের সন্ধানে যেমন দুনিয়াদার লোকেরা করে থাকে –তাহলে বহুসংখ্যক মেয়ে স্বামীহীনাএবং বহু সংখ্যক পুরুষ স্ত্রীহীনা অবিবাহিত হয়ে থাকতে বাধ্য হবে। আর এরই ফলে জ্বেনা-ব্যভিচার ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে এবং সমাজে দেখা দেবে নানারূপ ফিতনা-ফাসাদ ও বিপদ-বিপর্যয়।

বিয়ের বয়স

ছেলে বা মেয়ের বিয়ের জন্যে কোনো বয়স-পরিমাণ নির্দিষ্ট আছে কি? কত বয়স হলে পরে ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেয়া যেতে পারে, আর কত বয়ষ পূর্ণ না হলে বিয়ে দেয়া উচিত হতে পারে না আধুনিক যুগের সমাজ-মানসে এ এক জরুরী জিজ্ঞাসা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ের বিয়ের জন্যে একটা বয়স পরিমাণ আইনের সাহায্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, এত বয়স না হলে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দেয়া চলবে না, এ সম্পর্কে ইসলামের অভিমত কি?

এই পর্যায়ে হযরত আয়েশা (রা)-র নিম্নোক্ত উক্তি থেকে কিছুটা পথের সন্ধান লাভ করা যায়। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

রাসূলে করীম (স) আমাকে বিয়ে করেন যখন আমার বয়স মাত্র ছয় বছর, আর আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধেন যখন আমি নয় বছরের মেয়ে।

অপর এক হাদীসে এক সাহাবীর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী************************************************)

রাসূলে করীম (স) হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেন, যখন তাঁর বয়স নয়।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

নবী করীম (স) হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেছিলেন যখন তিনি ছোট্ট ছিলেন, তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।

নবী করীম (স) নিজে যখন হযরত আয়েশাকে ছয় কিংবা নয় বছর বয়সে বিয়ে করলেন তখন এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসলামে ছেলেমেয়ের বিয়ের জন্য কোনো নিম্নতম বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। যে-কোনো বয়সের ছেলেমেয়েকে যে-কোনো সময় অনায়াসেই বিয়ে দেয়া যেতে পারে।

এই পর্যায়ে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী মনীষী ইবনে বাত্তালের নিম্নোক্ত উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ

(আরবী**************************************************************)

ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, পিতার পক্ষে তার ছোট্ট বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয –বৈধ, যদিও সে মেয়ে দোলনায় শোয়া শিশুই হোক না কেন। তবে তাদের স্বামীদের পক্ষে তাদের নিয়ে ঘর বাঁধা কিছুতেই জায়েয হবে না, যতক্ষণ তারা যৌন সঙ্গম কার্যের জন্যে পূর্ণ যোগ্য এবং পুরুষ গ্রহণ ও ধারণ করার সামর্থ্যসম্পন্না না হচ্ছে।

ইমাম নববী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

পিতার পক্ষে তার ছোট্ট মেয়েকে বিয়ে দেয়া জায়েয হওয়া সম্পর্কে সমস্ত মুসলমানই একমত হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে কোনো বয়স নির্দিষ্ট করা চলে না এজন্যে যে, সব মেয়েই স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যের দিক দিয়ে সমান হয় না, হয় বিভিন্ন রকমের ও প্রকারের। এমন কি বংশ-গোত্র, পারিবারিক জীবন-মান ও আবহাওয়ার পার্থক্যের দরুনও এদিক দিয়ে মেয়েদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য হয়ে থাকে। এজন্যে কোনো এক নীতি বা কোনো ধরাবাঁধা কথা এ ব্যাপারে বলা যায় না। তাই বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী***************************************************************)

মেয়েদের জন্মগত পরিমিতি ও স্বাস্থ্যগত সামর্থ্য, যোগ্যতা এবং ক্ষমতা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।

অতএব ঠিক কত বয়সে যে মেয়েদের বিয়ে দেয়া উচিত আর কত বয়সে নয়, তা নির্দিষ্ট করে বলা এবং এজন্যে কোনো বয়স নির্দিষ্ট করে দিয়ে তার পূর্বে বিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন জারি করা আদৌ যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

তাছাড়া বিয়ে বলতে কি বোঝায়, তাও ভেবে দেখা দরকার। কেননা ‘বিয়ে’ বলতে যদি স্বামী-স্ত্রী যৌন মিলন ও তদুদ্দেশ্যে ঘর বাঁধা বোঝায়, তাহলে তা যে, ছেলেমেয়ের পূর্ণ বয়স্ক (বালেগ) হওয়ার পূর্বে আদৌ সম্ভব হতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। আর যদি বিয়ে বলতে শুধু আকদ ও ঈজাব-কবুলমাত্র বোঝায় তাহলে তা যে কোন বয়সেই হতে পারে। এমন কি দোলনায় শোয় বা দুগ্ধপোষ্য শিশুরও হতে পারে তার পিতার নেতৃত্বে। ইসলামী শরীয়তে এ বিয়ে নিষিদ্ধ নয় এবং এতে অশোভনও কিছু নেই।

এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামবিদ ড. মুস্তফা আস-সাবায়ী লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

চারটি মাযহাবের ইজতিহাদী রায় এই যে, ‘বালেগ’ হয়নি –এমন ছোট ছেলেমেয়ের বিয়ে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও বৈধ।

কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা এবং নবী করীম (স)-এর যুগে ও তাঁর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলীর ভিত্তিতে উপরিউক্ত কথার যৌক্তিকতা ও প্রামাণিকতা অনস্বীকার্য।

অবশ্য কিছু সংখ্যক ফিকাহবিদ; যেমন –ইবনে শাবরামাতা ও আল-বাতী উপরিউক্ত কথার বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে ছোট বয়সের ছেলেমেয়ের কোনো রকম বিয়েই আদৌ জায়েয নয়। আর তাদের অভিভাবকগণ তাদের পক্ষ থেকে উকীল হয়ে যেসব বিয়ে সম্পন্ন করে থাকে, তা সম্পূর্ণ বাতিল, তাকে বিয়ে বলে ধরাই যায় না।

বস্তুত শরীয়তে বিয়ের আদেশ এবং এ সম্পর্কিত যাবতীয় বিধান উপদেশ এই শেষোক্ত মতকেই সমর্থন করে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেয়ার বাস্তব কোনো ফায়দাই নেই, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে ছোট বয়সের বিয়ে ছেলেমেয়েদের নিজেদের জীবনে কিংবা উভয় পক্ষের অলী-গার্জিয়ানদের জীবনে নানা প্রকারের জটিলতারই সৃষ্টি করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। যে বিয়েতে ছেলেমেয়ে বড় হয়ে নিজেদেরকে এমন এক বিয়ের বন্ধনে বন্দী-দশায় দেখতে পায়, যে বিয়েতে তাদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। আবার অনকে বিবাহিত ছেলেমেয়ে বড় ও বয়স্ক হওয়ার পর মন-মেজাজ ও স্বভাব-চরিত্রে পরস্পরে এমন পার্থক্য দেখতে পায়, যাতে করে দাম্পত্য জীবনের প্রতি তারা কোনো আকর্ষণই বোধ করতে পারে না। ফলে উভয় পক্ষের গার্জিয়ানদের মধ্যেও যথেষ্ট তিক্ততা এবং শেষ পর্যন্ত পরস্পরে প্রবল বিরোধ ও প্রকাশ্য শত্রুতা দেখা দেয়াও বিচিত্র কিছু নয়।

প্রাচীনকালে ইসলামী সমাজ-ব্যবস্থার পতন ও ভাঙ্গনের পর এমন এক সময় ছিল, যখন ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে তাদের কোনো মতামত নেয়া হতো না, আর তা ব্যক্ত করার জন্যেও অনুকূল পরিবেশ বর্তমান ছিল না। ফলে এ কাজ অলী-গার্জিয়ানরাই নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে একান্তভাবে নিজেদের মতে এ কাজ সম্পন্ন করত। শেষ পর্যন্ত তারা এ কাজ ছেলেমেয়েদের অত্যন্ত ছোট বয়সকলেই সম্পন্ন করে ফেলতে শুরু করল। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এ ধরনের কাজকে ‘খুব ভালো কাজ’ বলে কখনোই ঘোষণা করেনি, না পারিবারিক ও দাম্পত্য সুখ-শান্তির দৃষ্টিতে এ কাজ কখনো কল্যাণকর হতে পারে। ছোট বয়সের বিয়েতে ছেলেমেয়েদের জীবনে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করা গেছে, তদ্দরুন এর প্রতি বর্তমান সমাজ-মানসে অতি যুক্তিসঙ্গতভাবেই তীব্র ঘৃণা ও প্রতিরোধ জেগে উঠেছে। এ কাজকে আজ কেউই ভালো ও শোভনীয় বা  সমর্থনীয় মনের করতে পারছে না।

কিন্তু তাই বলে বিয়ের একটা বয়স নির্দিষ্ট করা এবং তার পূর্বে বিয়ে অনুষ্ঠানকে আইনের জোরে নিষিদ্ধ করে দেয়া, এমন কি যদি কেউ তা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযুক্ত জেল-জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত করা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। ইসলামী শরীয়তে ছোট বয়সে ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিতে হুকুম করা হয়নি কিংবা স জন্যে উৎসাহও দেয়া হয়নি। কিন্তু এ কাজ যদি কোনো পিতা –গার্জিয়ান করেই –করা অপরিহার্য বলে মনে করে নানা বৈষয়িক বা সামাজিক কারণে, তাহলে তাকে জেল-জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত করার আইন প্রণয়নের অধিকার ইসলামী শরীয়তে কাউকেই দেয়া হয়নি।

বস্তুত ইসলামী আদর্শের দৃষ্টিকোণ এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট। ইসলাম ব্যাপারটিকে উন্মুক্ত রেখে গিয়েছে এবং সমাজ-সংস্থার শান্তি-শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে তাই থাকা উচিত সর্বত্র। বিয়ে-শাদী সম্পর্কে ইসলামের সাধারণ আদেশ উপদেশ দাবি করে যে, পূর্ণ বয়সে ও কার্যত যৌন-সঙ্গমে সক্ষম হওয়ার পরই বিয়ে সম্পন্ন হওয়া উচিত। তবে তার পূর্বে বিয়ে অনুষ্ঠান করাকে নিষেধও করা হয়নি। কেননা ব্যাপারটি পিতা ও সমাজের সাধারণ অবস্থার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে যদি কোনো পিতা বা দাদা তার মেয়ে বা নাতনীকে ছোট বয়সে –বালেগা হওয়ার পূর্বেই বিয়ে দিয়ে দেয় আর বালেগা হওয়ার পর যদি সে স্বামী তার পছন্দ না হয় তাহলে সে সেই বিয়েকে অস্বীকার করতে পারবে –শরীয়তে তার অবকাশ রয়েছে। ইমাম নববী উল্লেখ করেছেনঃ

(আরবী***********************************)

ইরাকী ফকীহগণ বলেছেন, ছোট্ট বয়সে বিয়ে দেয়া মেয়ে বালেগা হয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার রাখে। (নববী শরহে মুসলিম)

তিনি আরও লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************)

ইমাম আওযায়ী, আবূ হানীফা ও  পূর্ববর্তী ফকীহগণ বলেছেন, ছোট্ট মেয়ে বিয়ে দেয়া সব কর্তৃপক্ষের জন্যেই জায়েয। তবে সে যখন বালেগা হবে, তখন সে বিয়ে রক্ষা করা কি ভেঙ্গে দেয়ার পূর্ণ ইখতিয়ার তার নিজের। ইমাম আবূ ইউসুফ অবশ্য এ থেকে ভিন্ন মত পোষণ করেন।

এমতাবস্থায় ছোট্ট মেয়ে বিয়ে দেয়ার অনুমতি থাকায় মেয়েদের জন্যে কোনো ক্ষতিকারক হবে না। বালেগা হলে পরে তার বিয়ের প্রকৃত মালিক তো সে নিজেই। ইচ্ছা হলে ভেঙ্গে দিতে পারে। বিয়ের জন্যে ছেলেমেয়ের কোনো বয়স নির্দিষ্ট করে দিয়ে ইসলাম পিতা বা গার্জিয়ানকে একটা বিশেষ বাধ্যবাধকতার মধ্যে বেঁধে দেয়নি। এ হচ্ছে বিশ্বমানবতার প্রতি ইসলামের বিশেষ অনুগ্রহ।

তাই একথা বলা যায় যে, বিয়ের কোনো বয়স নির্দিষ্ট করে দেয়া, তার পূর্বে বিয়ে নিষিদ্ধ এবং তার জন্যে দণ্ড দান করা ইসলামের পরিপন্থী। মানবীয় নৈতিকতার দৃষ্টিতেও এ কাজ অত্যন্ত অসমীচীন। ইসলামের কোনো ফিকাহবিদই এ বিষয়টি সমর্থন করেন নি। বরং এ হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয় সমাজ-আদর্শ এবং সেখান থেকেই এর অনুকূলে মতবাদ ও আইনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে দুনিয়ার বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও রাষ্ট্রে। এ হচ্ছে ইউরোপের সাংস্কৃতিক গোলামীর এক লজ্জ্বাকর দৃষ্টান্ত।

বর-কনের পারস্পরিক বয়স পার্থক্য

 বর-কনের পারস্পরিক বয়স পার্থক্য ও সামঞ্জস্য সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রথম কথা এই যে, সাধারণভাবে এ দুয়ের বয়সে খুব বেশী পার্থক্য হওয়া উচিত নয়। তাতে দাম্পত্য জীবনে অনেক ধরনের দুঃসাধ্য জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। এ হচ্ছে সাধারণ অবস্থার কথা। আর ইসলামে এ সাধারণ অবস্থার প্রতিই দৃষ্টি রেখে বলা হয়েছে যে, বর-কনের বয়স সাধারণত সমান-সমান হলেই ভালো হয়। নাসায়ী শরীফে উদ্ধৃত হাদীসের একটি অধ্যায় রচিত হয়েছে এ ভাষায়ঃ

(আরবী********************************************)

সমান-সমান বয়সে বর-কনের বিয়ের অধ্যায়।

এবং এর পরে হযরত ফাতিমা (রা)-কে হযরত আলী (রা)-র নিকট বিয়ে দেয়ার প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে।

অপরদিকে পিতা বা অলীকে বলা হয়েছে যে, তারা যেন নিজেদের মেয়েকে বয়সেরদিক দিয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন লোকের কাছে বিয়ে না দেয়। এজন্যে ফিকাহবিদগণ তাগিদ করে বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

পিতা বা অলী যেন তার যুবতী মেয়েকে খুনখুনে বুড়ো বা কুৎসিৎ চেহারার লোকের নিকট বিয়ে না দেয়।

তবে সেই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, এ ব্যাপারেও ব্যতিক্রম হতে পারে। কেননা দুনিয়ার সব পুরুষই এক রকম হয় না। অনেক বয়স্ক লোকও এমন হতে পারে –হয়ে থাকে, যারা পূর্ণ স্বাস্থ্যবান, সামর্থ্যবান ও দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম। আর অনেক বুড়োও স্বীয় যুবতী স্ত্রীকে প্রেম-ভালোবাসা, যৌন সুখ-তৃপ্তি ও আনন্দ-উৎসাহের মাদকতায় অনেক যুবকের তুলনায় অধিক মাতিয়ে রাখতে পটু হয়ে থাকে। হযরত আয়েশার বয়স যখন ছয় বছর, তখন নবী করীম (স)-এর সাথে তাঁর বিয়ের আক্দ হয়েছিল এবং নবী করীম (স) তাঁকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন যখন তাঁর বয়স হয়েছিল নয় বছর, একথা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। আর রাসূলে করীমের বয়স ছির এ সময় পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এতদুভয়ের দাম্পত্য জীবনের সুখ ও আনন্দের কথা বিশ্বের সকল যুবতীর আদর্শ হয়ে রয়েছে।

কিন্তু তাই বলে দুনিয়ার উপস্থিত কোনো স্বার্থের বশবর্তী হয়ে যদি এরূপ কাজ করা হয়, তাহলে তার পরিণাম অত্যন্ত মারাত্মক হতে বাধ্য। বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু ও বিপর্যস্ত মুসলিম সমাজে এর দৃষ্টান্ত কিছু মাত্র বিরল নয়। অনেক খুনখুনে বুড়ো –যে দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে আদৌ সামর্থবান নয়, তার নিকট যুবতী মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয় বিপুল পরিমাণ টাকা-পয়সার বিনিময়ে, ফলে সে মেয়ে বুড়ো স্বামীর নিকট দাম্পত্য সুখলাভে বঞ্চিতা থাকে। তখন সে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করতে শুরু করে অথবা পাপোর পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়। ইসলামী শরীয়ত এ ধরনের বিয়েকে যদিও স্পষ্ট ভাষায় হারাম করেদেয়নি, কিন্তু শরীয়তের ঘোষিত দাম্পত্য জীবনের আদর্শ ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে অনায়াসেই বলা যায় যে, এরূপ কাজ অত্যন্ত আপত্তিকর ও অভিসম্পাতের ব্যাপার। কোনো কোনো ফিকাহবিদ অবশ্য এ ধরনের বিয়েকে হারাম মনে করেন। ‘কালইউবী’ আল-মিনহাজ গ্রন্থের টীকায় লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************)

ছোট মেয়েকে বৃদ্ধ ও অন্ধ প্রভৃতির নিকট বিয়ে দেয়া যদিও শুদ্ধ; কিন্তু এরূপ বিয়ে করা তার পক্ষে হারাম। অধিকাংশ ফিকাহবিদই একথা বলেছেন।

হযরত আয়েশা (রা) পূর্বে অবিবাহিত মেয়ে বিয়ে করার গুরুত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে একদা নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ

(আরবী********************************************)

হে রাসূল, আপনি যদি কোনো চারণভূমিতে জন্তু-জানোয়ার নিয়ে অবতীর্ণ হন, আর সেখানে এমন গাছ দেখতে পান, যার পাতা খাওয়া হয়ে গেছে এবং এমন গাছ পান যা থেকে এখনো কিছু খাওয়া হয়নি, তাহলে তখন আপনি আপনার উটকে কোন গাছ থেকে পাতা খাওয়াতে চাইবেন?

এ জবাবে নবী করীম (স) বললেনঃ

(আরবী**********************************)

খাওয়াব সেই গাছ থেকে, যার থেকে এখনো কিছু খাওয়া হয়নি।

হাদীস বর্ণনাকারী নিজেই বলেন, একথার মানে তিনি নিজেই সেই গাছ, যা থেকে পূর্বে ‘খাওয়া’ হয়নি অর্থাৎ নবী করীম (স) কেবলমাত্র হযরত আয়েশা (রা)-কেই বাকারা (কুমারী) অবস্তায় বিয়ে করেছেন। এ বিয়ের পূর্বে তাঁর কোনো বিয়ে হয়নি, তাঁকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রা) একদা হযরত আয়েশাকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ

(আরবী*********************************************)

নবী করীম (স) আপনাকে ছাড়া ‘বাকারা’ কুমারী অবস্থায় আর কাউকে বিয়ে করেন নি।

‘বাকারা’ –পূর্বে বিয়ে হয়নি এমন মেয়ে অনাঘ্রাত কুসুমের ন্যায়। তাকে কেউ স্পর্শ করেনি, তার ঘ্রাণ কেউ গ্রহণ করেনি, তার মুখের ও বুকের মধু কেউ ইতিপূর্বে আহরণ করে নেয়নি। সবই যথাযথ পুঞ্জীভূত রয়েছে। কাজেই এ ধরনের মেয়ে বিয়ে করার জন্যে ইসলামে উৎসাহ দান করা হয়েছে।

এজন্যে নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

পূর্বে বিয়ে হয়নি –এমন (বাকারা) মেয়ে বিয়ে করাই তোমাদের উচিত হবে। কেননা এ ধরনের মেয়েরা মিষ্টিমুখ ও মিষ্টভাষিনী, পবিত্র যৌনাঙ্গসমন্বিতা ও অল্পে তুষ্ট হয়ে থাকে।

হাফেয ইবনে কাইয়্যেম লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

নবী করীম (স) তাঁর উম্মতকে পূর্বে-অবিবাহিতা সুন্দরী ও দ্বীনদার স্ত্রী গ্রহণের জন্যে সব সময় উৎসাহ দিতেন।

একথা থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তা হচ্ছে, বিয়ে শুদ্ধ হওয়া এবং তারই আবার হারাম হওয়া –এ দুয়ের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বুড়োদের নিকট যুবতী বা ছোট্ট বয়সের মেয়েকে বিয়ে দিলে বিয়ে শুদ্ধ হবে বটে; তবে এরূপ বিয়ে করা এ ধরনের বুড়োদের পক্ষে হারাম কাজের তুল্য হবে, এই হচ্ছে ফিকাহবিদদের পূর্বোক্ত কথার তাৎপর্য।

কিন্তু যেহেতু এ ধরনের বিয়ে হারাম হওয়া সত্ত্বেও অনেক খুনখুনে বুড়ো টাকার অহংকারে যুবতী মেয়েকে বিয়ে করতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে থাকে আর অনেক গরীব পিতাও টাকার লোভে পড়ে নিজের কাঁচা বয়সের মেয়েকে বুড়ো বরের নিকট বলি দিতেও দ্বিধা বোধ করে না, তাই আইনের সাহায্যে এ কাজ বন্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

জুড়ি গ্রহণের ব্যাপারে বর-কনের প্রতি উপদেশ

ইসলামী শরীয়তের ছেলে বা মেয়েকে তার নিজের জুড়ি গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্যে কিছু কিছু উপদেশ দেয়া হয়েছে। তার মধ্য থেকে কয়েকটি জরুরী কথা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ

প্রথমত বলা হয়েছে, পূর্বে অবিবাহিত ছেলে বা মেয়ে বাছাই করে নিতে। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (র) বলেন, নবী করীম (স) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবী**********) –তুমি কি বিয়ে করেছ? জবাবে আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘সাইয়েবা’ না ‘বাকারা’ –মানে পূর্বে-বিবাহিতা মেয়ে বিয়ে করেছ, না পূর্বের অবিবাহিতা কোনো মেয়ে? তখন আমি বললাম, ‘সাইয়েবা’ বিয়ে করেছি।তখন তিনি বললেনঃ

(আরবী***************************************)

বাকারা অর্থাৎ কোনো পূর্বে-অবিবাহিতা মেয়েকে কেন বিয়ে করলে না? তাহলে তুমি তাকে নিয়ে আনন্দের খেলায় মত্ত হতে পারতে, আর সেও তোমাকে নিয়ে।

মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হাদীসটির ভাষাঃ

(আরবী******************************************)

‘বাকারা’ মেয়ে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে পারস্পরিক আনন্দ-স্ফুর্তি ও হাসি খুশীতে জীবন কাটাতে পারতে।

এ কথার জবাবে হযরত জাবির ‘সাইয়েবা’ বিয়ে করার কারণ রাসূলের খেদমতে বর্ণনা করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, রাসূলে করীম (স) সাধারণত এমন মেয়ে বিয়ে করাই পছন্দ করেন, যার পূর্বে কোনো বিয়ে হয়নি। আরবী ভাষায় ‘বাকারা’ বা ‘বাকের’ বলা হয় এমন মেয়েকেঃ

(আরবী*************************************************)

যার পূর্বে বিয়ে হয়নি, কেউ তার স্বামী হয়নি এবং কারোর সাথেই হয়নি কোনো যৌন সম্পর্ক স্থাপন।

আর ‘সাইয়েবা’ হচ্ছে এর বিপরীত অর্থাৎ যার বিয়ে হয়েছিল। যার স্বামী ছিল এবং তার সাথে যৌন সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিল।

তার মানে হচ্ছে দ্বীনদারীর সঙ্গে রূপ ও সৌন্দর্যের লাভের জন্যে চেষ্টা করাও আবশ্যক্

কিন্তু উপরের কথা থেকে একথা যেন কেউ মনে না করেন যে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মেয়েকে বিয়ে করা বুঝি ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত বা নাজায়েয। কেননা তা আদৌ ঠিক নয়। নবী করীম (স) ও সাহাবায়ে কিরামের অনেকেই বিধবা ও পরিত্যক্তা মহিলাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের পূর্ন মর্যাদা ও অধিকার দিয়ে শান্তিরূপে দাম্পত্য জীবন যাপন করেছেন।

বিশেষত ও সুযোগ-সুবিধার দৃষ্টিতে অনেক সময় ‘বাকারা’ মেয়ের পরিবর্তে ‘সাইয়েবা’ মেয়েকে বিয়ে করা অধিকতর যুক্তিবহ। রাসূলে করীম (স)-এর কাছ থেকেও এর সমর্থন পাওয়া গিয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহর ব্যাপারটিই এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তাঁকে যখন রাসূলে করীম (স) বিয়ে করেছ কিনা এবং কি ধরনের মেয়ে বিয়ে করেছ জিজ্ঞেস করলেন তখন জবাবে তিনি বললেন, ‘সাইয়েবা’ –‘পূর্ব-বিবাহিতা মেয়ে’। রাসূলে করীম (স) এ ব্যাপারে কিছুটা আপত্তি ও নিরুৎসাহ প্রকাশ করলে তখন তার কারণ প্রদর্শনস্বরূপ হযরত জাবির (রা) বললেনঃ

(আরবী***************************************************)

আমার পিতা ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং রেখে গেছেন সাতটি কন্যা। এমতাবস্থায় তাদের সাথে এনে এমন আর একটি মেয়েকে একত্র করা আমি পছন্দ করিনি, (যে হবে সংসার-অনভিজ্ঞা, যে নিজ হাতে কাজ কর্ম করবে না –করতে পারবে না। বরং দরকার ছিল এমন এক বয়স্কা মেয়েলোকের, যে তাদের (পিতার কন্যাদের) চুল আঁচড়ে দেবে এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য যাবতীয় কাজ-কর্ম করে দেবে।

এ বিবরণ শুনে নবী করীম (স) বললেঃ (আরবী*******) ‘তুমি ঠিকই করেছ’। অপর এক বর্ণনায় রাসূলের জবাব ছিলঃ (আরবী***************) ‘হ্যাঁ, তুমি যা ভালো মনে করেছ তা ঠিকই হয়েছে’। (মুসনাদে আহমাদ)

নবী করীম (স) বিশেষ গুরুত্ব সহকারে এই পর্যায়ে আর একটি উপদেশ দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে অধিক সন্তানবতী ও অধিক প্রেমময়ী মেয়েলোক বিয়ে করা।

এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর খেদতে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলঃ

(আরবী************************************************)

উচ্চ বংশজাত ও সুন্দরী একটি মেয়ে পেয়েছি, কিন্তু দোষ হচ্চে এই যে, সে সন্তান প্রসব করে না (বন্ধ্যা), তাকে কি আমি বিয়ে করব?

জবাবে রাসূলে করীম (স) বললেনঃ ‘না’। লোকটি তার পরও দুই-তিনবার এসে সেই একই প্রম্ন জিজ্ঞেস করে এবং প্রত্যেকবারই তিনি নিষেধ করেন। শেষবারে রাসূল (স) বললেনঃ

(আরবী***************************************)

তোমরা বিয়ে করবে প্রেম-ভালোবাসাময়ী ও অধিক সন্তানবতী মেয়েলোককে। কেননা আমি তোমাদের বিপুল সংখ্যা নিয়ে গৌরব করব।

অপর একটি বর্ণনায় রাসূলের কথাটির ভাষা এইঃ

(আরবী***********************************************)

তোমরা বিয়ে করো অধিক প্রেম-প্রীতিসম্পন্না ও বেশি সংখ্যক সন্তান দাত্রী মেয়ে। কেনান আমি কেয়ামতের দিন অন্যান্য নবীর মুকাবিলায় তোমাদের বিপুল সংখ্যা নিয়ে গৌরব করব।

বিয়ের মতামত জ্ঞাপনের অধিকার

বিয়ের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়ার যে ব্যবস্থা ইসলামে করা হয়েছে, তা থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, বিযের ব্যাপারে শরীয়তের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে পুরুষের পক্ষে ভাবী স্ত্রী এবং মেয়েদের পক্ষে ভাবী স্বামীকে বাছাই করার –মনোনীত করার স্থায়ী অধিকার রয়েছে। কুরআন মজীদে পুরুষদের সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************)

অনন্তর তোমরা বিয়ে করো যেসব মেয়েলোক তোমাদের জন্যে ভালো হবে ও ভালো  লাগবে।

আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

অর্থাৎ রূপ-সৌন্দর্য, জ্ঞান-বুদ্ধি ও পারিবারিক ব্যবস্তাপনা ও কল্যাণ ক্ষমতার দিক দিয়ে যে সব মেয়ে তোমাদের নিজেদের জন্যে ভালো বিবেচিত হবে –মনমতো হবে, তোমরা তাদের বিয়ে করো।

অথবা এর অর্থঃ

(আরবী*****************************************************)

তবে বিয়ে করো সেসব মেয়ে, যারা তোমাদের জন্যে পাক-পবিত্র, যারা তোমাদের জন্যে হালাল, নিষিদ্ধ নয়, যারা তোমাদের জন্যে হবে কল্যাণকর ও পবিত্র।

এ আয়াতে বিয়ের যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তার দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত বিয়ে করবে সেসব মেয়েলোক, যা হালাল, মুহাররম নয়। কেননা কতক মেয়েলোককে যেমন রক্তের সম্পর্কের নিকটাত্মীয়া ও ভিন্ন ধর্মের মেয়েলোক –বিয়ে করা শরীয়ত স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ তাদের ছাড়া প্রায় সব মেয়েলোকই এমন যাদের মধ্য থেকে যে-কাউকে বিয়ে করা যেতে পারে।

আর দ্বিতীয় দিক হচ্ছে এই যে, বিয়ের জন্যে একটি মেয়েলোক হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তাকে অবশ্য দুটি দিক দিয়ে যোগ্য হতে হবে। প্রথম দিক এই যে, সে নিজে হবে পবিত্র, চরিত্রবতী, কল্যাণময়ী। সর্বদিক দিয়ে ভালো। আর দ্বিতীয় দিক এইযে, যে পুরুষ তাকে বিয়ে করবে, তার জন্যেও সে হবে প্রেমময়ী, কল্যাণময়ী সর্বগুণে গুণান্বিত ও তার মনমত মনোনীত। এ ধরনের মেয়ে বাছাই করেবিয়ে করারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে উপরোক্ত আয়াতে। আর এসব কথা নিহিত রয়েছে আয়াতের (আরবী**********) শব্দের মধ্যে। অন্যথায় শুধু (আরবী***************) –‘মেয়েলোক বিয়ে করো’ বলে দেয়াই যথেষ্ট ছিল। এ জন্যে শায়খ মুহাম্মদ নববী এ আয়াতের তাফসীর লিখেছেন নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী********************************************)

অর্থাৎ অপরিচিতা বা সম্পর্কহীনা মেয়েলোকদের মধ্যে যাদের প্রতি তোমাদের মন আকৃষ্ট হয় এবং যাদের পেলে তোমাদের দিল সন্তুষ্ট, আনন্দিত হবে ও যাদের ভালো বলে গ্রহণ করতে পারবে, তোমরা তাদেরকেই বিয়ে করো।

উপরন্তু বিভিন্ন তাফসীরে এ আয়াতটির নাযিল হওয়ার যে উপলক্ষ বর্ণিত হয়েছে, সে দৃষ্টিতেও আয়াতটির উপরোক্ত অর্থ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এ আয়াতের শানে নুজুল হচ্ছে –লোকেরা বাপ-দাদার লালিতা-পালিতা ইয়াতীম মেয়েদের বিয়ে করত শুধু তাদের রূপ-যৌবন ও ধন-মালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে। ফলে বিবাহিত জীবনে তার প্রতি দেখাত মনের বিরাগ, উপেক্ষা ও অযত্ন। কেননা মেয়েটিকে মনের আকর্ষণে ও ভালো লাগার কারণে বিয়ে করা হয়নি, করা হয়েছে অন্যসব জিনিস –রূপ, যৌবন ও ধনমাল সামনে রেখে, সেগুলো অবাধে ভোগ করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে। এ কারণে ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি যে জুলুম ও অবিচার হতো, তারই নিরসন ও বিদূরণের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা এ নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই যাকে বিয়ে করা হচ্ছে, তার নিজস্ব গুণ-গরিমার কারণেই তাকে বিয়ে করা উচিত। অপর কোনো লক্ষ্য থাকা উচিত নয় বিয়ের পেছনে। বস্তুত নিছক টাকা পয়সা লাভ কিংবা একজন নারীর নিছক রূপ-যৌবন-ভোগের লালসায় পড়ে যেসব বিয়ে সংঘটিত হয়, তা কিছু কাল যেতে না যেতেই কিংবা লক্ষ্যবস্তুর ভোগ-সম্ভোগে তৃপ্তি লাভের পরই সে বিয়ে ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। এর বাস্তব দৃষ্টান্তের কোনো অভাব নেই আমাদের সমাজে।

পূর্বেই বলেছি, কনে বাছাই করার যে অধিকার এ আয়াতে পুরুষদের দেয়া হয়েছে, তা কেবল পুরুষদের জন্যেই একচেটিয়া অধিকার নয়। বরং পুরুষদের ন্যায় কনেরও অনুরূপ অধিকার রয়েছে। ‘বর’ বাছাই করে খরিদ করা হয়, তখন বিয়ের মতো একটা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সারা জীবনের ব্যাপার খুব  সহজেই সম্পন্ন হওয়া ও হতে দেয়া উচিত হতে পারে না। বরং যথাসম্ভব জানা-শুনা করে, খবর নিয়ে দেখে-শুনে ও ছাঁটাই-বাঁছাই করেই এ কাজ সম্পন্ন হওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই কল্যাণকর। আর এর অধিকার কেবল পুরুষদেরই একচেটিয়াভাবে হতে পারে না। এ অধিকার তাদের ন্যায় নারীদেরও অবশ্যই থাকতে হবে এবং ইসলাম তা দিয়েছে। পুরুষ যেমন নিজের দিক দিয়ে বিচার-বিবেচনা করবে কনেকে, তেমনি কনেরও উচিত অনুরূপভাবে বুঝে-শুনে একজনকে স্বামীরূপে বরণ করা। এজন্যে বিবাহেচ্ছু নর-নারীর ইচ্ছা, পছন্দ ও মনোনয়ন এবং সন্তোষে অভিমত বা সমর্থন ব্যক্ত করার গুরুত্ব সর্বজন স্বীকৃত। ইসলামী শরীয়তেও উপযুক্ত বয়সের ছেলেমেয়েকে অন্যান্য কাজের ন্যায় বিয়ের ব্যাপারেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। পিতামাতা ও অন্যান্য নিকটাত্মীয় লোকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ অবশ্যই দেবে; কিন্তু তাদের মতই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ও একমাত্র শক্তি (Only factor) হতে পারে না। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতোই ছেলেমেয়েদেরকে কোথাও বিয়ে করতে বাধ্য করতেও পারে না। বয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে তাদের সুস্পষ্ট মত ছাড়া সম্পন্ন হতেই পারে না। নবী করীম (স) এই পর্যায়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা যেমন খুব স্পষ্ট তেমনি অত্যন্ত জোরালো।

(আরবী*************************************)

পূর্বে বিবাহিত এখন জুড়িহীন ছেলেমের বিয়ে হতে পারে না, যতক্ষণ না তাদের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যাবে এবং পূর্বে অবিবাহিত ছেলেমেয়ের বিয়ে হতে পারে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে স্পষ্ট অনুমতি পাওয়া যাবে”? তখন তিনি বললেন, জিজ্ঞেস করার পর তার চুপ থাকাই তার অনুমতি।

এ হাদীসের ওপর ভিত্তি করেই ইমাম আবূ হানিফা (রহ) বলেছেনঃ

(আরবী***********************************)

অলী পূর্বে বিবাহিত ও অবিবাহিত ছেলেমেয়েকে কোনো নির্দিষ্ট ছেলেমেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করতে পারে না। অতএব পূর্বে বিবাহিত ছেলেমেয়ের কাছ থেকে বিয়ের জন্যে রীতিমত আদেশ পেতে হবে এবং অবিবাহিত বালেগ ছেলেমেয়ের কাছ থেকে যথারীতি অনুমতি নিতে হবে।

 ইমাম আবূ হানীফা উপরোক্ত হাদীসের ভিত্তিতে এতদূর বলেছেন যে, কোনো পূর্ন বয়স্ক ও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্না মেয়ে অলীর অনুমতি ব্যতিরেকে নিজ ইচ্ছায় কোথাও বিয়ে করে বসলে সে বিয়ে অবশ্যই শুদ্ধ হবে। যদিও ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে অলীর অনুমতির অপেক্ষায় সে বিয়ে মওকুফ থাকবে। আর ইমাম শাফিয়ী, মালিক ও আহমাদ বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

কেবলমাত্র মেয়ের অনুমতিতেই বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে না।

কেননা রাসূলে করীম (স) অন্যত্র বলেছেনঃ

(আরবী*********************************)

অলীর অনুমতি ছাড়া বিয়েই হতে পারে না।

কিন্তু পূর্বোক্ত হাদীস দ্বারা তাদের এ মত খণ্ডিত হয়ে যায়। বিশেষত এই শেষোক্ত হাদীস সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম বুখারী ও ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন প্রমুখ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এ হাদীস সম্পর্কে বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

অলীর মত ছাড়া বিয়ে হতে পারে না। এ ধরনের শর্তের কোনো হাদীসই সহীহ নয়।

আর তিরমিযী শরীফে এই পর্যায়ে যে হাদীষটি উদ্ধৃত হয়েছে তা হচ্ছেঃ

(আরবী***********************************************)

পূর্বে বিবাহিতা ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের বিয়ে সম্পর্কে মত জানানোর ব্যাপার তাদের অলীর চেয়েও বেশি অধিকারসম্পন্ন। আর পূর্বে অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের নিকট তাদের বিয়ের ব্যাপারে তাদের মতামত অবশ্যই জানতে চাওয়া হবে এবং তাদের চুপ থাকাই তাদের অনুমতি নামান্তর।

আর দ্বিতীয় হাদিসটি হচ্ছেঃ

(আরবী*************************************************)

পূর্বে বিবাহিত ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের বিয়েতে মত জানানোর ব্যাপারে তাদের অলী অপেক্ষাও বেশী অধিকার রাখে। আর পূর্বে অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের নিকট তাদের পিতা বিয়ের মত জানতে চাইলে, তবে তাদের চুপ থাকাই তাদের অনুমতিজ্ঞাপক।

হাদীসসমূহের ভাষা, শব্দ, সুর ও কথা বিশেষ লক্ষণীয়। বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা স্ত্রীলোকদেরকে মতামত জ্ঞাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন নি; বরং তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ ও মতামতকে পূর্ণ মাত্রায় স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাদের মরজী ছাড়া কোনো পুরুষের সাথে জবরদস্তি তাদের বিয়ে দেয়া ইসলামী শরীয়তে আদৌ জায়েয নয়।

এ ব্যাপারে অলী-গার্জিয়ানদের কর্তব্য হচ্ছে ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে তাদের মতামত জেনে নেয়া এবং তারপরই বিয়ের কথাবার্তা চালানো বা চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

কিন্তু ইসলামে যেখানে মেয়ের মতের গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে, সেখানে তাদের স্বাভাবিক লজ্জা-শরমকেও কোনো প্রকারে ক্ষুণ্ন হতে দেয়া হয়নি। এজন্যে পূর্বে বিয়ে হয়নি –এমন মেয়ের (বাকরার) অনুমতি দানের ক্ষেত্রে চুপ থাকাকেও ‘মত’ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

ইমাম আবূ হানীফার মতে পূর্বে-অবিবাহিতা পূর্ণ বয়স্কা মেয়েকে অলীর মতে বিয়ে করতে বাধ্য করা অলীর পক্ষে জায়েয নয়। তাই তার কাছে যখন অনুমতি চাওয়া হবে, তখন যদি সে চুপ থাকে কিংবা হেসে ওঠে তাহলে তার মত আছে ও অনুমতি দিচ্ছে বলে বোঝা যাবে।

কিন্তু পূর্বে বিয়ে হওয়া (সাইয়েবা) মেয়ের পুনর্বিবাহের প্রশ্ন দেখা দিলে তখন সুস্পষ্ট ভাষায় তার কাছ থেকে এজন্যে আদেশ পেতে হবে।

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী লিখেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

পূর্বে বিবাহিতা মেয়ে মত জানাবার ব্যাপারে বেশি অধিকারসম্পন্না –এ কথার অর্থ এই যে, মত জানানোর অধিকারে সেও শরীক রয়েছে। আর তার মানে, তাকে কোনো বিয়েতে রাজি হতে জোর করে বাধ্য করা যাবে না; স্বামী নির্বাচন নির্ধারণে সে-ই সবচেয়ে বেশি অধিকারী।

এ ব্যাপারে মেয়ের মতের গুরুত্ব যে কতখানি, তা এক ঘটনা থেকে স্পষ্ট জানতে পারা যায়। হযরত খানসা বিনতে হাজাম (রা)-কে তাঁর পিতা এক ব্যক্তির নিকট বিয়ে দেন। কিন্তু এ বিয়ে খানসার পছন্দ হয় না। তিনি রাসূলের দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ

(আরবী********************************************)

তাঁর পিতা তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন, তিনি পূর্ব বিবাহিত; তিনি এ বিয়ে পছন্দ করেন না।

হাদীস বর্ণনাকারী বলেনঃ (আরবী*************) রাসূলে করীম (স) তাঁর এ কথা শুনে তাঁর বিয়ে প্রত্যাহার ও বাতিল করে দেন।

ইমাম আবদুর রাজ্জাক এ ঘটনাটিকে অন্য ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনা হচ্ছে, একজন আনসারী খানসাকে বিয়ে করেন। তিনি ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, অতঃপর তাঁর বাবা তাঁকে অপর এক ব্যক্তির নিকট বিয়ে দেন। তখন তিনি রাসূলের দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ

(আরবী************************************)

আমার পিতা আমাকে বিয়ে দিয়েছেন অথচ আমার সন্তানের চাচাকেই আমি অধিক ভালোবাসি (তার সাথেই আমি বিয়ে বসতে চাই)।

তখন নবী (স) তাঁর বিয়ে ভেঙ্গে দেন।

এ পর্যায়ে আর একটি ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। হযরত জাবির বলেনঃ

(আরবী******************************)

এক ব্যক্তি তাঁর ‘বাকেরা’ মেয়েকে বিয়ে দেন তার বিনানুমতিতে। পরে সে নবী করীমের নিকট হাজির হয় ও অভিযোগ দায়ের করে। ফলে নবী করীম (স) তাদের বিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

একটি পূর্ব-অবিবাহিতা মেয়েকে তার পিতা এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল, যাকে সে পছন্দ করে না। পরে রাসূলে করীম (স) সে মেয়েকে বিয়ে বহাল রাখা-না-রাখা সম্পর্কে পূর্ণ ইখতিয়ার দান করেন।

অপর একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, চাচাতো ভাইয়ের সাথে পিতা কর্তৃক বিয়ে দেয়া কোনো মেয়ে রাসূলের দরবারে হাযির হয়ে বললঃ

(আরবী**************************************************)

আমার পিতা আমাকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। সে নীচ শ্রেণীর লোক; আমাকে বিয়ে করে তার নীচতা দূর করতে চায়।

এ অবস্থায় রাসূলে করীম (স) তাকে বিয়ে বহাল রাখা-না-রাখার স্বাধীনতা দান করেন। তারপরে মেয়েলোকটি বলেঃ

(আরবী*********************************************************)

আমি তো পিতার করা বিয়েতেই অনুমতি দিয়েছি।

কিন্তু তবু এ অভিযোগ নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হলোঃ

(আরবী*****************************************)

আমি চাই যে, মেয়েলোকেরা একথা ভালো করে জেনে নিক যে, বিয়ের ব্যাপারে বাপদের কিছুই করণীয় নেই।

এসব হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বয়স্কা মেয়েদের বিয়েতে তাদের নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও পছন্দ-অপছন্দ হচ্ছে শেষ কথা। পিতা বা কোনো অলীই কেবল তাদের নিজেদেরই ইচ্ছায় বিয়ে করতে কোনো মেয়েকে বাধ্য করতে পারে না। এজন্যে রাসূল করীম (স) সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেনঃ

(আরবী***********************************)

মেয়েদের বিয়েতে তাদের কাছ থেকে তোমরা আদেশ পেতে চেষ্টা করো। ইয়াতীম মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারেও এই নির্দেশই প্রযোজ্য ও কার্যকর। হাদীসে এ সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

ইয়াতীম মেয়ের কাছে তার নিজের বিয়ের ব্যাপারে স্পষ্ট আদেশ পেতে হবে। জিজ্ঞেস করা হলে সে যদি চুপ থাকে, তবে সে অনুমতি দিয়েছে বলে বুঝতে হবে। আর সে যদি অস্বীকার করে, তবে তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করা যাবে না।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**************************************************)

ইয়াতীম মেয়েকে তার সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতিরেকে বিয়ে দেয়া যেতে পারে না।

এ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে ইসলামের মৌলিক বিধান ও দৃষ্টিকোণ। নারী পুরুষের জীবনের বৃহত্তর ও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বিয়ে। ইসলাম তাতে উভয়কে যে অধিকার ও আজাদি দিয়েছে, তা বিশ্বমানবতার প্রতি এক বিপুল অবদান, সন্দেহ নেই। কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়, বর্তমান অধঃপতিত ও বিপর্যস্ত মুসলিম সমাজে ছেলেমেয়েদের এ অধিকার ও আজাদি বাস্তা ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এর অপর একটি দিক বর্তমানে খুবই প্রাবল্য লাভ করেছে। আধুনিক ছেলেমেয়েরা তাদের বিয়ের ব্যাপরে বাপ-মা-গার্জিয়ানদের কোনো তোয়াক্কাই রাখে না। তাদের কোনো পরোয়াই করা হয় না। ‘বিয়ে নিজের পছন্দে ঠিক’ এ কথার সত্যতা অস্বীকার করা হচ্ছে না, তেমনি একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আধুনিক যুবক-যুবতীরা যৌবনের উদ্দাম স্রোতের ধাক্কায় অবাধ মেলামেশার গড্ডালিকা প্রবাহে পড়ে দিশেহারা হয়ে যেতে পারে এবং ভালো-মন্দ, শোভন-অশোভন বিচারশুন্য হয়ে যেখানে-সেখানে আত্মদান করে বসতে পারে। তাই উদ্যম-উৎসাহের সঙ্গে সঙ্গে সুস্থা বিচার-বিবেচনারও বিশেষ প্রয়োজন। কেননা বিয়ে কেবলমাত্র যৌন প্রেরণার পরিতৃপ্তির মাধ্যম নয়; ঘর, পরিবার, সন্তান, সমাজ, জাতি ও দেশ সর্বোপরি নৈতিকতার প্রশ্নও তার সাথে গভীরভাবে জড়িত। তাই বিয়ের ব্যাপারে ছেলেমেয়ের পিতা বা অলীর মতামতের গুরুত্বও অনস্বীকার্য। ইমাম নববী উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় যে মত দিয়েছেন, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বলেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

হাদীসে উক্ত ‘সবচেয়ে বেশি অধিকার’ কথাটিতে শরীকদারী রয়েছে। তার মানে, মেয়ের নিজের বিয়ের ব্যাপারে যেমন তার অধিকার রয়েছে, তেমনি তার অলীরও অধিকার রয়েছে। তবে পার্থক্য এই যে, মেয়ের অধিকার অলীর অধিকার অপেক্ষা অধিক তাগিতপূর্ণ ও কার্যকর। তাই অলী যদি কোনো কুফু’তেও মেয়ের বিয়ে দিতে চায়, আর সে মেয়ে তা গ্রহণ করতে রাজি না হয়, তাহলে তাকে জোর করে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু মেয়ে নিজে যদি কোনো কুফু’তে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে; কিন্তু অলী তাতে বাধ্য না হয়; তাহলে অলী তাকে তা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করতে পারে।

কেননা সাধারণত অলী-পিতা-দাদা নিজেদের ছেলেমেয়ের কখনো অকল্যাণকামী হতে পারে না। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পিতামাতার মতের গুরুত্ব কিছুতেই অস্বীকার করা চলে না।

মতবিরোধের মীমাংসা

ইমাম নববীর উপরে উদ্ধৃত কথার শেষাংশ অবশ্য পূর্ব-বিবাহিত ছেলেমেয়ের ব্যাপারে স্বীকার করে নেয়া মুশকিল। অলীর মতে ও ছেলেমেয়ের মতে বিয়ের ব্যাপারে যদি মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তখন অলীর মতের ওপর ছেলেমেয়ের মতকেই প্রধান্য দেয়া যুক্তিযুক্ত –যদি তা ভালো পাত্র বা পাত্রীর সাথে সম্পন্ন হতে দেখা যায়। কেননা বিয়ে হচ্ছে তার, অলীর নয়। আর বিয়ের বন্ধনজনিত যাবতীয় দায়িত্ব তাকেই পলন করতে হবে, অলীকে নয়। কুরআন মজীদে নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও একথা প্রমাণিত হয়। বলা হয়েছেঃ

(আরবী**************************************)

তাদের ইদ্দত পূর্ণ হলে পরে তারা তাদের নিজেদের সম্পর্কে শরীয়ত মুতাবিক ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক না কেন, সেজন্যে তোমরা –অলী-গার্জিয়ানদের কিংবা সমাজপতিদের কোনো দায়িত্ব নেই (কিছুই করণীয় নেই)।

এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************************)

যখন কোনো মহিলা তালাকপ্রাপ্তা হবে কিংবা তার স্বামী মারা যাওয়ার কারণে বিধবা হবে, তখন ইদ্দত উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর সে যদি সুসাজে সজ্জিতা হয়, দেহে রং লাগায়, আর বিয়ের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে ও কথাবার্তা চালায়, তবে তাতে তার কোনো দোষ হবে না।

এ আয়াত পূর্বে-বিবাহিতা স্ত্রীলোকদের তাদের নিজেদের বিয়ের ব্যাপারে শরীয়ত মুতাবেক যে-কোন স্থানে, যে কোন পাত্রের সাথে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করার অধিকার দিচ্ছে।

নওয়াব সিদ্দীক হাসান তাঁর তাফসীরে এ আয়াতের নীচে লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

ইমাম আবূ হানীফার সঙ্গী-সাথী ও তাঁর মাযহাবের আলেমগণ এই আয়াতের ভিত্তিতে বলেছেন যে, অলী ছাড়াও বিয়ে হতে পারে। কেননা আয়াতে ‘মেয়েরা যে কাজ করে’ বলা হয়েছে। তার মানে, শরীয়ত মুতাবেক যে-কোনো ‘কাজ’ করার তাদের জন্যে অনুমতি আছে।

আল্লামা ইবনে রুশদ লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

ইমাম আবূ হানীফা, যুফর, শা’বী ও জুহরী বলেছেনঃ একজন মেয়েলোক যখন তার বিয়ে অলী ছাড়াই সম্পন্ন করে ফেলে এবং তা কুফু অনুযায়ী হয় তবে তা অবশ্যই জায়েয বিয়ে হবে।

এমতাবস্থায় দুই ধরনের দলীলের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপনের পন্থা এই হতে পারে যে, যেসব হাদীসে ‘অলী ছাড়া বিয়ে হতেই পারে না’ বলা হয়েছে, তার মানে হবেঃ

(আরবী**********************************************)

সুন্নত তরীকা মতো বিয়ে অলীর মত ছাড়া হতে পারে না।

আর যেসব দলীল থেকে প্রমাণিত হয় যে, মেয়ের নিজের ইচ্ছায় বিয়েতে অলী বাধা দিতে পারে, তার মানে হবে সেই বিয়ে, যা মেয়ে করতে চাইবে কুফু’র বাইরে। মওলানা সানাউল্লাহ পানীপতি লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************************************************)

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ের ব্যাপারে পূর্বে বিবাহিতা মেয়র মতের প্রতিবন্ধক কিছু হতে পারে না। প্রতিবন্ধক হতে পারে কেবল অলীর অধিকার, যা রাসূলে হাদীস ‘পূর্ব-বিবাহিতা মেয়েরা তাদের নিজেদের বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার অলীর তুলনায় অধিক অধিকারী’ থেকে জানা গেছে। আর অলীর অধিকার হচ্ছে কুফু’র বাইরে বিয়ে হতে থাকলে শুধু আপত্তি জ্ঞাপন, যেন সামাজিক লজ্জা অপমান থেকে বাঁচা যায়।

তাহলে সুষ্ঠুরূপে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার একমাত্র পথ এই যে, অলী নেজই মেয়ের জন্যে উদ্যোগী হবে। মেয়ের নিজস্ব কোনো মত –কোনো দৃষ্টি যদি থাকে, আর তাতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো আপত্তির কারণ না থাকে, তাহলে সে অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন করে দেবে। কোনো ছেলের সাথে বিয়েতে রাজি না হলে তার ওপর কোনো প্রকারেই জোর প্রয়োগ করা চলবে না। প্রসিদ্ধ ফিকাহবিদ ইমাম সরখসী রচিত ‘আল-মবসূত’ গ্রন্থে লিখিত হয়েছেঃ

বিয়ের সময় মেয়ের অনুমতি নিতে হবে। কেননা তার কোনো অভ্যন্তরীন রোগ বা দৈহিক কোনো অসুবিধা থাকতে পারে। অথবা তার মন অন্য কারো দিকে আকৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে। এরূপ অবস্থায় তার মত না নিয়ে বিয়ে দিলে সে তার স্বামীর ঘর সুষ্ঠুরূপে করতে পারবে না। তখন সে মেয়ে বিপদে পড়ে যাবে, কেননা তার মন অন্যত্র বাধা রয়েছে। আর প্রেমের রোগ অপেক্ষা বড় রোগ কিছু হতে পারে না। (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৭)

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী এ বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************************)

জেনে রাখো, বিয়ের ব্যাপারে কেবলমাত্র মেয়েদেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী বানানো সঙ্গত হয়। কেননা তাদের বুদ্ধি অসম্পূর্ণ, চিন্তা-বিবেচনা দুর্বল। অনেক সময় তারা ভালো দিকটি জানতেই পারে না। সামাজিক মর্যাদার দিকেও তাদের প্রায়ই লক্ষ্য থাকে না। তাতে করে অনেক সময় তারা অনুপযুক্ত ক্ষেত্রেই মন দিয়ে বসে আর তাতে সমাজের লোকদের অনেক লজ্জা-অপমানের কারণ হতে পারে। এজন্যে এ ব্যাপারে অলীর কিছুটা দখল থাকা বাঞ্ছনীয়, যেন উপরোক্ত আশঙ্কার পথ বন্ধ করা যায়।

তিনি আরো বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

তাই বলে কেবল অলীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বারা বিয়ে সম্পন্ন হওয়াও জায়েয নয়। কেননা মেয়েরা তাদের নিজেদের বিষয় যতটা বুঝে ততটা তারা বুঝে না এবং বিশেষ করে যখন বিয়ের ভালো-মন্দ ও সুখ-দুঃখ তাদেরই ভোগ করতে হয়।

বিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচার

বিয়ে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে –যারা সমাজেরই লোক –বিবাহিত হয়ে পরস্পরে মিলে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে ইচ্ছুক, কাজেই তাদের ঐক্য ও মিলন সৃষ্টি ও সুষ্ঠু মিলিত জীবন যাপনের পশ্চাতে সমাজের আনুকূল্য ও সমর্থন-অনুমোদন একান্তই অপরিহার্য। এ কারণে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতে গোপনে নারী-পুরুষের মিলনকে স্পষ্ট অসমর্থন জানানো হয়েছে। পুরুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************)

বিবাহের বন্ধনে বন্দী হয়ে স্ত্রী গ্রহণ করবে জ্বেনাকারী হিসেবে নয়।

মেয়েদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী************************************)

বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পুরুষদের সাথে মিলিত হবে, জ্বেনাকারিণী কিংবা গোপনে প্রণয়-বন্ধুতাকারিণী হয়ে নয়।

প্রথম আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

আল্লাহ তা’আলা এখানে প্রকারান্তরে মুসলিমদের আদেশ করেছেন যে, তারা মেয়েদের মোহরানা দিয়ে বিয়ে করে গ্রহণ করবে, জ্বেনা-ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে নয়।

আর দ্বিতীয় আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

আরববাসীরা জ্বেনা-ব্যভিচারের প্রচার হলে খুবই আপত্তি করত, দোষের মনে করত, কিন্তু গোপন বন্ধুত্ব গ্রহণে কোনো আপত্তি তাদের ছিল না। ইসলাম এসে এসব কিছুর পথ বন্ধ করে দিয়েছে। (ঐ)

আল্লামা ‘জুজাজ’ বলেছেনঃ

(আরবী****************************************)

কোনো বিশুদ্ধ বিয়ে ব্যতিরেকে যৌন চর্চার উদ্দেশ্যে কোনো মেয়ে যদি কোনো পুরুষের সাথে একত্র বসবাস করে, তবে তাকেই বলা হয়, ‘মুসাফিহাত’ আর তা সুস্পষ্ট হারাম।–[এই দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ

জাহিলিয়াতের যুগে ব্যভিচারী মেয়েরা ছিল দু’ধরনের। কেউ প্রকাশ্যভাবে ব্যভিচার করত এবং কেউ গোপন-বন্ধুত্ব ও প্রণয়-প্রীতি হিসেবে করত। আর তারা নিজেদের বুদ্ধিতেই প্রথম প্রকারের ব্যভিচারকে হারাম ও দ্বিতীয় প্রকারের ব্যভিচারকে হালাল মনে করত।]

কাজেই একজন পুরুষ ও একজন মেয়ে পরস্পরের সাথে কেবল বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমেই মিলত হতে পারে এবং এ বিয়ের মাধ্যমেই মিলিত হতে পারে এবং এ বিয়ের মাধ্যমে মিলিত হওয়ার বিষয়ে সমাজের লোকদেরকে জানতে হবে, তার প্রতি তাদের সমর্থনও থাকতে হবে। আর এজন্যে দরকার হচ্ছে মিলনকারী নারী-পুরুষের বিয়ে এবং সে বিয়ে গোপনে অনুষ্ঠিত হলে চরবে না, হতে হবে প্রকাশ্যে সকলকে জানিয়ে, সমাজের সমর্থন নিয়ে। এজন্যে ইসলামের বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রচার হওয়ার অনুকূলে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং গোপন বিয়েকে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে।

ইমাম মালিক বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর ফারূকের সম্মুখে এমন এক বিয়ের ব্যাপারে পেশ করা হয়, যার অনুষ্ঠানে কেবলমাত্র একজন পুরুষ ও একজন মেয়েলোক উপস্থিত ছিল। তিনি বললেনঃ

(আরবী*********************************************************)

এ তো গোপন বিয়ে এবং গোপন বিয়েকে আমি জায়েয মনে করি না। আমি তার অনুমতিও দিচ্ছি না। এ ব্যাপারটি পূর্বে আমার নিকট এলে আমি এ ধরনের বিয়েকারীকে ‘রজম’ করার হুকুম দিতাম।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী****************************************************************)

অধিকাংশ ইসলামবিদের মতে অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কোনো বিয়ে প্রমাণিত হতে পারে না, আর তা অনুষ্ঠিত হতে পারে না, যতক্ষণ না তাতে তবিয়ের সময় সাক্ষিগণ উপস্থিত থাকবে।

বিয়ের অনুষ্ঠান যাতেকরে ব্যাপক প্রচার লাভ করে তার নির্দেশ এবং তার উপায় বলতে গিয়ে রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

এ বিয়ে অনুষ্ঠানের ব্যাপক প্রচার করো এবং সাধারণত এর অনুষ্ঠান মসজিদে সম্পন্ন করো, আর এ সময় একতারা বাদ্য বাজাও।

বিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচার সম্পর্কিত আদেশ স্পষ্ট ও অকাট্য। এর ব্যতিক্রম হলে সে বিয়ে শুদ্ধ হতে পারে না। আর প্রচার অনুষ্ঠানের জন্যে মসজিদে বিয়ে সম্পন্ন করতে আদেশ করেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠান মসজিদ করা যদিও ওয়াজিব নয়; কিন্তু সুন্নত –ভালো ও পছন্দনীয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা মসজিদ হচ্ছে মুসলমানদে মিলন কেন্দ্র। মহল্লার ও আশেপাশের মুসলমানগণ দৈনিক পাঁচবার মসজি জমায়েত হয়ে থাকে। এখানে বিয়ে অনুষ্ঠিত হলে তারা সহজেই এতে শরীক হতে পারে, আপনা-আপনিই জেনে যেতে পারে অমুকের ছেলে আর অমুকের মেয়ে আজ বিবাহিত হচ্ছে ও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। এতে করে সামাজিক সমর্থন সহজেই লাভ করা যায়।

এছাড়া মসজিদ হচ্ছে অতিশয় পবিত্র স্থান, বিয়েও অত্যন্ত পবিত্র কাজ। মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের জায়গা, বিয়েও আল্লাহর এক অন্যতম প্রধান ইবাদত, সন্দেহ নেই।

দ্বিতীয়ত, বিয়ে অনুষ্ঠানের সময় ‘দফ’-[ (আরবী****) টি ইংরেজী হচ্ছে Tambourine খঞ্ছনি বা তম্বুরা।] বা একতারা বাদ্য বাজাতে বলা হয়েছে। এ বাধ্য নির্দোষ রাসূলে করীম (স) বিয়ে অনুষ্ঠাতের সময় এ বাধ্য বাজানোর শুধু অনুমতিই দেন নি, সুস্পষ্ট নির্দেশও দিয়েছেন। যদিও তা বাজানো ওয়াজিব নয়; কিন্তু সুন্নত –অতি ভালো তাতে সন্দেহ থাকতে পারে না। বিশেষত এজন্যে যে, নবী করীম (স) চুপেচাপে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়াকে আদৌ পছন্দ করতেন না। এমনি এক বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) লোকদের জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ

(আরবী******************************************)

তোমরা সে বিয়েতে কোনো মেয়ে পাঠাও নি, যে বাধ্য বাজাবে আর গান গাইবে?

এসব হাদীসের আলোচনা করে ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী***********************************************************)

এ হাদীস থেকে ‘দফ’ বাজিয়ে ও নির্দোষ গান গেয়ে বিয়ের প্রচার করা জায়েয হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সমাজপতিরও উচিত বিয়ে অনুষ্ঠানে শরীক হওয়া, যদিও তাতে আনন্দ-উৎসব ও খেল-তামাসাই হোক না কেন –যদি তা শরীয়তের জায়েয সীমালংঘন করে না যায়।

রুবাই বিনে মুওয়ায (রা) বলেনঃ আমার যখন বিয়ে হচ্ছিল, তখন নবী করীম (স) আমার ঘরে এসে উপস্থিত হলেন এবং আমার বিছানায় আসন গ্রহণ করলেন। তখন ছোট ছোট মেয়েরা ‘দফ’ বাজাচ্ছিল আর গান করছিল। এই সময় মেয়ে গায়িকা গান বন্ধ করে বললঃ ‘সাবধান, এখানে নবী করীম (স) উপস্থিত হয়েছেন, কাল কি হবে, তা তিনি জানেন’। একথা শুনে নবী করীম (স) বললেনঃ

(আরবী**************************************************)

এসব কথা ছাড়ো, বরং তোমরা যা বলছিলে, তাই বলতে থাকো।

(আরবী*************************************************)

তোমরা যুদ্ধ-সংগ্রাম ও বীরত্বের কাহিনী সম্বলিত যেসব গীত-কবিতা পাঠ করছিলে ও গাইতেছিলে, তা-ই করতে লেগে যাও।

এসব হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচারের উদ্দেশ্যে একতারা বাধ্য বাজানো আর এ উপলক্ষ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নির্দোষ, ঐতিহাসি কাহিনী ও জাতীয় বীরত্বব্যক গীত-গজল গাওয়া শরীয়তের খেলাফ নয়। কিন্তু তাই বলে এমন সব গীত-গান গাওয়া কিছুতেই জায়েয হতে পারে না যাতে অন্যায়-অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রচার হয়, যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, রূপ ও সৌন্দর্যের প্রতি অন্ধ আবেগ উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কেননা এ ধরনে গান-গজল বিয়ের সময়ও হারাম, যেমন হারাম সাধারণ সময়ে। এ সম্পর্কে মূলনীতি হচ্ছেঃ

যেসব গান-গজল-বাজনা-আনন্দানুষ্ঠান সাধারণ সময়ও হারাম, তার অধিকাংশই হারাম বিয়ের অনুষ্ঠানেও। কেননা এ সম্পর্কে যে নিষেধাবানী উচ্চারিত হয়েছে, তা সাধারণভাবে প্রযোজ্য।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ ‘দফ’ বাজানো সম্পর্কে লিখেছেনঃ

(আরবী***************************************************************)

একতারা বাদ্য বাজানোর জন্যে আদেশ করার মূলে একটি ভালো দিক রয়েছে। তা এই যে, বিয়ে এবং গোপনে বন্ধুত্ব-ব্যভিচার উভয় ক্ষেত্রেই যখন যৌন স্পৃহার পরিতৃপ্তি ও নর-নারী উভয়ের সম্মতি সমানভাবে বর্তমান থাকে, তখন উভয়ের মধ্যে প্রথম দৃষ্টিতেই পার্থক্য করার মতো কোনো জিনিসের ব্যবস্থা করার আদেশ দেয়া একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যেন বিয়ে সম্পর্কে কারো কোনো কথা বলবার না থাকে এবং না থাকে কোনো গোপনীয়তা।

নবী করীম (স) নারী-পুরুষের হারাম মিলন ও হালাল মিলনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির জন্যে বিয়ের সময় দফ বাজাতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

হালাল বিয়ে ও হারাম যৌন মিলনের মথ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে একতারা বাজনার বাদ্য ও বিয়ে অনুষ্ঠানের শব্দ ও ধ্বনি।

আল্লামা আমদুল বান্না এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

সুন্নত তরীকা হচ্ছে বিয়ের সময় দফ বাজানো, নির্দোষ গান গাওয়া ও এ ধরনের অন্যান্য কাজ। হাদীসে বিয়ের শব্দ প্রচারের যে কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ তিনি বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

শব্দ করার অর্থ হচ্ছে নির্দোষ কথা সম্বলিত গান-গীতি গাওয়া।

আল্লামা ইসমাঈল কাহলানী সনয়ানী লিখেছেনঃ

বিয়ের প্রচারের আদেশ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। প্রচার করা- গোপন বিয়ের বিপরীত। এ সম্পর্কে বহু হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। তার সনদ সম্পর্কে কিছু কথা থাকলেও সব হাদীস থেকেই মোটামুটি একই কথা জানা যায় এবং একটি অপরটিকে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে দেয়। আর ‘দফ’ –একতারা বাদ্য বা ঢোল –বাজানো জায়েয এজন্যে যে, বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রচারের ব্যাপারে এটা অতিশয় কার্যকর।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

বিয়ে অনুষ্ঠানে ‘ঢোল’ খঞ্জনি বাজানো ও অনুরূপ কোনো বাদ্য বাজানো জায়েয হওয়া সম্পকে সব আলেমই একমত। আর বিয়ে অনুষ্ঠানের সাথে তার বিশেষ যোগের কারণ হচ্ছে এই যে, এতে করে বিয়ের কথা প্রচার হবে ও এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। আর তার ফলেই বিয়ে সংক্রান্ত যাবতীয় অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

ইমাম মালিক বলেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢোল ও তবলা বাজানোতে কোনো দোষ নেই। কেননা আমরা মনে করি, তার আওয়াজ খুব হালকা, আর বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া অপর ক্ষেত্রে তা জায়েয নয়।

ইমাম মালিকের বাঁশী বাজিয়ে আনন্দ-স্ফুর্তি করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস হলে জবাবে তিনি বলেনঃ

(আরবী**************************************************)

তার আওয়াজ যদি বিকট ও প্রচণ্ড হয়, চারদিককে প্রকম্পিত ও আলোড়িত করে তোলে, তাহলে তা আমি পছন্দ করি না –মাকরূহ মনে করি। পক্ষান্তরে সে আওয়াজ যদি ক্ষীণ হয় তবে তাতে দোষ নেই।

কুরজা ইবনে কায়াব আনসারী ও আবূ মাসঊদ আনসারী বলেনঃ

(আরবী********************************************************)

বিয়ের অনুষ্ঠানে বাদ্য ও বাঁশী বাজিয়ে আনন্দ-স্ফুর্তি করার অনুমতি দিয়েছেন আমাদের।

পূর্বেই বলা হয়েছে, রাসূলে করীম (স)-এর বাদ্য বাজানো সংক্রান্ত অনুমতি ফরয-ওয়াজিব কিছু নয়। কিন্তু তবুও এর যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। আর এ ব্যাপারে ধর্মীয় গোঁড়ামীও যেমন সমর্থনীয় নয়, তেমনি অশ্লীল নাচ-গানের আসর জমানো, ভাড়া করা কিংবা বাড়ির যুবক-যুবতীদের সীমালংঘনকারী আনন্দ-উল্লাস এবং তার মধ্যে যৌন-উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী কাজের অনুষ্ঠান কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। বর্তমাতে মুসলিম সমাজ আদুনিকাতর সয়লাবে যেভাবে ভেসে চলেছে, তা অনতিবিলম্বে রোধ করা না গেলে জাতীয় ধ্বংস ও অধোগতি অবধারিত হয়ে দেখা দেবে, তাতে সন্দেহ নেই।

বিয়ের সময় বর-কনেকে সাজানো

বিয়ের সময় বর ও কনেকে নতুন চাকচিক্যময় পোশাক-পরিচ্ছদে সুসজ্জিত করা এবং ছেলেমেয়ের গায়ে হলুদ মাখা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ জায়েয। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেনঃ হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) একদিন রাসূলে করীমের চিহ্ন লাগানো ছিল।

(আরবী*******************) –এবং তখন তাঁর গায়ে হলুদের চিহ্ন লাগানো ছিল।

রাসূলে করীম (স) তার কারণ জিজ্ঞেস করলে হযরত ইবনে আওফ জানালেনঃ

(আরবী**********************************************)

তিনি আনসার বংশের এক মহিলাকে বিয়ে করেছেন (এবং এ বিয়েতে লাগানো হলুদের রং-ই তাঁর গায়ে লেগে রয়েছে)। (বুখারী)

এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ের সময় বর ও কনে –ছেলে ও মেয়ে –উভয়কেই সাজানো এবং তাদের গায়ে হলুদ লাগানো প্রাচীনকালেও –রাসূলের ও সাহাবীদের সমাজেও –প্রচলিত ছিল। হলুদ, জাফরান ইত্যাদি যে কোন জিনিস দিয়েই বর-কনের শরীর রঙীন করা যেতে পারে এবং এর সঙ্গে সুগন্ধি ব্যবহারেরও অনুমতি রয়েছে। কেননা হযতর আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) এসব লাগিয়ে রাসূলের সম্মুখে হাযির হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর এ কাজকে অপছন্দ করেন নি, সেজন্যে তিরস্কারও করেন নি। এ সম্পর্কে ইসলামের মনীষীদের মত হচ্ছে এইঃ

(আরবী************************************************)

যে লোক বিয়ে করবে, সে যেন বিয়ে ও আনন্দ-উৎসবের নিদর্শনস্বরূপ হলুদ বর্ণের রঙীন কাপড় পরিধান করে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

সমস্ত রং ও বর্ণের মধ্যে হলুদ বর্ণই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।

এর কারণস্বরূপ তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত বাক্যাংশ পাঠ করেছিলেনঃ

(আরবী***********************************************)

উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ সম্পন্ন, যার রঙ চকচকে, দর্শকদের মনকে আনন্দে উৎফুল্ল করে দেয়।

এখানে পরিচ্ছন্ন ও চকচকে হলুদ বর্ণকেই লক্ষ্য করা হয়েছে, যা দেখলে চোখ ঝলসে যায়, রঙের সৌন্দর্য দেখে দর্শক মুগ্ধ-বিমোহিত হয়।

রাসূলে করীম (স) নিজে কি সব রং পছন্দ করতেন, এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে হযরত আনাস (রা) বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************************)

নবী করীম (স) হরিৎ বর্ণ লাগাতেন, আমিও তা-ই লাগিয়ে থাকি এবং তা-ই আমি পছন্দ করি, ভালোবাসি।

আল্লামা ইবনে আবদুল বার ইমাম জুহরী থেকে বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

সাহাবায়ে কিরাম হলুদ বর্ণের সুগদ্ধি ব্যবহার করতেন এবং তাতে কোনো দোষ দেখতেন না।

ইবনে সুফিয়ান বলেনঃ

(আরবী***********************************************)

এ রঙ কাপকে ব্যবহার করা আমাদের মনীষীদের মতে জায়েয, দেহ ও শরীরের লাগানো নয়।

অবশ্য ইমাম আবূ হানীফা, শাফিয়ী ও তাঁদের সঙ্গী-সাথীদের মতে কাপড়ে কিংবা দাঁড়িতে জাফরানের রঙ লাগানো মাকরূহ।

দেন-মোহর

বিয়েতে দেন-মোহর বা ‘মহরানা’ অবশ্য দেয় হিসেবে ধার্য করার এবং তা যথারীতি আদায় করার জন্যে ইসলামে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ‘এনায়া’ গ্রন্থে ‘মহরানা’ বলতে কি বোঝায় তার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী******************************************************)

দেনমোহর বলতে এমন অর্থ-সম্পদ বোঝায়, যা বিয়ের বন্ধনে স্ত্রীর ওপর স্বামীত্বের অধিকার লাভের বিনিময়ে স্বামীকে আদায় করতে হয়, হয় বিয়ের সময়ই তা ধার্য হবে, নয় বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কারণে তা আদায় করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব হবে।

বিয়ের ক্ষেত্রে মহরানা দেয়া ফরয বা ওয়াজিব। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**************************************************)

তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের কাছ থেকে যে যৌন-স্বাদ গ্রহণ করো, তার বিনিময়ে তাদের ‘মহরানা’ ফরয মনে করেই আদায় করো।

তাফসীরের কিতাবে এ আয়াতের তরজমা করা হয়েছে নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী**************************************)

অর্থাৎ তোমরা পুরুষরা বিবাহিতা স্ত্রীদের সাথে কার্য সম্পাদন করে যে স্বাদ গ্রহণ করেছ, তার বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য মহরানা পুরাপুরি তাদের নিকট আদায় করে দাও, আদায় করো এ হিসেবে যে, তা পূর্ণমাত্রায় দেয়া আল্লাতর তরফ থেকে তোমাদের ওপর ফরয করা হয়েছে।

অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***************************************************)

এবং মেয়েদের অলি-গার্জিয়ানের অনুমতি নিয়ে তাদের বিয়ে করো এবং তাদের ‘মহরানা’ প্রচলিত নিয়মে ও সকলের জানামতে তাদেরকেই আদায় করে দাও।

এ আয়াতদ্বয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে দেয়ার স্পষ্ট নির্দেশ ঘোষিত হয়েছে। এজন্যে ‘মহরানা’ হচ্ছে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার একটি জরুরী শর্ত। প্রথম আয়াতে আজাদ ও স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করা সম্পর্কে নির্দেশ এবং দ্বিতীয় আয়াতে দাসী বিয়ে করা সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর দু’জায়গায় বিয়ের বিনিময়ে মহরানা দেয়ার স্পষ্ট নির্দেশ উল্লিখিত হয়েছে।

আল্লামা ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

মহান আল্লাহ মহরানাকে বিনিময় স্বরূপ ধার্য করেছেন এবং যাবতীয় পারস্পরিক বিনিময়সূচক ও একটা জিনিসের মুকাবিলার আর একটা জিনিস দানের কারবারের মতোই ধরে দিয়েছেন।

অতএব এটাকে স্বামীর ‘অনুগ্রহের দান’ মনে না করে একটার বদলে একটা প্রাপ্তির মতো ব্যাপার মনে করতে হবে। অর্থাৎ মহরানার বিনিময়ে স্ত্রীর যৌন অঙ্গ ব্যবহারের অধিকার লাভ।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************************)

এবং মুহাররম মেয়েদের ছাড়া আর সব মহিলাকেই তোমাদের জন্যে হালাল করে দেয়া হয়েছে এজন্যে যে, তোমরা তাদের গ্রহণ করবে তোমাদের ধন-মালের বিনিময়ে।

ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************)

আল্লাহ মহান হুকুমদাতা স্ত্রীর যৌন অঙ্গ ব্যবহার হালাল করেছেন ধন-মালের বিনিময়ে ও বিয়ের মাধ্যমে পবিত্রতা রক্ষার্থে, জেনার জন্যে নয়। আর একথা প্রমাণ করে যে, বিয়েতে মহরানা দেয়া ওয়াজিব অর্থাৎ ফরয নয়।

কুরআনে আবার বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************************)

এবং মুসলমান ও আহলি কিতাব বংশের সতীত্ব-পবিত্রতাসম্পন্না মহিলারাও তোমাদের জন্যে হালাল, যখন তোমরা তাদের মহরানা আদায় করে বিয়ে করবে।

অন্যত্র এ কথারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

(আরবী******************************************************)

তোমরা যদি সে মহিলাদের বিনিময় –মহরানা –দিয়ে বিয়ে করো, তবে তোমাদের কোনো গুনাহ হবে না।

এ আয়াত দুটি উদ্ধৃত করে ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

এসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, মহরানা দেয়া সকল বিয়েতে ও সকল অবস্থায়ই ওয়াজিব (ফরয)। এমনকি আকদ-এর সময় যদি ধার্য করা নাও হয় তবুও সে স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন হওয়ার সাথে সাথে মহরানা দেয়া ওয়াজিব (ফরয) হয়ে যাবে।

শুধু তা-ই নয়, মহরানা আদায় করতে হবে অন্তরের সন্তোষ ও সদিচ্ছা সহকারে এবং মেয়েদের জন্যে আল্লাহর দেয়া এক নেয়ামত মনে করে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************)

এবং স্ত্রীদের প্রাপ্য মহরানা তাদের আদায় করে দাও আন্তরিক খুশীর সাথে ও তাদের অধিকার মনে করে।

আয়াতে উদ্ধৃত (আরবী********) শব্দের অর্থ ব্যাপক। তার একটি মানে হচ্ছে (আরবী********) কোনো বিনিময় ও বদলা ব্যতিরেকেই কিছু দিয়ে দেয়া। আয়াতের আর একটি অর্থ হচ্ছেঃ

(আরবী******************************)

মহরানা দিয়ে মনকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ করে নাও, মহরানা দেয়ার জন্যে  মনের কুণ্ঠা কৃপণতা দূর করো।

আর এর তৃতীয় অর্থ হচ্ছেঃ

(আরবী***********) –আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ দান।

কেননা জাহিলিয়াতের যুগে হয় মহরানা ছাড়াই মেয়েদের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যেত, নয় মহরানা বাবদ যা কিছু আদায় হতো তা সবই মেয়েদের বাপ বা অলি-গার্জিয়ানরাই লুটে পুটে খেয়ে নিত। মেয়েরা বঞ্চিতাই থেকে যেত। এজন্যে ইসলামে যেমন মহরানা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তেমনি এ জিনিসকে একমাত্র মেয়েদেরই প্রাপ্য ও তাদের একচেটিয়া অধিকারের বস্তু বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এতে বাপ বা অলী-গার্জিয়ানের কোনো হক নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বস্তুত মহরানা যখন মেয়েদের জন্যে আল্লাহর বিশেষ দান, তখন তা আদায় করা স্বামীদের পক্ষে ফরয এবং স্বামীদের ওপর তা হচ্ছে স্ত্রীদের আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার।

প্রশ্ন উঠতে পারে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ই তো উভয়ের কাছে থেকে যৌন সুখ ও পরিতৃপ্তি লাভ করে থাকে। ‘মহরানা’ যদি এরই ‘বিনিময়’ হয় তাহলে তা কেবল স্বামীই কেন দেবে স্ত্রীকে, তা কি স্বামীদের ওপর অতিরিক্ত ‘জরিমানা’ হয়ে যায় না?

এর জবাবে বলা যায়, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, স্বামী বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর ওপর এক প্রকারের কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব লাভ করে থাকে। স্বামী স্ত্রীর যাবতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরনের দায়িত্ব গ্রহণ করে আর স্ত্রী নিজেকে –নিজের দেহমন, প্রেম-ভালবাসা, যাবতীয় সম্পদ-ঐশ্বর্য –একান্তভাবে স্বামীর হাতে সোপর্দ করে দেয়। এর বিনিময়স্বরূপই মহরানা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেননাঃ

(আরবী*************************************************************)

অতঃপর স্ত্রী স্বামীর মত ও  অনুমতি না নিয়ে –না নফল রোযা রাখবে, না হজ্জ করবে। আর না তার ঘর ছেড়ে কোথাও চলে যাবে।

শাফিয়ী মাযহাবের আলেমগণ মহরানার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

বিয়ে হবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিনিময়মূলক একটি বন্ধন। বিয়ের পর একজন অপরজনকে নিজের বিনিময়ে লাভ করে থাকে। প্রত্যেক অপরজনের থেকে যেটুকু ফায়দা লাভ করে, তাই হচ্ছে অপর জনের ফায়দার বিনিময় –বদল। আর মহরানা হচ্ছে এক অতিরিক্ত ব্যবস্থা। আল্লাত তা’আলা তা স্বামীর ওপর অবশ্য দেয় –ফরয করে দিয়েছেন এজন্যে যে, বিয়ের সাহায্যে সে স্ত্রীর ওপর খানিকটা অধিকারসম্পন্ন মর্যাদা লাভ করতে পেরেছে।

অতএব বিয়ের আকদ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময়ই মহরানা নির্ধারণ এবং তার পরিমাণের উল্লেখ একান্ত কর্তব্য। নবী করীম (স) অত্যন্ত জোরের সাথে বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************)

বিয়ের সময় অবশ্য পূরণীয় শর্ত হচ্ছে তা, যার বিনিময়ে তোমরা স্ত্রীর যৌন অঙ্গ নিজের জন্যে হালাল মনে করে নাও।

-আর তা হচ্ছে মহরানা বা দেন-মোহর।

বিয়ের পর স্ত্রীকে কিছু না দিয়ে তার কাছে যেতেও নবী করীম (স) স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) হযরত ফাতিমা (রা)-কে বিয়ে করার পর তাঁর নিকটে যেতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তখন নবী করীম (স)-

(আরবী**************************************)

তাকে কোনো জিনিস না দেয়া পর্যন্ত তাঁর নিকট যেতে তাঁকে নিষেধ করলেন।

আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

নবী করীম (স) স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার মনকে স্বামীর প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে স্ত্রীকে কিছু না-কিছু আগে-ভাগে দেবার জন্যে স্বামীকে আদেশ করেছেন।

প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, বিয়ের সময় দেন-মোহর ছাড়া অপর এমন কোনো শর্ত আরোপ করা চলবে না, যা শরীয়তের বিরোধী।

নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী********************************************)

কোনো মহিলা তার বিয়ের জন্যে তারই অপর এক বোনকে তালাক দেয়ার শর্ত আরোপ করতে পারবে না।

বুখারী শরীফে এ হাদীসটির পূর্ণ ভাষণ নিম্নরূপঃ

(আরবী*****************************************)

কোনো মেয়েলোকের জন্যে তার অপর এক বোনকে তালাক দেয়ার দাবি করা –যেন সে তার ভোগের পাত্র সে নিজের জন্যে পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নিতে পারে –হালাল নয়। কেননা সে তা পাবেই, যা তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।–[ইবনে হাবীব বলেছেনঃ

(আরবী*************************************)

মনীষীগণ এ নিষেধকে অবশ্য পালনীয় মনে করেন না; বরং এ কাজ বাঞ্ছনীয়-ও মনে করেন না। তা সত্ত্বেও এরূপ শর্ত যদি কেউ আরোপ করে, তবে তাতে তার বিয়ে ভেঙ্গে যাবে না –যদিও ইবনে বাত্তাল এ কথার ওপর জোর আপত্তি জানিয়েছেন।]

‘তার অপর এক বোন’ বলতে আপন সহোদরাও হতে পারে, অনাত্মীয় কোনো মেয়েলোকও হতে পারে। কেননা সে তার আপন সহোদরা বোন না হলেও মুসলিম হিসেবে সে তার দ্বীনী বোন অর্থাৎ কোনো পুরুষ –যার স্ত্রী রয়েছে –যদি অপর কোনো মেয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়, মেয়ে সে বিয়েতে রাজি হয়ে পুরুষটিকে একথা বলতে পারবে না যে, তোমরা আগের (মানে বর্তমান) স্ত্রীকে আগে তালাক দাও, তারপর আমাকে বিয়ে করো। এরূপ শর্ত আরোপ করার তার কোনো অধিকার নেই। সে ইচ্ছে করলে এ বিয়ের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু একজনের বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দেয়ার শর্ত আরোপ করা এবং সে তালাক হয়ে যাওয়ার পর তার নিকট বিয়ে বসতে রাজি হওয়ার কারো অধিকার থাকতে পারে না। এরূপ শর্ত আরোপ করা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রাসূলে করীম (স) এ পর্যায়ে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

আল্লাহর কিতাবে নেই –এমন কোনো শর্ত আরোপ করা হলে তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান হবে।

মহরানা না দিয়ে স্ত্রীর নিকট গমন করাই অবাঞ্ছনীয়। হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, হযরত আলী যখন হযরত ফাতিমাকে বিয়ে করলেন, তখন নবী করীম (স) তাঁকে বললেনঃ

(আরবী***************************)

তুমি ওকে কিছু একটা দাও।

হযরত ইবনে উমর বললেনঃ

(আরবী**********************************************************)

কোনো মুসলমানেরই মহরানা বাবদ কম বা বেশি কিছু অগ্রিম না দিয়ে তার স্ত্রীর নিকট গমন করা জায়েয নয়।

মালিক ইবনে আনাস বলেছেনঃ

(আরবী***************************************************************)

স্ত্রীকে তার মহরানার কিছু-না-কিছু না দিয়ে স্বামী যেন তার নিকট গমন না করে। মহরানার কম-সে-কম পরিমাণ হলো একটি দীনারের এক চতুর্থাংমে কিংবা তিন দিরহাম। বিয়ের সময় এ পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক আর নাই হোক, তাতে কিছু আসে যায় না।

দেন-মোহরের কি হওয়া উচিত, ইসলামী শরীয়তে এ সম্পর্কে কোনো অকাট্য নির্দেশ দেয়া হয়নি, নির্দিষ্টভাবে কোনো পরিমাণও ঠিক করে বলা হয়নি। তবে একথা স্পষ্ট যে, প্রত্যেক স্বামীর-ই কর্তব্য হচ্ছে তার আর্থিক সামর্থ্য ও স্ত্রীর মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে উভয় পক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেয়া। আর মেয়ে পক্ষেরও তাতে সহজেই রাজি হয়ে যাওয়া উচিত। এ ব্যাপারে শরীয়ত উভয় পক্ষকে পূর্ণ আজাদি দিয়েছে বলেই মনে হয়। এ বিষয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী যা লিখেছেন, তা নিম্নোক্ত ভাষায় প্রকাশ করা হচ্ছেঃ

নবী করীম (স) মহরানার কোনো পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেন নি এ কারণে যে, এ ব্যাপারে লোকদের আগ্রহ-উৎসাহ ও ঔদার্য প্রকাশ করার মান কখনো এক হতে পারে না। বরং বিভিন্ন যুগে, দুনিয়ার বিভিন্ন স্তরের লোকদের আর্থিক অবস্থা এবং লোকদের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, কার্পণ্য ও উদারতার ভাবধারায় আকাশ-ছোঁয়া পার্থক্য হয়ে থাকে। বর্তমানেও এ পার্থক্য বিদ্যমান। এজন্যে সর্বকাল যুগ-সমাজ স্তর, অর্থনৈতিক অবস্থা ও রুচি-উৎসাহ নির্বিশেষে প্রযোজ্য হিসেবে একটি পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া বাস্তব দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব। যেমন করে কোনো সুরুচিপূর্ণ দ্রব্যের মূল্য সর্বকালের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া যায় না –দেয়া অবৈজ্ঞানিক ও হাস্যকর। কাজেই এর পরিমাণ সমাজ, লোক ও আর্থিক মানের পার্থক্যের কারণে বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। তবে শুধু শুধু এবং পারিবারিক আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে এর পরিমাণ নির্ধারণর বাড়াবাড়ি ও দর কষাকষি করাও আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। তার পরিমাণ এমন সামান্য ও নগণ্য হওয়া উচিত নয়, যা স্বামীর মনের ওপর কোনো শুভ প্রভাবই বিস্তার করতে সমর্থ হবে না। যা দেখে মনে হবে যে, মহরানা আদায় করতে গিয়ে স্বামীকে কিছুমাত্র ক্ষতি স্বীকার করতে হয়নি, সেজন্যে তাকে কোনো ত্যাগও স্বীকার করতে হয়নি।

শাহ দেহলভীর মতে, দেন-মোহরের পরিমাণ এমন হওয়া উচিত, যা আদায় করা স্বামীর পক্ষে কষ্টসাধ্য হবে এবং সেজন্যে সে রীতিমতো চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে তার পরিমাণ এমনও হওয়া উচিত নয়, যা আদায় করা স্বামীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এজন্যে নবী করীম (স) একদিকে গরীব সাহাবীকে বললেনঃ

(আরবী********************************************)

কিছু-না-কিছু দিতে চেষ্টা করো। আর কিছু না পার, মহরানা বাবদ অন্তত লোহার একটি আঙ্গুরীয় দিতে পারলেও সেজন্যে অবশ্য চেষ্টা করবে।

আর যে নিঃস্ব সাহাবী তাও দিতে পারেন নি, তাঁকে তিনি বলেছেনঃ

(আরবী************************************************)

কুরআন শরীফের যা কিছু তোমরা জানা আছে, তা তুমি তোমার স্ত্রীকে শিক্ষা দেবে –এই বিনিময়েই আমি মেয়েটিকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।

এ ধরনের মহরানার সম্পর্কে ফিকাহবিশারদ মকহুল বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

এ ধরনের মহরানার বিনিময়ে বিয়ে সম্পন্ন করার ইখতিয়ার রাসূলে করীম (স)-এর পরে আর কারো নেই।

ফিকাহবিদ লাইস বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************************************************)

রাসূলের তিরোধানের পর এই ধরনের মহরানা নির্দিষ্ট করার অধিকার আর কারো নেই।

ইবনে জাওজী বলেছেনঃ ইসলামের প্রথম যুগে স্বাভাবিক দারিদ্র্যের কারণে প্রয়োজনবশতই এ ধরনের মহরানা নির্দিষ্ট করা জায়েয ছিল। কিন্তু এখন তা জায়েয নয়।

একটি হাদীস থেকে জানা যায়, এক জোড়া জুতার বিনিময়ে অনুষ্ঠিত বিয়েকেও রাসূলে করীম (স) বৈধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি মেয়েলোকটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি মহরানা বাবদ যা পেয়েছ, তাতে বিয়ে করতে কি তুমি রাজি আছ?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। তখন রাসূলে করীম (স) সে বিয়েতে অনুমতি দান করেছিলেন।

অপরদিকে কুরআন মজীদে এই মহরানা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************************)

এবং তোমরা মেয়েদের এক-একজনকে ‘বিপুল পরিমাণ’ ধন-সম্পদ মহরানা বাবদ দিয়ে দিয়েছ।

এ আয়াতের ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মহরানা বাবদ দেয়া জায়েয প্রমাণিত হচ্ছে। হযরত উমর (রা) উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেছিলেন এবং মহরানা বাবদ দিয়েছিলেন চল্লিশ হাজার দিরহাম। চল্লিশ হাজার দিরহাম তদানীন্তন সমাজে বিরাট সম্পদ। নবী করীম (স) স্বয়ং হযরত উম্মে হাবীবাকে মহরানা দিয়েছিলেন চারশত দীনার –চার শতটি স্বর্ণমুদ্রা। এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁর মহরানার পরিমাণ ছিল আটশ’ দীনার। (আরবী****************)

এ আলোচনা থেকে একদিকে যেমন জানা যায় মহরানার সর্বনিম্ন পরিমাণ, অপর দিকে জানা যায় সর্বোচ্চ পরিমাণ। ইসলামী শরীয়তে এ দু’ধরনের পরিমাণই জায়েয।

কিন্তু জাহিলিয়াতের যুগে পরিমাণে মহরানা ধার্য করা হতো। পরিমাণ বৃদ্ধির জন্যে কন্যাপক্ষ খুবই চাপ দিত। ফলে দুপক্ষের মধ্যে নানারূপ দর কষাকষি ও ঝগড়াঝাটি হতো। এর পরিণামে সমাজে দেখা দিত নানা প্রকারের জটিলতা। বর্তমানেও মুসলিম সমাজে মহরানা ধার্যের ব্যাপারে অনুরূপ অবস্থাই দেখা দিয়েছে। বলা যেতে পারে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির চরমোন্নতির এ যুগে পুরাতন জাহিলিয়াত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এখন নতুন করে স্মরণ করা আবশ্যক বোধ হচ্ছে নবী করীম (স)-এর পুরাতন বাণী। বলেছেনঃ

(আরবী***************************************)

সবচেয়ে উত্তর পরিমাণের মহরানা হচ্ছে তা, যা আদায় করা খুবই সহজসাধ্য।

এজন্যে একান্ত প্রয়োজন হচ্ছে অবস্থাভেদে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পরিমাণের মধ্যে সহজ দেয় একটা পরিমাণ বেঁধে দেয়া এবং এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ থেকে অকারণ বাড়াবাড়ি করা কিছুমাত্র বাঞ্ছনীয় নয়।

মহরানা বাঁধার মান মধ্যম পর্যায়ে আনার প্রচেষ্টা রাসূলে করীম (স)-এর সময় থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে একটা ভুল দৃষ্টি যেন মুসলমানদের মধ্যে থেকেই গিয়েছে। হযরত উমর ফারূক (রা) পর্যন্ত এ সম্পর্কে বিশেষ যত্নবান হয়েছিলেন। তিনি একদা মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে লোকদের নসীহত করছিলেন এবং মহরানা সম্পর্কে বিশেষভাবে বলেছিলেনঃ

(আরবী****************************************)

সাবধান হে লোকেরা, স্ত্রীদের মহরানা বাঁধতে কিছুমাত্র বাড়াবাড়ি করো না। মনে রেখো, মহরানা যদি দুনিয়ায় মান-সম্মান বাড়াতে কিংবা আল্লাহর নিকট তাকওয়ার প্রমাণ হতো। তাহলে অতিরিক্ত মহরানা বাঁধার কাজ করার জন্যে রাসূলে করীমই ছিলেন তোমাদের অপেক্ষাও বেশি অধিকারী ও যোগ্য। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের ও কন্যাদের মধ্যে কারো মহরানাই বারো ‘আউকিয়া’ (চার শ’ আশি দিরহাম কিংবা বড়জোর একশ’ কুড়ি টাকা)-র বেশি ধার্য করেন নি। মনে রাখা আবশ্যক যে, এক-একজন লোক তার স্ত্রীকে দেয় মহরানার দরুন বড় বিপদে পড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সে নিজের স্ত্রীকে শত্রু বলে মনে করতে শুরু করে।

এমনি এক ভাষণ শুনে উপস্থিতদের মধ্য থেকে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে বললেনঃ

(আরবী*****************************************************)

আল্লাহ তো আমাদের দিচ্ছেন, আর তুমি হারাম করে দিচ্ছ? তুমি লোকদেরকে মেয়েদের মহরানার পরিমাণ চরশ’ দিরহামের বেশি বাঁধতে নিষেধ করছো? …তুমি কি শোননি, আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

তোমরা তোমাদের এক এক স্ত্রীকে মহরানা দিচ্ছ বিপুল পরিমাণে?

তখন উমর (রা) বললেনঃ

(আরবী********************************)

একজন মেয়েলোক ঠিক বলতে পারল; কিন্তু ভুল করল একজন রাষ্ট্রনেতা।

বললেনঃ

(আরবী**********************************)

হে আল্লাহ মাফ করে দাও, -সব লোকই কি উমরের তুলনায় অধিক সমঝদার?

অপর বর্ণনায় হযরত উমরের কথাটি এভাবে উদ্ধৃত হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************************)

প্রত্যেকটি ব্যক্তিই উমরের অপেক্ষা বেশি ফিকাহবিদ –এমনকি মেয়েলোকরা পর্যন্ত।

বাহ্যত মনে হয়, হযতর উমর (রা) অধিক পরিমাণে মহরানা বাঁধার কাজকে নিষেধ করা থেকে ফিরে গিয়েছেন। বস্তুত হযরত উমরের কথার অর্থ এই ছিল না যে, তিনি অধিক পরিমাণে মহরানা ধার্য করাকে হারাম মনে করতেন, আর তাকে হারাম করে দেওয়াও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং বলা যায়, তিনি অধিক পরিমাণে মহরানা ধার্য করা ভালো মনে করতেন না। বস্তুত মহরানা পরিমাণের কোনো সর্বোচ্চ পরিমাণ নেই, এ কথার ওপরই মনীষীদের ইজমা হয়েছে।

(আরবী**************************)

কাজেই শরীয়তে না সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, না সর্বোচ্চ পরিমাণ। যার পক্ষে যতটুকু আদায় করা সহজসাধ্য, তার সেই পরিমাণই ধার্য করা উচিত।–[তবে সহজ হওয়ার অর্থও নিশ্চয়ই এই নয় যে, মহরানার পরিমাণটা এতই সামান্য হবে যে, মনে হবে সে ভিখারীকে ভিক্ষা দিচ্ছে। বস্তুত শরীয়তে মহরানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার পরিমাণটাও তেমনি গণনার যোগ্য হওয়া উচিত।] তার চেয়ে কম করা যেমন স্বামীর উচিত নয়, তেমনি তার চেয়ে বেশি করতে চেষ্টা করাও উচিত নয় মেয়ে পক্ষের।

কোনো কোনো সাহাবী ও তাবেয়ীন নিজেদের ইজতিহাদের ভিত্তিতে মহরানার একটা সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করতে চেষ্টা করেছেন। হযতর আলী (রা) বলেছেনঃ

(আরবী***************************)

দশ দিরহাম পরিমাণের কমে মহরানা হতে পারে না।

শা’বী, ইবরাহীন নখয়ী ও অন্যান্য তাবেয়ীও এ মতই প্রকাশ করেছেন। ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ, জুফর, হাসান ইবনে জিয়াদেরও এই মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আবূ সাইদ খুদরী (রা), হাসান, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব ও আতা প্রমুখ ফকীহ বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************)

বিয়ে কম পরিমাণ মহরানায়ও শুদ্ধ হয়, শুদ্ধ হয়ে বেশি পরিমাণ মহরানায়ও।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) এক ‘নাওয়াত’ পরিমাণ স্বর্ণ মহরানা বাবদ দিয়েছিলেন। তার মূল্য বড়জোর তিন দিরহাম মাত্র। আর কেউ বলেছেন পাঁচ, কেউ বলেছেন দশ দিরহাম। ইমাম মালিক বলেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

নিম্নতম মহরানার পরিমাণ হচ্ছে এক দীনারের এক-চতুর্থাংশ।

পূর্বেই বলেছি, এসব হচ্ছে ইসলামের বিশেষজ্ঞ মনীষীদের নিজস্ব মতামত ও নিজস্ব ইজতিহাদ। এর মূলে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো অকাট্য দলীল নেই।

আসলে বিয়েতে দেন-মোহরের ব্যবস্থা করা হয়েছে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে একটা কিছু বেঁধে দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। বরং যা কিছু ধার্য করা হবে তা একদিকে যেমন স্ত্রীর প্রাপ্য আল্লাহর দেয়া অধিকার, অপরদিকে স্বামীর শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ স্ত্রীর অঙ্গের অধিকার হালাল করার একটি পুরস্কারও বটে। অতএব তা ধার্য করতে হবে তাকে ঠিক ঠিকভাবে ও যথাসময়ে স্ত্রীর নিকট আদায় করে দয়োর উদ্দেশ্যে। স্ত্রীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানও এর একটা বিশেষ লক্ষ্য। কিন্তু শুধু করে দেয়ার উদ্দেশ্যে। স্ত্রীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানও এর একটা বিশেষ লক্ষ্য। কিন্তু শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে যদি একটা বিরাট পরিমাণ বেঁধেও দেয়া হয় কিংবা স্বামীকে তা স্বীকার করে নিতে বাধ্যও করা হয়, অথব তা যদি সঠিকভাবে আদায়ই না করা হয়, তাহলে স্ত্রীর কার্যত কোনো ফায়দাই তাতে হয় না। আর পরিমাণ যদি এত বড় হয় যে, তা আদায় করা স্বামীর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়, তাহলে তার পরিমাণ পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। স্বামী যদি বিয়ের উদ্দেশ্যে মেয়ে পক্ষের অসম্ভব দাবির নিকট মাথা নত করে দিয়ে তাদের মর্জি মতো বড় পরিমাণের মহরানা স্বীকার করে নেয়, আর মনে মনে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত করে রাখে যে, কার্যত সে তার কিছুই আদায় করবে না, তা হলেও ব্যাপারটি একটি বড় রকমের প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে আদায় করার নিয়ত না থাকা সত্ত্বেও একটা বড় পরিমাণের মহরানা মুখে স্বীকার করে নেয়া যে কত বড় গুনাহ তা রাসূলে করীম (স)-এর উদ্ধৃত বাণী থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী****************************************************)

যে লোক কোনো মেয়েকে কম বেশি পরিমাণের মহরানা দেয়ার ওয়াদায় বিয়ে করে অথচ তার মনে স্ত্রীর সে হক আদায় করার ইচ্ছা থাকে না, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে ব্যভিচারীরূপে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

হযরত সুহাইব ইবনে সানান (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

যে লোক কোনো মেয়েকে কম বেশি পরিমাণের মহরানা দেয়ার ওয়াদায় বিয়ে করে অথচ তার মনে স্ত্রীর সে হক আদায় করার ইচ্ছা থাকে না, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে ব্যভিচারীরূপে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

হযরত সুহাইব ইবনে সানান (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

যে-লোক তার স্ত্রীর জন্যে কোনো মহরানা ধার্য করবে অথচ আল্লাহ জানেন যে, তা আদায় করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই, ফলে আল্লাহর নামে নিজের স্ত্রীকেই প্রতারিত করল এবং অন্যায়ভাবে ও বাতিল পন্থায় নিজ স্ত্রীর যৌন অঙ্গ নিজের জন্যে হালাল মনে করে ভোগ করল, সে লোক আল্লাহর সাথে ব্যভিচারী হিসাবে সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হবে। (আরবী*******************************)

দান –জেহাজ

ছেলেমেয়ের বিবাহ উপলক্ষে মেয়ে পক্ষ থেকে দান –জেহাজ দেয়ার প্রশ্নটিও ইসলামে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ পর্যায়ে দুটি প্রশ্ন বিচার্য। একটি হচ্ছে ইসলামে দান-জেহাজের রীতি প্রচলিত কিনা, আর দ্বিতীয় তার পরিমাণ কি হওয়া উচিত।

দান –জেহাজের রেওয়াজ যে ইসলামে রয়েছে এবং শরীয়তে তা অসমর্থিতও নয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হাদীসে গ্রন্থসমূহে এ সম্পর্কে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে।

হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা যায়, জেহাজ বা যৌতুক দেয়ার রেওয়াজ রাসূরে করীম (স)-এর যুগেও বর্তমান ছিল এবং নবী করীম (স) নিজে তাঁর কন্যাদের বিয়ের সময় যৌতুক দান করেছেন। হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

রাসূলে করীম (স) ফাতিমাকে যৌতুক হিসেবে দিয়েছিলেন একটি পাড়ওয়ালা কাপড়, একটি পানির পাত্র, আর একটি চামড়ার তৈরী বালিশ –যার মধ্যে তীব্র সুগন্ধিযুক্ত ইযখির খড় ভর্তি ছিল।

হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করীম (স) এই কয়টি জিনিস ছাড়াও দুটি যাঁতা এবং পাকা মাটির একটি পাত্র ফাতিমা (রা)-কে জেহাজ হিসেবে দিয়েছিলেন।

এসব হাদীসের ভিত্তিতে আল্লামা আহমাদুল বান্না লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************)

এ পর্যায়ের যাবতীয় হাদীস প্রমাণ করে যে, জেহাজ দানের ব্যাপারে মধ্যম নীতি অবলম্বন করা এবং তাতে বিপুল প্রাচুর্যের বাহুল্য না করা বরং প্রত্যেক যুগের দৃষ্টিতে নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করা আবশ্যক।

বস্তুত যৌতুক দেয়া কনের পিতা বা গার্জিয়ানের কর্তব্য। কিন্তু তাতে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, প্রাচুর্য ও আতিশয্য করা ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষত এ ব্যাপারে মানুষ প্রাচুর্য ও বাহুল্য দেখায় শুধু নাম ডাক আর খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে –এ উদ্দেশ্যে যে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে, সকলে জানতে পারবে যে, অমুকে তার কন্যাকে এত শত বা এত হাজার টাকার জিনিসপত্র যৌতুক হিসেবে দিয়েছে।

তবে একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মেয়েকে বিয়ে দিলে সাময়িকভাবে এবং হঠাৎ করে পিতার ঘর-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সম্পূর্ণ নতুন মানুষের নিতান্তই অপরিচিত পরিবেশে এক নতুন ঘর ও সংসার রচনা করতে শুরু করে। এ সময় তার সংসার গঠনে বহু রকমের জিনিসপত্রের প্রয়োজন দেখা দেয়া আবশ্যম্ভাবী। এ এক সংকটময় সময় বলতে হবে। কাজেই কন্যার পিতা যদি জরুরী কিছু জিনিসপত্র দিয়ে নিজ কন্যার সংসার গঠনে বাস্তবভাবে সাহায্য করে, তবে তা মেয়ের প্রতি কল্যাণই শুধু হবে তা না, পিতার এক কতর্বব্যও পালিত হবে।

কিন্তু সেই সঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে যে, দান-জেহাজ যেমন পিতার অবস্থানুপাতে মধ্যম মানের ও মাঝামাঝি পর্যায়ের হওয়া উচিত, কোনো বাড়বাড়ির অবকাশ দেয়া উচিত নয়, তেমনি তা বিয়ের শর্ত হিসেবে দাবি করে নেয়ার ব্যাপারও নয়। বর্তমান সময় সেকালের হিন্দু সমাজের ন্যায় মুসলিম সমাজেও দাবি ও শর্ত করে যৌতুক আদায়ের একটা মারাত্মক প্রচলন ব্যাপক ও প্রকট হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। আজকের বিবাহেচ্ছু বা বিবাহোপযোগী যুবকদের মধ্যে যত বেশি সম্ভব যৌতুক আদায়ের একটা লজ্জাকর প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর ফলে অনেক ঠিক করা-বিয়েও শুধু যৌতুকের পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষি হওয়ার কারণে ভেঙে যেতে দেখা যাচ্ছে। আর বহু বিবাহোপযোগী মেয়ের বিয়ে হতে পারছে না শুধু এ কারণে যে, মেয়ের পিতা ছেলের বা ছেলে পক্ষের দাবি অনুযায়ী যৌতুক দেয়ার সামর্থ্য রাখে না। অনেক ছেলে জোর করে, মেয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে, এমন কি অনেক সময় তালাক দেয়ার ভয় দেখিয়েও যৌতুক আদায় করে। বাবার নিকট থেকে দাবি অনুযায়ী যৌতুক আনতে না পারার দরুন কত নব বিবাহিতাকে যে প্রাণও দিতে হয়েছে ও হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে পিতারও চরম উপেক্ষা অনমনীয় মনোভাব দেখা যায়। সামর্থ্য থাকলেও আর মেয়ের নতুন সংসারের জন্যে প্রয়োজন হলেও কিছু দিতে পিতা রাজি হয় না।

হযরত হাফসা (রা) রাসূলের অন্যান্য বেগমের সাথে একত্রিত হয়ে একদিন রাসূলে করীম (স)-এর নিকট নানা জিনিস দাবি করেন। তাতে রাসূলে করীম (স) খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। হযতর উমর ফারূক (রা) একথা শুনতে পেয়ে দ্রুত হাফসার নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ

(আরবী************************************************************)

তুমি রাসূলের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করবে না এবং তাঁর কাছে কখনই কিছু চাইতে পারবে না। (সহীহ হাদীসের শব্দ –যা তাঁর কাছে নেই তা চাইতে পারবে না।) বরং তোমার যা কিছু প্রয়োজন তা আমার নিকটই চাবে।

এ ঘটনা দান –জেহাজ সম্পর্কে ইসলামী আদর্শবাদী ব্যক্তির জন্যে এক উজ্জ্বল ও গৌরবদীপ্ত দৃষ্টান্ত পেশ করছে।

ওয়ালীমার জিয়াফত

বিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারের দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে ওয়ালীমার জিয়াফত করা। এ অনুষ্ঠান মেয়ে পক্ষেরও যেমন করা উচিত, তেমনি করা উচিত ছলে পক্ষেরও। নিজেদের ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের একত্রিত করা একান্তই বাঞ্ছনীয়। ইসলামে এ ওয়ালীমা-জিয়াফতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাসূলে করীম (স) ওয়ালীর রীতি ইসলামী সমাজে বিশেষভাবে চালু করেছেন।

‘ওয়ালীমা’ শব্দের আসল অর্থ হল একত্রিত করা। কেননা একজন পুরুষ ও একজন মেয়ের বিবাহিত জীবনের মিলিত হওয়ার উপলক্ষে নিকটাত্মীয়দের একত্রিত করা হয় এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘ওয়ালীমা’।

আর শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়ালীমার জিয়াফত বলতে বোঝায়ঃ

(আরবী**********************************************************)

বিয়ে-অনুষ্ঠানের সময়কালীন আয়োজিত খানা, যার জন্যে লোকদের দাওয়াত দেয়া হয়।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) বিয়ে করলে পরে রাসূলে করীম (স) তাকে বলেনঃ

(আরবী****************************************)

আল্লাহ এ কাজে তোমাকে বরকত দিন। এখন তুমি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমার জিয়াফত করো।

রাসূলে করীম (স) নিজে যখন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা)-কে বিয়ে করলেন, তখন তিনি একটি বকরী জবাইকরে ওয়ালীমার জিয়াফত করেছিলেন। সে সম্পর্কে হযরত আনাস (রা) বলেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

রাসূলে করীম (স) যখন যায়নাব বিনতে জাহাশকে বিয়ে করে ঘর বাঁধলেন, তখন তিনি লোকদের রুটি ও গোশত খাইয়ে পরিতৃপ্ত করে দিয়েছিলেন।

তিনি যখন হযরত সফীয়া (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন, তখন খেজুর (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন, তখন খেজুর দিয়ে এই ওয়ালীমার জিয়াফত করেছিলেন। অপর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, নবী করীম (স) খায়বর ও মদীনার মাঝখানে একাদিক্রমে তিন রাত্রি পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন। তার মধ্যে একদিন সঙ্গীর সব সাহাবীদের ওয়ালীমার দাওয়াত দিলেন। এ দাওয়াতে না ছিল গোশত না ছিল রুটি। বরং রাসূলে করীম (স) সকলের সামনে খেজুর ছড়িয়ে দিলেন। হযরত সফীয়ার সাথে বিয়ের ওয়ালীমা এমনি অনাড়ম্বরভাবে সম্পন্ন হয়ে গেল। (আরবী************************************)

ওয়ালীমা সম্পর্কে কুরআন মজীদেও তাগিদ রয়েছে। সূরা আন-নিসা’য় বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************) –‘তোমরা তোমাদের অর্থ-সম্পদের বিনিময়েই স্ত্রী গ্রহণ করতে চাবে’। বিয়ের পরে ওয়ালীমা অনুষ্ঠানের নির্দেশও এরই মধ্যে রয়েছে বলে মনে করতে হবে। কেননা ‘ওয়ালীশা’ বিয়ে উপলক্ষেই হয়ে থাকে এবং তাতে অর্থ ব্যয় হয়।

রাসূলে করীম (স) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফকে যে ওয়ালীমার জিয়াফত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতে আল্লামা সানয়ানী কাহলানী লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************)

এ নির্দেশ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়েতে ওয়ালীমার জিয়াফত করা ওয়াজিব।

হযরত আলী (রা) যখন বিবি ফাতিমার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন নবী করীম বলেছিলেনঃ

(আরবী********************************)

এ বিয়েতে ওয়ালীমা অবশ্যই করতে হবে।

একথা থেকে ওয়ালীমা সম্পর্কে পূর্বোক্ত মতেরই সমর্থন পাওয়া যায়। ইমাম তাবরানী হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে রাসূলে করীম (স)-এর নিম্নোক্ত ঘোষণা বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী******************************)

ওয়ালীমা করা হচ্ছে একটা অধিকারের ব্যাপার, একান্তই কর্তব্য। ইসলামের স্থায়ী নীতি। অতএব যাকে এ জয়াফতে শরীক হওয়াদর দাওয়াত দেয়া হবে, সে যদি তাতে উপস্থিত না হয়, তাহলে সে নাফরমানী করল।

ইমাম বায়হাকী বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

রাসূলে করীম (স) বিয়ে করে ওয়ালীমা জিয়াফত করেন নি –এমন ঘটনা জানা নাই।

এ থেকেও ওয়ালীমা করা যে ওয়াজীব, তাই প্রমাণিত হচ্ছে।

ওয়ালীমা জিয়াফতের আকার কি হবে, কত হবে তাতে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ, তা শরীয়তে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে একথা মনে রাখা আবশ্যক যে, ব্যক্তির সামর্থ্য এবং তার মনের উদারতা অকৃপণতা অনুপাতেই তা করতে হবে। আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************)

সচ্ছল অবস্থায় লোকের পক্ষে একটি বকরী জবাই করে খাওয়ানোই হচ্ছে ওয়ালীমার কম-সে-কম পরিমাণ।

তবে নবী করীম (স) যে বকরীর চাইতেও কম মূল্যের জিনিস দিয়ে ওয়ালীমার জিয়াফত করেছিলেন, তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লামা কাযী ইয়াজ লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

ওয়ালীমার জিয়াফতে কত বেশি খরচ করা হবে, এ সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই বলেই বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেছেন। আর কমেরও কোনো শেষ পরিমাণ নির্দিষ্ট করা যায় না। যার পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব ও সহজ, তা করাই যথেষ্ট। তবে স্বামীর আর্থিক সঙ্গতি অনুপাতেই যে এ কাজে অর্থ ব্যয় হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাতে সন্দেহ নেই।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী ইবনে বাত্তালের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************************************)

ওয়ালীমা জিয়াফত করা স্বামীর আর্থিক সামর্থ্যানুযায়ী হওয়া উচিত এবং তা করা ওয়াজিব বিয়ে অনুষ্ঠানের প্রচারের উদ্দেশ্যে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************)

ওয়ালীমার জিয়াফত করায় অনেক প্রকারের কল্যাণ ও যৌক্তিকতা নিহিত রয়েছে।

এরপর তিনি দুটো কল্যাণের উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছেঃ

(আরবী*******************************************************)

এতে করে খুব সুন্দরভাবে বিয়ের প্রচার হয়ে যায়। …...কেননা বিয়ের প্রচার হওয়া এ কারণেও জরুরী যে, তাদের কোনো সন্তান হলে তার সদজাত হওয়া ও তার বংশ সাব্যস্ত হওয়ায় কোনো সন্দেহকারীর সন্দেহ করার কোনো অবকাশই যেন না থাকে।

আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, স্ত্রী এবং তার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের প্রতি শুভেচ্ছা ও সদাচরণ প্রকাশ করা। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

নববধুর জন্যে স্বামী যদি অর্থ খরচ করে ও তার জন্যে লোকদের একত্রিত করে, তবে তা প্রমাণ করবে যে, স্বামীর নিকট তার খুবই মর্যাদা রয়েছে এবং সে তার স্বামীর নিকট রীতিমত সমীহ করার যোগ্য।

এবং এ করে স্বামী এমন এক নেয়ামত লাভ করেছে বলে শোকরিয়া আদায় করেচে, যা সে ইতিপূর্বে কখনো লাভ করেনি। এ কারণে তার মনে অনাবিল আনন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত পুলক বোধ করছে। এজন্যেই সে এত অর্থ খরচ করছে আর এসব তারই জন্যে।

এর ফলে নববধূর মনেও জাগবে পরম পুলক, স্বামীর প্রতি অকৃত্রিম প্রেম-ভালোবাসা। আর এর দরুন উভয় পক্ষের আত্মীয়-স্বজনের সাথেও পরম মাধুর্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

ইসলামে বিয়ে উপলক্ষে ওয়ালীমার জিয়াফতের গুরুত্ব এতখানি যে, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে এ দাওয়াত কবুল না করার ইখতিয়ার দেয়া হয়নি। বরং এ দাওয়াতে হাজির হওয়াকে শরীয়তে ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে। নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

তোমাদের কেউ যদি বিয়ের ওয়ালীমায় নিমন্ত্রিত হয়, তবে সে যেন সে দাওয়াত কবুল করে ও উপস্থিত হয়।

অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************************************)

তোমাদের কেউ ওয়ালীমার দাওয়াতে নিমন্ত্রিত হলে সে যেন অবশ্যই তাতে যায়।

হযরত জাবির বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***********************************************************)

তোমাদের কেউ কোনো খাবার দাওয়াতে নিমন্ত্রিত হলে তার সেখানে অবশ্যই যাওয়া উচিত, তারপরে খাওয়া তার ইচ্ছাধীন।

হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণিত হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ

(আরবী**********************************************************)

যে লোক ওয়ালীমার দাওয়াতে শরীক হয় না, সে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে।

হযরত ইবনে উমর বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************)

ওয়ালীমার দাওয়াতে যদি তোমরা নিমন্ত্রিত হও তবে অবশ্যই তাতে শরীক হবে।

এসব হাদীস থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে, ওয়ালীমার দাওয়াত হলে তা কবুল করা এবং তাতে শরীক হওয়া প্রত্যেকটি মুসলমানের পক্ষে ওয়াজিব। কোনো কোনো ফিকাহবিদ ওয়ালীমার দাওয়াত এবং সাধারণ খাবার দাওয়াদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাদের মধ্যে ইবনে আবদুল বার্র, কাযী ইয়াজ ও ইমাম নববী একমত হয়ে রায় দিয়েছেন যে, বিয়ে-ওয়ালীশার দাওয়াতে হাজির হওয়া ওয়াজিব। আর শাফিয়ী ও হাম্বলী মতের অধিকাংশ মনীষীর মতে এ হচ্ছে ফরযে আইন। আবার কেউ কেউ ‘ফরযে কিফায়া’ও বলেছেন। ইমাম শাফিয়ীর মতে তা ওয়াজিব এবং এ ব্যাপারে কোনো ‘রুখছাত’ নেই। কেননা হাদীসে যেখানে কথাটির বারবার তাগিদ এসেছে, সেভাবে অপর কোনো ওয়াজিব কাজ সম্পর্কেই বলা হয়নি। (আরবী*********************)

ওয়ালীমার যিয়াফতে কি ধরনের লোক দাওয়াত করা হবে, এ সম্পর্কে হাদীসে বিশেষভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

সেই ওয়ালীমার খানা হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম, যেখানে কেবল ধনী লোকদেরকেই দাওয়াত দেয়া হবে। আর গরীব লোকদেরকে বাদ দেয়া হবে।

অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

ওয়ালীমার সেই খানা অত্যন্ত নিকৃষ্ট, যেখানে যারা আসবে তাদের তো নিষেধ করা হবে বা দাওয়াত দেয়া হবে না, আর দাওয়াত দেয়া হবে কেবল তাদের, যারা তা কবুল করে না বা আসবে না।

এ হাদীস দুটি থেকে প্রমাণিত হলো যে, ওয়ালীমার জিয়াফতে বেছে বেছে কেবল ধনী লোকদেরকেই দাওয়াত দেয়া আর গরীব ফকীরদের দাওয়ান তা দেয়া মহা অন্যায়। বরং কর্তব্য হচ্ছে, গরীব-ধনী নির্বিশেষে যতদূর সম্ভব সব শ্রেণীর আত্মীয়-স্বজনকে নিমন্ত্রণ করা। যেখানে কেবলমাত্র ধনী বন্ধু বা আত্মীয়দের দাওয়াত দেয়া হয় আর গরীবদের জন্যে প্রবেশ নিষেধ করে দেয়া হয়, সেখানকার খানায় আল্লাহর কোনো রহমত-বরকত হতে পারে না। বরং সেই খানা হয়ে যায় নিকৃষ্টতম। এজন্যে যে, আল্লাহর নিকট তো গরীব-ধনীর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই; কিন্তু ওয়ালীমার দাওয়াতকারী ব্যক্তি বিয়ে করে, কিংবা নিজের ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিয়ে স্ফূর্তিতে মেতে গিয়ে গরীব-ধনীর মাঝে আকাশ-ছোঁয়া পার্থক্য সৃষ্টি করেছে।

বিয়ের উৎসবে আর ওয়ালীমার জিয়াফতে কেবল যে বয়স্ক পুরুষদেরই দাওয়াত করা হবে, এমন কথাও ঠিক নয়। বরং তাতে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্য থেকে মেয়েলোক ও শিশুদেরও নিমন্ত্রণ করতে হবে, -করা কিছুমাত্র দোষের নয়। বরং সত্যি কথা এই যে, এ উপলক্ষে মেয়েদের শিশুদের বাদ দেয়া খুবই আপত্কির। নিম্নোদ্ধৃত হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে ও ওয়ালীমার উৎসবে মেয়েলোক ও শিশুদেরও দাওয়াত দেয়া খুবই সঙ্গত হযরত আনাস ইবনে মালিক বলেনঃ

(আরবী*****************************************************)

নবী করীম (স) এক বিয়ের উৎসবে বহু মেয়েলোক ও ছেলেপেলে পরস্পর মুখোমুখি বসে থাকতে দেখলেন। তিনি তাদের দেখে খুবই আনন্দ বোধ করে তাদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশার্তে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালেন এবং তিনি তাদের জন্যে দো’আ করতে গিয়ে বললেনঃ ‘তোরমাই তো আমার নিকট সবার তুলনায় অধিকতর প্রিয়জন।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, বিয়ের উৎসবাদিতে মেয়েলোক ও শিশুদের উপস্থিত হওয়া বা করা খুবই ভালো ও পছন্দনীয়। কেননা এসব উৎসবই তো হচ্ছে আমাদের পরস্পরের নিকট আসার উপলক্ষ। আর এ কাজে বিয়ের প্রচারকার্যও পরামাত্রায় সুসম্পন্ন হয়ে থাকে।

ওয়ালীমার জিয়াফত কখন করা হবে –বিয়ে অনুষ্ঠানের সময়, না তার পরে, কিংবা নব দম্পতির ফুল-শয্যা বা মধুমিলনের রাতে, এ সম্পর্কে নানা মতের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মালিকী মাযহাবে কেউ কেউ বলেছেন, ওয়ালীমা বিয়ে অনুষ্ঠানের সময় অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। কারো মতে মধুমিলনের পরে। ইমাম মাওয়ার্দীর মতে তা হওয়া উচিত মধুমিলনের রাতে। এর দলীল হিসেবে তিনি হযরত আনাসের নিম্নোদ্ধৃত উক্তির উল্লেখ করেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

নবী করীম (স) হযরত জয়নবের সাথে মধুমিলনের রাত যাপনের পর সকালের দিকে লোকদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।

দাম্পত্য জীবনের শর্ত

স্বামী ও স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন –মাধুর্যময় ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ করে তোলবার জন্যে ইসলামে কতগুলো জরুরী বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে তার বিশেষ কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা যাচ্ছে।

প্রেম ভালোবাসা

বিয়ের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও মনের পরম প্রশান্তি লাভই হচ্ছে বিয়ের প্রধানতম উদ্দেশ্য। কেননা এ জিনিস মানুষ মাত্রেই প্রয়োজন –স্বভাবের ঐকান্তিক দাবি। পুরুষ ও নারী উভয়ের এক নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ হলেই বিপরীত লিঙ্গ (Opposite sex) সম্পন্ন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার এক তীব্র ইচ্ছা ও বাসনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে। উভয়ের দেহমনে যৌবনের সর্বপ্লাবী জোয়ারের সৃষ্টি হয়। তখন যৌন মিলনের অপেক্ষাও প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা লাভের জন্যে নর নারীর মন অধিকতর উদ্দাম হয়ে ওঠে। এ কারণে ঠিক এই সময়েই ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যবস্তা করার তাগিদ করা হয়েছে ইসলামী শরীয়তে। আর এ বিয়েকে কুরআন মজীদে ‘প্রেম-ভালোবাসার জীবন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত বিয়ের প্রকৃত বন্ধন হচ্ছে প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন। এ বন্ধন শিথিল হলে অন্য হাজারো বন্ধন ছিন্ন হতে কিছুমাত্র বিলম্ব লাগবে না। এ কারণে পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টিও তাকে স্থায়িত্ব ও গভীরতা দানের জন্যে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে।

একটি নর ও একটি নারীর বিবাহ-সূত্রে একত্রিত হয়ে সুষ্ঠু পারিবারিক জীবন যাপনকেই বলা হয় দাম্পত্য জীবন। দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন বংশ, ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশের লোক, পরস্পরের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত, একজনের নিকট অপরজন সম্পূর্ণ নতুন –আনকোরা। প্রত্যেকের মন-মগজ-চিন্তা-ভাবনা, স্বভাব-অভ্যাস পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন প্রকারের। সাধারণত এ-ই হয়ে থাকে এবং এ-ই স্বাভাবিক। অনেক সময় এসব দিক দিয়ে পরস্পরের মধ্যে বিরাট পার্থক্যও হতে পারে –হয়ে থাকে। এ দুজনের মধ্যে পূর্ণ মিলন ও সামঞ্জস্য হয়ে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব। উভয়ের প্রকৃতি ও মেজাজ এমন পার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক, যার দরুন এদের মিলেমিশে জীবন কাটানো অসম্ভব বলে প্রথম মনে হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। এসব দিকে লক্ষ্য রেখে ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে কতগুলো জরুরী বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে। নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন উভয়ের জন্যে কিছু কিছু অধিকার এবং তা যেমন স্বামীর জন্যে অবশ্য পালনীয়, তেমনি স্ত্রীর পক্ষেও।

আমরা এখানে প্রথমে স্বামীর কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করছি। কিন্তু তার আগে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীতে গভীর একাত্মবোধ জাগ্রত হওয়া যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবন করা আবশ্যক। প্রথম লক্ষ্য করার বিষয় হলো এই যে, কুরআন মজীদের আয়াতসমূহে স্বামী বা স্ত্রী উভয়ের জন্যে (আরবী*******) ‘যাওজ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লামা আহমাদ মুস্তফা আল-মারাগী লিখেছেনঃ

(আরবী****************************************************************)

‘যাওজ’ শব্দটি পুরুষ নারী উভয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে –এর আসল অর্থ এমন একটি সংখ্যা যা এমন দুটি জিনিসের সমন্বয়ে রচিত ও গঠিত যেখানে সে দুটি জিনিসই একাকার হয়ে রয়েছে এবং বাহ্যত তারা দুটি হলেও মূলত ও প্রকৃতপক্ষে তারা পরস্পরের সাথে মিলেমিশে একটিমাত্র জিনিসে পরিণত হয়েছে। অতঃপর এ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রী –উভয়ের জন্যে। ব্যবহার করা হচ্ছে একথা বোঝাবার জন্যে যে, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে এবং স্ত্রী তার স্বামীর সাথে অন্তরের গভীর একাত্মপূর্ণ ভাবধারা ও ভেদহীন কল্যাণ কামনার সাহায্যে একাকার হয়ে থাকবে, তা-ই হচ্ছে স্বাভাবিকতার ঐকান্তিক দাবি। তারা একাকার হবে এমনভাবে যে, একজন ঠিক অপরজনে পরিণত হবে।

ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা

স্বামী-স্ত্রীর মধে মন কষাকষি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর এ সুযোগে শয়তা পরস্পরের মনে নানারূপ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে কম চেষ্টা করে না। আর এরই ফলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরতে কিছু বিলম্ব হয় না। বিশেষ করে এজন্যেও অনেক সময় জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, মেয়েরা সাধারণই নাজুক স্বভাবের হয়ে থাকে। অল্পতেই রেগে যাওয়া, অভিমানে ক্ষুব্ধ হওয়া এবং স্বভাবগত অস্থিরতায় চঞ্চলা হয়ে ওঠা নারী চরিত্রের বিশেষ দিক। মেয়েদের এ স্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা বৈশিষ্ট্যই বলুন –আল্লাহর খুব ভালোভাবেই জানা ছিল। তাই তিনি স্বামীদের নির্দেশ দিয়েছেনঃ

(আরবী************************************)

তোমরা স্ত্রীদের সাথে খুব ভালোভাবে ব্যবহার ও বসবাস করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো তাহলে এ হতে পারে যে, তোমরা একটা জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ তার মধ্যে বিপুল কল্যাণ নিহিত রেখে দেবেন।

মওলানা সানাউল্লাহ পানিপত্তী এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ

স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার ও তাকে নিয়ে ভালোভাবে বসবাস করার মানে হচ্ছে কার্যত তাদের প্রতি ইনসাফ করা, তাদের হক-হকুক রীতিমত আদায় করা এবং কথাবার্তায় ও আলাপ-ব্যবহারে তাদের প্রতি সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা প্রদর্শন। আর তারা তাদের কুশ্রীতা কিংবা খারাপ স্বভাব-চরিত্রের কারণে যদি তোমাদের অপছন্দনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের জন্যে  ধৈর্য ধারণ করো, তাদের না বিচ্ছিন্ন করে দেবে, না তাদের কষ্ট দেবে, না তাদের কোনো ক্ষতি করবে। (আরবী*************************)….

স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এ আয়াতে স্বামীদেরকে এক ব্যাপক হেদায়েত দেয়া হয়েছে। স্বামীদের প্রতি আল্লাহর প্রথম নির্দেশ হচ্ছেঃ তোমরা যাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে নিলে, যাকে নিয়ে ঘর বাঁধলে তার প্রতি সব সময়ই খুব ভালো ব্যবহার করবে, তাদের অধিকার পূর্ণ মাত্রায় আদায় করবে। আর প্রথমেই যদি এমন কিছু যদি এমন কিছু দেখতে পাও যার দরুন তোমার স্ত্রী তোমার কাছে ঘৃণার্হ হয়ে পড়ে এবং যার কারণে তার প্রতি তোমার মনে প্রেম-ভালোবাসা জাগার বদলে ঘৃণা জেগে ওঠে, তাহলেই তুমি তার প্রতি খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করো না। বুদ্ধির স্থিরতা ও সজাগ বিচক্ষণতা সহকারে শান্ত থাকতে ও পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনতে চেষ্টিত হবে। তোমাকে বুঝতে হবে যে, কোনো বিশেষ কারণে তোমার স্ত্রীর প্রতি যদি তোমার মনে ঘৃণা জেগে থাকে, তবে এখানেই চূড়ান্ত নৈরাশ্যের ও চিরবিচ্ছেদের কারণ হয়ে গেলো না। কেননা হতে পারে, প্রথমবারের হঠাৎ এক অপরিচিতা মেয়েকে তোমার সমগ্র মন দিয়ে তুমি গ্রহণ করতে পারো নি। তার ফলেই এই ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে কিংবা তুমি হয়তো একটি দিক দিয়েই তাকে বিচার করেছ এবং সেদিক দিয়ে তাকে মনমতো না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছ। অথচ তোমার বোঝা উচিত যে, সেই বিশেষ দিক ছাড়া আরো সহস্র দিক এমন থাকতে পারে, যার জন্যে তোমার মনের আকাশ থেকে ঘৃণতর এ পুঞ্জিত ঘনঘটা দূরীভূত হয়ে যাবে এবং তুমি তোমার সমগ্র অন্তর দিয়ে তাকে আপনার করে নিতে পারবে। সেই সঙ্গে একথাও বোঝা উচিত যে, কোনো নারীই সমগ্রভাবে ঘৃণার্হ হয় না। যার একটি দিক ঘৃণার্হ, তার এমন আরো সহস্র গুণ থাকতে পারে, যা এখনো তোমার সামনে উদঘাটিত হতে পারে নি। তার বিকাশ লাভের জন্যে একান্তই কর্তব্য। এ কারণেই নবী করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************)

কোনো মুসলিম পুরুষ যেন কোনো মুসলিম মহিলাকে তার কোনো একটি অভ্যাসের কারণে ঘৃণা না করে। কেননা একটি অপছন্দ হলে অন্য আরো অভ্যাস দেখে সে খুশীও হয়ে যেতে পারে।

কেননা, কোনো নারীই সম্পূর্ণরূপে খারাবীর প্রতিমূর্তি না হয়। কিছু দোষ থাকলে অনেকগুলো গুণও তার থাকতে পারে। সেই কারণে কোনো কিছু খারাপ লাগবে অমনি অস্থির, চঞ্চল ও দিশেহারা হয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার অপরাপর ভালে দিকের উন্মেষ ও বিকাশ লাভের সুযোগ দেয়া এবং সেজন্যে অপেক্ষা করা স্বামীর কর্তব্য। আল্লামা আহমাদুল বান্না এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

এ হাদীসের মানে হচ্ছে এই যে, কোনো মু’মিনের উতি নয় অপর কোনো মু’মিন স্ত্রীলোক সম্পর্কে পূর্ণ মাত্রায় ঘৃণা পোষণ করা, যার ফলে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের কারণ দেখা দিতে পারে। বরং তার কর্তব্য হচ্ছে মেয়েলোকটির ভালো গুণের খাতিরে তার দোষ ও খারাবী ক্ষমা করে দেয়া আর তার মধ্যে ঘৃণার্হ যা আছে, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করা; বরং তার প্রতি ভালোবাসা জাগাতে চেষ্টা করা। হতে পারে তার স্বভাব-অভ্যাস খারাপ; কিন্তু সে বড় দ্বীনদার কিংবা সুন্দরী রূপসী বা নৈতিক পবিত্রতা ও সতীত্ব সম্পন্না অথবা স্বামীর জন্যে জীবন সঙ্গিনী।

আল্লাম শাওকানী এ হাদীস সম্পর্কে লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

এ হাদীসে স্ত্রীদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার ও ভালোভাবে বসবাস করার নির্দেশ যেমন আছে, তেমনি তার কোনো এক অভ্যাস স্বভাবের কারণেই তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে নিষেধও করা হয়েছে। কেননা তার মধ্যে অবশ্যই এমন কোনো গুণ থাকবে, যার দরুন সে তার প্রতি খুশী হতে পারবে।

এজন্যে নবী করীম (স) স্বামীদের স্পষ্ট নসীহত করেছেন। বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************)

তোমরা স্ত্রীদের সাথে সব সময় কল্যাণময় ব্যবহার করার জন্যে আমার এ নসীহত কবুল করো। কেননা নারীরা জন্মগতভাবেই বাঁকা স্বভাবের হয়ে থাকে। তুমি যদি জোরপূর্বক তাকে সোজা করতে যাও, তবে তুমি তাকে চূর্ণ করে দেবে। আর যদি অমনি ছেড়ে দাও তবে সে সব সময় বাঁকা থেকে যাবে। অতএব বুঝে-শুনে তাদের সাথে ব্যবহার করার আমার এ উপদেশ অবশ্যই গ্রহণ করবে।

এ হাদীসের মানে বদরুদ্দীন আইনীর ভাষায় নিম্নরূপঃ

(আরবী******************************************)

আমি মেয়েলোকদের প্রতি ভালো ব্যবহার করার জন্যে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা তাদের সম্পপের্ক আমার দেয়া এ নসীহত অবশ্যই কবুল করবে। কেননা তাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে পাঁজরের হাঁড় থেকে।

মেয়েলোকদের ‘হাড়’ থেকে সৃষ্টি করার মানে কি? –বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************)

‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’ কথাটা বক্রতা বোঝার জন্যে রূপক অর্থে বলা হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে যে, মেয়েদের এমন এক ধরনের স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, সে সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে বক্রতা –বাঁকা হওয়া অর্থাৎ মেয়েদের এক বাঁকা মূল থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব তাদের দ্বারা কোনোরূপ উপকারিতা লাভ করা সম্ভব কেবল তখনি, যদি তাদের মেজাজ স্বভাবের প্রতি পূর্ণরূপে সহানুভূতি সহকারে লক্ষ্য রেখে কাজ করা হয় এবং তাদের বাঁকা স্বভাবের দরুন কখনো ধৈর্য হারানো না হয়। (ঐ)

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************)

মেয়েলোক পাঁজরের হাড়ের মতো। তাকে সোজা করতে চাইবে তো তাকে চূর্ণ করে ফেলবে, আর তাকে ব্যবহার করতে প্রস্তুত হলে তার স্বাভাবিক বক্রতা রেখেই ব্যবহার করবে।

এ হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নারীদের স্বভাবে বক্রতা স্বভাবগত ও জন্মগত। এ বক্রতা স্মপূর্ণরূপে দূর করা কখনো সম্ভব হবে না। তবে তাদের আসল প্রকৃতিকে বজায় রেখেই এবং তাদের স্বভাবকে যথাযথভাবে থাকতে দিয়েই তাদেরকে নিয়ে সুমধুর পারিবারিক জীবন গড়ে তোলা যেতে পারে, সম্ভব তাদের সহযোগিতায় কল্যাণময় সমাজ গড়া। আর তা হচ্ছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, তাদের সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও সদিচ্ছাপূর্ণ ব্যবহার করা এবং তাদের মন রক্ষা করতে শেষ সীমা পর্যন্ত যাওয়া ও যেতে রাজি থাকা।

আল্লামা শাওকানী এ হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছেনঃ

মেয়েলোকদের পাঁজরের বাঁকা হাড়ের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ কথা বোঝানো যে, (আরবী******************) মেয়েরা স্বভাবতই বাঁকা,তাদের সোজা ও ঋজু করা সম্ভব নয়। যদি কেউ তাকে ঠিক করতে চেষ্টা করে, তবে সে তাকে ভেঙে-চুরে ফেলবে, নষ্ট করবে। আর যে তাকে যেমন আছে তেমনিই থাকতে দেবে, সে তার দ্বারা অশেষ কল্যাণকর কাজ করাতে পারবে, ঠিক যেমন পাঁজবের হাড়। তাকে বানানেই হয়েছে বাঁকা, তাকে সোজা করতে যাওয়ার মানে তাকে ভেঙে ফেলা –চূর্ণ করা। আর যদি তাকে বাঁকাই থাকতে দেয়া হয়, তবে তা দেহকে সঠিক কাজে সাহায্য করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি  লিখেছেনঃ

(আরবী************************************************)

এ হাদীসে নির্দেশ করা হয়েছে, মেয়েলোকদের সাথে সব সময়ই ভালো ও আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। তাদের স্বভাব-চরিত্রে বক্রতা থাকলে (সেজন্যে) অসীম ধৈর্য অবলম্বন করতে হবে। আর সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, মেয়েরা এমন এক স্বভাবের সৃষ্টি, যাকে আদব-কায়দা শিখিয়ে অন্যরকম কিছু বানানো সম্ভব নয়। স্বভাব-বিরোধী নসীহত উপদেশও সেখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য। কাজেই ধৈর্য ধারণ করে তার সাথে ভালো ব্যবহার করা, তাকে ভৎসনা করা এবং তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বর্জন করা ছাড়া পুরুষদের গত্যন্তর নেই।

নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)-এর এ উক্তিতে তাদের অসন্তুষ্ট বা ক্রুব্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই কথা বলে তাদের অপমান করা হয়নি, না এতে তাদের প্রতি কোনো খারাপ কটাক্ষ করা হয়েছে। এ ধরনের কথার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নারী সমাজের জটিল ও নাজুক মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে পুরুষ সমাজকে অত্যধিক সতর্ক ও সাবধান করে তোলা। এ কথার ফলে পুরুষরা নারীদের সমীহ করে চলবে, তাদের মনস্তত্ত্বের প্রতি নিয়ত খেয়াল রেখেই তাদের সাথে আচার-ব্যবহার করতে উদ্ধুদ্ধ হবে। এ কারণে পুরুষদের কাছে নারীরা অধিকতর আদরণীয়া হবে। এতে তাদের দাম বাড়ল বৈ কমল না একটুকুও।

আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ নারীদের এ বাঁকা স্বভাব দেখে তাদের এমনি ছেড়ে দেয়া উচিত নয়, বরং ভালো ব্যবহার ও অনুকূল পরিবেশ দিয়ে তাদের সংশোধন করতে চেষ্টা পাওয়াই পুরুষদের কর্তব্য। দ্বিতীয়ত, নারীদের প্রতি ভালো ব্যবহার করা সব সময়ই প্রয়োজন, তাহলেই স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় হবে। সেই সঙ্গে মেয়েদের অনেক ‘দোষ’ ক্ষমা করে দেয়ার গুণও অর্জন করতে হবে স্বামীদের। খুটিনাটি ও ছোটখাটো দোষ দেখেই চটে যাওয়া কোনো স্বামীরই উচিত নয়।

নারী সাধারণত একটু জেদী হয়ে থাকে। নিজের কতার ওপর অটল হয়ে থাকা ও একবার জেদ উঠলে সবকিছু বরদাশত করা নারী-স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা খুঁতখুতে মেজাজেরও হয়ে থাকে। কাজেই পুরুষ যদি কথায় কথায় দোষ ধরে, আর একবার কোনো দোষ পাওয়াগেলে তা শক্ত করে ধরে রাখে- কোনোদিন তা ভুলে যেতে রাজি না হয়, তাহলে দাম্পত্য জীবনের মাধুর্যটুকুই শুধু নষ্ট হবে না –তার স্থিতিও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

তার কারণ, নারীদের এই স্বভাবগত দোসের দিক ছাড়া তার ভালো ও মহৎ গুণের দিকও অনেক রয়েছে। তারা খুব কষ্টসহিষ্ণু, অল্পে সন্তুষ্ট, স্বামীর জন্যে জীবন-প্রাণ উৎসর্গ করতে সতত প্রস্তুত। সন্তান গর্ভে ধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তান লালন-পালনের কাজ নারীরা –মায়েরা যে কতখানি কষ্ট সহ্য করে সম্পন্ন করে থাকে, পুরুষদের পক্ষে তার অনুমান পর্যন্ত করা সহজ নয়। এ কাজ একমাত্র তাদের পক্ষেই করা সম্ভব। ঘর-সংসারের কাজ করায় ও ব্যবস্থাপনায় তারা অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত, একান্ত বিশ্বাসভাজন ও একনিষ্ঠ। তাইবলা যায়, তাদের মধ্যে দোষের দিকের তুলনায় গুণের দিক অনেক গুণ বেশি।

একজন ইউরোপীয় চিন্তাবিদ পুরুষদের লক্ষ্য করে বলেছেনঃ

গর্ভ ধারণ ও সন্তান প্রসবজনিত কঠিন ও দুঃসহ যন্ত্রণার কথা একবার চিন্তা করো। দেখো, নারী জাতি দুনিয়ায় কত শত কষ্ট ব্যথা-বেদনা ও বিপদের ঝুঁকি নিজেদের মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকে। তারা যদি পুরুষের ন্যায় ধৈর্যহীনা হতো, তাহলে এতো সব কষ্ট তারা কি করে বরদাশত করতে পারত? প্রকৃত পক্ষে বিশ্বমানবতার এ এক বিরাট সৌভাগ্য যে, মায়ের জাতি স্বভাবতই কষ্টসহিষ্ণু, তাদের অনুভূতি পুরুষদের মতো নাজুক ও স্পর্শকাতর নয়। অন্যথায় মানুষের এসব নাজুক ও কঠিন কষ্টকর কাজের দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।

স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ক্ষমাশীলতা দাম্পত্য জীবনের মাধুর্য ও স্থায়িত্বের জন্যে একান্তই অপরিহার্য। যে স্বামী স্ত্রীকে ক্ষমা করতে পারে না, ক্ষমা করতে জানে না, কথায় কথায় দোষ ধরাই যে স্বামীর স্বভাব, শাসন ও ভীতি প্রদর্শনই যার কথার ধরন, তার পক্ষে কোনো নারীকে স্ত্রী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে স্থায়ীভাবে জীবন যাপন করা সম্ভব হতে পারে না। স্ত্রীদের সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রতি ক্ষমাসহিষ্ণুতা প্রয়োগেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতেঃ

(আরবী**********************************************************)

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মধ্যে অনেকেই তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের সম্পর্কে সাবধান! তবে তোমরা যদি তাদের ক্ষমা করো, তাদের ওপর বেশি চাপ প্রয়োগ না করো বা জোরজবরদস্তি না করো এবং তাদের দোষ-ত্রুটিও ক্ষমা করে দাও, তাহলে জেনে রাখবে, আল্লাহ নিজেই বড় ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

নবী করীম (স) তাঁর স্ত্রীদের অনেক বাড়াবাড়িই মাফ করে দিতেন। হযরত উমর ফারূকের বর্ণিত একদিনের ঘটনা থেকে তা বাস্তববাবে প্রমাণিত হয়।

হযতর উমর (রা) একদিন খবর পেলেন, নবী করীম (স) তাঁর বেগমগণকে তাঁদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে তালাক দিয়েছেন। তিনি এ খবর শুনে খুব ভীত হয়ে রাসূলের নিকট উপস্থিত হলেন। জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি আপনার বেগমদের তালাক দিয়েছেন? রাসূল (স) বললেনঃ না। পরে রাসূল (স) তাঁর সাথে হাসিমুখে কথাবার্তা বলেছেন। -বুখারী।

এ হাদীসকে ভিত্তি করে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী*****************************************************)

এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীদের পীড়ন ও বাড়াবাড়িতে ধৈর্য ধারণ করা, তাদের দোষ-ত্রুটির প্রতি বেশি গুরুত্ব না দেয়া এবং স্বামীর অধিকারের পর্যায়ে তাদের যা কিছু অপরাধ বা পদঙ্খলন হয়, তা ক্ষমা করে দেয়া স্বামীর একান্ত কর্তব্য। তবে আল্লাহর হক আদায় না করলে সেখানে ক্ষমা করা যেতে পারে না।

স্ত্রীদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলবে না

ইসলামে নারীদের কোনোরূপ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে তাদের বিব্রত করে তুলতে নিষেধ করা হয়েছে।  প্রয়োজন হলে তাদের অবসর দিতে হবে –প্রস্তুতির জন্যে সময় দিতে হবে। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করে রাতের বেলা বাড়িতে উপস্থিত হলে স্ত্রী নিজেকে অপ্রস্তুত ও বিব্রত বোধ করতে পারে। এজন্যে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************************)

তোমাদের কেউ যদি দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাড়িতে অনুপস্থিত থাকার পর ফিরে আসে, তাহলে পূর্বে খবর না দিয়ে রাতের বেলা হঠাৎ করে বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া উচিত নয়।

হযরত জাবির (রা) বললেনঃ ‘আমরা এক যুদ্ধে রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। পরে যখন আমরা মদীনায় ফিরে এলাম, তখন আমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঘরে চলে যেতে ইচ্ছা করল। কিন্তু নবী করীম (স) বললেনঃ

(আরবী******************************************************)

কিছুটা অবসর দাও। রাতে ঘরে ফিরে যেতে পারবে। এই অবসরে তোমাদের স্ত্রীরা প্রয়োজনীয় সাজ-সজ্জা করে নেবে, গোপন অঙ্গ পরিস্কার করবে এবং তোমাদের গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তুতি নিতে পারবে।

মেয়েরা সাধারণত অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকে, তাদের মাথায়ও হয়ত ঠিক মতো চিরুণী করা হয় না। প্রয়োজনীয় সাজ-সজ্জায় সুজজ্জিত হয়েও তারা সব সময় থাকে না। বিশেষত স্বামীর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে মেয়েরা নিজেদের সাজ-সজ্জার ব্যাপারে খুবই অসতর্ক হয়ে পড়ে। নবী করীম (স) সাহাবিগণকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন পরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেও সঙ্গে সঙ্গেই সকলকে নিজের নিজের ঘরে ফিরে যেতে দিলেন না। তাদের প্রত্যাবর্তনের খবর সকলের জানা হয়ে গেছে। স্ত্রীরা নিজের নিজের স্বামীকে সাদরে গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তুতি নিতে পারছে এই অবসরে। এ দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর উপরোক্ত কথার তাৎপর্য স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। স্বামীর দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে স্ত্রী হয়ত ময়লা দেহ ও মলিন বসন পরে রয়েছে। তার মাথার চুলও হয়ত আঁচড়ানো হয়নি। এরূপ অবস্থায় স্বামী যখন তাকে দেখতে পাবে দীর্ঘদিনের বিরহের পর, তখন স্বামী যে নিরাশ ও নিরানন্দের বেদনায় মুষড়ে পড়বে এবং স্ত্রীও যে এরূপ অবস্থায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরও অন্তরঢালা আনন্দ সহকারে স্বামীকে গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হবে, তা বুঝতে পারা দুনিয়ার স্বামী ও স্ত্রীদের পক্ষ কঠিন নয়। বস্তুত এর দরুন স্বামীদের মন স্ত্রীর প্রতি বিরূপ ও তিক্ত-বিরক্ত হয়ে যেতে পারে, আর স্ত্রীর মনও স্বামীর কাছে ছোট হয়ে যেতে পারে। এরূপ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী কারো মন খারাপ হয়ে যাবার কোনো কারণ যাতে না ঘটতে পারে, এজন্যেই রাসূলে করীম(স) সাহাবীদের উক্তরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্যথায় যারা সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আসে, তাদের জন্যে এ রকম কিছু করণীয় নেই।

স্ত্রীদের ওপর জুলুম অত্যাচার করা নিষেধ

স্ত্রীদের প্রতি অত্যাচার জুলুম করা তো দূরের কথা, বারে বারে তালাক দিয়ে আবার ফেরত নিয়ে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়া ও দাম্পত্য জীবনকে বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করা যেতে পারে। বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************************)

তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের নানাভাবে কষ্টদান ও উৎপীড়নের উদ্দেশ্যে আটক করে রেখ না। যে লোক এরূপ করবে, সে নিজের ওপরই জুলুম করবে। আর তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে খেলনার বস্তুতে পরিণত করো না। (সূরা বাকারাঃ ৩৩)

যদিও আরবে প্রচলিত কুসংস্কার –স্ত্রীকে বারবার তালাক দিয়ে বারবার ফেরত নেয়ার রেওয়াজ নিষিদ্ধ করে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল; কিন্তু স্ত্রীকে কোনো প্রকার অকারণ কষ্ট দেয়া বা তারক্ষতি করা যে নিষেধ, তা এ আয়াত থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। আয়াত থেকে একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, নিজের স্ত্রীকে যে লোক কষ্ট দেবে, জুলুম-পীড়ন করবে, পরিণামে তার নিজের জীবনই নানাভাবে জর্জরিত হয়ে উঠবে, সে নিজেই কষ্ট পাবে, তার দাম্পত্য জীবনই দুঃসহ তিক্ততায় পূর্ণ হয়ে যাবে এবং স্ত্রীর সাথে মধুর সম্পর্ক বজায় রাখলে যে শান্তিপূর্ণ সুখময় জীবন যাপন সম্ভব, তা থেকে সে বঞ্চিত হয়ে যাবে। দুনিয়ায় তার প্রতি একদিকে যেমন আল্লাহর অসন্তোষ জেগে উঠবে, তেমনি জনগণ ও স্ত্রীলোকদের সমাজেও তার প্রতি জাগবে রুদ্র রোষ ও ঘৃণা।

বস্তুত স্ত্রীদের সাথে মিষ্টি ও মধুর ব্যবহার করা এবং তাদের কোনোরূপ কষ্ট না দিয়ে শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও যদি কেউ তার স্ত্রীকে অকারণ জ্বালা-যন্ত্রণা দেয়, ক্ষতিগ্রস্থ করতে চেষ্টিত হয়, তবে সে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে আল্লাহর গজব পড়ার যোগ্য হবে। আল্লাম আ-লুসরি মতে তার নিজের কষ্ট ও ক্ষতি হবে।

(আরবী********************************************************************)

এভাবে যে, সে মধুর পারিবারিক জীবন যাপনের ফলে লভ্য সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে বলে সে দ্বীনের ফায়দা হারাবে আর দুনিয়ার ফায়দা হারাবে এভাবে যে, তার এ বীভৎস কাজের প্রচার হয়ে যাওয়ার কারণে নারী সমাজ তার প্রতি বিরূপ ও বিরাগভাজন হয়ে পড়বে।

নবী করীম (স) তাঁর নিজের ভাষায় স্ত্রীদের মারপিট করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। বলেছেনঃ

(আরবী***************************************)

তোমার স্ত্রী –অঙ্কশায়িনীকে এমন নির্মমভাবে মারধোর করো না, যেমন করে তোমরা মেরে থাকো তোমাদের ক্রীতদাসীদের।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জামায়াতা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে ক্রীতদাসদের মারার মতো না মারে, আর মারধোর করার পর দিনের শেষে তার সাথে যেন যৌন সঙ্গম না করে।

অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে যৌন-সঙ্গম করা তো এক স্বাভাবিক কাজ, কিন্তু স্ত্রীকে একদিকে মারধোর করা আর অপরদিকে সেদিনই তার সাথে যৌন সঙ্গম করা অত্যন্ত ঘৃণার্হ কাজ। এ দুয়ের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী**********************************************************************)

স্ত্রীকে প্রচণ্ডভাবে মারধোর করা এবং সে দিনের বা সে রাতেরই পরবর্তী সময়ে তারই সাথে যৌন সঙ্গম করা –এ দুটো কাজ এক সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া যে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির দ্বারাই সম্ভব হতে পারে না –হওয়া বাঞ্চনীয় নয়, যৌন সঙ্গম সুন্দর ও মাধুর্যপূর্ণ হতে পারে যদি তা মনের প্রবল ঝোঁক ও তীব্র অদম্য আকর্ষণের ফলে সম্পন্ন হয়। কিন্তু প্রহৃতের মন প্রহারকারীর প্রতি যে ঘৃণা পোষণ করে, তা সর্বজনবিদিত।

বস্তুত স্ত্রীকে মারধোর না করা, তার ত্রুটিবিচ্যুতি যথাসম্ভব ক্ষমা করে দেয়া ও তার প্রতি দয়া অনুগ্রহ প্রদর্শন করাই অতি উত্তম নীতি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) এই নীতি ও চরিত্রেই ভূষিত ছিলেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ

(আরবী*******************************************)

রাসূলে করীম (স) তাঁর কোনো স্ত্রীকে কিংবা কোনো চাকর-খাদেমকে কখনো মারধোর করেন নি –না তাঁর নিজের হাত দিয়ে, তা আল্লাহর পথে। তবে যদি কেউ আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ করে, তবে সেই আল্লাহর জন্যে তার প্রতিরোধ গ্রহণ করতেন। (আরবী*********)

স্ত্রীদের মারধেঅর করা, গালাগাল করা এবং তাদের সাথে কোনোরূপ অন্যায় জুলুম জাতীয় আচরণ গ্রহণ করতে নিষেধ করে রাসূলে করীম (স) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

তোমরা স্ত্রীদের আদৌ মারধেঅর করবে না এবং তাদের মুখমণ্ডলকে কুশ্রী ও কদাকার করে নিও না।

 তিনি আরো বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

আল্লাহর দাসীদের তোমরা মারধোর করো না।

লক্ষণীয় যে, স্ত্রীদেরকে এখানে ‘আল্লাহর দাসী’ বলা হয়েছে, পুরুষদের বা স্বামীদের দাসী নয়। তাই তাদের অকারণ মারধোর করা কিংবা তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার কোনো অধিকার স্বামীদের নেই।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী**********************************************************)

তোমরা স্ত্রীদের মুখের ওপর মারবে না, মুখমণ্ডলের ওপর আঘাত দেবে না, তাদের মুখের শ্রী বিনষ্ট করবে না, অকথ্য ভাষায় তাদের গালাগাল করবে না এবং নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কোথাও তাদের বিচ্ছিন্নাবস্থায় ফেলে রাখবে না।

তবে কি স্ত্রীদের মারধোর করা আদৌ জায়েয নয়? উপরোক্ত হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম খাত্তাবী লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

রাসূলের ‘মুখের ওপর মারবে না’ উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুখমণ্ডল ব্যতীত দেহের অন্যান্য অংশের ওপর স্ত্রীকে মারধোর করা সঙ্গত। তবে শর্ত এই যে, তা মাত্রার বেশি, সীমালংঘনকারী ও অমানুষিক মার হতে পারবে না।

ওপরে উদ্ধৃত হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল কাহলানী বুখারী লিখেছেনঃ

(আরবী*************************************************) হাদীসটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীকে খুব হালকাভাবে সামান্য মারধোর করা জায়েয।

কিন্তু স্ত্রীকে মারধোর করা কখন ও কি কারণে করা সঙ্গত? …...এ পর্যায়ে প্রথমে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত পাঠ করা যেতে পারে। আয়াতটি হলোঃ

(আরবী********************************************************)

আর যেসব স্ত্রীলোকের অনানুগত্য ও বিদ্রোহের ব্যাপারে তোমরা ভয় করো, তাদের ভালোভাবে বুঝাও, নানা উপদেশ দিয়ে তাদের বিনয়ী বানাতে চেষ্টা করো। পরবর্তী পর্যায়ে মিলন-শয্যা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখ। আর (শেষ উপায় হিসেবে) তাদের মারো। এর ফলে যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়ে যায়, তাহলে তাদের ওপর অন্যায় ব্যবহারের নতুন কোনো পথ খুঁজে বেড়িও না। …..নিশ্চয় আল্লাহই হচ্ছেন সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ।

এ আয়াতে দুনিয়ার মুসলিম স্বামীদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে। ‘ভয় করা’ মানে জানতে পারা অথবা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যে, স্ত্রী স্বামীকে মানছে না, অথচ স্বামীকে মেনে চলাই স্ত্রীর কর্তব্য। এরূপ অবস্থায় স্বামী কি করবে, তা-ই বলা হয়েছে এ আয়াতে। এখানে প্রথমে বলা হয়েছে স্ত্রীকে ভালোভাবে বোঝাতে, উপদেশ দিতে ও নসীহত করতে, একথা তাকে জানিয়ে দিতে যে, স্বামীকে মান্য করে চলা, স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা ও তা বজায় রাখার জন্যে আল্লাহ তা’আলাই নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ তাকে অবশ্যই পালন করতে হবে। অন্যথায় তার ইহকালীন দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক জীবন তিক্ত-বিষাক্ত হয়ে যাবে, আর পরকালেও তাকে আল্লাহর আযাব ভোগ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, অমান্যকারী স্ত্রীকে মিলন-শয্যা থেকে সরিয়ে রাখা –তার সাথে যৌন সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা। অন্য কথায় তাকে না শয্যা-সঙ্গী বানাবে, না তার সাথে যৌন সম্পর্ক বজায় রাখবে। আর তৃতীয়ত বলা হয়েছে তাকে মারধোর করতে। কিন্তু এ মারধোর সম্পর্কে একথা স্পষ্ট যে, তা অবশ্যই শিক্ষামূলক হতে হবে মাত্র। ক্রীতদাস ও জন্তু-জানোয়ারকে যেমন মারা হয়, সে রকম মার দেয়ার অধিকার কারো নেই।–[‘ফতোয়ায়ে কাজীখান’-এ বলা হয়েছেঃ (আরবী**************************************************)

স্বামী স্ত্রীকে চারটি অবস্থায় বা চারটি কারণে মারতে পারে। এক, স্বামীর ইচ্ছা ও নির্দেশ সত্ত্বেও স্ত্রী যদি সাজ-সজ্জা পরিত্যাগ করে। দুই, স্বামী যৌন সঙ্গমের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেজন্যে প্রস্তুত না হওয়া তার পবিত্র ও হায়যমুক্ত থাকা সত্ত্বেও। তৃতীয়, স্ত্রী যদি নামায তরক করে এবং চতুর্থ, স্ত্রী যদি স্বামীর বিনানুমতিতে ঘর থেকে বাইরে চলে যায়।]

কিন্তু এ সব কয়টি কাজ স্বামী এক সঙ্গে করবে, কিংবা একটার পর একটা প্রয়োজনানুপাতে করবে। ….আয়াতের ধরন ও বাচনভঙ্গী দেখে বাহ্যত সব কয়টি কাজ এক সঙ্গে করারই অনুমতি রয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু বিবেক ও সুস্থ বুদ্ধির নির্দেশ এই যে, এই কয়টি কাজ এক সঙ্গে একই সময় করবে না, ক্রমিক নীতিতে ও প্রয়োজনানুপাতে একটির পর একটি করবে। কিন্তু এ কাজ করার অনুমতিই দেয়া হয়েছে স্ত্রীকে অনুগতা বানাবার উদ্দেশ্যে। নিছক কষ্ট বা শাস্তি দেয়াই এর লক্ষ্য নয়। কাজেই একটি একটি করে তার সফলতা যাচাই করবে। তা ব্যর্থ হলে পরেরটা করবে। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহর পরিচয় দিয়ে যা বলা হয়েছে, তার মানে আল্লামা শাওকানীর ভাষায় নিম্নরূপঃ

(আরবী************************************************************)

আয়াতে স্বামীদের বলা হয়েছে স্ত্রীদের জন্যে ভালোবাসার বাহু বিছিয়ে দিতে, পার্শ্ববিনম্র করতে অর্থাৎ তোমরা স্বামীর যদি স্ত্রীদের প্রতি যা ইচ্ছা তা-ই করার ক্ষমতা রাখ, তাহলেও তোমাদের উচিত তোমাদের ওপর স্থাপিত আল্লাহর অসীম ও অতুলনীয় ক্ষমতার কথা স্মরণ করা। কেননা তা হচ্চে সর্বক্ষমতার ঊর্ধ্বে –অধিক। মনে রেখ, আল্লাহ তোমাদের প্রতি উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছেন।–[আয়াত থেকে আল্লাহর ইচ্ছা এই মনে হয় যে, স্ত্রীকে মারবার ব্যাপারে যতদূর সম্ভব হালকা ভাব অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এজন্যে আল্লাহ তা’আলা ওয়ায-নসীহত, বোঝানো –সমঝানোর আদেশ দিয়েছেন সর্ব প্রথম। তারপরে ক্রমশ অগ্রসর হয়ে মিলন-শয্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ও শেষ পর্যায়ে মারবার কথা বলেছেন। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মতে এর তাৎপর্য হচ্ছেঃ

(আরবী*******************************************************************)

একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া যে, অপেক্ষাকৃত হালকা শাসনে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে পরে তাতেই ক্ষান্ত করা উচিত এবং তার পরও অধিকতর কঠোর নীতি অবলম্বনে অগ্রসর হওয়া কিছুতেই জায়েয নয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এ আয়াতের ভিত্তিতে বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

প্রথমে তাকে মিলন-শয্যা থেকে সরিয়ে দেবে, এতে যদি সে মেনে যায় ভালো, অন্যথায় আল্লাহ তা’আলা তোমাকে অনুমতি দিয়েছেন তাকে মারবার; কিন্তু সে মার নির্দয় অমানুষিক হবে না। মারের চোটে তার হাড় ভেঙ্গে দিতে পারবে না। এতে যদি সে ফিরে আসে ভালো কথা; অন্যথায় তুমি তার কাছ থেকে বিনিময় গ্রহণ করে তাকে তালাক দিয়ে দিতে পারো।]

স্ত্রীদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কে একথা বলে দুনিয়ার স্বামীদের বিশেষভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে, যেন তারা নারী অবলার প্রতি কোনোরূপ দুর্ব্যবহার ও অন্যায়-অত্যাচার করতে সাহসী না হয়।

অতঃপর বলা হয়েছে, স্ত্রী যদি স্বামীকে মেনে নেয়, স্বামীর সাথে মিলমিশ রক্ষা করে বসবাস করতে রাজি হয় এবং তা-ই করে, তাহলে স্বামীর কোনো অধিকার নেই তার ওপর কোনোরূপ অত্যাচার করার, তাকে একবিন্দু কষ্ট ও জ্বালাতন দেয়ার! আয়াতের শেষাংশে কোনো উপযুক্ত কারণ ব্যতীত স্ত্রীকে কষ্ট দেয়ার যে কতদূর অন্যায় তার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, তারা যদিও অবলা, দুর্বল, স্ত্রীকে কষ্ট দেয়ার যে কতদূর অন্যায় তার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, তারা যদিও অবলা, দুর্বল, তোমাদের জুলুম-পীড়ন থেকে আত্মরক্ষা করার সাধ্য যদিও তাদের নেই; তোমাদের অত্যাচারের প্রতিশোদ গ্রহণ করতে তারা যদিও অক্ষম; কিন্তু তোমাদের ভুললে চলবে না যে, আল্লাহ হচ্ছেন প্রবল পরাক্রান্ত, শ্রেষ্ঠ, শক্তিমান; তিনি অবশ্যই প্রত্যেক জালিমের জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং সেজন্যে কঠোর শাস্তিদান করবেন। অতএব তোমরা শক্তিমান বলে স্ত্রীদের ওপর অকারণ জুলুম করতে উদ্যত হবে, তা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না।

স্ত্রীদের প্রতি ভালো ব্যবহার ঈমানের লক্ষণ

স্ত্রীদের ওপর অন্যায়ভাবে, অকারণে ও উঠতে-বসতে আর কথায়-কথায় কোনোরূপ দুর্ব্যবহার বা মারধোর করতে শুধু নিষেধ করেই ক্ষান্ত করা হয়নি, ইসলাম আরো অগ্রসর হয়ে স্ত্রীদের প্রতি সক্রিয়ভাবে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বামীদেরকে।

এ পর্যায়ে কুরআনের আয়াতঃ

(আরবী**************************************)

স্ত্রীদের সাথে যথাযথভাবে কুব ভালো ব্যবহার করবে।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা কাসেমী লিখেছেনঃ

(আরবী******************************************************)

স্ত্রীদের সাথে কার্যত ইনসাফ করে আর ভালো সম্মানজনক কথা বলে একত্র বসবাস করো যেন তোমরা স্ত্রীদের বিদ্রোহ বা চরিত্র খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে না বসো। এ ধরনের কোনো কিছু করা তোমাদের জন্যে আদৌ হালাল নয়।

আল্লামা আ-লুসী লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************************)

তাঁদের সাথে ভালোভাবে ব্যবহার করো। আর ‘ভালোভাবে’ মানে এমনভাবে যা শরীয়ত ও মানবিকতার দৃষ্টিতে অন্যায় নয় –খারাপ নয়।

এ ‘ভালোভাবে’ কথার মধ্যে এ কথাও শামিলঃ

(আরবী***********************************************) স্ত্রীকে মারধোর করবে না, তার সাথে খারপ কথাবার্তা বলবে না এবং তাদের সাথে সদা হাসিমুখে ও সন্তুষ্টচিত্তে সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে।

তাফসীরকারদের মতে এ আয়াত থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রী যদি ঘরের কাজ-কর্ম করতে অক্ষম হয় বা তাতে অভ্যস্ত না হয়, তাহলে স্বামী তার যাবতীয় কাজ করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে বাধ্য। (আরবী*******)

স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করা পূর্ণ ঈমান ও চরিত্রের লক্ষণ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী****************************************************)

যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম, নিষ্কলুষ সে সবচেয়ে বেশি পূর্ণ ঈমানদার। আর তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে তার স্ত্রীর নিকট সবচেয়ে ভালো।

অপর এক হাদীসে স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসূলে করীম (স)-এর নিজের ভূমিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লোক সে, যে তার পরিবার ও স্ত্রী-পরিজনের পক্ষে ভালো। আর আমি আমার নিজের পরিবারবর্গের পক্ষে তোমাদের তুলনায় অনেক ভালো।  তোমাদের সঙ্গী-স্ত্রী বা স্বামী –যদি মরে যায়, তাহলে তার কল্যাণের জন্যে তোমরা অবশ্যই দো’আ করবে।

হযরত আবূ যুবার (রা) বলেন, একদা নবী করীম (স) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেনঃ

(আরবী*******************) –তোমরা আল্লাহর দাসীদের মারধোর করো না।

তখন হযরত উমর ফারূক (রা) রাসূলের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ

(আরবী************************************************)

আপনার এ কথাটি শুনে স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের ওপর খুবই বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে।

তখন নবী করীম (স) তাদেরও মারবার অনুমতি দিলেন। একথা জানতে পেরে বহু সংখ্যক মহিলা রাসূলের ঘরে এসে উপস্থিত হলো এবং তারা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে নানা প্রকারের অভিযোগ পেশ করলো। সব কথা শুনে নবী করীম (স) বললেনঃ

(আরবী***************************************************************)

বহু সংখ্যক মহিলা মুহাম্মদের পরিবারবর্গের নিকট এসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে গেছে। মনে হচ্ছে, এসব স্বামী তোমাদের মধ্যে ভালো লোক নয়।

অন্য কথায়ঃ

(আরবী******************************************************)

বরং তোমাদের মধ্যে উত্তম লোক হচ্ছে তারা, যারা তাদের স্ত্রীদের মারপিট করে না; বরং তাদের অনেক কিছুই তারা সহ্য করে নেয়। (অথবা বলেছেন) তাদের প্রতি প্রেম-ভালোবাসা পোষণ করে, তাদের কঠিন মার মারে না এবং তাদের অভাব-অভিযোগগুলো যথাযথভাবে দূর করে।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক উপহার বিনিময়

স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রেম-ভালোবাসার স্থায়িত্ব ও গভীরতা বিধানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজন হচ্ছে পারস্পরিক উপহার-উপঢৌকন বিনিময়। স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীকে মাঝে-মধ্যে নানা ধরনের চিত্তাকর্ষক দ্রব্যাদি দেয়া। স্ত্রীরও যথাসাধ্য তাই করা উচিত। যার যে রকস সম্বল ও সামর্থ্য, সেই অনুপাতে যদি পরস্পরে উপহার-দ্রব্যের আদান-প্রদান হয়, তাহলে তার ফলে পারস্পরিক আকর্ষণ, কৌতুহল ও হৃদয়াবেগ বৃদ্ধি পাবে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রতি থাকবে সদা সন্তুষ্ট। এজন্যে রাসূলে করীম (স)-এর একটি সাধঅরণ ও সংক্ষিপ্ত উপদেশ সব সময় স্মরণে রাখা কর্তব্য। তা হলোঃ (আরবী************) অর্থাৎ তোমরা পরস্পর উপহার-উপঢৌকনের আদান-প্রদান করো। দেখবে, এর ফলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে –পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসার মাত্রা বৃদ্ধি পাবে।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************)

তোমরা পরস্পরে হাদিয়া-তোহফার আদান-প্রদান করবে, কেননা হাদিয়া-তোহফা দিলের ক্লেদ ও হিংসা-দ্বেষ দূর করে দেয়।

এর কারণ সুস্পষ্ট। মানুষের দিলে ধন-মালের মায়া খুবই তীব্র ও গভীর। তা যদি কেউ অন্য কারো নিকট থেকে লাভ করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার মন তার দিকে ঝুঁকে পড়ে, আকৃষ্ট হয় এবং মাল-সম্পদ দানকারীর মনও ঝুকে পড়ে তার প্রতি, যাকে সে তা দান করল।

(আরবী*************************************)

ইবরাহীম ইবনে ইয়াজীদ নখয়ী বলেছেনঃ

(আরবী*********************************************************************)

পুরুষের পক্ষে তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর পক্ষে তার স্বামীকে উপহার দান খুবই বৈধ কাজ। তিনি আরো বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************************************************)

স্ত্রী যদি স্বামীকে কিংবা স্বামী যদি স্ত্রীকে কোনো উপহার দেয়, তবে তা তাদের প্রত্যেকের জন্যে হতে তার পাওয়া দান।

কিন্তু এ ব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশ হলো, কেউই অপরের দেয়া উপহার ফেরত নিতে বা দিতে পারবে না। ইবরাহীম নখয়ী বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

এ দুয়ের কারোর পক্ষেই তার নিজের দেয়া উপহার ফিরিয়ে নেয়া জায়েয নয়।

হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয বলেছেণ, ‘এভাবে উপহার আদান-প্রদান করলে কেউই কারোরটা ফিরিয়ে দেবে না, ফিরেয়ে নেবে না।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে যা কিছু একবার দিয়ে দিয়েছে, তা ফেরত নেয়া কারো পক্ষেই জায়েয নয়।

ইবনে বাত্তাল বলেছেনঃ কারো কারো মতে স্ত্রী তার দেয়া জিনিস ফিরিয়ে নিলেও নিতে পারে; কিন্তু স্বামী তার দেয়া উপহার কিছুতেই ফিরিয়ে নিতে পারবে না।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মান-অভিমান অনেক সময় জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব করে। অনেক সময় তা সীমাতিক্রম করে যায়। অনেক সময় কথার কাটাকাটি ও তর্ক-বিতর্কেও পরিণত হয়ে পড়ে। রাসূলে করীম (স)-এর দাম্পত্য জীবনেও তা লক্ষ্য করা গিয়েছে। হযরত উমরের বেগম একদিন হযরত উমরকেই বললেনঃ

(আরবী**********************************************)

আল্লাহর কসম, নবীর বেগমরা পর্যন্ত তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করে থাকেন। এমন কি তাঁদের এক-একজন রাসূলকে দিনের বেলা ত্যাগ করে রাত পর্যন্ত অভিমান করে থাকেন।

তখন হযরত উমর (রা) চিন্তায়ি ভারাক্রান্ত হয়ে তাঁর কন্যা উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসার নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন ও সত্যাসত্য জানতে চাইলেন। জবাবে হাফসা হ্যাঁ-সূচক উক্তি করলেন। হযরত উমর এর পরিণাম ভয়াবহ মনে করে কন্যাকে সাবধান করে দিলেন ও বললেনঃ

(আরবী******************************************************)

সাবধান! তুমি রাসূলের নিকট বেশি বেশি জিনিস পেতে চাইবে না। তাঁর কথায় মুখের ওপর জবাব দেবে না, রাগ করে কখনো তাঁকে ত্যাগ করবে না। আর তোমার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে তা আমার নিকট চাইবে।

(আরবী***************************************************************)

নিজের কন্যার দাম্পত্য জীবন সুখের হওয়ার জন্যে অর্থ ব্যয় করার একটা নির্দেশ এতে নিহিত রয়েছে। আর এ হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই মর্যাদা রক্ষার ব্যাপার এবং এ উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা কর্তব্য। জামাতার নিকট মেয়ে বেশি বেশি জিনিস চাইলে তার কষ্ট হতে পারে মনে করে কন্যার জন্যে অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত হওয়ারও নিদর্শন এতে রয়েছে।

 

স্ত্রীর অধিকারের গুরুত্ব

ইবাদত-বন্দেগী ও কৃচ্ছ্র সাধনা অনেক প্রশংসার কাজ সন্দেহ নেই, কিন্তু তা করতে গিয়ে স্ত্রীর অধিকার হরণ করা, তার পাওনা যথারীতি ও পুরাপুরি আদায় না করা, তার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন করা নিশ্চয়ই বড় গুনাহ। নবী করীম (স) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ

(আরবী****************************************************)

নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রীর তোমার ওপর একটা অধিকার রয়েছে।

কেবল স্ত্রীর অধিকার স্বামীর ওপর, সে কথা নয়, স্বামীর অধিকার রয়েছে স্ত্রীর ওপর। আল্লামা বদরুদ্দীন এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

(আরবী*********************************************)

স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকেরই অধিকার রয়েছে প্রত্যেকের ওপর।

স্বামীর উপর স্ত্রীর যা কিছু অধিকার, তার মধ্যে একটি হচ্ছে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। আর সাধারণভাবে তার প্রাপ্য হচ্ছেঃ

(আরবী******************************************)

তাকে খাবার দেবে যখন যেমন তুমি নিজে খাবে এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে দেবে, যেমন মানের পোশাক তুমি নিজে গ্রহণ করবে।

এ হাদীসের তাৎপর্য মওলানা খলীলুর রহমান লিখেছেণ নিম্নরূপঃ

(আরবী************************************************************)

স্ত্রীর খোরাক ও পোশাক যোগাড় করে দেয়া স্বামীর কর্তব্য, যখন সে নিজের জন্যে এগুলোর ব্যবস্থা করতে সমর্থ হবে।

আল্লামা আল-খাত্তাবী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************************)

এ হাদীস স্ত্রীর খোরাক-পোশাকের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব করে দিচ্ছে। এ ব্যপারে কোনো সীমা নির্দিষ্ট নেই, প্রচলন মতোই তা করতে হবে, করতে হবে স্বামীর সামর্থ্যানুযায়ী। আর রাসূলে করীম (স) যখন একে ‘অধিকার’ বলেছেণ তখন তা স্বামীর অবশ্য আদায় করতে হবে –সে উপস্থিত থাক, কি অনুপস্থিত। সময়মতো তা পাওয়া না গেলে তা স্বামীর ওপর অবশ্য দেয় ঋণ হবে –যেমন অন্যান্য হক-অধিকারের ব্যাপারে হয়ে থাকে।

এতদ্ব্যতীত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে স্ত্রীর নিকট যাওয়াও স্ত্রীর একটি অধিকার স্বামীর ওপর এবং তা স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীর প্রতি। স্বামী যদি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে স্ত্রীর নিকট উপস্থিত হয়, তবে তাতে স্ত্রীর মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যাওয়া স্বাভাবিক। কেননা তাতে প্রমাণ হয় যে, স্বামী স্ত্রীর মন জয় করার জন্যে বিশেষ যত্ন নিয়েছে এবং পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারেই সে স্ত্রীর নিকট হাজির হয়েছে। অপরিচ্ছন্ন ও মলিন দেহ ও পোশাক নিয়ে স্ত্রীর নিকট যাওয়া স্বামীর একেবারেই অনুচিত। স্ত্রীরও কর্তব্য স্বামীর ইচ্ছানুরূপ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও সেই অবস্থায়ই স্বামীর নিকট যাওয়া। এজন্যে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, সাবান ও অন্যান্য জরুরী প্রসাধন দ্রব্য সংগ্রহ করে দেয়া স্বামীর কর্তব্য। হযরত ইবনে আব্বাস এ পর্যায়ে একটি নীতি হিসেবে বলেছেনঃ

(আরবী*****************************************************************)

আমি স্ত্রীর জন্যে সাজসজ্জা করা খুবই পছন্দ করি, যেমন পছন্দ করি স্ত্রী আমার জন্যে সাজসজ্জা করুক।

স্ত্রীর বিপদে সহানুভূতি প্রদর্শন

স্ত্রীর বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে তার প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি প্রদর্শন করা স্বামীর কর্তব্য। স্ত্রী রোগাক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা করা স্বামীরই দায়িত্ব। বস্তুত স্ত্রী সবচেয়ে বেশী দুঃখ পায় তখন, যখন তার বিপদে-শোকে তার স্বামীকে সহানুভূতিপূর্ণ ও দুঃখ ভারাক্রান্ত দেখতে পায় না অথবা স্ত্রীর যখন কোন বিপদ হয়, শোক হয় কিংবা রোগ হয়, তখন স্বামীর মন যদি তার জন্যে দ্রবীভূত না হয়, বরং তখন স্বামীর মন মৌমাছির মতো অন্য ফুলের সন্ধানে উড়ে বেড়ায়, তখন বাস্তবিকই স্ত্রীর দুঃখ ও মনোকষ্টের কোনো অবধি থাকে না। এজন্যে নবী করীম (স) স্ত্রীর প্রতি দয়াবান ও সহানুভূতিপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এর সাধারণ নিয়ম হিসেবে বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************)

যে লোক নিজে অপরের জন্যে দয়াপূর্ণ হয় না, সে কখনো অপরের দয়া-সহানুভূতি লাভ করতে পারে না।

স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের ক্ষেত্রে এ কথা অতীব বাস্তব। এজন্যে স্ত্রীদের মনের আবেগ উচ্ছ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রাখঅ স্বামীর একান্তই কর্তব্য।

এ প্রসঙ্গে হযরত উমর ফারূকের একটি ফরমান স্মরণীয়। তিনি এক বিরহিণী নারীর আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখতে পেয়ে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। তখন তিনি তাঁর কন্যা উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবী*********************************)

মেয়েলোক স্বামী ছাড়া বেশির ভাগ কদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতে পারে?

হযরত হাফসা বললেনঃ (আরবী************) –‘চার মাস’। তখন হযরত উমর বললেনঃ

(আরবী***********************************************************)

সৈন্যদের মধ্যে কাউকে আমি চার মাসের অধিক বাইরে আটকে রাখব না।

(আরবী**********************************)

তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবে সব সেনাধ্যক্ষকে লিখে পাঠালেনঃ

(আরবী**********************************)

এই (চার মাসের) অধিক কাল কোনো বিবাহিত ব্যক্তিই তার স্ত্রী-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকে।

এ ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, স্ত্রীর মনের কামনা-বাসনা ও আন্তরিক ভাবধারার প্রতি তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখা স্বামীর অবশ্য কর্তব্য। আর স্ত্রীদের পক্ষে স্বামীহারা হয়ে বেশি দিন ধৈর্য ধরে থাকা সম্ভব নয় –এ কথার তার কিছুতেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************************************)

যেসব লোক তাদের স্ত্রীদের সম্পর্কে কসম খেয়ে বসে যে, তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাত ইত্যাদি করবে না, তাদের জন্যে মাত্র চার মাসের মেয়াদ অপেক্ষা করা হবে। এর মধ্যে তারা যদি ফিরে আসে, তবে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা মার্জনাকারী ও অতিশয় দয়াবান। আর তারা যদি তালাক দেয়ারই সিদ্ধান্ত করে থাকে, তবে আল্লাহ সব শোনেন ও সব জানেন।

এ আয়াতে ‘ঈলা’ সম্পর্কে ফয়সালা দেয়া হয়েছে। ঈলা (আরবী********) শব্দের অর্থ হচ্ছে, (আরবী********) ‘কসম করে কোনো কাজ না করা –‘কোনো কাজ করা থেকৈ বিরত থাকা’ আর ইসলামী শরীয়তের ভাষায় এর অর্থ হচ্ছেঃ

(আরবী***********************************************)

কসম করে স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম না করা –স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম করা থেকে বিরত থাকা।

আয়াতে বলা হয়েছেঃ যারা স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম না করার কিরা করবে তাদের জন্যে চার মাসের অবসর। এ চার মাস অতিবাহিত হবার পরে হয় সে স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে তাকে ফিরিয়ে নেবে, আর না হয় তালাক দিয়ে তাকে চিরতরে বিদায় করে দেবে।

(আরবী**********************************************************)

আল্লামা শাওকানী লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************************)

আল্লাহ তা’আলা স্ত্রীর ক্ষতি হয় এমন কাজ বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই মেয়াদের সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েচেন। জাহিলিয়াত যুগে লোকেরা এক বছর, দুই বছর কি ততোদিক কালের জন্য ‘ঈলা’ করত আর তাদের উদ্দেশ্য হতো স্ত্রীলোককে ক্ষতিগ্রস্ত করা। এসব ক্ষতি-লোকসানের পথ বন্ধ করার এবং স্ত্রীলোকদের প্রতি পুরুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত করানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াদের কথাগুলো বলে দিয়েছেন।

স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ না করা

স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার হচ্ছে এই যে, সে স্ত্রীর গোপন কথা অপরের নিকট প্রকাশ করে দেবে না। নবী করীম (স) তীব্র ভাষায় নিষেধ করেছেন এ ধরনের কোনো কথা প্রকাশ করতে। বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************************)

যে স্বামী নিজ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় ও স্ত্রী মিলিন হয় তার স্বামীর সাথে, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে দেয় –প্রচার করে, সে স্বামী আল্লাহর নিকট মর্যাদার দিক দিয়ে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি।

অর্থাৎ স্বামী যাবতীয় গোপন বিষয়ে অবহিত হয়ে থাকে, তার সাথে যৌন মিলন সম্পন্ন করে, স্ত্রী নিজকে –নিজের পূর্ণ সত্তা –দেহ ও মনকে স্বামীর নিকট উন্ম