মক্কার পথ

মক্কার পথ

‘The Road of Mecca’ গ্রন্থের রচয়িতা আল্লামা মুহাম্মদ আসাদ। গ্রন্থটি বাংলা অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক শাহেদ আলী।

‘মক্কার পথে’ লেখকের নাটকীয় জীবনের বহু কথা তিনি অবলিলাক্রমে ব্যক্ত করেছেন। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন-এর বাহ্য জাকজমকের অন্তরালে লুকায়িত অতল-গর্ভ শূন্যতাকে দুনিয়ার সামনে উদঘাটিত করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, তিনি সাংবাদিকতার উদ্যেশ্যে জেরুযালেম আসেন এবং আরবদের জীবন পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশার পর তিনি আবিষ্কার করেন ট্রেডিশনাল মুসলিম সমাজের মধ্যে রয়েছে মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সঙ্গতি,- যা ইউরোপ হারিয়েছে। তিনি তাঁদের মধ্যে আবিষ্কার করেন হৃদয়ের নিশ্চয়তা এবং আত্ম-অবিশ্বাস থেকে মুক্তি,যে মুক্তি ইউরোপীয়দের স্বপ্নের অগোচর। এ বিশ্বাসের প্রতি অনুরক্ত হয়ে তিনি ১৯২৬ সনে ইউরোপ ফিরে সস্ত্রীক ইসলাম ধর্ম কবুল করেন।

উৎসর্গ

স্বকীয় তাহযীব তমদ্দুনের ভালোবাসায়

গর্বিত,আনন্দ-স্লাত,

একান্ত শুভানুধ্যায়ী,অগ্রজ-প্রতিম

শামসুল হুদা চৌধুরী

শ্রদ্ধাস্পদেষু

দুটি কথা

 

‘মক্কার পথ’ প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, লেখক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ আসাদ কর্তৃক লিখিত ‘The Road of Mecca’ গ্রন্থ এর অনুবাদ। মুহাম্মদ আসাদ জাতিতে ছিলেন ইহুদী। কিন্তু কিশোর বয়সেই তিনি ইহুদী ধর্মের প্রতি তাঁর আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন। বয়োবৃদ্ধির সংগে সংগে তিনি পাশ্চাত্যের নব্য আধুনিক  জীবন-পদ্ধতি ও তার জীবনাচরনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একদিকে পাশ্চাত্যের জড়বাদী ভোগবাদ, অন্যদিকে যাজকদের অপার্থিব শরীর-বিমুক্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা তাঁকে পাশ্চাত্য বলয় থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং তাঁকে প্রাচ্যমুখী করে তোলে। তিনি আরবীয় এবং দেহ ও আত্মার সামঞ্জস্যবাদী মধ্যপন্থী ইসলামী জীবনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং মুহাম্মদ আসাদ নাম গ্রহণ করেন।

‘The Road of Mecca’ বা ‘মক্কার পথ’ মুহাম্মদ আসাদের রূহানী আত্মজীবনী। দেশ সফরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসংগে তিনি তাঁর আত্মিক উন্মোচনের কহিনী তুলে ধরেছেন। এ গ্রন্থে তাঁর ভ্রমণ-জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আরবীয় দুনিয়ার জীবনধারা এবং তার সংগে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জীবনধারার তুলনামুলক বৈশিষ্ট্য যেমন গল্পের আংগিকে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি চিত্রিত হয়েছে এক অতৃপ্ত সত্যসন্ধানী চিত্তের সত্যোপলদ্ধির মর্মস্পর্শী কাহিনী।

বলাবাহুল্য, এ বইটি লিখেছেন এ যুগের এমন একজন চিন্তাশীল মনীষী, যিনি সাধারণ যুক্তিহীন আবেগাক্রান্ত ধর্মন্তরিত মুসলিম নন। তিনি এক অনন্যসাধারণ প্রতিভান্বিত ব্যক্তি যিনি ধর্ম  গ্রহণের পূর্বে তাঁর সমস্ত বিদ্যা ও বুদ্ধির আলোকে ধর্মকে বুঝতে এবং তার মর্ম উপলদ্ধি করতে প্রয়াস পেয়েছেন।

এই অতি উঁচু মানের সাহিত্য-গুণসম্পন্ন চিত্তাকর্ষক গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও ইসলমী চিন্তাবিদ, ‘ইসলমি ফাউন্ডেশন পত্রিকা’ ও ‘সবুজ পাতা’র সাবেক সম্পাদক শাহেদ আলী। গল্প লেখার ভাষা তাঁর জাদুকরী হাত এই গ্রন্থটির বর্ণনাধর্মী সাহিত্যিক ভাষার অনুবাদে যে দারুণভাবে সফল হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই এবং যে-কোন পাঠক এর প্রাঞ্জল প্রসাদগুণ উপভোগ করে আনন্দ উপভোগ করবেন এবং এর বিশাল পৃষ্ঠযাত্রায় যে ক্লান্ত হবেন না, আনন্দের সংগে সে সংবাদ আমরা দিতে পারি। আর এ কারণেই পাঠকদের উপহার দিতে আমরা এ গ্রন্থখানির পুন:নবকলেবরে প্রকাশ করছি। ‘মক্কার পথ’ কে অনুবাদ না বলে বলা যায় নতুন সৃষ্টি, বাংলা সাহিত্যে এটি একটি অভিনব সংযোজন।

আমরা আশা করি, এ গ্রন্থ পাঠে পাঠক ইসলামের ধর্মাদর্শ উপলব্ধিতে নতুন চিন্তার খোরাক পাবেন এবং এবং ইসলামের প্রতি আরও গভীর বিশ্বাসে জেগে উঠবেন।

-শরীফ হাসান তরফদার

প্রকাশক

পূর্বকথা

 

লিও-পোলড উইস নামক একজন ইহুদী পন্ডিত ইসলাম কবুল করেছেন-এ খবর সম্ভবত স্কুল জীবনেই শুনেছিলাম; কিন্তু তিনি যে একজন লেখক, একজন অসাধারণ প্রতিভাশীল চিন্তাবিদ একথা জানলাম অনেক পরে। তাঁর মুসলিম নাম মুহাম্মদ আসাদ। আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রইলেও তাঁর কোন রচনা পড়ার সৌভাগ্য তখনো আমার হয়নি। বিট্রিশ আমলে তিনি ভারতে ছিলেন, পাকিস্থান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিম পাঞ্জাব সরকারের ইসলামী পুনর্গঠন সংস্থার পরিচালক ছিলেন এবং তিনি ‘আরাফাত’ নামক একটি অতি উন্নতমানের ইংরেজী সাময়কী সম্পাদনা করেন। এর বেশী কিছু তাঁর সম্পর্কে জানতাম না।

একদিন, খুব সম্ভব ১৯৫৮-এর দিকে ব্যরিষ্টার এ.টিম.মুস্তাফা, যিনি পরে পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, কথা প্রসংগে বলেন, ‘ভাইয়া, আপনি কি ‘The Road of Mecca’ পড়েছেনে? জীবনে আমি যত বই পড়েছি সেগুলোর মধ্যে এটি হচ্ছে বই।

মুস্তাফা ভাই কেবল একজন মশহুর আইনবেত্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আপোসহীন সক্রিয় ইসলামী সংস্কৃতিকর্মী এবং সুধী পাঠক; দুনিয়ার কোথায় কোন শ্রেষ্ঠ লেখক ইসলামের উপর বই-পুস্তক লিখেছেন তিনি তার আপ-টু-ডেট খবর রাখতেন। তার মুখে ‘The Road of Mecca’ –র উচ্ছ্বাসিত প্রসংশা শুনে বইটি সংগ্রহ করার জন্য আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং কিছুদিন পর এক কপি লাহোর থেকে পার্শেল করে আনাই। বইটি হাতে পেয়ে তার মধ্যে ডুবে যাই, শৈশব থেকে ইসলাম গ্রহণ পর্যন্ত আসাদের দীর্ঘ চাঞ্চল্যকর আধ্যাত্মিক সফরে তাঁর সহযাত্রী হয়ে আমিও ঘুরি ইউরোপ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, পথে-প্রান্তরে, হাটে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, সমুদ্রে, আর নতুন করে দেখি জগতকে; ধীরে ধীরে ইসলামের  পরিপূর্ণ রূপটি পাপড়ির পর মেলে বিকশিত হয়ে ওঠে আমার দৃষ্টির সম্মুখে। বার বার পড়লাম ‘The Road of Mecca’এবং পড়তে পড়তেই অন্তরে এ উপলব্ধি হলো-এ বই-এর বাংলা তরজমা বাংলাভাষী পাঠক-পাঠীকাদের জন্যে ইসলামী জীবন-দৃষ্টির এক নতুন দিগন্ত উন্নোচিত করবে।

সীমিত সামর্থ্য আর সময়ের অভাব সত্ত্বেও আমি বইটির তরজমায় হাত দিই এবং আমার সম্পাদিত ইসলামিক একাডেমী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপাতে থাকি। বিয়ষবস্তু এবং আসাদের অপূর্ব রচনশৈলীর গুনে আমার অক্ষম তরজমাও পাঠক মহলে প্রবল সাড়া জাগায়; কেবল এই তরজমার জন্যেই বহু পাঠক ইসলমিক একাডেমী পত্রিকা’র গ্রাহক হন এবং পত্রিকাটির প্রকাশনা কখনো অনিয়মিত হয়ে পড়লে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

‘The Road of Mecca’ বা মক্কার পথ মুহাম্মদ আসাদের রূহানী আত্মজীবনী। আসাদ গল্পচ্ছলে নিজের জীবনের কাহিনী লিখেছেন। উপন্যাসের চেয়েও সরস এ কাহিনী আসাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রামাণিকতায় হয়ে উঠেছে এ-কালের মানুষের জন্যে ইসলামের এক অনাস্বাদিতপূর্ব বিশ্লেষণ। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে এক নতুন স্বাদ, এক অভিনব রস, যা পাঠককে কেবল আনন্দই দেয় না, এক সুগভীর তৃপ্তিকর অভিজ্ঞতায় করে ঐশ্বর্যবান; লেখকের সফর সংগী হয়ে পাঠকও অন্তিমে গিয়ে পৌঁছান মক্কা তথা ইসলামী জীবন-দৃষ্টির মর্মকেন্দ্র, আর ইসলামের পথে তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রা হয় পূর্ণ, আসাদের ভাষায় যা হচ্ছে home-coming- স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন।

মুহাম্মদ আসাদ সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, ইসলামের এক অনন্য ব্যাখ্যাতা-কিন্তু মূলত তিনি দিব্যদৃষ্টির অধিকারী সৃজনধর্মী একজন প্রতিভা; ‘The Road of Mecca’ তাঁর এক অপূর্ব সৃষ্টি। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন তাঁর স্ত্রী পোলা হামিদা আসাদকে। তাঁর এই সৃষ্টিকে বাংলা ভাষার আধারে পরিবেশন করতে গিয়ে যতদূর সম্ভব মূলের ছন্দ প্রবাহ, বাকভঙ্গি ও রচনাশৈলী অক্ষুণ্ণ রেখে আসাদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো সৃষ্টিকেই তো হুবহু ভাষান্তরতি করা যায় না। তাই আমি এ দাবী করি না যে, আসাদের এ অনুপম সৃষ্টিকে আমি পুরোপুরি আমার নিজের ভাষায় তুলে ধরতে পেরেছি। তবে আমার সান্তনা এই যে, এ বই-তরজমার পেছনে প্রথম থেকে শেস পর্যন্ত সক্রিয় ছিল সৃজনধর্মী রচনার প্রতি আমার সহজাত অনুরাগ এবং ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি আমার অশৈশব ভালোবাসা। বইটির তরজমা বংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমি আমার নিজের উপর স্ব-আরোপিত একটি দায়িত্ব পালন করেছি, যার জন্য পুরষ্কার পরম করুনাময় আল্লাহ তাআলার কাছে মুহাম্মদ আসাদেরই প্রাপ্য। তরজমা সম্পূর্ণ করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করার জন্য অগণিত উৎসুক এবং আগ্রহী পাঠক আমাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগিদ দিয়েছেন; দেখা হলেই এ প্রসংগ তুলেছেন। তাঁদের সাগ্রহ প্রতীক্ষার এতদিনে অবসান হলো, তাঁদের দাবী এতদিনে পূর্ণ হলোঃ এজন্য আমি নিজেকে ভারমুক্ত মনে করছি এবং আল্লাহতা আলার প্রতি শুকরিয়া জানাচ্ছি। এই সব অগণিত পাঠকের মধ্যে ভাই শাহ্ আবদুল হান্নানের কথা কিছুতেই ভুলবার নয়; তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ ও দাবী, আমার মধ্যে যখনি অনুবাদে শৈথিল্য এসেছে, আমাকে নতুন করে উৎসাহিত করেছে।

বইটির তরজমার প্রথম পর্যায়ে সাবেক ইসলামকি একাডেমীর মোহাম্মদ আজিজুর ইসলাম ও শেখ তোফাজ্জল হোসেন দীর্ঘদিন আমার মৌখিত তরজমা লিপিবদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই দায়িত্বের এই দায়িত্বে পুরোটাই পালন করেছেন কবি মাসউদ-উশ-শহীদ। এতোটা আনন্দের সংগে মসউদ তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের এক মূল্যবান অংশ এ কাজে আমার সংগে ব্যয়-এর প্রুফ দেখার দায়িত্ব সানন্দে বহন করেছেন আবদুল মুকীত চৌধুরী। বইটির নির্ঘন্ট তৈরী করে দিয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসের কালাম আজাদ। এঁরা প্রত্যেকেই আমার স্নেহভাজন; ধন্যবাদ দিয়ে এঁদের আন্তরিক সহযোগিতার মূল্যকে আমি লঘু করতে চাই না।

জ্ঞানকোষ প্রকাশনী বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে গোটা বাংলা-ভাষী পাঠক সমাজের কৃতজ্ঞভাজন হয়েছেন।

শাহেদ আলী

আল্লামা মুহাম্মদ আসাদের নাটকীয় জীবনের কিছু কথা

অধ্যাপক শাহেদ আলী

মুসলিম বিশ্বের আকাশ থেকে প্রজ্ঞা ও মনীষার উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি খসে পড়ে ১৯৯৪ সনে। পশ্চিমা জগতের দৃষ্টিতে এই নক্ষত্রটির আলো ছিলো প্রখর, চোখ ধাঁধানো; তাই তারা প্রায় শতাব্দীকাল এক চোখের সামনে দেখেও না দেখার ভান করেছে। এই মনীষী জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমে ইউরোপীয় পরিবেশে। অথচ তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন-এরা বাহ্য জাকজমকের অন্তরালে লুকায়িত অতল-গর্ভ শূন্যতাকে দুনিয়ার সামনে উদঘাটিত করে দিয়েছিলেন। এজন্য পাশ্চাত্য জগত তাঁকে বরাবর বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ইন্তেকালের খবর কোন প্রচার পায়নি পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে।

আর রাতকানা মানুষ চাঁদ-নক্ষত্র কিছুই দেখেনা, অন্ধ যেমন সূর্য দেখেনা, তেমনি মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতেও এই নক্ষত্রের কিরনের জ্যোতি কখনো পুরোপুরি প্রতিবিম্বিত হয়নি। তাই তার আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটির খসে পড়লেও তার কোন শূন্যতা মুসলিম বিশ্ব অনুভব করেনি-সূর্য বা নক্ষত্রের উদয়-অস্তে অন্ধের কিছুই আসে যায় না। তাদের নিজস্ব কোন প্রচার মিডিয়াও নেই। তাছাড়া যা কিছু আছে তাতেও এই মৃত্যু তেমন কোন গুরুত্বই পাইনি। তাঁর নাকি অসিয়ত ছিলো-তাঁর কবর যেন হয় মক্বায়-যেখানে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করে ইসলামকে আবিস্কার করেছিলেন, ইসলামের সেরা ব্যাখাতা এবং প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন, ইসলাম কবুল করে সারা বিশ্বের মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরেছিলেন, লিখেছিলেন ‘Road To Mecca’ –র মত বিশ্বে আলোড়ন জাগানো বই। কিন্তু তাঁর সাধ পূরণ হয়নি। তিনি স্পেনে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

মুহাম্মদ আসদ, ইসলাম কবুল করার আগে যার নাম ছিলো লিওপোন্ড লুইস, তাঁর স্ত্রী পোলা হামিদা আসাদকে নিয়ে প্রায় ২৬/২৭ বছর বাস করেছিলেন মরক্কোর তানজির্য়াস শহরে। তিনি রাবাত আল-আলমই ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন কোরানুল করিমের একখানি সংক্ষিপ্ত তফসীরসহ তরজুমা করার জন্য। প্রথম ১০ পারার তফসির প্রকাশিত হলে কোন কোন আলিম, তাঁর কোন কোন ব্যাখ্যা সম্বন্ধে ভিন্নমত পোষণ করেন। তখন আসাদ রাবিতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মরক্কো চলে যান এবং আর্থিক অসুবিধা সত্ত্বেও, কেবল তাঁর স্ত্রী ও কতিপয় বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় তিনি একায় অনুবাদ ও তাফসীর সম্পূর্ণ করে তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। সুদীর্ঘ ২০ বছরের সাধনার পর তাঁর তরজমা ও তাফসীর তিনি প্রকাশ করেন। আধুনিক বিশ্ব কোরআনুল করিমের আধুনিকতম তরজমা ও তফসীরকারের দায়িত্ব পালন করেন।

লিওপোন্ড লুইসের জন্ম ১৯০০ সনে, বর্তমান পোলান্ডের লেমবার্গ শহরে, এক ইহুদী পরিবারে। তাঁর পিতামহ ছিলেন কয়েক পুরুষ বিস্তৃত এক ইহুদী রাব্বী বা পুরোহীত পরিবারের শেষ রাব্বী হিসাবে। তাঁর পিতাকে ট্রেডিশনাল ইহুদী রাব্বী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা দেয়া হলেও তিনি সে পারিবাকি ঐতিহ্য ত্যাগ করে ব্যরিষ্টারী অধ্যয়ন করেন, নামকরা আইনজীবি হয়ে উঠেন এবং বিয়ে করেন এক ব্যাংকার পরিবারে। স্কুলের সাধারণ পড়াশুনার সঙ্গে লুইস হিব্রু ভাষা অনর্গল বলতে ও পড়তে শিখেন, এবং আর্মায়িক ভাষার সঙ্গেও সুপরিচিত হয়ে উঠেন। এই বয়সেই তিনি তালমুাদের মূল পাঠ ও ভাষ্যের সঙ্গে সম্যক পরিচয় লাভ করেন। বহু বছর পর এ বিষয়ে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক আত্মরচিত ‘Road To Mecca’–তে লিখেন  “আমার মনে হলো ওল্ড টেষ্টামেন্ট এবং তালমুদের আল্লাহ যেন তাঁর পূজারীরা কিভাবে তাঁর পূজা করবে তার অনুষ্ঠানগুলো নিয়েই ব্যস্ত। আমার আরো মনে হতো আল্লাহ যেন বিশেষ একটি জাতির ভাগ্য নিয়ে বিস্ময়কররূপে ব্যস্ত রয়েছেন পূর্ব থেকেই। ইব্রাহিমের বংশধরগণের ইতিহাসরূপে ওল্ড টেষ্টামেন্টের কাঠামোটিই এমন যে মনে হয় আল্লাহ যেন গোটা মানবজাতির স্রষ্টা ও পালনকর্তা নন, বরং তিনি যেন এক উপজাতীয় দেবতা, যে দেবতা একটি মনোনীত জাতির প্রয়োজনের সঙ্গে গোটা সৃষ্টির সংগতি বিধান করে চলেছেন।”

ইহুদী মতবাদ নিয়ে নিরাশ হলেও লুইস কিন্তু অন্য কোন পন্থায় আধ্যাত্মিক সত্যানুসন্ধানে গেলেন না। প্রথম মহাযুদ্ধের পর তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং আনেকটা উন্নাসিকতার সঙ্গে শিল্প ও দর্শনের ইতিহাস অধ্যয়নে মনোযোগী হন। কিন্তু এই একাডেমিক জীবন তাঁর ধর্মীয় তাৎপর্য অনুসন্ধানের অন্তর্নিহিত তৃষ্ণা নিবারণে ব্যর্থ হলো। তাঁর অ্যাডভেনচারের বাসনাও তাতে তৃপ্ত হলোনা। প্রথম মাহযুদ্ধের পর ভিয়েনা কিন্তু মরিয়া হয়ে নিয়েজিত ছিলো তার স্বকীয়তা ও আত্মপরিচয় লাভের প্রয়াসে। যুদ্ধ এবং ৬০০ বছরের পুরানো হ্যারসবুর্গ রাজতন্ত্রের পতন পুরানো মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যগুলোর ভিত্তি ধ্বসিয়ে দেয়। অবশ্য এর পূর্বে এগুলো শিল্পবোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর আক্রমণের বিষয় হয়ে উঠেছিলো। এক সংশয়বাদী পরিবারে প্রভাবে লুইস তাঁর তরুণ বয়সের অন্য বহু বালকের মতোই সকল আনুষ্ঠানিক ধর্মকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসেন। তাঁর তখন লক্ষ্য ছিলো কর্ম, দুঃসাহসিক অভিযান এবং উত্তেজনা। এই তাড়নাবশে তিনি অস্ট্রীয় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন এক ছদ্মনামে কারণ তখনো তাঁর বয়স ১৮ বছর হয়নি। ফলে তার স্বপ্ন ব্যর্থ হলো্। চার বছর পর যখন তিনি আইনত ভর্তি হলেন সামরিক বাহিনীতে তার আগেই তাঁর সামরিক গৌরবের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। কারণ কয়েক সপ্তাহ পরেই ঘটলো বিপ্লব, অষ্ট্রীয় সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ল এবং যুদ্ধও শেষ হয়ে গেলো।

কিন্তু আন্ত-একাডেমিক জীবনের কোন আকর্ষণই লুইসের ছিলোনা। তিনি অনুভব করছিলেন, জীবনের সাথে গভীরভাবে মোকাবেলা করার আকাংখা-জীবনে প্রবেশ করার বাসনা। নিরাপত্তা-প্রিয় মানুষ নিজের চারপাশে যে-সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে লুইস সেগুলোর আশ্রয় না নিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন জীবনে-চেয়েছিলেন সবকিছুর পিছনে যে আধ্যাত্মিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে তা উপলদ্ধি পথ নিজেই খুঁজে বের করতে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকের দশকগুলোর একটি বিশেষ লক্ষণ ছিলো আধ্যাত্মিক শূন্যতা। বহুশত বছর ধরে ইউরোপ যে-সব মূল্যবোধে অভ্যস্ত ছিলো, সে সমুদয়ই ১৯১৪-১৯১৮ এর মধ্যে যা ঘটলো তাতে নিজস্ব রূপরেখা হারিয়ে নিরাকার, নিরবয়ব হয়ে পড়লো। সে শূন্যতা পূরণ করতে পারে এমন নতুন কোন মূল্যবোধ কোথাও দেখা যাচ্ছিলো না। ক্ষুণভঙ্কুরতা ও অনিশ্চয়তার ভাব, সামাজিক, মানসিক ওলটপালটের পূর্বাভাস মানুষের চিন্তা ও প্রয়াসে স্থায়ী বলে কিছু নেই এমন একটা সন্দেহের জন্ম দেয় তরুণ মনে। তরুণের আত্মিক চাঞ্চল্য কোথাও কোন নির্ভর খুঁজে পাচ্ছিলো না লুইস এবং তাঁর মত নবীনের যে –সব প্রশ্নে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলো নৈতিকতার কোন নির্ভরযোগ্য মানের অভাবে কেউ তাদের সেইসব প্রশ্নের সন্তোসজনক জবাব দিতে পারছিলেন না। লুইস দেখতে পেলেন, “বিজ্ঞান বলে জ্ঞানই সব অথচ একট নৈতিক লক্ষ্য ছাড়া জ্ঞান কেবল বিশৃঙ্খলাই সষ্টি করতে পারে।” এতে সন্দেহ নেই যে, সে সময়কার সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী এবং কমিউনিষ্টরা একটা মহত্তর এবং অধিকতর সুখী দুনিয়া নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লুইসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়লো এরা সকলে চিন্তা করছে, কেবল বাহ্য সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে এবং এসব ক্ষেত্রে এই ক্রটি সংশোধনের জন্য ওরা ‘জিয়ান’ বাদী ধারণাকে এক নতুন অধিবিদ্যা বিরোধী অধিবিদ্যায় উন্নীত করেছে। তারা দেখতে পেল, তাদের চারপাশের পথিবীতে যা যা কিছু ঘটছে অনেক সময় কল্পিত ঐশী গুণাবলীর সঙ্গে তার অসঙ্গতি প্রচন্ড। আল্লাহর প্রতি যে-সব গুণ আরোপ করা হয়, মানব ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো যেন সেগুলো স্পষ্টভাবে স্বতন্ত্র ও আলাদা। এ থেকে তারা সিদ্ধান্তে এলো আল্লাহ বলে কিছু নেই। ধর্মের আত্মাভিমানী অভিভাবকেরা আল্লাহকে তাদের নিজেদের পোষাক পরিয়ে মানুষের ভাগ্য থেকে আল্লাহকে বিচ্ছিন্ন, সম্পর্কহীন করে ফেলেছিলো। কিন্তু এতে তো সমস্যার সমাধান হলো না, ব্যক্তি-জীবনে কিংকর্তব্য সম্বন্ধে এই অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীলতা ঘোর বিশৃংখলার কারণ হয়ে উঠতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য বোধের প্রতি অশ্রদ্ধা। এই সহজাত উপলদ্ধির কারণে লুইস এখানেই থামলেন না। তাঁর জন্য মহত জীবনকে গড়ে তোলা তাঁর দিকে আশার একটি সৃজনধর্মী পথ অনুসন্ধানের জন্য সহায়ক হয়ে উঠলো। এই তাগিদেই তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়ে তার মূল পাঠ্য বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন শিল্পকলার ইতিহাস। কিন্তু পাঠ্য বিষয় লুইসকে তৃপ্ত করতে পারালো না। তিনি দেখতে পেলেন তাঁর শিক্ষকেরা- যাদের মধ্যে স্ট্রজিগোভস্কি এবং দূভোরাক ছিলেন বিখ্যাত এবং বিশিষ্ট সৌন্দর্যতত্ত্বের যে-সব নিয়ম-কানুন দ্বারা শিল্প সষ্টি নিয়ন্ত্রিত হয়, সেগুলো আবিষ্কার করতেই ছিলেন অতিমাত্রায় ব্যস্ত;এর মর্মমূলে যে আধ্যাত্মিক তরঙ্গভিঘাত রয়েছে তা উৎঘটনের চেষ্টা খুব সামান্যই করেছেন, অর্থাৎ লুইসের মতে শিল্পকলার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সেইসব রূপ ও আঙ্গিকের মধ্যে ছিলে সংকীর্ণভাবে সীমাবদ্ধ, যেগুলোর মাধ্যমে আর্ট লাভ করা অভিব্যক্তি।

লুইস তাঁর যৌবনোচ্ছল বিভ্রান্তির দিনগুলোতে ইউরোপে নবীন মনোবিকেলন শাস্ত্রের যে-সব সিদ্ধান্ত নিয়ে মেতে উঠেছিলো তার সঙ্গে পরিচিতি হয়েও তিনি তাতে তৃপ্তি পেলেন না-পেলেন না তার জিজ্ঞাসার জবাব, যদিও তখন মনোবিকোলন তত্ত্ব দেখা ‍দিয়েছিলো একটা প্রথম শ্রেণী বিপ্লবরূপে। মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে নির্জ্ঞান মনের কামনা-বাসনার যে ভুমিকা রয়েছে তার আবিষ্কার গভীরতর আত্মেপলদ্ধির পথ সন্দেহতীতভাবে মুক্ত করে দিয়েছে-তরূণ লিওপোন্ড লুইসের এই বিশ্বাস বেশীদিন স্থায়ী হলো না। তাঁর কাছে ফ্রয়েডীয় চিন্তাধারার উদ্দীপনা ছিলো মদের মাদকতার মতোই তীব্র। ভিয়েনার ক্যাফেগুলোতে তিনি তন্ময় হয়ে শুনেছেন মনোবিকোলন তত্ত্বের শুরুর দিকের কয়েকজন পথিকৃত-আলেফ্রেড এডলার, হার্মান ষ্টিকেল এবং অটোগ্রোস প্রমুখ পন্ডিতদের নিজেদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ তর্ক-বিতর্ক, কিন্তু লুইস এই নতুন বিজ্ঞানের বুদ্ধিগত ঔদ্ধত্যে বিচলিত হয়েছেন। কারণ তাঁর মতে, “এ বিজ্ঞান মানুষের আত্মার সকল রহস্যকে কতগুলো স্নায়বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত করতে চায়।” তিনি উপলদ্ধি করলেন পরম সত্যগুলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর ক্ষমতাও এই নতুন শাস্ত্রের সিদ্ধান্তগুলোতে নেই। তাছাড়া, মহৎ ও উন্নত জীবনের দিকে কোন নতুন পথের নির্দেশও তিনি এতে পেলেন না। মহাযুদ্ধের পর পর সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত মূল্যগুলোর ব্যাপক ভাঙন শুরু হলো, সেই ভাঙনের ধারায় নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান অনেক বাধা-নিষেধও শিথিল হয়ে পড়লো। এ ছিলো একটি অবস্থা থেকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আর একটি অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হওয়া, যেখানে সবাকিছু হয়ে পড়েছিলো বিতর্কের বিষয়, অর্থাৎ অবস্থাটা এই দাঁড়ালোঃ কান পর্যন্ত মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উর্ধ্বভিসারী অগ্রগতিতে মানুষের যে বিশ্বাস ও আস্থা ছিলো তা থেকে মানুষ নিক্ষিপ্ত হলো স্পেসলারের তিক্ত নৈরাশ্যের দিকে, নীটশের নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ ও মনোবিকলন সৃষ্ট আধ্যাত্মিক শূন্যতার মধ্যে। শরীরের যুক্তি অভিলাসী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হলো নির্বিচার আপতিক, অবাধ। লিওপোন্ড লুইসের মনে হতো এ আর কিছুই নয়, ফাকা প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাঁর মনে হলো একজন পুরুষ থেকে আর একজন পুরুষকে যে ভয়ংকর নিঃসঙ্গতা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে হয়তো তার দূর হতে পারে এটি নারী ও পুরুষের মিলনে। এই মানসিক চাঞ্চল্য ও অস্থিরতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হলো না। তাঁর আব্বা তাঁকে পন্ডিত,পি,এইচ,ডি বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর পিতার অমতে বেছে নিলেন সাংবাদিক জীবন-তিনি লেখক হবেন এবং লেখাই হবে তার পেশা। ভিয়েনা থেকে তিনি পৌঁছলেন প্রাগে-যেখানে তিনি একটি পুরানো ক্যাফে, দ্য ওয়েষ্টেনসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক ঐন্দ্রজালিক চক্রের সঙ্গে পরিচিত হলেন। কিছুদিন পর তাঁর পিতা খবর পেয়ে চিঠি লিখলেন, ‘‘আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ‍তুমি এক ভবঘুরে বাউন্ডলে হিসাবে মরে পড়ে রয়েছ রাস্তার পাশে নর্দমায়।” প্রবল আত্মবিশ্বাসী জেদী তরুণ লুইস জবাব দিলেন-“না ”। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি লেখক হতে চান; তাঁর এই বিশ্বাস জন্মেছিলেন-তাঁর জন্য সাহিত্যিকদের জগত অপেক্ষা করছে সাগ্রহে, দরাজ দু’হাত বাড়িয়ে।

কিন্তু সেদিনে মশহুর কোন সংবাদপত্রে প্রবেশাধিকার ছিলো কঠিন ব্যাপার। বার্লিনের রাস্তায় রাস্তায় দিনের পর দিন পায়াচারী করেছেন, সাবওয়ে বা ট্যাক্সির ভাড়া নেই্। বহু সপ্তাহ তিনি কাটালেন, কেবল চা এবং বাড়ীওয়ালী সকালে যে দু’টি পাউরুটীর টুকরা দিতেন তা খেয়ে। তাঁর তখনকার এই দিনগুলোর নিয়তি ছিলো নির্জলা উপবাস। আর তাঁর রাতের স্বপ্ন ঠাসা থাকতো সতেজ আর মাখন মাখানে পুরু রুটির টুকরায়।

এই চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে এক চলচ্চিত্র প্রযোজকের সহকারী হিসাবে কাজ করে এবং পরে তাঁর ভিয়েনিজ বন্ধু এস্তোন কুহের জন্যে ফিল্মের সিনারিও লিখে দিয়ে এবং পরে আরে একটি সিনারিও লিখে কিছু অর্থ উপার্জন করে কিছুদিন কাটালেন। এরপর আরে একটি বছর মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নানারকম অস্থায়ী কাজ করে শেষ পর্যন্ত তিন প্রবেশ করলেন খবরের কাগজের জগতে ১৯২১ সনে। জার্মান ক্যাথোলিক সেন্টার পার্টির বিত্তশালী সদস্য ডর ডেমার্ট, জার্মান রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ত্ব যিনি ইউনাইটেড প্রেস অব আমেররিকান সহযোগিতায় ইউনাইটেড টেলিগ্রাফ নামে একটি বার্তা সংস্থা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। তাঁরই প্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসাবে কাজ করারা আবেদন জানিয়ে পেলেন টেলিফোনিষ্টের কাজ। তাঁর উচ্চাকাংখার জন্য এ ছিলো একটি অতি অবসানজনক কাজ। কিন্তু কাজটি গ্রহণ না করে লুইসের উপায় ছিল না। এভাবে একমাস কাজ করার পর তিনি গোপনে বার্লিনে আগম মাদাম ম্যাক্সিম গোর্কী, যিনি ১৯২১-এর রাশিয়ার চরম দুর্ভিক্ষের সময় এখানে এসেছিলেন মধ্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে কার্যকরি ত্রাণ ও সাহায্যের জন্য জনমত গঠন করতে। তাঁরই সঙ্গে এক সাক্ষাতকার ঘটিয়ে টেলিফেনিষ্ট লিওপোন্ড লুইস হয়ে পড়লেন এক রিপোর্টার। তিনি হলেন সাংবাদিক।

লিওপোন্ড লুইস তখন ২২ বছরের উত্তার তরুণ। সমাজ বদলে দেবার, সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার বাসনায় লুইস এবং তাঁর বয়সী তুরুণেরা তখন অস্থির। সমাজকে কিভাবে গঠন করা উচিত যাতে করে মানুষ যাথার্থ এবং পরিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে। কিভাবে বিন্যাস্ত হওয়া উচিত তাদের সম্পর্ক যাতে করে যে একাকীত্ব ও নিঃঙ্গতা প্রত্যেকটি মানুষকে ঘিরে রেখেছে  ভেঙ্গে–চুরে সকলে বেরিয়ে আসতে পারে এবং সত্যিকার পারস্পরিকক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মধ্যে কাটাতে পারে পারে জীবন? ভাল কি, মন্দ কি, ভাগ্য কি, কিংবা ভিন্নভাবে বলতে গেলে মানুষের কি করা উচিত যাতে করে সে যথার্থ অর্থে কেবল মুখে নয় তার জীবনের সাথে এক ও অভিন্ন হতে পারে এবং বলতে পারে আমি এবং আমার অদৃষ্ট আলাদা নয়-একই!

সর্বত্র যখন নৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার আবহাওয়া প্রবল তাই জন্ম দিয়েছিলো বেপরোয়া আশাবাদের। আর তার প্রকাশ ঘটেছিলে একদিকে, -তাঁর সে সময়কার সঙ্গীতে, চিত্রকলা ও নাটকে দুঃসাহসিক পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে, অন্যদিকে সংস্কৃতির কাঠামোও রূপরেখার সম্পর্কে অন্ধভাবে হাতড়ানোতে প্রায়শ বৈপ্লবিক অনুসন্ধানে রত ছিল। কিন্তু এই জোর করে বাঁচিয়ে রাখা আশাবাদের পাশাপাশিই তখন চলছে একটি আধ্যাত্মিক শূন্যতা। একটা অস্পষ্ট উন্নাসিক আপেক্ষিকতাবাদ ক্রমবর্ধমান এক নৈরাশ্যবাদের মধ্যে যার জন্ম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উচ্চগ্রামে বাঁধা ভাবাবেগ পীড়িত অসন্তুষ্ট উত্তেজিত ইউরোপীয় জগতে কিছুই আর চলছিলোনা আগের মত স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খলভাবে। লুইসের চেখে ধরা পড়লো পশ্চিমা জগতের আসল মাবুদ আর আধ্যাত্মিক কিছু নয়। এর একমাত্র উপাস্য হচ্ছে কমফোর্ট, আরাম-আয়াস-গড়পড়তায় একজন ইউরোপীয়, সে গণতন্ত্রী কমিউনিষ্ট, মজুদুর বুদ্ধিজীবি যেই হউক তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ বিশ্বাস ছিলো একটি বৈষয়িক উন্নতির পূজা, কারণ জীবনকে ক্রমাগত সহজতর করে তোলা ছাড়া জীবনের আর কোন লক্ষ্য থাকতে পারে না। সম্প্রতিক ভাষায় প্রকৃতির কবল থেকে মানুষকে আজাদ করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই নতুন ধর্মের মন্দির হচ্ছে বিশাল কলকারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক গবেষণাগার, নৃত্যশালা, প্রাণিবিদ্যা সংস্থাসমূহ। আর এ ধরণের মন্দিরের পুরোতঠাকুর হচ্ছে ব্যাংকার, ইঞ্জিনায়ার, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকা, পরিসংখ্যানবিদ, শিক্ষা পরিচালক, রেকর্ড স্রষ্টা, বৈমানিক এবং কমিসারেরা। ভালো এবং মন্দের ধারণার ক্ষেত্রে সার্বিক মতানৈক্য এবং সকল সমাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের সুবিধাবাদের আশ্রয় গ্রহণ-এর মধ্যে ঘটলো নৈতিক ব্যর্থতার প্রকাশ-সেই সুবিধাবাধিতার যা রাস্তার বীরঙ্গনার সাথে তুলনীয়, যে বীরঙ্গনা যখনই এবং যারাই বাঞ্ছিতা হয় তখনই তার কাছে দেহ দান করে। সেই বয়সেই লুইস দেখতে পেলেন ক্ষমতা এবং সুখের অতৃপ্ত লালসাই পাশ্চত্য জগতকে অনিবার্যভাবেই পরস্পরভিরোধী বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রেখেছে। যে দলগুলোর প্রত্যেকেই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং যখনই সেখানে তাদের পারস্পরিক স্বার্থে আঘাত লাঘছে, তারা একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তখন ন্যায়-অন্যায়ের সর্বোচ্চ মাপকাঠিই ছিলের বাস্তব উপযোগিতা, জাগতিক, সাফল্য। লুইসের সেই সময়কার অবস্থা , লুইসের ভাষায় “ আমি দেখতে পেলাম জীবন কতো অসুখী এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগ কত সামান্য। যদিও সমাজ ও জাতির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে কান ফাটানো উন্মত্ত চিৎকারের সঙ্গে। আমরা আমাদের সহজাত অনুভূতির দুনিয়া থেকে কত দূরে সরে পড়েছি। আর আমদের আত্মা কতো সংকীর্ণ এবং দীপ্ত হয়ে উঠেছে। তখন আমাদের সকল চিন্তার আদি এবং অন্ত ছিলো ইউরোপ।”

লুইস বলেন, ‘‘কিন্তু আমার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের কিংবা তাদের মধ্যকার কোন দলের বিভিন্নমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আশা-আকাংখায় শারিক হতে আমার অক্ষমতা কালক্রমে আমার মধ্যে এই অস্পষ্ট ধারণার রূপ নেয় যে, আমি ঠিক ওদের কেউ নই, ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই এবং তারই সঙ্গে আমর এ বাসনা জন্মাল যে আমাকে কারো অঙ্গীভূত হতেই হবে-তবে কার? কোন কিছুর অংশ হতে হবেই –তবে কিসের’’ বুকভরা এই আকুতি ও অস্থিরতা নিয়েই  তিনি ১৯২২ সনে তাঁর মাথা কোরআনের আহবানে ২২ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন আরক মূলক জেরুযালেমে। দীর্ঘদিন আরবদের সঙ্গে মেলামেশা করে তিনি পেলেন সেই জবাব। –তিনি কার অঙ্গীভূত হবেন, কিসের অংশ হবেন। ফ্রাংকফুর্টার শাইটুম নামক এক জগত বিখ্যাত কাগজের সংবাদদাতা হয়ে তিনি আসেন জেরুজালেম এবং কয়েক বছর পর করেন, ফিলিস্তীন, ট্রান্সজর্ডান, ইরাক, পারস্য, আফগানিস্থান। জেরুযালেমে অবস্থানকালে, তিনি প্রথম ইসলামের সংস্পর্শে আসেন এবং আরবদের জীবন পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আরবদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশার পর তিনি আবিষ্কার করলেন, ট্রাডিশনাল মুসলিম সমাজের মধ্যে রয়েছে মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সঙ্গতি, -যা ইউরোপ হারিয়ে বসেছে। তিনি তাদের মধ্যে আকিষ্কার করলেন হৃদয়ের নিশ্চয়তা এবং আত্ম-অবিশ্বাস থেকে ‍মুক্তি, যে মুক্তি ইউরোপীয়দের স্বপ্নের অগোচর। তিনি কিসের অংশ হবেন, অবশেষে সেই জিজ্ঞাসার জবাব পেলেন লিওপোন্ড লুইস এবং ১৯২৬ সনে ইউরোপ ফিরে তিনি সস্ত্রীক কবুল করলেন ইসলাম। তাঁর মুসলিম নাম হলো মুহাম্মদ আসাদ। আসাদের আত্মকথা ‘মক্কার পথ’ গ্রন্থ তাঁর এই ইসলাম কবুল কে বলা হয়েছে ‘স্বগৃহ প্রর্ত্যাবর্তন’। ইসলামের দীক্ষিত হবার পর আসাদ প্রায় ৬ বছর আরব দেশে বাস করেন, আরব জীবন ও ভাষার সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয়। তিনি বাদশা ইবনে সউদের অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেন। এরপর তিনি আরব দেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং মহান মুসলিম কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবালের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁরই পরামর্শে আসাদ তাঁর পূর্ব তুর্কীস্তান, চীন এবং ইন্দোনেশিয়া সফরের পরিকল্পনা ত্যাগ করেন, ইসলামী রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্যে তিনি ভারতে থেকে যান। ইসলামী রাষ্ট্র তখন এক স্বাপ্নিক কবির স্বপ্ন বিহবল মনের স্বপ্ন মাত্র ছিলো। ‍মুহাম্মদ আসাদের ভাষায় “আমার কাছে ইকবালের মতই স্বপ্ন ছিলো-ইসলামের সমস্ত ঘুমন্ত আত্মাকে পুনর্জীবিত করে তোলার একটি পথের –বস্তুত একমাত্র পথের পথিকঃ একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সত্তা সৃষ্টি, যার সংহতির ভিত্তি একই রক্ত-মাংস নয়, বরং এটি আদর্শের প্রতি সাধারণ আনুগত্য। বহু বছর আমি নিজেকে নিবেদিত রাখি এই লক্ষ্যে অধ্যয়ন, রচনা ও বক্তৃতায় এবং কালে ইসলামী আইনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে কিছুটা খ্যাতি অর্জন করি।” কিন্তু এই অর্জন কিছুটা নয়, আসলে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে এই রাষ্ট্রের সরকার ইসলামী পুনর্গঠন বিভাগ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এবং পরিচালনার জন্য মুহাম্মদ আসাদকে আহবান করে,-এর লক্ষ্য রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে আদর্শগত ইসলামী ধ্যান-ধারণাগুলোকে বিশদভাবে তুলে ধরা, যার উপর নবজাত রাজনৈতিক সংগঠনটি তার আদর্শিক দিক-নির্দেশনার জন্য নির্ভর করতে পারে। মুহাম্মদ আসাদ দু’বছর এই অতিশয় উদ্দীপনাপূর্ণ কাজটি চালিয়ে যাবার পর পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরে তিনি হন মধ্যপ্রাচ্য ভিভিশনের প্রধান। ইহুদীবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তীনিদের পক্ষে পাকিস্তান জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে যে যুক্তি ও তথ্যের লড়াই সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করে তার সমর্থনে সকল ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিল প্রমাণাদি সরবরাহ করেন মুহাম্মদ আসাদ। পররাষ্ট্র দপ্তরে তিনি আত্মনিয়োগ করেন, পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত করে তোলার জন্য। এই সময়ে মুহাম্মদ আসাদ নিযুক্ত হলেন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানী মিশনে মিনিষ্টার প্লেনিপোটেনশিয়ার হিসেবে। পরে ১৯৫২ সালের শেষেরদিকে তিনি এই পদে ইস্তাফা দিয়ে তাঁর অমর ‘‘The Road To Mecca’’গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়েগে করেন।

কাহিনীর কাহিনী

আমি এ বইয়ের যে কাহিনী বলতে যাচ্ছি তা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ভূমিকার জন্য বিশিষ্ট কোনো মানুষের আত্মকাহিনী নয়;এটি দুঃসাহসিক অভিযানের বর্ণনামূলক কোনো কাহিনীও নয়-কারণ আমার জীবনে বহু বিস্ময়কর এ্যাডভেঞ্চার ঘটে থাকলেও সেগুলি আমার ভেতরে যা ঘটে চলছিল তারই অনুষাঙ্গিক মাত্র, তার বেশি কখনো ছিলো না, ধর্ম-বিশ্বাস অনুসন্ধানে সচেতন প্রয়াসের কাহিনীও এ নয়-কারণ সে বিশ্বাস বহু বছরে আমার জীবনে এসেছে, আমার পক্ষ থেকে তা অর্জনের কোনো চেষ্টা ছাড়াই। আামার কাহিনী হচ্ছে-একজন ইউরোপীয়’র ইসলাম আবিষ্কার এবং মুসলিম সমাজের মধ্যে তার মিশে যাওয়ার সাদামাঠা কথা।

আমি কখনো এ বই লেখার কথা ভাবিনি। কারণ আমার কখনো মনে হয়নি, আমার জীবন আমি নিজে ছাড়া অন্য কারো কাছে বিশেষ কোনো আকর্ষনের কারণ হতে পারে। কিন্তু যখন পাশ্চাত্য জগত থেকে পঁশিচ বছর বাইরে কাটানোর পর আমি প্যারিসে এলাম এবং সেখান থেকে এলাম নিউইয়র্ক ১৯৫২ সালের শুরুর দিকে, তখন আমি আমার এ মত পাল্টাতে বাধ্য হই। আমি তখন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানের পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে কাজ করছিলাম বলে স্বভাবতই সকলের চোখ ছিলো আমার উপর; আমার ইউরোপীয় ও মার্কিন বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনের মধ্যে আমি বিপুল ঔৎসুক্যের কারণ হয়ে উঠি। প্রথমে ওদের মনে হয়েছিলো আমার কাজ হচ্ছে একজন ইউরোপীয় ‘বিশেষজ্ঞের’, যাকে প্রচ্যে দেশের একটি সরকার একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়োগ করেছে, আর আমি যে জাতির চাকরি করছি তাদের চালচলনের সঙ্গে আমার সুবিধার খাতিরেই মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে আমার কার্যকলাপ যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো,আমি কেবল ‘কাজের দিকে’ দিয়েই নয়, বরং আবেগ-অনুভূতি এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়েও সাধারণভাবে মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক এবং তামুদ্দিনক লক্ষ্যের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছি তখন ওরা কিছুটা বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে পড়ে। যতই দিন যেতে লাগলো, ক্রমবর্ধমান হারে বেশি বেশি লোক জিজ্ঞাসা করতে লাগলো আমার অতীত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে। ওরা জানতে পেলো, আমি আমার জীবনের একেবারে প্রথমদিকে কাজ শুরু করেছিলাম কন্টিনেন্টাল পত্র-পত্রিকাগুলির এক বৈদেশিক সংবাদদাতা হিসাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র কয়েক বছর ব্যাপক সফরের পর আমি ১৯২৬ সালে মুসলমান হই; ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর প্রায় ছ’বছর আমি আরব দেশে বাস করি এবং বাদশাহ ইবনে সউদের বন্ধত্ব লাভে সমর্থ হই; এরপর আমি আরব দেশ ছেড়ে যাই ভারতে, আর সেখানে আমার সাক্ষাৎ ঘটে পাকিস্তান চিন্তার আধ্যিাত্মিক জনক –এবং মহান মুসলিম কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের সংগে। তিনিই আমাকে অল্প সময়ের মধ্যে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজী করান। আমার পূর্ব তুর্কিস্তান, চীন এবং ইন্দোনেশিয়া সফরের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে এবং ভাবী ইসলামী রাষ্ট্র, যা তখনো ইকবালের স্বাপ্নিক মনের স্বপ্নের বেশি কিছু ছিলো না, তার বুদ্ধিবৃত্তিক সূত্রগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য ভারতে থেকে যেতে। আমার কাছে, ইকবালের মতোই এ স্বপ্ন ছিলো ইসলামের সমস্ত ঘুমন্ত আশাকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার একটি পথের, বস্তুত, একমাত্র পথের প্রতীকঃ একটি জনগোষ্ঠীর একটি রাজনৈতিক সত্তার সৃষ্টি, যার সংহতির  ভিত্তি একই রক্ত-বংশ নয়, বরং একটি আদর্শের প্রতি সাধারণ আনুগত্য। বহু বছর আমি নিজেকে নিবেদিত রাখি এই লক্ষ্যে অধ্যয়ন, রচনা ও বক্তৃতায় এবং কালক্রমে ইসলামী আইন ও তমুদ্দনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে আমি বেশ কিছুটা খ্যাতি অর্জন করি। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত হলো, আমাকে তখন ঐ রাষ্ট্রের সরকার ‘ইসলামী পুনর্গঠন বিভাগ’ নামক একটি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা এবং পরিচালনার জন্য আহবান করলেন; এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে আদর্শগত ইসলামী ধ্যান-ধারণাগুলিকে বিশদভাবে তুলে ধরা, যার উপর নবজাত রাজনৈতিক সংগঠনটি তার আদর্শিক দিক-নির্দেশের জন্য নির্ভর করতে পারে। দু’বছর ধরে এই অত্যন্ত উদ্দীপনাময় কাজটি চালিায়ে যাওয়ার পরি আমি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরে আমাকে মধ্যপ্রাচ্য ডিভিশনের প্রধান ‍নিযুক্ত করা হয়। এখানে আমি পাকিস্তান এবং অবশিষ্ট মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বন্ধন ও সম্পর্ক মজবুত করে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করি; আর এ সময়েই একদা আমি নিউইয়র্কে জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠনে পাকিস্তানী মিশনে নিযুক্ত হই।

এ সবই একজন ইউরেপীয় যে-মুসলিম সমাজের মধ্যে ঘটনা ক্রমে বাস করছে তার সংগে নিছক বাহ্যিক খাপ খাইয়ে নেয়ার চাইতে অনেক বেশী গভীরতরো কিছুর দিকে ইংগিত করেঃ বরং এতে করে একটি সাংস্কৃতিক পরিবারের প্রতি আনুগত্য সজ্ঞানে সর্বান্তকরনে প্রত্যাহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা বোঝায়। আমার বহু পাশ্চাত্য বন্ধুর কাছে এটা খু্বই বিস্ময়কর ঠেকে। তারা তাদের মনে এই চিত্র আনতে সক্ষম হলো না-যে মানুষ জন্মেছে পাশ্চাত্য জগতে এবং সেখানে বড় হয়েছে ও শিক্ষা-দীক্ষা পেয়েছে সে কেমন করে এমন সম্পূর্ণভাবে এবং বাহ্যত, মনে কোন কিছু চেপে না রেখে  মুসলিম জগতের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছে; তার পক্ষে কী করে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বদলে সম্ভব হলো ইসলামী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গ্রহণ, এবং কী সেই জিনিস যা তাকে বাধ্য করেছে অমন একটি ধর্মীয়-সামাজিক আদর্শ গ্রহণ করতে, যা আমার মনে হয়, সকল ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণা থেকেই অতি ব্যাপকভাবে নিকৃষ্টতরো বলে ওরা স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে ধরে নিয়েছে।

কিন্তু কেন, আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলাম, আমার পাশ্চাত্য বন্ধুরা এ বিষয়টিকে এমন একটা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছে? ওরা কি কখনো সত্যি সত্যি সরাসরি ইসলামের মর্মে পৌছানোর চেষ্টা করার প্রয়োজন বোধ করেছে? অথবা ওদের মতামতের ভিত্তি কি পূর্ববর্তী পুরুষ পরস্পরায় পাওয়া বিকৃত ধ্যান-ধারণ এবং কতিপয় ধরাবাধাঁ বুলি? হতে পারে কি যে সনাতন গ্রীক ও রোমান চিন্তা –পদ্ধতি পৃথিবীকে একদিকে গ্রীক ও রোমান এবং অন্যদিকে বারব্যরিয়ান্স তথা বর্বর জাতিপুঞ্জ, এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলো তা পাশ্চাত্য মানসে আজো এতো পরিপূর্ণভাবে মিশে আছে যে তার নিজের সাংস্কৃতিক কক্ষপথের বাইরে যা কিছু পড়ে তার কোন স্পষ্ট নির্দিষ্ট মূল্য আছে বলে তত্ত্বগতভাবেও সে স্বীকার করতে অক্ষম?

গ্রীক এবং রোমানদের আমল থেকে, ইউরোপীয় চিন্তাবিদ এবং ঐতিহাসিকেরা ইউরোপীয় ইতিহাস ও কেবল পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং অর্থেই পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা করতে উন্নুখ ও ইচ্ছুক। এ চিত্রে অপাশ্চাত্য সভ্যতাগুলি কেবল তখনি প্রবেশ করে যখন ওদের অস্তিত্ব অথবা ওদের মধ্যে থেকে উত্থিত বিশেষ বিশেষ আন্দোলন পাশ্চাত্য মানুষের ভাগ্যের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে বা করে থাকে; আর এ কারনে, পাশ্চত্যবাসীর দৃষ্টিতে পৃথিবীর ইতিহাস এবং তার বিভিন্ন সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত একটা সম্প্রসারিত পাশ্চত্য ইতিহাসের বেশি নয়!

স্বভাবতই এ ধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ একটি বিকৃত পরিপ্রেক্ষিতের জন্ম দিয়ে থকে। পাশ্চাত্যের মানুষ যেহেতু সেই সব লেখার সাথেই পরিচিতি যা তার নিজের সংস্কৃতিকে চিত্রিত করে অথবা নিজের সভ্যতার সমস্যাগুলি আলোচনা করে তার খুঁটিনাটি সমেত এবং উজ্জ্বল রঙে, আর বাকি বিশ্বের প্রতি এখানে-ওখানে ঘাড় বাঁকিয়ে মাঝে মাঝে তাকানোর বেশি কিছু করে না; এজন্য গড়পড়তা একজন ইউরোপীয় অথবা আমেরিকান সহজেই এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হ’য়ে পড়ে যে, পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বাকি বিশ্বের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার চাইতে কেবল উৎকৃষ্টতরোই নয়, বরং আয়তনেও এতো বিপুল যে, দু’য়ের  মধ্যে কোন তুলনাই  হয় না; আর এ কারণে, পাশ্চত্য জীবন পদ্ধতি হচ্ছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য আদর্শ যার মনদন্ডেই কেবল অন্যান্য জীবন-পদ্ধতিকে বিচার করা যেতে পারে। এর দ্বারা অবশ্য এ কথাই বোঝানো হয় যে, যে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্যান-ধারণা, সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা নৈতিক মূল্যায়ন, যা এই পাশ্চাত্য আদর্শ বা নমুনার সংগে মিলে না, তা বস্তুতই একিট নিম্মস্তরের জীবনের বস্তু। গ্রীক এবং রোমানদের পায়ের চিহ্ণ অনুসরণ করে পাশ্চাত্য জগত ভাবতে পছন্দ করে যে, ঐসব ভিন্ন সভ্যতা, এককালে যা বিদ্যমান ছিলো বা বর্তমানে আছে সে সবই প্রগতির যে-পথ পাশ্চাত্য অভ্রান্তভাবে অনুসরণ করে চলেছে সে পথে প্রতিবন্ধকস্বরূপ কতকগুলি পরীক্ষণ –নিরীক্ষণ মাত্র;অথবা, বড় জোর একথা বলা যায় (যেমন জনক সভ্যতাগুলির ক্ষেত্রে, যা সরাসরিভাবে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার পূর্বে বিকাশ লাভ করেছিলো একই রেখায়) এগুলি একই পুস্তকের পরপর কয়েকটি অধ্যায় মাত্র-অবশ্যই সভ্যতা হচ্ছে এর শেষ অধ্যায়।

আমি যখন আমার এই মতের কথা আমার কোন এক মার্কিন বন্ধুর নিকট ব্যক্ত করি-বন্ধুটি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে বেশ কৃতিত্বের অধিকারী এবং মানসিক প্রবণতার দিক দিয়ে তাঁকে পন্ডিত বলা যায়-তিনি প্রথমে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন।

‘মেনে নিলাম’, তিনি বললেন, ‘প্রচীন গ্রীক এবং রোমকরা বিদেশী সভ্যতার বিচার করতে গিয়ে সীমিত দৃষ্টিভংগির পরিচয় দিয়েছিলো; কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা কি ওদের এবং বাকি দুনিয়ার মধ্যে যোগাযোগের অসুবিধারই অনিবার্য ফল নয়? আর এই অসুবিধা কি আধুনিককালে অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা যায়নি? যা-ই হোক, আমরা, পাশ্চাত্যবাসীরা আজকাল আমাদের আপন সাংস্কৃতিক কক্ষপথের বাইরেও যা ঘটছে তার সংগে অবশ্যই নিজেদেরকে সম্পর্কিত রাখি । গত সিকি শতকে প্রাচ্য শিল্পকলা ও দর্শন সম্পর্কে এবং প্রাচ্যের বিভিন্ন জাতির মনকে যেসব রাজনৈতি চিন্তাধারা করে আছে সেসব বিষয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে যে বহু সংখ্যক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে আপনি কি সেগুলির কথা ভুলে যাচ্ছেন না? অন্যান্য সংস্কৃতির কী দেবার থাকতে পারে তা বোঝার জন্য পাশ্চাত্যবাসীর এ আকাংখাকে উপেক্ষা করা নিশ্চয় সুবিচার হবে না!’

‘হয়তো আপনার কথা কিছুটা সত্য’, আমি জবাব দিই, ‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সেই আদি গ্রীক-রোমক দৃষ্টিভংগি আজকাল আর সম্পূর্ণ সক্রিয় নয়। এর কঠোরতা তার ধার উল্লেখযোগ্যভাবে হারিয়ে ফেলেছে, অন্য কোন কারণে নয়, কেবল এ কারণে যে, পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের মধ্যে যাঁরা অধিকতরো পরিণতি চিন্তাশক্তির অধিকারী তাঁরা তাদের নিজেদের সভ্যতার বহু দিক সম্পর্কেই হতাশ এবং সন্ধিগ্ধ হয়ে উঠেছেন। ওঁদের কারো কারো মনে এই উপলদ্ধির সূচনা হতে শুরু করেছে যে, মানব প্রগতির কেবল একটিমাত্র কিতাব এবং একটিমাত্র কাহিনী না-ও থাকতে পারে, বরং বহু কিতাব এবং বহু কহিনী থাকা সম্ভবঃ আর এর কারণ কেবল এই যে, ঐতিহাসিক অর্থে মানবজাতি একটি সমজাতীয় সত্তা নয়, বরং বিভিন্ন গ্রুপের এক বিচিত্র সমবায়, যাদের মধ্যে মানব জীবনের অর্থ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে অনেক দূর ব্যবধানের ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারা রয়েছে। তবু আমি মনে করি না যে, পাশ্চাত্য জগত গ্রীক ও রোমকদের চাইতে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি কৃপাশীল পৃষ্ঠপোষকের মনোভাব সত্যি কম পোষণ করতে শুরু করেছেঃ বলা যায়, পাশ্চাত্য কেবল অধিকতর সহনশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু মনে রাখবেন-এ সহনশীলতা ইসলামের প্রতি নয়-কেবল কতকগুলি নির্দিষ্ট প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতি যা পাশ্চাত্যের অধ্যাত্ম ক্ষুধায় পীড়িত মানুষের জ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আকর্ষণ যোগায় এবং একই সাথে তা পাশ্চাত্য বিশ্বদৃষ্টি থেকে অতো বেশি দূরের যে, এর মূল্যগুলির বিরুদ্ধে কোন সত্যিকার চ্যালেঞ্জ বলে তা গন্য হয় না।’

‘আপনি এর দ্বারা কি বোঝাতে চান?’

‘দেখুন’, আমি জবাব দিই, ‘যখন একজন প্রতীচ্যবাসী, ধরা যাক, হিন্দু ধর্ম অথবা বৌদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করে তখন সে ব্যতিক্রমহীনোভাবেই এ –সব মতবাদ ও তার নিজের মতবাদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কে সতর্ক থকে। এ –সব মতবাদের এটা-ওটা তার প্রশংসা পেতে পর, কিন্তু স্বভাবতই সে কখনো তার নিজের ভাবধারার বদলে এগুলি গ্রহণ করার সম্ভাবনা বিবেচনা করে দেখতে রাজী হবে না। যেহেতু সে পূর্ব থেকেই এ অসম্ভব্যতা স্বীকার করে নেয় সে কারনে এসব বিজাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে মানসিক স্থৈর্য এবং প্রায়ই সহানুভূতিপূর্ণ  সমঝদারের মনোভাব নিয়ে সে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। কিন্তু ইসলামের প্রসংগ যখন আসে, যা হিন্দু অথবা বৌদ্ধ দর্শনের মতো পাশ্চাত্য মূ্ল্যগুলির মোটেই ততটা বিরোধী নয়, তখন এ পাশ্চাত্য মানসিক স্থৈর্য প্রায় সব-সময় এবং অনিবার্যভাবেই আবেগাত্মক পক্ষপাত দ্বারা বিচলিত হয়ে পড়ে। এর কারণ কি সম্ভবত এই যে, মাঝে মাঝে আমি সবিস্ময়ে ভাবি, ইসলামী মূল্যবোধগুলি পাশ্চাত্য মূল্যবোধের খুব কাছাকাছি বলেই তা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের বহু পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার প্রতি প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ বিশেষ?

এবং আমি তাঁকে আমার একটা থিওরীর কথা বলতে আরম্ভ করি, যা আমার চিন্তায় এসেছিল কয়েক বছর আগে; এটি এমন এক থিওরী, যা আমার মতে, পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সমসাময়িক চিন্তাধারায় ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায়ই যে গভীর মূল বিদ্বেষ দেখতে পাওয়া যায় তা স্পষ্টতরোভাবে বোঝার সহায়কও হতে পারে।

‘এই বিদ্বেষের একটা সত্যিকার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পেতে হলে’, আমি বললাম, ‘আপনাকে তাকাতে হবে অনেক পেছনদিকে, ইতিহাসের অভ্যন্তরে-এবং পাশ্চাত্য ও মুসলিম জগতের মধ্যকার প্রথমদিকের সম্পর্কগুলির মনস্তাত্ত্বিক পটভূমিকা বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। পাশ্চাত্যের লোকেরা আজকের দিনে ইসলাম সম্পর্কে যা চিন্তা এবং অনুভব করে তার শিকড় রয়েছে সেইসব গভীর প্রভাবের চাপ এবং স্মৃতির ছাপের মধ্যে যা জন্ম নিয়েছিলো ক্রসেডের সময়’।

‘ক্রসেড!’ আমার বন্ধু বিস্মিত কন্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আপনি নিশ্চয় বলতে চান না যে প্রায় হাজার বছর আগে যা ঘটেছিলো তা এখনো, এই বিশ শতকের লোকের উপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে?’

‘কিন্তু তা অবশ্যই করে থাকে। আমি জানি, এ অবিশ্বাস্য শোনাবে। কিন্তু আপনার কি স্মরণ নেই মনোবিকলনকারীদের প্রথমদিকের আবিস্ক্রিয়াগুলিকে কী অবিশ্বসের সংগে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিলো, যখন ওঁরা প্রমাণ করবার চেষ্টা করছিলেন একটা বয়স্ক মানুষের আবেগময় দিকের বহুলাংশেরই –এবং ইডিওসিনক্রেসিস বা ‘বিশেষ মেজাজ-মর্জি’ শব্দটিতে যেসব আপাত অহেতুক প্রবণতা, রুচি ও সংস্ককার নিহিত রয়েছে তার ও প্রায় সবটারিই –উৎস খুঁজে পাওয়া  যেতে পারে তা শৈশবের প্রথমদিকের, তার বয়সের সবচাইতে ফর্মেটিভ সময়টির বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে? আচ্ছা, জাতি এবং সভ্যতা কি যৌথ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কিছু ? ওদের ক্রমবিকাশও ওদের শৈশবের প্রথমদিকের অভিজ্ঞাতর সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। শিশুদের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি ওদের শৈশবের এসব অভিজ্ঞতাও হয়তো আনন্দদায়ক ছিলো অথবা ছিলো পীড়াদায়ক;ঐসব অভিজ্ঞতা হতে পারে সম্পূর্ণ যুক্তিসম্পন্ন, অথবা বিপরীত পক্ষে, সেগুলি হতে পারে কোনো ঘটনার শিশুসুলভ সরল ভুল ব্যাখ্যার ফলঃ এ ধরনের প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতারই মন-মানস বদলে দেয়ার ক্ষমতা প্রধানত নির্ভর করে সেই অভিজ্ঞতার সূচনাকালীন তীব্রতার উপর। ক্রসেডের অব্যবহিত পূর্বের শতকটিকে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় সনের প্রথম হাজার বছরের সমাপ্তটিকালটিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার শৈশবের প্রথম দিক বলে সহজেই বর্ণনা করা যেতে পারে .. .. .

আমি আমার বন্ধুকে স্মরণ করিয়ে দিই-তিনি নিজেও একজন ইতিহাসবিদ-এ হচ্ছে সেই যুগ রোম সাম্রাজ্যেরে ভাঙনের পরবর্তী অন্ধকার শতাব্দীগুলির পর এই প্রথম ইউরোপ তার নিজস্ব সাংস্বৃতির পথ দেখতে পশুর করেছে। প্রায় বিস্মৃত রোমন ঐতিহ্যের-সাথে কোন সম্পর্ক না রেখেই ঠিক সেই মুহুর্তে ইউরোপের জনসাধারণের বিভিন্ন মাতৃভাষায় নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি শুরু  হয়েছেঃ যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে গথ, হূন এবং অভরদের স্থান হতে স্থানান্তরে বিচরনের ফলে যে মানসিক অবসাদ এসেছিলো, তা কাটিয়ে উঠে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টধর্মের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার প্রেরণায় চারুকলা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যুগের প্রথমদিকের অপরিণত অবস্থার মধ্য থকে জন্ম নিচ্ছিলো এক নতুন সাংস্কৃতিক জগত। ঠিক সেই সন্ধিক্ষনে, ক্রসেড থেকে তার আত্মবিকাশের সেই চরম নাজুক সংবেদময় মুহর্তটিতে পেলো তার জীবনের সবচেয়ে প্রচন্ড আঘাত-আধুনিক ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘ট্রওমা’ বা আবেগজনিত আঘাত, যা হয়ে উঠতে পারে মানসিক ব্যাধির হেতু.. .. .. .

ক্রসেডগুলি হচ্ছে এমন এক সভ্যতার উপর প্রচন্ড সমষ্টিগত চাপ, যা সবেমাত্র  আত্মসচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বলতে গেলে, ক্রুসেডের যুদ্ধগুলি হচ্ছে এটা সাংস্কৃতিক সংহতির আলোকে নিজেকে দেখার জন্য ইউরোপের প্রথমতম এবং সম্পূর্ণ সফল এক প্রয়াস। প্রথম ক্রসেড যে উৎসাহ –উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছেো তার আগে কিংবা পরে ইউরোপ আর এতমন কোন অভিজ্ঞতাই অর্জন করেনি, যা এর সাথে  তুলনীয় হতে পারে। ইউরোপ মাহদেশের উপর দিয়ে উন্মাদনার এক প্রবল ঢেউ বয়ে গেলো-এমন এক  আনন্দ-উল্লাস যা এই প্রথম বিভিন্ন রাষ্ট্র, গোত্র ও শ্রেণীর মধ্যকার সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে গেলো। এর আগে ছিলো ফ্রাঙ্ক, স্যাক্সন, জার্মান, বুর্গান্ডীয়, সিলিলীয়, নরম্যান এবং লুম্বার্ডেরা-বিভিন্ন গোত্র ও জাতের এক জগাখিচুড়ি, যাদের মধ্যে সাধারণ কিছু ছিলো না বললেই চলে, কেবল একটি বিষয় ছাড়াঃ ওদের প্রায় সবকটি সামন্ততন্ত্রী রাজ্য ও প্রদেশ ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, আর ওরা সকলেই ছিলো খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীঃ কিন্তু ক্রুসেডের যুদ্ধগুলিতে, এবং এসব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই ধর্মীয় বন্ধন উন্নীত হয় এক নতুন সমতলে, যা সকল ইউরোপীয়রই সাধারণ লক্ষ্যঃ ‘খ্রিষ্টান রাজ্যের’ রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় ধারণা। পরিণামে তা-ই জন্ম দেয় ইউরোপ –ভিত্তিক সাংস্কৃতিক চেতনার। ১০৯৫ সালের নভেম্বরে পোপ দ্বিতীয় আরবান তাঁর ক্লারমন্টের বিখ্যাত বক্তৃতায় যখন পবিত্র ভূমি দখল করে রাখা ‘পাষন্ড জাতির’ বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদরকে যুদ্ধের জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন তখনি তিনি সম্ভবত তাঁর নিজের অজান্তেই পাশ্চাত্য সভ্যতার চার্টার বা সনদ ঘোষণা করেন।

ক্রুসেডের যুদ্ধের ফলে আবেগজনিত প্রচন্ড আঘাতের যে অভিজ্ঞতা হয় তা-ই ইউরোপকে দেয় তার সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং তার ঐক্য; কিন্তু পরিণামে এই একই অভিজ্ঞতাই তখন থেকে সেই মিথ্যা রঙের পোঁচ দিতে থাকরো, যে –রঙে পা্শ্চাত্যবাসীর চোখে ইসলাম প্রতিভাত হয়েছে পরবর্তীকালে-কেবল এ কারনে নয় যে, ক্রুসেডের অর্থই হচ্ছে যুদ্ধ এবং রক্তপাত। বিভিন্ন জাতির মধ্যে অমন কত যুদ্ধই তো সংঘটিত হয়েছে-যার কথা পরবর্তীকালে বেমালুম ভুলে গেছে সে-সব জাতি-এবং কতো শত্রুতা ও বৈরিতা, যা তাদের কারে মনে হয়েছিলে অনপনেয়, পরবতীকালে রূপান্তরিত হয়েছে বন্ধুত্বে! বিভিন্ন ক্রুসেডে যে ক্ষতি হলো তা অস্ত্রের ঝনঝনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনিঃ প্রথমত এবং সর্বাগ্রে এ হচ্ছে মনোজাগতিক ক্ষতি-ইসলামের শিক্ষা এবং আদ- র্শের একটি ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে পাশ্চাত্য মনকে মুসলিম জগতের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলাই সেই ক্ষতি; কারন ক্রুসেডের আহবানের যুক্তিযুক্ততা যদি বজায় রাখতে হয় তাহলে মুসলমানদের নবীকে অপরিহার্যভাবেই চিহ্ণিত করতে হবে খ্রিস্ট-বিরোধীরূপে এবং তাঁর ধর্মকে জঘন্যতম ভাষায় চিত্রিত করতে হবে, লাম্পট্য ও বিকৃত রুচির উৎসরূপে। ইসলাম যে এটি স্কুল ইন্দ্রিয়পরায়ণতা এবং পাশবিক হানাহানির ধর্ম, চিত্ত শুদ্ধির ধর্ম নয়, আনুষ্ঠানাদি পালনের ধর্ম, ক্রুসেডের আমলেই এ হাস্যকর ধারণা প্রবেশ করে পাশ্চাত্য মানসে এবং তখন থেকেই তা ওখানেই রয়ে গেছে; আর সেই সময়ে নবী মুহাম্মদের নাম-সেই একই মুহাম্মদ যিনি তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন-অন্যান্য ধর্মের নবীগণকে শ্রদ্ধা করতে-ইউরোপীয়রা ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সংগে রূপান্তরিত করে ‘মাহৌন্দ’ –এ, ইউরোপে স্বাধীন অনুসন্ধিৎসা সূচিত হওয়ার যুগ তখনো অনেক সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপার। তখন যেসব শক্তি বিদ্যমান ছিলো তাদের পক্ষে পাশ্চাত্য ধর্ম এবং সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক ধর্ম ও সভ্যতার বিরুদ্ধে হিংসা –বিদ্ধেষের কালো বীজ বপন করা ছিরো খুবই সহজ। কাজেই, এ কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় যে, এই সব যুদ্ধ যখন চলছিলো তখন জ্বালাময়ী শ্যাজো দ্য রোঁলা-যাতে দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম বে-দ্বীনের উপর খৃষ্টান রাজ্যের অলীক বিজয় কাহিনী বর্ণিত হয়েছে-রচিত হয়নি, রচিত হয়েছিলো তিন শতাব্দী পরে-অর্থাৎ প্রথমে ক্রুসেডের ঠিক কিছু আগে-এবং সংগে সংগেই তা হয়ে দাঁড়ালো ইউরোপের ‘জাতীয় সংগীত’-স্বরূপ; এবং এ-ও আকিস্মিক ব্যাপার নয় যে, এই যুদ্ধ নিয়ে রচিত মাহকাব্য হচ্ছে এক ‘ইউরোপীয়’ সাহিত্যের আরম্ভ যা আগেকার আঞ্চলিক সাহিত্য থেকে সুস্পষ্টভঅবে স্বতন্ত্রঃ কারণ ইউরোপীয় সভ্যতার শৈশবাবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের প্রতি নিদারুণ বিদ্বেষ।

এই ইতিহাসেরই একটা পরিহাস বলে মনে হয় যে, ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতীচ্যে যুগ যুগ লালিত শত্রুতা, যা আদিতে ছিলো ধর্মীয় আজো, এমন এক সময়েও টিকে আছে তার অবচেতন মনে যখন পাশ্চাত্য মানুষের কল্পনার উপর ধর্ম তার কর্তৃত্ব প্রায় সবটাই হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য, আসরে তা বিস্ময়কর নয়। আমরা জানি, মানুষকে তার শৈশবে যেসব ধমীয় বিশ্বাস জীবনব্যাপী-‘আর এই ই’, আমি আমার বক্তব্য শেষ করে বলি, ‘ঠিক এ-ই ঘটেছিলো সেই সমষ্ঠিগত ব্যক্তিত্ব পাশ্চাত্য সভ্যতার জীবনে। ক্রসেডের ছায়া আজো পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে আছে পাশ্চাত্য সভ্যতার উপর;আর ইসলাম এবং মুসলিম জগতের প্রতি তার সকল প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সুস্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে সেই মরেও-মরে না প্রেতের.. .’

আমার বন্ধু কিছুক্ষনের জন্য চুপ করে থাকেন। আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি লম্বা হালকা-পাতলা সেই মানুষটি কামরার ভেতর পায়চারী করছেন। তাঁর হাত দুটি তাঁর কোটের পকেটে, মাথা ঝাঁকাচ্ছেন যেন কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে এবং অবশেষে তিনি বললেনঃ

‘আপনি যা বলছেন তাতে কিছু সারবস্তু থাকতে পারে-সত্যি হয়তো থাকতে পারে-যদিও, হঠাৎ করে আমি আপনার এই থিওরী বিচার করে দেখতে পারছি না, সে অবস্থা আমার নেই। তবে যা-ই হোক, আপনার জীবন, যা আপনার কাছে খুবই সরল এবং জটিলতা মুক্ত, পাশ্চাত্যের লোকদের কাছে অবশ্যই পরম বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ঠেকবে? আপনি আপনার আত্মজীবনী লিখছেন না কেন? আমি নিশ্চিত যে, এটি খুবই চমকপ্রদ এবং আক র্ষণীয় পুস্তক হবে।’

উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে আমি জবাব দিইঃ হ্যাঁ, এ ধরণের একটি বই লিখতে গিয়ে আমি হয়তো ফরেন সার্ভিস ত্যাগের জন্য মানিয়ে নিতে পারি নিজেকে। মোদ্দা কথা, লেখাই তো আমার মূল পেশা.. .

আমি রসিকতা করে যে জবাব দিয়েছিলাম পরবর্তী কয়েক হপ্তা এবং মাসে আস্তে আস্তে আমার অজান্তেই তা উবে গেলো। আমি আমার জীবনের কাহিনী লিপিবদ্ধ করার জন্য এবং এতে ক’রে, যত তুচ্ছভাবেই হোক না কেন, যে ‍পুরু যবনিকা ইসলাম এবং তার সংস্কৃতিতে প্রতীচ্য-মন থেকে আড়াল করে রেখেছে তা সরাতে সাহায্য করার জন্য চিন্তা করতে শুরু করি, গভীরভাবে। ইসলামে আমার প্রবেশ অনেক দিক দিয়ে একটি একক, অতুলনীয় ব্যাপারঃ মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘকাল বসবাস করেছি বলেই আমি মুসলমান হইনি, পক্ষান্তরে আমি তাদের মদ্যে বাস করার সিদ্ধান্ত নিই এ কারণে যে, আমি ইসলাম কবুল করেছি। আমি কি আমার একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাশ্চাত্য পাঠকদেরকে অবগত ক’রে ইসলামী জগত ও পাশ্চাত্য জগতের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বেশি অবদান রাখতে পারি না, সেই কুটনৈতিক পদে অবস্থান ক’রে যা করতে পারি, তার চেয়ে যে পদ আমরা দেশের অন্য লোকদের দ্বারা পূরণ করা যেতে পারে একই রকম প্রকৃষ্টরূপে! মোদ্দাকথা যে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি পাকিস্তানের মন্ত্রী হতে পারেন জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানে-কিন্তু আমার পক্ষে পাশ্চাত্যের লোকদের নিকট ইসলাম সম্পর্কে যেভাবে কথা বলা সম্ভব ক’জন লোক তা করতে সক্ষম? আমি মুসলমান, কিন্তু এ-ও সত্য যে, আমার জন্ম পাশ্চাত্য জগতেঃ কাজেই ইসলাম এবং পাশ্চাত্য জগত, দু’য়েরই সুধীজনের ভঅষায় কথা বলতে পারি আমি..

আর এ কারনে, ১৯৫২ সালের শেষের দিকে আমি পদত্যাগ করি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস থেকে এবং এ বইটি লিখতে শুরু করি। আমার আমেরিকান বন্ধুটি যে রকমটি আশা করেছিলেন এটি সে রকম ‘চিত্তাকর্ষক বই’ হয়েছে কিনা আমি বলতে পারি না। কেবল কিছু পুরানো নোট, বিচ্ছিন্ন রোজনামচা এবং সে সময়ে আমি সংবাদপত্রের জন্য যে সব প্রবন্ধ লিখেছিলাম তারই কয়েকটি সাহায্যে, স্মৃতি থেকে-এক ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের জটিল রেখাগুলি ধরে ফের অতীতের দিকে যাত্রা করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না- যে বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছে বহু বছর এবং ভৌগলিক স্থানের এক বিশাল বিস্তার জুড়ে।

আর এই যে কহিনীঃ আমার সমগ্র জীবনের কাহিনী নয়, কেবল সেই বছরগুলির কাহিনী, ভারতের পথে আরবদেশ ছেড়ে বের হওয়ার আগেকার বছরগুলির কাহিনী-সেই উত্তেজনাময় বছরগুলি, যা আমি সফরে কাটিয়েছি লিবিয়ার মরুভূমি থেকে পামীর মালভূমির বরফ-ঢাকা পর্বত শৃংগগুলি মধ্যবর্তী এবং বসফরাস ও আরব সাগরের মধ্যকার প্রায় সকল দেশের ভেতর দিয়ে। এ কাহিনী বলা হয়েছে একটি পটভূমিতে-এবং মনে রাখতে হবে, আরবের অভ্যন্তর থেকে মক্কায় ১৯৩২-এর গ্রীষ্মের শেষের দিকে, আমার সর্বশেষ মরু সফরের প্রেক্ষিতেঃ কারণ ঐ তেইশ দিনের মধ্যেই আমার জীবনের প্যাটার্ন সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো আমার কাছে।

পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে যে আরবের  বর্ণনা করা হয়েছে তা এখন আর নেই। এর নির্জনতা এবং সংহতি ধ্বসে পড়েছে অকস্মাৎ প্রবল বেগে উৎক্ষিপ্ত তেলের প্রচন্ড ধাক্কায় এবং তেল যে স্বর্ণ নিয়ে এসেছে তারই চাপে। এর মহৎ সরলতা হারিয়ে গেছে এবং তার সংগে হারিয়ে গেছে মানবিকতার দিক যা ছিলো একক অনন্য তা-ও। মানুষ যখন মহামূল্য কোন কিছুর জন্য বেদনা অনুভব করে, যা এখন হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য, যা ফিরে পাওয়া যাবে না আর কখনো, সে বেদনার সাথে আমার মনে পড়েছে সেই শেষ দীর্ঘ মরুপথে চলার কথা-যখন আমরা দুজন, সওয়ারী হাঁকিায়ে চলেছি; আর চলেছি, দুজন দুটি উটের উপরে, সাঁতরে চলা আলোর ভেতর দিয়ে.. .

 

তৃষ্ণা

এক

আমরা দু’জন দু’টি  উটের উপর, চলেছি তো চলেছি; মাথার উপর সূর্য জ্বলছে, সর্বত্র আালো ঝলমল করছে, ঝলসাচ্ছে, একাধারে নির্জনতা আর রোদ –ঝলসানো নীরবতা এবং তারই মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা দুটি মানুষ, দুটি উটের উপর-চলেছি দুলতে দুলতে, চলার সেই ছন্দে ও ভংগীতে যা মানুষকে নিদ্রালূ করে তোলো, আর তাকে ভুলিয়ে দেয় দিনের কথা, রোদের কথা, উষ্ণ হাওয়া আর সুদীর্ঘ পথের কথা। বালিয়াড়ির মাথায় কোথাও কোথাও হলদে ঘাসের গুচ্ছ আর এখানে ওখানে গ্রন্থিল হামদ-লতার ঝোপ, মস্ত বড় অজগরের মত বালির উপর কুন্ডলি পাকিয়ে পড়ে আছে। ইন্দ্রিয়গুলি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে । জিনের উপর বসে দুলছি। কিছুই টের পাচ্ছি না উটের পায়ের নিচে  বালি গুঁড়ানোর আওয়াজ এবং হাঁটুর ভেতরের দিক জিন-আঁটানো কাঠের পেরেকের ঘষা ছড়া। রোদ আর বাতাস থেকে মুখটাকে বাঁচানোর জন্য পাগড়ীর গুচ্ছ দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছি। মনে হলো, আমি যেন আমার আপন নিঃসংগতাকে একটি বস্তুরই মতো ধরা ছোঁয়া যায় একন একটা পদার্থের মতো এরই মধ্যে দিয়ে, হ্যাঁ ঠিক এরই মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছি তায়েমার কুয়াগুলির দিকে... তায়েমার সেই গহীন কুয়াগুলির দিকে, যা পানি যোগায় তৃষ্ণার্তকে.. ঠিক ‍নুফুদের ভেতর দিয়ে তায়েমার দিকে-আমি একটা স্বর শুনতে পেলাম, জানি না স্বপ্নে শোনা স্বর, না আমার সংগীর কন্ঠস্বরঃ

-‘তুমি কিছু বলছিলে জায়েদ?’

-‘বলছিলাম’ আমার সংগী জবাব দেয়, ‘তায়েমার কুয়া দেখার জন্য ঠিক আড়াআড়িভাবে নুফুদ পাড়ি দেবার দুঃসাহস খুব বেশি লোক করবে না।’

আমি আর জায়েদ গিয়েছিলাম নজদ-ইরাক সীমান্তের কসর আসাইমনে, বাদশাহ ইবনে সাউদের অনুরোধে। সেখান থেকে আমরা দু’জন ফিরছিলাম। আমার কাজ শেষ করার পর হাতে ছিল প্রচুর অবসর। তাই ঠিক করলাম, প্রায় দু’শ, মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তায়েমার সুদূর এবং প্রাচীন মরুদ্যানটি একবার দেখতে যাবো। ওল্ড টেস্টামেন্টের সেই ‘তোমা’-আর এর সম্পর্কেই ঈসায়া বলেছিলেন, ‘তোমা’র বাসিন্দারা তৃষ্ণার্তদের পানি যোগায়’। তায়েমার অঢেল পানি আর এর বড়ো ইঁদারা, সারা আরবে এমনটি কোথাও মিলে না। এই পানি আর ইঁদারার  জন্য ইসলাম-পূর্ব যুগে তায়েমা হয়ে উঠেছিল ক্যারাভাঁ বাণিজ্যের একটা মস্ত বড়ো কেন্দ্র আর সেকেলে আরব তমদ্দুনের এক পীঠস্থান। স্থানটি দেখার ইচ্ছা আমার অনেকদিনের। তাই মরু-কাফেলা যে –সব ঘুরতি পথে চলে সে-সব পথে না গিয়ে কসর আসাইমিন থেকে আমরা সোজা ঢুকে পড়লাম বিশাল নুফুদের ভেতরে। মধ্য আরবের উঁচু এলাকাগুলি আর সিরীয় মরুভূমির মাঝখানে ছড়িয়ে আছে লালচে বালি মরু নুফুদ, বিশাল তার আয়তন । এই ভয়ংকর নির্জন এলাকার এই অংশে নেই কোনো পায়ের রেখা, নেই কোনো পথ। বাতাস যেন দায়িত্ব নিয়েছে –যাতে মানুষ বা কোনো পশুর পদক্ষেপ এই নরম দেবে-যাওয়া ঝুরঝুরে বালিতে স্থায়ী চিহ্ন রেখে যেতে না পারে এবং জমির কোনো নিশানা মুসাফিরকে পথ দেখানোর জন্য বেশিদিন টিকে না থাকে! বাতাসের ধাক্কায় বালিয়াড়িগুলির রূপরেখা হরদম বদলাচ্ছে, আস্তে আস্তে, টের পাওয়া যায় না এমনি মৃদু গতিতে প্রবাহিত হয়ে আকারের পর আকার নিচ্ছে। পাহাড় রূপান্তরিত হচ্ছে উপত্যকায়, উপত্যকায়, উপত্যকা রূপ নিচ্ছে নতুন মৃদু মর্মর ধ্বনি তোলে। উটের মুখেও তেতো ছাইয়ের মত সে ঘাস!

বহুবার দিক দিয়ে এ মরুভূমি আমি পার হয়েছি। তবুও কারো মদদ না নিয়ে নিজে নিজে এর মধ্য দিয়ে রাস্তা খুঁজে নেবার হিম্মত আমার নাই। কাজেই জয়েদকে আমার সংগে পেয়ে আমি ভীষণ খুশী। দেশের এই এলাকারই লোক জায়েদ। তার বংশের নাম শাম্মার, আল—নুফুদের দক্ষিণ এবং পূর্ব সীমানায় শাম্মার খান্দানের বসতি। শীতকারের ধারা বর্ষণে বালিয়ড়িগুলি যখন হঠাৎ ঘন সবুজ মাঠে রূপান্তরিত হয়, তখন বছরের কয়েক মাস ধরে ওরা নুফুদের মাঝখানে উট চরায়। মরুভূমির পরিবর্তনশীল মেজাজের সংগে জায়েদের সম্বন্ধ রক্তের, এর সাথে সাথে স্পন্দিত হয় জায়েদের হৃদয়।

আজ পর্যন্ত যত মানুষের সংগে আমার পরিচয় হয়েছে মনে হয় জায়েদই তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। চওড়া তার কপাল, পাতলা শরীর, মাঝারি আকার, সুন্দর গঠন, প্রচন্ড তার শক্তি, সুগঠিত মজবুত চোয়াল, আর একাধারে কঠোর এবং লালসাপূর্ণ মুখ নিয়ে তার গোধুম-রঙা সংকীর্ণ মুখমন্ডল-তাতে রয়েছে সেই প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য যা মরু –আরবের বাসিন্দাদের একটি খাস বৈশিষ্ট্য-মর্যাদাবোধের সংগে একটা আন্তরিক মাধুর্যপূর্ণ আত্মসমাহিত ভাব। খাঁটি বেদুঈন রক্ত এবং নজদী শহরে জীবনের এক সুন্দর সংমিশ্রণ সে; বেদুঈনী ভাবাতিশয্যের গলদ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেও বেদুঈনের সহজ প্রবৃত্তির নিশ্চয়তা সে নিজের মধ্যে অক্ষুণ্ণ রেখেছে এবং শহরে লোকের বৈষয়িক কৃত্রিমতার শিকার না হয়েও তাদের সংসার জ্ঞান সে হাসিল করেছে। আমার মতো সেও এ্যডভেঞ্চার জীবন নানা ঘটনা এবং উত্তেজনায় ভরা। মহাযুদ্ধের সময় সিনাই উপদ্বীপে অভিযান চালানোর জন্য তুর্কী সরকার এক অনিয়মিত উট সওয়ার বাহিনী গঠন করেছিলো, বালক বয়সে জায়েদ ছিলো তারই একজন সিপাই। তা ছাড়া, ইবনে সউদের হামলা থেকে তার শাম্মার খান্দানের বসত–ভূমি রক্ষা করার জন্য সে লড়েছে। কিছুদিন আবার অস্ত্রের চোরাচালান দিয়েছে পারস্য উপসাগরে। আরব জাহানের বহু এলাকায় বহু আওরতের সংগে প্রেম করেছে প্রচন্ডভাবে। অবশ্য প্রত্যেকের সাথেই কোনো –না কোনো সময় আইনত তার শাদী হয়েছে এবং তারপর আইন মোতাবেক তাদেরকে সে তালাকও দিয়েছে। মিসরে সে কিছুকাল ঘোড়ার ব্যবসা করেছে। আর ইরাকে সে ছিরা ভাগ্যান্বেষী সৈনিক, সবশেষে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সে রয়েছে আমার সহচর হিসাবে, আরব মুলুকে। এবং এখন উনিশ শ’ বত্রিশের গ্রীষ্মের এই শেষ দিকে আমরা দু’জন আরো অনেকবারের মতো চলেছি উটের উপরে বসে, বালিয়াড়ির মধ্যে নির্জন পথে ঘুরতে ঘুরতে; চওড়া চত্বরবিশিষ্ট কোন কোন কুয়ার পাশে আমরা থামছি এবং তারা –ঝিলমিল আকাশের নিচে আরাম করছি রাতের বেলা। তপ্ত বালুর উপর উটের পায়ের একটা সুইশ্ সুই্শ্ আওয়াজ, কখনো কখনো চলার মাঝে ‍উটের পায়ের আওয়াজের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে জায়েদ নীরস কন্ঠে গান ধরে; রাত্রে আমরা তাঁবু খাটাই, কফি  বানাই, ভাত রাঁধি  এবং কখনো কখনো পাকাই শিকার-করা বুনো প্রাণীর গোশত। রাতের বেলা যখন আমরা বালির উপর শুয়ে থাকি বাতাস আমাদের উপর একটা ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে যায়। বালিয়াড়ির উপর সূর্য ওঠে, লালচে সূর্য প্রচন্ড বিস্ফোরণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় আতশবাজির মতো এবং আজকের মতো কখনো কখনো আমরা দেখতে পাই, হঠাৎ পানি পেয়ে জীবনের বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে তৃণলতার মধ্যে।

যোহরের সালাতের জন্য আমরা থেমেছি, একটা মশক থেকে পানি নিয়ে আমি হাত-মুখ এবং পা ধুচ্ছি। কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো আমার পায়ের কাছে ঘাসের একটা শুকনো গুচ্ছের উপর-একটা অসহায় ক্ষুদ্র তৃণের গুচ্ছ, সূর্যের নিষ্ঠুর তাপে রং হয়েছে হলদে, নেতিয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে বালির উপর। কিন্তু কয়েক ফোঁটা পানি ওর উপর পড়ার সংগে সংগেই ওর কোঁকড়ানো পাতাগুলির মধ্যে দিয়ে এক আশ্চর্য শিহরণ বয়ে গেলো, স্পষ্ট দেখতে পোম, কিভঅবে সেগুলি মেলে গোলো আমার চোখের সামনে। আরো কয়েকটি ফোঁটা.. . ছোট্ট পাতাগুলি নড়ে উঠলো, কুঁকড়ে গেলো এবং তারপর ধীরে ধীরে যেন সংকোচের সংগে শিউরে সেগুলি সোজা হয়ে গেলো। আমি নিরুদ্ধ শ্বাসে আরো কিছুটা পানি ঢালি তৃণ গুচ্ছটির উপর। আরো দ্রুত, আরো প্রচন্ডভাবে নড়ে উঠলো তৃণটি, যেন কোন অদৃশ্য শক্তি ওকে মৃত্যু-স্পন্ন থেকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলছে। আর ওর পাতাগুলি, কী আনন্দের সে দৃশ্য! তারা মাছের বাহুগুলির মতো সংকুচিত ও প্রসারিত হতে লাগলো, যেন লাজুক অথচ অদম্য উত্তেজনায় ইন্দ্রিয়জ আনন্দের একটি সত্যিকার ক্ষণিক বিস্ফোরণে সে অভিভূত। কিছুক্ষণ আগেও যা মৃতের শামিল, এমনি করে তারই মধ্যে আবার ফিরে এলো তার প্রাণ, প্রকাশ্যে, প্রবলভাবে, যে প্রানের কাছে হার মানে মৃত্যু এবং যার ঐশ্বর্য মানুষের বুদ্ধির অগম্য।

মরুভূমিতে আপনি প্রাণকে তার রাজকীয় রূপে অনুভব করবেন সবসময়ে। প্রাণকে টিকেয়ে রাখা এতো কষ্টকর, এতো কঠিন বলেন মরুভূমিতে প্রাণ যেন সবসময়েই একটা বহমত, একটা সম্পদ, একটা বিস্ময়। আর মরুভূমি সবসময়েই চমকপ্রদ মানুষের জন্য। মরুভূমির সাথে বহু  বছরের জানাজানি থাকলেও বিস্ময়ের অবকাশ হামেশাই রয়েছে। কখনো কখনো যখন মনে হয় , মরুভূমি তার সমস্ত কঠোরতা আর শূন্যতা নিয়ে রয়েছে আমাদের চোখের সামনে তখন মরুভূমি যেন তার স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে বিশ্বাস ফেলতে শুরু করে এবং গতকাল যেখানে বালু আর টুকরো পাথর ছাড়া আর কিছু ছিলো না, আমরা দেখতে পাই, হঠাৎ সেখানে জেগে উঠেছে কচি ফিকে সবুজ ঘাস। আবার মরুভূমির শ্বাস বইতে ‍শুরু করে, আর এক ঝাঁক ছোটো পাখি ডানার আওয়াজ তুলে বাতাসের মধ্য দিয়ে উড়তে আরম্ভ করে। কোত্থেখে এলো, কোথায় যাবে এই ক্ষীণ-দেহ লম্বা ডানাওয়ালা পান্না-সবুজ পাখিগুলি? কিংবা হয়তো এক ঝাঁক পংগপাল হঠাৎ তীব্র বেগে এবং ঝুমঝুম ছেড়ে উঠলো আসমানে, ধূসর এবং ক্ষুধার্ত, যোদ্ধা-বাহিনীর মতো হিংস্র আর অশেষ.. .

প্রাণের প্রকাশ তার রাজকীয় রূপেঃ মরুভূমিতে প্রাণ বিরল বলেই তার রাজকীয় রূপ হামেশাই বিস্ময়কর, সর্বদাই চমকপ্রদ, আর এখানেই নিহিত আছে আরবের এমনিতরো বালুমরু এবং আরো বহু পরিবর্তনশীল ল্যাণ্ডস্কেপের নামহীন সমগ্র সুবাসটুকু!

কখনো কখনো পথে পড়ে লাভা-মৃত্তিকা –কালো এবং অসমতল, কখনো বা বালিয়াড়ি, যার শেষ নেই । কাঁটা ঝোপ-ঢাকা ‘ওয়াদি’ বা উপত্যকা দুই পাথুরে পাহাড়ের মাঝখানে, আর সেই ঝোপ থেকে চকিত ভীত খরগোশ লাফ মেরে আমাদের পথের এক পাশ থেকে আরেক পাশ গিয়ে পড়ছে কখনো কখনো। কখনো-বা পাচ্ছি হরিণের পায়ের দাগ-পড়া শিথিল বালু আর আগুনে কালো হয়ে যাওয়া দু’চারটি পাথর, যার উপর অনেক অনেক আগে, বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মুসাফিরেরা, বহু পূর্বে, বিস্মৃত কোনো দিনে তাদের খাবার রেঁধেছিলো। কখনো কখনো চোখে পড়ছে খেজুর-বীথির ছায়া-পড়া কোনো পল্লী, আর কুয়ার উপরে কাঠের চাক্কাগুলি ঘুরছে এবং তাতে করে এক ধরণের  সংগীত সৃষ্টি হচ্ছে.. . আর মুসাফিরেরা শুনছে সেই একটানা সংগীত। কখনো কখনো পাচ্ছি মরু –উপত্যকার মাঝখানে একটি ‍কুয়া আর তার চারপাশে বেদুঈন পশু-পালকেরা জটলা পাকাচ্ছে তাদের তৃষ্ণার্ত মেষ এবং উটগুলিকে পানি খাওয়ানোর জন্য। তারা কোরাসে গান গাইতে চামড়ার বড় থলেতে করে পানি তুলছে আর ঝরাৎ করে সেই পানি চামড়ার পাত্রে ঢালার সঙ্গে সঙ্গে পশুগুলির উত্তেজনা চরমে পৌঁছুচ্ছে। তার উপর রয়েছে নিষ্করণ রোদে অভিভূত স্তেপভূমির নির্জনতা, এখানে- ওখানে হলদে ঘাস আর সাপের মতো শাখা ছড়িয়ে মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে চলা পত্রঘন ঝোপগুলি কোনো কোনো স্থানকে করে তোলে উটের জন্য সাদর চারণ ক্ষেত্র। একটা নিঃসঙ্গ বাবলাজাতীয় বৃক্ষ হয়তো ইস্পাত-নীল আকাশে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির স্তূপ আর পাথরের মাঝখান থেকে ডানে-বাঁয়ে নজর ছুঁড়ে মারতে মারতে বেরিয়ে আসছে সোনালী গিরগিটি, তারপর আবার মিলিয়ে যাচ্ছে একটা ছায়ার মতো, ভৌতিক ব্যাপারের মতো। লোকের বিশ্বাস, এই স্বর্ণ-গিরগিটি কখনো পানি খায় না। দেবে-যাওয়া নিচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছাপ-পশমের কালো কালো তাঁবুগুলি! বিকালের দিকে এক পাল উঢকে হয়তো তাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে ঘরের দিকে আর তরুণ উটের খালি পিঠে চড়েছে পশু-পালকেরা। তারা যখন তাদের পশুগুলিকে ডাকে তখন মরুভূমির নীরবতা যেনো তাদের কন্ঠস্বরকে চুমুক দিয়ে চুষে নেয়, কোন প্রতিধ্বনি না জাগিয়ে সে কন্ঠস্বর হারিয়ে যায় ঐ নীরবতায়।

কখনো কখনো দূর দিগন্তে  দেখা যায় ঈষৎ উজ্জ্বল ছায়া-ওগুলি কি মেঘ? ওরা নিচু দিয়ে ভেসে যায়। ঘন ঘন বদলায় তাদের রং আর অবস্থান। এই মুহূর্তে হয়তো দেখাচ্ছে ধূসর তামাটে পাহাড়ের মতো-অবশ্যি শূন্য দিগন্তের কিছুটা উপরে-এবং পরমুহূর্তেই সারা দুনিয়ার কাছে ওরা পাথুরে দেওদারের ছায়াদার বীথিকার রূপ নিচ্ছে-কিন্তু শূন্যে,তারপর ওরা যখন আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসে আর হ্রদে এবং বয়ে-চলা নদীতে রূপান্তরিত হয় এবং তাদের হাতছানি দেয়া পানিতে পাহাড় পাহাড় ও গাছপালার প্রতিবিম্ব কাঁপতে থাকে তখন হঠাৎ আপনি চিনতে পারেন ওরা কী! ওরা হচ্ছে জ্বিনের হাতছানি-সেই মরীচিকা যা বারবার মুসাফিরদের মনে মিছে আশা জাগিয়েছে এবং ‘তাতে করে’ ডেকে এনেছে তাদের সর্বনাশ আর অনিচ্ছাকৃতভঅবেই মুসাফিরের হাত তখন আগিয়ে যায় জিনের উপর মশকের দিকে.. .

কোনো কোনো রাত আবার ভিন্নতরো বিপদে পূর্ণ। বিভিন্ন কবিলার মধ্যে তখন যুদ্ধের উত্তেজনা, যুদ্ধের চাঞ্চল্য; মুসাফির তাঁবু খাটায়, কিন্তু আগুন জ্বালে না, যেন দূর থেকে তাদের কেউ দেখতে না পায়। দু’হাঁটুর মধ্যে রাইফেল রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা ওরা জেগে থাকে। আর সেই শান্তির দিনগুলি, যখন নিঃসঙ্গ দীর্ঘপথ ঘুরতে ঘুরতে মুসাফির কোনো কাফেলার দেখা পায় আর সন্ধ্যাকলে তাঁবুর আগুনের চারপাশে বসা রোদে-পেড়া গম্ভীর লোকগুলির কথা কান পেতে শোনে-ওরা জিন্দেগী এবং মওতের, ক্ষুধা এবং তৃপ্তির, গর্ব, মহব্বত এবং ঘেন্নার, দেহের লালসা ও সে লালসা নিবৃত্তির, যুদ্ধ এবং সূদূর পল্লীগৃহের খেজুর-বীথিকার সহজ আর বৃহৎ বিষয় সম্বন্ধে আলাপ করে এবং কখনো আপনি শুনবেন না ওরা বাজে বকছে, কারণ মরুভূমিতে কেউ বাজে বকতে পারে না।.. .

আর প্রাণের দাবি আপনার মালুম হবে তৃষ্ণার সে দিনগুলিতে যখন শুকনা এক টুকরা কাঠের মতো জিব লেগে থাকে তালুর সংগে এবং দিগন্ত থেকে মুক্তির কোনো পয়গাম আসে না, বরং তার জায়গায় আসে জ্বলন্ত ‘মরু-সাইমুম’ এবং ঘূর্ণমান বালু-ঝড়ঃ আরো ভিন্নতরো দিনে আপনি হয়তো কোনো বেদুঈন তাঁবুতে মেহমান, পুরুষেরা আপনার জন্য নিয়ে আসবে পাত্র ভর্তি দুধ, বসন্তের শুরুতে মোটা-তাজা উষ্ট্রীর দুধ, যখন ধারা বর্ষনের পর স্তেপ আর বালিয়াড়িগুলি বাগানের মতো সবুজ হয়ে ওঠে, জানোয়ারের উর হয়ে ওঠে সুগোল আর ভারী। তাঁবুর এক পাশ থেকে আপনি শুনতে পাবেন আপনার সম্মানে মেয়েরে খোলা আগুনে ভেড়ার গোশত পাক করছে  আর সশব্দে হাসছে।

রক্তিম ধাতুর মতো সূর্য হারিয়ে যায় পাহাড়ের আাড়লে। পৃথিবীর যে কোন স্থানের চাইতে রাতের বেলার তারা ঝিলমিল আকাশ এখানে উচ্ছতরো আর এই তারার নিচে আপনার ঘুম গভীর এবং নিঃস্বপ্ন; সকালগুলি ফিকে ধূসর এবং মৃদু ঠান্ডা, আর শীতল শীতকালের রাতগুলি, হাড় কাঁপানো বাতাস তাঁবুর আগুনের উপর ঝাপটা মারছে, যে আগুনের চারপাশে আপনি আর আপনার সংগীরা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছেন একটুখানি গরমের জন্য। আর গ্রীষ্মের দিনগুলি হচ্ছে অগ্নিঝরা, যখন আপনি চলেছেন আপনার হেলতে-দুলতে চলা উটের পিঠের উপর বসে, ঘন্টার পর ঘন্টা যেন অনন্তকাল ধরে  আপনি চলেছেন; ঝলসানো বাতাস থেকে বাঁচানোর জন্য আপনার মুখ আপনার অনেক-অনেক উপরে একটি শিখারী পাখি চক্রাকারে ঘুরছে, চক্কর খাচ্ছে.. .

দুই

ধীরে ধীরে বিকাল গড়িয়ে যায় তার বালিয়াড়ি, তার নীরবতা আর তার নিঃসংগতা নিয়ে। কিছুক্ষণ পর নির্জনতা ভাঙে একদল বেদুঈন। ওরা চার কি পাঁচজন পুরুষ আর দু’জন মেয়ে। সবাই উটের উপর সওয়ার। আর একটি  ভারবাহী জানোয়ারের পিঠে ওদের ভাঁজ করা কালো তাঁবু, বাসন-কোসন এবং বেদুঈন জীবনের অন্য সব তৈজসপত্র। আসবাবপত্রের স্তূপের উপর বসে আছে দু’টি  শিশু। দলটি আমাদের পথ অতিক্রম করছিলো। আমাদের একদম কাছাকাছি এসে পড়ারপর ওরা ওদের জানোয়ারগুলির লাগাম টেনে ধরে বলেঃ

-‘আস-সালামু আলাইকুম-তোমাদের উপর শান্তি বার্ষিত হোক।’ আমরা জবাব দিই-‘এবং তোমাদের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক আর বর্ষিত হোক তাঁর আশিস।’

-‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ মুসাফির?’

-‘ইনশাআল্লাহ, তায়েমা।

-‘তোমরা আসছো কোত্থেকে?’

-‘কসর – আসাইমিন থেকে’, জবাব দিই আমি। তারপর সব চুপচাপ। এদের মধ্যে একজন লোক বয়স্ক, সে রোগাটে, তার মুখমন্ডল ধারালো আর তীক্ষ্ণ এবং দাড়ি কালো আর সূঁচালো। সে যে এদের নেতা তাতে সন্দেহ নেই। তার নজর আরো ধারালো ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো যখন তা জায়েদের উপর থেকে এসে সন্দেহজনকভাবে স্থির হরো আমার উপর-রং যার ফরসা এমন একজন বিদেশী আমি।  এই পথহীন ঊষর প্রান্তরে হঠাৎ আমি আবির্ভূত হয়েছি শূণ্য থেকে, অপ্রত্যাশিত-আমি ব্রিটিশ দখলভূক্ত ইরাকের দিক থেকে আসছি। হতে পারে আমি একজন (সে তীক্ষ্ণ মুখওয়ালা লোকটির হাত যেনো হতবুদ্ধি হয়েই তার জিনের সম্মুখভাগটি নিয়ে খেলা করছে। আর একক্ষণে আমদের চারপাশ তার সংগীরা ফাঁক ফাঁক হয়ে অপেক্ষা করছে। কথা তো দলের সরদার হিসাবে ও-ই করবে। কয়েকটি মুহূর্ত পর, মনে হলো,সে যেন আর এ নীরবতা বরদাশত করতে পারছে না,আমাকে সে জিজ্ঞেস করেঃ

-‘কোন আরবদের লোক তুমি?’ – অর্থাৎ আমি কোন কওম বা এলাকার ও জানতে চায়। কিন্তু আমি জবাব দিয়ে ওঠার আগেই আমাকে চিনতে পেরে আচমকা হাসিতে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

-‘ওহ, এখন তোমাকে চিনতে পারছি। আবদুল আজীজের সংগে তোমাকে দেখেছি। কিন্তু সে তো অনেকদিন-পুরা চার বছর আগের কথা, তাই না?’

সে তার বন্ধত্বভরা হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। তারপর বলে সেই সময়ের কথা, যখন আমি বাস করছিলাম রিয়াদের শাহী কিল্লায়-আর সে এসেছিলো শাম্মার খান্দানের এক সরদারদলের সংগে, ইবনে সউদের কবিলাকে শ্রদ্ধা জানাতে।  ইবনে সউদকে বেদুঈনেরা সবসময় তাঁর পয়লা নাম ‘আব্দুল আজীজ’ বলে ডাকে। আনুষ্ঠানিক সম্মানসূচক কোনো খেতাব তারা যোগ করে না তাঁর নামের সংগে, কারন বেদুঈনেরা মুক্ত মানুষ। বাদশাহকে তারা শুধু একজন মানুষ বলেই জানে-বেশক তিনি সম্মানের পাত্র, কিন্তু মানুষ যতোটুকুর যোগ্য তার বেশি নয়। এমনিভাবে আমরা কিছুক্ষণ সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলিকে স্মৃতির সাহয্যে জীবন্ত করে তুলি, হয়  এর কথা না হয় ওর কথা বলি। আর রিয়াদ সম্পর্কে ও এক কাহিনী বলে তো আমি  আর এক কাহিনী-সেই রিয়াদ, যার ভেতরে ও বাইরে রোজ হাজার মেহমান বাদশাহর খরচে বাস করে আর যাবার সময় ওরা পায় ইনাম-প্রত্যেক ব্যক্তির ইজ্জত অনুসারে-এক মুঠা রূপার মুদ্রা বা একটা ‘আবায়া’ থেকে শুরু করে সোনার মোহর ভর্তি থলে, ঘোড়া অথবা উট যা বাদশাহ প্রায়ই দিয়ে থাকেন সরদারদেরকে।

কিন্তু বাদশাহর এই মাহনুভতা অর্থের যতোটা না তার চাইতে ঢের বেশি তাঁর হৃদয়ের। হয়তো সবার উপরে তাঁর হৃদয়ানুভূতির এই উষ্ণতার জন্যই চারপাশে সবাই তাঁকে ভালবাসে এবং আমিও ভালবাসি।

আরবে যে বছরগুলি আমি কাটিয়েছি ইবনে সউদের বন্ধত্ব যেন একটা ঊষ্ণ আলোর দীপ্তির মতো সবসময়েই ছড়িয়েছিলো আমার জীবনের উপর। তিনি আমাকে বন্ধু বলে ডাকেন যদিও তিনি একজন বাদশাহ আর আমি একজন সাংবাদিক মাত্র। তাঁর রাজ্যে আমি যে –বছরগুলি কাটিয়েছে সেই বছরগুলিতে সবসময়ে আমি তাঁর বন্ধুত্ব দেদারছে পেয়েছি বলেই যে আমি তাঁকে ভালবাসি, তা নয়। কারণ বন্ধুত্ব তিনি বহু মানুষকেই বিতরণ করেন। আমি তাঁকে আমার বন্ধু বলে ডাকি, কারণ বহু মানুষের মধ্যে যেমন তাঁর টাকার থলে মেলে ধরেন, তেমনি তিনি কখনো কখনো তাঁর হৃদয়েকে মেলে ধরেন আমার কাছে। আমি তাঁকে  আমার বন্ধু বলতে ভালোবাসি, কারণ তাঁর সকল দোষক্রটি সত্ত্বে ও আর দোষক্রটি কারই বা না আছে- তিনি একজন অতিশয় মহৎ ব্যক্তি; ঠিক ‘দয়ালু’ নন, কারণ দয়ালুতা কোন কোন সময় একা সস্তা চিজ হয়ে উঠতে পারে। একটা পুরানো দামেস্ক-তরবারী দেখে যেমন আপনি মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেন, হ্যাঁ, এ একটা ‘উৎকৃষ্ট’ হাতিয়ার বটে, কারন, এ ধরনের একটি অস্ত্রে আপনি যা-কিছু চান সবই আছে, ঠিক তেমনিভাবে আমি ইবনে সউদকে একজন মহৎ ব্যক্তি বলে মনে করি। তিনি নিজের মধ্যে সমাহিত এবং সবসময় নিজের পথে চলেন এবং তিনি যদি তাঁর কাজে-কর্মে প্রায়ই ভুলও করেন, তারও কারণ তিনি নিজে যা তা’ছাড়া আর কিছুই কখনো তিনি হতে চান না।

বাদশাহ আব্দুল আজীজের সাথে আমার প্রথম মুলাকাত হয় মক্কায়, ১৯২৭ ইংরেজীর প্রথমদিকে, আমার ইসলাম গ্রহনের কয়েক মাস পরেই।

আমার-স্ত্রী-যিনি মক্কায় আমার এই প্রথম হ্জ্জ্ব-যাত্রায় আমার সংগিনী ছিলেন-সম্প্রতি তাঁর আকস্মিক ইন্তেকাল আমাকে করে তুলেছিলো বিষণ্ণ; আমি অসামাজিক হয়ে উঠেছিলাম। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম অন্ধকার থেকে, চরম নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য। বেশির ভাগ সময় আমি আমার ঘরেই কাটাচ্ছিলাম। এ সময়ে আমার সম্পর্ক ছিলো মাত্র গুটিকয়েক লোকের সাথে এবং বাদশাহর সাথে প্রথামতো সৌজন্যমূলক মূলাকাতও এড়িয়ে যাচ্ছিলাম কয়েক হপ্তা ধ’রে। তারপর, একদিন বাদশাহ ইবনে সউদের একজন বিদেশী মেহমান –ইন্দোনেশিয়ার হাজী আজোস সলিমের সাথে মুলাকাত করতে গিয়েই জানতে পারলাম, বাদশাহর হুকুমে আমার নামও তাঁর মেহমানদের তালিকায় তোলা হয়ে গেছে। মনে হয়, তিনি আমার নীরবতার কারণ জানতে পেরেছিলেন এবং নীরব সহৃদয়তার সংগে তা তিনি গ্রহণ করেছিলেন। এভাবে একজন মেহমান হিসাবে –যে-মেহমানের আজ  পর্যন্ত একবারের জন্য ও তাঁর মেহমানদারের মুখ দেখার নসিব হয়নি, আমি মক্কার দক্ষিণ প্রান্তে, শিলাময় গিরি-সংকটের নিকটে একটি সুন্দর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। এই গিরি-সংকটের মধ্য দিয়েই রাস্তা চলে গেছে ইয়েমেনের দিকে। চত্বর থেকে আমি নগরীর একটি বড় অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম-মসজিদুল কুবরার মীনার, রঙিন ইঁটের ছাদবিশিষ্ট হাজার হাজার গৃহের সারি এবং নিষ্প্রাণ মরু-পাহাড়, যার উপর গম্বুজের মতো রয়েছে আকাশ, তরল ধাতুর মতো ঝলসানো আকাশ।

তবু, বাদশাহর সাথ আমার মুলাকাত হয়তো আমি মুলতবিই রেখে দিতাম যদি না মসজিদুল কুবরার বারান্দায়, একটা বই-ঘরে, ঘটনাক্রমে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আমীর ফয়সারের সাথে আমার দেখা হতো। পুরানো আরবী, ফারসী এবং তুর্কী পুঁথি-পান্ডুলিপিতে পরিবেষ্টিত হয়ে সেই দীর্ঘ সংকীর্ণ কামরাটিতে বসা ছিলো একটা আনান্দের ব্যাপার; কামরাটির নিশ্চলতা ও অন্ধকার আমাকে ভরে  দিতো এক অপূর্ব শান্তিতে। অবশ্যি, একদিন এই স্বাভাবিক নীরবতা একদল মানুষের সশব্দ উপস্থিতিতে ভেংগে গেলো। দলটির আগে আগে ছিলো সশস্ত্র দেহরক্ষীরা। আমীর ফয়সাল তাঁর সাংগ-পাংগ নিয়ে বই-ঘরের মধ্যে দিয়ে কাঁবায় যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন লম্বা আর হ্যাংলা এবং তাঁর বয়স ও দাড়িশূণ্য মুখখানার তুলনায় অনেক-অনেক বেশি মর্যাদাবান। তাঁর বয়স অল্প হওয়া  সত্ত্বেও তাঁর পিতা দু’বছর আগে তাঁর হিজায জয়ের পর পরই তাঁকে হিজাযে বাদশাহর প্রতিনিধির গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন (নজদে বাদশাহর প্রতিনিধি ছিলেন ফয়সালের বড়ো ভাই শাহযাদা সউদ-যদিও বাদশাহ নিজে বছরের অর্ধেকটা কাটাতেন হিজাযের রাজধানী মক্কায় আর বাকী সময়টা কাটাতেন নজদের রাজধানী রিয়াদে)।

বই-ঘরের পরিচালকটি ছিলেন মক্কার একজন তরুণ পন্ডিত। তাঁর সংগে কিছুকাল ধরে আমার দোস্তী। শাহযাদার সংগে তিনি আমার পরিচয় করিয়ে দেন।

ফয়সল আমার সাথে হাত মেলালেন এবং আমি যখন তাঁর দিকে মাথা নিচু করলাম, তিনি আঙুলের ডগায় আলতো করে আমার মাথাটা একটু পেছনদিকে ঠেলে দিলেন; তাঁর মুখ হৃদ্যতাময় স্মিত হাস্যে দীপ্ত হলো।

তিনি বললেন- ‘আমরা, নজদের মানুষেরা, বিশ্বাস করি না যে, এক মানুষ আরেক মানুষের নিকট মাথা নোয়াবে! সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে শুধু আল্লাহরই নিকট সে নোয়াবে মাথা।

শাহযাদাকে দয়ালু, স্বাপ্নিক এবং কিছুটা গম্ভীর ও লাজুক বলে মনে হলো। তাঁর সম্পর্কে আমার এ ধরণা আমাদের পরিচয়ের শেষ বছরগুলোতে আরো দৃঢ়মূল হয়। তাঁর ভাবভংগির আভিজাত্য কৃত্রিম নয়, এ যেন তাঁর ভেতর থেকে ঠিকরে পড়ছে, বিকিরিত হচ্ছে। সেদিন আমরা দু’জনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার একটা তীব্য  ইচ্ছা হলো, এই পুত্রের পিতার সাথে মুলাকাতের।

-‘বাদশাহ আপনাকে দেখলে খুশিই হবেন’, আমীর ফয়সল বললেন, ‘আপনি তাঁকে এড়িয়ে চলছেন কেন?’

‘পরদিন আমীরের সেক্রেটারী আমাকে একটা মোটরে করে নিয়ে গেলেন বাদশাহর প্রাসাদে। আমরা যাচ্ছি আল-মা’আলার বাজারের রাস্তা দিয়ে, যাচ্ছি ধীরে ধীরে –উট, বেদুঈন ও নিলামদারদের হট্টগোলে ভিড়ের মধ্য দিয়ে। নিলামদাররা বিক্রি করছে বেদুঈনদের দরকারী সমস্ত জিনিস-উটের জিন, আবায়া, গালিচা রূপার কাজ করা তরবারি, তাঁবু পিতলের তৈরি কফি –পাত্র। এদেরকে ছাড়িয়ে আমরা বের হলাম এক প্রশস্ততরো, নীরবতা ও অধিক খোলা রাস্তায়, এবং আখেরে গিয়ে পৌঁছলাম বাদশাহ যেখানে থাকেন সেই বিশাল প্রাসাদে। প্রাসাদের সামনেকার খোলা জায়গাটি জিন-আঁটা উটে গিজগিজ করছে এবং কয়েকজন সশস্ত্র খিলানওয়ালা কামরায়, যার মেঝেতে ছিলো কম-দামী গালিচা বিছানো, দেয়াল ঘেঁষে ছিলো খাকী কাপড়ে ঢাকা সুদীর্ঘ দীওয়ান এবং জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো সবুজ পাতাঃ এ হচ্ছে একটি বাগিচার শুরু, যা মক্কার মাটিতে অতি কষ্টের সাথে ফলানো হচ্ছিলো।

এক কৃষ্ণাংগ বান্দা এসে হাযির হলো-‘বাদশাহ আপনাকে দাওয়াত করেছেন।’

যে কামরা থেকে আমি এই মাত্র বের হয়ে এলাম তেমনি একটি কামরায় ঢুকলাম। তফাৎ এই যে, কামরাটি ছোটো এবং হালকা, তবে এর একটা দিক বাগিচার দিকে সম্পূর্ণ খোলা। দামী ইরানী গালিচায় মেঝে; বাগিচার দিকে খোলা একটা ঘুলঘুলি-জানালায় দীওয়ানের উপর বাদশাহ বসেছিলেন পায়ের উপর পা রেখে। তাঁর পায়ের কাছেই মেঝের উপর বসে সেক্রেটারী তাঁর ডিকটেশন নিচ্ছিলেন। আমি যখন ঢুকলাম, বাদশাহ দাঁড়িয়ে গেলেন, তারপর দু’হাত বাড়িয়ে বললেনঃ ‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘এ আপনারই ঘর,সহজ হোন।’

এ অভ্যর্থনার অর্থ ‘আপনি এখন আপনার নিজ পরিবারে প্রবেশ করেছেন; আপনি যেন আপনার আসন এখন সহজ জায়গার উপর রাখতে পারেন’ঃ খোশ-আপদেদ জানানোর এই প্রকাশ-ভংগিটি হচ্ছে সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে সুন্দর আরবীয় প্রথা।

মুহূর্তের জন্য সবিস্ময়ে আমি তাকাই বাদশাহ ইবনে সউদের বিশাল উচ্চতার দিকে। যখন (ততোদিনে আমি নজদী রীতির সাথে পরিচিতি হয়ে উঠেছি) আমি আলতো করে তাঁর নাকের ডগা ও  কপালে চুমু খেলাম, আমার উচ্চতা ছয় ফুট হওয়া সত্ত্বেও আমাকে পায়ের আঙ্গুলে ভর করে  দাঁড়াতে হলো, আর বাদশাহকে মাথা নিচু  করে ঝুঁকে পড়তে হলো আমার দিকে। তারপর তাঁর সেক্রেটারীর প্রতি একটি কৈফিয়তের দৃষ্টি হেনে তিনি বসে পড়লেন দীওয়ানে, আর আমাকে তাঁর পাশেই বসিয়ে দিলেনঃ

-‘একটি মিনিট, চিঠিখান শেষ হলো বলে।’

যখন তিনি শান্তভাবে ডিকটেশন দিয়ে যাচ্ছিলেন তখনি তিনি আমার সাথে আলপও শুরু করছিলেন-অথচ দু’বিষয়ের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেলো না একটিবারও। কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বাক্যের পর আমি তাঁর হাতে একটি পরিচয়পত্র দিলাম। তিনি তা পড়লেন, অর্থাৎ একইসংগে তিনটি কাজ তিনি করে চললেন, এবং তারপর, ডিকটেশন বন্ধ না ক’রে অথবা আমার ভালোমন্দের খবর নেয়া না থামিয়ে তিনি হুকুম দিলেন কফির জন্য।

ইতিমধ্যে আমি তাঁকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে দেখবার সুযোগ পেলাম। তাঁর দেহ এতো সুগঠিত এবং অংঘ –প্রত্যংগের বিন্যাস এতো পরিমিত যে তাঁর বিশাল দেহ-তিনি কমপক্ষে সাড়ে ছয় ফুট নিশ্চয় হবেন-শুধু তখনি ধরা পড়ে যখন তিনি দাঁড়ান। চিরাচরিত নীল –শাদা চেক ‘কুফিয়া’য় ঘেরা এবং জরীর কাজ-করা ‘ইগাল’ মাথায় তাঁর মুখমন্ডল তীব্র পৌরুষব্যঞ্জক। নজদী ফ্যাশন অনুযায়ী তিনি তাঁর দাড়ি ও গোঁফ ছেঁটে ছোটো করে রাখেন। তাঁর কপাল প্রশস্ত, নাক মজবুত আর ‍ উন্নত, ঈগল পাখীর ঠোঁটের মতো; তাঁর পূর্ণ মুখ, মোলায়েম না হয়েও ইন্দ্রিয়জ লাজুকতায় কখনো কখনো একেবারেই নারীসুলভ মনে হতো। যখন তিনি কথা বলেন তাঁর চেহারা মুখের পেশীর অস্বাভাবিক গতিময়তার জীবন্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু যখন তিনি চুপ করেন তখন তাঁর মুখখানাকে কেমন যেন করুণ মনে হয়-যেন তিনি তাঁর অন্তরের একাকীত্বে আবার ফিরে গেছেন। বাদশাহর চোখ দুটির গভীর অবস্থান এর জন্য কিছুটা দায়ী হতে পারে। তাঁর বাঁ-চোখের ঝাপসা দৃষ্টি তাঁর মুখমন্ডলের পরম সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ করেছে খানিকটা! একটা পর্দা দেখা যাচ্ছিলো বাদশাহর চোখটিতে। পরে তাঁর এই কষ্টের কাহিনী আমি জানতে পেরেছিলাম, যদিও বেশির ভাগ লোকই না জেনে বলতো বাদশাহর বাঁ- চোখটি আপনিতেই এমনটি হয়েছে; আসলে কিন্তু ব্যাপারটি ঘটেছিলো একটি দুঃখজনক অবস্থায়।

ক’বছর আগে, তাঁর বেগমদেরই একজন, বাদশাহকে মেরে ফেলার প্রকাশ্যে মতলবে বাদশাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ইবনের রশিদের খানদানের প্ররোচনায় আতরদানিতে বিষ ঢেলে দিয়েছিলো। এ ধরণের পিতলের তৈরি আতরদানি নজদে আনুষ্ঠানিক মজলিসে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রথামতো, আতরদানিটি  বাদশাহর মেহমানদের সামনে রাখার পূর্বে প্রথমে তা দেয়া হয় বাদশাহকে। প্রথমবার গন্ধ নিয়েই ইবনে সউদ টের পান গন্ধটা যেন কেমন বিদঘুটে লাগছে- সংগে সংগেই তিনি আতরদানিটি নিক্ষেপ করেন মেঝের উপর। তাঁর সতর্কতায় তাঁর জান বেঁচে গেলো, কিন্তু তার আগেই তাঁর বাঁ –চোখ আহত ও কিছুটা অন্ধ হয়ে পড়লো। তাঁর অবস্থায় বহু রাজ –বাদশাহ নিশ্চিতভাবেই এর বদলা নিতেন; কিন্তু ইবনে সউদ বিশ্বাসঘাতিনী নারীর উপর বদলা না নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন-কারণ, তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন যে, নারীটি তার আপন পরিবারের অনিবার্য প্রভাবেই এ কাজ করোছে, যেহেতু রশিদের পরিবারের সাথে সম্পর্কিত ছিলো এ নারীর পরিবার। তিনি শুধু তাকে তালাক দিলেন, তারপর প্রচুর সোনরূপা ও ইনামসহ তাকে পাঠিয়ে দেন ‘হইলে’, তার আপন বাড়িতে।

সেই পয়লা মুলাকাতের পর বাদশাহ প্রায় রোজই আমাকে ডেকে পাঠাতে লাগলেন। এক সকালে আমি তাঁর কাছে গেলাম একটি ইচ্ছা নিয়ে। বেশি আশা করিনি যে তা মঞ্জুর হবে, কারণ, আমি অনুমতি চেয়েছিলাম দেশের ভেতরে সফর করার, অথচ বাদশাহ সাধারণ বিদেশীদেরকে নজদ সফরের এজাজত দেন না। সে যা-ই হোক, আমি যখন প্রস্তাবটি তুলি-তুলি করছি বাদশাহ হঠাৎ আমার প্রতি একটা সংক্ষিপত্ত অথচ তীব্র দৃষ্টি হানলেন; এ এমন এক দৃষ্টি যে, মনে হলো তা আমার অনুক্ত ভাবনা-চিন্তার একেবারে মর্মে গিয়ে প্রবেশ করেছে; বাদশাহ স্মিত হাসলেন, তারপর বললেন-‘ও মুহাম্মদ  তুমি কি আমার সংগে নজদ আসবে না, এবং মাস কতক রিয়াদে থাকবে না?’

আমি একেবারে অবাক হয়ে গেলাম এবং আর যাঁরা ওখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের অবস্থাও হুবহু আমারই মতো মনে হলো। কোনো বিদেশীর প্রতি এমন স্বতস্ফূর্ত দাওয়াত প্রায় অশ্রুতপূর্ব ব্যাপার।

তিনি বলে চললেন, ‘আমি চাই যে, আসছে মাসে তুমি আমার সাথে মোটরে সফর করবে।

আমি বুক ভরে দম নিলাম এবং তারপর বললাম, ‘হে ইমাম, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। তবে মোটরে সফর করে আমার কি ফায়দা হবে? পাঁছ-ছ’দিনে মক্কা থেকে রিয়াদ ছুটে গিয়ে কি লাভ হবে আমার যদি না আমি আপনার দেশের কিছুই দেখতে পেলাম... মরুভূমি, কিছু বালিয়াড়ি এবং দিগন্তের ধারে কোথাও কিছু মানষ, ছায়ার মতো কিছু মানুষ ছাড়া? আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন, আপনার সকল মোটরের চাইতে একটি উটই হবে আমার জন্য বেশি উপযোগী!

ইবনে সউদ হাসলেনঃ ‘তোমার কি তাহলে আমার বদুদের চোখে চোখে তাকাবার লোভ হয়েছে? আমি তোমাকে আগে থেকেই হুঁশিয়ার করে দিচ্ছিঃ ওরা বড় অনুন্নত। আর আমার নজদ হচ্ছে মরুভূমি, এর কোন আকর্ষণই নেই; এ সফরে উটের জিন শক্ত মালুম হবে আর খাবার হবে দুষ্প্রাপ্য; ভাত, খেজুর এবং কচিৎ কখনো গোশত ছাড়া আর কিছু মিলবে না। কিন্তু তা যা-ই হোক, তুমি যদি উটে চড়েই সফর করতে চাও, তা-ই হবে এবং শেষতক এ-ও হতে পারে যে, আমার কওমকে চেনার পর তুমি আফসোস করবে নাঃ তারা গরীব, তারা কিছুই জানে না, তারা কিছুই নয়, কিন্তু তাদের হৃদয় সরল বিশ্বাসে পূর্ণ।’

এবং এর কয়েক হপ্তা পরেই একটি ঘুরতি পথে আমি বার হয়ে পড়ি রিয়াদের দিকে; সফরের সম্বলস্বরূপ বাদশাহ দিলেন উট, খাদ্যসম্ভার, একটি তাঁবু ও একজন হাদী  বা পদ-প্রদর্শক। রিয়াদে পৌঁছুতে আমার লাগলো দু’মাসেরও বেশি। এ-ই ছিলো আররের অভ্যন্তরে আমার পহেলা সফর, -আমার বহু সফরের মধ্যে প্রথম। কারণ বাদশাহ যে অল্প ক’মাসের কথা বলেছিলেন, সেই ক’মাসই গড়িয়ে গিয়ে ক’য়েক বছরে দাঁড়িয়ে গেলো, কত সহজেই না কয়েক বছর হয়ে উঠলো-যে বছরগুলি আমি শুধু ‍রিয়াদে নয়, আরবের প্রায় প্রত্যেক এলাকাতেই ঘুরে বেড়িয়েছি এবং উটের জিন এখন আর কঠিন মালুম হয় না!

‘আল্লাহ আবুদল আজীজকে দীর্ঘজীবী করুন,’ বললো তীক্ষ্ণমুখো লোকটি,- ‘তিনি ‘বদু’কে ভালোবাসেন এবং ‘বদুরা’ তাঁকে ভালোবাসে!’ আর কেনই বা তারা ভালোবাসবে না?- আমি নিজেকে শুধাই। নজদের বেদুঈনদের প্রতি বাদশাহ মুক্তহস্ত এবং তাঁর এই সাহায্য তাঁর হুকুমতের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। হয়তো খুব প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য নয়, কারণ বাদশাহ বিভিন্ন কাবিলার সর্দারদের ও তাদের অনুগতদের মদ্যে নিয়মিত যে –সব অর্থ- উপহার বিতরণ করেন তার ফলে তারা বাদশাহর ইনামের উপর এতোটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে যে, তারা নিজের চেষ্টায় নিজেদের জীবনের অবস্থা উন্নত করার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে এবং ক্রমে ক্রমে তারা হয়ে উঠেছে খয়রাত –ভোজী –জাহিল এবং  অলস থাকতেই  ‍খুশি।

তীক্ষ্ণমুখোর সংগে আমার আলাপের আগাগোড়া আমি লক্ষ্য করলাম-জায়েদ যেন কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠেছেঅ। সে যখন ওদের একজনের সংগে কথা বলছে তখনি ঘন ঘন তার চোখ রাখছে আমার উপর, যেনো সে দৃষ্টি আমাকে ইয়াদ করিয়ে দিতে চাইছে-এখনো দূর –দরাজ পথ রয়েছে আমাদের সামনে এবং পুরানো স্মৃতির রোমন্থন, ফেলে আসা অতীতের চিন্তা-ভাবনা উটের গতিকে ত্বরান্বিত করে না। আমরা বিদায় নিই। শাম্মার বেদুঈনেরা উট হাঁকিয়ে পূর্ব মুখে আগাতে থাকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বালিয়াড়ির আাড়লে হারিয়ে যায়। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকেই আমরা শুনতে পাই-ওদের একজন একটা যাযাবরী সুর ধরেছে-এমন গান, যা উট তাঁর সওয়ারীর গতি বাড়ানোর জন্য এবং উটে চড়ে চলার একঘেঁয়েমি দূর করার জন্য গেয়ে থাকি এবং জায়েদ আর আমি আবার আমাদের পশ্চিম মুখো পথ ধরি সুদূর তায়েমার দিকে, তখন সে ‍সুরটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় আমদের পেছনে এবং নীরবতা আবার ফিরে আসে।

তিন

-‘দেখুন, দেখুন,’ জায়েদের গলার স্বর নীরবতা ভাঙে,-‘একটি খরগোশ!

একটি ঝোপ থেকে এইমাত্র ধূসর পশমের যে বান্ডিলটি লাফ দিয়ে বের হলো আমি তার দিকে তাকাই আর জায়েদ পিছলে নেমে পড়ে তার জিন থেকে, জিনের আগা থেকে যে কাঠের ডাণ্ডাটি ঝুলে থাকে তাই খুলে নিয়ে। সে খরগোশটির পেছনে লাফিয়ে পড়ে এবং ছুঁড়তে যাবে অমনি তার পা আটকে যায় একটি ‘হামদে’র শিকড়ে, সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় মুখের উপর-আর খরগোশটি চোখের আড়ালে গায়েব হয়ে যায়।

-‘একটা চমৎকার খাবার হারালাম বটে’, আমি জায়েদের দিকে তাকিয়ে হাসি। জায়েদ নিজে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার নিজের হাতের ডাণ্ডাটি দিকে অনুশোচনা –মেশানো ‍দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে।

-‘কিন্তু এজন্য দুঃখ করো না, জায়েদ, খরগোশটি আলবৎ আমাদের কিসমতে ছিলো না।..

-‘না, আমাদের কিসমতে ওটি ছিলো না-কিছুটা আনমনা হয়ে সে জবা দেয়। তারপর দেখি কি-ও কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।

-‘তুমি কি আঘাত পেয়েছ, জায়েদ?’

-‘ওহ কিচ্ছুনা। শুধু আমার গোড়ালিটা মচকে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেরে যাবে।

কিন্তু সত্যি সে সেরে উঠলো না। জিনের পর বসে আরো ঘন্টাখানেক চলার পর আমি জায়েদের মুখে কিছু ঘাম দেখতে পাই এবং তার পায়ের দিকে যখন একবার তাকালাম-দেখতে পেলাম-তার গোড়ালিটি একদম মচকে গেছে এবং ভয়ানক ফুলেও উঠেছে।

-‘এভাবে চলার কোনো মানে নেই জায়েদ, চলো, আজ আমরা এখানেই তাঁবু খাটাই। এক রাতের বিশ্রামে তুমি সেরে যাবে।

জায়েদ সারারাত ছটফট করে যন্ত্রণায়। সুবহে সাদেকের অনেক আগেই সে উঠে পড়ে আর তার হঠাৎ চাঞ্চল্য আমাকেও জাগিয়ে দেয় আমার অস্বস্তিকর ঘুম থেকে।

-শুধ একটি উটই দেখতে পাচ্ছি, সে বলে, তারপর, আমরা চারদিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করি, জানোয়ার দু’টির একটি- জায়েদের উটটিই গায়েব হয়ে গেছে। আমার উট চড়ে জয়েদ তার উটের খোঁজে বার হতে চায়-কিন্তু তার পয়ের জখমের জন্য দাঁড়ানোই তারপক্ষে কঠিন; হাঁটা আর উটে চড়া এবং উট থেকে নামার তো কথাই ওঠে না।

-তুমি বরং আরাম করো জায়েদ, -তোমার বদলে আমি যাচ্ছি, আমি যে পথে যাবো সেই পথ ধরে আবার ফিরে আসা আমার পক্ষে কঠিন হবে না।

এবং সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আমি হারানো উটটির পায়ের নিশানা ধরে বের হয়ে পড়ি আমার উটে চটে; পায়ের দাগ আগিয়ে যায় বালু-উপত্যকার মধ্য দিয়ে একেবেঁকে, তারপর তা হারিয়ে গেলো বালিয়াড়ির আড়ালে।

আমি এক ঘন্টা চলি-তারপর আরেক ঘন্টা, তারপরও এক ঘন্টা; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জানোয়ারটির পদচিহ্ণ অনেক দূর গড়িয়ে যায় যখন আমি কিছুক্ষণের জন্য উট থেকে নামি-কয়েকটা খেজুর আর উটের সংগে বাঁধা মশক থেকে কিছু পানি খাই। সূর্য অনেক উপরে। কিন্তু কেন জানি, ওর চোখ ঝলসানো দীপ্তি এখন আর নেই। বছরের এই সময়ে সচরাচর যা ঘটে না, পিঙলবর্ণ মেঘ নিশ্চল ভাসছে আসমানের নিচে; এক বিস্ময়কর পুরু এবং ভারী বাতাস মরুভূমির বুকে চেপে আছে আর বালিয়াড়ির রূপরেখা, সাধারণত যেমন মোলায়েম হয়ে থাকে তার চাইতে সেগুলেকে অনেক অনেক বেশি স্নিগ্ধ করে তুলেছে।

আমার সম্মুখে উঁচু বালু পাহাড়ের চূড়ায় একটা অদ্ভূদ আন্দোলন আমর দৃষ্টি আকর্ষণ করে-ওটি একটি জানোয়ার? হয়তো হারানো উটটি! কিন্তু আরো মনোযোগ দিয়ে তাকালে পরে দেখতে পাই – আন্দোলনটি চূড়ার উপরে নয়-চূড়ারই মধ্যে । চূড়াটি চলতে শুরু করেছে খুব ধীরে, বিরাম না নিয়ে হালকাভাবে চলছে, অস্পষ্ট ঢেউ-খেলানো লহরী তুলে চলছে সামনের দিকে-তারপর মনে হলো ঢালু বেয়ে আমার দিকে গড়িয়ে পড়ছে-আস্তে আস্তে গড়িয়ে পড়া একট  ঢেউ-এর মাথার চূড়ার মতো। বালিয়াড়ির ওপাশ থেকে একটা গাঢ় রক্তিমতা লতিয়ে ওটে আসমানের দিকে। এই রক্তিমতার নিচে, বালিয়াড়ির রেখাগুলির তাদের তীক্ষ্ণতা হারিয়ে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে-যেনো হঠাৎ একটা যবনিকা টেনে দেয়া হয়েছে মাঝখানে; লালাভ এক ফিকে উদয়-রশ্নি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মরুভূমির উপর। বালু-মেঘ আমার মুখের উপর ও চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করে এবং সহসা বাতাস প্রচন্ড আঘাতে উপত্যকাটিকে ছেদ করে, ভেদ ক’রে ছিন্নভিন্ন করে চারিদিক থেকে শুরু করেলো গর্জন। প্রথম পাহাড়-চূড়াটির মতোই আমার দৃষ্টির ভেতরকার সকল বালু-পাহাড়ের চূড়াই বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝুরে ঝুরে  গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসমান একটি গভীর মরচে কাটা রং ধারণ করে এবং বাতাস ভরে ওঠে ঘূর্ণমান বালুকণায়, যা লালাভ ঘন কুয়াশার মতো সূর্য এবং দিবস, দুটিকেই ঢেকে দেয়। এ যে ধূলিঝড় এতে কোনোই সন্দেহ নেই!

হামাগুড়ি দিয়ে বসা উটটি আতংকে উঠে দাঁড়াতে চায়। বাতাস ততোক্ষণে ঝড়ের রূপ নিয়েছে। বাতাসের মধ্যে নিজেকে সোজা করে রাখার চেষ্টা করি এবং উটটির গলায় দড়ি বেঁধে বসিয়ে দিই; উটটির সামনের পা দু’টি আমি রশি দিয়ে বাঁধি এবং আরও নিশ্চয়তার জন্য ওর পেছনের একটি পা-ও। এরপর আমি নিজে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি মাটির উপর এবং আমার মাথার উপর ‘আবায়া’টি টেনে দিই। উড়ন্ত বালুতে যাতে শ্বস রোধ না হয় সেজন্য আমি উটটির বগলে আমার মুখ চেপে ধরি। আমি টের পাই, জানোয়ারটিও তার মুখ চেপে  ধরেছে আমার কাঁধের উপর, সন্দেহ নেই; এ কারনে আমি অনুভব করি- আমার যে দিকটায় উটের শরীরের আড়াল নেই । সে দিক থেকে বালু স্তূপীকৃত হচ্ছে আমার উপর;বালুর নিচে যাতে আমি একদম চাপা না পড়ে যাই সেজন্য আমি কিছুক্ষণ পর পর বাধ্য হয়ে স্থান বদলাতে থাকি।

আমার উদ্বেগ অহেতুক নয়, কারণ মরুভূমিতে হঠাৎ বালু-ঝড়ে পড়া আমার জন্য এ পয়লা নয়। আমার নিজের ‘আবায়ায় নিজেকে খুব এটেসেঁটে ঢেকে লম্বা হয়ে মাটির উপর পড়ে থাকি।

ঝড় কতোক্ষণে থামবে তার জন্য অপেক্ষা করি। বাতসের গর্জন আর আমার পোশাকের পতপত শব্দ ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই, রশি ছেড়ে দেওয়া পালের পতপত শব্দ-অথবা  বাতাসে পতাকার শব্দ-মার্চ করে চলা বেদুঈন ফৌজের হাতে দীর্ঘ-দণ্ডের মাথয় কওমী পতাকার পতপত শব্দের মতো, যেমনটি পতাকা নেচেছিলো এবং পতপত করেছিলো প্রায় পাঁচ বছর আগে নজদী বেদুঈন সওয়ারদের উপর; ওরা ছিলো কয়েক হাজার এবং আমিও ছিলাম ওদের মধ্যে। হজ্ব করার পর আমরা আরাফাত থেকে ফিরছিলাম মক্কায়! এ ছিলো আমার দ্বিতীয় হ্জ্ব যাত্রা। আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরভাগে বছর খানেক কাটিয়ে পবিত্র নগরীর পূর্বে আরাফাত প্রান্তরে হাজীদের জমাতে ঠিক হজ্বের সময়ে শামিল হবার জন্য আমি দেখতে পেলাম-আমি ছিলাম সাদা পোশাক-পরা নজদী বেদুঈনদের এক বিপুল জনতার সংগে-ধূলি প্রান্তরে হাজীদের জমাতে ঠিক হজ্বের সময়ে শামিল হবার জন্য আমি কোনো রকমে ফিরে এসেছিলাম মক্কায়। এবং আরাফাত থেকে ফেরা পথে আমি দেখতে পোম-আমি ছিলাম সাদা পোশাক-পরা নজদী বেদুঈনদের এক বিপুল জনতার সংগে-ধূীল প্রান্তরের উপর দিয়ে ঘন পদক্ষেপ এবং দ্রুত গতিতে উট হাঁকিয়ে চলেছে, সাদা পোশাক –পরা মানুষের এক সমুদ্র যেনো –কেউ মধুরাঙা হলদে উটের; উচ্চকিত পৃথিবী-কাঁপানো গতিতে নর্তন-কুর্দন করতে করতে আগিয়ে চলেছে হাজার হাজার উট যেন একটা অপ্রতিরোধ্য তরংগ ধেয়ে চলেছে সামনের দিকে-কওমী ঝাণ্ডাসমূহ গর্জন করছে বাতাসে এবং কওমী হাঁক-ডাক যার মাধ্যমে ওরা ওদের বিভিন্নর কওমের এবং ওদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপের কথা ঘোষণা করে থাকে-ঢেউয়ের আকারে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠেছে প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে। আসলে নজদের বাসিন্দাদের জন্য তথা মধ্য আরবে উচ্চ ভূমিসমূহের অধিবাসীদের জন্য যুদ্ধ আর হজ্বের উৎস একই.. . এবং অন্যান্য দেশের অসংখ্য হজ্বযাত্রী-যারা এসেছে মিসর থেকে, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে, উত্তর আফ্রিকা এবং জাভা থেকে- যারা এ ধরণের মত্ততায় অভ্যস্ত নয়, আতংকে ওরা আমাদের সন্মুখ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, কারণ সে গর্জনশীল বাহনিীর পথের কাছে দাঁড়িয়ে জানে বেঁচে থাকা কারো পক্ষে সম্ভব নয়, ঠিক যেমন ছুটে চলা হাজার হাজার উটের মধ্যে কোন আরোহী তার উটের পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়লে মৃত্যুই তার জন্য অবধারিত।

উঠের পিঠে সেদিনকার সে চলা যতো উন্মদাপূর্ণই হোক, আমি সে উন্মদনায় শারিক হয়েছিলাম এবং আমার অন্তরে একটা বুনো আনন্দ, বোঁ-বোঁ শোঁ – শোঁ ধ্বনি, আমি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম সেই বিশেষ মুহূর্তটির নিকট, গতি ও গর্জনের নিকট-আর আমার মুখের উপর দিয়ে ছুটে-যাওয়া বাতাস যেন গেয়ে উঠলে, ‘তুমি আর কখনো পরদেশী থাকবে না-আমার জাতির মধ্যে আর কখনো তুমি পর বলে গণ্য হবে না।

আমরা পতপত করা ‘আবায়া’র নিচে বালুর উপর শুয়ে থেকে আমি শুনতে পাই ধূলি-ঝড়ের গর্জন থেকেও যেনো প্রতিধ্বনি উঠছে-‘কখনো তুমি আর পরদেশী থাকবে না।

আমি পরদেশী নই। আরব  আমার স্বদেশ হয়ে উঠেছে। আমার পশ্চিমা অতীত যেনো বহু আগে দেখা একটা স্বপ্ন- এতোটা অবাস্তব নয় যে ভুলে যেতে পারি এবং এতোটা বাস্তব নয় যে আমার বর্তমানের অংশ হয় উঠবে । কথা এ নয় যে, আমি অলস স্বপ্ন-বিলাসী হয়ে উঠেছি- বরং যখনই আমি কোনো শহরে কয়েক মাস ধরে থাকি –যেমন মদীনায়, যেখানে আমার এক আরবী বিবি এবং এক শিশু ছেলে রয়ে, আর আছে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের উপর লেখা বইয়ে ভর্তি একটি বইঘর – আমি চঞ্চল হয়ে উঠি এবং কর্ম ও গতির জন্য, মরুভূমির শুল্ক প্রাণবন্ত হওয়ার জন্য, উটের ঘ্রাণ এবং উটের জিনের পরশের জন্য প্রলুব্ধ হয়ে উঠ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবনের বেশির ভাগ সময়ে (আমার বয়স এখন বত্রিশ-এর কিছু উপরে) ঘুরে বেড়ানোর যে তাগিদ আমাকে এতোটা অস্থির করেছে এবং বার বার আমাকে সকল রকমের ঝুকি ও বিপদ-আপদ  মুকাবেলার প্রতি প্রলুব্ধ করেছে তার উৎস এ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ততোটা নয়, যতোটা পৃথিবীতে আমার নিজের জন্য একটা স্বস্তির স্থান খুঁজে বার করার বাসানার মধ্যে, এমন একটা বিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য, যেখানে আমি যা কিছু ভাবি, অনুভব করি, কামনা করি,তার সংগে। এবং আমি যদি ঠিকমতো বুঝে থাকি, এই বছরগুলিতে অন্তরের এই আবিষ্কারের বাসনাই আমার ইউরোপীয় জন্ম এবং ইউরোপীয় পরিবেশে লালন-পালন যা কিছু আমার ভাগ্যে নির্ধারিত করেছে বলে মনে হয়েছিলো সেসব থেকে আমাকে ঠেলে দিয়েছে চিন্তা এবং বাইরের রূপ, উভয়দিক দিয়েই সম্পূর্ণ আলাদা এক নতুন জগত।

ঝড় যখন সম্পূর্ণ থামলো আমার চারদিকে জমে-ওঠা বালুর স্তূপ থেকে গা ঝেড়ে বের হয়ে এলাম। আমার উটটিও বালুতে অর্ধেকটা ডুবে আছে, কিন্তু তাই বলে অভিজ্ঞতা হিসাবে তা খুব খারাপ ছিলো না, কারণ এ রকমের অভিজ্ঞতা উটটির জীবনে অবশ্যি আরো বহুবার ঘটেছে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হলো, বালুতে আমার মুখ-কান এবং নাক ভর্তি করে দেওয়া আর আমার জিনের উপর থেকে ভেড়ার চামড়ার উড়িয়ে নেওয়া ছাড়া ঝড় আমাদের তেমন কোন ক্ষতি করেনি। কিন্তু শিগগীরিই আমার ভুল বুঝতে পারলাম।

আমার চারপাশে সব কটি বালিয়াড়ির রূপরেখা একেবারে বদলে গেছে। হারানো উটের ও আমার পায়ের দাগ মুছে গেছে ঝড়ে। আমি দাঁড়িয়ে আছি সম্পূর্ণ নতুন ভূমির উপর। এখন আর তাঁবুতে ফিরে যাওয়া অথবা নিদেনপক্ষে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু করবার নেই; সহায় কেবল সূর্য এবং দিক সম্পর্কে সাধারণ একটা ধারণা যা মরুভূমির সফরে অভ্যস্ত যে –কোন ব্যক্তিরই প্রায় একটা সহজাত অনুভূীতিবিশেষ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এ দুটি সহায়ও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়; কারণ বালিয়াড়ির জন্য আপনি একটা সোজা সরল পথে আগাতে পারবেন না – পারবেন না আপনি যে দিক অনুসরণ করতে চান সেই দিকে আগাতে।

ঝড়ের ফলে আমার পিয়াস লেগেছে ভীষণ, কিন্তু অল্প কয়েক ঘন্টার বেশি আমাকে তাঁবু থেকে দূরে থাকতে হবে না, এই ভরসায় আমি আমার ছোট্ট মশক থেকে শেষ চুমুক পানিটুকু অনেক আগেই খেয়ে ফেলেছি। যাইহোক, আমি তাঁবু থেকে দূরে এাসে পড়িনি তা নিশ্চিত এবং আমার উটটি, যদিও দুদিন আগে কুয়ার পাশে শেষবার যখন আমরা থেমেছিলাম তারপর আর পানি খায়নি, তবু আমার এই উটটি হচ্ছে একটি অভিজ্ঞ অভিযাত্রী এবং সে আমাকে বহন করে তাঁবুতে নিয়ে যেতে পারবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে দিকে তাঁবুটি রয়েছে বলে আমর মনে হলো সেই দিকেই আমি ফিরিয়ে দিলাম আমর উটটির মুখ, তারপর রওনা দিলাম ত্বরিত পদে।

এক ঘন্টা কেটে গেলো, তারপর আরেক ঘন্টা, তারপর আরেক ঘন্টা, কিন্তু জায়েদ কিংবা আমাদের তাঁবুর জায়গাটির কোন চিহ্ণ নেই। নারাঙ্গি –রঙ পাগাড়গুলির কোনো একটিরই আর পরিচিতি চেহারা নেই। ঝড় যদি না –ও হতো তবু এই পাহাড়গুলির মাঝে পরিচিতি কিছু খুঁজে বের করা সত্যি খুব মুশকিল হতো।

শেষ বিকালের দিকে আমি এসে পৌঁছি বালুর মধ্য থেকে  বেরিয়ে থাকা কতকগুলি গ্রানাইট শিলার নিকট; এসব বালু-বিস্তারের মধ্যে এ রকম শিলার সাক্ষাৎ মিলে ক্বচিৎ। দেখা মাত্রই আমি এগুলিকে চিনতে পারলাম। আমি আর জায়েদ গতকালই বিকালে, রাতের জন্য তাঁবু গাড়ার খুব আগে নয়, এর পাশ দিয়ে গিয়েছিলাম। আমি অনেকটা হাঁফ ছেড়ে  বাঁচলাম, কারণ জায়েদকে আমি যে জায়গায় পাবো বলে আশা করেছিলাম সেখান থেকে যে আমি দূরে এসে পড়েছি তাতে কোন সন্দেহ নেই; কালকের মতো কেবলমাত্র দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে সোজা এগিয়ে গেলেই চলবে, ওকে পেতে আর খুব বেগ পেতে হবে না।

আমার মনে আছে, এই শিলাগুলি আর আমাদের রাতের তাঁবুর মধ্যে ছিলো তিন ঘন্টার পথ; কিন্তু এখন যখন আমি আরো তিন ঘন্টার জন্য উট হাঁকিয়েছি, কিন্তু তাঁবু বা জায়েদের কোনো নিশানাই খুঁজে পেলাম না, আমি কি তবে তাকে আবার হারিয়েছি? আমি আগাতে থাকি, আগাতে থাকি বারবার দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে, আসমানে সূর্যের গতিবিধির দিকে সযত্ন লক্ষ্য রেখে। যখন রাত্রি নামলো, আমি স্থির করলাম আর আগানো একেবারেই অর্থহীন। তার চেয়ে বরং একু জিরিয়ে নিই এবং ভোরের আলোর জন্য অপেক্ষা করি! আমি উটটি থেকে নেমে তাকে বাঁধি এবং চেষ্টা করি কয়েকটি খেজুর চিবাতে কিন্তু বলতে কি, আমার ভীষণ পিয়াস পেয়েছে, তাই আমি খেজুরগুলি উটের সামনে রেকে ওর গায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ি।

থেকে থেকে আমার তন্দ্রা আসছে-ঠিক ঘুমও নয়, ঠিক ঘুমও নয়, ঠিক জাগরণও নয়, পর পর কয়েকটি স্বপ্নাবস্থা, যার মূলে রয়েছে শ্রান্তি। সেই তন্দ্রা বারবার টুটে যাচ্ছে তৃষ্ণার দরুন যা ক্রমেই ভয়ানক পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া অন্তরের গহীনতম প্রদেশের কোথাও, যা মানুষ নিজের কাছেও খুলে ধরতে চায় না, রয়েছে ভযের সেই শুভ্র সততা গা- মোচড়ানো মলাস্ক ১[শামুকজাতীয় কোমলাংগ প্রাণীবিশষ]- আমার কী হবে যদি আমি  জয়েদ ও আমাদের মশকগুলির নিকট ফিরে যাবার পথ আর না পাই? কারণ, এখানে থেকে যে –কোনো দিকেই রওনা করি না কেন, বহুদিন সফর করলেও কোনো বসতি বা পানি আর মিলবে না।

আবার রওনা করি ফজরে। রাতের বেলা ভেবে-চিন্তে এই সিদ্ধান্তে আসি যে, আমি নিশ্চয় দক্ষিণদিকে অনেক দূর চলে এসেছি। কাজেই আমি যেখানে রাত কাটিয়েছি জায়েদের তাঁবু সেখান থেকে উত্তর কিংবা উত্তর-পূর্বে কোথাও হওয়া উচিত। তাই,আমরা উত্তর, উত্তর-পূর্ব মুখে চলেছি বালু তরঙ্গ ভেদ করে এক উপত্যকা থেকে আরেক উপত্যকায়, কখনো ডানদিকের কখনো বামদিকের বালুর পাহাড়ের চারপাশে ঘুরে ঘুরে। দুপুরে আমরা আমরা জিরাই। আমার জিব লেগে আছে তালুর সাথে এবং মনে হচ্ছে এ যেন পুরানো চিড়-খাওয়া পুরু চামড়া। গলায় ঘা হয়ে গেছে আর চোখ জ্বালা করছে। আমার ‘আবায়াটা’ মাথার উপর টেনে দিয়ে আমি উটের পেটের সংগে গা ঘেঁষে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুম হলো না। বিকালে আবার আমরা রওনা করি, তবে এবার আরো পূর্বমুখে, কারণ এতোক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি আমরা পশ্চিমমুখো হয়ে অনেক দূর চলে এসেছি;কিন্তু আশ্চর্য, এখনো জায়েদ বা তাঁবুর কোন হদিসই নেই।

 এমনি করে আসে আরেকটি রাত। তৃষ্ণা হয়ে ওঠে যন্ত্রণা এবং পানির আকাংখা হয়ে ওঠে মনের একমাত্র অদম্য ভাবনা, যে-মন আর গুছিয়ে চিন্তা করতেও সক্ষম নয়। কিন্তু ভোরের সূর্য সমান আলো করার সাথে সাথে আমি আবার উঠে বসি আমার উটের পিঠে; সকাল গড়িয়ে, দুপুর গড়িয়ে আরো একটি দিনের বিকাল আসে; আমি উট হাঁকিয়ে চলেছি তো চলেছি। কেবল বালিয়াড়ি এবং তার শেষ নেই। কিংবা এই কি শেষ-আমার সকল পথের, চাওয়ার সকল পাওয়ার ইতি? -যাদের মধ্যে আমি আর কখনো পরদেশী বলে গণ্য হবো না তাদের মধ্যে  আমার সমাপ্তি ..? ‘আল্লাহ গো’, আমি প্রার্থনায় ভেঙে পড়ি- ‘তুমি আমাকে এভাবে ধ্বংস হতে দিওনা .. .।

বিকালে আমি একটা উঁচু বালিয়াড়ির চড়ি, চারদিকের ভূ-প্রকৃতি একটু ভালোভাবে দেখতে পাবো এই আশায়। যখন দেখলাম পূবে, বহুদূরে একটা কালো বিন্দুর মতো কী দেখা যাচ্ছে, আমার ইচ্ছা হলো, উল্লাসে চিৎকারের সামর্থ্য্ও আমার নেই। আমার সন্দেহ নেই যে, এই কালো দাগটি আর কিছু নয়, জায়েদের তাঁবু এবং মশক দুটি –পানি ভর্তি দুটি মস্ত মশক! ফের উটে চড়তে গিয়ে আমার হাঁটু দুটি ঠকঠক করে কাঁপাতে লাগলো। ধীরে ধীরে হুঁশিয়ারির সাথে আমরা সেই কালো দাগটির দিকে আগাতে থাকি-ওটি যে জায়েদের তাঁবু তাতে একটুও সন্দেহ নেই। আবার যাতে দিক না হারাই এজন্য এবার সব রকমের সতর্কতা অবলম্বন করি। আমি সোজা এক সরলরেখায় আগাতে থাকি –চলতে চলতে কখনো উঠি বালুর পাহাড়ে, কখনো নামি বালু উপত্যকায়, এইভাবে আমাদের কষ্ট দু’গুণ তিনগুন বাড়িয়ে। শুধুমাত্র এ আশাই আমাকে উদ্দীপিত করেছে যে, কিছুক্ষণ, বড় জোর এক দু’ঘন্টার মধ্যেই, আমি পৌছুবো আমার মঞ্জিলে। শেষ নাগাদ, শেষ বালিয়াড়ির চূড়াটি অতিক্রম করার পর আমার সেই মঞ্জিল স্পষ্ট হয়ে উঠলো আমার চোখের সামনে; আমি উটের মুখের লাগাম টেনে ধরি এবং প্রায় আধ মাইল দূরের সেই কালো দাগটির দিকে তাকাই। মনো হলো, আমার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেছে, কার আমার সামনে যা দেখতে পেলাম তা আর কিছু নয়, বালুর ভেতর থেকে বের হয়ে থাকা সেই কালো গ্রানাইট শিলাগুলি যা আমি জায়েদের সংগে তিন দিন আগে অতিক্রম করেছিলাম এবং দুদিন আগে একা আমি আবার অতিক্রম করেছি.. .

আমি বৃত্তাকারে ঘুরছি দুদিন ধরে।

চার

যখন জিন থেকে নামলাম তখন আমি একেবারেই ক্লান্ত, গায়ে জোর নেই একটু। এমনকি, উটের পা বাঁধার দিকেও আমর খেয়াল নেই। বলতে কি, জানোযারটিও এক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, পালিয়ে যাওয়ার ই্চ্ছাও তার নেই। আমার কান্না পেলো কিন্তু আমার শুকনো ফোলা ফোলা চোখ থেকে আসু এলো না এক ফোঁটাও।

আমি যখন কেঁদেছি তারপর কতো সময় অতিক্রান্ত হলো! .. . কিন্তু যা-ই হোক, সব কিছুই কি দূর অতীতের ব্যাপার নয়? সব কিছুই অতীতের বস্তু এবং বর্তমান বলে কিছুই নেই! আছে কেবল তৃষ্ণা .. . আর গরম .. আর যন্ত্রণা।

প্রায় তিন দিন হলো আমি পানি খাইনি। আর আমার উটটি শেষবার পানি খেয়েছে পাঁচদিন আগে। এভাবে হয়তো আরো একদিন, বড় জোর দু’দিন চলতে পারে। কিন্তু আমি জানি, আমি ততোক্ষণ আর চ লতে পারবো না। হয়তো আমার মৃত্যুর আগে আমি পাগলই হয়ে যাবো, কারণ আমার গায়ের ব্যাথার সাথে জড়িয়ে আছে আমার মনের ভয়; একটি থেকে জন্ম নেয় আরেকটি – জ্বালাময়, যন্ত্রণাপ্রদ-বিদারক! .. .

 আমি চাই বিশ্রাম নিতে, আরম করতে, কিন্তু সংগে সংগে আমি এ কথাও জানি যে, আমি যদি এখন আরাম করি আর কখনো উঠে বসতে পারবো না। আমি নিজেকে কোন রকমে টেনে নিয়ে আবার জিনের উপর চড়ি, তারপর আঘাত করে লাথি মেরে উটটিকে দাঁড়াতে বাধ্য করি। আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম জিনের উপর থেকে যখন উটটি পেছনের পা ‍দুটির উপর দাঁড়াতে গিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে-এবং আবার যখন সে সামনের পা দুটি সোজা করতে গিয়ে হেলে পড়ে পেছনদিকে। আমরা  চলতে শুরু করি ধীরে ধীরে যন্ত্রণার মধ্যে, পশ্চিমদিকে। পশ্চিমদিকেঃ কী তামাশা! কিন্তু আমি বাঁচতে চাই, আর এ জন্যই আমরা চলি, আগাতে থাকি।

আমাদের যেটুকু কুওৎ বাকি আচে তারি সাহায্যে সারা রাত থপথপ করে পা ফেলে চলি। আমি যখন জিন থেকে পড়ে যাই তখন নিশ্চয়ই হয়ে ভোর হয়ে গেছে। আমি শক্ত কিছুর উপর পড়িনি; বালু খুবই মোলায়েম এবং আরামদায়ক; মনে হলো যেনো আদরে আলিংগন করছে আমাদের। কিছুক্ষণের জন্য উটটি নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, পয়লা হাঁটুর উপরে তারপর পেছনে পা দুটির উপরে সে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দেয় এবং বালুর উপর গলা ছড়িয়ে দিয়ে আমার পাশে গুটিগুটি মেরে শুয়ে পড়ে।

আমিও শুয়ে পড়ি আমার উটের সংকীর্ণ ছায়ায়, বালুর উপর। আমার ‘আবায়া’ দিয়ে আমি নিজেকে মুড়ে দিই, আমার বাইরে মরুভূমির যে জ্বালা রয়েছে- এবং ভেতরে যে ব্যাথা তৃষ্ণা এবং ভয় রয়েছে তা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। আমার আর চিন্তা করার কোনো তাকৎ নেই। আমি আমার চোখ দুটি বন্ধ করতে পারছি না। চোখের পাতা একটু নড়লেই মনে হয় চোখের পুতুলের উপর যেনো উত্তপ্ত ধাতু নড়ছে। তৃষ্ণা এবং উত্তাপ.. .তৃষ্ণা এবং সর্বনেশে নীরবতা-উষ্ণ-শুল্ক নীরবাত, যা আমাকে ঢেকে দেয় তার নির্জনতা ও নৈরাজ্যের কাফনে, আমার কানে রক্তের ধ্বনি উটের ক্ষণিক দীর্ঘশ্বাসকে করে তোলে ভয়ংকর-যেন, পৃথিবীতে এগুলিই হচ্ছে শেষ ধ্বনি, আর আমরা দু’জন একটি মানুষ, একটি জানোয়ার-আমরা হচ্ছি পৃথিবীর বুকে হতভাগ্য শেষ জীবন্ত প্রাণী- ধ্বংস যাদের অবধারিত!

আামদের অনেক উপরে, তরল গরমের মধ্যে চক্কর খাচ্ছে একটি শকুন, একবারো না থেমে, আসমানের বিবর্ণ পটভূমিকায় একটি সূঁচের মাথা যেনো, উড়ছে মুক্তভাবে, সকল দিগন্তের উপর..

আমার গলা ফুলে গেছে-শুকিয়ে প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে কন্ঠনালী, আর প্রত্যেকটি নিশ্বাস যেন হাজার সূঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে আমার জিবের গোড়ায় –সেই বড় সেই মহৎ আলজিব, যার নড়ার কথা নয়, অথচ নড়াচড়া না ক’রে একটুও থামতে পারছে না। আমার ভেতরের সবকিছুই জ্বলছে, সবকিছু রূপ নিয়েছে এক বিরামহীন যন্ত্রণায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইস্পাত-সদৃশ আসমান উজ্বল হয়ে উঠলো আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে!

আমার হাত যেন নিাজে নিজেই প্রসারিত হয় এবং জিনের খিলের সংগে ঝুলানো ছোট বন্দুকটির কঠিন কোঁদার উপর গিয়ে লাগে। সংগে সংগে হাত থেকে যায় এবং আকস্মিক স্বচ্ছতায় আমার মন দেখতে পায়-কার্তুজের খোপে পাঁচটি তাজা কার্তুজ এবং ট্রিগারে একটু চাপ দিলেই ত্বরিত যা ঘটতে পারে তার স্বরূপ –কী যেন আমার ভেতরে , ফিসফিস করে বলে উঠলোঃ শিগগীর করো, আবার তুমি চলতে অক্ষম হয়ে পড়ার আগেই বন্দুকটি হাতে নাও।

এবং সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, আমার ঠোঁট নড়ছে এবং আমার মনের গহীন গুহা থেকে যেসব ধ্বনিহীন শব্দ আসছে সেগুলিকে আকার দিচ্ছেঃ ‘আমি তোমাদেকে পরীক্ষা করবো .. . নিশ্চয় পরীক্ষা করবো’, এবং ঝাপসা অস্পষ্ট শব্দগুলি ধীরে ধীরে আকার নেয়, হয়ে ওঠে কুরআনের একটি আয়াতের মতোঃ ‘আমি অবশ্য তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো ভয় দিয়ে, ক্ষুধা দিয়ে, সম্পদ জীবন ও ফল-ফসলের স্বল্পতা দিয়ে; তুমি খোশ খবর দাও তাদেরকে যারা ধৈর্যশীল এবং যখনি কোন মুসিবত আসে বলেঃ আমরা আল্লাহরই এবং আমাদের প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই দিকে।

সবকিছুই তপ্ত এবং বিষণ্ণ। এই জ্বালাময় বিষণ্ণতার মধ্যে আমি বাতসে একটি প্রাণ জুড়ানো নিশ্বাস অনুভব করি এবং তার মৃদু ঝিরঝির ধ্বনি শুনি, যেনো গাছপালার মধ্যে মর্মর ধ্বনি তুলে বাতাস বইছে-পানির উপর দিয়ে – এবং সেই পানির হচ্ছে সবুজ ঘাসে ঢাকা দু’পারের মধ্যে ধীরে ধীরে বয়ে চলা একটি ক্ষীণ স্রোত, আমার শিশুকালের বাড়ি কাছে। আমি শুয়ে আছি নদীর পারে – নয় কি দশ বছরের ছোট্ট বালক, একটা ঘাসের ডগা চিবাচ্ছি এবং তাকিয়ে আছি সাদা গরুগুলির দিকে –গরুগুলি ঘাস খাচ্ছে, নিকটেই, বৃহৎ মলিন চোখ মেলে তৃপ্তির সরলতা নিয়ে। দূরে কিষাণ রমণীরা মাঠে কাজ করছে। একজন পড়েছে একটা লাল রুমাল এবং চওড়া লাল ডোরাকাটা নীল স্কার্ট। সাদা হাঁস, পায়ের ধাক্কায় পানিকে ঝলসিয়ে দিয়ে। এবং মোলায়েম বাতাস ধ্বনি তুলে চলেছে আমার মুখের উপর, জানোয়ারে নিশ্বাসের ধ্বনির মতো। হ্যাঁ, তাই বটে- জানোয়ারেরই নিশ্বাস ফেলার  আওয়াজ। বৃহৎ সাদা গাভীটি, যার পায়ে সাদার মধ্যে ছিটানো রয়েছে তামাটে রংয়ের ফোঁটা, আমার একেবারেই কাছে এসে পড়েছে এবং এখন নাক দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে আমাকে ধাক্কা মারছে, আমার পাশেই আমি টের পাই গাভীটির পায়ের নড়াচড়া।

আমি আমার চোখ দুটি মেলি; শুনতে পাই আমার উটের হ্রেষাধ্বনি আর আমার পাশেই ওর পায়ের নড়াচাড় টের পাই; উটটি তার পেছনের পা দুটির উপর অর্ধেক দাঁড়িয়েছে ঘাড় এবং মাথা উপর দিকে তুলে, ওর নাকের ছেদাগুলি স্ফুরিত –যেন সে দুপুরের বাতসে হঠাৎ এবং শুভ সুগন্ধের আভাস পেয়েছে। ফের ও জোরে জোরে শব্দ করে নাক দিয়ে এক আমি টের পাই –ওর উত্তেজনা যেন তরংগের আকারে গলা বেয়ে নেমে কাঁধ হয়ে ওর অর্ধেত্থিক বিশাল দেহের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন মরুসফরের পর পানি গন্ধ পেলে উট এভাবেই নাক দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয় এবং শব্দ করে – এ আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু এখানে .. . এখনে তো পানি নেই। .. . আছে কি? আমি আমার মাথা সোজা করে, যে দিকে উটটি মুখ ফিরিয়েছে সেদিকে তাকাই দু’চোখ সেলে। উটটি মুখ ফিরিয়েছে আমাদের সবচেয়ে নিকটের বালিয়াড়িটির দিকে – আকাশের ইস্পাতসদৃশ শূন্যতার পটভূমিকায় একটা নিচু শীর্ষ –সেখানে কিছুই নড়চে না বা কোন শব্দ ও হচ্ছে না –কেবল শোনা গেলো একটা অস্ফুট ধ্বনি, পুরোনো এক বীণার তারের স্পন্দনের মতো, খুবই কোমল এবং ভংগুর, তীক্ষ্ণঃ সে তীক্ষ্ণ, উচ্চ ও ভংগুর ধ্বনি এক বেদুঈনে কন্ঠের –যে উট হাঁকিয়ে গেছে চলেছে উটের পায়ের তালের সাথে ছন্দের মিল রেখে,বালু পাহাড়ের মাথার ঠিক ওপশেই দূরত্বের বিচারে একবারেই নিকটে, কিন্তু মুহূর্তের  ভগ্নাংশেল মধ্যে আমি জানতে পারি, আমার নাগালের অনেক দূরে সেই স্থান, আমার কন্ঠস্বর ওখানে কিছুতেই পেছুবে না। নিশ্চয় ওখানে মানুষ আছে, কিন্তু ওদের নিকট পৌছুবার তাকৎ মোটেই নেই আমার। এমনকি, আমি এতো দূর্ব যে, দাঁড়াবার ক্সমতাও আমার নেই। আমি চেষ্টা করি চিৎকার করতে –কিন্তু আমর গলা থেকে কেবল একটি কর্কশ গোঙানি ছাড়া কিছু বার হলো না। তখন, নিজে নিজেই আমার হাত গিয়ে পড়ে জিনের সংগে ঝুলানো আমার ছোট্ট বন্দুকটির শক্ত কোঁদার উপর .. .  এবং আমি আমার মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাই কার্তুজের খোপে পাঁচটি তাজা কার্তুজ!

একটা চূড়া্ত চেষ্টার ফলে আমি জিনের খিল থেকে বন্দুকটি খুলতে পারলাম। বেন্ট থেকে বন্দুকে কার্তুজ পোরা –একটা পর্বতকে মাথার উপর তোলার মতো ভারি মনে হলো, তবু, শেষ পর্যন্ত তাতে সক্ষম হলাম। এরপর আমি বন্দুকটি কোঁদার উপর দাঁড় করিয়ে বন্দুকের নল সোজা আকাশের দিকে রেখে ট্রিগার টেনে দিই। বুলেটটি শন করে শূন্যতায় হারিয়ে গেলো অতি করুণভাবে, অতি ক্ষীণ একটি শব্দ করে। আবার  বন্দুকের নল ভেঙে তাতে কার্তুজ পুরে ‍ছুঁড়ি আর কান পেতে থাকি। বীণার সুরের মতো সেই গান থেমে গেছে। মুহূর্তের জন্য রইলো কেবল নীরবতা, আর কিছুই না। হঠাৎ বালিয়াড়ির মাথার উপরে দেকা দিলো। একটি মানুষের মাথা, তারপর কাঁধ এবং সেই লোকটির পাশে আরেকটি মানুষ। তারা কিছুক্ষনের জন্য তাকালো নিচের দিকে, তারপর ঘুরে তাদের অদৃশ্য সাথীদের কী যেনো বলো চিৎকার করে উঠলো; এরপর ওরা হামাগুলি দিয়ে বালিয়াড়ির মাথার চড়ে এবং অর্ধেক দৌড়ে, অর্ধেক ঢালু বেয়ে পিছলে নেমে ছুটে এলো আমার দিকে।

আমাকে গিরে প্রচন্ড উত্তেজন, দু’তিনজন মানুষ-এই নিঃসংগ নির্জনতর পর কী বিশাল জনতা! ওরা আমাকে তোলার চেষ্টা করছে; ওদের ক্রিয়া –কলাপ, হাত আর পায়ের এলোপাতাড়ি নড়াচড়ার এক অতি বিভ্রান্তিকর দৃশ্য! আমি যেন জ্বলন্ত ঠান্ডা বরফ এবং আগুন অনুভব করি আমার ঠোঁটের উপর এবং দেখতে পাই এক দাঁড়িওয়াল বেদুঈনের মুখ  ঝুঁকে আছে আমার উপর, আর তার হাত এক ময়লা ভেজা তেনা ঠেলে দিচ্ছে আমার মুখের ভেতর। লোকটির আরেকটি হাত ধরে আছে একটি খোলা মশক। আমি আপনা আপনি হাত বাড়াই মকটির দিকে, কিন্তু বেদুঈনটি আমার হাত ঠেলে পেছন-দিকে; তেনাটি পানিতে ডুবিয়ে আবার সে কয়েক ফোঁটা পানি সেই তেনা চিপে আমার ঠোঁটের মধ্যে দেয়;আর এই পানি যাতে আমার মুখে ঢুকে আমার গলা গলা পুড়িয়ে না দেয় সেজন্য আমি দাঁতের সংগে দাঁত চেপে রাখি। কিন্তু বেদুঈন আমার দাঁত আলাদা না করে আমার মুখে আবার কয়েক ফোঁটা পানি দেয়। এ তো পানি নয়, যেন গলানো সীসা। ওরা আমার সাথে এরূপ ব্যবহার করছে কেন? আমি পালিয়ে বাঁচতে চাই এদের জূলুম থেকে। কিন্তু ওরা আমাকে ধরে রাখে। শয়তান সব! আমার চামড়া জ্বলছে; আমার সারা গায়ে আগুন লেগেছে। ওরা কি মেরে ফেলতে চাই আমাকে? হায় যদি কেবল বন্দুকটি ধরবার মতো শক্তি থাকতো আমার আত্মরক্ষার জন্য! কিন্তু ওরা আমাকে হা করিয়ে আমার মুখে কয়েক ফোঁটা পারি দেয়; এ পানি গোলা ছাড়া আমর আর উপায় রইলো না। আশ্চর্য! কিছুক্ষণ আগরে মতো অতো তীব্রভাবে আরদহন করছে না এ পানি; মাথার উপরে ভেজা নেকড়াটা ভালোই লাগছে এবং ওরা যখন পানি ঢাললো গায়ের উপর, ভেজা কাপড়ের স্পর্শ নিয়ে এলো উল্লাসের এক শিহরণ.. .

এরপর সব কিছু কালো হয়ে আসে; আমি নামছি এক গহীন কুয়ায় –এতো দ্রুত গতিতে নামছি যে, বাতাস আমার কানের পাম দিয়ে ছুটে যায় হুহু করে, শোঁ- শোঁ করে, আর সেই শোঁ-শোঁ ধ্বনি রূপ নেয় গর্জনে –গর্জনমুখর কৃষ্ণতায়.. . কালো- কালো.. .

পাঁচ

কালো .. . কালো. .. নরম মোলায়েম কালো, যার কোনো শব্দ নেই –একটা মহৎ সহৃদয় আঁধার, যা আমাকে আলিংগন করে গরম এক কম্বলের মতো এবং মনে জাগায় এই কামনা যে, আমি যেনো সবসময় এভাবেই থাকতে পারি, এমনি আশ্চর্য রকমে ক্লান্ত, নিদ্রালু আর আলসে। কোনো প্রয়োজন নেই আমার চোখ দুটি মেলার কিংবা আমার বাহু  নাড়ানোরঃ তবু আমি আমার বাহু নাড়ি, আমার চোখ মেলি, কেবল আমার মাথার উপরে অন্ধকার দেখার জন্য –কালো ছাগ-পশম দিয়ে তৈরি বেদুঈনের তাঁবুর পশমী-আধাঁর, যার সমুখ দিকে রয়েছে সংকীর্ণ খোলা জায়গা, যার ফাঁক দিয়ে আমি দেখতে পাই তারা ঝিলমিল রাতের আসমানের একটি টুকরা এবং তারার আলোতে নিচে একটি ঝলমলো বালিয়াড়ির এক মোলায়মে বাঁক। .. . তাপরপর –তারপর তাঁবুর সেই ফাঁকটুকু আঁধার হয়ে ওঠে এবং একটি মানুষের মূর্তি এসে দাঁড়াই  সেই ফাঁকটুকুর মধ্যে – তার ঝূলন্ত জোব্বার নকশা যেন আকাশের গায়ে খোদাই করা এবং আমি শুনতে পাই জায়েদের চিৎকার – ‘জেগে আছেন, ‘উনি জেগে আছেন’! এরপর তার কঠোর সংযত মুখখান ঝুঁকে পড়ে প্রায় আমার মুখের উপর; জায়েদ তার হাত দিয়ে ধরে আমার কাঁধে। আরেকজন মানুষ ঢোকে তাঁবুর ভেতর। আমি তাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু সে যখন আস্তে ভারিক্কি গলায় কথা বলতে শুরু করলো আমি সংগে সংগে বুঝতে পারি, সে শাম্মার কবিলার বেদুঈন।

আবার আমি অনুভব করি এক তপ্ত সর্বশেষে পিয়াস এবং জায়েদ আমার দিকে দুধের যে বাটি আগিয়ে ধরেছে তা চেপে ধরি সাজোরে। কিন্তু আমি যখন তা গিললাম তখন আর কোনো যন্ত্রণা রইলো না। আমি সেই দুধ খাচ্ছি যখন জায়েদ বর্ণনা করে চলে-কীভাবে এই ছোট্ট বেদুঈন দলটি বালু-ঝড় শুরু হলো তার কাছেই তাঁবু খাটাতে এলো,তারপর যখন হারানো উটটি রাতের বেলা নিজে নিজে ফিরে এলো তখন তার কেমন চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো এবং কী করে সকলে জোট বেঁধে বের হয়েছিলো আমাকে খুঁজতে, কীভাবে প্রায় তিন দিন পরে যখন তারা সব আশাই একরকম ছেড়ে দিয়েছিলো, তখন ওরা বালিয়াড়ির আড়াল থেকে শুনেছিলো আমার বন্দুকের আওয়াজ…

এরপর, ওরা আমার উপর খাটিয়ে দিলো একটি তাঁবু আর আমাকে হুকুম করা হলো, আমি যেনো আজ রাত এবং আগামীকাল এ তাঁবুর ভেতর পড়ে থাকি। আমাদের বেদুঈন বন্ধুদের কোনা তাড়াহুড়া নেই; তাদের মশকগুলি পানিতে ভর্তি, এমনকি তারা পুরা তিন বালতি পানি দিল আমার উটটিকে, কারণ, ওরা জানে, দক্ষিণদিকে একদিনের পথ গেলেই, ওরা আর আমরা গিয়ে পৌছুবো একটি ওয়েসিস – যেখানে রয়েছে প্রচুর খাদ্য – ‘হামদ –ঝোপ।

কিছুক্ষণ পর জায়েদ আমাকে তাঁবু থেকে বের করে, তারপর বালুর উপর একখানা কম্বল বিছিয়ে দেয়। আমি শুয়ে থাকি তারা –ভরা আসমানের নিচে।

কয়েক ঘন্টা পর আমি জায়েদের কাফি-পাত্রের টুঙটাঙ শব্দে জেগে উঠি-টাটকা কফির গন্ধ যেনো রমণীর উষ্ণ  আলিংগন!

-‘জায়েদ’! আমি চিৎকার করে উঠি; বিস্ময়ের সাথে আমি লক্ষ্য করি, আমার গলার আওয়াজ যদিও এখনো ক্লান্ত তবু এখন আর তা কর্কশ নয়- ‘তুমি আমাকে কিছু কফি দেবে?’

-‘আল্লাহর কসম চাচা, অবশ্যি দেবো’, জায়েদ পুরানো আরবী রসুম মুতাবিক জবাব দেয়, আরববাসী এভাবেই তাকে সম্বোধন করে যাকে সে দেখাতে চায় সম্মান, তা সে বক্তার চেয়ে বয়সে বড়োই হোক অথবা ছোটই হোক, (যেমন আমাদের বেলায়- আমি জায়েদের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট)-আপনার দীল যতো চায় ততো কফি আপনি পাবেন।’

আমি কফি খাই আর জায়েদের প্রসন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসি-‘আচ্ছ ভায়া, বুদ্ধিমান লোকের মতো ঘরে না থেকে আমরা এরূপ বিপদের মুখে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছি কেন বলো তো?’

-‘কারণ, জায়েদ এবার আমার দিকে তাকিয়ে দঁত বের করে হাসে, আপনার আর আমার মতো লোকের পক্ষে যতো দিন না হাত পা কঠিন হয়ে উঠেছে আর আমরা যয়ীফ হয়ে পড়েছি ততোদিন ঘরে  বসে থাকা সম্ভব নয়! তাছাড়া মানুষ কি নিজেদের ঘরে থেকে মরে না? মানুষ কি তার অদৃষ্টকে ঘাড়ে করে নিয়ে চলে না-থাকুক না সে যেখানেই?

জায়েদ ‘অদৃষ্ট’ অর্থে ব্যবহার করে ‘কিসমা’ শব্দটি‘-কিসম’ মানে ‘যা ভাগ্যে নির্ধারিত হয়েছে।’ এই শব্দটি তুর্কী রূপ ‘কিসমত’, প্রতীচ্যে সুপরিচিত। আরেক পোয়ালা কিফ পান করতে আমার মনে হলো, এই আরবী শব্দটির একটি গভীরতরো অর্থও আছে –‘যাতে মানুষের অংশ আছে তাই –তো কিসমত।’

যাতে অংশ আছে মানুষের, তা-ই.. .

শব্দগুলি আমার স্মৃতিতে একটা ক্ষীণ বিলীয়মান ধ্বনি জাগায়, সংগে সংগে আমার সামনে ভেসে ওঠে একটি ক্লিষ্ট হাসির দৃশ্য.. . কার হাসি? এক ঝাঁক ধোঁয়া, উৎকট ধোঁয়া, যেন হাশিশের ধোঁয়া, আর তারি আড়ালে একটা ক্লিষ্ট হাসি, হ্যাঁ, এ ছিলো হাশিশেরই ধোঁয়া, আর হাসিটি ছিলো, আজতক  আমি যতো মানুষের সাথে মিশেছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিচিত্র ব্যক্তিটির হাসি। আমার জীবনের বিচিত্র এক অভিজ্ঞিতার পর ওর সাথে আমার মুলাকাত হয়েছিলো! এক বিপদ. .. যা মনে হয়েছিলো.. . হ্যাঁ কেবলি মনে হয়েছিলো আসন্ন, সে বিপদ থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য আমি না জেনেই ধেয়ে চলেছিলাম, আরেক বিপদের দিকে, আর সে বিপদ –আমি যা এড়াবার চেষ্টা করেছিলাম, তার চেয়ে ছিলো অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি আসন্ন.. . এই অবাস্তব ও বাস্তব বিপদ-এ দু’য়ে মিলে আমাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলো এক নতুনতরো মুক্তির দিকে।

ব্যাপারটি ঘটেছিলো আট বছর আগে। আমি যাচ্ছিলাম ঘোড়ায় চড়ে আমার তাতার নওকর ইবরাহীমকে সাথে নিয়ে, শিবাজ থেকে দক্ষিণ ইরানে নাইরস হ্রদের কাছে, একটি পাড়ো, পাতলা বসতি, পথ-ঘাটহীন এলাকা কিরমানের দিকে। তখন শীতকাল-আর এই শীতকালে এলাকাটি হয়ে পড়েছিলো প্যাঁচ-প্যাঁচে কর্দমাক্ত একটি স্তেপ বিশেষ; আশেপাশে কোনো গাঁও-গেরাম নেই, দক্ষিণদিকে, কুহ-ই-গুশনেগান অর্থাৎ ‘ভুখাদের পাহাড়’ কর্তৃক ঘেরা সেই জলাভূমি গিয়ে স্পর্শ করেছে হ্রদটির কিনার। বিকালে আমরা যখন একটি আলগোছে পাহড়ের চারদিকে ঘুরছিলাম, হঠাৎ আমাদের নজরে পড়লো হ্রদটি-একটি নিস্তব্ধ সবুজ সমতল, যেখানে নেই কোনো আলোড়ন, শব্দ অথবা জীবন, কারণ এর পানি এতো নোনা যে, এতে কোনো মাছই বাঁচতে পারে না। গুটিকয়েক পংগু গাছপালা আর কিছু মরু-তৃণ ছাড়া হ্রদটির তীরের নোনা মৃত্তিকায় কোন উদ্ভিদই জন্মায় না।  ভূমিটি কাদা মেশানো তুষারের পাতলা আস্তরণে ঢাকা এবং তার উজান দিকে তীর থেকে প্রায় দু’শো গজ দূরে চলে গেছে একটি সরু ক্ষীণ পথ।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে; আমাদের আজকের রাতের মঞ্জিল খানই-ই –খেত সরাইখানার কোন নিশানাই মিললো না এখনো। কিন্তু যে-কোনো মূল্যেই হোক আমাদের পৌছুতেই হবে ওখানে। দূরে-বহুদূর তক আর কোনো বসতি নেই এবং জলাভূমিটি কাছে হওয়ায়, অন্ধকারে আমাদের আগানো খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠে। আসলে সকালেই আমাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিলো ওখানে একাকী না আগাতে, কারণ একটিমা্ত্র ভূল পদক্ষেপের ফলেই ঘটতে পারে সহজ এবং আকস্মিক মৃত্যু। তাছাড়া, ভেজা প্যাঁচ-প্যাঁচে জমির উপর দিয়ে দীর্ঘ একটা দিন চলার পর আমাদের ঘোড়াগুলি হয়ে পড়েছিল খুবই ক্লান্ত-ওদের জন্যও এখন দরকার বিশ্রাম এবং খাবার।

রাত আসার সাথে সাথে শুরু হরো মুষলধারে বৃষ্টি। আমরা চলছি ভিজতে ভিজতে বিষণ্ণচিত্তে এবং নীরবে- আমাদের নিজেদের বেফায়দা চোখের চাইতে ঘোড়ার সহজাত অনুভূতির উপরই আমরা নির্ভর করছি বেশি। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় .. . কিন্তু কোথায় সেই সরাইখানা? কোন নিশনাই নেই! হয়তো আমরা অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে সরাইখানাটিকে পেছনে ফেলে এসেছি; ফলে আজ হয়তো আমাদেকে রাত কাটাতে হবে খোলা জায়গায় –বর্ষনের নীচে, যে বর্ষণ ক্রমেই তীব্র ও জোরদার হয়ে উটেছে! আমাদের ঘোড়ার খুর পানিতে আঘাত হেনে ছিটাতে থাকে পানি, আমাদের ভেজা কাপড়গুলি ভারি বোঝার মত লেপ্টে  থাকে আমাদের গায়ের সাথে। উচ্ছ্বসিত পানির পর্দার আবরনে কালো এবং নিশ্চিদ্র রাত ঝুলে আছে আমাদের চারপাশে। আমাদের হাড্ডি পর্যন্ত শীতে ঠক ঠক করছে-কিন্তু জলাভূমিটি যে আমাদের নিকটেই রয়েছে এ জ্ঞান আমাদেরকে আরে বেশি শংকিত করে তুলেলো। ঘোড়াগুলি একটিবারের মতো কঠিন মৃত্তিকার উপর পা ফেলতে ভুল করে তাহলে আল্লহ যেন আমাদের উপর রহম করেন! –সকালবেলা হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিলো আমাদেরকে।

আমি চলছি আগে, আর ইবরাহীম আমার পেছনে, সম্ভবত দশ পা তফাতে।  বারবার মনে হানা দিতে থাকে সেই ভয়ংকর জিজ্ঞাসা-আমরা কি অন্ধকারে খান-ই-খেত পেছনে ফেলে এসেছি? ঠান্ডা বৃষ্টির নিচে রাত কাটানো-কী যে অশুভ সম্ভাবনা! কিন্তু আমরা যদি অনেক দূর গিয়েই থাকি তাহলে জলাভূমিটি গেলো কোথায়?

হঠাৎ আমি ‍শুনতে পাই একটি নরম মোলায়েম চপচপ শব্দ, আমার ঘোড়ার খুরের নিচে। আমি টের পেলাম জানোয়ারটি কাদার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে-কিছুটা ডুবে যাচ্ছে, কিছুটা ডুবে গেছে,তারপর মরিয়া হয়ে একটা পা তুলছে এবং আবার ডুবে যাচ্ছে। সহসা এই চিন্তা আমার মনকে বিদীর্ণ করে দেয়-আমরা কি তাহলে জলাভূমিতে পা দিয়েছি? আমি সাজোরে লাগাম টেনে ধরি এবং ঘোড়ার দু’পাশে দু’পা দিয়ে সাজোরে লাথি মারতে থাকি। ঘোড়াটি তার মাথা উপর দিকে তুলে ভীষণ ভাবে দাপাদাপি শুরু করে। আমার চামড়া ফেটে নির্গত হতে লাগলো ঠান্ডা ঘাম। রাতটা এতো কালো যে, আমি আমার নিজের হাত দুটি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না; কিন্তু নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ঘোড়াটি শরীর যেভাবে স্ফীত হচ্ছে, তাতে টের পেলাম, কাঁদার আলিংগন থেকে বাঁচার জন্য কী মরিয়া হয়েই না ও চেষ্টা করছে। প্রায় কোনো রকম ভাবনা না করেই আমি হাতে নিই ঘোড়ার চাবুকটি যা ব্যবহার না করে সাধারণত ঝুলানো থাকে আমার হাতের কব্জিতে এবং আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই চাবুক দ্বারা আঘাত করি ঘোড়াটির পাছার উপর; উদ্দেশ্য –এভাবে যদি ঘোড়াটিকে কার শেষ শক্তিটুক খাটানোর জন্য উত্তেজিত করা যায়, কারন ঘোড়াটি যদি এই মুহূর্তে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সে দেবে যাবে এবং তার সাথে আমিও ডুবে যাবো এ কাঁদার মধ্যে, গভীর হতে গভীরে। এ ধরণের মার কেতে অনভ্যস্ত হতভাগা জানোয়ারটি-অসাধারণ গতি ও শক্তির অধিকারী কাশগাই টাটু –পেছনের দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেলো-তারপর চারটি পায়ে আবার আঘাত করতে লাগলো জামিনের উপর; কাঁদা থেকে বাঁচার জন্য ঘন ঘন দম ফেলতে মরিয়া হয়ে সে চেষ্টা করে, লাফ দেয়, আবার নিজেকে নিক্ষেপ করে সম্মুকদিকে, আাবর পিছলে পড়ে যায়- এবং বিরতি না দিয়ে নরম কাদামটির উপর বারবার  পড়তে থাকে ঘোড়াটির খুরের আঘাত।

আমার মাথার উপর দিয়ে একটি রহস্যময় বস্তু বয়ে যায় শোঁ শোঁ আওয়াজ ক’রে, আমি আমার মাথা তুলি সংগে সংগে, আর আমার উপর এসে পড়ে এটা কঠিন ধারণা-বহির্ভূত আঘাত, কিন্তু কোত্থেকে? সময় এবং চিন্তা একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর তালগোল পাকিয়ে যায়।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ঘন্টার পর ঘন্টার মতোই দীর্ঘ, বৃষ্টির ছাট আর ঘোড়ার হাফানির ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনতে পাচ্ছি সেই জলাটি চুষে চুষে পান করছে সেই ধ্বনি। আমাদের অন্তিম মুহূর্ত নিশ্চয় আসন্ন। রেকাব থেকে আমি আমার পা দুটি শিথিল করে দিলাম, তারপর তৈরি হলাম জিনের উপর থেকে লাফিয়ে পড়া একা আমার ভাগ্য পরীক্ষা করতে .. হয়তো কাদার উপর চিৎ হয়ে পড়ে থাকলে আমি নিজেকে বাঁচাতেও পারি – আমার মনের অবস্থা যখন এই , হঠাৎ অবিশ্বাস্য রকমে আমার ঘোড়াটি খুব শক্ত কঠিন মাটির উপর আঘাত হানলো সজোরে একবার .. . দুবার .. এবং আমি, মুক্তির উল্লাসে ফুপিয়ে উটে লাগাম টেনে ধরলাম আর কাঁপতে থাক জানোয়ারটিকে থামিয়ে দিলাম। আমরা বেঁচে গেলাম।

এই মুহূর্তে হঠাৎ আমার মনে পড়লো সংগীর কথা, আর আমি ভয়ে বিহ্বল হয়ে চিৎকার করে উঠরাম.. . ‘ইবরাহীম!’ কিন্তু কোনো জবাব নেই। আমার হৃদপিণ্ড জমে গেলো।

‘ইবরাহীম!’ কিন্তু আমাকে ঘিরে রয়েছে কেবল এক আধাঁর রাত আর বর্ষণ। ও কি তাহলে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি? কর্কশ স্বরে আমি আবার চিৎকার করে ডাকি ‘ইবরাহিম।’

এবং তখন প্রায় অবিশাস্য রকমে, অনেক দূর থেকে অস্পষ্ট ভেসে এলো একটা চিৎকারের আওয়াজ ‘এই যে.. . আমি এখানে।;

এখন আমার বুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পালা! আর এতে বিপুল ব্যবদানে একজন আরেকজন থেকে আলাদা হয়ে পড়লাম কী করে?

-‘ইবরাহীম!’

-‘এই যে .. .এই যে’.-

এবং আমি ঐ শব্দ অনুসরণ করে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াটাকে টানতে টানতে প্রতি ইঞ্চি মাটি পা দ্বারা পরখ করে খুব ধীরে ধীরে অত্যন্ত সতর্কতার সংগে দূরবর্তী সে কন্ঠস্বরের দিকে হাঁটতে থাকিঃ ইবরাহীম .. . ইবরাহীম শান্তভাবে বসে আছে ঘোড়ার জিনের উপর।

-‘তোমার কি হয়েছিলো ইবরাহীম? তুমিও কি ভুল করে জলাভূমিতে গিয়ে পড়েছিলে?’

- জলাভূমী? না তো। কেন জানি না আপনি হঠাৎ যখন ঘোড়া হাকিয়ে গায়েব হয়ে গেলেন আমি তখন –নড়ন-চড়ন নাস্তি, একটুও নড়লাম না, যেখানে ছিলাম সেখানেই থেমে গেলাম।’

-ঘোড়া হাঁকিয়ে গায়েব হয়ে গেলেন!’ এতোক্ষণে সমাধান হলো রহস্যের! জলাভূমিতে হাত থেকে বাঁচার এই চেষ্টা তাহলে আমার কল্পনারই পরিণতি। নিশ্চয়ই আমার ঘোড়াড়াটি এসে পড়েছিলো একটি কর্দমাক্ত রাস্তায় এবং আমার মনে হয়েছিলে, আমি আর আমার ঘোড়া তলিয়ে যাচ্ছি জলাভূমিতে আর তাই ঘোড়াটিকে চাবুক মেরে হাঁকিয়েছিলাম পাগলের মতো! আঁধারে দ্বারা প্রতারিত হয়ে আমি ঘোড়াটির অগ্রগতিকে, তার সম্মুকে ছুটে চলাকে জলাভূমির কবল থেকে বাঁচার প্রাণান্ত চেষ্টা বলে ভূল করেছিলাম এবং রাতভর ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছিলাম, জানতাম না যে, মাঠের এখানে –ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু গ্রন্থিল গাছপালা। জলাভূমি নয়, এই গাছগুলিই ছিলো আসন্ন এবং প্রকৃত বিপদঃ যে শাখাটি আঘাত করেছিলো আমার হাতে, তা ছোট না হয়ে হতে পারতে আরো বড় একটি শাখা, যা গুঁড়িয়ে দিতে পারতো আমার খুলি এবং এভাবেই দক্ষিণ –ইরানের একটি চিহ্নিত করবে চূড়ান্ত অবসান ঘটতো আমার সফরের।

আমি ক্ষেপে গেলাম নিজের বিরুদ্ধে –ক্ষেপে গেলাম এ কারনেও যে, আমরা সব দিশা হারিয়ে ফেলেছি এবং রাস্তার কোনো নিশানাই আর খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। আমরা আর সরাইখানা ফিরে পাবো না।

কিন্তু আমি আবার ভুল করে বসি।

ইবরাহীম ঘোড়ার উপর থেমে নেমে পড়লো হাত দিয়ে জমিনের অবস্থা অনুভব করবার জন্য এবং হয়তো এভাবেই নতুন করে পথ খুঁজে বের করার জন্য। এভাবে যখন সে হামাগুড়ি দিচ্ছে হঠাৎ তার মাথা গিয়ে ঠেকলো এক দেয়ালে-খান –ই-কেত সরাইখানার কালো প্রাচীরে!

জলাভূমিতে ঢুকে পড়ার কাল্পনিক ভুলটি যদি আমি না করতাম আমরা হয়তো আগাতেই থাকতাম, হয়তো সরাইখানাটিকে পেছনে ফেলে চলে যেতাম অনেক দূরে, তারপর হয়তো সত্যি সত্যি আমরা হারিয়ে যেতাম সেই জলাভূমিতে, কারণ পরে আমরা জানতে পেরেছিলাম, দুশ গজেরও কম সামনে থেকেই সেই জলাটি শুরু হয়েছে।

মহান শাহ আব্বাসের আমলের বহু ধ্বংসাবশেষের একটি হচ্ছে এই সরাইখানাটি। সারি সারি মজবুত ইমারতের খিলানের নিচে দিয়ে রয়েছে আসা-যাওয়ার পথ, হা-করা দরজা এবং ভেঙে পড়া উনান। এখানে-ওখানে লিণ্টেলের এবং ফাটল ধরা মেজলিকা টালির উপর আমি দেখতে পেলাম পুরানো খোদাই-এর কিছু চিহ্ন। বাসের অযোগ্য কোঠা কটিতে ছড়ানো রয়েছে পুরানো খড়কুটা আর ঘোড়ার লাদ। আমি আর ইবরাহীম প্রধান ‘হল’ কামরায় ঢুকে দেখতে পেলাম সরাইখানার ওভারশিয়র খালি মেঝেয় খোলা আগুনের পাশে বসে আছে আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মানুষ, খালি পা, আকারে বামন এবং পরনে ছেঁড়া কাপড়। আমরা ঢোকার সাথে সাথে দুজনেই দাঁড়িয়ে গেলো। বামনাকৃতি লোকটি গম্ভীরভাবে, নিখুঁত প্রায় নাটকীয় ভংগিতে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালো ডান হাতটি বুকের উপর রেখে। তার গারে জামাটিতে অসংখ্য তালি, নানা রঙের; লোকটি নোংরা, একেবারেই অগোছালো, এলোমেলো, কিন্তু তার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে এবং মুখটি শান্ত স্নিগ্ধ।

আমাদের ঘোড়া কটির তদারক করার জন্য ওভারশিয়র কোঠা থেকে বের হয়ে গেলো একবার। আমি আমার ভেজা জামা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম আর ইবরাহিম দেরী না করে সেই খোলা আগুনের উপর চায়ের পানি বসিয়ে দিলো। যে মহৎ সামস্ত প্রভু তার চাইতে যারা হীন তাদের প্রতি ভদ্র হয়েও নিজের ইজ্জত হারায় না, তারি ভংগিতে সুন্দরভাবে সেই বামনটি ইবরাহীম কর্তৃক তার দিকে তুরে ধরা চায়ের পেয়ালটি গ্রহণ হরে।

বিন্দু মাত্র অস্বাভাবিক ঔৎসুক্য না দেখিয়ে, যেন একটি বৈঠকী আলাপ শুরু করার জন্যেই সে তাকালো আমার দিকে – ‘জনাব-ই আলী, আপনি কি ইংরেজ?

-‘না, আমি নামসাভী (অস্ট্রীয়)’

- ‘আমি যদি জিজ্ঞাস করি, আপনি কি তেজারতির উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন তা কি অশোভন হবে?’

-‘আমি খবরের কাগজের লেখক, আমি জবাব দিই, আমি তোমাদের দেশে সফর করছি – আমার কওমের নিকটে তোমার দেশের পরিচয় জানাবার জন্য। আমার কওম অন্যেরা কীভাবে জীবন-যাপন করে তা জানতে ভালোবাসে।’

সম্মতিসূচক স্মিত হাসির সাথে সে মাথা নাড়ে, তারপর চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর সে তার জামার ভাঁজ থেকে বের করলো একটি মাটির হুঁকা, আর একটি বাঁশের দন্ড; বাঁশের দন্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়; তারপর স েতার দুই হাতের চেটোয়, দেখতে তামাকের মতোই কী একটা জিনিস ডরতে থাকে; পরে যত্নের সাথে, যেনো সোনার চাইতেও দামী সেই জিনিসটি ছিলিমের মধ্যে রেকে ঢেকে দেয় জ্বলন্ত আংগার দিয়ে বাঁশের দণ্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়;তারপর চুপ করে যায়। কিছু্ক্ষণ পর সে  তার জামার ভাঁজ থেকে বের করলো একটি মাটির হুঁকা, আর একটি বাঁশের দণ্ড; বাঁশের দণ্ডটি সে মাটির পাত্রটির সাথে লাগিয়ে দেয়; তারপর সে তার দুই হাতের চেটোয়, দেখতে তামাকের মতোই কী একটা জিনিস ডলতে থাক; পরে যত্নের সাথে, যেনো সোনার চাইতেও দামী সেই জিনিসটি ছিলিমের মধ্যে রেখে ঢেকে দেয় জ্বলন্ত অংগার দিয়ে। বাঁশের নলটি মুখে পুরে অনেকটা জোরে জোরেই সে ধোঁয়া টানতে লাগলো এবং ধোঁয়া টানতে টারতেই প্রচন্ডভাব কেশে উঠলো এবং এভাবে তার গলা পরিষ্কার করে নিলো। মাটির হুঁকার ভেতর পনি বগবগ করতে থাকে এবং একটা উৎকট গন্ধে ধীরে ধীরে কোঠাটি ছেয়ে যায়। এখন আমি বুঝতে পারলাম – এহচ্ছে ভারতীয় গাঁজা ‘হাশিশ’। এতোক্ষণে তার অদ্ভুত আদব –কায়দা ও ভাবভংগির অর্থ পরিষ্কার হলোঃ ও একজন ‘হাশশাশী’, গাঁজাখোর! আফিমখোরদের মতো তার চোখ দুটি ঢাকা নয়, এক ধরনের অনাসক্ত নৈর্ব্যক্তিক গভীরতায় তার চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে-বহুদূরে তার নজর , তার আশেপাশে বাস্তব দুনিয়া থেকে এতো দূরে যে, তা অপরিমেয়।

আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ও ধূমপান শেষকরে আমাকে জিজ্ঞাস করে – ‘আপনি কি একটু চেষ্টা করে দেখবেন’?

আমি ধন্যবাদের সাথে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই। জীবনে দুএকবার আফিম চেষ্টা করে দেখেছি, (অবশ্যি তাতে কোনো আনন্দ পাইনি; কিন্তু এই হাশিশ পানের চেষ্টাও আমার কাছে খুবই কষ্টসাধ্য, এমনকি অরুচিকর মনে হয়। হাশশাশী নিঃশব্দে হাসে –এক বন্ধুত্বপূর্ণ শ্লেষের সাথে তার তীর্যক চোখের নজর  আমার উপর বুলিয়ে নেয়ঃ

-`আমি জানি, মাননীয় দোস্ত, আপনি কী ভাবছেন। আপনি ভাবছেন-হাশিশ খাওয়া হচ্ছে শয়তানের কাজ এবং আপনি একে ভয় করছেন। এক্কেবারে বাজে কথা। হাশিশ হচ্ছে আল্লাহর একটি দান-রহমত। অতি উত্তম.. . বিশেষ করে মনের জন্য। হযরত, লক্ষ্য করুন, আমি বুঝিয়ে বলছি আপনাকে। আফিম খারাপ –এতে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ আফিম মানুষের মনে জাগায় এমন জিনিসের কামনা যা পাওয়া যাবে না। আফিম মানুষের স্বপন্গুলিকে করে তোলে লোভী, জন্তু-জানোয়ারের কামনার মতোই। কিন্তু হাশিশ সব লোককে শান্ত করে দয়ে এবং দুনিয়ার সব কিছুর প্রতি মানুষকে করে তোলো উদাসীন। হ্যাঁ তাই। হাশিশ মানুষকে দেয় তুষ্ঠি। একজন হাশশাশীর সামনে আপনি রেখে দিতে পারেন এক মণ সোনা সে যখন হাশিশ পান করছে কেবল সেই সময় নয়, যে কোনসময়ে – হাশশাশী তার একটি আঙুল ও সে সোনার দিকে বাড়াবে না। আফিম মানুষকে দুর্বল ও কাপুরুষ করে তোলে, কিন্তু হশিশ.. . হাশিশ সব ভয় দূর করে দেয় এবং মানুষকে করে তোলে সিংহের মতোই সাহসী। আপনি যদি শীতকালের মাঝামাঝি বরফের স্রোতে ডুব দিতে বলেন ‘হাশশাশী’কে, সে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই স্রোতে আর হাসবে.. . কারণ সে জেনেছে,যার লোভ নেই তার ভয় নেই- এবং মানুষ যদি ভয়কে জয় করতে পারে, সে বিপদকেও জয় করে, কারণ- সে জানে, তার জীবনে যা কিছুই ঘটেছে তা তারই অংশ, সৃষ্টিতে যা কিছু ঘটে চলেছে সে সবের মধ্যে.. .’

আবার ও হাসে, সেই সংক্ষিপ্ত ঢেউ তোলা নিঃসব্দ হাসি, যাঁকে বিদ্রূপ বলা যায় না; সদাসয়তাও বলা যায় না –দুয়ের মাঝামাঝি একটা অবস্থা। এরপর তার হাসি থেমে যায়, কুণ্ডলী পাকানো ধূঁয়ার আড়ালে কেবল তার দাঁতগুলি বিকশিত হয় এবং তার উজ্জ্বল দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় এক স্থির অনড় দূরত্বের প্রতি।

‘যা কিছু ঘটে চলেছে তাতে আমার অংশ...’ বন্ধুত্বপূর্ণ, আরবীয় আকাশের তারকাপুঞ্জের নিচে শুয়ে শুয়ে আমি মনে মনে ভাবি-আমি .. হাড্ডি ও গোশতের, সংবেদন ও উপলব্দির এই বাণ্ডিল –আমাকে রাখা হয়েছে বিশ্বনিয়ন্তার কক্ষে এবং যা কিছু ঘটে চলেছে আমি আছি তারি মধ্যে। ‘বিপদ’, এ তো অলীক কল্পনা মাত্র – এ আমাকে কখনো ‘পরাভূত’ করতে পারে না – কারণ, আমার জীবনে যা কিছু ঘটছে তা তো সর্বত্রগামী সেই স্রোতেরই একটা অংশ – আমি নিজেই যে স্রোতের অংশ। এ-ও হতে পারে যে, এই বিপদ ও নিরাপত্তা, মৃত্যু ও আনন্দ, নিয়তি ও পূর্ণতা, সবকিছুই এই যে ক্ষুদ্র অথচ মর্যাদাবান একটি ‘বণ্ডিল’, আমি, তারই বিভিন্ন দিক মাত্র। কী অননত্ মুক্তি, হে আল্লাহ, তুমি দান করেছো মানুষকে!’

এই চিন্তার আনন্দের বেদনা এতো তীব্র এবং তীক্ষ্ণ যে, আমি আমার চোখ বুঁজতে বাধ্য হই এবং আমার মুখের উপর দিয়ে যে ঝিরঝির হাওয়া বয়ে যাচ্ছে তা-ই যেনো দূর থেকে মুক্তির পাখনারূপে নীরবে আমার উপর পরশ বুলিয়ে দেয়।

ছয়

এতোক্ষণে উঠে বসার মতো যথেষ্ঠ শক্তি আমি অনুভব করছি। আমি যাতে হেলান দিয়ে বসতে পারি সেজন্য জায়েদ আমাদের উঢের জিনের একটি নিয়ে আমার কাছে এলো।

-চাচা, আপনি আরাম করুন; আপনাকে মৃত মনে করে আপনার জন্য মাতম করেছি, আজ আপনাকে বহাল তবিয়তে পেয়ে আমি কতো যে আনন্দিত হয়েছি!

-‘তোমাকে সবসময় এক পরম বন্ধুরূপে পেয়েছি! তুমি যদি আমার ডাক শুনে আমার কাছে ছুটে না আসতে, তোমাকে ছাড়া বছরগুলি আমি কীভাবে চলতাম, বলো তো?

-“চাচা, আমি যে আপনার সাথে এই বছরগুলি কাটিয়েছি – তার জন্য কখনো অনুশোচনা হয়নি। আমার এখনো সেই দিনটির কথা মনে আছে যেদিন আমি আপনার চিঠি পেয়েছিলাম পাঁচ বছরেরো আগে। সেই চিঠিতে আপনি আমাকে মক্কায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আপনার সাথে আবার দেখা হবে এই চিন্তাটাই ছিলো আমার নিকট প্রিয়। তার বিশেষ কারণ ও ছিল – আপনি এরই মধ্যে ইসলামের আর্শীবাদ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ই আমি শাদি করেছিলাম এক কুমারী মুন্তাফিক বালিকাকে; তার ভালোবাসায় আমার আনন্দের অবধি ছিলনা। ঐসব ইরাকী বালিকার কোমর খুবই চিকন, আর স্তন মজবুত, কঠিন, ঠিক এরি মত – অতীতের দৃশ্য স্মরণ করে মৃদু হেসে সে তার তর্জনী চেপে ধরে আমি যে জিনের উপর হেলান দিয়ে আছি তারি শক্ত অগ্রভাগের উপর – ‘এবং এদের আলিংগন থেমে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন।’ তাই আমি মনে মনে বললাম, ‘আমি যাবো তবে ঠিক এক্ষুণি নয়। কয়েক হপ্তা অপেক্ষা করতে হবে আাকে।’ কিন্তু হপ্তার পর হপ্তা গড়িয়ে যায়... গাড়িয়ে যায মাসের পর মাস এবং যদিও আমি কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই স্ত্রীলোকটিকে –সেই কুত্তীর বাচ্চাকে তালাক দিয়েছিলাম – ও কি না ওর চাচাত ভাইয়ের দিকে তাকচ্ছিলো আশনাই –এর দৃষ্টিতে, তবু আমি ইরাকী ‘আগায়েল’ আমার নোকরি ছাড়তে পারছিলাম না, ছাড়তে পারলাম না আমার দোস্ত-ইয়ারদেরকে, বাগদাদ ও বসরার আনন্দ –উল্লাসকে এবং সবসময়ই নিজেকে বলে  চলছিলাম একথা ঠিক এখুনি নয়, আরো কিছু পরে।’ কিন্তু একদিন যখন আমি আমাদের তাঁবু থেকে আমার মাইনের টাকা নিয়ে চলেছিলাম উটে চড়ে এবং ভাবছিলাম, রাতটা আমার কোন দোস্তের বাড়িতে কাটাবো, হঠাৎ তখন মনে পড়লো আপনার কথা, মনে পড়লো, আপনার চিঠিতে আপনার প্রিয় সহধর্মিণী-আপনার রফিকার ইন্তিকার সম্বন্ধে আপনি লিখেছেন- আল্লাহ তাঁর উপর সদয় হোন এবং আমি ভাবলাম, তাঁকে হারিয়ে কতো নিঃসংগ বোধ করছেন আপনি এবং সংগে সংগে আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর অপেক্ষা করা চলে না –আমাকে ছুটে যেতে হবে আপনার কাছে সেখানেই এবং তক্ষুণি, আমি আমার ইরাকী ‘ঈগাল’ থেকে তারকাটি ছিড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম; তারপর আমি আমার কাপড় –চোপড়গুলি নেবার জন্য ঘরে পর্যন্ত গেলাম না। আমার উটের রোখ আমি ফিরিয়ে দিলাম নুফুদের দিকে…  নজদের দিকে, তারপর রওনা করে দিলাম –শুধু পরের গেরামটিতেই একবার থেমেছিলাম একটা মশক এবং কিছু খাবার কেনার জন্য ... তারপর চললাম উট হাঁকিয়ে ‍দিনের পর দিন –যতক্ষণ না আপনার সাথে মুলাকাত হলো মক্কায়, চার হপ্তা পরে...’

- ‘এবং তোমার মনে আছে জায়েদ, আররে অভ্যন্তরে আমাদের দুজনেরেই সেই পয়লা সফরের কথা, দক্ষিণ মুখে, খেজুর বাগিচার এবং ওয়াদি বিশার গম ক্ষেতের দিকে এবং সেখান থেকে রানিয়ার বালু বিস্তারের দিকে, যা আগে অতিক্রম করেনি কোন অন-আরব !

-‘কতো স্পষ্ট না তা আমার মনে পড়ছে, চাচা। আপনি কতো উৎসুকই না ছিলেন সেই শূন্য এলাকা ১[রাব আলখালি-নামক সুাবিশাল জনবসিতিশূন্য বালুময় মরুভূমি যা আরব উপদ্বীপে এক চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে] দেখতে যেখানে জীনের প্রভাবে বালুরাশি গান গায় সূর্যের নিচে। আর সেই এলাকার কিনারে যে-সব ‘বদু’ বাস করে তাদের কথা? যারা তাদের জীবনে তখনো চশমা দেখেনি এবং মনে করেছিলো আপনার চশমা জমাট পানি দিয়ে তৈরি? ওরা নিজেরাই জিনের মতো; অন্য মানুষ যেমন বই-কিতাব পড়ে তেমনি পড়ে  ওরা বালুর উপর পথের রেখাসমূহ এবং পড়ে আকাশ আর হাওয়া থেকে ধূলি –ঝড়ের আগমনের কথা-ঝড় আসার বহু ঘন্টা আগেই। আর চাচা, আপনার কি মনে আছে রানিয়াতে আমরা যে গাইড ভাড়া করেছিলাম তার কথা –সেই শয়তান ‘বাদাভীর’ কথা-যাকে আপনি গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, সে আমাদেরকে মরুভূমির মাঝখানে ফেলে চলে যেতে চেয়েছিলো বলে। আপনি যে যন্ত্রটি দিয়ে ছবি তোরেন তার বিরুদ্ধে  সে কী ক্ষেপেই না গিয়েছিলো!’

আমরা দুজনেই আাদের বহু দূরে ফেলে আসা সেই এ্যাডভেঞ্চার হাসি। কিন্তু তখন আমাদের মোটেই হাসির মতো অবস্থা ছিলো না। আমরা ছিলাম রিয়াদের দক্ষিণে ছ-সাত দিনের পথ দূরে যখন সেই গাইড, আর রাইনের ‘ইখওয়ান’ বস্তির এক গৌড়া বেদুঈন, গোস্বায় ফেটে পড়েছিলো আমি তাকে ক্যামেরার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলাতে। সে তখুনি এবং সেখানেই আমাদেরকে ফেলে চলে যাবার জন্য তৈরি হলো, কারণ এ ধরনের জাহেলী ছবি তোলায় তার রূহ বিপন্ন হয়ে পড়েছিলো। ওর হাত থেকে ছাড়া পেতে আমার মোটেই আপত্তি ছিলো না , যদি এ আশংকা না থাকতো যে আমরা তখন অমন একটি এলাকায় এসে পড়েছিলাম যার সাথে আমার বা জায়েদের কোনে পরিচয় ছিলো না –যেখানে আমাদের দুজনকে একলা ছেড়ে গেলে নিশ্চয় আমরা দিশাহারা হয়ে পড়তাম। পয়লা আমি আমাদের সেই ‘বেদুঈন শয়তান’কে বুঝাতে চাইলাম যুক্তি দিয়ে। কিন্তু কোনো ফায়দাই হলো না। ও কিছুতেই বুঝতে চাইবে না। বরং উটের রোক ও ফিরিয়ে দেয় রানিয়ার দিকে। আমি তখন ওকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলাম, আমাদের এভাবে তৃষ্ণায় প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে যদি ও রোখে যায় তাহলে সে জান নিয়ে কিছুতেই  পালাতে পারবে না। এই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও যখন ওর উট চালাতে শুরু কররো আমি তখন ওর দিকে আমার রাইফেল তাক করে তৈরি হলাম ওকে গুলি করতে –গুলি করার পুরা ইচ্ছাই ছিলো; এবং মনে হলো তাতেই শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধুটি রূহ নিয়ে যতো ভাবনা –চিন্তা চাপা পড়ে গেলো। কিছুক্ষণ বিড়বিড় করার পর সে রাজি হলো, ওখান থেকে তিন দিনের রাস্তা পরবর্তী বস্তি পর্যন্ত আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে –যেখানে আমরা পারবো আমাদের বিতর্কিত বিষয়টিকে বিচারে জন্য কাজীর সামনে পেশ করতে। আমি আর জায়েদ মিলে ওর অস্ত্র কেড়ে নিলাম, তারপর পালাক্রমে পাহাড়া দিতে লাগলাম যাতে সে সরে পড়তে না পারে। কয়েক দিন পর আমরা যখন –কুবাইয়ার ‘কাজী’র নিকট বিচার প্রর্থনা করলাম তিনি প্রথমে রায় দিলেন আমাদের গাইডেরই পক্ষে। ‘কারণ’ (রসূলের একটি হাদীসের ভূল ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে তিনি বললেন, ‘জীবিত প্রাণীর ছবি তোলা নিন্দনীয় কাজ’ কিন্ত জীবিত প্রাণীর ছবি তোলা নিষিদ্ধ –বর্তমান কাল পর্যন্ত বহু মুসলমানের মধ্যে প্রবল এই বিশ্বাস সত্ত্বেও, এ ব্যাপারে ইসলামী আইনে কোনো বিধান নেই। তখন আমি ‘দেশের সকল আমীর এবং যে কেউ এটা পড়বে’ তার জন্য লিখিত বাদশাহর খোলা চিঠি ‘কাজী’র সামনে মেলে ধরলাম –এবং পড়তে গিয়ে ‘কাজী’র মুখ ক্রমেই লম্বাটে হয়ে উঠতে লাগলো – ‘মুহম্মদ আসাদ আমার মেহমান, দোস্ত এবং আমার প্রিয়জন, যে কেউ তার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবে সে আমার প্রতিই তা করবে এবং যে কেউ তার প্রতি শত্রুতা করবে সে আমারই শত্রু বলে গন্য হবে,...  ইবনে সউদের কথা এবং মোহর যাদুর মতো কাজ করলো কঠোর কাজীর উপর। শেষ পর্যন্ত তিনি এ রায় দিলেন যে, ‘কোনো কোনো অবস্থায়’ ছবি তোলা অনুমোদন করা যেতে পারে। ... এই রায়ের পর আমরা আমাদের গাইডকে ছেড়ে দিলাম এবং আমাদেকে রিয়াদের দিকে নিয়ে যাবার জন্য নিযুক্ত করলাম নতুন গাইড।

-‘চাচা, রিয়াদের সেই দিনগুলির কথা মনে আছে কি, যখন আমরা ছিলাম বাদশাহর মেহমান এবং পুরানো শাহী আস্তাবাল ঝকঝকে মোটর গাড়িতে ভর্তি দেখে আপনি কতো মর্মাহত হয়েছিলেন!.. এবং আপনার প্রতি বাদশাহর মেহেরবানির কথা?’

-‘আর তোমার কি মনে পড়ছে জায়েদ, বাদশাহ কীভাবে আমাদের পাঠয়েছিলেন বেদুঈন বিদ্রোহের রহস্য উদঘাটন করতে এবং কীভাবে আমরা রাতের পর রাত সফর করে লুকিয়ে ঢুকেছিলাম কুয়েত –এ; শেষ পর্যন্ত জানতে পেরেছিলাম ঝকঝকে নতুন ‘রিয়াল’ এবং সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে যেসব অস্ত্রশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিকট আসছিলো তার আসল রহস্য… .?’

-‘আর চাচা, আমাদের সেই মিশনের কথা যখন সৈয়দ আহমদ –আল্লাহ তাঁর হায়াত  দারাজ করুন –আমাদেরকে পাঠিয়েছিলেন সাইরেনিকায় এবং কেমন করে আমরা গোপনে একটি ‘ধাও’ –এ করে সমুদ্দুর পার হয়ে ঢুকেছিলাম মিসরে এবং কীবাবে আমরা সেই ইতালীয়দের দৃষ্টি এড়িয়ে আল্লাহর লানত হোক ওদের উপরে প্রবেশ করেছিলাম জবল আখদারে এবং ‍উমর আল –মুখতারের নেতৃত্বে যোগদান করেছিলাম, মুজাহিদিনের সংগে? কী উত্তেজনাপূর্ণই না ছিলো !

তারার আলোকে আলোকিত মরুভূমির রাতের নীরবতায় যখন এক নাজুক ঈষদুষ্ণ হাওয়ায় ছোটো ছোটো ঢেউ জাগে বালুতে –অতীত আর বর্তমানের ছবি একে আরেকের সাথে বারবার জড়িয়ে যায়, আবার আলাদা হয় পড়ে এবং স্মৃতিকে জিইয়ে তোলা এক বিস্ময়কর ধ্বনির সংগে একে অপর পেছন দিকে ডাকে, বহু বছর পেরিয়ে, আমার আরবীয় বছরগুলির শুরতে মক্কায় আমার পয়লা হজ্ব এবং  যে আঁধার সেই ‍শুরু দিনগুলিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো, তার প্রতিঃ সেই নারীর মৃত্যুর প্রতি যাকে আমি এমন ভালোবেসেছিলাম, যেমন আর কোন নারীকেই ভালোবাসিনি পরে, যে এখন শুয়ে আছে মক্কার মাটির নীচে, একটা সাদাসিধা পাথর রয়েছে তার শিয়রে যাতে কোন লেখা নেই, যা চিহ্নিত করছে তার পথের শেষ এবং আমার এক নতুন পথের শুরু, একটি শেষ এবং একটি ‍শুরু, একটি ডাক এবং একটি প্রতিধ্বনি মক্কার শিলাময় উপত্যকায়, আশ্চর্য্জনকভাবে একে অপরের স্বপ্নের সাথে জড়িত!

-‘জায়েদ, আরো কিছু কফি হবে?’

-‘আপনার হুকুমের অপেক্ষায় চাচা!’ জায়েদ জবাব দেয়। সে ব্যস্ত সমস্ত না হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তার বাঁ হাতে লম্বা চিকন কফি পাত্র। তারপর মিনিট দু’এক, হাতলশূন্য পেয়ালা টুঙটু করে ওঠে তার ডান হাতে– একটি আমার জন্য আর একটি ওর নিজের জন্য-পয়লা পেয়ালাটিতে কিছু কফি ঢেলে সে আমার হাতে দিলো। লাল এবং সাদা চেক-‘কুফিয়া’র ছায়ার নিচে থেকে তার চোখ দুটি আমাকে নিরীক্ষণ করে গভীর মনোনিবেশের সাথে, যেন সামান্য কফির পেয়ালার চাইতে এভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনই অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এই লম্বা লম্বা পশম শোভিত, গভীর, সংযত, শান্ত অবস্থায় করুণ অথচ অতি আনন্দে ঝলসে উঠতে সাদা উৎসুক দুটি চোখ বলছে স্তেপ অঞ্চলে মু্ক্তির মধ্যে শত পুরুষের জীবন কথাঃ এ চোখ এমন মানুষের চোখ যার পূর্ব পুরুষেরা শোষিত হয়নি কখনো এবং অন্যকেও শোষণ করেনি কোনোদিন। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে ওর চলনের ভংগিগুলি, প্রাশান্ত, প্রতিটি ভংগির নিজস্ব ছন্দ সম্বন্ধে সচেতন, কখনো তাড়াহুা নেই –দ্বিধাগ্রস্থ নয় কখনোঃ এমন নিখুঁত এবং বাহুল্য বর্জিত যে, আপনাকে তা একটা সুসমন্বিত অর্কেষ্টার ঐকতানের মধ্যে বিভিন্ন যন্ত্রের পারস্পরিকক ‍ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে। বেদুঈনদের মধ্যে আপনি প্রায় দেখতে পাবেন এ ধরনের চলনভংগি মরুভূমির বাহুল্যহীনতা ওদের মধ্যে প্রতিফলিত। কারণ অল্প কটি শহর এবং গ্রাম বাদ দিলে, আরব দেশের মানুষের জীবন মানুষের হাতে এতো সামান্য্য আকৃতি পেয়েছে যে, প্রকৃতি তার কঠোর  নিয়মকে মানুষকে বাধ্য করেছে আচার –আচরণে সকল প্রকার বিক্ষিপ্ততাকে বর্জন করতে এবং তার নিজের ইচ্ছা অথবা প্রয়োজনে করা সকল কাজকে রূপান্তরিত করতে স্বল্প কটি অতি নির্দিষ্ট, মৌলিক রূপে –যা অসংখ্য পুরুষ দরে একই রয়ে গেছে এবং কালক্রমে অর্জন করেছে স্পটিকের মসৃণ স্পষ্টতা। আর উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত এই সরলতাই এখন আমরা দেখতে পাই খাঁটি আরবের অংগভংগিতে যেমন, তেমনি জীবনে প্রতি তার মনোভঅবে।

-‘জায়েদ, তুমি আমাকে বলো, কাল আমরা কোথায় যাচ্ছি!’

জায়েদ স্মিত হাসির সাথে আমার দিকে তাকায় –‘কেন চাচা, আমরা তো তায়েমার দিকেই যাচ্ছি.. . ?’

-‘না ভায়া, আমি অবশ্যি চেয়েছিলাম তায়েমা যেতে! কিন্তু এখন আর আমি তা চাইছি না। আমরা যাচ্ছি মক্কা .. .’

পথের শুরু

এক

তৃষ্ণার কবলে পড়ার কয়েক দিন পর সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময়ে আমি আর জায়েদ পৌছুই একটি ছোট্ট পরিত্যক্ত ওয়েসিসে এবং রাতটা সেখানেই কাটাবার ইরাদা করি। ডুবন্ত সূর্যের কিরনের নীচে পুবদিকের বালু –পাহাড়গুলির রঙধনু-রঙ চাঁই –চাঁই আকীক পাথরের মতো ঝলমল করছে একটান পরিবর্তনশীল রঙীন খড়ি-রঙ ছায়া আর কোমলীকৃত আলোর প্রতিফলনের ধারায় –আর বর্ণের দিক দিয়ে এ পরিবর্তন এতোই নাজুক যে মনে হয়, ঘনায়মান গোধূলির ধূসরতার দিকে আগিয়ে চলা কোনো রকমে অনুভবযোগ্য ছায়া –স্রোতের অনুসরন করতে গিয়ে চোখও যেন তার প্রতি জুলুম করছে। আপনি এখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন খেজুর গাছের মাথাগুরি, যেন পালক-খচিত মুকুট, আর ওদের পেছনে, আধা লুকানো নিচু কাদা –ধসুর ঘর-বাড়ি আর বাগিচার দেয়ালগুলি! কুয়ার উপর কাঠের চাকাগুলি তখনও গান গেয়ে চলেছে।

গ্রামটি থেকে কিছু দূরে আমরা আমাদের উটগুলিকে শোয়াই খেজুর বাগানের নিচে। তারপর আদের ভারি বস্তাগুলি নামাই এবং উটের গরম পিঠের উপর থেকে জিন খুলে ফেলি। আমাদেরকে বেগানা দেখে আমাদের চারপাশে কয়েকটি দুরন্ত শিশু এসে জড়ো হয় এবং তাদের মধ্যে একটি ছেলে, যার চোখ বড়ো বড়ো এবং পরনে ছেঁড়া কাপড়, সে জায়েদকে বললো –কোথায় লাকড়ি পাওয়া যাবে সে তা দেখিয়ে দেবে। ওরা দুজন যখন লাকড়ির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো তখন আমি উটগুলিকে নিয়ে তালাবের নিকট যাই। আমি আমার চাড়ার বালতি নামিয়ে পানি ভর্তি করে যখন তুলছি সেই সময় গাঁ থেকে কটি মেয়ে এলো পানি নেবার জন্য, তামার পাত্র এবং মাটির কলসে করে। ওরা পাত্রগুলি স্বচ্ছন্দে বহন করছে মাথায়, দুহাত দুপাশে ছেড়ে ঝুলিয়ে দিয়ে, বোঝার সংগে তাল রাখার জন্যই সামনের দিকে একটু ঝুঁকে, বোরকার ঝুল ঝাপটানো পাখার মতো দু’হাতে তুলে ধরে।

 ‘আসসালামু আলাইকুম, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক হে মুসাফির।’

এবং আমি জবাব দিইঃ আর তোমাদের উপরও শান্তি আর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হোক।’

ওদের পোশাক কালো রঙের এবং ওদর মুখমণ্ডল খোলা, যা আরবের এ অঞ্চলে গ্রাম্য এবং  বদ্দু রমণীদের প্রায় প্রত্যেকের বেলায়ই সত্যি, ফলে আপনি সহজেই দেখতে পান ওদের কালো বিশাল চোখ। বহু পুরুষ ধরে যদিও ওরা বসতি স্থাপন করেছে এক মরূদ্যানে তবু ওরা ওদের পূর্বপুরুষদের যাযাবর জীবনের আন্তুরিক ভাবভংগি হারায়নি। ওদের চালচলন পরিষ্কার আর নির্দিষ্ট;ওদের বাকসংযম লজ্জা–শরম থেকে একেবারেই মুক্ত-যখন দেখলাম ওরা নিঃশব্দে বালিতির রশি আমার হাত থেকে তুলে নিচ্ছে এবং আমার উটের জন্য পানি তুলছে-ঠিক যেমনটি চার হাজার বাছর আগে এক তালাবের নিকটে সেই নারীটি করেছিলো ইবরাহীমের ভৃত্যের প্রতি-যখন সে কেনান থেকে এসেছিলো ‘পাদান আরাম’-এ তাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর নিকট, তার মুনিবের পুত্র ইসহাকের জন্য একটি কনে যোগাড় করতে।

“সে সন্ধ্যাকালে শহরের বাইরে, একটি তালাবের কাছে হাঁটু গাড়িয়ে বসালো তার উটগুলিকে।

এবং সে বললো, ওগো আমার মুনিব, ইবরাহীমের প্রভু, আমি প্রার্থনা করছি তোমার নিকট, তুমি আজ আমাকে দ্রুতগতি দাও এবং  আমার মুনিব ইবরাহিমের প্রতি দয়া করো। দেখো, এখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি পানির তালাবের কাছে এবং নগরের লোকদের কন্যারা আসছে পানি তুলতে। এ রকম যেনো ঘটে যে, আমি যে তরুণীকে বলবো, আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি- তোমার কলসী নামাও,  যাতে আমি পেতে পারি পানি এবং সে বলবে, খাও-এবং তোমার উটগুলিকে পানি খাওয়াবো আমি’- ‘সে যেনো ঐ মেয়ে হয় যাকে তুমি মনোনীত করেছো তোমার দাস ইসহাকের জন্য এবং তাহলেই আমি জানতে পারবো তুমি আমার মুনিবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেছো।

এবং দেখো, তার কথা বলার আগেই এরূপ ঘটলো যে, রেবেকা এসে হাজির হলো.. .তার কাঁদের উপর তার কলস। আর তরুণীটি ছিলো দেখতে অতি সুন্দর এবং কুমারী, যাকে স্পর্শ করেনি কোনো পুরুষ। সে ইদারার ভেতর নেমে ভর্তি করলো তার কলস, তারপর উঠে এলো।

নওকরটি তার নিকট ছুটে গিয়ে বললো, ‘আমি তোমার নিকট মাঙছি –তোমার কসল থেকে পানি খেতে দাও আমাকে’। সে বললো,‘পান করুন প্রভু।’ এবং তাড়াতাড়ি করে কলসটিকে তার হাতে নামিয়ে তাকে খেতে দিলো পানি। পানি খাওয়ার পর তরুণীটি বললো, আমি উটগুলির জন্যও পানি তুলবো যতোক্ষণ না ওদের পিয়াস মিটছে।’ সে দেরী না করে তার কলস খালি করে পানি ঢেলে দেয় গামলার মধ্যে যেখান থেকে উটগুলি খাবে এবং আবার ছুটে যায় ইঁদারার ভেতরে আর সব কটি উটের জন্যই তুলতে থাকে পানি.. .”

বিশাল নুফুদের বালুরাশি মধ্যে ছোট একটি ওয়েসিসে একটি ইঁদারার কাছে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার দুটি উট নিয়ে, আর তাকাচ্ছি মেয়েটির দিকে যে বালতির রশি আমার হাত থেকে নিজের হাতে আর আমার জন্তুগুলির জন্য পানি তুলছে –আর আমার মনের উপর তখন ভেসে চলেছে বাইবেলের ঐ কাহিনী। ‘পাদান আরাম’ নামক সেই দেশ এবং ইবরাহীমের জমানা বহু বহু দূরের কিন্তু এই রমণীরা ওদের মর্যাদাপূর্ণ অংগভঙ্গি যে স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে তারি জোরে, স্থানের সব ব্যবধান দিয়েছে মুছে এবং সময়ের বিচারে দীর্ঘ চার হাজার বছর যেন কিছুই নয়!

-প্রিয় বোনেরা, আল্লাহ তোমাদের হাতকে ধন্য করুন এবং সালামতে রাখুন।

-আর হে মুসাফির, আপনিও থাকুন আল্লাহর হিফাজতে, ওরা জবাব দেয়, তারপর ওরা মনোযোগী হয় ওদের গামলা আর কলসগুলির প্রতি- সেগুলি ভর্তি করে ঘরে পানি নিয়ে যাবার জন্য।

আমাদের তাঁবুর  জায়গায় ফিরে এসে আমি আমার উটগুলিকে হাঁটু গাড়িয়ে বসাই এবং সামনের পাগুলিতে বেড়ি পরিয়ে দেই, যাতে ওরা রাতের বেলা কোথাও চলে যেতে না পারে। জায়েদ এরি মধ্যে আগুন ধরিয়েছে এবং কফি তৈরি করতে লেগে গেছে। একটা লম্বা বাঁকানো নল, পনি টগবগ করছে; একই আকারের ছোট্ট আরেকটি কফি পাত্র জায়েদের কনুইয়ের কাছে তৈরি রয়েছে। বাঁ হাতে সে ধরে আছে চ্যাপ্টা প্রকাণ্ড একটি লোহার চামচ, যার হাতলটি দু-ফুট লম্বা; এই চামচে সে মৃদু আগুনোর উপর এক মুঠপা কফিগুলি ভাজচে, কারণ আরব দেশে প্রতিটি পাত্রের জন্যই নতুন করে ভাজা হয় কফি। কফিগুলি কিছুটা তামাটে হয়ে ওঠার সংগে সংগেই জায়েদ সেগুলি একটি কাঁসার তৈরি হামানদিস্তায় রাখে এবং গুঁড়া করে। এরপর সে বড় পাত্রটি থেকে কিছু ফুটন্ত পানি ছোটো পাত্রিটিতে ঢালে –চুর্ণ কফি এর মধ্যে ঢেলে দেয় উপুড় করে এবং পাত্রটিকে রেখে দেয় আগুনের কাছে, যাতে করে ধীরে ধীরে ফুটতে পারে পানি। পানীয়টি প্রায় তৈরি হয়ে এলে জায়েদ তাতে কিছু এলাচ দানা ছেড়ে দেয় পানীয়টিকে তীব্রতরো করার জন্য, কারণ আরব দেশে কথা আছে, কফি যদি ভালো হতে হয়, অবশ্যি তা হতে হবে মৃত্যুর মতো তীব্র এবং প্রেমের মতো ঝাল ও উষ্ণ।’

কিন্তু আমি এখনো আরামের সাথে কফি পানের জন্য তৈরি নৈই। ক্লান্ত-দীর্ঘ, উত্তপ্ত ঘন্টার পর ঘন্টা জীনের উপর বসে থেকে ঘর্মাক্ত –পরনের পোশাক আমার শরীরের চামড়ার সাথে লেপ্টে আছে নোঙরভাবে, স্বভাবতই গোসলের জন্য সারা সত্ত্বা লালায়িত হয়ে আছে, তাই আমি ধীরে ধীরে আবার ফিরে যাই খেজুর বাগানের নিচে  কুয়াটির কাছে।

আঁধার ঘনীয়ে এসেছে এরি মধ্যে। খেজুর বাগান থেকে সবাই ঘরে ফিরে গেছে। শুধু দূরে, যেখানে ঘর-বাড়িগুলি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে একটি কুকুর ডাকছে। আমি আমার গায়ের কাপড়-চোপড় ফেলে দিয়ে নেমে পড়ি কুয়ার ভেতরে, কুয়ার দেয়ালের তাক ও খাঁজে হাত আর পা রেখে এবং কয়েকটি রশি অবলম্বন করে – যে রশিতে ঝুলছে পানি তোলার মশকগুলিঃ আমি নেমে পড় অন্ধকার পানি পর্যন্ত, তারপর সেই পানির ভেতরে। পানি বড় ঠান্ডা এবং আামর বুক পর্যন্ত পৌছুলো সেই পানি। অন্ধকারে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পানি তোলার রশিগুলি-এখন পানিতে ডোবা মস্ত বড়ো মশকগুলির ভারে সটান খাড়া হয়ে। দিনের বেলা এই মশকগুলিই ব্যবহৃত হয় ক্ষেতে পানি দেবার কাজে। পায়ের তলার নিচে আমি অনুভব করি, পাতলা ক্ষীণ পানির ধারা চুঁয়ে চুঁয়ে উপরদিকে উঠছে মাটির নীচের উৎস থেকে, যা এক মন্থর, চির-নতুনের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় কুয়াটিকে রাখছে তাজা।

আমার উপরে কুয়াটির মুখের উপর বাতাস হু হু করছে এবং কয়াটির ভেতর সৃষ্টি করছে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি, যেন কানের কাছে চেপে ধরা সামুদ্রকি শঙ্খের ভেতরের আওয়াজ –একটি বৃহৎ শন শন ধ্বনি করা সামুদ্রিক শঙ্খ, যা আমি কানের কাছে চেপে ধরে শুনতে ভালোবাসতাম আমার আব্বার বাড়িতে, বহু বহু  বছর আগে যখন আমি শিশু –কোনা রকমে টেবিলের উপর তাকাতে পারি লম্বায় অতটুকু উঁচু। আমি কানে চেপে ধরতাম শঙ্খটি আর বিস্মিত হয়ে ভাবতাম, এ আওয়াজ কি সবসময়ই শঙ্খের ভেতরে উঠছে, না, আমি যখন এটিকে কানের কাছে ধরি তখনি তা বেজে ওঠে। আমার সংগে কি এর কোনো সম্পর্ক  নেই? এ সংগীত কি এমনি বাজছে? না কি আমি যখন শুনতে চাই তখনি বেজে ওঠে? বহুবার আমি চেষ্টা করেছি শঙ্খটিকে চালাকিতে হারিয়ে দিতে আমার নিকট থেকে ওটিকে দূরে রেখে, যাতে শন শন ধ্বনিটি থেমে যায়-তারপর, হঠাৎ আবার সেটিকে চেপে ধরেছি কানের কাছে। আবার সেই সংগীত, সেই ধ্বনি! আমি কখনো এ সমস্যার সমাধান করতে পারিনিঃ যখন আমি শুনতে চেষ্টা করতাম তখনো শঙ্খের ভেতরে এ সংগীত বেজে চলতো কিনা!

অবশ্য আমি তখনি বুঝতে পারিনি যে, আমার বুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে এমন একটি প্রশ্নে যাতে হতবুদ্ধি হয়েছেন আমার চেয়ে অনেক বেশি দানিশমন্দ আদমীরা অসংখ্য জামানা ধরেঃ প্রশ্নটি হচ্ছে – আমাদের মন-নিরপেক্ষ ‘সত্য’ বা ‘বাস্তব’ বলে কিছু আছে কি না, কিংবা আমাদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিই তা সৃষ্টি করে কিনা। কিন্তু ফেলে আসা দিনগুলির দিকে তাকিয়ে আমর মনে হচ্ছে-এ সমস্যা কেবল ছোটবেলায়ই আমার পিছু পিছু ধাওয়া করেনি, পরবর্তীকালেও করেছে –যেমন ধাওয়া করে থঅকবে কোনো –না কোনো সময়, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে, প্রত্যেকটি চিন্তাশীল মানুষকেই। কারণ, ব্যক্তি-নিরেপক্ষ সত্য যা-ই হোক, পৃথিবী আমাদের নিকট নিজেকে ব্যক্ত করে সেই আকৃতিতে এবং ততোটুকু যে আকৃতি এবং যতোটুকু প্রতিফলিত হয় আমাদের মন। কাজেই, আমরা প্রত্যেকেই ‘সত্য’ উপলদ্ধি করতে পারি কেবল নিজের অভিজ্ঞতারই যোগসূত্রে। এখানেই হয়তো পাওয়া যাবে মানুষের চেতনার প্রথম সূচনা থেমে মৃত্যুর পর মানুষের বেঁচে থাকায় মানুষের চিরন্তন বিশ্বাসের একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা এবং এ বিশ্বাস এতো গভীর, সকল কওম ও সকল কালে এতো ব্যাপকভঅবে সম্প্রসারিত যে একে কেবল একটি খেয়ালি ধারণ বলে সহজেই উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এ কথা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, মানুষের মনের বিশেষ গড়নের ফলেই এ বিশ্বাস অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, অনিবার্যভাবেই। বিমূর্ত তাত্ত্বিক অর্থে নিজের মৃত্যুকে চূড়ান্ত বিলুপ্তি বলে মানুষের পক্ষে চিন্তা করা হয়তো কঠিন নয়, কিন্তু সেই বিলুপ্তিকে দৃষ্টিগোচরে আনা অসম্ভব। কারণ এর অর্থই এই যে, মানুষ বাস্তব বস্তু মাত্রেরই বিলুপ্তি প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে। অন্য কথায় সে পারবে শূন্যতার ধারণা করতে যে ধারণা কেনো মানুষের মনই করতে সক্ষম নয়।

দার্শনিক এবং নবী-রসূলগণ নতুন করে আমাদের শেখাননি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে –তাঁরা তো কেবল পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের মতোই প্রাচীন, সহজাত একটি ধারণাকে রূপ দিয়েছেন এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যমণ্ডিত করেছেন।

সারাদিনের সফরের ধূলাবালু আর ঘাম ধুয়ে ফেরার মতো নেহাৎ জাগতিক ক্রিয়ার সাথে এ ধরনের গভীর সমস্যা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে তাতে আমি মনে মনে না হেসে পারি না। দৃষ্টি বা বুদ্ধিগ্রাহ্য কেনো সীমারেখা জীবনের জাগতিক এবং নিগূঢ় দিকের মধ্যে আছে কি? নজিরস্বরূপ, একটি হারানো উটের খোঁজের বের হওয়ার চাইতে অধিকতরো জাগতিক বিষয় কী হতে পারে? এবং পিয়াসে প্রায় মৃত্যুর চেয়ে নিগূঢ়তরো এবং দুর্বোধ্যতরো বিষয়ই বা কী হতে পারে?

হয়তো সেই অভিজ্ঞতার ধাক্কাই আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে করেছে তীক্ষ্ণ, ধারালো এবং আমার নিজের নিকট একটা কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজনীতাকে করে তুলেছে অনিবার্য। সেই প্রয়োজনটি হচ্ছে- আমি আমার নিজের জীবনের গতিকে আগে যেভাবে উপলব্ধি করেছ তার চাইতে পূর্ণতরোরূপে তাকে উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু তাই বলে, আমি আমার মনকে স্মরণ করিয়ে দিই, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন কি সে সত্যি তার নিজের জীবনের মানে উপলব্ধি করতে পারে?

হয়তো সেই অভিজ্ঞতার ধাক্কাই আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে করেছে তীক্ষ্ম ধারালো এবং আমার নিজের নিকট একটা কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তাকে করে তুলেছে অনিবার্য। সেই প্রয়োজনটি হচ্ছে-আমি আমার নিজের জীবনের গতিকে আগে যেভাবে উপলব্ধি করেছি তার চাইতে পূর্ণতরোরূপে তাকে উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু তাই বলে, আমি আমার মনকে স্মরণ করিয়ে দিই, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন কি সে সত্যি তার নিজের জীবনের মানে উপলব্ধি করতে পারে? আমাদের জীবনে, এই মুহূর্তে বা অমুক সময়ে কী ঘটেছে তা –ও আমরা মাঝে মাঝে জানি, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য, আমাদের অদৃষ্ট অতো সহজে বোঝা বা দেখা যায় না। কারণ, অদৃষ্ট হচ্ছে অতীত ও বর্তমান, যা কিছু আমাদের মধ্যে ঘটেছে আর আমাদেরকে চালিত করেছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু আমাদের মধ্যে ঘটবে ও আমাদেরকে  আমাদেরকে চালিত করবে তারই মোটমাট যোগফল এবং সে কারণে, আমাদের যাত্রার একেবারে শেষেই কেবল তার পূর্ণ রূপটি ধরা দিতে পারে এবং যতোদিন আমরা পথ চলছি ততোদিন সবসময় আমরা তাকে ভুলই বুঝবো কিংবা কেবল অর্ধেকই বুঝবো।

আমি আমার এই বত্রিশ বছর বয়সে কী করে বলতে পারি, আমার অদৃষ্ট কী ছিলো কিংবা তা কী?

আমার ফেলে আসা জীবনের দিকে আমি যখন তাকাই, কখনো কখনো আমার মনে হয়, আমি যেন দুটি মানুষের জীবনই দেখছি। কিন্তু এ বিষয়ে যখনই ভবি, প্রশ্ন জাগে আমার জীবনের এ দুটি অংশ  কি আসলেই একে অপর থেকে এতো আলাদা-না কি রূপ ও পন্থার বিষয়ে এতো সব বাহ্য-পার্থকের তলদেশেও জীবনের উভয় অংশে সবসময়েই ছিলো অনুভূতির মিল এবং লক্ষ্য ছিলো একই?

আমি আমার মাথা তুলি এবং কুয়ার বৃত্তাকার কাঁধির উর্ধ্বেদেশে দেখতে পাই আসমানের একটি বৃত্তাকার খণ্ড এবং তারসমূহ। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি নিশ্চল; আর আমার মনে হলো, আমি যেনো দেখতে পাচ্ছি কী করে ওরা ধীরে ধীরে স্থান বলে চলেছে যাতে করে ওরা পুরা করতে পারে লাখো-কোটি বছরের চক্র যা কখনো শেষ হবার নয়। এবং তারপর, আমি না চাইলেও আমাকে ভাবতে হয়, বছরের চক্র যা কখনো শেষ হবার নয়। এবং তারপর, আমি না চাইলে, আমাকে ভাবতে হয়, বছরের যে স্বল্প কটি পাড়ি আমি পার হয়ে এসেছি তার কথা, সেই অস্পষ্ট বছরগুলি যা আমি কাটিয়েছি আমার শৈশবের গৃহের উষ্ণ নিরাপত্তায়, অমন একটি শহরে, যার প্রতিটি অলিগলি ছিলো আমার চেনা পরিচিত.. . তারপর বড় বড় সব নগরীতে, উত্তেজনা ও আশা আকঙ্খায় ভরপুর নগরীতে কাটানো দিনসব, যা শুধু কিশোরই পারে অনুভব করতে... এরপর এক নতুন জগতে, যেখানে মানুষগুলির চেহার-সুরত প্রথমে মনে হয়েছিলো বিদেশী, কিন্তু কালক্রমে নিয়ে এসেছিলো এক নতুন অন্তরংগতা এবং স্বগৃহে ফেরার নতুনতরো অনুভূতি। তারপর..  অপরিচিত... আরো অপরিচিত পটভূমিকায়, মানব-মনের মতোই পুরোনো সব শহর-নগরে দিন যাপন, দিগন্তহীন স্তেপ অঞ্চলে, পাহাড়-পর্বতে, যার আদিমতা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় মানব হৃদয়ের বন্য আদিমতার কথা... এবং মরুভূমির নির্জন উত্তপ্ত একাকীত্বে গড়িয়ে চলা দিনগুলি ধীরে ধীরি জন্ম নেয় নতুন সত্য-সত্য, যা আমার কাচে নুতন .. এবং  সেদিন দীর্ঘ আলাপের পরে, হিন্দুকুশ পর্বতের তুষারের মধ্যে এক আফগান বন্ধু বিস্মিত হয়ে বলে উঠেছিলো.. . ‘কিন্তু আপনি তো মুসলিম; আপনি নিজে তা জানেন না, এই যা।’ ... এবং আরেক দিন,কয়েক মাস পরে যখন আমি নিজেই তা জানতে পেরেছিলাম। তারপর মক্কায় আমার প্রথম হজ্জ্ব, আমার স্ত্রীর মৃত্যু এবং তার পরবর্তী নৈরাশ্য; আর তখন থেকে আরবদের মধ্যে কাটানো এই সব মুহূর্ত-অন্তহীন মুহূর্তগলি এবং বছরের পর বছর মরুভূমি আর স্তেপের মধ্যে ঘরে বেড়ানো আরব বেদুঈনদের যুদ্ধের মদ্যে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সফর করা, লিবিয়ার আজাদী সংগ্রামে শরীক হওয়া এবং মদীনায় দীর্ঘদিন অবস্থান..  যেখানে ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান পরিপূর্ণ কারার জন্য আমি চেষ্টা করি মসজিদে নববীতে; তারপর বারবার হ্জ্ব; বেদুঈন বালিকাদের সাথে শাদি আর পরে তালাক; মানুষের সাথে আগেগোষ্ণ সম্পর্ক এবং একাকীত্বের উষর দিনগুলি... পৃথিবীর সকল অঞ্চলের বিদগ্ধ মুসলমানদের সাথে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা, অজানা অনাবিষ্কৃত এলাকার মধ্যে দিয়ে সফরঃ প্রতীচ্য জীবনের চিন্তাধারা ও লক্ষ্য থেকে অনেক দরের জগতে নিমজ্জনের এই বছরগুলি।

বছরের পর বছরের কি সুদীর্ঘ মিছিল! এই মুহূর্তে,এই সব নিমজ্জিত বছর এখন ভেসে উঠেছে এবং আবার তাদের মুখের পর্দা তুলে বহু স্বরে আমাকে ডাকতে শুরু করেছে আর অকস্মাৎ আমার হৃদয়ের এক চকিত ঝাঁকুনিতে আমি দেখতে পেলাম কতো দীর্ঘ, কী অন্তহীন আমার এই পথ চলা! –তুমি তো হামেশাই কেবল চলেছো, আর চলেছো ‘ আমি নিজেকে বলি, ‘তোমার নিজের জীবনেকে তুমি এখনো এমন কোনো রূপ দিতে পারোনি যা মানুষ ধরতে পারে তার হাত দিয়ে এবং কখনো পারোনি ‘কোথায়’-এই প্রশ্নের জবাব দিতে। ... ‘তুমি তো কেবল চলেছো আর চলেছো... মুসাফির রূপে, বহুদেশের ভেতর দিয়ে, বহুঘরের মেহমান য়ে, কিন্তু তোমার সফরের তামান্না তো এখনো শেষ হয়নি এবং তুমি যদিও অপরিচিত নও, তুমি এখনো শিকড় গাড়তে পারোনি।

আমি এক মানব গোষ্ঠীর মাঝে নিজের জায়গা করে নিয়েছি-ওরা যাতে বিশ্বাস করে আমি ও সে সব বিষয়ে বিশ্বাস এনেছি, - তবু আমি এখনো শিকড় গাড়তে পারিনি, এর কারণ কী?

দুবছর আগে আমি যখন মদীনায় এক আরবী জরু গ্রহণ করি তখন আমি এই কামনাই তো করেছিলাম যে, ও আমাকে একটি বেটা ছেলে সওগাত দেবে। তার পুত্র তালাল, যে মাত্র কয়েক মাস আগে আমাদের ঘরে জন্মেছে তাকে পেয়ে আমি অনুভব করতে শুরু করেছি যে আরবেরা একাধারে আমার স্বজন এবং আদর্শিক ভাই। আমি চাই যে তালাল দেশের গভীরে তার শিকড় গাড়ুক এবং রক্ত ও তমুদ্দুনের যে মহৎ উত্তরাধিকার তার রয়েছে তারি উপলব্ধির মধ্যে সে বেড়ে উঠুক। আমার মনে হয়ে, কোথাও স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের জন্য এবং পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আবাস প্রতিষ্ঠার জন্য যে-কোন ব্যক্তিকে লালায়িত করে তোলার পক্ষে এই যথেষ্ট। তাহলে, কেন এখনো আমার ঘুরে বেড়ানো শেষ হলো না, কেন এখনো আমাকে চলতে হচ্ছে আমার পথে? কেন আমার জন্য আমি নিজে যে-জীবন বেছে নিয়েছি তা এখনো পুরাপুরি আমাকে খুশি করতে পারছে না? কী সেই জিনিস যা আমি পাচ্ছি না এই পরিবেশে?-ইউরোপের বুদ্ধিগত কৌতুহল তা নিশ্চয়ই নয়। আমি সে-সব ফেলে এসেছি পেছনে। এতে যে আমার খুব লোকসান হয়েছে তা নয়। বলতে কি, আমি এসব থেকে এতো দূরে সরে পড়েছি যে, ইউরোপের যে কাগজগুলি আমার রুটিরুজি যোগাচ্ছে সে-সবের জন্য লেখা তৈরি করাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে আমার জন্য। যখনি আমি কোনো লেখা পাঠাই আমার মনে হয়, আমি যেন এক অতল কুয়ার ভেতর ছুঁড়ে মারছি একখণ্ড পাথরঃ পাথরটি গায়েব হয়ে যায় অন্ধকার শূন্যতায় এবং সামান্য একটু প্রতিধ্বনিও আসে ন াআমাকে একথা জানাতে যে পাথরটি গিয়ে পৌছেছে তার লক্ষ্যস্থলে।

এভাবে যখন আমি চিন্তু করছি, অস্থিরতা এবং বিমূঢ়তার মধ্যে আরবের এক ওয়েসিসের কুয়ার অন্ধকার পানিতে, অর্ধ-নিমজ্জিত অবস্থায়, হঠাৎ আমি আমার স্মৃতির পটভূমিকা থেকে শুরতে পাই একটি কন্ঠস্বর... এক বুড়ো  কুর্দিশ যাযাবরের গলার আওয়াজঃ ‘পানি যদি বদ্ধ জলার মধ্যে তার গতি হারিয়ে ফেলে, পানি হয়ে ওঠে বসি, জীর্ণ এবং ময়লা, কিন্তু যখন তা গতিশীল ও প্রবাহিত হয় তখন পানি হয়ে ওঠে স্বচ্ছ, পরিষ্কার। নিরন্তর ভ্রাম্যমান চলমান মানুষের অবস্থাও তাই।’ এরপর মনে হলো যেন যাদুমন্ত্র বলে আমার সকল চাঞ্চল্য থেকে গেছে। আমি সুদূর আঁখি মেলে তাকাতে শুরু কারি আমার জীবনের দিকে, যেমন আমি তাকাই একটি বই-এর পাতায়, তা থেকে একটি গল্প পড়ার  জন্য এবং আমি বুঝতে শুরু করি  যে, আমার জীবনের গতি ভিন্ন হতে  পারতো না এর থেকে; কারণ, যখন আমি নিজেকে জিজ্ঞাস করি, ‘আমার জীবনের মোটফলটা কী,’ আমার ভেতর থেকেই কে যেন জবাব দেয়ঃ ‘তুমি বের হয়েছো এক জগতের বদলে আরেক জগৎ পাবার জন্য-এক নতুন জগৎ হাসিলের জন্য পুরানো এক জগতের বদলে, প্রকৃতপক্ষে যার অধিকারী তুমি কোনোদিই ছিলে না। ‘এবং চকিত স্বচ্ছতায় আমি বুঝতে পারি-এ ধরনের একটা প্রয়াসে আসলে গোটা জীবনটারই প্রয়োজন হতে পারে।

আমি কুয়ার ভেতর থেকে বের হয়ে আসি, সাথে যে পরিষ্কার লম্বা কুর্তা আমি এনেছিলাম তা গায়ে চড়াই এবং ফিরে যাই আগুনের নিকট জায়েদের কাছে, উটগুলির পাশে। জায়েদ আমাকে যে কড়া কফি দিলো আমি তা-ই খাই, তারপর আগুনের কাছে মাটির উপর সটান শুয়ে পড়ি, সতেজ প্রাণবন্ত হয়ে।

দুই

আমার ঘাড়ের নিচে আড়াআড়িভাবে রাখা আমার হাত  দুটি; এবং আমি তাকিয়ে আছি এই আরবীয় রাতের দিকে, অন্ধকার তারাখচিত রাত, যা ধনুকের মতো বেঁকে আছে আমার উপরে। একটা বৈদ্যুতিক চাপের আকারে ছুটে চলেছে একটি উল্কা, এবং এই যে আরেকটি তারপর আরেকটিঃ আলোর চাপ বিদীর্ণ করছে অন্ধকারের বুক! এগুলি কি কেবল খণ্ড-বিখণ্ড গ্রহের টুকরো, কোনো এক মহাজাগতিক বিপর্যয়েরই  ভগ্নাবশেষ, যা এখন উদ্দেশ্যহীনভাব ধেয়ে চলেছে মহাবিশ্বের অসীম বিস্তারের মধ্য দিয়ে? ওহো! তা নয়। আপনি যদি জায়েদকে জিজ্ঞাস করেন, সে আপনাকে বলে দেবে-এগুলি হচ্ছে আগুনের বর্শা, যার সাহায্যে ফেরেশতারা বিতাড়িত  করে শয়তানকে, কোনো কোনো রাতে যে চুপি চুপি আসমানের উঠে যায় আল্লাহর রহস্য চুরি করে জানবার জন্য... একি তাহলে শয়তানের রাজা ইবলিস নিজে, যার উপর পূর্বাকাশে, এইমাত্র প্রচণ্ড বেগে নিক্ষেপ করা হয়েছে অগ্নিবাণ.. .?

এই আসমান এবং এর তারকারাজির সাথে সম্পর্কিত উপকথাগুলি-আমার কাছে বেশি পরিচিত, আমার শৈশবের ঘর থেকে.. .

এছাড়া অন্য রকম কী করেই বা হতে পারতো? আরব দেশে যখন আমি ঢুকেছি তখন থেকেই জিন্দেগী গুজরান করেছি একজন আরবেরই মতো, কেবল আরবী পোশাকই পরেছি, কথাও বলেছি কেবল আরবী জবানে আর  আমার স্বপ্নগুলিও দেখেছি আরবীতে; আরবের রীতিনীতি আর চিত্রৈশ্বর্য প্রায় অলক্ষিতেই রূপ দিয়েছে আমার চিন্তাকে। একটি দেশের আচার-আচরণ আর ভাষায় একজন বিদেশী যতো দক্ষই হোক না কেন, মনের যে কার্পণ্যের ফলে সাধারণত তার পক্ষে ভিন দেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি উপলব্ধির প্রকৃত পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না এবং তাদের জগতকে নিজের জগৎ করে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে , সে –সবের দ্বারা আমি কখনো বাধাগ্রস্থ হইনি।

হঠাৎ আমি সুখ ও মুক্তির হাসিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠি-এতো জোরে হেসে উঠি যে জায়েদ বিস্মিত চোখ মেলে আমার দিকে তাকায় এবং আমার উটটি একটি ধীর অস্পষ্ট উন্নাসিক ভংগিতে তার মাথা আমার দিকে ফেরায়ঃ কারণ, এই মুহূর্তে আমি দেখতে পেলাম আমার পথটি, তার এতো দৈর্ঘ্য সত্ত্বেও কতো সহজ এবং সরল-যে জগত আমার ছিলো না সেকান থেকে একান্তভাবে আমার নিজের জগতের এই রাস্তাটি।

এদেশে আমার আসা-একি সত্যি নিজেরই ঘরে প্রত্যাবর্তন নয়? একটি হৃদয়ের নিজের ঘরে ফেরা, যে হাজার হাজার বছরের বাঁক ঘুরে তার নিজের ঘর খুঁজেছে এবং এখন চিনতে পেরেছে এই আকাশকে-আমার আকাশকে-বেদনাময় উল্লাসের সংগে? কারণ, এই আরবের আকাশ এতো গাঢ়, এতো উঁচু এবং যে –কোনো দেশের আকাশের চাইতে তারায় তারায় অনেক বেশি উৎসব মুখর, এই আকাশটাই চাঁদোয়ার মতো ছিলো আমার পুর্বপুরুষদের পথের উপর, সেই ভ্রাম্যমাণ পশুচারী যোদ্ধারা, যারা হাজার হাজার বছর আগে তাদের ক্ষমাতর একেবারে প্রভাতকালে জমি ও গণিমতের লোভে অন্ধ হয়ে রওনা করেছিলো কালদিয়ার উর্বর এলাকা এবং এক অজানা ভবিষ্যতের দিকেঃ ইহুদীদের সেই ছোট্ট বেদুঈন কবিলা-সেই লোকদের পিতৃপুরুষ যিনি পরে পয়দা হয়েছিলেন ‘কালদি’দের ‘উর’ নামক স্থানে।

সেই ব্যক্তি, যাঁর নাম ইবরাহিম, তিনি ‘উর’ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তাঁর কবিলা ছিলো আরবের বহু গোত্রের মধ্যে একটি। এসব আরব গোত্র কোনো না-কোনো সময়ে উপদ্বীপের ক্ষুধার্ত মরুভূমি হতে এঁকে-বেঁকে যাত্রা করেছে উত্তরের স্বপনপুরীর দিকে, যে এলাকাগুলি দুধ আর মধুতে সয়লাব ছিলো ওরা মনে করতো। উর্বর আল-হিলালের আবাদী এলাকা সিরিয়া এবং মেসোপটিমিয়াই হচ্ছে সেই সব অঞ্চল। কখনো কখনো এই সব কবিলা ওখানকার বাসিন্দাদের পরাজিত করে ওদের জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ওখনাকার বাসিন্দাদের পরাজিত করে ওদের জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে শাসকরূপে, ক্রমে ওরা মিশে গেছে পরাজিতদের সাথে আর ওদের সহ নতুন এক জাতিরূপে হয়েছে অভ্যুত্থান, আসিরীয় এবং  ব্যাবলনীয়দের মতো জাতির-যারা তাদের রাজ্য গড়ে তুলেছিলো আগেকার সুমেরীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের উপর-কিংবা কালদিদের মতো যারা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলো ব্যাবিলনের অথবা এমোরাইতদের মতো যারা পরে কেনানী বলে পরিচিত হয়েছিলো ফিলিস্তিনে  এবং ফনীশীয়রূপে, সিরিয়ার উপকূলভাগে।  আবার কখনো কখনো বহিরাগত পশুচারী যাযাবরেরা এতোই দুর্বল ছিলো যে যারা ওদের পূর্বে এসেছিলো তাদেরকে হারাবার শক্তি ওদের ছিলো না; পরিণামে এরা পূর্বগতদের মধ্যে হারিয়ে যায় অথবা আবাদীরা পিছু হটিয়ে দেয় যাযাবরদেরকে মরুভূমির দিকে,  আর এমনিভাবে ওদেরকে বাধ্য করে নতুন পশু চারণের ক্ষেত্র তালাশ করতে এবং সম্ভবত ভিন্ন এলাকা জয় করতে। ইবরাহীমের আসল নাম তৌরত অনুসারে  ‘আব-রাম’, প্রাচীন আরবী ভাষায় যার মানে হচ্ছে সেই ব্যক্তি-যিনি উচ্চাভিলাসী স্পস্টতই এই ইবরাহীমের কাবিলা ছিলো কমজোর গোত্রগুলি একটি। মরুভূমির প্রান্তদেশে উষর অঞ্চলে তাদরে বসতি সম্পর্কে বাইবেলে যে কাহিনী আছে তা সেই সময়ের কথাই বর্ণনা করে যখন তারা বুঝতে পেরেছিলো-দোজলা অঞ্চলে নিজেদের জন্য নতুন ঘর খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ হয়েছে-এবং তারা তৈরি হচ্ছিলো, ফোরাতের তীর বরাবর উত্তর-পশ্চিমে হারানেরা দিকে এবং সেখান হতে সিরিয়ার দিকে, রওনা করার জন্য।

‘সেই ব্যক্তি-যিনি উচ্চাভিলাসী’-আমার সেই আদি পূর্বপুরুষ, যাঁকে আল্লাহ ঠেলে দিয়েছিলেন অজানা অজ্ঞাত সব এলাকার দিকে,  এমনি করে আবিষ্কার করতে নিজের সত্তাকে-তিনি নিশ্চয় বুঝতেন, ভালো করেই বুঝতেন, কেন আম এখানে এসেছি-কারণ, তাঁকেও বহু  দেমের মধ্যে দিয়ে ছুটাছুটি করতে, কেন আমি এখানে এসেছি-কারণ, তাঁকেও ববহু দেশের মধ্যে দিয়ে ছুটাছুটি করতে, ঘোরাফেরা করতে হয়েছে, -নিজের জীবনকে অমন একটি রূপ দিতে পাবার আগে যাকে আপনি ধরতে, স্পর্শ করতে পারেন আপনার হাত দিয়ে; বিশেষ এক জায়গায় শিকড় গেড়ে বসার পূর্বে তাঁকেও হতে হয়েছে বহু ঘরের মেহমনা। তাঁর সেই যুগপৎ শ্রদ্ধা-ভীতি জাগানো অভিজ্ঞতার কাছে আমার এই তুচ্ছ বিমূঢ়তা কোনো সমস্যাই মনে হতো না। তিনি বুঝতেন যেমন আমি বুঝতে পারছি এখন-আমার ঘুরে বেড়ানোর মানে নিহিত রয়েছে এমন এক জগতের সাথে পরিচিত হয়ে আমার নিজের সাথে পরিচয়ের একটি সুপ্ত বাসনার মধ্যে, জীবনের গভীরতম প্রশ্ন-সকল এবং সত্য-স্বরূপের প্রতি যে-জগতের দিকে অভিগমন,  আমি শৈশব ও যৌবনে যা-কিছুর সাথে পরিচিত ও অভ্যস্ত ছিলাম তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তিন

মধ্য ইউরোপে আমার শৈশব ও যৌবনকাল থেকে আরবে আমার হালের জীবন পর্যন্ত কী সুদীর্ঘ পথ!  কিন্তু  জীবনের ফেলে আসা এই দিনগুলির স্মৃতিচারণ কতো আনন্দের।

সেই প্রথম শৈশবের দিনগুলি-পোলাণ্ডের লাও নগরী তখনও অস্ট্রিয়ার অধীনে-এমন একটা বাড়িতে কাটানো, যা ছিলো সেই রাস্তাটির মতোই নীরব এবং মর্যাদাপূর্ণ, যার পাশে দাঁড়িয়েছিলো বাড়িটি। লম্বা রাস্তা, কিছুটা ধুলিধূসর অথচ পরিচ্ছন্ন, দুপাশে সারি সারি চেস্টগান গাছ, পুরু কাঠের তক্তা বিছানো সেই রাস্তা ঘোড়ার ক্ষুরের ধ্বনিকে চাপা দিয়ে দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে রূপান্তরিত করতে অলস বিকালে। আমি ভালোবাসতাম সেই  সুন্দর রাস্তাটিকে এক অদ্ভুদ সজ্ঞানতার সংগে, আমার শৈশবের শহরগুলির সাথে-কেবল এ করণেই নয় যে, রাস্তাটি ছিলো আমার বাড়ির রাস্তা; বরং আমি মনে করি, আমি একে আসলেই ভালোবাসতাম, কারণ একটি মহৎ প্রশান্তির ভাব নিয়ে রাস্তাটি হাসি-খুশিতে উচ্ছ্বাসিত শহরে প্রাণচঞ্চল কেন্দ্র থেকে প্রবাহিত হয়েছে শহর-প্রান্তের বনানীর নীরবতার দিকে এবং সেই বনানীতে লুকানো বিশাল গোরস্তানের দিকে। কখনো কখনো সুন্দর সুন্দর গাড়ি নিঃশব্দ চাকার উপরে, ধাবমান ঘোড়ার ক্ষুরের দ্রুত খট্ খট্ খট্ খট্ ছন্দের সথে তাল মিলিয়ে যেনো উড়ে চলে; আর যদি তা শীতকাল হয় এবং রাস্তাটি ঢাকা পড়ে যায় ফুট-গভীর তুষারে, আর তখন তার উপর দিয়ে গাড়িয়ে চলে শ্লেজ গাড়ি এবং ঘোড়ার নাসা থেকে বেরয়ে আসে বাস্প, আর কুয়াশার ভারাক্রান্ত হাওয়ার টুঙটুঙ করতে থাকে তাদের ঘন্টাগুলি আর তুমি যদি নিজেই বসে একটি শ্লেজ গাড়ির ভেতরে এবং অনুভব করো, কুয়াশা তোমার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে আর তোমার গাচে লাগছে তার হিমশীতল পরশ, তোমার শিশুসুলব হৃদয় বুঝতে পারবে –ধাবমান ঘোড়াগুলি এমন এক সুখের দিকে তোমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যার আরম্ভ নেই, শেষও নেই।

তারপর, গ্রামাঞ্চলে গ্রীষ্মের সেই মাসগুলি যেখানে আমার এক ধনী ব্যাঙ্কার নানা রেখেছিলেন এক বড় জমিদারী, তাঁর বড় পরিবারের খুশির জন্য । অলস –গতি ছোট্ট একটি নদী বয়ে যেতো, যার ‍দুই পারে ছিলো উইলো গাছের সারি; তারপর, শান্ত-শিষ্ট গবাদিতে ভর্তি সেখানকার গোলাবাড়িগুলি-আর এমন একটি আলো-আধাঁরী যা জন্তু-জানোয়ার ও খড়ের গন্ধে ছিলো রহস্যজনকভাবে পূর্ণ, আর রুথেনিয়ো কিষাণ কন্যাদের হাসি, যারা সন্ধ্যাকালে ব্যস্ত থাকতো গাই দোহানে; সোজা দোনার ভেতর থেকে উষ্ণ ফেনিল দুধ পান করতে পারো তুমি, কেবল তৃষ্ণার্ত বলেই নয়, বরং এখনও যা তার জান্তব উৎসবের এতো কাছাকাছি রয়েছে তেমন কিছু পান করাটাই ছিলো উত্তেজনাপূর্ণ। আগষ্ট মাসের সেই দিনগুলি, যা আমি কাটিয়েছি মাঠে কামালদের সংগে, যারা গম কাটছিলো, আর সেই মেয়েদের সংগে যারা সেগুলি একত্র কারে আঁটি বাঁধছিলোঃ তরুণী সেই সব নারী, দেখতে সুন্দর ভারিক্কি দেহ, বুকভরা স্তন আর কঠিন সজীব বাহু, যার শক্তি আমি অনুভব করতাম যখন ওরা দুপুর বেলা খেলাচ্ছলে আমাকে গমের স্তূপের ‍উপরে গড়িয়ে দিতো; অবশ্য , সে সময় আমার বয়স ছিলো এতো অল্প যে ওদের  হাস্যমুখর আলিংগনের এর বেশি কোনো অর্থ করা আমার পক্ষে সম্ভ ছিলো না।

আর আব্বা-আম্মার সাথে আমার ভিয়েনা এবং বার্লিন, আল্পস পর্বতমালা এবং বোহেমিয়ার অরণ্যাঞ্চল, উত্তর সমুদ্দুর আর বান্টিক সফর; স্থানগুলি এতো দুরে দূরে ছিলো যে, মনে হয়েছিলো প্রত্যেকটিই যেনো এক একটি নতুন দুনিয়া। যখনি আমি এ ধরনের সফরে বেরিয়েছি, ট্রেনের ইঞ্জিনের প্রথম হুইশল এবং তার চাকার প্রথম  ঝাঁকুনির সংগে সংগে যে নয়া-নয়া বিস্ময় উদগটিত হতে যাচ্ছে আমাদের নিকট, তারই কল্পনায় যেনো থেমে যেতো আমার হৃদ-স্পন্দন!

.. . তা ছাড়া অনেক খেলার সাথী-ছেলে এবং মেয়েরা , একটি ভাই ও একটি বোন এবং বহু চাচাতো-খালাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাই –বোন এবং হপ্তার ইস্কুলের দিনগুলি নিরান্দতার পর.. . যা খুব পীড়াদায়ক ছিলো না, সেই উজ্জ্বল স্বাধীন রোববারগুলি; গ্রামাঞ্চলে ছুটাছুটি করে বেড়ানো, আমার নিজের বয়সী সুন্দর বালিকাদের সাথে  আমার প্রথম গোপন সাক্ষাতকার এবং অদ্ভুত এক উত্তেজনায় লাল হয়ে ওঠা, যা কাটিয়ে উঠতে আমার লাগতো ঘন্টার পর ঘন্টা.. .

এই শৈশব ছিলো সুখের- অতীতের হলেও তৃপ্তিকর। আব্বা-আম্মার জীবন ছিলো আরাম-আয়েশের জীবন, বলা যায় তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের জন্যেই জীবন ধারণ করেছেন। পরবর্তী বছরগুলিতে অপরিচিত এবং কখনো প্রতিকূল অবস্থার সাথে আমি যে সহজভাব নিজেকে খাপ খাইয়ে  নিতে পেরেছি, তার মূলে থাকতে পারে আমার আম্মারই প্রশান্তির এবং অবিচলিত নীরবতার কিছু –না-কিছু প্রভাব-অন্যদিকে আমার আব্বার মানসিক চঞ্চলতা হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে আমর অস্থির প্রকৃতিতে.. .

আমাকে যদি আমার আব্বার বর্ণনা করতে হয়, আমি বলবো, এই সুন্দর, ছিপছিপে, মাঝারি আকৃতির গাঢ় রঙের মানুষটির –যাঁর চোখ দুটি ছিলো কালো এবং ব্যগ্র, -পরিবেশের সাথে খুব মিল ছিলো না। যৌবনের প্রথমদিকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিজ্ঞান চর্চা করবেন-বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানের আত্মনিয়োগ করবেন। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন তাঁর জীবন সফল হয়নি। তিনি ব্যরিষ্টার হয়েই খুশি থাকতে বাধ্য হন। অবশ্য তাঁর এই পেশায় তিনি বেশ সফলিই হয়েছিলেন, কারণ তাঁর তীক্ষ্ম ব্যগ্র মনের জন্যে এ পেশা হয়তো একটা চ্যালেঞ্জের মতন ছিলো। তবু আব্বা কখনো এই পোশাকে মনে-প্রানে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁকে ঘিরে জেঁকেছিলো যে একাকীত্বের একটি ভাব, তার মূলে হয়তো ছিলো হামেশা-বিধ্যমান এই সচেতনতা যে, তাঁর সত্যিকার পেশা তাঁকে ছলনা করেছে।

আমার আব্বার আব্বা ছিলেন তখনকার দিনের অস্ট্রীয় প্রদেশ বুকোভিনার রাজধানী জার্নোবিৎসের এক গোঁড়া রাব্বী তথা ইহুদী মোল্লা। আমার এখনো মনে পড়ে –বুড়ো ছিলেন খুবই সুন্দর, তাঁর হাত দুটি ছিলো নরম মোলায়েম এবং লম্বা, সাদা দাঁড়ির ফ্রেমের মধ্যে আঁটা ছিলো তাঁর উৎসুক অনুভূতিময় মুখখানা। তিনি তাঁর অবসর সময়ে সারাজীবন ধরেই গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেছেন; এই দুই শাস্ত্রে তাঁর গভীর অনুরাগ ছিলো। তাছাড়া তিনি ছিলেন সেই এলাকার সেরা দাবাড়ে-আর এটাই হয়তো ছিলো.. . গোঁড়া গ্রীক আর্কবিশপের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের বুনিয়াদ, কারণ, আর্কবিশপ নিজেও ছিলেন একজন নামকরা দাবাড়ে। দুই বুড়ো সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা কাটাতেন দাবার ছক নিয়ে, তাদের আসর শেষ হতো নিজ নিজ ধর্মের তূরীয় প্রতিজ্ঞাগুলির আলোচনায়। অনেকে মনে করতে পারে, এ ধরনের মানসিক প্রবণতা নিয়ে আমার দাদার পক্ষে আমার আব্বার বিজ্ঞানমুখিতাকে অভিনন্দিত করাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু মনে মনে তিনি শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত করেন, তাঁর পয়লা পুত্র অনুসরণ করবে ইহুদী রাব্বীর ঐতিহ্য, যা ছিলো তাঁদের পরিবারের কয়েক পুরষের পুরোনো ঐতিহ্য। আমার আব্বার জন্য অন্য কোনো পেশার কথা বিবেচনা করে দেখতেও তিনি রাজী ছিলেন না। তাঁর এই প্রতিজ্ঞা হয়তো আরো মজবুত হয়েছিলো পারিবারিক আলমারিতে রক্ষিত একটি কলংকজনক কংকালের দ্বারা; তাঁর এক চাচার অর্থাৎ আমার পর-দাদার এক ভাই-এর স্মৃতি, যিনি অত্যন্ত অস্বাভাবিকভাবে ভংগ করেছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্য-এমনকি, তাঁর পিতৃপুরুষের ধর্মকেও পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন।

মনে হয়, পর-দাদার সেই প্রায়-উপকথার ভাই-যাঁর নাম কখনো সশব্দে উচ্চারিত হতো না এ পরিবারে-মানুষ হয়েছিলেন একই পারিবারিকি ঐতিহ্যের মধ্যে। অতি তরুণ বয়সে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন পুরো রাব্বী আর এমন এক রমণীর সাথে সেই বয়সেই তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যাকে তিনি ভালোবাসতেন বলে মনে হয় না। সেকালে রাব্বীর পেশার মাইনে খুব বেশি ছিলো না। তাই তিনি আয় বৃদ্ধির জন্য পশমের ব্যবসা করতেন, আর এজন্য প্রতি বছর তাঁকে যেতে  হতো ইউরোপের কেন্দ্রীয় পশমের বাজার লীপজিগে। যখন তাঁর বয়স প্রায় পঁশিচ বছর, তখন তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে এ ধরনের দীর্ঘ সফরে বেরিয়ে পড়েন। সে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের কথা; সেবারো তিনি লীপজিগে গিয়ে তাঁর পশম বিক্রি করেন; কিন্তু তিনি ঘরে না ফিরে তাঁর গাড়ি এবং ঘোড়া দুই-ই বিক্রি করে দিলেন। তারপর, দাড়ি আর জুলফি চেছে ফেলে দিায়ে, যে স্ত্রীকে তিনি ভালবাসনতেন না তাকে ভুলে গিয়ে চলে যান ইংল্যাণ্ডে। কিছুদিন তিনি তাঁর দিন-গুজরান করেন গতর খাটিয়ে, সন্ধ্যাকালে তিনি অধ্যয়ন করতেন জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্র। তাঁর কোনো এক পৃষ্ঠপোষক তাঁর জোহনের পরিচয় পেয়েছিলেন বলে মনে হয়-তিনি অক্সফোর্ডে তাঁর পড়াশেোনা চালাবার ব্যবস্থা করে দেন! অক্সফোর্ড থেকেই কয়েক বছর পরে আমার পর –দাদার ভাই বেরিয়ে আসেন এক প্রতিশ্রুতিশীল পণ্ডিত এবং নও-খৃষ্টানরূপে। তাঁর ইহুদী স্ত্রীর নিকট তালাকনামা পাঠাবার কিছু পরেই তিনি বিয়ে করেন অ-ইহুদীদের এক বালিকাকে। তাঁর পরবর্তী জীবন সম্বন্ধে আমাদের পরিবারে বিশেষ কিছু জানা যায়নি-তিনি জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন এবং নাইট হিসাবে ইন্তেকাল করেন, কেবল এটুকুই জানা গিয়েছিলো।

মনে হয়, এই ভয়ংকর ‍দৃষ্টান্তই, জাহিলদের বিজ্ঞান অধ্যায়নের জন্য আমার আব্বার যে আগ্রহ ছিলো তার প্রতি আমার দাদার মনোভাবকে এতো অনমনীয় করে তোলে। তাঁকে একজন রাব্বী হতে হবে-এবং এই শেষ কথা! অবশ্যি আমার আব্বা এতোটা সহজেই হাল ছেড়ে দেবার জন্য তৈরি ছিলেন না। দিনের বেলা তিনি পড়তেন ‘তালমুদ’-কিন্তু রাতের বেলা লুকিয়ে তিনি পড়তেন কেনো শিক্ষকের সাহায্য না নিয়েই, -‘মানবতামুলক মাধ্যমিক কারিকুলাম’। পরে তিনি তাঁর মার কাছে তা খুলে বলেন। তাঁর পুত্রের গোপন পড়াশোনায় তিনি হয়তো মনে কষ্ট পেয়ে থাকবেন, তবু তিনি তাঁর মহৎ প্রকৃতির দরুন বুঝতে পারেন, পুত্রকে তাঁর অন্তরের ইচ্ছা  মতো কাজা করার সুযোগ থেকে  বঞ্চিত করা খুবই নির্দয় কাজ হবে। বাইশ বছর বয়সে, আট বছর বয়সে, আট বছরের ‘মাধ্যমিক’ কোর্স চার বছরে শেষ করে আমার আব্বা বি. এ. পরীক্ষার জন্য তৈরি হন এবং কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। এই ডিগ্রী নিয়ে তিনি এবং তাঁর আম্মা আমার দাদার কাছে ভয়ংকর  খবরটি প্রকাশ করার জন্য সাহস করে তৈরি হলেন। এর ফলে যে নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় তা আমি অনুমান করতে পারি। কিন্তু এর পরিণতি এই হলো যে আমার দাদা শেষতক নরম হয়ে পড়েন এবং রাজী হয়ে গেলেন, আমার আব্বা আর রাব্বীর পড়াশোনা করবেন না, তার বদলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বেন। অবশ্যি, পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন ছিলো না যে তিনি তাঁর প্রিয় বিষয় ‘পদার্থ বিজ্ঞান’ অধ্যয়ন করতে পারেন। এ জন্য তিনি এর চাইতে অধিকতরো অর্থকরী একটি পেশা- আইনজীবীর পেশার আশ্রয় নেন এবং যথাসময়ে একজন ব্যারিষ্ট্যার হয়ে বের হয়ে আসেন। কয়েক বছর পর তিনি পূর্ব গ্যালিসিয়ার লাও শহরে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানেই স্থানীয় একজন ধনী ব্যাংকারের চার কন্যার অন্যতমা-আমার আম্মাকে শাদি করেন। সেখানে ১৯০০ সালের গ্রীষ্মকালে তাঁদের তিনটি সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানরূপে আমি জন্মগ্রহণ করি।

আমার আব্বার ব্যর্থ বাসনার প্রকাশ ঘটে বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি নিয়ে তাঁর ব্যাপক পড়াশোনায় এবং হয়তো তাঁর এই দ্বিতীয় পুত্রের-অর্থাৎ আমার প্রতি তাঁর অদ্ভুত অথচ খুবই চাপা পক্ষপাতিত্বে। মনে হয়, আমিও সেই সব বিষয়ের প্রতিই বেশি অনুরাগী ছিলাম যার সংগে কোনো সম্পর্ক ছিলো না আশু অর্থ-উপার্জনের এবং সফল কর্ম-জীবনে’র। তা সত্ত্বেও তিনি যে আমাকে একজন বৈজ্ঞানিক বানাবার স্বপ্ন দেখতেন তা পূরণ হাবার কেনো সম্ভাবনাই ছিলো না। আমি বোকা না হলেও, ছাত্র হিসাবে ছিলাম খুবই উদাসীন প্রকৃতির। গণিতশাস্ত্র এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলি ছিলো আমার কাছে বিরক্তিকর। আমি অপরিসীম আনন্দ পেতাম সিয়েনকীবিজের উত্তেজনাকর ঐতিহাসিক রোমান্সগুলি পড়তে, জুল ভার্নের উদ্ভট কাহিনী, জেমস ফেনিমোর কূপার এবং কার্ল মে- এর রেড ইণ্ডিয়ানদের নিয়ে লেখা গল্প এবং পরে রিলেকর কবিতা ও গভীর উদাত্ত ছন্দে রচিত ‘অলসো স্প্রাখ জরথুস্ত্র’ পাঠ করতে। লাতিন এবং গ্রীক ব্যাকরণের মতোই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও বিদ্যুতের রহস্য আমাকে উৎসাহিত করতো না মোটেই। এর ফলে, প্রতিবারই আমি পরীক্ষায় ফেল করতে করতে প্রমোশন পেয়েছি। নিশ্চয়ই আমার আব্বার জন্য এ ছিলো তীব্র নৈরাশ্যের ব্যাপার। কিন্তু খুব সম্ভব, এ বিষয়ে তিনি সান্তনা বোধ করে থাকবেন যে, আমার ওস্তাদেরা পোলিশ ও জার্মান সাহিত্য এবং ইতিহাসের প্রতি আমার ঝোঁক দেখে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন।

আমার পারিবারিক ঐতিত্যের অনুসরণে আমি ঘরেই ওস্তাদের কাছে হিব্রু ধর্মে পুরাদস্তুর ইলম হাসিল করি। এর কারণ, আমার আব্বা-আম্মার প্রকাশ্য ধার্মিকতা নয়। ওঁরা ছিলেন এমন এক জামানার মানুষ যখন মানুষ পূর্বপুরুষদের জীবন যে ধর্ম-বিশ্বাসগুলি দ্বারা গঠিত হয়েছিলো সেগুলির কোনো-না-কোনোটির প্রতি কেবল মৌখিক আনুগত্যই প্রকাশ করতো; সে ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী তার ব্যবহারিক, এমনকি নৈতি চিন্তাকেও গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কেউ করতো না। এহেন সব লোকের নীরস প্রাণহীন আনু্ষ্ঠানিকতায়-যারা কেবল অভ্যাসবশে, কেবল অভ্যাসেরই বশে... তাদের ধর্মীয় উত্তাধিকারকে আঁকড়ে ধরেছিলো-কিংবা অধিকতরো ‘সংস্কারমুক্তদের উন্নাসিক উদাসীনতায়, যারা মনে করতো ধর্ম একটি জরাজীর্ণ কুসংস্কার বিশেষ, মানুষ যার সাথে মাঝে মাঝে  বহ্যিক খাপ খাইয়ে চলতে পারে, কিন্তু যার সম্পর্কে সে মনে মনে শরমিন্দা, বুদ্ধি দিয়ে তাকে সমর্থন করা যায় না বলে। সকল দিক দিয়েই,  আমর আব্বা-আম্মা ছিলেন প্রতমোক্ত দলের মানুষ। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে এই ক্ষীণ সন্দেহ জাগে-অন্তুতপক্ষে আমার আব্বার ঝোঁক ছিলো দ্বিতীয় দলটিরই দিকে। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর আব্বা ও শ্বশুরকে খুশি করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন-আমাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে ধর্মীয় কিতাবগুলি পড়েতে হবে। এভাবে বারো তোরো বছর বয়সে আমি যে কেবল খুব দ্রুত হিব্রু ভাষা পড়তেই শিখে ফেললাম তা নয়, বরং হিব্রু ভাষায় অনায়াসে কথা বলার ক্ষমাতও আয়ত্ব করলাম। তাছাড়া আর্মায়িক ভাষার সাথেও মোটামুটি একটি পরিচয় হয়ে গেলো। বোধহয়, এই পরিচয়ের  জন্য পরবর্তীকালে আমি অতো সহজে আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম। আমি ‘ওল্ড টেস্টামেণ্ট’ পড়ে ফেললাম তার আদি ভাষায়। এভাবে ‘মিশনা’ এবং‘ জেমারা’ – অর্থাৎ তালমুদের মূল পাঠ এবং তার তফসীরের সাথেও আমর পরিচয় হলো। বেশ কিছুটা আত্ম-প্রত্যয়ের সংগেই আমি আলোচনা করতে পারতাম জেরুজারেম এবং ব্যবিলনের তালমুদের তফাৎ নিয়ে। ‘তারগুম,’- অর্থাৎ বাইবেলের ভাষ্যগুলির জটিলতার মধ্যে আমি এভাবে হারিয়ে গেলাম যে, ‘রাব্বীর’  জীবনই যেনো আমার জন্য নির্ধারিত!

এই সব নতুন ধর্মীয় জ্ঞান সত্ত্বেও,  কিংবা হয়তো এ কারনেই শিগগীরই আমি ইহুদী ধর্মের অনেক সূত্র সম্বন্ধেই একটা উন্নাসিক মনোভাব অবলম্বন করতে শুরু করি। একথা সত্য যে, ইহুদী ধর্মগ্রন্থের সর্বত্র যে নৈতকি সৎ-আলের উপর এতো জোর দেওয়া হয়েছে তার সংগে মতবিরোধ ছিলো না, ইহুদী নবীদের মহান ঐশী চেতনার সংগেও নয়। কিন্তু আমার মনে হলো ওল্ড টেষ্টামেণ্ট এবং তালমুদের ‘আল্লাহ’ যেনো তাঁর পূজারীরা কিভাবে তাঁর পূজা করবে তার অনুষ্ঠানগুলি নেয়েই অনাবশ্যকভাবে ব্যস্ত ছিলেন। আমার আরো মনে হতো, আল্লাহ যেনো বিশেষ একটি জাতি তথা ইহুদীদের ভাগ্য নিয়েই বিস্ময়করভাবে ব্যস্ত রয়েছেন পূর্ব থেকেই। ইবরাহীমের বংশধরগণের ইতিহাসরূপে ওল্ড টেষ্টামেন্টের কাঠামোটিই এমন যে, মনে হয়, আল্লাহ যেনো গোটা মানবজাতির স্রষ্টা ও পালনকর্তা নন, বরং একটি উপজাতীয় দেবতা, যে-দেবতা একটি মনোনীত জাতির প্রয়োজনের সংগ-সংগগতির বিধান করে চলেছে গোটা সৃষ্টিরঃ যখন তারা সৎকার্য করে তাদেরকে পুরস্কৃত করছে  দেশ জয় দ্বারা এবং যখনি তারা তাদের জন্য স্থিরীকৃত পথ তেকে সরে পড়েছে তাদেরকে দুখ-লাঞ্ছনা ভোগ করতে কবাধ্য করছে অবিশ্বাসীদের হাতে। যখন এই মৌলিক ক্রটিগুলির আলোকে দেখি, মনে হয়, ইসায়া এবং জেরিমিয়ার মতো পরবর্তী নবীদের নৈতিক উদ্দীপনায়ও যেনো বিশ্বজনীন পয়গাম বলতে কিছু নেই।

কিন্তু, আমার সেই প্রথমদিকের পড়াশেরানর ফল, যা আশা করা হয়েছিলো তার বিপরীত হলেও-কারণ তা আমাকে আমার পিতৃপুরষদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট না করে, বরং তা থেকে দূরেই ঠেলে দিয়েছিলো, আমাকে পরবর্তীকালে বুঝতে সাহায্য করেছে-আমি মাঝে মাঝে ভাবি-ধর্ম মাত্রেরই মৌলিক উদ্দেশ্যকে; তার রূপ যা-ই হোক। অবশ্যি ইহুদী ধর্ম আমাকে হতাশ করলেও সে সময়ে অন্য কোথাও আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা আমি করিনি। এক সংশয়বাদী-পরিবেশের প্রভাবে আমি আমার বয়সের অন্যান্য বহু বালকের মতোই সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসি সকল আনুষ্ঠানিক ধর্মকে। যেহেতু, আমার কাছে ধর্ম কখনো এক মস্ত বাধা-নিষেধমূলক আইনের বেশি কিছু মনে হয়নি, তাই এই ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে আমার আসলেই কেনো সম্পর্ক ছিলো না। আমি যা চাইছিলাম, অন্যান্য প্রায় সকল বালকই যা চাই তা থেকে খুব ভিন্ন কিছু তা নয়- আমি চাইছিলাম কর্ম, আমি চাইছিলাম দুঃসাহসিক অভিযান এবং উত্তেজনা!

উনিশ শ’ চৌদ্দ সালের দিকে, যখন মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, মনো হলো, আমার বাল-সুলভ স্বপ্ন সফল করার পয়লা বড়ো সুযোগ যেনো হাতের মুঠায় এসে গেছে। ‍চৌদ্দ বছর বয়সে আমি স্কুল থেকে পালিয়ে গিয়ে যোগ দিলাম অস্ট্রীয় সামরিক বহিনীনতে-এক মিথ্যা নামে। আমার বয়সের তুলনায় আমি ছিলাম অনেক লম্বা, সহজেই আঠারো বছর বলে পার হয়ে গেলাম, আর আঠারোই ছিলো ফৌজে ভর্তি হবার নূন্যতম বয়স। কিন্তু স্পষ্টতেই আমার মধ্যে ছিলো না সৈনিকোচিত কেনো বৈশিষ্ট্য। প্রায় এক হপ্তা পর আার আব্বা আমাকে খুঁজে বের করেন পুলিশের সাহায্যে। পরে আমাকে কলংকজনকভাবে নিয়ে যাওয়া হলো ভিয়েনায়, যেখানে কিছুকাল আগে থেকেই বাস করতে শুরু করেছিলো আমার পরিবার। প্রায় চার বছর পর, আমাকে কার্যত এবং আইনানুসারে ভর্তি করা হলো অস্ট্রীয় বাহিনীতে, কিন্তু এর আগেই আমার সামরিক গৌরবের স্বপ্ন ফুরিয়ে গেছে, আমি আমার সার্থকতার জন্য খুঁজে ফিরছিলাম অন্য পথ। যা হোক, আমার সামরিক বাহিনীতে ভর্তি হবার কয়েক হপ্তা পরেই বিপ্লব ঘটলো, অস্ট্রী সাম্রাজ্য ভেংগে পড়লো এবং যুদ্ধও শেষ হয়ে গেলো।

পয়লা মহাযুদ্ধের পর প্রায় দু’বছর আমি অনেকটা অগোছালোভাবেই ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলায় ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্র পড়ি। আমার মন ছিলো না এসব অনুশীলনে। শান্ত একাডেমিক জীবনের কোনো আকর্ষণই আমার কাছে ছিলো না। আমি অনুভব করছিলাম জীবেনের সাথে আরো গভীরভাবে মুকাবিলা করার আকাঙ্খা,  জীবনে প্রবেশ করার বাসনা। নিরাপত্তাপ্রিয় মানুষ নিজের চারপাশে যে-সব কৃত্রিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে সেগুলির আশ্রয় না নিয়েই আমি প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম জীবনে-আমি চেয়েছিলাম, সবকিছুর পেছনে যে আধ্যাত্মিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে তা উপলব্ধির পথ নিজেই খুঁজে বের করতে-যে শৃঙ্খলা অবশ্যই রয়েছে বলে আমি জানতাম, অথচ, যা আমি তখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না।

সে দিন যে আধ্যাত্মিক শৃংখলা বলতে আমি কী বুঝতাম তা ভাষায় প্রকাশ করা মোটেই খুব সহজ নয়। নিশ্চয় আমি মামুলি ধর্মীয় অর্থে এ প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করিনি; বরং বলা যায়, নির্দিষ্ট কোনো অর্থেই নয়। আমার নিজের প্রতি সুবিচার করতে হলে বলতে হয় আমার এই অস্পষ্টতা এই অনির্দিষ্টতা আমার নিজের তৈরি নয়-এ আসলে একটা গোটা যুগ বা জামানারই অস্পষ্টতা এই অনির্দিষ্টতা।

বিশ শতকের শুরুর দশকগুলির একটি লক্ষণ ছিলো আধ্যাত্মিকতা শূন্যতা। ইউরোপ বহু শত বছর ধরে যে –সব নৈতিক মূল্যবোধে অভ্যস্ত ছিলো সে সমুদয়ই ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সারের মধ্যে যা ঘটলো তারই ভয়ংকর চাপে নির্দিষ্ট  রূপরেখা হারিয়ে আকার-শূন্য হয়ে পড়লো। এবং তার জায়গায় নতুন এক স্তবক মূল্যবোধ তখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো না কোথাও। সবাই অনুভব করছিলো একটা ক্ষণভংগুরতা ও অনিশ্চয়তার ভাব, সামাজিক ও মানসিক ওলট-পালটের পূর্বাভাস-যার ফলে মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করলো-মানুষের চিন্তা ও প্রয়াসে আর কখনো স্থায়িত্ব বলে কিছু থাকতে পারে কি না। সমস্ত কিছুই যেনো ভেসে চলছিলো এক নিরাকার, নিরাবয়ব বন্যায়। এবং তরুণের আত্মিক চাঞ্চল্য কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলো না কোনো নির্ভর। নৈতিকতার কেনো নির্ভরযোগ্য মান না থাকায় কেউই আমাদের তরুণদেরকে দিতো পারতো না সেই সব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব যে প্রশ্নগুলিতে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। বিজ্ঞান বলতে ‘জ্ঞানই সব’- এবং গিয়েছিলো  যে একটা নৈতিক লক্ষ্য ছাড়া জ্ঞান কেবল বিশৃংখলাই সৃষ্টি করতে পারে। সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী এবং কমিউনিষ্টরা-এতো সন্দেহ নেই যে, এরা সকলেই চেয়েছিলো একটা উৎকৃষ্টতরো এবং অধিকতরো সুখী দুনিয়া নির্মাণ করতে –কিন্তু এদের প্রত্যেকেই চিন্তা করছিলো কেবল বাহ্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে এবং ক্রটি সংশোধনের জন্য ওরা ওদের ইতিহাসের জড়বাদী ধারণাকে উন্নীত করেছিলো এক নতুন অধিবিদ্যা-বিরোধী অধিবিদ্যায়। এদিকে নিজেদের চিন্তার রীতি থেকে অর্জিত যে গুনসমূহ অনেক আগেই অনমনীয় এবং অর্থহীন হয়ে পড়েছিলো, মামুলি ধার্মিকেরা সেগুলিকে আল্লাহর প্রতি আরোপ করার চাইতে বেহতর কিছু জানতো না। এবং আমরা তরুনেরা যখন দেখতে পেলাম- আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে যা ঘটছে, অনেক সময়ই কল্পিত ঐশী গুণাবলীর সঙ্গে তার প্রচণ্ড অসংগতি দেখা যায় তখন আমরা নিজেদের বললামঃ ‘আল্লাহর প্রতি যে-সব গুণ আরেপ করা হয় সেগুলি মানবভাগ্যের নিয়ামক শক্তিগুলি থেকে স্পষ্টতই আলাদা, স্বতন্ত্র। কাজেই আল্লাহ বলে কিছু নেই।’ আমাদের অতি অল্প কজনের মনে হয়েছিলো, এ সমস্ত বিভ্রান্তির কারণ হয়তো ধর্মের আত্মাভিমানী অভিভাবকদের খেয়ালী মেজায-মার্জির মধ্যেই নিহিত, যারা দাবি করে, ‘আল্লাহর, পরিচয় দেয়া’র অধিকার তাদের রয়েছে এবং এভাবে, আল্লাহকে তাদের নিজের পোশাক পরিয়ে মানুষ  ও তার ভাগ্য থেকে যারা আল্লাহকে করেছে বিচ্ছিন্ন।

ব্যক্তি-জীবনে কিংকর্তব্য সম্বন্ধে এই অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীলতা নিয়ে আসতে পারে ঘোর নৈতিক বিশৃংখলা এবং মানুষের শিল্প, সৌন্দর্য, সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধা; পক্ষান্তরে মহৎ জীবনকে যা গড়ে তোলো তারি দিকে আসবার একটি সৃজনধর্মী ব্যক্তিগত পথ –অনুসন্ধানেরও তা সহায়ক হতে পারে।

পরোক্ষভাবে, এই সহজাত উপলব্ধিই হয়তো আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মূল পাঠ্য বিষয় হিসাবে শিল্পকলার ইতিহাস বেছে নিয়েছিলাম তার কারণ। মনে হয়েছিলো, শিল্পকলার সত্যিকার কাজই হচ্ছে আমাদের মনে সমাঞ্জস্যপূর্ণ বহুকে এক কর তোলার একটা নমুনা ফুটিয়ে তোলা, যা নিশ্চয়ই রয়েছে ঘটনায় খণ্ডবিচ্ছিন্ন যে-সব ছবি আমাদের চেতনা আমাদের নিকট উদঘটিত করছে সে সবের তলদেশে, -যে-নমুনাকে কল্পনামূলক চিন্তার সহায্যে কেবল সম্পূর্ণভাবেই প্রকাশ করা যেতে পারে। বলাবাহুল্য, আমার পাঠ্য বিষয় আমাকে খুশি করতে পারলো না। মনে হলো, আমার অধ্যাপকেরা-যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন, স্ট্রজিগভস্কি এবং দ্বোরাক ছিলেন নিজ নিজ অনুশীলনের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট-সৌন্দর্যতত্ত্বে যে-সব নিয়ম-কানুন দ্বারা শিল্প সৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হয় সেগুলি আবিষ্কার করতেই ছিলেন বেশি মাত্রায় ব্যস্ত; এর মর্মমূলে যে আধ্যাত্মিক তরংগাভিঘাত রয়েছে তা উদঘাটন করার চেষ্টা তাঁরা খুব সামান্যই করেছেন। অন্য কথায়, আমার মতে, শিল্পকলার প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভংগি অতি সংকীর্ণভাবে সীমাবদ্ধ ছিলো সেইসব রূপ ও আংগিকের মধ্যে যাদের মাধ্যমে অভিব্যক্তি লাভ করে আর্ট।

সেই যৌবনোজ্জ্বল বিভ্রান্তির দিনগুলিতে মনোবিলন শাস্ত্রের যে-সব সিদ্ধান্তের সাথে আমি পরিচিত হই সেগুলিতেও আমি, হয়তো বা কিছুটা ভিন্ন কারণেই, একই রকম অতৃপ্ত থেকে যাই। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে সময়ে মনোবিকলন তত্ত্ব একটা পয়লা নম্বর মনোবিপ্লব রূপে দেখা দিয়েছিলো। আমি তখন অনুভব করছিলাম মর্মে মর্মেঃ জ্ঞান ও উপলব্ধির এতোদিনকার বদ্ধ অথচ নতুন দরোজাগুলি এভাবে খুলে দেয়ার ফলে মানুষের নিজের সম্পর্কে ও সমাজ সম্পর্কে চিন্তাধারা প্রভাবিত হবে গভীরভাবে, হয়তো বা একেবারেই বদলে যাবে; মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে নির্জ্ঞান-মনের কামনা-বাসনার যে ভূমিকা রয়েছে তার আবিষ্কার সন্দেহতীতভাবেই গভীরতরো আত্মোপলব্ধির পথ মুক্ত করে দিয়েছে, যা আমাদেরকে দিতে পারেনি আগেকার মনস্তাত্ত্বিক থিওরীগুলি। এ সবই মেনে নিতে তৈরি ছিলাম আমি –বলতে কি,  ফ্রয়েডীয় চিন্তাধারার উদ্ধীপনা ছিলো আমার নিকট শরাবের মাদকতার মতোই তীব্র। বহু সন্ধ্যা আমি ভিয়েনার ক্যাফেগুলিতে শুনেছি মনোবিকলন তত্ত্বের শুরুর দিকে কয়েকজন পথিকৃতের নিজেদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা-যেমন আলফ্রেড এডলার, হারমান স্টিকেল এবং ওটো গ্রস। তবে, এর বিশ্লেষণের সূত্রগুলি সম্বন্ধে যদিও আমি বিচলিত হয়েছিলাম; কারণ এ বিজ্ঞান চেয়েছিলো মানুষের আত্মার সকল রহস্যকে কতকগুলি স্নায়বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত করতে। এই মতবাদরে প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর ভক্তরা যে-সব দার্শনিক সিদ্ধান্তে এসেছিলেন  সেগুলি আমার কাছে কেন যেনো মনে হয়েছিলো, অতিমাত্রায় সূক্ষ্ম, অতিমাত্রায় সুনিশ্চিত এবং অতিমাত্রায় সরলীকৃত; যার ফলে, আমার মনে হলো পরম সত্যগুলির কাছাকাছি পৌছুনোর ক্ষমতাও এ সব সিদ্ধান্তের নেই; তাছাড়া, উন্নত  জীবনের দিকে কোনো নতুন পথের নির্দেশও নিশ্চয়ই তাতে ছিলো না।

তবে এসব সমস্যা আমার মনকে প্রায়ই দখল করে থাকলেও আমি কিন্তু তাতে তেমন অসুবিধা বোধ করিনি। ইন্দ্রিয়াতীত কেনো বিষয়ের চিন্তনে অথবা যে-সব সত্য কেবলি ধারণ-মাত্র সেগুলির সজ্ঞান অনুসন্ধানে আমি কখনো বেশি আগ্রহী ছিলাম না। আমার আকর্ষণ ছিলো যা-কিছু দেখা যায়, অনুভব করা যায় সে সবের প্রতি, জনগোষ্ঠেী, তার ক্রিয়া কর্ম ও বিভিন্ন সম্পর্কের প্রতি। আর ঠিক এ সময়েই আমি শুরু করেছিলাম নারীর সম্পর্ক আবিষ্কার করতে।

মহাযুদ্ধের পরপর, সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত মূল্যগুলির ব্যাপক ভাঙন শুরু হলো, সেই ভাঙনের ধারায় নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান অনেক বাধা-নিষেধও শিথিল পয়ে পড়লো। আমার মতে তা উনিশ শতকের সংকীর্ণ গোড়ামীর বিরুদ্ধে যতোটা না বিদ্রোহ ছিলো তার চেয়ে বেশি ছিলো একটি অবস্থা থেকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আরেকটি অবস্থায় আপনা –আপনি নিক্ষিপ্ত হওয়া-যে অবস্থায় বিশেষ কতকগুলি নৈতিক মনকে চিরন্তন ও তর্কাতীত মনে করা হতো সে অবস্থা থেকে অমন আরেকটি অবস্থায় নিক্ষেপণ যেখানে সব কিছু হয়ে পড়েছিলো তর্কের বিষয়। এ ছিলো, কাল পর্যন্ত মানুষের নিরবিচ্ছন্ন উর্ধ্বাভিসারী অগ্রগতিতে মানুষের যে-বিশ্বাস ছিলো  সেই বিশ্বাস থেকে স্প্রেঙলারের তিক্ত নৈরাশ্যের দিকে, নীটশের নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ ও মনোবিকলন-সৃষ্ট আধ্যাত্মিক শূন্যতার দিকে দোলকের প্রত্যাবর্তন। যুদ্ধ-পরবর্তী সেই প্রথমদিকের বছরগুলির দিকে তাকালে মনে হয়, তরুণ এবং তরুণীরা, এত উৎসাহের সাথে যারা কথা বলতো ও লিখতো ‘শরীরের মুক্তি’ সম্বন্ধে, তারা যখন-তখন যে ‘প্যান দেবাতার’ শরণ নিতো তারা সেই দেবতার অতি উত্তেজনাময় প্রেরণা থেকে ছিলো অনেক দূরে। তাদের ভাবাবেশ অতো বেশি আয়েশী ছিলো তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না বিপ্লবী হওয়া। সাধারণত তাদের মধ্যে যৌন সংযোগ হতো আকস্মিক, ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই উপস্থিত হতো, অমন এক গদৎবৎ ভাব লেশহীনতা,  প্রায়ই যার পরিণতি ঘট তো অবাধ যৌন-মিলনে।

চিরচারিত নৈতিকাতর যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তার শাসনে আমি যদি নিজেকে বাঁধাও মনে করতাম, তবু যে হাওয়া এতো ব্যাপক এবং এতো প্রবল হয়ে উঠেছিলো তা থেকে নিজেকে বাঁচানো কঠিন হতো খুবই। আমি বরং, যা ফাঁকা পথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহত বলে বিবেচিত হতো তাতেই আমার সময়োর আরো অনেকের মতো গর্বই বোধ করতাম। প্রেম-প্রেম খেলা সহজেই পরিণত হতো প্রণয়ে এবং কোনো কোনো প্রণয় রূপ নিতো কামোচ্ছ্বাসে। আমি অবশ্যই মনে করি না  আমি লম্পট ছিলাম, কারণ আমার সেই যৌবনসুলভ ভালোবাসাগুলিতেও যতো তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী তা হোক, হামেশাই অস্পষ্ট অথচ জোরারো এই আশার গুঞ্জরণ ছিলো যে, একজন পুরুষ থেকে আরেক একজন পুরুষকে যে ভয়ংকর নিঃসংগতা সুস্পষ্টভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, হয়তো তা ভংগ হতে পারে একটি পুরুষ ও  একটি নরীর মিলনের মাধমে।

... ... .      ..                  .. .............                     ... .                    ...  ... ... .      ..

আমার অস্থিরতা  বেড়েই চললো। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে ক্রমেই আরো কঠিন হয়ে উঠতে লাগলো। শেষ নাগাদ ঠিক করলাম, পড়ালেখা একদম ছেড়ে দেবো এবং সাংবাদিকতায় আমার হাত পরখ করে দেখবো। কিন্তু আমার আব্বা তাতে ভীষণ বাধ সাধলেন। এ বিরোধিতার জন্য  যতোটুকু যুক্তি তখন  আমি মেনে নিতে রাজী ছিলাম হয়তো তার চেয়ে প্রবলতরো যুক্তি  দিয়েই তিনি তাঁর আপত্তি তুলেছিলেন। তিনি বললেন, লেখাকে পেশা হিসাবে বেছে নেবার আগে অন্তত আমার নিজের কাছে  হলেও এ প্রমাণ আবশ্যক যে আমি লিখতে পারি। একবার তুমুল আলোচনা পর তিনি তাঁর কথা শেষ করলেন এই বলে, ‘তা যাই হোক, পি-এইচ-ডি-ডিগ্রী কারো সার্থক লেখক হবার পথে বাধা হয়েছে বলে আজে জানা যায়নি। তাঁর যুক্তি ছিলো নিখুঁত, নির্ভুল। কিন্তু আমি ছিলাম একেবারেই নবীন, প্রচণ্ড আশাবাদী এবং অতিশয় চঞ্চল। যখন বুঝতে পারলাম, তিনি কিছুতেই তাঁর মত বদলাবেন না, তখন নিজের মতে জীবন শুরু করে দেয়া ছঅড়া আমার আর কোনো উপায়ই রইলো না। কাউকে আমার মনের কথা না বলেই ১৯২০ সালের গ্রীষ্মের এক দিনে আমি ভিয়েনার কাছে বিদায় নিলাম এবং প্রাগের পথে চেপে  বসলাম যাত্রীবাহী এক ট্রেনে।

আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাদ দিলে আমার একটি হীরার আংটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। আংটিটি আমি পেয়েছিলাম আমার মার কাছ থেকে। মা এক বছর আগেই জান্নাতবাসী হন। প্রাগে সাহত্যিকদের প্রধান আড্ডা ছিলো একটি ক্যাফে; সেই ক্যাফের এক খিদমতগারের সাহায্যে আংটিটি আমি বিক্রি করে দিই। খুব সম্ভব, এতে আমি একেবারেই ঠকে যাই; তবু আমি যে টাকা পেলাম তা-ই আমার কাছে মনে হলো সাত রাজার ধন। এই সম্পদ পকেটে করে আমি পৌছুলাম বার্লিন। ওখানে কয়েকজন ভিয়েনী বন্ধু আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে পুরোনো ক্যাফে দ্য ওয়সটেনস-‘এ শিল্পী সাহিত্যিকদের’ এক যাদুকরী চক্রের সংগে।

 আমি বুঝতে পারলাম এখন থেকে কারো সাহায্য না নিয়ে একাই আমাকে আমার পথ করে চলতে হবে। আমার পরিবার থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য আর কখনো আমি আশা করবো না বা নেবো না। কয়েক হপ্তা পর, আমার আব্বার গোস্বা যখন একটু কমলো তিনি আমাকে লিখে পাঠালেন, ‘আমি এখন সাফ দেখতে পাচ্ছি, একদিন তুমি ভবঘুরে বাউন্ডেলে হিসাবে মরে পড়ে রয়েছো রাস্তার পাশে, নর্দমায়।’ আমি ত্বরিৎ জবাব পাঠাই ‘না, আমার জন্য রাস্তার পাশের নর্দমা নেই- দেখবেন আমি উঠবো একোবরে শীর্ষ-চূড়ায়। কী করে আমি চূড়ায় উঠবো তা তখনো আমার কাছে মোটেই পরিষ্কার ছিলো না; তবে, আমি জানতামা যে, আমি লিখতে চাই, লেখক হতে চাই-এবং আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছিলো যে সাহিত্যিকদের জগত আমার জন্য অপেক্ষা করছে সাগ্রহে, দরাজ দুহাত বাড়িয়ে।

কয়েক মাস পর আমার নগদ টাকাকড়ি ফুরিয়ে গেলোঃ আমি তখন একটি কাজের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সাংবাদিক হওয়ার উচ্চবিলাস রয়েছে যে তরুনের তার জন্য সুস্পষ্ট পছন্দের বিষয় হচ্ছে মশহুর দৈনিক কাগজগুলির কেনো একটিতে কর্ম প্রাপ্তি; কিন্তু আমি দেখতে পেলাম ওরা আমাকে পছন্দ করছে না; অবশ্য আমি যে হঠাৎ তা বুজতে পারলাম তা নয়। একথা বুঝতে আমাকে বার্লিনের ফুটপাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পায়চারি করতে হয়েছে, আর কী কষ্টকরই না ছিলো এভাবে পায়চারি করা-কারণ সাবওয়ে বা ট্যাক্সির ভাড়া যোগাড় করাও তখন একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাছাড়া প্রধান সম্পাদক বার্তা সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকদের সাথে অসংখ্যবার অপমানজনক ইণ্টারভিউ থেকেও একই সিদ্ধান্তে আসিঃ একটা মোজেজা ছাড়া কোনো তরুণ, যার একটি মাত্র লাইনও নাই এক ফোটাও।

আমার জন্য কোনো মোজেজাই ঘটলো না। তার বগলে আমি পরিচিত হলাম ক্ষুধার সাথে এবং অনেক কটি সপ্তাহ আমি কাটালাম চার আর রোজ সকালে যে-দুটা পাউরুটির টুকরা আমার বাড়ীওয়ালী আমাকে দিতেন তা-ই খেয়ে। ক্যাফে দ্যা ওয়েসটেন্স-এ যে সাহিত্যক বন্ধদের সংগ লাভ করছিলাম তারাও আমার মতো একজন কাঁচা অনভিজ্ঞ ভাবী লেখকের জন্য তেমন কিছু করতে পারছিলো না। তাও দিনের পর দিন এভাবে কাটাচ্ছিলো, শূন্যতার একোবরে কিনারে বসে; বহু কষ্টে পানির উপর কেবল থুৎনিটুকু জাগিয়ে রাখতে চেয়েছিলো ওরা। কখনো কখনো কারো কপালের জোরে কেনো ভালো রচনা বা কোনো ছবি বিক্রি হলে একটা হঠাৎ ঐশ্বর্যের সাক্ষাৎ মিলতো; তখন ওদের কেউ-না কেউ বিয়ার এবং ফ্রাংফুর্টারের পার্টি দিতো আর আমাকে বলতো এই আকস্মিক সৌভাগ্যে শরীক হতে। কখনো বা কেনো এক হীনমন্যতাগ্রস্ত ভূইফোঁড় ধনী আমাদের এই অদ্ভুত বুদ্ধিজীবী যাযাবরদের দাওয়াত করতো তার ফ্লাটে, আমাদের দেখে হা করে তাকিয়ে থাকতো ভয় মেশানো তাজিমের সংগে-যখন আমরা আমাদের খালি উদর ভরে চলতাম ক্যাভিয়ার, ক্যানাপে ও শ্যাম্পেন দ্বারা এবং আমাদের মেজবানের সহৃদয়তার ঋণ শোধ করতাম ‘বোহেমিয়ান জীবনে আমাদের অর্ন্তদৃষ্টি’ দিয়ে।  কিন্তু এ ধরনের ব্যাপার ছিলো ব্যতিক্রম। আমার ঐ দিনগুলির সাধারণ নিয়ম ছিলো নির্জলা উপবাস এবং আমার রাতের স্বপ্ন ঠাসা থাকতো সতেজ আর মাখন-মাখানো পুরু রুটির টুকরায়। কয়েকবারই আমার ইচ্ছা হয়েছে আব্বাকে লিখি এবং সাহায্য চাই। আব্বা নিশ্চয়ই তা প্রত্যাখান করতেন না। কিন্তু প্রত্যেকবারই আমার মর্যাদা আমাকে বাধা দিয়েছে; তাই সাহায্য না চেয়ে আমি তাঁকে বরং লিখতাম যে আমি একটি চমৎকার চাকরি বাগিয়েছি এবং মোটা মাইনে পাচ্ছি।

শেষ তক খোশ নসিব বশে এলো এক পরিবর্তন। এফ. ডবলু মার্নোর সাথে আমি পরিচিত হলাম। তিনি সবেমাত্র খ্যাতির অংগনে পা দিয়েছেন একজন উদীয়মান চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসাবে।  (তাঁর সাথে আমার এই পরিচয় হয়েছিলো তাঁর হলিউডে যাবার অল্প কবছর আগে। সেখানে তিনি আরো খ্যাতি অর্জন করেন এবং শেষকালে অসময়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যান।) মার্নোর মধ্যে ছিলো একটা খামখেয়ালী বেপরোয়া ভাব আর এ কারণে তিনি ছিলেন তাঁর সকল বন্ধুরই অতি প্রিয়। দেখামাত্রই, এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রবল আশাবাদী ও উৎসুক এই তরুণের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, তিনি যে নতুন ফিল্ম শুরু করতে যাচ্ছেন তাতে আমি তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করতে রাজী আছি কিনা-আর যদিও কাজটি ছিলো খুবই অস্থায়ী তবু আমি দেখতে পেলাম আমার সামনে তখন বেহেস্তের দরোজা যেনো খুলো যাচ্ছে, যখন আমি আমতা আমতা করে বললাম-জী –হ্যাঁ, আমি রাজী।

দুটি উজ্জ্বল মাস-টাকাকড়ির দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত! জীবনে কখনো যে-সব অভিজ্ঞতা আমার ঘটেনি এমনি ধরনের বিচিত্র চমৎকার অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গিয়ে আমি মার্নোর সহকারী হিসাবে কাজ করে গেলাম। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো প্রচণ্ড রকমে; আর আমার এ আত্মবিশ্বাস নিশ্চয় এ কারণে হ্রাস পেলো না যে ফিল্মের নায়িকা-এক মশহুর এবং সুন্দরী চিত্রাভিনেত্রী-বিপন্ন বোধ করেননি পরিচালকের তরুণ সহকারীর প্রেম-প্রেম খেলায়। ফিল্মটির কাজ  শেষ হওয়ার পর মার্নো যখন একটি নতুন কাজ নিয়ে বিদেশ যেতে তৈরি হলেন আমি তাঁর কাজ থেকে বিদায় নিলাম এই বিশ্বাস নিয়ে যে আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলির অবসান হলো।

এর অল্প দিন পর –আমার এক ভিয়েনিজ সাংবাদিক বন্ধু তখন বার্লিনে নাটক-সমালোচক হিসাবে বেশ নাম কিনেছে, নাম তার আন্তন কুহ, আমাকে অনুরোধ করলো, তাকে একটি ফিল্মের সিনারিও রচনায় সাহায্য করতে। সিনারিওটি লেখার দায়িত্ব আমাকেই দেয়া হয়েছিলো। আমি প্রচণ্ড উৎসাহের সাথে রাজী হয়ে যাই। আমার বিশ্বাস, আমি এই রচনার জন্য ভয়ানক খেটেছিলাম। যা-ই হোক, পরিচালক খুশি হয়ে আমাদেরকে তাঁর ওয়াদা মতো অর্থ দিয়েছিলেন-সেই টাকা আমি ও আস্তন, আমরা দুজনের মধ্যে, আধা –আধি ভাগ করে নিই। চলচ্চিত্র জগতে আমাদের এই প্রবেশের ব্যাপারটিকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য আমরা বার্লিনের সবচেয়ে ফ্যাশন-দোরস্ত রেস্তোরায় একটি পার্টি দিই। আমরা যখন রেস্তোরা পাওনা চুকিয়ে দেবার জন্য বিলটি নিলাম দেখতে পেলাম আমাদের সব টাকাই গলদা চিংড়ি, নোনতা মাছের ডিম আর ফরাসী মদের জন্য বার করে দিতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কপাল আমাদেরকে রক্ষা করলো। আমরা তখুনি আরেকটি সিনারিও লিখতে বসে গেলাম ব্যালাজাককে কেন্দ্র করে, সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি চিত্র, তাঁর এক অদ্ভুত কাল্পনিক অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে! শুধু তাই নয়, যেদিন রচনা শেষ হলো সেদিনই আমরা এর এক খদ্দেরও পেয়ে গেলাম। এবার আর আমরা আমাদের এ সাফল্য নিয়ে কোনো ‘ভোজের আয়োজন’ করলাম না। তার বদলে আমরা বের হয়ে পড়লাম ব্যাভেরিয়ার দেশগুলিতে কয়েক সপ্তাহ অবসর বিনোদনের উদ্দেশ্যে।

এরপর আরো একটি বছর—দুঃসাহসিক সাফল্য ও ব্যর্থতার ভরা একটি বছর। মধ্য-ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নানা রকমের অস্থায়ী কাজ করার পর আমি সফল হলাম সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করতে।

এই দুর্গ ভেদের ব্যাপারটি ঘটে ১৯২১ সালের শরৎকালে, টাকা-পয়সার অসুবিধার আরো একটি খন্ডকালের পর। একাদিন আমি বসে আছি ক্যাফে দা ওয়েসটেন্স-এ, ক্লান্ত এবং সান্তনাহীন। এমন সময় আমার এক বন্ধু এসে বসলো আমার টেবিলে। আমি যখন তাকে আমার অসুবিধাগুলির কথা বললাম সে আমাকে পরামর্শ দিলোঃ

-‘তোমার জন্য একটি সুযোগ হতেও পারে। ডার্মাট নিজেই একটি বার্তা প্রতিষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছে ইউনাইটেড প্রেস অব আমেরিকার সহযোগিতায়। এ প্রতিষ্ঠানের নাম হবে ইউনাইটড টেলিগ্রাফ। আমার বিশ্বাস, তাঁর বহু সহ-সম্পাদকের দরকার হবে। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।’

বিশ দশকের দিকে, জার্মানীতে রাজনৈতিক  মহলে ডঃ ডামার্ট ছিলেন একজন নামজাদা ব্যক্তি। ক্যাথলিক সেন্টার পার্টির সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন সত্যি অতুলনীয়। তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করতে পারবো-আমার নিকট লোভনীয় মনে হলো এক ধারণা।

পরদিন আমার বন্ধু আমাকে নিয়ে গেলো ডঃ ডামার্টের দপ্তরে। চমৎকার মাঝারি বয়েসি লোকটি আমাদেরকে বসতে অনুরোধ করলেন ভদ্র ও বন্ধুসুলভ ভংগিতে।

-‘মিঃ ফিংগাল। (আমার বন্ধুর নাম) তোমার বিষয়ে আমাকে বলেছেন; তুমি কি এর আগে কখনো সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছে?’

-‘জ্বী না’ আমি জবাব দিই, ‘তবে আমর অন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে বিস্তর। বলতে পারেন, আমি পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ এবং আমি অনেক ভাষা জানি। (আসলে কিন্তু আমি পূর্ব ইউরোপীয় একটিমাত্র ভাষাতেই কথা বলতে পারতাম, আর সেই ভাষাটি হচ্ছে পোলিশ ভাষা, আর ঐ অংশটিতে তখন কী ঘটছিলো সে বিষয়ে খুব অষ্পষ্ট এক ধারণাই ছিলো আমার। তবু আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অনাবশ্যক বিনয়ের দ্বারা আমি আমার সুযোগ নষ্ট হতে দেবো না।)

-তাই নামি, চমৎকার তো, আরো সাসির সংগে ডঃ ডামার্ট মন্তব্য করেন, বিশেষজ্ঞদের আমি ভারি পছন্দ করি। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, এই মুহূর্তে পূর্ব ইউরোপীয় বিষয়ের কোনো কাজে তোমাকে লাগাতে পারছিনে।’

নিশ্চয়িই তিনি আমার চেহারায় নৈরাশ্যের ছায়া পেয়েছিলেন, তাই ঝটিটি তিনি বললেন-তবু তোমার জন্য আমার হাতে একটি কাজ রয়েছে-অবশ্য, কাজটি তোমার মর্যাদার ঠিক উপযোগী হয়তো বা নয়..’

-কী রকম কাজ স্যার? আমি আমার বাড়ি ভাড়া আজো দিতে পারিনি, একথা মনে করে জিজ্ঞাসু হই।

-‘দ্যাখো, আমি আরো কটি টেলিফোনিস্ট চাই—না, না, তুমি চিন্তা করো না, অপারেটর নয়। আমার দরকার সেই রকম টেলিফোনিস্ট যারা প্রাদেশিক কাগজগুলির জন্য টেলিফোনে বার্তা পাঠাবে…।’

আমার উচ্চাকাঙ্খার পক্ষে এ প্রস্তাব ছিলো অপমানকর। আমি ডঃ ডামার্টের দিকে তাকাই, তিনিও তাকালেন আমার দিকে, যখন আমি দেখতে পেলাম তাঁর চোখের চারদিকের চটুল রসিকতাময় ভাঁজগুলি ঘনসম্বদ্ধ হয়ে আসছে, আমি বুঝতে পারলাম আমার গর্বোদ্ধত খেলা ভেস্তে গেছে।

-‘আমি তাই করবো স্যার, দীর্ঘশ্বাস ও হাসির সাথে আমি জবাব দিই।

পরের হপ্তায় আমি আমার নতুন কাজ শুরু করি। কাজটা ছিলো খুবই একঘেয়ে ক্লান্তিকর। আমি যে সাংবাদিক জীবনের খাব দেখে আসছিলাম তার সাথে এর সম্পর্ক ছিলো সামান্যই। দিনে কবার করে টেলিফোনের সাহায্যে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাগুলিকে পাঠানোই ছিলো আমার কাজ। তবে আমি ছিলাম একজন চমৎকার টেলিফোনিস্ট এবং আমার মাইনেও ছিলো চমৎকার!

এক মাস এভাবে কাজ শুরু করি। কাজটা ছিলো খুবই একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। আমি যে সাংবাদিক জীবনের খা’ব দেখে আসছিলাম তার সাথে এর সম্পর্ক ছিলো সামান্যই। দিনে কবার করে টেলিফোনের সাহায্যে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের পত্রিকাগুলিকে পাঠানোই ছিলো আমার কাজ। তবে আমি ছিলাম একজন চমৎকার টেলিফোনিস্ট এবং আমার মাইনেও ছিলো চমৎকার!

একমাস এভাবে কাজ করি। মাসের শেষে অদৃষ্টপূর্ব এক সুযোগ এসে গেলো আমার জন্য।।

১৯২১ সালে রাশিয়ায় এমন এক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ছিলো ভয়াবহতায় অভাবিতপূর্ব। কোটি কেটি লোক উপবাস করছিলো এবং মারা যাচ্ছিলো লাখে লাখে। গোটা ইউরোপের সংবাদপত্রগুলি এই পরিস্থিতির লোমহর্ষক বর্ণনায় মেতে উঠেছিলো। বৈদেশিক রিলিফ প্রেরণের কয়েকটি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছিলো, -তার মধ্যে একটি পরিচালনা করেন হার্বাট হুভার যিনি মহাযুদ্ধের পর মধ্য ইউরোপের জন্য বিপুল সাহায্য করেছিলেন। রাশিয়ার ভেতরে ম্যাক্সিম গোর্কি একটি বড়ো আকারের সাহায্য প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন। সাহায্যের জন্য তাঁর নাটকীয় আবেদনগুলি সারা পৃথিবীকে বিচলিত করে এবং জোর কানাঘুষা চলছিলো, তাঁর স্ত্রী নাকি শিগগিরই মধ্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলি সফর করেছেন আরো কার্যকরী সাহায্যের জন্য জনমত গঠন করতে।

আমি ছিলাম কেবল একজন টেলিফোনিস্ট। কাজেই, এই উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার বিবরণ পাঠানেরা ব্যাপারে আমি সরাসরি কিছুই করিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার এক হঠাৎ পরিচিতির বন্ধুর হঠা একটি মন্তব্য আমি  এতে জাড়িত হয়ে পড়ি আকস্মিকভাবে। (আমার এ ধরনের হঠাৎ বন্ধুর সংখ্যা ছিলো অনেক, সবচেয়ে অচেনা স্থানগুলিতে)। এ ক্ষেত্রে আমার এ পরিচিতি বন্ধুটি ছিলো হোটেল এসপ্লানেডের নৈশ দারোয়ান, বার্লিনের সবচেয়ে চালাক লোকদের একজন, আর সেই বললো, এই যে, মাদাম গোর্কি-ইনি একজন চমৎকার মহিলা, কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না যে ইনি একজন বোলশেভি!’

-‘মাদাম গোর্কি? তুমি কোথায় দেখেছো তাঁকে?’

সংবাদদাতা তার গলা নিচু করে ফিস ফিস করে বলে-তিনি আমাদের হোটেলেই আছেন। মাত্র গতকাল এসেছেন, তবে হোটেলের খাতার তিনি ভিন্ন নাম লিখিয়েছেন। শুধু মাত্র ম্যানেজারই জানেন, তিনি কে। তিনি চান না যে রিপোর্টাররা তাঁকে ঘিরে থাকুক।

-কিন্তু ‘তুমি’ তা কী করে জানলে?’

-হোটেলে কী হয় না হয়, আমরা দারোয়ানরা সব জানি, সে  দাঁত বার করে হাসে, আপনি কি মনে করেন যে, এটুকু না জানলে আমাদের চাকরি বেশি দিন টিকতো?’

মাদাম গোর্কির সাথে একটি যোগ, একটি নিজস্ব সাক্ষাৎকার কী চমৎকার ব্যাপারই না হবে! বিশেষ করে এজন্যও যে, তিনি যে বার্লিনে আছেন এ ব্যাপারে খবরের কাগজে আজে একটি হরফও ছাপা হয়নি। মুহূর্তে আমার কল্পনায় আগুন ধরে গেলো।

-তুমি কি কোনো রকমে তাঁর সাথে আমার দেখা করিয়ে দিতে পারো? আমি আমার বন্ধুকে বলি।

-‘আমি জানি না পারবো কি না-মাদাম গোর্কি নিজের কথা কাউকে জানতে দিতে একদম নারায। তবে হ্যাঁ, একটা কাজ হয়তো আমি করতে পারি। তুমি যদি সন্ধ্যায় লবিতে বসো, আমি হয়তো ইশারায় তাঁকে দেখিয়ে দিতে পারি ‘

ওর সংগে এই হলো কথা। আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে আমার অফিসে ছুটে গেলাম। প্রায় সকলেই তখন চলে গেছে, কিন্তু সৌভঅগ্যক্রমে বার্তা সম্পাদক তখনো টেবিলে কাজ করছিলেন। আমি তাঁকে চেপে ধরলাম-আমি যদি আপনাকে একটি চাঞ্চল্যকর কাহিনী যোগাড় করে দেবার ওয়াদা  দিই আপনি আমাকে একটি প্রেস কার্ড দেবেন কিন?

-‘কী ধরনের কাহিনী?’-তিনি সন্দেহের সাথে জিজ্ঞাস করেন।

-‘আপনি আমাকে প্রেস কার্ডটি দিন-আমি আপনাকে কাহিনীটি দেবো। যদি আমি তা না দিই, আপনি যে কোনো সময় কার্ডটি ফেরত পেতে পারেন।’

শেষতক বুড়ো বার্তা-পাগল আমার কথায় রাজী হয়ে গেলেন।  আমি অফিস থেকে বের হয়ে গেলাম একটি কার্ড নিয়ে-এমন একটি কার্ডের গর্বিত অধিকারীরূপে বের হয়ে এলাম যার বদৌলতে  এখন আমর পরিচয় হলো আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি।

পরের কটি ঘন্টা আমার কাটলো এসপ্লানেডের লবিতে  (প্রবেশ কক্ষে)। ন’টায় সময় আমর দোস্ত এসে কাজে যোগ দিলো। দরজায় দাঁড়িয়ে সে আমাকে চোখ ইশারা করলো-তারপর সে হারিয়ে গেলো অভ্যর্থনা ডেস্কের আড়ালে এবং কয়েক মিনিট পর আবার ফিরে এসে বললো যে মাদাম গোর্কি তাঁর কামরায় নেই, বাইরে গেছেন।

-‘তুমি যদি সবুর করে অনেকক্ষণ বসো,  তিনি এলে আলবৎ তাঁকে দেখতে পাবে।’

প্রায় এগারোটার সময় আমি আমর দোস্তের সংকেত পেলাম। সে গোপনে আমাকে ইশারা করছিলো একজন মহিলার প্রতি, যিনি এই মাত্র ঘূর্ণায়মান দরজা দিয়ে ঢুকছেনঃ ছোট্ট অবয়বের চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের এক সুন্দরী মহিলা, পরনে তার অতি চমৎকার কাটিং-এর একটি কালো গাউন আর হাত-কাটা ঢিলা জামা, যা যমীনের উপর গড়াচ্ছিলো তাঁর পেছনে পেছনে, তাঁর চলার সংগে সংগে। তিনি  তাঁর চাল-চলনে এমনি খাঁটি অভিজাত যে তাঁকে ‘কুলি-মজুরের কবির’ স্ত্রী বলে কল্পনা করা  সত্যি বড়ো কঠিন এবং আরো কঠিন তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন নাগরিক বলে কল্পনা করা। তাঁর পথ আটকে আমি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাই, তারপর গলার স্বরটাকে যতদূর সম্ভব আকর্ষনীয় করে তাঁকে সম্বোধন করতে তৈরি হই—‘মাদাম গোর্কি..।’

মুহূর্তের জন তিনি চকিত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে একটি স্মিত হাসিতে তাঁর সুন্দর কালো চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তারপর তিনি অমন জার্মান ভাষায় জবাব দিলেন যাতে স্লাভ উচ্চারণের প্রতি সামান্যেই ধরা পড়লোঃ‘ আমি মাদাম গোর্কি নই—তুমি ভুল করেছো- আমার নাম অমুক (রুশীয় নামের মতো শোনায় এমন একটি নাম বললেন, যা আমি ভুলে গেছি।)’

-‘না,  মাদাম গোর্কি’, আমি জোর দিয়ে বলি, ‘আমি জানি, আমি ভূল করিনি। আমি এ-ও জানি যে, আমরা রিপোর্টারদের দ্বারা আপনি বিরক্ত হতে চান না—কিন্তু আমি যদি আপনার সাথে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পাই আমার জন্য তা-ই যথেস্ট হবে-হ্যাঁ, যথেষ্ট হবে আমার জন্য। এ সুযোগ আমার জীবেনের পয়লা সুযোগ, আমার আত্মপ্রতিষ্ঠার। আমি নিশ্চিত যে আপনি আমার এ ‍সুযোগ নষ্ট হতে দেবেন না।’ এরপর আমি তাঁকে আমার প্রেস-কার্ড দেখাই,-- ‘আজই আমি এটি পেয়েছি-এবং আমি যদি মাদাম গোর্কির সাথে আমার সাক্ষাৎকারের রিপোর্ট দিতে না পারি এই কার্ডটি আমাকে ফেরত দিতে হবে।’

অভিজাত মহিলাটির মুখে আগের মতোই স্মিত হাসি জেগে রয়েছে-‘কিন্তু  আমি যদি হলফ করে বলি, আমি মাদাম গোর্কি নই, তাহলে কি তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে?’

-‘আপনি হলফ করে যা-ই বলবেন আমি বিশ্বাস করবো।’

মহিলা হাসিতে ফেটে পড়লেন-তুমি তো ভারি চমৎকার ছোকরা হে।’ (তাঁর সুন্দর মাথাটি আমর কাঁধ পর্যন্ত পৌছালো কি না, সন্দেহজনক।) ‘আমি তোমাকে কোনো মিথ্যা বলবো না। তোমারই জয় হলো। তবে সন্ধ্যার বাকী সময়টা আমিরা লবিতে কাটাতে পারি না। তুমি আমার কামরায় আমার সাথে চা খেয়ে  আমাকে কিছুটা আনন্দ দিতে কি রাজী আছো?’

এইভাবে আমি মাদাম গোর্কির কামরায় বসে চা খেয়ে ধন্য হই। প্রায় এক ঘন্টাকাল তিনি দূর্ভিক্ষের ভয়াবহতা হুবহু বর্ণনা করলেন। তারপর, আমি যখন মাঝরাতে তাঁর কাছে থেকে বিদায় নিলাম, আমি সংগে করে নিয়ে এলাম অনেকগুলি নোট করা অনেকগুলি পাতা।

ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের অফিসে  যে-সব সহ –সম্পাদক রাতের ডিউটিতে ছিলো এই অস্বাভাবিক মুহূর্তে আমাকে অফিসে দেখে তাদের চোখ বিস্ফারিত হলো। কিন্তু আমি কোনো ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। কারণ আমার হাতে রয়েছে জরুরী কাজ। আমার সাক্ষাৎকারের রিপোর্ট যতো তাড়াতাড়ি লিখে নিয়ে সম্পাদকের অপেক্ষা না করেই আমাদের গ্রাহক প্রত্যেকটি কাগজের জন্য জরুরী প্রেস কল বুক করি।

পরের সকালেই বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটলো। বার্লিনের বিখ্যাত দৈনিকগুলির একটিতেও মাদাম গোর্কির উপস্থিতি সম্পর্কে একটি হরফও ছাপা হয়নি, অথচ আমাদের বার্তা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক মফস্বলের প্রত্যেকটি কাগজ পয়লা পৃষ্ঠায় ছাপিয়ে দিয়েছে মাদাম গোর্কির সাথে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের বিশেষ প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারের নিজস্ব বিবরণ। টেলিফোনিস্ট একটা পয়লা শ্রেণীর রিপোর্ট তৈরি করে বসেছে!

বিকালে ডঃ ডামার্টের অফিসে সম্পাদকদের একটা বৈঠকে বসলো। আমাকে সেখানে ডেকে পাঠানো হলো-তারপর আমাকে বক্তৃতা দিয়ে বোঝানো হলো, গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবরই বার্তা-সম্পাদকের অনুমতি ছাড়া কখনো বিলি করতে নেই। প্রাথামি এই বক্তৃতার পর আমাকে জানানো হলো, আমাকে রিপোর্টার  পদে উন্নীত করা হয়েছে।

অবশেষে আমি হলাম একজন সাংবাদিক।

চার

বালিতে নরম মৃদু পায়ের আওয়াজঃ জায়েদ-কুয়া থেকে সে ফিরছে মশক-ভর্তি পানি নিয়ে। ধপ করে সে মশকটি ছেড়ে দেয় যমীনের উপর, তারপর সে আমাদের দুপুরের রান্নায় আবার  ব্যস্ত হয়ে পড়ে; ভাত এবং ছোট একটি ভেড়ার গোশত যা সে আগে সন্ধ্যায় কিনেছিলো গাঁ থেকে । হাতা দিয়ে শেষবারের মতো  বারেক নেড়ে দেয়, তারপর কড়াই থেকে বক বক করে দূয়া ওঠার পর সে আমার দিকে ফেরেঃ

-‘আপনি কি এখন খাবেন, চাচা?’ এবং আমার জবারের জন্য অপেক্ষা না করে- কারণ ও জানে, আমার জবাব হ্যাঁ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না,- সে পাত্র থেকে খাবারগুলি একটি বড়ো বর্তনের উপর স্তূপীকৃত করে আমার সামনে রেখে দেয় এবং আমাদের একটি পিতলের জগে পানি ভরে তুলে ধরে আমার হাত ধোয়ার জন্যঃ

-‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের হায়াত দরাজ করুন।’ তারপর আমরা একে অপরের মুখোমুখি পদ্মাসন হয়ে বসে ডান হাতের আাঙুল দিয়ে কেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

আমরা চুপচাপ খাচ্চি। আমাদের দুজনের কেউই খুব বেশি কথা বলতে জানি না, তাছাড়া যেভাবেই হোক, আমার মন তখন পুরানো স্মৃতির রাজ্যে গিয়ে পড়েছে। আমি ভাবছিলাম, আরব দেশে আমার আগেকার দিনগুলির কথা, যখন জায়েদের সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়নি। কাজেই, আমি পরিষ্কার কথা বলতে পারবো না; কেবল আমার নিজের মনে মনে নিজের সাথে কথা বলে চলি, আমার বর্তমান মেজাজের সাথে অতীতের মুহূর্তে মেজাজ-মর্জির স্বাদ-গন্ধ মিশিয়ে।

খানা শেষ হবার পর আমি যখন আমার উটের জিনে হেলান দিয়ে বসলাম, আঙুলগুলি তখন খেলা করছিলো বালু নিয়ে এবং আমি তাকিয়ে থাকি নীরব নিশ্চুপ আরব-আসমানের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। আমার মনে হলো, সেই সুদূরের বছরগুলিতে আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে সব বলতে পারি দীল খুলে এমন একজনকে যদি আমার পাশে পেতাম, কী চমৎকারই না হতো! কিন্তু আমার পাশে তো জায়েদ ছাড়া আর কেউই নেই। জায়েদ এক চমৎকার এবং বিশ্বস্ত মানুষ-আমার জীবনের বহু নিঃসংগ মুহূর্তে তাকে আমি  পেয়েছি আমার সাথী হিসাবে। জায়েদ অতি বিচক্ষণ, সে অতি সূক্ষ্ম বিষয়ও  ধরতে পারে এবং মানুষের চরিত্রে তার জ্ঞান গভীর। কিন্তু আমি যখন ওর মুখের দিকে আড়ভাবে তাকাই ঘাড় বাঁকিয়ে, দীর্ঘ জুলফির ফ্রেমের মধ্যে ওর সুগঠিত, পরিচ্ছন্ন মুখমণ্ডল এই মুহূর্তে ঝুঁকে পড়েছে কফি-পেয়ালার উপর, সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার পরমুহূর্তেই  জায়েদ ঘাড় ফিরেয়ে চাইছে কাছে যমীনের উপর বসে-পড়া উটগুলির দিকে, প্রশান্তরি সংগে জাবর কাটছে উটগুলি-তখন আমি বুঝতে পারি, আমি চাই ঠিক ভিন্ন এক শ্রোতা; এমন একজন শ্রোতা, আমার সেই দূর অতীতের সাথেই যে কেবল তার সম্পর্ক নেই, তা নয়, বরং আমার বর্তমান দিনরাতের দৃশ্য শব্দ গন্ধ থেকেও সে থাকবে অনেক দূরে, যার সামনে আমি আমার স্মৃতির গেরো খুলে দিতে পারবো একটি একটি করে-যাতে করে তার চোখ সেগুলি দেখতে পায়, আর পরে  আমার চোখও পুনরায় দেখতে পায় সেগুলি এবং এভাবে যে আমাকে সাহায্য করবে, আমার শব্দের জালের মধ্যে আমার নিজের অতীত জীবনকে ধরতে।

কিন্তু এখানে জায়েদ ছাড়া নেই। এবং জায়েদই তো মূর্তিমান বর্তমান।

 

হাওয়া

এক

আমরা চলেছি তো চলেছি-দু’টি মানুষ দু’টি উটের উপর এবং সকাল গড়িয়ে ছাড়িয়ে গেল আমাদেরকে।

-‘এ ভারি তাজ্জব ব্যাপার-ভারি বিস্ময়কর ব্যাপার’, নীরবতার মধ্যে জায়েদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়।

-‘ তাজ্জব ব্যাপার কী, জায়েদ?’

-‘একি তাজ্জব ব্যাপার নয় চাচাজান, মাত্র ক’দিন আমরা যাচ্ছিলাম তায়েমার দিকে, কিন্তু এখন আমাদের উটগুলির মুখ রয়েছে মক্কার দিকে। আমার বিশ্বাস যে, সেই রাতের আগে আপনি নিজেও তা জানতে না। আপনি বদ্দুর মতোই ভবঘুরে.. এই ঠিক যেমন আমি! চাচাজান, একি কোনো জিন, যে আজ থেকে চার বছর আগে হঠাৎ আমার মনে জাগিয়ে দিয়েছিলো আপনার সাথে মক্কায় দেখা করার বাসনা এবং এখন আপনার মনে জন্ম দিয়েছে মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত? এমনি করে কি আমরা হাওয়ার মুখে উড়ে চলেছি, আমরা কী চাই তা জানি না বলে?’

-‘না যায়েদ, তুমি আমি- আমরা স্বেচ্ছায় হাওয়ার মুখে ভেসে চলেছি, কারণ আমরা জানি, আমরা কী চাই; আমাদের হৃদয় তা জানে, যদিও আমাদের চিন্তা কখনো কখনো তা অনুধাবন করতে দেরী করে বসে; কিন্তু পরিণামে আমাদের চিন্তা আমাদের হৃদয়ের সাথে তাল রেখেই চলে এবং তখন আমরা ভাবি, আমরা একটি সিদ্ধান্তে এসেছি..!

.. .                        .. .                        ...                            .. .             .. .                ...

হয়তে দশ বছর আগে, সেদিনও আমার হৃদয় তা জানতো না, যখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের পাটাতনে। জাহাজটি আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলো নিকট প্রাচ্যের দিকে আমার পয়লা সফরে, দক্ষিণমুখে, কৃষ্ণসাগরের ভেতর দিয়ে ধূসর কিনারহীন কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রির অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে, কুয়াশার মোড়া এক ভোর অতিক্রম করে বসফোরাসের অভিমুখে। সমুদ্দুর মনে হচ্ছিলো সীসার মতো, কখনো ফেনা ছিটকে পড়ছিলো পাটাতনের উপর আর ইঞ্জিনের আঘাত যেন হৃদস্পন্দনের শামিল!

আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলাম-দৃষ্টি আমার পাণ্ডুর ছায়াচ্ছন্নতার দিকে। কেউ যদি তখন আমাকে জিজ্ঞাস করতো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি কী ভাবছিলাম কিংবা প্রাচ্যে আমার এই পয়লা অভিযানে আমি ঠিক কী প্রত্যাশা নিয়ে বের হয়েছি আমার পক্ষে পরিষ্কার জবাব দেয়া খুবই কঠিন হতো। ঔৎসুক্য সম্ভবত, কিন্তু এ এমন এক ঔৎসুক্য যা তীব্র ছিলো না এবং মনে হয়, এর লক্ষ্য ছিলো অমন বিষয় যার বিশেষ কোনো গুরুত্বই ছিলো না। আমার অস্বত্বির এই কুয়াশা, যা সমুদ্রের উপর ঘনায়মান কুয়াশার সাথেই যেনো কিছুটা সম্পর্কিত-তার লক্ষ্য ছিলো না বিদেশ-ভূমি কিংবা আসছে দিনগুলির মানুষেরা, নিকট ভবিষ্যতের ছবিসমুহ, অদ্ভূত শহর-বন্দর আর চেহারা-সুরত, বিদেশী কাপড়- চোপড় আর চাল-চলন, যা শীঘ্রই আমার চোখে ছায়া ফেলতে লাগলো, আমার চিন্তায় সেগুলির স্থান ছিলো খুব অল্পই। সফরে কিছুটা আকস্মিক এক ব্যাপার মনে হয়েছিলো আমার কাছে। আমি একে গ্রহণ করেছিলাম আমার দীর্ঘ সফরে এক আনন্দদায়ক অথচ তেমন-বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমনি এক অবকাশ হিসাবে। সে সময়টায় আমার মন বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলো অতীতের ভাবনায়!

অতীত? সত্যি কি আমার কোনো অতীত আছে? আমার বয়স তখন বাইশ বছর। কিন্তু আমর বয়সের মানুষ-সেসব মানুষ যারা জন্মেছে এই তকের শুরুতে-সম্ভবত আগের যে –কোনো কালের মানুষের চাইতে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠেছে; অল্পদিনের মধ্যেই তাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেক বেশি দীর্ঘ জীবনের-আর আমার মনে হলো, আমি যেনো পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি সময়ের সুদীর্ঘ বিস্তানের দিকে চোখ মেলে। এই বছরগুলির সব কটি বাঁধা-বিপত্তি এবং দুঃসাহসিক অভিযান-সেইসব আশা-আকাঙ্খা, চেষ্টা ও ব্যর্থতা আর সেই সব রমণী এবং জীবনের উপর আমর প্রথম অতর্কিত সব হামল-সবই আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে। তারা ঝলমল আসমানের নীচে সেইসব অন্তহীন রাত, যখন আমি ঠিক জানতাম না আমি কী চাই এবং কোনো দোস্তের সাথে হেঁটে চলেছি জনশূন্য রাস্তায়, পারমার্থিক বিষেয়ে কথা বলতে বলতে-বেমালুম ভূলে যেতাম যে, পকেট কতো শূন্য এবং আসছে কাল আমার জন্য কতো অনিশ্চিত-একটি সুখদায় অসন্তোষ, যা কেবল একজন তরুণই অনুভব করতে পারে, তার সংগে দুনিয়াকে বদলে দেবার আর তাকে নুতন করে নির্মাণ করার বাসনা- সমাজকে কীভাবে বিন্যস্ত হওয়া উচিত তাদের সম্পর্ক, যাতে করে প্রত্যেটি মানুষ যে একাকীত্ব দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তা ভেঙে-চুরে সকলেই বেরিয়ে আসতে পারে এবং সত্যিকার পারস্পরিক সহয়োগিতা ও বন্ধুত্বের মধ্যে কাটাতে পারে জীবন? ভালো কী এবং মন্দ কী, ভাগ্য কী- কিংবা ভিন্নভাবে বলতে গেলেঃ মানুষের কী করা উচিত, যাতে করে সে যথার্থভাবেই এবং কেবল মুখে নয়, তার জীবনের সাথে এক ও অভিন্ন হতে পারে এবং  বলতে পারে, ‘আমি আর আমার অদৃষ্ট আলাদা নয়, একই’-এই ধরনের সব আলোচনা যা কখনো ফুরাতে চাইতো না। ভিয়েনা ও বার্লিনের সাহিত্যের ক্যাফে গুলি যেখানে অবিরাম তর্ক-বিতর্ক চলতো ‘রূপ’ ও ‘স্টাইল’ ও ‘প্রকাশভংগি’ নিয়ে, রাজনৈতিক স্বাধীনাতর অর্থ নিয়ে, নারী ও পুরাষের মেলামেশা নিয়ে.. . জানার ক্ষুধা এবং কখনো কখনো পেটের ক্ষুধাও .. . এবং অসংযত ইন্দ্রিয়াবেগের মধ্যে কাটানো রাতগুলিঃ ভোরে বিছানা পড়ে থাকতো নোংরা, এলোমেলোভাবে, যখন রাতের উত্তেজনায় পড়তো ভাটা আর তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠতো ধূসর, কঠিন আর নিরানন্দ। কিন্তু যখন সকাল হতো তখন আমি ভুলে যেতাম ভোরের রিক্তাবশেষের কথা এবং দুলতে দুলতে আবার চলতে শুরু করতাম এবং টের পেতাম পায়ের নীচে জমিন যেনো আনন্দে কাঁপছে,.. . একটি নতুনমুখ দেখা বা নতুন বই হাতে নেবার উত্তেজনা.. প্রশ্নের জবাব খুঁজে  বেড়ানো এবং অর্ধেক উত্তর পাওয়া,-এবং সেইসব অতিশয় বিরল মুহূর্তে যখন মনে হতো; পৃথিবী যেনো সহসা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে, উপলব্ধির চকিত আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে-উপলব্ধি যার আভাস এনে দিতো এমন কিছু উদঘাটনের পূর্বে কখনো যার নাগাল পায়নি কেউঃ সকল প্রশ্নের এক জবাব.. .

বিশ শতকের গোড়ার দিকের সেই বছরগুলি ছিলো অদ্ভুত বিস্ময়কর। সর্বথ্র তখন সামাজিক ও নৈতিক অনিশ্চয়তার যে আবহাওয়া বিরাজ করছে, তা-ই  জন্ম দেয় বেপরোয়া আশাবাদের, আর তার প্রকাশ ঘটে একদিকে সংগীত, চিত্রকলা ও নাটকে দুঃসাহসিক-পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে, অন্যদিকে সংস্কৃতির রূপরেখা ও কাঠামো সম্পর্কে আঁধারে হাতড়ানোতে, প্রায়শ বৈপ্লবিক অনুসন্ধানের; কিন্তু এই জোর করে বাঁচিয়ে রাখা আশাবাদের পাশাপাশিই তখন চলছে একটি আধ্যাত্মিক শূন্যতা, একটি, একট অস্পষ্ট উন্নাসিক আপেক্ষিকতাবাদ, যার জন্ম হয়েছিলো মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে  এক ক্রমবর্ধমান নৈরাশ্যের মধ্যে।

আমার অল্প বয়স সত্ত্বেও আমার নিকট এ বিষয় গোপন ছিলো না যে, মাহযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পর ভয়-বিধ্বস্ত, অসন্তুষ্ট, ভাবাবেগ-পীড়িত, উত্তেজিত, উচ্চগ্রামে বাঁধা ইউরোপীয় জগতে কোনো কিছুই আর ঠিক –ঠাক চলছিলো না আগের মতো। আমি দেখতে পেলাম, এর আসল উপাস্য আর আধ্যাত্মিক কিছু নয়, এর একমাত্র উপাস্য হচ্ছে ‘কমফর্ট’, আরাম-আয়েশ। সন্দেহ নেই যে, তখনো এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁদের অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হতো ধর্মীয় তাৎপর্য দ্বারা, যাঁরা নিজেদের সভ্যতার সার-নির্যাসের সাথে তাঁদের নৈতিক বিশ্বাসগুলিকে খাপ-খাওয়ানোর জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম।

গড়পড়তা একজন ইউরোপীয়, সে গণতন্ত্রী হোক আর কমিউনিস্টই হোক, মজদুর হোক আর বুদ্ধিজীবীই হোক, তার কাছে অর্তপূর্ণ বিশ্বাস একটিই ছিলো বলে মনে হয়ঃ বৈষয়িক উন্নতির পূজা-এই বিশ্বাসে যে, জীবনকে ক্রমাগত সহজতরো করে তোলা ছাড়া জীবনের আর কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না, কিংবা সাম্প্রতিক পরিভাষায় যেমন বলা হয়ে থাকে,  জীবনকে ‘প্রকৃতির কবল থেকে আযাদ করাই  জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য’। এই ধর্মের মন্দির হচ্ছে বিশাল কল-কারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক, গবেষণার,  নৃত্যশালা, পানি বিদ্যুৎ সংস্থাসমূহ আর এ ধরনের মন্দিরের পুরোত ঠাকুর হচ্ছে ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকা, সংখ্যাতত্ত্ববিদ, শিক্ষা-পরিচালক, রেকর্ড স্রষ্টা বৈমানিক এবং কমিসারেরা! ভালো এবং মন্দের ধারণার ব্যাপারে সার্বিক মতানৈক্য এবং সকল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সুবিধাবাদের আশ্রয় গ্রহণ- এরি মধ্যে অভিব্যক্তি ঘটলো নৈতিক ব্যর্থতার-সেই সুবিধাবাদিতার যা চুনকাম করা রাস্তার বারাংগনার সংগে তুলনীয়, যে বারাংগনা যখনি বাঞ্ছিত হয় যে-কোন জনের কাছে যে-কোনো সময়ে নিজেকে দান করে থাকে। ক্ষমতা ও সুখের অতৃপ্ত লালসাই পাশ্চাত্য সমাজকে অনিবার্যভাবে বিভক্ত করে রেখেছে পরস্পর-বিরোধী বিভিন্ন দলে, যে দলগুলি প্রত্যেকটিই সর্বপ্রকার অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত এবং যখনি আর যেখানেই তাদের পারস্পরিক স্বার্থে সংঘাত বাঁধছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তমদ্দুনের ক্ষেত্রে এর ফল হলো এমন এক ধরনের মানুষের সৃষ্টি, বাস্তব উপযোগিতাই যার কাছে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো বলে মনে হয়, যার কাছে ন্যায়-অন্যায়ের সর্বোচ্চ মাপকাঠিই ছিলো জাগতিক সাফল্য।

আমি দেখতে পেলাম আমাদের জীবন কতো অসুখী এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে মানুষের সংগে মানুষের সত্যিকার যোগ কতো সামান্য, যদিও সমাজ ও জাতির উপর জোর দেয়া হচ্ছে কান-ফাটানো, প্রায় ‍উন্নত্ত চিৎকারের সাথে। আমরা আমাদের সহজাত অনুভূতির দুনিয়া থেকে কত দূরে সরে পড়েছি আর আমাদের আত্মা কতো সংকীর্ণ কতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। আমি এ সবই দেখতে পেলাম। কিন্তু যে কারণেই হোক, এ চিন্তা কখনো আমার মনে গভীরভাবে জাগেনি, যেমন কখনো তা জাগেনি আমার চারপাশে আংশিক সমাধান, হয়তো ইউরোপের নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বাইরে কোথাও থাকতে পারে। আমাদের সকল চিন্তার আদি আর অন্ত ছিলো ইউরোপ। এবং সতেরো বছর কিংবা তার কাছাকাছি বয়সে, আমর লাওসে’র সন্ধান লাভও এ ব্যাপারে আমার মনোভংগির কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

  . ..                                        ...                                                  ...

এছিলো একটি খাঁটি আবিষ্কার। এর আগে কখনো আমি লাওসের নামই শুনিনি, আর তাঁর দর্শন সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ও ছিলো না, তখন একদিন আমি হঠাৎ ভিয়েনার এক বইয়ের দোকানের কাউন্টারে পেয়ে গেলাম তাও-কে-কিং-এর একটি জার্মান তর্জমা। বইটির অদ্ভুত নাম আমাকে কিছুটা উৎসুক করে তোলে। এলোমেলোভাবে বইটির পাতা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ আমার নজরে পড়ে বইটির ছোট্ট তাৎপর্যবহ অধ্যায়গুলির একটির উপর, আর আমি অনুভব করি, সুখের ছুরিকাঘাতের মতো একটি হঠাৎ রোমান্স, একটা আকস্মিক শিহরণ, ফলে আমি নিজ পরিপার্শ্বের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে, যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম মন্ত্রমুগ্ধবৎ স্থির নিশ্চল হয়ে, বইটি হাতে নিয়ে; কারণ,  এ বইতে আমি জীবনকে দেখতে পেলাম তার পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ নির্মলরূপে, সমস্ত ফাটল ও দ্বন্ধ থেকে মুক্ত সেই শান্ত, নম্র আনন্দের মধ্যে যা উর্ধ্বাভিগামী, যার অবকাশ হামেশাই রয়েছে মানব হৃদয়ে, যখনি মানুষ যত্নবান হয় তার আপন স্বাধীনতার সদ্ব্যবহারে।... এ যে সত্য, তা আমি জানতামঃ এমন এক সত্য এ, যা সত্য ছিলো সবসময়ই, যদিও আমরা তা ভুলে গেছি, আর এই মুহূর্তে এই সত্যকে প্রত্যক্ষ করলাম সেই আনন্দের সংগে, যে আনন্দের সংগে মানুষ ফিরে আসে তার বহু দিনের হারানো ঘরে.. ..

তখন থেকে কয়েকটি বছর ধরে লাওসে ছিলেন আমার জন্য এক জানালা বিশেষ, যার ফাঁক দিয়ে আমি তাকাতাম জীবনের কাঁচ-স্বচ্ছ এলাকাগুলির দিকে, যে-জীবন ছিলো সমস্ত সংকীর্ণতা ও মানুষের নিজের সৃষ্ট ভয়-ভীতি থেকে অনেক দূরে, শিশুসুলভ বাতিক থেকে মুক্ত, যে বাতিক আমাদের বাধ্য করেছিলো, মুহূর্ত থেকে মুহুর্তে হামেশা এবং যে-কোনো মূল্যে, জাগতিক উন্নতির মাধ্যমে নতুন করে আমাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা বিধান করতে। কথা এ নয় যে, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ আমার দৃষ্টিতে অন্যায়, কিংবা অনাবশ্যক মনে হতো-বরং তখনো আমি তা কল্যাণকর এবং প্রয়োজনীয় বলেই ভাবতাম। কিন্তু একই সংগে আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছিলো, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ কখনো তার আসল লক্ষ্য হাসিল করতে পারে না, যে লক্ষ্য মানুষের সামগ্রিক সুখ বৃদ্ধি,- যদি না এ উন্নতির সাথে থাকে আমাদের আধ্যাত্মিক মনোভংগির নব রূপায়ণ আর পরম মূল্যগুলিতে, অন্য-নিরেপেক্ষ, এক নতুন বিশ্বাস। কিন্তু এই নব রূপায়ণ কী করে সম্ভব আর এই নব মূল্যায়ন কী ধরনের হবে তা আমার কাছে  পরিষ্কার ছিলো না মোটেই।

জীবন আঁকড়ে ধরে তার উপর জুলুম না করে মানুষের উচিত জীবনের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়া-লাওসের এ বিশেষ প্রচারের মতো কেউ প্রচার করতে শুরু করলেই যে মানুষ জীবনের লক্ষ্য-বদলে ফেলবে এবং এভাবে সে তার চেষ্টা –সাধনার দিক পরিবর্তন করবে এমন প্রত্যাশা অলস কল্পনা ছাড়া আর কিছুই হতো না। কেবলমাত্র প্রচার, কেবলমাত্র বুদ্ধিগত উপলব্ধি ইউরোপীয় সমাজের আাধ্যাত্মিক মনোভংগিতে কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম ছিলো না মোটেই। প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো হৃদয়ের এক নতুন বিশ্বাস, এক নতুন ধর্মের-ঈমানের আগুনে উদ্দীপিত হয়ে সেসব মূল্যের নিকট আত্মসমর্পণের-যেগুলিতে ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র কোনো অবকাশ নাই। কিন্তু সে ধর্ম কোথায় পাওয়অ যাবে....?

 যে কারণেই হোক, এ আমর মনে জাগেনি যে, লাওসে, ক্ষণস্থায়ী এবং সে কারণে পরিবর্তনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক মনোভাবের বিরুদ্ধেই তাঁর প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন। বরং তাঁর চ্যালেঞ্জ ছিলো সেই মৌলিক ধারণার বিরুদ্ধে যা থেকে পয়দা হয় এই মনোভংগি। আমি তা জানলে এ সিদ্ধান্তে আসতেই বাধ্য হাতাম যে, লাওসে আত্মার যে নির্ভার প্রশান্তির কথা বলেছেন সেখানে পৌছুনোর ক্ষমতা নাই ইউরোপের, যদি না সে সাহস সঞ্চয় করে নিজের আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কেই প্রশ্ন তোলো। অবশ্য, সজ্ঞানে এরূপ একটা সিদ্ধান্তে আসার জন্য তখন আমার বয়স ছিলো খুবই কম.. . চৈনিক দরবেশের সেই প্রতিবাদের পূর্ণ তাৎপর্য এবং তার সামগ্রিক ঐশ্বর্য বোঝার বয়স আমার তখনো হয়নি। একথা সত্য যে, তাঁর বাণী আমার অন্তরতম সত্ত্বাকে ধরে নাড়া দিয়েছিলো-আমার কাছে তা জীবনের অমন একটা রূপ উদঘাতিত করেছিলো যাতে মানুষ তার ভাগ্যের সংগে এবং এভাবে তার নিজেরই সংগে একাত্মবোধ করতে পারে। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না-এ ধরনের একটা দর্শন কী করে বিশুদ্ধ মানসিক অনুধ্যানের গণ্ডী ডিঙিয়ে যেতে পারে এবং বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে ইউরোপীয় জীবনের পটভূমিকায়। ফলে, ধীরে ধীরে আমার সন্দেহ হতে লাগলো- এর রূপায়ন আদতেই সম্ভব কিনা। আমি অবশ্য তখনো সেই বিন্দুতে এসে পৌছুইনি যেখানে এসে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারিঃ যদি তার মূলনীতিগুলির আলোকে ইউরোপীয় জীবন-পদ্ধতির বিচার করা হয়, তাহলে সে জীবন পদ্ধতিই একমাত্র সম্বাব্য জীবন পদ্ধতি কি না। অন্য কথায়, আমি আমার চারপাশের আর সকলের মতোই সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন ছিলাম ইউরোপের অহং-সর্বস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভংগির দ্বারা।

তাই, লাওসে’র কণ্ঠস্বর কখনো একদম নীরব হয়ে না পড়লেও,  ক্রমে ক্রমে তা সরে গেলো চিন্তামূলক কল্পনার পশ্চাদভূমিতে এবং কালে তা হয়ে উঠটো কেবল সুন্দর কবিতার বাহন, আর কিছু নয়। আমি তখনো তা মাঝে মাঝে পড়তাম এবং সুখদায়ক এক প্রত্যাশার ছুরিতে জখম হতাম। প্রত্যেকবারই কিন্তু বইটি আমি এই ঐকান্তিক অনুশোচনার সাথে রেখে দিতাম যে এ কোনো হাতীর দাঁতের তৈরি মিনারের দিকে স্বপ্নের ডাক ছাড়া কিছু নয় এবং আমি যে জগতের অংশ সেই বেসুরো, তিক্ত এবং লোভান্ধ জগতের সাথে যদিও আমি তাল রেখে চলতে পারছিলাম না তবু হাতীর দাঁতে তৈরি মিনারে বাস করার ইচ্ছা আমার ছিলো না।

তবু, সে সময়ে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে যে-সব লক্ষ্য ও প্রয়াস নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছিলো এবং ইউরোপের সাহিত্য, কলা ও রাজনীতিকে ভরে ‍তুলেছিলো প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্কের গুঞ্জন ধ্বনিতে, আমি তাতে মোটেই কোনো উদ্দীপনা বোধ করছিলাম না- কারণ, এসব লক্ষ্য ও প্রয়াসের বেশির ভাগ একে অপরের যতো বিরোধীই হোক না কেন, সব কটির মধ্যেই একটি জিনিস ছিলো কমন বা সাধারণঃ তা এই সরল ধারণা যে, জীবনকে বর্তমান বিভ্রান্তি থেকে টেনে তোলা এবং ‘উন্নত করা’ সত্যি সম্ভব  যদি কেবল বাহ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা উন্নত করা যায়। এ আমি তখনো খুব গভীরভাবেই অনুভব করেছিলাম, কেবলমাত্র বৈষয়িক উন্নতি কেনো সমাধা নয় এবং যদিও আমি নিশ্চিত করে জানতাম না সমাধান কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তবু আমি নিজের মধ্যে সে উৎসাহ উত্তেজনার সন্দেহাতীত প্রমাণ কখনো পাইনি যা আমার সমকালীন লোকের ‘প্রগতির নামে অনুভব করতো।

একথা ঠিক নয় যে, আমি অসুখী ছিলাম। আমি কোনো দিনই অর্ন্তমুখী ছিলাম না। আর ঠিক সেই সময়ে আমি আমার ব্যবহারিক জীবনে প্রায় অসাধারণ সাফল্য উপভোগ করছিলাম। যদিও আমি পোশাকে পেশা হিসাবে খুব গুরুত্ব দিতে সামন্যই ইচ্ছুক ছিলাম, তবু ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে আমার কাজ আমার জন্য বৃহত্তর পৃথিবীর বহু পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে হলো-কারণ বহু ভাষা জানতাম বলে আমি তখন সহ-সম্পাদক পদে উন্নীত হয়েছি এবং স্ক্যণ্ডিনেভিয়ান দেমগুলির পত্র-পত্রিকার জন্য সংবাদ সরবরাহের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। ক্যাফে দা ওয়েসটেন্স এবং তার আত্মিক উত্তরাধিকারী রোমানিশেষ ক্যাফে-দুটি ছিলো অনেকটা আমার মন মানসের স্ব-গৃহঃ এ দুজায়গায় তখনকার দিনের প্রায় সকল বিখ্যাত লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা এবং চিত্রপরিচালকেরা জমায়েত হতেন। নামকরা এইসব লোকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বের এবং কখনো কখনো অন্তরংগতার, আর নিজেকে আমি মনে করতাম তাঁদেরই একজন, অন্ত দৃষ্টিভংগির দিকে দিয়ে, খ্যাতিতে না হলেও। আমি গভীর বন্ধুত্ব এবং ক্ষণিক প্রেম দুই-ই উপভোগ করেছি। জীবন আমার কাছে ছিলো উত্তেজনাময়, প্রতিশুতি-প্রত্যাশায় ভরপুর এবং বিচিছন্ন অনুভূতিতে বার্ণঢ্য; কারণ, আমি জানতামা না আমি সত্যি কী চাই, যদিও তরুণের হাস্যকর ঔদ্ধত্যের সংগে, যুগপৎ এ প্রত্যয়ও জন্মেছিলো যে, একদিন আমি তা অবশ্য জানতে পারবো। তাই আমি আমার হৃদয়ের তৃপ্তি ও অতৃপ্তির দোলকে ঠিক একইভাবে দোল খাচ্ছিলাম, যেমন দোল কাচ্ছিলো বহু তরুণ সেই বিস্ময়কর বছরগুলিতে-কারণ, আমাদের কেউই প্রকৃত অসুখী ছিলো না যেমনি সত্যি তেমনি এ-ও সত্যি যে খুব অল্প কজনকেই সেদিন জ্ঞাতসারে সুখী বলে মনে হতো।

আমি অসুখী ছিলাম না কিন্তু আমার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের কিংবা তাদের মধ্যকার কোনো দলের বিভিন্নমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আশা-আকঙ্খায় অংশগ্রহণে আমার অক্ষমতা কালক্রমে এই অস্পষ্ট ধারণার রূপ নেই যে, আমি ঠিক ওদের কেউ নই, ওদের সংগে আমার সম্পর্ক নেই এবং আমি তারি সংগে আবার অস্পষ্টভাবে এ বাসনাও জন্মালো যে আমাকে কারো অংগীভূত হতে হবেই, তবে কারঃ- কোনো কিছুর অংশ হতে হবেই—তবে কিসেরঃ

 ...                         ...                                             ...                                       ...

তারপর একদিন ১৯২২ সনের বসন্তকালে আমি আমার মাম ডোরিয়ানের একটি চিঠি পেলাম।

ডোরিয়ান ছিলেন আমার আম্মার সবচেয়ে ছোট ভাই। মামা ভাগ্নের নয়, বরং বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো আমাদের দুজনের মধ্যে। তিনি ছিলেন একজন মনোবিকলনবিদ, ফ্রয়েডের প্রথমদিকের একজন শাগরিদ; সে সময় তিনি জেরুযালেম একটি মানসিক হাসপাতালের প্রধান ছিলেন। তিনি নিজে যেহেতু জিওনিস্ট ছিলেন না এবং জিওনিজমের প্রতি তাঁর তেমন সহানুভুতিও ছিলো না, পক্ষান্তরে আরবদের প্রতিই তিনি ছিলেন আকৃষ্ট যার আর কিছুই দেবার ছিলো না। মামা ছিলেন অবিবাহিত, তাই তাঁর এই এককীত্বে এই তরুন ভাগ্নেটি তাঁর সাথী হতে পারে। তিনি তাঁর চিঠিতে ভিয়েনার সেই উত্তেজনাময় দিনগুলির কথা উল্লেক করেন যখন তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মনোবিকলনবদ্যার নতুন দুনিয়ায় এবং এই বলে শেষ করেনঃ তুমি একনে চলে আসো এবং আমার সাথে কয়েখ মাস থাকে। আমি তোমার আসা-যাওয়ার খরচ বহন করবো। তোমার যখন ইচ্ছ তখনই বালিনে ফিরে যেতে পারবে। এখানে এলে তুমি থাকবে এক পরম আনন্দদায়ক পুরোনো আরব পাথুরে ঘরে, যা গরমের দিনি ঈষৎ শীতল (এবং শীতকালে ভয়ানক ঠাণ্ডা)। আমরা দু’জনে এক সংগে সময় কাটাবো। আমার বইপত্র রয়েছে প্রচুর, তোমার চার পাশের অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন তুমি হাঁফিয়ে উঠবে তখন তুমি পড়তে পারবে যতো ইচ্ছ্. ..।

আমি আমার মন স্থির করে ফেললাম তৎপরতার সাথে। অবশ্য এ তৎপরতা সব-সময়ই আমার জীবনের বড়ো বড়ো সিদ্ধান্তের বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। পরদিন সকালেই আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফ অফিসে ডঃ ডামার্টকে জানিয়ে দিলাম-আমাকে এক জরুরী কাজের তাগিদে নিকট-প্রাচ্য যেতে হচ্ছে, কাজেই এক হপ্তার মধ্যে আমি এজেন্সী ছেড়ে দিচ্ছি,-

কেউ যদি তখন আমাকে বলতো, ইসলামী দুনিয়ার সাথে আমার এই পয়লা পরিচয় একটি অবসরকালীন অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমিত থাকবে না, বরং তার ফল হবে অনেক-অনেক সূদুর প্রসারী এবং তা আমার জীবনেরই মোড় ফিরিয়ে দেবে তার সে ধারণা আমি একেবারেই অবাস্তব ও অযৌক্তিক বলে হেসে উড়িয়ে দিতাম। একথাও ঠিক নয় যে, বেশির ভাগ ইউরোপীয়র মতোই আরব্য উপন্যাসের রোমান্টিক আবহাওয়ায় যেসব দেশের সাথে আমার মন জড়িয়েছিলো আমি সেসবের মোহ থেকে মুক্ত ছিলাম। আমি অবশ্য বর্ণের সমারোহ, উদ্দাম রীতিনীতি এভং বিচিত্র সাক্ষাৎকার আশা করেছি। কিন্তু একথা কখনো আমার মনে হয়নি যে, আমি আত্মার জগতেও নতুন নতুন অভিযান প্রত্যাশা করতে পারি। এই নতুন সফরে আমার জন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে মনে হলো না। ইতিপূর্বে আমার জীবনে আমি যেসব ধারণ লাভ করেছি সেগুলিকে আমি সহজভাবেই পশ্চিমা বিশ্ব-দৃষ্টির সাথে মিলিয়ে নিয়েছি এবং আশা করেছি, এতে করে আমি আমার পরিচিত একমাত্র সাংস্কৃতিক পরিবেশের আওতায় অনুভূতি ও ধারণার এ প্রশস্ততর, ক্ষেত্রে পৌছুতে পারবো। এভং আপনি যদি এ সম্পর্কে চিন্তা করেন, এর চেয়ে ভিন্ন উপলদ্ধি আমার পক্ষে কী করেই বা সম্ভব ছিলো? আমি ছিলাম এক অতি-অতি তরুণ ইউরোপীয় এবং এই বিশ্বাসের মধ্যে আমি বড়ো হয়েছি যে, ইসলাম এবং ইসলামের উদ্দিষ্ট সবকিছুই মানুষের ইতিহাসের একটি রোমান্টিক গলিপথ ছাড়া কিছু নয়, কাজেই, ই্উরোপীয় পশ্চিমারা কেবলমাত্র যে-দুটি ধর্মকে গুরুত্বের সাথেবিবেচনার লায়েক মনে করে সেই খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মের সাথে তার উল্লেখও অনুচিত, তুলনার তো কথাই ওঠে না।

ইসলামী বিষয়বস্তুর বিরদ্ধে (যদিও মুসলিম জীবনের রোমান্টিসাইজড বহিরংগের বিরুদ্ধে নয়) এই অস্পষ্ট ইউরোপীয় বিদ্বেষ নিয়ে আমি ১৯২২ সনের গ্রীষ্মকালে আমর সফর শুরু করি। নিজের প্রতি সুবিচার করতে গিয়ে আমি যদি একথা বলতে না পারি যে আমি একটা ব্যক্তিগত তাৎপর্যের মধ্যে ডুবেছিলাম, তা সত্ত্বেও আমি অজান্তেই গভীরভাবে বিজড়িত ছিলাম সেই আত্মনিমগ্না, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায়, যা পাশ্চাত্যের সকল সময়েরেই একিট বৈশিষ্ট্য।

...                                            ...                                           ...

এবং এখন আমি প্রাচ্যের পথে, একটি জাহাজের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে আছি। একটি মন্থর সফর আমাকে এনে পৌছিয়ে দিলো কনস্টঞ্জায় এবং সেখান থেকে এই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রভাবে।

কুযাশার পর্দার আড়াল থেকে চোখের সামনে ভেসে ‍উঠলো একটি লাল বাদাম, তারপর তা ঢলে গেলো জাহাজের একেবারে কাছ দিয়ে পাশ কেটে। বাদামটি দেখা গেলো বলে বুঝতে পারলাম কুয়াশা কাটিয়ে সুরুজ উঠি উঠি করছে। কয়েকটি পাণ্ডুর যেনো অনেকটা ধাতুর কাঠিন্য আর কি। তাদেরই চাপে দুধের মতো সাদা জমাট কুয়াশা যেনো ধীরে ধীরে অথচ গা ছড়িয়ে বসলো পানির উপর, তারপর সেগুলি বেঁকে বৃত্তাকারে আলাদা হয়ে গেলো, অবশেষে সুরুজের রশ্নির ডান বাম পাশ থেকে সেগুলি বিস্তৃত ভাসমান রক্তচাপের আকারে উঠতে লাগলো উপরদিকে, পাখার মতো।

‘সুপ্রভাত’। একটি গাঢ়, পূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনা গেলো। আমি ঘুরে দাঁড়াই এবং আমর পূর্ব সন্ধ্যার সংগীটির কালো আলখিল্লাটি চিনতে পারি। আরো চিনতে পারি একটি মুখের বন্ধুত্বপূর্ণ সেই স্লিদ্ধ হাসি যা আমাদের কয়েক ঘন্টার পরিচয়ের মধ্যেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি। জেস্যূট পাদরীটি ছিলেন আধা পোল আধা ফরাসী, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার একটি কলেজে পড়াতেন। ছুটি ভোগ করার পর তিনি আবার তাঁর কর্মস্থানে ফিরে যাচ্ছেন। জাহাজে ওঠার পর আমরা সন্ধ্যাটা কাটিয়েছিলাম অন্তরং আলাপে। যদিও শীগগীরই বুঝতে পারলামে বহু বিষয়েই আমাদের মতের অমিল ব্যাপক, তবে অনেক বিষয়েই আমাদের মধ্যে মিলও রয়েছে; এবং এটুকু বুঝবার  মতো যথেষ্ট বয়সও তখন আমার হয়েছে যে, এমন একজন মানুষ আমার সামনে রয়েছেন যিনি একটা চমৎকার, সিরিয়াস অথচ সুরসিক মনের অধিকারী.. .।

--‘সুপ্রভাত ফাদার ফেলিক্স, সমুদ্দুরের দিকে একটু চেয়ে দেখুন’—

সূর্যোদয়ের সাথে দিবালোক এবং রঙের আবির্ভাব ঘটেছে। আমরা ভোরের হাওয়ার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের গলুই-এর উপর। অসম্ভবের নেশায় মেতে আমি নিজেই চেষ্টা করলাম ঢেউ-এর ওঠা-পড়ার মধ্যে রঙের গতি নির্ধারণ করতে। নীল? সবুজ? ধূসর? রঙটা নীল হতে পারতো, কিন্তু এরি মধ্যে একটা রক্ত-লাল উজ্জ্বল দীপ্তি, যা কাঁপছিলো এবং  যা ছিলো সূর্যেরেই প্রতিফরন, গড়িয়ে গেলো ঢেউ-এর ঢালু উপত্যকার উপর দিয়ে, অথচ ঢেউ-এর চূড়াটি ভেঙে পড়লো বরফের মতো সাদা ফেনপুঞ্জে এবং তার উপর দিয়ে ছুটে গেলো ইস্পাতের মতো-ধূসর, ছিন্ন, কুঞ্চিত বস্ত্রের আকারে। মুহুর্তকাল আগে যা ছিলো একটা ঢেউ এর পাহাড় তা-ই এখন হয়ে উঠেছে একটা স্পন্দনশীল গতি-রূপান্তরিত হলো হাজারো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আলাদা আলাদা ঘূর্ণিপাকে এবং সেইসব ঘূর্ণিপাকের ছায়া-ঢাকা গর্তের মধ্যে, রক্তের মতো লাল রঙটি বদলে গিয়ে হয়ে উঠলৈা গাঢ়, স্লিগ্ধ সবুজ; তারপর সেই সবুজ রঙটি উঠতে লাগলো উপরদিকে এবং রূপান্তরিত হলো কাঁপতে থাকা স্পন্দনময় বেগুনীতে, যা নিম্মগামী হয়ে পয়লা শরাবের মতো লাল হয়ে উঠলো, কিন্তু মুহূর্তকাল পরেই আবার তীব্যবেগে উর্ধ্বগামী হলো আসামনী নীল রঙে, পরিণত হলো ঢেউ-এর চূড়া্য় এবং ভেঙে পড়লো এবং আবার সাদা ফেনপুঞ্জ তার জাল ছড়িয়ে দিলো গড়াগড়ি-যাওয়া পানির পাহাড়গুলির উপর, উদ্ধতভাবে.. . এবং এভাবে এ অনন্ত খেলা চলতেই থাকলো।

রঙের এই খেলা এবং মুহূর্তে  মুহূর্তে এর পরিবর্তনশীল ছন্দ আমি কখনো অনুধাবন করতে সক্ষম হবো না, এ বোধ আমার এমন একটি অস্থিরতা এনে দিলো যা প্রায় এক দৈহিক অনুভূতিই শামিল। বলা যায়, আমি যখন আমার চোকের কোণ দিয়ে অনেকটা লঘুভাবে এর দিকে তাকালাম মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, গোটা ব্যাপারটিকে একটিমাত্র ছবির মধ্যে ধরা হয়তো সম্ভবঃ কিন্তু সতর্কভাবে সজ্ঞান মনোনিবেশ  করতে গিয়ে, যা একটি বিচ্ছিন্ন ধারণাকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ধারণার সাথে যুক্ত করার এক অভ্যাস বিশেষ, কেবল কতকগুলি ভাঙাচোরা, আলাদা আলাদা ছবিই পাওয়া গেলো, আর কিছু নয়। কিন্তু এই সংকট থেকে, এই অদ্ভুদ বিরক্তিকর বিভ্রান্তির মধ্যেও একদা অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা হলো আমার-কিংবা বলা যায়, সেই মুহর্তে আমার ঠিক এরূপই মনে হলো- এভং আমি প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই স্বগত বলে উঠলামঃ

-‘ যে কেউ এ সমস্তকে তার ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধি করতে পারবে সেই পারবে তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে।’

-’তুমি কী বলতে চাইছো, আমি জানি’, ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন, ‘কিন্তু নিয়তির উপর প্রভুত্ব করার ইচ্ছা মানুষের কেন হবে? দুঃখ –কষ্ট থেকে রেহাই পাবার জন্য? তার চেয়ে কি নিয়তি থেকে মুক্ত হওয়াই উত্তম নয়?’

-‘আপনি তো প্রায় একজন বৌদ্ধের মতোই কথা বলছেন, ফাদার ফেলিক্স! তাহলে কি আপনিও মনে করেন নির্বাণিই সকল জীবরে লক্ষ্য?’

-‘না, না, নিশ্চয় নয়- আমরা খৃশ্চানরা জীবন এবং অনুভূতির বিনাশ চাই না- আমরা কেবল চাই জীবনকে বস্তু আর ইন্দ্রিয়ের এলাকা থেকে আত্মার জগতে উন্নীত করতে।’

-‘কিন্তু তা কি সন্ন্যাস নয়?’

-‘এ সন্ন্যাস নয়, তরুণ বন্ধু সন্ন্যাস নয়! এ-ই একমাত্র পথ প্রকৃত জীবনের.. . শান্তির…’

বসফোরাস প্রাণালী উন্মুক্ত হলো আমাদের সামনে-একটি প্রশস্ত পানি-পথ, যার দু’পাশে  দাঁড়িয়ে আছে শিলাগঠিত পাহাড়। এখানে ওখানে আমি দেখতে পাচ্ছি থামের উপর তৈরি হাওয়া খেলানো দালান-কোঠা, চত্বর-বিশিষ্ট বাগ বাগিচা, রহস্যময় উচ্চতায় জেগে ওঠা সাইপ্রেস বৃক্ষরাজি এবং প্রাচীন জেনিসারী কিল্লাসমূহ, জমাট স্তূপীকৃত শিলা, যা শিকারী পাখীর বাসার মতো ঝুলে আছে পানির উপর। মনে হলো যেনো বহুদূর থেকে এলো ফাদার ফেলিক্সের গলার স্বরঃ

-তুমি ভেবে দেখো-বাসনার ... সকল মানুষের বাসনার গভীরতম প্রতীক হচ্ছে- জান্নাতরূপ প্রতীক। তুমি সকল সময়ই দেখতে পাবে, যদিও সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে, তবু তার অর্থ সবসময়ই এক, মানুষ নিয়তির হাত থেকে মুক্ত হতে চায়। জান্নাতে মানুাষের নিয়তি বলে কিছু নেই; মানুষ যখন দেহ আর প্রকৃতির প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করলো এবং এভাবে, আমরা যাকে আদি পাপ বরি সেই পাপ করে বসলো, তখনি এলো নিয়তি। সেই আদি পাপটি কী?- মানুষের পথে বাধাস্বরূপ দেহের যে প্ররোচনা তাতে আত্মার পদস্থলন, আর প্ররোচনাগুলিই হচ্ছে আসলে মানুসের প্রকুতির মধ্যে অবশিষ্ট পশু –স্বভাব। মানুষের সার, মানবিক ও মানবিক-ঐশি অংশ হচেছ কেবল তার আত্মা। আত্মার অভিযাত্রা হচ্ছে আলোর দিকে। কিন্তু আদি পাপের জন্য তার পথ সবসময়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন সব বাধার দ্বারা, যা দেহের হাড় এবং অদৈব গঠন ও তার প্ররোচনাগুলি থেকে উদ্ভুত। তাই খৃশ্চান ধর্মের লক্ষ্য হচ্ছে জীবনের আসার, ক্ষণিক পাশবিক দিক হতে মানুষের নিজের মুক্তি এবং তার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকরে প্রত্যাবর্তন!’

দুমিনার বিশিষ্ট প্রাচীন কিল্লা রুমিলি হিসাব দেখতে পেলাম। এর একটি দেয়াল- কিল্লার ভেতর থেকে দুশমনকে আক্রম্যন করার জন্য যাতে ছিরো অসংখ্য ছিদ্র-নেমে এসেছে প্রায় পনির কিনার পর্যন্ত। তীরে, কিল্লার দেয়ালগুলির দ্বারা তৈরি অর্ধবৃত্তটির মধ্যে একটি ছোট্ট তুর্কি গোরস্তান, যার কবরের পাথরগুলি ভেঙে পড়ে আছে, যেন শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে।

-‘তা হতে পারে ফাদার ফেরিক্স, কিন্তু আমার মনে হয় এভং আবার বয়সের অনেকেই এরূপ মনে করে, দেহের গঠনের মধ্যে সার আর অসারেরঃ পার্থক্য নিরূপণে এবং দেহ আর আত্মাকে পৃথক করার মধ্যে কোথায় যেনো একটা ভুল রযে গেছে।... সংক্ষেপে, আমি আপনার মতো সাথে একমত হতে পারছিনা যে, দেহের দাবি, রক্ত-মাংস আর পার্থিব নিয়তির মধ্যে মহৎ পবিত্র কিছুই নেই-আমার কামনার লক্ষ্য অন্যত্র! আমি জীবনের এমন একটি রূপের স্বপ্ন দেখি যদিও আমি স্বীকার করছি, এখানে তা খুব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না-যাতে-গোটা মানুষ, দেহ-আত্মায় মিলে মানুষ, তার সত্ত্বার গভীর হতে গভীরতরো পূর্ণতার জন্য চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে, যাতে আত্মা আর ইন্দ্রিয় একে অপরের শত্রু হবে না-যাতে মানুষ যেমন তার নিজের ভেতরের ঐক্য উপলব্ধি করবে তেমনি ঐক্য উপলব্ধি করবে তার নিয়তির তাৎপর্যের সংগে, যাতে করে সে তার জীবনের চূড়ায় পৌছুনোর পর বলতে পারে-‘আমি আমার নিয়তি।’

-‘এ তো হেলনীয় স্বপ্ন’। ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন-‘কিন্তু এ স্বপ্নের পরিণতি কী হয়েছিলো? প্রথম ওর্ফিক আর ডায়োনোসিয়ান রহস্যে, তারপর আফলাতুন আর প্লোতিনিয়াসের ভাবধারায়, আর এমনি করে,আবার এই উপলব্ধিতেও যে, দেহ আর আত্মা পরস্পর বিরোধী… দেহের প্রভুত্ব থেকে আত্মার মুক্তি সাধন, এই হচ্ছে খৃশ্চান মুক্তির অর্থ, ক্রুশে আমাদের প্রভুর আত্মোৎসর্গে আমাদের বিশ্বাসের তাৎপর্য.. . ‘এখানে তিনি থামলেনঃ তারপর আমার দিকে এক ঝলক চেয়ে বললেন, ‘দেখো আমি সব সময়ই কিন্তু মিশনারী নই.. আমি যদি তোমাকে আমার বিশ্বাসের কথা বলি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো, কারণ এ তোমার বিশ্বাস নয়.. .

-কিন্তু আমর কোনো বিশ্বাসই নেই’, আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি।

-হ্যাঁ, ফাদার ফেলিক্স বলেন, আমি তা জানি, বিশ্বাসের অভাব, বরঞ্চ বলা উচিত বিশ্বাস করার অক্ষমতা- এ হচ্ছে আমাদের জামানার আসল রোগ। তুমি আরো অনেকের মতোই বাস করছো একটি বিভ্রান্তির মধ্যে, যা হাজার বছরের পুরোনো। বিভ্রান্তিটি এই যে, মানুষের চেষ্টা –সাধনার দিক বুদ্ধিই দেখতে পারে। কিন্তু বুদ্ধি নিজে আধ্যাত্মিক জ্ঞান পর্যন্ত পৌছুতে পারে না, কারণ জাগতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য জ্ঞান একেবারেই মশহুল। বিশ্বাস –কেবল বিশ্বাসই পারে আমাদেরকে এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করতে।

-‘বিশ্বাস? আমি জিজ্ঞাস করি, আপনি আবার এ শব্দটি উল্লেক করলেন। একটি বিষয় আমি বুজতে পারি না, আপনি বলেছেন যে, কেবল বুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞান হাসিল ও সৎ জীবন-যাপন সম্ভব নয়; বিশ্বাসের দরকার-আপনি বলেছেন। আমি আপনার সাথে ষোলো আনা একমত। কিন্তু যার বিশ্বাসই নেই সে কী করে বিশ্বাস অর্জন করবে? এর কোনো পথ আছে কি, অর্থাৎ এমন কোনো পথ যা আমাদের ইচ্ছার জন্য, উন্মুক্ত।’

-কেবলমাত্র ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রিয় বন্ধু। এ পথ কুলে যায় একমাত্র আল্লাহরই রহমতে। তবে, এ পথ সবসময়ই তারই জন্য উন্মুক্ত হয় যে তার অন্তরের অন্তস্থল থেকেই প্রার্থনা করে আলোকের জন্য-দিশার জন্য।’

-‘প্রার্থনা করে? কিন্তু ফাদার ফেলিক্স, মানুষ যখন প্রর্থনা করতে পারে তখন তার বিশ্বাস তো রয়েছেই। আপনি আমাকে একটা বৃত্তের চারদিকে চালাতে চাইছেন-কারণ, কোনো মানুষ যদি প্রার্থনা করে, যার কাছে সে প্রার্থনা করছে তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার প্রত্যয় তো আগে থেকেই রয়েছে। এই প্রত্যয় তার কী করে এলো? তার বুদ্ধির মাধ্যমে? এর অর্থ কি একথা স্বীকার করার শামিল নয় যে, বুদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন অসম্ভব? তা বাদ দিলেও এমন কারো কাছে রহমতের কী অর্থই বা হতে পারে যার এ জাতীয় কোনো অভিজ্ঞতা নেই?

পাদ্রিটি তাঁর কাঁধ ঝাঁকুনি দিলেন অনুশোচনার সংগে, আমার তাই মনে হলো। কেউ যদি নিজে আল্লাহকে উপলব্ধি করতে না পেরে থাকে তার উচিত অন্যদের অভিজ্ঞতার দ্বারা পথ চলার জন্য তৈরি থাকা, এমন সব লোকের অভিজ্ঞতার দ্বারা যাঁরা তাঁকে উপলব্ধি করেছেন.. .

……                    .. .                  .. .

কয়েকদিন পর আমরা নামলাম আলেকজেন্দ্রিয়ার সেদিন বিকালেই আমি ফিলিস্তিন রওনা হই।

ট্রেন সোজা তীর বেগে ছুটে চললো সেই বিকালভর, মোলায়েম আর্দ্র, ব-দ্বীপের দৃশ্যগুলি পাড়ি দিয়ে। পথে পড়লো নীলনদ থেকে নেয়া নহরসমূহ-বহু আঁধা-বোটের বাদামের ছায়ায় ছায়ায় ঢাকা শহর। দেখতে দেখতে পেছনে হারিয়ে গেলো ছোটো ছোটে বহু শহর; সারি সারি ধূলায় ধূসর ঘরবাড়ি এবং হালকা মিনারসব। বাক্সের মতো দেখতে মাটির কুটির নিয়ে গড়ে ওঠা গাঁয়ের পর গাঁ ছুটে গেলো পেছনদিকে। ফসল তুলে নেয়া কার্পাসের জমি, অংকুর গজানো আখের ক্ষেত; মোটা-সোটা মোষ এখন ঘরে চলেছে রাখাল ছাড়াই, সারাদিন কাদায় ভর্তি ডোবাতে গা ডুবিয়ে তাকার পর –এমনি কতো দৃশ্য চোখে পড়তেই পড়তেই আবার হারিয়ে যেতে লাগলো পেছনে। দূরে দেখতে পেলাম লম্বা জোব্বা পরা মানুষ – মনে হলো ওরা যেন ভেসে চলেছে-এমনি পরিষ্কার স্বচ্ছ ছিলো হাওয়া, সুউচ্চ নীল, যেনো কাঁচ –নির্মিত আসমানের নীচে। খালগুলির তীরে তীরে নল-খাগড়া নুয়ে পড়েছে বাতাসের ধাক্কায়; কালো রঙের সূক্ষ্ণ রেশমের পোশাকপরা রমণীরা ওদের মাটির কলসীতে পানি ভরছেঃ অদ্ভুদ সুন্দর সব রমণী, তন্বী, কআর দীঘাংগী, তওদের হাঁটা দেখে মনে হলো লম্বা লম্বা শাখাবিশিষ্ট গাছপালার কথা, যারা মৃদুভাবে আন্দোলিত হয় বাতাসে অথচ শক্ত মজবুত! তরুণী এবং মায়েরা-সকলেই হাঁটছে এমনি ভেসে ভেসে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তারপর তা বয়ে চলে, বিশাল, বিশ্রাম-নেয়া কোনো প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। হালকা-পাতলা গড়নের পুরুষেরা হেঁটে চলেছে বাড়ির দিকে তাদের জমি থেকে, আর মনে হচ্ছে ওরা যেন একেকটি বিশাল পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে- আর একই সংগে এ-ও মনে হলো-ধীরে ধীরে মিলিয়ে দিনের থেকে ওদের যেনো তুলে নেয়া হয়েছে। মনে হলো, ওদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপেরই যেনো একেকটা নিজস্ব অস্তিত্ব আছে-নিজেতেই নিজে সম্পূর্ণ একেকটি পদক্ষেপ-চিরন্তর, আর চিরন্তনের মধ্যে সবসময় কেবল ঐ একটি পদক্ষেপেই তো আছে। এই যে হালাক স্নিগ্ধতার ভাব-হয়তো এর মূলে রয়েছে নীল-বদ্বীপের মাদকতাময় সান্ধ্য আলো অথবা হয়তো অতো-সব নতুন জিনিস দেখার পর আমরাই নিজের চঞ্চলতা; কিন্তু কারণ যাই হোক, হঠাৎ আমি আমার নিজের ভেতরে অনুভব করলাম, ইউরোপের ভারঃ আমাদের সকল কাজে ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যের ভার। আমি নিজে নিজে ভাবলাম, আমাদরে জন্য সত্যের সাথে সাক্ষাৎ কী কঠিন! সবসময়ই আমরা চেষ্টা করে চলেছি একে হাতের মুঠায় ধরার জন্য.. . কিন্তু সত্য হাতে ধরা দিতে রাজী নয়। কেবল যেখানে সত্য মানুষকে অভিভূত করে সেখানেই তা আত্মসমর্পণ করে মানুষের কাছে।

মিসরীয় ক্ষেত-মজুরের পদক্ষেপ, যা এরি মধ্যে হারিয়ে গেছে দূরে, অন্ধকারে, আমার মনের ভেতরে দোল খেতে থাকে মহৎ সমস্ত কিছুর জন্য প্রশংসা করা একটা সংগীতের মতো।

আমরা সুয়েজ খালে এষে পৌছুই এবং একটি সমকোনের মতো হঠাৎ মোড় ফিরি আর কিছুক্ষনের জন্য ধূসর কালো তীর  বেয়ে উত্তরকে চলতে টেনে বের করা একটি সুর।জোছনা মেখে খালটি রূপান্তরিত হয়েছে একটি সত্যিকার অথচ স্বপ্নের প্রশস্ত রাস্তায়-যেনো ঝকঝকে ধাতুর একটি গাঢ় বন্ধনী! তুপ্ত, ক্লান্ত, নীল উপত্যকার মাটি এক বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে বালিয়াড়ির পর বালিয়াড়ি গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে! এই বালিয়াড়িগুলি খালের দুতীরকে অমন একটি অস্পষ্টতা আর তীক্ষ্ণতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে যা রাতের অন্য ল্যাণ্ডস্কেপে ক্বচিৎ দেখা যায়। নিবিষ্ট নীরবতার মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে আছে একেকটা ড্রেজারের কংকাল। ওদিকে, অপর পারে ছুটে চলেছে এক উট চালক, ছুটে চলেছে প্রায় অদৃশ্যভাবে, আর এরি মধ্যে তাকে গ্রাস করে ফেলেছে রাত্রি ... কী বিশাল সহজ স্রোতঃ লোহিত সাগর থেকে তোতো হ্রদ হয়ে ভূমধ্যসগার পর্যন্ত.. . সোজা এক মরুভূমির মধ্য দিয়ে, যাতে করে, ভারত মহাসাগর আছাড় খেয়ে পড়তে পারে ইউরোপের অবতরণ স্থলগুলিতে।.. .

কাস্তারায় কিছুক্ষণের জন্য ট্রেন সফরের পড়ে এবং একটি অলস মন্থর ফেরি মুসাফিরদের নিয়ে যায় ওপারে, নীরব নিস্পন্দ খাল পাড়ি দিয়ে। ফিলিস্তিনের ট্রেন ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম আর শুকনা। আমার ডানে মরুভূমি, বামে মরুভূমি-একটানা কাঁপা-কাঁপা ধূসরতা, এখানে ওখানে দাগ বুলানো, আর কোনো জন্তুর বিচ্ছিন্ন ডাকে বিঘ্নিত-হয় শিয়াল না হয় কুকুরের ডাক। উজ্জ্বল কার্পেটের কাপড়ে তৈরি ভারি বস্তা নিায়ে একটি বেদুঈন উঠে এলো ফেরি থেকে এবং আগিয়ে গেলো দূরে একটি দলের দিকে- আর এই মাত্র আমি দেখতে পেলাম, ওরা কতকগুলি নিশ্চল মানুষ আর হাঁটু-গেড়ে বসে পড়া কতকগুলি উট, পিঠে বোঝা চাপিয়ে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি। মনে হলো, ওরা যেন বেদুঈনটির আসার ইন্তেজারিতে ছিলো। বেদুঈনটি তার বস্তাগুলি একটি উটের পিঠে রেখে দেয় ধপ করে; গোটা কয়েক কথার আদন-প্রদান হয়, তারপর সামনের পা –এর উপর, সওয়ারীরা দাঁড়িয়ে যায়, পয়লা পেছনের পা-এর উপর, তারপর সামনের পা-এ উপর, সওয়ারীরা সামনে-পেছনে দুরতে থাকে- তারপর তারা মোলায়েম শপশপ আওয়াজ তুলে উট হাঁকিয়ে রওনা করে দেয় এবং অল্পক্ষনের জন্য আমার চোখ অনুষরণ করেঃ বিলীয়মান পণ্ডগুলির দোল খাওয়া হালকা রঙের শরীর এবং চওড়া, বাদামী ও সাদা ডোরাওয়ালা বেদুঈন পোশাক।

একটি রেল মজুর আমার দিকে আগিয়ে এলো। ওরা গায়ে একটি নীল রঙের ওভারকোট, আর মনে হলো, লোকটি খোঁড়া। সে আমার সিগারেট থেকে ওর নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিলো এবং ভাঙা ভাঙা ফরাসীতে আমাকে জিজ্ঞাস করলো,“আপনি জেরুজালেম যাচ্ছেন’? যখন আমি বললাম ‘হ্যাঁ’, সে আবার জিজ্ঞাস করে, ‘প্রই প্রথমবার’?

 আমি কথা নেড়ে সায় দিই। সে চলে যাবার উদ্যোগ করছিলো, পরে আবার আমার দিকে ফিরে বসলো- ‘আপনি কি ওখানে সিনাই মরুভূমি থেকে আসা বড়ো কাফেলাটি দেখেছেন? দেখেন নি? তাহলে আসুন আমার সাথে, ওদের সাথে দেখা করি গিয়ে। আপনার হাতে সময় আছে এখনো।

একটা নীরব শূন্যতার মধ্য দিয়ে, একটা সংকীর্ণ বহু-ব্যবহৃত রাস্তা ধরে আমরা আগাতে থাকি। আমাদের জুতার তলা বালুতে ডুবে যায়। রাস্তাটি গিয়ে পৌছুছে বালিয়াড়িগুলি পর্যন্ত। আঁধারে একটি কুকুর ডেকে ওঠে। ছোটো ছোটো কাঁটা-বনের মধ্যে হোঁচট খেতে খেতে আমরা যাখন আগাচ্ছিলাম, আমার কানে ভেসে এলো বহু কণ্ঠস্বর-অস্পস্ট, এলোমেলো, চাপা, যেনো বহু মানুষের গলার আওয়াজ; আর, মরুভূমির শুকনা বাতাসের সাথে মিশে এলো বহু বিশ্রামরত জন্তুর উগ্র অথচ মোলায়েম গন্ধ। হঠাৎ যেমন আমরা কুয়াশা-ঢাকা রাতে শহর-বন্দরে কখনো কখনো দেখতে পাই, রাস্তার প্রান্তে এখনো অদৃশ্য কোনো প্রদীপের আলোর কাঁপুনি, যা কেবল কুয়াশাকেই উজ্জ্বল করে তোলে-একটা চিকন আলোর শিখা নীচ থেকে উঠরো উপরদিকে, -যেনো মাটির নীচে থেকে উঠেছে েএবং সোজা আঁধার হাওয়া ভেদ করে উঠছে উর্ধ্বে। এ হচ্ছে একটি আগুনের দীপ্তি যা উঠে এসেছে বালিয়াড়ি দুটির মধ্যকার গভীর খাদ থেকে, পথটি ঘন কাঁটাবনে এমনি আচ্ছন্ন যে আমি তার তলা দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি এখন মানুষের আওয়াজই কেবল শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু যারা কথা বলছে তাদের এখনো দেখতে পাচ্ছি না। আমি শুনতে পেলাম উটের নিশ্বাষের আওয়াজ এবং সেই সংকীর্ণ পথে কেমন করে ওরা একে অপরের সাথে গা ঘষছে, তারি শব্দ। মানুষের একটি বিশাল কালো ছায়া পড়ে আলোটির উপর, ছুটে যায় বিপরীতদিকের ঢালুর দিকে, তারপর আবার নীচের দিকে নেমে আসে। আরো কয়েক পা আগানোর পর সমস্ত কিছু দেখতে পেলাম- হাঁটু ভেঙে একটি বড়ো বৃত্তের আকারে জামিনের উপর বসে আছে অনেকগুলি উট, এখানে ওখানে স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে জিনের পাশে বাঁধা থলে ও বস্তা-এবং সে-সবের মধ্যে কতকগুলি মানুষের মূর্তি! জন্তুগুলির গন্ধ শরাবের মতোই মিষ্টি আর গাঢ় যেনো। কখনো কখনো একেকটি উপ তার গা নাড়ে, যার আকৃতি চারপাশের আঁধারের দরুন বোঝা যাচ্ছে না, তারপর সে ঘাড় তোলে এবং নাকে একটা শব্দ করে রাতের বায়ূতে শ্বাস নেয়; মনে হলো যেনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছেঃ এভাবে আমি জীবনে প্রথম শুনলাম উটের দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ। একটি ভেড়া আস্তে আস্তে ডাকছে-একটা কুকুর গরগর করে উঠছে এবং সেই সংকীর্ণ পথটির বাইরে রাত সর্বত্রই অন্ধকার আর তারকাহীন।

এরি মধ্যে দেরি হয়ে গেছে। আমাকে ষ্টেশনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমি খুবই ধীরে ধীরে আগাতে থাকি সেই পথ দিয়ে, যে পথ দিয়ে আমরা এসেছিলাম- হতবুদ্ধি এবং বিস্ময়করভাবে বিচলিত-যেনো অমন একটি রহস্যজনক অভিজ্ঞতায় আমি হতবুদ্ধি এবং বিচলিত যা আমার হৃদয়ের একটি কোণকে আচ্ছন্ন করেছে এবং আমাকে আর যেতে দেবে না! ট্রেন আমাকে নিয়ে যায় সিনাই মরুভূমির মধ্য দিয়ে। মরুভূমির রাতের ঠাণ্ডা, আর ঢিলা বালুর উপর বসানো রেল লাইনের উপর দিয়ে চলা গাড়ীর ধাক্কা আর ঝাঁকুনিতে আমি ক্লান্ত, নির্ঘুম। আমার উল্টা দিকে বসেছে এক বেদুঈন, তামাটে রঙের বিশাল আবায় গায়ে দিয়ে। সেও ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলো-পাগড়ির কাপড় দিয়ে সে ঢেকে নিায়েছে মুখ। পায়ের উপর পা রেখে সে পদ্মাসন করে বেঞ্চির উপর বসেছে, আর তার কোলের উপর পড়ে আছে রূপার কাজ করা খাপে ঢাকা একটা বাঁকা তলোয়ার। প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। বাইরে বালিয়াড়ির আর ক্যকটাস বনের রূপরেখা দেখতে পাচ্ছি আমি।

এখনো আমার মনে পড়ছে কেমন করে সেদিন ভোর হয়েছিলো-ধূসর কালো ছবি এঁকে, ধীরে ধীরে রূপরেখা অংকন করে- এবং কেমন করে তা বালিয়াড়িগুলিকে অন্ধকার থেকে তুলে তৈরি করছিলো কতকগুলি জমাট স্তূপ-বিশার এবং সাঞ্জস্যপূর্ণ। ক্রমে ফুটে-ওঠা আধো আলোতে দেখতে পেলাম কতকগুলি তাঁবু, দেখতে দেখেতে সেগুলিও হারিয়ে গেলো পেছনে এবং তার নীচে দেখলাম, বাতাসে ছড়ানো কুয়াশার জালের মতো জেলেদের জাল, দূরে দূরে গাড়া খুঁটির সংগে বেঁধে মাটির উপর ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে শুকানোর জন্যঃ মরুভূমিতে মাছ ধরার জাল, ভোরের বাতাসে দুলছে, যেনো স্বপ্নের পর্দা দিন আর রাত্রির মধ্যে, স্বচ্ছ, অবাস্তব।

ডানদিকে মরুভূমি- বাঁদিকে সমুদ্দুর। সমুদ্দুরের উপকূলে দেখলাম একাকী এক উট চালককে। সম্ভবত সে সারারাত উটের উপর সওয়ার ছিলো। মনো হলো, এখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে গাদির উপর গা এলিয়ে দিয়ে-এবং ওরা দুজনে, উট চালক এবং উট, উভয়ই দোল খাচ্ছে একই ছন্দে। আবার নজরে পড়ে বেদুঈনদের কালো তাঁবু; মেয়েরা এরি মধ্যে তাঁবু থেকে বের হয়ে পড়েছে মাটির কলস মাথায় নিয়ে কুয়াতে যাবার জন্য তৈরি হয়ে। আধো-আধো আলো স্পষ্টতরো হয়ে উঠছে আর সেই আলোর মধ্যে জেগে উঠছে একটি সুস্পষ্ট জগৎ যেনো অদৃশ্য তাগিদে চালিত হয়ে-যা কিছু সহজ সরল এ বিস্ময় যেনো তারি থেকে উদ্ভুত এবং এর যেনো শেষ নেই!

স্থূল থেকে স্থূলতরো রশ্মিতে সূর্য ছড়িয়ে পড়ছে বালুরাশির উপর আর ভোরের ধূসরাত বিস্ফুরিত হলো নারাংগি-সোনালি বর্ণের আতশবাজি হয়ে। আমরা ছুটে চলেছি আল আরশি নামক ওয়েসিসে মধ্যে দিয়ে। দুপাশের সারি সারি পাম তরু, পাম শাখা হাজার হাজার সূক্ষ্ণগ্র বর্শার মতো দাঁড়িয়ে আছে দু’ধারে আলোছায়ায় সৃষ্টি হয়েছে বাদামী –সবুজ জালির যেনোঃ এরি মদ্যে ছুটে চলেছি আমরা। আমি দেখতে পেলাম, একটি মেয়ে, মাথায় একটি ভরা কলসী চাপিয়ে ফিরে আসছে কুয়া থেকে, তারপর পাম গাছের নীচে দিয়ে চলা একটি পথ ধরে আগাচ্ছে। মেয়েটির পরনে লাল আর নীল মেশানো একটি পোশাক, লম্বা তার ঝুল-মনো হলো, ও যেনো উপকথার এক সম্ভ্রন্ত রমণী!

আল-আরিশের পাম বাগিচা যেমন আকস্মিক নজরে পড়লো তেমনি দ্রুত তা আড়াল হয়ে গেরো চোখের। এখন আমরা সফর করছি শাঁখ-রঙ আলোর ভিতর দিয়ে। বাএর কাঁপতে থাকা জানালার সার্শিগুলি, ওপাশে অমন একটা নীরবতা জেঁকে আছে যা আমি কখনো সম্ভব বলে ভাবতেও পারিনি। যতো রূপ আর গতিবিধি  নজড়ে পড়লো, মনো হলো কোনোটিরই যেনো গতকাল বা আসছে কাল বলে কিছু নেই, ওগুলি যেনো ওখানেই জমানো রয়েছে ইচ্ছাকৃত অনন্যতায়। দেখতে পেলাম নরম মোলায়েম বালু, বাতাস সেই বালুকে রূপান্তরিত করেছে নরম নরম বালু-টিলায়, যা সূর্যের নীচে খুব পুরোনো পার্চমেন্টের মতোই দীপ্তি পাচ্ছে স্নান কমলালেবুর রঙে-তবে, পার্চমেন্টের চাইতে কিছুটা নরম কেবল, আর ভাঙতি ও বাঁকুগুরিতে তা কম ভঙুর-টিলার চূড়ায় চূড়ায় বারু আঘাত করছে, বীণাযন্ত্রে তীক্ষ্ণ সুনির্দিষ্ট আঘাতের মতো, টিলাগুলির পার্শ্বদেশ অপরিসীম কোমল, যার অগভীর গর্ত ও ভাঁজগুলিতে পড়েছে স্বচ্ছ জল রঙ ছায়া-রক্তবর্ণ, হালকা নীল, রক্তিমাত, আর মর্চের মতো ফ্যাকাশে লাল রঙ। দুধের মতো উজ্জ্ব সাদা মেঘ, এখানে ওখানে ক্যাকটাস ঝোঁপ এবং কখনো লম্বা শাখাবিশিষ্ট শক্ত ঘাস নজরে পড়লো। দু-একবার আমি দেখলাম হালকা-পাতলা খালি পা বেদুঈনদেরকে এবং পাম শাখা বোঝাই এক উটের কাফেলাকে, যা তারা এক জায়গা থেকে নিয়ে চলেছে আরেক জায়গায়। মহৎ প্রাকৃতিক দৃশ্যে আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি!

কয়েকবারই আমরা থামি ছোটো স্টেশনগুলিতে, যা সাধারণত কাঠ আর টিনের তৈরি কতিপয় ব্যারাক ছাড়া আর কিছুই নয়। তামাটে রঙের, ছেঁড়া কাপড় পরা ছেলেরা ঝুড়ি নিয়ে ছুটাছুটি করছে, জলপাই, পুরা সিদ্ধ আণ্ডা আর মাছ এবং চেপটা আটার পাউরুটি বিক্রির জন্য হাঁকছে। আমার বিপরীতদিকে যে বেদুঈন বসেছিলো সে তার মাথার পাগড়ি খুলে পরে জানালাটা খুলে দিলো। তার মুখখানা পাতলা, বাদামী, তীক্ষ্ণ-সেই বাজপাখীর মুখ,যা সব সময়ই নিবিষ্টভাবে চেয়ে থাকে সামনের দিকে। সে একটি কেক কেনে এবং মোড় ফিরে বসার উপক্রম করে; এমন সময় তার নজর পড়ে আমার উপর এবং কোনো কথা না বলেই সে কেকটি ভেংগে দুটুকরা করে অর্ধেকটা আমার দিকে আগিয়ে দেয়। কিন্তু ও যখন দেখরো আমি ইতস্তত ও বিস্ময় বোধ করছি, ও হেসে ফেললো এবং আমি দেখতে পেরাম সেই কোমল হাসিটি তার মুখে এবং তার মুহূর্তকাল আগেকার অভিনিবেশেরর সাথে মানিয়েছে চমৎকার; সেই কোমল হাসি হেসে সে অমন একটি শব্দ উচ্চারণ কররো যা তখন আমি বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝতে পারি; সে বললো ‘তফদ্দল’- ‘আমাকে অনুগৃহীত করুন’। আমি কেকের টুকরাটি নিলাম এবং মাথা নেড়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম।আরেকজন মুসাফির, তার মাথায় একটি লাল ফেজ টুপি, এ ছাড়া তার বাকী সক কাপড়-চোপড়ই ইউরোপীয়, মনে হলো লোকটি একজন ছোটো- খাটো ব্যবসায়ী, অযাচিতভাবে সে দোভাষীর দায়িত্ব গ্রহণ করলো। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বললো-

-‘সে বলে,তুমি মুসাফির, সে-ও মুসাফির। তার পথ এবং তোমার পথ একই।’

এখন যখন আমি সেই ছোটো ঘটনাটির কথা ভাবি, আমার মনেহয়, আরব চরিত্রের প্রতি আমার পরবর্তী সকল প্রেমের মূলে হয়তো পড়েছে এরি প্রভাব। কারণ, এই যে, বেদুঈনটি অপরিচয়ের অতো সব বাধা সত্ত্বেও সফরে এক আকস্মিক সহাযাত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব উপলব্ধি করেছে-এবং তার সংগে রুটি ভাগ করে খেতে চাইছে, তার আচরণে আমি এরি মধ্যে এক ভারমুক্ত মনুষ্যত্বের বিশ্বাস ও পদক্ষেপ অবশ্যি অনুভব করে থাকবো!

এর কিছুক্ষণ পরেই পথে পড়লো পুরোনো গাজা শহর, যেনো একটা মাটির কিল্লা, তার বিস্তৃতত জীবন কাটাচ্ছে একটি বালু-পাহাড়ের উপর, ফণিমনসার প্রাচীরের মধ্যে। আমার বেদুঈন সংগীটি তার বোঝার থলেগুলি জমা করে গম্ভীর হাসির সাথে আমাকে সালাম জানালো, তারপর ঘাটির উপর লুটিয়ে পড়া কাপড়ের প্রান্ত দিয়ে বালুতে ঝাড়ু দিতে দিতে গাড়ী থেকে নেমে পড়লো। বাইরে প্লাটফর্মে আরো দুজন বেদুঈন দাঁড়িয়েছিলো, ওরা তার সাথে হাত মোসাফা করে এবং তার দু’গালে চুমু খেয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।

ইংরেজি বোলনেওয়ালা ব্যবসায়ীটি তার হাত রাখলো আমার বাজুর উপর, বললো ‘আমার সাথে আসুন। এখানে পনেরো মিনিট সময় আছে।’

স্টেশন ঘরের ওপাশে একটি কাফেলা তাঁবু খাটিয়েছে। আমার সাথী আমাকে জানালো-ওরা উত্তর হিজাযের বেদুঈন, ওদের মুখমণ্ডল বাদামী রঙের, ধূলি-ধূসর, আর বুনো আবেগে উত্তপ্ত। আমাদের বন্ধুটি গিয়ে দাঁড়ালো ওদের মাঝে। মনে হলো, ও বেশ কিছুটা মান্যগণ্য ব্যক্তি, কারণ ওরা সবাই ওকে ‍ঘিরে অর্ধ-বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলো এবং ওর প্রশ্নাদির জবাব দিতে লাগলো। ব্যবসায়ীটি ওদের সাথে কথা বলে। তখন ওরা আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আমাদের শহরে জীবনের কথা ভেবে ওরা বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে.. . আমার মনে হলো, কতকটা গর্বিত উন্মসিকতার সংগেই যেনো আমাদের দিকে তাকালো। ওদেরকে ঘিরে রয়েছে একটি আযাদীর পরিবেশ, একটি মুক্ত আবহাওয়া। ওদের জীবনকে বুঝবার জন্য আমার মনে একটা তীব্র খায়েশ জাগলো। বাতাস শুকনা ও শিহরণ-জাগানো; মনে হলো, শরীর ভেদ করে যেনো সে বাতাস আমার ভেতর ঢুকছে। এই আবহাওয়ায় যেনো সমস্ত কাঠিন্যের গেরো খুলে যায়, সমস্ত চিন্তা হয়ে পড়ে এলোমেলো, অলস আর নিশ্চল! এর মধ্যে অমন একটা সময়হীনতা রয়েছে, যাতে প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি ঘ্রাণ একেকটি সুনির্দিষ্ট নিজস্ব মূল্যের রূপ ধারণ করে। ক্রমে আমার এ উপলব্ধি হলোঃ মরুভূমির পরিবেশে যেসব বেদুঈন বাস করে তারা জীবনকে নিশ্চয়ই অন্য সকল অঞ্চলের মানুষের চেয়ে একেবারে আলাদভাবে দেখে, অনুভব করে; যে-সব অরসেসন ও স্বপ্ন অধিকতরো ঠাণ্ডা ও সম্পদশালী অঞ্চলের বাসিন্দাদেরই বৈশিষ্ট্য, ওরা নিশ্চয়ই সেগুলি থেকে মুক্ত এবং সম্ভবত বহু স্বপ্ন থেকেও, এবং নিশ্চয়ই তাদের বহু রুটি থেকেও! ওরা যেহেতু ওদের নিজের অনুভূতিরই উপর অন্তরংগতরোভাবে নির্ভর করে, তাই ঐ সব মরুবাসী অবশ্যি জাগতিক সকল বস্তুর জন্যই স্থির করে সম্পূর্ণ আলাদা মূল্যমান।

হয়তো এ ছিলো আমার নিজের জীবনেরই ভাবী বিপ্লবের পূর্বাভাস-যা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো এক আরব দেশে, সেই পয়লা দিনটিতে বেদঈনদের দৃশ্যে, -এমন এক জগতের পূর্বাভাস, যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় অমন কোনো সীমা নেই, অথচ যা রূপহীন নয়ঃ যে জগত নিজেতেই নিজ পূর্ণ-এবং তা সত্ত্বেও, সবদিক দিায়েই উন্মুক্তঃ এমন এক জগৎ যা কিছুদিন পরেই হয়ে উঠলো আমার নিজের জগৎ! একথা ঠিক নয় যে, ভবিষ্যতে আমার ভাগ্যে কী রেখেছে সে সম্বন্ধে আমি তখন সচেতন ছিলাম; নিশ্চয়ই নয়। বরং এহচ্ছে সেই অনুভূতি যখন আ্পনি, জীবনে পয়লা এক অপরিচিত বাড়িতে ঢোকেন এবং অর্ধ পথে একটি অনির্দেশ্য গন্ধে আপনাকে অস্পষ্ট আভাস দেয়, যা- কিচু সে ঘরে ঘটবে সে সবের- যা ঘটবে আপনাকেই কেন্দ্র করে এবং সেগুলি যাদি আনন্দের হয়, আপনি অনুভব করবেন আপনার হৃদয় যেনো আকস্মিক হর্ষের ছুরিতে বিদ্ধ হয়েছে-এবং এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক-অনেক পরেও আপনার তা মনে পড়বে এবং আপনি মনে মনে বলবেন, আমি তো বহু আগে, ঠিক এভাবেই-অন্য কোনো রূপে নয়, এ সমস্তের আভাস পেয়েছিলাম সেই হল ঘরে, সেই পয়লা মুহূর্তেই-সেই পয়লা মুহূর্তেই!

দুই

মরুভূমির উপর দিয়ে বয়ে যায় তীব্র হাওয়া, আর মুহুর্তের জন্য জায়েদ ভাবে, আমরা আরেকটা বালু- ঝড়ের সম্মুখীন হতে চলেছি। বালু-ঝড় এলো না বটে, কিন্তু হাওয়া আমাদেরকে রেহাই দিলো না-আমাদেরকে অনুসরণ করতে লাগলো নিয়মিত দমকা বায়ুর রূপে এবং আমরা যখন এক বালু উপত্যকায় নামি তখন সেই বাতাসের ঝাপটাগুলি এক হয়ে বয়ে যেতে লাগলো এক নিরবচ্ছিন্ন শন শন ধ্বনিরূপে। উপত্যকার মাঝখানটাতে পাম গাছে ভরা একটি গাঁ, কটি আলাদা বস্তি নিয়ে আর প্রত্যেকটি বস্তি মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা-গাঁটি ঘূর্ণি বায়ূতে উড়ানো ধুলা-বালুতে প্রায় ঢাকাই পড়ে গেছে।

এলাকাটি যেনো বাতাসের একটি গুহাঃ হররোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বায়ু এখানে তার সবল ডানা দিয়ে ক্রমাগত ঝাপটা মারে, রাতের বেলা চুপ করে থাকে এবং পরদিন আবার নতুন শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে। বাতাসের এই বিরামহীন আঘাতে নুয়ে –পড়া পাম গাছগুলি যতোটুকা উচু হওয়া উচিত ততো উচু হতে পারে না,-বাধাগ্রস্তই থেকে যায়, জমিনের কাছাকাছি চারদিকে শাখা প্রসারিত করে। এসব পাম গাছের জন্য সবসময়ই রয়েছে চারিদিকে আগিয়ে আসা বালিয়াড়ির ভয়। প্রতেকটি মেওয়া বাগিচার চারপাশে গাঁর লোকেরা সারি সারি তামারিস্ক না লাগালে গা’টি অনেক আগেই  বালুতে ডুবে যেতো।  এই লম্বা গাছগুলির প্রতিরোধ- ক্ষমতা পাম গাছের চাইতে বেশি। এ সব গাছ, বস্তিগুলির চারপাশে তাদের মজবুত কাণ্ড এবং মর্মর-ধ্বনি  জাগানো চিরহরিৎ শাখা দিয়ে তৈরি করে একটা জীবন্ত দেয়াল আর ওদেরকে দেয় একটা অনিশ্চিত নিরাপত্তা।

আমরা গাঁ’ ‘আমিরে’র মাটির ঘরের কাছে অবতরণ করি- ইচ্ছাঃ বিকালের এই গরমে এখানে আমরা একটু বিশ্রাম নেবো। মেহমানদের অভ্যর্থনার জন্যে যে ‘কাহওয়া’ নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে তা উন্মুক্ত এবং তাতে রয়েছে দারিদ্রের চিহ্ন। কফি জ্বাল দেয়ার পাথুরে চুলার সামনে রয়েছে কেবল একটি খড়ের মাদুর। কিন্তু স্বভাবতই আরবের মেহমানদারির কাছে সব রকমের দারিদ্রই হার মানে- কারণ, মাদুরের উপর আমরা বসতে না বসতেই চুলায় ডালপালা গুঁজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো; সদ্য-ভাজা কফির দানাগুলি তামার যে হামানদিস্তার গুঁড়া করা হচ্ছে তার ঝনঝন শব্দ কামরাটাকে দেয় একটা বাসের উপযোগী বৈশিষ্ট্য; আর সমস্ত বড়ো একটা থালায় স্তূপীকৃত হালকা বাদামী রঙের  খেজুর ক্ষুধা দূরে করে মূসাফিরদের।

আমাদের মেজবান ছোট্ট হালকা-পাতলা এক বৃদ্ধ, বেতো, মিটমিটে চোখ, গায়ে কেবল একটি সূতী কাপড় আর মাথায় পাগড়ি- আমাদেরকে এতে শরীক হওয়ার জন্য আহবান করেনঃ

-‘আল্লাহ আপনাদের হায়াত দরাজ করুন। এ বাড়ি আপনাদের বাড়ি। আল্লাহর নামে খান। আমাদের কেবল এ-ই আছে’- আর তিনি তাঁর হাত দিয়ে একটি ওজরখাহীর ভংগি করেন, একটি মাত্র ভংগি- আর তার ভাগ্যের সমস্ত ভার ব্যক্ত হয় মানুষকে সম্বোধন করার সেই অকৃত্রিম শক্তিতে, যা সেইসব জাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যারা সহজ অনুভূতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখে জিন্দেগী ওজরান করে- তবে খেজুরগুলি মন্দ নয়, খান হে মুসাফিরেরা, আমাদের সাধ্যমতো যা দিতে পারছি,,,,,,।‘

সত্যি, আমি জীবনে যতো উৎকৃষ্ট খেজুর খেয়েছি এ খেজুর তারি মধ্যে গণ্য হবার যোগ্য আর আমাদের মেজবানও স্পষ্টই খুশি আমাদের খিদায়, যা তিনি মেটাতে সক্ষম! তিনি আবার শুরু করেনঃ

-‘বাতাস…. বাতাস…. আমাদের জীবনকে এ করে তোলে কঠোর, কষ্টময়; কিন্তু আল্লাহরই মর্জি! আমাদের গাছ-গাছড়াগুলিকে ধ্বংস করে দেয় বাতাস। এগুলি যাতে বালূতে ঢাকা না পড়ে এজন্য হামেশাই আমাদেরকে লড়াই করতে হয়। অবশ্য সব সময়ই যে এমনটি ছিলো তা নয়। আগেকার দিনে এতো বাতাস এখানে ছিল না, আর তখন গাঁ’টা ছিলো বড়ো আর সমৃদ্ধিশালী। কিন্তু এখন গাঁ’টা ছোটো হয়ে গেছে। আমাদের তরুণদের অনেকেই এখান থেকে চলে যাচ্ছে- কারণ, সবাই এ ধরনের জীবন বরদাশত করতে সক্ষত নয়। দিনে দিনে বালূ ক্রমেই চারদিকে ঘেরাও করে ফেলছে আমাদেরকে। বেশি দিন নেই যখন আর এ পাম গাছগুলির জন্য কোনো জায়গাই থাকবে না। এই বাতাস…. কিন্তু আমরা নালিশ করি না। আপনারা জানেন নবী- তাঁর উপর আল্লাহর রহমত হোক- আমাদেরকে বলেছেন- ‘আল্লাহ বলেন, নিয়তিকে তিরস্কার করো না, কারণ জেনে রাখো আমিই নিয়তি….।

খুব সম্ভব  আমি চমকে উঠেছিলাম- কারণ বৃদ্ধ তাঁর কথা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগের সাথে তাকালেন আমার দিকে, যেনো আমি কেন চমকে উঠেীছ তা বুঝতে পেরে তিনি স্মিত হাসলেন। অনেকটা যেনো রমণীর মুখের হাসি- সেই ক্লান্ত জরাজীর্ণ মুখে সে হাসি দেখতে অদ্ভুত ঠেকলো। বৃদ্ধ মৃদু স্বরে, যেনো অনেকটা স্বাগত, আবার বলেনঃ

‘জেনে রাখো আমিই নিয়তি’- তাঁর কথার সংগে তাঁর মাথা যেভাবে আন্দোলিত হলো তাতেই ব্যক্ত হলো জীবনে তাঁর নিজের স্থানের গর্বিত স্বীকৃতি। অতটুকু  প্রশান্তি আর নিশ্চয়তার সংগে বাস্তবের এরূপ স্বীকৃতি জীবনে আমি কখনো দেখিনি, এমনকি সুখী মানুষের মধ্যেও নয়। তিনি শূন্য একটি বৃত্ত রচনা করেন বাহু অনেক প্রসারিত করে অস্পস্টভাবে; যেনো অনেকটা ইন্দ্রিয়াসক্তিরাই দ্যোতক তাঁরা বাহুর আন্দোলন।

এমন একটি বৃত্ত তিনি আঁকলেন বাহু প্রসারিত করে যার মধ্যে মানুষের এই জীবনের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই পড়েঃ দরিদ্র, অন্ধকার ঘর, বায়ূ আর তার চিরন্তন গর্জন, বালুর অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি, সুখের বাসনা আর যা অপরিবর্তনীয় তার কাছে আত্মসমর্প; খেজুর-ভর্তি থালা, চির-হরিৎ ঝাউ গাছের প্রাচীরের আড়ালে বেঁচে থাকার জন্য ফল- বাগিচাগুলির সংগ্রাম; চুলায় ধরানো আগুন ওপাশে উঠানের কোথাও কোনো এক তরুনীর হাস্যঃ এবং আমি এই সমস্তর মধ্যে, এর যে অংগভংগী ও সংকেত এসবকে জবিন্ত ও একত্র করেছে তাতে এমন এক বলিষ্ঠ আত্মার সংগতি শুনতে পেলাম যা কোনো অবস্থাকেই বাধা বলে জানে না, যা নিজের মধ্যেই শান্ত।

আমি আবার ফিরে যাই, অনেক আগে, দশ বছর পূর্বে জেরুজালেম, শরৎকালে সেই দিনটিতে, যখন আরো একজন বৃদ্ধ আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের কথা, মানুষ যে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই কেবল পারে আল্লাহর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থাপন করতে, আর এভাবে, নিজের নিয়তির সাথেও।

সেই শরৎকালে, আমি ছিলাম আমার মামা ডোরিয়ানের বাড়িতে- পুরানা জেরুজালেম নগরীর ঠিক মাঝখানে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছিলো- ফলে আমি বাইরে বেশি যেতে পারছিলাম না। প্রায়ই আমি জানালায় বসে থাকতাম; বাড়ির পেছনের মস্ত বড়ো একটা উঠানের দিকে সেই জানালাটা থাকতো খোলা। উঠানটি ছিলো বৃদ্ধ এক আরবের; লোকে তাকে ‘হাজী’ বলতো- কারণ, তিনি মক্কায় হজ্জ্ব করেছিলেন। তিনি সওয়ারি আর মাল বহনের জন্য গাধা ভাড়া খাটাতেন। কাজেই তাঁর উঠানখানা হয়ে উঠেছিলো একটা সরাইখানার মতো।

রোজ সকালে সুরুজ ওঠার আগেই উট- বোঝাই করে শাক-সব্জি, তরি-তরকারি ও ফলমূল আনা হতো আশ-পাশের গ্রামাঞ্চল হতে; তারপর সেগুলি গাধার পিঠে চাপিয়ে শহরের বাজারে চিপা গলিপথে পাঠিয়ে দেয়া হতো। দিনের বেলা দেখতাম উটের বিশাল ভারি দেহগুলি মাটির উপর বিশ্রাম করছে; লোকজন হামেশা হৈ হল্ল করে উট আর গাধাগুলির দেখ-শোন করছে, তত্ত্ব-তালাবি নিচ্ছে, অবশ্য মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ওরা বাধ্য হয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতো  আস্তাবলে। উট আার গাধা চালক এই লোকগুলি ছিলো দরিদ্র আর ওদের গায়ে দেখতাম ছেড়া জামা-কাপড়; কিন্তু চাল-চলনে আর আচরণে ওদের তুলনা করা চলে মুক্ত-স্বাধীন নৃপতিদের সাথে। যখন ওরা একত্রে কেতে বসতো জমিনের উপরে আর আটার তৈরী চেপ্টা রুটি খেতো সামান্য পনীর বা দু’চারটি জলপাই-এর সাথেম আমি তাদের আচরণের আভিজাত্য ও স্বতঃস্ফুর্ততার এবং তাদের হৃদয়ের প্রশান্তির প্রশংসা না করে পারতাম না। আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম- ওরা নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সকল বস্তুকেও ওরা শ্রদ্ধা করে। হাজী সাব একটি ছড়ি ভর করে পায়চারী করতেন, কারণ, তিনি ছিলেন বাতের রোগী, আর তাঁর হাঁটু গিয়েছিলো ফুলে, ওদের মধ্যে এক রকম সর্দার ছিলেন তিনি-। দেখতাম, ওরা কোনো আপত্তি না করেই ওর কথা শুনছে। দিনে কয়েকবার তিনি ওদেরকে জমায়েত করতেন সালাতের জন্য, আর বৃষ্টি না হলে ওরা খোলা জায়গায়ই সালাত আদায় করতো। ওরা সব ক’জন একটিমাত্র লম্বা কাতারে দাঁড়ায় এবং তিনি ওদের ‘ইমাম’  হিসাবে দাঁড়ানের ওদের সম্মুখে। সালাতে নিখুঁৎ অংগ সঞ্চালনের দিকে দিয়ে ওরা যেনো সৈনিক, ওরা একই সংগে মক্কার দিকে মুখ করে মাথা নীচু করে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে এবং জমিনের উপর কপাল ঠেকায়। মনে হতো ওরা যেনো ইমামের মুখের অশ্রুত শব্দগুলি অনুসরণক করছে,- ইমাম, যিনি সিজদা থেকে উঠে আবার সিজদায় যাওয়ার আগে নগ্ন পায়ে দাঁড়ান জায়নামাজের উপর, তাঁর চোখ বোঁজা, হাত দু’টি ভাঁজ করে বুকের উপর রাখা, নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ছেন, স্পষ্টই  তনি গভীর ধ্যানে সমাহিতঃ আমি দেখতাম, তিনি তাঁর সমগ্র আত্মা দিয়ে প্রার্থনা করছেন!

এ ধরনের একটি প্রকৃত প্রার্থনার সাথে, প্রায় যান্ত্রিক অংগ সঞ্চালনের যোগ দেখে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি এবং একদিন ‘হাজী’ সাবকে,  যিন কিছু ইংরেজি বোঝেন, জিগগাস করিঃ

-‘আপনারা কি সত্যি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ চান আপনারা বারবার নুয়ে হাঁটু গেড়ে সিজদা করে তাঁর প্রতি আপনাদের ভক্তি দেখাবেন? এর চেয়ে কি নিজের দিকে তাকানো এবং নিজের অন্তরের নিভৃতে তাঁর প্রতি প্রার্থনাই উত্তম নয়? আপনাদের এ ধরনের অংগ সঞ্চালনের কারণ কি?

কথাগুলি মুখ থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমার অনুশোচনা হলো, কারণ, এই বৃদ্ধ লোকটির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার ইচ্ছা আমার ছিলো না। কিন্তু ‘হাজী’ সাবকে মোটেই আহত মনে হলো না। তাঁর দন্তহীন মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো, তিনি বললেনঃ

-‘তাহলে, এ ছাড়া আমরা আর কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করবো? তিনি কি দেহ আর আত্মা, দু’ই এক সংগে সৃষ্টি করেননি? শুনুন, আপনাকে বলছি, আমরা মুসলমানরা যেভাবে প্রার্থনা করি কেবল, সেইভাবেই প্রার্থনা করে থাকি, অন্যভাবে করি না। আমরা কাবা’র দিকে মুখ করে দাড়াই, মক্কায় অবস্থিত আল্লাহর পবিত্র ঘরের দিকে, এ সত্য উপলব্ধি করে যে দুনিয়ার সকল মুসলমানেরই মুখ- সে যেখানেই থাকুক না কেন- প্রার্থনায় এই ঘরের দিকেই ফেরানো হয়, আর আমরা সকলে মিলে একটি মাত্র দেহের শামিল এবং আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের ধ্যান-ধারণার কেন্দ্র। প্রথম আমরা সরল সোজা হয়ে দাঁড়াই এবং পাক কুরআন থেকে তিলাওয়াত করি, একথা মনে রেখে যে, এ হচ্ছে তাঁরই কালাম, মানুষকে দেয়া হয়েছৈ যাতে সে জীবনে সরল, ন্যায়পরায়ণ ও অটল হতে পারে, তারপরে আমরা বলি, আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা আমরা নিজেদের একথা স্মরণ করিয়ে দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই যে আমাদের উপাস্য হতে পারে। একথা বলার পরে আমরা গভীরভাবে নুয়ে পড়ি, কারণ আমরা তাঁকে সম্মান করি সকলের উপরে এবং তাঁর শক্তি ও মহিমার প্রশংসা জ্ঞাপন করি। এরপর আমরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জমিনে কপাল ঠেকাই, কারণ, আমরা উপলব্ধি করি যে, তাঁর সম্মুখে আমরা ধূলিকণা মাত্র এবং আমরা কিছুই না- আর তিনি আমাদের স্রষ্টা, লালন-পালনকর্তা। এরপর আমরা জমিন থেকে আমাদের মাথা তুলি আর স্থির হয়ে বসি, আর প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদের পাপ ক্ষমা করে দেন, আমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, আমাদের সোজা-সরণ পথে পরিচালনা করেন; এবং আমাদেরকে স্বাস্থ্য ও রিযিক দেন- তারপর আবার আমরা সিজদায় যাই, এক আল্লাহর মহিমার সম্মুখে ধূলিতে আমাদের কপাল ঠেকাই। এরপর আবার স্থির হয়ে ব সি, আর প্রার্থনা করি যেনো তিনি, নবী মুহাম্মদ, যিনি আল্লাহর বানী আমাদের কাছে এনে দেন তাঁর প্রতি রহমত করেন, যেমন তিনি রহমত করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদেরকেঃ আমরা প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদেরকে এবং যারা সত্য পথে চলে তাদের সকলকে রহমত করেন; আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেনো তিনি আমাদেরকে ইহজগতের কল্যাণ এবং পরকারের কল্যাণ- দু’ই দান করেন। সবার শেষে আমরা আমাদের মাথা ডানদিকে এবং বামদিকে ঘুরাই- এবং বলি, তোমাদের সকলের উপর আল্লাহর শান্তি আর রহমত বর্ষিত হোক, এবং এভাবে যাঁরা সৎকর্মপরায়ণ, যেখানেই তাঁরা থাকুক না কেন তাঁদের সকলের প্রতি আমরা জানাই অভিবাদন।

এভাবেই আমাদের রাসূল (স) সালাত আদায় করতেন এবং এভাবেই সর্বকালে সালাত সম্পাদনের জন্য তিনি তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন, যাতে তারা স্বেচ্ছায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে, আর ইসলামের অর্থ এ-ই এবং এভাবেই তাঁর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থপন করতে পারে আর তাদের নিজেদের নিয়তির সংগেও।

অবশ্য বৃদ্ধ লোকটি হুবহু এই শব্দগুলি ব্যবহার করেননি- কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন তার অর্থ হলো এ-ই এবং এভাবেই আমি এগুলি স্মরণ করে থাকি। কয়েক বছর পর আমি বুঝতে পেরেছিলাম ‘হাজী’ সাব তাঁর এই ব্যাখ্যা দ্বারাই ইসলামের দরোজা পয়লা খুলে দিয়েছিলেন আমার জন্য। তা সত্ত্বেও আমি, ইসলাম আমার নিজের ধর্ম হয়ে উঠতে পারে এ চিন্তা আমার মনে প্রবেশ করারও বহু আগে এক দীনতা অনুভব করতে শুরু করেছিলাম- যখনি দেখতাম, যেমন দেখতাম প্রায়ই- একজন লোক নাঙ্গা পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তার জায়নামাযের উপর, কিংবা খড়ের মাদুরের উপর- বুকের উপর হাত দু’টি ভাঁজ করে রেখে, মাথা নীচু করে সম্পুর্ণভাবে নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে, তার চাপাশে যা ঘটছে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে- সে মসজিদের ভেতরেই হোক, অথবা কর্মব্যস্ত কোনো রাস্তার ফুটপাতেই হোকঃ একজন মানুষ যার নিজেকে নিয়ে কোনো নালিশ নেই- শান্ত এবং তৃপ্ত!

*         *            *          *          *          *

মামা ডোরিয়ান আমাকে যে ‘আরব পাথুরে ঘরের’ কথা লিখেছিলেন তা ছিলো সত্যি আনন্দদায়ক। বাড়িটি ছিলো’ প্রাচীন নগরীর’ কিনারে, ‘জাফা-দরোজার’ কাছে। এর প্রশস্ত, উঁচু সিলিং-বিশিষ্ট কোঠাগুলি, অতীতের বিভিন্ন জামানায় যেসব অভিজাত এখানে বসবাস করতেন, তাঁদেরই স্মৃতিতে যেনো ভারাক্রান্ত- আর এর দেয়ালগুলির নিকটবর্তী বাজার থেকে ভেঙে- পড়া জীবন্ত বর্তমানের স্পন্দনে স্পন্দিত। আর সে সব দৃশ্য, ধ্বনি আর গন্ধ এমনি যার সংগে আমার অতীতের অভিজ্ঞতার কোনো মিলই নেই।

ছাতের চত্বর থেমে আমি দেখতে পেলাম- সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত প্রাচীন নগরীর এলাকা- জালের মতো ছড়ানো তার অনিয়মিত পথ-ঘাট আর পাথরে খোদাই অলি-গলিসহ। অপর প্রান্তে রয়েছেন, বিশাল বিস্তৃতির বিচারে অনেক কাছে, সুলায়মানের মসজিদ-এলাকা, আর রয়েছে একেবারে শেষ সীমানায় মসজিদুল আকসা’ যা মক্কা মদীনার পরেই সবচেয়ে পবিত্র গণ্য, আর ঠিক মাঝখানটায় রয়েছে, ‘পাথুরে গম্বুজ’। তার ওপাশে প্রাচীন পবিত্র নগরীর দেয়ালগুলি প্রসারিত রয়েছে কিদরণ উপত্যকার দিকে আর উপত্যকার ওপাশে জেগে উঠেছে মোলায়েম মসৃণ লতা-পাতাশূণ্য পাহাড়- কেবল পাহাড়ের ঢালুগুলিই এখানে-ওখানে জলপাই গাছের দ্বারা চিহ্নিত। পূর্বদিকে এর চেয়ে কিছুটা উর্বরতার চিহ্ন মেলে; ওদিকেই দেখতে পেলাম একটা বাগিচা, ঢালু হয়ে নেমে এসেছে রাস্তার দিকে, গাঢ় সবুজ সে বাগিচা আর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটি হচ্ছে ‘জেথসিমেনের উদ্যান’। এরি মধ্য থেকে একদিকে জলপাই ও অপরদিকে সাইপ্রেস গাছের মধ্যে সোনালী, পেঁয়াজের আকারের রুশ গির্জার গম্বুজগুলি ঝলমল করছে।

এ যেনো, কিমিয়াগরের বক- যন্ত্রে আন্দোলিত কম্পিত ঢালাই তরল পদার্থ, পরিস্কার অথচ অবর্ণনীয়, হাজারো রঙে বিচিত্র, যা শব্দের অতীত, এমনকি, চিন্তারও আয়ত্তাতীত। এ রকমই আমার মনে হতো জলপাই পর্বত থেকে জর্ডান উপত্যকা আর মৃত-সাগরকে। ঢেউ- খেলানো পাহাড় আর দুগ্ধ-শুভ্র উজ্জ্বল পটভূমিকায় যেনো রুদ্ধশ্বাসের মতো অংকিত; তার সংগে জর্ডান নদীর গাঢ়-নীল রেখা এবং দূরে মৃত-সাগরের গোল আবর্ত এবং আরো দূরে, যেনো নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ আরেকটি জগৎ, প্রদোষ-মগ্ন মোআব গিরিশ্রেণী- এমন একটি অবিশ্বাস্য, বিচিত্র রূপময় সৌন্দর্য-চিত্র যে, আমার অন্তর তাতে উক্তেজনায় কাঁপতে শুরু করত।

আমার কাছে জেরুজালেম ছিলো একটি সম্পূর্ণ নতুন দুনিয়া। ‘পুরোনো নগরী’র প্রত্যেকটি স্থান থেকে জেগে উঠতো কতো ঐতিহাসিক স্মৃতিঃ সেই সব রাস্তা, যারা শুনেছে ইশায়াকে প্রচার করতে, সেই সব খোয়া যার উপর দিয়ে হযরত ঈসা (আ) হাঁটতেন, সেই সব প্রাচীর যা পুরোনো হয়ে গিয়েছিলো যখন রোমান সৈনিকদের ভারি পদক্ষেপ প্রতিধ্বনিত হতো সেগুলি থেকে, আর দরোজার উপরের খিলান, যাতে খোদাই রয়েছে সালাহুদদীনের আমরের লিপি। আসমান ছিলো গাঢ় নীল, যা ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য দেশকে যারা জানে তাদের কাছে হয়তো নতুন মনে হতো না। কিন্তু আমার কাছে- যেহেতু আমি বেড়ে উঠেছি অনেক কম-বন্ধুত্বপূর্ণ আবহাওয়ায়- এই নীল ছিলো যগপৎ একটি আহবান ও একটি প্রতিশ্রুতি। বাড়ি-ঘর আর রাস্তাঘাটগুলি যেনো কাঁপতে থাকা একটা কোমল উজ্জ্বলতায় মোড়ানো, আর লোকজনের চলন-বলন স্বতস্ফুর্ত, জড়তামুক্ত, অংগভংগী সম্ভ্রম ও আভিজাত্যপূর্ণ- আর লোজন মানেই এখানকার আরবেরা,- কারণ ওরাই শুরু থেকে আমার চেতনায় ছাপ এঁকে দিয়েছিলো এদেশের মানুষ হিসাবে- এদেশেরই মাটি আর ইতিহাস থেকে তা জন্ম লাভ করেছে এবং এখানকার আলো-বাতাসের সাথে ওরা আছে এক হয়ে। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বিচিত্র, বর্ণাঢ্য, বাইবেলী বর্ণনার দৈর্ঘ্য ও বিস্তার তাদের পরনের কাপড়ের; ‘ফেলাহ’ হোক, আর বদ্যু হোক- কারণ, আমি প্রায়ই দেখতাম বদ্যা শহরে আসছে জিনিস-পত্র কেনা-বেচা করার জন্য প্রত্যেকেই তাদের কাপড়-চোপড় পরে নিজের মতো করে, সবসময়ই অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা, যেনো মুহূর্তের প্রেরণায় সে একটা নেহাৎ-নিজস্ব ফ্যাশন উদ্ভাবন করেছে।

ডোরিয়ানের বাড়ির সামনেই, সম্ভবত চল্লিশ গগজের মতো দূরেই দাউদের কেল্লার কাড়া-কাল-জীর্ণ প্রাচীরগুলি উঠেছে- এই কেল্লাটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ; এটি একটি খাঁটি মধ্যযুগীয় আরব নগর-দুর্গ, আর সম্ভবত এটি তৈরি হয়েছিলো হিরোদীয় আমলের বুনিয়াদের উপরে; এর প্রহরা-কক্ষটি মিনারের মতো উঁচু আর সংকীর্ণ। (বাদশাহ দাউদের সাথে এর প্রত্যক্ষ কোনো যোগ না থাকলেও ইহুদীরা সবসময়েই একে এ নামেই অভিহিত করেছে; কারণ, বলা হয়, এখানে ‘জিওন’ পাহাড়ের উপরেই পুরানো শাহী প্রাসাদ ছিলো অবস্থিত)। ‘প্রাচীন নগরী’টির দিকে রয়েছে একটি নীচু প্রশস্ত দালান, যার ভেতর দিয়ে চলে গেছে প্রবেশ দরোজাটি আর দরোজার সম্মুখে পুরোনো পরিখাটির উপরই রয়েছে পাথরে তৈরি ধনুকের মতো বাঁদকা তোরণ- একটি পুল। বদ্যুরা যখন শহরে আসে তখন এই পথটিকে ওরা নিয়মিত ব্যবহার করে ওদের মিলনের জায়গারূপে। একদিন আমি দেখতে পেলাম- এক দীর্ঘ- দেহ বদ্যু সেখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে, রূপালী ধূসর আসমানের পটভূমিকায় একটি দেহাকৃতি, যেনো প্রাচীন কোনো উপকথার এক মূর্তি। ছোট্ট-লাল বাদামী দাড়ির ফ্রেমে, ধারালো চোয়াল- মুখমণ্ডলে একটি গভীর গাম্ভীর্যের অভিব্যক্তিঃ বিষণ্ন মলিন মুখমণ্ডল যেনো সে কোনো কিছুর প্রত্যাশা করছে, অথচ ভাবতে পারছে না যে, সত্যি তা ঘটবে। তার গায়ের চওড়া বাদামী-সাদা ডোরাওয়ালা আলখিল্লাটি জির্ণ এবং ছেঁড়া! আর হঠাৎ আমার মনে হলো, কেন মনে হলো জানি না, এ আলখিল্লাটি লোকটির গায়ে রয়েছৈ বহু মাস ধরে বিপদ আর পালিয়ে বেড়ানোর বহু মাস- ও কি তা হলে সেই ক’জন যোদ্ধারই একজন, যারা হযরত দাউদের অনুগমন করেছিলেন, হয়তো এই মুহূর্তে কোথাও জুদী পাহাড়ের কোলে এ গুহায় লুকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন দাউদ, আর এই বিশ্বস্ত ও সাহসী বন্ধুটি একজন সংগী নিয়ে চুপি চুটি এই রাজধানী শহরে এসেছে- দেখেতে- ‘সল’ তাদের নেতা সম্পর্কে কী ভাবেন আর তাঁর জন্য ফিরে আসা নিরাপদ কি না এবং এখন, এই মুহূর্তে, দাউদের এই বন্ধুটি এখানে অপেক্সা করছে তার সংগীটির জন্য, সমূহ অমংগলের আশংকা নিয়েঃ ওরা হয়তো খোশ-খবর নিয়ে যেতে পারবে না দাউদের কাছে……

হঠাৎ বদ্যুটি নড়ে ওঠে এবং ঢালু বেয়ে নীচুতে নামতে শুরু করে আর আমার স্বপ্ন-কল্পনা টুটে যায়। তখন, সহসা আমার মনে পড়লোঃ এই লোকটি হচ্ছে একজন আরব, আর ওরা, বাইবেলের সেই মূর্তিগুলি ছিলো ইহুদী। কিন্তু আমার এই বিস্ময় কেবর মুহূর্তকাল স্থায়ী হলো, কারণ, অকস্মাৎ আমি বুঝতে পারলাম সেই স্বচ্ছতার সংগে যা হঠাৎ বিদ্যুৎ- ঝলকের মতো কখনো কখনো আমাদের অন্তরে ঝলসে ওঠে এবং পৃথিবীকে উদ্ভাসিত করে দেয় হৃদয়ের একটি মাত্র স্পন্দন-কালের জন্য সেই স্বচ্ছতার সংগে আমি বুঝতে পারলাম- দাউদ এবং দাউদের সময় ইবরাহীম ও ইবরাহীমের সময়ের মতোই তাদের আরব উৎসমূলের অনেক কাছে, আর সে কারণে, আজকের বেদুঈনদেরও তা নিকটতরো আজকের ইহুদীদের চাইতে- যাঁরা নিজেদেরকে মনে করে দাউদ ও ইবরাহীমের খান্দান বলে…..

আমি প্রায়ই বসতাম জাফা-দরোঝার নীচে, পাথর নির্মিত সূঁচালো স্বম্ভটির উপর এবং দেখতাম দলে দলে মানুষ প্রাচীন নগরীতে ঢুকছে আর সেখান থেকে বের হচ্ছে, সবাই একে অপরের সাথে গা ঘষতে ঘষতে, একে অপরকে কুনইয়ের ধাক্কা দিতে দিতে চলছে- আরব এবং ইহুদী যতো রকমের হতে পারে, সকলেই। এদের মধ্যে রয়েছে শক্ত হাডডিওয়ালা ‘ফেলাহীন’ মাথায় বাদামী রঙের কাপড় অথবা কমলা-রঙের পাগড়ি; আরো রয়েছে বেদুঈনেরা, মুখমণ্ডল, তাদের তীক্ষ্ম, পরিচ্ছন্ন এবং প্রায় সব সময়ই কৃশ; ওরা আলখিল্লা পরে এক আশ্চর্য আত্মস্থ ভংগীতে, প্রায়ই দু’হাত নিতম্বের উপর রেখে কনুই প্রসারিত করে দিয়ে, যেনো তারা নিশ্চিত যে, প্রত্যেকেই ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবে। ওদের মধ্যে কিষাণ রমণীদেরও দেখতামঃ কালো বা নীল রঙের সূতী বস্ত্র গায়ে, বুকের উপর সাদা সূতায় ফুল তোলা; প্রায়ই ওদের মাথায় থাকতো জুড়ি এবং ওরা চলতো একটা নম্র, সহজ সুন্দর গতিচ্ছন্দে। পেছন দিক থেকে তাকিয়ে অনেক ষাট বছরের রমণীকেও মনে হতো রমনী। ওদের চোখের দৃষ্টি মনে হতো পরিস্কার এবং বয়সের প্রভাব-মুক্ত- যদি না ওরা আক্রান্ত হতো ‘ট্রাকোমা’ দ্বারা- এটি একটি দুরারোগ্য মিসরীয় চক্ষুরোগ, যা ভূমধ্যসাগরের পূর্বের সকল দেশের জন্যই এক অভিশাপ বিশেষ।

এবং ইহুদীদেরও দেখতামঃ স্থানীয় ইহুদী, যারা পরতো ‘তারবুশ’, আর চওড়া, বিশাল আলখিল্লা, মুখাকৃতির দিক দিয়ে যাদের গভীর মিল রয়েছে আরবদের সাথে; পোলাণ্ড আর রশিয়া থেকে এসেছে যে ইহুদীরা, তারা তাদের অতীত ইউরোপীয় জীবনের এতো ক্ষুদ্রতা আর সংকীর্ণতা নিয়ে এসেছে সাথে করে যে ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তারা দাবি করে তারা আর মরক্কো ও তিউনিসিয়ার সাদা বার্নাস পরিহিত গর্বিত ইহুদীরা একই বংশের লোক। তবু, ইউরোপীয় ইহুদীরা তাদের চারপাশের চিত্রের সংগে স্পষ্টই বেমানান হলেও ইহুদী জীবন ও রাজনীতির সুর এবং মেজাজ তারাই সৃষ্টি করে, আর এ কারণে, আরব ও ইহুদীদের মধ্যে প্রায় দৃশ্যমান মন- কষাকষির জন্য ওরাই দায়ী।

ঐ সময়ে একজন সাধারণ ইউরোপীয় কতোটুকু জানতো আরবদের সম্বন্ধে? আসলে কিচ্ছুই না। সে নিকট প্রাচ্যে আসার সময় সংগে বয়ে নিয়ে আসতো কতকগুলি রোমান্টিক এবং ভ্রান্ত ধারণা এবং যদি সদিচ্ছা থাকতো এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে যদি সে সৎ হতো, তা’হলে তাকে স্বীকার করতেই হতো যে, আরবদের সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানই নেই। ফিলিস্তিনে আসার আগে আমি তো কখনো এ দেশকে আরবদেশ বলে ভাবিনি। অবশ্য, আমার এ অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিলো যে, এখানে ‘কিছু সংখ্যক’ আরবও বাস করে- তবে ওদের আমি কল্পনা করেছিলাম কেবল মরুভূমির তাঁবুর বাসিন্দা যাযাবর এবং স্নিগ্ধ মরূদ্যানের বাসিন্দারূপে। ফিলিস্তিন সম্পর্কে এর আগে আমি যা কিছু পড়েছি সবই জিওনিস্টদের লেখা; স্বভাবতই এবং কেবল নিজেদের দৃষ্টিভংগীতেই ওরা লিখে থাকে। তাই আমি বুঝতে পারিনি যে, শহরগুলিও আরবদের দ্বারা পূর্ণ, বুঝতে পারিনি যে, আসলে ১৯২২ সনেও ফিলিস্তিনে যেখানে ইহুদী ছিলো একজন, সেখানে পাঁচজন ছিলো আরব, সে কারণে ফিলিস্তিন যতোটা না ইহুদীদের দেশ তার চাইতে বহু-বহু গুণে বেশি আরবদেরই দেশ!

আমি যখন জিওনিস্ট সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান মিঃ উসীশকিনের নিকট এ বিষয়ে মন্তব্য করলাম, আমার মনে হলো, জিওনিস্টরা আবরদের এই সংখ্যাগুরুত্বের সত্যটিকে বিবেচনা করে দেখতেও রাজী নয়। জিওজিজমের বিরুদ্ধে আরবদের বিরোধিতাকে তারা কোনো গুরুত্ব দিতেই তৈরি নয়। মিঃ উসীশকিনের প্রতিক্রিয়া আরবদের প্রতি ঘেন্না ও তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছুই মনে হলো নাঃ

-‘এদেশে আমাদের বিরুদ্ধে আরবদের সত্যিকার কোনে আন্দোলনই নেই- অথ্যাৎ, এমন কোনো আন্দোলনই নেই যার মূল রয়েছে জনতার মধ্যে। যাকে আপনি বিরোধিতা মনে করছেন এ সবই আসলে কতিপয় অসন্তুষ্ট এজিটেটরের চিৎকার মাত্র। নিজে নিজেই তা ভেঙে পড়বে কয়েক মাসেই- বড়জোর কয়েক বছরেই’।

তাঁর এ যুক্তি আমার কাছে মোটেই সন্তোষজনক মনে হলো না। শুরু থেকেই আমার মনে হচ্ছিলো ফিলিস্তিনে ইহুদী বসতি স্থাপনের গোটা ধারণাটি কৃত্রিম, অবাস্তব আর তার চাইতে বিপদের কথা- এতে করে, ইউরোপীয় জ ীবনের সকল জটিলতা ও অসমাধ্য সমস্যা এমন একটি দেশে আমদানি হওয়ার আশংকা রয়েছে যা হয়তো এ সবকে বাদ দিয়েই অধিকতরো সুখ থাকতে পারে। ফিলিস্তিনে ইহুদীরা সত্যি এমনভাবে আসছিলো না যাকে বলা যেতে পারে প্রত্যাবর্তন, বরং তারা, ফিলিস্তিনকে ইউরোপীয় লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপীয় ছকে স্বদেশে পরিণত করার জন্যই মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। অল্প কথায় ওরা হচ্ছে দরোজায় প্রবিষ্ট বিদেশী। তাই নিজেদের মাঝখানে ইহুদীদের একটি স্বদেশের ধারণার বিরুদ্ধে আরবদের দৃঢ় বিরোধিতায় আমি আপত্তির কিছুই খুঁজে পাইনি। বরং আমি শীগগীরই বুঝতে পারলাম, জোর করে একটি ইহুদী রাষ্ট্র চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে আর এর বিরুদ্দে আরবরা সংগতভাবেই সংগ্রাম করে চলেছে।

১৯১৭ সনের ব্যালফোর ঘোষণায়, ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী ‘জাতীয় আবাসে’র ওয়াদা করা হয়। আমি এই ঘোষণায় দেখতে পেলাম একটি নিবিড় রাজনৈতিক চাল, সকল ঔপনিবেশিক শক্তিই যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। চালটি হচ্ছে ভেদনীতির মাধ্যমে কোনো দেশ শাসনের বহু পুরোনো নীতি। ফিলিস্তিনের বেলায় এই নীতিটি ছিলো আরো নির্লজ্জ। কারণ, ১৯১৬ সনে তুরস্কের বিরুদ্দে ইংরেজকে সাহায্যের প্রতিদান  হিসাবে ইংরেজরা তখনকার মক্কার শাসক শরীফ হোসেনকে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের প্রতিশ্রতি দিয়েছিলো। কথা ছিলো, ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী সব ক’টি দেশ নিয়ে গঠিত হবে এ রাষ্ট্র। ইংরেজেরা যে কেবল এক বছর পরই ফ্রান্সের সাথে সাইফ-পিকট চুক্তি করে (যাতে ক’রে লেবানন ও সিরিয়ার উপর ফরাসী প্রভুত্ব কায়েম হয়) সে ওয়াদা খেলাফ করে তা নয়, বরং আরবদের ব্যাপারে ওরা যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলো কার্যত ফিলিস্তিনকে তার আওতা থেকেও বাদ দেয়া হয়।

নিজে ইহুদী খান্দানের লোক হলেও শুরু থেকেই আমি জিওনি- নিজমের বিরুদ্ধের এক প্রচণ্ড আপত্তি অনুভব করি। আরবদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত সহানুভূতির কথা বাদ দিলেও বিদেশী বৃহৎ শক্তির সাহায্যে বহিরাগতরা বাইরে থেকে এ দেশে আসবে সংখ্যা গুরুত্ব অর্জনের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য নিয়ে আর এভাবে একটা জাতিকে উচ্ছেদ করবে তার দেশ থেকে, যে- দেশ স্মরণাতীতকাল থেকে বরাবরই তারই দেশ- ব্যাপারটি আমার কাছে ঘোর নৈতিকতা- বিরুদ্দ বলে মনে হলো। তাই আরব- ইহুদী সমস্যা নিয়ে যখনি কোনো কথা ওঠে আমি স্বভাবতই আরবদের পক্ষ নিই। আর এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো প্রায়ই। এ মাসগুলিতে যে- সব ইহুদীর সংস্পর্শে আমি আসি তাদের প্রায় সকলেই আমার মনোভাব বুঝতে ছিলো অপারগ। আমি আরবদের মধ্যে যা দেখেছি তা ওরা বুঝতে পারতো না। ওদের মতে, আরবরা এক পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী ছাড়া আর কিছুই নয়। অমন এক মনোভাব নিয়ে ওরা আরবদের প্রতি তাকাতো যা মধ্যে আফ্রিকার ইউরোপীয় আবাদীদের মনোভাবের থেকে খুব আলাদা নয়। আরবরা কী ভাবছে এ নিয়ে ওদের মোটেই কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। ওদের প্রায় কেউই আরবী শেখার কোনো চেষ্টা করতো না, আর স কলেই বিনাদ্বিধায় এই আপ্তবাক্য গ্রহণ করেছিলো যে, ফিলিস্তিন হচ্ছে ইহুদীদেরই ন্যায্য উত্তরাধিকার।

এ বিষয়ে, জিওনিস্ট আন্দোলনের তর্কাতীত নেতা শাইম ওয়াইজম্যানের সংগে আমার যে মুখতসর আলোচনা হয়েছিলো এখনো তা আমার মনে আছে। তিনি ফিলিস্তিনে তাঁর নিয়মিত সফরের একটিতে এখানে এসেছিলেন। (আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিলো লগুনে) তাঁর সাথে আমার দেখা হয় এক ইহুদী বন্ধুর বাড়িতে। এ লোকটির অপরিসীম প্রাণশক্তিতে আমি প্রভাবিত না হয়ে পারিনি- এমন এক প্রাণশক্তি যার অভিব্যক্তি ঘটেছিলো তাঁর দৈহিক গতিবিধিতেও, তাঁর দীর্ঘ স্প্রিং- এর মতো পদক্ষেপেও, কারণ এভাবেই তিনি পায়চারি করছিলেন ঘরের ভেতর। আমি  প্রভাবিত না হয়ে পারিনি তাঁর প্রশস্ত কপালে ফুটে ওটা বুদ্ধির দীপ্তিতে আর তাঁর চোখের মর্মভেদী চাহনিতে।

তিনি কথা বলছিলেন টাকা- কড়ির অসুবিধা সম্বন্ধে যে- সব অসুবিধা ইহুদী জাতীয়- আবাসের স্বপ্নকে রূপ দেবার পথে ছিলো বাধাস্বরূপ- আর বলছিলেন, বিদেশে ইহুদীরা এই স্বপ্নে যে সাড়া দেয় তার ক্ষীণতা সম্বন্ধে। এতে আমার এই বিরক্তিকর ধারণাই হলোঃ

ওয়াইজম্যানও প্রায় অন্য সকল ইহুদীর মতোই উৎসুক ছিলেন ফিলিস্তিনে যা কিছু ঘটছিলো তার নৈতিক দায়িত্ব ‘বহির্জগতে’ চালান দিতে। এর ফলে আমি বাধ্য হলাম সেই সশ্রদ্ধ নীরবতা ভাঙতে যে নীরবতার সাথে উপস্থিত সকলেই তাঁর কথা শুনছিলো। আমি জিগগাস করিঃ

-‘কিন্তু আরবদের সম্বন্ধে কী?’

আলোচনার মধ্যে এ ধরনের একটি তাল- কাটা সুর এনে নিশ্চয়ই আমি ‘ভূল’ করেছিলাম, কারণ, ওয়াইজম্যান তাঁর মুখ ধীরে ধীরে ফেরালেন আমার দিকে, তাঁর হাতের পেয়ালাটি রেখে দিলেন আর আমরা কথাটির পুনরাবৃক্তি করলেনঃ

-‘এবং আরবদের সম্বন্ধে কী?’

-‘আরবদের তুমুল বিরোধিতার মুখে আপনি কী করে আশা করছেন যে, ফিলিস্তিনকে আপনার নিজেদের স্বদেশ বানিয়ে ফেলবেন? অথচ, মোদ্দাকথা তো এই, আরবরাই এদেশে সংখ্যাগুরু।

জিওনিস্ট নেতা কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন- ‘আমরা আমা করছি, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা আর মেজরিটি থাকছে না’।

-‘হয়তো তা-ই! আপনি এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বহু বছর ধরে, আপনি পরিস্থিতি আমার চেয়ে অবশ্যই ভালো বোঝেন। কিন্তু আরবরা যে- সব রাজনৈতিক বাধাবিঘ্ন আপনাদের জন্য সৃষ্টি করতে পারে- হয়তো না-ও করতে পারে- সে সবের কথা বাদ দিয়েও, এ সম্যার নৈতিক দিকটা কি আপনাকে মোটেই বিব্রত করে না? আপনি কি মনে করেন না যে, যারা এদেশে চিরকাল বসবাস করে এসেছে তাদের উচ্ছেদ করা আপনাদের পক্ষে অন্যায়?’

-‘কিন্তু এদেশ তো আমাদের’, ডঃ ওয়াইজম্যান ভুরু জোড়া কপালে তুলে জবাব দেন, ‘যা থেকে আমাদেরকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিলো আমরা তো তাই ফেরত নেয়ার বেশি কিছু করছি না’।

-‘কিন্তু আপনারা প্রায় দু’হাজার বছরের কাছাকাছি ফিলিস্তিন থেকে দূরে রয়েছেন। এর আগে, আপনারা এদেশ শাসন করেছিলেন, কিন্তু পুরা দেমটি কখনো নয়- পাঁচমো বছরেরও কম। আপনি কি মনে করেন না যে, একই যুক্তিতে আরবরা দাবি করতে পারে স্পেন, কারণ, তারাও তো স্পেনে কর্তৃত্ব করেছিলো প্রায় সাতশো বছর, আর প্রায় পাঁচশো বছর আগে তা সম্পূর্ণ খুইয়ে বসে’।

দেখতে পেলাম ডঃ ওয়াইজম্যান অধৈয্য হয়ে উঠেছেনঃ

-‘বাজে কথা! আরবরা তো স্পেন ‘জয় করেছিলো’ মাত্র; সে দেশ কখনো তাদের নিজেদের আদি বাসভূমি ছিলো না। তাই, স্পেনীয়রা শেষ নাগাদ ওদেরকে সেখান থেকে বের করে দিয়েছিলো- তা ঠিকই হয়েছিলো’।

-‘মাফ করবেন’ আমি পাল্টা জবাব দিই, ‘আমার মনে হচ্ছে এতে ঐতিহাসিক তথ্যগত কিছু ভুল রয়ে গেছে। আসলে, হিব্রুরাও তো ফিলিস্তিনে এসেছিলো বিজয়ী হিসাবে। তাদের বহু বহু আসে এখানে বাস করতো অনেক সেমিটিক এবং অ-সেমেটিক গোত্র- যেমন আমেরাইত, এদুমাইত, ফিলিস্টাইন, মোআইবাত এবং হিট্টাইট প্রভৃতি। ইসরাঈল এবং যুদা’র রাজত্বকালেও তো এসব কবিলা এখানেই বাস করতো। রোমানরা যখন আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেয় তখনো ঐসব গোত্র এখানেই বাস করতো। ওরা এখনো এখানেই বাস করছে। সপ্তম শতকে যে- সব আরব এ অঞ্চল জয় করে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে, তারা সবসময়ই জনসংখ্যার  একটি ক্ষুদ্র মাইনরিটি মাত্র ছিলো। বাকী যাদেরকে আমরা আজ ফিলিস্তিনী বা সিরীয় ‘আরব’ বলে বর্ণনা করে থাকি আসলে তারা হচ্ছে এখানকার আরবায়িত মূল বাসিন্দা মাত্র। বহু শতাব্দীতে এদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। অন্যরা খ্রিস্টানই রয়ে গেছে। মুসলমানেরা স্বভাবতই আরব থেকে আগত তাদের ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়। কিন্তু আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ লোক, যারা আরবীতে কথা বলে, তারা মুসলমানই হোক বা খ্রিস্টানই হোক, তারা সরাসরি সূত্রে, এখানকার আদি বাসিন্দাদেরই বংশধর- আদি এই অর্থে যে, হিব্রুরা এখানে আসার বহু শতাব্দী আগেও তারা এখানেই বাস করতো’!

আমার এই বিস্ফোরণে ডঃ ওয়াইজম্যান ভদ্র হাসিতে মোলায়েম হয়ে ওঠেন এবং আলোচনার মোড় অন্য বিষয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেন।

আমার এই হস্তক্ষেপের যে পরিণতি হলো তাতে আমি সুখী হইনি। আমি অবশ্যি আশা করিনি, উপস্থিত কেউ- ডঃ ওয়াইজম্যান তো ননই- আমার সাথে একমত হবেন যে, নৈতিকতার বিচারে জিওনিস্ট আদর্শটি খুবই দুর্বল এবং খোলো। কিন্তু এই প্রত্যাশা আমার ছিলোঃ আরবদের লক্ষ্যের প্রতি আমার সমর্থন আর কিছু না হোক জীওনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যে অন্তত কিছুটা অস্বস্তির জন্ম দেবে- এমন এক অস্বস্তি যা ওদের মধ্যে এনে দিতে পারে আরও বেশি অর্ন্তমূখিতা, আর তাতে করে হয়তো একথা মেনে নেয়ার জন্য সৃষ্টি করতে পারে অধিকতরো মানসিক প্রস্তুতি। কথাটি এই যে, আরবদের জিওনিজম বিরোধিতার মধ্যে একটি নৈতিক অধিকারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার কিছুটা ঘটলো না। তার বদলে আমি দেখতে পেলাম একটা শূন্য দেয়াল যেন চোখ বের করে তাকিয়ে আছে আমার দিকেঃ আমার হঠকারিতার বিরুদ্ধে তিরস্কারই ভরা প্রতিবাদ- এখন সেই হঠকারিতা, যা ওদের পূর্বপুরুষদের দেশে, ইহুদীদের প্রশ্নাতীত অীধকার সম্ভন্ধে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস করেছে!

ভেবে ভেবে বিস্মিত হতাম আমি- অমন সৃজনধর্মী বুদ্ধির অধিকারী ইহুদীদের পক্ষে জিওনিস্ট- আরব বিরোধটিকে কী করে কেবল ইহুদীদেরই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব হচ্ছে! ওরা কি বুঝতে পারেনি যে, শেষতক ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সমস্যাটির সমাধান কেবলমাত্র আরবদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ভেতর দিয়েই সম্ভব হতে পারে? ওদের এই পলিসি যে যন্ত্রণাদায়ক ভবিষ্যৎ ডেকে আনবে অনিবার্যভাবেই সে বিষয়ে ওরা কি ছিলো সত্যি সত্যি অতোটা অন্ধ? যদি সামরিকভাবে সকলও হয় তবু এক শক্রভাবাপন্ন আরব সমুদ্দুরের মধ্যে ইহুদী- রাষ্ট্ররূপ ছোট্ট দ্বপটি চিরকারের জন্য যে সংঘাত, ঘেন্না ও তিক্ততার মুখোমুখি হবে তা দেখার মতো দৃষ্টিশক্তি কি ওদের একেবারেই ছিলো না?

এবং কী আশ্চর্য, আমি ভাবতাম, যে জাতি তার দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসে, বারবার অন্যায় জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, আজ সে-ই তার নিজের লক্ষ্য হাসিলের ঐকান্তিক চেষ্টায় অপর একটি জাতির প্রতি মারাত্মক জুলুম করতে উদ্যত- আর সে জাতিও এমন এক জাতি যারা ইহুদীদের অতীত দুঃখ- কষ্টের ব্যাপারে একেবারেই নিরপরাধ! আমি জানতাম, ইতিহাসে এরূপ ঘটনা কখনো ঘটেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চোখের সামনেই তা ঘটতে যাচ্ছে দেখে আমার দুঃখের সীমা রইলো না।

 সে সময়ে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে আমার এই অষ্টপ্রহর চিন্তা- ভাবনার মূলে যে কেবল আরবদের প্রতি আমার সহানুভূতি আর জিওনিস্টদের এক্সপেরিমেন্ট আমার উদ্বেগই কাজ করেছে তা নয়- এর মূলে আমার সাংবাদিক কৌতূহলও ছিলো সক্রিয়- কারণ আমি তখন ‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ- এর বিশেষ সংবাদদাতা আর ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবাদপত্রগুলির অন্যতম ছিলো এ কাগজ। অনেকটা আকস্মিকভাবেই আমি এ সুযোগ পেয়ে যাই।

এক সন্ধ্যায় আমি আমার এক স্যুটকেসে ঠাঁসা পুরোনো কাগজগুলি বাছাই করছি- কাগজ ঘাটতে ঘাটতে এক বছর আগে বার্লিনে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে যে কার্ডটি আমাকে দেওয়া হয়েছিলো, তা পেয়ে গেলাম। আমি প্রায়  ওটি ছিঁড়েই ফেলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ডোরিয়ান মামা আমার হাত ধরে রসিকতার সাথে বলে উঠলেনঃ ‘ছিঁড়ো না। তুমি যদি হাইকমিশন অফিসে এই কার্ডটি পেশ করো কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারী ভবনে খানার দাওয়াত পেয়ে যাবে। এদেশে সাংবাদিকরা খুবই বাঞ্ছিত জীব’।

আমি যদিও অনাবশ্যক কার্ডটি ছিঁড়ে ফেললাম, তবু মামার ঠাট্টা আমার মধ্যে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। অবশ্য আমি সরকারী ভবনে খানার দাওয়াতের জন্য মোটেই উদগ্রীব ছিলাম না- কিন্তু তাই বলে এমন একটি সময়ে নিকটপ্রাচ্যে থাকার এই দুর্লভ সুযোগ কেন আমি কাজে লাগাবো না- যখন দেখতে পাচ্ছি- মধ্য ইউরোপের খুব কম সাংবাদিকই এখানে সফরের সুযোগ পাচ্ছে, আমি কেন আবার আমার সাংবাদিক কাজকর্ম শুরু করবো না? তবে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে নয়, কোনো একটি মশহুর দৈনিকের সংবাদদাতা হিসাবে। এবং যেরূপ আকস্মাৎ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি তেমনি সহসা আমি স্থির করে ফেললাম- আমি ‘সত্যিকার’ সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করবো!

‘ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে’র সাথে এক বছর কাজ করলেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের সাথেই আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তাছাড়া, যেহেতু আমার নিজের নামে আজো কিছুই ছাপা হয়নি, তাই সংবাদপত্র জগতে আমার নাম এখনো সম্পূর্ণ অজানা, অপরিচিত। অবশ্য, এতে আমি নিরাশ হয়ে পড়িনি। আমি ফিলিস্তিন সম্পর্কে আমার ধারণার উপর একটি প্রবন্ধ লিখলাম এবং দশটি জার্মান সংবাদপত্রে পাঠালাম তার কপি। সংগে আমি এ প্রস্তাবও দিলাম যে, নিকট-প্রাচ্যের উপর আমি ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ লিখতে তৈরি আছে।

এ হচ্ছে ১৯২২ শেষের দিকের মাসগুলির কথা- তখন জার্মানীতে চরম সর্বনাশা মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। জার্মান সংবাদপত্রগুলির পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিলো। অতি অল্পসংখ্যক খবরের কাগজই পারবতো মুদ্রায় তাদের বৈদেশিক সংবাদদাতাদের খরচ বহন করতে। কাজেই এ মোটেই আশ্চর্যজনক ছিলো না যে, আমি যে-দশটি সংবাদপত্রে আমার নমুনা প্রবন্ধটি পাঠিয়েছিলাম তারা একের পর এক, কমবেশি ভদ্র বাষায় তাদের প্রত্যাখ্যানের কথা লিখে জানালো। দশটি পত্রিকার মধ্যে কেবল একটিই আমার পরামর্শ গ্রহণ করে এবং মনে হয়, আমি যা লিখেছিলাম তাতে খুশি হয়েই আমাকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিশেষ ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা নিয়োগ করে, আর তার সংগে একটি চুক্তিপত্রও পাঠায়- ফিরে গিয়ে আমাকে একটি বই লিখে দিতে হবে। এই পত্রিকাটিই ‘ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ’। আমি প্রায় কাৎ হয়ে গেলাম যখন দেখতে পেলাম, আমি যেড কেবল একটি সংবাদপত্রের সাথে (আর কী সে সংবাদপত্র!) সম্পর্কই স্থাপন করতে পেরেছি তা নয়, পয়লা চেষ্টায়ই অমন একটা মর্যাদা হাসিল করেছি যা বহু ঝানু সাংবাদিকেরও ঈর্ষার বস্তু হতে পারে!

অবশ্য এর মধ্যে একটা কাঁটাও ছিলো। মুদ্রাস্ফীতির জন্য ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আমাকে নগদ টাকায় আমার মাইনে দিতে সক্ষম ছিলো না। বিনয়ের সাথে তারা বললো, আমার পারিশ্রমিক দেয়া হবে জার্মান মার্কের হিসাবে; ওদের মতোই আমিও জানতাম যে, এতে আমার প্রবন্ধগুলি পাঠাবার জন্য খামের উপর যে টিকেট লাগাতে হবে তার খরচ বহন করাও কঠিন হবে। কিন্তু ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর বিশেষ সংবাদদাতা হওয়ার গৌরব অনেক- অনেক বেশি মূল্যবান মনে হলো- সংবাদদাতা হিসাবে টাকা- কড়ি না পাওয়অর সাময়িক অসুবিধা সত্ত্বেও। আমি ফিলিস্তিনের উপর প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে দিলাম এই আশায় যে, শীগগীরই হোক বা বিলম্বেই হোক, ভাগ্যে কোনো শুভ পরিবর্তনের ফলে, একদিন হয়তো আমি গোটা নিকট-প্রাচ্যেই, সফর করতে সক্ষম হবো।

*         *              *        *          *          *          *          *          *

ফিলিস্তিনে এখন আমার বন্ধু অনেক- ইহুদী এবং আরব, উভয়ই।

একথা সত্য যে, আরবদের প্রতি আমার সহানুভতির জন্য যা ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এ প্রকামিত আমার প্রবন্ধ গুলিতে ছিলো সুস্পষ্ট, জিওনিস্টরা আমাকে দেখতো অনেকটা বিস্ময়-মেশানো সন্দেহের সংগে। স্পষ্টই তারা স্থির করতে পারছিলো না আমি কি আরবদের দ্বারা ‘খরিদ’ হয়ে গেছি (কারণ, জিওনিস্টরা প্রায় সমস্ত কিছুকেই টাকা- কড়ির অর্থে ব্যাখ্যা করতে ছিলো অভ্যস্ত)! না কি, আমি কেবল একটা উদ্ভট বুদ্ধিজীবী, বিদেশী সবকিছুকেই যে ভালোবাসে। কিন্তু তখন যেসব ইহুদী ফিলিস্তিনে বাস করতো তাদের সবাই যে জিওনিস্ট ছিলো তা নয়। ওদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনে এসেছে, রাজনৈতিক কোনো মতলব নিয়ে নয়, বরং পাকভূমি আর তার সাথে জড়িত বাইবেলী স্মৃতি- অনুষংগের প্রতি একটী ধর্মীয় অনুরাগবশে।

এই দলের মধ্যে ছিলেন আমার ডাচ বন্ধু ইয়াকব দ্য হান- দেখতে ছোটো- খাটো, গোলগাল, মুখে সোনালী রঙের দাড়ি, বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। এখানে আমার আসার আগে তিনি ছিলেন হল্যান্ডের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক। এখন তিনি আমস্টার্ডামের ‘হ্যাণ্ডলসব্লাড’ ও লণ্ডনের ‘ডেলি একপ্রেসে’র বিশেষ সংবাদদাতা। তাঁর ধর্মবিশ্বাস ছিলো গভীর, পূর্ব ইউরোপের যে- কোনো ইহুদীর মতোই গোঁড়া- কিন্তু তিনি জিওনিস্ট চিন্তাধারা সমর্থন করতেন না, কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘প্রতিশ্রুত ভূমিতে তাঁর জাতির প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদেরকে মিসাইঅ্যার আগমনের অপেক্ষা করতে হবে’।

-‘আমরা ইহুদীরা’, তিনি আমাকে একাধিকবার বলেছেন, ‘আমরা পাক ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম এবং পৃথিবীর সর্বত্র আমাদেরকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো, কারণ আল্লাহ আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমরা তা পালন করতে পারিনি। তিনি আমাদেরকে মনোনীত করেছিলেন তাঁর কালাম প্রচারের জন্য, কিন্তু আমরা আমাদের উদ্ধত অহংকার- বশে ভাবতে শুরু করলাম, তিনি কেবল খাতিরেই ‘মনোনীত জাতি’ করেছেন- এবং এভাবে আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এখন আর তওবা করা আর অন্তর সাফ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। এবং আমরা যখন আবার তাঁর কালাম শোনার লায়েক হবো, তিনি একজন মিসাইঅ্যা পাঠাবেন তাঁর বান্দাদেরকে প্রতিশ্রুত দেশে আবার নিয়ে যাবার জন্যে’।

-‘কিন্তু’, আমি জিগগাস করি, ‘জিওনিস্ট’ আন্দোলনের মূলেও এই মিসাইঅ্যার ধারণা নেই কি? আপনি জানেন, আমি তা সমর্থন করি না; কিন্তু প্রত্যেক জাতিরই কি এ বাসনা স্বাভাবিক নয় যে, তাদের একটি নিজস্ব আবাস-ভূমি থাকবে?

ডঃ দ্য হান আমার দিকে একটু লঘু পরিহাস মেশানো নজরে তাকান,- ‘আপনি কি মনে করেন, ইতিহাস কেবল কতগুলি ঘটনাপস্পরা? আমি তা মনে করি না। আল্লাহ যে, আমাদেরকে বাধ্য করেছিলেন আমাদের দেশ হারাতে, আর আমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নানা দেশে, তা উদ্দেশ্যহীন ছিলো না। কিন্তু জিওনিস্টরা নিজেরা একথা স্বীকার করতে রাজী নয়; যে- আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব আমাদের পতনের জন্য দায়ী ওরা সেই অন্ধতায়ই ভূগছে। ইহুদীদের দু’হাজার বছরের নির্বাসন এবং দুঃখ-কষ্ট ওদেরকে কিছুই শেখায়নি। আমাদের দুঃখ-কষ্টের মূল কারণটি বুঝবার চেষ্টা না করে তাকে এখন এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে; বলা যায়, পশ্চিমা শক্তির রাজনীতি থেকে পাওয়া বুনিয়াদের উপর একটা ‘জাতীয় আবাস’ তৈরি করে- এবং জাতীয় আবাসভূমি তৈরিরর এই প্রচেষ্টায় অপর একটি জাতিকে তার নিজের আবাস থেকে বঞ্চিত করার অপরাধই করে চলেছে ওরা!

স্বভাবতই, ইয়াকব দ্য হানের রাজনৈতিক মতামত তাকে জিওনিস্টদের মধ্যে খুবই অপ্রিয় করে তোলে (আসলে আমার ফিলিস্তিন ত্যাগের কিছুদিন পরেই, আমি শুনে মর্মাহত হই যে, তাঁকে সন্ত্রাসবাদীরা এক রাত্রে গুলী করে হত্যা করেছে।) তাঁর সংগে যখন আমার পরিচয় হয় তখন তাঁর নিজের মতের অল্প ক’জন ইহুদীদের মধ্যেই তাঁর সামাজিক মেলামেশা ছিলো সীমাবদ্ধ- এদের কেউ কেউ ছিলো ইউরোপীয়, কেউ কেউ ছিলো আরব। আরবদের প্রতি তাঁর খুবই দরদ ছিলো বলে মনে হয়, আর তাঁর সম্বন্ধে আরবদেরও ছিলো খুব উচ্চ ধারণা। ওরা প্রায়ই ওঁকে দাওয়াত করতো ওদের বাড়িতে। আসলে তখনো আবরা ইহুদী হিসাবেই ইহুদীদের প্রতি সর্বতোভাবে বির্দ্বিষ্ট হয়ে ওঠেনি। কেবল ব্যালফোর ঘোষণার পরই- অর্থাৎ শত শত বছর পাশাপাশি সম্প্রীতির সাথে বসবাস এবং একটা জাতিগত ঐক্য-চেতনা সত্ত্বেও আরবরা ইহুদীদেরকে রাজনৈতিক দুশমন ভাবতে শুরু করে। কিন্তু দ্বিতীয় দশকের প্রথমদিকের বদলে- যাওয়া পরিস্থিতিতেও আরবরা জিওনিস্ট এবং ডঃ দ্যা হা’নের মতো বন্ধুভাবাপন্ন ইহুদীদেরকে স্পষ্টভাবেই আলাদা করে দেখতো।

….      ….         ….       ….       ….

আরবদের মধ্যে আমার সফরের এই প্রথমদিকের নিয়তি-নির্দিষ্ট মাসগুলি যেনো আবেগ-অনুভুতি ও চেতনা প্রতিবিম্বের এক প্রবাহ বইয়ে দিলো। বলতে কি, ব্যক্তিগত ধরনের কতকগুলি অনুচ্চারিত আশা- আকাঙ্ক্ষা আমার চেতনায় স্থান পাবার দাবি জানাতে থাকলো্

আমি অমন একটা জীবনবোধের সম্মুখীন হলাম যা ছিলো আমার কাছে একেবারেই নতুন। মনে হলো, এই মানুষগুলির রক্ত থেকে একটি উষ্ণ, তপ্ত, মানবিক নিশ্বাস প্রবাহিক হচ্ছে ওদের চিন্তায়, ওদের অংগ-ভংগীতে- আত্মার সেইসব যন্ত্রণাদায়ক ফাটল, ভয়, ক্ষোভ এবং মানসিক বাধার সেইসব প্রেত যা ইউরোপের জীবনকে কুৎসিততরে এবং প্রতিশ্রতির দিক দিয়ে অতো কাঙাল করেছে…. এই আরবদের মধ্যে এর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। আমি আমার নিজেরও অজান্তে হামেমা যা কামনা করে এসেছি তারই কিছুটা পেতে শুরু করি আরবদের মধ্যেঃ হালকাভাবে জীবনের সকল প্রশ্নের মুকাবিলা করার জন্য এটি একটি আবেগধর্মী মনোভাব। বলা যায়, অনুভূমির ক্ষেত্রে এক মহৎ কাণ্ডজ্ঞান।

কালক্রমে, এই মুসলিম জাতির মর্মকথা বোঝা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে উঠলো। এর কারণ এ নয় যে, ওদের ধর্ম আমাকে আকর্ষণ করেছিলো (কারণ তখনো এ সম্বন্ধে আমি জানতাম সামান্যই)। বরং তা এ কারণেই আমার কাছে অতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, ওদের মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছিলাম মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সংগতি, যা ইউরোপ খুইয়ে বসেছিলো। আরো নিবিড়ভাবে আরবদের জীবন বোঝার মাধ্যকে কি আমাদের পম্চিমা জগতের দুঃখ-যন্ত্রণা, মানবিক সংহতিকর ক্ষয়কর অভাব আর সেই দুঃখ-যন্ত্রণার কারণের মধ্যে যে গোপন সম্পর্ক রয়েছে তা আবিস্কার করার সম্ভব নয়? কী সেই জিনিস, যা আমাদেরকে, পশ্চিমাদেরকে, জীবনের সেই পরম স্বাধীনতা থেকে পলায়ন করতে শিখিয়েছে, যে স্বাধীনতার অধিকারী এই আরবেরা, ওদের এই মানসিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের যুগেও- যার অধিকারী আমরাও হয়তো ছিলাম অতীতের কোনো এক সময়ে? তা যদি না হতো, আমরা কী করে সৃষ্টি করতে পারতাম আমাদের অতীতের মহৎ সব শিল্পকলা, মধ্যযুগের সার্থক গির্জাসমূহ, রেনেসাঁসের উন্মাদ উল্লাস, রেমব্রাতের চিত্রের আলো-আধাঁরের খেলা, বাখের সুর-মূর্ছনা, মোজার্টের স্নিগ্ধ মোলায়েম অস্বপ্ন, আমাদের চাষীদের চিত্রকলায় ময়ূরের পেখমের গৌরব এবং অস্পষ্ট, প্রায় অমূল্য শিখর- চূড়ার দিকে বীথোফোনের গর্জনময় আশায়-দীপ্ত উড্ডয়ন, যেখান থেকে মানুষ বলতে পারে- ‘আমি আর আমার নিয়তি অভিন্ন।

আত্মশক্তির প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য কী তা আমরা জানি না বলে আমাদের পক্ষে আর ঐসব শক্তির সত্যিকার ব্যবহার সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে আর কখনো জ ন্ম হবে না কোনো বীথোফেনের বা কোনো রেমব্রাতের! তার বদলে এখন আমরা জানি শিল্পকলায়, সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতি-বিজ্ঞানে প্রকাশের নব নব রূপ নিয়ে কেবল মারাত্মক  দলাদলি, কেবলি পরস্পরবিরোধী শ্লোগান, ও সূক্ষ্মভাবে, পরিকল্পিত নীতির মদ্যে তুমুল সংগ্রাম। আমাদের সব যন্ত্রপাতি, আর   আসমান- ছোঁয়া দালাকোঠা আমাদের আত্মার সমগ্রতা পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও… ইউরোপের অতীতের সেই হারানো আত্মিক গৌরব কি প্রকৃতপক্ষে চিরদিনের জন্যই হারিয়ে গেছে? আমরা কোথায় ভূল করেছি তা উপলব্ধি করে আমরা কি সেই আত্মিক গৌরবের কিছুটা ফিরে পেতে পারি না?

এবং প্রথমে যা, আরবদের  রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি, আরবীয় জীবনের বাইরের রূপ, আর আমি এ জাতির লোকদের মধ্যে আবেগের দিক দিয়ে যে স্থির- নিশ্চয়তা লক্ষ্য করেছি তার প্রতি আমার পক্ষে সহানুভুতি মাত্র ছিলো, তাই ধীরে ধীরে আমার অজ্ঞাতসারে, এমন কিছুতে রূপান্তরিত হলো যা এক ব্যক্তিগত অন্বেষার সাথেই তুলনীয়। আমি ধীরে ধীরে আরো সচেতন হয়ে উঠলাম একটি আচ্ছন্ন-করা তন্ময় বাসনা সম্পর্কে- জানার এ বাসনা যে, আবেগের দিক দিয়ে ওদের নিশ্চিন্ত নির্ভরতার মূলে কী রয়েছে, আর কী সেই জিনিস যা আরবদের জীবনকে অতো আলাদা করে দিয়েছে পাশ্চাত্য জীবন থেকে? আর মনে হলো, এই বাসনা যেনো আমার নিজের গহনতম সমস্যাগুলির সাথেই রহস্যজনকভাবে জড়িত। আমি পথ খুঁজতে লাগলাম যা আমাকে দেবে আরদের চরিত্রে, তাদের ধ্যান-ধারণায় গভীরতরো অন্তদৃষ্টি, যে চরিত্র- ও ধ্যান-ধারণা ওদেরকে দিয়েছে একটা বিশেষ রূপ আর আত্মিক দিক দিয়ে ওদেরকে করেছে ইউরোপীয়দের থেকে অতো স্বতন্ত্র! ওদের ইতিহাস, তমদ্দুন আর ধর্ম সম্বন্ধে আমি গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। আর এই তাগিদ, যা আমি সেই জিনিসটি আবিস্কার করার জন্য অনুভব করি যা ওদের হৃদয়কে করেছে উদ্বুদ্ধ আর পরিপূর্ণ আর দিয়েছে ওদের পথের দিশা- তারি মধ্যে যেনো আমি আভাস পেলাম একটি প্রেরণার, এক গোপন শক্তি আবিষ্কারের, যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, পূর্ণ করেছ, আর দিয়েছে দিক-নির্দেশনার প্রতিশ্রুতি।

 

কণ্ঠস্বর

এক

আমরা চলছি উটের উপর সওয়ার হয়ে, আর জায়েদ গান গাইছে। বালিয়াড়িগুলি এখন আগের চেয়ে আরো প্রশস্ত। এখানে ওখানে বালু জায়গা ছেড়ে দেয় নূড়ি পাথরের শয্যার জন্য এবং খণ্ড খণ্ড বেসল্টের জন্য, আর আমাদের সম্মুখেই, অনেক দক্ষিণে, জেগে ওঠে গিরিশ্রেণীর ছায়া ছায়া রেখাঃ জাবাল শাম্মার পর্বতশ্রেণী।

জায়েদের গানের পদগুলি একাকার হয়ে ভেদ করে আমার নিদ্রালূতাকে – কিন্তু ঠিক অমন মাত্রায় যে, আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে যে- শব্দগুলি সেগুলিই এমন এক বিস্তৃততরো, গভীরতরো তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠছে যার সাথে তাদের বাহ্য অর্থের কোনো যোগই নেই!

এ  হচ্ছে উট সওয়ারের সেই গানগুলির একটি, যা আপনি প্রায়ই শুনতে পাবেন আরব দেশে- এমন গান যা মানুষ গায় তাদের জন্তগুরির পদক্ষেপকে নিয়মিত ও ক্ষিপ্র রাখতে এবং ঘুমিয়ে-পড়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে- মরু- মানবের সুর, যারা অমন স্থানের সাথে দিন গুজরান করে যার কোন সীমা- সরহদ নেই, প্রতিধ্বনিও নেইঃ যে সুর সবসময়ই তোলা হয় বাদ্যবন্ত্রের প্রধান চাবিতে, সুরের একই সমতলে, ঢিলা-ঢালা আর কিছুটা কর্কশ- বেরিয়ে আসছে গলার একেবারে উপর থেকে, আর আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে শুস্ক হাওয়ায়ঃ যেনো মরুভূমির নিশ্বাস ধরা পড়েছে মানুষের একটি কণ্টস্বরে। মরুভূমির ভেতর দিয়ে যে মানুষ কখনো সফর করেছে সে কিছুতেই ভূলতে পারবে না এই কণ্টস্বর। এ কণ্টস্বর যেখানে জমি নিষ্ফলা, বাতাস উষ্ণ আর চতুর্দিকে উন্মুক্ত অবারিত আর জীবন কঠিন- সব জায়গায় একই।

আমরা চলেছি উটের উপর সওয়ার হয়ে আর জায়েদ গেয়ে চলেছে, যেমন তার আগে নিশ্চয়ই গেয়েছে তার আব্বা এবং তার কবিলার আর সকল মানুষ এবং আরো বহু কবিলার মানুষ, হাজার হাজার বছর ধ’রে; কারণ, এই গভীর, একঘেয়ে সূরগুলি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে চূড়ান্ত রূপ দিতে দরকার হয়েছে হাজার হাজার রছরের। বহু সুরে সুরেলা পাশ্চাত্য সংগীত প্রায় সবসময়ই প্রকাশ করে কোনো না- কোন ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিন্তু এই আরকীয় সুরগুলি- অগণিতবার যাতে তোলা হয়েছে একই সুরের আমেজ- এগুলি যেনো, অনুভূমি থেকে পাওয়া উপলব্ধির সুরময় প্রতীক মাত্র, যার অভিজ্ঞতা রয়েছে বহু মানুষের, যার উদ্দেশ্যে কোন একটা বাব জাগানো নয়, বরং আপনাকে আপনার আত্মিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। এইসব সুরের জন্ম হয়েছিলো বহু বহু আগে, মরুভূমির আবহাওয়া থেকে, বাতাসের আর যাযাবর জিন্দেগীর ছন্দ থেকে, বিশাল মাঠ- প্রান্তরের বিশালতার অনুভুতি থেকে, এক চিরন্তন বর্তমানের ধ্যান থেকেঃ এবং ঠিক যেমন জীবনের মৌলিক বিষয়গুলি সব সময়ই একই থাকে তেমনি এই সুরগুলিও সময়ের অতীত, পরিবর্তনের অতীত।

এই ধরনের সুরের কথা প্রতীচ্যে ক্বচিৎ কেউ ধারণা করতে পারে। প্রতীচ্যে, আলাদা আলাদা সুর কেবল সংগীতেরই একটা দিক নয়, এ তার অনুভুতি ও কামনা- বাসনারও একটি দিক। শীতল আবহাওয়া, ছুটে চলা নদী-নালা, পর পর চারটি ঋতু- এসব উপাদান জীবনকে এতো বহুমুখী তাৎপর্য ও দিক নির্দেশ করে যে, পাশ্চাত্যের মানুষ অতি স্বাভাবিকভাবেই পীড়িত হয় বহু কামনা- বাসনা দ্বারা’ এবং পরিণামে একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষার দ্বারা, সে আকাঙ্ক্ষা কেবলমাত্র করার তাগিদেই কাজ করার আকাঙ্ক্ষা। তাকে সবসময়ই সৃষ্টি করতে হবে, নির্মাণ করতে হবে, জয়ী হতে হবে, তার নিজর জীবনের বিভিন্ন রূপের মধ্যে, নিজের অস্তিত্বকে বারবার উপলব্ধি করার জন্য; আর এই নিত্য পরিবর্তনশীল জটিলতা তার সংগীতেও প্রতিফলিত। তরংগিত উদাত্ত পশ্চিমা সংগীতেও ধ্বনি আসে বুকের ভেতর থেকে এবং উদাত্ত সব সময়ই বিভিন্ন তালে ওঠা নামা করতে করতে; এ সংগীতে কথা বলে সেই ‘ফাউস্টীয় প্রকৃতি- যার প্রবাবে পশ্চিমী মানুষেরা অনেক বেশি স্বপ্ন দেখে, অনেক বেশি কামনা করে এবং জয়লাভের ইচ্ছায় অনেক বেশি সংগ্রাম করে- কিন্তু তার সংগে হয়তো ওরা হারায়ও অনেক বেশি এবং তা হারায় বেদনাদায়ভাবে! কারণ, পশ্চিমী মানুষের জগৎ হচ্ছে ইতিহাসের জগৎঃ কেবলি হওয়া, ঘটা আর অতীত হয়ে যাওয়া; এতে শান্ত থাকার প্রশান্তিটুকু নেইঃ সময় হচ্ছে একটি দুশমন- যাকে সবসময়ই দেখতে হবে সন্দেহের নজরে; এবং ‘এখন’ এই কথাটি কখনো বহন করে না চিরন্তনের কোনো ইংগিত…..

পক্ষান্তরে মরুভূমি আর স্তেপ অঞ্চলের আরবকে তার চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য স্বপ্নের মায়াময় জগতে নিয়ে যায় না, এ দৃশ্য তার কাছে দিনের মতোই কঠোর বাস্তব; এতে অনুভুতির আলো-ছায়া খেলার কোনো অবকাশ নেই। বাহির আর ভেতর, আমি আর পৃথিবী তার কাছে বিপরীত এবং পরস্পরবিরোধী কোনা সত্ত্বা নয়, বরং এক অপরিবর্তনীয় বর্তমানেরই বিভিন্ন দিক; গোপন ভয় তার জীবনের উপর প্রভুত্ব করে না এবং যখনই সে কোনো কাজ করে সে তা করে বাহ্য প্রয়োজনে, মানসিক নিরাপত্তার বাসনার তাগিদে নয়। ফলের দিক দিয়ে সে পশ্চিমাদের মতো দ্রুত বৈষয়িক ‘সাফল্য’ হাসিল করতে পারেনি সত্য, কিন্তু সে তার আত্মাকে বাঁচাতে পেরেছে।

….      ….         …..      …..

….. ‘কতো কাল’- আমি প্রায় একটা শরীরী চমকের সাথে নিজেকে নিজে সুধাই- জায়েদ আর জায়েদের জাতের লোকেরা, অমন সূক্ষ্মভাবে, অমন নির্দয় কঠোরতার সাথে যে-বিপদ তাদেরকে ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে তার মুকাবিলায় বাঁচাতে পারবে তাদের আত্মাকে? আমরা বাস করছি অমন একটা সময়ে যখন অগ্রসরমান পশ্চিমের মুকাবিলায় আর নিষ্ক্রিয় থাকতে পারবে না প্রাচ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক- হাজারো শক্তি এসে আঘাত করছে মুসলিম জাহানের দরোজায়। মুসলিম জাহান কি অভিভূত হয়ে পড়বে পশ্চিমী বিশ শতকের চাপে এবং এই প্রক্রিয়ায় হারাবে কেবল তার নিজের ঐতিহ্যিক রূপগুলিকে নয়, তার আত্মিক বুনিয়াদকেও?

দুই

মধ্যপ্রাচ্যে আমি যে বছরগুলি কাটিয়েছি ১৯২২ থেকে ১৯২৬ তক, একজন সহানুভূতিশীল বাইরের লোক হিসাবে এবং এরপর থেকে, মুসলিম হিসাবে ইসলামী কওমের আশা- আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যের অংশীদার রূপে সেই সময়টাতে আমি লক্ষ্য করেছি, কীভাবে ইউরোপীয়রা ধীরে ধীরে অপ্রতিহতভাবে মুসলমানদের তাদ্দুনিক জীবন ও রাজনৈতিক আযাদীকে গ্রাস করে চলেছে; এবং যেখানেই মুসলিম জাতিগুলি এই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজেদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাধারণ জনমমত তাদের প্রতিরোধকে আখ্যায়িত করছে ‘জেনোফোবিয়া বলে, তাদের সরল বিশ্বাস আহত হয়েছে, এই মনোভাব নিয়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু ঘটছে তাকে এমনি স্থুলভাবে সরল করে দেখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ইতিহাসকে কেবলমাত্র ইউরোপের স্বার্থের এলাকা বিচার করতে ইউরোপ বহুকাল ধরে অভ্যস্ত। যদিও পশ্চিমাদের সর্বত্র (বৃটেন ছাড়া) জনমত সব সময়ই প্রচুর সহানুভূতি দেখিয়েছে আইরিশ আযাদী আন্দোলনের প্রতি অথবা (রাশিয়া ও জার্মানীর বাইরে) পোল্যান্ডের জাতীয় জাগরণের প্রতি, তবু মুসলমানদের এরূপ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতি সে সহানুভুতি কখনো সম্প্রসারিত হয়নি। পশ্চিমের প্রধান যক্তিই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভাঙন এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা; এবং প্রত্যেকটি সক্রিয় পশ্চিমী হস্তক্ষেপেরই উদ্দেশ্য, এই হস্তক্ষেপের উদ্যোক্তাদের মতে (এবং খালিস নিয়তের ভান করেই তারা এরূপ বলে থাকে), কেবল পশ্চিমের আইনসংগত’ স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, স্থানীয় লোকদের নিজেদের প্রগতি সাধনও বটে!

বাইরের প্রত্যেকটি সরাসরি, এমনকি, সদাশয় হস্তক্ষেপও যে একটি দেশের বিকাশকে কেবল বিঘ্নিতই করে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের পশ্চিমী জ্ঞানার্থীরা তা বেমালূম ভূলে গিয়ে এ ধরনের দাবিগুলি গিলতে হামেশাই উৎসুক! তারা কেবল দেখে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি দ্বারা তৈরি নতুন রেলপথসমূহ; একটি দেশের সামাজিক কাঠামোর ধ্বংস তাদের নজরে পড়ে না। তারা নতুন বিজলীর কিলোয়াট গোণে, একটি জাতির আত্মগৌরবের উপর যে আঘাত হানা হয় তা গোণে না।

বলকানে অস্ট্রিয়ার হস্তক্ষেপের যুক্তিসংগত অজুহাত হিসাবে অস্ট্রিয়া কর্তৃক বলকানকে ‘সভ্য করার মিশন’ যে- সব লোক কখনো গ্রহণ করবে না, তারাই কিন্তু একই রকমের অজুহাত সাগ্রহে গ্রহণ করে থাকে ব্রিটেনের বেলায় মিসরে, রাশিয়ার বেলায় মধ্য এশিয়ায়, ফ্রান্সের বেলায় মরক্কোতে এবং ইতালীর বেলায় লিবিয়াতে; এবং একথা কখনো তাদের মনে জাগে না যে, মধ্যপ্রাচ্য যে – সব সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাধিতে ভুগছে তার অনেকগুলিই এই পশ্চিমী স্বার্থের প্রত্যক্ষ পরিনাম; একথাও তাদের মনে জাগে না যে, পশ্চিমী হস্তক্ষেপের অনিবার্য লক্ষ্য হচ্ছে আভ্য্ন্তরীণ যে ভাঙন এরি মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তাকে স্থায়ী এবং প্রশস্ততরো করে তোলা আর এভাবে সংশ্লিষ্ট জাতিগুলির আত্মস্থ হওয়াকে অসম্ভব করে তোলা।

আমি এটা পয়লা অনুভব করতে শুরু করি ১৯২২ সনে, যখনআমি আরব আর জিওনিস্টদের বিরোধের ব্যাপারে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বৈত ভূমিকা লক্ষ্য করি। আমার কাছে তা আরো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠলো ১৯২৩ সনের শুরুর দিকে, যখন অনেকগুলি মাস ফিলিস্তিনে ঘুরে ঘুরে কাটানোর পর আমি আসি মিসরে। মিসর তখন প্রায় একটানা বৈপ্লবিক আন্দোলন করে চলেছে ব্রিটিশ প্রটেকটরেটের বিরুদ্ধে। যে- সব প্রকাশ্য জায়গায় ব্রিটিশ সেপাইরা প্রায়ই যেতো সেখানেই নিক্ষেপ করা হতো বোমা- এং তার জবাব দেওয়া হতো নানারকম দমনমূলক পন্হায়- সামরিক শাসন, রাজনৈতিক গ্রেফতারী, নেতাদের নির্বাসন, পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু এ ব্যবস্থাগুলি যতো কঠোরই হোক এর কোনটিই জনসাধারণের আযাদী স্পৃহাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। গোটা মিসরীয় জাতির মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিলো ব্যাকুল নিরুদ্ধ কান্নার ঢেউ-এর মতো একটা কিছু- নৈরাশ্যে নয়, বরং এ ছিলো ব্যগ্র উৎসাহজনিত কান্না, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির মূল আবিস্কারের উত্তেজনায় ক্রন্দন!

সেই দিনগুলিতে কেবলমাত্র ধনী পাশারা, বিশাল বিশাল জমিদারীর যারা ছিলো মালিক, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তারাই ছিলো আপোসধর্মী। বাকী অগণিত মানুষ, যাদের মধ্যে ছিলো হতভাগা ‘ফেলাহিনে’রা, এক একর জমি যাদের মনে হতো একটা গোটা পরিবারের জন্য আর্শীবাদস্বরূপ এক সম্পদ, তারা সবাই সমর্থন করতো আযাদী আন্দোলনকে। একদিন হয়তো শোনা গেলো, খবরের কাগজের হকারেরা রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করছে- ‘ওয়াফদ পার্টির সকল নেতা মিলিটারী গভর্নর কর্তৃত গ্রেফতার’ কিন্তু পরদিনই, নতুন নেতার দ্বারা পূর্ণ হয়ে যেতো তাদের স্থান- এভাবে আযাদীর ক্ষুধা এবং বিদ্বেষ দুই বাড়তে থাকে। ইউরোপীয়দের এর জন্য একটি মাত্র শব্দই ছিলো- ‘জেনোফেবিয়া’।

সে সময়ে আমার মিসরে আসার মূলে ছিলো একটি ইচ্ছা- আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর জন্য আমার কাঝের পরিসর সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলাম ফিলিস্তিনের বাইরে, অন্যান্য দেশেও। ডোরিয়ান মামার আর্থিক অবস্থা অমন ছিলো না যে তিনি আমার জন্য অত্যুৎসুক তখন তিনি নিজেই অগ্রণী হয়ে আমাকে কিছু আগাম টাকা দিলেন, যাতে আমার জেরুজালেম থেকে কায়রো যাওয়া- আসার রেলের ভাড়া এবং সেখানে পনেরো দিন থাকার খরচ কোনো রকমে চলে।

কায়রোতে আমি থাকবার জায়গা পেলাম একটি চিপা গলিতে, যেখানে প্রধানত আরব হস্তশিল্পী ও গ্রীক দোকানদাররাই বাস করতো। আমার বাড়ির মালিক ছিলেন ত্রিয়েস্তিনের এক বৃদ্ধা, দীর্ঘংগী, ভারিক্কি, এলোমেলো, শুভ্রকেশী। তিনি সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কড়া গ্রীক শরাব গলায় ঢালতেন এবং এক মেজাজ থেকে আরেক মেজাজে হোঁচট খেয়ে পড়তেন। তাঁর মেজাজ ছিলো খুবই উগ্র আর তীব্র, যা কখনো তার নিজ স্বরূপ বুঝতো বলে মনে হয় না। কিন্তু তিনি আমার প্রতি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্না, আর তাঁর উপস্থিতিতে আমার ভালোই লাগতো।

প্রায় এক হপ্তা পরে আমার হাতের নগদ টাকা প্রায় ফুরিয়ে এলো। আমার ইচ্ছা ছিলো না যে আমি অতো তাড়াতাড়ি ফিলিস্তনে আমার মামার বাড়ির নিরাপত্তায় ফিরে যাই। তাই আমি আমার রুজির অন্য উপায় খুঁজতে শুরু করি।

আমার জেরুজালেমের বন্ধু ডঃ দ্যা হা’ন কায়রোর এক ব্যবসায়ীর নিকট একটি চিঠি দিয়েছিলেন আমার পরিচয় দিয়ে। আমি তাঁর কাছেই গেলাম পরামর্শের জন্য। তিনি হল্যাণ্ডের লোক; দেখলাম, তিনি খুবই উদার আর সহৃদয়, আর তাঁর নিজের কর্মক্ষেত্র অতিক্রম করে বহু দূর বিস্তৃত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎসুক্য ও আকর্ষণ। ইয়াকব দ্যা হা’নের চিঠি থেকে তিনি জানতে পারলেন যে, আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর একজন সংবাদদাতা। তাঁর অনুরোধে আমি যখন তাঁকে হালে ছাপা আমার কয়েকটি প্রবন্ধ দেখালাম, বিস্ময়ে তাঁর চোখের ভুরু একেবারে কপালে উঠে গেলোঃ

-‘বলুন, আপনার বয়স কতো?’

-‘বাইশ বছর’।

-‘তাহলে মেহেরবানী করে আমাকে অন্য কথা বলুন। এই প্রবন্ধগুলি দিয়ে আপনাকে কে সাহায্য করেছে?- দ্যা হা’ন?’

আমি হাসলাম- ‘অবশ্যি নয়, আমি নিজেই লিখেছি! আমি আমার কাজে হামেশা নিজেই করি। কিন্তু আপনি সন্দেহ করছেন কেন?’

তিনি তাঁর মাথা নাড়েন যেনো বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে- ‘কিন্তু খুবই তাজ্জব মনে হচ্ছে… এ ধরনের প্রবন্ধ লেখার পরিপক্কতা আপনি কোত্থেকে পেলেন? আপনি কেমন করে অর্ধেক একটি বাক্যে, যে- সব ব্যাপার অতো সাধারণ বলে মনে হয়, তাতেও প্রায় মরমী এক তাৎপর্য দান করেন?’

এর মধ্যে যে শ্রদ্ধা লুকানো ছিলো তাতে আমি অতোটা গৌরববোধ করি যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফলে, আমার আত্মমর্যাদাবোধ বেড়ে গেলো অনেক। আমার এই নতুন পরিচিত দোস্তের সাথে আলোচনায় বোঝা গেলো, তাঁর নিজের ব্যবসায়ে কর্ম- সংস্থানের কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু তিনি মনে করেন, তিনি হয়তো একটি মিসরীয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আমাকে একটি কাজ যোগাড় করে দিতে পারেন- যে প্রতিষ্ঠানটির সংগে রয়েছে তাঁর নিজের লেনদেন।

তিনি আমাকে যে অফিসটি দেখিয়ে দিলেন সেটি ছিলো কায়রোর এক প্রাচীনতরো মহল্লায়। আমার বাসা থেকে তা খুব দূরে ছিলো নাঃ একটি চিপা গলি- যার দু’পাশে রয়েছে এককালের অভিজাত বাড়িঘর; এখন যা অফিস আর সস্তা এপার্টমেন্টে রূপান্তরিত। আমার ভাবী মুনিব একজন বয়স্ক, টেকো, মিসরীয় ব্যবসায়ী, যার মুখখানা সময়ে-পাকা এক শকুনেরই মুখের মতো। তাঁর একজন পার্ট- টাইম কেরানী দরকার, তাঁর হয়ে ফরাসী ভাষায় চিঠি- পত্রের আদান- প্রদানের জন্য। আমি তাঁকে এ বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে পারলাম যে, এ দায়িত্ব পালন আমি করতে পারবো, যদিও ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা আমার একদম নেই। আমাকে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করতে হবে। সে অনুপাতে মাইনেও কম, কিন্তু এ মাইনেও আমার বাড়িভাড়া চুকানো আর অনির্দিষ্টকাল আমাকে রুটি, দুধি ও জলপাই-এ তৃপ্ত রাখার জন্য ছিলো যথেষ্ট।

আমার বাসা আর অফিসের মধ্যেই পড়ে কায়রোর বারাংগনা পল্লী। এলাকাটি হচ্ছে একটি জটিল গোলক- ধাঁধাঁ বিশেষ, যেখানে অভিজাত আর নীচ বারাংগনারা কাটায় তাদের দিন আর রাত। বিকালে আমি যখন কাজে যাই অলিগলিগুলি দেখি শূণ্য, নীরব। ঘুলঘুলি দেয়া জানালায় ছায়ায় কোনো নারী হয়তো তার দেহ ছড়িয়ে দিতো আলসভরে; এ-বাড়ি না হয় ও-বাড়ির সম্মুখে, ছোটো ছোটো টেবিলের পাশে বসে গম্ভীর মুখে, দাড়িওয়ালা লোকদের সাথে, শান্তভাবে কফি পান করে বালিকারা, আর তারা আর দৈহিক মত্ততা থেকে অনেক দূরের বলে মনে হতো।

কিন্তু সন্ধ্যায় যখন আমি ঘরে ফিরে আসি তখন দেখতে পাই মহল্লাটি অন্য যে- কোনো মহল্লা অপেক্ষা অধিকতরো প্রাণবন্ত। আরবীয় বাঁশির নরম মোলায়েম সুর এবং ঢোল ও নারীর হাসিতে গুঞ্জন উঠেছে মহল্লাটিতে। বহু বিজলী বাতি আর রঙিন লণ্ঠনের আলোর নিচ দিয়ে যখন আপনি হাঁটছেন, প্রতি পদক্ষেপেই একটি মোলায়েম বাহু জড়িয়ে ধরবে আপনার গলায়, বাহুটি হতে পারে বাদামী অথবা সাদা- কিন্তু সব সময়ই তা সোনা ও রূপার চেন আর চুড়িতে ঝনঝন করবে এবং সবসময়ই তাতে পাওয়া যাবে মেশক, গুগগুল ও উষ্ণ জন্তু-ত্বকের গন্ধ। আপনাকে খুবই দৃঢ় থাকতে হবে- নিজেকে এই সব সহাস্য আলিংগন এবং ‘ইয়া হাবিবী’ ‘হে আমার প্রিয় সাআদাতাক’, ‘সুখী হও তুমি’- এই সব আহবান থেকে মুক্ত রাখতে। আপনাকে পথ করে যেতে হবে স্পন্দিত অংগ-প্রত্যংগের মধ্য দিয়ে, যার অধিকাংশই সরল, সুন্দর এবং ইংগিতপূর্ণ দেহ-ভাজ দ্বারা আপনাকে মাতিয়ে দেয়। গোটা মিসর যেন ভেঙে পড়ছে আপনার উপর, ভেঙে পড়ছে মরক্কো, আলজিরিয়া, ভেঙে পড়ছে সুদান, নুবিয়া, ভেঙে পড়ছে আরব, আর্মেনিয়া, সিরিয়া, ইরান- গৃহের দেয়ালের সাথে লম্বালম্বি করে রাখা বেঞ্চির উপর পাশাপাশি বসেছে লম্বা, রেশমী জামা-কাপড় পরা লোকেরা- হর্ষে উৎফুল্লা… হাসছে, মেয়েদের ডাকছে, অথবা নীরবে নারকেলের হুকা টানছে। ওরা সকলেই কিন্তু এখানকার ‘খদ্দের’ নয়… অনেকেই এসেছে, এই মহল্লার গতানুগতিকতামুক্ত হর্ষোৎফুল্ল আবহাওয়ায় দু-একটা ঘণ্টা কাটাতে… কখনো বা আপনাকে পিছিয়ে যেতে হ্চেছ সুদানের ছেঁড়া-জীর্ণ কাপড় পরা দরবেশের সমুখ হতে, যিনি ভিক্ষা চেয়ে গান গাইছেন আবিষ্ট মুখে, অনড় দু’হাত বাড়িয়ে। সুগন্ধি বিক্রেতা হকারের দোলায়মান ধুনচি থেকে ওঠা ধুপের ধোঁয়া, কুণ্ডলী-পাকানো মেঘের আকারে আপনার মুখকে বুরুশ করে দিচ্ছে! প্রায়ই আপনি শুনতে পাচ্ছেন মিলিত কণ্টে গান এবং আপনি বুঝতে শুরু করবেন শোঁ শোঁ করা, মোলায়েম আরবী ধ্বনিগুলির কোন কোনটির অর্থ। …. এবং ঘুরে ফিরে আপনি শুনতে পাচ্ছেন কোমল, কল- কল্লোলের মতো, সুখের উক্তি… ঔসব বালিকার জান্তব সুখ (কারণ ওরা সন্দেহাতীতভাবেই উপভোগ করছিলো নিজেদেরকে), যাদের পরনে রয়েছে হালকা-নীল, হলদে, লাল, সবুজ, সাদা, ঝিলিক-মারা সোনালি পোশাক, মিহি রেশমী, সূক্ষ্ম জালি জালি করে বোনা পাতলা টিউল, ভয়েল অথবা বুটিদার কাপড় তৈরি- আর ওদের হাসি যেন নূড়ি বিছানো ফুটপাতের উপর দিয়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদক্ষেপে ছুটে চলেছে- এই উচ্ছাসিত, এই নিম্নগামী এবং পরমহূর্তেই আবার স্ফূরিত হচ্ছে অন্যদের ওষ্ঠ থেকে…।

এই মিসরীয়রা- কী করে ওদের পক্ষে সম্ভব হতো এই হাসি? কী আনন্দ আর ফুর্তির সংগেই না ওরা, দিন নেই রাত নেই, চলতো কায়রোর পথে পথে, দুলনী চালে, লম্বা লম্বা ধাপে পা ফেলতে ফেলতে, ওদের দীর্ঘ শার্টের মতো ‘গাল্লাবিয়া’ গায় দিয়ে, যাতে থাকতো ডোরা, রংধনুর প্রত্যেকটি রঙের- চলতো ওরা লঘু চিত্তে, মুক্ত মনে, যাতে করে মনে হতো, মানুষের জীবনকে চূর্ণ করা দারিদ্র্য, অসন্তোষ আর রাজনৈতিক বিক্ষোভ, এ সমস্তকে মানুষ গুরুত্ব দেয় কেবলি আপেক্ষিক অর্থে। এই মানুষগুলির প্রচণ্ড বিস্ফোরণমুখী উত্তেজনায় সবসময়ই, দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন ভাবান্তর ছাড়াই অবকাশ থাকতো। পরিপূর্ণ শান্তি, এমনকি আলস্যৈর যেন কিছুই কখনো ঘটেনি এবং কিছুই খোয়া যায়নি। এজন্য অধিকাংশ ইউরোপীয়রা মনে করতো (এবং হয়তো এখনো মনে করে) আরবরা মানুষ হিসাবে লঘু, ভাসাভাসা! কিন্তু প্রথমদিকে, সেই দিনগুলিতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম- আরবদের প্রতি পশ্চিমের এই তাচ্ছিল্যের মূলে রয়েছে যে- সব আবেগ ‘গভীর’ প্রতীয়মান হয় সেগুলিকে অতি-গুরত্বি দেয়ার প্রবণতা এবং যা-কিছু ‘লঘু’ ভাসাভাসা, যা কিছু হাল্কা, বায়বীয় এবং নির্ভার তাকেই নিন্দা করার প্রবণাত। আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে সব মানসিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ও চাপ পশ্চিমের বৈশিষ্ট্য আরবরা মুক্ত রয়েছে সেগুলি থেকে। কাজেই আমাদের মাপকাঠি আমরা ওদের বেলায় কী করে ব্যবহার করতে পারি?ওদের যদি ‘লঘু’ ভাসাভাসাই মনে হয়, তারো কারণ হয়তো এই যে, ওদের আবেগগুলি দ্বন্দ্ব- সংঘাতের মুকাবিলা না করেই স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হয় ওদের আচরণের মধ্যে। হয়তো ‘পশ্চিমীকরণের’ চাপে ওরাও ধীরে ধীরে বাস্তবের সাথে সাক্ষাৎ যোগাযোগের এই স্বাভাবগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বসবে। কারণ, ঐ পশ্চিমী প্রভাব নানাভাবে সমকালীন আরব চিন্তার ক্ষেত্রে একটা উদ্দীপক ও ফলপ্রসূ নিমিত্ত হওয়া সত্ত্বেও অনিবার্যভাবেই তা আরবদের মধ্যে সেই সব মারাত্মক সমস্যাই সৃষ্টি করে যার দ্বারা পশ্চিমের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবন পীড়িত, বিড়ম্বিত।

…..     …..        …..      …..

আমার ঘরের ঠিক বিপরীতদিকেই- এবং অতো নিকটে যে আমি হাত বাড়িয়ে প্রায় নাগাল পেতে পারি- দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা মসজিদ, যার রয়েছে সরু একটি মিনার, যে মিনার থেকে রোজ পাঁচবার সালাতের জন্য দেয়া হয় আযান। সাদা পাগড়ি পরা একজন লোক মিনারে চড়ে দু’হাত তুলে সুর করে গায়- আল্লাহু- আকবার’ – আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল… এ যখন ধীরে ধীরে চারদিকে মুখ ফেরায় তার কণ্ঠের ধ্বনি উঠতে থাকে উর্ধ্ব দিকে, পরিষ্কার হাওয়ায় তা  বুলন্দ হয়ে ওঠে, আরবী ভাষায়- গলা থেকে- আসা গভীর শব্দগুলির উপর দোল খেতে খেতে, আন্দোলিত হয়ে, কখনো আগিয়ে কখনো পিছিয়ে। ওর গলার স্বর গাঢ় উদাত্ত,  মোলায়েমএবং দৃঢ়- যার মধ্যে অবকাশ রয়েছে অনেক ওঠা- নামার। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, তপ্ত আবেগই কণ্ঠস্বরকে করেছে সুন্দর, বলার চাতর্য নয়!

-‘মুয়াজ্জিন’- এর এই সুর ছিলো কায়রোতে আমার দিবস ও সন্ধ্যার মূল সংগীত- ঠিক যেমন তা আমার জন্য মূল সংগীত ছিলো প্রাচীন জেরুজালেম নগরীতে এবং পরবর্তিকালেও মুসলিম দেশগুলিতে তা-ই আমার প্রত্যেকটি সফরকালে বিদ্যমান ছিলো আমার একমাত্র সংগীতরূপে। উপভাষার পার্থক্য এবং লোক- সমাজের রোজকার কথাবার্তার উচ্চারণের যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা সত্ত্বেও আযান ঘোষিত হয় সর্বত্রঃ শব্দের এই ঐক্য থেকে, আমি আমার কায়রোর সেই দিনগুলিতেই উপলব্ধি করি, সকল মুসলমানের মধ্যে অন্তরের ঐক্য কতো গভীর এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের যে রেখা রয়েছে তা কতো কৃত্রিম আর অর্থহীন। ওদের চিন্তার পদ্ধতি একই, ভাল-মন্দ সৎ-অসতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের বেলায় সকল মুসলমানই এক এবং মহৎ জীবনের উপাদানগুলি সম্পর্কে ওদের ধারণাও অভিন্ন।

এই প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো আমি অমন একটি জনগোষ্ঠির দেখা পেয়েছি যেখানে মানুষে মানুষে আত্মীয়তা, দৈবক্রমে একই রক্ত- বংশজাত হওয়ার উপর বা অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক নয়- বরং তার ভিত্তি অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি স্থায়ী কিছু। এ আত্মীয়তার উৎস একই দৃষ্টিভংগি, যে দৃষ্টিভংগি মানুষে মানুষে নিঃসংগতাস্বরূত যতো রকম প্রতিবন্ধক রয়েছে সমস্ত কিছুকেই করে উন্মুলিত।

১৯২৩ সনের গ্রীষ্মে মধ্যপ্রাচ্যের জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছতরো দৃষ্টিভংগিতে সমৃদ্ধ হয়ে আমি ফিরে আসি জেরুজালেমে।

আমার বন্ধু ইয়াকব দ্য হানের সহায়তায় পাশ্ববর্তী এলাকা ট্রানসজর্ডানের আমীর আবদুল্লাহর সাথে আমি পরিচিত হই। তিনি আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর মুলুকে। এখানেই আমি পয়লা দেখলাম একটা খাঁটি বেদুঈন দেশ। রাজধানী আম্মান, টলেমিআস ফিলাডেলফাস কর্তৃক নির্মিত গ্রীক উপনিবেশ ফিলাডেলফিয়ার ধ্বংসাবশেষের উপর তৈরি একটি ছোট শহর ছিলো তখন। লোক সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি ছিলো না। রাস্তাঘাটগুলি ভর্তি বেদুঈনদের দ্বারা, খোলা স্তেপ অঞ্চলের খাঁটি বেদুঈন!, যাদের ক্বচি* দেখা যায় ফিলিস্তিনে- স্বাধীন যোদ্ধা আর উটপালক বেদুঈন! সার্কসিয়ান গরুর গাড়িগুলি (কারণ, শহরটি প্রথম আবাদ করেছিলো সার্কাসিয়ানরা; ওরা উনিশ শতকে ওদের স্বদেশ রাশিয়ানরা দখল করে নিলে এদেশে চলে এসে এখানে বসতি স্থাপন করে) আস্তে আস্তে কষ্টে- সৃষ্টে চলতো বাজারের মধ্য দিয়ে। বাজারটি আকারে বড় হলেও এতে যে হট্টগোল ও উত্তেজনা দেখা যেতো তা অনেক বেশি বড়ো এক নগরীকেই মানায়।

শহরে দালান-কোঠা খুব বেশি ছিলো না; তাই আমীর আবদুল্লাহ তখন বাস করছিলেন পাহাড়ের উপর এক তাঁবু খাটানো ক্যাম্পে; পাহাড়টি যেনো উপর দিক হতে তাকিয়ে আছে নিচে, আম্মানের দিকে। তাঁর তাঁবুটি ছিলো অন্যান্য তাঁবুর চেয়ে কিছুটা বড়ো; তার মধ্যে ছিলো ক্যানভাসের পার্টিশন দেয়া কয়েকটি কোঠা; চূড়ান্ত সরলতায় তাঁবুটি আলাদা ছিল অন্য সকল তাঁবু থেকে। এরি একটি কোঠায়, এক কোণে জমিনের উপর কালো ভালুকের চামড়া বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিছানা। অভ্যর্থনা কোঠায়, কেউ যখন গালিচার উপর বসতো তখন তার বাহুদ্বয় রাখার জন্য সেখানে ছিলো রূপার কাজ-করা অগ্রভাগ বিশিষ্ট এক জোড়া সুন্দর উটের জীন।

আমীরে’র প্রধান পরামর্শদাতা ডঃ রিজা তওফিক বে’র করে যখন আমি তাঁবুতে ঢুকলাম, তখন কেবল একজন নিগ্রোই ছিলো সেখানে, যার পরনে ছিলো জমকালো ব্রোকেডের জামা-কাপড় আর কোমরে একটি সোনার ছুরি। রিজা তওফির বে’ ছিলেন একজন তুর্কী, আগে ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক,আর কামাল আতাতুর্কের আগে, তিন বছরের জন্য ছিলেন তুর্কী মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি আমাকে বললেন, আমীর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরবেন। এই মুহূর্তে তিনি কয়েকজন বেদুঈন সর্দারের সাথে আলাপ করছেন দক্ষিণ ট্রান্সজর্ডানে সর্বশেষ নযদী হানা নিয়ে। ঐ সব নযদী ওয়াহাবীরা, ডঃ রিজা আমাকে বোঝালেন, ইসলামের অভ্যন্তরে অমন একটি ভূমিকা গ্রহণ করেছে যা খৃশ্চান জগতের গোঁড়া সংস্কারপন্হীদের থেকে আলাদা নয়, কারণ ওরা পীর-দরবেশের পূজার ঘোর বিরোধী, বহুশতকের পরিক্রমায় যে-সব মরমী কুসংস্কার ইসলামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে সেগুলিরও ঘোর বিরোধী। তা’ছাড়া, ওরা শরীফী খান্দানেরও আপোসহীন দুশমন, যে-খান্দানের প্রধান হচ্ছে ‘আমীরে’র পিতা, হিজাজের বাদশাহ হোসাইন। রিজা তওফিক বে’র মতে, ওয়াহাবীদের ধর্মীয় মতামত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা যায় না; আসলে, ওদের মতামত, অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের জনসাধারণের মধ্যে যে-সব ধারণা রয়েছে তার চেয়ে আল কুরআনের মর্মের অনেক কাছাকাছি। আর তা ইসলামের সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর বিস্তার করতে পারে এক কল্যাণকর প্রভাব। অবশ্য ওদের অতিশয় গোড়ামি অন্যান্য মুসলমানের পক্ষে ওয়াহাবী আন্দোলনকে পুরাপুরি বোঝা কিছুটা কঠিন করে তুলেছে; আর এই ক্রটি, তিনি বলেন, কোন কোন বিশেষ মহলে হয়তো অনভিপ্রেত নয়, যারা আরব জাতিগুলির সম্ভাব্য পূনর্মিলনকে এক ভয়ংকর বিপদের সম্ভাবনা বলে গন্য করে।

কিছুক্ষণ পর ‘আমীর এসে ঢুকলেন। চল্লিশের মতো বয়স- মাঝারী আকৃতি, ছোট সোনালী রঙের দাড়ি, কালো প্যাটেন্ট চামড়ার চটি পায়ে, মৃদু পদক্ষেপে, সাদা ঝকঝকে রেশমের ঢিলা আরবী পোশাকে- যার উপরে রয়েছে প্রায় স্বচ্ছ সাদা সূতী ‘আবায়া। তিনি বলেনঃ

-‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘এ আপনারই ঘর, সহজ হোন’, এই প্রথম আমি শুনলাম- এই সুন্দর আরবী অভিবাদন!

আমীর আব্দুল্লাহর ব্যক্তিত্বের মধ্যে অমন কিছু রয়েছে যা আকর্ষণীয়, যা প্রায় বলপুর্বক জয় করে নেয় মানুষকে- আর সে জিনিস হচ্ছে তাঁর প্রগাঢ় রসবোধ, তাঁর আবেগ- তৃপ্ত কথাবার্তা আর তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। সে সময় যে তিনি কী জন্য তাঁর লোকজনের কাছে অতো জনপ্রিয় ছিলেন তা বুঝতে কষ্ট হয় না। অবশ্য তিনি তুর্কীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের প্ররোচিত শরীফীয় বিদ্রোহে যে ভূমিকা গ্রহণ করেন তার জন্য বহু আরব খুশি ছিলো না। ওরা তাঁর এই ভূমিকাকে মুসলিমের প্রতি মুসলিমের বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে করতো। তা সত্ত্বেও জিওনিজমের বিরুদ্ধে আরবদের স্বার্থ রক্ষার নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তিনি বেশ কিছুটা মর্যাদা হাসিল করেন। সেদিন তখনো আসেনি যখন তার রাজনীতির পাকচক্র তাঁর নামকে গোটা আরব জাহানে করে তুলবে ঘৃণ্য।

হাবশী পরিচালক, ছোট ছোট যে পেয়ালায় আমাকের কফি পরিবেশন করলো,এ থেকে চুমুক দিয়ে কফি খেতে খেতে আমরা কথা বলছিলাম। মাঝে মাঝে আমাদের সাহায্য করছিলেন ডঃ রিজা, তিনি চমৎকার ফরাসী বলতেন। আমরা কথা বলছিলাম এই নতুন দেশ ট্রান্সজর্ডানের শাসন বিষয়ক অসুবিধাগুলি নিয়ে। ওখানে প্রত্যেক ব্যক্তিই অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে এবং কেবল নিজের কবিলার আইন-কানুন মানতেই সে অভ্যস্ত।– ‘কিন্তু, ‘আমীর বললেন, ‘আরবদের কাণ্ডজ্ঞান চমৎকার। বেদুঈনরা পর্যন্ত বুঝতে শুরু করেছে- বিদেশী প্রভুত্ব থেকে মুক্ত হতে হলে, ওদের পুরানো যেমন- খুশি চলার অভ্যাস অবশ্যি বর্জন করতে হবে। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যেসব ঝগড়া-ফাসাদের কথা আপনি নিশ্চয় শুনে থাকবেন সেগুলি এখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।

এরপর তিনি অসংযত চঞ্চল বেদুঈনদের বর্ণনা করে চলেনঃ ওরা সামান্যতম উসিলায়ই নিজেদের মধ্যে লড়াই করে থাকে। ওদের খান্দানগত শক্রতা প্রায়ই বহু পুরুষ ধরে চলতে থাকে এবং কখনো কখনো তা পিতা থেকে পায় পুত্র, এমনকি শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে- যার ফলে চলতে থাকে নিত্যনতুন খুনজারি, রক্তপাত এবং নবতরো তিক্ততা, আদি কারণটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ মাত্র একটিই আছে; পূর্বতর নিহত ব্যক্তিটির গোত্র ও কবিলার কোন জোয়অন যদি অপরাধীর গোত্র ও কবিলার কোন  কুমারীকে অপহরণ করে এবং তাকে বিয়ে করে, তাহলে বিয়ের রাতের রক্ত- যা খুনীর কবিলার রুক্ত- প্রতীক- রূপে এবং চূড়ান্তভাবে, হত্যার সময় যে রক্তপাত করা হয়েছিলো তারই প্রতিশোধরূপে গণ্য হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায়, বহু পুরুষ ধরে বিদ্যমান শক্রতায় উভয় গোত্রের লোকেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কারণ তাতে উভয় দলেরই শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। এমন সব ক্ষেত্রে প্রায়ই তৃতীয় গোত্রের কোন ঘটক কর্তৃক অপহরণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

-‘আমি এর চাইতেও ভালো করেছি’, আমীর আমাকে বললেন, ‘আমি যথার্থ খান্দানী শক্রতা কমিশন’ গঠন করেছি; এই কমিশন বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে গঠিত। ওরা সারা দেশে ঘুরে বেড়ায় এবং বিবাদমান গোত্রগুলির মধ্যে  এই ধরনের প্রতীকী অপহরণ ও বিয়ের ব্যবস্থা করে থাকে। ‘কিন্তু’, বলতে তাঁর চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে- ‘আমি সবসময় কমিশনের সদস্যদের বোঝাবার চেষ্টা করি’- যেন তারা কুমারীদের নির্বাচন করতে গিয়ে হুশিয়ারির সাথে কাজ করে- কারণ, আমি চাই না যে, বরের সম্ভাব্য হতাশার কারণে আবার পরিবারের ‘ভেতরেই শক্রতা সৃষ্টি হোক’।,,,,

দরমের আড়াল থেকে বার হয়ে একটি বালক, বারো বছরের মতো ওর বয়স। সন্ধ্যার আঁধার নামা তাঁবুর কামরার ভেতর দিয়ে ও ছুটে যায় ক্ষিপ্রগতিতে, নিঃশব্দ পদক্ষেপে, আর তাঁবুর বাইরে রাখা একটা ঘোড়ার পিঠে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে, রেকাবে পা না রেখেই; একটি নওকর, ঘোড়াটিকে ধরে দাঁড়িয়েছিলো- ওরি জন্য প্রস্তুত ছিলো ঘোড়াটি; ছেলেটি আর কেউ নয়, ‘আমীরের বড়ো ছেলে তালা; তার হালকা দেহে, ঘোড়ার পিঠি একলাফে তার আরোহণে, তার উজ্জ্বল চাহনিতে আবার আমি লক্ষ্য করলাম সেই জিনিসঃ নিজের জীবনের সাথে স্বপ্নমুক্ত বাস্তব যোগ, যা আমি ইউরোপে যা- কিছু জানবার সুযোগ পেয়েছিলাম তার সব কিছু থেকেই আরবকে স্থাপন করেছে অত দূর ব্যবধানে!

তাঁর ছেলের প্রতি আমার এই সুস্পষ্ট সপ্রশংসা দৃষ্টি  লক্ষ্য করে ‘আমীর’ বললেন- ‘অন্য প্রত্যেকটি আরব শিশুর মতোই সে বেড়ে উঠেছে কেবল একটিমাত্র চিন্তা মনে নিয়েঃ মুক্তি, আযাদী।‘ আমরা আরবরা মনে করি না যে, আমাদের কোন ক্রটি নেই অথবা আমরা ভূল থেকে মুক্ত। তবে আমরা আমাদের ভূলগুলি নিজেরাই করতে চাই এবং এভাবে শিখতে চাই- কেমন করে এই ভূলগুলি থেকে বাঁচা যায়। ঠিক যেমন একটি গাছ বাড়তে বাড়তেই জানে কেমন করে বাড়তে হয়; কিংবা একটি স্রোত চলতে চলতে খুঁজে পায় ওর নিজের সঠিক চলার পথ। সে সব লোকের নিজেদের কোন প্রজ্ঞা নেই- যাদের আছে কেবল ক্ষমতা আর বন্দুক আর অর্থবিত্ত, যারা জানে কেবল সেইসব বন্ধুদের হারাতে যাদেরকে ওরা সহজেই রাখতে পারতো নিজেদের বন্ধুরূপে- আমরা চাই না যে, তারা আমাদেরকে প্রজ্ঞার পথ দেখাক! [সে সময়ে (১৯২৩) কেউই আঁচ করেনি যে, পরবর্তীকালে আমীর আবদুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র তালালের সম্পর্ককে নষ্ট করে দেবে তীব্র বিরোধীতা- পুত্র ঘেন্ন করছেন আরব জগতে ব্রিটিশ নীতির প্রতি তাঁর পিতার আপস মনোভাবকে এংব পিতা তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করছেন তাঁর তীব্র স্পষ্ট ভাষণের বিরুদ্ধে। তখন কিংবা পরে তালালের মধ্যে কখনো আমি দেখিনি- কোন মানসিক ব্যাধির লক্ষণ, যে ওজুহাত তাঁকে ১৯৫২ সনে বাধ্য করা হয় জর্ডানের তখত ত্যাগ করতে।]

অনির্দিষ্টকালের জন্য ফিলিস্তিনে থাকার ইচ্ছা আমার ছিলো না। ইয়াকব দ্য হা’ন আবার ছুটে এলেন আমার সাহায্যে। সাংবাদিক হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিলো সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ইউরোপের সর্বত্র নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে ছিলো তাঁর সম্পর্ক। তাঁর সুপারিশের ফলে আমি দুটি ছোট খবরের কাগজের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে সক্ষম হই ধারাবাহিকভাবে কতকগুলি প্রবন্ধ লেখার জন্য; কাগজ দু’টির একটি ইংল্যান্ডের, অপরটি সুইজারল্যান্ডের। চুক্তি হলোঃ কাগজ দুটি আমার পারিশ্রমিক পরিশোধ করবে ডাচ গিল্ডারে এবং সুইস ফ্রাঁ-তে। কাগজগুলি ছিলো প্রাদেশিক ধরনের আর এদের খুব বেশি মর্যাদাও ছিলো না। মোটা মাইনা দেবার ক্ষমতা ওদের ছিলো না। কিন্তু আমার চালচলন সরল হওয়ায় ওদের কাছ থেকে আমি যে অর্থ পেলাম তাই আমার পরিকল্পিত মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত সফরের খরচের জন্য যথেষ্ট মনে হলো।

আমার ইচ্ছা ছিলো- প্রথমে আমি যাই সিরিয়ায়। কিন্তু ফরাসী কর্তৃপক্ষ, যারা সবেমাত্র এক শক্রভাবাপন্ন জনতার মাঝখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, অষ্ট্রিয়ার একজন প্রাক্তন বিদেশী শক্র-সৈন্যকে প্রবেশ পত্র দিতে রাজী ছিলো না। এ আঘাত ছিলো নিষ্ঠুর; কিন্তু এ ব্যাপারে আমার করবার কিছুই ছিলো না। তাই আমি স্থির করলাম- আমি হাইফা যাবো এবং সেকানে গিয়ে জাহাজে উঠবো ইস্তাম্বুলের পথে। বলাবাহুল্য এ-ও ছিলো আমার পরিকল্পনার অন্তর্গত।

জেরুযালেম থেকে হাইফা যাওয়ার ট্রেনে সফরে আমি এক মুসিবতে পড়ি।আমার একটা কোট পথে হারিয়ে যায়, যার মধ্যে ছিলো আমার ছাড়পত্র আর একটি ছোট্ট থলে। আমার কাছে রইলো কেবল কটি রূপার মুদ্রা আমার প্যান্টের পকেটে। কাজেই এখনকার মতো আমার ইস্তাম্বুল যাওয়ার কোন প্রশ্নইওঠে নাঃ পাসপোর্ট নেই, টাকাও নেই। বাসে করে জেরুযালেম ফেরা ছাড়া আমার আর কোন গতি রইলো না। ভাড়া পরিশোধ করতে হবে সেখানে পৌঁছুনোর পর, বরাবরকার মতোই, ডোরিয়ান মামার কাছ থেকে ধার করে। জেরুযালেম আমাকে অপেক্ষা করতে হবে কয়েক সপ্তাহ, কায়রোর অস্ট্রীয় কনসুলেট থেকে একটি ছাড়পত্রের জন্য (কারণ, তখন ফিলিস্তিনে কোন কনসুলেট ছিলো না) এবং হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড থেকে আরো কিছু অর্থের জন্য।

এমনি করে পরদিন সকালবেলা আমি গিয়ে হাজির হই হাইফার প্রান্তে, একটি বাস- অফিসে। ভাড়া সম্পর্কে কথাবার্তা শেষ করে নিলাম। বাস ছাড়ার তখনো এক ঘন্টা বাকি। সময় কাটানোর জন্য আমি রাস্তায় পায়চারি শুরু করি, কখনো সামনে, কখনো পেছনে ফিরে আসি; নিজের প্রতি আমার অপরিসীম বিরক্তি- বিরক্তি আমার ভাগ্যকে নিয়ে যা আমাকে বাধ্য করছে জীবন সংগ্রামে অমন হীনভাব পিছু হটতে। ইস্তেজারি সবসময়ই অপ্রীতিকর- এবং জেরুজালেম প্রত্যার্তনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, আমার এই চিন্তা, এই পরাজয়বোধ ছিলো সবচাইতে তিক্ত, বেশি করে আরো এ কারণে যে, এরূপ সামান্য টাকা-পয়সা নিয়ে আমি আমার পরিকল্পনা কার্যকরী করতে পারবো কি-না, এ সম্বন্ধে ডোরিয়ান ছিলেন হামেশাই সন্দিহান। তাছাড়া আমি সিরিয়া সফর করতে পারবো না এবং আল্লাহই জানেন, আবার কখনো আমি আসতে পারবো কি-না পৃথিবীর এই এলাকায়। এ সম্ভাবনা অবশ্যি ছিলো যে, পরবর্তী কোন সময় ‘ফ্লাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’ মধ্যপ্রাচ্যে আমার আরেকটি সফরের খরচ বহন করতে পারে এবং ফরাসী সরকারও পারে কোন একদিন  প্রাক্তন-শক্র বিদেশীদের উপর থেকে তাদের বাধা-নিষেধ তুলে নিতে। কিন্তু তা নিশ্চিত ছিলো না এবং ইত্যবসরে দামেশক সফরের সৌভাগ্য আমার এবার আর হলো না… ‘কেন’ আমি নিজেকে জিগগাস করি, তিক্তভাবে, ‘দামেশক নিষিদ্ধ হলো আমার জন্য?’

কিন্তু আসলে কি তা-ই সত্য? অবশ্য আমার পাসপোর্ট নেই, টাকা-কড়িও নেই। কিন্তু পাসপোর্ট আর টাকা-কড়ি কি সত্যি একেবারে অপরিহার্য ছিলো…?

চিন্তায় এতোদূর আগানোর পর হঠাৎ আমি থেকে যাই। যদি মনোবল থেকে যথেষ্ট, আমি পায়দল সফর করতে পারি, আরব গেরামবাসীদের উপর ভরসা করে। এবং হয়তো- বা আমি কোন-না কোনভাবে গোপেন পার হয়ে যেতে পারি সরহদ-পাসপোর্ট আর প্রবেশপত্রের জন্য মাথা না ঘামিয়েই…।

এবং আমি এ ব্যাপারে পূরাপূরি অবহিত হওয়ার আগেই আমার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়ে গেলোঃ আমি দামেশ যাচ্ছি। আমি আবার মত বদলে ফেলেছি এবং শেষতক আমি জেরুযালেম যাচ্ছি না, বাস চালকদের একথা বোঝাতে মিনিট দূয়েক সময়ই ছিলো যথেষ্ট। আমার আরো কয়েক মিনিট লাগলো, একজোড়া নীল ওভার-অল ও একটি আরবী ‘কুফিয়া’ যোগাড় করতে… (এ হচ্ছে আরবের ঝলসানো রোদ্দুর থেকে বাঁচার সম্ভাব্য উত্তম উপায়) কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনস একটি থলেতে ভরতে আর আমার স্যুটকেসটি ডোরিয়ান, সি. ও ডি- এর নিকট পাঠাবার ব্যবস্থা করতে। এরপর আমি রওনা দিলাম দামেশকের দীর্ঘ পায়ে হাঁটা-পথে।

যে অদম্য মুক্তিবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করেছিলো তাকে সুখ থেকে আলঅদা করা সম্ভব ছিলো না। আমার পকেটে ছিলো মাত্র কয়েকটি ভাঙতি মুদ্রা। আমি একটি বেআইনী কাজের ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি, যার ফলে আমি নিক্ষিপ্ত হতে পারি জিন্দানখানায়। অস্পষ্ট, অনিশ্চিতরূপে আমার সামনে রয়েছে সরহদ পার হবার সমস্যাটি। আমি কেবল আমার চাতুর্যের উপর বাড়ি দিয়েছি এই উপলব্ধিই হলো আমার সুখের কারণ, আজ আমি সুখী।

আমি গ্যালিলির পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। বিকালের দিকে ‘ইস্ত্রেলন’ প্রান্তর পড়লো আমার ডানদিকে। আমি যে-পথ দিয়ে হাঁটছিলাম তার থেকে নিচু সেই প্রান্তর; এখানে ওখানে পড়েছে আলো আর ছায়ায় টুকরা টুকরা ফালি। আমি আগিয়ে গেলাম নাজারাতের মধ্য দিয়ে এবং রাতের আগেই পৌঁছুলাম একটি আরবীয় গায়েঁ- দারুচিনি আর সাইপ্রেস তরুর ছায়াঘেরা একটি পল্লীতে। পয়লা বাড়িটির দরোজায় বসে আছে তিন চারজন পুরুষ ও মেয়েলোক। আমি ওখান থেকে জিগগাস করি- এ গাঁ’টি ‘আর-রায়না’ কি না। যখন শুনলাম তা’ই, আমি আবার রওনা করতে উদ্যত হই। অমন সময় মেয়েদের একজন আমাকে ডাকলো- ‘ইয়া সিদি, আপনি কি নিজেকে একটু তাজা করে নেবেন না?’ তারপর, যেনো আমার পিয়াসের কথা বুঝতে পেরেই সে ঠাণ্ডা পানি ভর্তি একটি সুরাহী আগিয়ে দেয় আমার দিকে।

যখন আমি পানি খেয়ে জিঁউ ঠাণ্ডা করেছি তখন পুরুষদের একজন, বলাবাহুল্য, ঐ মেয়েটিরই স্বামী, আমাকে জিজ্ঞেস করেঃ

-‘আপনি কি মেহেরবানী করে আমাদের সাথে খানা খাবেন না? এবং রাতটা আমাদের ঘরেই কাটাবেন না?’

ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করলো না, আমি কে, কোথায় চলেছি এবং আমার উদ্দেশ্যই বা কী! আমি রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিলাম ওদের মেহমান হিসাবে।

কোন আরবের মেহমান হওয়া- ইউরোপের স্কুলের ছাত্র- ছাত্রীরা পর্যন্ত এ সর্ম্পে নানা কাহিনী শুনতে পায়। -কোন আরবের মেহমান হওয়ার অর্থই হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার জন্য, কিছুক্ষণের জন্য, সত্যিকারভাবে ও সম্পূর্ণভাবে এমন সব মানুষের জীবনে প্রবেশ করা যারা হতে চায় ‘আপনার ভাই বা বোন’। আরবদের অমন প্রবল, প্রাণঢালা মেহমানদারির মূলে যে কেবল একটা মহৎ ঐতিহ্যই কাজ করছে তা নয়, এর আসল কারণ হচ্ছে ওদের অন্তরের স্বাধীনতা। ওরা ওদের নিজেদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে অতোটা মুক্ত যে ওরা সহজেই ওদের হৃদয়কে মেলে ধরতে পারে অপরের কাছে। পশ্চিমী দেশগুলিতে প্রতিটি মানুষ তার নিজেরও পড়শীর মধ্যে যে-সব আপাতসুন্দর প্রাচীর গড়ে তোলে তার একটিও দরকার হয় না এই সব আরবের।

আমরা এক সঙ্গে খেলাম নারী ও পুরুষে মিলে, একটা মস্তবড়ো থালার চারপাশে, মাদুরের উপর পায়ের উপর পা রেখে বসে। থালাটি, মোটা করে ভাঙা গম আর দুধ মিশিয়ে তৈরি ‘পরিজে ভর্তি’। আমার মেজবানেরা বড়ো বড়ো অথচ কাগজের মতো পাতলা রুটির ছোট ছোট টুকরা ছিঁড়ে নিয়ে তার দ্বারা অমন কৌশলের সাথে পরিজ তুলছিলো যে, ওদের আঙুল কখনো লাগছিলো না পরিজে। আমাকে ওরা একটি চামচ দিলো; কিন্তু আমি তা না নিয়ে চেষ্টা করলাম, সাফল্যের সংগেই চেষ্টা করলাম ওদের সহজ অথচ পরিচ্ছন্ন চমৎকার খাবার পদ্ধতি অনুকরণ করতে এবং তাতে আমার বন্ধরা স্পষ্টই খুশি হলো।

আমরা যখন শুয়ে পড়লাম, প্রায় এক ডজন মানুষ, একই কোঠায়, আমি তাকালাম উপরে কড়িকাঠের দিকে, যেখান থেকে সারি সারি শুকনা মরিচ ও বেগুন গাছ ঝুলছে, তাকালাম তামা ও পাথরের তৈজস-পত্রে ভর্তি দেয়ারের তাকগুলির দিকে, আর ঘুমন্ত নারী ও পুরুষের দেহগুলির দিকে আর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আমার নিজের বাড়িই কি কখনো এর চাইতে বেশি আপনতরো মনে হতে পারতো আমার কাছে?

এরপরের দিনগুলিতে, যুদী পাহাড়ের মর্টে-বাদামী রঙ, তার নীলাভ-ধূসর আর বেগুনি ছায়া ধীরে ধীরে পেছনে পড়লে গ্যালিলির প্রসন্নতরো এবং উর্বরতরো পাহাড়গুলি নজরে এলো। বহু ফোয়ারা আর নহর আত্মপ্রকাশ করলো অপ্রত্যাশিতভাবে। লতাপাতা উদ্ভিত ক্রমেই ঘনতরো হয়ে ওঠে। দেখতে পেলাম- সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ঘন পত্রপুঞ্জে ছাওয়া জলপাই এবং উঁচু গাঢ় সাইপ্রেস বৃক্ষ; বিগত গ্রীষ্মের ফুল তখনো দেখা যাচ্ছিলো পাহাড়ের ঢালুগুলিতে।

কখনো কখনো আমি উট চালকের সাথে পথের কিছুটা অংশে হাঁটি এবং কিছুক্ষণের জন্য ওদের সরল হৃদয়ের উষ্ণতা উপভোগ করি। আমরা সবাই আমার ক্যান্টিন থেকে পানি খই এবং সকলে মিলে একই সিগ্রেট পান করি; তারপর আমি একাকী হাঁটি, রাতগুলি কাটাই আরবদের বাড়িতে,আর তাদের সংগে বসে তাদের রুটি খাই। আমি দিনের পর দিন হাঁটতে থাকি, গ্যালিলি হৃদের কিনার ঘেঁষে প্রসারিত গরম নিছু এলাকার ভেতর এবং হিউল হৃদ এলাকার মোলায়েম স্নিগ্ধ শৈত্যের মধ্য দিয়ে। হ্রদটি একটি ধাতব আয়নার মতো যার উপর রয়েছে রূপালী কুয়াশা, পানির উপর ঝুলে পড়া সন্ধ্যা- সূর্যের শেষ কিরণে কিছুটা রক্তিমাভ। উপকূলের নিকটেই বাস করে আরব জেলেরা, ডাল-পালা দিয়ে তৈরি করা চারের উপর কোন রকমে চাপিয়ে দেয়া পড়ের চাটাই- এর ঘরে। ওরা খুবই গরীব, কিন্তু ওদের এই হাওয়াই কুটিরে, রঙ-চটা, বিবর্ণ কিছু পরিচ্ছদ গায়ে, রুটি তৈরির জন্য কয়েক মুঠা গম এবং ওদের নিজেদের হাতে ধরা মাছ- এর বেশি কিছুর প্রয়োজন ওদের আছে বলে মনে হয় না, এবং সবসময়ই মনে হয় মুসাফিরকে ওদের ঘরে আহবান করা ও সংগে বসে খাওয়ার জন্য ওদের দাওয়াত প্রচুর রয়েছে।

ফিলিস্তিনের সবচাইতে উত্তরের স্থান হচ্ছে ইয়াহুদী উপনিবেশ মেতুলা; পরে আমি জানতে পেরেছিলাম এই মেতুলা ব্রিটিশ-শাসিত ফিলিস্তিন আর ফরাসী অধিকৃত সিরিয়ার মধ্যে একটুখানি ফাঁকা বিশেষ। দু’ গভর্নমেন্টের মধ্যে একটি চুক্তির ভিত্তিতে কিছুদিন পরই মেতুলা এবং পাশ্ববর্তী আরো দুটি উপনিবেশ ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্তবর্তীকালীন এই অল্প কটি হপ্তায় দু’ গভর্নমেন্টের কোনটিরই কার্যকর কোন কর্তৃত্ব ছিলো না মেতুলার উপর। কাজেই এটি ছিলো এক উত্তম স্থান, যেখান থেকে অতি সহজেই সিরিয়ায় ঢুকে পড়া যায়। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এরপর থেকে বড়ো রাস্তায় মুসাফিরদের কাছে থেকে সনাক্তি কাগড়-পত্র দাবি করা হয়। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণই নাকি কঠোর ছিলো বেশি। কার্যত বেশি দূর আগানো সম্ভবই ছিলো না। পুলিশ প্রত্যেক যাত্রীকেই বাধ্য করতো থামতে। তখনো মেতুলাকে মনে করা হতো সিরিয়ার একটি অংশ। কাজেই দেশের অন্য জায়গার বাসিন্দাদের মতোই, এখানকার প্রত্যেকটি বাসিন্দাদের ফরাসী কর্তৃপক্ষের দেয়া পরিচয়-পত্র বহন করতে হতো। এ ধরনের একটি পরিচয-পত্র যোগাড় করা আমার জন্য বিশেষ জরুরী হয়ে পড়লো।

আমি খুব সতর্কতার সাথে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর করতে থাকি। শেষপর্যন্ত আমাকে এমন একজন লোকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যিনি, হয়তো- বা কিছুটা লাভের বিনিময়েই, তাঁর নিজের পরিচয়-পত্রটি আমাকে দিয়ে দিতে পারেন। তিনি ছিলেন এক বিশাল পুরুষ, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স; বুক-পকেট থেকে ভাঁজকরা তেল চিটচিটে যে দলিলখানা তিনি বের করলেন তাতেও তাঁর বর্ণনা এরূপই ছিলো। কিন্তু দলিলটিতে কোন ফটোগ্রাফ না থাকায় সমস্যাটি অসমাধ্য মনে হলো না।

-‘আপনি এর জন্য কতো চান?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

-‘তিন পাউণ্ড’।

আমি আমার পকেটে যে ক’টি মুদ্রা ছিলো সব কটি বের করে গুণতে শুরু করি; গুণে দেখলাম পঞ্চান্ন ‘পিয়াস্তার’ আছে- অর্থাৎ কুল্লে আধ পাউণ্ডের সামান্য কিছু উপরে।

-‘এ-ই আমার সব’, আমি বললাম, ‘এ থেকে কিছুটা আমার সফরের বাকি অংশের জন্য অবশ্যি আমাকে রাখতে হবে। আমি আপনাকে কুড়ি পিয়াস্তারের বেশি দিতে পারবো না (অর্থাৎ তাঁর দাবির ঠিক এক-পঞ্চমাংশের বেশি দেবার ক্ষমতা আমার নেই)।

কয়েক মিনিট দর-কষাকষির পর ঠিক হলো পঁয়ত্রিশ ‘পিয়াস্তার’ দেয়া হবে। দলিলটা এখন আমার হাতে। এর একটা পাতা ছিলো ছাপানো, তাতে দু’টি কলাম- একটি ফরাসী ভাষায়, আরেকটি আরবীতে। প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ কালিতে লেখা হয়েছে বিন্দু বিন্দু রেখার উপরে। তাতে ব্যক্তিগত যে বর্ণনা রয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর খুব প্রয়োজন হয়নি আমার, কারণ এ ধরণের বর্ণনার বেলায় সাধারণত যা হয়ে থাকে এটিও তাই; অর্থাৎ বিস্ময়কভাবে অস্পষ্ট ঝাপসা এই বর্ণনা। কিন্তু তাতে যে বয়েস লেখা হয়েছে তা উনচল্লিশ অথচ আমার বয়স মাত্র তেইশ বছর এবং আমাকে দেখতে দেখায় কুড়ি বছরের। একজন অসতর্ক পুলিশ অফিসারের কাছেও এই গরমিল সহজেই ধরা পড়বে; কাজেই দলিলে বয়সের পরিমাণটা কমানো জরুরী হয়ে পড়লো, তবে বয়সের উল্লেখ কেবল এক জায়গায় থাকলে এ পরিবর্তন তেমন অসুবিধাজনক হতো না, কিন্তু আমারই বদনসিব, তা লেখা হয়েছে ফরাসী এবং আরবী উভয় ভাষাতেই। খুবই হুঁশিয়ারির সাথে আমি কলম ব্যবহার করি এই অংকটি বদলাবার জন্য; কিন্তু তাতে যা দাঁড়ালো সে জালিয়াতি বিশ্বাস পয়দা করার খুব উপযোগী মনে হলো না। আর চোখ আছে অমন হরেক আদমির কাছেই ধরা পড়বে যে, দুটি কলমেই অংকটি বদলানো হয়েছে। কিন্তু এছাড়া আর কোন করণীয় ছিলো না আমার। আমাকে নির্ভর করতে হবে আমার কপাল এবং পুলিশের অমনোযোগিতার উপর।

খুব সকালে আমার ব্যবসায়ী ইয়ারটি আমাকে নিয়ে গেলো গাঁয়ের পেছনে একটি গলিতে এবং প্রায় আধ মাইল দূরের কয়েকটি টিলার দিকে আঙুলি নির্দেশকরে বলল- ‘অই যে সিরিয়া’।

আমি গলির ভেতর দিয়ে চলছিলাম। তখন সকাল হলেও খুবই গরম পড়েছিলো এবং যে বৃদ্ধা আরব মহিলাটি টিলার কাছে এক গাছতলায় বসেছিলো, যে- টিলার ওপারেই রয়েছে সিরিয়া, তারো নিশ্চয়ই খুবই গরম লাগছিলো, কারণ সে শুকনো ভাঙা গলায় আমাকে ডেকে বললঃ

-‘তুমি কি এই বুড়িকে একটু পানি খাওয়াবে বেটা?’

আমি আামর এই মাত্র ভর্তি করা ক্যান্টিন কাঁধ থেকে নামিয়ে ওকে দিই। বুড়ি লোভীর মত ঢক ঢক করে খায় এবং ক্যান্টিনটি আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলেঃ

-‘আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত করুন; তিনি তোমাকে সহিসালামতে রাখুন এবং তোমার কাম্য মনযিলে পৌঁছিয়ে দিন।‘

-‘শুকরিয়া মা, আমি এর বেশি কিছু চাই না। এবং যখন আমি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম বৃদ্ধার ঠোঁট দুটি প্রার্থনায় কাঁপছে- আন্দোলিত হচ্ছে; আমি এক অদ্ভুত উল্লাস অনুভব করলাম।

আমি টিলাগুলি পর্যন্ত পৌঁছে সেসব পেছনে ফেলে যাই। আমি এখন সিরিয়ার। আমার সামনে পড়ে আছে এক বিস্তীর্ণ অনুর্বর সমতল এলাকা। বহু দূরে, দিগন্তের কাছে আমি দেখতে পেলাম গাছপালার চেহারা, আর অমন কিছু যা দেখতে অনেকটা ঘরের মতো। নিশ্চয়ই এ ‘বানিয়াস’ শহর। এই সমতল এলাকাটি আমার ভালো লাগলো না; কারণ এতে নেই গাছপালা, ঝোপঝাড় যার আড়ালে আবডালে গা ঢাকা দেয়া যেতে পারে, যা সরইদের অতো নিকটে বলেই প্রয়োজনীয় হযে উঠতে পারে। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। কেউ যখন স্বপ্নে এক জনবহুল রাস্তার মধ্য দিয়ে উলংগ হয়ে হাঁটে তখন তার স্বপ্নে যেমন মনে হয় আমারও নিজেকে ঠিক সেইরূপ মনে হলো।

তখন অনেকটা দুপুর হয়ে গেছে যখন আমি একটা ছোট নহরের কাছে পৌঁছুই- যে নহরটি প্রস্তরটিকে করেছে দু’ভাগ। আমি বসে জুতা ও মোজা খোলার চেষ্টা করছি এমন সময় দূরে তাকিয়ে দেখি চারটি ঘোড়-সওয়ার আসছে আমার দিকে। ওদের রাইফেলগুলি জিনের উপর আড়াআড়িভাবে রাখা; ফলে ওদেরকে দেখাচ্ছিলো ভয়ানক চেহারার ফৌজী পুলিশের মতো। আসলে ওরা ফৌজী পুলিশই ‘বটে’। তাই আমার পালানেরা চেষ্টা করার কোন মানেই হতো না। আমি মনে মনে এভাবে সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করি যে, যা ঘটনার তাই ঘটবে। এখন যদি ধরা পড়ি, আমাকে হয়তো রাইফেলের কয়েক ঘার বেশি দেয়া হবে না, আর আমাকে ওরা আবার নিয়ে যাবে মেতুলায়।

আমি নহরটি পার হয়ে উপরে গিয়ে বসি এবং খুব আস্তে আস্তে পা শুকাতে থাকি আর ফৌজী পুলিশেরা কাছে আগিয়ে আসক, তারি ইন্তেজারি করি। ওরা এসে আমার দিকে সন্দেহের নজরে তাকায়; কারণ যদিও আমি আরবী পাগড়ী পরেছিলাম, আমি যে একজন ইউরোপীয় তাতে কোন সন্দেহই ছিলো না।

-‘কোত্থেকে?’ ওদের একজন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আরবী জবানে আমাকে জিগগাস করে।

-‘মেতুলা থেকে।‘

-‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’

-‘দামেশকে’।

-‘মতলব?’

-‘ও, তেমন কিছু নয়, প্রমোদ ভ্রমণ!’

-‘কাগজপত্র কিছু আছে?’

-‘অবশ্যি’।

সংগে সংগে ‘আমর’ পরিচয়-পত্র বের হয়ে এলো আমার পকেট থেকে আর তার সংগে আমার হৃদপিণ্ডটা উঠে এলো আমার মুখে। ফৌজী পুলিশ কাগজের ভাঁজ খুলে তার দিকে তাকিয়ে দেখলো। আমার হৃদপিণ্ডটি আবার পিছলে নেমে গেলো যথাস্থানে আর স্পন্দিত হতে শুরু করলো। কারণ আমি দেখতে পেলাম, কাগজটির উপর দিকটা ও নিচু করে ধরেছে; বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ও পড়তে জানে না। দু’তিনটি বড়ো বড়ো সরকারী মোহরেই সে সন্তুষ্ট, কারণ সে কী ভাবতে ভাবতে কাগজটি আাবর ভাঁজ করে আমার হাতে ফিরিয়ে দেয়ঃ

-‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে, যেতে পারেন’।

মুহূর্তের জন্য ইচ্ছা হলো, আমি ওর সাথে মুসাফা করি, কিন্তু পরে আবার ভাবলাম আমাদের সম্পর্কটিকে পুরোপুরি সরকারী সম্পর্ক রাখাই ঠিক হবে; লোক চারজন ঘোড়া ঘুরিয়ে কদমতালে দূরে হারিয়ে যায় এবং আমি আবার সফর শুরু করি আমার নিজ পথে।

বানিয়াসের কাছে এসে আমি পথ হারিয়ে ফেলি। আমার ম্যাপে যা বর্ণিত ছিলো ‘চাক্কাওয়ালা গাড়ি-ঘোড়া চলার লায়েক রাস্তা’ হিসাবে, দেখা গেলো, তা প্রায় এক অদৃশ্য পথ, আর স্তেপভূমি, জলা, ও ছোট-খাট নদী-নহর পার হয়ে একেঁ বেঁকে চলে গেছে সেই পথ এবং শেষতক একদম ফূরিয়ে গেছে বড়ো বড়ো পাথর-ছড়ানো কতকগুলি টিলার কাছে এসে। এই টিলাগুলির উপর আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াই কয়েক ঘণ্টা, চড়াই-উৎরাই ভেঙে এবং এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বিকালে দেখা হয়ে গেলো দুটি আরবের সাথে; ওরা গাধার পিঠে চাপিয়ে আঙুর আন পনির নিয়ে যাচ্ছিলো বানিয়াসে। রাস্তার শেষ নাগাদ আমরা এক সাথেই হাঁটি। ওরা আমাকে খেতে দিলো রসালেঅ আঙুর। শহরের আগে বাগানে পৌঁছে আমরা নিজ নিজ পথ ধরি। রাস্তার পাশে একটি স্বচ্ছ, সরু খরগতি স্রোত উচ্ছ্বলিত! আমি আমার বুকপেট যমীনে রেখে শুয়ে পড়ি, বরফ-ঠান্ডা পানিতে কান নাগাদ মাথা ডুবিয়ে দিই এবং পানি গিলতে থাকি- খেতে থাকি।

আমি খুবই লেংগা, খুবই ক্লান্ত বটে, তবু বানিয়াসে থাকার ইচ্ছা আমার নেই- কারণ আমার আশংকা, এটি সিরিয়ার দিকের পহেলা ফাঁড়ি হওয়ায় এখানে নিশ্চয়ই পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ফৌজ পুলিশের সাথে আমার মোলাকাত সাধারণ সিরীয় সেপাই সম্পর্কে আমাকে অনেকটা নিশ্চিত করেছে- কারণ ধরে নেয়া যায়, ওদের বেশির ভাগই উম্মী, নিরক্ষর এবং সে কারণে ওরা আমার জালিয়াতি ধরতে অক্ষম, অপারগ। কিন্তু পুলিশ ফাঁড়ি, যেখানে রয়েছে একজন অফিসার, তার কথা আলাদা। আমি তাই ক্ষিপ্র পায়ে অলিগলির ভেতর দিয়ে বাজারের বড়ো রাস্তাটি এড়িয়ে চলতে শুরু করি, কারণ পুলিশ ফাঁড়ি ঐ রাস্তায়ই থাকার সম্ভাবনা বেশি। একটি গলিতে আমি শুনতে পেলাম বাঁশের বাঁশির সুর আর হাততালির সংগে একটি মানুষের গান। তাতে আকৃষ্ট হয়ে আমি ঘুরে আসি বাঁকটি আর এক্কেবারে নির্বাক, নিশ্চল দাঁড়িয়ে যাই। আমার ঠিক উল্টা দিকেই সম্ভবত দশ পা দূরে রয়েছে একটি দরোজা যার উপর খোদিত রয়েছে দুটি শব্দ ‘পুলিশ-ফাঁড়ি, তাতে রয়েছে কয়েকজন সিরীয় পুলিশ, তাদের মধ্যে একজন অফিসার। ওরা বিকালে রোধে টুলের ওপর একজন সাথীর গান উপভোগ করছে। এখন পিছু হটার কোন উপায় নেই; কারণ ওরা এরি মধ্যে আমাকে দেখে ফেলেছে এবং অফিসারটি, বাহ্যত সে-ও একজন সিরীয়, আমাকে ডেকে বলল- ‘ওহে এদিকে আসো!

হুকুম তামিল করা ছাড়া উপায় নেই। ধীরে ধীরে আসতে থাকি আমি, হঠাৎ আমার মগজে একটি বুদ্ধি খেলে যায়। ক্যামেরা হাতে নিয়ে আমি অফিসারটিকে ফরাসী ভাষায় অভিনন্দন জানাই এবং তার সওয়ালের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকিঃ

-‘আমি মেতুলা থেকে আসছি এই শহরে, সংক্ষিপ্ত সফরের জন্য। কিন্তু আপনার যে-বন্ধুর গান আমাকে অমন মোহবিষ্ট করেছে, তার এবং আপনার ফটো না নিয়ে আমি এখান থেকে ফিরছি না’।

আরবরা তোষামোদ পছন্দ করে। তার উপর ওরা নিজেদের ছবি তুলে আনন্দ পায়। তা্ই অফিসারটি মৃদু হাসির সাথে আমার প্রস্তাবে সম্মতি জানায় এবং আমাকে অনুরোধ করে আমি যেনো ফটো ডেভেলপ আর প্রিন্টিং-এর পর তার ফটো তাকে পাঠাই (আমি তা পাঠিয়েছিলাম আমার ধন্যবাদসহ)। আমার পরিচয়-পত্র চাওয়ার কথা তার আর মনেই পড়লো না। তার বদলে সে আমাকে মিষ্টি চা খাইয়ে আপ্যায়িত করে। এবং অবশেষে আমি যখন মেতুলায় ফিরে যাবার জন্য উঠলাম, আমাকে সে ‘শুভ বিদায়’ জানালো। আমি যে পথে এসেছিলাম সে পথে আবার পেছনে ফিরে যাই, শহরের চারদিকে চক্কর দিয়ে আসি এবং এভাবে আবার দামেশকের পথ ধরি।

হাইফা ছাড়ার ঠিক দু’হপ্তা পর আমি বেশ বড়ো একটি গাঁয়ে এসে পৌঁছাই, বলা যায় একটি শহর, যার নাম মাজদাল আশশামস। এ গাঁয়ে বেশির ভাগই দ্রুজ এবং কিছু খ্রিস্টান বাস করে। আমি একটি বাড়ি পছন্দ করলাম; মনে হলো বেশ সম্পন্ন মানুষের বাড়ি। কড়া নাড়তেই দরোজা ফাঁক করে বার হয়ে এলো এক নৌযোয়ান। ওকে আমি বললাম, রাতের জন্য আশ্রয় পেলে আমি সরফরায হবো। চিরাচরিত ‘আহলান ওয়া সাহলান’ সম্ভাষণের সাথে দরোজা একেবারে খুলে গেলো এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখতে পেলাম, আমি এই ছোট্ট পরিবারে সাদরে গৃহীত হয়ে গেছি।

আমি এখন সিরিয়ার অনেক ভেতরে। এখান থেকে অনেক পথই রয়েছে দামেশকের। তাই আমি আামার দ্রুজ মেজবানকে বিশ্বাস করে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইবার ইরাদা করি। আমি জানতাম যে, কোন আরবই তার মেহমানের প্রতি বে-উফাই বা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। তাই আমি তাকে সমস্ত কিছু খুলে বলি, এমন কি, আমি যে জাল পরিচয়-পত্র নিয়ে সফর করছি-তা’ও। আমার মেজবান তখন আমাকে বলল, বড়ো রাস্তা ধরে চলা আামার পক্ষে বিপজ্জনক হবে খুবই। কারণ, এখান থেকে শুরু করে গোটা রাস্তাই ফরাসী ফৌজী পুলিশেরা পাহারা দিচ্ছে; ওরা সিরীয় পুলিশের মতো অতো সহজে আমাকে ছেড়ে দেবে না।

-‘আমি ভাবছি, তোমার সাথে আমার ছেলেকে পাঠাবো, আমার মেজবান বলল- যে নৌযোয়ান আমার জন্য দরোজা খুলে দিয়েছিলো তার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে- ‘ও তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, তোমাকে মদদ করবে, যাতে তুমি এড়িয়ে চলতে পারো বড়ো রাস্তাগুলি’।

সন্ধ্যার আহারের পর আমরা বাড়ির সামনে খোলা চত্বরে বসি এবং পরদিন সকালে কোন পথ ধরবো তাই নিয়ে আলোচনা করি। আমার হাঁটুর উপর মেলা রয়েছে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার একখানি ছোট্ট ম্যাপ, জার্মানীতে তৈরি। আমি জেরুজালেম থেকে এটি নিয়ে এসেছি সাথে করে। এই ম্যাপের উপর অনুসরণের চেষ্টা করি আমার দ্রুজ বন্ধুর প্রদর্শিত রাস্তা। আমরা যখন এই আলাপে মশগুল রয়েছি, পুলিশ অফিসারের উর্দিপরা একটি লোক, বোঝাই যাচ্ছিলো একজন সিরীয়, সে গাঁয়ের পথে পায়চারি করতে করতে এসে হাজির হয়। আড়াল থেকে লোকটি অমন হঠাৎ আবির্ভূত হলো যে, ম্যাপটি ভাঁজ করারই সময় পেলাম না, ওর নজর থেকে ওটি গোপন করার তো কথাই ওঠে না। অফিসারটি বুঝতে পারলো যে, আমি একজন পরদেশী, কারণ মেজবানের প্রতি একটুখানি মাথা ঝুঁকিয়ে চত্বরটি পার হয়ে সে আস্তে আস্তে আমাদের কাছে পৌঁছে।

-‘কে আপনি?’ ফরাসী জবানে আমাকে ও জিজ্ঞাসা করে এমন এক স্বরে যা খুব নির্দয় বলে মনে হলো না।

আমি আামর চিরদিনের অভ্যাস মতো দীর্ঘ অংসলগ্ন বক্তৃতায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকি, আমি মেতুলাবাসী একজন ঔপনিবেশিক, প্রমোদ সফরে বেরিয়েছি। তবু যখন সে আমার কাছে পরিচয়-পত্র দাবি করে বসলো আমি তা ওর হাতে না দিয়ে পারলাম না। মনোযোগের সাথে ও কাগজটি দেখলো, আর তার ঠৌঁট দু’টি বেঁকে গেলো একটা শুকনো হাসিতে। - ‘কিন্তু আপনার হাতে ওটি কী?’ জার্মান ম্যাপটির দিকে ইশারা ক’রে আমাকে ও প্রশ্ন করে।

-‘এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়’, আমি বলি; কিন্তু অফিসারটি ওটা দেখবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয় এবং ম্যাপ দেখতে অভ্যস্ত মানুষের কুশলী আঙুল দিয়ে ভাঁজ খুলে কয়েক সেণ্ডে ম্যাপটির দিকে চেয়ে থাকে, তারপর সযত্নে আবার ভাঁজ করে স্মিত হাসির সাথে আমার হাতে তা ফিরিয়ে দেয়। তারপর ভাঙা জার্মান জবানে বলেঃ

-‘যুদ্ধের সময় আমি জার্মানদের পাশাপাশি তুর্কী বাহিনীতে কাজ করেছি’। -কথা শেষ করে ফৌজ কায়দায় আমাকে স্যালুট করে দাঁত বের করে ও আবার হাসে, তারপর চলে যায়।

-‘ও বুঝতে পেরেছে তুমি একজন ‘আলেমানি’- অর্থাৎ জার্মান, জার্মানদের ও ভালবাসে এবং ফরাসীদের ঘেন্না করে। ও আর তোমাকে বিরক্ত করবে না’।

পরদিন সকালে, আমি আমার তরুণ দ্রুজ সাথীটিকে নিয়ে পথচলঅ শুরু করি। খুব সম্ভব এ সফর ছিলো আমার জীবনের দুরূহতম সফর। দুপুরে বিশ মিনিটের খানিক বিরতিসহ আমরা এগারো ঘণ্টারও বেশি চলি, শিলাময় পাহাড় ডিঙিয়ে, বড়ো বড়ো পাথরের মধ্য দিয়ে, ধারালো নূড়ি পাথরের উপর সন্তর্পণে পা ফেলে, উৎরাই-চড়াই চড়াই-উৎরাই ভেঙে- যতক্ষণ না আমি টের পেলাম যে, আমার আর হাঁটার শক্তি নেই। যখন আমরা বিকালে দামেশকের সমতল অঞ্চলে আল-কাতানা শহরে পৌছুলাম তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়েছি- আমার পায়ের আঙ্গুলগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে, আর আমার পা দু’টি গেছে ফুলে। আমার ইচ্ছা হলো, রাতটা এখানেই কাটাই, কিন্তু আমার তরুণ বন্ধুটি বাধা দেয় প্রবলভাবে, চারপাশে বহু ফরাসী পুলিশ রয়েছে এবং এটি যখন গাঁ নয় শহর, এখানে মনোযোগ আকর্ষণ না করে আশ্রয় পাওয়অ সহজ হবে না মোটেই। একমাত্র উপায় হচ্ছে, এখান থেকে দামেশকের মধ্যে যে মোটর চলাচল করে তারি একটিতে চড়ে বসা। এখনো আমার হাতে রয়েছে কুড়ি ‘পিয়াস্তার’ (হাইফা থেকে, আমার গোটা সফরে একটি পেনিও খরচ করতে হয়নি)। এবং এখান থেকে দামেশকে যাওয়ার গাড়ি ভাড়াও কুড়ি ‘পিয়াস্তার’।

শহরের প্রধান চকে ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদারের ভাঙাচোরা অফিসে আমি জানতে পারলাম পরবর্তী গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত আমাকে এখানে প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার বন্ধু রাহনুমার কাছ থেকে বিদায় নিই; ও আমাকে আলিংগন করে আপন ভাইয়ের মতো, তারপর দেরী না করে নিজ বাড়ি ফেরার পথ ধরে। বুকিং অফিসের দরোজার কাছে ন্যাপস্যাকটি পাশে রাখে শেষ বিকালের মিষ্টি রোদে আমি ঢুলছিলাম। হঠাৎ একজন লোক আমার কাঁধ ধরে খুব জোরে ঝাঁকুনি দেয়ায় আমার ঝিমুনি টুটে যায়; লোকটি একজন সিরীয় ফৌজী পুলিশ। আমি মামুলি প্রশ্নাদির মুকাবিলা করি এবং মামুলি জওয়াব দিই। কিন্তু মনে হলো, লোকটি আামার জবাবে খুশি হতে পারেনি।

-‘আমার সাথে থানায় চলুন’, -এ বলে, ভারপ্রাপ্ত অফিসারের সাথে কথা বলূন’।

আমি এমনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি ধরা পড়ি বা না পড়ি তা আর আমার জন্য মোটেই ভাবনার বিষয় ছিলো না।

ইস্টিশন-কামরায় পেছনে বসা ‘অফিসার’টি একজন হৃষ্টপুষ্ট লম্বা চওড়া ফরাসী সার্জেন্ট; তার সামনেই ডেস্কের উপর রয়েছে আরকের একটি খালি বোতল আর একটি ময়লা গ্লাস। সে শরাবে একেবারেই চুর হয়ে রেগে মেগে আছে; খুন-রাঙা চোখ মেলে উৎকট দৃষ্টিতে সে তাকালো পুলিশটির দিকে যে আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে।

-‘এখন আবার কী?’

পুলিশটি তাকে আরবী জবানে বোঝায়- সে আমাকে, একজন পরদেশীকে, প্রধান চকে বাস থাকতে দেখে। এদিকে আমি তাকে ফরাসী জবানে বুঝাই যে, আমি পরদেশী নই, আমি একজন অনুগত নাগরিক।

-‘অনুগত নাগরিক?’ সার্জেন্টটি চিৎকারে করে ওঠে- ‘তোমরা হচ্ছো নচ্চর, বাউণ্ডেলে। দেশের ভেতর ঘোরাফেরা করো- কেবল আমাদেরকে উত্ত্যক্ত করার জন্য। কোথায় তোমার কাগজপত্র?

নিতান্ত অসহায়ভাবে আমি সোজা শক্ত আঙুল দিয়ে পকেট হাতড়চ্ছি আমার পরিচয়- পত্রের জন্য, এমন সময় সে তার বদ্ধমুষ্ঠি দিয়ে একটি কিল মারে টেবিলের ওপর আর ঝড়ের মত গর্জন করে ওঠেঃ

-‘থাক, দরকার নেই, বেরোও এখান থেকে’ এবং বের হয়ে আসতে আসতে যখন আমি আমার পেছন দিকে দরোজা লাগাচ্ছি আমি দেখতে পেলাম, সে আবার হাতে গ্লাস ও বোতল তুলে নিচ্ছে।

দীর্ঘ, দরাজ পায়দল সফরের পর আল-কাতানা থেকে মোটরে করে কোশাদা রাজপথের উপর দিয়ে, ফল-ফুলের বাগিচায় ঢাকা দামেশক প্রান্তরে প্রবেশ- কী যে এক মুক্তি, কী যে আরাম সে গাড়ি চড়ে! না, যেনো হাওয়ায় ভয় করে ভেসে চলা! দিগন্তে রয়েছৈ আমার মনযিল, ঘন সন্নিবিষ্ট গাছের মাথায় মাথায় তৈরি এক অন্তহীন সমুদ্দুর, আসমানের পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে কয়েকটা গম্বুজ এবং মিনার, আবছা আবছা। অনেক দূরে কিছুটা ডানদিকে, দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ অনাবৃত পাহাড়টির চূড়া, এখনো সূর্যের কিরণে স্নাত, যদিও নরম ছায়া এরি মধ্যে লতিয়ে উঠতে শুরু করেছে ওর তলদেশে। সেই পাহাড়ের উপর ঝুলে আছে কেবল একখন্ড মেঘ- সরু, দীর্ঘ, ঝলোমলো, কালচে; দূরে হালকা নীল আসমান, একেবারে সোজা, খাড়া-প্রান্তরের উপর আমাদের ডান ও বাঁয়ের পাহাড়গুলির পটভূমিকায় ছড়িয়ে আছে ঘুঘু-ধুসর এক স্বর্ণাভা। আর হাওয়া- সে কতো হালকা!

তারপর- পথে পড়ে ফুলের উঁচু উঁচু বাগিচা, মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা; নানা রকমের সওয়ারী, ঠেলাগাড়ি, জানোয়ারে টানা গাড়ি, সৈনিক (ফরাসী সৈনিক) কতো কি! গোধূলি সবুজ হয়ে এলো পানির মতো। একজন অফিসার মোটর সাইকেলে করে প্রচণ্ড ধ্বনি তুলে পাশ দিয়ে ছুটে যায়, চোখে তার মস্ত বড়ো গগলস- এক ধরনের গভীর সমুদ্দুরের মাছের মতো দেখতে। তারপর- প্রথমে বাড়িটি পাশে পড়ে। তারপর- তারপরই দামেশক, খোলা প্রান্তরের নীরবতার পর হট্টগোলে উচ্ছ্বাসিত, উদ্বোলিত ফেনপুঞ্জ যেনো। জানালায় আর রাস্তায় সন্ধ্যার প্রথম বাতি সব জ্বলে উঠেছে। আমার সত্ত্বা উল্লাসিত হলো অমন একটা আনন্দের অনুভূতিতে যা আমি মনে রাখতে পারিনি।

কিন্তু আমার খুশি, আমার আনন্দ হঠাৎ চুরমার হয়ে গেলো, যখন শহরের কিনারায় ‘থানা’র কাছে এসে গাড়িটি থেমে গেলো।

-‘ব্যাপার কী?’ আমি আমার পাশে বসা গাড়ি-চালককে জিজ্ঞাস করি।

-‘ওহ, কিছুই না। বাইরে থেকে যতো গাড়ি আসে তার প্রত্যেকটিকে এখানে পৌঁছুনোর পর পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে হয়’।

ইস্টিশন থেকে একজন সিরীয় পুলিশ বের হয়ে আসেঃ

-‘আপনি কোত্থেকে আসছেন?’

-‘কেবল আল-কাতানা থেকে,’ ড্রাইভারটি জবাব দেয়।

-‘বেশ, তাহলে যেতে পারেন, (কারণ এ হচ্ছে নেহায়েতই স্থানীয় সফর) ড্রাইভার দাঁত কিড়মিড় করে গাড়ি স্ট্রার্ট দেয়। আমরা চলতে শুরু করি এবং অবাধে শ্বাস-প্রশ্বাস নিই। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আবার কে একজন রাস্তা থেকে চিৎকার করে ওঠে- ‘ছাদ ঢিলা হয়ে পড়েছে’, এবং ‘থানা’ ছাড়িয়ে কয়েক পা পরেই ড্রাইভারটি তার নড়বড়ে গাড়িখানা থামালো খোলা ছাদটি ঠিক করার জন্য, যা এতোক্ষণ ঝুলে পড়েছে একপাশে। ড্রাইভার যখন এ নিয়ে ব্যস্ত তখন পুলিশটি আবার আস্তে আস্তে আগিয়ে এলো আমাদের দিকে- মনে হলো ড্রাইভারের যান্ত্রিক গোলাযোগ ছাড়া আর কিছুর প্রতিই সে আকৃষ্ট নয়। পরে অবশ্য, তার নজর পড়লো আামার উপর, আমি দেখলাম আর সংগে সংগে আমার সারা শরীর কঠিন হয়ে উঠলো; ওর চোখ দু’টি সজাগ-সতর্ক হয়ে উঠেছে; আমার মাথা থেকে পা নাগাদ ও জরীপ করছে। আরো কাছে এসে ও তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালো গাড়ির মেঝের দিকে, যেখানে আমার ন্যাপস্যাকটি পড়ে আছে।

-‘আপনি কে?’ সন্দিগ্ধ কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাস করে।

-‘মেতুলা থেকে’ – আমি শুরু করি; কিন্তু দেখলাম, পুলিশটির মাথা সন্দেহে দুলছে। তারপর ও ফিসফিস করে কথা বলে ড্রাইভারটির সাথে। আমি শব্দগুলি বুঝতে পারছিলাম- ‘ইংরেজ সিপাই, দলত্যাগী’। এবং এই পহেলা আমার জ্ঞান হলো যে, আামার নীল ওভারকোট, আমার বাদামী জরীর কাজ করা ইগাল-চাপা ‘কুফিয়া’ আর আমার ফৌজী-ধরনের ন্যাপস্যাক (যা আমি কিনেছিলাম জেরুজালেমে, একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে( সবকিছুরই মিল রয়েছে আইরিশ কনস্টেবলের পোশাকের সাথে, যাদেরকে সে সময়ে নিয়োগ করেছিলেন ফিলিস্তিন সরকার। এ-ও আমার মনে পড়লো, ফরাসী ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে, উভয়ই নিজ নিজ দলত্যাগীদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবে।

আমি আমার ভাঙা ভাঙা আরবী বুলিতে পুলিশটিকে বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি দলত্যাগী নই, কিন্তু ও আমার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বলেঃ

-‘সবকিছু ইন্সপেকটর সাবকে বুঝান’।

এবং এভাবে আমাকে মজবুর হয়েই যেতে হলো থানায়। ড্রাইভার বিড়বিড় করে বলল- ও আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না; এরপর সত্যি ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আমার চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলো। ইন্সপেকটর তখন থানায় ছিলেন না; তবে আমাকে বলা হলো, যে- কোন মুহূর্তেই তিনি ফিরে আসতে পারেন। আমাকে একটি কামরায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কামরাটিতে একটিমাত্র বেঞ্চি রয়েছে বসবার জন্য, আর দরোজা রয়েছে দু’টি, প্রধান প্রবেশ পথটি ছাড়া। একটির উপর খোদাই রয়েছে ‘কারারক্ষি’ এই কথা দুটি; আর অন্যটির উপর লেখা ‘কয়েদখানা’ এই শব্দটি। এই অস্বাস্তকর পরিবেশে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো আধ ঘন্টারও বেশি, এবং প্রতি মুহুর্তে আমার এ বিশ্বাস পাকাপোক্ত হতে লাগল যে, আমার সফরের এই খানেই শেষ; কেননা আমার কাছে ইন্সপেকটর শব্দটি শুধু অফিসার শব্দটির চেয়ে অনেক অনেক বেশি অশুভ মনে হলো। আমি যদিএখন ধরা পড়ি, আমাকে কয়েকদিন, হয়তো, কয়েক হপ্তা হবে জেলে, বিচারাধীন কয়েদী হিসেবে; তারপর আমাকে দেওয়া হবে প্রথা অনুযায়ী তিন মাসের শাস্তি। এভাবে জেলখানায় তিন মাসের শাস্তি ভোগের পর আমাকে আবার রওনা করতে হবে পায়দল—ঘোড় সওয়ার ফৌজী পুলিশের প্রহরাধীনে, আবার ফিলিস্তিন সহরদের দিকে এবং সর্বপরি, পাসপোর্ট আইনের খেরাপ করার অপরাধে আমাকে হয়তো বের করে দেয়া হবে ফিলিস্তিন থেকে। ওয়েটিংরুমে যে বিষন্নতা বিরাজ করছে আমার বিতরের বিষাদের তুলনায় কিছুই নয়।

হঠাৎ আমার কানে এলো একটি গাড়ির শব্দ। গাড়িটি থানায় ঢুকে পথের সামনেই এসে থামে; মুহূর্তকাল পরেই, গাড়ি থেকে নেমে এলো একজন লোক, বেসামরিক পোশাকে, মাথায় ‘তারবুশ’ পরা। তার পিছু পিছু নামে একটি পুলিশ যে উত্তেজিতভাবে কিছু বোঝাতে চেষ্টা করছে সাদা পোশাক পরা লোকটাকে। বোঝাই যাচ্ছে, ইন্সপেক্টর অতিমাত্রায় ব্যস্ত।

এরপর যা ঘটলো তা যে ঠিক কেমন করে ঘটলো তা আমি জানি না। সেই সংকট মুহূর্তে আমি যা করলাম তা হয়তো প্রতিভার সেই দুর্লভ এক হঠাৎ-ঝলকানির ফল, যা আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে আর ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে এমন-একেকটি ঘটনার জন্ম দেয় যা ইতিহাসকে দেয় বদলে। আমি এক লাফ মেরে দাঁড়ালাম এসে ইন্সপেক্টরের একেবারে কাছে, তারপর তার প্রশ্নাদির অপেক্ষা না করেই তার উপর ছুঁড়ে মারলাম ফরাসী জবানে এক ঝাঁক অনর্গল নালিশ, পুলিশটির অপমানজনক বিশ্রী ব্যবহারের বিরুদ্ধে, যে আমাকে আমার মতো একজন মাসুম নাগরিককে দলত্যাগী সেপাই গণ্য করেছে, যার জন্য শহরে যাওয়ার গাড়ি আমাকে হারাতে হয়েছে! ইন্সপেক্টর কয়েকবার আমাকে থামাবার চেষ্টা করলো- কিন্তু আমি তাকে সুযোগ দিলাম না একবারও, আর এক অনর্গল শব্দ- প্রবাহ দ্বারা আমি আচ্ছন্ন করে দিই তাকে, যার দশ ভাগের এক ভাগও সে বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না, ‘মেতুলা’ ‘দামেশক’- এ দু’টি নাম ছাড়া। যা অগুণতিবার আমি উল্লেখ করেছি আামার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে আমি উল্লেখ করেছি আমার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে তাকে আটকে রাখার জন্য সে বিব্রত বোধ করছে। কিন্তু আমি তাকে একটি কথাও বলতে দিলাম না, নিশ্বাস নেবার জন্যও না থেমে আমি অবিরাম চালিয়ে যাই আমার শব্দের গোলাবাজি। শেষপর্যন্ত সে তেক্ত-বিরক্ত হয়ে হাত ছুঁড়ে মারলো শূন্যে আর চিৎকার করে উঠলোঃ

-‘থামুন, থামুন, আল্লাহর ওয়াস্তে থামুন। আপনার কোন কাগজপত্র আছে?’

আমার হাত যান্ত্রিকভাবেই প্রবেশ করে আমার বুক-পকেটে এবং তখনো অনর্গল স্রোতে কথার পর কথা বলতে বলতেই আমি আমার জাল পরিচয়-পত্রকানা তার হাতে গুঁজে দেই। অসহায় লোকটির হয়তো তখন এই উপলব্ধিই হয়েছিলো যে, সে ডুবে যাচ্ছে, কারণ সে দ্রুত ভাঁজ করে কাগজটির একটি কোণের উপর লক্ষ্য করে এবং সরকারী স্ট্যাম্পটি দেখে আর তারপর সেটি ছুঁড়ে মারে আমার উপর।

-‘ঠিক আছে, হু, সব ঠিক আছে, এখন যান, মেহেরবানী করে কেবল যান।‘ আমি তার অনুরোধের পুনরাবৃত্তির জন্য অপেক্ষা করলাম না।

কয়েকমাস আগে জেরুজালেমে এক দামেশকী শিক্ষকের সাথে আমার দেখা হয়। তিনিই আমাকে দাওয়াত করেছিলেন, আমি যখন দামেশকে আসি, আমি যেন তাঁর মেহমান হই। তাঁর বাড়ির খোঁজে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একটি ছোট্ট ছেলে রাজী হয়ে গেলো আমার পথ-প্রদর্শক হতে। সে-ই আমার হাত ধরে আমার উদ্দিষ্ট বাড়ির পথ ধরলো।

গাঢ় সন্ধ্যা, পুরানো নগরী। রাস্তাগুলি চিপা; সংকীর্ণ রাস্তার উপর ঝুলে থাকা কোঠাগুলির জানালা, রাত যতোটা আঁধার করে তুলতে পারে তার চাইতে বেশি আঁধার করে তুলেছে রাস্তাগুলিকে। এখানে ওখানে কেরোসিনের হলদে আলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি- কোন-না কো ফলওয়ালার দোকান, যার সামনেই রয়েছে স্তূপীকৃত তরমুজ এবং ঝুড়িভর্তি আঙুর। মানুষগুলি যেনো ছায়ামূর্তি। কখনো কখনো খড়খড়ির জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসে কোন রমনীর বাজখাঁই গলার আওয়াজ। তারপর সেই ছোট্ট ছেলেটি একবার বলে উঠলো- ‘এই যে সেই বাড়িটি’।

আমি একটা দরোজায় ধাক্কা দিই। কে একজন ভেতর থেকে জবাব দেয়। আমি দরোজার সিটকিনি খুলে প্রবেশ করি একটি শান-বাঁধা প্রাংগণে। আঁধারেও আমি দেখতে পেলাম, ফলের ভারে নুয়ে পড়া আঙুরের গাছসমূহ এবং একটি পাথরের বেসিন যা থেকে উচ্ছিত হচ্ছে একটি ফোয়ারা। কে একজন উপর থেকে ডেকে বলল-

-‘তফদ্দল, ইয়া সিদি, মেহেরবানী করে প্রবেশ করুন’! আমি তখন ঘরের বাইরের দেয়ালের পাশ ঘেঁষে ওঠা একটি সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি এবং একটি খোলা চত্বর পার হয়ে একেবারে আমার বন্ধুর দরাজ আলিংগনে গিয়ে পড়ি।

আমি তকন ক্লান্ত অবসন্ন- একেবারেই হৃতশক্তি। তাই আমাকে যে বিছানা দেয়া হলো তাতেই আমি ধপ করে ছেড়ে দিলাম নিজেকে। সুমুখের প্রাংগণের গাছগুলিতে এবং বাড়ির পেছনের বাগানের গাছপালার হাওয়ার মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। দূর থেকে ভেসে এলো অনেক স্তিমিত ধ্বনিঃ এক বৃহৎ আরব্য নগরী ঘুমিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তারই আওয়াজ!

একটা নতুন উপলিব্ধির উত্তেজনা নিয়ে, যে-সব বস্তু বা বিষয় সম্বন্ধে আগে আমার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিলো না সেগুলির প্রতি চোখ খোলা রেখে, আমি সেই গ্রীষ্মের দিনগুলিতে দামেশকের পুরানো বাজারের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আর তার বাসিন্দাদের জীবনকে যে অপূর্ব প্রশান্তি ঘিরে রেখেছে তা অনুভব করছিলাম। ওদের অন্তরের এই নিরাপত্তাবোধ লক্ষ্য করতাম একের প্রতি অন্যের ব্যবহারে, যে আবেগ-উষ্ণ মর্যাদাবোধের সাথে ওরা একে অপরের সাথে দেকা করে বা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয় তাতে, অপরকে বন্ধু বলে ভাবে কেবল এ-কারণেই শিশুদের মতো পরস্পর হাত ধরে দু’টি মানুষ যেভাবে এক সাথে চলে তার মধ্যে- দোকানীদের একের প্রতি অন্যের আচরণে, ছোটো দোকানের সেইসব ব্যবসায়ী যারা অবশ্যই পথচারীদের চিৎকার ক’রে ডাকবে- মনে হতো না এ- সব নাছোড়বান্দা দোকানীর কোন বুক চাপা ভয় আছে কিংবাওদের মধ্যে কোন ঈর্ষা আছে, -বিশ্বাস অতোটা চূড়ান্ত পর্যায়ের যে দোকানের মালিক, যখনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাবার দরকার হয় সে তার দোকনপাট তার প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দোকানদারের হেফাজতে রেখে চলে যায় বিনাদ্বিধায়। আমি প্রায়ই দেখতাম, এভাবে ফেলে যাওয়া দোকানের সামনে থেমেছে কোন সত্যিকারের খদ্দের, বোঝাই যাচ্ছে সে নিজের মনে মনে ভাবাগোনা করছে- দোকানদার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, না সে যাবে পাশের দোকানে জিনিস কিনতে। আর সে অবস্থায় প্রত্যেকবারই পাশের দোকানীট, যে আসলে অনুপস্থিত দোকানীর প্রতিদ্বন্দ্বী, আগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করছে, খদ্দের কি চায় এবং তার নিকট বিক্রি করছে অনুপস্থিত দোকানীর দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসাপাতি- তার নিজের জিনিস নয়, তার অনুপস্থিত প্রতিবেশীর জিনিস, এবং দামটা সে রেখে দিচ্ছে প্রতিবেশীর বেঞ্চির উপর। ইউরোপে এ  ধরনের বেচাকেনা কে কবে কোথায় দেখেছে!

বাজারের কোন কোন বাস্তায় জটলা পাকায় শক্ত সবল পরিশ্রমী বেদুঈনেরা, প্রশস্ত লম্বা ঝুলওয়ালা জোমব্বা প’রে। ওরা এমনিতরো মানুষ যে, দেখলেই মনে হয় ওরা যেনো নিজেদের জীবনকে নিজেরাই সংগে নিয়ে চলেছে এবং সবসময়ই চলছে নিজেদের পথে। দীর্ঘদেহী লোকগুলি, গভীর জ্বলজ্বলে ওদের চোখ, দল বেঁধে ওরা দাঁড়া, না হয় বসে পড়ে দোকানের সামনে। একে অন্যকে খুব বেশি কথা ওরা বলে না- একটি শব্দ, একটি ছোট্ট বাক্য মন দিয়ে বললে এবং মন দিয়ে তা শুনলে, দীর্ঘ আলাপের জন্য তা-ই হয় যথেষ্ট। বুঝতে পারলাম, এই বেদুঈনের দল অযথা বকবক করতে জানে না। বকবক করা মানে সেই ধরনের কথা বলা যার কোন বিষয় নেই, যাতে নেই কোন ঝুঁকি, যা ক্ষয়িত আত্মার একটা বিশেষ চিহ্ন। এবং আমার মনে পড়লো আল-কুরআনের সেই শব্দগুলি যাতে বর্ণনা করা হয়েছে জান্নাতের জীবনকে- ‘এবং তুমি সেখানে শুনতে পাবে না কোন অসার কথা’। মনে হলোঃ নীরবতা হচ্ছে একটি বেদুঈন গুণ। ওরা নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করে চওড়া বাদামী, সাদা অথবা কালো জোব্বায় এবং চুপ করে থাকে। ওরা যখন আপনার পাশ দিয়ে যায় ওরা আপনার দিকে তাকাবে শিশুর নীরব দৃষ্টিতে- গর্বিত, নম্র ও সজাগ। আপনি যখন ওদের সম্বোধন করেন ওদের ভাষায় ওদের কালো চোখের তারায় সহসা স্ফূরিত হয় স্মিত হাস্য! কারণ ওরা নিজেদের মধ্যে ডুবে থাকে না এবং ওরা চায় যে, অপরিচিতরা ওদের বুঝুক। ওরা হচ্ছে ‘অভিজাত…. শরীফ’ …. একেবারেই চুপচাপ অথচ জীবনের সকল বিষয়ের প্রতিই মুক্ত হৃদয়।

শুক্রবারে, যা মুসলমানদের  ছুটির দিন, আমি দামেশকের জীবনে লক্ষ্য করতাম এক ছন্দ পরিবর্তন, আনন্দময় উত্তেজনার একটুখানি চাঞ্চল্য, একটা ঝটকা এবং তারই সাথে ভাবের গাম্ভীর্য। আমার মনে পড়লো- ইউরোপে আমাদের রোববারগুলির কথা- নগরীর নির্জন রাস্তাঘাট এবং বন্ধ দোকানপাটের কথা, সেই সব অর্থহীন শূন্যগর্ভ দিন আর সেই শূণ্যতা যা দুর্বহ পীড়ন এনে দিতো, তার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এরূপ কেনই বা হবে। ক্রমে আমার এই উপলব্ধি হতে লাগলোঃ এর কারণ, প্রতীচ্যের প্রায় সকল লোকের কাছেই ওদের রোজকার জীবন হচ্ছে একটি বোঝা, যা থেকে কেবল রোববারগুলিই ওদের দিতে পারে নিস্তার। রোববার এখন আর অবকাশের দিন নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অবাস্তত জগতে, এক আত্মপ্রতারণামূলক বিস্মৃতিতে পালানোর একটি উপায়, যে বিস্মৃতির পেছনে উকি মারছে দ্বিগুণ ভারী আর ভয়ংকর বিগত হপ্তার দিনগুলি।

এদিকে, আরবদের কাছে কিন্তু শুক্রবার হপ্তার বাকি দিনগুলি বিস্মৃত হবার একটি সুযোগ নয়; এর মানে এ নয় যে, এ লোকগুলির কোলে জীবনের ফল-ফসল সহজে এবং অনায়াসে ঝরে পড়ে। বরং এর সোজা মানে হচ্ছে- ওদের পরিশ্রম, হোক না কঠোরতম, ওদের ব্যক্তিগত আরজু- আকাঙ্ক্ষার সাথে সংঘাত বাঁধায় না। রুটিনের জন্যে রুটিন এদের জীবনে নেই। তার পরিবর্তে একজন কর্মরত মানুষ ও তার কাজের মধ্যে রয়েছে একটা নিবিড় আন্তরিক যোগ। কাজেই এদের জীবনে বিশ্রামের শুধু তখনি প্রয়োজন হয় যখন ওরা ক্লান্তি বোধ করে। মানুষ আর তার কাজের মধ্যে সংগতি, এই মিলকে ইসলাম নিশ্চয়ই স্বাভাবিক অবস্থা বলে বিবেচনা করে, আর এজন্যই শুক্রবার বাধ্যতামূলক বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। কুটির শিল্পী এবং দামেশক বাজারের দোকানীরা কয়েক ঘণ্টা  কাজ করে, কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকানপাট রেখে দিয়ে ওরা যায় মসজিদে জুম’আর সালাত আদায় করতে। তারপর কোন ক্যাফেতে গিয়ে বসে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ করে। এরপর ওরা আবার ফিরে আসে ওদের দোকানপাটে, নিজ নিজ কাজে। এবং আরো কয়েক ঘণ্টা আনন্দ ও স্ফুর্তির সাথে তারমুক্ত হৃদয়ে ওরা কাজ করে চলে, যার যেমন খুশি। মাত্র অল্প ক’টি দোকানই আমি বন্ধ করতে দেখেছি এবং সে-ও কেবল সালাতের সময়ে, যখন লোকজন গিয়ে জমা হতো মসজিদে। দিনের বাকি সময়ে রাস্তাগুলিতে মানুষ গমগম করে, কর্মমুখর থাকে হপ্তার অন্য দিনগুলির মতোই।

এক শুক্রবারে আমি ‘উমাইয়া মসজিদে’ গিয়েছিলাম আমার এক দোস্তকে নিয়ে, যাঁর মেহমান ছিলাম আমি। মসজিদের গম্বুজ অনেকগুলি স্তম্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে; জানালার ভেতর দিয়ে আলো এসে পড়ায় তা ঝলমল করছে। বাতাসে ভাসছে মেশকের খোশবু। মসজিদের মেঝেটি লাল নীল কার্পেট দিয়ে ঢাকা। দীর্ঘ সমান সমান সারিতে কাতারবন্দী হয়ে লোকেরা দাঁড়িয়েছে ‘ইমামে’র পেছনে। ওরা মাথা নিচু করছে, হাঁটু গেড়ে বসছে ভূমিতে ঠেকাচ্ছে কপাল এবং আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে; সকলের মধ্যে এক সুশৃংখল ঐক্য, সৈনিকদের মতো। এমনি নিরিবিলি চুপচাপ ব্যাপার। লোকেরা যখন জামা’আতে দাঁড়ালো, আমি অনেক দূরে। বিশাল মসজিদের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম বৃদ্ধ ‘ইমামে’র কণ্ঠস্বর। তিনি কুরআনের আয়াত আবৃত্তি করছিলেন। তিনি যখন মাথা নিচু করছেন বা সিজদায় যাচ্ছেন, গোটা জামা’আতেই একটিমাত্র ব্যক্তির মতো অনুসরণ করছে তাঁকে। আল্লাহর সামনে তারা মাথা নিচু করছে এবং সিজদায় যাচ্ছে, যেন আল্লাহ তাদের চোখের সামনেই রয়েছেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলামঃ এই লোকগুলির কাছে ওদের আল্লাহ এবং ধর্ম কতো কাছের, কতো আপন!

-‘কী বিস্ময়কর! কী চমৎকার!’ আমি আমার বন্ধুকে বলি মসজিদ থেকে বের হতে হতে- ‘তোমরা আল্লাহকে তোমাদের এতো কাছে বলে অনুভব করো! আমার ইচ্ছা হয়, আমি নিজেও যদি ঠিক এরূপ অনুভব করতে পারতাম’।

-‘কিন্তু ভাই, এর চেয়ে অন্যরূপ হওয়াই বা কি করে সম্ভব? আমাদের পবিত্র কিতাব যেমন বলে, “আল্লাহ কি তোমাদের গর্দানের রগের চেয়েও তোমার নিকটতরো নন?’

এই নতুন উপলব্ধিতে চঞ্চল হয়ে আমি দামেশকে আমার প্রচুর সময় ব্যয় করি, ইসলাম সম্পর্কে যখনি যে কিতাব পাই তা-ই পড়ে পড়ে। আরবী ভাষার উপর আমার দখল কথাবার্তার জন্য যথেষ্ট হলেও তখনো তা মূল কুরআন পাঠের জন্য ছিলো খুবই অপ্রচুর। কাজেই আমি দু’টি তর্জমার আশ্রয় নিই- একটি ফরাসী, অপরটি জার্মান। তর্জমাগুলি আমি সংগ্রহ করেছিলাম এক লাইব্রেরী থেকে এছাড়া বাকী সবকিচুর জন্য আমাকে নির্ভর করতে হলো ইউরোপীয় প্রাচ্যাতত্ত্ববিদদের বই-পুস্তক আর আমার বন্ধুর ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণের উপর।

যতো আংশিক এবং বিচ্ছিন্নই হোক না কেন, আমার জন্য এই সব পড়াশোনা এবং আলাপ-আলোচনা হলো যবনিকা তোলার মতো- এমন একটি চিন্তার জগৎ দেখতে শুরু করলাম যার বিষয়ে  এতোদিন আমি ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

মনে হলোঃ ধর্মকে সাধারণ অর্থে লোকে যা বোঝে ইসলাম সে রকম কিছু নয়- বরং এ যেন এক জীবন-ব্যবস্থা, শাস্ত্রবিধি এ যতোটুকু নয় তার চইতে অনেক অনেক বেশি গুণে, এ হচ্ছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের একটি কর্মসূচী, যার  ভিত্তি আল্লাহর উপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআনে কোথাও আমি কোন উল্লেখ পেলাম না ‘পরিত্রাণের’ প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। ব্যক্তি এবং তার নিয়তিম মধ্যে কোন আদি জন্মগত পাপ দাঁড়িয়ে নেই; কারণ মানুষ কিছুই পাবে না যার জন্য সে চেষ্টা-সাধনা করে তা ছাড়া’। পবিত্রতার কোন গোপন প্রবেশদ্বার খোলার জন্য কোন কৃচ্ছব্রত বা সন্ন্যাসের প্রয়োজন নেই- এবং আল্লাহ যে-সব সহজাত কল্যাণকর গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন প্রতিটি মানুষকে সেগুলি থেকে বিচ্যুতিই তো পাপ। পাপ তো এছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের প্রকৃতি বিচার করতে গিয়ে কোন দ্বৈতবাদের অবকাশ রাখা হয়নি। দেহ আর আত্মা মিলে এক অখণ্ড সত্তা মনে করে ইসলাম।

প্রথমে আমি কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং আপাতদৃষ্টিতে যা জীবনের তুচ্ছ এবং বৈষয়িক ব্যাপার তা নিয়েও আল-কুরআনের ঔৎসুক্যে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে শুরু করলামঃ মানুষ যদি দেহ আর আত্মা নিয়ে একটি গোটা সত্তা হয়ে থাকে, যা ইসলাম দাবি করে, তাহলে জীবনের কোনদিকই এতো তুচ্ছ হতে পারে না যে, তা ধর্মীয় এখতিয়ারের বাইরে পড়বে। এ সব বিষয়কে নজরে রেখেই কুরআন কখনো তার অনুসারীদের একথা ভূলতে দেয় না যে মানুষের এই পার্থিব জীবন মানুষের উচ্চতর জীবনের পথে একটি স্তর মাত্র এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক প্রকৃতির। বৈষয়কি উন্নতি ও সমৃধ্ধি কাম্য, কিন্তু তা-ই লক্ষ্য নয়। এজন্য, মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণার যদিও নিজস্ব যৌক্তিকতা আছে তবু তা নৈতিক চেতনার দ্বারা অবশ্য সংযত ও নিয়ন্ত্রিক করতে হবে। কেবল যে আল্লাহর সংগে মানুষের সম্পর্কের সাথে এই চেতনার যেগা থাকবে তা নয়, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের সাথেও এর যোগ থাকবে; কেবল সৃষ্টির সংগেও তার সম্পর্ক থাকবে যা সকলের আত্মিক বিকাশেরও অনুকুল, যা’তে করে সকল মানুষই পূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে।

এ সবই ছিলো, এর আগে আমি ইসলাম সম্বন্ধে যা কিছু শুনেছি এবং পড়েছি সে-সব থেকে, মানসিক নৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশি ‘শ্রদ্ধেয়’। আত্মিক জগতের সমস্যাবলী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভংগী ওল্ড টেস্টামেন্টের চাইতে অনেক বেশি গভীর মনে হলো। অধিকন্তু বিশেষ একটি জাতির প্রতি ওল্ড টেস্টামেন্টের যে পক্ষপাত দেখা যায় এতে তা-ও নেই। তা ছাড়া, জৈবিক সমস্যাবলীর প্রতি এর দৃষ্টি নিউ টেস্টামেন্টের চাইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং খুবই ইতিবাচক। আত্মা ও দেহের সম্পর্ক, দুয়ের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট নিয়ে, আল্লাহ-র সৃষ্ট মানব-জীবনর যগল দিক ছাড়া আর কিছু নয়।

-‘এই শিক্ষাই কি,’ আমি জিজ্ঞাসা করি নিজেকে,’ এতোদিন আরবদের মধ্যে যে আবেগ অনুভূতির নিশ্চয়তা আমি উপলব্ধি করেছি, তার জন্য দায়ী নয়?’

এক সন্ধ্যায় আমার মেহমানদার আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর সংগে দামেশকের এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে খানার মজলিসে। বন্ধুটি তাঁর এক পুত্রের জন্মোৎসব পালন করেছিলেন।

আমরা দু’জনে হাঁটছিলাম ভেতরের নগরীর আঁকা-বাঁকা গলিপথে। এতোই সংকীর্ণ সে গলি যে, রাস্তার দু’পাশের বাড়ি-ঘরের দেয়াল থেকে রাস্তার উপর বের হয়ে আসা জানালা ও জাফরি দেওয়া ব্যালকনি প্রায় গায়ে গায়ে ঠেকেছে। পাথরের তৈরি পুরানো বাড়িগুলির মধ্যে জেঁকে আছে গাঢ় ছায়া আর প্রশস্ত নীরবতা, কখনো কখনো দু’একটি কালো বোরখায় ঢাকা মেয়ে ত্বরিৎ ছোট্ট পদক্ষেপে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। একবার দেখলামঃ একজন দাড়িওয়ালা লোক লম্বা ‘কাফতান’ গায়ে, পথের একটি মোড় থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো অন্য এক মোড়ে। রাস্তার মোড় এবং অনিয়মিত কোণগুলি সর্বত্র একই ধরনের; একই রকম সংকীর্ণ গলি, যার একটি অপরটিকে কেটে চলে গেছে নানাদিকে, হামেশাই এই প্রতিশ্রুতিসহ যে, সামনেই কোন-না- কোন বিস্ময়কর আবিষ্কার রয়েছে এবং প্রত্যেকবারই একই ধরনের অন্য এক গলিতে গিয়ে মিশিছে!

কিন্তু আবিস্ক্রিয়াটি ঘটলো একেবারে শেষে। আমার বন্ধু এবং রাহনুমা একটা সাদামাটা, মাটির আস্তর দেয়া দেয়ালের উপর স্থাপিত নাম নম্বরহীন এক কাঠের দরোজার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং মুষ্টবদ্ধ হাত দিয়ে দরোজায় ধাক্কা দিতে দিতে বললঃ এই যে, আমরা এসে পড়েছি।

একটা ক্যাঁচকোচ শব্দ করে দরজাটা খুলে যায়। একজন একদম বুড়ো লোক তার দন্তহীন মুখে আমাদের খোশ আমদেদ জানালো ‘আহলান ওয়া সাহলান’ বলে। তারপর আমরা একটি ছোট্ট করিডোরের ভেতর দিয়ে, যার ছিলো দুটি সমকোণবিশিষ্ট বাঁক, ঢুকলাম বাড়ির প্রাংগণে- যা বাইরে থেকে একটি মেটে রঙের খোলার বেশি কিছু মনে হচ্ছিলো না।

প্রাংগণটি প্রশস্ত এবং হাওয়া খেলানো। সাদা এবং কালো রঙের মার্বেলের টুকরা দিয়ে প্রাঙগণটি মোড়ানো। দেখতে মনে হয় যেন মস্ত বড়ো একটা দাবার ছক। মাঝখানে একটি নিচু আট কোণা বেসিন থেকে একটি ফোয়ারা খেলছে, গুঁড়া গুঁড়া পানি ছিটাচ্ছে। মার্বেলে মোড়া মেঝের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ছোট ছোট ফাঁক। সেই ফাঁকগুলিতে লাগানো লেবু গাছ এবং ওলিয়েগুরের ঝোপ তাদের ফুল-ফলে নূয়ে পড়ে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে সমস্ত প্রাংগণের উপর এবং ভেতরের গৃহপ্রাচীরের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে, দেয়ালগুলি ভূমি থেকে ছাদ পর্যন্ত অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য করা অ্যালাবাস্টার রিলিফে ঢাকা যাতে রয়েছে জটিল জ্যামিতিক নকশা আর লতাপাতা আঁকা আরাবেষ্ক, ব্যতিক্রম কেবল খিড়কিগুলি যাতে স্থাপন করা হয়েছে মার্বেলের উপর খোলা জলির কাজ করা প্রশস্ত ফ্রেম। প্রাংগণের একদিকে দেয়ালগুলি বেঁকে গিয়ে ভূমি থেকে প্রায় তিন ফুযট উঁচুতে তৈরি করেছে একটি গভীর কুলুংগি, যার আকার একটি বড় কোঠার মতো, যেখানে উঠতে হয় মার্বেরের প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে। এই যে কুলুংগিটি, যাকে বলা হয় ‘লিওয়ান’- এর তিনটি দেয়াল ঘেঁষে পাতা রয়েছে নিচু বুটিদার দিওয়ান এবং মেঝের উপর বিছানো রয়েছে একটি খুব দামী গালিচা। কুলুংগির দেয়ালগুলিতে লাগানো হয়েছে বড় বড় আয়না, যার একেকটির উচ্চতা হবে প্রায় পনেরো ফুট এবং গোটা প্রাংগণটি, তার গাছপালা, তার সাদা-কালো মেঝে, তার অ্যালাবাস্টার, রিলিফ, মার্বেলের জানালার জালি এবং বাড়ির ভেতরে ঢোকার খোদাই করা দরোজা, আর মেহমানদের বর্ণাঢ্য ভিড়, যাদের কেউ কেউ বসেছে দিওয়ানে আর কেউ কেউ পানির বেসিনটির চারপাশে ঘোরাফেরা করছে- এ সব কিছুই প্রতিবিম্বিত হচ্ছিলো লিওয়ানের’ আয়নাগুলিতে এবং আমি যখন সেগুলির দিকে তাকালাম, আমি আবিস্কার করলাম, উঠানের বিপরীত প্রাচীরটিও আগাগোড়া এমনি আয়না  দিয়ে মোড়ানো, যার ফলে গোটা দৃশ্যটিই প্রতিবিম্বত হচ্ছিলো দু’বার চারচার শতবার এবং এভাবে রূপ নিচ্ছিলো এক ইন্দ্রজালে, মার্বেল আ্যলবাস্টার, ফোয়ারা, অগণিত লোকজন, লেবু গাছের ঝাড়, ওলিয়েণ্ডার, ঝোপের অন্তহীন পরিক্রমণ- এক অন্তহীন স্বপ্নপূরী ঝলমল করছে সান্ধ্য আকাশের নিচে, যার বর্ণ অন্তহীন সূর্যের রশ্মিতে এখনও গোলাপী।

এ ধরনেদর একটি বাড়ি, রাস্তার দিকে সাদামাটা, অলংকৃত, ভেতরে জমকালো ও মনোরম, আমার কাছে ছিলো একেবারেই অভিনব। কিন্তু কালক্রুমে আমি জানতে পারলাম, কেবল সিরিয়া এবং ইরাকে নয়, বরং ইরানেরও সংগতিপন্ন মানুষের চিরাচরিত বাসগৃহের এই হচ্ছে নমুনা। আগেকার দিন আরব কিংবা ইরানী কেউই বাড়ির সমুখভাগ নিয়ে মাথা ঘামাতো না। তাদের কাছে ঘর ছিলো বাস করার জন্য এবং এর উপযোগিতা ছিলো ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ জিনিসটি, আধুনিক পশ্চিমা স্থাপত্যে জোর করে যে ‘উপযোগিতা’ সৃষ্টির এতো চেষ্টা করা হয়ে থাকে কতোই না ভিন্ন। এক ধরনের বিকৃত রোমান্টিসিজমের জালে আটকা পড়া, নিজস্ব অনুভূতি সম্পর্কে অনিশ্চিত প্রতীচ্যের লোকেরা আজকাল বাড়ির নকশা করতে গিয়ে তৈরি করে সমস্যা, আর আরব এবং ইরানীরা তৈরি করে, অথবা গতকালও তৈরি করতো, ঘর।

আমার মেহমানদার আমাকে তাঁর ডান পাশে দেয়ালের উপর বসালেন। একটি নগ্নপদ নওকর ছোট্ট একটি পিতলের ট্টেতে করে কফি পরিবেশন করে; গুড় গুড় আওয়াজ ওঠা ‘নারকেলে’র হুকা থেকে ধোঁয়া উঠে ‘লিওয়ানে’ গোলাব পানির খোশবু মিশানো হাওয়ার সংগে মিলে যায় এবং কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেসে যায় কাঁচের ঢাকনা দেয়া মোমবাতিরগুলির দিকে আর মোমবাতিগুলি জ্বলানো হচ্ছিলো একটির পর একটি, দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে এবং গাছপালায় ঘনায়মান সবুজের ফাঁকে ফাঁকে।

উপস্থিত লোকজন সকলেই পুরুষ এবং অতি বিচিত্র ধরনের। ওদের অনেকের গায়ে ডোরাকাটা খসখসে দামেশকী রেশেম অথবা হাতীর দাঁতের বর্ণবিশিষ্ট মোটা চীনা রেশেমের কাফতান অথবা নীলচে মিহি পশমের বিশাল ‘জোব্বা’। আর মাথায় লাল ‘তরবুশে’র উপর জরির কাজ করা সাদা পাগড়ি।কেউ কেউ পরেছে ইউরোপীয় পোশাক, কিন্তু তা নিয়েই, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ওরা দিওয়ানের উপর, গায়ের উপর পা রেখে বসে আছে পরম আরামে। কোন কোন বেদুঈন সর্দার ওদের দলবল নিয়ে এসেছে স্তেপ অঞ্চল থেকে, ওদের চোখগুলি উজ্জ্বল, আর কৃশ বাদামী রংয়ের মুখে খাট কালো দাড়ি। ওদের প্রত্যেকটি অংগ সঞ্চালনের সংগে সংগে ওদের নতুন কাপড়-চোপড়ের খসখস আওয়াজ হচ্ছে; ওরা প্রত্যেকেই বহন করছে রূপার খাপে ঢাকা তলোয়ার। আলস্যভরে পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত আরামের ভংগী ওদেরঃ খাঁটি অভিজাত ওরা- কেবল ওদের বেলা ইউরোপীয় অভিজাতদের থেকে তফাতটা এই যে, ওরা বহু পুরুষের আন্তরিক যত্ন এবং ভদ্র জীবন- যাপনের ফলে উদ্ভুত মৃদু উজ্জ্বল এক জাত নয়, বরং ওরা যেন নিজেদের অনুভূতির নিশ্চয়তা থেকে বার হয়ে আসা তপ্ত আগুন। সুন্দর বাতাস, একটি শুকনা পরিষ্কার আবহাওয়া ওদেরকে ঘিরে আছে। ঠিক একই ধরনের আবহাওয়া তার বিশুরদ্ধতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে সবাইকে, তবে অযাচিতভাবে নয়। এই লোকগুলি যেন সূদুরের বন্ধু, এ জায়গার ক্ষণিক মুসাফিরঃ ওদের মুক্ত লক্ষ্যহীন জীবন ওদের  জন্য অপেক্ষা করছে অন্য কোথাও।

নাচনেওয়ালী এক মেয়ে বের হয়ে এলো একটি দরোজা দিয়ে এবং হালকা পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ‘লিওয়ানে’। মেয়েটি বয়সে খুবই কাঁচা, নিশ্চয়ই কুড়ি বছরের বেশি হবে না এবং দেখতে অতি খুবসুরত। চড়চড় আওয়াজ করা, অবস্থান বদলের সাথে সাথে রং বদলায় এমনি এক ধরনের রেশমের ঢেউ খেলানো ইজার পরে, সোনালী রয়ের এক জোড়া চটি পায়ে আর মুক্তার বর্ডার দেয়া বডিস পরে, যা যতোটুকু না ঢেকেছে তার চাইতে বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে তার উঁচু উন্নত স্তন যুগকে, মেয়েটি আগালো এমনি এক তরুণীর ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্য ছড়িয়ে যে সকলের প্রশংসা পেতে ও বাঞ্ছিত হতে অভ্যস্ত আর তরুণীটির নরম মোলায়েম অংড়-প্রত্যংগ এবং তার টান টান হাতির দাঁতের মতো শ্রভ্র ত্বকের দৃশ্যে এই মজলিসের ভেতর দিয়ে আনন্দের যে একটা কল্লোল উঠলো, আমি যেন তা শুনতে পেলাম।

মেয়েটি তার সাথেই ‘লিওয়ানে’ যে মাঝারি বয়সের লোকটি এস ঢুকেছে তার হাতের তবলার বোলের সংগে তাল রেখে ঐ ধরনের চিরাচরিত কামোদ্দীপক নাচ নাচতে শুরু করে যা প্রাচ্যের অতি প্রিয় জিনিস, ঘুমন্ত বাসনাকে জাগিয়ে তোলা আর রুদ্বশ্বাস বাসনা পূর্তির আশ্বাস দানই যে নাচের উদ্দেশ্য।

-‘ওহো, কি বিস্ময়কর তুমি! ওহো, কি চমৎকার তুমি!’ আমার মেহমানদার বিড় বিড় করে, তারপর আমার হাঁটুতে আলতো করে থাপপড় মেরে বলে, ‘ছুড়ি কি একটি জখমের ওপর স্নিগ্ধ শীতল মলমের মতো নয়?’

নাচনেওয়ালীটি যেমন দ্রুত এসেছিলো তেমনি ত্বরিৎ আবার সে চলে গেলো- তার কিছুই আর অবশিষ্ট রইলো না কেবল বেশিরভাগ লোকের চোখে একটি অস্পষ্ট ঝিকিমিকি ছাড়া। ‘লিওয়ানে’র গালিচার উপর এখন নাচনেওয়ালীর স্থান গ্রহণ করেছে চারজন গায়ক। মেহমানদের একজন আমাকে বললঃ ‘এদের মধ্যে কেউ কেউ হচ্ছে সিরিয়ার সেরা গায়ক’। ওদের একজনের হাতে একটি লম্বা গলাওয়ালা বাঁশের বাঁশী। অপরজনের হাতে একটা চ্যাপটা এক মাথাওয়ালা ঢোল, অনেকটা ঘুংঘুর ছাড়া তাম্বয়ার মতো, তৃতীয় জনের হাতে এমন একটি যন্ত্র রয়েছে যা দেখতে গীটারের মতো এবং চতুর্থ জন নিয়েছে একটি মিসরীয় ‘তাম্বুরা’ যেনো একটা খুব চওড়া পিতলের বোতল, যার তলা ঢোলের চামড়া দিয়ে মোড়া।

প্রথমে ওরা খেলাচ্ছলে সূক্ষ্মভাবে টুঙটাঙ আওয়াজ তোলে, ঢোলে আঘাত করে, কোন রকম অনুভবযোগ্য স্পষ্ট তান লয় ছাড়াই; যেন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, যেন তারা যন্ত্রগুলিতে সূর তুলছে একটা সাধারণ উর্ধ্বমূখী তাল সৃষ্টির প্রস্তুতি হিসাবে। যার হাতে গীটার রয়েছে সে তার যন্ত্রে তারগুলির উপর দিয়ে উঁচু থেকে নিচু দিকে কয়েকবার তার আঙৃলের ডগা টেনে নেয়, ফলে একটা নিয়ন্ত্রিত বীণাধ্বনির আমেজ সৃষ্টি হয়। তাম্বারা-বাদক মোলায়েমভাবে তার ‘তাম্বারা’ বাজায়, বিরতি নেয় এবং আবার বাজায়। বাঁশীওয়ালা যেন আনমরা পর পর দ্রুতপতিতে কয়েকটি নিচু, তীক্ষ্ণ তন্ত্রীতে আঘাত করে, এমন সব তন্ত্রী, যা মনে হয়, যেন আকস্মিকভাবেই শুষ্ক একঘেঁয়ে বার বার আঘাত করা খঞ্জনীর সংগে মিলে যাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে বাঁশীর, পরমূহূর্তে গীটারের তারের প্রচণ্ড ঝংকারের প্রতি দ্বিধার সংগে সাড়া  দিতে ‘তাম্বুরা’কে বাধ্য করছে- আমি এ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার আগেই একটি ঐকিক তান লয়, চারটি যন্ত্রকে এক সংগে বেঁধে দিলো আর একটি ঐকতানে রূপ নিলো। একটি ঐকতান?- আমি বলতে পারবো না, আমার মনে হলো, একটি সংগীত অনুষ্ঠানের প্রতি আমি যতোটা না মন দিয়েছি তার চেয়ে বেশি আমি প্রত্যক্ষ করছি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা। আর যন্ত্রগুলির অবোধ্য তীক্ষ্ম স্বর থেকে জন্ম নিলো একটি নতুন তান লয়, যা উঠছে উচ্চগ্রামে, যেন গাঢ়, শংখের মত পেঁচানো রেখায় এবং তারপর হঠাৎ নেমে যাচ্ছে একেবারে নিচুতে, একটা ধাতব বস্তুর ছন্দময় উত্থান ও পতনের মতোঃ কখনো দ্রুতগতিতে, কখনো আস্তে, কখনো মোলায়েম ভাবে, কখনো সজোরে, নিস্পৃহ ঐকান্তিকতা ও আন্তহীন পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নির্বিঘ্ন ঘটনা, এই ধ্বনি ও শ্রুতিগত ব্যাপার, যা কাঁপছে একটি সংগত নেশার মধ্যে, বেড়ে উঠে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে প্রবেশ করে আমার চেতনায়ঃ এবং যখন ক্রমে, উচ্চগ্রামে ধাবমান এক সংগীতের মধ্যে হঠাৎ (তা কতো শীঘ্র আহা! কতো শীঘ্রই না থেমে গেলো!-) আমি বুঝতে পারলামঃ আমি বন্দী হয়েছি। এই সংগীতের উত্তেজনা আমাকে আমার অলক্ষ্যেই করে তুলেছিলো মোহবিষ্ট, আমাকে যেন পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই সব সূরে রাজ্যে, যে সূরগুলি তাদের বাহ্যিক একঘেয়েমিরই মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেয় অস্তিত্ববান সকল বস্তুর চিরন্তন পুনরাবৃত্তির কথা, এবং আমার অনুভূতির দরজায় ধাক্কা দিয়ে, আমার অজ্ঞাতে যা- কিছু আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে সবকিছুকে ধাপে ধাপে আনে বা’র করে- এমন কিছুকে অনাবৃত ক’রে সামনে রাখে যা সবসময়ই ছিলো, যা এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এমন এক তীব্র উজ্জ্বলতার সংগে যে, আমার হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো।

পাশ্চাত্য সংগীতের সাথে আমি পরিচিত। এ সংগীতের সুরকারের আবেগের সমগ্র পটভূমি পতিটি স্বতন্ত্র সূরে টেনে আনা হয় এবং প্রতিটি মেজাজে প্রতিফলিত করে সম্ভাব্য আর সকল মেজাজকে। কিন্তু এই আরবী সংগতি যেন উৎসারিত হলো চেতনার একই সমতল থেকে, একটি মাত্র নাজুক হালত থেকে- নাজুক হালত ছাড়া আর কিছুই যা ছিলো না- আর সে কারণেই তার প্রত্যেক শ্রোতার অনুভূতির ব্যক্তিগত মেজাজগুলিকে ধারণ করতে ছিলো সক্ষম….

কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর নিচু চাপা ভারিক্কি সূরে ‘তাম্বুরা’ বেজে ওঠে এবং বাকি যন্ত্রগুলি করে তার অনুসরণ। এবারকার সুর আগের চেয়ে অনেব বেশি নারীসুলভ; প্রসারণ অনেক বেশি মোলায়েম, প্রত্যেকের আলাদা- আলাদা কণ্টস্বর একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে যায় নিবিড়ভাবে, পরস্পরকে আলিংগন করে আবেগ-উষ্ণতার সাথে এ যেন একটা যাদুমন্ত্রে একত্র বাঁধা পড়ে অনেক-অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওরা একে অন্যকে আঘাত করে একে অপরকে ঘিরে প্রবাহিত হয় মৃদু তরংগায়িত রেখায়, যা প্রথমে কয়েকবার সংঘর্ষ বাঁধায় ‘তাম্বুরা’র দ্রুত তালের সংগে যেন একটি কঠিন বাধার সংগে সংঘর্ষ। কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ‘তাম্বুরা’র উপর বিজয়ী হয়ে এক বন্দী করে ফেলে, ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আপসে একটি সাধারণ, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠা সুরের উচ্চগ্রামে এবং তাম্বুরা প্রথম অনিচ্ছুক হলেও শিগগিরই সাধারণ বিহ্বলতার শিকার হয়ে পড়ে আর নেশায় মাতাল হয়ে যোগ দেয় আর সবার সংগে। তরংগায়িত রেখা হারিয়ে ফেলে তার নারীসূলভ কমনীয়তা আার ছুটে চলে বেড়ে ওঠা প্রচণ্ডতার সংগে, দ্রুততরো উচ্চতরো তীক্ষ্ণতরো হয়ে- সচেতন প্রবৃক্তির এক শীতল ক্রোধের মধ্যে, যে- প্রবৃত্তি সংযমের সমস্ত বাঁধন ছিড়ে ফেলেছে! সে তরংগায়িত রেখাই এবার পরিণত হলো শক্তি ও সার্বভেৌমত্বের অদৃশ্য কয়েকটি চূড়ার দিকে এক মাতাল বিহ্বল উর্ধ্বাভিসারে; কিছুক্ষণ আগেকার একে-অপরকে ঘিরে ঘূর্ণামান প্রবাহ থেকে জন্ম নেয় সূরের সঙ্গতিতে এক প্রচণ্ড চক্রবৎ ঘূর্ণন, চিরন্তন থেকে চিরন্তনের দিকে ছুটে চলা চক্রসমূহ, যার মান নেই, সীমা নেই, লক্ষ্য নেই, যেন অতল গর্তের ছুরির মতো ধারালো কিনারের উপর দিয়ে টানা রাশির উপর ছুটে চলেছে এক রুদ্ধশ্বাস বেপরোয়া বাজিকর, এক চিরন্তন বর্তমানের মর্ধ দিয়ে, এমন একটি উপলব্ধির দিকে যাকে বলা যায় মুক্তি এবং শক্তি- এবং যা সমস্ত চিন্তার অগোচর। হঠাৎ এক উর্ধ্বভিমুখী প্রসারণের মাঝখানে বিরতি, একটি মৃত্যুর নীরবতা- নির্দয়! সৎ। স্বচ্ছ।

গাছের পাতার মর্মর ধ্বনির মতো শ্বাস ফিরে এলো শ্রোতা ও দর্শকরে মধ্যে এবং দীর্ঘায়িত গুঞ্জত ‘ইয়া আল্লাহ ইয়া আল্লাহ’ উঠলো তাদের মধ্য থেকে। ওরা যেন এমনিতরো বুদ্ধিমান শিশু যারা এমন সব খেলায় মগ্ন থাকে, যা তাদের বহু পরিচিত এবং হামেশা তাদেরকে প্রলুব্ধ করে। ওরা সুখে আনন্দে স্মিত হাসি হাসছিলো।

তিন

আমরা আমাদের উট হাঁকিয়ে চলি এবং জায়েদ গান গায়; সবসময় একই তালে, সবসময় একই একঘেয়ে সুরে। কারণ, আরবের মনই হচ্ছে একঘেয়ে; কিন্তু তার মানে এ নয় যে, কল্পনার দিক দিয়ে সে দরিদ্র। কল্পনা শক্তি তার যথেষ্ট। কিন্তু তার সহজাত অনুভূতি প্রতীচ্যের মানুষের মতো বিস্তার, ত্রিমাত্রিক মহাশূণ্য এবং এক সংগে আবেগের নানা সূক্ষ্ম পরিবর্তন নিয়ে মগ্ন নয়। আরবীয় সংগীতের মাধ্যমে কথা বলে একটি মাত্র বাসনা, প্রতিবার, একটি একক আবেগধর্মী অভিজ্ঞতাকে তার সীমার একেবারে শেষপ্রান্তে নিয়ে যাবার জন্য। এই খাঁটি মনোটনিতে, অনুভূতিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন উর্ধ্বভিসারী রেখার ঘনীভূত করে দেখার এই প্রায়- ইন্দ্রিয়জ বাসনার মধ্যে আরব চরিত্রের শক্তি এবং ক্রটি- দু-ই নিহিত রয়েছে। এর ক্রটিঃ এই জগৎ জাগতিক পরিসরেও আগে অভিজ্ঞ হতে চায়। আর এর শক্তিঃ আবেগধর্মী জ্ঞান একটি অনন্ত রেখায় উর্ধ্বভিসারী হতে পারে, এ সম্ভাবনায় বিশ্বাসের পরিণাম মনোজগতে মানুষকে পৌছতে পারে আল্লাহর উপলব্দিতে, অন্য কোথাও নয়। কেবলমাত্র এই জন্মগত প্রবণতা, যা মরুবাসীদের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য, এর বুনিয়াদের উপরেই সম্ভব হয়েচিলো আদি ইহুদীদের তৌহিদ বা একেশ্বরবাদের উদ্ভদ এবং তার সাফল্যজনক পরিপূর্ণ রূপ, মুহাম্মদের ধর্মের। দুয়েরই পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমি, মায়ের মতো।

 

আত্মা এবং দেহ

এক

দিনগুলি গড়িয়ে চলে এব রাতগুলি সংক্ষিপ্ত। আর আমরা দু’জন ক্ষিপ্র পদে চলি দক্ষিণদিকে। আমাদের উটগুলি এখন খুবই সুস্থ, শক্তিমান। সম্প্রতি তাদের পারি খাওয়ানো হয়েছে এবং গত এক দু’দিন তাদেরকে প্রচুর ঘাস খেতে দেওয়া হয়েছে চারণ ক্ষেত্রে। মক্কা আর এ জায়গার মধ্যে এখনো রয়েছে চৌদ্দ দিনের পথ এবং তার বেশিও হতে পারে, যদি আমরা কিছুটা সময় কাটাই- যার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে- হাইল ও মদীনা নগীরতে, যে শহর দু’টি পড়বে আমাদেরই রাস্তায়।

এক অস্বাভাবিক অধৈর্য আমাকে পেয়ে বসেছে- এমন একটা তাগিদ যার কোন ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। এতোদিন আমি মনের আনন্দে কোনরকম তাড়াহুড়া না করেই সফর করেছি; জলদি জলদি গন্তব্যে পৌঁছানোর বিশেষ তাকিদ ছিলো না কখনো। সফরে পূর্ণতা এবং লক্ষ্যস্থল সবসময়ই মনে হয়েছে আকস্মিক। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম তা-ই যা আমি আরব দেশে আমার বহু বছরে কখনো উপলব্ধি করিনিঃ রাস্তার শেষপ্রান্তে পৌঁছানোর অধৈর্য। রাস্তার শেষ কী? মক্কা দেখা? আমি এই পবিত্র নগরীতে এতোবার গিয়েছি এবং এ জীবনধারাকে এতো বিশদভাবে আমি জানি যে, মক্কা আর আামার জন্য নতুন কোন আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতি বহন করে না- অথবা একটি নতুন কোন আবিষ্কার, যা আমি প্রত্যাশা করছি? নিশ্চয়ই তাই হবে। কারণ আমি মক্কার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি একটি অদ্ভুত ব্যক্তিগত প্রত্যাশায়। পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চল থেকে আগত বহু জাতির মানুষের জামায়েতসহ মুসলিম বিশ্বের এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রটি, আমি একন যে- জগতে বাস করছি তার চাইতে, প্রশস্ততরো এক জগতের প্রবেশ- পথ যেন। এ নয় যে, আমি আরব দেশ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; না আমি আরবের মরুভূমি, তার শহর, তার অধিবাসীদের জীবনধারা ভালোবাসি, যেমন আমি আরবের মরুভূমি, তার শহর, তার অধিবাসীদের জীবনধারা ভালোবাসি, যেমন আমি সবসময়ই তাদের ভালবেসেছি। প্রায় দশ বছর আগে সিনাই মরুভূমিতে আরব-জীবনের যে প্রথম আভাস পেয়েছিলাম, তারপর কখনো আমার কাছে নৈরাশ্যের কারণ ঘটেনি এবং পরবর্তী বছরগুলি আমার প্রথম প্রত্যাশাকেই কেবল মজবুত করেছে। কিন্তু দু’দিন আগে ইদারার কাছে আমি যে-রাতটা কাটিয়েছি তখন থেকে আমার মধ্যে এই প্রত্যয় জন্মেছে যে, আরব মুলুক আমাকে তার যা দেবার ছিলো সবই দিয়েছে নিঃশেষে।

আমি শক্ত-সমর্থ, তরুণ এবং স্বাস্থ্যবান। অহেতুক ক্লান্ত না হয়ে আমি একলাগা ঘণ্টার পর ঘণ্টা উট হাঁকিয়ে চলতে পারি। আমি সফর করতে পারি এবং বহু বছর ধরেই আমি সফর করে চলেছি বেদুঈনের মতো, তাঁবু এবং ছোট-খাট সেসব আরাম-আয়েশ ছাড়াই, যা নযদের শহুরে লোকদের মতে দীর্ঘ সফরে অপরিহার্য। বেদুঈন জীবনের ছোট-খাট সব রকম নিপুণতার সাথেই আমি অভ্যস্ত এবং আমার প্রায় অজান্তেই আমি গ্রহণ করেছি নয়দী আরবের চালচলন ও রীতিনীতি। কিন্তু এ-ই কি সম্ভাব্য সব কিছু? আমি কি এতোদিন আরব মূলুকে বাস করেছি কেবলমাত্র একজন আরব হওয়ার জন্য? কিংবা একি এমন কিছুর জন্য প্রস্তুতি যা এখনো ঘটেনি?

…..     ……      …..      ……

আমি যে চাঞ্চল্য এখন অনুভব করছি তা মধ্যপ্রাচ্যে আমার পয়লা সফরের পর ইউরোপে ফিরে এসে যে তীব্র অধৈর্ড আমি উপলীব্ধ করেছিলাম অনেকটা তারই মতোঃ একটি প্রচণ্ড আবিষ্কারের ঠিক পূর্বমূহূর্তে হঠাৎ থেকে যাওয়ার উপলব্ধি- যে আবিস্কার ঘটতে পারতো আমার জীবনে, যদি আমার হাতে থাকতো কেবল আরো বেশি কিছু সময়।

আর জাহান ছেড়ে আবার ইউরোপ প্রবেশ করার প্রাথমিক চাপ কিছুটা ফিকা হয়ে এসেছিলো-  ১৯২৩ সালের শরৎকালে, সিরিয়া ত্যঅগের পর, আমার কয়েক মাস তুরস্কে কাটানোর ফলে। মোস্তফা কামালের তুরস্ক তখনো প্রবেশ করেডিন তার সংস্কারবাদী অনুকরণের পর্যায়ে। তখনো তুরস্ক ছিলো তার জীবনধারার ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে খাঁটি তুর্কী; এবং এজন্য ইসলাম ধর্মের ঐক্যবন্ধনে তখনো সে ছিলো আরব জীবেনর সাধারণ। গতিধারার সংগে সম্পর্কিত। কিনতু তুরস্কের হৃদয়ের দ্বন্দ্বে মনে হয়েছিলো বেশ কিচুটা ভারিক্কি, কম স্বচ্ছ, কম লঘু এবং অনেক বেশি প্রাচ্য দেশীয়। যখন আমি স্থলপথে সফর করি ইস্তাম্বুল থেকে সোফিয়া এবং বেলগ্রেড়ে, মাশরিক থেকে মাগরিবে প্রবেশ আকস্মিক একটা ছেদের মতো মনে হয়নি আমার; চিত্রগুলি বদলালো ধীরে ধীরে, ক্রমশ, একিট পরিবেশ- মিনারের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে, পুরুষদের লম্বা ‘কাফতানে’র জায়গায় দেখা গেলো কিষাণদের কোমরবন্ধ আঁটা জামা। আনাতোলিয়অর বিক্ষিপ্ত গাছপালা ও উপবন যখন হারিয়ে গেলো সার্বিয়ার ফার বনাঞ্চলে তখন সহসা ইতালীর সীমান্তে আমি দেখতে পেলাত- আমি আবার ইউরোপে ফিরে এসেছি।

ত্রিয়েস্ত থেকে ভিয়েনার দিকে যাচ্ছি আমি ট্রেনে। চলতে চলতে তুরস্ক আমার মনের উপর যে- সব ছাপ এঁকে দিয়েছিলো সেগুলির সজীবতা হারিয়ে যেতে লাগলো এবং আরব মুলূকগুলিতে আমি যে আঠারোটি মাস কাটিয়েছিলাম তা-ই কেবল টিকে রইলো একমাত্র বাস্তবরূপে। এ আমার কাছে মনে হলো যেন একটা কশাঘাত যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার এককালের অতো পরিচিত ইউরোপীয় দৃশ্যাবলীর দিকে আমি তাকাচ্ছি এক বিদেশীর চোখে। মানুষগুলি মনে হলো ভয়ানক কুৎসিক, গতিবিধি ওদের রূঢ় এবং বিশ্রী; ওরা যা সত্যি সত্যি   অনুভব করে আর চায় তার সাথে ওদের প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্কেই নেই; এবং হঠাৎ এক ঝলকে আমি বুঝতে পারলাম, ওরা যা- কিছু  করছে তাতে একটা উদ্দেশ্যের বাহ্যিক আভাস থাকলেও ওরাওদের অজান্তেই বাস করছে এক ছলনার জগতে… আরবদের সহবতে আসার ফলে জীবনে আমি যাকে অপরিাহর্য এবং মৌলিক মনে করেছি, অতোদিনে তার প্রতি আমার মনোভাব একেবারে স্পষ্টই এবং অপরিবর্তনীয়ভাবেই বদলে গেছে; অনেকটা বিস্ময়ের সংগে আমি স্মরণ করলাম- আমার পূর্বে বহু ইউরোপীয়ই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে আরব জীবনধারা; তাহলে এ কী করে সম্ভবপর হলো যে, আমি যে আবিস্কারের ধাক্কায় বিচলিত হয়েীছ ওদের সে ধাক্কা লাগেনি? অথবা ওদেরও কি তা লেগেছে? ওদের কেউ কেউও কি ওদের মর্মের গভীরে বিচলিত হয়েছে যেমন আমি এখন হয়েছি?

এ প্রশ্নের জবাব কয়েক বছর পর আমি পেয়েছিলাম আরব মুলুকে। জবাবটি এসেছিলো জেদ্দায় তখনকার দিনের ডাচ মন্ত্রী ডঃ ভ্যান ডার মিউলেনের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন এক উদার বহুমুখী সংস্কৃতির মানুস। আপন ধর্ম খৃশ্চানিটিকে তিনি এমন একটি আবেগ ও নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে ছিলেন যা আজকের পশ্চিমী লোকদের মধ্যে একেবারই বিরল। কাজেই বলা যায়, বোধগম্যবাবেই তিনি ধর্ম হিসাবে ইসলামের বন্ধু ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন- জীবনে যেসব দেশের সংগে তাঁর পরিচয় হয়েছে তার প্রত্যেকটি থেকে, এখন কি তাঁর নিজের দেশ থেকেও আরব দেশকে তিনি ভালোবাসেন বেশি। হিজাজে তাঁর কাজের মেয়াদ যখন প্রায় ফূরিয়ে এসেছে, তখন আমাকে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কোন তীক্ষ্ণ অনুভূতিশীল মানুষ কখনো আরবীয় জীবনের যাদু-প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না, পারবে না আরবদের মধ্যে কিছুদিন কাটানোর পর এ প্রভাবকে তার হৃদয় থেকে উপড়ে তুলে ফেলতে। কেউ যদি এদেশ থেকে চলে যায়, চিরদিনের জন্য তবু সে হৃদয়ে বহন করবে এই মরুভূমির হাওয়া এবং হামেশাই সে পেছনে ফিরে এক দিকে তাকাবে উৎসুক আকাংখায়, তার নিজের ঘরবাড়ি যদি অনেক বেশি ঐশ্বর্যশালী এবং অনৈক বেশি সুন্দর অঞ্চলে হয়… তবুও’।

আমি কয়েক হপ্তার জন্য ভিয়েনায় থাকি এবং আমার আব্বার সংগে একটা আপোসে আসি। আমার বিশ্বাবিদ্যালয় ত্যাগ এবং যে অসৌজন্যের স াথে আমি তাঁর বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিলাম তার জন্য তিনি তাঁর রাগ ইতিমধ্যেই জয় করেছিলেন। আর যা’ই হোক, আমি এখন ‘ফ্রাংকফৃর্টঅর শাইটুঙ’- এর সংবাদদাতা; এটি এমন একটি নাম, যা তখনকার দিনে মধ্য ইউরোপে উচ্চারিত হতো প্রায় সভয় শ্রদ্ধার সাথে। এই পত্রিকার সংবাদদাতা হয়ে আমি সকলের উপর থাকবো, আমার এই দম্ভপূর্ণ দাবি আমি সার্থক প্রমাণ করেছি।

ভিয়েনা থেকে আমি সোজা রওনা করি ফ্রাংকফুর্টে, সশরীরে সেই কাগজের অফিসে হাজিরা দিতে, যার জন্য আমি এক বছরের অধিককাল ধরে লিখে চলেছি। ওখানে আমি হাজির হই প্রচুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে; কারণ ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আমি যে-সব চিঠি-পত্র পেয়েছিলাম তাতে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, আমার কাজে ওরা খুবই খুমি। আমি সত্যি সত্যিই ওখানে ‘হাজির হয়েছি’। এই  উপলব্ধি নিয়ে ঢুকলাম ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’-এর গম্ভীর পুরানো ফ্যাশানের প্রাসাদে। ঢুকে প্রধান সম্পাদক বিশ্ববিখ্যাত ডক্টর হাইনবিশ সাইমন- এর নিকট আমার কার্ড পাঠিয়ে দিলাম।

যখন আমি তাঁর কামরায় ঢুকি, মুহূর্তকালের জন্য তিনি  তাকালের নির্বাক বিস্ময়ে; চেম্বার থেকে উঠতেও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিগগিরই তিনি তাঁর সমাহিত বাব ফিরে পেলেন এবং দাঁড়িয়ে আমার সংগে হাত মেলালেন।

-‘বসুন, বসুন। আমি আপনারই অপেক্ষা করছিলাম’। তিনি আমার দিকে নিষ্পলক চোকে তাকিয়ে রইলেন আর কোন কথা না বলে। ফলে, আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।

-‘কোন ক্রটি হয়েছে কি ডঃ সাইমন?’

-‘না, না, কোন ক্রটি হয়নি। কিংবা বলতে পারেন সবই ভূল…’। তারপর তিনি সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়লেন এবং বললেন. –‘যেমন করেই হোক, আমি আশা করেছিলাম একটি মাঝারি বয়সের লোকের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি, যার চোখে রয়েছে সোনালী ফ্রেমে আঁটা চশমা; আর আমি কিনা দেখতে পাচ্ছি একটি বালাককে… ওহো, আমাকে মাফ করুন- যদি কিছু মনে না করেন- আপনার বয়স কতো?’

হঠাৎ আমার মনে পড়লো কায়বোর ফুর্তিবাজ ডাচ সওদাগরের কথা; সেও আমাকে এক বছর আগে একই প্রশ্ন করেছিলো। আামি উচ্চ হাস্যে ফেটে পড়লাম, ‘আমার বয়স তেইশের কিছু উপরে স্যার, চব্বিশের কাছাকাছি’ তারপর আমি যোগ করি, ‘আপনি কি মনে করেন ‘ ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর জন্য এ বয়স খুবই কম?’

-‘না’, ধীরে ধীরে জবাব দেন সাইমন, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টঅর শাইটুঙ’-এর জন্য নয়, আপনার প্রবন্ধগুলির  জন্য। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম আত্মপ্রচারের স্বাভাবিক ইচ্ছাকে জয় করে নিজের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে লেখার আড়ালে রেখে দেয়া, যেমনটি আপনার লেখায় লক্ষ্য করেছি, তা আরো অনেক বেশি বয়সের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আপনি জানেন, এ হচ্ছে পরিণত সাংবাদিকতার গোপন রহস্যঃ আপনি যা দেখেছেন, শুনেছেন এবং ভাবছেন তার সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখা, সেই সব অভিজ্ঞতাকে আপনার নিজের একান্ত ‘ব্যক্তিগত’ অভিজ্ঞতার সংগে না জড়িয়ে…। পক্ষান্তরে এ বিয়ষে চিন্তা করে এখন আমার মনে হচ্ছেঃ কেবল খুব এক তরুণই লিখতে পারতো অতো বেশি আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে, অতো বিপুল- আমি কেমন করেই যে বলি- অতো বিপুল পুলক রোমাঞ্চের সাথে…

এরপর তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন- ‘আমি এ আশই করছি যে, এ যেন ক্ষয়ে না যায়। এবং আপনি যেন আর সব্বাইর মতো আত্মতুষ্ট, ভোঁতা স্থুল হয়ে না পড়েন-‘।

মনে হয়, আমার এই অীত তারুণ্যের আবিষ্কারই ডঃ সাইমনের এ বিশ্বাসকে আরো শক্ত ও জোরদার করে তোলে যে, তিনি আমার মধ্যে খুবই সম্ভাবনাময় এক সাংবাদিকের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তিনি পুরাপুরি একমত হলেন যে, যতো জলদি সম্ভব আমার আবার মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে যাওয়া উচিত। যতো শীগগিরই ফেরা যায় ততোই ভাল। টাকা-পয়সার দিক দিয়ে এ ধরনের একটি পরিকল্পনার পথে আর কোন বাধা নেই। কারণ শেষপর্যন্ত জার্মান মুদ্রাস্ফীতিকে আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে এবং মুদ্রামূল্যে স্থিতিশীলতা আসার ফলস্বরূপ প্রায় সংগে সংগেই এসেছে সমৃদ্ধির এক প্লাবন। ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আবার সামর্থ্য অর্জন করেছে তার বিশেষ সংবাদদাতাদের ভ্রমণের খরচ বহন করতে। অবশ্য আবার মধ্যপ্রাচ্যের পথে বের হয়ে পড়ার আগেই, এ সংবাদপত্রটির সাথে যে বইটি লেখার জন্য প্রথমে আমি চুক্তি করেছিলাম, সে বইটি আমাকেলিখৈ দিতে হবে এবং এ-ও ঠিক হলো যে, এই সময়ের মধ্যে আমাকে সম্পাদকীয় দফতরের সংগে যুক্ত থাকতে হবে, যাতে করে আমি একটি বড় খবরের কাগজের কাজের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারি।

ফের বিদেশে যাবার জন্য আমার অধৈর্য সত্ত্বেও ফ্রাঙ্কফুর্টের ঐ মাসগুলি ছিলো ভয়ানক রকমের উদ্দীপনাপূর্ণ। ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ কেবল একটি বড় সংবাদপত্রই ছিলো না, এ ছিলো রীতিমতো এক গবেষণা কেন্দ্র। পূঁতাল্লিশজন পুরা সম্পাদক ছিলো এ কাগজটির। বার্তাকক্ষে যে বহু সংখ্যাক সহ-সম্পাদক এবং সহকারী কাজ করতো তাদেরকে এখানে গোণা হয়নি। সম্পাদকীয় কাজটি ছিলো বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞদের কাজ। পৃথিবীল প্রত্যেকটি অঞ্চল এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক বিষয় অর্পিত ছিলো এমন একজন সম্পাদকের হাতে যিনি ছিলেন নিজ ক্ষেত্রে এক অসাধারণ বিশেষজ্ঞ। আর এ ছিলো সেই পুরানো ঐতিহ্যেরই অনুসরণ যে, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টঅর শাইটুঙ’-এর রচনা ও খবর কেবল চলমান ঘটনার ক্ষণিক প্রতিফলনই হবে না, বরং তা হবে এক  ধরনের প্রমাণ্য সাক্ষ্য, যার উপর রাজনৈতিক এবং ইতিহাসবিদেরা পারবেন নির্ভল করতে। একথা সবাই জানতো- বার্লিনের পররাষ্ট্র দফতরে ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ- এর সম্পাদকীয় এবং রাজনৈতিক ভাষ্যগুলি ফাইল করা হয়- বিভিন্ন বিদেশী সরকারের ‘চিঠিপত্র’ যেমন শ্রদ্ধার সাথে ফাইল করা হয় তেমনি। (বস্তুত এই পত্রিকার বার্লিন দফতরের তখনকার দিনর প্রধান সম্পর্কে বিসমার্ক বলেছিলেনঃ ডঃ স্টেইন হচ্ছেন বার্লিন দরবারে ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’-এর রাষ্ট্রদূত) এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়া আমার বয়সের একজন তরুণের  জন্য ছিলো সত্যি সত্যি গৌরবের ও আনন্দের। এ আনন্দ আরো বেশি করে অনুভব করি এজন্য যে, মধ্যপ্রাচ্যে সম্পর্কে আমি দ্বিধার সাথে যে- সব মতামত পেশ করেছি সেগুলির প্রতি সম্পাদকেরা গভীর মনোযোগ দিয়েছেন এবং প্রায়ই সেগুলি দৈনিক সম্পাদকীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু হয়েছে। অবশ্য আমার চূড়ান্ত সাফল্য সেই দিনই এলো যেদিন আমাকে বলা হলো সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার উপর একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখতে।

‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ’- এ আমাকে যে কাজ দেওয়া হলো তা আমার সজ্ঞান চিন্তার পেচনে যোগায় বিপুল উদ্দীপনা্। আগে সবসময়েই আমার চিন্তার যে স্বচ্ছতা ছিলো তার চাইতে আরো অনেক বেশি স্বচ্ছতার সাথে আমি আমার প্রাচ্যদেশের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম পাশ্চাত্যের সাথে, যার আমি অংশ হয়েছি আবার, ঠিক যেমন ক’মাস আগে আরবদের হৃদয়ের নিরাপত্তাবোধ এবং তাদের আচরিত  ধর্মের মধ্যে একটা যোগ আবিষ্কার করেছিলাম তেমনি এখন আমার মনে হতে লাগলো- ইউরোপের যে আত্মিক সংহতি নেই আর তার নৈতিকতায় যে নৈরাজ্য বিদ্যমান তার কারণ হয়তো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ- যে বিশ্বাস পাশ্চাত্য সভ্যতাকে রূপ দিয়েছিলো একদিন।

এখানে আমি দেখতে পেলাম এমন এক সমাজ যা আল্লাহকে পরিত্যাগ করার পর একটা নতুন রূহানী পথের সন্ধানে রয়েছে; কিন্তু জাহিরা পশ্চিমের খুব কম লোকই উপলব্ধি করেছে সমাজের সেই লক্ষ্যটি কী-। জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে প্রতীচ্যের অধিকাংশ লোক কম-বেশি অনেকটা এ ধরনেরই চিন্তা করতো বলে মনে হয়- ‘যেহেতু আমাদের বুদ্ধি, আমাদের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ, আমাদের হিসাব-নিকাশ, মানব জীবনের সূচনা এবং দৈহিক মৃত্যুর পর তার পরিণাম সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু ব্যক্ত করে না, আমাদের তাই উচিত সমস্ত শক্তিকে আমাদের বৈষয়িক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা বিকাশের জন্য নিয়োজিত করা- অতীন্দ্রিয় নীতিশাস্ত্র আর স্বতঃসিদ্ধ ধ্যান-ধারণা, যা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ধার ধারে না, তার দ্বারা আমাদের নিজেদেরকে বন্দী করা উচিত নয়’। তাই প্রতীচ্যের সমাজ যদিও প্রকাশ্যে আল্লাহকে অস্বীকার করেনি তবুও তার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন-ব্যবস্থার তাঁর জন্য আর কোন স্থানই সে রাখেনি।

বেশ কয়েক বছর আগে আমার পূর্বপুরুষদের ধর্ম সম্বন্ধে আমি যখন নিরাশ হয়ে পড়ি তখন আমি খুশ্চান ধর্ম নিয়ে কিছু চিন্তা করেছিলাম। আমার দৃষ্টিতে আল্লাহ সম্পর্কে খৃশ্চান ধারণা ছিলো ওল্ড টেস্টামেন্টের ধারণা থেকে অনেক-অনেক বেশি মহৎ, কারণ এ ধর্ম আল্লাহর ভাবনাকে কোন এক মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্দ করেনি, বরং তিনি যে গোটা মানবজাতির পিতা- এই ধারণার জন্ম দিয়েছে। অবশ্য, খৃশ্চান ধর্ম- বিশ্বাসের মধ্যে এমন একটি  উপাদান রয়েছে যা এই ধর্মের সার্বিক দৃষ্টিভংগী থেকে এক বিচ্যুতি; সে উপাদানটি হচ্ছেঃ খৃশ্চান ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেহ ও আত্মার মধ্যকার প্রভেদ, বিশ্বাসের জগৎ ও বাস্তব বৈষয়িক জগতের মধ্যকার ব্যবধান ও পার্থক্য।

যে-সব প্রবণতা জীবনকে এবং জাগতিক উদ্যমকে সত্য বলে স্বীকার করতে চায় সে-সব থেকে শুরুতেই খৃশ্চান ধর্ম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায়, আমার মনে হলো, খৃশ্চান ধর্ম বহু আগেই পাশ্চাত্য সভ্যতার পেচনে একটি নৈতিক উদ্দীপনা যোগাবার শক্তি সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। খৃশ্চান ধর্মের অনুসারীরা এ ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে যে, মানুষের ব্যবহারিক জীবনে নাক গলানো ধর্মের কাজ নয়। ওরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে একটা শান্তিপ্রদ প্রথা ভেবেই সন্তুষ্ট, যে প্রথার উদ্দেশ্য- ব্যক্তিগতভাবে পুরুষ ও নারীর মধ্যে একটা অস্পষ্ট ব্যক্তিগত নৈতিকতাবোধের, বিশেষ করে যৌন ব্যাপারে নৈতিকতার পোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবে চার্চের একটি বহু প্রাচীন দৃষ্টিভংগির সহায়তায় ওরা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের গোটা ক্ষেত্রটিকেই নিজেদের গণ্ডির বাইরে রেখে দিয়েছে। চার্চের সেই দৃষ্টিভংগীটি হচ্ছেঃ ‘আল্লাহর পাওনা আল্লাহকে দাও এবং সিজারের পাওনা দাও সিজারকে’- এই বিভাগ। এভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রকে নিজেদের গণ্ডির বাইরে রেখে দেওয়ায় খৃশ্চান রাষ্ট্রনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য যে-পথ ধরে বিকাশ লাভ করেছে তা হযরত ঈসা কল্পিত পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জাগতিক ব্যাপারে তাঁর অনুসারীদের একটা বাস্তব পন্হা নির্দেশ করতে না পারায় পাশ্চাত্য জগত যে ধর্ম অনুসরণ করে, আমার মতে, তা হযতর ঈসার সত্যিকার উদ্দেশ্যের এবং বলা যায়, অনুসরণ করে, আমার মতে, তা হযরত ঈসার সত্যিকার উদ্দেশ্যের এবং বলা যায়, প্রত্যেক ধর্মেরই যা মূল লক্ষ্য তার বিচারে ব্যর্থ হয়েছে? সেই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যটি কি? মানুষ কিভাবে অনুভব করবে শুধু তা’ই নয়, বরং কিভাবে সে সঠিক জীবন-যাপন করবে তা দেখানোই হচ্ছে সেই লক্ষ্য। নিজের ধর্ম একভাবে না একভাবে তাকে নিরাশ করেছে, ব্যর্থ করেছে, এই সহজাত অনুভূীতর ফলে প্রতীচ্যের মানুষ বিগত কয়েক শতাব্দীতে খৃশ্চান ধর্মে তার সর্বপ্রকার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এই বিশ্বাস হারানোর ফলে সে এই প্রত্যয়ও হারিয়েছে যে, বিশ্বজগত একটিমাত্র পরিকল্পক মনের অভিব্যক্তি এবং সে কারণে, তা এক সুসমন্বিত সমগ্র। আর এ প্রত্যয় হারিয়েছে বলেই এখন সে জীবন-যাপন করছে এক আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শূণ্যতার মধ্যে। পশ্চিম যে এভাবে ধীরে ধীরে খৃশ্চান ধর্ম থেকে দূরে সরে পড়েছে তার মধ্যে আমি দেখতে পেলাম, ইহজীবনের প্রতি সেন্ট পলের যে ঘৃণা একেবারে শুরুতেই এবং সম্পূর্ণভাবেই হযরত ঈসার শিক্ষাকে দুর্বোধ্য করে তুলেছিলো তারই বিরুদ্ধে এক সবল বিদ্রোহ। তাহলে, পাশ্চাত্য সমাজ কি করে এখনো দাবি করতে পারে খৃস্ট সমাজ বলে? এবং একটি বাস্তব বিশ্বাস ছাড়া কী করেই বা ওরা বর্তমান নৈতিক নৈরাজ্যকে কাটিয়ে ওঠার আশা করতে পারে?

নিজস্ব অবস্থান থেকে উলট-পালট, উৎক্ষিপ্ত বিপর্যস্ত এক বিশ্বঃ এ-ই ছিলো আমাদের পাশ্চাত্য জগত। অভূতপূর্ব ব্যাপকতার সাথে রক্তপাত, ধ্বংসলীলা, হিংসাত্মক হানাহানি, বহু সামাজিক প্রথাপদ্ধতির ভাঙন, আদর্শের সংঘাত, নতুন নতুন জীবন-পদ্ধতিরে পক্ষে তিক্ত, সর্বাত্মক সংগ্রাম- এগুলিই ছিলো আমাদের সময়কার লক্ষণ। একটি বিশ্বযুদ্ধের ধূম্রজাল আর ধ্বংসলীলা থেকে অসংখ্য ছোট ছোট যুদ্ধবিগ্রহ এবং বহু বিপ্লবে ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে থেকে- তখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ সমস্ত কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থণৈতিক বিপর্যয় থেকে- এককথায়, ভয়ংকর এ সকল ঘটনা থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো একটি সত্য যে, কেবল বৈষয়িক এবং কারিগরি প্রগতির উপর প্রতীচ্যের বর্তমান একান্ত- নির্ভরশীলতাই আজকের নৈরাজ্য ও বিশৃংখলাকে দূর করে একটা ঐক্য ও শৃঙ্খলা স্থাপন করতে কিছুতেই সক্ষম নয়। মানুষ কেবল রুটি খেয়েই বাঁচে না, আমার এই সহজাত যৌবন-ধর্মী প্রত্যয় দানা বাঁধলো এই বুদ্ধিগত প্রত্যয়ে যে, মানুষ বর্তমানে ‘প্রগতির’ যে পূজা করছে তা আগের দিনের অবিমিশ্র মূল্যে বিশ্বাসের্ই একটি দুর্বল অস্পষ্ট প্রতিকল্প ছাড়া কিছুই নয়- আরর এই মিথ্যা বিশ্বাস সে-সব মানুষই উদ্ভাবন করেছে যারা অবিমিশ্র শর্তাতীত মূল্যে বিশ্বাস করবার হৃদয়গত সমস্ত ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন এই বিশ্বাসের দ্বারা নিজেদের ছলনা করছে যে, কোন- না কোনভাবে কেবল বিবর্তনের তাড়নায়ই মানুষ তার বর্তমানের বাধা-বিধ্নগুলি কাটিয়ে উঠবে। আমি বুঝতে পারলাম না, এই খেয়ালী বিশ্বাস থেকে নির্গত নতুন সব অর্থনৈতিক ব্যবস্থঅর কোন একটি কী করে পাশ্চাত্য সমাজের দুঃখ-দূর্দশার একটি সাময়িক প্রতিষেধকের বেশি কিছু হতে পারে? এ ব্যবস্থাগুলি বড় জোর এর কোন- না- কোন লক্ষণেরই কেবল চিকিঝসা করতে পারে, কিন্তু ব্যাধির মূল কারণের কখনও নয়।

……   ……      …….   ……..

আমি যখন ‘ফ্রঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’-এর সম্পাদকীয় দফতরে কাজ করছিলাম তখন প্রায়ই বার্লিনে যেতাম যেখানে ছিলো আমার প্রায় সকল বন্ধু-বান্ধব এবং বার্লিনে এ ধরনের একটি সফরকালেই সেই নারীর সংগে আমার সাক্ষাৎ হয়, পরবর্তীকালে যে হয়েছিলো আমার সহধর্মিনী।

রোমানিশেজ ক্যাফের জমজমাট ভিড়ের মধ্যে যে মুহূর্তে আমাকে এলসার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়অ হয় তখন থেকেই আমি তার প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। এ আকর্ষণ কেবল তার চেহারার নাজুক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তার সংকীর্ণ, সুবিন্যস্ত অস্থিবিশিষ্ট মুখমণ্ডলের জন্য, যাতে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ গভীর নীল দু’টি চোখ আর অনুভূতিশীল নাজুক মুখ, যা ব্যক্ত করে রসবোধ ও মেহেরবানী,- বরং তারও চাইতে বেশি, যে-হৃদয়গত ইন্দিয়জ সহজ গুণের মাধ্যমে সে মানুষ এবং বস্তুকে গ্রহণ করে, সে কারণে। এলসা ছিলো একজন চিত্রশিল্পী। পরে আমি জানতে পেরেছিলাম ওর শিল্পকর্ম উঁচু দরের না হলেও ওর সেই স্নিগ্ধ উজ্জ্বল গভীরতা- ওর সমস্ত কথায় ও অংগভংগীতে যা ব্যক্ত হতো- ওর সমস্ত শিল্পকর্মও বহন করতো তারই ছাপ, যদিিও তার বয়স ছিলো আমার চাইতে পনেরো বছর বেশি, অর্থাৎ তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশের উপর- তবু তার মসৃণ মুখমণ্ডল আর ক্ষীণ, নমনীয় শরীরের জন্য তাকে দেখলে মনে হতো অনেক কম বয়সের। জীবনে খাঁটি নর্ডিক জাতের যতো মানুষ আমি দেখেছি, সম্ভবত এলসাই হচ্ছে তাদের সুন্দরতম প্রতিনিধি। বিশুদ্ধ নর্ডিক জাতের মানুষের চেহারায় যে পরিচ্ছন্নতা ও তীক্ষ্ণতা থাকে সবই ছিলো তার মধ্যে; কিন্তু এ জাতেরই মানুষের মধ্যে প্রায়ই যে অনমনীয়তা এবং অনুভূতিহীনতা দেখা যায় এলসা ছিলো তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এলসার জন্ম সেই সব পুরানো হলস্টিন পরিবারগুলির একটিতে, যাদেরকে বর্ণনা করা যেতে পারে ইংরেজ ‘জোতদার সম্প্রদায়েরে’ উত্তর-জার্মান সমগোত্রীয়রূপে। কিন্তু তার চলাফেরা ও আচরনের মধ্যে যে সংস্কারমুক্ত স্বাধীনতা ছিলো তা’ই জোতদারসুলভ বস্তুনিষ্ঠতার স্থলে তাকে দিয়েছিলো সম্পূর্ণ এক অ-নর্ডিকসুলভ উষ্ণতা আর স্বাভাবিক বিচক্ষণতা। এলসা ছিলো বিধবা, তার ছিলো ছ’বছরের একটি পুত্র, যাকে সে খুবই ভালোবাসতো।

নিশ্চয়ই শুরু থেকেই এ আকর্ষণ ছিলো দু’তরফা, কারণ প্রথম সাক্ষাতের পর প্রায়ই আমরা একে অপরের সাথে দেখা করতে থাকি। আরব জগতের সাম্প্রতিক ছাপ আমার মনেক এতোটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে, আমি স্বাভাবিকভাবেই এলসাকে সেসব বলতে থাকি আর এ-সব ছাপ আমার মধ্যে যে মজবুত অথচ এখনো বিচ্ছিন্ন অনুভূতি ও ধারণার জন্ম দিয়েছে সেগুলির প্রতি সে আমার বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধব থেকে ভিন্নরূপে এক অসাধারণ সমঝদারি ও সহানুভূতির পরিচয় দেয়। এলসাকে এতো গভীর করে এসব জানাতে চেয়েছি যে, নিকট-প্রাচ্যে আমার সফরের বর্ণনা করে আমি যে বইটি লিখছিলাম তারি একটি ভূমিকা লিখতে গিয়ে আমার মনে হলো, আমি যেন এলসাকেই সম্বোধন করে লিখছিঃ

যখন কোন ইউরোপীয় ইউরোপের এমন কোন দেশে সফর করে যা সে আগে কখনো দেখেনি তখন সে কিছুটা বিস্তৃততরো হলেও নিজের পরিবেশের মধ্যেই বিচরণ করে চলে এবং সহজেই, অভ্যাস যে-সব জিনিসের সংগে তাকে পরিচিত করেছে এবং চলার পথ যে- নতুনের সাথে তার সাক্ষাৎ হচ্ছে তার পার্থক্য সে বুঝতে পারে; কারণ আমরা জার্মানই হই আর ইংরেই হই এবং ফ্রান্স, ইতালি অথবা হাঙ্গেরী যে-কোন দেশের ভিতর দিয়েই সফর করি না কেন, ইউরোপের মন ও চেতনা আমাদের সবাইকে বেঁধে দেয় এক ঐক্যবন্ধণে। আমরা যেহেতু নানা অনুষঙ্গের একটি সুনির্দিষ্ট পরিধির মধ্যে বাস করি সে কারণে আমরা একটা সাধারণ ভাষার মতোই এই সব অনুসংগের মাধ্যমে একে অপরকে বুঝতে এবং নিজেদেরকে অন্যের বোধগম্য করে তুলতে সক্ষম হই। আমরা এই ব্যাপারটিকে বলি সাংস্কৃতিক মিলন। এ জিনিসটির অস্তিত্ব নিশ্চয়ই একটি সুবিধা, একটি ফায়দা। কিন্তু অভ্যাস থেকে যে-সব সুবিধা উদগত হয় সে সবের মতোই এটিও কখনোপ কখনো অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায়; কারণ মাঝে মাঝে আমরা দেখতে পাই, আমরা সেই বিশ্বজনীন চেতনায় যেন সুতী পশম দ্বারা আচ্ছাসিত। আমরা লক্ষ্য করি সে অভ্যাস আমাদের ঘুম পাড়িয়ে হৃদয়ে এসে দিয়েছে আলস্য; এ আমাদের ভূলিয়ে দিয়েছে আমাদের আগেকার অধিকতরো সৃজনশীল সময়ের বিপজ্জনক পথে চলার উদ্যমকে, সেই স্পর্শাতীত সত্যের সন্ধান লাভের প্রয়াসকে। আগেকার সেই সব জামানায় হয়তো এগুলিকে বলা হতো স্পর্শাতীত সম্ভাবনা, এবং আবিষ্কারক, অভিযাত্রী অথবা শিল্পী, যারাই তার সন্ধানে বার হয়ে পড়েছিলো তারা সবসময়ই নিজেদের জীবনের গহনতম উৎসেরই অনুসন্ধান করেছে। আমরা যারা দেরীতে এসেছি তারাও নিজেদেরই জীবনকে খুঁজে ফিরছি; কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন আপনা-আপনি পাঁপড়ির পর পাঁপড়ি মেলে বিকাশিত হবার আগেই আমরা তাকে পাবার বাসনায় আচ্ছন্ন এবং এই ধরনের প্রয়াসের আড়ালে যে পাপ প্রচ্ছন্ন রয়েছে আমরা অস্পষ্টভাবে তা আশংকা করছি। বহু ইউরোপীয় আজ অনযুভব করতে শুরু করেছেঃ বিপদকে এড়িয়ে চলার ভয়ংকর বিপদ!

এ বইটিতে আমি এমন একটি এলাকায় আমার সফরের কথা বর্ননা করছি ইউরোপ থেকে যার পার্থক্য এতোই বৃহৎ যে, এ দু’য়ের মধ্যে সহজে সেতু তৈরি করা সম্ভব নয়, এবং বলা যায়, এ পার্থক্যটি এক দিকে থেকে বিপদেরই শামিল। আমরা পেছনে ফেলে চলেছি এতো বেশি এক-রূপ এক-পরিবেশের নিরাপত্তাকে, যেখানে অপরিচিত তেমন কিছুই নেই এবং নেই বিস্ময়কর কিছু- আর আমরা প্রবেশ করছি অন্য এক জগতের বিস্ময়কর অদৃষ্টপূর্ব বৈচিত্র্যের মধ্যে।

আমরা যেনো আত্মপ্রতারণা না করিঃ সেই ভিন্ন জগতে যে বহু বর্ণাঢ্য ছবি আমাদের পথে পড়বে, আমরা হয়তো তার এটির বা ওটির মর্ম বুঝতে পারি; তবে, একটি পাশ্চাত্য দেশে গোটা চিত্রটির মর্ম যেমন সচেতনভাবে বোঝা সম্ভব এই আলাদা জগতে তা আমাদের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। এই ভিন্ন জগতের মানুষ থেকে আমাদেরকে যা আলাদা করেছে তা কেবল স্থান নয়, স্থানের অতিরিক্ত আর কিছু। কী করে ভাবের আদান-প্রদান চলতে পারে ওদের সংগে? শুধুমাত্র ওদের ভাষা বলতে পারাই যথেষ্ট নয়। ওরা ওদের জীবনকে কিভাবে উপলব্ধি করে কেউ যদি তা বুঝতে চায় তাকে পুরাপুরি সংস্কারমুক্ত হয়ে ঢুকতে হবে ওদের পরিবেশে এবং ওদের সংগ ও অনুষঙ্গগুলির ভেতর শুরু করতে হবে জীবন-যাপন। তা কি সম্ভব? এবং তা বাঞ্ছনীয় হবে? হয়তো আমাদের পুরানো পরিচিত চিন্তাভ্যাসের বদলে বিদেশী অপরিচিত চিন্তাভ্যাস গ্রহণ করা তেজারতি হিসাবে পরিণামে ক্ষতিকরই হবে।

কিন্তু সত্যই কি আমরা ওই জগতের বহির্ভূত? আমি তা মনে করি না। আমরা যে নিজেদেরকে বহির্ভূত বলে অনুভব করি তার প্রধান কারণ আমাদের পাশ্চাত্য চিন্তা-পদ্ধতি আমাদেরই একটি নিজস্ব ভুলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বিদেশী অপরিচিত সৃজনধর্মী মূল্যকে খাটো করে দেখতে অভ্যস্ত এবং সবসময়ই তাকে আঘাত করতে, আমাদের নিজ শর্তে তাকে আত্মসাৎ করতে, আমাদের নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে তাকে গ্রহণ করতে প্রলুব্ধ। অবশ্য আমার মনে হয়, আমাদের এ উৎকণ্ঠার যুগে এ ধরনের উদ্ধত প্রয়াসের আর কোন অবকাশ নেই। আমরা অনেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেছি যে, সাংস্কৃতিক ব্যবধান বুদ্ধিগত বলাৎকারের মাধ্যমে নয় বরং অন্য উপায়ে জয় করা যেতে পারে এবং জয় করা উচিত। হয় তো আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিতে এর নিকট সমর্পণ করেই তা জয় করা যেতে পারে। যেহেতু এই অপরিচিত জগত, আপনি যা কিছু আপনার স্বদেশে জেনেছেন তা থেকে এতো সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন, যেহেতু সেই জগতে এতো বেশি কিছুর অবকাশ রয়েছে যা রূপে ও ধ্বনিতে আশ্চর্য রকমে অভিনব এবং বিচিত্র সে কারণে, আপনি যদি মনোযোগী হন, কখনো কখনো তা, সুদুর অতীতে যে-সব বস্তুর সংগে ছিলো আপনার পরিচয় এবং দূর-অতীতে যা বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে, সে-সবের ক্ষণিক স্মৃতির পরশ বুলিয়ে যাবে আপনার উপর- আপনার নিজের জীবনের সেই স্পর্শনাতীত বাস্তবতাগুলি। এবং আপনার জগতকে সেই ভিন্ন, সেই অপরিচিত জগত থেকে আলাদা করেছে যে গহ্বর তার  ওপর থেকে স্মৃতির এই নিশ্বাস যখন আপনার নিকট পৌঁছায় তকন আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেনঃ হয়তো এখানেই- এবং কেবল এখানেই সকল সফর, সকল ভবঘুরেমীর অর্থ নিহিত কি নাঃ কী সেই অর্থ? না, আপনার চারপাশের জগতের অজ্ঞাত-পরিচয় বৈচিত্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠা আর তাতে করে আপনার নিজের ব্যক্তিগত বিস্মৃত বাস্তবতাকে নতুন করে জাগ্রত করা….।

এবং আমি অন্ধকারে পথ হাতড়ানো মানুষের মতো এই বাধো বাধো কথাগুলির দ্বারা এতো অসার্থকভাবে যা বলবার চেষ্টা করেছিলাম- এলসা যেহেতু তার সহজাত অনুভুতি দিয়ে তার মর্ম বুঝতে পেরেছিলো, তা’ই আমি তীব্রভাবে অনুভব করলাম যে, এলসা এবং কেবল এলসাই- বুঝতে পারে আমি কিসের পেছনে ছুটেছি এবং এলসাই পারে আমার এই অনুসন্ধানে আমাকে সাহায্য করতে।

দুই

দীর্ঘ উদ্দেশ্যহীন সফরের আরো একটি দিন ফুরিয়ে গেলো। নৈঃশব্দ আমার ভেতর এবং নৈঃশব্দ আমার চারপাশের রাত্রিতে। বালিয়াড়ির উপর দিয়ে বাতাস বয়ে চলে আস্তে আস্তে, আলতো পরশ বুলিয়ে এবং বালিয়াড়ির ঢালুর বালুতে কোঁকড়ানো চুরের মতো ঢেউ খেলে। যে আগুন জ্বালানো হযেছে তারই সকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে আমি দেখতে পাই জায়েদের মূর্তি.. তার পাত্র ও কড়াইগুলি নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের জীবনের থলেগুলি পড়ে আছে নিকটেই, রাতের জন্যে তাঁবু খাটানোর সময় আমরা যেখানে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম সেখানেই- আর উঁচু কাঠের হাতলওয়ালা আমাদের জীনগুলিও। কিছুদূরে এরই মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে হামাগুড়ি দিয়ে পড়া দুটি উটের দেহ; দীর্ঘ সফরে ওরা ক্লান্ত ওদের গলা বালির দৃশ্যমান অথচ আপনার হৃদস্পন্দনের মতোই আপনার নিকটে, শূণ্য মরুভূমি।

পৃথিবীতে এর চাইতে সুন্দর অনেক ল্যাণ্ডস্কেপ রয়েছে, কিন্তু কোনটিই, আমি মনে করি, এমনি চূড়ান্ত ক্ষমতা সহারে মানুষের আত্মাকে গড়ে তুলতে পারে না। মরুভূমি তার কাঠিন্যে ও প্রায়-বসতিহীন গাছপালা-শূণ্য বিস্তৃতিতে সমস্ত ছলাককলাকে মুছে দেয় আমাদের জীবনের মর্ম-উপলব্ধির বাসনা থেকে-মুছে দেয়, অধিকতর সদয় প্রকৃতি যে- বহুবিধ প্রবঞ্চনার ফাঁদে ফেলে মানুষকে তার চারদিকের জগতে তার নিজের কল্পনা আরোপ করতে বাধ্য করতে পারে, সেগুলিকে; মরুভূমি  হ চ্ছ নগ্ন এবং পরিচ্ছন্ন- সে আপোস করতে জানে না। যে-ব মনোরম খেয়াল মর্জি মাফিক চিন্তার মুখোশ হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে, মরুভূমি সেগুলিকে ঝেঁটিয়ে তাড়িয়ে দেয় মানুষের হৃদয় থেকে এবং এভাবে তাকে মুক্ত করে এমন এক পরমের নিকট আত্মসমর্পণ করার জন্য- যার কোন আকার নেইঃ সকল দূরের চাইতে দূর, অথচ যা-কিছু নিকট তার চাইতেও কাছে।

মানুষ যখন চিন্তা করতে শিখেছে তখন থেকেই মরুভূমি হচ্ছে এক আল্লাহকে তার সমস্ত বিশ্বাসের লালনকেন্দ্র। একথা সত্য, কোমলতরো পরিবেশ এবং আরো বেশি অনুকূল আবহাওয়ায়ও মানুষ বারবার তাঁর অস্তিত্বের এবং একত্বের হদিস পেয়েছে- যেমন প্রাচীন ইউনানীদের ‘মৈরা’র ধারণায়ঃ এই মৈরা এমন একটি অনির্বাচনীয় শক্তি যা অলিস্পাসের সকল দেবদেবীর ক্ষমতার উৎস এবং তাদের আয়েত্তের বহির্ভুত। কিন্ত এ  জাতীয় ধারণা কখনো একটা অস্পষ্ট অনুভূতি, একটা কিয়াসী উপলব্ধির ফল ছাড়া বেশি কিছু ছিলো না, ছিলো না তা নিশ্চিত প্রজ্ঞার ফল, যতক্ষণ না চোখ-ধাঁধানো নিশ্চয়তার সংগে এই জ্ঞান উদ্ভাসিত হলো মরুভূমির মানুষের নিকট, মরুভূমিরই মধ্য থেকে। মিদিয়ানের মরুভূমির একটি আগুন-ধরা কাঁটাবন থেকেই আল্লাহর বানী ধ্বনিত হয়েছিলো মূসার নিকট; যূদী মরুভূমির বিয়াবানেই হযরত ঈসা পেয়েছিলেন আল্লাহর রাজ্যের পয়গাম এবং মক্কার নিকটে মরু-পাহাড়ের হেরা গুহায়ই প্রথম ওহী নাযিল হয়েছিলো আরবের নবী মুহাম্মদের (স) নিকটে।

তাঁর নিকট এ এসেছিলো শিলাময় পাহাড়ের মধ্যবর্তী সেই সংকীর্ণ, শুষ্ক গিরি সংকটে, সেই মরুভূমির রোদে পোড়া নগ্ন উপত্যকায়। কী ছিলো সেই পয়গাম?- না, দেহ ও আত্মার মিলনে যে জীবন সেই জীবনের সামগ্রিক স্বীকৃতিঃ যে পয়গামের পরিণাম- বিভিন্ন কবিলার রূপহীন ধর্মহীন এক জাতিকে একটি নির্দিষ্ট অবয়ব ও লক্ষ্য দান করা এবং তার মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যেই একটি শিকা, এবং একটি প্রতিশ্রুতির মতো ছড়িয়ে পড়া, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর এবং পূর্বদিকে চীনের প্রাচীর পর্যন্ত। তার নিয়তি ছিলো তেরশ’ বছরের অধিককাল পরেও, সব রকমের রাজনৈতিক অবক্ষয় কাটিয়ে উঠে, এমনকি, এ পয়গাম যে-মহৎ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলো সেই সভ্যতার পরও টিকে থেকে, আজ পর্যন্ত একটি মহান আধ্যাত্মিক শক্তি হিসাবে কায়েম থাকা- সেই পয়গাম যা এসেছিলো আরবের নবীর নিকট….।

….      …..        …..      …..

আামার সময় কাটে ঘুমিয়ে এবং জেগে।আমি চিন্তা করি সেই দিনগুলির কথা যা চলে গেছে, কিন্তু এখনো মৃত নয়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি এবং স্বপ্ন দেখি, আবার আমার ঘুম টুটে যায়, আবার আমি উঠে বসি। আমার জাগরণের আধো-আলো আধো-ছায়অ স্বপ্ন এবং স্মৃতি বয়ে চলে একত্রে, কোমলতার সংগে।

রাত এখন ভোরের কাছাকাছি। আগুন একদম নিভে গেছে। নিজের কম্বলে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে জায়েদ। আমাদের উট দু’টি পড়ে আছে নিস্পন্দ, যেন মাটির দু’টি ঢিবি। নক্ষত্র এখনো দেখা যাচ্ছে আসমানে এবং আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, এখনো ঘূমানোর সময় আছে। কিন্তু পূব আসমানের নিচুতে দেখা দেয় অন্ধকার ফুঁড়ে ফ্যাকাশে হয়ে বের হয়ে আসা একটি অনুজ্জ্বল আলোর রশ্মি আরেকটি গাঢ়তর শিকার উপরে, যা ছড়িয়ে আছে দিগন্তের উপরেঃ যুগল নকীব, ভোরের, ফজরের সালাতের সময়ে।

আমার উপরে আমি তেরছা দেখতে পাই শুকতারাটিকে, যাকে আরবরা বলে, আয-যোহরা, জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। আাপনি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাস করেন এ সম্পর্কে, আপনাকে ওরা বলবে, এককালে এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলো এক রমনী….

এক সময়ে দুই ফেরেশতা ছিলো হারুত আর মারুত নামে। বিনয় আর নম্রতা যদিও ফেরেশতাদের জন্য শোভনীয়, তবু এই দুই ফেরেশতা ভূলে গিয়ে অহংকার করেছিলো যে, তাদের পবিত্রতা অক্ষয়, অজেয়। আমরা নূরের তৈরি- পুরুষের ঔরসজাত দুর্বল মানুষের এসবের উর্ধ্বে! কিন্তু তারা ভূলে গিয়েছিলো তারা পবিত্র কেবল এ কারণেই যে, তাদের কামনা বলে কিছু নেই এবং কামনাকে দমন করবরা জন্য কখনো তাদের বলাও হয়নি। তাদের ঔদ্ধত্যে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তাদেরকে বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যাও এবং সেখানে তোমাদের পরীক্ষার মুকাবেলা করো’। দাম্ভিক ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসে এবং মানুষের দেহে মানব সন্তানদের মাঝে ঘুরে বেড়াতে থাকে- আর পয়লা রাতেই ওরা দেখা পায় এক রমনীর, যার সৌন্দর্য্য এতো বিস্ময়কর ছিলো যে, লোকেরা তাকে বলতো আয-যোহরা…. উজ্জ্বল রমনী। যখন ফেরেশতা দু’জন তাদের এই মুহূর্তেল মানুষের চোখ এবং অনুভুতিদিয়ে যোহরার দিকে তাকালো, তাদের বুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে গেলো এবং ওরো যেন ঠিক মানুষেরই সন্তান, তাই তাদের মনে জাগলো যোহরাকে পাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। ওদের দু’জনেই যোহরাকে বলল, ‘তুমি রাযী হয়ে যাও আমার প্রতি’। কিন্তু যোহরা জবাব দিলো, ‘আমি তো অন্য এক পুরুষের। তুমি যদি আমাকে চাও, ওর হাত থেকে আমাকে অবশ্যি মুক্ত করতে হবে। ‘তখন হারুত মারুত ওই লোকটিতে কতল করে বসে এবং ওরা অন্যায়ভাবে যে রক্তপাত করেছিলো সেই রক্তে রাঙা হাত নিয়েই ওরা সেই রমনীর উপর মিটায় ওদের উদগ্র কামনা। কিন্তু যে মুহূর্তে ওদের কামনা আর রইলো না, তখনি, কিছুক্ষণ আগেকার এ দুই ফেরেশতার চৈতন্যোদয় হলো যে, পৃথিবীতে ওদের পয়লা রাতেই ওরা দ্বিবিধ পাপ করে বসেছেঃ হত্যা এবং ব্যভিচার, এবং ওদের অহংকারের কোন অর্থই হয় না! তখন আল্লাহ বললেন, ‘পার্থিব শাস্তি এবং পরলেঅকের শাস্তি’- এ দু’টির একটি বেছে নাও তোমরা’। তীব্র অনুশোচনায় পতিত ফেরেশতা দু’জন বেছে নেয় এই পৃথিবীর শাস্তি। তখন আল্লাহ হুকুম দিলেন- আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে এদেরকে ঝুলিয়ে রাখা হোক শৃংখলিত করে এবং এভাবেই ওরা ঝুলানো থাকবে হাশরের দিন পর্যন্ত, ফেরেশতা এব্ং মানষের প্রতি এই নসিহতরূপে যে, সমস্ত সদগুণই আপনা- আপনি ধ্বংস হয়ে যায় যখন তাতে থাকে না বিনয় এবং নম্রতা। কিন্তু কোন মানব-চক্ষুই যেহেতু ফেরেশতাদের দেখতে সমর্থ নয়, তাই আল্লাহ আয-যোহরাকে একটি নক্ষত্রে রূপান্তরিত করে ঝুলিয়ে দিলেন আসমানে, যাতে মানুষ সবসময়ই তাকে দেখতে পায় এবং তার কাহিনী ইয়াদ করে মানুষ স্মরণ করে হারুত আর মারুতের দুর্ভাগ্যেল কথা। এই কাহিনীর রূপরেখা ইসলামের চেয়ে অনেক- অনেক বেশি প্রাচীন মনে হয়। প্রাচীন সিমাইটরা তাদের দেবী ইশতারকে কেন্দ্র করে- পরবর্তীকালে যিনি হয়েছিলেন গ্রীসীয়দের দেবী এফ্লোদিতে, - যে সব উপকথার জাল বুনেছিলো, তারই কোন একটি থেকে এই কাহিনীর উৎপত্তি। আমরা যে গ্রহকে ‘শুক্র’ বলে জানি সেই গ্রহ আর এই দুই দেবীই এক বলে সনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আমি যে রূপে এই গল্পটি শুনেছিলাম তাতে হারুত মারুতের কাহিনীটি হচ্ছে মুসলিম মানসের এক নিজস্ব সৃষ্টি। এ কাহিনী এ ধারণারই দৃষ্টান্ত যে, বস্তু-নিরপেক্ষ পবিত্রতার কোন নৈতিক তাৎপর্যই নেই যতক্ষণ তা নির্ভর করে কামনা-বাসনা না-থাকার উপরে। কারণ বারবার ঘুরে ফিরে ভাল আর মন্দের মধ্যে একটি বেছে নেয়ার প্রয়োজনই কি সমস্ত নৈতিকতার ভিত্তি নয়?

বেচারা হারুত মারুত এ কথা জানতো না। যেহেতু ফেরেশতা হিসাবে ওরা কখনো কোন প্রলোভনের সম্মুখীন হয়নি তাই ওরা নিজেদেরকে মনে করতো পবিত্র এবং নৈতিকতার দিক দিয়ে মানুষের উর্ধ্বে। ওরা বুঝতে পারেনি যে, দৈহিক চাহিদার বৈধতা অস্বীকার করার পরোক্ষ অর্থ হবে মানুষের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সকল প্রকার নৈতিক মূল্যবোধের অস্বীকৃতি। কারণ কেবলমাত্র এই সব তাকিদ, প্রলোভন এবং সংঘাতের উপস্থিতিই… ‘বেছে নেয়ার সম্ভাবনাই- মানুষকে এবং কেবল মানুষকেই, আর কাউকে নয়, করে তোলে এক নৈতিক সত্তাবান প্রাণী, যার রয়েছে একটি আত্মা’।

এই ধারণার ভিত্তিতেই সকল উন্নততরো ধর্মের মধ্যে ইসলাম একাই আত্মাকে মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি দিক বলে গণ্য করে এবং নিজের অধিকারেই তা একটি অন্য নিরপেক্ষ ব্যাপার, এরূপ মনে করে না। এর ফলে, মুসলিম দৃষ্টিতে মানুষের আত্মার বিকাশ তার প্রকৃতির সবক’টি দিকের সংগে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৈহিক কামনা- বাসনা তার এই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংগ। এগুলি কোন ‘আদি পাপে’র ফল নয়, বরং বাস্তব আল্লা- প্রদত্ত শক্তি, যাকে স্বীকার করে নিতে হবে এবং সেভাবেই ব্যবহার করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সংগে। বলাবাহুল্য, আদি পাপের ধারণাই ইসলামী নীতিশাস্ত্রের নিকে অপরিচিত; তাই দেহের চাহিদাকে কি করে দমন করা যাবে তা মানুষের সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে কেমন করে তার আত্মার চাহিদার সংগে সেগুলির সমন্বয় সাধন করা যাবে এমনভাবে যাতে করে জীবন হয়ে উঠবে পূর্ণ এবং সুকৃতিময়।

এই প্রায় অদ্বৈতবাদী জীবন-স্বীকৃতির মূল খুঁজে পাওয়া যাবে ইসলামের এই দৃষ্টিভংগীর যে, মানুষের আদি ফিতরত হচ্ছে মূলত সৎ। মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী- এই খৃশ্চান ধারণা, অথবা সে জন্মগতবাবে হীন এবং অপবিত্র আর তাকে বহু জন্মের ভেতর দিয়ে করুণ ও দুঃখজনকভাবে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে মোক্ষলাভ করতে হবে- হিন্দু ধর্মের এই শিক্ষা থেকে ভিন্ন সুরে আল- কুরআন বলেছেঃ ‘আমি তো সৃষ্টি করেছি মানুষকে শ্রেষ্ঠতম আবয়বে- পবিত্র অবস্থায়- (যে পবিত্রতা কেবল পরবর্তী ভ্রান্ত আচরণের ফলেই নষ্ট হতে পারে) অতঃপর আমি তাকে পরিণত করি হীনতমে, কিন্তু তাদেরকে নয়, যারা বিশ্বাসী এবং সৎকর্মপরায়ন’।

তিন

আমদের সামনে রয়েছে হাইলের পাম-তরুর বাগিচা।

আমরা থামলাম একটি পুরোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত ওয়াচ-টাওয়ারের পাশে, শহর প্রবেশে আমাদের প্রস্তুতি হিসাবে। কারণ, পুরানো আরবীয় প্রথা, যার সংগে হামেশাই সম্পর্ক থাকে ব্যক্তিগত সুরুচি ও সৌন্দর্যবোধের, তার দাবি এই যে, সফরকারী যখন কোন শহরে প্রবেশ করে তখন সে যেন তার সবচেয়ে ভাল পোশাক পরে, নগরে প্রবেশ করে সজীব এবং পরিচ্ছন্নভাবে যেন এইমাত্র সে তার উটের উপর চড়েছে। কাজেই আমরা আমাদের বাকি পানি খরচ করে ফেলি আমাদের হাত মুখ ধোয়ার জন্য, আমাদের অবহেলিত দাড়ি ছেঁটে নিই এবং আমাদের জীনের উপর চাপানো তলে টেনে বের করি আমাদের শুভ্রতম জামা-কৃর্তা। আমরা আমাদের ‘আবায়া’র উপর থেকে এবং জীনের উজ্জ্বল রংয়ের ঝুলন্ত টাসেল থেকে কয়েক হপ্তার জমে-ওঠা মরুবালি ঝেড়ে ফেলি বরুশ দিয়ে এবং আমাদের উটগুলিকে সাজাই তাদের উত্তম অলংকারে।

এবং  এতক্ষণে আমরা তৈরি হয়েছি হাইল শহরে আমাদেরকে পেশ করবার জন্য। এই শহরটি প্রকৃতির দিক দিয়ে অনেক বেশি আরবীয়, যেমন ধরুন, বাগদাদ অথবা মদীনা থেকে। আরব-বহির্ভূত কোন দেশ বা জাতির কোন উপাদানই এ শহরে নেই, -সদ্য দোয়অনো এক গামলা দুধের মতোই এ শহরটি পবিত্র এবং নির্ভেজাল। বাজারে এখানে দেখা যায় না কোন বিদেশী পোশাক, দেখবেন কেবল ঢিলা আরবী ‘আবায়া’, ‘কুফিয়া’ এবং ‘ইগাল’। মধ্যপ্রাচ্যের আর যে- কোন রাস্তার চেয়েও এর রাস্তাগুলি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন- এমনকি, নযদের জন্য যে- কোন শহর থেকেও- যে নযদ তার অপ্রাচ্য পরিচ্ছন্নতার জন্য মশহুর (সম্ভবত কারণ এই যে, এ দেশের মানুষ চিরকালই ‘আযাদ’ রয়েছে বলে প্রাচ্যের যে-কোন স্থানের চাইতে ওরা অনেক বেশি আত্মমর্যাদাোধ বজায় রেখেছে। এখানকার ঘর বাড়িগুলি চাপ দিয়ে শক্ত- করা কাদা-মাটির ঢেলা, একটির উপর আরেকটি বিছিয়ে তৈরি করা; ঘরগুলি মেরামত করা হয়েছে সুন্দরভাবে.. ব্যতিক্রম কেবল বিধ্বস্ত নগরীর প্রাচীরগুলি যা এখনো সাক্ষ্য বহন করছে ইবনে সউদ এবং ইবনে রশিদের পরিবারের মধ্যকার বিগত যুদ্ধের এবং ১৯২১ সালে এবং স্বয়ং ইবনে সউদ কর্তক শহরটি বিজয়ের।

তাম্রকারদের হাতুড়িগুলি পিটিয়ে পিটিয়ে তৈরি করছে সকল রকমের পাত্র, মিস্ত্রিদের করাতগুলি চিৎকার করে দাঁত বসিয়ে দ্ছে কাঠের মধ্যে, মুচিরা তলী লাগাচ্ছে স্যান্ডেলের। ভীড় ঠেলে ঠেলে চলেছে উট, পিঠে লাকড়ির বোঝা এবং মাখন ভর্তি চামড়ার মশক নিয়ে বাকি সব উট, যাদের বেদুঈনেরা এনেছে বিক্রির জন্য, বাতাসকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে তাদের গর্জনে। আলহাসা থেকে আনীত উজ্জ্বল জীনের থলেসমূহ আঙুল দিয়ে টিপে টিপে পরীক্ষা করছে অভিজ্ঞ হস্ত। নিলামদারেরা বাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চলেছে চিৎকার করতে করতে, তাদের জিনিস বিক্রির ঘোষণা করে করে ঘুরে-ফিরে নির্দিষ্ট তারিখে। এ ধরনের নিলাম যে কোন আরব শহরের একটি চিরচারিত বৈশিষ্ট্য। এখানে ওখানে আপনি দেখতে পাবেন শিকারী বাজ পাখী ওদের কাঠের দাঁড়ের উপর নিচে লাফাচ্ছে ওদের পা বাঁধা পাতলা চামড়ার ফালি দিয়ে। ‘মৌ-রঙা’ ‘সালুকী’ হাইণ্ড কুকুর ওদের সুন্দর অংশ- প্রত্যংগগুলি আলস্য ভরে রোদে ছড়িয়ে দিয়ে পড়ে আছে। জীর্ণ ‘আবায়া’ গায়ে কৃশ বেদুঈনেরা, চমৎকার পোশাক পরা নওকরেরা এবং আমীরের দেহরক্ষীরা- প্রায় সকলেই দক্ষিণের প্রদেশগুলির লোক- মেলামেশা করছে বাগদাদ, বসরা এবং কুয়েতের সওদাগর আর হাইলের বাসিন্দাদের সাথে। এই সব স্থানীয় বাসিন্দা অর্থাৎ পুরুষেরা- কারণ মেয়েদের তো আপনি বেশি কিছু দেখতে পাবেন না ওদের কালো ‘আবায়া’ ছাড়া, যা ঢেকে রাখে ওদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত- এরা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে খুবসুরৎ খান্দানগুলির অন্যতম একটি খান্দানের লোক। আরবজাতি চেহারা আর অংগভংগীর যা কিছু সৌন্দর্য- সুষমা আজ পর্যন্ত লাভ করেছে, মনে হয়, তার সবই মূর্ত হয়েছে এই শাম্মার কবিলার মধ্যে, যার সম্পর্ক প্রাক- ইসলামী যুগের কবি গেয়েছিলেনঃ উচ্চভূমিতে বাস করে ইস্পাতের মতো তেজী পুরুষেরা আর গর্বিত সাধ্বী রমনীরা।

আমরা যখন ‘আমীরে’র কিল্লা সম্মুখে পৌঁছুই, যেখানে আমরা পরবর্তী দু’দিন থাকবো বলে স্থির করি, আমরা দেখতে পেলাম, আমাদের মেহমানদারেরা কিল্লার দরোজার বাইরে খোলা জায়গায় দরবার বসিয়েছে। আমীর ইবনে মুসা’দ হচ্ছেন ইবনে সউদের খান্দানের জিলুভী শাখার লোক এবং বাদশাহর একজন শ্যালক। ইনি বাদশাহর শক্তিশালী গভর্নরদের অন্যতম। এঁকে বলা হয় ‘উত্তরের আমীর’ কারণ, ইনি কেবল জবল শাম্মার প্রদেশের উপর কর্তৃত্বই করেন না, সিরিয়া এবং ইরাকের সরহদ পর্যন্ত সমগ্র উত্তর নযদ, যে এলাকার আয়তন প্রায় ফ্রান্সের মতোই বিশাল, এই গোটা অঞ্চলটির উপরই তাঁর কর্তৃত্ব।

‘আমীর’ যিনি আমার পুরানো দোস্ত এবং স্তেপ অঞ্চল থেকে এসেছে এমন একজন বেদুঈন ‘শায়াখ’ বসে আছেন কিল্লার দেয়াল বরাবর তৈরি একটি দীর্ঘ সংকীর্ণ ইটের বেঞ্চির উপর। লম্বা এক সারিতে তাঁদের পায়েল কাছে বসে আছে ইবনে মুসা’দ- এর ‘রাজাজিল’- রাইফেল আর রূপার খাপে ঢাকা তলোয়ারে সজ্জিত অস্ত্রধারী, রক্ষীরা, যারা দিনের মধ্যে কখনো তাঁকে ছেড়ে যায় না, যতোতটা না তাঁর রক্ষার জন্য তার চেয়ে বেশি তাঁর মর্যাদার খাতিরে; ওদের পরে রয়েছে বাজ পাখী পোষণেওয়ারা, পাখীগুলিকে দস্তানাপরা মুষ্টির উপর বসিয়ে- রয়েছে নিম্নস্তরের ভৃত্যেরা, বেদুঈনেরা, একদল অনুচর, ছোটো এবং বড়ো আস্তাবলের সহিস পর্যন্ত- সকলেই এক অপরকে সমান মনে করছে মানুষ হিসাবে, তাদের পদের পার্থক্য সত্ত্বেও। এবং এদেশে, যেখানে আপনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেন না ‘আমার প্রভু’ বলে সালাতে আল্লাহকে সম্বোধন করা ছাড়া, সেখানে এর অন্যথা কী করেই বা সম্ভবপর হতে পারে? ওঁদের দিকে মুখ করে একটি বৃহৎ অর্ধবৃত্তের আকারে বসেছে বেদুঈন এবং শহুরে লোকেরা, যারা নিজেদের নালিশ এবং ঝগড়া-ফাসাদের বিষয় পেশ করছে ‘আমীরে’র কাছে ফয়সালার জন্য।

আমরা আমাদের উটগুলিকে এই বৃত্তের বাইরে বসিয়ে দিই। যে দু’জন অনুচর আমাদের কিকে দৌড়ে এসেছে তাদের হেফাজতে উটগুলিতে রেখে দিয়ে আমরা আগিয়ে যাই ‘আমীরে’র দিকে। তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং যাঁরা বসেছিলেন তাঁর পাশে বেঞ্চির উপর এবং সম্মুখে যমীনের উপর, তাঁরাও তাঁর সংগে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমার দিকেই তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেনঃ ‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘আসুন, বসুন, আল্লাহ আপনার হায়াত দারাজ করুন’।

আমি আমীরের নাকের ডগায় এবং কপালে চুমু খাই আর তিনি চুমু খান আমার উভয় গালে; তারপর আমাকে টেনে বসিয়ে দেন বেঞ্চিতে, তাঁর পাশে। জায়েদ তার নিজের স্থান করে নেয় ‘রাজাজিল’দের মধ্যে।

ইবনে মুসা’দ আমাকে তাঁর মেহমানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এঁদের কেউ কেউ আমার কাছে একেবারে নতুন, আবার কেউ কেউ কয়েক বছর ধরে পরিচিত। এঁদের মধ্যে রয়েছে গাদবান ইবনে রিমাল, সিজারা শাম্মারদের সর্বোচ্চ ‘শায়খ’। এই হাসিখুশি প্রবীণ যোদ্ধাকে সবসময় আমি চাচা বলে ডাকি। তাঁর এই প্রায়-সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ চেহারা দেখে কেউ আন্দাজও করতে পারবে না, তিনি উত্তর অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সর্দার; তিনি তাঁর তরুণী ভার্যার গায়ে সোনা ও মণি-মুক্তার এতো অলংকার চাপিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণের বিশ্বাস, এই তরুণী যখন তাঁর ষোলোটি খুঁটির ওপর স্থাপিত বিশাল তাঁবু থেকে বের হতে ইচ্ছা করেন তখন তাঁকে তাঁর গায়ের ভার রাখতে হয় দু’টি ক্রীতদাসীর উপর।

তাঁর চোখ দু’টি ঝিলিক মারতে লাগলো যখন তিনি আমাকে আলিংগন করলেন এবং আমার কানে ফিস ফিস করে বললেনঃ

-‘এখনো নতুন বৌ পাওনি?’

আমি এর জ বাবে কেবল স্মিত হাসি এবং  কাঁধ ঝাঁকুনি দিই।

আমীর ইবনে মুসা’দ নিশ্চয়ই এই রসিকতা শুনে ফেলেছেন, কারণ তিনি উচ্চেস্বরে হেসে বললেন,

-‘শ্রান্ত মুসাফিরের জন্য দরকার স্ত্রী নয়, কফি’। তারপর তিনি হাঁক দেন,

‘কাহওয়া’

-‘কাহওয়া’- পুনরাবৃত্তি করে আমীরের নিকটতম নওকরটি এবং সারির শেষপ্রান্তে যে নওকরটি রয়েছে সেই এই ধ্বনিটি মুখে নিয়ে বলে ‘কাহওয়া’। এভাবেই তা চলতে থাকে যতোক্ষণ না আনুষ্ঠানিক আদেশটি গিয়ে পৌছায় দুর্গদ্বারে এবং তা আবার প্রতিধ্বনিত হয় ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে একটি নওকর আবির্ভূত হয় বাঁ হাতে ঐতিহ্যময় পিতলের কফিপত্র এবং ডান হাতে ছোট ছোট কয়েকটি পেয়ালা নিয়ে, আর পহেলা সে কফি ঢালে ‘আমীরে’র জন্য, দ্বিতীয়বার ঢালে আামার জন্য আর তারপর, বাকি মেহমানদের কফি পরিবেশন করে ওদের মর্যাদানুসারে। একবার অথবা দু’বার ফের ভর্তি করা হচ্ছে পেয়ালা এবং কোন মেহমান ইংগিত করেন যে, তাঁর আর দরকার নেই, তখন পেয়ালাটি আবার পূর্ণ করা এবং  পরিবেশন করা হয় পরবর্তী মেহমানকে।

বোঝা যাচ্ছে, ‘আমীর’ ইরাক সীমান্তে আমার সফরের ফল জানতে উৎসুক। কিন্তু পথে আমার কী কী ঘটেছে, কেবল এই সব ছোট-খাট প্রশ্নের মধ্যে ধরা পড়ছে তাঁর ঔৎসুক্য, পূর্ণতরো খোঁজ-খবর নেওয়ার কাজটি রেখে দিচ্ছেন সেই সময়ের জন্য যখন একলা হবো আমরা দু’জন। তারপর, আমাদের উপস্থিতিতে যে-বিচারের শুনানীতে ছেদ পড়েছিলো তিনি আবার শুরু করলেন সেই শুনানী।

প্রতীচ্যে এ ধরনের সাদামাটা জটিলতামুক্ত বিচারালয় অকল্পনিয়, অবশ্য শাসক ও বিচারক হিসাবে সকল সম্মানই ‘আমীরে’র প্রাপ্য। কিন্তু বেদুঈনেরা তাঁকে যে সম্মান দেখায় তাতে গোলামি মনোভাবের কোন চিহ্নই নেই। বাদী এবং বিবাদী প্রত্যেকেই, সে-যে মানুষ হিসাবে আযাদ, এই চৈতন্যে সগৌরবে অবস্থান করছে। তাদের অংগভংগীতে কোন দ্বিধা-জড়তা নেই, তাদের কণ্ঠ প্রায়ই সোচ্চার এবং দৃঢ়তাব্যঞ্জক, আর প্রত্যেকেই আমীরে’র নিকট এভাবেই কথা বলছে যেন সে কথা বলছে বড়ো ভাইয়ের সংগে- তাঁকে ডাকছে, বাদশাহর নিজের ক্ষেত্রেও প্রচলিক বেদুঈন রীতি মোতাবেক, তাঁর প্রথম নাম ধ’রে, তাঁর খেতাব ধরে নয়। উগ্রতার আভাস মাত্র নেই ইবনে মুসা’দের অভিজাত্যের মধ্যে। তাঁর খাটো কালো দাড়ি শোভিত সুন্দর মুখখানা, তাঁর মাঝারি আকারের কিছুটা গাট্টাগোট্টা শরীরে ব্যক্ত করছে সেই সহজাত আত্মসংযম এবং সহজ মর্যাদাবোধ, যা আরবদেশে প্রায়ই দোর্দণ্ড প্রতাপের পাশাপাশি বিদ্যমান। ইবনে মুসা’দ খুবই গম্ভীর এবং কথাবার্তায় অতি সংক্ষিপ্ত্ কৃতিত্বপূর্ণ বাক্যে তিনি সহজ মামলাগুলির ফয়সালা করে ফেলেন কালাবিলম্ব না করে এবং একটু জটিল মামলাগুলি, যার জন্য আইনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য প্রয়োজন, পাঠিয়ে দেন সে এলাকার ‘কাযী’র নিকট।

কোন বৃহৎ বেদুঈন অঞ্চলে সবোর্চ্চ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সহজ নয়। বেদুঈনের নালিশের উত্তেজনাপূর্ণ জটিলতার মধ্যে সঠিক ফয়সালাটি পেতে হলে প্রয়েঅজন হবে সমূহ বেদুঈন কবিলা, বিভিন্ন পরিবারের সম্পর্ক, প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ, গোত্রগুলির পশুচারণ ক্ষেত্র, অতীত ইতিহাস ও বর্তমান মানসিক মেজাজমর্জি সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞানের। এক্ষেত্রে বুদ্ধির ক্ষুরধারের মতোই প্রয়োজন হৃদয়ের চাতুর্যের এবং ভূলের হাত থেকে বাঁচার জন্য উভয়কে অবশ্যই কাজ করতে হবে এক সংগে সূচাগ্র সূক্ষ্ম সঠিকতার সাথে। কারণ বেদুঈনেরা তাদের প্রতি কোন অনুগ্রহ করা হলে জীবেন কখনো যেমন ভূলে না, ঠিক তেমনি তারা, বিচারের যে রায়কে অন্যায় মনে করে তা’ও কখনো ভুলে না। অপরদিকে, ন্যায়সংগত রায়কে যাদের বিরুদ্দে দেওয়া হয়েছে সে রায়, তারাও প্রায় সবসময়ই হাসিমুখে গ্রহণ করে। সম্ভবত ইবনে সউদের আর ‘সকল আমীর’ থেকেই ইবনে মুসা’দ শ্রেষ্ঠতরো, এই সকল শর্ত পূরণের দিক দিয়ে। তিনি এতো আত্মসমাহিত, এতো চুপচাপ এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে এতোটা মুক্ত যে, যখনি তাঁর বিচারবুদ্দি একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছায়, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর সহজাত অনুভূতি প্রায় সবসময়ই তাঁকে দেখায় সঠিক পথ। তিনি জীবন নদের সাঁতারু। তিনি নিজেকে ভাসিয়ে দেন স্রোতের টানে এবং স্রোতের সংগে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন নিয়ন্ত্রণ করেন স্রোত।

এই মুহূর্তে দু’জন জীর্ণ পোশাক পরা বেদুঈন উত্তেজনাময় বাক্য আর অংগভংগীর সাথে তাদের ঝগড়ার বিষয় পেশ করছে। সাধারণত বেদুঈনদের বিষয়ে কিছু স্থির করা কঠিন কাজ; তাদের মধ্যে সব সময় এমন কিছু থাকে যার ব্যাপারে আগাম কিছু বলা যায় না- হঠাৎ স্বতঃস্ফূর্ত উত্তেজনার সম্ভাবনা, যা আপোস করতে জানে না- সবসময় জান্নাত আর জাহান্নাম যেন একে অপরের কাছাকাছি। কিন্তু আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, কেমন করে ইবনে মুসা’দ ওদের জ্বলন্ত গোস্বার মধ্যে ওদেরকে আলাদা করে দিচ্ছেন এবং তাঁর নিরুত্তাপ কথার দ্বারা শান্ত করছেন ওদের। কেউ কেউ মনে করতে পারে, ওদের একজন যখন নিজের হক প্রতিষ্ঠার জন্য উকালতি করছে, তখন অন্যকে তিনি হুকুম করবেন খামোশ হতে; কিন্তু না, তিনি তা করলেন না। বরং তিনি তাদের উভয়কে একই সাথে বলতে, গলাবাজিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে দিলেন এবং কেবল মাঝে মাঝে তিনি ওদের মাঝাখানে এসে দাঁড়াচ্ছেন, এখানে একটি শব্দ, ওখানে একটি প্রশ্ন নিয়ে, আর পরমুহূর্তেই তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন ওদের উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের মধ্যে; তিনি হার মানেন এবং মনে হয় যেন তিনি পিছু হটছেন, কেবল কিছুক্ষণ পরেই আর একটি উপযুক্ত মন্তব্য নিয়ে ওদের মধ্যে এসে দাঁড়ানোর জন্য। এভাবে বাস্তবের সংগে বিচারকের নিজের মনকে খাপ খাইয়ে নেয়া যে-বাস্তবের ব্যাখ্যা করে চলেছে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে দুই ক্রুদ্ধ মানুষ- এ দৃশ্য মনোমুগ্ধকরঃ এভাবে খাপ খাইয়ে নেবার প্রয়াস আইনের অর্থে সত্যানুসন্ধান যতোটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ধীরে ধীরে একটি গোপন বস্তুগত সত্যের উন্মোচন। ‘আমীর’ এই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হন থেমে থেমে এবং সত্যকে টেনে বের করেন, যেন একটি সূক্ষ্ম তারের সাহায্যে, আস্তে আস্তে পরম ধৈর্যের সংগে, বাদী-বিবাদী দুয়েরই প্রায় অলক্ষ্যে… যখন ওরা হঠাৎ থেকে যায়, একে অপরের দিকে তাকায় বিস্ময়-বিমূঢ় দৃষ্টিতে এবং বুঝতে পারেঃ রায় দেওয়অ হয়ে গেছে এবং এ রায় স্পষ্টত এমনি ন