বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত

আমাদের কথা

 

সারা দুনিয়া জুড়ে চলছে এক মহাক্রান্তিকাল। যে জড়বাদী সভ্যতার চোখ-ঝলসানো চাকচিক্য একদিন বিশ্বের মানুষকে হকচকিয়ে দিয়েছিল, তার অন্তঃসারশূণ্যতা ইতিমধ্যেই সবার কাছে ধরা পড়ে গেছে। জড়বাদী সভ্যতার পুঁজিবাদী সংস্করণের মরণ-ঘণ্টা বহু আগেই বেজে উঠেছে। এর মার্কসবাদী সংস্করণ আজ মৃত। পশ্চিমা সমাজের দূরদর্শী চিন্তাবিদদের কাছে, জড়বাদী সভ্যতার মানবতা-বিরোধী রূপ চরমভাবে উদঘাটিত হয়ে গেলেও আমাদের দেশের এক শ্রেণীর হীনমন্যতাগ্রস্ত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এখনও পাশ্চাত্য সমাজের বাহ্যিক চাকচিক্যের মায়া-মরীচিকাময় মোহগ্রস্ততা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না –এটা সত্যই এক দুর্ভাগ্যের কথা। তাদের মতে জড়বাদী সভ্যতারূপী আধুনিক জাহিলিয়াতের মধ্যেই নাকি বিশ্বমানবতার পরিত্রাণ নিহিত রয়েছে।

 

আরব বিশ্বের বিখ্যাত মনীষী মুহাম্মদ কুতুব এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী নামধারীর এই মোহগ্রস্ততা কাটিয়ে তোলার লক্ষ্যে এই পুস্তকে জাহিলিয়াতের নব রূপের স্বরূপ উদঘাটন করেছেন নির্মম হস্তে। এই সময়োপযোগী মূল্যবান গ্রন্থের বাংলা তরজমা করেছেন বাংলাদেশের মহান ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ)। এই গ্রন্থ পাঠে পাঠকবৃন্দ শুধু বর্তমান শতাব্দীর জাহিলিয়াতের স্বরূপের সঙ্গেই পরিচিত হবেন না, এই সব মানবতা বিরোধী মতবাদ কিভাবে আধুনিক সমাজ-মানসকে বিশেষ করে মুসলিম সমাজকে কিভাবে বিভ্রান্ত করে তুলতে উদ্যত হয়েছে লেখক তারও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দিয়েছেন। এ ধরনের পুস্তক শিক্ষিত মুসলমান সমাজের ঘরে ঘরে পঠিত হওয়া অত্যাবশ্যক বলে মনে করি। এই বই পড়ে যদি আমাদের তরুণ সমাজ আধুনিক জাহিলিয়াতের সর্বনাশা স্বরূপ সম্বন্ধে সচেতন হতে পারে তবেই সার্থক হবে আমাদের এ প্রয়াস।

 

বইটির নাম নিয়ে হয়ত জনগণের মনে বিভ্রান্তি থাকতে পারে। যেহেতু বর্তমান শতাব্দী একবিংশ শতাব্দী। আমরা বিংশ শতাব্দীর লেখা লেখকের নামটিই রাখার পক্ষপাতি, কারণ, “জাহিলিয়াত কোন শতাব্দীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় –সময়ের বিবর্তনে শুধু রং পাল্টায়”। পাঠক বইটি পড়লেই বুঝতে পারবেন আশা করি।

 

-প্রকাশক

 

 

 

গ্রন্থ পরিচিতি

 

এই গ্রন্থখানি

 

‘বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত’ এই বইখানির নাম……..

 

এ নাম বহু লোকের মনে কঠিন প্রশ্নের উদ্রেক করবে। …..বিংশ শতাব্দীর এই যুগকে ‘জাহিলিয়াত’ বলা যায় কি করে? জাহিলিয়াত বলতে কি সেই একটি বিশেষ সময়কে বুঝায় না, যা জাজীরাতুল আরবে ছিল হযরত মুহাম্মদ (স)-এর পূর্বে? কিংবা মানুষের সুদীর্ঘ ইতিহাসের কোন এক অধ্যায়ে –যা অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে? তা ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির এই চরম উন্নতির যুগকে –বস্তুগত উন্নতি-অগ্রগতির এই বিস্ময়কর বিকাশের সময়কে ‘জাহিলিয়াত’ বলে আখ্যায়িত করা কি ধৃষ্টতা নয়?.........

 

গ্রন্থকার এই পর্যায়ে উল্লিখিত সকল প্রকারের প্রশ্নের অকাট্য জবাব দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ‘জাহিলিয়াত’ শব্দের প্রচলিত অর্থের উপর নির্ভর করেন নি। শব্দটিকে সেই অর্থে ব্যবহারও করেন নি। তিনি শব্দটিকে একটি বিশেস পরিভাষারূপে দেখেছেন। আসলে গ্রন্থকার ইসলামী ভাবধারা ও কুরআনী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে নতুন নতুন পরিভাষা রচনা করে নিয়েছেন। ‘জাহিলিয়াত’ ও অনুরূপ একটি বিশেষ পরিভাষা।

 

এই সব প্রাথমিক আলোচনার পর গ্রন্থকার পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেছেন এবং তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপিত করেছেন ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে….. আধুনিক জাহিলিয়াতের বৈশিষ্ট্য …..ধারণা বিশ্বাসে বিপর্যয়….. আচার-আচরণে ও জীবন-ধারায়ও বিপর্যয় ….কেননা ধারণা-বিশ্বাস বিপর্যয় সৃষ্টি করলে বাস্তব জীবন ধারায় ও আচার-আচরণে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী…….।

 

বিংশ শতাব্দীর এই যুগে জাহিলিয়াত মানুষের জীবনকে সর্বাত্মকভাবে গ্রাস করে ফেলেছে। বর্তমান দুনিয়ার মানুষের জীবনে কোনো একটি দিকও এমন নেই, যা এই জাহিলিয়াতের প্রভাব থেকে মুক্ত রয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। এই অবস্থায় অপরিহার্য ফলশ্রুতি স্বরূপ ইসলামের সম্মুখে আসা, পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করা, দেশে দেশে ইসলামী বিপ্লব সাধিত হওয়া ছাড়া বিশ্বমানবতার পক্ষে গত্যন্তর থাকতে পারে না। কেননা জাহিলিয়াতের ঘন তমিশ্রায় আচ্ছন্ন নিশিথের অবসানে নবীন সূর্যের উদয় এক চিরন্তন ও স্বাভাবিক ব্যাপার। তার ব্যতিক্রম হতে পারে না, ইতিহাসে কখনোই হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।

 

কিন্তু বর্তমানেও বহু লোক সেই ইসলামকে এড়িয়ে যেতে চায়, বহু লোক তাকে ঘৃণা করে। গ্রন্থকার অত্যন্ত নিপুণভাবে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে, এড়িয়ে চলা বা ঘৃণা করার কারণ, জাহিলিয়াতে আচ্ছন্ন লোকেরা ইসলামী জীবনে নিজেদের স্বার্থান্ধতা, লালসার অন্ধ অনুসরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার অপমৃত্যু ঘটতে দেখবার জন্যে প্রস্তুত নয়। কিন্তু সেদিন দূরে নয়, যখন তাদের এই মানসিকতাকে চূর্ণ করে দিয়ে ইসলামের অভ্যূদয় ঘটবে।

 

ইসলামের দিকে বিশ্বমানবতার প্রত্যাবর্তন এক অপরিহার্য ও অবধারিত সত্য। বর্তমান সময়ের মানুষ যত কুফরীতেই নিমজ্জিত থাকুক, জনগণ এই কুফরী ব্যবস্থায় যত কষ্ট পাচ্ছে, তাগুতী শাসনের যত দর্প ও ক্রুরতাই দেখা যাচ্ছে, ইসলামের আগমনের সাথে সাথে সব কিছুই বিলীন হয়ে যাবে –রাত্রি শেষে সূর্যোদয়ে যেমন করে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায় রাতের পুঞ্জীভূত অন্ধকার।

 

সেই নতুন দিনের নির্মল সূর্য কিরণের সন্ধান করাই এই গ্রন্থের লক্ষ্য।

 

-অনুবাদক

 

 

 

শুরু কথা

 

এই গ্রন্থের নাম ‘বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত’। বহু লোক এই নামকরণ দেখে বিস্মিত হবেন, অন্য বহু লোক হয়ত তাকে সম্পূর্ণরূপে অপছন্দ করবেন….

 

বিংশ শতাব্দী সভ্যতা ও সংস্কৃতির শতাব্দী। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আবিস্কার উদ্ভাবনীর শতাব্দী! সংগঠন ও বিন্যাস স্থাপনের সময় কাল। প্রকৃতির ওপর মানুষের কর্তৃত্ব স্থাপনের যুগ। অণু ও পরমাণুশক্তি বিচূর্ণকরণ ও তার বিকাশ লাভের যুগ। তাহলে এই সবই কি জাহিলিয়াত?

 

এই যুগে মানুষ উন্নতি উৎকর্ষের চরম শিখরে আরোহণ করেছে। অতীতের সমগ্র ইতিহাসেও তার কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষ এ যুগে যে শক্তি, কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও প্রতাপ-দাপট অর্জন করেছে, মাত্র কয়েক দশক পূর্বেও পৃথিবী গ্রহের মানুষ তার কল্পনাও করতে পারেনি। কয়েক শতক পূর্বে তা পারা তো সুদূর পরাহত ছিল। ….তাহলে এতদসত্ত্বেও মানুষ এই বিংশ শতাব্দীতে জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে, তা আমরা কি করে বলতে পারি?

 

আজকের মানুষ যে মূল্যবোধের ছত্রছায়ায় বসবাস করছে, তা হচ্ছে মুক্তি ও স্বাধীনতা, সৌভ্রাতৃত্ব ও সাম্য, গণতন্ত্র ও সামাজিক সুবিচার, যুক্তি ও বিজ্ঞান। এরূপ অবস্থায় আমাদের এই যুগকে জাহিলিয়াত বলব কোন যুক্তিতে?

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

বহু  লোকই সাধারণভাবে মনে করে, জাহিলিয়াত বলতে বুঝি কালের কোন একটি বিশেষ অধ্যায়কে বোঝায়, যা ইসলামের পূর্বে আরব উপদ্বীপে বিরাজমান ছিল।

 

……..এরা পবিত্র চরিত্রাশ্রয়ী! রাসূলে করীম (স)-কে প্রেরণের পূর্ববর্তী কালকে আল্লাহ তা’আলা ‘জাহিলিয়াত’ বলে অভিহিত করেছেন। মনে হচ্ছে, ওরা এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষন করতে প্রস্তুত নয়। তাই শুধু উক্ত সময়টিকেই তারা জাহিলিয়াত মনে করতে বদ্ধপরিকর। ওরা বাস্তবিকই বিশ্বাস করে, ইসলামের বিপরীতে এই যুগটি সত্যিই জাহিলিয়াত ছিল।

 

তবে খারাপ মনোবৃত্তির লোকদের প্রতিরোধ করে বহু সংখ্যক অনৈসলামী শক্তি। রাসূলে করীম (স) একটি হাদীসে বলেছেনঃ

 

(আরবী**********************************************************************************)

 

যে লোক হিংস্র গোষ্ঠীপ্রীতির আহবান জানাবে, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়। আর যে লোক এই হিংস্র বিদ্বেষী গোষ্ঠীবদ্ধতার ভাবধারা নিয়ে মৃত্যবরণ করবে, সেও আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।

 

উক্ত লোকেরা এই ব্যাপারে বহু বিতর্কের অবতারণা করেছে। তারা সকলে তদানীন্তন আরবের জাহিলিয়াতকে আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। তাদের মতে কুরআন যদিও তাকে ‘জাহিলিয়াত’ বলেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নাকি জাহিলিয়াত ছিল না। তদানীন্তন আরব পরিবেশে অনেক বিশেষত্ব ছিল। ছিল ব্যক্তিগত অনেক মূল্যবোধ। ছিল জ্ঞান তথ্য, ছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতি। আর তা সবই তখনকার দুনিয়ার প্রথম দুই সভ্যতা –রোমান ও পারসিক –এর সাথে আরবের গভীর সম্পর্ক ও যোগাযোগের ফলশ্রুতি। এসব তথ্য অবশ্য এ কালের প্রাচ্যবিদদের (orientalists) গভীর সূক্ষ্ম গবেষণার ফলে জানা গেছে। এ শ্রেণীর লোকেরা বলিষ্ঠ কণ্ঠে দাবী করছে, বিংশ শতাব্দীর এই জ্ঞানোজ্জ্বল যুগে ‘জাহিলিয়াত’ বলতে কিছু নেই, থাকতে পারে না।

 

তাদের নিজস্ব মানদণ্ডেই যদি সত্য-মিথ্যা বা ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয়, তাহলে তাদের একথা মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

 

কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, এই সব লোক ‘জাহিলিয়াত’ বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বোঝায়, কি তার যথার্থ তাৎপর্য, তা আসলেই জানে না। জানে না কুরআন মজীদ ‘জাহিলিয়াত’ বলতে কি বুঝিয়েছে।

 

এই লোকদের ধারণা, সাদা-মাটা শিরক এবং মরুজীবন উপযোগী মূর্তিপূজা-ই হচ্ছে ‘জাহিলিয়াত’। সেই সাথে প্রতিরোধ গ্রহণও সেকালের আরব সমাজের যে নৈতিক বিপর্যয় ঘটেছিল, তা-ও জাহিলিয়াতের বাহ্যিক প্রকাশ। অন্য কথায় জাহিলিয়াতের বাহ্যিক প্রকাশ –প্রপঞ্জকেই তারা জাহিলিয়াত মনে করেন, যা তখনকার আরব সমাজে ব্যাপক হয়ে দেখা দিয়েছিল। এরা জাহিলিয়াতকে এই সীমাবদ্ধ অর্থে গ্রহণ করতেই অভ্যস্ত এবং তা ইতিহাসের দূর অতীত এক অধ্যায়ে আরব উপদ্বীপের বিচ্ছিন্ন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর সেই কাল যেহেতু অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তাই তা আর কখনোই –কোনো সময়ই এবং কোনো জনসমাজে পুনঃ প্রবর্তিত হতে পারবে না।

 

এ ক্ষেত্রে খারাপ মনোভাব সম্পন্ন লোকেরা মনে করে, জাহিলিয়াত হচ্ছে তাই, যা জ্ঞান ও বিজ্হাতের পরিপন্থী। যা সত্যতা ও সংস্কৃতির বিরোধী। যা প্রগতি বিরোধী, বস্তুগত অগ্রগতির পথে যা প্রতিবন্ধক। যা চিন্তা, সামষ্টিকতা, রাজনৈতিকতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের বিপরীত, তাই জাহিলিয়াত। এই কারণেই তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা একান্তভাবে নিয়োজিত হয়েছে সেইসব জিনিস প্রতিরোধ সংগ্রামে। কিন্তু তা রাসূলে করীম (স)-এর নীতি আদর্শ ও সংগ্রাম রীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। ফলে প্রকারান্তরে তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে, তদানীন্তন আরব মূর্খ বা জাহিল ছিল না, তারা নানা তত্ত্ব ও তথ্যের ধারক বাহক ছিল। তারা ছিল না পশ্চাদপদ, প্রগতি বিরোধী। তারাও এক ধরনের সভ্যতা সংস্কৃতির ধ্বজাধারী ছিল। মূল্যবোধশূন্যও ছিল না তারা, তাদেরও নানা গুণ-বৈশিষ্ট্য ছিল –মহানুভবতা, বীরত্ব, বিপন্নের ফরিয়াদে সাড়া দান, সাহসিকতা, নির্ভীকতা, মর্যাদাবোধ ও অনুরূপ অন্যান্য ভালো কাজের জন্যে জীবন দান এবং প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মহৎ গুণে তারা বিভূষিত ছিল। অতএব কুরআন যে এই যুগ বা সমাজকে ‘জাহিলিয়াত’ বলেছে তা যথার্থ নয়। আর এই কারণেই তারা বিংশ শতাব্দীতে জাহিলিয়াতের কোনো নাম-চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না। বরং তাদের দৃষ্টিতে বর্তমান শতাব্দী তো উন্নতি-উৎকর্ষের আলোকোজ্জ্বল যুগ। এই যুগেই মানুষ পারে উচ্চতর স্বপ্ন দেখতে, মহান কিছু ভাবতে।

 

এ সত্ত্বেও আমরা বলব, এরা জাহিলিয়াতের প্রকৃতি তাৎপর্য জানে না। তারা বুঝতে পারেনি কুরআন কেন এই যুগকে জাহিলিয়াত বলছে, তার গভীর সূক্ষ্মতত্ত্ব এই লোকদের অগোচরেই রয়ে গেছে।

 

বস্তুত ‘জাহিলিয়াত’ বলতে –এরা যেমন মনে করেছে কোনো সুনির্র্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ প্রতিকৃতি নয়। ওদের ধারণা, তা অতীত কালের একটি সময়ের বিশেষ ব্যাপার, তা পুনঃ প্রবর্তিত হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মূলত জাহিলিয়াত হচ্ছে একটি সুনির্র্দিষ্ট ভাবধারা –সারনির্যাস। তা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে এবং তা হয়ে থাকে পরিবেশ-পরিস্থিতি সময়-কাল ও স্থানের অবস্থার প্রেক্ষিতে। তা সত্ত্বেও সেইসব রূপের অভিন্ন পরিচয় –তা জাহিলিয়াত। তার বাহ্য প্রকাশ (Phenomenon) যতই বিভিন্ন ও বিচিত্র হোক না কেন, আর বাহ্যিকভাবে সেসবের মধ্যে যত পার্থক্যেরই ধারণা করা হোক-না-কেন, মূল ব্যাপারের দিক দিয়ে তাতে বিন্দুমাত্রও তারতম্য ঘটে না।

 

আর তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, অবিহিতি, অভিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, বস্তুগত প্রগতি-অগ্রগতি এবং চিন্তা সামষ্টিকতা রাজনৈতিকতা ও সাধারণ মানবিকতার বিপরীতও কিছু নয়। যেমন এক শ্রেণীর লোক চিন্তা করেছে। তা আরব জাহিলিয়াতের প্রেক্ষিতেই হোক, কি অধুনা বিংশ শতকের জাহিলিয়াতের প্রেক্ষিতে। সেই মূল ভাবধারা সর্বত্রই লক্ষণীয়।

 

মূলক কুরআন মজীদ-ই এই শব্দটির ব্যভহার করেছে এবং তার সংজ্ঞা ও পরিচিতিও উপস্থাপিত করেছে। কুরআনের দৃষ্টিতে ‘জাহিলিয়াত’ হচ্ছে একটি মানসিক অবস্থা, যা আল্লাহর দেওয়া হেদায়েত মেনে নিতে পুরোপুরি অস্বীকার করে। তা এমন এক পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠন যা আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ও বিচার কার্য সম্পাদন করতে সম্পূর্ণ অরাজী হয়ে দাঁড়ায়। এই কথাই প্রকাশ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটিতে-

 

(আরবী**************************************************************)

 

ওরা কি জাহিলিয়াতের কর্তৃত্ব সন্ধান করে? অথচ দৃঢ় প্রত্যয় সম্পন্ন লোকদের জন্যে আল্লাহর তুলনায় অধিক উত্তম ফয়সালাকারী আর কে হতে পারে?

 

এ আয়াত অনুযায়ী ‘জাহিলিয়াত’ হচ্ছে আল্লাহ পরিচিতি আল্লাহর দেওয়া হেদায়েত অনুযায়ী হেদায়েত গ্রহণ এবং আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসন-প্রশাসন চালানোর পরিপন্থী রীতি-নীতি ও আদর্শ। তা কথিত জ্ঞান-বিজ্ঞান, বস্তুগত সভ্যতা-সংস্কৃতি ও বিপুল উৎপাদনের বিপরীত কিছু নয়।

 

০০০০০০০০০০০০

 

কুরআন কখনোই বলেনি যে, আরবরা ‘জাহিলিয়াতের’ মধ্যে নিমজ্জিত ছিল এইজন্য যে, তারা জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও চিকিৎসাবিদ্যা জানত না। অথবা এজন্যে যে, তারা রাজনৈতিক সংস্থা-ব্যবস্থার সাথে পরিচিতি ছিল না। কিংবা বস্তুগত উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা পশ্চাদপদ রয়ে গিয়েছিল। তারা বিশেষ বিশেষ কোনো গুণ-বৈশিষ্ট্যে ভূষিত ছিল না; কিংবা সাধারণভাবে মূল্যবোধ বঞ্চিত ছিল বলেও তাদের জীবনকে ‘জাহিলিয়াত’ বলে অভিহিত করা হয়নি। কুরআন যদি তাদের প্রসঙ্গে এরূপ কথা বলত তাহলে আল্লাহ তাদের জন্যে বিকল্প কিছুর ব্যবস্থা অবশ্যই করতেন। যেমন মূর্খতার বিকল্প বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য বা জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৃতি বিজ্ঞান, রসায়ন ও চিকিৎসা বিদ্যাই তার বিকল্প হিসেবে মনে করা যেত। কিংবা রাজনৈতিক মূর্খতার পরিবর্তে বিস্তারিত অধীত রাষ্ট্রীয় মতবাদ মতাদর্শ ও বিকল্প হতে পারত। বস্তুগত উৎপাদন ব্যবস্থা করা অসম্ভব ছিল না। এ কাজকে আরও উন্নত উৎকর্ষসম্পন্নও করা যেত। বিশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্যের অভাব ও বিশেষ ধরনের মূল্যবোধের অনুপস্থিতিকেও নানাভাবে পূরণ করা যেত। তাতে কোনোরূপ অসম্ভাব্যতার অবকাশ ছিল না।

 

কিন্তু কুরআন তাদের সম্পর্কে এই পর্যায়ের কোন কথাই বলেনি। আর এই কারণেই কথিত ধরনের কোন বিকল্প ব্যবস্থাই তাদের জন্যে করা হয়নি।[সন্দেহ নেই, উত্তরকালে ইসলামী অভ্যূদয়ের পরিণতিত এই সব কিছুই তাদের করায়ত্ত হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ যে মানুষকে জাহিলিয়াত থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন ঐগুলো তার বিকল্প ছিল না।]

 

কুরআন তাদের সম্পর্কে বলেছে, ওরা ‘জাহিল’। কেননা ওরা নিজেদের কামনা-বাসনা ধারণা-চিন্তাকে শাসক-নিয়ন্ত্রক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। আর আল্লহার হুকুম ও বিধানকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বস্তুত এটাই হচ্ছে জাহিলিয়াত এবং আল্লাহ তাদের এই জাহিলিয়াতের বদলেই দ্বীন-ইসলাম দান করেছেন।

 

মানব জীবনকে বিচার করার জন্যে এটাই হচ্ছে কুরআন অবলম্বিত মানদণ্ড (Measure)। এই মানদণ্ড জাহিলিয়াতের প্রতিপক্ষ। তা তদানীন্তন আরব জাহিলিয়াত হোক; কিংবা হোক ইতিহাসের অন্য কোনো অধ্যায়ে অপর কোনো জাহিলিয়াত।

 

প্রাচীনতম কালের অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতির কাহিনী কুরআন মজীদে উদ্ধৃত হয়েছে। যে সব সভ্যতা-সংস্কৃতি ইসলাম পূর্ব আরবদের তুলনায় বিপুলভাবে উন্নত মানের ও অগ্রসর ছিল। তা সত্ত্বেও কুরআন-ইসলাম তাকে ‘জাহিলিয়াত’ নামে অভিহিত করছে। কেননা সে সব সভ্যতা-সংস্কৃতি আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েত অবলম্বনকারী বা তার অনুসারী ছিল না। এ পর্যায়ে কুরআনের এ আয়াতটি স্মরণীয়ঃ

 

(আরবী***********************************************************************************)

 

ওরা কি পৃথিবী পরিভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা দেখতে পেত তাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণতি কি হয়েছিল। তারা শক্তির দিক দিয়ে ওদের অপেক্ষা অধিক ছিল। তারা পৃথিবীকে উন্নত ও উৎকর্ষিত করেছে। তারা যতটা উন্নত-উৎকর্ষিত করেছে তার তুলনায় অনেক বেশী এবং তাদের কাছে তাদের রাসূলগণও এসেছিল অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ নিদর্শনাদি সহকারে। ফলে আল্লাহ তো তাদের ওপর জুলুম করেন নি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। পরে যারা চূড়ান্ত মাত্রায় খারাপ কাজ করেছে তাদের পরিণতিও খারাপ হয়েছে। আর সে খারাপ কাজ এই ছিল যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অসত্য মনে করেছিল এবং তারা সে সবের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিল।

 

এ আয়াতে কুরআন আরব ‘জাহিলগণ’কে প্রাচীণ ও পূর্ববর্তী জাহিলিয়াতের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করার আহবান জাহিয়েছে। সে দিকে দৃষ্টিপাত করলেই তারা দেখতে পাবে তার পরিণতি কি ভয়াবহ হয়েছে। তাহলেই তারা জাহিলিয়াতকে ভয় করবে, তাকে এড়িয়ে যেতে পারবে। আর তাহলে তারা আল্লাহর আয়াতকে অসত্য মনে করবে না, তা মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতাকেও পারবে না অস্বীকার করতে। তখন তারা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে, কুরআনের হেদায়েতকে তারা  অবলম্বন করবে। উপরোক্ত আয়াতে যদিও ‘জাহিলিয়াত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি, কিন্তু তার তাৎপর্য ও ভাবার্থ যথাযথভাবে উপস্থিত। এ আয়াতে আরব ‘জাহিল’গণকে বলা হয়েছে, জাহিলিয়াতের ক্ষেত্রে ওরা সব তোমাদেরই মতো। যদিও তারা শক্তি-সামর্থ দাপট-প্রতাপ ও পৃথিবী আবাদকরণে, সভ্যতা-সংস্কৃতি সৃষ্টিতে তোমাদের তুলনায় অনেক অগ্রসর ও উন্নত ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও জাহিলিয়াতের মানদণ্ডে তোমরা ও তারা ভিন্ন। আর জাহিলিয়াতের এই সভ্যতা ও সংস্কৃতি তোমাদের সকলের পক্ষেই অত্যন্ত মারাত্মক। অতএব তোমরা এই জাহিলিয়াতের অক্টোপাস থেকে মুক্তি ও নিস্কৃতি লাভ করে আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতের পটভূমিতে ফিরে এসো। তোমরা সত্যিকার অর্থে মুসলিম –একান্তভাবে আল্লাহনুগত হয়ে যাওয়।

 

এ প্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, জাহিলিয়াত মূলত একটি মনস্তাত্মিক অবস্থা, যা আল্লাহর দেওয়া হেদায়েত গ্রহণে অস্বীকৃতি হয়। তা এমন এক সাংগঠনিক সামষ্টিক রূপ, যা আল্লাহর নাযিলকরা বিধান অনুযায়ী সিদ্ধঅন্ত গ্রহণ ও শাসন-প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে সম্পূর্ণরূপে অবাধ্য ও অরাজী। আর এই রূপ অবস্থারই অনিবার্য ফসল হচ্ছে চরম মাত্রার বিকৃতি ও বিপর্যয় –deliquity perversion. এই বিকৃতি ও বিপর্যয়ের রূপ বিভিন্ন হতে পরে এবং বিভিন্ন রূপের বিকৃতি ও বিপর্যয়ের ফলাফলও হতে পারে বিভিন্ন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানব জীবনে বিকৃতি ও বিপর্যয় নিয়ে আসার ব্যাপারে অভিন্ন ভূমিকা পালন করে। জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। শান্তি সমৃদ্ধি ও  শৃঙ্খলা হয়ে দাঁড়ায় সুদূর পরাহত।

 

এই কারণে এ জাহিলিয়াত ইসলাম পূর্ব আরব জাহিলিয়াতের রূপ ও প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,  সীমিত নয় কাল ও যুগের কোনো একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে। আসলে তা এমন একটি অবস্থা, যা কালের যে-কোনো সময়ে, দুনিয়ার যে-কোনো দেশে এবং মানুষের যে-কোনো সমাজ-সংস্থায় পাওয়া যাওয়া খুবই সম্ভভ। অনুরূপভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির যে কোনো স্তরে –বস্তুগত উন্নতি-অগ্রগতি, মূল্যমান, চিন্তা, রাজনৈতিকতা, সামষ্টিকতা ও মানবিকতার যে কোনো ধাপে ও বাঁকেই তা বাস্তব হয়ে দেখা দিতে পারে। আর তা বাস্তব হয়ে দেখা দিতে পারে তখনই, যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হেদায়েত অবলম্বিত অনুসৃত হবে না, হবে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষিত। আর তদস্থলে অনুসৃত হবে মানুষের নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত মতাদর্শ, পরিপূরিত হবে মানুষের খাহেশ-কামনা-বাসনা, অস্বীকৃত হবে আল্লাহর দ্বীন, আল্লাহর নাযিল করা বিধান।

 

এ কারণেই বলা যায়, জাহিলিয়াত ও মানুষের খাহেশ, কামনা-বাসনা ও নিজস্ব চিন্তা প্রসূত মতবাদ মতাদর্শ এক ও অভিন্ন।

 

অতএব যারাই নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়, অনুসৃত করে মানব-রচিত নিয়ম বিধান কার্যত তারাই অস্বীকার করে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মেনে চলতে, অনসরণ করতে। আর তখনই তারা নিমজ্জিত হয়ে পড়ে জাহিলিয়াতের অতল গহবরে। কেননা তারা আল্লাহর হেদায়েতকে গ্রহণ ও অনুসরণ করতে অস্বীকার করেছে। মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের, সভ্যতা-সংস্কৃতির, বস্তুগত অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক-সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্থা-সংগঠনের দিক দিয়ে উন্নতি ঊর্ধ্বগতির যত উচ্চতর স্তরেই পৌঁছে গিয়ে থাকুক-না কেন। আর এই জাহিলিয়াতের যা কিছু অনিবার্য পরিণতি, যা কিছু ফলাফল, তার সম্মুখীন তাদের হতেই হবে নিশ্চিতভাবে। অশান্তি-অস্থিরতা, দুর্ভাগ্য-হতাশা-বঞ্চনার অমোঘ পরিণতি থেকে তাদের নিস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।

 

কাজেই স্পষ্ট ভাষায় বলা যায়, তদানীন্তন আরবরাই জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল না ইসলামের পূর্বে। বরং অনুরূপভাবে যে জন-গোষ্ঠীই আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা-মতবাদ অনুসরণ করে চলে, তারা অভিন্নভাবেই জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত।

 

যার মনে করে, ইসলাম-পূর্বকালীন আরবের জাহিলিয়াতই একমাত্র জাহিলিয়াত, তাদের সম্মুখে জাহিলিয়াতের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। এই বিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা সংস্কৃতির চরম উন্নতির আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে জীবন যাপনের সঠিক রূপ কি তা তারা নির্ভুলভাবে বুঝতে পারবে জাহিলিয়াতের এই তাৎপর্যের আলোকেই। এ কালের যে সব লোক তদানীন্তন আরব জাহিলিয়াতের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করেন, সে জাহিলিয়াত থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে আছে বলে অন্তরে আত্মশ্লাঘা বোধ করে, তাদের জন্য আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, তারা এজন্য যত চেষ্টাই করুক না কেন, বিংশ শতাব্দীর এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি রাজনৈতিক-সামষ্টিক-চৈন্তিক মূল্যবোধের এই চরম উৎকর্ষের যুগে তদানীন্তন আরব জাহিলিয়াত –যাকে তারা অনেক পশ্চাতে ফেলে এসেছে-তাদের স্পর্শমাত্রও করতে পারবে না। তাদের মনে রাখা উচিত বিংশ শতাব্দীর এই যুগ চৌদ্দশ বছর পূর্বেকার আরব জাহিলিয়াতের তুলনায় অধিক বীভৎস ও জঘন্য জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত। উপরন্তু অধিক সত্য কথা হচ্ছে, পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী মানুষের ইতিহাসে বর্তমান বিংশ শতাব্দীই হচ্ছে সর্বাধিক জাহিলিয়াতের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ।

 

তদানীন্তন আরবে জাহিলিয়াত ছিল খুবই সাদা-সিধা হালকা অপঞ্জীভূত এক পাত্রের তলদেশে অবস্থিত আবর্জনার মতো। তখনকার লোকেরা দৃশ্যমান মূর্তির পূজা করত। তাও ছিল অপরিপক্ক, সরল প্রকৃতির কল্পনার সাহায্যে মূর্তিগুলোর গাত্রে নানা বিচিত্র রঙ লাগিয়ে দিয়ে শোভা মণ্ডিত করে দিত। এইগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের নানা প্রকারের অনুষ্ঠান হতো –যদিও সবই হলো পথভ্রান্ত, আদর্শ বিচ্যুত। কিন্তু সে বিচ্যুত ও বিভ্রান্তি ছিল অত্যন্ত সরল, অগভীর। আর এই সবই ছিল কোরায়েশ বংশের ষড়যন্ত্র ও শক্ত হস্তক্ষেপের ফল। সব কিছু তাদের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে নিয়ন্ত্রিত হতো। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণই ছিল সবকিছুর মূলে নিহিত লক্ষ্য। আর এই সব কারণেই তারা শাশ্বত সত্য ও সুবিচারের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর সর্বপ্রকারের জাহিলিয়াতের পশ্চাতেই এই রূপ কালো হাতের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী; তা প্রাচীন কালের হোক, কি আধুনিক কালের। তবে তা কখনো অশক্ত সহজ রূপও ধারণ করে থাকে, যদিওো তাতে তার বীভৎসতা পূর্ণ মাত্রায় নগ্ন হয়ে দেখা দেয়। তার কারণ, আসল প্রকৃতিতে এতটা বিকৃতি আসে না, যতটা তার বাহ্যিক প্রকাশে গোচরীভূত হয়। এরূপ অবস্থায় বাহ্যিক ছালের (বকল) সাথে মহাসত্যের ঘর্ষণে তা অবিলম্বেন বিলীন হয়ে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত তা শাশ্বত সত্যের ধারক হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, পুঞ্জিভূত অন্ধকার হয়ে যেতে পারে বিলীন।

 

কিন্তু আধুনিক জাহিলিয়াত সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র ও অপকৌশলের, সুগঠিত, সুপরিকল্পিত; বিশ্বমানবতাকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে একান্তভাবে নিয়োজিত। তার যাবতীয় কার্যকলাপই বিজ্ঞানভিত্তিক; বৈজ্ঞানিক কলা-কৌশল সমৃদ্ধ। এমন এক জাহিলিয়াত; যার দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

বিংশ শতাব্দীর এই অভিনব জাহিলিয়াতের –তার প্রপঞ্চের বিস্তারিত অধ্যয়নই এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য।

 

এ গ্রন্থে অধ্যয়ন করব এর কার্যকারণের, তার চাকচিক্যময় বাহ্য প্রকাশ্যের, মানুষের ধ্যান-ধারণা ও আচার-আচরণের ওপর তার প্রতিফলন, মানব জীবন লব্ধতার ফলাফল; মানুষের ভবিষ্যত।

 

এই আলোচনায় আমাদের বক্তব্যের সমর্থনে যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হবে; তা সবই সেই বাস্তব অবস্থা ও ঘটনাবলী থেকে সংগৃহীত; যার মধ্যে আমরা জীবন ধারণ করছি। তা প্রাচ্য হোক, কি পাশ্চাত্যে।

 

গোটা পৃথিবী থেকে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ……

 

এ আলোচনার প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের ধ্যান-ধারণা নির্ভুল করে তোলা।

 

আচার-আচরণকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা। প্রগতি ও অগ্রগতির বা বিকাশ-এর নামে যে বিভ্রান্তির কুহক জালে বর্তমান বিশ্বমানবতা জর্জরিত, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতারণায় সম্মোহিত, এ আলোচনার তীব্র কষাঘাতে তা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে, এ আমাদের দুরাশা নয়। এর ফলে মানবতা আত্ম-সচেতনতা ফিরে পাবে। তারা যে গভীর খাঁদের দিকে তীব্রগতিতে দৌড়ে যাচ্ছে, মনে করছে, তারা নির্ভুল পথেই অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের এ আলোচনায় তাদের এ ভুল ভাঙবে।

 

আর এই সব প্রেক্ষিতেই বিশ্ব মানবতার সম্মুখে শুভ সংবাদ উপস্থাপিত করাও আমাদের কাম্য।

 

সে এমন এক উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ, যার প্রতি আমাদের রয়েছে প্রবল ঈমান। সে ভবিষ্যৎ অর্জন করা তখনই সম্ভব হবে, যখন মানবতা বর্তমান পুঞ্জীভূত অন্ধকারের বক্ষ দীর্ণ করে নির্মল আলোকের দিকে অগ্রসর হবে।

 

আমি অবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে খুবই সচেতন। আমি জানি, আমাদের লক্ষ্যভূত কাজ মাত্র দু’-এক খানি কেন, হাজার খানি গ্রন্থেও সাধ্যায়ত্ত নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে আমি দুটি ব্যাপারকে পরপর সাজিয়ে দিচ্ছিঃ

 

প্রথম, আমি বিশ্বাস করি, অন্তর-নিঃসৃত কথা কখনোই নিস্ফল যায় না, যদিও তা সহসাই মানুষের কর্ণকুহরে ভেদ করে মর্মে গিয়ে পৌঁছায় না।

 

আর দ্বিতীয়, অন্ধকারের দুর্ভেদ্য জাল ছিন্ন করার কাজ যথারীতি শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছুকাল আগে থেকেই।

 

পুঞ্জীভূত অন্ধকারের বক্ষ দীর্ণ করে নতুন সূর্যের আলোকচ্ছটা চতুর্দিকে বিচ্ছুরিত হয়ে পড়েছে। -আমি তা নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছি। আর সেই আলো উজ্জ্বল। তার মধ্যে বসেই আমি এই গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করে দিয়েছি। মহান আল্লাহই আমাকে মনযিলে পৌঁছিয়ে দিবেন।

 

-মুহাম্মদ কুতুব

 

 

 

(আরবী*****************************************************************************)

 

তবে ওরা কি জাহিলিয়াতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চায়? অথচ দৃঢ় প্রত্যয় সম্পন্ন লোকদের জন্যে আল্লাহর তুলনায় অধিক উত্তম হুকুম দানকারী (কর্তৃত্ব সম্পন্ন) সত্তা আর কে হতে পারে? (সূরা মায়েদাঃ ৫০)

 

 

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

 

ভূমিকা

 

আমরা যথার্থভাবেই জানতে পেরেছি যে, ইতিহাসের অধ্যায়সমূহের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ ও সীমাবদ্ধ অধ্যায়কেই ‘জাহিলিয়াত’ নামে চিহ্নিত করা যায় না।

 

আমরা এ-ও জেনে নিয়েছি যে, তা জ্ঞঅন-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-সভ্যতা ও বস্তুগত উৎকর্ষ-অগ্রগতি বললে যা বুঝায় তার বিপরীত কোনো জিনিসকে জাহিলিয়াত বলা যায় না।

 

মূলত জাহিলিয়াত হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া হেদায়েত অবলম্বন ও অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন, আল্লাহর নাযিল করা বিদান অনুযায়ী জীবন-সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনা করতে অস্বীকার করা।

 

এই প্রেক্ষিতে আমাদের মন-মানসিকতার মধ্যে এমন একটি প্রস্তুতি জেগে ও গড়ে উঠেছে, যার দরুন আমরা সহজেই বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত পর্যায়ে প্রকাশ্য ও উন্মুক্ত আলোচনার অবতারণা করতে পারি।

 

আমাদের এই প্রস্তুতি কারোর-কারোর জন্য বিব্রতকরও হতে পারে বটে! কেননা আধুনিককালের জাহিলিয়াত অনেক মানুষকে বিমোহিত, অবনত ও অধীন বানিয়ে দিয়েছে। তারা বলে, জাহিলিয়াত বলতে তুমি যখন এই শতাব্দীকেই বোঝাতে চেয়েছ তখন তা-ই সই। আমরা যে অবস্থায় রয়েছি তাতেই আমরা সন্তুষ্ট। এই শতাব্দীর প্রতি আমাদের পূর্ণ সন্তুষ্টি রয়েছে, তোমরা একে যতই জাহিলিয়াত বলে অভিহিত করো না কেন! শুধু তা-ই নয়, আমরা এর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করছি, এর প্রতি লোলুপ হয়ে তাকিয়ে আছি। আমরা এই শতাব্দীর ভূষণ ও আয়োজন ত্যাগ করে ‘আল্লাহর হেদায়েত’ নামের কোনো জিনিসের দিকে প্রত্যাবতন করতে রাজি নই। কেননা, তোমরা ‘আল্লাহর হেদায়েত’ বলে যে-জিনিস পেশ করছ, তা তো মূর্খতা, কুসংস্কারে ভর্তি, পশ্চাদপদতা, পতনশীলতা, পচনশীলতা, অসভ্যতা, বর্বরতা। আমরা ইচ্ছা করেই তার অক্টোপাস থেকে বের হয়ে এসেছি। আমরা নবতর সংস্কৃতি পেয়েছি, উত্তরিত হয়েছি নবতর এক উচ্চমানের সভ্যতায়। ফলে আমরা অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে আলোকমণ্ডিত পরিবেশে এসে গেছি। না, না, তোমাদের কথা শুনছি না! এই জাহিলিয়াতই আমাদের পছন্দ, আমাদের কাছে অতিশয় প্রিয় সেই জিনিসের তুলনায়, যার দিকে তোমরা আমাদের ডাক দিচ্ছ।

 

এই মানসিকতার সাথে কুরআন মজীদের এই কথাটুকু পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেনঃ

 

(আরবী*****************************************************************************)

 

এই লোকেরা অন্ধত্বকে অধিক পছন্দ করে নিয়েছে হেদায়েতের তুলনায়।

 

(হা-মীম সাজদাহঃ ১৭)

 

আল্লাহর এই কথাটিও যথার্থঃ

 

(আরবী***********************************************************************)

 

এমনিভাবেই যারা কিছুই জানে না, বুঝে না, তারা বলে ওদের মতোই কথা। আসলে ওদের সকলের অন্তরসমূহ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ –অভিন্ন হয়ে গেছে….। (সূরা বাকারাঃ ১১৮)

 

সার কথা, জাহিলিয়াতের এই ধ্বজাধারী লোকেরা ইতিহাসের পটভূমিতে একই কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। সেকালের ও একালের এই মনোভাবের লোকদের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই –সবই একাকার।

 

আধুনিক কালের জাহিলিয়াত সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে আমাদের মন ও মগজ সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের আলোচ্য বিষয়টি মোটেই বিস্ময়কর কিছু নয়, নয় অপরিচিত কিছু –যেমন প্রথম দিক দিয়ে মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই সাথে একথাও সত্য যে, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণমুখী আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

 

বরং সত্যি কথা এই যে, এ পর্যায়ে এত বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন যে, এই ধরনের আরও বহু সংখ্যক বই এ পর্যায়ে রচিত হওয়া একান্তই বাঞ্ছনীয়।

 

বস্তুত ‘জাহিলিয়াত’ মাত্রই –তা যে কালের ও যে-ধরনেরই হোক –আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতকে অপছন্দ ও অগ্রাহ্য করে। হেদায়েতকে প্রত্যাখ্যান করে অন্ধত্বকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আর মনে মনে ধারণা করে, তারা যে জিনিস অবলম্বন করেছে, তা সম্পূর্ণ কল্যাণময়। আর তাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর যে হেদায়েতের দিকে তাদের আহবান করা হচ্ছে তাতে ক্ষতি বা লোকসান ছাড়া আর কিছুই নেই।

 

কিন্তু তাদের অবলম্বিত জাহিলিয়াত ও অন্ধত্বে যে পথভ্রষ্টতা, বিকৃতি, বিপথগামিতা, ভাগ্যহীনতা ও অস্থিরতা নিহিত রয়েছে, সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রথম দিক দিয়ে সম্ভব হয় না, সম্ভভ হয় হেদায়েত পাওয়ার পর; তার পূর্বে নয়। অন্ধকারের গহবর থেকে মুক্তিলাভের পর আলোকের মধ্যে আসতে পারলেই বুঝতে পারা যায় আলোর মর্যাদা ও গুরুত্ব। জাহিলিয়াতের ধ্বংসকারিতা মর্মে মর্মে অনুধাবনের জন্যে একান্ত প্রয়োজন হচ্ছে মানব প্রকৃতিকে আল্লাহর হেদায়েতের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

 

আমাদের এই গ্রন্থের লক্ষ্যই হচ্ছে, বর্তমান মানবতা যে ভ্রষ্টতা, বিকৃতি, বিপথগামিতা, দুর্ভাগ্য ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত, তা পূর্ণ মাত্রায় উদঘাটন করা। এটা স্পষ্ট করে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যে, তাদের বর্তমান সর্বাত্মক দুর্দশা ও সর্বগ্রাসী পতনের একমাত্র কারণ হচ্ছে আল্লাহর দাসত্বকে অস্বীকার করা, আল্লহার নাযিল করা বিধান থেকে দূরে –অনেক দূরে চলে যাওয়া।

 

সন্দেহ নেই, আমার বক্তব্য হৃদয়ঙ্গম করা তাদের মন-মগজের পক্ষে খুব সহজ হবে না, কেননা বর্তমানের এই জাহিলিয়াত তার অনুসারীদের মনের পটে বহুবিধ বর্ণের ছটা বিক্ষেপণ করেছে। তাদের ধারণা ও আচরণে বিভিন্ন প্রকারের বিকৃতি ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।

 

কোনো কোনো সময় তাদের এই প্রবোধ দেওয়া হয় যে, তাদের ধারনা ও আচার-আচরণ যা কিছুই রয়েছে, তাতে তারা আল্লাহর বিরোধিতা কিছু করছে না। তারা যা কিছু ভাবছে, যা কিছু করছে, তা আল্লাহর কাছ থেকেই স্থিরীকৃত হয়েছে। তাতে রয়েছে আল্লাহর নির্দেশ।

 

আবার কখনো বোঝানো হয়, তাদের ধারণা ও আচার-আচরণে যা কিছু বিকৃতি ও বিপর্যয় এসেছে, তাতে তাদের কোনো হাত নেই। এই সবকিছুই অবধারিত, ললাট লিখন। তারা তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না, পারে না তা পরিবর্তন করতেও। তা সর্বদিক দিয়েই তাদের বুঝ দিতে সচেষ্ট বটে; কিন্তু যে বুঝ দেওয়ার মধ্যে আল্লাহর উল্লেখ অনিবার্য, তা সযত্নে পরিহার করে চলবে। আল্লাহরও যে বিধান রয়েছে মানবতার কল্যাণের মধ্যে, তা কখনোই তাদের বলা হবে না। ফলে দুনিয়ার প্রতিটি শক্তিই বিদ্রোহী, এমন প্রতিটি মক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করা অবশ্যম্ভাবী। এখানকার প্রত্যেক সংস্থা ও ব্যবস্থা অবশ্যই সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু তার কোনোটিই আল্লাহ প্রদত্ত মানদণ্ডে ওজন বা যাচাই করা হবে না। কেননা তাকে তো কোনো হিসাবেই গণ্য করা হয় না বর্তমান যুগের জাহিলিয়াতের পটভূমিতে।

 

জনগণ যখন প্রকৃতই আত্মসচেতনতা লাভ করবে, তাদের আত্মা যখন জেগে উঠবে, স্বচ্ছ দৃষ্টি হবে উন্মুক্ত, তখনই তারা বুঝতে ও জানতে পারবে যে, মানুষের সাথে এরূপ আচরণ কেল একালের এই জাহিলিয়াতেরই নয়; ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের জাহিলিয়াতেরই এই প্রকৃতি, এই ধর্ম। কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত দ্বারা তাদের কথাই বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী**********************************************************************)

 

এই লোকেরা যখন কোনো চরম নির্লজ্জতার কাজ করে তখন তারা বলে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের তো এইরূপ কাজে ব্যস্ত পেয়েছি –বরং আল্লাহ-ই আমাদের তা করার নির্দেম দিয়েছেন। (সূরা আ’রাফঃ ২৮)

 

(আরবী*********************************************************************)

 

শিরককারীরা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ চাইলে তো আমরা শিরক করতাম না, আমাদের পতৃপুরষরাও নয়। (সূরা আন’আমঃ ১৪৮)

 

তাহলে দেখা গেল, জাহিলিয়াতের বাহ্যিক রূপ বিভিন্ন হয়ে থাকে। তা যেমন বস্তুগত হয়, তেমনি হয় পরিবেশগত। কিন্তু এ সম্পর্কিত মৌল ধারণা বিভিন্ন হয় না। ইতিহাসের ধারায় তার কার্যকারিতাও হয় না বিভিন্ন রূপ।

 

ব্যাপার যা-ই হোক, বর্তমান জাহিলিয়াতের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত লোকেরা কি কঠিন বিকৃতি ও বিপথগামিতার আবর্তে পড়ে গেছে তা অনুধাবন করা তাদের পক্ষে খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। কেননা, এই বিকৃতি ও বিপথগামিতার মৌল কারণই হচ্ছে আল্লাহর হেদায়েত থেকে তাদের দূরে সরে যাওয়া, তার সাথে সম্পর্কহীন হয়ে পড়া। তাদের কাছে এই ব্যাপারটি যখন প্রকট হয়ে উঠবে এবং তারা এ বিষয়ে পূর্ণ সচেতন হতে পারবে, ঠিক তখনই আল্লাহর হেদায়েত তাদের বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থা, অশান্তি, পীড়ন, জ্বালা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। অন্য কথায় আল্লাহর হেদায়েতের কার্যকারিতার জন্যে এই মানসিক চেতনা ও জাগরণ পূর্বশর্ত। তা হলেই তা তাদেরকে স্থিতি, নিশ্চিন্ততা, স্বস্তি, সৌভাগ্য ও সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারবে।

 

কিন্তু তা কি খুব সহজসাধ্য ব্যাপার? ….মোটেই নয়। সেইজন্য সেই পরিমাণ চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন, যতটা আধুনিক জাহিলিয়াত তাদেরকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যয় ও বিনিয়োগ করেছে। যা করে তারা তাদের মনে আল্লাহর হেদায়েতের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিয়েছে। এখানে তাদের সম্মুখে জীবনের নবতর ব্যাখ্যা পেশ করতে হবে, অন্য সব ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত করতে হবে এবং তদস্থলে সেই ব্যাখ্যা মন-মগজে বসিয়ে দিতে হবে যা নাযিল করেছেন স্বয়ং বিশ্ব-স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা।

 

কিন্তু ব্যপারটির কঠিনতা-জটিলতা আমাদেরকে যেন নিষ্ক্রিয় করে দিতে না পারে সেজন্যে আমরা এই কথা বলা থেকেও বিরত থাকব না। এই বর্ণনা নিশ্চয়ই প্রকৃত কোনো অন্তরায় হয়ে যেন না দাঁড়ায় আল্লাহর সত্য হেদায়েত লাভ এ জনগণের মধ্যে। জনগণকে অবশ্যই আধুনিক জাহিলিয়াতের সব লোভনয়ি-আকর্ষনীয় কথাবার্তা ও জাঁকজমক থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। তা হলেই আশা করা যায় তাদের হৃদয় উন্মুক্ত হবে মহাসত্য অনুধাবন ও গ্রহণের জন্যে। তখন বর্তমান জাহিলিয়াতের কুৎসিত চেহারা তাদের চোখের সামনে উদঘাটিত হবে। এই পরম সত্যকে যারা বালোবাসতে পারবে, তদনুযায়ী জীবন যাপন শুরু করতে ও তাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে পূর্ণ শক্তি দিয়ে জিহাদও করতে সক্ষম হবে।

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

শুরুতেই জনগণ হয়তো আমাদের সাথে একমত হবে না, আমাদের বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেবে না।

 

একালের মানুষ যে চরম ব্যর্থতা, অস্থিরতা ও অশান্তির মধ্যে জীবন যাপন করছে, তা যেন আল্লাহর দিক থেকে তাদের দূরত্বে পড়ে যাওয়ারই অনিবার্য ফল, একথা অনুধাবন করা হয়তো তাদের পক্ষে কঠিনই হবে।

 

আধুনিক জাহিলিয়াত তাদের বুঝেয়েছে মূলধন বা পুঁজিবাদই হচ্ছে তাদের এ দুর্ভাগ্যের মূলীভূত কারণ অথবা তা শ্রেণী পার্থক্য ও শ্রেণীগত দ্বন্দ্বেরও ফলশ্রুতি। কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থাই এই অশান্তির আসল স্রষ্টা বা পারস্পরিক নিশ্চিত বৈপরীত্য এর এক উদ্ভাবক। অথবা অর্থনৈতিক চাপ ও নির্যাতন মানুষকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। …..এইভাবে অনেক জিনিসেরই উল্ল্রেখ করবে; কিন্তু কস্মিনকালেও এবং একারের তরেও বলবে না যে, মানব জীবনের বাস্তবতার সাথে আল্লাহর –আল্লাহর শাশ্বত নিয়মের –এই দুনিয়ায় আল্লাহর প্রবর্তিত নিয়মের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং সম্পর্কে ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই আজকের বিশ্বব্যাপী এই অশান্তি।

 

আধুনিক জাহিলিয়াত যতই পরিহাস করুন, জীবনের উত্থান ও পতন এবং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, তার প্রকৃত ও নির্ভুল ব্যাখ্যা তো সম্ভব আল্লাহর সুন্নাত অনুযায়ী, আল্লাহর দেখানো পন্থা ও পন্ধতিতেই মানুষের মন ও মগজ থেকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কশীল সব কিছুকে উৎখাত করতে তা যতই চেষ্টা করুক, তারা তো সমগ্র জীবনের বাস্তবতাকেই শামিল করবে –তা মতাদর্শের ক্ষেত্রেই হোক, কি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।

 

সর্বোপরি আল্লাহ ও তাঁর পদ্ধতি এবং মধ্যযুগ অন্ধকার যুগের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তা নিঃসসেন্দহে বলা যায়। যেমন তা সংযোগ স্থাপক করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তার পদ্ধতির মধ্যে, আল্লাহর পদ্ধতি থেকে দূরত্ব সৃষ্টির মধ্যে।

 

এই কারণে আধুনিক মন-মানসিকতার লোকেরা খুব সহজেই যে আমাদের এই আলোচনার যথার্থতা স্বীকার করবে না তা আগেভাগেই বলে রাখছি।

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

বক্ষ্যমান আলোচনায় আমরা যে পদ্ধতি অবলম্বন করছি তা হচ্ছে প্রথমে আমরা দেখাব, আধুনিক জাহিলিয়াতের উৎপত্তি কি করে হলো। তা ইতিহাসেরই একটি পাতা। দ্বিতীয়ত, আমরা বলব জাহিলিয়াতের যে সব মন-ভোলানো চাকচিক্যের কথা যার মধ্যে এখনকার লোকেরা জীবন অতিবাহিত করছে।…

 

তা একালের ইতিহাস।

 

অতঃপর আমরা সন্ধান করব, একালে সমস্ত মানুষের জীবনে সে চাকচিক্য কি করে অনুপ্রবেশ লাভ করেছে। অনুপ্রবেশ লাভ করেছে তাদের ধারণায়, তাদের আচার-আচরণে, রাজনীতিতে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে, সমাজ সমষ্টিতে, মনোবিদ্যায়, চরিত্রে, শিল্পে, কলায়, জীবনের সকল র্পায়ের তৎপরতায়। …..তা-ও বাস্তব ঘটনা সমন্বিত।

 

সর্বশেষে আমরা বলব, এই সবকিছু কিভাবে সংঘটিত হলো ….হতে পারত না যদি তারা সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর প্রদর্শিত পন্থা ও পদ্ধতি অনুসরণ করত। …আর এক্ষণে তারা যদি নিজেদের জীবন থেকে এই সব কলংক-কালিমা মুছে ফেলে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন পথ ও পন্থা অনুসরণ করতে ইচ্ছুক হয় যদি বলতে প্রস্তুত হয় আল্লাহ প্রদর্শিত উচ্চ-উন্নত পথে তাহলে তাদের জন্যে করণীয় কি আছে? এটা উন্নত ভবিষ্যতের আশা-ভরসায় ভরা পৃষ্ঠা। অতঃপর পর্যায়ক্রমিক এই আলোচনাই শুরু করা হয়েছে……।

 

 

ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে

 

পৃথিবীতে জাহিলিয়াতের একটা ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস অতীব প্রাচীন। যেমন প্রাচীনতম ইতিহাস রয়েছে ঈমান ও ইসলামের।

 

এই দুটোরই সূচনা হয়েছে প্রথম মানুষ আদম থেকে …তাঁর বংশধরদের সময় থেকে। এ দুটোরই মূলে নিহিত রয়েছে মানবীয় প্রকৃতি, মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। মূলতই মানুষ সমন্বিত সত্তা। তার মধ্যে রয়েছে যেমন হেদায়েদ গ্রহণের প্রবণতা তেমনি রয়েছে গুমরাহীর প্রতি আকর্ষণ, জাহিলিয়াতের প্রতি যেমন ঝোঁক রয়েছে তেমনি উদ্যম ও উৎসাহ রয়েছে পরিরিচতি লাভের জন্যে নির্ভুল ও প্রকৃত জ্ঞান। কুরআন মজীদে তাই বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী************************************************************************************)

 

কসম নফসের এবং যা তাকে ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। অতঃপর তাকে ইলহাম করা হয়েছে (জানিয়ে দেওয়া হয়েছে) তার পাপপ্রবণতা ও আল্লাহ-ভীতিমূলক ভাবধারা। নিঃসন্দেহে সাফল্য ও কল্যাণ লাভ করল সে, যে তাকে পবিত্র –পরিচ্ছন্ন-পরিশুদ্ধ করেছে। আর যে তাকে ধূলিমলিন করে বসিয়ে দিল, সে হলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ। (সূরা আল-শামসঃ ৭-১০)

 

বলেছেনঃ

 

(আরবী***************************************)

 

এবং তাকে দুটি উজ্জ্বল স্পষ্ট পথ প্রদর্শন করেছি। (সূরা বালাদঃ ১০)

 

(আরবী*************************************************************)

 

আমরা মানুষকে পথ দেখিয়েছি –হয় আল্লাহর আনুগত্য ও শোকর করো না হয় কুফরির পথ। (সূরা আদ-দাহরঃ ৩)

 

অতএব দুনিয়ায় মানুষের দ্বারা যা কিছু সংঘটিত হবে, যা কিছু ঘটবে মানুষের জন্যে, তা সবই মানব সৃষ্টি সংক্রান্ত আল্লাহর এই নীতি ও নিয়মের ভিত্তিতেই ঘটবে। কেননা তিনিই মানুষকে সমন্বিত প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তা যেমন হেদায়েত গ্রহণ করতে পারে, তেমনি পারে গুমরাহী গ্রহণ করতেও। মানবতার ইতিহাসে এ থেকে ব্যতিক্রম কিছু –না মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে, না মানুষের জন্যে সংঘটিত হয়েছে। কি অতীতে, কি অদূর-সুদূর ভবিষ্যতে সেরূপ কিছু সংঘটিত হওয়ার সম্ভব ছিল, না কোনো দিন তা সম্ভব হবে।

 

মানুষের ইতিহাস হেদায়েত বা গুমরাহী এই দুই ধারায় প্রবহমান। এর কোনো একটি পথ থেকে মানুষের বাইরে চলে যাওয়া কখনোই সম্ভব হতে পারে নি, পারবে না কোনো দিন। এই দুটি পথের একটির নাম ইসলাম। আর অপরটিই হচ্ছে জাহিলিয়াত।[আরবী টীকা**************************************]

 

এই পৃথিবীর বুকে মানুষের বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছে –বিভিন্ন স্তরে ও পর্যায়ে। তাদের বিবর্তন ঘটেছে প্রকৃত তাৎপর্যগতভাবে, সুদৃঢ় পথে ও ভঙ্গিতে। অর্থাৎ তারা ক্রমবৃদ্ধি লাভ করেছে। পরিপক্ক হয়েছে এবং হয়েছে পূর্ণাঙ্গ, পূর্ণ পরিণত। অথবা তাদের বিবর্তন ঘটেছে বিকৃত, কৃত্রিম বিপর্যস্ত পথের বিপথগামিতায়। অর্থাৎ তারা সরল সোজা ভারসাম্যপূর্ণ পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলেছে।[আরবী টীকা******************************]

 

এবং প্রতিটি বিবর্তন –এটা বা ওটা –বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। যে রূপটি পরিবেশ ও বস্তুগত –জ্ঞনগত এবং সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির আনুকূল্য লাভ করেছে, তা-ই ধারণ করেছে, পরিণত হয়েছে।

 

কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের সামগ্রিক বিবর্তনে এবং সে বিবর্তন যে রূপ পরিগ্রহ করেছে সেই রূপে বর্ণিত দুটি অবস্থার কোনো একটি থেকেও বাইরে চলে যায়নি। এখানে তৃতীয় কোনো অবস্থা সৃষ্টি হওয়া আদৌ সম্ভব নয়। হয় হেদায়েতের অবস্থা হবে, নয় হবে গুমরাহীর অবস্থা। হয় ইসলাম হবে, না হয় হবে জাহিলিয়াত।

 

এই প্রেক্ষিতেই একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাহিলিয়াতের সাথে স্থান ও কালের কোনো সম্পর্ক নেই, জ্ঞান-মনীষার মান, বস্তুগত প্রগতি-অগ্রগতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সংগঠন সংবদ্ধতার সাথেও নেই তার এক বিন্দু বন্ধন বা সম্পর্ক।

 

মূলত হেদায়েত যেমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ মৌল ভাবধারা, তেমনি জাহিলিয়াতও এক স্বতন্ত্র মৌল। অবশ্য এর প্রতিটর বিবর্তিত রূপ ও আকৃতি বিভিন্ন হয়ে থাকে।

 

‘হেদায়েত’ হচ্ছে আল্লহার মারফত –পরিচিতি লাভ, আল্লাহর হেদায়েত অনুসরণ আর ‘জাহিলিয়াত’ হচ্ছে আল্লাহ সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা, অজ্ঞানতা –আল্লাহর হেদায়েত হতে দূরবর্তিতা, তাঁর সাথে নিঃসম্পর্কতা।

 

পরবর্তীতে ‘হেদায়েত’ ও ‘জাহিলিয়াত’ বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। তা অর্থনীতি সমাজনীতি, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে –সর্বক্ষেত্রে ঘটে। ঘটে মানবীয় বিবেক-বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে তার পরিবেশগত বস্তুপ্রকৃতির সাথে ঘর্ষণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে, সেই সাথে সংগঠন, বিন্যাস এবং জীবনের বিভিন্ন ‘ফ্যাক্টরে’র মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে লব্ধ অভিজ্ঞতার মাত্রা অনুপাতে।

 

অর্থনীতি, সামাজিকতা, রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতির কোনো একটিও তার বিবর্তিত কোনো একটি অবস্থাতেও কথিত দুটি অবস্থার মধ্য থেকে কোনো একটি অবস্থারও বাইরে যেতে পারে না। হয় হবে হেদায়েত, না হয় গুমরাহী, -ভ্রষ্টতা; হয় ইসলাম, না হয় জাহিলিয়াত।

 

এ আলোচনার আলোটে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ‘জাহিলিয়াত’ মানুষের বা ইতিহাসের বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে বা স্তরের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত নয় –তা পর্যায়-স্তরের ঊর্ধ্বে।

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

এ আলোচনায় অবশ্য আমরা সমগ্র ইতিহাস –ইতিহাসের সবগুলো পৃষ্ঠাই টেনে আনতে পারি না। তা কোনো ক্রমেই সহজ কাজও নয়।

 

তবে ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে আমরা এমন সব দৃষ্টান্তমূলক ঘটনার উল্লেখ করব, যা সেই মহাসত্যকে উদ্ভাসিত করে তুলবে, আধুনিক জাহিলিয়াত যে মহাসত্যকে ইচ্ছামূলকবাবেই অবহেলা ও উপেক্ষা করে এসেছে। ইচ্ছামূলকভাবে উপেক্ষা করার মূলে উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আল্লাহ থেকে যেসব জিনিস বাস্তব জীবনে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক গভীর ও সুদৃঢ় করে সেই সব জিনিস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।

 

বস্তুত আল্লাহর দ্বীন প্রথম দিন থেকেই পূর্ণাঙ্গ জীবনের সংগঠক। মানুষের সামাজিকতা-সামষ্টিকতা, তাদের অর্থনীতি ও রাজনীতি –সব কিছুই তার অন্তর্ভুক্ত। তার অন্তর্ভুক্ত মানুষের অনুভূতি, স্বজ্ঞা ও আকীদা-বিশ্বাস। কিন্তু আধুনিক জাহিলিয়াত এই মহা সত্যকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছে। তা এই ধারণা প্রচার করেছে যে, দ্বীন বা ধর্ম এই অনুভূতি ও আকীদা-বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট ব্যাপারই ছিল চিরকাল। মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধান হিসেবে তা কখনোই কোনো ভূমিকা পপালন করেনি। সেরূপ স্বীকৃতও হয়নি কখনো।

 

আর আকীদা-বিশ্বাস তো একটা স্থিতিশীল জিনিস। তা কখনোই পরিবর্তিত হয় না, পরিবর্তন স্বীকার করে না। আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা –তিনিই উপাস্য-আরাধ্য, মা’বুদ –যদিও আরাধনা-উপাসনা-ইবাদতের রূপ এক-এক ধর্মে এক-এক প্রকারের রয়েছে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে। তাতে কখনোই কোনো পরিবর্তন আসেনি, আসবার নয়।

 

তবে শরীয়ত –বাস্তব জীবনের কর্মবিধান মানুষের প্রবৃদ্ধি পরিপক্কতার সাথে সাথে বিবর্তিত হয়েছে। সরল সহজ থেকে জটিল-কঠিনে রূপান্তরিত হয়েছে।

 

সাধারণ মৌলনীতি থেকে বিস্তারিত খুঁটিনাটিতে পরিব্যাপ্ত হয়েছে। আর এভাবেই দ্বীন আকীদা ও বিধান উভয় দিক দিয়েই পূর্ণত্ব লাভ করেছে সেইদিন, যেদিন আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ

 

(আরবী************************************************************************************)

 

আজকের দিনে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে এবং সম্পূর্ণ করে দিয়েছি তোমাদের প্রতি আমার এই নেয়ামত। আর তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে ইসলামকে আমি পছন্দ ও মনোনীত করে দিলাম। (সূরা আল-মায়েদাঃ ৩)

 

ইতিহাসের ধারায় হেদায়েত ও জাহিলিয়াত দুটি পাশাপাশি চলে এসেছে, এসেছে একটির পরই অন্যটি। যখনই রাসূল প্রেরিত হয়েছে, আল্লাহর কাছ থেকে ওহী নাযিল হয়েছে। মানুষ তখন তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হেদায়েতের ওপর দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তখন কিছু লোক এই মূল পর্যায়ে বা অন্য কোনো পর্যায়ে ভিন্নতর পথ অবলম্বন করে জাহিলিয়াতের দিকে চলে গেছে সত্য পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে। ফলে জীবনের যে পর্যায়ে এই দুটি পাশাপাশি দেখা গেছে সেখানেই হেদায়েত ও জাহিলিয়াত প্রতিবারে পরস্পর সমান মানে ও মাত্রায় সুবিন্যস্ত হয়ে রয়েছে। ইতিহাসের একটি অধ্যায়েঃ

 

(আরবী***************************************************************************)

 

এবং মাদইয়ানের দিকে পাঠিয়েছি সেখানকার লোকদেরই ভাই শুয়াইবকে। সে বললঃ হে জনগণ! তোমরা দাস হয়ে থাকো একমাত্র আল্লাহর। তিনি ছাড়া তোমাদের মা’বুদ কেউ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের আল্লাহর কাছ থেকে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ এসে গেছে। অতএব, তোমরা পাপ ও ওজন পূর্ণ করে দাও, লোকদের জিনিসপত্র কম দিয়ে জুলুম করো না। পৃথিবীর শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন ও সুস্থতা শুদ্ধতার পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্যে অতীব কল্যাণকর, যদি তোমরা ঈমানদার লোক হয়ে থাকো, তোমরা প্রতিটি পথে বসে থেকে ওয়াদা করতে এবং আল্লাহর প্রতি যে ঈমান এনেছে তাকে আল্লাহর পথ থেকে ফেরাতে চেষ্টা করো না –সে পথে যেতে বাধাগ্রস্ত করো না, সেই পথ বাঁকা করতে চেয়ে। তোমরা স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন তোমরা সংখ্যায় খুব কম ছিলে। পরে আল্লাহই তোমাদের বিপুল সংখ্যক করে দিয়েছেন। আর দেখো বিপর্যয়কারীদের পরিণতি কি হয়েছে!

 

(সূরা আরাফঃ ৮৫-৮৬)

 

হযরত শুয়াইব (আ) তাঁর জনগণের প্রতি রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি যেমন আকীদা পেশ করেছিলেন, তেমনি দিয়েছিলেন শরীয়ত –জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-নীতি।

 

সে আকীদা স্থায়ী, অপরিবর্তনীয়। তার মূল কথাঃ (আরবী**********************) –‘তোমরা সকলে আল্লাহর দাস হয়ে জীবন যাপন করো। তিনি ছাড়া তোমাদের ইলাহ আর কেউ হয় –নেই’। আর যে শরীয়ত পেশ করেছিলেন, তা ছিল বিস্তারিত। অর্থনৈতিক নিয়মনীতি ও তার রূপরেখাও তার মধ্যে শামিল ছিল। এ পর্যায়ে তিনি বলেছিলেনঃ

 

(আরবী**************************************************************************************)

 

তোমরা পূর্ণ করো পরিমাপ এবং ওজন। আর লোকদের কাছে বিক্রয় করা দ্রব্য সামগ্রীতে কম দিয়ে জুলুম করো না। (সূরা আরাফঃ ৮৫)

 

সেই সাথে ছিল সামাজিক রাজনৈতিক নিয়ম-বিধানঃ

 

(আরবী***************************************************************************************)

 

এবং পৃথিবীতে তার সুস্থ, নির্ঝঞ্ঝাট-নির্বিঘ্ন থাকার পরে তোমরা বিপর্যয় অশান্তির চেষ্টা করো না। ….আর প্রতিটি পথে লোকদেরকে নানা ওয়াদা করা থেকে আল্লাহর প্রতি ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর পথে চলতে বাধাগ্রস্ত করো না। (সূরা আরাফঃ ৫৬ ও ৮৬)

 

হযরত শুয়াইব প্রদত্ত এসব মৌল বিদান ছিল তখণকার লোকেরা যে সামাজিক-রাজনৈতিক –অর্থনৈতিক স্তরে বসবাস করছিল, তারই পরিপ্রেক্ষিতে, সেই অনুপাতে।

 

এই স্তরেও বহু লোক তাদের সামষ্টিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জীবন সংস্থা গড়ে তুলেছিল আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের বিধানের ভিত্তিতে। তারা ছিল প্রকৃত মুমিন কিংবা বলা যায় তারা ছিল মুসলিম। ইসলামের সর্বাত্মক রূপতই তাতে প্রতিফলিত। হযরত শুয়াইবের আপন জনগণের মধ্য থেকেই বহু লোক শরীয়তের হেদায়েতের ভিত্তিতে তাদের জীবন গড়ে তুলতে ও পরিচালিত করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে তারা জাহিলিয়াতের মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল। আর এই ইসলাম ও জাহিলিয়াত সেই মান ও স্তরেই অবস্থিত ছিল যার মধ্যে তখনকার মানুষ জীবন যাপন করত।

 

অতঃপর হযরত মূসা (আ)-এর আগমন হল। তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হলো তওরাত গ্রন্থ। তাতে যেমন ছিল হেদায়েত, তেমনি আলো। তাতে এমন আকীধা বিধৃত ছিল যা কখনোই পরিবর্তিত হয় না এবং তা-ওঃ

 

(আরবী*******************************************************************)

 

তোমরা সকলে এক আল্লাহর বান্দা হও, তিনি ছাড়া তোমাদের ইলাহ আর কেউ নেই। (সূরা আরাফঃ ৬৫)

 

তাতে যে শরীয়ত বিবৃত হয়েছিল, তা মানবতার বিকাশ ও ক্রমোন্নতির মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত সমাজ-সমষ্টিতে একটি রাষ্ট্র ও সরকারে রূপান্তরিত হওয়ার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যসম্পন্ন ছিল। তাতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভৃতি জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিধান বিধৃত ছিল। তাতে ক্রয়-বিক্রয়ের আইন ছিল। বিয়ে-তালাকের বিধান ছিল, অপরাধ ও তার দণ্ড উল্লেখিত ছিল, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও নীতি-বিধানেরও উল্লেখ ছিল তাতে।

 

এই স্তরেও বহু মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনকে আল্লাহর শরীয়তের বিধানের ভিত্তিতে সুসংগঠিত করে নিয়েছিল। ফলে এরা ছিল প্রকৃত মুমিন ও মুসলিম। আর অপর কিছু লোক –হযরত মূসার আপনজনের মধ্য থেকেই –শরীয়তের বিধান অনুযায়ী জীবন গঠন ও পরিচালন করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে তারা জাহিলিয়াতের মধ্যেই থেকে গেল। এই ইসলাম ও জাহিলিয়াত উভয়ই সেই সময়কার জনগণের জীবন যাত্রার মান ও স্তরের সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল।

 

অতঃপর প্রেরিত হলেন হযরত ঈসা (আ)। তিনি নিয়ে এলেন আল্লাহর কিতাব ইনজীল। তা তার পূর্বে অবতীর্ণ তওরাত কিতাবের সত্যতা প্রমাণকারী, সত্যতা প্রমাণকারী, সত্যতা ঘোষণাকারী ছিল। তখনকার লোকদের প্রতি যেসব জিনিস হারাম করে দেওয়া হয়েছিল, তাতেও তা হালাল ঘোষিত হলো। আকীদা ও শরীয়ত উভয় দিক দিয়েই তা ছিল তওরাতের পরিপূরক ও পশ্চাদানুসরণ (Follow up)। তখন কিছু লোক তা গ্রহণ ও অনুসরণ করে। এজন্যে তারাই ছিল তখনকার সময়ের মুমিন ও মুসলিম। অন্যরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃত হয়ে জাহিলিয়াতের মধ্যে ডুবে থাকল। এ সময়কার জনগণের জীবন মান ও স্তর অনুপাতেই ইসলাম ও জাহিলিয়াত বিবর্তন-স্তর পরিগ্রহ করেছিল।

 

এরপর এলো দ্বীন-ইসলামের যুগ। দ্বীন হল পূর্ণাঙ্গ, পূর্ণ পরিণত। বিশ্ব মানবতার প্রতি আল্লাহর এই মহানেয়ামত নাযিল হওয়ার কাজটি সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হলো।

 

ইসলাম উপস্থাপিত করল আকীদা ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান –শরীয়ত। আল্লাহর কাছ থেকে আসা সব দ্বীনই এমনি পূর্ণাঙ্গ ছিল। তাতে যেমন অপরিবর্তনশীল আকীদা-বিশ্বাস ছিলঃ ‘দাস হয়ে থাকো একমাত্র আল্লাহর। তিনি ছাড়া আর কেউ তোমাদের মা’বুদ নেই –নয়’। আর শরীয়ত বিবর্তিত হয়ে সর্বশেষ পূর্ণ পরিণত রূপ পরিগ্রহ করল। বস্তুত আল্লাহ তা’আলাই অনাগত বিশ্ব মানবতার জন্যে এই শরীয়তকে আল্লাহ তা’আলা রচনা করেছেন। তাতে জীবনের গভীর সূক্ষ্ম দূরবর্তী খুঁটিনাটি বিষয়েও পূর্ণাঙ্গ হেদায়েত দেওয়া হয়েছে। তা মানবতার পরবর্তী বিবর্তনের সকল স্তর ও পর্যায়ের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল ও চাহিদা পরিপূরণে সক্ষম। তা সেই দিন পর্যন্ত মানুষকে পরিচালনা করবে যেদিন ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর আল্লাহই এই পরিত্যক্ত পৃথিবী ও তার উপর অবস্থিত সবকিছুর উত্তরাধিকারী হবেন। (মানব জীবনের স্থিতি ও বিবর্তন পর্যায়ের বিস্তারি আলোচনাও গ্রন্থকার করেছেন তাঁর স্বতন্ত্র একখানি গ্রন্থে এবং ইসলাম কিভাবে উভয় দিকের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম তাও তিনি তাতে দেখিয়েছেন। প্রমাণ করেছেন যে, জীবন তার বিবর্তনের কোনো স্তরেই ইসলামী ভাবধারা এই আইন-বিধানের আওতার বাইরে যেতে বাধ্য হয় না। এখানে তা উদ্ধৃত করা শোভন হবে না। তবে এ গ্রন্থেও আমরা যথাস্থানে এই পর্যায়ের আলোচনা তুলব)-[এই গ্রন্থটির নামঃ (আরবী**************************) অধ্যায়ঃ (আরবী******************************) পাঠ করুন।]

 

এই পর্যায়েও বহু লোক ইষলামের প্রতি ঈমান গ্রহণ করে মুমিন ও মুসলিম হয়েছেন। আর অন্য লোকেরা তা অস্বীকার করে জাহিলিয়াতের মধ্যেই রয়ে গেছে –সেই সময় থেকেই।

 

বিগত চৌদ্দশ’ বছরে মানুষের জীবন নানাভাবে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়েছে ইসলাম আগমনের পর। আর প্রায় সব ভূখণ্ডেই মানুষ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। তৃতীয় ভাগের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়নি। একভাগে মুসলিম, অপরভাগে জাহিলিয়াতের নিশানবরদার –জাহিল। প্রতিটি জীবনের বিবর্তিত পর্যায়ে অবস্থান করছে। সেই স্তরের মান ও দাবি-দাওয়া অনুপাতেই সব হচ্ছে। কিন্তু যেসব লোক আল্লাহর যথার্থ পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা আল্লাহর হেদায়েত গ্রহণ করতে পেরেছেন ও সেইভাবেই চলেছেন। তাঁরাও জীবনের বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি ব্যাপার পর্যন্ত আল্লাহর শরীয়তকে যথাযথভাবে মেনে চলেছেন। এঁরাই প্রকৃতপক্ষে মুসলিম। কিন্তু যারা আল্লাহর পরিচিতি পায়নি যথাযথভাবে, তারা তাঁর উপস্থাপিত হেদায়েতকেও গ্রহণ করেনি। বাস্তব জীবনে তারা তাঁর শরীয়তকে মেনেও চলছে না। একালে ওরাই জাহিল। জাহিলিয়াত পরিবেষ্টিত। তা প্রচলিত ও নিয়মে বা অন্ধ অনুসরণের মাধ্যমে হলেও। আর ওরা নামকা-ওয়াস্তের মুসলিম হলেও কোনো তারতম্য হয় না।

 

উপরে ইতিহাস থেকেই দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত হয়েছে। আর তা এই সুস্পষ্ট সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে। এ আলোচনা থেকে আমরা নিঃসন্দেহে জানতে ও বুঝতে পারছি যে, মানুষের জীবন দুটি অবস্থার যে কোনো একটির মধ্যে অবশ্যই থাকবেঃ হয় হেদায়েতের পথে, না হয় গুমরাহীর পথে। অন্য কথায়, হয় ইসলাম হবে জীবন ব্যবস্থা, না হয় হবে জাহিলিয়াত। তৃতীয় কিছু হবার নয়।

 

সমস্ত বিবর্তনই বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। তাতেও আবার এক যুগ থেকে অন্য যুগে পার্থক্য ঘটে। কিন্তু সে বিবর্তনও উল্লিখিত দুটি বেষ্টনীর যে কোনো একটির অভ্যন্তরে সংঘটিত হবে, তৃতীয় কিছুই নেই। হয় হেদায়েত, না হয় গুমরাহী; হয় ইসলাম, না হয় জাহিলিয়াত। কিন্তু এই বিবর্তন স্তর নিজেই নির্ধারণ করে না যে, হেদায়েত হবে, কিংবা জাহিলিয়াত হবে। একটি বিবর্তন স্তর যে পথ ধরে চলে তা-ই তার স্থান নির্দিষ্ট করে যে তা হেদায়েতের বেষ্টনীতে হবে কিংবা হবে জাহিলিয়াতের বেষ্টনীতে আর অপরদিক থেকে হেদায়েত মানব জীবনের কোনো নির্র্দিষ্ট পর্যায় নয়, জাহিলিয়াতও নয় কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়। বরং এ দুটির প্রতিটি বিবর্তিত  পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে রয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

 

উপরের ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে যে সব দৃষ্টান্ত আমরা উদ্ধৃত করেছি, এ পর্যায়ের আলোচনায় সেগুলোই আমাদের আসল লক্ষ্য নয়। মূলত আমরা যা বলতে চাই, তা তারই পূর্বাভাস বা ভূমিকা মাত্র। তারই আলোকে আমাদের মূল বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করেছি। প্রকৃতপক্ষে আমরা এখানে আধুনিক জাহিলিয়াতের ইতিহাস পেশ করতে চাই। তা কিভাবে সূচিত হল, তা যে ধারায় অগ্রসর হয়েছে সেই ধারায় অগ্রসর হয়ে বিংশ শতাব্দীতে এসে তা এতটা সাংঘাতিক ও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করল কিবাবে, কোন সব কার্যকারণ তাকে এতটা স্ফীত ও বিরাট করে দিল তা একালের সমস্ত মানুষের সমগ্র বাস্তবতাতে গ্রাস করে ফেলল, আসলে এগুলোই হচ্ছে এ পর্যায়ে আমাদের আলোচ্য।

 

আজকের ইউরোপ সমগ্র পৃথিবীর ওপর বিজয়ী হয়ে আছে। কোথাও প্রত্যক্ষভাবে ইউরোপের উপস্থিতি না থাকলেও সেখানে তারই ফসল আমেরিকা রয়েছে। সরাসরিভাবে না থাকলেও তারই সভ্যতা ও সংস্কৃতি তারই প্রচারিত ভাবধারা, চিন্তাধারা, আকীদা-বিশ্বাস ও মূল্যমান-মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি সারা পৃথিবীতে বিজয় ও সর্বাধিক প্রভাবশালী হয়ে আছে।

 

অথচ এই ইউরোপ-আমেরিকার গোটা ইতিহাসই হচ্ছে জাহিলিয়াতের ইতিহাস। যদিও তার শাখা-প্রশাখা রয়েছে অনেক।

 

ইউরোপের পূর্বে ছিল গ্রীক জাহিলিয়াত এবং তারপরই রোমান জাহিলিয়াত। তারপর ছিল মধ্যযুগীয় বিকৃত ধারণা-বিশ্বাস সম্বলিত জাহিলিয়াত। আর এ শেষকালে ব্যাপক ও সর্বঘ্রাসী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানের জাহিলিয়াত। যা প্রকৃতপক্ষে গ্রীক-রোমান জাহিলিয়াতেরই রূপান্তর। এরই পাশাপাশি রয়েছে ডারউইনের নবোদ্ভাবিত জাহিলিয়াত। ইহুদীদের ধ্বংসাত্মক কলা-কুশলতা ও বুদ্ধিবৃত্তি তাকে অত্যন্ত শাণিত ও মারাত্মক বানিয়ে দিয়েছে।

 

এই গ্রন্থে আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় যেহেতু আধুনিক জাহিলিয়াত, এই কারণে আমরা প্রাচীনতম ও মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াত পর্যায়ে খুবই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হয়ে যাব। সে সংক্ষিপ্ত উল্লেখে অবশ্য আধুনিক জাহিলিয়াত সহজবোধ্য হবে, কেননা আধুনিক জাহিলিয়াত হঠাৎ করে তো আর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। তার শিকড় ইউরোপীয় মাটি ও ইউরোপীয় ইতিহাসের অনেক গভীর বিস্তৃত।

 

বস্তুত গ্রীক জাহিলিয়াত ও রোমান জাহিলিয়াতই হচ্ছে বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল উৎস ও ভিত্তি। স্বয়ং ইউরোপীয় উৎসসমূহ একথা অকপটে স্বীকার করেছে, যদিও তা নিজেকে জাহিলিয়াত বলতে প্রস্তুত নয়। বরং এক নবতর সভ্যতা বলেই বিশ্বসভায় উদাত্ত দাবি জানিয়েছে।

 

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আধুনিক ইউরোপীয় নব জাগরণের মূলে নিহিত রয়েছে ইসলামী সভ্যতার বিরাট অবদান। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে। এই কথাও স্বয়ং ইউরোপীয় উৎসসমূহ নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে তা ইসলামের বিশেস ধারায় চলেনি, অগ্রসর হয়নি, ইসলামী সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত সাধারণ রাব্বানী ধারাকে অবলম্বন করেও সম্মুখে চলেনি। বরং নিজেকে সম্পূর্ণ সার্বতোভাবে গ্রীক রোমান রঙে রঞ্জিত করে নিয়েছে এবং তার প্রাথমিককালীন পৌত্তলিকতার দিকে প্রত্যাবর্তিত ও পরিণত হয়েছে। আর তাকে হালকাভাবে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে খ্রিষ্টীয় ভাবধারা। প্রথমদিকে তাকে ইউরোপীয় গীর্জা ব্যবস্থার অধীন লালিত হতে হয়েছে এবং ক্রমাগতভাবে এই ভাবধারাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গীর্জা ব্যবস্থাকে চূড়ান্তভাবে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে।

 

তাই এই পর্যায়ে বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াতের রূপরেখা বলার পূর্বে গ্রীক ও রোমান-সভ্যতা-সংস্কৃতির স্বরূপ উদঘাটন জরুরী বলে আমরা মনে করছি।

 

গ্রীক জাহিলিয়াত ছিল বিভিন্ন শিল্প, দর্শন, রাজনৈতিক মতবাদ এবং বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ সমন্বিত।

 

এক্ষত্রে তার উত্তরাধিকার বিরাট।

 

আধুনিক ইউরোপ তার উত্থানে-অভ্যুদয়ে গ্রীক উত্তরাধিকারের আতিপাতি করে অনুসন্ধান চালিয়েছে তার প্রতিটি দিকে ও বিভাগে। গ্রীক সভ্যতার অত্যন্ত ব্যাপক ও ফলপ্রসূ অধ্যয়ন করেছে, তার খুঁটিনাটি দিকগুলোও হাতছাড়া করতে প্রস্তুত হয়নি। কেননা ইউরোপের আধুনিককালীন অভ্যুদয়ে তা ছিল একান্তই অপরিহার্য।

 

এই পর্যায়ে মানবীয় চেষ্টা-সাধনার পক্ষে মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ যতটা সম্ভব ছিল, তার বিভিন্ন দিক উদঘাটন ও নব দিগন্তের অন্বেষণে বিনিয়োগ করতে একবিন্দু ত্রুটি করেনি।

 

অবশ্য তাদের জ্ঞান-সাধনার ত্রুটি-বিচ্যুতির অবমূল্যায়ন এবং তাদের চিন্তার মৌলিক ভুল ও বিভ্রান্তি নির্ধারণে আমাদের ওপর বিশেস কোনো দায়িত্ব অর্পিত হয় না। আমরা স্বীকার করব তারা তাদের সর্বশেষ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের এমন কোনো শিক্ষাগুরু ছিল না যে, তাদের বিপথগামিতাকে প্রতিরোধ করবে এবং তাদেরকে নির্ভুল পথে পরিচালিত করবে। যদিও তাদের এই বিপথগামিতা রোধ করা ও তাদের বিকৃতি-বিপর্যয় থেকে ফিরিয়ে আনা কারোরই সাধ্যায়তও ছিল না। তাই আমরা কারোর ওপর দায়িত্ব না চাপিয়ে ও বিভ্রান্তি-বিপথগামিতার জন্যে কারোর দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ না করেই গ্রীক উত্তরাধিকারের বিভ্রান্তির দিকগুলোকে পাঠকদের সম্মুখে তুলে ধরতে চাই। গ্রীকদের এই বিভ্রান্তি একটা স্থায়ী জাহিলিয়াতেরই নিদর্শন। তারই আলোকে আমরা আধুনিক জাহিলিয়াতের রূপরেখাসমূহ স্পষ্ট করে তুলতে অনেক সহায়তা ও আনুকূল্য পাচ্ছি। আধুনিক জাহিলিয়াত তো সেই উত্তরাধিকার থেকেই রস ও খাদ্য গ্রহণ করছে প্রতিনিয়ত।

 

কারোর প্রতি দোষারোপ না করে –সেই প্রাচীনকালীন চিন্তাবিদ দার্শনিকদের বিশেস কাউকে দায়ী না করেই –আমাদের বক্তব্য পেশ করব। আমরা জানি, তাদের চেষ্টার কোনো অন্ত ছিল না সত্য-নির্ভুল পথ লাভ করার জন্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তারা এমন কাউকেই পায়নি যে তাদের নির্ভুল পথের ও লক্ষ্যের সন্ধান দিতে পারত। কিন্তু তাদের এই বিভ্রান্তিকে যারা আকড়ে ধরেছে এবং আধুনিক জাহিলিয়াতে সেগুলোকেই যথাযথ নিয়ে এসছে, বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্যে কোনো চেষ্টাই করেনি, গ্রহণ করেনি কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তাদের আমরা কিছুতেই ছেড়ে দেব না। কেননা গ্রীকদের বিভ্রান্তি যথাযথভাবে গ্রহণ করার মূলে গ্রহণকারীদের মনে বিভ্রান্তির প্রতি তীব্র আসক্তি ছিল বলেই সম্ভব হয়েছিল।

 

যদিও স্বীকার করতে বাধা নেই, গ্রীক উত্তরাধিকারে বহু মূল্যবান ও কল্যাণকর উপকরণ ছিল। যেমন ছিল প্রাচীন মিশরীয় উত্তরাধিকারে, প্রাচীন আরব উত্তরাধিকারে, প্রাচীন পারসিক উত্তরাধিকারে, প্রাচীন ভারতীয় ও চৈনিক উত্তরাধিকারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দুটি ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতাবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না।

 

প্রথম, ইউরোপ আধুনিক জাহিলিয়াত সৃষ্টিতে গ্রীক উত্তরাধিকারকে স্ফীত ও পরিপুষ্ট করে তোলায় খুব বেশী বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। যদিও তা বিদ্বেষী মন-মানসিকতারই ফলশ্রুতি। লোকদের মনে শীর্ষস্থানীয় হওয়ার লোভ এমন অহমিকার সৃষ্টি করেছে, যার ওপর শীর্ষস্থানীয় হওয়া কল্পনাতীত। বরং তা এমন এক শীর্ষস্থানীয় হওয়ার অহমিকায় ডুবে যায়, যা কেবল আল্লাহর প্রেরিত ওহী সম্পর্কেই ধারণা করা চলে, যাকে সত্য বলে মানা যেতে পারে, কিংবা অসথ্য মনে করে অমান্যও করা চলে। বেশির ভাগই অগ্রাহ্য করা হয়। কেননা তা এমন এক সত্যের অপলাপ মাত্র, যার তুলনায় অধিক সত্য কোথাও পাওয়া যেতে পারে না।

 

দ্বিতীয়, এই উত্তরাধিকারের কোনো কোনো দিক সম্পর্কে আমাদের বিস্ময় ঠিক প্রাচীন মিশরীয়, পারসিক, ভারতীয় বা চৈনিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমাদের বিস্ময়ের মতোই। তাই বলে উত্তরাধিকারকে যে নিরংকুশ ও সর্বোচ্চ মূল্য ও মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে, তা মনে করার কোনোই কারণ নেই। প্রত্যেকটি জিনিসকে তার সময়ের মধ্যে রেখে মূল্যায়ণ করতে হয়, তার বাইরে হয়ত তার কোনো মূল্য বা গুরুত্বই স্বীকৃত হবে না। অনুরূপভাবে সেই উত্তরাধিকারকে তার জাহিলিয়াত সঞ্জাত বিভ্রান্তি সহকারে পুনরুজ্জীবিত করতে চাওয়ারও কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। কেননা সে বিভ্রান্তি তো তার একটা অক্ষমতার ব্যাপারও হতে পারে। আর আমরা যদি জাহিলিয়াত থেকে নিষ্ক্রয় হয়ে আলোকের দিকে এসে যেতে পারে তাহলে তার পুনরুজ্জীবনেও আমাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।

 

এই প্রেক্ষিতেই আমরা এখানে গ্রীক জাহিলিয়াতও বলতে পারি। এই জাহিলিয়াতই মানুষ ও দেবতা (বা দেবতাদের) মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের চিন্তা সূচিত –বরং দৃঢ়মূল করে দিয়েছে।

 

‘বহু খোদা’ সংক্রান্ত বিশ্বাসই হচ্ছে সর্বাত্মক জাহিলিয়াতের নিদর্শন। তা প্রাচী জাহিলিয়াত হোক, কি নব্য ও আধুনিক। সে ‘খোদাগণ’ বস্তুগত অনুভবযোগ্য হোক; কিংবা হোক ভাবগত এবং সে বিশ্বাস প্রত্যক্ষ ও সরাসরি স্পষ্ট হোক, কি আনুসঙ্গিক ও অস্পষ্ট। বহুত্বের সেই মূল বিতর্ক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়েও বলা যায়, গ্রীক জাহিলিয়াত মানুষ ও সেসব কল্পিত খোদাগণের মধ্যে অত্যন্ত মারাত্মক ও ক্ষতিকর শত্রুতার চিন্তাকে শক্ত করে বসিয়ে দিয়েছে।

 

তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হচ্ছে ‘পবিত্র আগুনের’ চোর প্রোমিথিউসের কল্পকাহিনী।

 

উপকথার সেই দৃষ্টান্ত হচ্ছে ‘পবিত্র আগুনের’ চোর প্রোমিথিউসের কল্পকাহিনী। সৃষ্টির কাজ করাচ্ছিল। মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর সৌহার্দ্য ও সৌহৃদ্য। তাই সে তাদের জন্যে আকাশমার্গ থেকে পবিত্র আগুন চুরি করে তা তাদেরকে দিয়ে দিল। এজন্যে জিউস তাকে কঠিন শাস্তি দিল। সে তাকে কোহকাফ পর্বত শৃংগে শক্ত শৃঙ্খল দিয়ে বেঁধে রাখল। আর তার ওপর একটা শকুন বসিয়ে দিল। শকুনটি সারাদিন তার কলিজা ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে খাচ্ছিল এবং রাত্রিকালে তা আবার নতুন করে গড়ে উঠছিল। আর তাই দিনের বেলা তাকে নতুন করে শাস্তি ও কষ্টদান সম্ভবপর হতো। এদিকে মানুষের হাতে পবিত্র অগ্নি থাকার অপরাধের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে জিউস পাণ্ডুরাকে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সে-ই ছিল দুনিয়ার বুকে প্রথম নারীসত্তা। তার সঙ্গে ছিল একটি বাক্স এবং তাতে ভর্তি ঝিল প্রজাতি মানব ধ্বংস করার লক্ষ্যে ব্যবহারযোগ্য নানা প্রকারের দুষ্কৃতি। এই পাণ্ডুরাকে বিয়ে করল প্রোমিথিউসের ভ্রাতা এম্পিমিথিউস। সে পাণ্ডুরার হাতে ভগবানের উপঢৌকন বাবদ সেই বাক্সটি গ্রহণ করল। সে সেই বাক্সটি খুললে সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য দুষ্কৃতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং ভূ-পৃষ্ঠকে দুষ্কৃতিতে ভরে দিল। এটাই হল খোদা ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি। একদিকে পবিত্র আগুন –যা জ্বালায়, ভস্ম করে –তা হচ্ছে জ্ঞানের আগুন। মানুষ তা খোদাগণের কাছ থেকে চুরি ও অপহরণ করে নিয়ে আয়ত্তাধীন করে রেখেছে। বিশ্ব প্রকৃতি ও জীবনের তত্ত্বজ্ঞান লাভ করাই এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য। আর তারপরে তারাই দেবতা হয়ে বসবে। আর দেবতারা তো চরম বর্বরতা, হিংস্রতা ও নৃশংসতা সহকারে তাদের ওপর দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে সদা সচেষ্ট। অন্যথায় তাদের শক্তির এককত্ব ও অনন্য ক্ষুণ্ন হয়ে যাবে এবং মানুষ তাদের মোকাবিলায় কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের অধিকারী হয়ে বসবে।[আরবী টীকা****** দ্রষ্টব্য।]

 

ইউরোপ আধুনিক ও নব্য জাহিলিয়াত প্রসঙ্গে বিভিন্ন গ্রীক উপকথার ব্যাপক অবতারণা করেছে। বিশেষ করে এই উপখ্যানটির উল্লেখ হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে। বলেছে, মানুষ তার নিজ সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে এখান থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু করে দিয়েছে। কেননা এর ফলেই তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। জীবন তার কর্মতৎপরতার মৌল কারণ এতেই নিহিত। তার সক্রিয়তার যৌক্তিকতাও তারই দরুন স্বীকৃত। আর আল্লাহর নাফরমানী –আল্লাহদ্রোহীতাই হচ্ছে মানবীয় সক্রিয়তা –ইতিবাচকতা ও আত্ম-প্রতিষ্ঠার অকাট্য দলীল।

 

এ পর্যায়ে আমরা আধুনিক জাহিলিয়াত সম্পর্কে কোনো পর্যালোচনা করছি না। এখানে গ্রীক জাহিলিয়াতের বিভিন্ন রূপ ও রঙের উল্লেখ করছি মাত্র। উত্তরকালে তা ইউরোপীয় চিন্তা-ভাবনায় কিভাবে অনুপ্রবেশ করেছে ও বিষক্রিয়ায় জর্জরিত করে দিয়েছে, তা এই আলোকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে।

 

সত্য কথা, এ এক বীভৎস বিপথগামীতা ও বিপর্যয়। এদিক দিয়ে আমার জানামতে গ্রীক জাহিলিয়াত সম্পূর্ণরূপে একক খোদা থাকার ধারণা গ্রহণ করেছে। সে সবের কতক খোদাকে অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির বলে কল্পনা করেছে। দুষ্কৃতি ছাড়া সে সবের আর কোনো কাজই যেন নেই। আর মানুষের ওপর দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ এবং নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীনভাবে ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টিই যেন তাদের প্রতিমুহুর্তের ব্যস্ততা। কিন্তু গ্রীক জাহিলিয়াত একক ভাবেই মানুষ ও দেবতাগণের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্যে এই বিশেষ রূপ ধারণ করেছে মানুষের সক্রিয়তা ও ইতিবাচকতা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে। ফলে মানুষের ওপর নেমে এসেছে মহা ধ্বংস ও অবিযানের জগদ্দল পাথর। এই বিশ্বাস গ্রহণ ব্যতীত মানুষও যেন তার সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না। আর তার মন আল্লাহর সাথে সন্ধি করতে কখনোই প্রস্তুত হতে পারছে না। এই কারণে তার মনের অভ্যন্তরে তার স্বভাবগত আত্ম-প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত আগ্রহ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার স্বভাবগত প্রবণতা ও তাগিদের মধ্যে কখনোই কোনো সামঞ্জস্য স্থাপিত হতে পারছে না।

 

গ্রীক জাহিলিয়াত রূহের পরিবর্তে বিবেক-বুদ্ধিকে অত্যন্ত মহান ও পবিত্র মনে করিয়াছে। আধুনিক জাহিলিয়াত মনে করছে, গ্রীক জাহিলিয়াতই মানব সত্তার বিকাশ, পবিত্রতা, ইতিবাচকতা, উচ্চতর মূল্য ও মর্যাদা, তার প্রাণশক্তির উচ্চমানতা এবং জীবনে তার উচ্চতর মূল্যমান প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ তা-ই মানুষের বহু উচ্চতর ও বিরাটতর দিককে সম্পূর্ণ অর্থহীন ও তাৎপর্যশূন্য করে দিয়েছে। আর তা হচ্ছে মানুষের ‘রূহ’ বা আত্মার দিকটি। তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ মাত্র করা হয়নি, কিছুমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিবেক-বুদ্ধিকে এবং তাকেই বানিয়ে দেওয়া হয়েছে মানুষের শ্রেষ্ঠ প্রভু বা নেতা –চালক।

 

অস্বীকার করার উপায় নেই, বিবেক-বুদ্ধি অত্যণ্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবীয় শক্তি তার পূর্ণমাত্রার যথার্থ ভূমিকার ফলেই মানবীয় সত্তা, মানুষের ক্রিয়াশীলতা এবং এই বিশ্বলোকের ইতিবাচকতা সম্ভবপর। কিন্তু কেবল তারই প্রতি ঈমান স্থাপন এবং ‘রূহে’র পরিবর্তে সব গুরুত্ব কেবল তারই ওপর আরোপ করা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, তা এমন এক জাহিলী বিপথগামিতা, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের মূল্য ও মর্যাদাকে নগণ্য ও হীন বানিয়ে দেয়। তখন সে এক বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন জন্তু হয়ে দাঁড়ায়। গ্রীক দর্শন মানুষ সম্পর্কে এই ধারণাই দিয়েছে। অথচ সত্য কথা এই যে, মানুষ জন্তু নয়, জীবজন্তুর বাইরে স্বতন্ত্র এক প্রজাতি হচ্ছে এই মানুষ, তার গোটা সত্তাই অত্যন্ত উচ্চতর, মহিমান্বিত। তা কেবল তার বিবেক-বুদ্ধির বদৌলতেই নয়, তার সকল দিক সমভিব্যবহারে, তার পূর্ণত্ব ও সকল যোগাযোগ সম্পর্কশীলতা সহকারেই সে অত্যন্ত উঁচু মর্যাদার সত্তা। আকার-আকৃতিতেও মানুষ একক। তার এ সব বিশেষত্ব কেবল মানুষের মধ্যেই রয়েছে, মানুষ ছাড়া আর কোথাও তা পাওয়া যেতে পারে না।[(আরবী টীকা*********) দ্রষ্টব্য।]

 

মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিকে ‘রূহ’ বা আত্মার পরিবর্তে অথবা মানুষের স্বজ্ঞার বিনিময়ে অত্যধিক পবিত্র মনে করার ফলেই গ্রীক জাহিলিয়াতে সকল প্রকার বিপথগামিতার উদ্ভব হয়েছে। ফলে বিবেক-বুদ্ধি যা ধারণ করতে অক্ষম হবে, মানুষ তাকে কখনোই গণ্য বা গ্রাহ্য করতে প্রস্তুত হবে না। আর তার বিবেক-বুদ্ধি যতটা ধারণ করতে সক্ষম হবে –স্বয়ং আল্লাহর সত্তাও তার মধ্যে গণ্য –ঠিক ততটাই গ্রহণ করবে। তার বাইরে কোনো কিছু আছে বলে ভাবতেও কখনও প্রস্তুত হতে পারে না।[অথব আল্লাহ তাঁর নিজ সম্পর্কে বলেছেনঃ (আরবী*************************************) দৃষ্টিসমূহ তাকে ধারণ করতে পারে না। তিনিই দৃষ্টিসমূহকে আয়ত্তাধীন করেন। তিনি অতীব সূক্ষ্ম, সর্ববিষয়ে অবহিত। বলেছেনঃ (আরবী***********) তাঁর মতো কেউ নেই, কিছু নেই। খোদায়ী মহাসত্য সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে গ্রীক দর্শন মারাত্মক রকমের ভুল করেছে। নিতান্তই আজে বাজে কথা বলেছে। তা বলেছে অক্ষম মানবীয় বিবেক-বুদ্ধির ধারণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকে। আর এভাবে জ্ঞানের যে ফসলই ফলানো হবে, তা অর্থহীন, বাতিল হতে বাধ্য। মানুষের জীবনের বাস্তবতার ওপর তা কোনো প্রভাবই ফেলতে পারবে না, তাতো আছেই আকীদা-বিশ্বাসেও কোনো স্থান হবে না তার। কেননা কোনো মানুষই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না তার দার্শনিক মানসিক পরীক্ষার ফলস্বরূপ। ইতিহাসে কোনো উন্নত সমাজ বা মুমিন ব্যক্তি গড়ে তুলতে তা কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারে না।] মানবীয় আত্মা যে আল্লাহকে ধারণ করে, বিশ্বাস করে, গ্রীক চিন্তার ফসলে তা অত্যন্ত প্রভাবহীন। পরবর্তীতে আধুনিক জাহিলিয়াতেও আত্মার অনুভূত আল্লাহর কোনো স্বীকৃতি নেই।

 

এই ধরনের বিমূর্ত মানসিক ধারণাসমূহ দ্বারাই গ্রীক দর্শন ভরপুর হয়ে আছে। বিবেক-বুদ্ধিকে অস্বাভাবিক গুরুত্ব দেওয়ার অনিবার্য ফলশ্রুতিই হচ্ছে তাই। ইউরোপের মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতের শক্তি নিঃশেষিত হওয়ার মূলেও রয়েছে বিবেক-বুদ্ধির প্রতি এই বাড়াবাড়িপূর্ণ গুরুত্বারোপ। শেষ পর্যন্ত তাই বাস্তব অভিজ্ঞতাজাত ধর্মমতের সৃষ্টি করেছে, যা এককালে মুসলমানদের কাছ থেকেই গৃহীত হয়েছিল। এ বিসয়ে আমরা পরে আলোচনা করছি।

 

আর এরই ফলে নৈতিকতা একটা মানসিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। বাস্তব কর্ম জীবনে তাকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একথা সত্য যে, গণতান্ত্রিক গ্রীক তার নাগরিকগণকে সুনির্দিষ্ট সামষ্টিক বিশেষত্ব ও মূল্যমানের ওপর গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা কেবলমাত্র বিবেক বুদ্ধির জোরে যতটা সম্ভব ছিল ততটাই। ফলে যৌন অরাজকতার ব্যাপারে নৈতিকতার বোধ আয়ত্ত করা তার পক্ষে অসম্ভব রয়ে গেছে। সেজন্যে কোনো নিয়ম-বিধি না দিয়েই তাকে অবাধ ও অপ্রতিরোধ্য করে ছেড়ে দিয়েছে। আর তাই হয়েছে তার চূড়ান্ত ধ্বংসের মৌল কারণ।

 

গ্রীক জাহিলিয়াতের বিপর্যয় ও বিপথগামীতার এ হচ্ছে অতীব সামান্য নমুনা। আমরা এসবের সংক্ষিপ্ত উল্লেখের মাধ্যমেই দ্রুতাতা সহকারে সম্মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কেননা এ আলোচনায় আমাদের লক্ষ্য নিবদ্ধ নয়, তা আমরা আগেই বলেছি। এ পর্যায়ে আমরা এমন সব সত্যকে তুলে ধরে সামনের দিকে বেরিয়ে যেতে চাই যা আধুনিক জাহিলিয়াতের এবং ইতিহাসের সব কয়টি জাহিলিয়াতের আলোচনায় আমাদের যথেষ্ট সহায়তা ও আনুকূল্য দিতে পারবে।

 

প্রথম কথা, যে কোনো জাহিলিয়াতে কোনো বিশেষত্ব, বিশেষ কোনো গুণপনা বা উচ্চতর উৎপাদনের অবস্থিতি কোনো বিস্ময়কর বা অসম্ভব ব্যাপার নয়। সম্ভভত কোনো জাহিলিয়াতই এই দিক দিয়ে একান্তভাবে শূন্য হয়ে থাকে না। কিন্তু তা একথা প্রমাণ করে না যে, সে জাহিলিয়াত জীবন্ত ও সুস্থ অবস্থায় রয়েছে।

 

একথারও দাবি করা চলে না যে, তা সর্বকালে অবশ্যই অনুসরণযোগ্য বা তা থেকেও কিছু গ্রহণীয় থাকতে পারে।

 

দ্বিতীয়, কোনো জাহিলিয়াতে উক্ত বিশেষত্ব, উত্তম গুণপনা ও উন্নত শুভফল থাকলেই তা জাহিলিয়াত হওয়ার কলংক থেকে মুক্ত হবে এমন কথা বলা চলে না। কেননা তার মধ্যে নিহিত বিকৃতি ও বিপথগামিতাই এসব বিশেষত্ব, শুভ গুণপতা ও উন্নতমানের ফল শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট ও ধ্বংস করে দেবে, তাতে সন্দেহ করার কোনো উপায় নেই।

 

তৃতীয়, এসব বিকৃতি বিপর্যয় ও বিপথগামিতার প্রধান কারণই হচ্ছে এই যে, এই জাহিলিয়াত সর্ব বিষয়ে স্বীয় খাহেশ-কামনা-বাসনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কিংবা করে সংকীর্ণ মানবীয় জ্ঞানের বলে। …..এ দুটি মূলত এক ও অভিন্ন। কেননা তা আল্লাহর হেদায়েত জানে না, চিনেও না। অথবা বলা যায়, হয়ত চিনে ও কিছু না কিছু জানেও। কিন্তু তা অগ্রাহ্য করে অন্য কিছুর সন্ধানে উন্মুখ হয়ে থাকে।

 

অতঃপর আমরা গ্রীক জাহিলিয়াতের ন্যায় রোমান জাহিলিয়াত সম্পর্কে বক্তব্য পেশ করার উদ্যোগ নিচ্ছি।

 

রোমান জাহিলিয়াতও বস্তুবাদী জাহিলিয়াত। ইন্দ্রিয়নিচয় কেন্দ্রিক জাহিলিয়াত। তবে এ জাহিলিয়াত এমন অনেক জিনিস নতুন উদ্ভাবন করেছে, যা মানুষের জন্যে কল্যাণকর, সন্দেহ নেই। এর পূর্বে গ্রীক জাহিলিয়াতও অনেক কিছু নতুন উদ্ভাবন করেছিল। এ ক্ষেত্রে উভয়ের ভূমিকা অভিন্ন।

 

বিচিত্র ধরনর সংগঠন –রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সামরিক ও নাগরিক সংগঠন রোমান সভ্যতারই উদ্ভাবন।

 

নাগরিক জীবন –‘নগর সভ্যতা’ তারই উদ্ভাবিত। তার অর্থ বস্তুগত উপায় উপকরণ ও বস্তুনিষ্ট উৎপাদনকে মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ ও ব্যবহার। সে সবের দ্বারা জীবন সহজ ও যাপনযোগ্য বানানো। এজন্যেই সড়ক-পুল নির্মাণ, জলধারা, পয়ঃপ্রণালী, বিবাহের ক্ষেত্র ও খেলার মাঠে তৈরী প্রভৃতি এরই সাথে জড়িত।

 

একটু উপরেই আমরা বলে এসেছি, কোনো জাহিলিয়াতই কিছু না কিছু কল্যাণের দিক নিয়ে থাকে। সেই সাথে একথাও বলেছি যে, এই অপেক্ষাকৃত কল্যাণ জাহিলিয়াতকে বিপর্যয়-বিকৃতি ও বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে না, রক্ষা করতে পারে না, আর তারই ফলে তার চূড়ান্ত ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়।

 

রোমান জাহিলিয়াতের সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক বিপর্যয় হচ্ছে তার বস্তুনিষ্টতা। বস্তুর ওপর প্রচণ্ড বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা। ‘রুহ’ বা আত্মা সেখানে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত। সেখানে অস্তিত্ব কেবল ‘বস্তুর’ –বস্তুগত। বস্তুই সব, বস্তুর বাইরে সেখানে কিছুই নেই,। কিছুই স্বীকৃত নয়। বস্তুগত অস্তিত্বও তা যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, তা কিছুই নয়, তার অস্তিত্বই নেই। সামান্য থাকলেও তা ধর্তব্য নয়। এর ফলেই রোমানদের জীবনে আকীদা-বিম্বাসের দিক অত্যন্ত স্থূল ও গভীরতা শূন্য হয়ে পড়েছে।

 

রোমান জাহিলিয়াতের অত্যন্ত বড় বিপর্যয়ের অনুরূপ একটি দিক হচ্ছে ইন্দ্রিয়গাহ্য জগতের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ, ইন্দ্রিয়গত স্বাদ আস্বাদন। এ কারণেই রোমানরা লাম্পট্য ও অনৈতিকতার অতল সাগরে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়েছিল যে, তার কেননাসীমা-পরিসীমা ছিল না। তারা যৌন স্বাদ-আস্বাদন সামগ্রীর প্রতি সীমাতিরিক্তভাবে লোলুপ হয়ে পড়েছিল। এ ক্ষেত্রে তাদের ঔদার্য ও বাধাহীনতা চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে স্বাদ গ্রহণের জন্যে তারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে, রক্তের বন্যা প্রবাহিত করেছে, নির্মম নিপীড়ন চালিয়েছে, লাশের দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিকৃত করেছে। এ সবই করেছে পাশবিক খেলায় মেতে গিয়ে। আর এই রক্তাক্ত ঘটনা দুই চোখ মেলে আনন্দ লাভ করার জন্যে বিরাট জনসমাবেশ ঘটিয়েছে, আর এরূপ অনুষ্ঠানের জন্যে  তারা দুই হাতে উদরভাবে পয়সা খরচ করেছে। আর যাদুমন্ত্রে বিমোহিত যেসব ব্যক্তিকে হত্যা ও মৃত্যুর উৎসবে আত্মহুতি দেওয়ার জন্যে উপস্থিত করা হয়েছিল, তারা তরবারি ও খঞ্জর হাতে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরস্পরের পেট ছিন্ন করছিল, রগ, নাড়ি-ভুঁড়ি কেটে দিচ্ছিল, পরস্পরের রক্তের লাল বন্যা প্রবাহিত করছিল। আর রোমান সমাজপতিরা নিতান্ত পশু হয়ে এই বীভৎস দৃশ্য দুই চোখ মেলে দেখে দেখে আনন্দ ও সুখ-রস পান করছিল। এই আনন্দ উৎসবের শেষে যখন পাশবিক মৃত্যু-উৎসব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছত, তখন দেখা যেত যে, দুজনের একজন বা দুজনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, পুঞ্জিত রক্তে প্রাণহীন লাশ ভাসছে।

 

এই জাহিলিয়াতের আর একটি বড় ধরনের বিকৃতি ও বিপথগামিতা হচ্ছে প্রখ্যাত রোমান ‘সুবিচার’। সে সমাজে ন্যায়বিচার ছিল একান্তভাবে রোমানদের জন্যে। কেবল তারাই ছিল ন্যায় বিচার পাওয়ার একমাত্র অধিকারী। তারাই লাভ করত তার সমস্ত সুফল। তাদের ছাড়া অন্যরা সব ক্রীতদাস –দাসানুদাস মাত্র। বিশাল মহান রোমান সাম্রাজ্যের অধীন রোমানদের ছাড়া আর সবাই অধীন প্রজাসাধারণ, দাসানুদাস মাত্র। তাদের কোনো অধিকার নেই, নেই ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো অধিকার। তাদেরকে শুধু কর্তব্য করে যেতে হবে। শাসকদের পক্ষ থেকে তাদের ওপর যা অবশ্য কর্তব্যরূপে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, চোখ-কান-মুখ বুঁজে তারা শুধু তা-ই করে গেছে।

 

রোমান জাহিলিয়াতের বিরাট অধ্যায় থেকে এ তো অতি সামান্য –যৎকিঞ্চিত মাত্র। বিশ্ব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তা স্বর্ণের অক্ষরে (?) লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

 

উপরের ঐতিহাসিক আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা মধ্যযুগে পৌঁছে গেছি। এখানে এসে আমরা এক অভিনব ধরন ও প্রকৃতির জাহিলিয়াতের সম্মুখীন হই। তা হচ্ছে ভিত্তিহীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাসের জাহিলিয়াত। আমেরিকান গ্রন্থকার ড্রীপার তাঁর ‘ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব’ নামের গ্রন্থে লিখেছেনঃ

 

খ্রিষ্ট ধর্মে শিরক ও পৌত্তলিকতা অনুপ্রবেশ করল সে সব মুনাফিকের প্রভাবে, যারা রোমান রাষ্ট্রের উচ্চতর পদে আসীন হয়ে মোটা বেতন গ্রহণের মহা সুযোগ লাভ করেছিল। তারা বাহ্যত নিজেদের খ্রিষ্টান বলে পরিচয় দিত বটে; কিন্তু আসলে ধর্ম-কর্মে তাদের কোনোই অংশ ছিল না। সেজন্যে একটি দিনও তারা একান্তভাবে ব্যয় করেনি। কনস্ট্যানটাইনও এদেরই একজন ছিল। সে তার গোটা জীবনই অতিবাহিত করেছে অত্যাচার নিপীড়ন ও যৌন-উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্য দিয়ে। গীর্জার ধর্মীয় দায়িত্ব সে কখনোই পালন করেনি। তবে শেষ জীবন অতি সামান্য কিছু (৩৩৭ পৃঃ)।

 

খ্রিষ্টান সমাজ যদিও তখন ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেছিল যে, তারা কনস্ট্যানটাইনকে বাদশাহ বানাতে সক্ষম হয়েছিল; কিন্তু সে পৌত্তলিকতার লেজুড় কাটতে ও তার জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি। তার সম্মুখীন হওয়ার কারণে খ্রিষ্ট ধর্মের মৌলনীতিতেই পৌত্তলিকতা সংমিশ্রিত হয়ে গেল। ফলে একটা নবতর ধর্মমত গড়ে উঠল। তাতে খ্রিষ্টবাদের পাশাপাশি সমান মাত্রায় রয়েছে পৌত্তলিকতা। দ্বীন-ইসলাম এখান থেকেই খ্রিষ্টবাদ থেকে ভিন্নতর হয়ে গেছে। ইসলাম পৌত্তলিকতাকে নির্মূল করেছে এবং কোনোরূপ অস্পষ্টতা ও সংমিশ্রণতা ব্যতিরেকেই উজ্জ্বল খালেস তওহীদী আকীদা পেশ করেছে।

 

এই সাম্রাজ্যবাদটি ছিল মূলত দুনিয়ার দাস। তার ধর্মীয় আকীদা বিশ্বাস একবিন্দু সুবিন্যস্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না। তা তার ব্যক্তিগত কল্যাণ এবং খ্রিষ্টীয় ও পৌত্তলিকত –এই দুই পরস্পর সাংঘর্ষিক আকীদা-সম্পন্ন জনসমষ্টির কল্যাণে এই দুটিকে একত্রিত করা এবং এ দুটির মধ্যে পূর্ণ মিল সৃষ্টি করা জরুরী মনে করেছিল। এমন কি দৃঢ় আকীদাসম্পন্ন খ্রিষ্টানরাও এই চেষ্টাকে অস্বীকার বা প্রতিরোধ করার প্রয়োজন মনে করল না। সম্ভবত তারা মনে করছিল যে, এই নতুন ধর্ম যদি প্রাচীন পৌত্তলিক মতে সমৃদ্ধ হয় তা হলে খুক আকর্ষণীয়, উন্নত মানের এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ কাজ হবে এবং খ্রিষ্ট ধর্ম শেষ পর্যন্ত পৌত্তলিকতার মলিনতা ও কলংক থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।[সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী লিখিত (আরবী**************) দ্রষ্টব্য।]

 

উপরে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টান লেখকের যে সাক্ষ্য উদ্ধৃত হয়েছে, আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট একথা প্রমাণের জন্য যে, ইউরোপের সহীহ আকীদায় মারাত্মক রকমের বিকৃতি ও বিপথগামিতা সংঘটিত হয়েছিল। অতঃপর বিস্তারিত কিছু তালাস করে বেড়ানোর কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় জাহিলিয়াত জীবনের বাস্তবতার যে ব্যাপক বিপর্যয় ও বিকৃতি সংঘটিত হয়েছিল এবং বাহ্যত যদিও তারা ধর্মের শীতল ছায়ায় জীবন যাপন করত, কিন্তু কার্যত তা ছির অন্তঃসারশূন্য, তা দেখাবার জন্যে  উক্ত উদ্ধৃতিই যথেষ্ট।

 

বস্তুত খ্রিষ্টীয় ধর্ম আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ অন্যান্য ধর্মের ন্যায় আকীদা ও শরীয়ত বাস্তব জীবনের বিধান সমন্বিত ছিল। যদিও তা বিস্তারিত ও খুঁটিনাটিসহ কোনো বিধান নিয়ে আসেনি। তারও কারণ এই যে, খ্রিষ্ট ধর্মের শরীয়ত মূলত ছিল ‘তাওরাত’ ভিত্তিক, তওরাতের ভিত্তিতেই তার শরীয়ত গড়ে উঠেছিল। যদিও তাতে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছিল, যা ঈসার প্রতি নাযিল হয়েছিল ইনজীল গ্রন্থে। এই ইনজীল তার পূর্ববর্তী ‘তওরাত’ নিহিত বিধানেরই সত্যতা প্রমাণকারী –সত্যতা ঘোষণাকারী গ্রন্থ ছিল। তার কারণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছেঃ

 

(আরবী****************************************************************************)

 

যেন আমি হালাল করে দেই এমন কতক জিনিস যা ইতিপূর্বে তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছিল। (সূরা আলে-ইমরানঃ ৫০)

 

ফলে খ্রিষ্ট ধর্ম সম্পর্কে স্বাভাবিক ধারণা এই ছিল যে, তওরাতে অবতীর্ণ আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ীই বিচার-ফয়সালা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সেই সাথে অবশ্য রক্ষিত হবে সে সব ব্যতিক্রমধর্মী বিধান, যা ইনজিল গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।

 

কিন্তু কার্যত তা ঘটেনি। মধ্যযুগে ইউরোপে গীর্জা প্রভাব বিস্তার করার জন্য যত চেষ্টাই করে থাকুক, সেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ের আইনের বাইরে খোদায়ী শরীয়ত বাস্তবায়িত হয়নি এবং বাস্তব জীবনের বিরাট অংশের ওপর খোদায়ী শরীয়তের কোনো প্রভাব ছিল না। তার পরিবর্তে রোমান আইনই ছিল কার্যকর। অন্য কথায় বললে বলা যায়, প্রাচীন রোমান জাহিলিয়াতই অত্যধিক প্রভাবশালী হয়েছিল তখনকার মানুষের ওপর।

 

ফলে ধর্ম ও বাস্তব জীবনের মধ্যে বিরাট পার্থক্যের সৃষ্টি হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের ধ্যান-ধারণায় বিজয়ী ধর্ম অনুপ্রবেশ লাভ করলেও ইউরোপের মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতে একটা বিপদের লক্ষণ প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল। অবশ্য তাও মারাত্মক কিছু ছিল না।

 

একদিকে গীর্জা জনগণের মন-মানসিতকা ও আচার-আচরণের ওপর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু তা বাস্তব জীবনে রোমান আইন তার স্থান দখল করার মতো শক্তি পায়নি কখনোই। গীর্জা এই আধিপত্যের সূত্রে এতদূর বিস্তার লাভ করে যে, তা সকল যুক্তিসঙ্গত সীমাকে অতিক্রম করে যায়। পাদ্রী-পুরোহিতরা নিজেদের জন্যে আকাশমণ্ডলীয় কর্তৃত্ব আয়ত্ত ও একান্ত করে নিয়েছিল। আর তা বিন্দু বিন্দু করে সঞ্চিত ও মওজুদ করছিল। তাতে এমন কাউকেই তারা প্রবেশাধিকার দিত না; যাদের প্রতি তারা সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের মনোনীত ব্যক্তিরাই তাতে প্রবেশ করার অধিকার বা অনুমতি পেত। যারা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল, তারাও। এদের বাইরের সব লোকই তাদের সন্তুষ্টি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েই ছিল।

 

অন্যদিকে গীর্জা জনগণের ওপর নানাবিধ কর ধার্য করে যাচ্ছিল। তা যেমন অর্থনৈতিক ছিল, তেমনি ছিল বিবেক-বুদ্ধিগত ও নিদারুণ চাপ সৃষ্টিকারী আধ্যাত্মিকও। ব্যবসায়ী কর, মালিকত্বের কর (Royalty) এবং গীর্জার মালিকানাধীন ভূমিতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদান এবং বিদ্রোহী রাজা-বাদশাহদের শিক্ষাদানমূলক যুদ্ধে সৈন্য হিসেবে ভর্তি গ্রহণের কাজ করতে জনগণ একান্তভাবেই বাধ্য ছিল। আর এ-ই ছিল গীর্জার কল্পিত কর্তৃত্ব ও আধিপত্য দাস জনগণের ওপর। তাতে ধর্মীয় পদাধিকারী ব্যক্তিদের সম্মুখে অপমানকর বিনয় গ্রহণ ছিল অপরিহার্য। মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করতে হতো যে কোনো পাদ্রী ব্যক্তির গমনাগমন কালে। এ এক ভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। যে সব বিলুপ্তপ্রায় পচা-গলা জ্ঞানগত চিন্তা বিশ্বাস গ্রহণের জন্যে গীর্জা জনগণকে নির্দেশ করত, তাও গ্রহণ করতে হতো তাদের। কেউ তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি হলে তার ওপর সবকিছু থেকে বঞ্চিত থাকার শাস্তি কার্যকর করা হতো। অথবা এমন দৈহিক নিপীড়ন চালানো হতো, যার ফলে নির্ঘাৎ মৃত্যুবরণ করতে হতো। এই অত্যাচারী স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্যের এ ছিল তৃতীয় রূপ। কিন্তু উত্তরকালে চারদানভ –ব্রোনো, কোপারনিকাস ও গ্যালিলিওর দার্শনিক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যখন গীর্জা প্রচারিত ভ্রান্ত-ভিত্তিহীন মতবাদসমূহ বাতিল প্রমাণ করেছিল, তখন গীর্জা তাদের ওপর অমানুষিক আযাত ও নির্যাতনের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে লাগল। যার দরুন তারা হয় মৃত্যুবরণ করল, না হয় গীর্জা বিরোধী মত পরিহার করতে বাধ্য হলো।

 

প্রতিষ্ঠিত জাহিলিয়াত ধর্মের নামে এসব করেই ক্ষান্ত থাকেনি। তা আরও অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে এবং তা ঘটল তখন যখন ‘রাহবানিয়াত’ –বৈরাগ্যবাদ সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে উপাসনা আরাধনায় আত্মনিয়োগ করাকে একান্তভাবে গ্রহণ করল। শুরুতে তা তাদের জন্যে বিধান থাকলেও তা ছিল ইচ্ছামূলক, কর্তব্য ছিল না। যেমন কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী***************************************************************************************)

 

এবং বৈরাগ্যবাদ, তারা নিজেরাই তা উদ্ভাবিত করেছে। আমরা তা তাদের জন্যে ফরয করে দেইনি। (সূরা হাদীদঃ ২৭)

 

এ বৈরাগ্যবাদ এমন পতনের দিকে বিবর্তিত হলো যে, তাতে সর্বপ্রকারের নৈতিক অপরাধ করাও অবাধে চলতে লাগল। পুরুষ বৈরাগী ও মেয়ে বৈরাগীর (?) একত্রিত জীবন কলুষতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখাল। এই পর্যায়ে কুরআনের উক্ত আয়াতের পরবর্তী কথা স্মরণীয়ঃ

 

(আরবী***************************************************)

 

তাদের জন্যে ফরয করা বিধান ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি সন্ধান। তারা তা যথাযথভাবে বহাল রাখতে পারেনি। (সূরা হাদীদঃ ২৭)

 

এরপরই তারা ইতিহাসখ্যাত ‘ক্ষমার সনদ’ বিক্রয় করতে শুরু করে, যা ছিল অত্যন্ত হাস্যকর। ফলে ধর্মের ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে হাসি ও ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্রে পরিণত হলো। তার মাহাত্ম্যও কিচু থাকল না, থাকল না কোনো সত্যতা। নিছক খেল-তামাসার ব্যাপার, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও বাটপারিই মুখ্য হয়ে দাঁড়াল।

 

এ হচ্ছে ইউরোপের মধ্যযুগে প্রতিষ্ঠিত জাহিলিয়াত সমষ্টিরই সারনির্যাস। তা-ই শেষ নয়, তারপরও বহু কিছু আছে-

 

আমরা এই গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়ে আধুনিক জাহিলিয়াত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করব, ধ্যান-ধারণার দিকটিও উপস্থিত হবে, তুলে ধরা হবে তার বাস্তব রূপরেখা। এ পর্যায়েও আমরা ইতিহাসের ধারাকেই অবলম্বন করে অগ্রসর হব।

 

আধুনিক ইউরোপের অভ্যুদয় ঘটেছিল ধর্মের সাথে সম্পর্কহীনভাবে, ধর্মের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে, তা থেকে অনেক দূরে থেকেই ধর্মের প্রতি শত্রুতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, এতটা অবশ্য আমরা বলতে চাইনে।

 

আর তদানীন্তন ইউরোপীয় পরিবেশ পরিপ্রেক্ষিতে তা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। যদিও অবস্থার দিক দিয়ে তাই যথার্থ ও কাম্য ছিল না।

 

এই মধ্যযুগেই খ্রিষ্টবাদ ও ইসলামের মধ্যে ক্রুশ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

 

তখনকার ইউরোপ যদিও প্রকৃতপক্ষে খ্রিষ্টবাদী –খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী ছিল না। পূর্বোদ্ধৃত আলোচনায়ই আমরা তা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এই খ্রিষ্টবাদের নামে আত্মম্ভরিতা ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে ঐক্যবদ্ধতা তখন কিছুমাত্র নিষিদ্ধ ছিল না। সে যুদ্ধ অনেক ক্ষেত্রে হীন পাশবিকতার সীমাও ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর হিংসা-বিদ্বেষ ছিল ক্ষয়িষ্ণু ধার্মিক মনের অনিবার্য প্রতিক্রিয়া। কেননা প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি কখনোই হিংসুক বা বিদ্বেষী হয় না; সাধারণত আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া যে কোনো হেদায়েত গ্রহণে তার কোনা কুণ্ঠা বা দ্বিধা থাকতে পারে না। কিন্তু তখনকার খ্রিষ্ট ধর্ম আসলে প্রকৃত কোনো ধর্মই ছিল না।

 

ব্যাপার যাই থাক না কেন, আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ ও তাঁর পদ্ধতি অবলম্বনের বিরাট সুযোগ ইউরোপকে দেওয়া হলেও তা করতে তারা অস্বীকার করেছিল। তারা তাদের উদ্ভাবিত জাহিলিয়াতের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকার ওপরই অবিচল হয়ে থাকল।

 

কিন্তু ব্যাপার এ পর্যন্ত এসেই থেমে গেল না। তথায় এমন অনেক কার্যকারণই ছিল, যা খুব দ্রুত সামনের দিকে যাওয়ার জন্যে শক্তভাবে ধাক্কা দিচ্ছিল। কিন্তু সে সম্মুখে কোনো পথে?

 

মুসলিম জাহানের সাথে ক্রুশধারীদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ ইউরোপীয় জীবনের মূলের ওপর কঠিন আঘাত হানছিল এবং সমূলে উৎপাটিত করে ফেলার উপক্রম হচ্ছিল। অবশ্য পাশ্চাত্যে –আন্দালুসিয়ায় –ইসলামের সাথে ইউরোপের মিলন ঘটাটা আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 

ব্রিফল্ট তাঁর Making of Humanity গ্রন্থে লিখেছেনঃ

 

‘আধুনিক জগতে আরব ইসলামী সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল জ্ঞান বিজ্ঞান’।[ইতিহাস আরবের ইসলামী সভ্যতা ছাড়া অপর কোনো বিশিষ্ট সভ্যতার সাথে পরিচিত নয়। আর ইসলামী সভ্যতা আরব সভ্যতা ছিল না। আরবে যে সভ্যতার উদ্ভব হয়, তা সরাসরি ইসলামের ফসল। সে সভ্যতার সব উপাদানই ইসলাম প্রদত্ত। তা ইসলামী প্রকৃতির ধারক ছিল, আরব প্রকৃতির নয়। এ সভ্যতা যে বহু সংখ্যক উপাদানে গড়ে উঠেছিল, ইসলামই হচ্ছে তার একমাত্র উপাদান।] কিন্তু তার ফল অনেক বিলম্বে পেকেছিল। যে মেধা ও প্রতিভা স্পেনে আরব সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, তা তার কৈশোরেই প্রবল হয়ে উঠতে পারেনি। তাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়েছিল। অন্ধকারের মেঘের আড়ালে সে সভ্যতার প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়তেও অনেক সময় লেগেছিল। ইউরোপকে জীবনদানকালী কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞানই একমাত্র উপকরণ ছিল না। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিপুল প্রভাবও পড়েছিল। তার বিদ্যুৎচ্ছটা ইউরোপের একটি মাত্র দ্কি আলোকোদ্ভাসিত হয়ে ওঠেনি, তার মর্মমূলকে সুনিশ্চিতভাবে ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবের দিকে ফিরিয়ে নেওয়াও সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। সে সব প্রভাব যতটা সম্ভব ততটাই প্রকট হয়ে আছে। আর তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই শক্তির উদ্বোধন, যা আধুনিক জগতকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ও স্থায়ী শক্তিতে বলীয়ান করে দিয়েছে। আর দিয়েছে আধুনিক বিম্বকে উদ্ভাসিত করার শক্তি উৎস। আর তা প্রকৃতি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা-গবেষণার প্রাণচাঞ্চল্য।

 

সেই সংঘর্ষ ও এই অবদান, এ দুটিই তো আধুনিক ইউরোপের উত্থান ও অভ্যুদয়কে সম্ভব করে দিয়েছে। অবশ্য তার বদলে এ অভ্যুদয় আল্লাহ প্রদত্ত জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেনি। অথচ তা-ই ইসলামী অভ্যুদয়কে বাস্তব করেছিল, কিন্তু ইউরোপ তা থেকেই আলো গ্রহণ করেও আল্লাহ প্রদত্ত জীবন পদ্ধতি থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে। তা একদিকে ইসলামের ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের সাথে প্রচণ্ড দ্বন্দ্বে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

 

তবে ইসলামের সাথে ইউরোপের বিবাদ-সংঘাত নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা প্রসূত হিংসা ও বিদ্বেষের ফল। যার চরম পর্যায়ে অত্যন্ত ক্ষতিকর ক্রুশ যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।

 

আর তার নিজের ধর্ম ও ধর্মীয় আকীদার সাথে সংঘাত, তা ইউরোপীয় জনগণের মনে জাগিয়ে দিয়েছিল গীর্জার নির্বুদ্ধিতা ও তার উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্বৈরাচার।

 

গীর্জা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। কেননা মুর্খতাই ছিল জনগণের ওপর তার প্রভাব-প্রতিপত্তি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখার ও তার সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় সনদ। জনগণ যেদিন মূর্খতা পরিহার করে শিক্ষিত হয়ে উঠবে, যেদিন তারা জানতে পারবে যে, গীর্জা তাদের যা কিছু শেখাচ্ছে, তা অপ্রমাণ্য পৌরাণিত কল্প-কাহিণীর স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়, সেদিন এই জনগণ আর গীর্জার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সহজে মেনে নিতে কিছুতেই রাজি হবে না। কেননা তার কর্তৃত্ব কেবল মূর্খতা ও অন্ধকারের মধ্যেই টিকে থাকতে পারে।

 

গীর্জা ছিল স্বাধীনতার দুশমন। কেননা স্বাধীনতা অত্যাচারী প্রভুত্ব আধিপত্যের জন্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক। যেদিন জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ পাবে ও তা আস্বাদন করবে, সেদিন তারা দাসত্ব করতে আর প্রস্তুত হবে না যদিও সে দাসত্ব ধর্মের নামে চলছে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের দোহাই দিয়ে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

 

গীর্জার অভ্যন্তরে চলছিল পৈশাচিক চরিত্রহীনতা, যৌনতার পরাকাষ্ঠা। আর তা-ই জনগণের ওপর তাকওয়া-পরহেযগারীর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। উপদেশ দিচ্ছে উত্তম চরিত্র গ্রহণের জন্যে! কিন্তু তা কেন মানা হবে?

 

তা ছিল ব্যবসায়ী কর ও মালিকানা স্বত্ব বাবদ আদায়কৃত কর-এর ওপর চাপানো কর্তব্য। কৃষককুলকে যে গীর্জা-মালিকাতাধীন জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো, অথচ তারা দারিদ্র্য ও বঞ্চনার আঘাতে ছিল জর্জরিত। এসব সত্ত্বেও তাদের ওপর ছিল নৈতিকতার বাধ্যবাধকতা!

 

এরূপ অবস্থায় যখনই –যে মুহুর্তে গণজাগরণ সৃষ্টি হবে, তখন যে তা এই মিথ্যা ধার্মিকতার সব বেড়াজাল ছিন্ন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তা আর বিচিত্র কি! চরম শত্রুতা ও আক্রোশের ঝাণ্ডা না-ই বা তুলল।

 

কার্যত তথায় তা-ই ঘটেছে।

 

তথায় যে গনজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তা এই কারণেই ধর্মীয় প্রভাব বিমুক্ত (Secular) ছিল। তা এমন কেন্দ্রবিন্দুতে সুসংবদ্ধ হয়ে উঠেছিল বা বিন্দু বিন্দু করে ধর্ম ও ধর্মীয় আকীদা বিশ্বাস থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল গোটা ইউরোপীয় সমাজকে গণ-অনুভূতি ও আচার-আচরণও হয়ে গিয়েছিল ধর্মীয় প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

 

ইউরোপ এক্ষণে তার সেই প্রাথমিক উৎস মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল যেখানে তা ছিল খ্রিষ্ট ধর্ম অবলম্বনের পূর্বে। তা হল প্রাচীন গ্রীক ও রোমান উত্তরাধিকার। অন্য কথায় সেই পূর্বতন জাহিলিয়াতের মধ্যেই নিমজ্জিত হয়ে পড়ল। এ দুটি তো প্রধান জাহিলিয়াতই ছিল, মধ্যযুগে কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়েছিল। অত্যাচারী গীর্জার অপমানকর প্রভুত্ব আধিপত্যের সম্মুখে বিনীত হওয়ার  লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত হয়েছিল তাদের মন ও মগজ। মানুষের জন্যে এই দাসত্ব হয়ে উঠেছিল চরম ঘৃণ্য। সবদিক দিয়েই তারা স্বাধীনতার উন্মুক্ত ময়দানের দিকে সম্প্রসারিত হয়েছিল।

 

কিন্তু তারা সেই ‘নূর’ কে তার স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত মৌলনীতির ওপর ধারণ করে রাখতে পারেনি। তারা নির্ভুল হেদায়েত অনুযায়ী পারেনি নিজেদের চালিত করতে। যে ইসলাম থেকে তারা এই ‘নূর’ গ্রহণ করেছিল, সেই ইসলামের শাশ্বত বিধান ও পদ্ধতির ওপর তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারেনি অথচ এই ইসলাম তো আল্লাহরই দেওয়া দ্বীন।

 

তাঁর প্রতি তারা চরম মাত্রায় ঘৃণা পোষণ করেছিল, চরম শত্রুতা শুরু করে দিয়েছিল তাদের এই উস্তাদদের সাথে, যাদের কাছ থেকে তারা জ্ঞানের আলো গ্রহণ করে আলোকমণ্ডিত হয়েছিল। তারা প্রখ্যাত অনুসন্ধানের বর্বরতায় মেতে উঠেছিল। তারা বিতাড়িত করেছিল মুসলমানদের আন্দালুসিয়া থেকে। তারই অনিবার্য পরিণতিতে তারা সেই অত্যাচারী প্রভুত্ব কর্তৃত্বের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই দেশকে।

 

তারা মুসলমানদের কাছ থেকেই জ্ঞান শিক্ষালাভ করেছিল, শিখেছিল সভ্যতা, পেয়েছিল স্বাধীনতার স্বাদ।

 

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পদ্ধতিও তারা মুসলমানদের কাছ থেকেই জানতে পেরেছিল। এই পরীক্ষা পদ্ধতিই তো আধুনিক বিজ্ঞানের চরমোন্নতির মূল ভিত্তি।

 

গোষ্ঠীগতভাবে একত্রি হওয়ার পদ্ধতিও তারা মুসলমানদের কাছ থেকে পেয়েছিল। তার পূর্বে তারা ছিল খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। আর আঞ্চলিক স্বৈরতন্ত্রীই তাদের ওপর চালাত একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ভিত্তিক শাসন ও শোষণ। তখন এক-একজন শাসক বিধান রচনা, বিচারকার্য ও প্রশাসন পরিচালনা করত। সবই ছিল সেই এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আর সে ভূখণ্ডের জনতা ছিল তার হুকুম পালনকারী দাসানুদাস।

 

মানবাধিকার সম্পর্কে তারা জ্ঞান পেয়েছিল মুসলমানদের কাছে, তারপর তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল মানব প্রজাতির মুক্তির দাবি উত্থাপন করা। যে দাসত্ব শৃঙ্খল তাদের মন ও চিন্তার ওপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসে প্রতি মুহুর্তে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দিচ্ছিল, তা থেকে নিষ্কৃতির উপায় জানতে পেরেছিল তারা মুসলমানদের কাছ থেকে।

 

কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা জাহিলিয়াতের মধ্যেই নিমগ্ন হয়ে থাকল। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত পদ্ধতিকে অবলম্বন ও অনুসরণ করতে তারা অস্বীকার করে বসেছিল। আর মুসলিম জাহান থেকে সংগৃহীত সেই ‘নূর’ পেয়েও তারা তাদের সেই প্রাচীন জাহিলিয়াতের উত্তরাধিকারের দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছিল। সে উত্তরাধিকার ছিল গ্রীকদের, রোমানদের।

 

মুক্তির উন্মুক্ত মহাসড়ক সম্মুখে উপস্থিত পেয়েও তারা এই সুযোগ হারিয়ে ফেলল। তারা শিখেছিল, সভ্যতার সন্ধান পেয়েছিল, মুক্ত এবং স্বাধীনও হয়েছিল। আর এক সুউচ্চ সুপুষ্ট সভ্যতাও শক্ত করে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছিল ভাঙ্গনমুখী নদীর তীরে।

 

পূর্বেই একথা বলে এসেছি যে জাহিলিয়াত জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা নাগরিকত্ব ও বস্তুগত উৎপাদদের অগ্রগতির বিপরীত অর্থ জ্ঞাপক কোনো শব্দ বা পরিভাষা নয়। জাহিলিয়াতেরও এই সব কথা ও পুরো মাত্রায় পাওয়া খুবই সম্ভব। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনগণের অন্ধ জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত থাকাও একান্তভাবে সম্ভব।

 

একথা বলতেও বাকী রাখিনি যে, জাহিলিয়াতে মানব কল্যাণকর কোনো উপাদান থাকবে না, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তাতে আনুপাতিক ভাবে যে কল্যাণটুকু থাকে, তা জাহিলিয়াতের অকল্যাণ ও অসম্মান থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে কিছু মাত্র সক্ষম নয়। জাহিলিয়াতের চূড়ান্ত পর্যায়ের নিশ্চিত অধোগতি প্রতিরোধ করবে, এমন সাধ্য তার হয় না।

 

আমরা আসরে খুব তাড়াহুড়া করে কথা বলতে চাইনে। ইতিহাসের ধীরে অগ্রগতির সাথে তাল রেখেই আমরা সম্মুখের দিকে অগ্রসর হতে চাই।

 

ধর্ম ও দ্বীন ব্যবস্থা থেকে ইউরোপের উপরিউক্ত দূরবর্তিতা হঠাৎ করে ঘটেনি। আকস্মিকভাবে বা এক সাথেও সংঘটিত হয়নি তা। কেননা মানব প্রকৃতিই এই আকস্মিকতার পক্ষপাতী নয়।

 

মানুষের মনে এক একটি বিষয় ক্রমাগতভাবে ও খুব ধীর গতিতে জেগে ওঠে। এ ধীরতা অবশ্যম্ভাবী। আর এই ধীর গতিতে প্রত্যেক ব্যক্তির মনে যখন কোনো ভাবধারা স্থান করে নেয় ঠিক তখনই গোটা সমাজ তা গ্রহণ করে না। সামষ্টিকভাবে সেই ভাবধারা গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটি বাস্তবায়িত হয় আরও পরে এবং অত্যন্ত ধীর নিয়মে। সমাজ সমষ্টি এলোমেলোভাবে বিষয়গুলো স্তূপীকৃত করে এবং খুব দ্রুত প্রবাহিত হয়ে যাওয়া থেকে চিন্তা চেতনা ও আচার-আচরণকে রক্ষা করে। তা প্রত্যেক নাবাগতের জন্যে এক ধরনের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠিত সংস্থা কল্যাণসমৃদ্ধ হোক, কি অকল্যাণের ধারক, উভয় অবস্থাই এ ক্ষেত্রে সমাজ। নবাগত বিষয় সম্পর্কেও এই কথা।

 

এই কারণে ইউরোপ বহু শতাব্দীকাল পর্যন্ত এক সংমিশ্রিত ব্যক্তিত্ব নিয়ে জীবন যাপন করেছে। একই সময় খ্রিষ্টবাদ ও পৌত্তলিকতার সংমিশ্রি রূপই হচ্ছে তার আসল অবস্থা।

 

নবজাগরণ –অভ্যুদয় তার নিজস্ব পথেই অগ্রসর হয়। তা একই সাথে শক্তি আহরণ করতে থাকে গ্রীক ও রোমান পৌত্তলিকতা থেকে আর প্রতি পদক্ষেপেই তা ইসলামী সভ্যতা ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দূরে –বহু দূরে সরে গিয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় গভীর শিকড় বিস্তীর্ণকারী উক্ত জাহিলিয়াত দুটির সাথে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হতেও ঘনিষ্ঠতর হচ্ছিল।

 

আকীদা-বিশ্বাস মানব মনে স্থির থেকে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে যতটা সম্ভব লোকদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণে এবং তাদের জীবনবোধে। কিন্তু এই জীবনটা যদি ধীরে ধীরে দ্বীন বা ধর্মীয় চিন্তা-বিশ্বাসে সমৃদ্ধ না হয় বা দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক এমন পথে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তা দ্বীনের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে, তাতে কি কোনো সন্দেহ থাকতে পারে!

 

এই দ্বৈত ভাবধারা সমৃদ্ধ অবস্থায় সেই ঘটনা সংঘটিত হলো, ইতিহাসে যা সংশোধন (Reformation) নামে খ্যাত। তা ছিল ধর্মের সংশোধন। ধর্মকে পরিচ্ছন্ন করার জন্যে সূচিত এই আন্দোলনসমূহ একই সময় বিস্তৃর্ণ বিশাল জীবন ক্ষেত্রের ওপর তার প্রভাব বিস্তৃত করার জন্যেও চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু কার্যত তা অসম্ভভই থেকে গেল। অন্তত এতটুকু বলা যায়, বাস্তবে তা ঘটতে পারল না। তার কারণও সুস্পষ্ট। এই সংশোধনকামীদের নিজেদের মনেও দ্বীন বা ধর্ম সম্পর্কিত ধারণা তা-ই ছিল ধারণ করে আসছিল সেই জাহিলী প্রকৃত থাকার সময় থেকে। আর তা হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও বাস্তব জীবন-বিধান শরীয়তের বিচ্ছিন্নতা ও দ্বৈততা। আল্লাহর শরীয়তকে বাদ দিয়ে বাস্তব জীবনে ভিন্নতর কোনো শরীয়তকে চালু করা। ফলে আকীদা-বিশ্বাসের মানে বাস্তব জীবনে ভিন্নতর কোনো শরীয়তকে চালু করা। ফলে আকীদা-বিম্বাসের মানে বাস্তব জীবনের কোনো সঙ্গতি থাকবে না। ফলে সব ধর্মীয় সংশোধনীই নিছক মানসিক খুঁত-খুতানি প্রতিকার হওয়ার জন্যে, বাস্তব জীবন-ক্ষেত্রে তার একবিন্দু প্রভাব প্রতিফলিত হতে পারল না।

 

এর মূলেও বড় বড় কারণ নিহিত ছিল। উক্ত আন্দোলন সমূহের মূলে প্রচ্ছন্ন কারণ ছিল নিছক ‘জাতীয়তা’ বা জাতিত্ব চেতনা, ধর্মীয় কারণ ছিল না মোটেই। জাতিসমূহ শুধু নিজেদের জাতিত্ব বা জাতি সত্তাকেই প্রকাশমান করতে চেয়েছিল তাদের গীর্জাকে রোমান গীর্জার প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রাধান্য থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে। কিন্তু সাধারণত মানুষ যে আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ হয় আল্লাহর দিকে চলার লক্ষ্যে, তা কখনোই উক্ত বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতার সমর্থক হতে পারে না। তাদের জাতীয়তা বা ভূমির যে খণ্ডে তারা বসবাস করে তার আঞ্চলিকতার ভিত্তিতেও একই ঐক্যবদ্ধতা সম্ভব হতে পারে না। ফলে তাদের জাতিত্ব চেতনা ছিল ধর্মীয় আকীদার প্রকৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

বস্তুত মানবীয় সত্তা অভিন্ন একক। তাকে অনুভূতি বা স্বজ্ঞা ও বাস্তবতা –এই দুয়ের মধ্যে বিভক্ত করা যেতে পারে না।

 

মানবীয় জীবন অবিভাজ্য একক। তাকে বিশ্বাস ও বাস্তব আচার-আচরণ এই দুটি বিভাগে বিভক্ত করা চলে না।

 

আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ দ্বীনও অনুরূপ এক, অবিভাজ্য। তাতে আকীদা ও বাস্তব বিধান –এই দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। স্বজ্ঞা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে পার্থক্য করাও অসম্ভব।

 

ঠিক যে সময়ে ইউরোপে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল, তখন নবোদ্ভুত পুঁজিতন্ত্র ভূ-পৃষ্ঠকে ওলট-পালট করে দিচ্ছিল। এই পুঁজিতন্ত্র এক সম্পূর্ণ অ-ধর্মীয় ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মতাদর্শ। তাতে সুদ, অপহরণ, ছল-চাতুরী, ঠকবাজি, মূল্য বৃদ্ধি, অপকৌশল ইত্যাদিই হচ্ছে পুঁজিবাদের অবিচ্ছিন্ন গুণপনা। শ্রমজীবীদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন এবং তাদের লালতপ্ত রক্ত চুষে নেওয়া। আর ওদিকে ধর্মীয় সংস্কারবাদীরা লোকদের অন্ত চেতনার সংশোধন-সংস্কারে ব্যতিব্যস্ত। মোটকথা, ইউরোপীয় সমাজের লোকদের ব্যক্তিসত্তার দ্বৈত অবস্থার টানা পোড়নে চলতে থাকে কয়েক শতাব্দীকাল ধরে।

 

কিন্তু চক্ষুস্মানের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ইতিহাসের গতিধারার দিকে। ঘটনাবলীর ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করতে একটুও ভ্যুল করেনি। স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যে, ঘটনাবলীর প্রবণতা নিঃসন্দেহে ধর্মহীনতার (Secularism) দিকে জীবনের সকল পর্যায়ে ও বাঁকে এবং তা ক্রমাগতভাবে দ্বীন ও ধর্মের পথ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে।

 

যদিও বাস্তব কার্যক্রম ক্রমিক ও ধীর গতিতে চলছিল। এভাবে ঊনবিংশ শতাব্দী এসে উপস্থিত হলো। আর ইউরোপীয় ইতিহাসে এই শতাব্দীই হচ্ছে বড় বড় ঘটনাবলী সংঘটিত হওয়ার শতাব্দী। এই শতকে এমন দুটি বড় ঘটনা সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসের ধারাকে কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ভিন্নতর একটি পথে পরিচালিত করে।

 

প্রথম ঘটনা, ডারউইনীয় বিবর্তনবাদে আত্মপ্রকাশ।

 

আর দ্বিতীয় ঘটনা, শিল্প বিপ্লব।

 

এ দুটি যেন যথাসময়ে সংঘটিত হলো। মধ্যযুগীয় ভাবধারার শেষ রেশটুকুকেও চিরতরে বিলীন ও ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যে এ দুটি ঘটনা যথাসময়ে ঘটে গেল।

 

এই সময় নবতর এক জাহিলিয়াতের বিরাট উঁচু চোখ ঝলসানো চাকচিক্যময় প্রাসাদ নির্মাণের লক্ষ্যে মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতের অবশিষ্টের নাম চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলল। আর তা-ই হলো এ যুগের জাহিলিয়াত।

 

ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ চিন্তা ও মতবাদের জগতে আকীদা-বিশ্বাসের ওপর কঠিন প্রলয়ংকর আঘাত হানল। শিল্প বিপ্লবেও তা প্রয়োগীয় অবকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত করে।

 

ডারউইনের জন্ম ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর গ্রন্থ ‘প্রজাতিসমূহের মূল’ (Original of Species) প্রকাশিত হয়। আর ১৮৭১ সনে প্রকাশিত হয় ‘মানুষের মূল্য’ সম্পর্কীয় গ্রন্থটি।

 

অতঃপর আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তার ক্ষেত্রে ভয়াবহ তোলপাড় ও ঘটনাবলীর তরঙ্গমালা ঘটতে থাকে অব্যাহত ধারায়।

 

বোতলবদ্ধ ভূত বোতল ভেঙে বেরিয়ে গেছে। তাকে ফিরিয়ে আনার আর কোনো উপায় –কোনো পন্থাই থাকল না। এ ভূত হচ্ছে ‘বিবর্তনবাদ’। এ ভূত মহা অত্যাচারী। তার সম্মুখে যা কিছুই আসে, সবই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ে যায়। পথে স্থিতিশীল ও প্রতিষ্ঠিত যা কিছুই আছে, তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে না দিয়ে সে এক মুহুর্তও থেকে থাকতে পারে না।

 

আকীদা-বিশ্বাস ও ইউরোপীয় চিন্তা সবকিছুর ওপর ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ কি কঠিন সর্বধ্বংসী আঘাত হেনেছে, তার বিস্তারিত আলোচনা আমি ইতিপূর্বে পেশ করেছি ‘বিবর্তন ও স্থিতি’ নামক এবং অন্য একটি গ্রন্থে। সেই সব কথাই এখানে পুনরাবৃত্তি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে যেমন আমরা আমাদের সংশ্লিষ্ট পরবর্তী আলোচনার দিকে ফিরে যেতে পারি। পরবর্তী অধ্যায়সমূহে এই প্রসঙ্গটি পুনরায় আসবে।

 

ডারউইন গবেষণাগারে বসে যে বিবর্তনবাদ রচনা করেছেন, পরবর্তীকালে তা আর গবেষণা ক্ষেত্রের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকেনি। তার সীমিত বেষ্টনীর মধ্যে তাকে সীমিত করে রাখাও কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না। সময়ের চিন্তাবিদ মনীষী, বিশেষজ্ঞ ও জনগণ তা হাতে হাতে তুলে নিল। তাদের সকলেরই মাথা ঘুরে গেল। অতঃপর তারা অস্তিত্বের জগতে কোনো কিছুই স্থিতিশীল দেখতে পেল না। এমন কি আকীদা-বিশ্বাস আল্লাহর চিন্তায় পর্যন্ত এই বিবর্তনবাদের প্রয়োগ হতে শুরু হয়ে গেল।

 

ফলে গীর্জা ও ডারউইনের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হল। গীর্জা তাকে ‘নাস্তিক’ নামে আখ্যায়িত করল। আর ডারউইন গীর্জাকে মূর্খতা ও কুসংস্কারের লীলাকেন্দ্র বলে অভিযুক্ত করল। জনগণ প্রথম দিকে গীর্জার পক্ষে ছিল। গীর্জা তার বিশ্বাসকে জোরদার করে প্রচার করল। আর ডারউইন মানুষকে নিম্নমানের জীব-জন্তুর আকৃতিতে ভূষিত করলেন। শেষ পর্যন্ত জনগণ গীর্জার পক্ষ ত্যাগ করে ডারউইন সমর্থকদের কাতারে জমায়েত হয়ে গেল। কেননা ডারউইনীয় মতবাদের হাতিয়ার দ্বারা তারা অত্যাচারী ও দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করে মানুষকে লাঞ্ছিতকারী গীর্জার প্রভাব প্রতিপত্তি খতম করার এক মহান সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল।

 

এ যুগ্ঘে শেষ পর্যন্ত ‘ধর্ম’ পরাজিত হলো। আর বোতল ভেঙে বের হয়ে আসা ভূত বিজয়ী হয়ে দাঁড়াল। তার পথে আর কোনো বাঁধাই থাকল না।

 

অপরদিকে এই সময়ই শিল্প পৃথিবীকে কঠিন ধাক্কায় কাঁপিয়ে দিল। পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার রূপটাকেই আমূল বদলে দিল এবং নতুন সমাজ গড়ার একটা ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।

 

কিন্তু এ নতুন সমাজ ব্যবস্থার সাথে আকীদা-বিশ্বাসের কোনোই সম্পর্ক থাকল না। তা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে উঠল নতুন সমাজ কাঠামো।

 

এ সমাজের প্রতিটি জিনিসই ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক, যুধ্যমান, ধর্মকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার প্রবণতাসম্পন্ন।

 

সীমা লংঘনকারী পুঁজিতন্ত্র ধর্মীয় আদেশ-উপদেশসমূহকে অপমানিত করার ক্ষেত্রে কোন সীমা পর্যন্ত এসে থেকে থাকল না। তা চুরি করতে লাগল জনগণের সম্পদ, লুটে পুটে নিতে লাগল সবকিছু। নিরীহ মানুসকে নির্দ্ধিধায় হত্যা করতে লাগল, নিরপরাধ রক্ত বন্যা পানির মতো প্রবাহিত হতে লাগল। তা মানুষকে প্ররোচিত করল আবহমান কালের সহজ-সরল জীবন ধারা থেকে বের হয়ে এসে বিলাস ও সৌন্দর্যের দ্রব্যাদি বিক্রয় করে বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের জন্যে। তারা অবস্থার স্বাভাবিক পরিণতিতে বিপুল মুনাফা অর্জনের মহা সুযোগও পেয়ে গেল। এলো সামাজিক ক্ষেত্রে মহাবিপর্যয়।

 

তা নারী সমাজকে তাদের শান্তির নীড় ঘর-সংসার থেকে টেনে বের করে নিয়ে শিল্প-কারখানায় উপস্থিত করে দিল। যেন এখানে শ্রম করেই তারা মুঠোমুঠো খাবার যোগাড় করতে পারে। ক্রমশ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলো, যেন পুরুষ শ্রমিকদের ব্যবস্থাপনা বিরোধী আন্দোলনসমূহকে খতম করে দেওয়া যায়। কেননা এই পুরুষ শ্রমিকরাই পুঁজিতন্ত্রের বেশি বেশি আয়ের ওপর বাধার সৃষ্টি করছিল। মেয়েরা স্বল্প পরিমাণ মজুরী পেয়ে নিজেদের রক্ত পানি করতে ও শক্তি ক্ষয় করতে প্রস্তুত হলো। এমনিভাবে তারা একমুঠো খাবার পাওয়ার বিনিময়ে নিজেদের নৈতিকতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হলো।

 

পুঁজিবাদ সৃষ্ট শিল্প-কারখানায় সমাজের যুবক শ্রমিকদের একত্রিত করল। তারা বাধ্য হলো স্ত্রী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে। যৌবনকালীন এই নিঃসঙ্গ ও স্ত্রী বর্জিত জীবনে তাদের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের চরম বিপর্যয় ঘটে গেল। ব্যভিচারের পথেই তারা তাদের এই সমস্যার সমাধান করতে বাধ্য হলো।

 

এভাবে, হ্যাঁ এভাবেই আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিকতার শক্ত বাঁধন ক্রমাগত ঢিলে ও আলগা হয়ে যেতে থাকল। চরিত্রের প্রাসাদটি ভেঙে পড়ল।

 

না, ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে ডারউইনীয় চিন্তা-মতবাদ ও শিল্প বিপ্লব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকল না।

 

শয়তানেরও কোনো অভাব থাকল না এই ময়দানে।

 

বিশ্ব ইহুদীবাদ তার এক মহাস্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্যে ওঁৎ পেতে বসেছিল। সে স্বপ্ন হচ্ছে বিশ্ব মানবের ওপর নিজস্ব নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। আর কুরআনের ভাষায় তা হচ্ছে ‘উম্মী’ গণের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন।[এ হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যা বলেছেঃ (আরবী**********************************) তা এভাবে যে, তারা বলেছে আমাদের উম্মী লোকদের কোনো দাবী-দাওয়া নেই; আমরা এখানে উম্মিয়ীন শব্দটির ওপর জোর দিচ্ছি। যার অনুবাদ করা হয়েছে Gentiles বলা। অর্থাৎ ইহা ইহুদীদের ছাড়া অন্যান্য সব জনগোষ্ঠী।]

 

‘তালমুদ’ গ্রন্থে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ উম্মী লোকেরা হচ্ছে গর্দভ। ওদেরকে আল্লাহ সৃষ্টিই করেছেন এই জন্যে যে, ওদের পিঠে সওয়ার হবে আল্লাহর বার্ছাইকরা জনগোষ্ঠী।

 

আর তাদের গোপন শিক্ষা তাদেরকে (ইহুদীদের) বলেছেঃ

 

‘তোমরা অপেক্ষায় থাকো। শেষ পর্যন্ত তোমরা পেয়ে যাবে ওদের এমন এক অসতর্কতার সময়, যখন তোমরা গাধার পিঠের ওপর শক্ত হয়ে বসতে পারবে’। ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ যে ধর্মহীনতার ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছে এজন্যে অন্যরা যা-ই মনে করুক, বিশ্ব ইহুদীবাদ অত্যন্ত সন্তুষ্টিবোধ করেছে। ইউরোপের পুরাতন আকীদাকে খতম করার জন্যে এই ধর্মহীনতার দ্বারা অর্ধেক পথ এগিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর বিম্ব ইহুদীবাদের পক্ষে দুশমন হচ্ছে এই আকীদা যা অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপিত, যা শয়তানের সমস্ত ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার জালকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। আর এই আকীদাই যদি অশক্ত ও ঢিলেঢালা হয়ে যায়, তাহলেই শয়তানদের পক্ষে গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বসা খুবই সহজসাধ্য হয়ে যায়।

 

আল্লাহ তা’আলা শয়তানের চ্যালেঞ্জের জবাবে বলেছিলেনঃ

 

(আরবী****************************************************************)

 

শয়তানের কোনো কর্তৃত্ব-আধিপত্য নেই সেই লোকদের ওপর যারা প্রকৃতভাবে ঈমান এনেছে এবং তাদের আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা অবলম্বন করে থাকে। (সূরা-নহলঃ ৯৯)

 

অপর আয়াতে বলেছেনঃ

 

(আরবী***********************************************************************************)

 

শয়তানের আধিপত্য কর্তৃত্ব কেবল তাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত যারা তাকেই বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক বানায়। আর যারা তার সাথে শিরক করে মুশরিক হয়ে আছে। (সূরা-নহলঃ ১০০)

 

বস্তুত শয়তান তার বড় বন্ধু ও সাহায্যকারী পেয়ে গেছে বিশ্ব-ইহুদীবাদী শয়তানদের মধ্য থেকে। তারা প্রতীক্ষায় থেকে শেষ পর্যণ্ত পেয়ে গেছে মহা অনুকূল সুযোগ ও ক্ষেত্র। এই বিরাট ঘটনা দ্বারা বলা যায়, এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে! তার একটি ডারউইনবাদ আর অপরটি শিল্প বিপ্লব।

 

স্বীকার করছি, হতে পারে ডারউইন হয়ত শয়তান ছিল না। সে হয়ত বিশ্ব মানবতার কোনো অনিষ্ট করার চিন্তাই করেনি তার মতবাদের মাধ্যমে।

 

কিন্তু এ-ও অনস্বীকার্য যে, অনেক মনীষীই এক একটি বিশ্বাসের কথা এই মনে করে প্রকাশ ও প্রচার করে যে, তা সত্য হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে যে ভুল করে তাঁর মতবাদ রচনায় –ডারউইনীয় চিন্তার মৌলনীতিসমূহের প্রতি বিশ্বাস রেখেও স্বয়ং নব ডারউইনবাদ (Neo-Darwinism) যে কথা অকপটে স্বীকার করেছে, -তার মাশুল গোটা মানবতাও হয়ত আদায় করে দিতে পারে না। কেননা ডারউউনের বিশ্বাস ছিল যে, মানুষ হচ্ছে পশু –জীব-জন্তু বিশেষ। কিন্তু উত্তরকালে তাঁর মত বিজ্ঞানের কাছে গৃহীত হয়নি। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষ এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি। তার মহো দেহাবয়বসম্পন্ন সত্তাও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্ট হয়েছে, তার মনমানসিকতা, বিবেক-বুদ্ধি ও রূহ-এর স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্ট হওয়া তো একান্তভাবেই অবধারিত। কিন্তু ডারউইনের মতবাদে এই মারাত্মক ভুলটি রয়ে গেছে। তাই বলতে হচ্ছে, সে তার মতবাদ হয়ত খারাপ উদ্দেশ্যে পেশ করেনি, যদিও সে তার এই মতবাদটিকে ধর্মীয় আকীদা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপিত করেছে। সে নিজেই বলেছেঃ ‘আল্লাহ স্বীকৃতির ভিত্তিতে জীবনের ব্যাখ্যাদান ব্যাপারটি ঠিক এ রকম, যেমন নিছক একটি যন্ত্রের মধ্যে তার প্রকৃতি পরিপন্থী কোনো উপকরণ প্রবেশ করিয়ে দেয়। সে এ-ও বলেছেঃ প্রকৃতি সব জিনিসই সৃষ্টি করেছে। তার সৃষ্টি ক্ষশতার কোনো সীমা নেই।

 

কিন্তু ইহুদী শয়তানেরা অত্যন্ত খারাপ উদ্দেশ্যে এই মতবাদটির মধ্যে অনেক খারাপ ধারণা শামিল করে দিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যে মানবসত্তাকেই ধ্বংস করা।

 

ইহুদীবাদের প্রোটোকল-এ বলা হয়েছেঃ ডারউইন ইহুদী নয়। কিন্তু আমরা জানি, কি করে তার মতবাদটিকে ব্যাপক ক্ষেত্রে প্রচার করে দেওয়া যায়। আমরা এটিকে ধর্মের ভিত্তিকে ধ্বংস করার কাজে প্রয়োগ করব।

 

উক্ত বইতে এ-ও বলা হয়েছেঃ আমরা ডারউইন, মার্কস ও নিটশের সাফল্য সৃষ্টি করব তাদের মতবাদের ব্যাপক প্রচার ও প্রচলন করে। অ-ইহুদী চিন্তায় তাদের বৈজ্ঞানিক মতবাদ নৈতিকতার জন্যে যে ধ্বংসাত্মক ক্রিয়া রয়েছে, তা তাদের সম্মুখে সর্বতোভাবে সুস্পষ্ট ও প্রকট।

 

সন্দেহ নেই, বিশ্ব ইহুদীবাদ ডারউইনের চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশবাদকে খুব বেশী বড় করে তুলেছে, বীভৎস রূপ দিয়েছে ইউরোপীয় জাহিলিয়াতের অবশিষ্ট সকল ভালো মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ খতম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এই কাজে তারা তিনজন প্রধান চিন্তানায়কের চিন্তাধারাকে ব্যবহার করেছে। তারা হচ্ছেঃ মার্কস, ফ্রয়েড ও দরখায়েম। এ তিনজন চিন্তাবিদই ধর্ম সম্পর্কে কথা বলতে গেয় খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও হীনতা দেখিয়েছে। জনগণের মনে ধর্মকে জঘন্য রূপে চিত্রিত করতে চেষ্টা করেছে।[(আরবী******************) গ্রন্থের (আরবী****************) তিন ইহুদী অধ্যায় দ্রষ্টব্য।]

 

দরখায়েম লিখেছেঃ ধর্ম প্রকৃতি সম্মত নয়।

 

মার্কস বলেছেঃ ধর্ম জনগণের জন্যে আফিম। তা এমন সব উপকথার সমষ্টি, যা সামন্তবাদী ও পুঁজি মালিকেরা রচনা করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রমজীবী জনতাকে চেতনাহীন করে দেওয়া এবং পরকালীন নিয়ামনের লোভ দেখিয়ে দুনিয়ার জীবনে বঞ্চিত থাকতে রাজি করা।

 

ফ্রয়েড বলেছেঃ ধর্ম সৃষ্ট হয়েছে মানুষের বঞ্চনা ও ব্যর্থতার ফলশ্রুতি হিসেবে তা উৎসারিত হয়েছে যৌন কামনা থেকে, যা পুত্র সন্তান তার মার প্রতি বোধ করে। পুত্র যে তার পিতাকে হত্যা করার আগ্রহী হয় তা থেকে।

 

এ তিনজনই মানুষের নৈতিকতাকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। দরখায়েম বলেছেনঃ অপরাধ নিতান্তই কাল্পনিক জিনিস। বিয়ে স্বভাবসম্মত নয়; নৈতিকতার সম্পর্কে সেভাবে কথা বলা যায় না যেন তা স্থিতিশীল সত্তা। তা সবই সামষ্টিক বিবেক-বুদ্ধির সৃষ্টি, যা একই অবস্থায় স্থায়ী হয়ে থাকে না। তা এক ‘অপোজিট’ থেকে অপর ‘অপোজিট’ –এর দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। কার্ল মার্কস বলেছেনঃ চরিত্র হচ্ছে বিবর্তনশীল অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন, যা সব সময়ই পরিবর্তন সাপেক্ষ, তা কোনো স্থায়ী মূল্যমান নয়।

 

ফ্রয়েড বলেছেনঃ চরিত্র জুলুমের চিহ্ন, মানবতার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

 

ধর্মের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র এখানে এসেই থেমে যায়নি। এই ষড়যন্ত্র নারী জাতিকেও গর থেকে বাইরে টেনে এনেছে। তাকে নামিয়ে দিয়েছে রাস্তায়।

 

মার্কস বলেছেনঃ নারীকেও অবশ্যই শ্রম করতে হবে।

 

দরখায়েম বলেছেনঃ নারীর বিয়ে করা তার স্বাভাবিক দাবি নয়।

 

ফ্রয়েড যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে তাকে বলছেন, নারীর যৌন সত্তা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে সকল প্রকার বাঁধা-বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েই।

 

বিশ্ব ইহুদীবাদ কেবল মতাদর্শের ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বাস্তবতার ক্ষেত্রেও পদচারণা করেছে।

 

বস্তুত তারা ডারউইনীয় মতাদর্শকে এমন কুৎসিতভাবে কাজে লাগিয়েছে, যা ডারউইনের কল্পনায় হয়তো আসেনি। শিল্প বিপ্লবকেও তারা সামাজিক ভাঙন ও বিপর্যয় সৃষ্টির হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছে।

 

সন্দেহ নেই, পুঁজিবাদ ইহুদী উদ্ভাবিত। ইহুদী সুদখোরেরা এই সুযোগে দুই হাতে জনগণের রক্ত পানি করা অর্থ কামিয়েছে। তাদের শয়তানী সুদী কারবারই এজন্যে অমোঘ হাতিয়ার।

 

পুঁজিবাদ কেবল ‘মুনাফাদাতা নিজেই’ জিনিসই নিয়ে আসেনি, মানুষকে পাগল করার উপায় ‘সিনেমা’ ও তাদেরই অবদান। তা দিয়ে তারা সন্তান-সন্ততিদের নৈতিক ধ্বংসের অতল গহবরে ফেলে দেওয়ার কাজ নিচ্ছে। সিনেমায় প্রধানত যৌনতার পংকিল দৃশ্যাবলীই দেখানো হয়। সাজঘর ও রূপচর্চাকেন্দ্রও তারা বানিয়েছে মেয়েদেরকে পুরুষদের নৈতিক পতন সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে। তাতে সুবিধাই পেয়ে গেছে। কেননা মার্কস আগেই তাদের ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছেন। লোকদের মন-মানসকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে, ফেতনা ও নৈতিক পদস্খলনের কারণ ঘটিয়েছে। আর আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিটিকেই এর দ্বারা নাড়িয়ে দিয়েছে –নড়বড়ে করে দিয়েছে।

 

যেন গোটা জগৎ জিনা-ব্যভিচারের এমন আড্ডাখানায় পরিণত করা যায়, যেন তথায় সমাজের নারী ও পুরুষরা সমানভাবে নাক পর্যণ্ত ডুবে যেতে পারে।

 

আর তাহলেই তো ইহুদীরা গাধার পিঠে টপ করে লাফিয়ে উঠে সওয়ার হতে পারবে। তখনই তো তারা তাদের শয়তানী স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে পারবে। তাদের পবিত্র গ্রন্থাবলী তো এ ধরনের স্বপ্নে রঙীন দৃশ্যাবলী দিয়ে ভরপুর হয়ে আছে।

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

এরই পরিণতিতে শেস পর্যন্ত সারাটি জগতের ওপর জাহিলিয়াত বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

 

যে ইউরোপে এই জাহিলিয়াত গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তিসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো, তাই বর্তমানে সমগ্র জগতের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করছে ও শাসন চালাচ্ছে। সেই জাহিলী চিন্তাধারা ও ভাবধারা সারা পৃথিবীতে প্রভাবশালী হয়ে আছে।

 

গ্রীক জাহিলিয়াত, রোমান জাহিলিয়াত, মধ্যযুগের বিকৃত আকীদার জাহিলিয়াত, ডারউইনীয় মতবাদ ছত্রছায়ায় ধর্ম থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জাহিলিয়াত এবং শিল্প-বিপ্লব –এই সবই আধুনিক জাহিলিয়াতের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ও পরিণত। আর তা-ই হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত।

 

এ জাহিলিয়াত কেবল ইউরোপেই রয়েছে তা নয়। তা শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি, কেননা ইউরোপ তার বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে এই জাহিলিয়াতকে পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে। আর সর্বত্রই সেই জাহিলিয়াতই বিজয়ী, কর্তৃত্বসম্পন্ন ও প্রভাবশালী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এভাবে আলোচনার মাধ্যমে আমরা আধুনিক জাহিলিয়াতের ইতিহাস বর্ণনা শেষ করলাম। এক্ষণে আমরা আধুনিক জাহিলিয়াতের নিদর্শনাবলীর বর্ণনা পেশ করব।

 

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের নিদর্শন

 

ইতিহাসের প্রতিটি জাহিলিয়াতের একটা নিজস্ব নিদর্শন ও বিশেষত্ব রয়েছে, যদ্দারা তা বিশিষ্ট হয়ে প্রতিভাত হয়। আসলে সে নিদর্শন হয় সেই সমাজ পরিবেশের, যার মধ্যে জাহিলিয়াত অবস্থান গ্রহণ করে অথবা তা হয় তার চতুষ্পার্শ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতকি অবস্থার নিদর্শন। সেই সাথে এমন কিছু মৌলিক বিশেষত্বও থাকে, যা সব জাহিলিয়াতেই অভিন্ন মূল্যমান হিসেবে থাকে এবং সামষ্টিকভাবে তা জাহিলিয়াতের একটা সুস্পষ্ট নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়।

 

পরবর্তী দুটি অধ্যায়ে আমরা ধারণা-বিশ্বাস ও বাস্তব আচার-আচরণে আধুনিক জাহিলিয়াতেরবিপর্যয় ও বিকৃতি সম্পর্খে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করব। কিন্তু সেই বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে আধুনিক জাহিলিয়াতের এমন কয়েকটি বিশেষত্বের উল্লেখ করা খুবই উত্তম হবে বলে মনে হয়েছে, যেমন করে পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা বলে এসেছি, আধুনিক জাহিলিয়াত কবে অস্তিত্ব লাভ করল এবং তার বিকাশ ও  প্রবৃদ্ধি কি করে সংঘটিত হয়েছিল বিগত শতাব্দীগুলোর মধ্যে।

 

সত্যি কথা, কোনো জাহিলয়াতই মহান আল্লাহর সত্যিকারভাবে ঈমানদার হয় না।

 

ইতিহাসের সব কয়টি জাহিলিয়াতের মধ্যে এটাই হচ্ছে অভিন্ন ও বড় বিশেষত্ব। বরং এটার ভিত্তিই আল্লাহকে অস্বীকার করে এক একটি জাহিলিয়াত গড়ে ওঠে। আর তার ওপর ভিত্তি করেই ধারণা-বিশ্বাস ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল প্রকারের বিপর্যয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

 

সহীহ ও নির্ভুল আকীদা হচ্ছে তাই, যা এই বিশ্বলোকে মানুষকে তার যথার্থ স্থান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। স্থান ও কালে তার যাবতীয় ভুল-ভ্রান্তিকে সঠিক ও সুষ্ঠু করে দেয়। তার জন্যে সঠিক দিক নির্দেশ করে, তার জন্য সুদৃঢ় সরল সোজা পথ চিহ্নিত করে দেয়। তাহলেই তার অনুভূতি, মন-মানসিকতা, আচার-আচরণ, গতিবিধি ও তৎপরতা সঠিক হতে পারে, সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে তার নীতি ও বাস্তবতা, ফলে বাঞ্ছিতভাবেই তার এই সব কিছুই পরস্পর ভারসাম্যপূর্ণ, পরিপূরক ও নির্ভুল পথে অগ্রসর হতে পারে।

 

কিন্তু এই আকীদা যখনই বিকৃত হয়, তখনই মানুষের গোটা সত্তায় বিপর্যয় দেখা দেওয়া অবশ্যম্ভাবী হড়ে পড়ে। ঠিক যেমন চুম্বক-সূচ থরথর করে কাঁপতে ও দিগ্বিদিকহারা হয়ে পড়ে যখন তার ও তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মাঝখানে কোনো অন্তরাল সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। তখনই সুসংবদ্ধ মানব সত্তা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। স্থান ও কালে তার পদচারণা হয়ে পড়ে দিশেহারা। অস্থির ও সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে তার আচরণ ও তৎপরতা, অনুভূতি, স্বজ্ঞা, মৌলনীতি ও বাস্তবতা। অতঃপর সেই বাঞ্ছিত ঐক্যবদ্ধতা ও  সুসংবদ্ধ আর কখনোই ফিরে আসে না, তার গোটা সত্তাই স্থিরতা ও শাস্তি নিরাপত্তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে পড়ে। অথচ এই দুই জিনিসের নিশ্চিত সুফল মানুষ লাভ করতে পারে সুস্থ সঠিক বিশ্বাসের ছত্রছায়ায় এবং সঠিক কর্মপথ গ্রহণে।

 

উক্ত বঞ্চনা ও অস্থিরতার ফলেই জাহিলিয়াতের দেখা দেয়।

 

বোঝা গেল, মহান আল্লাহর দাসত্ব করা থেকে বিপথগামী হওয়ারই নাম হচ্ছে জাহিলিয়াত। আল্লাহর এই দাসত্ব জীবনের সমগ্র ক্ষেত্রের জন্যে কেবলমাত্র এক আল্লাহর কাছ থেকে আইন-বিধান গ্রহণ ও আইন-বিধান ভিত্তিক বিচার-ফয়সালা গ্রহণও শামিল রয়েছে। এ সবের মধ্য দিয়েই আল্লাহর ইবাদত –দাসত্ব প্রতিফলিত ও বাস্তবায়িত হয়। এই নীতিতে যে বিপথগামিতা সংঘটিত হয়, তা-ই মানব জীবনে নিয়ে আসে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলতা, ছিন্নভিন্ন হওয়া, দলে দলে বিভক্তি। তা নিয়ে আসে সংগঠনে বিপত্তি, চিন্তায় বিচ্যুতি। আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের, গোটা সৃষ্টিলোকের সাথে, চতুষ্পার্শ্বের জীবনের সাথে ও তার ভাই ও অন্য মানুষের সাথে সম্পর্কের ব্যতিক্রম ঘটে, বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।

 

ইতিহাসে যখনই মহান আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামিতা সংঘটিত হয়েছে, তার পরিণতিতে বিপর্যয় ঘটেছে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে, সংযোজনে, ধারণায় ও চিন্তা-ভাবনায়। অতএব, এই আকীদাই হচ্ছে সেই শক্তি যা মানুষের এসব দিককে সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ করে। মানুষ তা জানতে ও বুঝতে সক্ষম হোক আর না-ই হোক, এ ব্যাপারে তার ইচ্ছার কোনো ভূমিকা থাক আর না-ই থাক। আর আকীদা যখন যথার্থ ও সঠিক হয়, তখনই মানুষের গোটা সত্ত্বা সুসংবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তার পদচারণা ও জীবনযাত্রা সবই সঠিক পথে অগ্রসর হতে থাকে। আকীদা-বিশ্বাসের বিপর্যয় গোটা জীবনেই বিস্তার লাভ করে।

 

তাই বলা যায়, আল্লাহর ইবাদত যখন সঠিকরূপে হতে থাকে, তখন পৃথিবীতে কোনো বিপর্যয় ঘটে না।

 

তবে অনেক সময় আকীদা হয়ত ঠিক থাকে, কিন্তু শুধু আকীদাটুকু থাকাই তো এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তকারী শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আকীদাকে অবশ্যই জীবন্ত, গতিশীল, সক্রিয়, ইতিবাচক, সর্বব্যাপক হতে হবে, এমন হতে হবে যা মানুষের গোটা জীবন পরিব্যাপ্ত হবে, জীবনের কোনো একটি খুঁটিনাটি ব্যাপার বা দিকও তার আওতার বাইরে থাকবে না। একই সময় ব্যক্তিই গোটা চিন্তা-ভাবনা, মূল্যবোধ ও আচার-আচরণ পরস্পর সম্পৃক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নীতি ও বাস্তবতার মধ্যেও কোনো পার্থক্য থাকবে না। যা-ই হবে ধারণা ও বিশ্বাস, তা-ই হবে তার কাজ।

 

এর বিপরীত অবস্থা –তাতে আল্লাহমুখী আকীদা থাক আর না-ই থাক,এ এক প্রকারের জাহিলিয়াত। ‘জাহিলিয়াত’ শব্দটিই তার ওপর প্রযোজ্য হবে এবং তার নিশ্চিত পরিণতিই ভোগ করতে হবে। তার ব্যতিক্রম সম্ভব নয়। কেননা তাই হচ্ছে আল্লাহর সুন্নাত –স্থায়ী প্রাকৃতিক নিয়ম।

 

০ ০ ০ ০ ০\nআরব জাহিলিয়াতের লোকেরা আল্লাহকে জানত, চিনত। তাঁর অস্তিত্বের প্রতিও তারা বিশ্বাসী ছিল। তাঁর প্রতি লক্ষ্য নিবদ্ধ করতে ও তাকেঁ স্মরণ করতেও তারা অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু সে লক্ষ্য দান ও স্মরণ যথার্থ ছিল না, ছিল ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ।

 

এই জাহিলিয়াতের আরবদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

 

(আরবী****************************************************************************************)

 

তুমি যদি ওদের জিজ্ঞেস করোঃ বলো তো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? ….তাহলে ওরা জবাবে নিশ্চয়ই বলবেঃ সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ।

 

(আরবী**************************************************************************)

 

তুমি যদি ওদের জিজ্ঞেস করোঃ বলো তো এই লোকেদের কে সৃষ্টি করেছেন? তারা নিশ্চয়ই বলবে –আল্লাহ। (সূরা –যুখরুফঃ ৮৭)

 

(আরবী*****************************************************************)

 

জিজ্ঞেস করোঃ তোমাদের আসমান ও জমিন থেকে কে রিযিক দেয় বা শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির মালিক কে এবং জীবন্তকে মৃত থেকে বা মৃতকে জীবন্ত থেকে কে বের করে, কে ব্যবস্থা করে যাবতীয় ব্যাপারের? তাহলে তারা অবশ্যই বলবে –আল্লাহ। (সূরা ইউনুসঃ ৩১)

 

(আরবী*************************************************************************************)

 

জিজ্ঞেস করোঃ এই পৃথিবী ও এর মধ্যে বসবাসকারীরা কার?.... বলো, যদি জানো। নিশ্চয়ই তারা বলবেঃ আল্লাহর। বলো, তোমরা কি একথা মনে প্রাণে গ্রহণ করছ না? জিজ্ঞেস করো, সপ্ত আকাশের রব্ব কে, কে মহান আরশের রব্ব? তারা অবশ্য বলবে, আল্লাহর জন্যেই আরশ। বলো, তাহলে তোমরা কি সে আল্লাহকে ভয় পাও না? বলো, সব জিনিসের প্রকৃত কর্তৃত্ব কার হাতে? তিনিই তো আশ্রয় দেন, তাঁর ওপর আশ্রয় দানের কাজ কেউ করে না যদি তোমাদের জানা থাকে, তারা নিশ্চয়ই বলবে, তা একমাত্র আল্লাহর জন্যে –বলো, তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা কোন দিক থেকে প্রতারিত হচ্ছ?

 

(সূরা মুমিনুনঃ ৮৪-৮৯)

 

এ সবয় কয়টি আয়াত একসাথে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আরব জাহিলিয়াতের লোকেরা বাস্তবিকই আল্লাহকে জানত। তারা এ-ও বিশ্বাস করত যে, সৃষ্টিকর্তা ব্যবস্থাপক তিনিই, তাঁর হস্তে সবকিছুর প্রকৃত কর্তৃত্ব নিবদ্ধ।

 

কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা জাহিলিয়াতে নিমগ্ন ছিল। তাদের জাহিলিয়াত দিয়ে তারা আল্লাহকে যথার্থভাবে জানত না, তাঁর প্রতি প্রকৃত কার্যকর ঈমান রাখত না।

 

তাদের যাবতীয় ব্যাপারে তাঁকেই একমাত্র আইন-বিধানদাতা, শাসক, প্রশাসক, বিচার-ফয়সালাকারী রূপে মানতো না –গ্রহণও করত না।

 

এই কারণেই আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেনঃ

 

(আরবী*****************************************************************************)

 

তারা আল্লাহকে সেই মূল্য-গুরুত্ব-মর্যাদা দিত না, যা তাঁর অধিকার। যা তাঁর জন্যে উপযুক্ত ও শোভন। (সূরা আন’আমঃ ৯১)

 

হ্যাঁ, তারা আল্লাহকে জানত। কিন্তু তাদের এই জানা তাদের জীবনে প্রতিফলিত ছিল না। জানার স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতি যা হওয়া বাঞ্ছনীয়, তা হতো না।

 

তারা এক আল্লাহকে জানা সত্ত্বেও একই সাথে অন্যান্য বহু ইলাহর পূজা উপাসনা করত, দাসত্ব করত। …..তা ছিল তাদের অনুভূতিক ও  স্বজ্ঞাজনিত আকীদা।

 

তারা আল্লাহকে জানত, কিন্তু তাঁরা শরীয়ত –আইন-বিধান কার্যকর করত না। তাঁরই কাছে আইন-বিধান বা বিচার-ফয়সালা চাইত না, তাদের জীবনে তাঁরই আইন-বিধান একান্তভাবে মেনে নিতো না, মেনে চলত না। -এ ছিল তাদের বাস্তব জীবন-আচরণের অবস্থা।

 

আর এসব কারণেই তারা ‘কাফের’ আখ্যায়িত হয়েছে। তারা ছিল সত্যিকারভাবে জাহিল। কুরআন তাদের সে-জাহিলিয়াতের গোমর ফাঁস করে দিয়েছে। তাতে এই সব কিছুই শামিল ছিল।

 

আকীদার ক্ষেত্রে কুরআন তাদের সমর্থন করেনি, তা সম্ভবও ছিল না। তারা যেসব মূর্তি ও দেবদেবী –খোদা-ভগবানের ইবাদত বা পূজা-উপাসনা করত, তার লক্ষ্য সেইগুলোই ছিল না। তারা তা করত এইজন্যে যে, তারা মনে করত, এইগুলো তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। অথচ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে তো খালেস তাঁরই ইবাদত একান্ত প্রয়োজন। তাই কুরআন বলেছেঃ

 

(আরবী****************************************************************************************)

 

জেনে রাখো, আল্লাহর জন্যেই হবে খালেস দ্বীন। আর যারা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যান্যকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ করেছে এই মনোভাব পোষণের দাবি নিয়ে যে, আমরা তো ওদের ইবাদত করি না, আমরা ওদের কাছে শুধু এতটুকু চাচ্ছি যে, ওরা আমাদেরকে আল্লাহর অতি নিকটে পৌঁছে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন সেই সব বিষয়ে, যাতে তারা পরস্পর মতপার্থক্য রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ হেদায়েত করেন না কোনো কাফের মিথ্যাবাদীকে। (সূরা যুমারঃ ৩)

 

শরীয়ত বা আইন পালনের ব্যাপারে কুরআন অত্যন্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। কেননা বাস্তব জীবনে আইন পালন ও মনে আকীদা পোষণের মধ্যে একবিন্দু বিচ্ছিন্নতা বা বৈপরীত্য কুরআন মেনে নিতে আদৌ প্রস্তুত নয়। আর বস্তুতই শরীয়ত পালন থেকে বিপথগামী হলে তার ঈমান আছে বলে বিশ্বাস করা এক অসম্ভব ব্যাপার। জীবনের বিভিন্ন দিকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের দেওয়া আইন-বিধান পালন করা হবে, অথচ আল্লাহর প্রতি ঈমানদার হওয়ার দাবি করা হবে, তা নিতান্তই হাস্যকর। এই কথাই তো বলেছেন আল্লাহর নিম্নোদ্ধৃত আয়াতেঃ

 

(আরবী********************************************************************************************************************************)

 

আমরা তওরাত নাযিল করেছি। তাতে আছে হেদায়েত ও নূর। ইসলাম গ্রহণকারী নবীগণ, আল্লাহওয়ালা ও আলিম-বুদ্ধিমান লোকেরা ইহুদীদের জন্যে তারই ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা করে সেই অনুযায়ী, যা তারা আল্লাহর কিতাব থেকে হেফয করে রেখেছে, যার সংরক্ষক তাদের বানানো হয়েছিল। আর তারা তার সত্যতার সাক্ষী ছিল। অতএব তোমরা লোকজনকে ভয় পেয়ো না, ভয় আমাকেই করো। আর আমার আয়াত স্বল্পমূল্যের জিনিসরূপে বিক্রয় করো না। বস্তুত যারাই আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের, তাতে তাদের জন্যে এই আইন আমরা লিখে দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, নাকের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত দিতে হবে। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই কিসাসের আওতাভুক্ত। তবে যদি কেউ তা মাফ করে দেয়, তাহলে তা তার জন্যে কাফফারা হবে। আর যে লোকেরা বিচার-ফয়সালা করে না আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী, তারা জালিম। তাদের পরে পরেই আমরা নিয়ে এলাম মরিয়ম-পুত্র ঈসাকে। তাদের কাছে তওরাতের যে অংশ রয়েছে তার সত্যতা ঘোষণাকালী হিসেবে। এবং তাঁকে আমরা ইনজিল দিলাশ। তাতে যেমন হেদায়েত আছে, তেমনি নূর। আর তা সত্যতা প্রমাণকারী তওরাতের যা বর্তমান আছে তার। এবং তা হেদায়েত ও উপদেশ মুত্তাকী লোকদের জন্যে। ইনজিল-বিশ্বাসীদের উচিত আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা। আর যারাই আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক। অতঃপর আমরা তোমার প্রতি –হে নবী কিতাব নাযিল করেছি পরম সত্যতা সহকারে। পূর্ববর্তী কিতাবের অবশিষ্টের সত্যতা বিধানকারী, তার সংরক্ষক। অতএব তুমি তাদের মধ্যে হুকুমত চালাও আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী, আর তাদের ইচ্ছা-বাসনার অনুসরণ করে আল্লাহর দেওয়া বিধান থেকে দূরে সরে থেকো না। তোমাদের জন্যেই একটা শরীয়ত ও একটা প্রশস্ত পথ বানিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের এক উম্মতভুক্ত বানিয়ে দিতেন। কিন্তু তা বানান নি, যেন তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। অতএব তোমরা সকলে সকল কল্যাণময় কাজের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে যাও। আল্লাহই তোমাদের সকলেরই চূড়ান্ত পরিণতি। তখন তিনি তোমাদের পারস্পরিক বিরোধিতার বিষয়ের মধ্যে প্রকৃত সত্য কোনটি তা জানিয়ে দেবেন। আর তুমি তাদের মধ্যে হুকুমত চালাও আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী, আর তাদের ইচ্ছা-বাসনার অনুসরণ করে আল্লাহর দেওয়া বিধান থেকে দূরে সরে থেকো না। তোমাদের জন্যেই একটা শরীয়ত ও একটা প্রশস্ত পথ বানিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের এক উম্মতভুক্ত বানিয়ে দিতেন। কিন্তু তা বানান নি, যেন তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। অতএব তোমরা সকলে সকল কল্যাণময় কাজের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে যাও। আল্লাহই তোমাদের সকলেরই চূড়ান্ত পরিণতি। তখন তিনি তোমাদের পারস্পরিক বিরোধিতার বিষয়ের মধ্যে প্রকৃত সত্য  কোনটি তা জানিয়ে দেবেন। আর তুমি তাদের মধ্যে হুকুমত চালাও আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী। তাদের কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। তাদের ব্যাপারে তুমি সতর্ক থাকবে, কেননা তারা তোমার প্রতি আল্লাহর নাযিল করা কোনো কোনো বিধানের ব্যাপারে তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে। ওরা যদি পৃষ্ঠপ্রদর্শনও করে, তবু তুমি জানবে যে, আল্লাহ চাহেন তাদের কোনো কোনো গুনাহের জন্যে তাদেরকে মুসীবতে নিমজ্জিত করবেন। যদিও বেশির ভাগ লোকই ফাসিক। ওরা কি জাহিলিয়াতের আইন-শাসন-প্রশাসন পেতে চায়? অথচ দৃঢ় প্রত্যয় সম্পন্ন লোকদের জন্যে আল্লাহর চাইতে অধিক উত্তম বিধানদাতা –বিচার ফয়সালাকারী আর কে হতে পারে?

 

(সূরা মায়িদাঃ ৪৪-৫০)

 

অন্যত্র বলেছেনঃ

 

(আরবী***************************************************************************************)

 

যার ওপর যবেহ কালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা তোমরা খেয়ো না –তা খাওয়া নিশ্চয়ই ফিসক। আর শয়তানেরা তাদের বন্ধু চেলাদের প্রতি অবশ্য গোপন কথা পাঠায়। যেন তারা তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। আর তোমরা যদি তাদের আনুগত্য করো, তাহলে তোমরা নিশ্চয়ই মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা আন’আমঃ ১২১)

 

এ দীর্ঘ উদ্ধৃত আয়াত থেকে অকাট্যভাবে জানা গেল, শরীয়ত আইন পালনের ব্যাপারটি প্রকৃতপক্ষে আকীদা বিশ্বাসেরই ব্যাপার, এ দুটির মধ্যে কোনোই তারতম্য হতে বা বিচ্ছিন্নতা হতে পারে না। হয় আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী আইন বিধান জারী ও বিচার-ফয়সালা করা হবে, না হয় হবে জাহিলিয়াত ও শিরক অনুযায়ী। অতএব আল্লাহর সত্যিকার পরিচিতি লাভ তাঁর প্রতি যথার্থ ঈমান গ্রহণ –এর অনিবার্য ফলশ্রুতি হচ্ছে একান্তভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া, ইলাহ হিসেবে কেবল তাঁকেই গ্রহণ করার মতোই ব্যাপার। কেননা তিনি একাই তো সৃষ্টিকর্তা, মালিক। কাজেই তিনি একাই এই মর্যাদায়  অভিষিক্ত যে, কেবল তাঁকে মান্য করা হবে, মেনে চলা হবে কেবল তাঁরই দেওয়া বিধান। মান্য করা কর্তব্য কেবল তাঁকেই। আকীদা বিশ্বাস ও শরীয়াতের বিধান পালন এক অভিন্ন ব্যাপার, যার দুই অংশ বা দিক হলেও তা এক অভিন্ন মৌল থেকে নির্গত। একই পরিণতির দিকে অগ্রসরমান। সে অভিন্ন মৌল হলো আল্লাহর প্রতি  ঈমান এবং অগ্রসর হওয়ার পথ বা পন্থা হচ্ছে ইসলাম।

 

পক্ষান্তরে প্রতিটি জাহিলিয়াতের নির্দিষ্ট দিক আছে। সেই দিকটিই তাকে জাহিলিয়াতরূপে নির্ধারিত করে। জাহিলিয়াতের সে দিকটি হচ্ছে আল্লাহর প্রতি সত্যিকার ঈমান না আনা অথবা যে কোনো বিষয়ে ইসলাম পালন না করা। এখানে আকীদা ও শরীয়ত, শরীয়ত ও আকীদা অভিন্ন, অবিচ্ছিন্ন। এ দুয়ের মধ্যে যেমন বিচ্ছিন্নতা আসতে পারে না, তেমনি পারে না কোনোরূপ পার্থক্য সৃষ্টি হতে।

 

ঈমানের ঐকান্তিক দাবি হচ্ছে আল্লাহকেই এককভাবে ‘ইলাহ’ মেনে নেওয়া। আর ইসলামের দাবি হচ্ছে এককভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা, কেবল তাঁরই দেওয়া আইন বিধানকে একমাত্র আইন বিধানরূপে গ্রহণ ও অবলম্বন করা।

 

আর আল্লাহকে একক ইলাহ ও একক সার্বভৌম না মানলেই জাহিলিয়াত উদ্ভূত হয়। তখন আল্লাহর সাথে শরীক করা হয় অন্যান্য অনেক ইলাহকে। আর তখন এক আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিচার-ফয়সালাকরণও সম্ভব হয় না।

 

বস্তুত জাহিলিয়াত যখন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ ও বিচার-ফায়সালা করে না, তখন তা অনিবার্যভাবে লোকদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা ইচ্ছা কামনারই অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

 

আর এটাই হচ্ছে প্রতিটি জাহিলিয়াতের দ্বিতীয় লক্ষণ। তা মৌলিকভাবে এক আল্লাহর প্রতি সত্যিকার ঈমান না থাকা এবং তাঁরই কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পিত না হওয়া থেকেই উৎসারিত।

 

এবং হুকুমত করো তাদের মধ্যে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী। তাদের ইচ্ছা-বাসনা অনুসরণ করো না। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। তারা তোমাকে তোমার প্রতি অবতীর্ণ কোনো কোনো বিধানের ব্যাপারে বিপদে ফেলতে পারে।[আল মায়িদাঃ ৪৯।]

 

তাহলে বোঝা গেল, গোটা ব্যাপারটাই পরস্পর সম্পৃক্ত, অবিভাজ্য। হয় আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে –আর এ থেকেই ইসলাম, একান্তভাবে তাঁর কাছে আত্মসমর্পিত হওয়া এবং তাঁরই নাযিল করা বিধান পালন অনিবার্য ফলশ্রুতিস্বরূপ প্রাপ্ত। পক্ষান্তরে জাহিলিয়াত হচ্ছে লোকদের কামনা-বাসনা-ইচ্ছার অনুসরণ। এর প্রতিটি বিধান আল্লাহর বিধান থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্নতর এবং নিছক কামনা-বাসনা মাত্র। এটা আল্লাহরই নির্ধারণ, জীবনের ইতিহাস থেকেই এক কথার সত্যথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

 

হ্যাঁ,লোকদের কামনা-বাসনা-চিন্তা এক যুগ থেকে যুগান্তরে, এক পরিবেশ থেকে ভিন্নতর পরিবেশে পার্থক্য সম্পন্ন হয়ে থাকে। এক জনগোষ্ঠী থেকে অপর জনগোষ্ঠীতেও এই ভিন্নতা অবশ্যই লক্ষণীয়। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তা ইচ্ছা-বাসনা জনগণের মধ্য  থেকে এক অংশের মাত্র। তা দিয়েই সমগ্র জনগোষ্ঠীকে শাসন করা হয়, সকলকে তা অকুণ্ঠিতভাবে মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। তাতে বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির কল্যাণ সাধিত হলেও হতে পারে; কিন্তু অবশিষ্ট সমস্ত সৃষ্টি এই কামনা-বাসনা-ইচ্ছা অনুপাতেই অধীনতা বা গোলামী করতে বাধ্য হয়।

 

শরীয়াতের বিধান এক আল্লাহ প্রদত্ত। তাতে লোকদের কামনা-বাসনা-ইচ্ছার একবিন্দু স্পর্শও লাগেনি। কেননা আল্লাহর নিজের জন্যে কল্যাণের চিন্তা নেই এই জনগোষ্ঠীর সাথে। ফলে তাঁর পক্ষপাতিত্বও নেই। তিনি নিজেই বলেছেনঃ

 

(আরবী**************************************************************************************)

 

আমি তো তাদের কাছ থেকে কোনো রিযিক পেতে চাই না, তারা আমাকে খাওযাবে এমন কোনো ইচ্ছাও নেই আমার। (সূরা যারিয়াতঃ ৫৮)

 

সব মানুষই তাঁর সৃষ্ট, সকলেই তাঁর কাছে সমান। কারোর ওপর কারোর কোনো মর্যাদাধিক্য বা অগ্রাধিকার নেই তাঁর কাছৈ। তা পাওয়ার একমাত্র ভিত হচ্ছে তাকওয়া।

 

(আরবী****************************************************************************************)

 

হে মানুষ! আমারই তোমাদের একজন পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, আর বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছি শুধু এজন্যে, যেন তোমরা পরস্পরের পরিচিতি লাভে সক্ষম হও। নিশ্চিত কথা, তোমাদের মধ্যকার সর্বাধিক মুত্তাকী ব্যক্তিই তোমাদের মধ্য থেকে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানার্হ। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সর্ববিষয়ে অবহিত।

 

(সূরা হুযরাতঃ ১৩)

 

অতএব হয় আল্লাহর শরীয়ত পালন করা হবে –আর তা-ই ইসলাম। অথবা লোকদের চিন্তা-ইচ্ছা-কামনা-বাসনার অনুসরণ করা হবে। আর তা-ই জাহিলিয়াত। সর্বকালে ও সর্বস্থানেই এই কথা যথার্থ, শাশ্বত।

 

তৃতীয় নিদর্শনটি সকল জাহিলিয়াতের ক্ষেত্রে অভিন্ন। আর তা হচ্ছে আল্লাহদ্রোহী সীমালংঘনকারী ক্ষমতাসীনদের অবস্থিতি। তারাই সর্বক্ষণ ও সর্বতোভাবে সচেষ্ট থাকে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত থেকে এবং এক আল্লাহর দেওয়া শরীয়ত পালন থেকে বিরত রাখতে। যেন তারা বাধ্য হয়ে সেই আল্লাহদ্রোহী-সীমালংঘনকারী লোকদের দাসত্ব করতে এবং তাদের বানানো শরীয়ত-বিধান, আইন-পালন করতে (যা তারা নিজেদের খাহেশ-কামনা-বাসনা-ইচ্ছার ভিত্তিতে রচনা করছে) বাধ্য হয়। এই কথাই বলা হয়েছে এ আয়াতেঃ

 

(আরবী*****************************************************************)

 

আল্লাহ বন্ধু পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন ঈমানদার লোকদের। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে বের করে নিয়ে আসেন। আর কাফেরদের বন্ধু পৃষ্ঠপোষক হয়েছে আল্লাহদ্রোহী-সীমালংঘনকারী লোকেরা। তারাই তাদের বের করে আনে আলো থেকে পুঞ্জীভূত অন্ধকারের দিকে। (সূরা বাকারাঃ ২৫৭)

 

(আরবী*******************************************************************************)

 

যারা ঈমানদার, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। আর যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে আল্লাহদ্রোহী-সীমালংঘনকারীদের পথে…। (সূরা নিসাঃ ৭৬)

 

এই আল্লাহদ্রোহী-সীমালংঘনকারী লোকদের কর্তৃত্ব থাকাটা একটা অবিচ্ছিন্ন লক্ষণ আল্লাহর পথ থেকে দূরে নিঃসম্পর্ক হয়ে থাকার। তাই মানুষ যখনই সত্যিকার ইবাদত থেকে বিপথগামী হবে, তখন তারা অন্যান্য সত্তার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করবে –এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি অনিবার্য। তা একক সত্তার ইবাদত হতে পারে, হতে পারে আল্লাহর সাথে শিরক সহকারে। আর আল্লাহ ছাড়া এ সব মা’বুদ তখনই আল্লাহদ্রোহী সীমালংঘনকারী হয়ে দাঁড়ায়।

 

সে ‘তাগুত’-আল্লাহদ্রোহী-সীমালংঘনকারী এক ব্যক্তি হতে পারে। একটি গোষ্ঠী হতে পারে, হতে পারে একটি জনসমষ্টি। প্রচলিতভাবে হতে পারে, হতে পারে অন্ধ অনুসরণ হিসেবে। অথবা অন্য কোনো শক্তিও মানুষকে দাস বানিয়ে রাখতে পারে। তখন তাদের পক্ষে সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

‘তাগুত’-সে এক ব্যক্তি হোক, কি হোক এক গোষ্ঠী বা দল, জনগণ এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনুক এবং কেবল মাত্র তাঁরই ইবাদত করুক যেমন করে তাঁর ইবাদত করতে হয়, তা কোনো দিনই বরদাশত করবে না। কেননা যেখানে আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রাধান্য-সার্বভৌমত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা সাধারণভাবে স্বীকৃত ও মান্য, তথায় ‘তাগুত’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না, টিকতে ও বসবাস করতেও পারে না। তাই তাকে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে ফিরাবার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করতে হয়। তারপরই তার নিজ ইচ্ছা বাসনার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা করা সম্ভব।

 

এই কারণে তাগুত সব সময়ই সত্য নির্ভুল আকীদার সাথে চরম শত্রুতা করতে বাধ্য থাকে। কেননা জনগণের বন্ধুত্ব-পৃষ্ঠপোষকতা, কর্তৃত্ব –সব কিছু তার নিজের জন্যে একান্ত করে রাখতে বদ্ধপরিকর। সত্য-সঠিক আকীদা তো এ সবকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে একান্ত করে দেয়।

 

আর এই জন্যেই জাহিলিয়াত –আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামিতা –অনিবার্যভাবে ‘তাগুতকে’ বহাল তবিয়তে প্রতিষ্ঠিত রাখে। ‘তাগুত’ ছাড়া জাহিলিয়াত হয় না, জাহিলিয়াত তাগুত ছাড়া চলতে পারে না।

 

চতুর্থ নিদর্শনটিও  সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে বর্তমান। তাও আল্লাহর নীতি ও পদ্ধতি থেকে দূরত্বের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। যদিও তার কারণসমূহ মানব প্রকৃতি নিহিত। আর তা হচ্ছে লালসা-কামনার স্রোতে ভেসে যাওয়া।

 

লালসা-কামনা মানুষের খুবই প্রিয় জিনিস। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী********************************************************)

 

জনগণের কাছে খুবই প্রিয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে লালসা-কামনা স্ত্রীলোক, পুত্র সন্তান, আর স্বর্ণ-রৌপ্যের স্তুপীকৃত সম্পদ, চিহ্নযুক্ত অশ্ব, গৃহপালিত পশু, ক্ষেতখামার ইত্যাদি বিষয়। এসব হচ্ছে বৈষয়িক জীবরে জন্যে জরুরী সামগ্রী। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪)

 

বস্তুত আয়াতে উল্লেখিত দ্রব্যাদির সব কিছুরই একটা পরিমাণ মানব জীবনের জন্যে একান্তই অপরিহার্য। অপরিহার্য সেই খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্যে, যার দেহসত্তায় কতকগুলো জৈবিক দাবি একত্র করে রেখে দেওয়া হয়েছে। যেমন খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান, পোশাক, যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা, প্রকাশ ও মালিকানা দখল।[(আরবী*************) গ্রন্থের (আরবী**************) অধ্যায় দ্রষ্টব্য।] ব্যক্তিকে জীবনের সাথে সম্পৃক্ত রাখার জন্যে এবং তাকে জীবনের পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে এগুলোর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।

 

কিন্তু এগুলোর পরিমাণ যখন যুক্তিসঙ্গত পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশী হয়ে যায়, আর লালসা-কামনা যদি মানব সত্তার ওপর আধিপত্যশীল হয়ে বসে, তখন সে তার স্বভাবসম্মত দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, যার জন্যে আল্লাহ এগুলোকে উদ্ভাবিত করেছেন। তখন মানব সত্তাটিকেই তা ধ্বংস করে। তার শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। খিলাফতের দায়িত্ব পালন থেকে তাকে বিরত রাখে। ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত মহান মানবীয় মর্যাদা থেকেও অনেক নীচে নামিয়ে দেয়। (অথচ আল্লাহ তাকে মহা সম্মানিতই বানিয়েছিলেন) তখন তাকে জন্তু-জানোয়ার আর শয়তানের পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দেয়।

 

এই মানব সত্তাটিকে এই পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে কেবলমাত্র তার আল্লাহতে বিশ্বাস এবং এমন এক জীবনধারা যা আল্লাহর শরীয়াতের বাস্তব ব্যবস্থার অধীন অতিবাহিত হয়।

 

অতীত শতাব্দীসমূহে মানব সংক্রান্ত সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই সত্যকে অনস্বীকার্য করে দেয়। হয় হেদায়েত অবলম্বন হবে আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতে, না হয় লালসা-কামনার খরস্রোতে রসাতলে ভেসে যাওয়া হবে। তখন এই লালসা-কামনাই সবকিছু, সকল প্রকার বাসনা-কামনাই তখন প্রকট। তন্মধ্যে যৌন লালসা সর্বাগ্রে। মানুষ এই যৌন লালসার তীব্র আকর্ষন থেকে নিজেকে কখনোই বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। …হ্যাঁ পারে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যে –আল্লাহর ভয়ে, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে।

 

তবে আইন ও শাসন এবং শাস্তির ভয়টাও এ ব্যাপারে কম ভূমিকা পালন করে না। এই কারণে মানুষ অপরাধ করে গোপনে, লোকদের না দেখিয়ে। যেন তারা ধরা পড়ে আইনের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য না হয়।

 

প্রচলিত আইন যে কাজকে অপরাধ গণ্য করে, অপরাধীরা সেই সব কাজ গোপনেই করতে চেষ্টা করে। আর লোকভয় থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্যে লোকদের না দেখিয়ে সে কাজ করে। কিন্তু সে অপরাধ থেকে নিজেকে প্রকৃতপক্ষে দূরে রাখতে পারে না। পারে কেবল তখন, যখন আল্লাহর ভয় তার মনে প্রবল হয়ে ওঠে। কেননা আল্লাহর কাছ থেকে কিচু লুকোনো যায় না।

 

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় একথা অকাট্যরূপে প্রতিষ্ঠিত যে, দুনিয়ার জাহিলিয়াতসহ নৈতিক নির্লজ্জতা –জ্বিনা-ব্যভিচারকে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার জন্যে কখনোই কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এক্ষেত্রে আরব জাহিলিয়াত, পারসিক জাহিলিয়াত, ভারতীয় জাহিলিয়াত, গ্রীক, রোমান ও ফিরাউনী জাহিলিয়াত এবং তখনকার এই বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত সবই একাকার, অভিন্ন। অবশ্য কারণ বিভিন্ন।

 

কখনও কারণ হয়, শাসক-প্রশাসক তাগুত একান্তভাবে তার নিজের কল্যাণের বিষয়াদিতে গভীরভাবে আত্মনিমগ্ন হয়ে পড়ে; তার বাইরে অন্য সব ব্যাপারাদির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার অবসরই পায় না। আল্লাহর বিধান ছাড়া যে শাসন-প্রশাসন, আসলে তা-ই তাগুত। ফলে সাধারণ মানুষ যৌনতার ক্ষেত্রে কোনো গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে, তা লক্ষ্য করার মতো কোনো অবকাশই তা পায় না। ফলে এই বিপথগামিতা থেকে তাদের রক্ষা করার কেউ থাকে না।

 

অনেক সময় ‘তাগুত’ নিজেই নির্লজ্জতা জ্বিনা-ব্যভিচারের প্রসারতা ঘটানোর জন্যে সচেষ্ট হয়, যেন সে নিজেই একদিকে হারাম সম্পদ আহরণ করে ভোগ-বিলাস করার সুযোগ পেতে পারে, অপরদিকে জনগণের ওপর তার চাপানো জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো কোনো মন-মানসিকতা বা ঈমানী সাহসিকতা কারুর মধ্যেই না থাকে। তার গোটা শাসন প্রশাসনই তো জুলুম। আল্লাহর বিধান ছাড়া যে শাসন, তা জুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়। এই কারণে জনগণের যৌন-উচ্ছৃঙ্খলতায় ডুবে যাওয়া থেকে চক্ষু ভিন্ন দিকেই ফিরিয়ে রাখে। ফলে জনগণও তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, আর তাগুতি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠা থেকে দূরে সরে থাকে।

 

সে যা-ই হোক, প্রতিটি জাহিলিয়াতেই যৌন লালসা-কামনা-স্রোতে মানুষের বিপথগামী হওয়া এক অনিবার্য ও অবধারিত অবস্থা।

 

ইতিহাসে আজ পর্যন্ত যতগুলো জাহিলিয়াতের অভ্যুদয় ঘটেছে তার প্রতিটিতেই এই লক্ষণটি প্রকটভাবে বর্তমান দেখা গেছে। তার প্রতিটিই সেই বড় ও প্রধান কারণ থেকে উৎসারিত, যা প্রতিটি জাহিলিয়াতেই অনিবার্যভাবে বিরাজিত। আর তা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামিতা।

 

এ এক অভিন্ন ও সম্মিলিত লক্ষণ। কোনো জাহিলিয়াতই তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। যা আরব জাহিলিয়াতে ছিল। পারসিক, গ্রীক, রোমান ও ফিরাউনী জাহিলিয়াতে তা পুরামাত্রায় বর্তমান ছিল। আর আধুনিক জাহিলিয়াতেরও তা রয়েছে পুরোপুরিভাবে। তবে বাহ্যিক প্রকাশ হয়ত বিভিন্ন হতে পারে কখনও কখনও। কখনও আবর তা-ও হয় না।

 

আরব জাহিলিয়াতে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামিতা ছিল আকীদার দিকে যেমন, তেমনি শরীয়াতের ক্ষেত্রেও। আল্লাহর ঘরে ও আশে-পাশে মূর্তি-প্রতিমূর্তির হরদম পূজা হচ্ছিল। তথায় জাহিলিয়াতের আইন কার্যকর ছিল আল্লাহর শরীয়তের পরিবর্তে। মানুষের ওপর, তাদের যাবতীয় কর্ম তৎপরতার ওপর খাহেশ-কামনা-বাসনার প্রাধান্য ও আধিপত্য ছিল। তথায় শক্তিমান দুর্বলের ওপর অন্যায়ভাবে জয়ী হতো। বিচার ক্ষেত্রে সত্যতার কোনো যোগ ছিল না। যা কিছু হতো তা হতো শক্তির জোরে, শক্তির পক্ষে। কুরায়শবংশের সরদারই সেখানে ‘তাগুত’ হয়ে বসেছিল। যারা গণকদার ও প্রাচীন রীতিনীতির পুনরুজ্জীবনকারী, তা যেমন বিপথগামী, তেমনি পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুসরণের নামান্তর। তারা যা ইচ্ছা করত, হারাম ঘোষণা করত। যা পছন্দ হতো, তাকেই হালাল বানিয়ে দিত। কেবল তাই নয় –অনেক সময় এক বছর যা হারাম ঘোষণা করত, পরবর্তী বছর তাই হালাল ঘোষণা করে দিত। যখন তাদের মন যা চাইত, পরবর্তী বছর তাই হালাল ঘোষণা করে দিত। যখন তাদের মন যা চাইত, তাই করত। বাতিল শাসকরা ক্ষমতাসীন হয়ে জনগণকে অকথ্যভাবে লাঞ্ছিত অপমানিত করত। তারা সাধারণ মানুষের গরদানের ওপর সওয়ার হয়ে বসেছিল। আর লালসা কামনার শক্তি মদ্য, নারী, জুয়া, হত্যা, লুটপাট, অধিকার হরণ, ছিনতাই, আত্মম্ভরিতা ও সীমালংঘনমূলক অহংকার গৌরব করার মাধ্যমে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর ছিল এবং তার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিল।

 

আর আজ চৌদ্দশ বছর পর আধুনিক জাহিলিয়াত ঠিক সেই বিশেষত্ব ও লক্ষণাদি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামী হওয়ার ব্যাপারটি আকীদা ও শরীয়তের বিধান উভয় ক্ষেত্রেই সর্বজনবিদিত ব্যাপার। সেদিকে শুধু ইঙ্গিত করাই যথেষ্ট। কিন্তু একালের জাহিলিয়াতে বিপথগামিতা বহু সত্যের ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র আকীদা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি। শরীয়ত পরিহারের ব্যাপারটিও তার সকল নিদর্শনসহ ব্যাপকভাবে কার্যকর। এ জাহিলিয়াত পূর্ণমাত্রায় নাস্তিকতা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মানুষ ব্যক্তিগতভাবেই সে নাস্তিকতা গ্রহণ করে থাকুক, অথবা তাগুতী শক্তি জনগণের ওপর চাপিয়েই দিক। আর শয়তানের সকল অবস্থাতেই তার মাত্রা অনেক বৃদ্ধি করে দিয়েছে।

 

লালসা-কামনা ও নিজস্ব মনের চিন্তা-ভাবনার অনুসরণে বর্তমান শতাব্দীর জাহিলিয়াত শীর্ষস্থান দখল করে বসেছে। অতীতের কোনো জাহিলিয়াতেই নফসের লালসা প্রবৃত্তির এতটা দাসত্ব আর কখনোই করা হয়নি। প্রতিটি ব্যাপারেই তা লক্ষণীয়। আর পূর্বে ও পশ্চিমে কোনোই পার্থক্য নেই এ ব্যাপারে। সর্বত্রই আকীদার বিশ্বাসকে পদদলিত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়েছে। যা কিছু পবিত্র, সম্মানার্হ, তার প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয়েছে, তাকে বিদ্রূপ করা হয়েছে। মানুষের কাজ-কর্মের সমস্ত নিয়ম-নীতি লংঘন করা হয়েছে। আর নিছক ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে নিতান্তই বেহুদা ও অপ্রয়োজনীয় তত্ত্ব উদ্ভাবন করা হয়েছে।

 

একালের ‘তাগুত’দের সংখ্যা যে কত, তা হিসেব-নিকেশের আওতা ছাড়িয়ে গেছে। পূঁজিতন্ত্র, প্রোলেটারিয়েট, মিথ্যা কল্পিত কিসসা-কাহিনী ও তাৎপর্যহীন মূল্যমান ও মূল্যবোধ, এসবই কি একালের বড় বড় তাগুত নয়?

 

আর একালের লালসা-বাসনা-কামনার প্রচণ্ডতার কথা বরং না বলাই ভালো।

 

এই নিদর্শনসমূহ এতই সাধারণ যে, দুনিয়ার বুকে সৃষ্ট ইতিহাসের কোনো জাহিলিয়াতই এই সব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।

 

সমস্ত জাহিলিয়াতে সমানভাবে বর্তমান থাকা অভিন্ন মূল্যায়ন ও নিদর্শনসমূহের সাথে পরিচিত হওয়ার পর, আধুনিক জাহিলিয়াতের বিশেষত্বসমূহের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করব, যেন আমাদের মানসপটে সে সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণার সৃষ্টি হয়। এই বিশেষত্বসমূহ সেই প্রধান বড় ও মৌল নিদর্শন থেকেই উৎসারিত। আর তা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিপথগামিতা। কিন্তু  আধুনিক জাহিলিয়াত এই ক্ষেত্রেও তার রূপ ও খুঁটিনাটি দিক দিয়ে বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র স্থান দখল করেছে। এর কারণ হচ্ছে পরিবেশগত পরিস্থিতি আর জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার বিবর্তন এবং সেই চিন্তা যা আল্লাহ প্রদত্ত পন্থা ও পদ্ধতি থেকে দূরবর্তিথা এবং তার সাথে শত্রুতা গ্রহণের দরুন উদ্ভুত হয়েছে।

 

ইতিহাসের প্রতিটি জাহিলিয়াতে এমন একটা বিশেষ বিশেষত্বও রয়েছে, যা তার অভিন্ন ও সর্ব জাহিলিয়াতের বর্তমান বিশেষত্ব থেকে তাকে পৃথকভাবে প্রতিভাত করে।

 

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আরব জাহিলিয়াতের একটি বিশেষত্ব ছিল সন্তান হত্যা ও তাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করা, নারী ও পুরুষের এক মহা উলঙ্গ ও বস্ত্রহীন অবস্থায় আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করা, কোনো কোনো ফসল ও জীবজন্তু কোনো কারণ ছাড়াই হারাম বলে নির্দিষ্ট করা ইত্যাদি। এই কাজ নিতান্ত হাস্যকর। তবু এগুলোই ব্যাপক প্রচলিত ছিল তখনকার সময়ে।

 

(আরবী**********************************************************************************************************)

 

এবং এই লোকেরা আল্লাহর জন্যে তাঁর নিজেরই পয়দা করা ক্ষেত খামারের ফসল ও গৃহপালিত পশুর একটি অংশ নির্দিষ্ট করেছে এবং বলেছে এটা আল্লাহর জন্যে আসলে এটা হচ্ছে তাদের নিজেদের ধারণা অনুমান –আর এটা আমাদের বানানো শরীক মা’বুদের জন্যে। কিন্তু যে অংশ তাদের বানানো শরীক মা’বুদদের জন্যে, তা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, অথচ যা আল্লাহর জন্যে, তা তাদের বানানো শরীকদের পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কতই না খারাপ এই লোকদের সিদ্ধান্ত। এমনিভাবে তাদের শরীকেরা বহু সংখ্যক মুশরিকদের জন্যে তাদের নিজেদের সন্তানকে হত্যা করার কাজকে খুবই আকর্ষণীয় ও চাকচিক্যময় বানিয়ে দিয়েছে, যেন তারা তাদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত করে। আল্লাহ চাইলে তারা এরূপ করত না। কাজেই তাদের ছেড়ে দাও, তারা নিজেদের মিথ্যা রচনায় নিমগ্ন থাকুক। তারা বলে, এই জন্তু ও এই ক্ষেত ফসল সুরক্ষিত। এগুলো কেবল তারাই খেতে পারবে, যাদের আমরা খাওয়াতে চাইবে। অথচ এই বিধি-নিষেধ তাদের নিজেদের কল্পিত। এছাড়া কিছু জন্তু, জানোয়ার এমন আছে যেগুলোর ওপর সওয়ার হওয়া ও মাল বোঝাই করাকে হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আর কিছু কিছু জন্তুর ওপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। এসব কিছুই তারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বানিয়ে নিয়েছে। অতিশীঘ্র আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যা রচনার প্রতিশোধ দেবেন। আর তারা বলে, এই জন্তুগুলোর গর্ভে যা আছে, তা আমাদরে পুরুষদের জন্যে বিশেষভাবে রক্ষিত এবং আমাদের নারীদের জন্যে তা হারাম। কিন্তু তা যদি মৃত হয়, তবে উভয়ই তা খাওয়াতে শরীক হতে পারে।…. (সূরা আন’আমঃ ১৩৬-১৩৯)

 

গ্রীক জাহিলিয়াতের পার্থক্যসূচক বিশেষত্ব ছিল জ্ঞানবুদ্ধির দাসত্ব ও দেহের পূজা। আর রোমান জাহিলিয়াতের বিশেষ লক্ষণ ছিল পাশবিক ধরনের মারামারির খেলার প্রতিযোগিতা। আর ভারতীয় জাহিলিয়াতের বশেস নিদর্শন হচ্ছে সেবা দাসী ব্যবস্থা যা এখন পর্যন্ত চালু রয়েছে। তাতে এই মেয়েরা নিতান্ত বেশ্যা হয়ে মন্দিরসমূহের পরিচর্যার কাজে নিযুক্ত থাকে এবং দেহদানের কাজকে ধর্মীয় কাজ মনে করে। মিসরীয় জাহিলিয়াতের বিশেষ বিশেষত্ব ছিল ফিরাঊনের ইবাদত –দাসত্ব ও আনুগত্য এবং তার খেদমত করতে গিয়ে চরম মাত্রার লাঞ্ছনা ভোগ করতে বাধ্য হওয়া। আর মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতের বিশেষত্ব ছিল গীর্জার সীমালংঘন, বিদ্রোহ, গীর্জার আভ্যন্তরীণ চারিত্রিক উচ্ছৃঙ্খলতা এবং ক্ষমতার সার্টিফিকেট বিতরণ।

 

অনুরূপভাবে আধুনিক জাহিলিয়াত কতকগুলো যৌথ ও অভিন্ন বিশেষত্বের ধারক হওয়ার সঙ্গে কিছু কিছু পার্থক্যসূচক বিশেষত্বেরও অধিকারী। এখানে সেগুলোর উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ

 

উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে মানবতাকে আল্লাহর হেদায়েত থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার, পথভ্রষ্ট করার এবং আল্লাহর সৃষ্টিকুলকে চরম দুঃখ-কষ্টে নিমজ্জিত করার কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করা।

 

বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও উদ্ভাবন ও বস্তুগত উন্নতি উৎকর্ষতার নেশায় মত্ত হয়ে মানুষকে আল্লাহর সাথে মোকাবিলায় লাগিয়ে দেওয়া। আর এই কথা মনে করা যে, বর্তমানের এই চরম উন্নীত যুগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন মানুষের নেই। সেই সাথে এ কথাও যে, একালে স্বয়ং মানুষই আল্লাহ হয়ে গেছে। -বৈজ্ঞানিক মতবাদ ও মতাদর্শসমূহ। বর্তমানে এগুলোই সমাজবিদ্যা, অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্ব –জীবনের সকল বিভাগেই মানব জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

 

 

 

-নারী সমাজের স্বাধীনতার নামে চরম মাত্রায় উচ্ছৃঙ্খলতা

 

এ অধ্যায়ে আমরা আধুনিক জাহিলিয়াতের পার্থক্যসূচক বিশেষত্ব কিংবা অপরাপর অভিন্ন ও সাধারণ বিশেষত্ব পর্যায়ে বিস্তারি আলোচনা করছি না। পরবর্তী অধ্যায়সমূহে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। কিন্তু এ পর্যায়ে আধুনিক জাহিলিয়াত সৃষ্ট মহাবিপদ সম্পর্কে কথা বলছি।

 

এ জাহিলিয়াত যে সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কারণ এ জাহিলিয়াতের সমর্থনে নিয়োজিত রয়েছে সীমাহীন জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সীমাতিরিক্ত বস্তুগত শক্তি-সামর্থ্য। এ জাহিলিয়াত মানুষের জন্যে কতিপয় সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা ও আরাম-আয়াসের সরঞ্জাম যোগাড় করে দিয়েছে। এগুলো বাহ্যতঃ খুবই কল্যাণকর মনে হয় বটে! কিন্তু আসলে তা-ই জাহিলিয়াতের বড় ধারক পরিপোষক।

 

এ কারণেই এ গ্রন্থের ভূমিকায় আমরা বলে এসেছি যে, আধুনিক জাহিলিয়াত ইতিহাসের অন্যান্য সকল জাহিলিয়াতের তুলনায় অধিক কর্দমাক্ত, অধিক জঘন্য এবং অধিক রূঢ়, নির্মম। প্রাচীন জাহিলিয়াতসমূহে ‘বাতিল’ ছিল সুস্পষ্ট, প্রকট। তার বাতুলতা জনতে বুঝতে কোনোই অসুবিধা হতো না। তা সত্ত্বেও প্রাচীন জাহিলিয়াতসমূহে জনগণের বিবেক-বুদ্ধির ওপর মুর্খতার প্রাধান্য ও প্রতিপত্তি থাকত। বাতিল সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা তাদের হতো না বা ছিল না। তখন তারা বুঝতে পারত যে, যে সত্যের আহবান তাদের দেওয়া হচ্ছে, তা নিতান্তই বাতিল ও ক্ষতিকর ছাড়া কিছুই নয়।

 

এতদসত্ত্বেও সে সব জাহিলিয়াত অজ্ঞতা-মুর্খতা, অন্যায় ও বাতিলের পরিমাণ ও মাত্রা কমই ছিল এবং জাহিলিয়াতের সাথে এক প্রচণ্ড যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব সংগ্রামের শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে হেদায়েতই সাফল্যমণ্ডিত হতো। অতঃপর সত্যকে সত্য বলে চিনে নিতে লোকদের কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো না। তাদের দ্বিধা-সংকোচেরও কোনো প্রয়োজন দেখা দিত না।

 

বস্তুগত শক্তিও এই বিপদের অন্যতম দিক।

 

একথা সত্য যে, ইতিহাসের প্রতিটি জাহিলিয়াতই কোনো-না-কোনো প্রকারের বস্তুগত শক্তির সমর্থনপুষ্ট ছিল। আর তাগুতরা সে শক্তির সহায়তা ও আনুকূল্য নিয়ে মানুষের মনের ওপর আধিপত্য স্থাপক করত। এ কারণেই তাগুতের বলা কথাকে চূড়ান্ত ফয়সালা ও সর্ববাদী সমর্থিত মনে করে নেওয়া হতো এবং সে বিষয়ে কোনো আলোচনা বা বিতর্কের একবিন্দু অবকাশ দেওয়া হতো না। তার পিছনে থাকত যেমন ভয় তেমিন আগ্রহ। কোনোরূপ প্রতিরোধ বা বিরোধিতা ছাড়াই বা তার চিন্তা না করেই তার আধিপত্য ও কর্তৃত্বকে মাথা পেতে মেনে নেওয়া হতো। তা সত্ত্বেও প্রাচীন জাহিলিয়াতে বস্তুগত শক্তি ছি কম ভয়াবহ ও কম মারাত্মক। সংগঠনের দিক দিয়েও তা এখন আজকের মতো সর্ববিধ্বংসী ছিল না।

 

আজ কেবল সম্পদের প্রাচুর্যই নেই, কেবল ধ্বংসাত্মক অস্ত্রশস্ত্রই নেই। আজ সেই সাথে রয়েছে সংবাদ পৌছানোর ও প্রচার করার ব্যাপক উপায় ও মাধ্যম। মানুষের মন ও মগজকে নির্দিষ্ট একটি দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে একাত্ম হয়ে লেগে আছে। এরই ফলে আজ লোকেরা বাতিলকেই হক (সত্য) বলে মনে করছে। আর ‘সত্য’কে মনে করছে এক অচিন বা বিরল পাখী, বাস্তব দুনিয়ায় যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

কেননা মানব সমাজ যতই বিকৃত ও বিপথগামী হোক, তা সর্বতোভাবে বিকৃতির সমষ্টি হতে এমনটা অসম্ভব। হ্যাঁ, ব্যক্তি হয়ত এ রকম হতে পারে, সমস্ত খারাবি তার ওপর বিজয়ী হয়ে দাঁড়াতে পারে এমনভাবে যে, তাতে কল্যাণের একবিন্দু সম্ভাবনাও থাকবে না।

 

তবে মানব সমষ্টি সম্পর্কে এরূপ ধারণা করা যায় না। তাতে সকল অবস্থায় কিছু না কিছু কল্যাণের দিক অবশ্যই থাকবে। আর মানবীয় মনের এই অবশিষ্ট সৌন্দর্যের কারণে নিকৃষ্টতম অবস্থায়ও প্রতিটি জাহিলিয়াতেই কোনো-না-কোনো বাহ্যিক কল্যাণ ও ভালো দিক অবশ্যই থাকবে। বাহ্যিক এজন্যে বলছি যে, তা কখনও সত্যের আশ্রয় গ্রহণ করে না। সঠিক পথেও তা উৎসারিত হয় না। এই কারণে এই বাহ্যিক সৌন্দর্য ও ভালো দিকও কার্যত বাস্তব জীবনে এসে প্রভাবহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই বাহ্যিক সৌন্দর্যই লোকদের চক্ষুকে ঝলসিয়ে দেয় এবং তারা মনে করে –আমরা কোনো জাহিলিয়াতের মধ্যে নেই। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী************************************************************************)

 

তারা মনে মনে ধারণা করে যে, তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত লোক। (সূরা আরাফঃ ৩০)

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের এই মহা বিদ্রোহ মানুষের মধ্যে এই চরম মাত্রার ফিতনা ও বিপদ সৃষ্টি করেছে। তা আল্লাহর দ্বীন থেকে বিপথগামী হওয়ার তীব্রতা ও প্রচণ্ডতা থেকেই সৃষ্ট। তাই লোকদের বিপথগামিতার অনুপাতেই তাগুতের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আর এই কারণেই এ কালের মানুষ আল্লাহর পথ ও পন্থা থেকে অত্যধিক মাত্রায় বিপথগামী হয়ে পড়েছে। মানুষের গোটা ইতিহাসেও এর কোনো নজীর নেই। আর এই কারণেই একালের ‘তাগুত’ অতীতের সকল পর্যায়ের তাগুতদের তুলনায় অনেক বেশী ও উচ্চতর শক্তির অধিকারী হয়ে বসেছে।

 

মোটকথা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শক্তি ও সংগঠন এ যুগের বিশেষ নিদর্শন এবং এ যুগের প্রতিভার প্রকাশ মাধ্যম। এ সবই আজকের তাগুতের খেদমতে একান্তভাবে নিয়োজিত। একালের তাগুত মানুষকে বিপথগামী বানাবার লক্ষ্যে এগুলো পুরা মাত্রায় ব্যবহার করছে। আর এগুলোও স্বভাবতঃই তারই কাজ করে, যে এগুলোকে নিজের অধীনে বানিয়ে নেয় ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

 

ভবিষ্যতে মানব সমাজ মহান আল্লাহর দিকে হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ে এ সব উপায় উপকরণ ও মাধ্যম মানবীয় কল্যাণের পথে পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার করবে। তখনই প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হবে সমস্ত মানব প্রজাতির।

 

আধুনিক জাহিলিয়াতকে পেয়ে যারা মত্ত ও উল্লসিত, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, এই জাহিলিয়াত তাদের অবস্থা ও প্রকৃতিকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়েছে। তাকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসও করেছে। প্রকৃত কল্যাণের সকল পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে। আজকের জাহিলিয়াত মাত্র তাদের সম্মুখে যে কল্যাণ নিয়ে এসেছে (তাদের ধারণা অনুযায়ী)-যেমন জীবন-যাত্রার সুখ-সুবিধা; চিকিৎসাগত সামাজিক ও আদালতী সুবিধা যা কিছুই দিয়েছে, মূলত তা সবই তাম্রের কয়েকটা মুদ্রা মাত্র। তাগুত তা মানুষের সম্মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, সে নিজেকে যেন রক্ষা করতে পারে মানুষের রোষ-আক্রোশের সর্বধ্বংসী আগুন থেকে। যেন জনতা সেগুলো লুটপাট করার মধ্যে মশগুল হয়ে থাকে। আর ওদিকে সে ভয়াবহ তাগুতী রাজত্বের সাথে সাথে জনগণের গর্দানের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম রাখার অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ পেয়ে যায়। সে এমন কর্তৃত্ব, ইতিহাসে যার কোনো তুলনা নেই।

 

একথা যদি একালের লোকেরা অনুধাবন করতে পারে, তা হলে তারা অবশ্যই বুঝতে পারবে যে, তারা এক সর্বগ্রাসী ও মহাবিধ্বংসী জাহিলিয়াতের করালগ্রাসে পড়ে গেছে এবং এ জাহিলিয়াতকে অবশ্যই খতম করতে হবে, তাকে অবশ্যই খতম হতে হবে। অন্যথায় চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে নিস্তার নেই।

 

পরবর্তী দুটি অধ্যায়ের বর্তমান জাহিলিয়াতের সৃষ্টি নিম্নোদ্ধৃত দুই বিপর্যয় সম্পর্কে কথা বলবঃ

 

চিন্তার ক্ষেত্রে বিপর্যয়।

 

বাস্তব কর্মক্ষেত্রে বিপর্যয়।

 

 

চিন্তার ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয়

 

আধুনিক জাহিলিয়াত চিন্তার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়নি এমন একটি ক্ষেত্রও অবশিষ্ট নেই। মানুষের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ও ধারণা-কল্পনা, মন-মানসিকতা ও মূল্যবোধ সর্বক্ষেত্রে চরম মাত্রায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে আল্লাহ, বিশ্বলোক, জীবন ও স্বয়ং মানুষ থেকে তার সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে।

 

আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার ক্ষেত্রেই সৃষ্টি করেছে প্রধান বিপর্যয়, সব চাইতে বড় রকমের বিপথগামিতা, সেই সাথে আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারটিও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

 

বিশ্বলোক সম্পর্কিত ধারণা, তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক, তার সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সাথে তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিকৃত ও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

 

স্বয়ং মানব সত্তা সম্পর্কিত ধারণাও ঠিক থাকতে পারেনি। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক –ব্যক্তিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে এবং নারী ও পুরুষ এই দুই লিঙ্গের সম্পর্কটিও সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছে।

 

মোটকথা, বর্তমানের এই বিপর্যয় ও বিপথগামিতা মানুষের গোটা জীবনকেই সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলেছে।

 

পূর্বে যেমন বলেছি, আধুনিক জাহিলিয়াত প্রাচীন ইউরোপীয় সমস্ত জাহিলিয়াত সারনির্যাস। ওপরন্তু তা গ্রীক, রোমান, মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতের উত্তরাধিকার পেয়েও সমৃদ্ধ হয়েছে। ইহুদী ও তাদের অনুসারী অ-ইহুদী চিন্তাবিদদের চিন্তার ফল ও ফসল তার সাথে যোগ হয়েছে।

 

বস্তুত ইউরোপ মহান আল্লাহর নিগূঢ় তত্ত্ব ও সত্যতা (Reality) পর্যায়ে খুব বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

 

এই বিভ্রান্তি যেমন দর্শনে ঘটেছে, তেমনি বিজ্ঞানে, তেমনি বাস্তব জীবনেও। আল্লাহর মূল সত্তা এবং তাঁকে নিরংকুশ এককত্ব –তওহীদ সম্পর্কিত ইউরোপীয় ধারণার বিকৃতি ও বিপর্যয় সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিনে। কেননা পূর্বে যেমন বলেছি –এ পর্যায়ে আমেরিকান লেখক ক্রিপার রচিত ‘বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেনঃ

 

যে কনস্ট্যান্টাইন রোমান সাম্রাজ্যের ওপর খ্রিষ্ট ধর্ম চাপিয়ে দিয়েছিল, সে নিজেই নতুন আকীদার সাথে বিপুল পৌত্তলিক চিন্তা-ভাবনা শামিল করে দিয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল পৌত্তলিকদের সন্তুষ্ট করা। অবশ্য এ করে তার আশা ছিল যে, তারা এই নতুন ধর্মে দলে দলে প্রবেশ করবে।

 

সত্য কথা হচ্ছে, মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় খ্রিষ্ট ধর্ম এবং আধুনিক নাস্তিক ইউরোপ মস্তবড় ভুল ধারণার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এই ভুল ধারণায় উভয় যুগের খ্রিষ্টানরা সম্পূর্ণ সমান।

 

আর সে ভুল ধারণা হচ্ছে, ধর্ম হচ্ছে স্রষ্টা ও মানুষের সম্পর্কের ব্যাপার। বাস্তব জীবন ও সমাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

 

তাদের ধারণা হচ্ছেঃ আকীদা যা-ই হোক না কেন, তার স্থান কেবল মানুষের মনের অভ্যন্তরে গভীর অনুভূতি ও স্বজ্ঞায়। বাস্তব জীবন যাত্রার সাথে এই আকীদার বিন্দুমাত্রও সম্পর্ক নেই। তা চলবে আকীদা থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নভাবে। বাস্তব জীবনের ওপর অন্তরে প্রচ্ছন্ন আকীদার কেননা প্রভাবই প্রতিফলিত হবে না।

 

কিন্তু এটাই হচ্ছে জাহিলিয়াতের সবচাইতে মারাত্মক ধরনের ভুল ধারণা, একটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রকল্প।

 

কেননা মূলত আকীদাই হলো জীবন; তা নির্ভুল ও সহীহ হোক, কিংবা তাতেই বিকৃতি প্রবেশ করে থাকুক। আকীদার প্রভাব পড়ে সমগ্র মানব জীবনের ওপর। চেতনার কোনো একদিক বা কোনো একটি কাজও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। মানুষের জীবন জগতটা আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণা থেকে স্বতন্ত্র হতে পারে না কোনোক্রমেই।

 

অন্ধকার যুগে ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতে ধর্ম ও বাস্তব জীবন-চেতনা ও কাজ এবং আকীদা ও আইন-বিধানের মধ্যে সৃষ্ট পার্থক্য ছিল এক বড় রকমের নির্বুদ্ধিতার কোনো তুলনাই নেই।

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ম কি বাস্তব জীবন থেকে কার্যতঃ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কখনও? না, তা কখনোই হয়নি। কার্যতঃ যা ঘটেছে, যা ঘটা অবশ্যম্ভাবী ছিল, তা হচ্ছে, বিকৃত আকীদা গোটা ইউরোপীয় জীবনকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে সব কিছুতেই বিকৃতি ও বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছে ক্রমাগতভাবে, ধীরে ধীরে। আর শেষ পর্যন্ত গোটা জীবনই বিকৃতি ও বিপর্যয়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছে।

 

অতীব সত্য ও অনস্বীকার্য সত্য কথা হচ্ছে, জীবন কখনোই আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসম্পর্ক হতে পারে না।

 

আকীদা কি?

 

নিছক অন্তরের অনুভূতি বা চেতনা –স্বজ্ঞারই নাম আকীদা নয়।

 

তা হচ্ছে স্তম্ভ –খুঁটি বিশেষ। জীবন সম্পর্কিত ধারণা তারই ওপর দাঁড়ায়। জীবনের বাস্তব সম্পর্কসমূহ গড়ে ওঠে তারই ভিত্তিতে। আকীদা হচ্ছে মানুষ ও বিশ্বলোকের সম্পর্ক কেন্দ্র। আকীদাই হচ্ছে মানব সত্তার কেন্দ্রবিন্দু, মানবীয় অস্তিত্বের যৌক্তিকতা।

 

সাদাসিধা মানুষের কাছে ধর্মটা হয়ত মনের একটা অনুভূতি মাত্র। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপার তা নয়। এই সাধারণ মানুষ হয়ত বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে সব ব্যাপার বুঝতে অভ্যস্ত নয়। হয়ত জীবনের গভীরতায় পৌঁছে না সব খুঁটিনাটি ব্যাপার। কিন্তু তারা তাদের ঐকান্তিক নিষ্ঠাপূর্ণ ধর্মীয় অনুভূতির সাহায্যে জীবন সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট ধারণা (বা Stand) গ্রহণ করে। এই কারণেই তারা কিছু গ্রহণ করে, কিছু কিছু করে অগ্রাহ্য, বর্জন –গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। সমস্ত জিনিসের পারস্পরিক সম্পর্কতা নির্ধারণ করে একটা সুনির্দিষ্টরূপে। তাতে এই হৃদয়ানুভূতিই হয় তাদের প্রধান সহায়তা হাতিয়ার।

 

বস্তুত এই ধর্মই হচ্ছে সাদাসিধা মন-মানসিকতাসম্পন্ন লোকদের জীবন পর্যায়ে গৃহীত একটি নির্দিষ্ট বোধ বা ধারণা। জীবনের একটা সুনির্দিষ্ট ধারণা প্রতিটি মানুষের মনেই জাগরূক রয়েছে।

 

জাহিলিয়াতের প্রভাবে পড়ে যারা মনে করে, জনগণের জীবন ও বাস্তবতায় ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত ক্ষীণ ও নিষপ্রভ, তারা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই মনে করে যে, ধর্ম আসলেই বুঝি এরূপ। বাস্তবতার সাথে যার সম্পর্ক না থাকার মতোই। আর জীবনের বাস্তবতা ঝুকি এ রকমই আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তা স্বতন্ত্র এমন সব কার্যকারণের অধীন অতিবাহিত হচ্ছে, যার সাথে ধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই।

 

আসলে এই ধরনের ধারণাই হচ্ছে জাহিলিয়াতের ফলশ্রুতি। মানব সম্পর্কিত ধারণার বিকৃতির কারণেই এরূপ ধারণার উদ্ভব সম্ভব হয়েছে।

 

জনজীবনের বাস্তবতায় ধর্মের প্রভাব যদি ক্ষীণ হয়ে পড়ে কখনও, তাহলে বুঝতে হবে, মানব মনে আকীদার বিকৃতি ঘটেছে। অনুরূপভাবে তার এ-ও অর্থ যে, জীবন সামগ্রিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে চলছে না। এটা অনিবার্যভাবে কোনো-না-কোনো ধরনের একটা বিকৃতি। কিছু দিন পরই তার অনিবার্য প্রতিক্রিয়া অবশ্যই প্রকাশ হবে। বিরাট ও ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে।

 

জনগণের জীবনে ধর্মের প্রভাব ক্ষীণ হওয়ার আরও একটি অর্থ হলো, মানুষ আল্লাহর দাসত্ব করছে না, তবে ইবাদত ত্যাগ করেছে অথবা আল্লাহর ইবাদত ঠিক যেভাবে হওয়া উচিত সেভাবে –সেই মানে ও ভাবধারায় হচ্ছে না, সে ইবাদত একান্তভাবে এক আল্লাহর জন্যে হচ্ছে না। তাঁর সাথে অন্যান্য ‘খোদাকে’ শরীক করা হচ্ছে। আর তারাই তাদের বাস্তব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ জীবনের ওপর একমাত্র আল্লাহর কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য হওয়া উচিত ছিল, উচিত ছিল সমগ্র জীবন আল্লাহর নির্ধারিত পথে চলা।

 

বস্তুত এ-ই হচ্ছে আকীদার ক্ষেত্রে প্রথম বিপর্যয়, বিকৃতি। বহুত্ববাদ সৃষ্টি এই বিপর্যয় ইতিহাসের সকল জাহিলিয়াতেই সমানভাবে বর্তমান। এই বহুত্ববাদী জাহিলিয়াত বা জাহিলিয়াতের এই বহুত্ববাদী লক্ষণের কারণেই বাস্তব জগতের ওপর আকীদার প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 

এই বহুত্ববাদের কারণেই আকীদায় অভিন্নতা ও পারস্পরিক সামঞ্জস্য থাকতে পারে না। এই কারণে তার দিকও অভিন্ন থাকে না। আর এই বিশেষত্বের কারণে জাহিলিয়াত তার নিশ্চিত ও অনিবার্য ফল প্রকাশ করে। যদিও সে ফল খুব ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। জনগণ খুব বিলম্বেই তা অনুভব ও হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হয়।

 

বহুত্ববাদের কথিত ধারণা প্রথম পরিণতিতে মানুষের গোটা জীবন দুনিয়ায় দুটি খাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দুটি ভিন্ন ভিন্ন সমান্তরাল পথে চলতে থাকে। তার একটি পথ যদি আল্লাহর দিকে চলে, তাহলে অন্যটি চলে আল্লাহর পথের বিপরীত দিকে –বাস্তব জীবনের দিকে। আর তারই ফরে মানব মনে মূল্যবোধের সংঘাত সৃষ্টি হয়ে পড়ে অনিবার্যভাবে। একটি মূল্যবোধ আল্লাহর পথমুখী হওয়ার কারণে অতীব উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন হয়। আর অপরটি বাস্তব জীবনের দিকে নিম্নমুখী এবং আল্লাহ প্রদত্ত পথ থেকে বিপরীতগামী। দ্বিতীয়টি আল্লাহর কাছে নিষিদ্ধ। যদিও বাস্তব জীবনে তা জরুরী। আর প্রথমটি আল্লাহর কাছে অতীব কাম্য, কাঙ্ক্ষিত ও প্রার্থিত। কিন্তু বাস্তব জীবনে তা অকেজো, অব্যবহৃত।

 

এই দ্বৈত বিভক্তির কারণে মানুষের চেতনা ও মন-মানসিকতা ছিন্নভিন্ন ও দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে, যদিও তা অনুভব করা সম্ভব হয় অনেক কাল পরে।

 

এরই ফলে বাস্তব জীবন আকীদার আলোকরশ্মি থেকে দূরে সরে যায়। অথবা বলা যায়, এক আল্লাহর পরিবর্তে নবতর বহু খোদা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর তাতে আল্লাহর পথের সাথে একবিন্দু সংযোগ থাকে না। ফলে গোটা পৃথিবীই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

অপরদিকে বাস্তব জীবন খাহেশাত –লালসা-কামনা-বাসনার অধীন চলতে থাকে। এরই দরুন তাগুতের আধিপত্যের অধীনে এবং ফলতঃ কামনা-বাসনা-লালসার অধীন হয়ে পড়ে। লালসার একচ্ছত্র রাজত্ব সর্বগ্রাসী হয়ে দাঁড়ায়। তার ফলে দেখা দেয় বিপর্যয়ের পর বিপর্যয়। আর তার শেষ পরিণতি ঘটে চূড়ান্ত ধ্বংসে। তখন আল্লাহর ইবাদতের স্থান হয়ে পড়ে গৌণ, গুরুত্বহীন। আর অপরাপর ‘খোদা’গণ মানব জীবনের ওপর প্রচণ্ড শক্তিতে সওয়ার হয়ে বসে।

 

আর এটাই হচ্ছে ইউরোপের ইতিহাস। ইউরোপের বাস্তব চিত্র। ইউরোপের এ দীর্ঘ ইতিহাস বহু শতাব্দী পরিব্যাপ্ত ও বিস্তীর্ণ। এ ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল ধর্মকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা থেকে। এরপর রেনেসাঁর যুগ আসে। তার ফলে ধর্ম ও জীবনের মধ্যকার দূরত্ব অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে যায়।

 

মধ্যযুগের জাহিলিয়াতে ইউরোপ হযরত ঈসা (আ)-এর কথাটি যথাযথ অর্থে বুঝতে পারেনি। তাঁর কথাঃ ‘কাইজারের যা তা কাইজারকে দাও আর আল্লাহর জন্যে যা তা আল্লাহকে দাও’। (ইনজীল-মথি ২২-২১ স্তোত্র) তাঁর সম্পর্কিত এ কথাটিও তারা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষমই রয়েছে। কুরআন মজীদের ভাষায়ঃ

 

(আরবী**********************************************************************************)

 

এবং আমি আমার সম্মুখবর্তী তওরাতের সত্যতা ঘোষনা প্রতিষ্ঠাকারী এবং আমি হালাল ঘোষনা করব তোমদের জন্যে এমন কিছু জিনিস, যা তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছিল। (সূরা আলে-ইমরানঃ ৫০)

 

আল্লাহর হেদায়েত থেকে বিভ্রান্ত হওয়ার কতগুলো ঐতিহাসিক কারণ থাকতে পারে। প্রাচ্যবিদ ও নও-মুসলিম লিওপো মুহাম্মদ আসাদ তাঁর Islam at the cross road নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ খ্রিষ্ট ধর্ম রোমান আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সেই বিরাট সাম্রাজ্যের ওপর তেমন কোনো প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল না। সেখানে ধর্ম শুধু প্রকাশমান বাহ্যিক, অন্তঃসারশূন্য। তৃতীয় শতাব্দীতে কনস্ট্যান্টাইন যখন খ্রিষ্ট ধর্মকে সরকারী বা রাষ্ট্রীয় ধর্মরূপে গ্রহণ করেছিল, তখনও শুধু আকীদা হিসেবেই খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করা হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় আইনের কোনো প্রশ্ন ছিল না। বরং অনেক সময় আকীদা ও রোমান মূর্তিপূজার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে যেত, খ্রিষ্টীয় আইন জারী হওয়া তো দূরের কথা। এতসব সত্ত্বেও লোকদের মধ্যে নিজেদের আকীদার ব্যাপারে কিছু-না-কিছু প্রীতি ও চেতনা ছিল। তাদের মনে-মগজে একথা বদ্ধমূল হয়ে বসেছিল যে, আল্লাহ কিংবা ইলাহ মানুষের জন্যে কল্যাণকামী নয়। মানুষ তাঁর মারেফাত লাভ করুক, তা-ও তিনি চান না। মানুষকে এই মারেফাত আল্লাহ বা ইলাহর কাছ থেকে জোর করে কেড়ে আনতে হয়।

 

‘রেনেসাঁ’র পর মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়ে গেল। আকীদার দিকে আকর্ষণ কেন্দ্র ফিরে এলো না। নতুন আন্দোলনে প্রাচীন হেলেনীয়বাদ থেকে চিন্তা ও ধারণা গ্রহণ করতে শুরু করে দিল। আর নতুভাবে ও ধীরে ধীরে তা গোটা জীবনের ওপর প্রভাবশালী হয়ে উঠলো।

 

এই সময় আকর্ষণ কেন্দ্র আল্লাহর পরিবর্তে হয়ে উঠল অসংখ্য ইলাহ।

 

তার বড় দুটি কারণ ছিল। একটি চেতনা ও চিন্তার সুস্পষ্ট আর দ্বিতীয়টি প্রচ্ছন্নতার গভীর তলায়।

 

বাহ্যিক কারণটি প্রতিফলিত হয়েছে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে গীর্জার যুদ্ধের মাধ্যমে। আর আন্দোলন ও বিবর্তনের তাৎপর্যও প্রকাশমান হয়ে পড়ল। তার অন্ধ অনুসরণের আধিপত্যের ওপর ভয় ছিল যে, তা বিজ্ঞানকে তার যথার্থ স্থান থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তার পরিবর্তে অপর একটি প্রতিনিধি স্থলাভিষিক্ত হবে, যেন গীর্জা তার স্থান থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। অতঃপর যখন বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও বিকাশ শুরু হলো, তা স্বভাবতঃই গীর্জার শত্রু ও প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল। অন্ততঃ তার কর্তৃত্বের বিরোধী হয়ে দাঁড়াল। যেমন চিন্তা ও সভ্যতার পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারটি সংঘটিত হয়েছিল। কেননা তা যেমন আন্দোলন, তেমনি বিবর্তন। শেষকাল অবধি অবস্থার প্রতিষ্ঠায় গীর্জার ইচ্ছা কংকল্পের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

চিন্তা ও সভ্যতার অভ্যুদয় গোটা বাস্তব জীবনের ওপর প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা তা স্বাভাবিকভাবেই জমিনের বাস্তবতা ও দৈনন্দিন জীবনের সাথে সংযুক্ত। আর গীর্জা যতদিন থাকবে, এ অভ্যুদয় ততদিন জোরদার হতে পারবে না, তার সাথে সহযোগিতাও করবে না। গীর্জা ছিল ধর্মের প্রতীক। এই কারণে বাস্তব জীবনধারা ও এই ধর্মের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত থাকা এই অবস্থার মধ্যে নিতান্তই অবধারিত ব্যাপার ছিল।

 

এই সময়টা ছিল গোটা অবস্থাকে ঠিকঠাক করার জন্যে অতীব উপযুক্ত ক্ষণ। আর সর্বাত্মক জাহিলিয়াতের আওতা থেকে বের হয়ে মহান আল্লাহর সত্য সঠিক দ্বীনের দিকে চলে আসারও উপযুক্ত সময় এটাই ছিল। কিন্তু ইউরোপ –পূর্বে যেমন বলেছি –এই উপযুক্ত সময়ের সুযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বসল। ক্রশকেন্দ্রিক বিজয়ী ভাবধারাই ছিল এর প্রধান কারণ। ফলে তারা মুসলমানদের কাছ থেকে তাদরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঞ্চয় গ্রহণ করল, নিয়ে নিল তাদের এ ক্ষেত্রের পরীক্ষা পদ্ধতি এবং তাদের সভ্যতার বাহ্য প্রকাশ। কিন্তু খোদায়ী জীবন পদ্ধতি গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। অথচ তারই ওপর নির্ভরশীল গোটা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা। ফলে রেনেসাঁর অভ্যুদয় প্রথম মুহুর্ত থেকেই আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয়ে উঠল সম্পূর্ণরূপে। এটাই হচ্ছে বাহ্যিক কারণ।

 

আর প্রচ্ছন্ন কারণটি হচ্ছে প্রাচীন গ্রীক জাহিলিয়াত থেকে পাওয়া দুঃখজনক উত্তরাধিকার। তা-ই ইউরোপীয় জনগণের মনের গভীরে হেলেনীয় ভাবধারার সৃষ্টি করেছিল। সে হচ্ছে আগুন-চোর প্রোমিথিউস।

 

আধুনিক ইউরোপের মানুষের এটাই হচ্ছে পরিচিতি ও রূপ। এ কিংবদন্তী বা পৌরাণিক কাহিনী ইউরোপীয় লোকদের মনে ও চরিত্রে তার পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে দিয়েছে। তা-ই তাদের এমন বানিয়ে দিয়েছে যে, তারা জ্ঞান অর্জন করে আর সেই সাথে অনুভব করে আল্লাহর প্রতি তীব্র শত্রুতা ও প্রতিহিংসা।

 

পৌরাণিক কাহিনী ইউরোপীয় লোকদের মনে ও চরিত্রে তার পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে দিয়েছে। তা-ই তাদের এমন বানিয়ে দিয়েছে যে, তারা জ্ঞান অর্জন করে আর সেই সাথে অনুভব করে আল্লাহর প্রতি তীব্র শত্রুতা ও প্রতিহিংসা।

 

এই পৌরাণিক কাহিনী এবং অনুরূপ আরও অনেক কিছু তাদের চিন্তা-চেতনায় এই ভাবধারা ঢুকিয়ে বদ্ধমূল করে দিয়েছে যে, আল্লাহ কিংবা খোদাগণ –মানুষের জন্যে কিছুমাত্র কল্যাণ চায় না। আর বিশেষ করে মানুষ জ্ঞান আহরণ করুক, তা আদৌ পছন্দ করে না। মানুষ তো জ্ঞান-বিজ্ঞান আল্লাহ কিংবা খোদাগণের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অর্জন করছে। আর অসন্তুষ্টি ও শত্রুতার ভিত্তিতেই কল্যাণ বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

জুলিয়ান হাক্সলী তাঁর ‘আধুনিক জগতের মানুষ’ নামক গ্রন্থে যেমন লিখেছেনঃ শুধু মুর্খতা ও অক্ষমতাই মানুষকে আল্লাহর কাছে নত বানায়। তাই মানুষের জ্ঞানের পরিধি ও তার শক্তি বৃদ্ধি পেলে তখন আর আল্লাহকে মেনে নেওয়ার বা তাঁর সম্পর্কে চিন্তা করার কোনোই কারণ অবশিষ্ট থাকে না। ইবাদত করে তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন বা রক্ষারও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। বরং তখন স্বয়ং মানুষই আল্লাহ হয়ে বসে।

 

ব্যাপারসমূহ এই অবস্থা পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থার দরুন হঠাৎ করে পৌঁছতে পারেনি। কেননা মানব প্রকৃতিই এমন যে, তা খুব ধীরে ও বিলম্বেই পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে আকীদার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনে তো যথেষ্ট বিলম্ব হয়ে থাকে। এজন্যে দীর্ঘ সময় ও যুগের পর যুগের প্রয়োজন হয়।

 

মধ্যম পর্যায়ে আল্লাহর দাসত্বের পরিবর্তে প্রকৃতির দাসত্ব শুরু হয়। আসলে প্রকৃতি পূজা ছিল গীর্জার খোদার পূজা থেকে বাঁচার একটা উপায় মাত্র। কেননা গীর্জা তো তার নামে মানুষকে দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। তাদের ওপর ধার্য করেছিল অনেক প্রকারের কর, শুল্ক ও অর্থদানের দায়-দায়িত্ব এবং গীর্জার জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদানের বাধ্যবাধকতা, চাপিয়ে ছিল গীর্জার সেনাবাহিনীতে কাজ করার অপরিহার্যতা। ধর্মীয় ব্যক্তিদের –পাদ্রী-পুরোহিতদের দাসানুদাস হওয়ার অপমান ও লাঞ্ছনা আর প্রকৃতি ছিল এমন এক খোদা, যার কোনো গীর্জা ছিল না, ছিল না চাপিয়ে দেওয়া দায়-দায়িত্ব ও নানাবিধ বাধ্যবাধকতা। এই নতুন খোদা মানব প্রকৃতির চাহিদারও তৃপ্তিদান করছিল। কেননা কোনো-না-কোনো খোদার সম্মুখে আত্মসমর্পণ তো ছিল মানব প্রকৃতির –একটি অপরিহার্য দাবি ও তাগিদ। আর তা তাদের উদ্দেশ্যের পরিপূরক ছিল। কেননা মানুষ গীর্জার খোদা ও গীর্জায় ধর্মের প্রতিপত্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল যা তাদের ওপর দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে চেয়ে বসেছিল।

 

যে সময়ে প্রকৃতির দেবতাদের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপের লোকদের হৃদয়ে আল্লাহ ও মওজুদ ছিলেন। তারা ঐকান্তিক একাকীত্বে ও নিবিড় নিভৃতে তাঁরই দিকে মনোযোগী হতো, গীর্জায় তাঁরই ইবাদত করত। আর কম বেশী নিজেদের ধর্মীয় নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের ওপরও দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু এই সবকিছুই ছিল নিতান্ত অভ্যাসবশতঃ ঈমানী শক্তির তাগিদে তা হচ্ছিল না।

 

এভাবে খোদাদের সংখ্যা বিপুল হয়ে গেল এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কও অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ল।

 

গীর্জায় যখন উপাসনা অনুষ্ঠিত হয়, তখন আল্লাহর সত্তাই হতো প্রিয়তর, তাঁকেই ভয় করা হতো। অথবা নামাযের বাইরে জীবনের অপর কোনো মুহুর্তে আল্লাহকেই মালিক মনে করা হতো।

 

আর যখন শিল্পগত চেতনার ব্যাপার দেখা দিত, তখন প্রকৃতিই হতো প্রিয়তর, ভয় তাকেই করা হতো। কেননা রোমান্টিকতার আন্দোলন প্রকৃতির খুব বেশী গুরুত্ব দিয়েছিল। গোটা কাজ প্রতিভা ও তজ্জনিত অনুষ্ঠানাদি তাকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।

 

বৈজ্ঞানিক উন্নতি প্রগতিতেও প্রকৃতিই চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির এমন নিয়ম আয়ত্ত করেছিল, যার ভিত্তিতে গোটা বিশ্বলোক আবর্তিত হচ্ছিল। এসব প্রাকৃতিক আইন বা নিয়মে মতপার্থক্যের কোনো অবকাশ ছিল না বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে। বৈজ্ঞানিক যুক্তির দৃষ্টিতেও তাতে কোনো মতবিরোধ ছিল না, যা এসব নিয়ম ও আইন উদঘাটন করেছিল।

 

এদিকে রাষ্ট্র-সরকার ও তার আইন-কানুন ছিল তৃতীয় খোদা। জনগণ অত্যন্ত আগ্রহ-উৎসাহ সহকারেই অথবা বাধ্যবাধকতা সহকারে যে সব আইন-কানুন মেনে চলছিল, তার আধিপত্য ও কর্তৃত্বের অধীনতার কাছে তারা সবাই আত্মসমর্পণ করছিল ঠিক যেমন আত্মসমর্পণ করতে হয় আল্লাহর কাছে।

 

এভাবে একই ধর্ম তিন খোদার মদ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। অথচ মধ্যযুগে ছিল দুই খোদা। তাদের একজন আকীদা’র দিক দিয়ে খোদা, অপরজন আইন-বিধান প্রদাতা খোদা। তাতে আকীদা ও শরীয়াতের বিচ্ছিন্নতাই ছিল ভিত্তি এবং প্রতিটিই তার অধীনত্বের ওপর কর্তৃত্ব করত।

 

অতঃপর ধীরে ধীরে অপর একটি পরিবর্তন সংঘটিত হলো।

 

আল্লাহ সমগ্র ইউরোপীয় অন্তর থেকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গেলেন। লোকদের চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণের ওপর আল্লাহর প্রভাব হ্রাস প্রাপ্ত হল। আল্লাহর স্থান দখল করে নিল স্বয়ং মানুষ। জায়গীরদারী বা সামান্তবাদ খতম হয়ে গেল। অতঃপর যন্ত্র আবিস্কৃত হওয়ার পর শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হলো। সেই সাথে চিন্তা-চেতনা ও ধারণা-বিশ্বাসেও বিপ্লব সূচিত হল।

 

এ জাহিলিয়াতে শিল্প বিপ্লব ঘটলো যখন, তখন আল্লাহর ইবাদত নিতান্তই বাহ্যিকভাবে হচ্ছিল। এ বিপ্লব জাহিলিয়াতের সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি কবুল করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তা জাহিলিয়াতকে নতুন পথ দেখাল, শক্তি গতিদান করল।

 

একদিকে গ্রাম্য জনতার মনের আবেগ আল্লাহর সাথে থাকলেও, তাঁর ইবাদত করলে থাকলেও অন্যান্য খোদাগণের সাথে শিরক করে যাচ্ছিল। কেনো তারা ফসল উৎপাদক, ফল-ফাকড়া প্রদাতা এবং বিপদাপদ ও ধ্বংস থেকে পৃথিবীকে রক্ষাকারী আল্লাহকেই মনে করত।

 

কিন্তু অপরদিকে নগরবাসী লোকেরা ছিল কল-কারখানার পণ্য উৎপাদনে মশগুল। আর সে কাজটি তো আল্লাহ করত না। তাই সামগ্রিকভাবে জাহিলিয়াত শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে খোদাহীন হয়ে পড়ল। খোদার প্রতি তেমন কোনো সম্পর্কের তাগিত তারা বোধ করত না।

 

শিল্প বিপ্লবে লোকদের ধারণা ছিল, শিল্পোৎপাদন আল্লাহ করেন না, করে মানুষ নিজেরা। মানুষ নিজেরাই নিজেদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বলে বস্তুর বিশেষত্ব জানতে ও আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ নিজেরাই যন্ত্র চালনা করে, আবার ইচ্ছামত নিজেরাই তা থামায়, তারাই একদিকে কাঁচামাল ঢেলে দেয় এবং অপাদিক থেকে পূর্ণ গঠিত পণ্য (Finished good) বের করে আনে।

 

এ কারণে এক্ষণে শিল্পোৎপাদনকারী মানুষেরই ইবাদত উত্তম বিবেচিত হলো, আল্লাহর ইবাদতের কোনো প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করতে পারল না।

 

আর এই সময় কালেই প্রকৃত তার সমস্ত যাদু-প্রভাব ও খোদায়ী ভাব-গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলল। জনমনে তার কোনো শক্তি মোহ অবশিষ্ট থাকল না। কেননা একদিকে শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে প্রকৃতি চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু থাকল না, রোমান্টিকতার পর্যায়ে যেমন ছিল। এ সময়ে বাস্তব অবস্থান দৃষ্টিকোণে মানুষই হয়ে দাঁড়াল নবতর খোদা।

 

অপরদিকে প্রকৃতির অনেক গোপন গূঢ় তত্ত্ব-রহস্য উদঘাটিত হলো বৈজ্ঞানিক আবিস্কার উদ্ভাবনের মাধ্যমে। এই সময় তার ওপর মানুষের প্রতিপত্তিও বেড়ে গেল। ফলে মানুষের প্রকৃতির প্রাধান্য তেমন আর থাকল না।

 

এই কারণে খোদায়ী মর্যাদা আল্লাহ ও প্রকৃতি উভয় থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মানুষে এসে কেন্দ্রীভূত হলো।

 

এই অবকাশে মানুষ বলে উঠল আল্লাহর ইবাদত মানুষের জন্যে লজ্জাজনক।

 

যে শক্তি অপ্রকাশ্য, প্রচ্ছন্ন, যা ইন্দ্রিয়ানুভূতি নয়, তার ইবাদত করা মানুষের পক্ষে খুবই লজ্জার বিষয়। এই অদৃশ্য গায়েবী শক্তির –যাকে কোনো দিন দেখা যায়নি, কোনো দিনই দেখা যাবে না, দেখা যেতে পারে না  -তার কাছ থেকে মানুষ তার নৈতিকতা, চিন্তা, বিশ্বাস, আচরণ ও মান্যতা গ্রহণ করবে, তাও তার জন্যে শোভন হতে পারে না। মানুষের জন্যে আইন বানাবে কোনো পৌরাণিক শক্তি, যার কোনো কোনো আলোচনা বা প্রতিবাদ করারও সুযোগ থাকবে না, তার কোনো সমালোচনা করা যাবে না, তার বিরুদ্ধে সে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে না, শুধু এইজন্যে যে, তা অবতীর্ণ হওয়া বিধান, এক পৌরাণিক জগৎ থেকে তা অবতীর্ণ হয়েছে –এটা কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না।

 

মানুষ এক্ষণে এসব বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছে। আর মুর্খতার যুগে সে যা করত, তা এই জ্ঞান-বিজ্ঞান আলোকোদ্ভাসিত যুগে করা কিছুতেই শোভা পায় না, আগে যে দুর্বল, অক্ষম ছিল, তার চতুষ্পার্শ্বে বিস্তীর্ণ প্রকৃতির কোনো নিগূঢ় তত্ত্বই তাদের জান ছিল না, পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করার কোনো ক্ষমতাই তখন তাদের ছিল না। তখন যে খোদার তারা ইবাদত করত, এখনও সেই খোদার ইবাদত করা তাদের জন্যে কিছুতেই শোভা পেতে পারে না। তখন আল্লাহর কালাম শ্রবণ বা আল্লাহর আদেশাবলী পালন করা তার পক্ষে আওয়াজ বুলন্দ করা মানুষের পক্ষে উচিত হতে পারে না।

 

এখন তো মানুসের কর্তব্য হচ্ছে প্রতিটি জিনিসের যাচাই পরখ করা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির মানদণ্ডে। এর ফলে যা তার বিবেক-বুদ্ধিসম্মত প্রমাণিত হবে, তাকে সত্য ও সঠিক বলে গ্রহণ করা, তাকে কার্যকর করা কর্তব্য। আর যা তার বিপরীত হবে তাকে বাতিল বলে গ্রহণ করা, তাকে কার্যকর করা কর্তব্য। আর যা তার বিপরীত হবে তাকে বাতিল ও পৌরাণিক কিসসা কাহিনী মনে করে প্রত্যাখ্যান করাই তার জন্যে বাঞ্ছনীয়।

 

এক্ষণে মানুষের নিজেরই হওয়া উচিত নিজের জন্যে আইন বিধানের রচয়িতা। সে নিজেই নিজের জন্যে আইন প্রণয়ন করবে। সে নিজের প্রয়োজন ও তার বিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে মধ্যযুগীয় খোদার তুলনায় অনেক বেশি অবহিত। কেননা সে ‘খোদার’ কাছে অবস্থা পূর্ববতই রয়েছে। নিতান্তই অপরিবর্তিত হয়ে।

 

বাঞ্ছনীয় হচ্ছে মানুষ নিজেই নিজের জীবনকে গড়বে। এ ব্যাপারে অন্য কাউকেই তার সাথে শরীক না করা।[সমকালীন আমেরিকান গ্রন্থকার জর্দান তুশায়েলদ লিখিত বই Man Makes himself দ্রষ্টব্য।]

 

অতঃপর বিকৃতি ও বিপর্যয় আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে গেল। সেই সাথে খোদা মানুষের দাসত্ব ও পূজার ব্যাপারটিও অন্তহিত ও বিলীন হয়ে গেল।

 

বর্তমান জাহিলয়াতের শীর্ষে অবস্থিত এই সর্বশেষ পর্যায় সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করার পূর্বে এসব জাহিলিয়াতের অবশিষ্ট নির্দেশাবলী চিহ্নিত করা আবশ্যক, যার দরুন খোদায়ী নিগুঢ় তত্ত্ব পর্যায়ে ধারণা, বিশ্বাস এই ব্যাপক বিস্তৃতি ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

 

গ্রীক জাহিলিয়াতের নিদর্শন হচ্ছে তা মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে ঘৃণ্য ও বিদ্বেষের উচ্চ প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজও তা অবশিষ্ট রয়েছে।

 

রোমান জাহিলিয়াতের নিদর্শন হচ্ছে, কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে বিশ্বাস স্থাপন এবং ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য জিনিসকে অস্তিত্বহীন মনে করা। আল্লাহ যেহেতু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন, এ কারণে তাঁর প্রতি ঈমানের কোনো প্রয়োজন নেই, তার প্রতি ঈমান না আনাই উত্তম ও জরুরী।

 

গ্রীক জাহিলিয়াত নতুন বেশে আবার সম্মুখে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তা আজও বিবেক-বুদ্ধিকে পবিত্রতার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপ করে রেখেছে। যেন তা সেই আল্লাহ হয়ে বসতে পারে যিনি ওহীর ভিত্তিতে হুকুমত করেন। বরং সেই বিবেক-বুদ্ধি নিজেই ইলাহ হতে পারে যখন তা ইচ্ছা করবে।

 

এই গ্রীক জাহিলিয়াত পুনরায় মানুষ ও আল্লাহ –এই দুয়ের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের সৃষ্টি করেছে।

 

রেনেসাঁর প্রাথমিক পর্যায়ে আল্লাহই মা’বুদ ছিলেন, তখন মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম ছিল। মানুষ যদিও মূর্খতা ও দুর্বলতার কারণে আল্লাহর অনুগত হতো। পরে সে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান দক্ষতা অর্জন করল এবং শক্তি সম্পন্ন হয়ে উঠল, তার নিজের দৃষ্টিতে সে উচ্চ মর্যাদার উন্নীত হল। আর তার ধারণায় খোদার মর্যাদা অনেক নীচু ও হীন হয়ে গেল। আবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রবৃদ্ধি লাভে সে-ও উচ্চে ওঠে গেল। আর খোদার নিম্নগামিতা বৃদ্ধি পেল।

 

শেষ পর্যণ্ত বর্তমান সময়ে মানুষ নিজেই ‘জীবন’ সৃষ্টি করে। ফলে সে-ই ‘আল্লাহ’ হয়ে গেছে।

 

বিশ্ব প্রকৃতি যখন আল্লাহর সাথে সাথে মা’বুদ হয়েছিল, তখন দ্বন্দ্বটা ছিল মানুষ ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে। মানুষ প্রকৃতির ক্রোধ-আক্রোশের মোকাবিলা করত। প্রকৃতি নিহিত বিপুল তত্ত্ব ও শক্তি আয়ত্ত করে নিত। যেমন প্রাচীন প্রোমিথিউস করেছিল।

 

অতঃপর মানুষই যখন মা’বুদ হয়ে বসল, তখন এই দুঃখজনক দ্বন্দ্বটা মানুষ ও মানুষের মধ্যে পারস্পরিকভাবে দাঁড়িয়ে গেল। একদিকে পূজাকারী মানুষ আর অপরদিকে পূজা ও পূজিত মানুষ। এ সময়ে মানুষে মানুষে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো, তা ব্যক্তির সাথে সমষ্টির এবং ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের সমতূল্য। ব্যক্তির সাথে দ্বন্দ্ব তার সমাজ সমষ্টিতে বিজয়ী ও প্রভাবশালী মূল্যমানের সাথে। এ দ্বন্দ্ব ব্যক্তির সাথে স্বয়ং তার ব্যক্তিগত শক্তিসমূহের সাথে এবং তা মানুষের নিজের বেষ্টনীর অভ্যন্তরেই অবস্থিত।

 

এই সর্বশেষ দ্বন্দ্ব মানুষে মানুষে পারস্পরিক, তা-ই মানুষের পূজা-উপাসনা বা দাসত্বের অবসান ঘটিয়েছে।

 

মানুষ সব সময়ই তার সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে অহংকারে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও এবং তার আনুগত্য না করার ওপর শক্ত হয়ে থাকা সত্ত্বেও সে আবিস্কার করল যে, এই পৃথিবীতে প্রকৃত খোদা বলতে কেউ নেই। বরং এখানে আছে অন্যান্য অনেক খোদা। মানুষের ইতিহাসে মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব ধারা পর্যায়ের বেজ্ঞানিক গবেষণায় মানুষই এই তত্ত্ব আবিস্কার করল যে, এখানে রয়েছে অসংখ্য নিশ্চিত ব্যাপারাধি, কতগুলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর তা হচ্ছে, অর্থনৈতিক চূড়ান্ততা, সামাজিক সামষ্টিক চূড়ান্ততা, ঐতিহাসিক নিশ্চয়তা। এই সব কয়টি নিশ্চয়তাই মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে।

 

এগুলো সুনিশ্চিত মূল্যমান, তা প্রত্যাহার বা প্রতিরোধ করা যায় না। এ মূল্যমান সবসময়ই মানুষের জীবনের ওপর প্রভাবশালী হয়ে থাকে। মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা এর ওপর খাটে না।

 

কার্ল মার্কস বলেনঃ “সামষ্টিক ফলাফল যা মানুষ ভোগ করতে বাধ্য হয়, তা খুবই সীমিত সম্পর্ক বিশেষ। তা মানুষের জন্যে অপরিহার্য। তাতে মানুষের ইচ্ছারও কোনো দখল নেই। তাই মানুসের বস্তুগত জীবনে উৎপাদন পদ্ধতিই হচ্ছে এমন শক্তি যা জীবনের সামাজিক, সামষ্টিক, রাজনৈতিক ও ভাবগত দিকগুলোকে রূপায়িত করে। মানুষের নিজস্ব চেতনা এগুলোর অস্তিত্ব নির্দিষ্ট করে না বরং এগুলোর অস্তিত্বই মানুষের চিন্তা-চেতনা নির্ধারণ করে”।

 

এ্যাঞ্জেলস বলেনঃ বস্তুগত মতাদর্শের সূচনা এখান থেকে হয় যে, উৎপাদন সকল সামষ্টিক জীবনের ভিত্তি। অর্থাৎ মৌলিক পরিবর্তন যাই হবে, উৎপাদন পদ্ধতিই হবে তার কারণ। লোকদের বিবেক-বুদ্ধি বা সত্য ও ন্যায়পরতার অনুসন্ধান।

 

মানুষের বিবেক-বুদ্ধির পক্ষে তা আলোচ্য বা বিবেচ্য নয়। এই পর্যায়ে তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার কোনো অবকাশ নেই। উৎপাদন কাজ এবং উৎপাদন দ্রব্যের বিনিময়ই আসল নিয়ামক।

 

এমনিভাবে নিশ্চিন্ততার এই দেবতার মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং সত্য ও ন্যায়পরতার প্রতি দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার তাদের স্বভাবগত যোগ্যতার প্রতি কোনো দৃষ্টি না দিয়েই জনগণের জীবনকে নিজস্ব রঙ্গে রঙ্গিন করে দেয়। এগুলো এমন দেবতা যা মানুষের মনের ডাকে কোনোই সাড়া দেয় না, তাদের মনের সাথে আনুকূল্য স্থাপন করেও চলে না। যেমন করে আল্লাহ মানুষের চেতনায় সাড়া দেন, তাদের মন রক্ষা করে কাজ করেন। প্রাথমিক জাহিলিয়াতের দেবতাগুলো এ জাহিলিয়াতসমূহের বিপথগামিতা ও মানুষের সাথে তার পাশবিক দ্বন্দ্ব ঝগড়া থাকা সত্ত্বেও সেদিকে অনেকটা লক্ষ্য রেখে চলত।

 

কিন্তু বর্তমান জাহিলিয়াতের দেবতা স্বীয় স্বৈর বন্ধনে মানুষকে যন্ত্রের একটা নিষ্প্রাণ অংশের ন্যায় শক্ত করে বেঁধে রাখে। ফলে সে এই সমাজ যন্ত্রের গতির সাথে একটি অংশের ন্যায় তাল রেখে চলতে একান্তভাবে বাধ্য হয়।

 

এভাবে মানুষ স্বীয় ইবাদতে চরম অধঃপতনের নিম্নতম পংকের দিকে নেমে গেল। প্রথমে যদি অন্যান্য খোদাগণের সাতে শিরক সহকারে এক আল্লাহর ইবাদত হতো, এখন তা প্রকৃতির দাসত্ব ও পূজার দিকে চলে এলো। পরে এই প্রকৃতি পূজা থেকে নেমে এলো তার নিজের পূজা ও দাসত্বের দিকে। মানুষ মানুষের পূজা ও দাসত্ব করেছে। আর তার ফলে ধ্বংসাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ সেই সব দেবতার পূজা ও উপাসনা করতে বাধ্য হয় যারা জালিম, নিষ্প্রাণ ও মানুষকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করেছে। এদের হাতে নিশ্চয়তা বা নিয়তির কঠোরতা ও অপমান ছাড়া আর কিছুই নেই।

 

এই হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত এবং এর মতো খারাপ ও মারাত্মক জিনিস আর কিছুই হয় না।

 

এই সব পতনের পিছনে কোনো যুক্তি নেই, নেই দূরদৃষ্টি, নেই কোনো সনদ। কেননা আল্লাহর সাথে শিরক-এর বিপর্যয় যখন শুরু হল, তখনও তার কোনো মুক্তি ছিল না, কোনো সনদও ছিল না।

 

বস্তুত যে লোক যথার্থ ও নির্ভুলভাবে আল্লাহকে জানতে ও চিনতে পারে, তার পক্ষে তাঁর সাথে কোনো ধরনের শিরক চিন্তা করা কখনোই সম্ভব হতে পারে না। কিন্তু ইউরোপ যেহেতু রোমান পৌত্তলিকতা মিশ্রিত আকীদা গ্রহণ করেছিল কনস্টান্টাইন সম্রাটের কাছ থেকে, এই কারণে তারা আল্লাহকে যথার্থ উচ্চতর মর্যাদার দৃষ্টিতে চিনতে ও জানতে পারেনি। তারা জাহিলিয়াতের মধ্যেই নিমজ্জিত হয়ে থাকল এবং এ জাহিলিয়াতের গ্রাস ক্রমবর্ধমান হল।

 

জনৈক ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেছেন যে, হযরত মূসা (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর ওপর অবতীর্ণ শরীয়ত যেহেতু রোমান সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্ত-ক্ষুদ্র অংশে প্রকাশমান হয়েছিল, এই কারণে ইউরোপের এত বিশাল বড় সাম্রাজ্যে তা কার্যখর করা সম্ভবপর ছিল না।

 

এই মত থেকে মূল ব্যাপারের বহু কয়টি দিকের মধ্যে একটি মাত্র দিক উদ্ভাসিত হয়। কিন্তু অপর এক মহাসত্যকে আচ্ছন্ন করেই রাখে। আর সে সত্য হচ্ছে, স্বয়ং সেই খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মূল আকীদা যথাযথ ও নির্ভুলভাবে স্থান পায়নি। যদি তা বাস্তবিকই নির্ভুল ও  নির্দোষ থাকত, তাহলে রোমান আধিপত্য তার পথ রোধ করতে পারত না। যেমন করে আরব উপদ্বীপ ও তার বাইরের জাহিলিয়াতের শক্তিসমূহ ইসলামী শক্তির সম্মুখে মুহুর্তের তরেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এই বাইরের শক্তিসমূহের মধ্যে ছিল সমগ্র রোমান সামাজ্র, পার্শ্ববর্তী পারসিক সাম্রাজ্য। সে যা-ই হোক। এই সমস্ত কারণ অবস্থার একটা ব্যাখ্যা তো দেয় বটে, কিন্তু তার পক্ষ সমর্থন করে না। দুনিয়ার কোনো জিনিসই আল্লাহ থেকে বিপথগামিতাকে সমর্থন  দিতে পারে না।

 

মূলত এই মৌলিক বিকৃতিই সকল প্রকার বিপর্যয়ের অগ্রবর্তীর কারণ। মনে যদি শিরক গ্রহণের অবকাশ থেকে থাকে, তাহলে সে শিরক গ্রহণের পর সব কিছুই সহজ হয়ে যায়। আর এই বিপর্যয়ও যখন শুরু হয়ে যায়, তখন সেই পথটাই নিয়ে আসে পতনের পর পতন এবং অধিকতর বিপর্যয়।

 

ইউরোপের সূচনাটাই হয়েছে অত্যন্ত ভুলভাবে। পরে ক্রমশই তা আল্লাহর হেদায়েত থেকে দূরে –বহুদূরে সরে যেতে থাকে অব্যাহতভাবে। কালের অগ্রগতির সাথে সাথে সে দূরত্ব অনেক দীর্ঘ হতেও দীর্ঘতর হতে থাকল।

 

গীর্জা যখন নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে সমস্ত খারাবি ও বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিল (যে বিষয়ে পূর্ব কিছুটা আলোচনা করে এসেছি), তখন ইউরোপের লোকদের আকীদায় এক নতুন বিকৃতি সৃষ্টির কারণ হয়ে দেখা দিল। আর তাই ক্রমাগতভাবে দীর্ঘ পরিক্রমার পরিণতিতে বর্তমান বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত পর্যন্ত এসে ঠেকিয়ে যোগ করে দিল।

 

এটাও এক ধরনের ব্যাখ্যা বটে! কিন্তু তা-ও তাকে কোনো সমর্থন দিচ্ছে না। কেননা ইউরোপীয়রা আগে থেকেই মনে করত যে, গীর্জা যাই পেশ করে, তা প্রকৃত ধর্ম নয়। তা পাদ্রী-পুরোহিতদের নিজেদের মনগড়া কথাবার্তা, তাদের নিজেদের সৃষ্টধর্ম। তাতে এমন আকীদা রয়েছে যা তাদের বোধগম্য নয়, যা গ্রহণ করতে তাদের বিবেক-বুদ্ধি অস্বীকার করে, কেননা এখন তাদের বিবেক-বুদ্ধি নতুন আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

 

কিন্তু ইউরোপীয় গীর্জা যে বিকৃত ধর্ম পেশ করছিল, তাকে প্রত্যাখ্যান ও প্রত্যাহারকরে নবী-রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর নাযিল করা পরিচ্ছন্ন ও পরম সত্য আকীদা ভিত্তিক ধর্ম গ্রহণ অগ্রাহ্য করে বসল। বলতে লাগলঃ সব ধর্মই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও পৌরাণিক কাহিনিমূলক।

 

কিন্তু সে যা-ই হোক, ইউরোপ যতই ইউরোপ যতই পেশ করুক, কোনো কিছু থেকেই ইউরোপ বাঁচতে পারে না।

 

মধ্যযুগে প্রকৃতি পূজার ব্যবস্থায় ইউরোপ যে কঠিন শিরক-এ নিমজ্জিত হয়েছিল, তার সমর্থনে কোনো যুক্তিই পেশ করা যেতে পারে না। ইউরোপের নতুন আলোকপ্রাপ্ত লোকেরা যে নতুন রূপে শিরক গ্রহণ করেছিল, তার কোনোই তাৎপর্য নেই। আমরা আগেই বলেছি, প্রকৃতি পূজা মূলত গীর্জার স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ব থেকে বাঁচার একটা পন্থা হিসেবেই অবলম্বিত হয়েছিল। কিন্তু খোদা প্রকৃতি জিনিসটি কি?

 

বিরোধী হেলেনীয় আদর্শের আলোকে এই বুদ্ধিবাদের যুগে একজন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ ডারউইনের এক কথাকে কি করে যুক্তিসঙ্গত ও বিবেকসম্মত বলে মানতে প্রস্তুত হতে পারে যে, প্রকৃতিই সব জিনিসের সৃষ্টিকর্তা? আর প্রকৃতির শক্তির কোনো সীমা-শেষ নেই। এই নিষ্প্রাণ-বুদ্ধিহীন প্রকৃতি বুদ্ধিমান, জ্ঞঅনবান, চিন্তাশীল সত্তা কিংবা অ-বুদ্ধিমান-[ডারউইন তাঁর পূর্ব কথার বিপরীত বলেছেঃ প্রকৃতি তার বিবর্তনে দিশেহারা অনিয়মিতভাবে কাজ করেছে।] সত্তা সৃষ্টি করেছে যা গোটা প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করেছে ও তার ভাগ্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে। একথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব?

 

সেসব আলোকপ্রাপ্ত লোকেরা নিজেদেরকে এ প্রশ্ন না করে পারল কি করে যে, তারা সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিতভাবে যে প্রকৃতির দাসত্ব করছে, সে প্রকৃতিটি কি? তা সৃষ্ট না অ-সৃষ্ট? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন, না বিবেক-বুদ্ধিহীন? সে জিনিকে নিজে কি করে সৃষ্টি করল? কেমন করে বানাল সেসব নিয়ম, যা বিশ্বলোককে নিয়ন্ত্রিত করছে? এসব নিয়মের এমনকি কর্তৃত্ব ক্ষমতা রয়েছে যার বলে এ বিশ্বলোককে সেসব নিয়ম অনুযায়ী চালাতে সক্ষম হচ্ছে, তা এই নিশ্চয়তা ও অনিবার্যতা কোত্থেকে পেল, যা তা গোটা বিশ্বলোকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্বলোক সেই অনুযায়ী চলতে শুরু করে দিল?

 

তা ছাড়া এ নবতর মাবুদ যাকে সরল প্রকার শক্তি-ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও বিশ্বলোকের ওপর এই নিরংকুশ সংরক্ষণতার একমাত্র উৎস বলে মনে করা হচ্ছে, আর আল্লাহ এই দুইয়ের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্যটা কি (যে আল্লাহকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিতান্ত অযৌক্তিক ও অবাধ্যভাবে যাঁর ইবাদত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে)?

 

অদৃশ্য গায়েমী শক্তিকে মেনে নিতে তো অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাহলে তারা এই প্রকৃতি সম্পর্কে নিজেদেরকে এ প্রশ্ন না করে চুপ থাকতে পারল কি করে? তা কি গায়েবী নয়? না, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণীয়? তার প্রপঞ্চ ও প্রকাশমান যদি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলে লক্ষণীয় হয়ে থাকে, বস্তু ও আলোকোচ্ছটাই যদি হয় তার বাহ্য প্রকাশ, তাহলে তার নিদূঢ়ত্ব ও প্রকৃত সত্যটা কি? তা কি তাই, যা আকাশকে আকাশ বানিয়েছে আর পৃথিবীকে পৃথিবী? বস্তুটি শুধু বস্তু? …….তাকি গায়ব নয়? নয় এমন প্রচ্ছন্ন যে, ইন্দ্রিয় নিয়ে তা আয়ত্ত করতে পারে না।

 

আল্লাহও কি এ ছাড়া অন্য কিছু? তিনিও তো গায়ব, ইন্দ্রিয়নিচয় তাঁকেও আয়ত্ত করতে পারে না। কিন্তু তাঁর মহাশক্তির প্রকাশমানতার প্রতীক হয়েছে এই বিস্তীর্ণ বিশাল আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী। …এই বস্তু ও আলোকোচ্ছটা।

 

এই প্রেক্ষিতে তো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইউরোপীয় সেসব আলোকমণ্ডিতরা এক মহা নির্বুদ্ধিতার আবর্তে পড়ে গিয়েছিল।

 

অতঃপর প্রকৃতি পূজার অবসান ঘটে। মানুষ নিজেই নিজের পূজা করতে শুরু করে। কিন্তু মানুষ পূজার একান্ত কি? কেন ঘটল? কিভাবে ঘটল? কি এ তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা?

 

তাকি এ জন্যে যে, মানুষ বিদ্যা অর্জন করেছে এবং তার শক্তি বেড়ে গেছে?

 

স্রষ্টা অস্বীকারকারী এই ঘৃণ্য জাহিলিয়াতকে খানিকটা সময়ের জন্যে চোখের আড়ালে সরিয়ে রাখুন। কেননা এ জাহিলিয়াত এতই হীন ও নিকৃষ্ট যে, তা তার সেই স্রষ্টাকে চিনতে পারে না, যে তাকে এই জ্ঞান ও বিদ্যা দান করল। মহাদানকারী, নিয়ামতদাতা আল্লাহ তা’আলার এই মহাদানের বিনিময়ে তাঁর শোকর আদায় করার পরিবর্তে মানুষ নিজেই সে মহাদানকে তাঁর প্রতি কুফর ও না শুকরির কারণ বানিয়ে নিয়েছে।

 

এ জাহিলিয়াত তো প্রাচীন  গ্রীক জাহিলিয়াতের প্রাণশক্তিকেও বিষাক্ত জর্জরিত করে ফেলেছে মানুষ ও দেবতাগণের মধ্যে দুঃখজনক দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম সৃষ্টি করে দিয়ে। যখন তা দেবতাগণের কাছ থেকে কিছু পরিমাণ জ্ঞান ও বিদ্যা কেড়ে নিয়েছে, তখনই তার বিদ্রোহের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে শুধু এই কারণে যে, তার হাতে একটা কর্তৃত্ব এসে গেছে।

 

কিছু সময়ের জন্যে এ সবই দূরে সরিয়ে রাখুন। তারপরে আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে, মানুষ কি বিজ্ঞানটা অর্জন করে বসেছে যে, মহাদাতা নিয়ামতদানকারী আল্লাহ তা’আলাকে সে চিনতে পারছে না, অস্বীকার করতে প্রস্তুত হয়ে গেল?

 

আমেরিকান বিজ্ঞানী মারেট স্টেনলে কোংগডট তাঁর ‘গোলাপ বাহার অধ্যয়ন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেনঃ

 

“বিজ্ঞান যদিও পর্যবেক্ষণীয় (বা পর্যবেক্ষিত) মহাসত্যের নাম, কিন্তু তা সত্ত্বেও মানবীয় কল্পনা অধ্যয়ন ও ফুল গ্রহণের বিভিন্ন পদ্ধতি দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। এই পরিসীমার মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা-গবেষণার ফলাফল গ্রহণীয় বটে। কিন্তু পরিমিতির ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তার শুরুও শুধু সম্ভাবনা, আর শেষ ও সম্ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো পর্যায়েই দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও চিন্তা গবেষণা ফল ভ্রান্ত হওয়াই সম্ভব ধারণা, অনুমান, পারস্পরিক তুলনা ইত্যাদির দিক দিয়ে। তাছাড়া তা যে কোনো সময় পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত, সংশোধিত, বর্জনকৃতও হতে পারে। কোনো চূড়ান্ত কথাই নেই তাতে”।[আল্লাহ বিজ্ঞান যুগে প্রতিভাত গ্রন্থের আরবী অনুবাদ ডঃ দমরাশ আবদুল মজীদ মারহান।]

 

এ উক্তিটি কোনো ধার্মিক বা ধর্মবাদী ব্যক্তির উক্তি নয়।

 

এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, মানবীয় বিদ্যা সম্ভাব্যতা পরিপূর্ণ (এ হতে পারে, ও হতে পারে –ইত্যাকার কথাবার্তাই হচ্ছে বিজ্ঞান।) সেখানে দৃঢ় নিশ্চিত প্রত্যয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। তা যত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির সাহায্যে যত সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই করা হোক না কেন।

 

আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রটাও একবার দেখুন!

 

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান বাধ্য হয়েছে বস্তুর আসল সত্যতা ও তার নিগূঢ় তত্ত্ব জানতে চেষ্টা করার পরিবর্তে তার শুধু বাহ্যিক দিক ও রূপরেখা সম্পর্কিত জ্ঞানঅর্জন করাকে যথেষ্ট মনে করত। কেননা তা জানতে পেরেছে যে, ইন্দ্রিয় অগম্য প্রচ্ছন্ন নিগূঢ় তত্ত্ব জানতে পারা কোনো ক্ষমতাই তার আয়ত্তে নেই। শুধু বাহ্যিক অধ্যয়ন ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর নেই। আর এই বাহ্য বিষয় অধ্যয়ন সম্পর্কেই উপরোক্ত বিজ্ঞানী বলেছেন যে, এই জ্ঞান বা বিজ্ঞান কোনো নিশ্চিত, নিঃসন্দেহ ও দৃঢ় প্রত্যয়মূলক জিনিস নয়। বরং তা সূচিত হয় সম্ভাবনা থেকে এবং পরিসমাপ্তও হয় এই সম্ভাবনা নিয়ে।

 

তাহলে প্রকৃত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমষ্টির মধ্যে এহেন বিজ্ঞান বা জ্ঞানের অবস্থাটা কি? কি তার মূল্য ও গুরুত্ব? এই বিজ্ঞানের কারণে আকজের মানুষ কোন কঠিন ধোঁকায় নিপতিত হয়েছে?

 

তাছাড়া মানুষ বাস্তবিকই যা জানতে আগ্রহী, সে তুলনায় তার অর্জিত এই বিজ্ঞানের পরিমাণ বা মাত্রাই বা কি?

 

সে গায়বী বিদ্যা কোথায়, যার সন্ধানে মানুষ প্রথম সৃষ্টি মুহুর্ত থেকে এবং হাজার হাজার বছর থেমে মানুষ আকুল আগ্রহী হয়ে আছে?

 

মানুষ গায়ব-এর কতটা জানে? স্থান ও কালের দৃষ্টিতে দূরবর্তী জ্ঞানের কথা তো অনেক দূরে, সম্মুখবর্তী মুহুর্তকাল জ্ঞানও কি মানুষের আছে? চলমান মুহুর্ত –যা সর্বদিক দিয়ে তার সম্মুখে উপস্থিত, সেই মুহুর্তের জ্ঞানও কি মানুষ আয়ত্ত করতে পেরেছে? তার ও এই জ্ঞানের মাঝে কি লক্ষ আবরণ ও অন্তরাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়নি?

 

এই তো হচ্ছে মানুষের জ্ঞানের দৌড়।

 

শক্তির কথা? হ্যাঁ মানুষের শক্তি আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, তা সত্য। মানুষ তার পরিবেশের ওপর ….প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে, সন্দেহ নেই। বিন্দু ও অণুকে মানুষ চূর্ণ করে পরমাণুর উদ্ভাবন করেছে। আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, রকেট ছেড়েছে। চাঁদের বুকেও  পদ সঞ্চারিত হয়েছে, বিজয় পতাকা পতপত করে উড়ছে সেখানে। ..এ সবই সত্য।

 

কিন্তু….. মানুষ যে শক্তি অর্জন করতে আগ্রহী, তা কি সে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে?

 

মৃত্যুকে প্রতিরোধ করার শক্তি কি মানুষ অর্জন করেছে? চিরন্তন জীবন লাভের শক্তি কি আয়ত্তাধীন হয়েছে মানুষের? ….স্বভাবগত সেই আগ্রহের কারণেই শয়তান আদমকে পদস্খলিত করতে সুযোগ পেয়েছিল। আদমের সন্তানরা আজও সেই কামনা নিয়ে বসে আছে, কেয়ামত পর্যন্তই থাকবে তার এই বাসনা! শয়তান আদম ও হাওয়াকে সম্বোধন করে এই কথাই তো বলেছিলঃ

 

(আরবী****************************************************************)

 

তোমাদের রব্ব তোমাদের দুইজনকে এই বৃক্ষটি সম্পর্কে যে নিষেধ বাণী দিয়েছেন, তা অন্য কোনো কারণে নয়, শুধু এই জন্যে যে, (গাছটি থেকে কিছু আহার করলে) তোমরা দুজনই ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা দুজনই চিরতরে জান্নাতবাসী হয়ে যাবে ….ফলে সে দুজনকে প্রতারিত করে ফেলল। (সূরা-আরাফঃ ২০-২২)

 

অন্তত রোগ প্রতিরোধ ….রোগজীবাণু ধ্বংস করা কি সম্ভব হয়েছে মানুষের দ্বারা? আজও অনুবীক্ষীয় রোগ জীবাণু বড় বড় চিকিৎসা অযোগ্য রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

মূর্খতা ও অক্ষমতাই নাকি আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার কারণ, ইলিয়ান হাক্সলী তার বুকের ওপর চড়ে বসা বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াতের কারণেই এইরূপ বলেছিলেন।

 

তা হলে তা-ই হওয়া উচিত ছিল কিন্তু বিজ্ঞান ও শক্তি কিংবা মূর্খতা ও অজ্ঞমতা পর্যায়ে বাস্তবে কি ঘটেছে? আল্লাহর ইবাদত পরিহার করার প্রবণতা মানুষের কিছু মাত্র কমেছে কি?

 

আমরা আবার সেই জাহিলিয়াতের প্রসঙ্গটা তুলছি, যার সব কিছুই ওলটপালট হয়ে গেছে।

 

আল্লাহ তা’আলা মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের এবং কোনো কোনো প্রাকৃতিক শক্তির আয়ত্তাধীন বানানোর শক্তি কি এ জন্যে দিয়েছিলেন যে, মানুষ অহংকার-অহমিকায় দিশেহারা হয়ে যাবে এবং আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যাগ করবে?

 

মূলত এ একটি মারাত্মক অভিশাপ। আগুন চোর প্রোমিথিউস সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনীই ইউরোপীয় চিন্তা বিজ্ঞানের ওপর টেনে নিয়ে এসেছে।

 

অহংকারী দাম্ভিক মানুষের ব্যাপারটাই দেখুন। সে বলছেঃ আমি আল্লাহর কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

 

আল্লাহর আনুগত্য পরিহার করে সে কোনো অপরাধ করা বাদ দিয়েছে?

 

সে বলেছে, আমিই আমার জন্যে আইন প্রণয়ন করব। …..কেননা সে এখন গোলামী থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে।

 

বলেছে, আমার আকীদা ও আনুগত্য বিধান আমি নিজেই রচনা করব।

 

বলেছে, আল্লাহর হেদায়েতকে পাশ কাটিয়ে আমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আমি নিজেই গড়ে তুলব।

 

কিন্তু পেরেছে….?

 

আসলে এ সবই ছিল শয়তানের ধোঁকা।

 

এটাই যদি শয়তানের কৃত না হয়ে থাকে, তা শয়তানের কীর্তি আর কি-ই বা হতে পারে! ….মানুষ একা এই কাজ কি করে করতে পারে!

 

সমগ্র পৃথিবী অন্যায়, পাপ ও দুষ্কৃতিতে ভরপুর করে দেওয়ার এ সাধ্য মানুষ কোথায় পেল? সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই জুলুম শয়তানের সহায়তা ছাড়া মানুষের পক্ষে করা কি করে সম্ভবপর হলো? পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য এই অপমানকর দাসত্ব মানুষের ললাট লিখন কি করে হতে পারল?

 

এ দাসত্ব বিচিত্র ধরনের।…..

 

মূলধনের দাসত্ব…..

 

রাষ্ট্রের দাসত্ব……..

 

মহান ব্যক্তিদের দাসত্ব ….মৃত অলী-আল্লাহগণের দাসত্ব

 

সর্বধ্বংসী লালসা-কামনার দাসত্ব।

 

এ সব নিতান্তই দাসত্ব –অপমানকর –লাঞ্ছনাকারী।

 

পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তীর্ণ এই পাপ মানুষ কি করে করতে পারল, যা পৃথিবীর চেহারাটাই বদলে বিকৃত করে দিয়েছে, পাপের এই গভীর পংক কি আল্লাহই করল যার মধ্যে যুবক-যুবতীরা পরপর নিপতিত হচ্ছে?

 

সভ্য দুনিয়ার হাসপাতাল ও গারতসমূহ যে পাগলের দ্বারা ভর্তি হয়ে আছে, এমনভাবে যে কোথাও তিলমাত্র স্থান খালি নেই?

 

পাগলামী তো এমন রকমারি যে, সরকারীভাবে তা গণতায় আসেনা, কিন্তু তা যে রোগ, অনিয়মতা, অসুস্থতা, প্রকৃতপক্ষে তা পাগলামী না হয়ে যায় না।

 

…এ হচ্ছে বন্ধুত্বের পাগলামী, সিনেমা থিয়েটারের পাগলামী, টেলিভিশনের ফ্যাসন-শোর নৃত্য-গীতের পাগলামী, ছিনতাইয়ের পাগলামী ….এই ধরনের অন্যান্য বহু প্রকারের বিকৃতি, বিপথগামিতা ও বিপর্যয়। আল্লাহার ইবাদত করাকে অহংকারবশত ঘৃণাকারী আল্লাহর দ্বারা এই সব বিপর্যয় হওয়া তো কোনো প্রকারের শোভা পায় না।

 

কখখন-ই না।

 

মানুষ যখন নিজকে ‘খোদা’ মনে করে বসেছিল, ধারণা করেছিল যে, দাসত্বের শৃঙ্খল বুঝি ছিন্ন হয়ে গেছে। আল্লাহর হেদায়েত গ্রহণে আর কোনো প্রয়োজনই নেই, তখন মানুষ জঘন্যতার কোন চরমেই না পৌঁছে গিয়েছিল।

 

ইহুদী চিন্তা উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কল্পিত খোদার জন্ম দিয়েছিল এবং সেই সময় থেকেই উম্মীদের চিন্তা সেই চিন্তার দ্বারা বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক-সামষ্টিক ঐতিহাসিক দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা (determinism)। আর এসবই ইতিহাসের বস্তুগত ব্যাখ্যার ফলশ্রুতি।

 

কথিত ও ঘোষিত এসব দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা আসলে কি?

 

প্রথমত, ইতিহাসের বস্তুনিষ্ট ব্যাখ্যা বলছে, মানুষের ইতিহাস হচ্ছে খাদ্যের আলোচনার ইতিহাস। ইতিহাসে তাই হচ্ছে অর্থনৈতিক দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা।

 

খাদ্য সংক্রান্ত আলোচনাকালেই যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উৎপাদনের প্রয়োজন দেখা দেয়।আর এই সব যন্ত্রপাতিই তার জীবনকে ইতিহাসের দীর্ঘ অগ্রগতিতে স্তরে স্তরে অগ্রসর করে নিয়ে এসেছে।

 

প্রাথমিক অবস্থায় ছিল প্রাথমিক কমিউনিজম। তথায় কারোরই ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। অতঃপর কৃষিকাজ উদ্ভাবিত হয়। তারপরই মালিকানার প্রশ্ন দেখা দেয়। তা জমির মালিকানা ও উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানা। তখব ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে এক জাতির অপর জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার দরুন দাসত্ব প্রথার জন্ম হয়। পরে এক এক জাতিকে দাস বানিয়ে তাদেরকে ভূমি চাষে নিযুক্ত করে ভূমিদাস বানিয়ে দেওয়া হয়। তারপরই জায়গীরদাবী বা সামস্তপ্রথার উদ্ভব ঘটে। এক নিশ্চিত অনিবার্যতা বা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতার ফলশ্রুতি স্বরূপ। এরপর যন্ত্রপাতি উদ্ভাবিত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে পুঁজিবাদের জন্ম। এও এক সুনিশ্চিত অনিবার্যতা। এখন জায়গীরদারী খতম হয়ে যায় এক নিশ্চিত অনিবার্যতার ফলস্বরূপ। অতঃপর মূলধন ও শ্রমিকদের মধ্যে এক সুনিশ্চিত অনিবার্যতার ন্যায়ই চরম দ্বন্দ্বও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। যন্ত্রপাতির মালিকানা ও উৎপডন্ন পণ্যের মালিকানা ও উৎপন্ন পণ্যের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে এক সুনিশ্চিত অনিবার্যতাস্বরূপ। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে বরং সর্বশেষ পর্যায়ে দ্বিতীয় কমিউনিজম জন্মগ্রহণ করে। তার জন্মের এটাই হচ্ছে পথ। তথায় ব্যক্তিগত মালিকানা থাকবে না কোনো একজন ব্যক্তির জন্যেও।

 

নিশ্চিত অনিবার্যতা ভিত্তিক মানবীয় ইতিহাসের এটাই হচ্ছে সারনির্যাস। এই ধারায় চিন্তা করা কেবল জাহিলিয়াতের পক্ষেই সম্ভভ বলে ধারণা করা যায়।

 

ইতিহাসের এ ব্যাখ্যা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে বিশ্বলোক জীবন ও মানুষের জন্যে  তাঁর কৃত যাবতীয় কল্যাণকর ব্যবস্থাপনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো এরূপ ব্যাখ্যা দ্বারা ইতিহাস কোনো মোক্ষম লাভ করল? কোথায় পৌঁছল, এ তো এমন ব্যাখ্যা যা আজকের আলোকমণ্ডিত ও আজকের জাহিলি জ্ঞান-বিজ্ঞান পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ ও  সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে পারে না।

 

জীবনের এই সমস্ত বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যাকে যদি সঠিক মেনেও নেওয়া হয় যদিও এখনই ভালোভাবে জানা যাবে যে, এ ব্যাখ্যা কোনোক্রমেই যথার্থ নয়, তবু মানুষের ইচ্ছা ও অবস্থার সাথে তার কোনোরূপ অসঙ্গতি সম্পর্ক হওয়া তো উচিত হতে পারে না।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষই কি জমি ও উৎপাদনযন্ত্রের মালিক হয়ে বসেনি অথচ পূর্বে তারা তার মালিক ছিল না? জমির ওপর মালিকানা কি জমি নিজেই চাপিয়ে দিয়েছে? জমি কি মানুষকে ডেকে বলেছিল যে, তোমরা শিগগীর আমার মালিক হয়ে যাও? জমিই কি মানুষের গলা চেপে ধরে বলেছিল যে, জমির মালিক হওয়া ছাড়া মানুষের আর কোনো গত্যন্তর নেই? কিংবা মানুষই জমির মালিক হয়েছিল এ জন্যে যে, মালিকানা লাভ মানষের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা?

 

মানুষ নিজেরাই কি ইচ্ছা করে যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন করেনি? কিংবা যন্ত্রপাতিই মানুষের গলা চেপে ধরে বলেছিল যে, আমাকে নির্মাণ কর? তার উন্নতমানের ও নিখুঁত নির্মাণের জনে মানুষ নিজেই কি আগ্রহী হয় নি? –এবং এ আগ্রহও তার স্বভাবের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে? ….সেই তো যন্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া শিক্ষা লাভ করেছিল, তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছিল এবং শেস পর্যন্ত তা নির্মাণে সক্ষম হয়েছিল।

 

এক্ষণে এ কথা যদি ধরেও নিই যে, এসব যন্ত্রপাতিই মানবতার ইতিহাস লিখছে, তাহলেও কি বলতে হবে যে, তাতে মানুষের ইচ্ছা শামিল নেই? ….তাহলে বিবর্তন মানুষের ইচ্ছার বাইরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নিঃসম্পর্কভাবে কি করে সম্ভবপর হলো?

 

অতঃপর যখন পুঁজিতন্ত্র চালু হয়ে গেল, তখন কি মালিক হয়ে বসার জন্যে মানুষ নিজেরাই আগ্রহী হয়ে ওঠেনি? নিজেরাই কি স্বভাবের তাড়নায় চায়নি যে, তাদের মালিকানা সম্পকের পরিমাণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হোক। মানুষের মধ্যে তো এই স্বাভাবিক তাড়না রয়েছে যে, সে যখন বিপথগামী হয়, তখন বিদ্রোহ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

 

তারপর যখন কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকেই সত্য ও ন্যায়পর পথ মনে করেনি? ফ্রেডারিক এঞ্জেলস তো তারই ওপর বিদ্রূপ করে বলেছিলঃ

 

‘মানুষ বৈষয়িক ব্যাপারাদিতে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকারই রাখে না’। এটা হলো প্রথম কথা। ….উল্লিখিত নিশ্চিত অনিবার্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃষ্টিতে এটা একটা খুবই নিকটবর্তী কথা!

 

আর দ্বিতীয় যে কথাটি চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের জন্যে প্রকৃত সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী, তা হচ্ছে, এসব নিশ্চিত অনিবার্যতাকে সত্য বলে ধরে নিলেও প্রশ্ন থাকে যে এসব কার নির্ধারিত নিশ্চিত অনিবার্যতা?

 

মানব প্রজাতির অগ্রগতির পথে এসব নিশ্চিত অনিবার্যতা কে ধার্য করেছে, কে অপরিহার্য বানিয়ে দিয়েছে?

 

তা-ই কি জীবনের জন্যে একটি মাত্র উপায়?

 

মানুষের পক্ষে কি প্রাথমিক পর্যায়ের কমিউনিজম স্তরে চিরদিনের তরে চিহ্নিত হয়ে থাকা সম্ভবপর ছিল না?

 

দাস প্রথার যুগে চিরদিন দাঁড়িয়ে থাকাও কি অসম্ভব ছিল? ….সামন্তবাদী যুগে? কিংবা পুঁজিবাদী স্তরে স্থায়ীভাবে? যন্ত্র উৎপাদন মানুষের জীবনকে একটা নতুন দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। খুলে দিয়েছিল এক নবতর দিগন্ত।

 

হ্যাঁ, যন্ত্র উৎপাদনও কি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিশ্চিত অনিবার্যতা? ….কে তা চাপিয়ে দিল?

 

আল্লাহর কথা স্মরণের ও তার বিধান পালনের ব্যাপারে কি আল্লাহর কোনো অংশ নেই? …অন্ততঃ একটা পক্ষও কি তিনি নন? তিনি-তো শিরককারীদের কথা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, পরম পবিত্র।

 

তিনিই কি মানুষকে সৃষ্টি করেন কি? ….মানুষকে যন্ত্র উৎপাদনের বুদ্ধি ও ক্ষমতা কি তিনি-ই দেন নি?

 

মানুষকে তাঁর এই শক্তি ও বুদ্ধি দান করাও কি নিশ্চিত অনিবার্য ছিল? মহাবিশ্বের পৃথিবী নামের গ্রহটির অস্তিত্বের কি নিশ্চিত অনিবার্য ছিল? না, তারও ওপরে গিয়ে বলো, এই গোটা বিশ্বলোকের অস্তিত্বটাও কি নিশ্চিত অনিবার্য ও অবধারিত ছিল? …সে নিশ্চিত অনিবার্যথা কার নির্ধারিত, কে করেছে তাকে নিশ্চিত অনিবার্য অবধারিত?

 

মহান আল্লাহর বিধান পালনের প্রতি এই অনীহা কেন?

 

মানুষের অন্তদৃষ্টি মহাসত্যের ওপর উন্মিলিত ও নিবদ্ধ হওয়া উচিত নয় কি?

 

আবার জিজ্ঞেস করছি, আল্লাহই কি এই বিশ্বলোককে সৃষ্টি করেন নি? যদিও তিনি তা করতে কোনোক্রমেই একবিন্দু বাধ্য ছিলেন না। …কে পারে তাকে বাধ্য করতে? …তিনি তো তা থেকে সর্বতোভাবে পবিত্র।

 

তিনিই কি পৃথিবী সৃষ্টি করেন নি? …মানুষকে সৃষ্টি করেন নি? …..অথচ তিনি তা সৃষ্টি না করেও পারতেন। সৃষ্টি না করলে তাঁর কিছুই ক্ষতি বা লাভ হতো না? …তিনি তার ঊর্ধ্বে। কিংবা জীবন ও মানুষের আত্মপ্রকাশের অনুকূল কোনো পরিস্থিতি এখানে আদপেই হতো না, তা-ও হতে পারত।

 

….এ সবই যখন আল্লাহ নির্ধারিত….. তিনিই তো সৃষ্টিকর্তা। ….তাহলে আমরা কোনো এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারি যে, না, না, তুমি নও হে খোদা! সে নির্ধারক হচ্ছে ঐতিহাসিক কিংবা অর্থনৈতিক অথবা সামাজিক-সামষ্টিক নিশ্চিত অনিবার্যতা। …কিংবা বানানো দেবতাগণই হচ্ছে তার নির্ধারণ?

 

ইউরোপীয় চিন্তা তার জাহিলিয়াতের তুঙ্গে ওঠে যে সব ‘খোদা’ বা ‘দেবতা’ উদ্ভাবন করেছে, তারা সবই অত্যন্ত নির্মম, অন্তঃসারশূন্য ও রুঢ় –বে-রহম। ওরা মানুষের ইচ্ছার কোনো অধিকারই স্বীকার করে না, দিন-রাত মানুষ যে ফরিয়াদ আর্তনাদ করে, তা-ও তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না, মর্ম স্পর্শ করে না। কোনো ডাকেরই এক বিন্দু সাড়া দেয় না।

 

এই দেবতাগুলো নিজেদের উদ্ভাবিত নির্বুদ্ধিতা মূল নিশ্চিত অনিবার্যতার দরুন মানুষকে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে উপেক্ষা করে গেছে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও কাজের সাথে সেগুলোর কোনো সম্পর্কই নেই। …মানুষের কাজ সঠিক কিংবা ভুল, তা নিয়েও তাদের কোনো ভাবনা বা দায়-দায়িত্ব নেই। মানুষের সত্যিকারভাবে উন্নতি হলো; কিন্তু লাঞ্ছনা-ব্যর্থতার অতল গর্ভে ডুবে গেল, তারা ঈমান আনল কি কুফরী অবলম্বন করল, সে বিষয়েও ওদের কোনো জবাবদিহি নেই। মানুষের সাথে এসব দেবতার আচরণ এমন, যেন মানুষ কোনো প্রাণহীন সত্তা, তারা তাদের পরাক্রমশালী নিশ্চিত অপরিহার্যতার সম্মুখে অত্যন্ত হীন ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। অথবা তাদের সাথে সেগুলোর আচরণ এমন যে, তারা যেন মানুষ পদবাচ্য নয়, তারা যেন ছাগল-ভেড়ার পাল। তাদেরকে এক অজানা পথে তাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে, সে পথ সম্পর্কে কোনো ধারণা করারও যেন কোনো শক্তি নেই তাদের।

 

বস্তুত এ ছিল মানবতার পক্ষে অত্যন্ত অপমানকর, চরম লাঞ্ছনার ব্যাপার। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কার্যাবলী –যা মানবীয় মহাসত্য সম্বলিত মূল্যমান, তার পক্ষে এর চাইতে অপমানকর ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না।

 

মানুষ আল্লাহর হেদায়েত থেকে দূরে সরে গিয়ে কি এই মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষী হয়েছিল? এখানে তারা তো নিকৃষ্টতম দাস হয়ে বসেছে নির্দয় ও তাদের অবস্থার প্রতি ভ্রূক্ষেপহীন দেবতাকুলের।

 

বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াতে মানুষের কি চরম ও মর্মান্তিক অবস্থাই না হয়েছে।

 

মানুষের এ জাহিলিয়াতে দুর্গতি  ও লাঞ্ছনার এই সীমা পর্যন্ত এসেও থেমে যায়নি। থেমে যাওয়া সম্ভবও ছিল না। আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণায় যদি বিপথগামিতা ও বিপর্যয় শুরু হয়ে যায়, তাহলে মানুষের সকল প্রকারের ও পর্যায়ের ধারণায় এবং বাহ্যিক আচার-আচরণে চরম গুমরাহীর মধ্যে পড়ে যাওয়া অবধারিত হয়ে পড়ে। কেননা শুরুতেই যাত্রা লক্ষ্য ভুল নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কারণে পথের প্রতি পদক্ষেপই ভুল দিকে ছুটে চলছে।

 

আধুনিক ইউরোপীয় জাহিলিয়াতে মানুষ বিশ্বলোক সংক্রান্ত ধারণায় তার সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক এবং তার সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণেও মারাত্মক ভুল করা হয়েছে। ফলে তারা সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে।

 

মানুষ কখনও প্রাকৃতিক নিয়ম-বিধানের নিশ্চিত অনিবার্যতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ঘটনা সংঘটনের কুদরতকেই অস্বীকার করে বসেছে। আবার কখনও বলছে, সমগ্র সৃষ্টিলোক স্বতঃই উদ্ভুত, বিকশিত। কোনো তার জীবন রয়েছে। ফলে তারা বিশ্বলোক ও জীবনের স্রষ্টা মা’বুদকেই অস্বীকার করেছে।

 

কখনও তারা বলছে, বিশ্বলোকের স্বাভাবিক অবস্থা জীবনের উপযোগী  জীবনোদগমের অনুকূলে ছিল না। এখানে জীবনের উদগম সম্ভব হয়েছে একটি সংঘর্ষের ফলে। আর এই সংঘর্ষের শেষ পরিণতিতে মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপ্রকাশ সম্ভবপর হয়েছে।

 

কখনও বলেছে, এই বিশ্বলোক এবং মানুষ নিতান্তই উদ্দেশ্যহীনভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে।

 

এভাবে কত ধরনের কত প্রকারের গুমরাহীর মধ্যে আজকের মানুষ নিমজ্জিত, তা বলে শেস করা যায় না। আর সে গুমরাহীর প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস-মূল্যবোধের ওপর, মানুষের আচার আচরণের ওপর। কোনা তা মূলত উদ্ভুতই হয়েছে আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা থেকে।

 

নিশ্চিত অনিবার্যতা সম্পর্কে আগেই বলে এসেছি। যে নিশ্চিত অনিবার্যতার নাম দেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক আইন, তা অন্যান্য নিশ্চিত অনিবার্যথা থেকে কিছুমাত্র ভিন্নতর জিনিস নয়। তা সবই এই বিশ্বলোকে অবস্থিত একক মহাসত্য ভিত্তিক নিশ্চিত অনিবাযতা থেকে বিভ্রান্ত ও গুমরাহ। সে একক মহাসত্য ভিত্তিক নিশ্চিত অনিবার্যতা হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা।

 

আল্লাহর ইচ্ছা এক নিরংকুশ ও অপ্রতিরোধ্য ব্যাপার। তাকে কোনো বন্ধনেই বন্দী করা বা আটকানো যায় না। আল্লাহর ইচ্ছার পথে যে কোনা বাধারই কল্পনা করা হবে, তা অবশ্যই বাতিল মনে করতে হবে। এমন কে কোথায় আছে বা থাকতে পারে, যে নিজ ইচ্ছাকে আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে! তিনি নিজে সবকিছুর স্রষ্টা, উদ্ভাবক, অমোঘ ইচ্ছার মালিক। সর্বপ্রকার দুর্বলতা অক্ষমতা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।

 

বিভ্রান্তির উদ্ভব হওয়ার কারণ হচ্ছে আল্লাহর সুন্নাতকে (নিয়ম বিধান) বিশ্বলোকের জন্যে অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী মনে করে নেওয়া হয়েছে। অথচ আল্লাহর ইচ্ছা যে স্থিতি এই বিশ্বলোকের জন্যে নির্ধারণ করেছে, তা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সকল বাধা-প্রতিবন্ধকতামূলক। তা ছিল রহমতস্বরূপ এই বিশ্বলোকের জন্যে যেমন, তেমনি মানুষের জন্যেও। তা আল্লাহর ইচ্ছাকে বন্দী ও বাধাগ্রস্ত করতে পারে না, একথা সুস্পষ্ট, মহান আল্লাহকে কেউ-ই কোনো শক্তিই অক্ষম করতে পারে না, একথা সুস্পষ্ট, মহান আল্লাহকে কেউ-ই কোনো শক্তিই অক্ষম করতে পারে না, বিরত রাখতে পারে না বিশ্বলোকে নিজ ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করা থেকে।

 

তা সম্ভবই বা কি করে হতে পারে!...তিনি নিজেই তো সবকিছুর স্রষ্টা, স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী তিনি। মহান আল্লাহ মুক্ত স্বাধীন ইচ্ছা ফয়সালা করেছে যে, বিশ্বলোকের ওপর একটা স্থায়ী নিয়ম চালু হয়ে থাকবে। আধুনিক জাহিলিয়াত তারই নামকরণ করেছে প্রাকৃতিক নিয়ম। মনে হচ্ছে তার প্রকৃত নাম সুন্নাতুল্লাহ বা ‘আল্লাহর নিয়ম’ রাখতে প্রস্তুত ছিল না।

 

কিন্তু সেই আল্লাহই যদি এই স্থায়ী নিয়মের বিরোধিতা করতে ইচ্ছা করে, তাহলে কার অধিকার থাকতে পারে একথা বলার যে, না, না, প্রাকৃতিক নিয়ম কখনোই বদলানো যেতে পারে না?

 

এখানেও মুজিযার প্রশ্ন। বাহ্যিকভাবে স্থায়ী নিয়মের ব্যতিক্রমকেই তো মুজিযা বলা হয়। এটাও তো সেই আল্লাহর সুন্নাত, যা এই বিশ্বলোকে একমাত্র ‘নিশ্চিত অনিবার্য’ হিসেবে চেপে বসেছে, স্থায়ী হয়ে আছে।

 

জাহিলিয়াতের ধ্বজাধারীরা মনে করেছে, তারা স্থায়ী প্রাকৃতিক নিয়ম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করেছে। কিন্তু ‘সুন্নাতুল্লাহ’ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ জাহিল অথচ ‘মুজিযা’ বিশ্বাস করলে প্রাকৃতিক নিয়ম সংক্রান্ত জ্ঞান লাভের পথে কোনোই বাধার সৃষ্টি হয় না। সে বিশ্বাস ও আকীদার অধীন জ্ঞান অর্জনও কিছুমাত্র বাধার সম্মুখীন হতে পারে না, বাধাগ্রস্ত হতে পারে না প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রবর্তিতা ও প্রগতি লাভ। কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম ও সুন্নাতুল্লাহ এই দুটির মধ্যে কোনোই বৈপরীত্য নেই।

 

ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান এক মহামূল্য ও বিরাট উত্তরাধিকার। তা মুসলমানের বিস্ময়কর প্রতিভা ও শক্তি সামর্থ্যের উজ্জ্বল সাক্ষী। সেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবেই তো ইউরোপের আধুনিক পুনর্জাগরণের সব কয়টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আধুনিক কালের সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান তারই ফলশ্রুতি, তারই ওপর স্থাপিত। মূলত সে বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছিল আকীদার ছত্রছায়ায়। মুজিযার প্রতি ঈমানের আশ্রয়ে। তখন মুসলিমদের হৃদয়ে ও চিন্তায় বিশ্বলোকে আল্লাহর সুন্নাতের স্থায়িত্ব এবং মুজিযার প্রতি ঈমান থাকা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক চিন্তা পর্যালোচনা গবেষণা এবং লব্ধ ফল গ্রহণে অনুসন্ধিৎসা পুরোপুরি সম্ভবপর হয়েছিল। কোনো এটা যেমন, ওটাও তেমনি সত্য। আর চিরন্তন সত্য কথা হচ্ছে, প্রকৃত সত্য যা, তার একাংশের সাথে অপরাংশের কোনো বৈপরীত্য থাকতে পারে না। তবে যে সব সংকীর্ণ, বিবেক বুদ্ধি দুটির মধ্যে সমন্বয় সাধনে অক্ষম, তাদের কথা আলাদা।

 

ইউরোপের সংকীর্ণ মন-মানসিকতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই ধারণা যে, কোনো সময় ‘মুজিযা’ সত্য হয়ে দেখা দিলে গোটা বিশ্বব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। কোনো গোটা বিশ্বলোক এক স্থায়ী নিয়মে বন্দী, পরস্পর গভীরভাবে জড়িত। এজন্যে তাদের মতে প্রত্যেক ঘটনার সুনির্দিষ্ট ফল হওয়া অনিবার্য।

 

কিন্তু এই নিয়মগুলোকে কে পরস্পর সংযুক্ত করে দিয়েছে? …এগুলোর সৃষ্টিকর্তা নিজেই তা করেছেন। তাই তিনি নিজেই চান, কোনো মুহুর্তে নির্দিষ্ট ফলের বিপরীত ফল প্রকাশিত হোক। সেই ফল বাস্তবায়িত হওয়া এক বিশেষ উদ্দেশ্যে, তাহলে সেই সৃষ্টিকর্তাকে তা করা থেকে কে বাধাগ্রস্ত করতে পারে? কে পারে তাকে ইচ্ছামতো কাজ করার ব্যাপারে বাধাগ্রস্ত করতে? কোনো সেই বিশেষ উদ্দেশ্য, ব্যতিক্রমধর্মী ফল বের করার পর তা তো সেই স্থায়ী নিয়মেই চলতে থাকবে। তখন আর তাতে কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাবে না।

 

তা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক নিয়মের নিশ্চিত অনিবার্যথা সংক্রান্ত সব জ্ঞানই আনুমানিক সবই সম্ভাব্যতার পর্যায়ভুক্ত।[মার্কিন বিজ্ঞানী ম্যারিয়ট স্টানলী কুঞ্জদন-এর সাক্ষ্য দেখুন। তা এ অধ্যায়েই উদ্ধৃত হয়েছে।]

 

স্যার জেমস্ জীনস্ প্রকৃতি বিজ্ঞান ও অংকশাস্ত্রের একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী মনীষী। শুরু জীবনে তিনি নাস্তিক সংশয়বাদী ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এই মত গ্রহণে বৈজ্ঞানিকভাবেই বাধ্য হলেন যে, বিজ্ঞানের সমস্যাবলীর সমাধানের জন্যে আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই। তিনি বলেছেনঃ

 

প্রাচীন বিজ্ঞান সুদৃঢ়ভাবে মনে করত যে, প্রকৃতি একটি মাত্র পথেই চলতে পারে। সে পথ ছাড়া অন্য পথে হলো তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর সে পথ তাই, যা বহু পূর্বেই স্থায়ীভাবে চালু করা হয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হলোর জন্যে। কার্য ও কারণের ধারাবাহিকতা রক্ষায়। আর তা হচ্ছে ‘ক’-এর পর সব সময়ই ‘খ’ আসবে নিশ্চিত অনিবার্যথার কারণে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আজও বলছে, ‘ক’ অবস্থার পর ‘খ’ অবস্থা যেমন আসা অসম্ভব, তেমনি সম্ভব গ, ঘ, ঙ ও চ অবস্থার সৃষ্টি হওয়া। এমনি আরও কোনো অবস্থা। ফলে তা নিশ্চিত অনিবার্যতাকেই ভুল প্রমাণ করে। তবে হ্যাঁ, একথা বলা যায় যে, ‘ক’ অবস্থার পর ‘খ’ অবস্থার সৃষ্টি হওয়া অধিক সম্ভব গ, ঘ, ঙ, চ ইত্যাদি অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার তুলনায়। আর গ অবস্থার সৃষ্টি হওয়া অধিক সম্ভভ ‘ঙ’ অবস্থার তুলনায়। সেই সাথে খ, গ ও ঙ এই তিনটি অবস্থারই সম্ভাব্যথা সুনির্দিষ্ট করা যায়। কিন্তু নিশ্চয় করে বলা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, কোন অবস্থাটা কোন অবস্থার পর নিশ্চিতভাবে সৃষ্টি হবে। কেননা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতেই হচ্ছে সম্ভাব্যতার ওপর। তবে কোনটা হওয়া জরুরী, এই কথাটি তকদীর বা নিয়তির ব্যাপার –সে নিয়তির মূল সত্য যা-ই হোক-না-কেন।

 

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সূচনায় আধুনিক জাহিলিয়াতের সমস্ত জাহিলিয়াতের মধ্যে একটা বিস্ময়কর জাহিলিয়াত হচ্ছে এই ধারণা যে, এই বিশ্বলোক আপনা-আপনি অস্তিত্ব লাভ করেছে।

 

চার্লস ডারউইন জীবনের বিভিন্ন স্তরের পর্যবেক্ষণ অধ্যয়ন করে জীবনের সূচনাকালীন ও বর্তমানকালীন আকার আকৃতির মধ্যবর্তী স্তরসমূহকে পরস্পর সংযোজিত করেছে। কিন্তু সে গীর্জার ‘খোদা’কে মানতে প্রস্তুত ছিল না। কোনো গীর্জার সাথে তার দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ চলে আসছিল। আর গীর্জাও সেই ‘খোদা’র নামে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। ডারউইন জিদের বশবর্তী হয়েই আল্লাহ-ই যে সৃষ্টিকর্তা এই সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল সত্যকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। আর তার ফলেই বিশ্বলোকের স্বতঃই অস্তিত্বমান হওয়ার জাহিলী পৌরাণিক কিংবদন্তির উদ্ভব ঘটেছে। অথচ এই ধারণাটি আদপেই এমন নয়, যা নিয়ে কিছুমাত্র আলোচনা করা যেতে পারে।

 

বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীগণ নিজেরাই এহেন দুর্বল যুক্তিহীন পৌরাণিক অবিশ্বাস্য ধারণার অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্ক চেতনা লাভ করেছিল এবং তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবেই তা সম্পূর্ণ পরিহার করেছে।

 

জার্মানীর ফ্রাঙ্কফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক রাসেল চার্সস আর্নস্ট বলেছেনঃ ‘নিষ্প্রাণ প্রস্তর থেকে জীবনের উদগম হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন তত্ত্ব ও মতবাদ পেশ করা হয়েছে। কোনো কোনো গবেষক বলেছেন, প্রোটোচিন বা ফিয়োম কিংবা বড় বড় প্রোটিনী অংশর সংমিশ্রণ থেকে জীবন উদ্ভুত হয়েছে। লোকেরা মনে করে এসব মতবাদ ও তত্ত্ব বুঝি জীবন জগত ও প্রস্তুর জগতের মধ্যকার শূন্যতা ভরে দিয়েছে। কিন্তু যে সত্য মেনে নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি, তা হচ্ছে এই যে, জীবন্ত বস্তুকে অ-জীবন্ত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন করার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাছাড়া যারা আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তাদের কাছেও এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, বিন্দু বা অণু ও অংশসমূহের হঠাৎ করে একত্রিভূত হয়ে যাওয়ার ফলে স্বতঃই জীবনের উদগম হতে পারে ও জীবন্ত কোষের রূপ ধারণ করতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তিই সর্বতোভাবে স্বাধীন। কেউ ইচ্ছা করলে জীবনের এই ব্যাখ্যা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মতবাদ গ্রহণ করলে বিবেক-বুদ্ধি এতসব কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে যে, খোদ আল্লাহকে স্বীকার করে নিলে কোনো সমস্যাই দেখা দেয় না।

 

আমি মনে করি, জীবন্ত কোষসমূহের প্রতিটি কোষই এতই জটিল যে, তা অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। আর পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ্য কোটি কোষ তো সেই আল্লাহরই অতুলনীয় শক্তির সাক্ষ্য দান করে। সে সাক্ষ্য বিবেক-বুদ্ধি ও যুক্তিভিত্তিক। এই কারণে আমি সেই আল্লাহর প্রকৃত সুদৃঢ় ঈমান গ্রহণ করছ।

 

আর বিশ্বলোক একটি দুর্ঘটনা (by chance) স্বরূপ অস্তিত্ব রাভ করেছে বলে যে মতটি প্রকাশিত হয়েছে, তার অযৌক্তিকতা, অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট করে তোলার জন্যেও ওপরে উদ্ধৃত কথাটিই যথেষ্ট হতে পারে।  কোনো তা একজন বিজ্ঞানীরই উক্তি।

 

তা সত্ত্বেও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এক পাশে রেখে দিয়ে শুধু খোলা চোখে এবং দূর সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন হৃদয় দিয়ে চিন্তা করি, তা হলেও অতি সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, গগনমন্ডলির আবর্তন এবং বিশ্বলোকের প্রতিটি জিনিসের অত্যন্ত সূক্ষ্ম জটিল ব্যবস্থা-শৃঙ্খলা হঠাৎ করে বা কোনো দুর্ঘটনার কারণে অস্তিত্ব পাওয়া কখনোই সম্ভবপর হতে পারে না। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, এই সব কিছু একজন মহাবুদ্ধিমান ব্যবস্থাপক প্রকৌশলীরই সৃষ্টি হতে পারে, অন্য কিছু নয়।

 

আকস্মিকভাবে কিংবা দুর্ঘটনাবশত অস্তিত্ব লাভের মতটি মূলতই সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। তাছাড়া কোনো দুর্ঘটনাই যে এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কোনো জিনিসকে কখখনই অস্তিত্ব দিতে পারে না, যার কোটি কোটি বছর কাল ধরে অব্যাহত ধারায় ও নির্বিঘ্ন গতিতে চলছে, তবু তাতে কোথাও এক বিন্দু ত্রুটি বিচ্যুতি ধরা পড়ছে না। এত কোটি বছর ধরে চলছে যে তা মানুষের গণনায়ও আসতে পারে না।

 

বিশ্বলোক দুর্ঘটনার ফলেও আকস্মিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে এই মতটির বিভ্রান্তির দরুন আরও বহু প্রকারের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, বিশ্বলোক উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সৃষ্টি লাভ করে এবং এখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনেরও কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। এ-ও সেই অতিবড় বিভ্রান্তকর ফলশ্রুতি। সে বিভ্রান্তি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়েত বিবর্জিত হওয়া, আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে চিন্তা ও বিশ্বাস গ্রহণ না করা। কোনো আল্লাহর স্বাধীন ইচ্ছাকারী উদ্ভাবনকারী সৃষ্টিকারী কুদরতের প্রতি যার ঈমান রয়েছে, তার মনে মগজে এই চিন্তা কখনোই স্থান পেতে পারে না।

 

বিশ্বলোকের নির্মাণ কৌশল স্বতঃই অত্যন্ত বিস্ময়কর যেমন, তেমনই অতিশয় সূক্ষ্ম ও জটিল। তা কখনোই নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীন হতে পারে না। তা স্বতঃই প্রমাণ করে যে, এই বিশ্বলোক উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি এবং এর একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অবশ্যই থাকবে। অস্তিত্বেই অস্তিত্বের উদ্দেশ্যের আবশ্যকতা প্রমাণ করে।

 

কিন্তু মানুষ নিজস্বভাবে সেই উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে –জানতে ও বুঝতে পারে না। কোনো মানুষ নিজে এই বিশাল বিশ্বলোকেরই একটা অংশ। অংশ কখনোই সমগ্রকে পুরামাত্রায় আয়ত্ত করতে পারে না। এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। গোটা সৃষ্টিলোকের লক্ষ্য উপলব্ধি করতে মানুষের অক্ষম হওয়া কিছুমাত্র অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এই অক্ষমতা সত্ত্বেও মানুষ যদি তার দৃষ্টিকে উন্মুক্ত রাখে, তাহলে সে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারবে যে, বিশ্বলোকের একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। অন্যথায় এই বিস্ময়কর সূক্ষ্ম সৃষ্টির কোনো অর্থ হয় না। তা এতই সূক্ষ্ম যে তা পুরোপুরি আয়ত্ত করা মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয় না।

 

‘বিশ্বলোক ও মানুষ উদ্দেশ্যহীন’ এই ধারণার বিভ্রান্তি জীবন সম্পর্কিত ধারণা, জীবনের লক্ষ্য ও কাজ সম্পর্কেও বিরাট বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। সর্বত্র ব্যাপক বিপথগামিতা সূচিত হয়েছে।

 

কোনো যে জীবন আকস্মিকভাবে কোনো স্রষ্টা ব্যবস্থাপক যৌক্তিকতা ছাড়াই অস্তিত্ব লাভ করেছে, মানুষও আকস্মিক সৃষ্টি বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে সে জীবনে কোনো ভারসাম্য রক্ষা পাওয়া, সামঞ্জস্য থাকা বা তার কোনো লক্ষ্য হওয়া আদৌ সম্ভবপর হতে পারে না।

 

ডারউইন বলেছেন, জীবন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্যহয়ে বিবর্তিত হয়েছে। তা যেন অন্ধের ষষ্ঠি। এই অবস্থায়ই মানুষের উদ্ভব, মানুষের বিবর্তন।

 

এই ধারণা থেকেই বিপথগামিতা মানুষের মনে মগজে ও তার জীবনের উদ্দেশ্যের ওপর অত্যন্ত খারাপ প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।

 

বস্তুত এ একটি বিরাট ক্ষতি, সন্দেহ নেই।

 

এ অত্যন্ত পীড়াদায়ক দুর্ভাগ্য। তা কোনো সীমায় এসে থেমে যায় না।

 

এ হতাশা ও ব্যর্থতার যন্ত্রণা ছাড়া আর কি! এটা এক ধরনের স্বাদ-আস্বাদনের ছটফটানি।

 

তা এক নিরাশ হতাশ ব্যক্তির অন্তদ্বর্ন্দ্ব। কোনো সমর্থনই তার পেছনে নেই। অপার করুণাময় আল্লাহর অনুগ্রহ থেকেও সে বঞ্চিত হয়েছে। এই কারণে এ দ্বন্দ্ব পাশবিক ও পাগলপাড়া রূপে পরিগ্রহ করেছে।

 

এ ধারণা মানুষ ও তার কর্মের ওপর যে নিদর্শন রেখেছে, পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা সে বিষয়ে আলোচনা করব। সে মানুষ ব্যক্তি হোক, গোষ্ঠীবদ্ধ বা জাতি, সমষ্টি আমরা তাদের চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে সৃষ্ট-বিপর্যয়-কুকৃতি ও বিপথগামিতার বিবরণ পেশ করব।

 

কোনো মানুষ যখনই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তার ও তাঁর মধ্যে কোনো সম্পর্কও যখন অবশিষ্ট থাকেনি, তখন মানুষ ভূপৃষ্ঠে দিশেহারা হয়ে হাতড়িয়ে বেড়াতে লাগল। তাকে পথ নির্দেশ করার কেউ কোথাও ছিল না।

 

মানুষ দিশেহারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ঘুরে মরতে লাগল। সে তা নিজের জীবনের কোনো লক্ষ্যের কথাই জানতে পারল না। আল্লাহর কাছে তার যে বড় সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে তা জানাও তার পক্ষে সম্ভব হলো না। এই বিশ্বলোকে তাকে কি ভূমিকা পালন করতে হবে, তা জানাও তার পক্ষে অসম্ভব থেকে গেল। ফলে সে আল্লাহর বিরুদ্ধে নিজেকেই পৃথিবীর ‘খোদা’ বানিয়ে নিল। পাগলের ন্যায় চিৎকার করে বলতে লাগল, সে মানুষ, এই বিশ্বলোকের সেরা এবং এখানকার যাবতীয় কর্তৃত্ব তার মুঠির মধ্যে, সেই সবকিছুর নিরংকুশ ব্যবস্থাপক ও কর্তৃত্বাধিকারী।

 

তারই সৃষ্টিকর্তার বিপরীতে সে উক্তরূপ অর্থহীন প্রলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল বটে, কিন্তু সে যখনই আল্লাহর প্রভাববলয় ও তার হেদায়েতের আওতার বাইরে বেরিয়ে এলো, অমনি নিশ্চিত অনিবার্যতার শয়তানেরা তাকে পাকড়াও করল, ঘিরে ফেলল কল্পিত খোদার দেবতারা। আর তারা মানুষের নাক মাটির সাথে ঘষে ঘষে তাকে এতটা অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে ছাড়ল যে, মানুষ অসহায় অবস্থায় তাদেরই সম্মুখে সিজদায় পড়ে গেল।

 

মানুষ তার নিজের মধ্যে নিহিত মহাসত্যের পরিচয় পেল না, জানতে পারল না তার অস্তিত্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

 

ডারউইনের মতে মানুষ নিতান্তই জীব বা জন্তু মাত্র, যেমন দুনিয়ার অন্যান্য জীব-জন্তু। এই কারণে মানসুঝের জীবন ও তার উন্নততর মর্যাদা পর্যায়ে তার মতের কোনো গুরুত্ব বা মূল্যই স্বীকৃত হতে পারে না। কেননা তার মতে এই মহাবিশ্বলোকে মানুষের স্থান হীন নগণ্য কীট পতঙ্গের তুলনায়ও বেশি কিছু নয়। বেঁচে থাকাই মূলত বিবর্তনবাদী দর্শনে সাফল্যের এক মানদণ্ড। তাই বিশ্বলোকে বেঁচে থাকা বর্তমান সব প্রাণী-জীব ও জন্তু সর্বতোভাবে অভিন্ন মূল্য ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী! অগ্রসর হওয়ার ধারণা কেবলমাত্র মানবীয় কল্পনা। অথচ একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, বর্তমানে মানুষই হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সেরা ও শীর্ষস্থানীয়। কিন্তু ক্রমবিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি পিপিলিকা বা বিড়াল ইঁদুর ও এই স্থান ও মর্যাদা পেতে পারে।[জুলিয়ান হাক্সলী লিখিত আধুনিক জগতের মানুষ শীর্ষক গ্রন্থ, আরবী অনুবাদের পৃঃ ২।]

 

এ থেকেই মানুষ নিজকে জন্তু-জানোয়ার ধারণা ও তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে লক্ষ্যহারা হয়ে পড়েছে এবং কার্যতও তারা পিপিলিকা ও বিড়ালের পর্যায়ে এসে গেছে।

 

মানুষ এ-ও জানতে বুঝতে পারেনি যে ভূপৃষ্ঠের এই সীমিত অবকাশটুকু নিঃশেষ হওয়ার সাথে সাথেই জীবনেরও অবসান হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 

জীবন এ পর্যন্ত এসেই যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তা হবে ছবির এক অপূর্ণাঙ্গ দিক। জীবন ও তার এতসব দ্বন্দ্ব বৈপরীত্য ও অসীম জুলুম নিপীড়নের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। যদি এখানেই শুরু ও এখানেই সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যায়। কোনো এখানকার এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে প্রকৃত সত্য কি এবং বাতিল কি তা পূর্ণমাত্রায় প্রতিভাত হতে পারে না। তাহলে মানুষের জীবন এতই নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায় যে, চিন্তাশীল মানুষ নিজের জন্যে সেরূপ জীবন কল্পনাও করতে পারে না। আর আল্লাহর পক্ষে মানুষের জন্যে এত সীমাবদ্ধ জীবনের ব্যবস্থা হওয়াটা সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।

 

তাদের অন্তর যখন আল্লাহ থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক হয়ে গেল, ছবি পূর্ণতা লাভের পূর্বেই কেটে ফেলা হলো, যখন তারা এই দুনিয়ার সীমাবদ্ধ বেষ্টনীর মধ্যেই নিজেদের দৃষ্টিকে সীমিত করে নিল, তখন বৈষয়িক জীবনটা তাদের সম্মুখে কুৎসিত হয়ে দেখা দিল। এর যে কোনো অর্থ থাকতে পারে, থাকতে পারে কোনো তাৎপর্য –তা তাদের বোধগম্য হলো না। তখন তারা দেখতে পেল যে, এই জীবনটা নিরর্থক ব্যর্থ, তাৎপর্যশূন্য, অস্থিরতা ও অশান্তিতে ভরপুর, তখন তারা সম্ভাব্য দ্রব্য সামগ্রীর স্বাদ আস্বাদনে পাগলের মতো ছুটে গেল। কোনো তাদের কাছে ছিল এক বিলীয়মান মহাসুযোগ। এই সুযোগ হারিয়ে ফেললে তা আর কোন দিনই ফিরে পাওয়া যাবে না। এই জীবনের পর আরও কোনো জীবন আছে তা তাদের ধারণায় আসছিল না।

 

ঠিক জন্তু জানোয়ারদের মতোই তারা যে দিকে ইচ্ছা দ্রুত দৌড়ে গেল। ছিল না কোনো উদ্দেশ্য, কোনো লক্ষ্য। যৌক্তিকতার কথা চিন্তা করারও সাধ্য ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা পাচ্ছিল না কোনো স্বস্তি, দেখছিল না সৌভাগ্যের মুখ, পাচ্ছিল না সত্যিকার আরাম বলতে কোনো কিছু। তখনকার এ দ্বন্দ্ব ও টানা-হেঁচড়া ঠিক পাগলের মতোই।

 

আল্লাহ থেকে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ার যে মৌল গুমরাহী তাদের ব্যাপকভাবে পরিবেষ্টিত করে ফেলেছে, তা হলো মানব প্রকৃতি ও মানুষের মন সম্পর্কে আধুনিক জাহিলিয়াতের ধারণা এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক। ব্যক্তিগতভাবে, দলবদ্ধভাবে –নারী ও পুরুষ এবং গোত্র ও জাতিগতভাবে।

 

মানুষ তার সর্বপ্রকারের গুমরাহী, সর্বপ্রকারের মুর্খতার প্রভাবে পড়েও ধারণা করতে লাগল যে, সে মানুষ। যদিও শেষ পর্যন্ত ডারউইন এসে সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণ সহকারে বলতে লাগলেন, মানুষ মানুষ নয়, নিতান্তই জন্তু-জানোয়ার মাত্র।

 

অথচ এই পৃথিবীতে মানুষের বসতি শুরু হওয়ার সময় থেকেই আল্লাহ তা’আলা মানবতার জন্যে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা সকলে এবং সর্বশেষ নবী ও রাসূল (সা)-ও একইভাবে অত্যন্ত তাগিদ সহকারে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ মানুষই, মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। আর তাঁরা মানুষের সম্মান ও মর্যাদা ঠিক ততদূর উন্নত করার জন্যে জিহাদ করেছেন, যতদূর উন্নীত হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব। তাঁরা মানুষকে এই মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যেই দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছিলেন, তাঁরা তাদের জন্যে পথ উদ্ভাসিত করে তুলেছিলেন, যেন তারা আল্লাহর হেদায়েত অনুযায়ী জীবন পথে অগ্রসর হতে পারে। এ জন্যে তাঁরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে অনেক মুজিযাও দেখিয়েছেন।

 

কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের নবী (?) এসে প্রচার করতে লাগল, না মানুষ মানুষ নয়, জন্তু মাত্র। মনে হচ্ছে, বিজ্ঞানের এ নবী শয়তানের নবীর কাজ করেছে এবং না বুঝে-শুনেই এ ধরনের ভিত্তিহীন ও হাস্যকর কথা বলছে।

 

মানুষ জীব বা জন্তু মাত্র। আর জন্তুর কাছ থেকে মানুষ কি-ই বা পেতে পারে, কি-ই বা পেতে চাইতে পারে?

 

পাশ্চাত্যের গোটা চিন্তার সমগ্র ক্ষেত্রেই ডারউইনীয় চিন্তাধারার বিষাক্ত প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, দর্শন, মনস্তত্ব, নীতিবিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্য –কোনোটিই তার বিষাক্ত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। জীবনের কোনো একটা দিকও এমন নেই যাকে বিকৃত ও বিষাক্ত করে দেয়নি।

 

তাই মানুষ নিজেকে যতদিন জন্তু-জানোয়ারমনে করতে থাকবে, ততদিন উপরোক্ত নিশ্চিত অনিবার্যতার কুফল ফলতেই থাকবে।

 

আর এ বিকৃত –অজ্ঞ মুর্খ ধারণার নিশ্চিত অনিবার্যতার ফল শুধু এ-ই হবে যে, মানুষ ও তার চরিত্র, ভাবধারা, চিন্তা-চেতনা সংযোজনা সবকিছুরই তাৎপর্য পাশবিকতার দিকেই চলতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত মানুষ সত্যিকারভাবে পশুতে পরিণত হবে, পাকাপোক্তা পশু হওয়াই হবে তাদের পরিণতি। কোনো তাদের চিন্তাবিদের কাছ থেকে মানুষের পাশবিক ব্যাখ্যাকেই পরম সত্য ব্যাখ্যারূপে পেয়েছে ও গ্রহণ করেছে।

 

ডারউইন যখন মানবদেহের আঙ্গিক সংস্থার অধ্যয়ন করে মনে করলেন, মানুষ ও পশুর দেহ-সংস্থার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে, তখন তিনি প্রতারিত হয়ে বিশ্বাস করতে লাগলেন যে, মানুষ আসলেও মূলের দিক দিয়ে পশু ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

কিন্তু ডারউইন জেনে হোক না জেনে হোক কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য বলতে পারেন নি। ডারউইন –পরবর্তী বিজ্ঞান নতুন ডারউইনবাদ (New Darwinism) বিবর্তনে বিশ্বাসী হয়েও ডারউইনবাদকে অবৈজ্ঞাকি ও অসত্য বলে ঘোষণা দিয়েছে। জুলিয়ান হাক্সলী’র মতো পূর্ণ মাত্রায় নাস্তিক বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী হয়েও মানুষের স্বাতন্ত্র্যের কথা বলেছেন, মানুষের জন্তু হওয়ার কথা নয়। ডারউইনীয় মতাদর্শের পর মানুষ তার জন্তু হওয়ার কথা অস্বীকার তো করতে পারেনি, তা সত্ত্বেও বুঝতে বাধ্য হয়েছেন যে, মানুষ জন্তু বটে তবে এক স্বতন্ত্র ধরনের জন্তু। অনেক দিক দিয়ে মানুষ যে স্বতন্ত্র সত্তা, তা-ও বোঝা যায়। অথচ মানুষের জীবতাত্ত্বিক গবেষণা তখন পর্যন্তও অসম্পূর্ণ।[নতুন যুগের মানুষ, জুলিয়ান হাক্সলী, পৃ. ৩।]

 

যে জীবজন্তু সাদৃশ্যের কারণে ডারউইন মনে করেছিলেন যে, মানুষ জন্তু এবং তারই ভিত্তিতে মানুষের জন্তু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, এক্ষণে সেই নৃতাত্ত্বিক তথ্যই স্বীয় সাংগঠনিকতার ও সংস্থার দিক দিয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রতিভাত হয়েছে।

 

হাক্সলী বলেছেন, সমস্ত জীবের মগজে দুই ধরনের স্নায়ু এসে মিলিত হয়েছে। একটা হচ্ছে ধারণকারী স্নায়ু মণ্ডলী আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে উন্মুক্তকারী স্নায়ুমণ্ডলী। একটি সময়ে একটি জন্তু একই ধরনের স্নায়ুমণ্ডলীকে নির্দেশ দিতে পারে। হয় প্রথমোক্ত স্নায়ুমণ্ডলীকে নির্দেশ দিবে, না হয় দ্বিতীয় ধরনের স্নায়ুমণ্ডলীকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কুকুর হয় দৌড়াবে, না হয় মড়ক ছিন্ন ভিন্ন করে খাবে। একই মুহুর্তে দুটো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। গোটা সৃষ্টিলোকে মানুষই হচ্ছে এমন সত্তা, যা একই সময় পরস্পর বিরোদী কাজ করতে সক্ষম। কোনো মানুষ পরস্পর বিরোধী ব্যাপারাদিকে একই সময় বিন্যস্ত ও সমন্বিত করতে পারে।[নতুন যুগের মানুষ, জুলিয়ান হাক্সলী, পৃ. ৩।]

 

হাক্সলী মানুষের জীবতাত্ত্বিক বিশেষত্ব বিশ্লেষণ পর্যায়ে বলেছেনঃ “মানুষের সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম বিশেষত্ব হচ্ছে, প্রতীকী চিন্তার ক্ষমতা রাখে। পারিভাষিকভাবে বললে বলা যায়, মানুষ সুস্পষ্ট কথা বলতে সক্ষম”।

 

মানুষের এই বিশেষত্বের দরুনই বহুবিদ সুফল ফলেছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান রসম-রেওয়াজ ও ঐতিহ্যের সৃষ্টি। আর এই রসম-রেওয়াজ বা ঐতিহ্যের প্রবৃদ্ধির দরুন মানুষের আরাম-আয়েশের দ্রব্য সরঞ্জামে সৌন্দর্য ও বিশেষত্ব জেগে উঠেছে। আর তারই দরুন মানুষ এই বিশ্বলোকে বিশিষ্ট স্থান লাভ করতে পেরেছে। বর্তমান সময়ে এই জীবতাত্ত্বিক বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব মানুষের একক বিশেষত্বসমূহের মধ্যে অন্যতম। মানুষ যে তাতে বিপুল অগ্রগতি লাভ করেছে তা-ই নয়, বরং বিবর্তিত হয়েছে, তার প্রভাব বিস্তৃত ও সম্প্রসারিত হয়েছে। আর জীবনে তার চলোমান পথের বৈচিত্রও অনেক বেড়ে গেছে।

 

মোটকথা, দুনিয়ার সমস্ত ধর্মমতই মানুষকে সেরা সৃষ্টি বলে মর্যাদা দিয়েছে। এমনিভাবে জীববিদ্যা মানুষকে অপরূপ এক কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার দরুন তার পক্ষে সেরা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভব বানিয়ে দিয়েছে।

 

বাকশক্ত, রসম-রেওয়াজ ও ঐতিহ্য এবং সংখ্যাগত বিপুলতা মানুষের এমন কিছু বিশেষত্বের সৃষ্টি করেছে যা অন্যান্য সৃষ্টিকুলের মধ্যে কোথাও পরিলক্ষিত হয় না।

 

তন্মধ্যে বড় বড় বিশেষত্বসমূহ খুবই পরিচিত ও সুস্পষ্ট। এ কারণে আমি তার উল্লেখের প্রয়োজন মনে করছি না। বরং বহু সংখ্যক অপরিচিত বিশেষত্ব সম্পর্কে কথা বলা উত্তম মনে করছি। কেননা মানব জাতি তার খালেস জীবতাত্ত্বিক গুণের দিক দিয়ে এক বিরল প্রজাতি বিশেষ। সেসব গুণের প্রতি যথোপযুক্ত গুরুত্ব কখনোই আরোপ করা হয়নি। তা প্রাণীবিদ্যার দৃষ্টিকোণ দিয়েই হোক কিংবা সমাজবিদ্যার দৃষ্টিকোণ দিয়ে।

 

….শেষ কথা, বিবর্তনের পথে অগ্রসরমান প্রাণীগুলোর মধ্যে মানুষের কোনো প্রতিরূপ নেই। নেই তার কোনো দৃষ্টান্ত।

 

নব্য ডারউইনবাদ মানুষের এই স্বতন্ত্র বিশেষত্ব কিংবা বিশেষত্বের এই স্বাতন্ত্র্য ও এককত্বের কথা অকপটে ঘোষনা করেছে আল্লাহর প্রতি ঈমানের দিক দিয়ে নয়। কেননা হাক্সলী তো কট্টর নাস্তিক, সে তার নাস্তিকতারকথা প্রকাশ্যভাবে ঘোষনাও করেছে। তা সত্ত্বেও মানুষ সম্পর্কে উক্ত রূপ কথা নিছক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাগত ও গবেষণাকেন্দ্রিক বা প্রয়োগশালায় প্রাপ্ত তত্ত্ব হিসেবেই বলা হয়েছে।

 

কিন্তু ডারউইন কোনোরূপ বৈজ্ঞানিক সনদ ছাড়াই খুব তাড়াহুড়া করেই মানুষের পশু হওয়ার কথাটি ঘোষণা করে দিয়েছেন। কেননা তাঁর সম্মুখে তো অসম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছিল। আর তা-ই তাঁকে মানুষের এক জন্তুর বা পাশবিক ব্যাখ্যা জনিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর এই তাড়াহুড়া করা উচিত হয়নি, বরং ধৈর্য ধারণা করা উচিত ছিল, যতক্ষণ না প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিস্কৃত হয়, যেমন করে নব্য ডারউইনবাদের সম্মুখে তা উদঘাটিত হয়েছে এবং তা মানুষকে মানুষ বলেই ঘোষণা দিয়েছে।

 

মানুষের এই পাশবিক ব্যাখ্যা যখন বিতাড়িত শয়তানের মতই মানুষের চিন্তার ও চেতনায় ও আকীদার ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করে ফেলল, তখন তা এমন এক সাংঘাতিক বিপর্যয় ঘটালো, যা ইতিহাসের কোনো জাহিলিয়াতই ঘটাতে সক্ষম হয়নি। তা মানুষের গোটা জীবনকে বিকৃতি করে দিয়েছে। তাকে জন্তু-জানোয়ারের স্তর থেকেও নিম্নে ফেলে দিয়েছে। মানুষ হয়েছে পশুর চাইতেও অধিক বিভ্রান্ত। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা তৈরী হয়েছে।

 

মানুষের চরিত্র ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে যৌন ব্যাখ্যা পেশ করা হয়েছে। চিন্তা চেতনার দেহকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। মোটকথা, মানব জীবনের মানবীয় ব্যাখ্যা ছাড়া আর সব ধরনেরই ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করা হয়েছে।

 

ইতিহাসের বস্তুগত ব্যাখ্যার উপস্থাপক হচ্ছে কার্ল মার্কস। তা মানব জীবনের সম্পূর্ণটার ব্যাখ্যা দিয়েছে পশুত্বের দিক দিয়ে। এই ব্যাখ্যানুযায়ী মানবীয় ইতিহাসের মৌল বিষয়বস্তু হচ্ছে খাদ্যালোচনার ইতিহাস। অর্থাৎ বলা হয়েছে যে, মানব জীবনের ওপর সবচেয়ে প্রভাবশালী পরাক্রমশালী প্রয়োচন হয়েছে খাদ্য।

 

আর বস্তুগত উৎপাদন হচ্ছে তা-ই, যা মানুষের অস্তিত্ব ও তাদের চিন্তা চেতনার সাহায্যকারী অর্থাৎ মানুষের ভাষাগত মর্যাদা ও মূল্যমান এক অস্থায়ী বিলীয়মান জিনিস, তাতে অক্ষয় মৌল পদার্থ কিছু নেই। জীবন ও মানুষের জন্যে তার বস্তুগত দেহ কাঠামোই হচ্ছে একমাত্র স্থায়ী বিশেষজ্ঞ।

 

তাছাড়া এই ব্যাখ্যা ডারউইনীয় তত্ত্ব থেকেই বিবর্তনবাদী চিন্তাটা গ্রহণ করেছে। আর তা সমস্ত মূল্যবোধ মূল্যমান এবং এ পর্যন্ত চলে আসা সকল হিসাব-নিকাশই চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।

 

ভাবগত মূল্যমান বস্তুগত মূল্যমানের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী। আর তাই বিবর্তনশীল। কোনো একটি অবস্থাই স্থিতিশীল হয়ে নেই। তাতে কোনো চিরন্তন ও শাশ্বত সত্য বা ন্যায়পরতা বলতে কিছুই স্বীকৃতব্য নয়। বস্তুত মূল্যমান মূল্যবোধই চিরন্তন ও অব্যাহতভাবে পরিবর্তনশীল। সমস্ত ভালো ও শুভই হচ্ছে অর্থনৈতিক, বস্তুগত ও সুনির্দিষ্ট বিবর্তনের ফলশ্রুতি। ফলে আজ যা ভাল ও শুভ, কালই তা অত্যন্ত হীন, নিকৃষ্ট ও মন্দ। কোনো অর্থনৈতিক, বস্তুগত ও উৎপাদনগত স্তর পরিবর্তিত হলে সবকিছুই বদলে যায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে। আর এটা শুধু ধরে নেওয়া বা কল্পিত কথা নয়। এটাই নাকি মহাসত্য ও পরম তত্ত্ব!

 

এ দৃষ্টিতে জায়গীরদারী সমস্ত সমাজের ধর্ম পালন একটা বিশেষত্ব বা শুভ কাজ রূপে বিবেচিত। কিন্তু শিল্পস্তরে সেই ধার্মিকতাই হবে পশ্চাদপদতা, স্থবিরতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা। নাস্তিকতাও একটা বিশেষ গুণ বৈশিষ্ট্য। আর নৈতিক পবিত্রতা, সতীত্ব ও যৌন রক্ষণশীলতার জাগীরদারী সামন্তবাদী সমাজে যথেষ্ট মূল্য স্বীকৃত হলেও বিবর্তনশীল শিল্পোন্নত সমাজে তা খুবই হাস্যকর ও কৌতুকবহ। কেননা এই সমাজে নারী অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হয়ে আছে। পুরুষরা তাদের জন্যে অর্থব্যয় করার সুযোগ লাভে তাদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার এবং তাদের আচার আচরণে বিশ্বাসী পবিত্রতা রক্ষার দাবি জানানোর কোনো অবকাশই এখানে পেতে পারে না। পুরুষরা পবিত্রতা রক্ষার দাবি জানানোর কোনো অবকাশই এখানে পেতে পারে না। পুরুষরা নারীদের প্রতি উক্তরূপ দাবি রাখলেও তারা নেজরা কিন্তু সকল বাধা বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। তারা নিজেরা নিজেদের চিন্তা চেতনায় ও বাস্তব কাজে কর্মে পবিত্র থাকার কোনো বাধ্যবাধকতাই মেনে চলে না। কোনো নতুন খোদা –তা পাশ্চাত্যের মূলধন হোক, কি প্রাচ্যের রাষ্ট্রই হোক –কাউকেই এরূপ করতে বলে না। মানুষ পবিত্র চরিত্র থাকুক, কি নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতায় নিমজ্জিত হোক সে জন্যে সেই নতুন খোদার দিক থেকে যেমন তাগিদ বা দাবি কিছু নেই, তেমনি সে জন্যে তো সাহায্য-সহযোগিতাও করছে না। বরং সে নব খোদা মানুষকে শেষোক্ত অবস্থার জন্যেই অধিক সহায়তা-সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

 

এ ব্যাখ্যা মানুষের কেবল বস্তুগত ও পাশবিক জীবনকেই সম্মুখে রাখে। রূহকে ঠাট্টা ও বিদ্রূপবাণে করে অপমানিত। কোনো বর্তমান জাহিলিয়াত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী নয়, মানুষের দেহ কাঠামোর মধ্যে যে আল্লাহ ‘রূহ’ অধিষ্ঠিত, তার প্রতিও তার ঈমান নেই।

 

মানুষের যৌনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ভয়াবহ গুমরাহী ও বিপথগামিতার বড় প্রবর্তক হচ্ছে ফ্রয়ড। ফ্রয়ড মানুষকে শুধু পশু বা জন্তু জানিয়েই ক্ষান্ত থাকেন নি, এক বীভৎস আকার-আকৃতি সম্পন্ন পশু বানিয়ে ছেড়েছেন। তিনি বলেছেন মানুষের সমস্ত কাজের মৌল উৎস হচ্ছে যৌনতা।

 

পশুরা যখন খাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে, তখন খায়। আবার পিপাসা লাগলে পান করে। দৌড়াবার ইচ্ছা হলে দৌড়াতে শুরু করে, আবার যখন যৌনতার তাড়না অনুভব করে তখন যৌনতৃপ্তি লাভের কাজে নিমগ্ন হয়। ….কিন্তু ফ্রয়ড চিত্রিত বিভৎস জঘন্য মানুষ! সে যখন মা’র স্তন চোষে, তখন তা যৌন সুড়সুড়ি লাভের জন্যে। ফ্রয়ড মানুষকে বিকৃত চেহারার জন্তুই বানিয়ে ছেড়েছেন। তাই মানব শিশু তার বৃদ্ধাঙ্গুলি চোষে সেই যৌনসুখ লাভের জন্যে। প্রস্রাব-পায়খানা করে যৌন সুখ পায় বলে, তার গ্রন্থিসমূহ নাড়ার এই যৌন সুখের আশায়। যৌন সুখের তাড়নায়ই সে তার মা’র প্রতি প্রেম বোধ করে। কিন্তু ফ্রয়ড চিত্রিত মানুষ-পশুর শিশু এখানে পৌঁছেও থাকে না। তার গোটা ভাবগত সত্তা, তার ধর্মপালন, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যানুসরণ সবকিছুই যেন দাউ দাউ করে জ্বালানো যৌন-অগ্নির তাপে ও ধাক্কায়ই অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

চিন্তার বিপর্যয়

 

আর মানুষের চিন্তা-চেতনার বা মনস্তত্ত্বের যে দেহাবয়ব কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তার উদ্ভাবক হচ্ছেন বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষাপন্থী বিজ্ঞানীরা। তাঁরা গোটা জীবনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন দেহকেন্দ্রিক, যেন মানুষও প্রাণী বা জন্তু-জানোয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

এই দৃষ্টিকোণে চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা-মতবাদ সবই বৈদ্যুতিক, মাংসপেশী কেন্দ্রিক ও রাসায়নিক।

 

যৌন-ইন্দ্রিয়ই যৌন চেতনার উদগাতা।

 

মাতৃত্ব ইন্দ্রিয়ই মাতৃপ্রেমের ও মাতৃচেতনা সৃষ্টি করে।

 

কাজের-ইন্দ্রিয়ের কারণে বীরত্ব কিংবা ভীরুতার সৃষ্টি হয়।

 

আর চর্মেন্দ্রিয়ের কারণে স্নায়ুবিক ভারসাম্য কিংবা শীতল মেজাজ গড়ে ওঠে। স্যার উইলিয়াম জেমস-[উইলিয়াম জেমস মনস্তত্ত্বের পরীক্ষণ পন্থীদের অগ্রনেতা।] তাঁর ‘ঝোঁক প্রবণতা মতাদর্শ’ গ্রন্থে বলছেনঃ

 

ঝোঁক প্রবণতা ও বাৎসল্য আকর্ষণ পর্যায়ে লোকেদের সাধারণ মতাদর্শ হচ্ছে,কোনো জিনিসের এমন বুদ্ধিগত উপলব্ধি, যার দরুন সজ্ঞাগত অবস্থার উচ্ছ্বাস-উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমার নিজের মত হচ্ছে, কোনো উত্তেজকের উপলব্ধির তাৎক্ষণিক পরবর্তী সময়ে দেহে নানা পরিবর্তন সংঘটিত হয়। আর যে অনুভূতি আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে, তা সেই পরিবর্তনসমূহের ফলশ্রুতি আর এরই নাম ঝোঁক প্রবণতা, আকর্ষণ।

 

কথায় সারনির্যাস হচ্ছে, ‘মন’ দেহেরই ফসল। তা মানবীয় স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণ ও রূপায়ণে কোনো মৌলিক ও আণবিক গুরুত্বের অধিকারী নয়। ‘মন’ দেহেরই অনুসারী মাত্র। দেহ থেকৈই মনের উৎপত্তি।

 

মানবীয় জীবনের এই সব ব্যাখ্যার বহু সমালোচনা ইতিপূর্বে আমার লিখিত আরও কয়েকটি গ্রন্থে পেশ করেছি।[কয়েকখানি বইয়ের নামঃ (আরবী টীকা*******************************)] এখানে অধিক কিছু আলোচনা-সমালোচনার তেমন প্রয়োজন নেই। মানব জীবনের যে দিকটি এসব ব্যাখ্যার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত বীভৎস এবং বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। অবশ্য পথ উজ্জ্বলকারী কিছু জরুরী বিষয়ের উল্লেখ এখানে করে দিচ্ছি।

 

বস্তুত মানব জীবনের ওপর উদ্ভব সব কটি ব্যাখ্যাই চরম পূঞ্জিভূত গুমরাহীর শিকার। এই সবগুলোই মানুষের কেবল মাত্র দেহ-সংস্থা কেন্দ্রিক ব্যাখ্যাই দিচ্ছে এবং তা মানব জীবনের সকল দিকের ওপর একটি নিম্নমানের ও নগণ্য দিকই অস্বাভাবিক প্রাধান্য দিয়েছে। মানবতার এই নগণ্য ও হীন দিকটি হচ্ছে মানুষের দেহ ও তার প্রয়োজনাবলী। পরে এই সমস্ত ব্যাখ্যার সম্পর্ক একই মৌলিক মতাদর্শের সাথে মিলিত সম্পৃক্ত। তাতে মানুষকে চূড়ান্তভাবে জন্তু বা পশু মনে করে নেওয়া হয়েছে।

 

মানবতা সম্পর্কে প্রতিটি আংশিক বা খণ্ড মতাদর্শই ভুল। কেননা সে ব্যাখ্যা অন্য সব দিককে অর্থহীন করে দিয়ে মানুষকে এমন এক বীভৎস চিত্রে উদ্ভাসিত করে যার প্রকৃত বাস্তবতার সাথে দূরতম সম্পর্কও নেই। আর এই আকৃতিটি আরও অধিক কুৎসিত ও বিভৎস হয়ে যায়, যখস সমগ্র মানবাত্মাকে সেই পক্ষপাতদৃষ্ট মতাদর্শকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করে দেবতা এবং মানুষকে সেই একই দৃষ্টিতেই বিচার করা হয়।

 

আরও মজার ব্যাপার এই যে, মানবতার সে দিকটির প্রতি এসব ব্যাখ্যা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কি, আসলে তাই হচ্ছে মানবতার সেই বিরাট দিক, যার জন্যে মানুষ ‘মানুষ’ নামে অভিহিত হয়েছে এবং জন্তু-জানোয়ার থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে অর্থাৎ এসব ব্যাখ্যাই রূহকে উপেক্ষা করেছে।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা এক মুঠো অন্নের সন্ধানকেই মানবীয় চিন্তা-চেতনার উদ্বোধক ও পথ-প্রদর্শক বানিয়ে দিয়েছে।

 

মানুষের যাবতীয় কাজ-কর্মের যৌনতাভিত্তিক ব্যাখ্যা মানবতাকে যৌনতার গভীর পংকিল গহবরে নিক্ষেপ করেছে।

 

চিন্তা-চেতনার দেহকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা দেহকেই মানবীয় মনস্তত্ত্বের উৎস বানিয়ে দিয়েছে। এভাবে সব কয়টি ব্যাখ্যাই রূহকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। মানব জীবনে তাকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। গুরুত্ব দেয়নি পৃথিবীর বুকে তার জীবন্ত বাস্তবতাকে এ সব কয়টি ব্যাখ্যাই মানুষকে জন্তু বা পশু পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মানুষকে নিতান্ত পশু ছাড়া আর কিছুই মনে করা হয়নি। এ-ও দেখেনি যে, মানুষ ও জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে বহু দিক দিয়ে সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে বিরাট ও মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে।

 

জন্তু-জানোয়ার খাওয়ার সন্ধানে ব্যস্ত থাকে।

 

জন্তু-জানোয়ার যৌন মিলনও সাধন করে।

 

আর সে সবের এ সব কার্যকলাপের মৌল উৎসও সেই দেহ-ই।

 

তাহলে মানুষের আকার-আকৃতি জন্তু-জানোয়ার থেকে ভিন্নতর হলো কেন?

 

এতদুভয়ের জীবন পথই বা কেন ভিন্ন ভিন্ন হলো।

 

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এ সকল ব্যাখ্যায় মানুষের প্রকৃত ও পর্যবেক্ষিত অবস্থার বাস্তবতার ওপর কোনো দৃষ্টি রাখা হয়নি, সেই দিকটিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষাই করা হয়েছে।

 

অথবা বলা যায়, হীন ও জঘন্য শয়তানী প্ররোচনায় পড়ে ইচ্ছা করেই মানুষকে নিকৃষ্ট পশু চরিত্রের চিত্রিত করা হয়েছে, পশু সাব্যস্ত করে দুনিয়ার সামনে পেশ করা হয়েছে।[(আরবী**********) গ্রন্থে তিন ইয়াহুদি অধ্যায় পাঠ করুন।]

 

প্রকৃত ব্যাপার যা-ই হোক, এ সব ত্রুটিপূর্ণ ও ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা ব্যাখ্যায় ‘মানুষ’-এর সত্যিকার ব্যাখ্যা পেশ করা সম্ভব হয়নি, এটাই হলো আসল কথা। আর সত্যি কথা, মানুষ সম্পর্কে নির্ভুল ব্যাখ্যাদান এ সবের পক্ষে আদৌ সম্ভবও নয়।

 

মানুষ তার যে কোনো ধরনের তৎপরতায়ই খাদ্য, যৌনতা, বাসস্থান, কিংবা পোশাকের সন্ধানে অত্যধিক ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে পথেই এই তৎপরতা শুরু হয়ে থাকুক, শেষ পর্যন্ত তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সংস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই সাথে আকীদা বিশ্বাস ও চিন্তার মৌল নিয়ম বিধানও গড়ে তুলেছে এসব সংগঠন-সংস্থাকে যথাযথভাবে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তা কেন এবং কিভাবে সম্ভব হলো? ….এ সব কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট মৌল নিয়ম-বিধান বাদ দিয়ে তাদের কর্মতৎপরতা চালাতে তারা অসমর্থ হলো কেন? …তা কি তারা করতে পারত?

 

মানুষ কেন শুধু পেট ভর খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না? তাও খাচ্ছে তারা এক অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে –তা সঠিক হোক, কি বে-ঠিক। এ এক স্বতন্ত্র ব্যাপার। এভাবেই তাকে তার খাদ্যের অংশ পেতে হয়। আর তার এই ভাভা এবং তা গ্রহণ পদ্ধতির ওপর প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এবং লোকদের পারস্পরিক সম্পর্কের নিশ্চিত প্রতিফলন হয় কেন? কেন এই সব একটা বিশেষ ধরনে ও পদ্ধতিতে চলতে থাকে।

 

মানুষ তার যৌন ক্ষুধা কেবলমাত্র যৌন আবেগ-উচ্ছ্বাসের অধীন পরিতৃপ্ত ও চরিতার্থ করে না কেন? কেন তা করার জন্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংস্থা গড়ে তোলার আবশ্যকতা বোধ করে? …তা যথার্থ নীতিভিত্তিক হোক, কি ভুল নীতিমূলক –সে তো স্বতন্ত্র ব্যাপার। এই সংস্থাই তার যাবতীয় প্রয়োজন পরিপূরণের পথ নির্ধারণ ও প্রশস্ত করে দেয়। তার ওপর নিশ্চিত অনিবার্যতার ফলাফলই বা প্রবর্তিত হয় কেন?

 

এভাবে মানুষের যাবতীয় তৎপরতাই সুম্পন্ন হয়ে থাকে। মানুষ ইচ্ছা করুক আর না-ই করুক, তার সে সব তৎপরতা সুম্পন্ন করার জন্যে কতিপয় সংগঠন ও সংস্থা গড়ে উঠবেই এবং সে জন্যে কিছু মূল্যমান, চিন্তা-বিবেচনা ও আকীদা-বিশ্বাস, তা ভুল হোক নির্ভুল –ভিত্তি হিসেবে অবশ্যই স্বীকার করে নেওয়া হবে। কিন্তু কেন? কি ভাবে?

 

এ সবই মূলত এক মহাসত্যের ফলশ্রুতি আর তা হলো, মানুষ দেহ ও রূপ এই দুটির সমন্বয়। এ দুটি এমনভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত যে, কখনোই একটি অপরটি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। উক্ত ব্যাখ্যাসমূহে যেভাবে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো দিনই সম্ভব হবে না।

 

মূলত এ সব ব্যাখ্যই ভুল, ভিত্তিহীন ও তাৎপর্যশূন্য। এ সবই হচ্ছে জাহিলিয়াত। আর আল্লাহর হেদায়েত থেকে সম্পর্কছিন্ন করার ফলে সৃষ্ট জাহিলিয়াতেরই উৎপন্ন ফসল। আল্লাহ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে ও দূরে সরে থেকে জীবনের যে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তারই ফলে এসব ভ্রান্ত ধারণা ও জাহিলিয়াতের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে।

 

মানব মনস্তত্ত্ব অনুধাবনে আধুনিক জাহিলিয়াত কেবল এই একটি ভুল বা বিপথগামিতারই সৃষ্টি করেনি। মানুষের দেহ ও রূহ-এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও দ্বৈততা সৃষ্টির বিপথগামিতা বর্তমান সময় পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলছে। শুধু তাই নয়, তাতে ‘রূহ’কে কোণঠাসা করে দেহকেই অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো ‘রূহ’ তো সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে। অথচ জাহিলিয়াত আল্লাহ থেকে পালিয়ে দূরে সরে যেতে প্রতিনিয়তই সচেষ্ট। আল্লাহর সুউজ্জ্বল আয়াতসমূহ থেকে পাশ কাটিয়ে চলারই এই জাহিলিয়াতের স্থায়ী নীতি। তার কাছে মানুষের দৈহিক চাহিদা-কামনা-বাসনা লালসারই গুরুত্ব সর্বাধিক। আর এই কারণে মান জীবনের গোটা ব্যাখ্যাই এই দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেকা হয়েছে। যদিও এরূপ পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত অবস্থায় মানুষের কোনো অস্তিত্বই এই দুনিয়ায় নেই।

 

কিন্তু এ বিপথগামিতা এখানে এসেও শেষ হয়নি, থেমে যায়নি।

 

জাহিলিয়াত যখনই আল্লাহর হেদায়েত –পথ ও পন্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তখন তার সমস্ত ধারণাই ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। সে ভারসাম্য তো কেবলমাত্র আল্লাহর পদ্ধতি গ্রহণ করলেই এবং আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতের ভিত্তিতে মানব জীবনের ও বিশ্ব প্রকৃতির ব্যাখ্যা হলেই রক্ষা পেতে পারে।

 

এ ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার কারণে সব মানদণ্ডই অকেজো ও ত্রুটিপূর্ণ হয়ে গেছে, এক্ষণে মানব সত্তার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের বাহ্যিক অবস্থার ওপরই বর্তমান জাহিলিয়াত দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে। কোনো কোনো জাহিল চিন্তাবিদ মানুষের ব্যক্তিসত্তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে। আর কিছু সংখ্যক জাহিলিয়াতপন্থী দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে মানুষের সামাজিক সামষ্টিক রূপের ওপর। প্রথমটি মানুষের সামষ্টিক দিকটিকে অস্বীকার করেছে, আর দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে। কেউ একটিকে অধিক মূল্য ও গুরুত্ব দিয়েছে, আবার কেউ অপরটিকে। ফলে বিপর্যয়, বিকৃতি ও বিপথগামিতা সর্বাত্মক সর্বগ্রাসী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ব্যক্তির স্বাতন্ত্র যেখানে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সমাজ সমষ্টি একটি বিদ্রোহী সীমালংঘনকারী জলিম শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ব্যক্তিসত্তাকে তথায় কোণঠাসা করে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও বিলীন করে দিতে সচেষ্ট।

 

পক্ষান্তরে সামাজিক সামষ্টিকতা যেখানে সত্য হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তথায় ব্যক্তিরা জালিম, সমাজ বিরোধী নীতিতে অগ্রসর এবং শোষণ নির্যাতনে দক্ষ হস্ত। ব্যক্তি তার নিজ ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সমাজ সমষ্টিকে করে ছিন্নভিন্ন। সেজন্যে সমাজ-সমষ্টির ওপর মরণাঘাত হানতেও দ্বিধা করে না। সমষ্টির নামে ব্যক্তি জাতীয় ধন-সম্পদ লুটে পুটে নিয়ে যায়। সম্পূর্ণ হারাম কামাই রোজগারে নিজেকে ধনশালী বানায়।

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের ধারণায় এই উভয় দিক কখনোই ভারসাম্যপূর্ণভাবে একত্রিত হতে পারে না। এই দুটির মধ্যে সমন্বয় সাধনের কোনো পন্থা জাহিলিয়াতের জানা নেই।

 

পরে এই দুটি বিকৃত বিপথগামী ধারণার উৎস থেকেই সংস্থাসমূহ গড়ে ওঠে রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে ও সমাজ সমষ্টিতে।

 

কিন্তু কেন?

 

জাহিলিয়াত বাস্তব ও প্রকৃত সত্যকে কেন দেখতে পায় না? …কেন বুঝতে পারে না –বুঝতে রাজি হয় না যে, মানুষ উক্ত উভয় দিকের সমন্বয়ই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন লাভ করতে পারে? মানুষ স্বতন্ত্র এক ব্যক্তি, একথা সত্য; কিন্তু সেই সাথে এ-ও সত্য যে, ঠিক সেই একই সময়ের মানুষ সমাজেরও অঙ্গ বা অংশ। ব্যক্তি সচেষ্ট। কিন্তু সেই সাথে সে সমাজ-সমষ্টির সদস্য হিসেবে অন্যান্যদের সাথে মিলেমিশে একান্ত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে চায়। তাদের সংস্পর্শে থাকার জন্যে হয় সদা আগ্রহী। এই মানুষগুলো পরস্পরের সাথে গভীর প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে।

 

বস্তুত ব্যক্তি ও সমষ্টি বা সমাজ। -এ দুয়ের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব নিহিত। কিন্তু তাতে একথা প্রমাণিত হয় না যে, সে দুটির অস্তিত্ব একসাথে মনের অভ্যন্তরে ও বাইরের বাস্তবতায় বর্তমান নেই। সেই সাথে এ দুটির মধ্যকার দ্বন্দ্ব অনেকটা প্রশমিত করে ও তার তেজ কমিয়ে এ দু’টির মধ্যে সামঞ্জস্য ও সমন্বয় সৃষ্টি করাও যে সম্ভব, তা কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। কোনো আল্লাহ প্রদত্ত পন্থায় ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবন সুন্দরভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করা খুবই সম্ভব, তাতে সন্দেহ নেই।

 

কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, জাহিলিয়াত কখনোই সঠিক সুস্থ ও নির্ভুল পথ অবলম্বন করতে প্রস্তুত হয় না। কোনো সে পথ সেতো আল্লাহর দেখানো পথ।

 

উক্ত জাহিলিয়াতের কারণেই মানুষের ধারণা ও জীবনাচরণ অসংখ্য প্রকারের বিপর্যয়, বিকৃতি ও বিপথগামিতার সৃষ্টি হয়েছে।

 

আমরা অবশ্যই এই অধ্যায়ে কেবল ধারণা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয়ের কথা আলোচনা করতেই আত্মনিয়োগ করেছি। আমরা সর্ব ক্ষেত্রেই আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখব।

 

এক কতায় মানব জীবনে সৃষ্ট সকল বিপর্যয়ের মৌল উৎসই হলো আল্লাহ থেকে দূরত্ব, আল্লাহর ইবাদত অস্বীকার করা। আর তা থেকেই উৎসারিত হয়েছে মানবীয় মনস্তত্ত্বের ধারণা জাহিলিয়াত। সেই কারণেই মানুষের পরস্পরে ব্যক্তি সমষ্টি দুই বিপরীত লিংগ, গোষ্ঠী ও জাতি হিসেবে পরস্পরের মধ্যে অবস্থিত সম্পর্কের ধারণা সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি।

 

ব্যক্তির নিজেরই দুটি দিক; সে নিজে এবং তার মন। বলা হয়েছে যে, এই দুটির পরস্পরের মধ্যে এত অসংখ্য দ্বন্দ্ব যা গুণে শেষ করা যায় না। তা সম্ভভও নয়। জাহিলিয়াত এই দ্বন্দ্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। ফলে এই দ্বন্দ্ব কোনো সময় এত সাংঘাতিক হয়ে পড়ে যে, পৃথিবীতে তার বদৌলতেই অগ্রতি, উন্নতি ও ইতিবাচক কার্যখ্রমের একমাত্র উন্নত উপায় বলে ধারণা করা হয়। আর মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি, শান্তি নির্লিপ্ততা, নেতিবাচক, রোগাক্রান্ত। মানুষের উচিত তারও ঊর্ধ্বে ওঠে যাওয়া। তাদের উপরোদ্ধৃত ব্যাখ্যাসমূহে বলা হয়েছে যে, মনের অস্থিরতা অতীব পবিত্র। তার দরুনই জীবন সম্মুখের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আমরা দেখছি, তাদের মনের এই বত্রি অশান্তি ও অস্থিরতা তাদেরকে সম্মুখের দিকে ঠেলে নিয়েছে। কিন্তু  তা শান্তি-স্বস্তি-সমৃদ্ধির দিকে নয়। ঠেলে নিয়েছে চরম অস্থিরতা, উদ্বেগ, কাতরতা, পাগলামী, শ্বাসরুদ্ধতা এবং স্নায়ুবিক-মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ও বিপর্যয়ের দিকে। এমন কি শেষ পর্যন্ত তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও বিবেক-বুদ্ধিগত রোগের হাসপাতালসমূহে এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভীড়ে তিল ধারণেরও স্থান বাকী নেই। পাগলামীকে তারা নাগরিক জীবনের রোগ মনে করেছে এবং স্নায়বিক বিকলাঙ্গতাকে তারা ধরে নিয়েছে সভ্যতা-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

 

হ্যাঁ, এটাই জাহিলিয়াত। জীবস্ত সুস্থ মানুষের তৎপরতা ও মনের অশান্তি-অস্থিরতা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস, কখনোই এক জিনিস নয়, তা এই জাহিলিয়াতের পক্ষে বোধগম্যও হচ্ছে না।

 

প্রাথমিক কালের মুসলমানরা ছিলেন সর্বাধিক কর্মতৎপর ও কর্মব্যস্ত জনগোষ্ঠী। ইতিহাসে এ ধরনের একনিষ্ঠ কর্মব্যস্ত জনগোষ্ঠী আর কখনোই দেখা যায়নি। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাঁরা অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলেন ইসলামের বিজয় পতাকা হাতে নিয়ে। তাঁদের জ্ঞান বিজ্ঞান ভিত্তিক আন্দোলন ছিল সর্বব্যাপক ও বিজয়ী। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসমূহ তাঁদের হস্তেই গড়ে উঠেছিল। আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যায় চিন্তাভিত্তিক মতাদর্শ এবং সমাজ-সমষ্টির ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন ছিল তাদের দায়িত্ববোধের উৎস। বিভিন্ন বিষয়গত ফিকহী মতের শিক্ষালয়সমূহ তাঁদের হাতেই গঠিত, কর্মতৎপর ও গতিশীল হয়ে উঠেছিল। এই সব কিছুই এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল যে, তার চাইতেও কম সময় এরূপ ঘটনা সংঘটিত হওয়া ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়। মানুষ ছিল জীবন্ত, গতিশীল, অনলস-অবিশ্রান্ত পরিশ্রমী। কিন্তু অত্যন্ত শান্ত-শ্লিষ্ট সুস্থ ও স্বস্তিপূর্ণ মন-মানসিকতা সহকারেই তারা এই বিরাট ও তুলনাহীন কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। কোনো তাঁরা তাঁদের এই সব জ্ঞানগত কাজ ও বাস্তব কর্মতৎপরতা দ্বারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকে নিচ্ছিলেন। ফলে আল্লাহর যিকির ও স্মরণেই তাঁদের হৃদয় ছিল সদা শান্ত-প্রশান্ত, নিস্তব্ধ ও নিস্তরঙ্গ ও নিরুদ্বিগ্ন।

 

ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার সম্পর্কটিও এক চিরন্তন দ্বন্দ্বরূপে চিত্রিত করা হয়েছে বর্তমা জাহিলিয়াতে। এ দুয়ের মধ্যে তা এত কঠিন সংঘর্ষের কারণ ঘটিয়েছে ও সংঘর্ষের সৃষ্টি করেছে যে, তা গণতা করাও যায় না, সংযত করাও সম্ভব নয়। এরই ভিত্তিতে বর্তমান জাহিলিয়াত জীবন ও মানুষের ব্যাখ্যা পেশ করেছে। আর তা হচ্ছে, অত্যন্ত কঠিন নির্মম ও ন্যাংটা জাহিলিয়াতের দেওয়া ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যাই ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে কঠিন সংঘর্ষের সৃষ্টি করেছে নিশ্চিত অনিবার্যতা সহকারে। তা থেকে নিষ্কৃতির কোনো পথই খোলা নেই। এতদুভয়ের মধ্যে মধুর মিষ্টি প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন-কোনো দিনই সম্ভব হতে পারে না।

 

কিন্তু এই দ্বন্দ্ব সত্য ও মিথ্যার –‘হক’ ও বাতিলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নয়। অথচ আল্লাহ যে মানুষকে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাবান বানিয়েছেন, তাদের মধ্যে এরূপ দ্বন্দ্ব আদৌ কাম্য হতে পারে না। কাম্য হতে পারে শুধু সত্য ও মিথ্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব মাত্র।

 

কিন্তু আধুনিক জাহিলিয়াত ‘হক’ ও ‘বাতিল’ চিনে না। হক-সত্য, ন্যায়পরায়ণতা ও চিরন্তন সুবিচারকে তা অসহ্য অশ্রাব্য ভাষায় বিদ্রূপ করে। তার কাছে কাম্য হচ্ছে এক শ্রেণীর স্বার্থ ও অন্য শ্রেণীর স্বার্থের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ। কিন্তু তা নৈতিকতার মানদন্ডে কখনোই যাচাই বা ওজন করা চলে না। এবং একটিকে ‘হক’ ও অপরটিকে ‘বাতিল’ মনে করা যায় না। কোনো একটি শ্রেণী ‘হক’-কে অতিক্রম করলে কিংবা মানুষের জন্যে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা কেউ লংঘন করলেও বলা যাবে না যে, এই শ্রেণী বা গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তি অন্যায় বাড়াবাড়ি করেছে ও ন্যায়পরায়ণতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কেননা বর্তমান জাহিলিয়াতের দেওয়া ধারণানুযায়ী প্রতিটি শ্রেণীই স্বীয় স্বার্থের দিক দিয়ে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে অনিবার্যভাবে তা অতীব কল্যাণকর এবং তা অবশ্যই ও নিশ্চিত অনিবার্যতার ভিত্তিতেই হতে হবে, তাহলে-ই না তাদের স্বার্থ বিনষ্টকারী বা অপহরণকারী সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। এ দ্বন্দ্ব মানবতার কল্যাণে নয়, নয় সত্যের জন্যে চিরন্তনের সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার জন্যে। বরং তা যে শ্রেণীটি নবতর অর্থনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে, তা তারই জন্যে।

 

হ্যাঁ, আজকের জাহিলিয়াতে কার্যত এরূপই ঘটেছে। এখানে প্রত্যেকের কল্যাণবোধ বা স্বার্থচিন্তা ভিন্ন ভিন্ন এবং তা পরস্পর সংঘর্ষশীল। এতে বিজয়ী হওয়া অবধারিত তার পক্ষে, যার হাতে কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা নিবদ্ধ। আর মার্কসীয় জাহিলিয়াতের ধারণায় প্রোলেটারিয়েট শ্রেণীই শেষমেশ বিজয়ী হবে এবং তার ফলে সমস্ত শ্রেণীই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর তখনই হবে সমস্ত বিশ্বলোকের পরিসমাপ্তি –চূড়ান্ত ধ্বংস ও বিলয়।

 

নারী ও পুরুষ –এই দুই লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান জাহিলিয়াতের মধ্যে যে বিপর্যয় ও বিকৃত ঘটেছে, তা হচ্ছে বীভৎসতম ও কলুষতম বিপর্যয়। বর্তমান জাহিলিয়াতের দৃষ্টিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন নিছকই একটা জৈবিক ও দৈহিক কার্যক্রম মাত্র। তার সাথে নৈতিকতার আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। যৌনক্রিয়া পরিহার সম্পর্কের আওতার মধ্যে সীমিত থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। যৌনক্রিয়াই হচ্ছে মানব সত্তার পূর্ণাঙ্গ ও যথার্থ বাস্তবায়নের প্রধান উপায়। যৌন আবেগকই হচ্ছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের বড় মাধ্যম। উন্মুক্ত ও বাধা নিষেধ বিমুক্ত যৌন চর্চাই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা।

 

যৌনতা নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাতে ভারসাম্য রক্ষিত হওয়া বা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। কেউ যদি তাতে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে, তাহলে চলতে পারে আর যদি কেউ তা বিঘ্নিত করে, তা করাও তার ইচ্ছাধীন।

 

জাহিলিয়াতের এ ধরনের কথাবার্তা বা মতাদর্শের কোনো সীমা সংখ্যা নেই। আর এ সবই যৌনতার ব্যাপারে মানুষের স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ আচার সব কয়টি জাহিলিয়াতই সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। আর তার পরিণতিতে যৌনতার ক্ষেত্রে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা ও অরাজকতার সৃষ্টি করেছে ব্যাপকভাবে। মানবতার ইতিহাসে তার কোনো দৃষ্টান্তই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

আল্লাহর পদ্ধতি থেকে বিভ্রান্ত জাহিলিয়াতে নিমজ্জিত জাতি-জনগোষ্ঠীসমূহ পরস্পরের ওপর ঠিক হিংস্র জন্তুর মত ঝাপিয়ে পড়ার ও জয় বা প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এদের পরস্পর দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ ছাড়া আর কোনো সম্পর্কই যেন কল্পনা করা যায় না। যখনই তারা পরস্পরের মুখোমুখী হয়, হয় জাতীয়তার সীমারেখার মধ্যে, ঠিক যেমন জন্তু চারণভূমিতে একত্রিত হয় কিংবা মিলিত হয় যৌনতার সীমার মধ্যে অথবা পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট মানবতাবাদের ভিত্তিতে মানবীয় রীতিনীতি অনুযায়ী তারা কখনোই একত্রিত হতে পারে না।

 

এ-ই হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাহিলী ধারণার বাস্তব রূপ। এবং এ পর্যায়ের মাত্র কয়েকটি দিকেরই উল্লেখ করা হলো এখানে।

 

এক্ষণে মানব মনস্তত্ত্ব ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক তত্ত্বের চরম মূর্খতা ও জাহিলিয়াতের আলোচনা শেষে আলেক্সেস ক্যারেল লিখিত Man The un-known গ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃত তুলে ধরা খুবই উত্তম বরে মনে করছি।

 

আলেক্সিস ক্যারেল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ –ওহীর মাধ্যমে পাওয়া ধর্মের আলোকে নয় –লিখেছেনঃ

 

সত্য কথা হলো মানুষ নিজেকে বুঝবার জন্যে প্রানান্তকরভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং প্রত্যেক যুগেই বিশিষ্ট মনীষী, দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ অসংখ্য চিন্তা-ভাবনা পেশ করেছে। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও আমরা আমাদের সত্তা ও অস্তিত্ত্বের মাত্র কয়টি দিকই বুঝতে পেরেছি। আমরা আসলে মানুষকে পূর্ণাঙ্গ ও যথার্থভাবে জানি না। শুধু এতটুকু জানি যে, মানুষ বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ। আর সে উপাদানসমূহও আমাদের মনের উৎপাদন মাত্র। অর্থাৎ পত্যেক ব্যক্তিই কতগুলো ছায়ার পশ্চাতে দৌড়াচ্ছে, আর এ সব ছায়ার পিছনে এমন সত্য হয়ত আছে, যা চির অজ্ঞাত।

 

আরও সত্য কথা এই যে, আমাদের অজ্ঞতা পুঞ্জীভূত। কোনো মানব জাতি অধ্যয়নরত ব্যক্তিতের সম্মুখে যেসব প্রশ্ন তীব্র হয়ে দেখা দেয় তার বেশির ভাগেরই কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। আর আমাদের আভ্যন্তরীণ জগতের অনেকগুলো দিকই তখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

 

“সে যা-ই হোক, একথা স্পষ্ট যে, মনীষী পণ্ডিৎ ব্যক্তিরা মানব অধ্যয়ন পর্যায়ে যত গবেষণার ফলশ্রুতিই পেশ করেছে, তা একোবরেই অযথেষ্ট এবং অধিকাংশই আমাদের নিজেদের সম্পর্কে জ্ঞান-লাভের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ে রয়েছে”।

 

পরে বিজ্ঞানী মানব-তত্ত্ব পর্যায়ে পুঞ্জীভূত অজ্ঞতার যে প্রভাব পড়েছে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সভ্যতার ওপর তার ব্যাখ্যাদান পর্যায়ে লিখেছেনঃ

 

আধুনিক সভ্যতা-সংস্কৃতি নিজেকে এক কঠিন অবস্থার মধ্যে আটক পাচ্ছে। কেননা তা আমাদরে জন্যে অনুকূল নয় মাত্রই। তা আমাদের প্রকৃতি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞানও না থাকার দরুন উদ্ভূত হয়েছে। সেগুলো বৈজ্ঞানিক আবিস্কার উদ্ভাবনজনিত চিন্তা-বিশ্বাসের ফলশ্রুতি মাত্র। মানুষের লালসা-কামনা, ভিত্তিহীন ধারণা, মতাদর্শ ও আগ্রহের আতিশয্যে সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বর্তমান সভ্যতা আমাদেরই চেষ্টা সাধনার ফলে গড়ে উঠলেও তা এই মানুষের পক্ষেই মারাত্মকবাবে অকল্যাণকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের আকৃতি ও দৈহিক সংগঠনের সাথে তার কোনো মিল নেই।

 

“একালের মতাদর্শ পূজারীরা মানবতার কল্যাণের জন্যে নানা সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। কিন্তু এই সব সভ্যতায়ই মানুষের একটা কুৎসিত ও অসম্পূর্ণ ছবিকে সম্মুখে রাখছে। অথচ প্রতিটি ব্যাপার পরিমাপের মানদণ্ড হওয়া উচিত ছিল স্বয়ং মানুষ। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মানুষ তো তার নিজের গড়া এই জগতে নিজেই অপরিচিত সাব্যস্ত হচ্ছে। এখন মানুষ নিজের এই জগতের সংগঠন নিজে থেকে করতে পারছে না। কোনো মানব প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো বাস্তব জ্ঞান-ই তার জানা নেই। এই কারণেই, জীব-বিজ্ঞান-এর বিপরীতে ‘প্রস্তর-বিজ্ঞানের’ উন্নতি একটি ভয়াবহ বিপদ হয়ে মানুষের সম্মুখে সমুপস্থিত। আসলে আমরা বড়ই হতভাগ্য। কেননা আমরা বিবেক-বুদ্ধি ও নৈতিকতা-উভয় কি দিয়েই ক্ষয়িষ্ণু ও বিলয়মুখী। যেসব জাতি বর্তশানে বস্তুনিষ্ঠ সভ্যতার শীর্ষস্থানে পৌঁছে গেছে, একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে তাদেরকে দুর্বলতার শিকার দেখা যাবে। বরং দুনিয়ার সমগ্র জাতির মধ্যে এই চরমোন্নত জাতিগুলোই পুনরায় বর্বরতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা অবলম্বন করে বসবে”।

 

মানব সংক্রান্ত ধারণায় আধুনিক জাহিলিয়াতের সৃষ্ট সর্বাত্মক বিপর্যয়ের সারনির্যাসই উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে বিধৃত।

 

আধুনিক জাহিলিয়াত বিকৃতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি এমন একটি ক্ষেত্রও অবশিষ্ট নেই। আর এই সব কিছুই সেই মহা বিপথগামিতারই ফলশ্রুতি, যা সূচিত হয়েছে আল্লাহর দাসত্ব অস্বীকৃতি থেকে।

 

 

 

আধুনিক জাহিলিয়াত

 

 আধুনিক জাহিলিয়াত অতীত জাহিলিয়াতসমূহের চাইতেও অনেক বেশী করে মনে করে নিয়েছে  যে, দ্বীন বা ধর্ম নিতান্তই একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো ধর্ম হচ্ছে একান্তভাবে ব্যক্তি ও তার আল্লাহর মধ্যকার বিষয়। এটাই হচ্ছে ধারণা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জাহিলিয়াতের মৌল বিপর্যয়। কিন্তু ইউরোপের বাস্তবতা এবং ইউরোপীয় অধিকৃত সমস্ত জগতের অবস্থা সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয় এবং আল্লাহর দাসত্ব অস্বীকৃতির বিপথগামিতা ব্যক্তির যতই অভ্যন্তরে মন-মানসিকতার ক্ষেত্রেই বিপর্যয় সৃষ্টি করে না –বীভৎস করে তুলে না, জাহিলিয়াতের এই ধারণা ভুল –বরং তার ছায়াপাত ঘটে মানব জীবনের সমগ্র ক্ষেত্রে। তাই  দেখা যাচ্ছে, জীবনের কোনো একটি দিকও আজ বিকৃত ও বিপর্যয়ের প্রচণ্ড আঘাত থেকে এক বিন্দু রক্ষা পায়নি।

 

এ সত্য ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, আকীদা-বিশ্বাসের বিকৃতি সমগ্র জীবনকেই বিপর্যস্ত করে। কোনো বিশ্বাস ও আকীদা কেবলমাত্র ব্যক্তি ও তার আল্লাহর মধ্যকার এমন কোনো ব্যাপার নয়, যার সাথে বাস্তব জীবনের কোনোই সম্পর্ক নেই। আসলেই তা-ই হচ্ছে জীবনের পরিচালনক –চালিকা শক্তি। তাই আকীদা যখন শুরু থেকেই বিপর্যয়ের পথে মানুষকে চালাবে, তখন মানুষের সব কিছুই সেই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যাবে অনিবার্যভাবে। আর গোটা জীবনই অন্ধকারাচ্ছন্ন গহবরের অতল গর্ভে নিপতিত হবে।

 

মানুষের আকীদার বিপথগামিতা কিভাবে সমগ্র জীবনকে বিপর্যস্ত করে তা আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে দেখেছি। কিন্তু তা শুধু বিশ্বাসের বিপর্যয়ের ব্যাপার নয়, তা নিশ্চিতভাবে যেমন ধারণা বিশ্বাসের বিপর্যয়, তেমনি বাস্তব জীবন ও আচার-আচরণের বিপর্যয়।

 

 

আচার-আচরণে বিপর্যয়

 

আধুনিক জাহিলিয়াত আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার থেকে যখন বিপথগামী ও বিভ্রান্ত হলো তখন সম্ভবত এই ধারণা করতে পারেনি যে, আকীদা-বিশ্বাসের বিকৃতি বিশ্বলোক, মানুষ ও জীবন সম্পর্কিত ধারণায় চরম বিকৃতি ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে অনিবার্যভাভে। শুধু তাই নয়, শুরু থেকৈই তা বাস্তব কর্মজীবনে সূচিত যথার্থতা থেকে বিকৃত লক্ষ্য করতে পারেনি। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটিতে যেন তার অবস্থারই বাস্তব চিত্র অংকিত হয়েছেঃ

 

(আরবী************************************************************************************)

 

ওরা শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবক রূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে। আর তারা মনে মনে ধারণা পোষণ করছে যে, তারা বুঝি সঠিক পথ প্রাপ্ত হয়েই আছে। (সূরা আল-আরাফঃ ৩০)

 

কিন্তু আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ের আলোচনায় দেখেছি যে, আকীদা বিশ্বাসে সৃষ্ট বিপথগামিতা জাহিলিয়াতের সকল বিষয়ের ধারণা বিশ্বাসই ব্যাপক বিকৃতি ঘটিয়েছে। ফলে তার উপস্থাপিত যাবতীয় ধারণা বিশ্বাসেই চরমভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। কোনো একটিও সঠিক নেই, কোনো যুক্তির ওপরই কোনো একটি ধারণাও দাঁড়িয়ে নেই। কোনো একটি ধারণাও নয় সত্য ও নির্ভুল। আসলে জাহিলিয়াতকে পরিচালিত করছে কতিপয় ব্যক্তির খাম-খেয়ালী, ভিত্তিহীন ধারণা-কামনা-বাসনা এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেও বিকৃত ঘটিয়েছে। অথচ জাহিলিয়াতের প্ররোচনায় অনকে লোকেরই ধারণা হচ্ছে, পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান ভিত্তিহীন ধারণা অনুমান থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থিত। কিন্তু আসলে তা সত্যের বাকচাতুর্য ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের ধারণায় বিজ্ঞানই হচ্ছে সকল ব্যাপারে পবিত্রতা। তা-ই সত্য মিথ্যা নির্ধারক। আর তাতে কোনোরূপ দ্বিধা সন্দেহের স্থান নেই।

 

আমরা বিজ্ঞানীদের দেওয়া সাক্ষ্যসমূহ ইতিপূর্বেই শুনতে ও পড়তে পেরেছি। জানতে পেরেছি তাদের উক্ত ধারণা কতই না ভিত্তিহীন। তা থেকে এ-ও নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, বিজ্ঞান কখনোই চূড়ান্ত ও নিশ্চিত কথা বলে না, বলতেই পারে না। দিতে পারে না কোনো দৃঢ় প্রত্যয়পূর্ণ সত্যভিত্তিক বিশ্বাস। বিজ্ঞান শুধু সম্ভাব্যতার কথা বলে। তা মানুষের নিজস্ব কামনা-বাসনার পুরোপুরি অধীন। মানুষের ধারণার ভিত্তিতেই বিজ্ঞানের দিক নির্দেশ করা হয়, আর সর্বোপরি, বিজ্ঞান শুধু বস্তুর বাহ্যিক দিকের অধ্যয়নের ফসল, প্রকৃত অন্তর্নিহিত মহাসত্য পর্যন্ত তার গতি নেই।

 

কিন্তু লোকেরা জাহিলিয়াতের প্রভাবে পড়েই মনে করেছে যে, ধারণা বিশ্বাস বিকৃত ও বিপথগামী হলেও বাস্তব জীবন ও আচার-আচরণ অবশ্যই ঠিক হবে। রাজনীতি, সমাজ-ব্যবস্থা, অর্থনীতি, নৈতিকতা ও শিল্প সাহিত্য সবই ঠিকভাবে চলবে, কোথাও বিকৃতি দেখা দেবে না। কোনো চিন্তা ও মতাদর্শ এক জিনিস আর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

 

মতবাদ-মতাদর্শ তো মানুষের চিন্তার ফসল, মানুষের কামনা-বাসনারই ফলশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ বাস্তব ও অভিজ্ঞতার ব্যাপার। তারই ওপর গড়ে ওঠে নানা সংগঠন ও সংস্থা। পূর্বে আকীদার কারণে যা বিপর্যস্ত হয়েছিল তা এক্ষণে সঠিক হয়ে ওঠে, ফলে তা সম্পূর্ণ নির্দোষ ও সুদৃঢ় হয়।

 

এই প্রেক্ষিতেই পাঠ করতে হয় কুরআন মজীদের এ আয়াতটিঃ

 

(আরবী*******************************************************************)

 

বলো, আমরা কি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, সেই লোকদের অবস্থা, যারা আমলের দিক দিয়ে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। ওরা সেই লোক, যাদের সব চেষ্টা সাধনাই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়ে গেছে দুনিয়ার জীবনে। অথচ ওরা মনে মনে ধারণা করেছে যে, তারা খুবই ভালো কাজ করেছে। (সূরা কাহাফঃ ১০৪)

 

প্রচীনকালে একজনের কথাঃ লাঠি বাঁকা হলে তার ছায়া কি কখনও সোজা ঋজু হতে পারে?

 

আর আসলে এটা হচ্ছে জাহিলিয়াত সৃষ্ট আর একটি ভিত্তিহীন ধারণা। বর্তমান জাহিলিয়াতের যুগে বাহ্যিকভাবে ভালো যা-ই সংঘটিত হয়, তা দেখেই ওরা প্রতারিত হয়। কোনো কোনো ব্যাপারে কিছু কিছু মানুষযদি আংশিকভাবে সত্য পথগামী হয়ও, তাহলে তাই দেখেই ওরা মনে করে নেয় যে, না, সবই ঠিক আছে। কিছুমাত্র ত্রুটি বা বিকৃতি ঘটেনি।

 

পূর্বে আমরা স্পষ্ট করে প্রকাশ করেছি যে, যে কোনো জাহিলিয়াতই সম্পূর্ণরূপে কল্যাণশূন্য হয় না। প্রতিটাতেই ফায়দার একটা দিক থাকে। ফলে তা দেখে লোকরা চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। মনে করতে থাকে যে, না, সবই ভালো হচ্ছে, অন্যায় কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু আসলে তা ক্ষয়িষ্ণু ভালো। প্রকৃত কল্যাণের তা কিছুমাত্র অনুকূল নয়, প্রকৃত কল্যাণের পথ উন্মুক্তকারীও নয় তা। তা মনযিলে পৌঁছিয়ে দেওয়ার পথেও চলছে না।

 

অনুরূপভাবে একথাও আমরা স্পষ্ট করে বলেছি যে, আধুনিক জাহিলিয়াত সৃষ্ট বিপদ অত্যন্ত ভয়াবহ এবং তা বিজ্ঞানেরই ফসল। জীবনকে সহজতর করার জন্যে এই বিরাট আবিস্কার উদ্ভাবন।  কিন্তু তার বাহ্যিক কল্যাণধর্মী চেহারা দেখেই সমস্ত মানুষ গভীরভাবে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হয়েছে। এ কারণেই তারা মনে করেছে যে, প্রকৃত কল্যাণই বিজয়ী হয়ে আছে এবং সব কিছুই যথাযথভাবে চলছে ও অগ্রহর হচ্ছে।

 

হ্যাঁ, শয়তাহের বিরাট বিশাল উপায় উপকরণের কারণেই তারা অন্যায়, অসত্য ও পাপের প্রকৃত রূপ জানতে ও বুঝতে পারেনি। যদিও তারা তারই পরিবেষ্টনের মধ্যে জীবন যাপন করতে পারত, তাদের জীবনের বাস্তবতায় যে মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে তারা যদি তার পরিমাপ করতে সক্ষম হতো, তাহলে তারা অবশ্যই এই তত্ত্বও পেয়ে যেত যতটুকু কল্যাণ দেখে আধুনিক জাহিলিয়াত বাহাদুরী করে বেড়াচ্ছে তার ভিতরকার কুৎসিত চেহারাকে লুকোবার উদ্দেশ্যে –আসলে তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরো হয়ে বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাতে এক বিন্দু সত্য নিহিত নেই। তারা এও জানতে পারবে যে, অন্যায় জুলুম ও পাপের এই মহাসমুদ্রে এই সামান্যটুকু কল্যাণও ডুবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা আরও জানতে পারবে, মানুষের আসল জীবনটাই ধ্বংসের মুখে এসে গেছে। পাপ ও অন্যায়ের বিরাটত্বের চাপে গোটা পৃথিবীই এই মুহুর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধুলিকণায় পরিণত হতে যাচ্ছে।

 

কোনো কোনো লোক আধুনিক জাহিলিয়াতের মান রক্ষার্থে বলে বেড়ায় যে, যা কিছু খারাপ দেখা যাচ্ছে, তা তেমন মারাত্মক কিছু নয়। এ বিপর্যয় সমগ্র জীবনকে গ্রাস করেনি; বরং জীবনের কোনো কোনো দিকে হয়ত কিছু বা বিকৃতি লক্ষ্য করা যায় মাত্র। নৈতিকতার ক্ষেত্রে চরম বিকৃতি ও বিপর্যয়ের প্রশ্ন তুললে তারা বলে, হ্যাঁ! নৈতিকতার ক্ষেত্রে কিছুটা বিকৃতি এসেছে বটে, কিন্তু তা ছাড়া সমগ্র জীবনই তো পবিত্র ও সুস্থ-সঠিক রয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, সব কিছুই অতি উত্তমভাবে চলছে। সবকিছুই উন্নতির উচ্চতর পর্যায়ের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যে, তার ওধারে উন্নতির আরও অনেক স্তর বা দিক বাকী আছে, তা মনেই করা যায় না। না, তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। আধুনিক জাহিলিয়াত এমন এক সর্বাত্মক সর্বগ্রাসী বিপর্যয় নিয়ে এসেছে মানুষের জীবনে, যার ব্যাপকতা ধারণার আওতার মধ্যেও আসে না। জীবনের দূরতম কোনো একটি দিকও তার কলুষতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র থাকতে পারেনি।

 

বক্ষ্যমান অধ্যায়ে আমরা এই বিপর্যয়ের ব্যাপকতা –রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, নৈতিকতা, দুই লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল দিক ও বিভাগ পরিব্যাপ্ত বিপর্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরব। কি করে তা সম্ভব হলো, তা-ও বলা হবে।

 

কিন্তু সে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করার পূর্বে এই সুস্পষ্ট সত্য উপস্থাপিত করতে চাই যে, এভাবে সব ধারণা বিশ্বাস বিপর্যস্ত হবে আর তারপরও বাস্তব জীবন ও জীবনের আচার-আচরণ সুস্থ ও সঠিক থাকবে, তা কখনোই সম্ভব হতে পারে না। এই সত্যের সত্যতা অবিসংবাদিত ও প্রশ্নাতীত।

 

সেরূপ হওয়া কিরূপেই বা সম্ভব হতে পারে?

 

আধুনিক জাহিলিয়াত তার ক্রমবর্ধমান বিরাট-বিপুল প্রকাশ ও প্রচারের উপায় উপকরণের সাহায্যে প্রতিদিন প্রতি মুহুর্তে প্রচার চালিয়ে এই ধারণা বিশ্বাসের বিকৃতি বিপথগামিতা থেকে লোকদের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে রাখার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছে। তা লোকদিগকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, তারা যে বাস্তব অবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছে, তা সর্বতোভাবে সুষ্ঠ সঠিক হওয়ার উচ্চমার্গে উন্নীত।

 

কিন্তু জনগণ যখন কোনো কোনো ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করল, তারা দেখাতে লাগল যে, এটা আল্লাহর ঘোষনার পরিপন্থি –এটা সত্য ও ন্যায়পরতার বিপরীত অথবা নৈতিকতার পক্ষে মারাত্মক তখন জাহিলিয়াত তার সর্বাত্মক প্রচার যন্ত্র লাগিয়ে জবাব দিতে ওঠে পড়ে লেগে যায়….।

 

বোঝাতে চায় যে, আরে, এ তো উন্নতি, অগ্রগতি ও ক্রমবিকাশ। তোমরা কি তা জানোনা, বোঝ না? ক্রমবিকাশের দ্রুত গতিশীলতার দিকে কি তোমার কোনো দৃষ্টি নেই? তুমি কি বিংশ শতাব্দীতে বাস করো না? ….এই শতাব্দী হচ্ছে বুদ্ধিমানদের চরম উন্নতির শতাব্দী। …তাহলে তুমি কি প্রতিক্রিয়াশীল? কি ব্যাপার! কি মুসিবত! সর্বক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা যাচ্ছে! …বড়ই আফসোসের কথা! এখনও মানুষ প্রাচীনতার আবর্তে বন্দী হয়ে পড়ে আছে। ….সবই সহ্য করা যায়; কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ক্রমোন্নতির চরম শীর্ষে ওঠে প্রাচীনত্ব ও প্রতিক্রিয়াশীলতা কিছুতেই সহ্য করা যায় না। ইত্যাদি ইত্যাদি….

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের প্রচার যন্ত্র ও প্রচার মাধ্যম; উপায়-উপকরণের কোনো সীমা-শেষ নেই। কি না আছে জাহিলিয়াতের হাতে! পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা –এই সব কিছুই এক সাথে লেগে যায় সেই ব্যক্তির কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্যে, যে বর্তমান জাহিলিয়াতের কোনো দোষ বা অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে টু শব্দ করবে।

 

যে ব্যক্তিই জনগণকে প্রকৃত সত্যের পথ দেখাতে এবং এ জাহিলিয়াতের বিপর্যয় ও বিকৃতির কথা বলে জনগণকে সজাগ ও জাগ্রত করতে চেষ্টা করবে, তার ইশারায় প্রতিক্রিয়াশীলতার এই বোমা বিস্ফোরিত হবে।

 

হায়রে প্রতিক্রিয়াশীলতার গালি!

 

সত্য, কল্যাণ ও ন্যায়পরতাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে যে লোকই দাঁড়িয়েছে, তারই হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এই অস্ত্র। …বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্যে প্রতিক্রিয়াশীলতার গালি। আর বোকা জনগণকে বিভ্রান্তি করার জন্যে উন্নতি, প্রগতি ও ক্রমবিকাশের লোভনীয় বুলি।

 

কিন্তু জাহিলিয়াতের বিপদ এ পর্যন্তই থেমে যায় নি। জাহিলিয়াত পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল ও দুসমাধ্য করে দিচ্ছে। সত্য ও মিথ্যা –হক ও বাতিলকে সংমিশ্রিত করেছে প্রতি মুহুর্তে। স্বয়ং মজলুম মানবতাকেও নানাভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তাদেরকে বোঝাতে চাইছে যে, তারা পরম ন্যায়পরতার ও সুবিচারের মধ্যে জীবন যাপন করছে। গুমরাহ পথভ্রষ্ট লোকদেরকে বোঝাতে চাইছে, তারা যেন মনে করে যে –তারা ঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। যাদের ওপর অন্যায় জুলুম পীড়ন ও নির্যাতন ভেঙ্গে পড়ছে, তাদের আসল অবস্থা থেকে বিভ্রান্ত করে বোঝাতে চাচ্ছে যে, তারা সর্বাত্মক কল্যাণের মধ্যেই দিনাতিপাত করছে।

 

সত্যি কথা হচ্ছে, ইতিহাসের সব কয়টি জাহিলিয়াতের তুলনায় বর্তমান জাহিলিয়াত এক কঠিনতর রুঢ়তা, অকল্পনীয় বীভৎসতা ও নির্লজ্জতার মধ্যে ফেঁসে গেছে। এ অবস্থা থেকে তার মুক্তিলাভের কথা চিন্তাও করা যায় না।

 

জাহিলিয়াতের মারাত্মক ব্যাপকতা ও প্রাধান্য সত্ত্বেও তার বর্ণনা দান কঠিন কিছু নয়। কোনো যা সত্য ও বাস্তব, তা স্বীকৃত না হয়েই পারে না। তার একটা নিজস্ব ওজন ও ভারিত্ব রয়েছে। তা অস্বীকৃত হওয়া সম্ভব নয়।

 

জাহিলিয়াতের যতই প্রভাব-প্রতিপত্তি হোক, লোকদের চোখ থেকে সত্যকে চিরদিন লুকিয়ে রাকা কোনো জাহিলিয়াতের পক্ষে সহজ নয়। সম্ভব নয়।

 

এ জাহিলিয়াতের সর্বাত্মক কুফল ও ব্যাপক দুষ্কৃতি সম্পর্কে জনগণ ক্রমশ সচেতন হয়ে উঠছে। পরবর্তী আলোচনায় একথা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 

মানব জীবনের বিশাল ক্ষেত্রে বর্তমান জাহিলিয়াত যে ব্যাপক গভীর অন্যায়, দুষ্কৃতি ও পাপের স্তুপ জমা করে দিয়েছে, তার মারাত্মকতা সম্পর্কে বর্তমান দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি খুবই সচেতন হয়ে উঠেছে।

 

তবুও ব্যাপার যে খুবই সহজসাধ্য, খুব শীঘ্র তা সম্ভব হবে, সে কথা মনে করা উচিত নয়। জাহিলিয়াতের ব্যাপকতা-গভীরতা এবং তার অনিষ্টতার বিরাটত্বের পরিমাণ অনুপাতে হক ও বাতিল –সত্য ও মিথ্যার চরম সংগ্রাম একান্তই অনিবার্য এবং এই অত্যাসন্ন সংঘর্ষে জয়ী হওয়ার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা ও সাধনার একান্ত প্রয়োজন।

 

কিন্তু একটি নির্দিষ্ট জিনিস আমাদের সকলকেই জানতে বুঝতে এবং তাকে বিশ্বাস করতে হবে। তা হচ্ছে, বাতিলের বিপুল স্তুপ –কখনোই সত্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে না।  অন্যায় ও পাপের ব্যাপকতা কখনোই কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে না।

 

এই মহাসত্যের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেই আমরা বাস্তব কর্ম-জীবনে আচার-আচরণে বর্তমান জাহিলিয়াত সৃষ্ট ব্যাপক বিপর্যয়ের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ পেশ করতে চাচ্ছি। এর পূর্বে আমরা ধারণা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয়ের বিশদ বর্ণনা পেশ করে এসেছি।

 

মানুষের ধারণা-বিশ্বাসের বিপর্যয় যেমন আল্লাহর মহাসত্যতা সম্পর্কিত ধারণাকেও গ্রাস করেছে, শামিল করেছে বিশ্বলোক, জীবন ও মানুষ সম্পর্কিত ধারণাকেও, তাদের পরস্পরের সাথে সম্পর্কের ধারণাকেও, ঠিক তেমনি বাস্তব আচার-আচরণের বিপর্যয় পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে সমগ্র জীবন-জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, নৈতিকতা, দুই লিংগের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং শিল্প সংস্কৃতি কোনো কিছুকেই নিষ্কৃতি দেয়নি।

 

অতঃপর প্রতিটি বিষয়ের স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা পেশ করা যাচ্ছে।

 

 

 

রাজনীতিতে বিপর্যয়

 

এই যুগটি নাকি মুক্তি ও স্বাধীনতার যুগ! কিন্তু তা সত্ত্বেও এ যুগের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে ইতিহাসের প্রচণ্ডতম স্বৈরতন্ত্র –ডিকটেটরবাদ। অন্ধশক্তি ও মরণাস্ত্র সৃষ্ট নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ।

 

বেশি দিনের কথা নয়, সমগ্র ইউরোপে ব্যাপক হয়ে বসেছিল জায়গীরদারী সামন্তবাদী ব্যবস্থা। মানুষ প্রকৃতপক্ষেই ছিল ভূমি-দাস –ভূমি-দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী। সামন্তবের দাস ছিল সাধারণ মানুষ। তারা একটি জমি ত্যাগ করে অন্য জমিতে চাষ করতে যাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। আর যদি কেউ চলে যেত, তাহলে তাকে পলাতক সাব্যস্ত করা হতো এবং আইনের শক্তি প্রয়োগ করে তাকে ঘরে এনে সেই জমি চাষাবাদ করতে বাধ্য করা হতো, যা ত্যাগ করে সে চলে গিয়েছিল। তার দেহে আগুনে উত্তপ্ত দগদগে লৌহ শলাকা দিয়ে দাগ দিয়ে দাসত্বের দূরপনেয় কলংক বসিয়ে দেওয়া হতো। তার অপরাধ ছিল শুধু এই যে, সে তার ‘ছোট খোদা’ সামন্তের অবাধ্য হয়ে তার দাসত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করে বেরিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস করেছিল। এখানে তাকে কঠিন বন্ধনে বেঁধে রাখা হতো যেন আবার কখনও ছুটে যেতে না পারে।

 

এ-ই ছিল তখনকার ভূমি-দাসদের অবস্থা। আর এই সামন্ত প্রত্যেক ভূমি-দাসের জন্যে এক-এক খণ্ড জমি নির্দিষ্ট করে দিত, সে তা চাষাবাদ করত, সেখানেই সে বসবাস করত।  কিন্তু সে জমির ওপর তার কোনো মালিকত্ব বা স্থায়ী ভোগ-দখল স্বত্ব ও স্বীকৃত হতো না। এসব পশুদের মধ্যে চারণভূমি বণ্টন করার মতো ব্যাপার। পশু সেখানেই বিচরণ করে খাদ্য গ্রহণ করে, দুগ্ধ ও মাখন দেয়। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ভূমি খণ্ডের চৌহদ্দী অতিক্রম করার কোনো সাধ্যই তার হয় না। কোনো পশুটি তো সেখানে শক্ত রশি দিয়ে বাঁধা রয়েছে।

 

সামন্তবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন স্বাধীন হয় না কখনও। তার জন্যে পার্থক্যকারী বিষয় হচ্ছে অধীনতা (Serfdom)। তারা জানত যে, তা এমন এক ব্যবস্থা, যার ছত্র-ছায়ায় থেকে প্রত্যক্ষ উৎপাদক তার মালিক মনিবের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ইত্যাদির বিনিময়ে ভূমি চাষের সুযোগ লাভ করত। সেই দেয় ‘কর’ হয় মনিবের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে আদায় করত কিংবা আদায় করত নগদ অর্থ বা জিনিসপত্র দিয়ে –ফসল দিয়ে।

 

এ কথাটির অধিক বিশ্লেষণের জন্যে আমরা বলব, সামন্তবাদী সমাজ দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল।

 

 প্রথম শ্রেণীতে ছিল স্বয়ং ভূমি-মালিকরা, সামন্তরা।

 

আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে গণ্য হত চাষাবাদকারী লোকেরা-কিষাণ, শ্রমিক, দাস, চাষী ইত্যাদি। এদের মর্যাদা হতো বিভিন্ন।

 

যদিও এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের সংখ্যা খুব দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছিল, এই কৃষক চাষীরা –প্রত্যক্ষ উৎপাদনকারীরা ভূমির একটি নির্দিষ্ট খণ্ড দখল করে থাকার অধিকার পেত। তাদের জীবিকার্জনের জন্যে তার যাবতীয় উপায় উপকরণসহ তারই ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকত। জীবন যাত্রার সুবিধার জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণাদিও তারা উৎপাদন করতে পারত। তারা নিজেদের ঘরে কৃষি সংক্রান্ত হালকা যন্ত্রপাতিও গার্হস্থ্য শিল্প হিসেবে বানাতে পারত। কিন্তু তার বিনিময়ে তাদেরকে বহু কয়টি জিনিস দিতে বাধ্য থাকতে হতো। যেমন মালিকের জমিতে নিজের কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে সপ্তাহে একবার করে বিনা পারিশ্রমিকে চাষ করে দিতে হতো। এ ছাড়া কৃষি মৌসুমেও তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হতো। আর উৎসব, পার্বন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ ভেট-উপঢৌকনও পেশ করতে হতো। অনুরূপভাবে মনিবের ফসল মাড়াই ক্ষেত্রেও তারা কাজ করতে দিতে বাধ্য হতো। মদ্য কেন্দ্রে তাদের মালিকদের জন্যে মদ চোলাই করে দিতেও বাধ্য হতো তারা।

 

সামন্ত সকল প্রশাসনও বিচার কার্যের নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী হতো। এক কথায়, সামন্ত সমগ্র সামষ্টিক জীবন অধীনস্থ এলাকার সমস্ত মানুষের রাজনীতির ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব করত।

 

“এই সামন্তবাদী ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ উৎপাদনকারী কখনোই সেই অর্থে স্বাধীন হতো না, স্বাধীনতার যে অর্থ উত্তরকালে আমরা জানতে পেরেছি। তারা ভূমির পুরোপুরি মালিক হতো না। তা বিক্রয়, উত্তরাধিকার নিয়মে বণ্টন, হস্তান্তর বা দান ইত্যাদি করারও তাকের কোনো ক্ষমতাই ছিল না। সে তো সামন্তের নির্দিষ্ট জমিতে শুধু লাঙ্গল চলাতে বাধ্য হতো তার নিজের ইচ্ছা ও কল্যাণ চিন্তার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তাকে করও দিতে হতো। তার পরিমাণ কখনোই নির্দিষ্ট থাকত না। এর কর দিয়ে তারা অধীনতার সম্পর্কের স্বীকৃতি দিত। তার জন্যে নির্দিষ্ট জমি হস্তান্তরিত কিংবা অন্য কোনো মনিবের খিদমতের কাজে জড়িত হওয়ার কোনো অধিকার থাকত না। এখানে তারা সেই প্রাচীন কালের দাসপ্রথা এবং আধুনিক কালের স্বাধীন চাষীদের মধ্যবর্তী অবস্থার প্রতীক হয়েছিল”।–[সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ গ্রন্থ থেকে। লেখক রাশিদুল বারী।]

 

বস্তুত মধ্যযুগীয় জাহিলিয়াতের যে অন্ধকারে ইউরোপ অবস্থান করত তারই বীভস চিত্র এখানে অংকিত হয়েছে। তখনই এই বিশাল অঞ্চল ছিল ইউরোপীয় গীর্জার কঠিন নির্মম শাসনের অধীন। কিন্তু একমাত্র ইসলামী জগতেই এরূপ অবস্থার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। প্রশাসন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের আংশিকভাবে যত বিপর্যয়ই হোক-না কেন, তারা ওরূপ অবস্থার সাথে মাত্রই পরিচিত নয়, যদিও বাস্তব  জীবনে আল্লাহর শরীয়ত এই সময় আংশিকভাবে জারী হয়েছিল, তখন এই জালিম কাফের সমাজ আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসিত হচ্ছিল না। শাসিত হচ্ছিল প্রখ্যাত রোমান আইনের ন্যায় বিচারের দ্বারা।

 

উত্তরকালে এমন একটা সময় আসে, যখন সামন্ত ব্যবস্থার অবসান ঘটে। কিন্তু তা এ কারণে নয় যে, তদানীন্তন ইউরোপীয় আত্মা মানবতার চরম দুর্গতি দেখে ব্যথিত হয়ে উঠেছিল। কোনো তা ছিল জাহিলিয়াতে আচ্ছন্ন। আর জাহিলিয়াতে আচ্ছন্ন আত্মা ওসব দেখেও কখনোই ফরিয়াদ করে ওঠে না। সামন্তবাদের অবসান ঘটেছিল ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার অনিবার্য দাবি হিসেবে। আর এই ব্যাখ্যা ইতিহাসের গতিশীলতায় মানুষের জাহিলিয়াতের পক্ষে যথার্থ ব্যাখ্যা। সামন্তবাদের অবসানের কারণ অর্থনৈতিক বিবর্তন যন্ত্রের আবিস্কারে এক নবতর অর্থ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে।

 

বস্তুবাদী বিবর্তন-আবর্তনের অনিবার্য কারণে উন্নয়নশীল শ্রেণী সেই শ্রেণীকে খতম করে দেয়, যার ভূমিকা পালন শেষ হয়ে গেছে বস্তুবাদী পরিবেশের দাবিতে। তখন তার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়াই ললাট লিখন হয়ে যায়। আর এ কারণেই তার অবসান লাভ ছিল একান্তই নিশ্চিত ও অনিবার্য।

 

এই বস্তুগত শ্রেণী-আবর্তনের সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। কোনো ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাই সত্য বা মিথ্যা, হক বা বাতিল বলে কোনো জিনিসই নেই।

 

যদিও সামন্তবাদী ব্যবস্থার অবসান নেই –অবসান বাঞ্ছনীয়ও নয়; কেননা তা জালিম। কিন্তু যেহেতু তা তার বস্তুগত ও শ্রেণীগত ভূমিকা পালন করে শেষ করেছে, আর নবতর ব্যবস্থা কায়েম হতে পারছে না –এক জুলুম তারই মতো আর এক জুলুমকে নির্মূল করতে পারে না বলে। কিন্তু যেহেতু তার বস্তুগত শ্রেণীভিত্তিক ভূমিকা রীতিমত পালিত হয়ে গেছে; অন্য কথায়, ঐতিহাসিক নিশ্চিত অনিবার্যতা কার্যকর হয়েছে, তাই তার অবসানও হয়েছে নিশ্চিত ও অনিবার্যভাবে এবং নবতর অর্থ ব্যবস্থার জন্যে পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা উৎপাদন উপায়ের বিবর্তনে গড়ে ওঠা অর্থ ব্যবস্থা ও শাসক-শ্রেণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। শাসক শ্রেণীই তথায় প্রধান ও প্রভাবশালী। যেহেতু একসাথে বাস্তব ও ব্যাখ্যাগত জাহিলিয়াত মানুষকে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী শাসন করে না, শাসন করে নিজেদের ইচ্ছা ও খামখেয়ালী ভিত্তিতে, এ কারণে মালিক শ্রেণীই হয় কর্তৃত্বশালী জালিম শাসক ও শোষক। আর জনগণ সেখানে চিরদিনের তরে নির্যাতিত হয় বিবর্তনের ধারাবাহিকতায়।

 

আর বাস্তব বা ব্যাখ্যাগত জাহিলিয়াত কখনোই এমন অবস্থার ধারণাও করতে পারে না, যখন অর্থ ব্যবস্থা এক স্তর থেকে ভিন্নতর স্তরে চয়ে যাবে উৎপাদন উপায়ে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন সূচিত হওয়ার কারণে এবং তা স্বভাবতই বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে থাকবে –তাতে একটি শ্রেণী অপর শ্রেণী থেকে অবৈধভাবে ফায়দা লুটে না। কোনো জাহিলিয়াত –পাগলেরা নিজেদের সুদীর্ঘ জাহিলিয়াতকালে কখনোই আল্লাহর নাযিল করা বিধান কার্যকর করেনি। আর এই বিধানের অধীন ব্যবস্থায় সমস্ত ব্যাপার হক ও ইনসাফ সহকারে কি করে সুসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাও দেখতে পায়নি –কিছুক্ষণের জন্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দৃষ্টিতে রাখা হলেও। কেননা আল্লাহর নাযিল করা বিধান ক্রম বিবর্তনের কোনো একটি স্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। তা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতেও বিস্তৃতি লাভ করেনি। তার বিস্তৃতি হয়েছে মানুষের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ অনুপাতে, বিবর্তনের স্তর-পার্থক্যে মানুষ যেখানেই পৌঁছে থাকে-না-কেন।

 

সে যা-ই হোক, ইউরোপীয় সামন্ত ব্যবস্থা নবতর উৎপাদন যন্ত্রের আবিস্কার তিরোহিত হয়ে গেল এবং সমাজে এক নবতর আবর্তন সূচিত হলো।

 

যান্ত্রিক উৎপাদনের কেন্দ্রসমূহে, শিল্প-কারখানাসমূহে শ্রমিক কর্মচারীর প্রয়োজন দেখা দিল। তারা আসতে পারত কেবল মাত্র গ্রামাঞ্চল থেকেই। এরই ফলে সামন্তবাদী ব্যবস্থার বিলীন হয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠল। কেননা কৃষিজীবীরা তো তারই অধীন জমির সাথে বাঁধা পড়েছিল। তারা জমির দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ করে গ্রামাঞ্চল থেকে দলে দলে শহরে আসতে শুরু করল। কেননা এখানেই গড়ে উঠেছে নতুন কর্মব্যবস্থা নতুন শিল্প নগরে।–[ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা সামন্তবাদের অবসানের এই ব্যাখ্যাই দিয়েছে। অথচ এখন ভুলে গেছে যে, ইউরোপীয় কৃষকরা ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই স্বভাবের তীব্র তাড়নার কারণেই –সামন্তবাদের জালিম ভূমিদাস প্রথার বিরুদ্ধে অমানুষিকভাবে নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হচ্ছিল এবং ধৈর্য্য ধারণের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছিল যদিও উৎপাদন উপায়ে তখন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তারা যখনই জমি ত্যাগ করে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন নবতর অর্থ ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।]

 

অতঃপর মানুষ কার্যত ভূমি-দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে গেল। তারা গ্রাম্য দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ করে নাগরিক জীবনের মুক্ত পরিবেশে এসে গিয়েছিল।

 

অবশ্য প্রথম দিক দিয়ে তারা তা-ই মনে করে নিয়েছিল।

 

মনে করেছিল যে, তারা তাদেরকে বন্দী করে রাখার সব বাঁধা-বন্ধনই ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে, আর আজ তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যা ইচ্ছা হয়, তা-ই তারা করতে পারে। কিন্তু মূলত তারা এক জাহিলী বিবর্তন-স্তর থেকে অপর এক জাহিলী বিবর্তন স্তরে চলে এসেছিল মাত্র। মৌলিক কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি তাদের জীবনে। তারা তখন পর্যন্তও তাদের জন্যে অপেক্ষমান নবতর দাসত্ব শৃঙ্খলকে দেখতে পায়নি। হ্যাঁ, সে সব বন্ধন তাদের জন্যে অপেক্ষাই করছিল। আর তারা নিজেদের পা ও গলদেশ নিয়ে সেখানেই উপস্থিত হয়ে গিয়েছিল নতুন করে দাসত্বের সুকঠিন শৃঙ্খল পরবার জন্যে।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বলেছে, উৎপাদন যন্ত্র যে নতুন শ্রেণীর সৃষ্টি করল এবং উৎপাদন কার্যক্রম সামন্তবাদী প্রক্রিয়া থেকে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হলো। এই দুটিই এক নবতর দাসত্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলল এবং তার পরিধি ক্রমশ সংকীর্ণ করে আনতে আনতে এতদূর নীচে নামিয়ে আনল যে, মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসেই রুদ্ধ করে দিতে লাগল।

 

কিন্তু ইতিহাসের এই বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বাহ্যিক অবস্থার যতটা বর্ণনা দিয়েছে, প্রকৃত অবস্থা ছিল তার চাইতেও গভীরতর। এ ব্যাখ্যাতে যা মনে করেছে, তাতে বুদ্ধিমত্তার চমর পরাকাষ্ঠা ঘটেছে। এবং অবস্থার ব্যাখ্যাদানে তা বিস্ময়কর কীর্তি দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তো ভিন্নতর।

 

প্রকৃত ব্যাপার এই হয়েছিল যে, নবতর জাহিলিয়াত তো পুঁজিবাদের অধীন সমাজে আল্লাহর নাযিল করা বিধান দিয়ে শাসনকার্য চালাত না। তা ছিল সেই প্রাচীন জাহিলিয়াতেরই সম্প্রসারণ মাত্র, যা সামন্তবাদের অধীন অনুরূপভাবে আল্লাহর বিধান দ্বারা রাষ্ট্র শাসন না চালানো।

 

মূল শাসন প্রতিভা ছিল সেই একই নফসের খাহেশ লালসা-কামনা, যা এক্ষণে ছিল বিবর্তিত। সেই একই খামখেয়ালীপনা, যা কৃষককুলের নামে বিপুল মুনাফা লুটে নিত।

 

আর আসলে তা সেই তাগুত, যা প্রতিটি জাহিলিয়াতেই প্রবলতর, যা মানুষকে শাসন করে খামখেয়ালীর ভিত্তিতে। আর মানুষ যতদিন না আল্লাহর বিধান দ্বারা শাসনকার্য চালাতে শুরু করবে, ততদিন এরূপ অবস্থাই অব্যাহত হয়ে থাকবে। তার থেকে নিস্কৃতি নেই।

 

মুসলিম জাহানেও এই তাগুতী শক্তি দেখা গেছে, দেখা যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। মানুষ যতটা আল্লাহর দেওয়া পদ্ধতি থেকে বিভ্রান্ত, তাগুত শক্তি ততটাই বিস্তার ও প্রসার লাভ করেছে তা-ও নিঃসন্দেহ। কিন্তু মানুষ আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী শাসনকার্য চালাতে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় যতটা বিকৃতি সহকারেই হোক-না-কেন-মানুষকে কোথাও অতটা দাসত্ব শৃঙ্খলে বাঁধতে পারেনি, যতটা বাঁধতে সক্ষম হয়েছে ইউরোপ। তথায় তো মানুষের গোটা জীবনকেই জাহান্নামে পরিণত করে দেওয়া হয়েছিল।

 

মুসলিম জাহানের কোথাও ইউরোপের ন্যায় বীভৎস ও জঘন্য ধরনের সামন্তবাদী ব্যবস্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। ইসলাম মৌলিকভাবেই স্বাধীনতাবাদী। তাই তা পূর্বে যেমন সামন্তবাদের তাগুতকে নিয়ন্ত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিল, অনুরূপভাবেই পুঁজিবাদের তাগুতের হাত-পা বেঁধে তাকে অক্ষম করে রাখতেও পেরেছিল –পেরেছিল জনতা যদ্দিন পর্যন্ত আল্লাহর শরীয়তের শাসন চালিয়েছিল, তা যতই আংশিকই হোক-না কেন।–[(আরবী*****) গ্রন্থের (আরবী**************) অধ্যায়ে]

 

তা যা-ই হোক, আমরা সেই ইউরোপেই ফিরে যাচ্ছি। যেখানে জাহিলিয়াতের ধারাবাহিকতা অব্যাহতভাবে চলেছে একের পর আর এক।

 

সেখানে যা কিছু ঘটেছে তা কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্য বিবর্তনের ধারা ছিল না। এ বিষয়ে মার্কসীয় জাহিলিয়াতের ধারণা যেমন অবান্তর, তেমনি ভিত্তিহীন। আসলে তাগুতী শক্তি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পদচারণা করেই যাচ্ছিল। এই নবতর বিবর্তন উৎপাদন উপায়ে শোষণকে অত্যন্ত ভারী ও ব্যাপক করে তুলেছিল। তাতে তার সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেল, মানুষকে আরও শক্ত করে দাসত্ব শৃঙ্খলে বাঁধতে সক্ষম হলো।

 

তা কোনো বাধ্যতামূলকভাবে হয়নি। তা ছিল স্থিতিশীল পরিবেশের স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। অথবা বলা যায়, তা নিশ্চিত অনিবার্য ছিল একটি মাত্র দিক দিয়ে। আর তা হচ্ছে, মানুষ যতদিনে আল্লাহর নাযিল করা বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা না করছে, ততদিন পর্যন্ত একটি মাত্র বিকল্প হিসেবে অবশ্যই তাগুত দ্বারা শাসিত হবে এবং তা জনগণকে দাসত্ব ও অপমান-লাঞ্ছনার তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করাতেই থাকবে। এর অন্যথা অকল্পনীয়।

 

উদীয়মান পুঁজিবাদী শ্রেণীও বিলীয়মান সামন্তবাদী শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত শেষোক্তদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অর্থ এ থেকে ভিন্নতর কিছু নয় যে, উত্তম অবস্থায়ই আসল শাসন হয়ে রয়েছে সেই তাগুতী শক্তিই। কোনো তাগুত ব্যক্তিগতভাবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়। নয় তা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর নাম। তাগুত বলতে যে কোনো জালিম ক্ষমতাধরকেই বোঝায়। তা জনগণের ওপর খুব দ্রুততার সাথে ক্ষমতা স্থাপন করে এবং সমস্ত মানুষকে দাসানুদাস বানিয়ে নেয়। এ সময় পারস্পরিকভাবে কঠিন দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় না, এমন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা সেই মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর হাতেই একান্তভাবে এসে যায়, যাদের আনুকূল্য করে অর্থনৈতিক পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা যেমন তদানীন্তন আরব জাহিলিয়াতের কুরায়শরা তাদেরই মতো পথভ্রান্ত ও শিরকে নিমজ্জিত গোত্রসমূহের সাথে বহুবার দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে এবং শেষ পর্যণ্ত তাগুতী কর্তৃত্ব একান্তভাবে তাদের হাতেই চলে এসেছে। অথচ অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর তাদেরই কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়েছিল। তারাই মালিক হয়েছিল, হয়েছিল শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী। আর নানাবিধ উপায়ে মানুষকে কঠিনভাবে দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করে নিয়েছিল।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা এক তাগুতের হাত থেকে অপর তাগুতের কাছে ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরিস্থিতিরই শুধু ব্যাখ্যা দিতে পারে; কিন্তু সে ব্যাখ্যায় গভীরতা বলতে কিছুই নেই। মূলত তাগুতের অস্তিত্ব কি করে হয়, তার কার্যকারণ কি, সে ব্যাখ্যা থেকেই তা কখনোই জানা যেতে পারে না। আসলে পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব নিশ্চিত অনিবার্য কিছুই নয়। …মানুষ যখন তার ইচ্ছা করে, তখনই তা ঘটে।

 

আসলে সে ব্যাখ্যাটা নিছক জাহিলী ব্যাখ্যা মাত্র। তা শুধু জাহিলিয়াতেরই ব্যাখ্যা দিতে পারে, প্রকৃত কারণের সন্ধান দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। শুরুতে নবতর দাসত্ব প্রথার দিক ও রূপ কিছু মাত্র স্পষ্ট ছিল না। বাহ্যত তারা যাত্রা করেছিল মুক্তি ও স্বাধীনতার নামে পাগলপারা হয়ে, তা ছিল জমির শৃঙ্খল থেকে শ্রমিক জনতার মুক্তি। সামন্তবাদের শৃঙ্খল থেকে জাতিসমূহের নিষ্কৃতি।

 

আর এ সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক আবর্তনও সংঘটিত হয়। তার ওপর স্বাধীনতার সীলমোহরও লেগেছিল। সে আবর্তনসমূহের নাম দেওয়া হয়েছিল গণতন্ত্র।

 

সন্দেহ নেই, এই নবতর জাহিলিয়াত অপেক্ষাকৃতভাবে কিছুটা মুক্তি ও স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে এসেছিল। অপেক্ষাকৃতভাবে কিছুটা কল্যাণও নিয়ে আসেনি, তা বলা যায় না, কিন্তু জনতা তাতে চরমভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে নবতর  তাগুত জনগণকে ধীরে ধীরে ও ক্রমাগতভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে নিচ্ছিল। নবতর তাগুত এই কর্মটাই করেছে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতা সহকারে। চিন্তা করা যেতে পারে, এক ব্যক্তি যখন আইনসম্মতভাবে তার জন্যে নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড ত্যাগ করে চলে যেতে পারে না, বস্তুগত ও আদর্শগত উভয় দিক দিয়েই যখন তাকে জমির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধে, কিংবা যে ব্যক্তি সামজেরই নৈতিক ও সামাজিক বন্ধনসমূহ ছিন্ন-ভিন্ন করে বের হয়ে আসার সাহস করতে পারে না, সে নৈতিক-সামাজিক বন্ধনসমূহ ভালো হোক, কি মন্দ –যদিও সেই সমাজের লোকেরা এমন বন্ধনকে আন্তরিকভাবে কোনো গুরুত্বই দেয় না কিংবা যে ব্যক্তি গীর্জার নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারছে না –করলে তাকে ধর্মত্যাগী, অভিশপ্ত বলে আখ্যায়িত করা হতো; অভিশাপ বর্ষণকারীরা চতুর্দিক থেকে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত।…

 

এরূপ এক ব্যক্তিকে যদি ধরে কোনো শহরে মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়, কোনো-রূপ পাহারাদারীরও ব্যবস্থা তার ওপর রাখা না হয়, তা হলে সে যে অলিতে গলিতে উচ্ছৃঙ্খলতা করে বেড়াবে এবং সে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে মনে করবে তা আর বিচিত্র কি? সেখানে তো তাকে বাঁধবার বা গীর্জার কঠোরতার ভয় করার এবং তাকে ধর্মত্যাগী বলে অভিশাপ দেওয়ারও কেউ নেই।

 

তার বলছিলাম, নবতর জাহিলিয়াত সদ্য বন্ধনমুক্ত মানুষকে শহর নগরে নিয়ে এই স্বাধীনতার মধ্যেই ছেড়ে দিয়েছিল। এখানে সে এমন স্বাধীনতা পেয়ে গিয়েছিল যার কোনো অস্তিত্বই ইতিপূর্বে তার জীবনে ছিল না। এখানে সে যত্রতত্র যাওয়ার, ঘোরাফেরা করার স্বাধীনতা পেয়েছে। যে-কোনো কাজ করার স্বাধীনতা পেয়েছে। একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, সভা সম্মেলন সংগঠন করার স্বাধীনতা লাভ করেছে। কথা বলার, সমালোচনার স্বাধীনতাও আছে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও স্বীকৃত। সেই সাথে এমন স্বাধীনতাও পেয়ে গেছে যার কোনো অস্তিত্বই পূর্বে ছিল না।

 

তারা পেয়ে গেল অকারণে অভিযোগ আরোপ থেকে নিরাপত্তা, তদন্তের নিরাপত্তা এবং বিচারের নিরাপত্তাথ।

 

এসব বাস্তব স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পেয়ে কেউ যদি মনে করে যে, সে সত্যিকার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে তা হলে তাকে তো দোষ দেওয়া যায় না।

 

হ্যাঁ, তারপরও রয়েছে পার্লিয়ামেন্ট –সংসদ, জাতীয় সংসদ। সেই সাথে নির্বাচন। এটাও স্বাধীনতার একটা বড় দিক। জাতীয় প্রতিনিধিত্বের ব্যাপার, এ কি কম কথা। সরকার গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করে, শাসনকার্য চালায় জাতির ইচ্ছানুযায়ী। হ্যাঁ, হ্যাঁ….

 

হ্যাঁ, জনতা পূর্ণ স্বাধীনতাই তো পেয়ে গেছে।

 

কিন্তু আসলে এসবই হচ্ছে আকাশ কুসুম কল্পনা, ভ্রান্ত মনের ধারণা, মনের বিভ্রান্তি মাত্র। পুঁজিবাদের যুগে নবতর জাহিলিয়াতই এই সব ভুল ধারণার সৃষ্টি করেছে।

 

সন্দেহ নেই, এ জাহিলিয়াতের বাহ্যিক দিকটি দিকটি খুবই সুন্দর। এতদূর সুন্দর যে, তা বলে শেষ করা যায় না। তা জনগণের চোখ ঝলসিয়ে দিয়েছে, হৃদয় মনকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এরপরই আসে বিজ্ঞান, বস্তুগত উন্নতি, অগ্রগতি। ফলে এ জাহিলিয়াতের রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গ হয়, অধিকতর চাকচিক্যময় হয়ে ওঠে।

 

এক্ষণে মানুষ কেবল ভূমি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকেই মুক্ত হয়নি, কেবল নৈতিকতার বন্ধন থেকেই মুক্ত হয়নি, শুধু গীর্জার আধিপত্যের অধীনতা থেকেই নিষ্কৃতি পায়নি, এক্ষণে কেবল প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও আইন পরিষদই কায়েম হয়নি, এ সময় মানুষ অমানুষিক দৈহিক শ্রম থেকেও মুক্তি পেয়ে যায়। কোনো ও বস্তুগত অগ্রগতি দৈহিক প্রাণান্তকর শ্রম থেকেও মানবীয় শক্তিকে মুক্তি দিয়েছে। কোনো এক্ষণে যন্ত্রপাতি সেই সব শ্রমকেই প্রায় সামলে নিয়েছে, যা দৈহিকভাবে করতে মানুষ বাধ্য হতো। ফলে মানুষ অনেক হালকা কাজের সুযোগ পেল। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম থেকে মুক্তি পেল। আর আনন্দ উৎফুল্লতা সহকারে জীবনীশক্তির পূর্ণ সংরক্ষণের মহা অবকাশ পেয়ে গেল।

 

এ পর্যায়ে আমরা এই নতুন জাহিলিয়াত সৃষ্ট চিন্তা-নৈতিকতা, অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিপথগামিতা-বিকৃতি সম্পর্কে কোনো কথাই বলব না। যদিও জীবনের এই সব দিক বাস্তবক্ষেত্রে পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত, সব দিক ও বিভাগ পরস্পর ওতপ্রোত বিজড়িত। একটি দিক বা বিভাগ অন্য দিক বা বিভাগ থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মানব জীবনে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিক ব্যবস্থা ও চিন্তা পদ্ধতি থেকে আদৌ বিচ্ছিন্ন কোনো জিনিস নয়। কোনো মানুষের মন ও জীবন বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন খণ্ডে কোনো মতেই বিভক্ত করা যায় না। কিন্তু তবুও এ পর্যায়ে আমরা প্রয়োজনের তাগিদেই রাজনীতি বিষয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয় সম্পর্কেই আলোচনা করব, আমাদের মূল আলোচনাকে অধিকতর স্পষ্ট করে তোলার উদ্দেশ্যে।

 

রাজনীতির ক্ষেত্রে নবতর জাহিলিয়াত যদিও গীর্জার কর্তৃত্ব থেকে বাঁচার লক্ষ্যে। জনমত ও গণ-সন্তুষ্টির পথ অবলম্বন করেছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই জাহিলী রাজনীতি জনমতের ভিত্তিতে শাসনকার্য চালাত না। গোটা রাজনীতিই চলছে, এমন একটা ধারণার ভিত্তিতে, বাস্তবে যার কোনো নাম চিহ্নও কোথাও ছিল না। কেননা নবতর জাহিলিয়াত যখন আল্লাহর বিধানকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাল, তখন তার মুখে তাগুতের ইচ্ছানুযায়ী শাসনকার্য চালানো ছাড়া আর কোনোই উপায় ছিল না।

 

“জাতির ইচ্ছা ও তার দোহাই ছিল বর্তমান জাহিলিয়াতে রাজনীতির বাহ্যিক দিক, লোক দেখানো দিক”। কিন্তু এই ঘৃণ্য জাহিলিয়াতের আসল ও প্রকৃত রূপ হচ্ছে তাগুতের ইচ্ছানুযায়ী চরম স্বেচ্ছাচারিতা সহকারে রাষ্ট্র শাসন ও সরকার পরিচালনা।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন জাহিলিয়াতসমূহের ব্যাখ্যাদানে খুবই সততার পরিচয় দিয়েছে। তার ব্যাখ্যানুযায়ী যে শ্রেণীর মুঠির মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা-সার্বভৌমত্ব থাকে তা-ই ক্ষমতার জোরে অন্যান্য সব শ্রেণীর লোকদের স্বার্থের সম্পূর্ণ বিপরীত নিজ স্বার্থকে পুরোপুরি রক্ষা করেই দেশ শাসনের কাজ সম্পন্ন করে।

 

তার গড়া সংস্থাসমূহ হচ্ছে নির্বাচন, পার্লামেন্ট, পার্লামেন্টারী সরকার, সংবিধান ইত্যাদি। মূলত এসব লোক-দেখানো সংস্থার পশ্চাত থেকে অলস জাহিলিয়াতই দেশ শাসন করে।

 

প্রথম দিক দিয়ে এই সব ব্যাপার একটা স্পষ্ট ছিল না। বরং আধুনিক জাহিলিয়াতের অধীন জীবন-যাপনকারী কতিপয় সাদা হৃদয়ের লোক মনে করছিল যে, তারা তাদের এই নবতর জীবনকে অতীব উত্তম ও উন্নত ও মানবীয় উচ্চতার সাথে সামঞ্জস্যশীল ভিত্তিসমূহের ওপর সুদৃঢ়ভা নির্মাণ করছে। ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক চাকচিক্যই তাদেরকে এই কঠিন ভুল ধারণার মধে নিমজ্জিত করেছিল।

 

এই বেচারারা মনে করছিল যে, তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করছে এবং নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরা অবশ্যই জনগণের ইচ্ছানুযায়ী ও তাদের কল্যাণের দৃষ্টিতেই আইন প্রণয়ন করবে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার ছিল এই যে, মূলধনের ‘তাগুত’ই নিরংকুশ কর্তৃত্ব সহকারে শাসনকার্য পরিচালনা করছিল।

 

এই ব্যাপারটি বর্তমানে এতই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, তা কারোর কাছেই অজানা থাকেনি। ফলে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার কোনো প্রয়োজনই হয় না। বিগত বছরগুলোতে দুনিয়ার প্রত্যেক দেশে সকল প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে পুঁজি বাদ সম্পর্কে যা কিছু প্রচার করা হয়েছে, তার ভিতরে যে অনিষ্ট, সীমালংঘনমূলক জঘন্যতা ও বিপর্যয় রয়েছে, তা বোঝার জন্যে তা-ই যথেষ্ট। এ পর্যায়ে বিগত বছরগুলোতে অনেক কিছু লেখাও হয়েছে। পুঁজিবাদী তাগুত তার বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে কত যে বাড়াবাড়ি করেছে, তাও আজ কারোর কাছে গোপন নেই। বিশেষ করে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমজীবীদের রক্ত কিভাবে শুষে নেওয়া হয়, তা আজ সকলের কাছেই স্পষ্ট। প্রকৃত স্বাধীনতাকামী ও প্রকৃত সুবিচার ও ন্যায়পরতার পক্ষপাতী লোক এবং তাগুতের হাত থেকৈ যারা কর্তৃত্ব কেড়ে নিতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে কি ভয়াবহ কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল –যার ফলে সকলে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়েছিল, বর্তমানে তা কারোরই অজানা নেই।

 

এখানে এই জুলুম নির্যাতন-নিপীড়নের কয়েকটি হালকা ধরনের দৃষ্টান্ত পেশ করছি।

 

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংলণ্ডে আহুত ধর্মঘট বন্ধ ও ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্যে সরকার সম্ভাব্য সকল উপায়ই অবলম্বন করেছিল। পুঁজিবাদ ঘোষণা করেছিল এ ধর্মঘট বেআইনী। অতঃপর পুলিশ ও সেনাবাহিনী ধর্মঘটীদের ওপর ট্যাংক ও কামান দিয়ে আক্রমণ করল। ধর্মঘট বন্ধ করার জন্যে বহু শত পন্থাও গ্রহণ করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবক ছাত্ররা এসে বাস ও ট্রাক চালাল। রেডিও ও পত্র-পত্রিকায় ধর্মঘট বিরোধী প্রচারণা চালানো হলো। গোটা সরকারযন্ত্র শিল্প-মালিখদের হাতে এসে গিয়েছিল। জনগণ ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে হিসেব পেশ করতে বাধ্য করার এবং তাদের নেতাদের গ্রেফতার করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।…

 

এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল গণতন্ত্রের সুতিকাগার ইংলণ্ডে। উক্ত বিবরণ কোনো শত্রুর দেওয়া নয়, একজন ইংরেজেরই দেওয়া।–[হেনরী নোয়েল ব্রেইলজ ফোর্ড]

 

আমেরিকার অবস্থা ইংল্যাণ্ড অপেক্ষাও অধিকতর বীভৎস। সেখানকার পেশাদার বিলটিজী দলসমূহ তথাকথিত গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে চলছিল। কোনো লোক যদি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তা হলে তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে কঠিনভাবে শাস্তি দেয়। প্রয়োজনবোধে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। হ্যারল্ড লাস্কি ‘আধুনিক যুগের বিপ্লবসমূহ’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেনঃ ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া বিস্তারিত বিবরণ লোকদের পাঠ করা উচিত। যথা ‘লাফলুত’ সমিতির সিদ্ধান্ত। আমেরিকার লর্ডদের মজলিস তা এই জন্যে মোতায়েন করেছিল যে, এই সমিতিটি নাগরিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপকারীর পর্যালোচনা করে। সে হস্তক্ষেপ কতদূর সম্প্রসারিত হয়েছে সে বিষয় পরিমাপ করবে। ঘুষ, গোয়েন্দাগিরি, প্রতারণা, ঠকবাজি ও বিচার বিভাগীয় দুর্নীতি এমন সব ব্যাপার, আমেরিকান নেতা ও কর্মীগণ যা করতে খুব বেশী অভ্যস্ত।

 

বড় বড় শিল্প সমিতিসমূহের উদ্দেশ্য হচ্ছে তারা যেন ট্রেড ইউনিয়নের শ্রমিকদেরকে নিষ্পেষিত ও নির্মূল করার জন্যে বন্দুক ও টিয়ার গ্যাসে সমৃদ্ধ সৈন্য নিয়োগ করতে পারে।

 

‘এতদ্ব্যতীত সিনেটর লঙ-এর সময়ে লুয়েজানা, জার্সিও, ক্যালিফর্নিয়ার কোনো কোনো এলাকায় অধিকার ধোষণার কোনো প্রভাব পড়েনি। কোনো ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি সর্ব প্রকারের স্বার্থ একান্তভাবে নিজেদের জন্যে মনে করত। তার কারণ এই ছিল যে, অর্থনীতির গোটা উৎসই ছিল তাদের মুটির মধ্যে। আমি তো মনে করি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমেরিকান ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের মনে ফ্যাঁসিবাদী মনোবৃত্তি মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হয়েছিল। অবশ্য গণতন্ত্রের একটা সূক্ষ্ম আবরণ ফেলে রেখে ছিল সব কিছুর ওপর।–[আধুনিক যুগের বিপ্লবসমূহ –হ্যারল্ড লাস্কি।]

 

সে যাই হোক আমেরিকার অবস্থা এতই স্পষ্ট যে, সে জন্যে বইয়ের উদ্ধৃতি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

 

আমেরিকার পুঁজিবাদ এত নিকৃষ্ট ধরনের যে, তথায় দিন রাত অসংখ্য অপরাধ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনুষ্ঠিত হচ্ছে পুঁজিপতিদের ইংগিতে।। এমন কি পুঁজিপতিদের সন্তুষ্ট করার জন্যে দিবালোকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডীকে হত্যা করা হলো। কোনো পুঁজিপতিরা ভয় করছিল, বিশ্ব উত্তেজনা হ্রাস করার জন্যে কেনেডীর পুঁজিবাদী চেষ্টা-সাধনার কারণে শিল্পোৎপাদন প্রবণতা যুদ্ধ সামগ্রীর দিক থেকে সরে দিয়ে সাংস্কৃতিক-তমদ্দুনিক সামগ্রী উৎপাদনের দিকে ঘুরে যাবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক তমদ্দুনিক সামগ্রী দ্বারা পুঁজিপতিরা এত বেশী মুনাফা লুটতে পারে না, যতটা তারা উপার্জন করতে পারে যুদ্ধ সামগ্রী উৎপাদন করে।

 

এই হলো পুঁজিবাদের অপরাধসমূহের গুরুত্বহীন চিত্র। নতুবা চরিত্র নষ্ট করণ, লোকদের জীবিকা হরণ এবং বিভিন্ন জাতিকে দাসানুদাসে পরিণত করণের লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ নীতি তো স্বতন্ত্র দিক। আমেরিকা সেজন্যে যথেষ্ট খ্যাতিও অর্জন করেছে।

 

মোটকথা, একথা অনস্বীকার্য যে, কাল্পনিক গণতন্ত্র আসলে পুঁজিপতিদের স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। আর এই স্বৈরতন্ত্র একটি তাগুত হয়ে তা জনগণকে দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছে। মানুষকে পদে পদে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করছে।

 

কিন্তু এই মারাত্মক ধরনের বিপর্যয় যে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হওয়ার কারণে ঘটেছে, জাহিলিয়াত তা কিছুতেই স্বীকার করবে না। তা মূলতই আল্লাহর পথ চিনে না, জাহিলিয়াত তা কিছুতেই স্বীকার করবে না। তা মূলতই আল্লাহর পথ চিনে না, গ্রহণ করতেও প্রস্তুত নয়। তার গোটা জীবনটাই আল্লাহর পথ ও তাঁর ওহীর মাধ্যমে নাযিল করা বিধান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েই অতিবাহিত হচ্ছে। তা সমস্ত ব্যাপারকে মাটির দ্বন্দ্ব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সংকীর্ণ বেষ্টনীর সীমিত পরিসরেইদেখে থাকে ও বিচার বিবেচনা করে।

 

আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাব্বানী বিধানে যখন সুদ ও মওজুদকারীকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি মানুষ সম্পর্কে এত বেশী জানত, যা মানুষও তাদের নিজেদের সম্পর্কে জানত না। তিনি তো মানুষের কল্যাণই চান কিন্তু তা যে কল্যাণ, মানুষ তাও জানে না। যে পথে মানুষের কল্যাণ ভারসাম্যপূর্ণ, যাতে প্রকৃত সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সীমালংঘনমূলক তৎপরতা বন্ধ থাকে, আল্লাহ তো তাদের জন্যে তারই নির্দেশ করছিলেন।

 

রাজনীতি আলোচনা এ অধ্যায়ে সুদ সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত কিছু বলব না। অর্থনীতি পর্যায়ের আলোচনাই তার উপযুক্ত স্থান। কিন্তু এখানে আমরা শুধু এতটুকুই বলে রাখতে চাই যে, পুঁজিবাদের সীমালংঘনকারী স্বৈরতন্ত্র মানুষকে ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু এই সুদ ও মওজুদকারীর পন্থা কার্যকর না হলে তা কখনোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারত না। মূলত এই দুটিই হচ্ছে পুঁজিবাদের দুটি বড় স্তম্ভ, বড় দুটি ভিত্তি। আর আল্লাহর বিধানে এ দুটিই হচ্ছে নিষিদ্ধ ও হারাম। ফলে রাজনীতি ও অর্থনীতি –উভয় ক্ষেত্রে তাও মানুষের দাসত্বের মধ্যে প্রতিবন্ধক হতে পারে কেবলমাত্র আল্লাহর বিধান ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা ইতিহাসের আরো কয়েকটা অধ্যায় আমরা অতিক্রম করতে চাচ্ছি। পুঁজি ও পুঁজিবাদের সীমালংঘনমূলক তৎপরতা যখন কঠিন হয়ে দাঁড়াল তখন তা দেখে মানুষ ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তখন জনতার বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করে দিল।

 

কিন্তু এই জিহাদকারীরা তো চিরদিন জাহিলিয়াতের মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল। আল্লাহ প্রদর্শিত পথ থেকে অনেক দূরে পড়েছিল। চূড়ান্ত মাত্রার শ্রম ও কার্য স্বীকার করার পর তারা নিজেদেরকে পুঁজিবাদের তাগুতের অক্টোপাশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে নিল। কিন্তু এই সুদীর্ঘকালের নির্যাতনে নিষ্পেষণ ভোগের পরও তারা কোনো শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে সক্ষম হলো না বরং যে মুহুর্তেই তারা পুঁজিবাদের অক্টোপাস থেকে নিস্কৃতি পেল, তখনই তাদেরকে গ্রাস করে ফেলল আর এক তাগুত। এ তাগূতের মুখে গণতন্ত্রের নেকাবটাও ছিল না। তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর স্বৈরতন্ত্র (Dictatorship of the Proletariats)

 

জনগণ পুঁজিবাদের স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি পেতেই শ্রমিক শ্রেণীর স্বৈরতন্ত্রের গ্রাসেরমধ্যে পড়ে গেল। একটি তাগুত থেকে মুক্তির পর পরই অপর এক তাগুতের পায়ের তলায় পড়ে নিষ্পেষিত হতে লাগল। আর আসল কথা, তারা আল্লাহর পথ থেকে বহু দূরেই পড়ে থাকল।

 

ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যা অবোধগম্য কার্যকারণ ও সেসবের ফলাফল সম্পর্কে এক দীর্ঘ আলোচনার পর শ্রেণী-সংগ্রামের উল্লেখ করে। তারপরে বলে অনিবার্যভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। অতঃপর জাহিলিয়াতের পাগলরা ভাঙ্গের নেশা খেয়ে শ্রমিক শ্রেণীর স্বৈরতন্ত্রের ছত্রছায়ায় পাওয়া কাল্পনিক স্বর্গের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন দেখায় মগ্ন হয়ে পড়ে। সে স্বর্গ তো পাওয়া যাবে তখন, যখন শ্রেণীসমূহ নির্মূল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং অবশিষ্ট থাকবে শুধু প্রোলেটারিয়েটরা।

 

অতঃপর নিশ্চিত অনিবার্যথা হিসেবে মূলধন ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু সে যুদ্ধ সত্য ও সুবিচারের নামে হচ্ছিল না। কেননা ফ্রেডারিক এ্যাঞ্জেলস তো সত্য ও সুবিচারকে সব সময়ই ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করেছে। এ যুদ্ধের ভিত্তি ছিল পরস্পর বিরোধী ভাবধারার বাধ্যতামূলক বিরোধ।

 

পুঁজিবাদ সকল প্রকার আইন ও বে-আইনী উপায় অবলম্বন করে শ্রমিকদের রক্ত শোষণ করছিল নির্মমভাবে। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকেও তা এজন্যে ব্যভহার করেছে। কিন্তু নিশ্চিত অনিবার্যতা শেষ পর্যন্ত দেখা দেওয়া ছিল একান্তই জরুরী। সেই কারণে শ্রমিক শ্রেণী সরকারতন্ত্র  দখল করে প্রোলেটারিয়েটদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। পরে তা উৎপাদন উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা খতম করে দেয় আর তদস্থলে সামষ্টিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে। এর ফলে সমস্ত শ্রেণী নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রোলেটারিয়েটদের স্বার্থ রক্ষার নীতি সরকার পরিচালনা করতে থাকে। তা সত্য ও ন্যায়ের দাবি হিসেবে করা হয়নি। করা হয়েছে এজন্যে যে, গ্রোলেটারিয়েটরাই এখন শাসনদণ্ডের ধারক। প্রোলেটারিয়েটরা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে সামর্থ্যানুযায়ী সম্পদ ও শক্তি কেড়ে নেয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তা দিয়ে থাকে তার প্রয়োজনমতো।

 

এভাবে চলতে থেকে শেষ পর্যন্ত সরকার ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে বলে নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন ভাঙ্গ ও আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থেকে হারানো স্বর্গ লাভ ঘটে।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন এই বিষয়ে যে পৌরাণিক তত্ত্ব রচনা করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয় মনে করতে হবে।

 

কার্লমার্কস ভবিষ্যৎ বাণী করেছিল যে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সর্বপ্রথম ইংল্যাণ্ডেই কায়েম হবে। কেননা ইংল্যাণ্ড শিল্পোন্নতির দিক দিয়ে অধিকতর অগ্রসর। সেখানেই ইতিহাসের নিশ্চিত অনিবার্য সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, যার ফলে সরকার পুঁজিবাদীদের হাত থেকে সড়কে গিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে চলে যাবে। অথচ লক্ষণীয় হচ্ছে, যে সব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি দেশই শিল্পোন্নতির দিক দিয়ে অত্যন্ত পশ্চাদপদ। রাশিয়া ও চীন তা থেকে ব্যতিক্রম ছিল না কিছুমাত্র। আর ইংল্যাণ্ড মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বাণীর একশত বৎসর পরও এই বিংশ শতাব্দীর যুগে একটি পুঁজিবাদী দেশ হয়েই আছে।

 

এর সাথে যোগ করা যেতে পারে এই পৌরাণিক কল্পকথা যে, সুদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাই বিলীন হয়ে যাবে। সমস্ত যেন কল্পিত ফেরেশতা হয়ে যাবে। তাদের হৃদয় হবে স্বচ্ছ দর্পনের ন্যায় পরিচ্ছন্ন। কোনো লোভ-লালসাই তাদের বিপথগামী করতে পারে না।

 

সত্যি কথা হচ্ছে, সমাজতন্ত্র তার পঞ্চাশ ষাট বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার পর লেনিন ও স্ট্যালিনের অনুসৃত নীতি থেকে অনেকখানি বাধ্যবাধকতা সহকারে। মজুরী ও পারিশ্রমিকের মধ্যেও আকাশ-পাতাল পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। সামষ্টিক কৃষি কাজের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। এখন সমাজতন্ত্রই জমির ব্যক্তিগত মালিকানা প্রবর্তনের স্বপক্ষে এসে গেছে।

 

এসব পৌরাণিক কথাবার্তা উল্লেখের পরিবর্তে আমরা এখানে শুধু রাজনীতি সম্পর্কেই কথা বলব। এখানে আমরা অবশ্যই উল্লেখ করব ক্রুশ্চেভের সেই ভাষণ, যা সে কমিউনিষ্ট পার্টির দ্বাবিংশতম অধিবেশনে পেশ করেছিল।

 

ক্রুশ্চেভ বলেছিলঃ

 

স্ট্যালিনের শাসনকালে দলীয় নেতৃত্ব, সরকার এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে অনেক কিছু দোষত্রুটি প্রবেশ করেছিল। একদিক থেকে শুধু নির্দেশ জারী করা হতো। ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন করে রাখা হতো। ভয়ে ভয়ে কাজ করা হতো। প্রতিটি নতুন জিনিসকেই ভয় করা হতো। আর এরূপ পরিস্থিতিতে বহু সংখ্যক তোশামোদ ও ধোঁকাবাজ তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিল।

 

সম্ভভত লোকেরা এখনো ভুলে যায়নি যে, স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর রাশিয়ার পত্র-পত্রিকায় তাকে খুনী, অপরাধী ও সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসঘাতক প্রভৃতি উপাতে ভূষিত করা হয়েছিল।

 

প্রোলেটারী স্বৈরতন্ত্র যে তার কঠোরতা, নির্মমতা, পাষণ্ডতা ও পাশবিকতার ক্ষেত্রে এতো বেশী অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল, যা মানুষ কল্পনা করতেও রীতিমত ভয় পেয়ে যেত।

 

ইচ্ছা হলো কাউকে অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত কারাগারে বন্দী করে রাখলো, এমন এমন শাস্তি দিতে শুরু করল যে, তার কল্পনায়ও রোমাঞ্চিত হতে হয়। এমন সব বিচারালয় গড়ে তোলা হয়েছিল, যার প্রতিটা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কয়েদ করার দণ্ড দেওয়া হতো। সমাজতান্ত্রিক দেশে এ সব ব্যাপার তো অত্যন্ত সাধারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল্ যে কোনো লোক তার খপ্পরে পড়ে যেতে পারে। যার মনে সমাজতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে লেশমাত্র ভাব জেগে উঠবে, তাকেই মর্মান্তিক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।

 

এ সময় গোটা সরকারই গোয়েন্দাগিরির আড্ডাখানায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তাতে লোকদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে এবং মানবীয় বিশেষত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে সরকারের একান্ত বাধ্য অনুগত বানাতে চেষ্টা করা হচ্ছিল।

 

এসব অমানুষিক কাণ্ড-কারখানা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে আর বাইরে ছিল লোক দেখানো গণপ্রতিনিধিত্ব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধুত্বের দুর্ভেদ্য আচরণ বাইরের দিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

 

সমাজতান্ত্রিক স্বাধীন সাংবাদিকতা সমাজতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দের প্রশংসা ও গুণ বর্ণনায় সব সময়ই পঞ্চমুখ হয়ে থাকে। কিন্তু সেই নেতাই যখন দুনিয়া থেকে চলে যায় তখন তারই ওপর অভিশাপ বর্ষণের ডংকা বাজানো হয়।

 

প্রোলেটারী স্বৈরতন্ত্রের অধীন রাজনীতির বাস্তব অবস্থা এরূপই। প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশেই এরূপ অবস্থা বিরাজমান। সমাজতান্ত্রিক দেশ ও সমাজে এ থেকে ভিন্নতর কিছু হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।

 

ভাল ধারণা পোষণকারী সাদা হৃদয়ের লোকেরা স্থুল দৃষ্টিসম্পন্ন বলে ব্যাপারগুরোর গভীর সূক্ষ্মতা অনুধাবন করতে অক্ষম। চিন্তার জাহিলিয়াতে জীবন যাপনকারী লোকেরা প্রকৃত সত্যের সন্ধান এবং তার প্রতিবিধান করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ।

 

এরা মনে করে, তাদের কামনাও এই হয় যে, পুঁজিবাদী স্বৈরতন্ত্র এবং প্রোলেটারী স্বৈরতন্ত্রের সব দোষত্রুটি ও ভুল-ভ্রান্তির প্রকার শুধু এভাবেই হতে পারে যে, সেখানে কিছুটা স্বাধীনতার সুযোগ-সুবিধা ও গণতান্ত্রিকতা সূচিত হোক। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যও শুধু এতটুকু।

 

বস্তুত আল্লাহর হেদায়েত ও আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত-বঞ্চিত হওয়া ও জাহিলিয়াতের পুঞ্জীভূত অন্ধকারে জীবন যাপনকারী লোকেরা জাহিলিয়াতের গোটা ব্যবস্থায় নিহিত যাবতীয় দোষত্রুটি দেখতে পায় না। জাহিলিয়াত যে তাগূতের অনুসারী, জাহিলিয়াত যে আল্লাহর দেখানো পথে চলে না, আল্লাহর আইন অনুযায়ী কোনো কাজও করে না, তা এই লোকদের মোটেই জানা নেই।

 

তাগুতী শক্তিসমূহের অস্তিত্ব এমন নয় যার প্রতিকার করা খুব সহজ কাজ। কিছুটা স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিকতার দ্বারা এই প্রতিকার কাজ সম্পন্ন হতে পারে না। তাগুত স্বতঃই এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। তার ভিত্তিসমূহ মাটির গভীর তলায় নিহিত ও বিস্তীর্ণ।

 

পুঁজিবাদ অবশ্যই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা হবে। আর সমাজতন্ত্রও স্বৈরতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয় –হতে পারে না। আসল কথা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বভিত্তিক শাসন নয়, তা অনিবার্যরূপেই তাগুত, তাই স্বৈরশাসন। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ছাড়া আর সব শাসন ব্যবস্থা –সকল প্রকারের শাসন ব্যবস্থাই পুরা মাত্রার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। কোনো তাগুতী বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সাথেই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ করা হলে তা এমন হবে না যে, তার মধ্যে  নিহিত তাগুতী দোষ-ত্রুটি দূরীভূত হয়ে যেতে পারে এবং স্বাধীনতা ও শাসনতন্ত্রের পূর্ণ কল্যাণ লাভ করা যেতে পারে। কোনো আসল দোষ তো এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন উপায়ের মধ্যে নয়, ত্রুটি-বিচ্যুতি তো এসব ব্যবস্থার মূলে ও ভিত্তির মধ্যেই নিহিত। ফলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ  ও সংযোগের ফলে সে ত্রুটি-বিচ্যুতি তো এসব ব্যবস্থার মূলে ও ভিত্তির মধ্যেই নিহিত। ফলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ ও সংযোগের ফলে সে ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীভূত হওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া আসল কথা হচ্ছে, এসব জাহিলিয়াত সুলভ শাসন ব্যবস্থার সাথে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ আদপেই সম্ভব নয়। তার প্রতিবিধান একটি মাত্র উপায়ে হওয়াই সম্ভব। আর তা হচ্ছে, জাহিলিয়াতের এই সব ব্যবস্থাকেই সমূলে উৎপাটিত করে দূরে নিক্ষেপ করতে হবে এবং তদস্থলে এমন একটি নবতর ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার ভিত্তি হবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর বানানো সিরাতিম মুস্তাকীম অনুযায়ী এবং তার নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে।

 

পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় স্বৈরতন্ত্রই স্বাধীনতা হরণ ও লোকদের জীবন সংকীর্ণ করে দেয়। আর তা ব্যাখ্যা দেয় এই বলে যে, আমরা এখানে পবিত্র সংগ্রামে লিপ্ত।

 

পুঁজিবাদী –মূলধন ভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র যে নিতান্তই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা তা কখনোই স্বীকার করবে না। তার ধারণা এবং দাবি হচ্ছে শতকরা একশত ভাগ গণতান্ত্রিক। তা জাতির জনগণের ইচ্ছা ও আগ্রহের সারনির্যাস। কিন্তু পুঁজিবাদের কাছে তার দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে –শ্রমিক ও তাদের ইউনিয়সমূহকে ভীত-সন্ত্রস্ত ও কোনঠাসা করা, প্রকৃত স্বাধীনতাকামী লোকদেরকে পথ থেকে হটিয়ে দেওয়া এবং এই ধরনের লোকদেরকে প্রধান পদ ও স্থান থেকে বিচ্যুত করা কিংবা তাদের জীবনকেই চিরদিনের তরে খতম করে দেওয়া ইত্যাদি কার্যকলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে (যে, এই ধরনের গণবিরোধী কাজ কেন করা হয়?) জবাবে বলে, সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিসমূহকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার উদ্দেশ্যেই এই সব করা হয়। (অন্যথায় সমাজতন্ত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র শেষ হয়ে যাবে!)

 

প্রোলেটারী ব্যবস্থারও দাবি বা ধারণা হচ্ছে, তা-ও নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যদিও তার ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক নামই হচ্ছে প্রোলেটারী ডিকটেটরশীপ। কিন্তু সমাজতন্ত্র সম্পর্কে লোকদিগকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা এবং বিরোধী পক্ষের জীবনটাকেই শেষ করে দেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হরে নিতান্ত বাধ্য হয়েই এই জবাব দেয় যে, তারা প্রতিক্রিয়াশীলতা ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

 

এই উভয় মতের লোকেরাই যুদ্ধের ময়দানে পবিত্র যুদ্ধে লিপ্ত! প্রত্যেক মনের লোকেরাই মনে করে, প্রতিপক্ষের লোকেরা তাদের ব্যবস্থাকে খতম করতে বদ্ধপরিকর। অতএব তাদেরকে এই ব্যবস্থা রক্ষার খাতিরে অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, যেন গণ-কল্যাণ ও গণ-স্বার্থ রক্ষার চলমান প্রচেষ্টা সংরক্ষিত হতে পারে।

 

এই ব্যবস্থাগুলো যে কোনোরূপ সমালোচনাই বরদাশত করতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। কোনো ইতিহাসে চিরদিন এরূপই হয়ে এসেছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাইরে অথবা ভেতরে শত্রু  হয়ে উঠল কিছু লোক, তারা সেই বস্থাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও উৎপাটিত করার লক্ষ্যে অন্যান্য যুধ্যমান লোকদের শিবিরে একত্রিত হয়ে গেল –যেন সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা-প্রচেষ্টার দ্বারা সে ব্যবস্থাকে উৎপাটিত করতে পারা যায়।

 

কাজেই জাহিলিয়াতের উপরোক্ত বক্তব্য হাস্যকর, ভিত্তিহীন এবং যৌক্তিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

কেননা এরূপ ঘটনা এই দুনিয়ার কিছুমাত্র নতুন নয়। তা তো খুবই স্বাভাবিক। তাই তার বিরুদ্ধে অমানুষিক দমন নীতি গ্রহণ করা নিতান্তই বর্বরতা এবং জাহিলিয়াতের তাগুতী আচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

তবু এ বিষয়ে ইসলাম ও জাহিলিয়াতের চিন্তাধারা অভিন্ন নয়। ইসলা মতার জন্ম মুহুর্ত থেকে এক প্রচণ্ড যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছে। এক মুহুর্তের জন্যেও সে যুদ্ধ সীমালংঘন থেকে বিরত থাকেনি।

 

সে যুদ্ধ ছিল আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে প্রচণ্ডরূপে পরিগ্রহ করেছিল। যুদ্ধ নৈতিক চরিত্রের ক্ষেত্রে। চিন্তাধারায় ইসলামের সুসংবদ্ধ সারিগুলোকে ভেঙ্গে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জাহিলিয়াত সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, সকল ইসলাম বিরোধী শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, সে জন্যে দৈহিক নির্যাতন, অভুক্ত রাখা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গোটা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল গ্রহণ –কোনোটাই বাদ রাখা হয়নি এবং এই সব কিছুই আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, ইসলামের আকীদা যাতে লোকেরা গ্রহণ না করে এবং গ্রহণ করে থাকলে যাতে তা ত্যাগ করে তার জন্যে অবিলম্বিত হয়েছিল।

 

উত্তরকালে মদীনায় যখন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠল, তখন ইসলামের বিরুদ্ধেও এই নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটিকে অংকুরেই খতম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল, সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করা হয়েছিল। সে যুদ্ধ যেমন ছিল প্রকাশ্য, তেমনি অধিকতর রুঢ় ও  নির্মম।

 

মুসলিম সমাজে সৃষ্ট মুসাফিরদেরকে ধন-দৌলত দিয়ে, লোকজন দিয়ে এবং সর্বপ্রকারের বস্তুগত প্রস্তুতি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল। সময় সুযোগ মতো নানা ধরনের সামাজিক ফিতনার সৃষ্টি করা হয়েছিল, জনগণের মনে অস্থিরতা, উদ্বেগ ও ভয়-ভীতির সঞ্চার করা হয়েছিল –অর্থনৈতিক বয়কট করা হয়েছিল। খাদ্যের উৎস থেকৈ মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।

 

আরও পরে গোটা আরব উপদ্বীপটি ব্যাপী যখন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেল, ইসলাম তার আসল স্বদেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং এই নবতর ইসলামী দাওয়াত ও বিপ্লবের চেষ্টা রোধ করার যখন আর সুযোগ থাকল না, তখন যুদ্ধ পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশী ভয়াবহ, সর্বধ্বংসী এবং খুবই মারাত্মক হয়ে দেখা দিল।

 

একদিকে রোমান সাম্রাজ্যবাদ ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিল,  প্রস্তুতি গ্রহণ করল ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করার। আর অপরদিকে পারস্য সাম্রাজ্য ঘাঁটিতে ওৎ পেতে বসে থাকল।

 

অতঃপর কার্যত সংঘর্ষের সৃষ্টি হলো। যুদ্ধ হলো ততই প্রচণ্ড, যতটা প্রচণ্ড হওয়া সম্ভব ছিল। ইসলাম এই পবিত্র জিহাদে নেমে পড়ল। ইসলামের দৃষ্টিতে এ যুদ্ধ প্রকৃতই পবিত্র ছিল। কেননা তা ছিল আল্লাহর পথে, আল্লাহর কালেমার বিস্তৃতি ও বিজয়ীকরণের জন্যে। কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এরূপ জরুরী অবস্থায় মুসলিম জাহানের অভ্যন্তরে সরকারের নীতি ও ভূমিকা কি হওয়া শোভন ছিল।

 

হযরত উমর ফারূক (রা)-এর খিলাফতের আমল। তাঁরই খিলাফত আমলে উপরোক্ত দুটি মহা ও পরাশক্তির সাম্রাজ্যবাদী নীতি সৃষ্ট এই মারাত্মক যুদ্ধসমূহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই উভয় পরাশক্তিই ইসলামকে ধ্বংস করার জন্যে গোপন ও প্রকাশ্য যত ষড়যন্ত্র করা সম্ভব ছিল, তা সবকিছুই করেছিল।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতে খলীফা উমর (রা) তাঁর সরকারাধীন মুসলিম জাহানের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলেন?

 

ঐ যে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন উনি কি উমর নন? ভাষণে কি বলছেন তিনি? …বলছেন –হে জনতা! আমার কথা শোন….। মান্য করো…।

 

সহসাই একজন মুসলমান –তিনি আরব ভাষাভাষী কেউ নন। তিনি সালমান ফারসী –দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেনঃ না, আপনার কথা শুনতে ও তা মানতে আমরা বাধ্য নই –যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার এই –এই কাজের যথার্থ ব্যাখ্যা দিবেন, বুঝিয়ে না বলবেন, আপনি তা কেন করেছেন?-[ব্যাপারটি ছিল এই যে, ইয়ামন থেকে সদ্য আসা কাপড় জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল। তাতে উমর ও অন্যান্য মুসলিম সমপরিমাণ কাপড় ভাগে পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘদেহী ব্যক্তি ছিলেন বলে প্রাপ্ত পরিমাণ কাপড়ের তাঁর কোর্তা তৈরী হওয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর পুত্রের প্রাপ্ত অংশটিও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর মাপের জামা তৈরি হতে পেরেছিল। আর তা দেখেই হযরত সালমান (রা) আপত্তি তুলেছিলেন, আপনি এত বেশী কাপড় কোথায় পেলেন? তিনি তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে ডেকে এই আপত্তির জবাব দিতে বললেন। তিনি দাঁড়িয়ে প্রকৃত ব্যাপার যখন খুলে বললেন এবং প্রমাণ করলেন যে, খলীফা কারো চাইতে বেশী নেয়নি। তখন ব্যাপারটি পরিস্কার হয়ে গেল।]

 

কিন্তু খলীফা এই কথা শুনেও  একবিন্দু ক্রুব্ধ ও উত্তেজিত হলেন না। তখন তিনি একথাও বললেন নাঃ “আমি ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের ধ্বংস করতে চায় এমন সব শত্রুর সাথে কঠিন যুদ্ধ কাজে লিপ্ত আছি। আর এই সময়ই তুমি আমার বিরুদ্ধে এরূপ কথা বলছ, আমার কাজে বাঁধা দিচ্ছ! না, তিনি এই তাগুতী কথা না বলে প্রকৃত ব্যাপার প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে তাকে শান্ত করলেন। তখন সালমান ফারসী বললেন, হ্যাঁ, এখন আপনার বক্তব্য বলুন, আমরা শুনব এবং মানবও”।

 

তিনি কি সেই উমরই ছিলেন না, যিনি নামাযের খুতবা দিচ্ছিলেন মিম্বরে দাঁড়িয়ে। তখন একজন মহিলা দাঁড়িয়ে বাঁধা দিলেন। বললেন, ‘তুমি ভুল করছ’।

 

জবাবে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, উমর ভুল করেছে আর একটি মেয়েলোক ঠিক কথাই বলেছে”।

 

তিনিও কি উমর ফারুক খলীফাতুল মুসলিমীন নন, যিনি ‘ফাই’ সম্পদ বিজয়ী মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা না –করার বিষয়ে মুসলিম কল্যাণের দিকের একটি বিশেস মত পোষন করতেন, (তিনি বণ্টন না করার মত পোষণ করতেন, (তিনি বণ্টন না করার মত পোষন করতেন, ভবিষ্যৎ বংশধরনের জন্যে রেখে দেওয়াই ছিল তাঁর ইচ্ছা) কিন্তু হাবশী ক্রীতদাস বিলাল অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় তাঁকে বাঁধা দিলেন। অন্যান্য বিরোধী মতের লোকদেরও তিনি একত্রিত করছিলেন। কিন্তু  বিলালের বিপরীত মতের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার কোনো পথই থাকল না। অথচ তিনি তাঁর মতের যথার্থতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ও দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন ছিলেন। কেননা তিনি তো সাধারণ মুসলিমের কল্যাণের জন্যেই সেই মত পোষণ করছিলেন। তিনি নিরুপায় হয়ে স্বীয় আল্লাহর সমীপে হাত তুলে কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করলেনঃ

 

(আরবী********************************************************************************)

 

হে আল্লাহ! তুমি বিলাল ও তাঁর সঙ্গীতের বিরুদ্ধে আমার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাও।

 

এ-ই হচ্ছে আল্লাহর প্রদর্শিত পথ ও পন্থা। এই পন্থাই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হয়েছিল। এরই আলোকে জাহিলিয়াতে কার্যকরী তাগুতী সরকারের বীভৎস রূপ উদঘাটিত হয়।

 

জাহিলিয়াতে যে যুদ্ধকে পবিত্র যদ্ধ বলে মানবতা বিধ্বংসী যুদ্ধ চালায়, তা মূলত এবং আদপেই কোনো পবিত্র যুদ্ধ নয়। স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে দেওয়া যুক্তি মূলত এবং আদপেই কোনো পবিত্র যুদ্ধ নয়। স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে দেওয়া যুক্তি আদপেই কোনো যুক্তি নয়, চরম স্বেচ্ছাচারিতা, পাশবিকতা ও বলাৎকার মাত্র।

 

 জাহিলিয়াতের কথিত যুদ্ধ নিতান্তই অপবিত্র, অপরিচ্ছন্ন, অভদ্রজনোচিত এবং অমানবিক। করায়ত্ত করা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে তা একান্তই তাগুতী যুদ্ধ।

 

পুঁজিবাদী ও মূলধন ভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র বর্ণিত কার্যকলাপ ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারে না। প্রোলেটারিয়েটের স্বৈরতন্ত্রের কার্যকলাপও তাই হতে বাধ্য, যা উপরে দেখানো হয়েছে। সকল স্বৈরতন্ত্রই মানবীয় সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক। মানুষের ওপর মানুষের সার্বভৌমত্ব। তা ছাড়া অন্য কিছু হওয়া তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।

 

তাই বলতে হচ্ছে, মানুষ যদ্দিন পর্যন্ত আল্লাহর দেওয়া আদর্শ ও নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র ও সরকার গঠন না করছে, তদ্দিন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ছাড়া মানুষের ভাগ্যে আর কিছুই জুটতে পারে না।

 

মূলধন যদ্দিন মানুষের ওপর প্রধান প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক ও নীতি-নির্ধারক হয়ে থাকবে, তদ্দিন তা জাহিলিয়াত ছাড়া আর কিছুই হবে না। তদ্দিন তার পক্ষে আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে রাজনীতি হড়ে তোলা ও পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তদ্দিন পর্যন্তই জাহিলিয়াতের দুর্ধর্ষ স্বৈরতন্ত্র  থেকে মানবতার মুক্তি নেই। তদ্দিন পর্যন্ত বিদ্রোহী শ্রেণীর পক্ষ তার হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। তদ্দিন পর্যণ্ত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র সেই মুখোমুখি দাঁড়ানো শ্রেণীকে স্বৈরতন্ত্রের নিষ্পেষণ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তদ্দিন তা এমন সব আইন কার্যকর করবে, যা তাদের রক্ষা করতে পারবে না। তদ্দিন তা এমন সব আইন কার্যকর করবে, যা তাদের ক্ষমতাকেই সুদৃঢ় করবে, শাসক পুঁজিপতিদের স্বার্থই রক্ষা করবে, সর্বাঙ্গীনভাবে।

 

তা থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি সম্ভব নয় এজন্যে যে, সেই অবস্থাটা মূলধনের কর্তৃত্ব কায়েম করার নিশ্চিত অনিবার্য ফলশ্রুতি।

 

তবে তা ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যানুযায়ী নিশ্চিত অনিবার্য নয়। কেননা মূলধনের ব্যাপারটাই ঐ রূপ। ‘ব্যক্তি’ ওমানুষের দিকে না দিয়েই একথা বলা হয়েছে। ঐ কথা নিশ্চিত অনিবার্য হচ্ছে আল্লাহর জারীকৃত সুন্নাতের দৃষ্টিতে। আল্লাহর সুন্নাত হচ্ছে, মানুষ যদ্দিন পর্যন্ত আল্লাহর নাযিল করা বিধান ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম না করবে তদ্দিন পর্যন্ত তাগুতী শক্তিই তাদের শাসন করবে।

 

পুঁজিবাদী অবস্থায় তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, মানুষ শুরু থেকেই আল্লাহর পদ্ধতি অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে অস্বীকার করেছে। কেননা তা সুদ ও মুজদদারীকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে। অথচ এ দুটিই হচ্ছে পুঁজিবাদের প্রধান স্তম্ভ। এ দুটির ওপর ভিত্তি করে পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে। আল্লাহর পদ্ধতি মুষ্টিমেয় ধনী লোকদের হস্তে মূলধনের আবর্তন সীমিত হয়ে যাওয়াকেও হারাম ঘোষণা করেছে। কিন্তু লোকেরা যখন সে বিধান অমান্য করে বসল, তখন তাগুতই তাদের ওপর শাসক ও ধন-মালের মালিক হয়ে বসল। আর মানুষ হলো তারই নিকৃষ্ট লাঞ্ছিত দাস। এই দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে তাদের মুক্তিলাভ কখনোই সম্ভব নয়।

 

তাগুত মানুষকে দাসানুদাস বানানো থেকে কখনোই বিরত থাকবে না। কেবলমাত্র দুটি উপায়েই মানুষ এই অপমানকার অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পারে। হয় মানুষ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর পথে ফিরে আসবে। তা হলে তখনই মূলধনের তাগুত ক্ষমতাচ্যুত হতে পারে। অতবা মানুষ অপর এক তাগুতের সন্ধান করবে। তা এসে পুঁজিবাদের ওপর কঠিন আঘাত হানবে। মূলধনের কর্তৃত্ব খতম হয়ে যাবে।

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের এই শেষোক্ত অবস্থারই একটি তাগুত এগিয়ে এসে মানুষের জানপ্রাণ ও ধন-মালের নিরংকুশ মালিক হয়ে বসেছে। এটাও আর একটি জাহিলিয়াত।

 

এই নতুন তাগুত যদ্দিন পর্যন্ত জাহিলিয়াতের মধ্যে থেকে শাসন ও নিয়ন্ত্রক হয়েই থাকবে, আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবে না, তদ্দিন পর্যন্ত এই তাগুতকে মাথা ও বুকের ওপর দিয়ে সরিয়ে দেওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। বিদ্রোহী শ্রেণীর পক্ষেও সম্ভব হবে না সেই শাসন কর্তৃত্ব তার হাতথেকে কেড়ে নেওয়া। তথাকথিত স্বাধীণতা ও গণতন্ত্র সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়েই থাকবে তাদের জীবনে। এই সুযোগ এই তাগুত নিজের স্বার্থেই আইন প্রণয়ন করবে। তার হাত থেকে এই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ও তার স্বৈরশাসনের পথে বাধার সৃষ্টি করার কোনো সুযোগ তা দেবে না।

 

না, তা কখনোই হবে না।

 

এই প্রেক্ষিতেই বলতে হচ্ছে, স্বৈরশাসন –তা মূলধন তথা পুঁজিবাদেরই হোক কিংবা হোক প্রোলেটারিয়েটের অথবা অন্য কোনো নামই ধারণ করুক –কোনো হালকা ও অস্থায়ীভাবে সওয়ার হয়ে বসা জিনিস নয় যে, সহসাই তা দূর হয়ে যাবে। আর জাহিলিয়াতের আকাশ থেকে লোকদের ওপর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বর্ষণ হবে এই তাগুতের ছায়াতলে, তা কোনো ক্রমেই কল্পনা করা যায় না।

 

ইতিহাসের জাহিলী বস্তুবাদী ব্যাখ্যায় সবচেয়ে প্রধান সমস্যা –সব সমস্যারই গোড়ার কথা –হচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা ও তজ্জনিত রাজনৈতিক ফলাফল।

 

পুঁজিবাদী স্বৈরতন্ত্র সীমা-নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তি মালিকানার অবাধ সুযোগ দিয়েছে, আর যদ্দিন তা এমনি সীমা ও নিয়ন্ত্রণহীন থাকবে তার রপ যা-ই হোক –তার নিশ্চিত অনিবার্য ফলশ্রুতি হচ্ছে, তারই হস্তে ধীরে ধীরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে। পরে তা এই ক্ষমতাকে সংরক্ষিত করার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োজিত করভে। এ ক্ষমতা ক্রমবর্ধমান, ক্রমবর্ধমানতা-ই তার প্রকৃতি। ফলে সুদ ও সুদী কারবার সম্পদকে ক্রমাগতভাবে চক্রবিদ্ধ হারে বাড়িয়ে দিবে তিন-চারগুণ বেশি-মুনাফা লাভের সুযোগ দিয়ে (আর পুঁজিবাদী স্বৈরতন্ত্র তো এরই ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।) শেষ পর্যন্ত তা মজুদদারী ব্যবসায়কে জমজমাট করে দেবে।–[সুদ ও মজুদদারী থেকেই উত্তরকালে অর্থনীতির ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। কিন্তু আমরা  এখানে তার শুধু রাজনৈতিক কুফলের কথা বলেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছি।] বর্তমান দুনিয়ার পুঁজিবাদ দেশসমূহে আমরা তাই ঘটতে দেখছি। আর তারই দরুন প্রভাব  ও কর্তৃত্ব খুবই মুষ্টিমেয় লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, তারা জীবিত মানুষের তাজা-তৃপ্ত রক্ত নিঃশেষ শুষে নিচ্ছে। একথাও তার জানা আছে যে, জনগণকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দেওয়া হলে তারা এই মুষ্টিমেয় লোকদের খতম করে তাদের ধন-মাল, শ্রম-মেহনত ও ঘাম-রক্তের প্রতিশোধ অবশ্যই নেবে।

 

এই কারণে পুজিবাদের গোষ্ঠী আইন প্রণয়নের সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের মুঠির মধ্যে রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পুরোপুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধু তা-ই নয়, সরকার যন্ত্র দখল করে কিংবা রাজনৈতিক দল গঠন করে আইন কার্যকর করার ক্ষমতাটাও নিজেদের মুঠির মধ্যে ধরে রাখে, আর জনগণকে কিছুটা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্যান্য কিছু আনন্দানুষ্ঠানের স্বাধীনতা দিয়ে মশগুল রাখে যেন তাদের অন্যায় গণ-স্বার্থবিরোধী ও শোষণমূলক কার্যকলাপের প্রতি তাদের দৃষ্টি না পড়ে।

 

হ্যাঁ, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।

 

সেই সুযোগ-সুবিধা নৃত্যগীত, নারী-পুরুষের অবাধ মেলা-মেশা, মদ্যপান, জুয়াখেলা ও জেনা-ব্যভিচারের। তার ঘোষণাই হলো, যা ইচ্ছা করতে পারো। এটা তোমার ব্যক্তি স্বাধীণতার ব্যাপার। তোমাকে কেউ কোনো কাজে বাধা দিতে পারবে না, বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না। কারুর কর্তৃত্ব হলোবা না তোমার ওপর। মনে যেমন ভালো লাগে পোষাক পরিধান করো আর ন্যাংটা হতে চাও? তাতেও কোনো বাঁধা নেই। তোমার যৌন সম্পর্ক করো যেমন তোমার ইচ্ছা –যার সাথে  ইচ্ছা। তুমি তো স্বাধীনতার ছত্রছায়ায় বাস করার সুযোগ পাচ্ছ।

 

এই ধরনের সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করেই পুঁজিবাদ টিকে তাকে। জনগণের বুকের ওপর চাপা থাকে তাগুতের জগদ্দল পাথর।

 

প্রোলেটারী স্বৈরতন্ত্র অবশ্য ব্যক্তিগত মালিকানা ও খতম করে দেয়। আর যদ্দিন এই ব্যক্তিগত মালিকানা বন্ধ থাকবে, তদ্দিন তার অনিবার্য ফলশ্রুতিতে কর্তৃত্ব ও আধিপত্য সম্পূর্ণ রূপ শাসন ক্ষমতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকবে। এই শাসন যদ্দিন স্থায়ী থাকবে, কোনো ব্যক্তিই একবিন্দু জিনিসেরও মালিক হতে  পারবে না। একমুঠি খাবারও পেতে হবে রাষ্ট্রের কাছ থেকে। এই পথ ছাড়া অন্য কোনো পথেই এক মুঠি খাবারও পাওয়া যাবে না। এরই নিশ্চিত অনিবার্য ফলে ব্যক্তি হবে রাষ্ট্রের নিকৃষ্টতম গোলাম। এই গোলামীর বিনিময়ে সে পাবে এক মুঠি খাবার মাত্র। তার পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে বা তার কোনো আচরণের প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়ানো তার পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে তা তার কোনো আচরণের প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়ানো কোনোদিনই সম্ভব হবেনা। কেননা তার জীবিকা –তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় একমুঠি খাবার তো সরকারের কাছ থেকে তাকে পেতে হচ্ছে। তার কর্তৃত্বের আওতার বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। কোনো তা গেলে তাকে না খেয়ে মরতে হবে। এরূপ অবস্থায় প্রোলেটারী পত্র-পত্রিকার সরকারী মালিকানাধীন থেকে প্রত্যেক জীবিকা থামা শাসনের খুবই পবিত্র চরিত্র নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক একনিষ্ঠ হওয়ার কথা বলো। আর সে মরে গেলেই কিংবা ক্ষমতাচ্যুত হলেই তাকে বর্বর, নির্মম, বিশ্বাসঘাতক, খুনী ও মানুষের দুশমনরূপে চিত্রিত করে। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে কোনোই পার্থক্য নেই। কার্যত এটা ওটা দুটোই সমান। এটা হলেও কিছু যায় আসে না, ওটা হলেও কোনো লাভ নেই। কেননা স্বৈরতন্ত্র কেবল মাত্র শাসক ব্যক্তির মধ্যে নিহিত নয়। এই গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিই রক্ষিত হয়েছে স্বৈরতন্ত্রের ওপর। তাতে একজন শাসক চলে গেলে আর একজন এসে তারই মতো স্বৈরতন্ত্র চালায়। জনগণ যে অবস্থায় পূর্বে ছিল পরেও ঠিক সেই অবস্থায়ই পড়ে থাকে। বিন্দুমাত্র পার্থক্য কোথাও লক্ষ্যগোচর হয় না।

 

অবশ্য প্রোলেটারী স্বৈরতন্ত্র –সমাজতান্ত্রিক শাসন –বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে বেড়ায়, তা সেইসব মানুষকে সম্পূর্ণ মুক্তিদান করেছে যারা সামন্তবাদের অধীন অপমানকর অবস্থার বাস করত ভূমিহীন ছিল বলে এবং মূলধনের পুঁজিবাদের নিকৃষ্ট গোলামী থেকেও। তথায় মানুষ এক মুঠি খাবারের জন্যে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছিল। …হ্যাঁ, মুক্তি পেয়েছিল বটে; কিন্তু কিছু সময় যেতে না যেতেই আবার সেই লাঞ্ছনা ও অপমানের মধ্যে পড়ে  গেল সেই একমুঠি খাবারের জন্যে। একজন মালিক চলে গেল, আর একজন এসে গেল, জনগণ যেমন নিকৃষ্ট দাস পূর্বে ছিল, পরেও তাই থাকবে। মৌলিকভাবে অবস্থার কিছুমাত্র পরিবর্তন হলো না। শুধু তাগুতের আকৃতি বদলে গেল। জনগণ পূর্বের মতই পূঞ্জীভূত জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত থাকল। নিতান্তই দাস হয়ে থাকল।

 

সমাজতন্ত্রও জনগণকে তার স্বৈরশাসন থেকে গাফিল বানিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদের মতোই জনগণকে কিছুটা স্বার্থ, কিছুটা সুযোগ-সুবিধা, কিছুটা সামাজিক সুবিচার ও আনন্দ লাভের নানা অনুষ্ঠান পালনের অনুমতি দিয়েছে। তা-ও সেই নৃত্য-গীত, নারী পুরুষের অবাধ মেলা-মেশা, যৌন-প্রবৃত্তির অবাধ নির্বিঘ্ন চরিতার্থতা ইত্যাদি। সমাজতন্ত্র ও জনগণকে বলে যা ইচ্ছা হয় করো, এখন তো তোমরা মুক্ত ও স্বাধীন।

 

পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক উভয় স্বৈরতান্ত্রিক কিছু কিছু প্রকৃত সুযোগ-সুবিধাও জনগণ লাভ করে বটে –তাতে সন্দেহ নেই। কিছু আংশিক ন্যায়পরতাও পায়, পায় কিছুটা আনন্দ স্ফুর্তি। যেমন কুকুরের ঘেউ থামাবার জন্যে তার সম্মুখে কিছু মাংসহীন হাড় ছুড়ে দেওয়া হয়, এইভাবে জনগণকে সম্পূর্ণ বেখেয়াল অপ্রতিবাদী বানিয়ে রেখে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম তাগুতের নিরংকুশ শাসন কায়েম হয়ে যায়। আর স্বয়ং শাসকগোষ্ঠী সর্বপ্রকারের ফিসক ফুজুরী পাপানুষ্ঠানের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে থাকে।

 

পুজিবাদী তাগুতের অধীন মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তির হাতে এত ধন-সম্পদ ও শক্তি-ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়ে যায় এবং তাদের জীবনে বিলাস-ব্যসন ও আনন্দ গৌরবের তত সীমা-সংখ্যহীন সামগ্রী ও তার চাকচিক্য এসে যায় যে, তা দেখে লোকদের চোখ ঝলসে যায়।

 

আর সমাজতান্ত্রিক তাগুতী ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব সম্পন্ন ও শাসনদণ্ড ধারণকারী কতিপয় দলীয় নেতা ও কর্মী দুনিয়ার সীমাহীন আনন্দ ও ভোগ-সম্ভোগ সামগ্রী দুই হাতে লুটেপুটে নেয়। আর অভাব-অনটন দারিদ্র্য দেশের আপামর জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে বণ্টন করে দেয়। এরা কোনো দিনই সুখের মুখ দেখে না। আর কর্তারা কোনো দিনই জানতে পার না অভাব ও ক্ষুধা কাকে বলে।

 

এই উভয় ধরনের স্বৈরতন্ত্রই প্রচারযন্ত্রসমূহ নিজেদের ইচ্ছামতো প্রোপাগাণ্ডা চালানোর কাজে ব্যবহার করে। জনসাধারণ তাদের দয়ায় কি কি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, সরকার তাদের খিদমতে কিভাবে দিন-রাত ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছে –তার ব্যাপক প্রচার চালানো হয়, যা শুনে জনগণ স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। তারা শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার ও অনাচার দেখাবার ও তার বিরুদ্ধে বলার কোনো সুযোগই কখনও পায় না। তারা যে মানুষগুলোকে নির্বাক জন্তু-জানোয়ারে পরিণত করে রেখেছে তাদের সকল মানবিক  মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করে –তা বোঝার সামর্থ্যও অনেকেরই হয় না।

 

ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যায় এসব কিছুই বিপ্লব ও উন্নতির নামে চলে আসছে আবহমানকাল ধরে।

 

 

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিপর্যয়

 

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে ব্যক্তি মালিকানা ও সামজের রাজনৈতিক অবস্থায় তার প্রভাবের দিকে আমরা ইঙ্গিত করেছি। আমরা বলে এসেছি-

 

আমরা ‘মালিকানা’ শব্দের ব্যাখ্যায় মূল জাহিলী যুক্তি গ্রহণ করেছি। কিন্তু তার চিন্তা-বিশ্লেষণে এই যুক্তির অনুসরণ আমাদের ইচ্ছা নয়। কেননা তা কারণ ও ফলকে ওলট-পালট করে দেয়। আরও ভালো ভাবে বললে বলা যায়, তা শিকলের ধারার মধ্য হতে একটি মাত্র কড়া গ্রহণ করে এবং মানব জীবনের বাস্তবতায় তার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা থেকে সেটিকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। তা রাজনৈতিক অবস্থার ব্যাখ্যা করে অর্থনৈতিক রূপরেখা দিয়ে। অর্থনীতিকে তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে রেখে ব্যাখ্যা করতে তা আদৌ প্রস্তুত নয়। মানুষের চিন্তা-বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়েও তার ব্যাখ্যাদান তার অনভিপ্রেত। কোনো ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যায় মানুষ অর্থনৈতিক সংস্থা ও অবস্থার অধীন। অর্থনৈতিক সংস্থা ও অবস্থা মানুষের অধীন নয়।

 

“সামষ্টিক উৎপাদন –যা লোকেরা করে আসছে, মানুষ তার ভিত্তিতে একটা সীমাবদ্ধ সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা থেকে তাদের নিষ্কৃতি নেই। তা তাদের ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। অতএব বস্তুগত জীবনে উৎপাদন পদ্ধতিই জীবনে আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও সামষ্টিক কার্যক্রমের রূপ নির্ধারণ করে। মানুষের নিজের চেতনা তাদের অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না বরং তাদের অস্তিত্বই তাদের চিন্তা-চেতনা নির্ধারণ করে”। -(কার্লমার্কস)

 

আমরা পূর্বে ধারণা ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিপর্যয় সম্পর্কিত আলোচনায় এই জাহিলী ধারণার মধ্যে নিহিত বিপর্যয় সম্পর্কে বলে এসেছি। তাতে মানুষের মেধা ও মূল্যবোধ এবং তার কর্মশীলতার ইতিবাচকতা সম্পূর্ণ গাফিল হয়ে যায়। আর এই মানুষ যে যন্ত্রপাতি উৎপাদন করেছে, ইতিহাসের বস্তুগত ব্যাখ্যা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের সবকিছুকে তারই ফলশ্রুতি বলে দাবি করছে। এই মানুষ তার নিজের মধ্যে নিহিত আগ্রহ ও প্রতিরোধক উদ্দীপতাকে অস্বীকার করে।

 

যন্ত্রপাতি উৎপন্ন হওয়ার পর সমগ্র জীবনের বিবর্তন সৃষ্টি করে এই কথা তার উৎপাদনকারী যখনতা উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তখন আদৌ চিন্তা করেনি। কিন্তু এই কথা বস্তুবাদী ব্যাখ্যার এই কথাকে সত্য বলে স্বীকার করে না যে, এই বিবর্তন মানুষের ইচ্ছাবাসনা থেকে স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন। এই বিবর্তন পূর্ণমাত্রায় দৃষ্টিগোচরও ছিল না যখন তা উৎপাদন করা হচ্ছিল। কাজেই তা স্বয়ং মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করেই চলতে পারে। পারে তাকে উন্নত করতে, পারে অধঃপতনে পৌঁছে দিতে। মানব মনের সকল সোজা ও আঁকা বাকা পথ ধরেই তার গতিবিধি হলো একান্ত জরুরী।  তার বাইরে তার জন্যে আদৌ কোনো পথ খোলা নেই। কোনো তা শূন্য –বায়ুলোক কাজ করতে পারে না। তা সব সময়ই মনের পথে মনের মধ্য দিয়েই কাজ করে।

 

মানুষ যখন উড়োজাহাজ আবিস্কার করল, তখন বস্তুগত কোনো প্রতিবন্ধক ছিল না, যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে বিরত রাখতে পারত। মানব মনে প্রাচীনকাল থেকেই একটা উদ্ধুদ্ধকরী আগ্রহ  কাজ করছিল। বলছিল, সে পাখির ন্যায় শূন্যলোকে উড়ে বেড়াবে। এই আগ্রহ উৎসাহই শুরুকালীন বহু প্রকারের চেষ্টা সাধনায় রূপায়িত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তার বৈজ্ঞানিক পন্থা উদ্ভাবিত হলো, যখন মানুষের জ্ঞান ও অর্জিত তত্ত্ব ও তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবেই এই আগ্রহ বাস্তবায়নে তাকে সক্ষম করে দিল। এই আগ্রহ ও উৎসাহের মূলে আর একটি কারণ ছিল এক স্থান থেকে অন্যস্থানে খুবই দ্রুততা সহকারে যাতায়াত করতে পারার সুবিধা লাভ। তার এটাও স্বভাবসিদ্ধ আগ্রহই বটে! শুরুতে সাহসিকতা সহকারেই তা পূরণের চেষ্টা হয়। পর সে একটি জন্তুর পিঠে সওয়ার হয়। পরে চেষ্টা-প্রচেষ্টায় রত হয় কোনো দ্রুত উপায় উদ্ভাবনে। আর তার এই চেষ্টা-প্রচেষ্টাই তাকে উড়োজাহাজ উৎপাদনে সক্ষম করে দিল।

 

তারপর রকেট আবিস্কৃত হলো।

 

উড়োজাহাজ যখন কার্যতই উৎপাদিত ও নির্মিত হলো, তখন সমাজে একটি বিপ্লবাত্মক বিবর্তন ঘটিয়ে দিল। যুদ্ধ ও শান্তি –উভয় অবস্থায়ই তার ব্যবহার হতে লাগল।

 

কিন্তু তাতে বিবর্তন ঘটল কেমন করে? এ বিবর্তন কি মানুষের মনের দিকটাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে, তার আগ্রহ-উৎসাহ এবং তার সোজা ও বাঁকা গতিবিধিকে বাদ দিয়ে ভিন্নতর কোনো পথ ধরে চলেছে? এবং চলে এসে মানুষের জন্যে এই কাজ করেছে?

 

বস্তুত উড়োজাহাজ উৎপাদন সহজতর হওয়ার পশ্চাতে আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-ধারণা ও সংস্কৃতি-সভ্যতার ব্যাপক সংযোগ রয়েছে। তা কি নতুন কোনো ব্যাপার যা উড়োজাহাজ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে? কিংবা তা অতীব প্রাচীনকালীন অন্তর্নিহিত বাসনা, যা পূরণের জন্যে মানবতা প্রাথমিক সহজ যন্ত্রপাতি দ্বারা চেষ্টা চালিয়েছিল প্রাচীনকালে। পরে এ পর্যায়ে বড় ও ব্যাপক আকারে চেষ্টা চালিয়েছে, যখন তার জন্যে সমস্ত সম্ভাবনাই গড়ে তোলা হয়েছিল। এ সম্ভাবনাই তা নিজ হস্তে গড়ে তুলেছে।

 

কোনো এক সভ্যতা-সংস্কৃতিকে অপর কোনো সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রধান প্রভাবশালী ও কর্তৃত্বশালী বানিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে উড়োজাহাজকে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এক সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধ্বংস করার কাজেও তা ব্যবহৃত হয়নি, তা বলার উপায় নেই। তা করা হয়েছে যুদ্ধ করে, যুদ্ধের উপায় অবলম্বন করে। তাহলে তা কি এমন কিছু নতুন ব্যাপার যা উড়োজাহাজ ঘটিয়েছে কিংবা ইতিহাসের গভীরে তার জন্যে বহু সাক্ষ্য রয়েছে।

 

মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জন্যে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উদার উন্মুক্ত করে খুলে দিয়েছে এই উড়োজাহাজ। কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে যা করেছে যা করেছে তা হচ্ছে বাড়তি সম্ভাবনা ও আগ্রহ উৎসাহ বাস্তবায়ন, যা এতদিন প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিল; কিন্তু কার্যকর হওয়ার পথ পাচ্ছিল না। কিন্তু তা এমন কিছুই নতুন করে সৃষ্টি করেনি, যা পূর্ব থেকেই মানুষের মনে প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশমানভাবে বিরাজ করছিল না। তা কোনো নতুন মানুষও সৃষ্টি করেনি। যদিও বস্তুগত ব্যাখ্যা এই সব কিছুই ধারণা করে নিতে বলতে চেয়েছে!

 

এখান থেকেই আমরা চিরন্তন মানুষের কাছে ফিরে যাব এবং মানবীয় দৃষ্টিকোণ দিয়ে অর্থনীতির ব্যাখ্যা করব, -অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে মানুষের ব্যাখ্যা নয়।

 

মালিকানা ব্যাপারটি অর্থনীতির জগতে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মালিকানা কি করে হয়, তার ফলাফল কি?

 

বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ইতিহাসের স্তরসমূহের জন্যে কতগুলো নিশ্চিত অনিবার্য রূপ নির্দিষ্ট করে দেয় মালিকানার জন্যে নিশ্চিত রূপ ও প্রকারের মধ্য থেকে।

 

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ দিয়েই ইতিপূর্বে আমরা দেখিয়েছি  যে, এই ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক নিশ্চিত অপরিহার্যতা নিতান্তই যুক্তিহীন ও দুর্বল কথা।

 

ইসলাম যখন তার মৌল নীতিসমূহ সহকারে তার এই জমিনে এই অবকাশের মধ্যে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যঅ প্রদত্ত নিশ্চিত অনিবার্যতার একবিন্দু সহায়তা ও আনুকূল্য ছাড়াই আত্মপ্রকাশ করল, তখন একবার আমরা ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতার সর্বাত্মক কৃত্রিমতা ধরতে পেরেছিলাম। তখন কোনো ক্রীতদাস মুক্তিলাভের জন্যে উদগ্রীব হয়ে যায়নি। তখন এমন কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতাও ছিল না, যা তাকে মুক্ত করতে পারত –যেমনটা ইউরোপে ঘটেছে ইসলামের সাত শতাব্দী পর। তখন কোনো তারীও মুক্তির জন্যে পাগল হয়ে ওঠেনি। তাকে মুক্ত করার কোনো নিশ্চিত অর্থনৈতিক অনিবার্যতাও ছিল না। ছিল না তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত করার, মালিকানার অধিকার দেওয়ার অধিকার দেওয়াবার পক্ষে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির কোনো কিছুই কোথাও ছিল না। এইগুলো এমন সব মৌল অধিকার যা ইউরোপ নারীকে দিয়েছে এই সেদিন –ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মাত্র। তাও আবার নৈতিকাতর ক্ষেত্রে বীভৎস দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ও ধ্বংসকারী বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার পর।

 

তখন সাধারণ জনগণও মুক্তি চায়নি গোত্রীয় কর্তৃত্ব আধিপত্য থেকে কিংবা স্বেচ্ছাচারী শাসনের গোলামী থেকে। কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতাও এই মুক্তির ব্যবস্থা করেনি। ধন-মাল ও শাসন সংক্রান্ত রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অভিনব তাৎপর্য নিয়ে আসারও তখন কোনো বাধ্যকারী কারণ কোথাও ছিল না। ইউরোপে। যার অনেকগুলোর প্রকাশ ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর পূর্বে ঘটতে পারেনি। তাও ঘটেছিল মালিক ও অ-মালিকদের মধ্যে বহু রক্তাক্ত সংঘর্ষ সৃষ্টি হওয়ার পর।

 

এই সব ক্ষেত্রের মধ্যে কোনো একটিতেও নিশ্চিত অপরিহার্যতা বলতে কোনো কিছুই ছিল না।

 

আমরা আর একবার এই নিশ্চিত অনিবার্যতার কৃত্রিমতা ও ভিত্তিহীনতা দেখতে পেয়েছি, যখন দুটি শিল্প-কারখানার দিক দিয়ে অত্যন্ত বেশী পশ্চাদপদ সামন্তবাদী দেশে কমিউনিজম শিকড় গেড়ে বসল, সে দেশ দুটি হচ্ছে রাশিয়া ও চীন। অথচ যে ইংল্যাণ্ডে তার শৈল্পিক অগ্রবর্তিতার কারণে সমাজতন্ত্র কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা ছিল একান্তই নিশ্চিত অপরিহার্য ব্যাপার। কিন্তু সেখানে তা কায়েম হয়নি বরং এখন পর্যন্ত সেই পুঁজিবাদই মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে ইংল্যাণ্ডের বুক জুড়ে।

 

তাই মালিকানার সেই রূপ পরিগ্রহ করাও কিছুমাত্র নিশ্চিত অনিবার্য নয়,যা বর্তমান জাহিলিয়াতের স্থলে গ্রহণ করেছে। তা পুঁজিবাদী স্বৈরতন্ত্রের হোক কিংবা হোক সমাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রে। …এ সবকিছুই ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

 

ইউরোপে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাহিলিয়াতের ছত্রছায়ায়, যা সামন্তবাদ প্রতিষ্ঠার কারণে পূর্ব থেকেই আনুকূল্য পেয়ে গিয়েছিল। পূর্বে ঠিক যে নিয়মে ও দারায় সামন্তবাদ কায়েম হয়েছিল, পুঁজিবাদও ঠিক সেই নিয়মে ও ধারায় কায়েম হয়েছিল, আর তা হচ্ছে মালিকানার সীমাহীনতা ও নিরংকুশ  স্বাধীনতা-সর্বতোভাবে।

 

ইউরোপীয় জাহিলিয়াতেরও আনুকূল্য তার জন্যে নিশ্চিত অনিবার্য ব্যাপার ছিল না। এ পর্যায়ে যা বলা যায় তা শুধু এতটুকুই যে, তা কার্যত সংঘটিত হয়েছে। তার বাস্তবমুখী শক্তি ছিল বলেই তা হয়েছে। কিন্তু তা তার কল্যাণময় হওয়ার পক্ষের কোনো যুক্তি নয়। কোনো সীমালংঘনের সাফাই গাওয়ার জন্যে কোনো কিছুই প্রস্তুত নয়।

 

আর পুঁজিবাদী জাহিলিয়াতে যে বিবর্তনই ঘটেছে, তা হচ্ছে প্রকৃতির বিবর্তন। তাগুত তার দ্বারাই মানুষকে গোলাম বানিয়ে ছেড়েছে। পূর্বে তারা ছিল ভূমিদাস। উত্তরকালে তারাই হলো শিল্প-কারখানার শ্রমিক দাস, মূলধন ও পুঁজিবাদের ক্রীতদাস। কিন্তু মৌলিকতা ও সারবত্তার দিক দিয়ে সীমালংঘন ও আল্লাহ-দ্রোহীতার প্রকৃতি এক ও অভিন্ন। আর দাসানুদাস হওয়ার –লাঞ্ছিত অবমানিত হওয়ার দিক দিয়ে দাসত্ব প্রকৃতিও অনুরূপভাবে সম্পূর্ণ অভিন্ন।

 

মূলধনের প্রকৃতি অর্থনৈতিক রূপ পরিগ্রহের ক্ষেত্রে জমির প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কিন্তু দখল, আয়ত্তকরণ, মালিকত্ব ও কর্তৃত্ব লাভের আগ্রহ উৎসুকের দিক দিয়ে তা ভিন্নতর কিছু নয়।

 

যন্ত্রপাতি উদ্ভাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কার্যকরতার জন্যে নগদ মূলধনের প্রয়োজন দেখা  দিল অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে।

 

কিন্তু এ পর্যন্ত চলে আসা ভূমি মালিকদের পক্ষে হঠাৎ করে মূলধন ও শিল্পপতি হয়ে যাওয়া প্রথম  দিক দিয়ে খুব একটা সহ ব্যাপার ছিল না। কোনো ঝোঁক-প্রবণতা ও অভ্যাস দুটোই মানুষের মনের সাথে সম্পৃক্ত। সামন্তবাদীরা তো এতদিন সম্পূর্ণ শান্ত ও নিশ্চিতভাবে সেই পথে কাজ করে আসছিল, যে পথে তারা ধন-মাল আয়ত্ত করার সাথে সাথে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেছিল। এই ক্ষেত্রে ক্রমাগত কয়েক শতাব্দীকালের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের ছিল। এদিকে সামন্তবাদীদের তাগুত শিল্পের ক্ষেত্রে নেমেছে মাত্র কয়েকশ বছর হলো। তাই এক্ষেত্রের চড়াই-উৎরাইয়ের অভিজ্ঞতা অনেক বিলম্বে অর্জিত হয়েছে। এটা কোনো ব্যক্তিগত নিশ্চিত অনিবার্যতার ব্যাপার নয়। বরং তা জনগণের একান্তভাবে সেদিকে ঝুঁকে পড়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে, …যদিও আল্লাহর পথ থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার পরিণামে।

 

প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের জন্যে জমির মালিকানার পথ বাদ দিয়ে নতুন একটি পথের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। ….আর সেই সুযোগেই সুদখোর বেনিয়া ইহুদীরা পুঁজিবাদ সৃষ্টি সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুই হাতে ঋণ বিতরণ করতে শুরু করল। যদিও ঋণের বিনিময়ে সুদখোর সমাজের সৃষ্টি নতুন কিছু ছিল না, যা পুঁজিবাদ সৃষ্টি করেছে। ইহুদীরা এই কাজ করে এসেছে ইতিহাসের সেই সূচনাকাল  থেকেই। সুদ তাদের দেহের শিরা-উপশিরায় রক্তর মতই সদা প্রবহমান। যদিও আল্লাহ তাদেরকে তাওরাত কিতাবে এই সুদখোরীথেকে বিরত থাকার জন্যে আদেশ করেছিলেন, সুদী কারবার করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তারা মুহুর্তের তরেও এই কাজ থেকে বিরত থাকেনি। বরং তারা এই কারবার নিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বত্র সূদী কারবারের এই জাহিলিয়াত একমাত্র ইহুদীদেরই সৃষ্টি।

 

তাওরাত তাদের বলেছিল; তোমার ভাইয়ের খাতিরে তুমি সুদী কারবার করো না। তখন তারা নিজেদেরকে বললে –অথবা বলা যায়, তাদের লোব ও লালসাই তাদের মনে জাগিয়ে দিল এই কথাঃ “তোমার ভাইয়ের জন্যে অর্থাৎ ইহুদীদের সঙ্গে সুদী কারবার করতে নিষেধ করা হয়েছে। খুব ভালো কথা! কিন্তু অ-ইহুদী উম্মীদের সাথে সুদী কারবার করে সর্বতোভাবে তাদের রক্ত শুঁষে নিতে তো  কোনো দোষ নেই”। কুরআন মজীদে তাদের এই কথাটিই উদ্ধৃত হয়েছে এই ভাষায়ঃ

 

(আরবী******************************************************************************)

 

তা এই ভাবে যে, তারা বলেছিল যে, উম্মী লোকদের মধ্যে আমাদের জন্যে কোনো নিষেধ ও বাধ্যবাধকতা নেই। (সূরা আলে-ইমরানঃ ৭৫)

 

সুদের ভিত্তিতে ঋণ দানের কারবারী এই ইহুদীদের জন্যে প্রয়োজন ছিল তাদের ঋণ ও সুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা। যেমন ঋণ গ্রহণকারীর জন্যে জরুরী ছিল এমন মুনাফা লাভ, যা ঋণ শোধ  দেওয়ার সাথে সাথে তার সুদ আদায় করার ব্যবস্থা করে দেবে। আর সেই সাথে ব্যক্তিগত মুনাফার একটা অংশ তার নিজের হাতে অবশিষ্ট থাকা। আর এখান থেকেই সূচিত হলো পুঁজিবাদ গড়ে ওঠা –সেই প্রথম দিন থেকেই। বিপুল মুনাফা লাভের আগ্রহই হলো এর মূল নিয়ামক। আর তা খুব সহজ পথেই হতে লাগল।

 

কিন্তু তা ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যায় কথিত কোনো ঐতিহাসিক বা অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতার ব্যাপার ছিল না।

 

সংশ্লিষ্ট সকলের পূর্ণ সহযোগিতায় পুঁজিবাদ গড়ে উঠার পথে সেখানে কোনো প্রতিবন্ধকই ছিল না। এই সময় ইউরোপীয় সমাজের ব্যবসায়ীরা যে ধন-মালের মালিক ছিল, তা শিল্প উৎপাদনের কাজে বিনিয়োগকৃত ছিল। তারাই আরও মূলধন সংগ্রহ করল ইহুদীদের কাছ থেকে সুদের ভিত্তিতে।

 

এই সময় জনগণ ইচ্ছা করলে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে পারত। আর তা এভাবে যে, আল্লাহর পথ –ইসলাম সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দিয়েছে। আর তদস্থলে সম্পূর্ণ ঘোষণা করেছে নির্দোষ শর্তে ব্যবসায়ী সহযোগিতা।

 

তাই বলতে হয়, পুঁজিবাদ সৃষ্টি কোনো নিশ্চিত অনিবার্যতার ফলশ্রুতি ছিল না। এটা পুরাপুরি বিপথগামিতা,  গুমরাহী ও বিভ্রান্তি মাত্র। আল্লাহর দাসত্ব কবুল করেনি বলেই জাহিলিয়াতের এই মারাত্মক বিভ্রান্তি।

 

জাহিলিয়াত অর্থনৈতিক কায়-কারবারে সুদী ব্যবস্থাকে অবাধ ও নির্বিঘ্ন করে দিয়েছে। আর এটাই ছিল মানবতার জন্যে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনার নিশ্চিত অনিবার্যতা। একটু পরেই আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত বলব। কিন্তু আমরা তার পূর্বে বলতে চাচ্ছি যে, ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যা যেমন বলে, অর্থনৈতিক কায়-কারবার জনগণের নৈতিক মূল্যমান ও আধ্যাত্মিক ভাবধারা থেকে  কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিলনা।

 

যে জাহিলিয়াত আল্লাহর পথের বিপরীত গিয়ে যে সুদী কারবারের প্রচলন করেছে, তারও পূর্বে ধোঁকা, প্রতারণা, অপহরণ, অধিকার কেড়ে নেওয়া ও লুণ্ঠনের কাজ করতে সিদ্ধহস্ত হয়েছিল সামন্তবাদী ব্যবস্থার ছত্রছায়ায়। এক্ষণে সেখান থেকে ফিরে এসে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ঠিক সেই কাজই করছে। নতুন কিছু নয়।

 

যে জাহিলিয়াত কৃষক চাষীদেরকে ভূমি চাষের কাজে একান্তভাবে মশগুল করে রেখেছিল, যেখানে তাদের সমস্ত কর্মশক্তি নিঃশেষ নিয়োজিত হয়েছিল, একমুঠি খাবারের বিনিময়ে, ঠিক সেই জাহিলিয়াতই শ্রমিক কর্মচারীদের মশগুল করে রেখেছে শিল্প কারখানার চার দেওয়ালের মধ্যে, যেন তাদের সমস্ত কর্মশক্তি এখানে নিঃশেষ হয়ে যায়, ঠিক সেই একমুঠি খাবার পাওয়ার বিনিময়ে।

 

না, জাহিলিয়াত নতুন কোনো সৃষ্টি হিসেবে গড়ে ওঠে না, যা পূর্বে ইউরোপীয় জাহিলিয়াতে বর্তমান ছিল না। মূলত তা ছিল, বর্তমানের রূপটা তারই সম্প্রসারণ মাত্র।

 

সুদী কারবারের অন্তর্নিহিত কথা হলো, তার ফলে মূলধন দ্রুততা সহকারে দুইগুণ তিনগুণ চারগুণ বৃদ্ধি পায়। এটাই তার স্বভাব। জমি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা তার সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। তার তুলনায় অনেক অনেক বেশী এবং দ্রুত মূলধন বৃদ্ধি পায় এই সুদী কারবারে। আর এই কারণে পুঁজিবাদের হাতে সামন্তবাদী জাহিলিয়াতের নৈতিকতাও বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এই বৃদ্ধিটা বীভৎসতা, কদর্যতা ও অধপতনে গমনের দিকে।

 

পুঁজিবাদ তার অগ্রগতিতে বিপুল সাহায্য ও সহযোগিতাও পেয়েছে। তার সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ ক্রমশ বৃদ্ধিই পেয়ে গেছে চতুর্দিক থেকে ব্যাপক আনুকূল্য পেয়ে। জ্ঞান-বিজ্ঞান তার সমস্ত সম্ভাবনা দিয়ে পুঁজিবাদেরই সহায়তা করেছে। ফলে তার পথের সব প্রতিবন্ধকতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করার ক্ষমতা ও মারাত্মকতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গেছে।

 

কিন্তু তাও কোনো ঐতিহাসিক বা অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতার কারণে হয়নি।

 

উত্তর ইউরোপীয় রাষ্টগুলো অন্যান্য বহু সংখ্যক ব্যাপারে তার বিপথগামিতা ও জাহিলিয়াত থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ সহযোগিতামূলক পুঁজিবাদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিটি দেশে পুঁজিবাদের সম্প্রসারণ ও অগ্রগতিতে পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া গেছে।

 

এসব দেশের জনগণই তা করতে ইচ্ছা করেছে এবং তা-ই কার্যকর করেছে। ফলে পুঁজিবাদের সহযোগিতা করার পথে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতারই সম্মুখীন হয়নি। এমন কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি, যার দরুন বীভৎস রক্তপাতকারী খুনীর ভূমিকা পালন করতে কোনোরূপ অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

 

এটা কোনো নিশ্চিত অনিবার্যতা নয়। এটা নিতান্তই বিপথগামিতা মাত্র। পুঁজি বাদ ক্রমশ সমৃদ্ধ, বিরাট বপু ও ক্রমবর্ধমান হতে থাকল। আর পাশাপাশি চলতে থাকল বিজ্ঞানের বেশি বেশি অগ্রগতি ও উন্নতি। ফলে এমন একদিন এলো, যখন বড় বড় পুঁজিদার বৈজ্ঞানিক পন্থায় সম্ভাব্য বিপুল মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে ছোট ছোট পুঁজিদারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াল। এরই ফলে বড় পুঁজি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজিকে খেয়ে ফেলল। অথবা তাকে বাধ্য করল তার সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্যে তার ভিতরে ঢুকে যেতে। আর শেষ পর্যণ্ত এক এক দেশে এক এক স্থানে পুঁজির স্তুপ জমা হয়ে গেল। পূর্ণ ইজারাদারী বা একচেটিয়া ব্যবসায় কর্তৃত্ব গড়ে উঠল। কোনো শিল্পে নিয়োজিত মূলধন যখন পারস্পরিকভাবে অনুপ্রবিষ্ট হলো, একটা আর একটার সাথে মিলিত হয়ে একটি একক ঐক্যবদ্ধতা গড়ে তুলল, তখন সেই শিল্পের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব অনিবার্যভাবে কায়েম হয়ে গেল সেই ঐক্যবদ্ধ পুঁজিবাদের। ফলে অপর কোনো মূলধন সেই ক্ষেত্রে তার সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে সাহস পেল না। কোনো তাতে ইতিমধ্যেই একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং তার সেই একচেটিয়া কর্তৃত্ব সর্বদিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কিন্তু এর-ও কোনো নিশ্চিত ঐতিহাসিক বা অর্থনৈতিক অনিবার্যথা ছিল না। উত্তর ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কার্যত সহযোগিতা যত বেশী বৃদ্ধি পেল, এই দেশগুলোর মধ্যে বসবাসকারী ব্যক্তিগণের পরস্পরেও তত বেশী সহযোগিতা গড়ে উঠল। অনুরূপভাবে সবগুলো দেশে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল ও সেইগুলো পরস্পরের মধ্যেই ব্যাপক সহযোগিতার কাজ করতে থাকল। বিনিয়োজিত হলো পরস্পর সহযোগিতাকারী বিরাট বিরাট  মূলধন। তখন পণ্য ব্যবহারকারীদের অপেক্ষা পণ্য মূল্য নির্ধারণে একচেটিয়া কর্তৃত্ব করাটাই লক্ষ্য থাকল না। এ সব যৌথ কারবারের অংশীদারদের সকলের বিপুল মুনাফা লাভ করিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। যদিও এই সব লোকই ছিল পণ্যের ব্যবহারকারীও। তাই এক্ষণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাসপ্রাপ্তিতে কল্যাণ বা ক্ষতি কোনোটাই তেমন থাকল না। তাই এই ব্যবসায় কোম্পানীসমূহের অংশীদাররা নিজেরাই যদ্দিন ব্যবহারকারীও তদ্দিন সর্বাবস্থায় অভিন্ন ফল দেখা দেওয়া অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল। শিল্পোৎপাদনের গতি বৃদ্ধি পেল, নিত্যনতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠল এবং উৎপন্ন পণ্যের স্তূপ জমা হয়ে গেল। তখন এই পণ্য দেশ-বিদেশের জনগণের মধ্যে বিস্তীর্ণ করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াল। আর তখন থেকেই পুঁজিবাদী দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্টি, তার সম্প্রসারণ ও ব্যাপকতা সৃষ্টির দিকে মনোযোগ দিল। যেন উদ্ধৃত পণ্যদ্রব্য সাম্রাজ্যের অধীন দেশসমূহে বিক্রয় করা সম্ভব হয়।

 

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দাবি করছে, এই সবই হয়েছে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক নিশ্চিত অনিবার্যতার কারণে। ….কিন্তু তার এই কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন।

 

পুঁজিবাদ ও উদ্ধৃত্ত পণ্যসম্ভার সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি করেনি। তাই যদি হবে, তা হলে ইতিহাসখ্যাত রোমান সাম্রাজ্যবাদের কি ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে? …আসলে সাম্রাজ্যবাদ জাহিলী সমাজের বিভ্রান্ত ও বিপথগামী কামনা বাসনারই অনিবার্য ফল। আর প্রতিটি জাহিলী সমাজই বিশেষ শক্তি সামর্থ্য ও আধিপত্য কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে থাকে।

 

উদ্ধৃত পণ্যসম্ভারকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে সাম্রাজ্যবাদই একমাত্র উপায় ও পন্থা নয়, যাকে নিশ্চিত অনিবার্য মনে করা যেতে পারে।

 

ব্যবসায় বাণিজ্যই তার স্বাভাবিক গতিতে উদ্ধৃত্ত গণ্য বিস্তারের জন্যে যথেষ্ট মাধ্যম। আর উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হলেই উদ্ধৃত পণ্যের কোনো প্রশ্ন থাকে না,যাকে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে পারে।

 

এসবই হচ্ছে পুঁজিবাদের ছত্রছায়ায় সৃষ্ট নিশ্চিত অনিবার্যতা। আরও ভালোভাবে বললে, পুঁজিবাদ সমৃদ্ধ জাহিলিয়াতের ছত্রছায়ায় তা সম্ভব। পরে তার সকল ফলাফলই তাকে অধিকতর সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। ফলে এটাই নিশ্চিত অনিবার্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। কোনো তার সীমালংঘনমূলক বাড়াবাড়িকে রুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করতে পারে, এমন কোনো জিনিসই কোথাও ছিল না।

 

অবশ্য  একটু একটু করে চেষ্টা করা হলে এ বিপথগামিতা ও বিভ্রান্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পথে পরিচালনা করা সম্ভব হতো। অবশ্য জনগণ যদি তা চাইত, যা চেয়েছি তা না চেয়ে এবং তারা যদি আল্লাহর পথে চলতে প্রস্তুত হতো। কুরআন মজীদে এই কথাই বলা হয়েছেঃ

 

(আরবী*************************************************************)

 

গ্রাম জনপদবাসীরা যদি সত্যিই ঈমান আনত এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করত, তাহলে আমরা ওপর পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল থেকে বরকত বিপুলতা-ব্যাপকতার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিতাম। (সূরা-আরাফঃ ৯৬)

 

অতঃপর এই জাহিলিয়াত অপর একটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। …আর তা হচ্ছে, এই সকলের থেকেই মালিকানা কেড়ে নেওয়া হলো….।

 

পূর্ববর্তী জাহিলিয়াতকালে এই ধারণা করা হয়েছিল যে, ব্যক্তিগত মালিকত্বই বুঝি পৃথিবীতে সার্বিক বিপর্যয় সৃষ্টির আসল কারণ। আসলে বিপর্যয় কে সৃষ্টি করল –কোন দিক থেকে বিপর্যয়টা এলো, জাহিলিয়াত তা আদৌ ধারণা করতে পারেনি। মানুষই যে সকল বিপর্যয়ের মূলে –বিপর্যস্ত হয়েছে খোদ মানুষ –তা এই জাহিলিয়াতের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। আসলে সংশোধন যদি কাউকে করতে হয়, তাহলে তা করতে হবে এই মানুষকে। আর মানুষের সংশোধন কেবল একটি উপায়েই সম্ভব। তা হচ্ছে, মানুষকে আল্লাহর পথের পথিক হতে হবে। আল্লাহর পথের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করেই তার গোটা জীবনকে –সামগ্রিক জীবনকে গড়ে তুলতে হবে। তা হলে মানুষ তার নিজের নিগূঢ় সত্যতা ও যথার্থতা বুঝতে সক্ষম হবে, তার মধ্যে নিহিত যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য ও মেধা-প্রতিভা সম্পর্খে অবহিত হওয়া ও তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব হবে, সম্ভব হবে জীবন ও বিশ্ব প্রকৃতি পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের কেন্দ্রীয় মর্যাদার কথা জানতে ও বুঝতে পারা।

 

কিন্তু জাহিলিয়াত তার ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যার আলোকে মনে করে দিয়েছে যে, অর্থনীতিই বুঝি মানুষ গড়ে, তাই অর্থনীতি ঠিক হলেই মানুষও ঠিক হয়ে যাবে স্বতঃস্ফুর্তভাবে। তখন কোনোরূপ হস্তক্ষেপ বা স্বতন্ত্রভাবে কোনো সংশোধনী প্রচেষ্টা চালানোর কোনো প্রয়োজন হবে না। কোনো এই ব্যাখ্যানুযায়ী যান্ত্রিক নিশ্চিত অনিবার্যথাই জীবনকে তার দাবি ও তাগিদ অনুযায়ী পরিচালিত করে এবং তা যান্ত্রিকরূপেই তার নিশ্চিত অনিবার্য ফলাফল প্রকাশিত হয়। গোটা বিশ্ব প্রকৃতিও সেই অনুসারে সংশোধিত হয়ে যায়, যখন লোকদের কাছ থেকে তাদের মালিকানা অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

 

কিন্তু এটা কোনো বিজ্ঞান ছিল না। এ ধারণা কোনোক্রমেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এটাকে নিতান্ত নির্বুদ্ধিতা, বোকামী ও জাহিলিয়াত ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

 

সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের একটা অত্যন্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। তারই অন্তর্ভুক্ত ছিল জাহিলিয়াতের সকল প্রতিক্রিয়া। তার সাথে বাড়তি জিনিস ছিল মানব মনে নিহিত যাবতীয় মেধাশক্তি ও প্রতিভা সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা ও মূর্খতা, জীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একদিকে এবং অন্যদিকে মানব সমষ্টির সাথে তার কার্যক্রম সম্পর্খেও চরম অজ্ঞানতা একটা বিরাট কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

 

বস্তুত অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থার নিজস্ব গুরুত্ব যতই বেশী হোক, তা মানব জীবনের একটি অংশ মাত্র। তার অধিক কোনো গুরুত্বই তা পেতে পারে না। অবশ্য সে অংশ নিতান্তই মৌলিক, অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নেহায়েত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা তো আর গোটা জীবনটা নয়। জীবনের ওপর একমাত্র প্রভাবশালী অংশও তা নয়।

 

কিন্তু আধুনিক জাহিলিয়াত তাতে অত্যন্ত বেশী অস্বাভাবিক রকমের বাড়াবাড়িমূলক গুরুত্ব আরোপ করেছে। আর জীবনের অন্যান্য সব দিকের গুরুত্বকে অনেক বেশী কম ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও প্রাচ্যদেশীয় সমাজতন্ত্র সমান ও অভিন্ন ভূমিকাই পালন করেছে। আর তারই দরুন মানব জীবনে মারাত্মক ধরনের বড় বড় গণ্ডগোল ও বিঘ্নতার সৃষ্টি করেছে। তার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত মানুষের কেবল ধ্বংসই অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর বেশীর ভাগে উৎপাদন যন্ত্রপাতিও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। কোনো যন্ত্রপাতির মূল্য নির্ধারণ হবে তা বস্তুগতভাবে কতটা উৎপাদন করতে পারছে সেই দৃষ্টিতে। মানুষের মূল্যায়ন মানবীয় মূল্যমানের দৃষ্টিতে হবে না।

 

উপরে যে বিশৃঙ্খলা, বিঘ্নতা ও দোষত্রুটির কথা বলা হয়েছে, তা অত্যন্ত ব্যাপক। সে বিষয়ে আমরা পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থা, নৈতিকতা ও দুই লিঙ্গের মধ্যকার সম্পর্কের বিকৃতি পর্যায়ের আলোচনায় বিস্তারিত কথা বলব। এখানে শুধু এতটুকুই বক্তব্য যে, উক্ত বিঘ্নতা ও দোষত্রুটির কারণে আধুনিক জাহিলিয়াত ব্যক্তিগত মালিকানা অধিকার কেড়ে নিয়ে সমস্যার সমাধানে যে বিশেষ পন্থায় প্রয়োগ করেছিল,তা তাদের ধারণানুযায়ী কোনো সুফল দিতে পারেনি, যদিও তারা সেটাকেই সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের একমাত্র চাবিকাঠি মনে করে বসেছিল।

 

আসলে বর্তমান জাহিলিয়াত বিকৃত বিপথগামী বলে তা মানব প্রকৃতির মৌলিক ভাবধারার সাথে প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানা (দখলী অধিকার) কেড়ে নিয়ে তার সমস্ত বৈশিষ্ট্যকেও খতম করে দিতে উদ্যত হয়েছে। আর দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক ঝগড়ার সৃষ্টি করেছে। তার দাবি হচ্ছে, মালিকানা প্রবণতা কোনো স্বাভাবিক –প্রকৃতিগত –প্রবণতা নয়, তা সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের উত্তরাধিকার মাত্র। মানব প্রকৃতিতে তা মৌলিকভাবে নিবদ্ধ নয়। …এখানেই থেমে যায়নি। তা যখন বুঝতে পারল, বিরোধীয় বিষয়টিকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করার জন্যে তাদের উপস্থাপিত যুক্তি কিছুমাত্র যথেষ্ট নয়, তখন তা প্রকৃতি বিরুদ্ধ দিকে আর এক ধাপ এগিয়ে গেল। তখন তা মানুষের আসলেই কোনো প্রকৃতি বা স্বভাব আছে, একথাই অস্বীাকর করে বসল। মনে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে এই প্রকৃতিটাকে তার গভীরে বিস্তীর্ণ শিকড় সহ উপড়িয়ে ফেলতেই বদ্ধপরিকর হয়েছে। বলতে শুরু করল, মানুষ প্রকৃতিগত কোনো প্রবণতা ব্যতিরেকেই জন্ম গ্রহণ করেছে। (কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস প্রমুখ এই মতই প্রকাশ করেছে।) বিশেষ করে মানুষের জন্মকালে মালিকানা লাভের কোনো প্রবণতাই তার প্রকৃতিতে ছিল না। সমাজ-ব্যবস্থা এই খারাপ চিন্তার বীজ তার মনের জমিনে বপন করে দিয়েছে। এখানে তা উৎপাটিত করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেননা তা-ই মানুষের সকল দুর্ভাগ্যের মৌলিক কারণ।

 

কিন্তু জাহিলিয়াতের এ ধ্বজাধারীরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো আলোচনা করতেই প্রস্তুত হয়নি। অথচ বিষয়টির ঐতিহাসিক দাবি ছিল তা করার। প্রশ্ন রয়েছে, সমাজই যদি এ প্রবণতা মানব-প্রকৃতিতে বদ্ধমূল করে থাকে, তাহলে সামজ তা করল কেন? …এই সমাজ জিনিসটাই বা কি? যা এই কর্মটি করেছে? ..তা কি খোদা মানুষকে বাদ দিয়ে ভিন্নতর কোনো জিনিস? …হ্যাঁ, একথা সত্য যে, সমাজ ব্যক্তি থেকে স্বতন্ত্র। ব্যক্তি যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা পায়, সমাজের গুণ-বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব তা থেকে অনেকটাই ভিন্নতর হয়। …কিন্তু তবু তা কি মানুষ ছাড়া কিছু?

 

তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেই যে, মার্কস ও দরখায়েম যেমন মনে করে, সমাজ-কাঠামো ব্যক্তির ওপর অনেক কিছুই চাপিয়ে দেয়, মানুষের মনের কোনো তাগিদ ছাড়াই –কোনো ইচ্ছা ও উদ্যোগ ব্যতীতই ব্যক্তির মনে ভালো ও খারাপ উভয় ধরনেরই ভাবধারার সৃষ্টি করে, তা হলে প্রশ্ন ওঠে, কেবল একজন ব্যক্তিই মানুষ, সমাজ নয়। এই ধারণা কে সৃষ্টি করেছে? ….সমাজ তো মানুষেরই সমষ্টি। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টির সমন্বয়কে কি সমাজ বলা হয়?

 

না, তা কখনোই নয়। অবশ্য জাহিলিয়াতের ধ্বজাধারীরা এই তর্কে এগিয়ে আসেনি। অথচ তারাই সর্বশক্তি প্রয়োগে ব্যক্তির মন মগজ থেকে এই ব্যক্তি-মালিকানার ভাবধারা ও প্রবণতাকে সমূলে উৎপাটিত করার জন্যে ওঠে পড়ে লেগে গিয়েছে। তাদের ধারণা হচ্ছে, প্রাথমিক কালের মানুষ ব্যক্তিগত মালিকানা চিনত না, জানত না সমাজরে সকলের মধ্যে উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার –যার অস্তিত্ব এখন নেই, ছড়িয়ে ছিল। আর উৎপাদন হতো অনুরূপভাবে সামাজিক সামষ্টিক পদ্ধতিতে। পরে যখন কৃষ্টি ও চাষাবাদের কাজ শুরু হলো, কেবল তখনই ব্যক্তি মালিকানার প্রশ্ন দেখা দিল, লোকেরাও তার সাথে পরিচিতি লাভ করল। মানুষ তখন জমির মালিকানা লাভের জন্যে আগ্রহী হয়ে উঠল। আর সেই সাথে উৎপাদন যন্ত্রের মালিকত্বও করায়ত্ত করতে চাইল। তা উৎপাদনকারী জনগণের মালিকানা, যা দাসত্ব স্তরে কার্যকর ছিল, পরে সামন্তবাদী স্তরেও তা ছিল, পুঁজিবাদের স্তরে এসেও তা অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।

 

জাহিলিয়াতের এই অন্ধ লোকগুলোকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যে যা যুক্তি পেশ করা হয়, তা কিছুমাত্র যথেষ্ট ছিল না।

 

প্রথম সূচনাকালীন যুগে মালিক হওয়ার যোগ্য –যার মালিক হওয়া যায় কোন জিনিসটি ছিল?

 

প্রস্তরখণ্ড ….চাকুর মতো শানিত, তীক্ষ্ম। তার মালিক হলে কার কি লাভ? কাঁচা মাংস কেটে খণ্ড করার কাজে দাঁত ও নখ যখন ব্যর্থ হয়ে যেত, তখন এই ধারালো পাথর খণ্ড ব্যবহার করা হতো। কিন্তু খোদা এই মাংস ও মাছ –যা টুকরা করা হতো এর মালিক হওয়া যেত কেমন করে? কোনো জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে সংগৃহীত মাছ ও মাংস দুর্গন্ধময় হয়ে যেত, পঁচে যেত। তা খাওয়ার যোগ্য হতো না, ….তা হলে তা পুঞ্জীত করে দখল করেই বা রাখা হতো কেন? কেনই বা তা সংরক্ষণের প্রশ্ন দেখা দিত। কি ভাবে তা সংরক্ষিত হতো?

 

এ পর্যায়ে মালিকত্ব মূলতই অর্থহীন ছিল। কোনো মালিক হওয়ার মতো কোনো জিনিসই তখন ছিল না। মালিক হওয়ার কোনো প্রবণতা মানব প্রকৃতি নেই, এ কারণে নয়, জাহিলিয়াতের ধ্বজাধারীরা কি এই নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করেছে যে, সেই প্রাথমিক সমাজে কোনো জিনিসেরই মালিকত্ব নিয়ে কখনোই কোনো ঝগড়ার সৃষ্টি হয়নি? …তা হলে? কোনো নির্দিষ্ট মেয়েলোকের মালিকত্ব লাভ নিয়ে কি তখনকার লোকদের মধ্যে কখনোই কোনো পাশবিক দ্বন্দ্ব ও বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়নি? যার চোখে সে মেয়েটি অধিক সুশ্রী, সুন্দর গণ্য হতো, তার প্রেম পাওয়ার জন্যে সে হতো পাগল। তখন সে তাকে নিজের একক দখলে পাওয়ার জন্যে চেষ্টা শুরু করে দিত। গোত্রপতি কিংবা সম্প্রদায়ের কোনো সাহসী যুবক যদি তাই হতো, তা হলে শক্তি পরীক্ষায় অন্য সকলের ওপর জয়ী হয়ে সে মেয়েটিকে রীতিমত দখল করে নিত।

 

গোত্রপতি কি নিজেকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করত না? …অন্ততঃ বাহ্যিক পোশাকে, মাথায় একটি পাখির পালক লাগিয়ে? অন্যদের থেকে তার মালিকত্ব কি ভিন্নতর ছিল না? অন্যদেরকে তা ব্যবহার করতে কি নিষেধ করা হতো না?

 

হ্যাঁ, খুব সামান্য ও জঘন্য জিনিসেই এই মালিকত্ব প্রতিফলিত হতো। তবু তাও মালিকত্ব, ব্যক্তিগত মালিকানার ব্যাপার নয় কি তা?... এ তো সেই সময়ের কথা যখন সেই প্রাথমিক যুগে সকল মানুষ যখন সমান মানে জীবন যাপন করত? তখনও ঠিক যতটা সম্ভব হতো, ব্যক্তিরা তার মালিক হয়ে বসত। ..তা কি অস্বীকার করা যায়?

 

ক্রমশ এই মালিকত্বের ভাবধারার বিকাশ ঘটে। মনস্তাত্ত্বিকতার দিক দিয়ে তা ক্রমশ অধিকতর পরিপক্ক হয়ে ওঠে। তাদের বস্তুগত শক্তি সম্ভাবনাও অনেক বড় হয়ে ওঠে। আর তাদের জ্ঞানগত সামর্থ্য হয় দিগন্ত বিস্তীর্ণ। তখন তারা মালিকানা লাভ করতে লাগল প্রশস্ত বেষ্টনীতে। মালিক হলো জমির, মালিক হলো জমির, মালিক হলো জমি চাষের যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারের।

 

তারপরই সূচিত হয় বিভ্রান্ত, বিপথগামিতা।

 

কিন্তু তাদের এই বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা এজন্যে ছিল না যে, তারা কিছু না কিছুর মালিক হয়ে বসেছিল, এর পূর্বেই তারা তাদের মনস্তাত্ত্বিক, বস্তুগত ও জ্ঞানগত মানের সীমার মধ্যেই কিছু না কিছুর মালিক হয়েছিল।

 

পরে তারা যখন জমির ও উৎপাদন যন্ত্রের মালিকত্ব চিনল, জানল, ঠিক তখনই তাদের বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা শুরু হয়ে যায়নি।

 

এ বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা অনেক পুরাতন ব্যাপার। মানুষ যত পুরাতন, তাও ততটাই প্রাচীন।

 

তারা যখন একটি নারীর মালিকত্ব নিয়ে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলো, গোত্রপতিত্ব নিয়েও –তা লাভ করার জন্যেও তারা পরস্পরের সাথে কঠিন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিল। যে পাখির পালক মাথায় লাগিয়ে স্বীয় শোভা বর্ধন করা হতো ও অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় ভূষিত হতো, তার মালিক কে হবে, তাই নিয়ে ছিল তাদের পারস্পরিক ঝগড়া, দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা।

 

পরে দৈহিক শক্তিবলে এই সব কিছু অর্জনে তারা প্রবৃত্ত হয়। যে বিজয়ী হতো সেই হতো তাদের প্রধান কর্তৃত্বশালী। …হ্যাঁ, এটাও ছিল বিভ্রান্তি, বিপথগামিতা। আসলে মানুষের মালিক হয়ে বসার এই বাসনা, পরে তারা নিজেরাই নিজেদের মালিক হতো? তারই জন্যে এই কামনা ও লোভ। মনুষ্যত্বের সূচনাকালীন এই বাসনা-কামনাই হচ্ছে মূল বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা।

 

আর বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা তো কোনো সময়ই কোনা চূড়ান্ত অনিবার্য শক্তি ছিল না। মানুষের জন্যে তা-ই একমাত্র উপায় ছিল না কখনোই।

 

বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা –তা যে সময়ই হোক –একটা মানবীয় সম্ভাবনা মাত্র। তা ঘটে, ঠিক যেমন ঘটে ভারসাম্যতা, সৎপথে হলো। এ দুটো ব্যাপারই সমান।

 

আর এ দুটিই মূল মানব প্রকৃতি থেকে উৎসারিত। সেই প্রকৃতি যেমন হেদায়েত গ্রহণের যোগ্যতার ধারক, তেমনি ধারক গুমরাহীর পথ গ্রহণের যোগ্যতারও। তাই মানব প্রকৃতি বিভ্রান্তিতে পড়ে, যেমন তা গ্রহণ করে ভারসাম্যতা, ঠিক নির্ভুল পথ।–[(আরবী****) দ্রষ্টব্য।]

 

ইতিহাসের জাহিলী বস্তুবাদী ব্যাখ্যার একটা নিতান্তই পৌরাণিক কথা হচ্ছে, ব্যক্তিগত মালিকানা প্রবণতা সূচিত হয়েছে কেবল তখন, যখন কৃষি ও চাষাবাদের সূচনা হয়েছে। আর এই মালিকত্বই হচ্ছে বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার আসল কারণ। …আসলে এটা একটা ভিত্তিহীন পৌরাণিক কল্প-কাহিনী মাত্র। জাহিলিয়াত মানব প্রকৃতি যথার্থভাবে জানতে ও অনুধাবন করতে পারেনি বলেই তা ঘটেছে।

 

ইতিহাসের এমন কোনো অধ্যায়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না, যখন এই ব্যক্তিগত মালিকানা প্রচলিত ছিল না। কিন্তু কেবল তাই বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার মৌল কারণ নয়, তা হতেও পারে না। যখন তা পড়েছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থায়, তখন সেটিকে কল্যাণের দিকে চালিত করলে তা হতো অতীব কল্যাণকর উপকরণ। কর্মতৎপরতা ও অগ্রগতি উন্নতি সাধিত হতো জীবনের সর্বক্ষেত্রে। অবশ্য তা তখন খারাপ দিকেও নিয়ে যাওয়া যেত আর তাই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে আজ তা ধ্বংস, বক্রতা চূড়ান্ত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ব্যক্তিগত মালিকানাই নিশ্চিত অনিবার্য হিসেবে সামন্তবাদ বা পুঁজিবাদের সৃষ্টি করেনি (পূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলা হয়েছে)। কামনা বাসনা লালসাই তার আসল উদ্ভাবক। এই কামনা-বাসনা লালসাই মানুষকে দাসানুদাস বানানোর জন্যে মালিকানাকে উপায় হিসেবে অবলম্বন করেছে। মানুষের ওপর নিজের প্রাধান্য ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছে। গৌরব-অহংকার করেছে। আর তারই মধ্যে নিহিত রয়েছে মানুসের বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার মৌল কারণ। আর তা সেই প্রাচীনতম কাল থেকেই।

 

পরে মার্কসীয় জাহিলিয়াত ব্যক্তিমালিকানা অধিকার চূড়ান্তভাবে হরণ করেছে, হরণ করেছে অত্যন্ত ভুলভাবে এই কথা মনে করে যে, বিপর্যয়ের কারণটা বুঝি ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে। তা মানুষের নিজের মধ্যে নেই, যে মানুষ জাহিলিয়াতের ইউরোপে তখন বাস করত। …অতঃপর বিগত অর্ধ শতাব্দীরও বেশিকাল সময়ের এই অভিজ্ঞতার বাস্তব ফল কি পাওয়া গেছে, কি হয়েছে তার পরিণতি?

 

ব্যক্তিমালিকানা হরণ করে মার্কসীয় জাহিলিয়াত কি কর্তৃত্ব লাভের স্বভাবগত কামনা-বাসনা-লালসাকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে?

 

…আমরা বললে তো দোষ হয়। তাই এ বিষয়ে আমাদের কথা বলা উচিত নয়। এ বিষয়ে মার্কসীয় জাহিলিয়াতের বড় পাণ্ডা ক্রুশ্চেভই আসল কথা বলে দিয়েছেন। ক্রুশ্চেভের পূর্বসূরির মৃত্যুর পর সে তার সম্পর্কে মুখ খুলতে সাহস পেয়েছিল। অবশ্য তখন সে ক্ষমতাসীন ছিল বলেছিল –সে ছিল অপরাধী, রক্তপাতকারী, খুনী, ইতিহাসের বীভৎস চরিত্রের এক স্বৈরাচারী।

 

এই কথা বলা হচ্ছে এমন সময়, যখন ব্যক্তিগত মালিকানা বলতে কোনো নাম চিহ্নও কোথাও নেই। সব কেড়ে কুড়ে নেওয়া হয়েছে। …কিন্তু আল্লাহর পথে না হলো এই জাহিলী মানুষের প্রকৃতিতে নিহিত বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতা পুরোপুরি রয়ে গেছে। তা বিলুপ্ত করার জন্যে কোনো পদক্ষেই গ্রহণ করা হয়নি। সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করা হয়নি। আর এই বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতারই অনিবার্য ফলশ্রুতিতে এই স্বৈরতন্ত্রীর বীভৎসতা সম্ভব হয়েছিল (এ বিষয়ে, ‘রাজনীতিতে বিপর্যয়’ অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করে এসেছি)। এই স্বৈরতন্ত্র মহান নেতা, বন্য অপরাধী, ব্যাপক রক্তপাতকারী দ্বারা অনুষ্ঠিত হোক কিংবা স্বয়ং এই নীতি ও আদর্শের দ্বারাই হোক, তাতে কার্যত তো কোনোই পার্থক্য সূচিত হয় না। কেননা সেখানে মানুষের গোটা সত্তাকেই তো অস্বীকার করা হয়েছে। তাকে করা হয়েছে লাঞ্ছিত, অবমানিত। বিনিময়ে দেওয়ার ওয়াদা করা হয়েছে শুধু এক মুঠো খাবার। তাকে দাসানুদাস বানিয়ে দেওয়া হয়েছে অত্যাচারী নিরংকুশ রাষ্ট্রযন্ত্রের। তারই হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে সমস্ত ক্ষমতা।

 

এ জাহিলিয়াত নানা বিঘ্নতা ও দোষ-ত্রুটির সমন্বয়।

 

অর্থনৈতিক দিকটাকে মানুষের গোটা সত্তার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মানুষের আসল সত্তাকে করা হয়েছে অস্বীকৃত। মানবীয় সত্তা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ভাবধারা সম্পন্নই নয়। তাতে রয়েছে আরও অনেক কল্যাণকামী ভাবধারা। মানুষ তার দেহ, বিবেক ও রূপ এই সব কিছু নিয়েই তো মানুষ। তাতেই নিহিত রয়েছে এই সকল ভাবধারা সমন্বিতভাবে, মানুষ তার পূর্ণ গভীরতা নিয়ে এক মৌল সত্তা।

 

বিপর্যয়ের মৌল উৎস নিহিত রয়েছে মালিকানা লাভের উপায় ও পন্থায়। সবকিছুকে সীমাহীনভাবে ‘মুবাহ’ গণ্য করেই হোক কিংবা পুঁজিবাদ অনুসৃত ভিন্নতর পন্থায়ই হোক অথবা সকল পথ বাতিল করে দিয়েই হোক –যেমন হয়েছে সমাজতন্ত্রের, অন্তত নীতিগতভাবে হলেও। যদিও মানব প্রকৃতির বাস্তবতার চাপে পড়ে মার্কসীয় লেনিনীয় দর্শনের মৌল তত্ত্ব থেকে সরে এসে হলেও কিছুটা ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে, মজুরীর মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে –আর ক্রুশ্চেভের কথানুযায়ী চরম বাস্তব ব্যর্থতা স্বীকারের পর কৃষিক্ষেত্রে ভূমির সামষ্টিক মালিকানাও নিঃশেষ করে দিতে হবে, -তবু এই মালিকানার পন্থার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিপর্যয়ের আসল কারণ।

 

এই বিভ্রান্ত মানবতা যদি নির্ভুল সঠিক পথে ফিরে আসতে রাজি হয়, যদি সংশোধন বা চিকিৎসা করার ইচ্ছা হয় এই কঠিন রোগের, তাহলে উভয় রোগের চিকিৎসা এক সাথে কিছুতেই সম্ভব নয়। আর যে মূল উৎস থেকে এই রোগ বিপর্যয় উৎসারিত, সেই মৌল উৎসের চিকিৎসা ও সংশোধন ব্যতিরেকে উক্ত রোগ দুটির চিকিৎসা কখনোই সফল হতে পারে না।

 

এজন্যে একদিকে মালিকানা লাভের উপায় ও পন্থার চিকিৎসার প্রয়োজন। সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের সততা কখনোই হরণ করা যাবে না। আবার কোনোরূপ সীমা নিয়ন্ত্রণ ব্যতীতই তাকে উন্মুক্তভাবে হলোতে দিতে সেই নির্বুদ্ধিতাও করা যেতে পারে না –যেমন করা হয়েছে পুঁজিবাদে।

 

অপরদিকে মানব জীবনে অর্থনৈতিক স্বভাবসম্মত যে স্থান, মর্যাদা ও গুরুত্ব ঠিক ততটুকু স্বীকা রকরে জীবনটাকে পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। আর তা যদি সত্যিই করা সম্ভব হয় তা হলে মানব জীবনে বস্তুগত ও অর্থনৈতিক কোনো নতুন বিপর্যয় কোনো দিনই দেখা দেবে না। অর্থনীতিকে তার আসল ও সঠিক স্থানে বসাতে হবে। তা হলে তা স্ফীত হয়ে বিপর্যয়ের কারণ ঘটাবে না। তারই পার্শ্বে তার সংরক্ষক –নিয়ন্ত্রক হিসেবে অত্যন্ত জাগ্রত ও তেজস্বী করে তুলতে হবে মানুষের আধ্যাত্মিক সত্তাকে, তার নৈতিক চেতনাকে, হালাল হারাম বোধকে।

 

মূলত মানুষ এমনি এক সমন্বিত গুণাবলী সম্পন্ন বিশেষ সৃষ্টি। ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব মানুষের এই মৌল সত্তাকে অস্বীখার করেছে। তাই মানুষ মানবীয় মর্যাদা থেকে পশুর স্তরে নেমে গেছে। মানবীয় মহৎ গুণাবলী হারিয়ে হিংস্র পশুতে পরিণত হয়েছে।

 

সোজা কথা হচ্ছে, মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে হবে। সমগ্র জীবনকে পুনর্গঠিত করতে হবে আল্লাহর দেওয়া বিধান –পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ভিত্তিতে।

 

 

সামাজিক বিপর্যয়

 

সমাজবিদ্যার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ব্যক্তি ও সমষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক।

 

আধুনিক জাহিলিয়াত যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, তেমনি ব্যক্তি ও সমষ্টির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতাদর্শ নির্ধারণেও মারাত্মক বিপর্যয় ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর বাস্তবায়নেও কোনো শৃঙ্খলা ও নিয়ম রক্ষিত হয়নি। তার কারণ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ প্রকৃতপক্ষে পরস্পর গভীরভাবে জড়িত। একটিকে অন্যটি থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করা যায় না।

 

পূর্বের আলোচনায় আমরা অর্থনীতি ও রাজনীতির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখে এসেছি। এক্ষণে সমাজের সাথে এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ আলোচনা নিশ্চয়ই বস্তুবাদী জাহিলিয়াতের দৃষ্টিকোণ দিয়ে হবে না। বরং তার ভিত্তি হবে এই যে, অর্থনীতি এক দিক যেমন সমাজ গঠন করে, তেমনি অপরদিক দিয়ে রাজনীতি ও সমাজ গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, এই সব কিছু মানব সত্তার বাহ্যিক প্রকাশ ও প্রপঞ্চ মাত্র। সুসংবদ্ধ সত্তারই বিভিন্ন দিক। আর সে সত্তা হচ্ছে মানুষ।–[(আরবী***************) এর (আরবী*********) অধ্যায় দ্রষ্টব্য।]

 

ব্যক্তি ও সমাজ সমষ্টির সম্পর্কে সম্পর্কিত ধারণার ক্ষেত্রে আধুনিক জাহিলিয়াত যে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে সে দিকে ইতিপূর্বে ইঙ্গিত করেছি –তা আসলে মূল মানুষ বা মনুষ্যত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণা গ্রহণেরই ফলশ্রুতি। আর মানুষ বা মনুষ্যত্ব সম্পর্কে ধারণা গ্রহণে বর্তমান যুগের জাহিলিয়াত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আর এ ভারসাম্য হারানোর একমাত্র কারণ হচ্ছে আল্লাহর বিধান ও প্রদর্শিত পথ থেকে বিভ্রান্তি বা বিপথগামিতা।

 

ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে আধুনিক জাহিলিয়াতের ধারণা হচ্ছেঃ

 

ব্যক্তির গুরুত্ব স্বীকার করে যে সমাজ সংস্থা গড়ে ওঠে, সেই সমাজের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, তা ব্যক্তিকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে, ব্যক্তির গুরুত্বে যথেষ্ট বাড়াবাড়ি করে এবং ব্যক্তির সত্তাকে সীমাহীনভাবে মহান পবিত্র জানিয়ে দেয়। জনমনে এই ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, তাকে কেউ স্পর্শও করতে পারে না। তার মনে যা-ই জাগে তা-ই সে করে। আর এই ইচ্ছার কোনো সীমা নেই। যে-কোন ভাবেই হোক, তার ইচ্ছাই কার্যকর হয়, সে যেমন চায় তেমনি চিন্তা-বিশ্বাস, চরিত্র ও রীতিনীতি গ্রহণ করতে পারে। সমাজের কোনো অধিকার নেই তার পথে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার। সমাজ তার কোনো কাজকে বলতে পারবে না এটা ভুল কিংবা এটা ঠিক। সমাজ কি? ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব বা মুরুব্বীগিরি করার তার কি অধিকার থাকতে পারে?

 

এখানে ব্যক্তি ‘খোদা’ হয়ে বসেছে। আর এ কারণেই প্রত্যেক ব্যক্তিখোদা যা ইচ্ছা হয় তাই করে। এই সকল ‘খোদা’র জন্যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদার, উন্মুক্ত এবং তাদের অনস্বীকার্য অধিকার।

 

পক্ষান্তরে  সমাজের সর্বাধিক গুরুত্ব স্বীকার করে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা সমাজকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনে স্বাভাবিকতার সীমা লংঘন করে অনেক দূরে চলে যায়। এখানে সমাজ যেমন এক পবিত্র দেবতা। ব্যক্তির জন্যে এখানে কোনো পবিত্রতা নেই, গুরুত্ব নেই, নেই কোনো অধিকার ও মর্যাদা। কোনো জিনিসের মালিক হওয়ারও তার অধিকার নেই। তার নিজের চিন্তা-মর্যাদা। কোনো জিনিসের মালিক হওয়ারও তার অধিকার নেই। তার নিজের চিন্তা-বিশ্বাস, নৈতিকতা ও রীতিনীতি নির্ধারণ ও অনুসরণ করার অধিকারও স্বীকৃত নয়, কোনো ব্যক্তি সমাজ সমষ্টির কোনো কাজের ওপর প্রশ্ন তুলতে বা আপত্তি জানাতে পারে না। তার কোনো কাজ মন্দ তো বলতেই পারে না, পারে না ভালো ও সঠিক বলতেও। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তি কি, কে ব্যক্তি? …তার কি অধিকার থাকতে পারে সমাজের ওপর কোনোরূপ মাতব্বরী করার?

 

এখানে সমাজ যেতন এক মহাদেবতা। ফলে যা-ই ইচ্ছা তা-ই করারই তার অধিকার রয়েছে এবং করেও। আর ব্যক্তি নিতান্তই দাসানুদাস।

 

উক্ত দুই প্রকারের প্রতিটিই বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে বলিষ্ঠ কণ্ঠে দাবি করছে।

 

কিন্তু তা যে নিতান্তই ভুল, ভুল বিজ্ঞানের ভিত্তি, আর সবচেয়ে বড়  প্রমাণ হচ্ছে, উক্ত দুটি সমাজ ব্যবস্থাই পরস্পর বিরোধী। একটির বিপরীতমুখী অপরটি। এ দুটি ব্যবস্থার মধ্যে কোনো মিলমিশ –কোন সন্ধি-সমঝোতা কখনোই হতে পারে না। তাহলে একই সময় এ দুটিই কি করে সঠিক ও যথার্থ হতে পারে; -হয় এর যে-কোনো একটা কিংবা এর দুটিই অবশ্যই ভুল হবে। …আর এ-ই হচ্ছে আসল সত্য কথা।

 

ব্যক্তির পবিত্রতা পৌরাণিক ধারণা গড়ে উঠেছে সেই বিবর্তন ও অগ্রগতি থেকে, যা ইউরোপ রেনেসাঁর সময় থেকে অর্জন করেছে।

 

মধ্যযুগের জাহিলিয়াতে ইউরোপীয় জনগণ কঠিন চাপের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল, সে চাপ ছিল অত্যন্ত খারাপ ধরনের, যা প্রত্যেক মানব সত্তাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। জনগণ জুলুম-নিপীড়নের তলায় পড়ে আর্তনাদ করে উঠেছিল। একদিকে জনগণের কাঁধের ওপর গীর্জা ও ধর্মীয় লোকদের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের জোয়ার চেপে বসেছিল। তখন সাধারণ মানুষের সরাসরিভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কোনো অধিকার ছিল না। পাদ্রী-পুরোহিতদের মধ্যস্থতা ছিল একান্তই অপরিহার্য। এই পাদ্রী-পুরোহিতদের সুপারিশ ছাড়া কারোর ক্ষমতা পাওয়াও সম্ভব ছিল না। কেউ যদি আল্লাহর কাছে স্বীয় গুনাহ-খাতার স্বীকারোক্তি করতে প্রস্তুত হয়, তারলে খোদ পাদ্রীর সম্মুখে নিজের গুনাহকে স্বীকার করাই ছিল তার জন্যে একমাত্র উপায়। মোটকথা মানুষ ব্যক্তিগতভাবে কোনোরূপ মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কথা ভাবতেও পারত না।

 

অপরদিকে রাজন্যবর্গ ও লর্ডদর প্রভুত্ব ও প্রাধান্য জনগণের মাথার ওপর সওয়ার হয়ে বসেছিল। এই রাজন্যবর্গই ছিল সমাজের সব চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ লোক। আর তাদের সমস্ত চাপ ছিল জনসাধারণের ওপর। অথচ সেই জনগণের না ছিল কোনো অধিকার, না মর্যাদা, তবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে কত ছিল তা হিসেব করেও শেষ করা যায় না।

 

এই সমাজে ব্যক্তির কোনো গুরুত্ব নেই। প্রকৃতপক্ষে সে কোনো কিছুর মালিক নয়, সামন্তই হচ্ছে সব কিছুর একচ্ছত্র মালিক ও মুখতার। ব্যক্তি সাধারণভাবে সরাসরি কোনো পারস্পরিক কার্যক্রম গ্রহণ করারও অধিকারী নয়। রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনেরও কোনো অধিকার নেই তার। রাষ্ট্র তো তাকে চিনে-ই না, চিনলেও তা চিনে সামন্তের মাধ্যমে, সেই তাকে অগ্রসর করতে পারে, পারে পিছনে ফেলে রাখতেও। পারে সমাজে তার জন্যে একটা মর্যাদা গড়ে তুলতে, পারে তার অস্তিত্বকেই বিলীন করে দিতে। এ কারণেই সামন্ত ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মাঝখানে সম্পর্কের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক যেমন পাদ্রী ও পুরোহিতরা ব্যক্তি ও খোদার মধ্যকার সম্পর্ক স্থাপনে একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

এখানে ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক অধিকারই নেই, জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই কোনোরূপ সুবিচার পাওয়ার …মোটকথা কোনো ধরনের কোনো নিরাপত্তা পাওয়ারও তার অধিকার নেই।

 

উপরন্তু মূল সমান্ত ব্যবস্থাই তার জাহিলিয়াতের রূপ পরিগ্রহ করেছিল ইউরোপে। তা ব্যক্তিত্বের ওপর কিছুমাত্র নির্ভরশীল ছিল না। সামন্ত ব্যবস্থার সব কিছু কেবলমাত্র সামন্তকে কেন্দ্র করেই সামন্ত ব্যক্তিই সেখানকার সর্বেসর্বা। এই ব্যবস্থায় সমস্ত গুরুত্ব ছিল সামন্তবাদভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার ওপর। ব্যক্তির কোনো স্বাতন্ত্র্যই স্বীকৃত ছিল না তথায়। এই সমাজের সাংগঠনিক অবস্থা ছিল স্থায়ী, স্থবির। কোনোরূপ পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই উঠত না সাধারণভাবে। চাষের জমি-কেন্দ্রিক জীবন সেখানে সম্পূর্ণ স্থির, নিস্তব্ধ,গতিহীন, পুঁতিগন্ধময়। শত শত বছর অতীত হয়ে যেত, কিন্তু তথায় জীবন যাত্রায় এক বিন্দু পরিবর্তনও আসত না। ব্যক্তি আসত ব্যক্তি চলে যেত। মনে হত, কেউ আসেও নি, কেউ যায়ও নি। ফলে ব্যক্তি তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন হতে পারত না, তার যে কোনো অস্তিত্ব আছে, সে বেঁচে আছে, তা বুঝবারও কোনো কারণ ঘটত না। তা চালু করার রীতি নিয়মের বন্ধনে জনগণকে আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলত। সে রীতি নিয়মের বন্ধনে বাঁধা হলে তাদের ব্যক্তিত্ব স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট হয়ে উঠবে এমন কোনো বিশ্বাসও তাদের ছিল না। রীতি-নিয়ম তাদের হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে চলত। ঠিক যেমন কলুর বলদ নিজেরই চতুষ্পার্শ্বে ঘুরে বেড়ানোর কাজে চব্বিশ ঘন্টা বন্দী হয়ে থাকে।

 

ইউরোপের ক্রুসেড যুদ্ধ এবং মাগরিব ও আন্দালুসিয়া (স্পেন)-এর জ্ঞান কেন্দ্রসমূহের মাধ্যমে যখন ইউরোপের নিষ্প্রাণ তুহিন হিমদেহে নব জীবনের সঞ্চার হয়েছিল। জনগণের কাঁধে আবহমান কাল থেকে চেপে থাকা সমস্ত দুর্বহ বোঝা ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছিল। সর্বপ্রথম তারা গীর্জার জগদ্দল পাথরকেই সরিয়ে নামিয়ে নিক্ষেপ করল। আর সেই সাথে নেমে গেল পাদ্রী পুরোহিতদের গোলামী লাঞ্ছিত জোয়াল।

 

তখন তারা গীর্জার দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিল প্রকৃতি পূজার আর এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে। প্রকৃতি হয়ে পড়েছিল তাদের জবরদস্ত দেবতা, তারই নামে –তারই দোহাই দিয়ে মানুষ মানুষের ওপর দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন ও কর্তৃত্ব চালায়। এই নূতন দাসত্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উপাসক ও উপাস্য –দাস ও মনিব পরস্পরের সাথে সরাসরি কোনোরূপ মাধ্যম ছাড়াই মিলিত হওয়ার সুযোগ পেল।

 

আমরা এখানে ইতিহাসের কতিপয় ঘটনার উল্লেখ করছি মাত্র। ইতিহাসের ঘটনাবলীর ‘সাফাই’ পেশ করার উদ্দেশ্যে নয়। গীর্জার দাসত্ব থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পর প্রকৃতি পূজার অর্থহীন শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে পড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি পেশ করারও কোনো উদ্দেশ্যই আমাদের নেই। পলায়ন ও বিভ্রান্তি নিতান্তই মানসিক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এর পক্ষে কোনো যুক্তিই পেশ করা যায় না। অবশ্য গীর্জার ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব প্রতিপত্তি দূর করা ও তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া কালে জনগণের জন্যে একটা বিরাট ও সুবর্ণ সুযোগ ছিল মহান আল্লাহর ইবাদত কবুল করার। খুব সহজেই তা তারা পারত। কিন্তু তা না করে তারা নতুন কিছু দেবতা উপাস্য বানিয়ে নিল, যা ক্ষয়িষ্ণু, বিলীয়মান, সত্তাহীন এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা সেই গুলোরই উপাসনা-আরাধনা আর দাসত্ব করতে শুরু করেছিল।

 

অতঃপর তারা সামন্তবাদী ব্যবস্থার অভিজাত শ্রেণীর প্রভুত্ব কর্তৃত্বের বোঝাও দূরে নিক্ষেপ করার ও তার শৃঙ্খল থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সুযোগও পেয়ে গেল।

 

ফরাসী বিপ্লব ছিল এই পরিবর্তন সৃষ্টি প্রধান হোতা। তা জমির মালিকানা ও সামন্ত সমাজের অভিজাত শ্রেণীর শৃঙ্খল চূর্ণবিচূর্ণ ও ছিন্ন ভিন্ন করে দিল ইউরোপীয় বা ফ্রান্সের নিজস্ব পদ্ধতিতে। কেননা তা-ই বিপুল জনতাকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করে রেখেছিল।

 

অতঃপর ব্যক্তি কিছুটা চেতনা লাভ করতে পারল। সচেতন হলো তার স্বাতন্ত্র সম্পর্কে। কিন্তু এই জাহিলিয়াতই তাকে আল্লাহর সাথে পরিচিত হতে দিল না। ফলে এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চেতনাটা আল্লাহর হেদায়েত লাভ করতে অক্ষম থেকে গেল। পাদ্রী পুরোহিতদের মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার কোনো চেষ্টাই তারা করেনি। তারা একতরফাভাবে গীর্জা ও গীর্জার খোদা উভয় থেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

 

তারা সমাজের পুরাতন পচা-দুর্গন্ধময় রীতি নিয়মকে ছাটাই বাছাই করে দূরে নিক্ষেপ করে উত্তম ও  পবিত্র আদর্শ রীতিনীতি গ্রহণ করার এবং এই পথে এক আদর্শবিশিষ্ট ব্যক্তিসত্তা গড়ে তুলতে আদৌ ইচ্ছা করেনি, সেজন্যে কোনো চেষ্টাও চালায়নি। তারা বরং রীতিনীতি ঐতিহ্য নামে চরিত্র সমষ্টির যা কিছু পেয়েছে, সবকিছুই নষ্ট ও অকেজো মনে করে দূরে নিক্ষেপ করেছে।

 

এটা ছিল রীতিমত একটা পাগলামী। এই ভাঙ্গাচোড়ায় ব্যক্তি কোনো বুদ্ধিমত্তারই পরিচয় দিতে পারেনি। মাথার উপরের সব বোঝা থেকেই নিষ্কৃতি পাওয়ার নামে তারা ভালো মন্দ নির্বিশেষে সব কিছুই দূরে নিক্ষেপ করে দিল।

 

অতঃপর এলো শিল্প বিপ্লবের যুগ। তা সমাজ সংস্থার গোটা প্রাসাদের অবশিষ্ট ভিত্তিটিকেও চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল।

 

শিল্প বিপ্লব সমাজ সংস্থায় পূর্ণমাত্রায় পরিবর্তন নিয়ে এলো। সবকিছুতেই পরিবর্তন। সমাজকে নবতর ভিত্তিতে গড়ে তুলতে শুরু করে দিল। …মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলায় শ্রমিক কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 

শ্রমিক কর্মচারীরা গ্রাম থেকে ব্যক্তিগতভাবেই ছুটে চলে এসেছিল কল-কারখানায় কাজ করার –শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন করার –উদ্দেশ্যে। তারা পরস্পর পরিচিত ছিল না, ছিল না তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক, কোনো যোগাযোগ। শহর-নগর শিল্প-কেন্দ্রে এসেও তারা বিচ্ছিন্ন ভাবেই বসবাস ও জীবন যাপন করতে লাগল। কেবল শ্রম-কেন্দ্রসমূহেই তারা পরস্পরের সাক্ষাৎ পেত, পরস্পরের সাথে মিলিত  হওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু গ্রামে কৃষক ও ভাইদের পরস্পরের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এখানে তা গড়ে উঠল না। গ্রামে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই পরস্পরের পরিচিত ও সম্পর্কশীল হয়ে থাকত। নৈকট্য-নিকটবর্তিতা, আত্মীয়তা ও পাশাপাশি কাছাকাছি বসবাসের কারণে একটা স্থায়ী মিলমিশ ও সম্পর্ক সম্বন্ধ গড়ে উঠত। এমন সব রীতিনীতি ঐতিহ্যও সেখানে চালু হয়ে থাকত, যা অন্তরের দিক দিয়ে অভিন্ন সত্তায় পরিণত করে দিত। চিন্তা-ভাবনায় ও রীতিনীতি রেওয়াজে তারা পরস্পর সুপরিচিতি হয়ে থাকত।

 

কিন্তু শিল্প-বিপ্লবের পর তারা গ্রামাঞ্চল ত্যাগ করে কল-কারখানার দেশে এসে বিচ্ছিন্ন একাকী পরিবার পরিজনবিহীন অবস্থায় পড়ে গেল। প্রথম পর্যায়ে যে সব শ্রমিক গ্রাম ত্যাগ করে শহরাঞ্চলে যেতে পেরেছিল, তাদের সঙ্গে তাদের পরিবার পরিজন না থাকায় তারা নিশ্চিত জীবন যাপন করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত চিল। তারা শুন্য গর্ভ পরিবেশে দিন কাটাতে লাগল। এদের অধিকাংশই ছিল যুবক, অবিবাহিত। বৈবাহিক সম্বন্ধে তারা তখনও বন্দী হয়নি। কোনো রূপ বৈবাহিক দায়িত্বও তাদের স্কন্ধে পড়েনি।

 

এভাবে শহরাঞ্চলে এসে প্রত্যেক শ্রমিকই তার একাকীত্বে নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে চেতনা লাভ করেছিল। সামাজিক সম্পর্কশীলতা সম্পর্কে এখানে তাহা কোনো চেতনা বা অনুভূতিই পায়নি।

 

এই অবিবাহিত যুবক শ্রমিকদের সাথে কাজে যোগ দিয়েছিল অসংখ্য মেয়েলোকও। তারাও এই একাকীত্বের দুর্বহ চাপে জর্জরিত হচ্ছিল। এই সব মেয়েরা ইতিপূর্বে যথেষ্ট উপেক্ষা ভোগ করে এসেছে। তাদের অস্তিত্ব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা বলতে কোনো কিছুর সাথে পরিচিত হওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি। নিছক অধীন অনুসারী ব্যক্তিজীবন ছিল তাদের। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও চিন্তাগতভাবে তারা একটা ভিন্ন ধরনের জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল। তারা তাদের নিজস্ব ব্যাপারাদি নিয়ে ও নিজস্বভাবে চিন্তা করার অধিকার বা সুযোগ পায়নি। তাদের জন্যে যা কিছু ভাবনা চিন্তার ব্যাপার ছিল, তা করতে তাদের পিতামাতা, বড় ভাই-বোন বা তাদের স্বামীরা, তারা সমাজ নিয়েও মাথা ঘামাত না। বৃহত্তর সমাজের সাথে তাদের কি সম্পর্ক? সমাজের প্রতি তাদের কি কর্তব্য দায়িত্ব বা সমাজের ওপরই বা তাদের কি অধিকার? এ সব জটিল বিষয়ে তারা কখনোই চিন্তা করেনি, চিন্তা করার কোনো প্রয়োজনও তারা বোধ করেনি। যদিও কখনও কিছু চিন্তা করতেও, তবে তা করত তাদের স্বামীর চিন্তাধারা অনুযায়ী। কেননা স্বামীই তাদের কাছে সমস্ত তৈরী করা দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে আসত। সে সব জিনিস প্রস্তুত করতে স্ত্রীলোকের কিচুই করতে হতো না। তাছাড়া পূর্ববর্তী সমাজে নারী স্বতন্ত্রভাবে কোনো কিছুর মালিক হতো না, কোনো কিছুতে নিজস্বভাবে কোনো হস্তক্ষেপও করত না। পুরুষই হত সব কিছুর মালিক। যা চাইত স্বামী তাই করত। চলতি প্রথা অনুযায়ী চলতো নারীর জীবন। আর চলতি নিয়মের বাধ্যবাধকতা পুরুষের তুলনায় মেয়েদের ওপরই আরোপ হতো অনেক বেশী। পুরুষ হতো সম্পূর্ণ স্বাধীন। নারী না বুঝে শুনেই অন্ধবাবে সামাজিক নিয়ম নীতি মেনে চলত। আর নিতান্ত ভাগ্যলিপি মনে করেই যেমন তেমন ভাবে জীবনটা অতিবাহিত করে দিত।

 

কিন্তু এই নারী যখন সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় শ্রম করতে শুরু করেছিল, তখন তার মনে মগজে বিরাট বিপ্লব ও আমূল পরিবর্তন সূচিত হলো।

 

এক্ষণে তার হাতে অর্থ এসে গেল। স্বোপার্জিত অর্থ সম্পদের সে হলো মালিক। এ মালিকানা প্রত্যক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত। যা ইচ্ছায় আসে তাই করতে সে হলো পূর্ণ মাত্রায় সক্ষম।

 

এখন সমাজ সমষ্টির সাথে তার কার্যক্রমের সম্পর্ক স্থাপিত হলো একান্তই ব্যক্তিগত এবং প্রত্যক্ষভাবে। শিল্প কারখানার অভ্যন্তরে, ব্যবসায় কেন্দ্রে ও রাস্তাঘাটে –সর্বত্রই সে এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন।

 

পুরুষদের সাথেও এই স্বাধীনতা নারীর কার্যক্রম সম্পর্ক সরাসরিভাবেই স্থাপিত হলো। যদিও এ সম্পর্কে তারা পুরুষদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াল না। অত্যন্ত তাতে নিতান্তই অধীন অনুসারী ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যহীন হয়ে দেখা দিল না। তারা স্বাতন্ত্র্য সত্তা লাভ করে পুরুষদের সমান কাতারে এসে কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো।

 

এইসব ক্ষেত্রের কোনো স্থানেই তারা নিজেদেরকে অস্বিত্বহীন মনে করল না। তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য পুরাপুরিভাবে বিকশিত ও অনস্বীকার্য হয়ে উঠল।

 

অল্প বয়সের বালকরাও এই অবস্থার মধ্যেই এসে গেল। তারাও ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ করল। এই বাচ্চা বয়সের লোকেরাও হয়ে ওঠল এক একজন ব্যক্তি। তারা তাদের বাচ্চা বয়স থেকেই মাথার ঘাম ফেলে স্বাধীনভাবে উপার্জন করতে লাগল। যদিও তাদের উপার্জনের পরিমাণ হতো খুবই সামান্য। এই যুবক, নারী ও বালক-বালিকা সকলেই স্বাধীন স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা লাভ করেছিল। প্রত্যেকেই এক একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।

 

কিন্তু এই ব্যক্তিবাদ ভয়ংকরভাবে বিপথগামী হয়ে গেল। ডেকে আনল মারাত্মক ধরনের পরিণতি।

 

এটাও কোনো স্বাভাবিক ও নিশ্চিত অনিবার্য ব্যাপার ছিল না। এই স্বতন্ত্র মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিসত্তাগুলোর বিভ্রান্ত-বিপথগামী হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল না। তারা তো সুস্থ মানব সমাজেরই এক-একটি অংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে বিপথগামী হয়ে পড়ল। কেননা তার জন্মই হয়েছে জাহিলিয়াতের অন্ধকারে, যা আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক দূরে সরে গেছে। তা ছাড়া বহু যুগ ও শতাব্দী কাল ধরে সামন্তবাদী ব্যবস্থা যে ব্যক্তিসত্তা গড়ে তুলেছিল, হঠাৎ করে তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া দেখা দিল অত্যন্ত রুঢ়, ভারসাম্যহীন হয়ে।

 

এ সব লোক তাদের মুক্ত স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার একাকীত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে শুরু করল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত অসমান পথে। তারা এমন পথের সাক্ষাৎ পেল না, যা তাদের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের অনুভুতিসহ একটা ভারসাম্য দিতে পারত তাদের ন্যায্যা অধিকার, অনুসরণ এবং স্বাধীনতা ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা পালনসহ।

 

পরবর্তীতে এই নতুন শহর-নগরের অধিবাসীরা ধীরে ধীরে এমন একটি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হল, যার সাথে দ্বীন-ধর্ম-নৈতিকতা ও ঐতিহ্য বলতে কিছুই থাকল না। তারা হলো এই সব কিছু থেকে মুক্ত ও সম্পর্কহীন। যেহেতু তারা গ্রামাঞ্চলের রুগ্ন শুষ্ক বিচ্ছিন্ন জীবন ধারা থেকে সহসাই মুক্ত হয়ে নাগরিকত্বের উন্মুক্ত ও বাধা বন্ধনহীন জীবন ধারার চোখ ঝলসানো চাকচিক্যের মধ্যে এসে পড়েছিল। আর তাতে দ্বীন-ধর্ম থেকে ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্নতা হতে হতে তা একটা স্থায়ী অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখানে তারা মানুষ সম্পর্কে একটা নবতর ব্যাখ্যাও লাভ করল, যার দৃষ্টিতে মানুষ মানুষ থাকল না, পশু হয়ে গেল। ডারউইন এই ভ্রান্ত ধারণা জনগণের মনে বদ্ধমূল করিয়ে দিয়েছিল। এখানে তারা ফ্রয়পের কাছ থেকে যৌন সম্পর্কের নবতর ব্যাখ্যাও জানতে পারল, তারা ছিল প্রবল শৃঙ্খলমুক্ত যৌবন শক্তির অধিকারী। যৌবনের নবজোয়ার বাঁধভাঙ্গা, দুকুল ছাপিয়ে দেওয়া জোয়ারের উন্মাত্ততা সকলের মনে ও দেহে মহাউল্লাসেরও সৃষ্টি করেছিল। তাদের কেউ পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না যদিও পারিবারিক বন্ধনে তাদেরকে পাপ পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখতে পারত। ফলে এই স্বতন্ত্র স্বাধীন ব্যক্তিসত্তাগুলো অবাধ-অনিয়ন্ত্রিত যৌন চর্চায় মশগুল হয়ে গেল। শহর নগরে গড়ে উঠল যৌন ব্যবসার বড় বড় আড্ডা।

 

ওদিকে নারীরাও ক্রমাগতভাবে পূর্ণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অধিকারী ছিল। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য তাদেরকে চরম বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার গড্ডালিকা প্রবাহে নিক্ষেপ করল। এক্ষণে তারা সত্তা-স্বাতন্ত্র্যহীন অবস্থা থেকে মুক্ত। সকল ব্যাপারেই তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত। এই রূপ অবস্থায়ই তারা তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে সকল বাধা বন্ধনকেই ছিন্ন ভিন্ন করে দেওয়ার সংগ্রামে নেমে গেল।

 

সে বন্ধন ভালো ছিল কি মন্দ ছিল, তার কোনো বিচার বিবেচনাই তারা করেনি। তারা সেই সাথে ধর্ম, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যও ধ্বংস করে দিতে লেগে গেল। কেননা সে সবগুলোই তাদের বর্তশান মুক্ত স্বাধীন জীবনের পথে প্রবল বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে এজন্যে যে, পুরুষরা সেগুলোকে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছিল, যেন নারীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে না পারে। যদিও পুরুষরা নিজেরা সকল প্রকারের ধর্ম ও নৈতিকতার বন্ধন থেকে আগেই সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে বসেছিল।

 

পরে পুরুষ যখন স্ত্রীলোকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করাও ত্যাগ করল, মেয়েরা বাধ্য হলো কর্মক্ষেত্রে বের হয়ে আসতে, তখন তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নৈতিকতাকে এমন একটা প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখতে পেল, যা তাদের স্বাধীন উপার্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, পুরুষরা জাহিলী ধারণানুযাযী আদতেই পশুত্ব গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের কাছে থেকেই শ্রমোপার্জন করছিল। কিন্তু তারা মেয়েদেরকে কাজ করার সুযোগ দিতে রাজি হতো তখন, যখন তারা এই পুরুষদের সেই দাবি পূরণে প্রস্তুত হতো, যে দাবি পুরুস পশু নারী পশুর কাছে করে থাকে। -তাছাড়া তারা নিজেরাও পুরুষদের সাথে পূর্ণ সাম্য ও সমকক্ষতারও দাবি করে আসছিল। সে সমকক্ষতার দাবি প্রথমে ছির শুধু মজুরীর ব্যাপারে। পরে তা এলো সর্ববিষয়ে, সর্বক্ষেত্রে। আর এই সমকক্ষতাই এই নারী ও পুরুষ সকলকেই চরম যৌন উচ্ছৃঙ্খলতার রসাতলে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

 

এই নারী ও পুরুষের বর্তমান মনোভাবের পিছনে কাজ করছিল সেই ষড়যন্ত্রকারী ইহুদীদের মতাদর্শ, যার চরম লক্ষ্য ছিল উম্মী জনসাধারণকে চরমভাবে ধ্বংস করা। সে ছিল কার্ল মার্কসের চিন্তাধারা, ফ্রয়ড ও দরখায়েম-এর চিন্তাধারা। আর তা হচ্ছে এই যে, নৈতিকতা নিছক একটা প্রতিবন্ধকতা মাত্র। আসলে তার কোনো অর্থ নেই, তাৎপর্য নেই। যৌনতা তো মানুষের অস্তিত্বের সাথে অংগীভূত, তাকে কোনো ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। আর নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাই হচ্ছে অবাধ যৌনতার একমাত্র পথ।–[(আরবী***************) দ্রষ্টব্য।]

 

অতঃপর সব বাঁধনবন্ধন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। রসাতলে ভেসে গেল সব নারী পুরুষ। গোটা সমাজ পড়ে গেল পংকিলতার সীমাহীন সুগভীর আবর্তে।

 

এর ফলে সমাজের বন্ধনও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। পারিবারিক বন্ধন বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। এখানে যৌন সম্পর্কই হলো মানুষে মানুষে নারী ও পুরুষে একমাত্র সম্পর্ক। নৈতিকতার কথা বাদ দিলেও এই যৌনতার সম্পর্ক নারী ও পুরুষকে প্রেম-ভালোবাসার বন্ধনে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেঁধে একত্র করে রাখতে পারল না। থাকল না কোনো সম্মিলিত ও অভিন্ন নিয়ম-নীতি, ঐতিহ্য। মুহুর্তের মধ্যে নিঃশেষিত হওয়া দৈহিক সম্পর্কই প্রধান হয়ে দাঁড়াল। পাশবিক প্রবৃত্তির চরিতার্থতার পরই তা ছিন্ন হয়ে যেতে লাগল। আর দৈহিক কামনার তাগিতে পুরুষের জন্যে তা নিত্যনতুন নারী এবং নারীর জন্যে নিত্য নতুন পুরুষের প্রয়োজন দেখা দিল।

 

নৈতিকতার দিকে দৃষ্টি না দিয়েও প্রেম-ভালোবাসা ও মানসিক বৃত্তিসমূহ রোমান্টিক ব্যাপার রূপে গণ্য হলো। লালসার রোগ –বাস্তবে যারকোনো অস্তিত্ব বা স্থিতি নেই। বাস্তবে থাকল শুধু পাশবিক দৈহিক সম্পর্ক। আর দেহ একটা যৌন কামনা-লালসা সর্বস্ব হয়ে থাকল।

 

ডারউইনীয় জাহিলিয়াতই তাদের মনে এই ধারণার সৃষ্টি করে দিল। ফ্রয়েডের দ্বারা তারই সম্প্রসারণ  সম্পন্ন হল। আর তাদের ছাত্ররা ও সমর্থকরা জীবনের সর্বত্রই এই ধারণাকে ছড়িয়ে দিল।

 

পুরুষ ও নারীর গোটা সত্তাই চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেল। ফলে এই নারী ও পুরুষ সে রকম নারী ও পুরুষ থাকল না, যে রকম মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলা তাদের সৃষ্টি করেছিলেন।

 

পুরুষরা তাদের সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধ হারিয়ে ফেলল। তাদের মনে পরিবারে প্রতি থাকল না কোনো আগ্রহ, আকর্ষণ। অবশিষ্ট হয়ে থাকল শুধু যৌন সংসর্গ। অতঃপর তারা মানুষ না থেকে উৎপাদনের একটা যন্ত্র বা বিরাট যন্ত্রের নিষ্প্রাণ অংশে পরিণত হল। চিন্তা করার অনুভূতি লাভের শক্তিও হারিয়ে ফেলল। প্রতি মুহুর্তে তাদের জীবন অতিহাবিহ হতে থাকল উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন। মানুষের সাথে নিছক মানবিক সম্পর্ক বলতেও কিছু থাকল না। বস্তুগত উৎপাদন তাদের সাথে জীবন্ত সত্তাকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দেয়। তার মধ্যকার প্রাণ স্পন্দনকে স্তব্ধ করে দেয়। কেননা যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাই এমন। তারা যখন এই উৎপাদনের কাজ থেকে অবসর পেত, তখন তাদের দেহে ও মনে জাগ্রত হিংসা পাশবিক প্রবৃত্তির চরিতার্থতা ছাড়া আর কোনো কাজ –কোনো ব্যস্ততাই থাকল না। ফলে তাদের সমগ্র জীবনের একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্যে পরিণত হলো এই দুটি কাজঃ একটি, যান্ত্রিক উৎপাদন আর দ্বিতীয়টি, পাশবিক লালসার চরিতার্থ।

 

এদিকে নারীদের অবস্থাও ভিন্নতর কিছু থাকল না। তারাও ভেতরের দিক চরম বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

 

ডঃ চিনতে শাতী মিসরের ‘আল-আরহাম’ পত্রিকার ‘তৃতীয় লিংগের আত্মপ্রকাশ’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেনঃ

 

আমি এক সপ্তাহকাল ধরে পাঠাগারে পুরাতন আরবী পত্র-পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত ছিলাম। এই শ্রমসাধ্য অধ্যয়নের পর রোববারের ছুটিতে আমি আমার এক বান্ধবীর সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা করলাম। আমার এ বান্ধবী ‘ফীনা’ নগরীর উপকণ্ঠে মহিলা ডাক্তার হিসেবে কাজ করছিল। আমি মনে করেছিলাম, রোববার তো দেখা-সাক্ষাতের উপযুক্ত দিন। কিন্তু আমার বিস্ময়ের কোনো সীমা থাকল না এই দেখে যে, আমার সে বান্ধব, যখন আমার জন্যে দরজা খুলে দিল, তখন তার হাতে ছিল আলু। সে আলুর খোসা ছড়াতে ব্যস্ত ছিল। সে আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে গেল। আমরা সেখানে বসলাম। আমার বান্ধবী আমার বিস্ময়ের ভাব বুঝতে পেরে বললঃ এখন মহিলা ডাক্তার রোববারের ছুটির দিনে রান্নাঘর ঢুকে আছে এই দেখে বোধ হয় তুমি খুবই বিস্মিত হয়ে পড়েছ? আমি হাসতে হাসতে বললামঃ হ্যাঁ, তবে রোববারের দিনে ব্যস্ত থাকাটা তো বুঝলাম, কিন্তু আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি এই দেখে যে, তুমি তোমার শ্রমসাধ্য পেশার কাজ করেও এই রান্নাঘরে আসতে পেরেছ।

 

সে বললঃ কথাটি যদি উল্টিয়ে দিতে, তাহলে সম্ভবত সঠিক কথা হতো। কেননা রোববারে কাজ করাটাই আমাদের সমাজে আশ্চর্যের ব্যাপার। কিন্তু কি করা যাবে। রোববারটাতেই তো অবসর পাওয়া যায়। তারপর রান্নাঘরের কাজ! আসলে আমার ন্যায় অন্যান্য জাতীয় খিদমতের কাজে নিয়োজিত মহিলারা যে মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়েছে, রান্নাঘরে প্রবেশ করা হচ্ছে তারই চিকিৎসা ব্যবস্থা।

 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই মানসিক অস্থিরতার প্রকৃত কারণ কি? অথচ সামষ্টিক জীবন পুরোপুরি পাশ্চাত্যের নারীর মন-মেজাজের সাথে সামঞ্জস্যশীল!

 

বলতে লাগলঃ আধুনিক প্রাচ্যা নারীর নতুন দায়িত্বের সাথে এই মানসিক অস্থিরতার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এ তো আসন্ন মানসিক বিপ্লবের প্রতিধ্বনি মাত্র। সমাজ বিজ্ঞানী, ফিজিয়লজিস্ট ও জীবতত্ত্ববিদরা বলছেন, নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ঘরের বাইরের জীবনের অংশ গ্রহণকারী মেয়েদের সন্তানাদি খুব কমই হয়। আগে তো মনে করতাম যে, বাইরে যাতায়াতকারী মেয়েরা গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও স্তন দানের ঝামেলায় বুঝি পড়তে চায় না। কেননা এসব ঝামেলায় তাদের কর্মজীবন খুবই  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পরে খুব চিন্তা ভাবনা করে পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখলে জানা গেল, সন্তান সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় মেয়েদের কোনো দায়িত্ব নেই। জন্মহার হ্রাস পাওয়ার কারণ হচ্ছে বন্ধ্যাত্ব। তাও আমার নারীর বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো ত্রটির কারণে হয় না। আসল কথা হচ্ছে, ঘরের বাইরে কর্মব্যস্ত মহিলারা ব্যক্তিসত্তা মা হওয়ার যোগ্যতা পরিহার করে চলেছে এবং বস্তুগত মানসিক ও স্নায়ুবিক দিক দিয়ে মাতৃসুলভ ব্যক্তিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য ও সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের সাথে একত্র হওয়াও নারীর মা হওয়ার যোগ্যতাকে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত করে দিচ্ছে।

 

জীববিজ্ঞানীরা এ পর্যায়ে সুপরিচিত প্রাকৃতিক আইনের বিশেষ মতাদর্শের উল্লেখ করেছে। আর তা হচ্ছে, কাজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টি করে। তার অর্থ হচ্ছে, নারীর মাতৃত্বের কাজ, যা স্ত্রীলোকের বিশেষত্ব হিসেবে মা হওয়ার মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল, এখনকার নারীদের মাতৃত্বসুলভ কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এবং পুরুষদের সংস্পর্শে ঢুকে পড়ার কারণে অনিবার্যভাবে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

এ বিষয়ে বিজ্ঞানীগণ আরও চিন্তা-গবেষণায় রত হলে অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাদের আরও সম্মুখের দিকে নিয়ে গেল। এক্ষণে বিজ্ঞানীগণ খুবই নিশ্চিন্ততা সহকারে বলছে যে, পৃথিবীতে এক তৃতীয় লিঙ্গের আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে। তাতে মেয়েলোকদের মাত্র এমন কয়েকটি বিশেষত্ব অবশিষ্ট থাকবে, যা দীর্ঘ চর্চার কারণে মেয়েদের ব্যক্তিসত্তার সুদৃঢ় হয়ে বসেছে।

 

এই মতের ওপর অনেক ধরনের আপত্তি ও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন এই উঠেছে যে, ঘরের বাইরে অবস্থানকারী বহু সংখ্যক মেয়েলোকই বন্ধ্যাত্বকে অপছন্দ করে। সন্তান কামনা করে (এ সত্য হলে উক্ত মতো সত্য হতে পারে না।)

 

দ্বিতীয় আপত্তি এই তোলা হয়েছে যে, সন্তানসম্ভবা মেয়ে শ্রমিক কর্মচারীকে কাজে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। আর আইনসম্মতভাবেই তারা স্বীয় স্বাভাবিক কর্তব্য পালনের অনুমতি পেয়ে থাকে। তৃতীয় প্রশ্ন এই যে, নারী তার জন্যে নির্দিষ্ট বিশেষ পরিবেশ থেকে বাইরে বরে হয়ে এসেছে খুব বেশী দিন হয়নি –এর মধ্যে বহু কয়েকটি বংশের সৃষ্টি হয়নি। অথচ নারীর মা হওয়ার যোগ্যতা শত সহস্র বৎসর কাল ধরে রয়েছে।

 

প্রথম প্রশ্নের জবাব এই দেওয়া হয়েছে যে, সন্তান পেতে চায় এমন মেয়ে লোকের মনে সন্তান প্রসবজনিত কষ্টের ভীতিটাও সমানভাবে রয়েছে। তা ছাড়া বাচ্চা জন্ম ও লালন-পালন তারকাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

 

দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, নারীর সন্তান প্রসব ও লালন-পালনের অনুমতিদান আইনের কঠিন বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। অনেক শিল্প-মালিকই কাজের জন্যে এমন মেয়েলোক বাছাই করে নেয়, যাদের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

 

তৃতীয় প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে এই বলে, নারীর ঘরের বাইরে চলে যাওয়ার বয়স খুব বেশি দিন হয়নি একথা ঠিক; কিন্তু নারী পুরুষদের সমতা সমকক্ষতা ও সাদৃশ্য গ্রহণে মাত্রাহীন আগ্রহ প্রদর্শন করেছে, তাদের স্নায়ুমণ্ডলীর ওপর দিন-রাত এই চিন্তাই সওয়ার হয়ে রয়েছে এবং তাদের মন-মগজে শক্ত হয়ে বসে আছে, এই কারণে জীবতাত্ত্বিক পরিবর্তনও খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হয়ে পড়বে।

 

বর্তমানে এই বিষয়ে বিশেষ অধ্যয়নকারীরা স্ত্রীলোকদের মধ্যে প্রকাশমান পরিবর্তনসমূহের গভীর পর্যবেক্ষণ করছে, এ বিষয়ে পরিসংখ্যানেরও যাচাই করা হচ্ছে যে, শ্রমজীবী মেয়েলোকদের বন্ধ্যাত্ব, স্তনে দুধ শুকিয়ে যাওয়া ও মা হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলার কারণ সমূহ কি?

 

আলোচ্য সর্বগ্রাসী তুফানের মাঝে যে বালকরা নিজেদের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের অনুভূতি ও চেতনা লাভ করেছে, তারা আসলে মারাত্মক বিপর্যয় ও বিপথগামিতার মধ্যে পড়ে গেছে।

 

যে পরিবারের পুরুষ ও মেয়ে শিল্প কারখানা ও ব্যবসায় কেন্দ্রে কাজের জন্যে ঘরের বাইরে চলে যায়, সেই পরিবারের বাচ্চা-বালকদের জন্যে স্নেহ মমতার আকর্ষন বলতে কিছুই থাকতে পারে না। অথচ তা-ই ছিল এমন জিনিস যা তাদের শক্তভাবে বেঁধে রাখতে পারত, তাদের হৃদয়ে প্রেম-ভালোবাসা-স্নেহ-মমতার বীজ বপন করতে পারত। তাদের চিন্তা ও চেতনা ভারসাম্য রক্ষা করে উন্মোচিত হতে পারত। যৌনতার নিয়ম-কানুন তারা শিখতে পারত। বংশবৃদ্ধির লক্ষ্য যে যৌন সম্পর্ক, তার প্রতি শ্রদ্ধবোধ শেখা দরকার। যৌন লালসা চরিতার্থ করার নামই নয় যৌনতা। তার মাধ্যমেই মানবতার মর্যাদানুরূপ সম্পর্কসমূহ সুদৃঢ় হয়ে ওঠে।

 

পরিবার থেকে মা’র সম্পর্কটা ছিন্ন হয়ে গেলে মানুষের মন-মানসিকতা অনুভূতির সম্পর্কও ছিন্ন হওয়া অবধারিত। তখন ঘরটা একটা হোটেলে পরিণত হয়। তাতে পুরুষ ও নারীর বসবাস করে বটে; কিন্তু পিতা ও মাতা হয় যেন দুইজন বেতনভুক্ত কর্মচারী। একজন পিতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে, অপরজন করে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন। সবকিছুই বাহ্যিক প্রদর্শন মাত্র, ঠিক যেমন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা কাজ করে থাকে। এ দায়িত্ব পালনের সাথে মন ও অন্তরের কোনো সম্পর্ক থাকে না। এ কাজ স্থায়ীভাবে করে যাওয়ারও কোনো আনন্দ কেউ পায় না। এ যেন রুটিনবদ্ধ কাজ। জীবনের ওপর একটা বড় দুর্বহ বোঝা যেন।

 

এরই ফলে সন্তানের বিপথগামিতা অনিবার্য পরিণতি হয়ে দেখা দেয়। তারা ঘরে চাকর বা ধাত্রীর হাতে লালিত পালিত হোক কিংবা কোনো শিশু সদনে আরও বহু পরিত্যক্ত শিশুর সাথে একত্রে লালিত হোক, তাতে মূলগতভাবে কোনোই পার্থক্য হয় না। কেননা এরা সকলেই মা-বাবা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন –পিতামাতার স্নেহ-বাৎসল্য থেকে বঞ্চিত।

 

আলেকসিল ক্যারেল লিখেছেনঃ

 

আধুনিক যুগের সমাজ পরিবার লালন-পালনের কাজটিকে শিক্ষা-নিকেতনের হাতে সোপর্দ করে এক বিরাট ভুল করে বসে আছে। এক্ষণে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের শিশুসদনে ফেলে চলে যাচ্ছে, যেন সহজেই তাদের কাজের ক্ষেত্রে ফিরে যেতে পারে। অথবা কোনো সামাজিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কিংবা শিল্প সাহিত্য সংক্রান্ত অনুষ্ঠানাদিতে নিশ্চিত মনে যোগাযোগ ও অংশ গ্রহণ করতে পারে। ব্রীজ খেলা বা সিনেমা দেখার ব্যস্ততাও তো কম নয়। এমনিভাবে চরম আলস্যের মধ্য দিয়ে তাদের মহামূল্যবান সময় অতিবাহিত করে। পরিবারের একত্বতা খণ্ড খণ্ড করা ও বাচ্চাদের সাথে একসাথে বসা ও শিক্ষামূলক আলোচনায় সময় কাটানোর অবসরকে হারিয়ে ফেলার জন্যে তারাই দায়ী।

 

কুকুরের বাচ্চাগুলোকে সমবয়সী কুকুর বাচ্চাদের সাথে একটি ঘরে বন্দী করে রাখা হলে এগুলোর ক্রমবৃদ্ধি অত দ্রুত হতে পারে না, যতটা হয় সেই বাচ্চাদের যারা মা-বাবার সাথে ঘুরে বেড়ায়। যেসব মানুষের বাচ্চারা তাদের সমবয়সীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, আর যেসব বাচ্চা বড়দের সাথে থাকে, এই দুই ধরনের বাচ্চাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য অবশ্যম্ভাবী। কেননা বাচ্চা ফিজিয়লজি; বিবেক-বুদ্ধি ও স্বজ্ঞার দিক দিয়ে তা-ই শিখে, যা তাদের চতুষ্পার্শ্বে দেখতে ও শুনতে পায়। সমবয়সী বাচ্চাদের কাছ থেকেও  অনেক শিখতে পারে। বিশেষ করে স্কুলে একাকী হলে বাচ্চা সম্পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হবে।একটি ব্যক্তির পরিপূর্ণ শক্তি লাভে তার জন্যে কিছুটা একাকীত্বেরও প্রয়োজন আছে। সেই সাথে প্রয়োজন পরিবারের সকলের সাথে একত্রিত হয়ে থাকার সুযোগ পাওয়া’।–[The man is the unknown]

 

আমেরিকান দার্শনিক ওয়াল দেরবাস্ট লিখেছেনঃ

 

“(আধুনিক সমাজে পুরুষ ও নারীর) বিয়ে প্রকৃত অর্থে কোনো বিয়ে নয়। কেননা তাদেরমধ্যে বাপ-মার ভাবধারা সঞ্চারিত হওয়ার পরিবর্তে একটি যৌন সম্পর্ক মাত্র গড়ে ওঠে। ফলে জীবন রচনাকারী ভিত্তিসমূহ ধ্বসে যায়। দাম্পত্য সম্পর্ক হয়ে পড়ে অত্যন্ত দুর্বল। কেননা জীবন ও প্রজাতীয় সম্পর্ক না থাকার দরুন এই বিয়ে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। ফলে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কহীন একক সত্তায় পরিণত হয়, যেন তাদের মধ্যে প্রকৃতই কোনো সম্পর্ক নেই। প্রেম-ভালোবাসায় যে আত্মসম্ভ্রম থাকে, তা নিঃসম্পর্ক ঠাট্টা-বিদ্রূপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়”।–[দর্শনের পদ্ধতি।]

 

এই দীর্ঘ সময় ব্যাপদেশে  সৃষ্ট বুর্জোয়া শ্রেণীর ব্যক্তিদের আরও অধিক স্বাধীনতা দানের চেষ্টা করতে থাকে। পূর্বে তো সমস্ত কর্তৃত্ব আধিপত্য ছিল সামন্তদের হাতে। তারা যেভাবে ইচ্ছা জনগণের রক্ত শোষণ করত। গীর্জা ব্যবস্থাও এই সামন্তবাদী ব্যবস্থার সহায়ক ও সমর্থক ছিল। আর জনগণকে আধ্যাত্মিকভাবে নিজেদের কর্তৃত্বাধীন বানাবার জন্যে নিজস্ব কল্যাণ হিসেবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, যেন পাদ্রী পুরোহিতরা নিরংকুশ কর্তৃত্বের আসনে আসীন হয়ে থাকতে পারে; ডুবে থাকতে পারে প্রাচুর্যের স্তুপের মধ্যে।

 

পর শহর-নগর যখন বিকাশ ও সম্প্রসারণ লাভ করতে থাকল তখন বেতনভুক্ত কর্মচারী, কর্মকাণ্ডারী, কর্মাধ্যক্ষ ও ছোট ছোট পুঁজিপতি তথায় ভিড় জমাতে লাগল। তখন তারা লক্ষ্য করল যে, তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। জাতীয় পার্লামেন্টের ওপর সেই সামন্তবাদীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

 

কথা বলার, সভা-সম্মেলন-সমিতি গড়ার ও ব্যক্তিগত মতো প্রকাশ ও প্রচার করার অধিকার ও স্বাধীনতার প্রকৃতপক্ষেই কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে এসব অধিকার প্রতিষ্ঠার জনে ধীরে ধীরে সামন্তবাদীদের সাথে কঠিন দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়।

 

এই দ্বন্দ্বে গণতন্ত্র প্রত্যেক দিন নবতর সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে ব্যক্তির জন্যে অধিকতর স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করতে থাকল।

 

দ্বন্দ্ব সংগ্রামের মার্কসীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, তা সবই হচ্ছে শ্রেণী-সংগ্রাম। নতুন জেগে ওঠা বুর্জোয়া পুরানো সামন্তবাদী শ্রেণীর সাথে নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামে লিপ্ত। …এই তত্ত্বকে সঠিক ধরে নিলেও এটা অসম্ভব নয় যে, শহর নগরবাসী এই বুর্জোয়ারা একটাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগ্রাম মনে করেছিল। এ সংগ্রাম তাদের প্রত্যেকের এবং প্রত্যেক ব্যক্তির এ সংগ্রামে লিপ্ত তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এর উদ্দেশ্যে। যেন সে মনে করতে পারে যে, সে স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত একজন মানু। সে কারুরই অধীন নয়।

 

এই দ্বন্দ্বের ফলে সামন্তবাদীদের কাছ থেকে যতটা স্বাধীনতাই অর্জিত হতো, তার অর্থ এই দাঁড়াত যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে এক নবতর পর্যায়ে সম্প্রসারিত করে নিয়েছে অর্থাৎ সে নবতর পরিবেষ্টনে ব্যক্তিগতভাবে যা-ইচ্ছা করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই মুক্তি স্বাধীণতা কেবলমাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রেই অর্জিত হয়নি। এটা কার্যত ছিল দ্বীন-ধর্ম নৈতিকতা ও ঐতিহ্যিক রীতিনীতির সকল বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি ও নিষ্কৃতি। সেই সাথে পাচ্ছে আইনের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও বিচার বিভাগীয় সমর্থন। আর এ সবই ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপোষক।

 

বুর্জোয়া শ্রেণী এমনিভাবেই সামন্তবাদীদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামে মুক্ত-স্বাধীন-নিরংকুশ ব্যক্তিসত্তার ওপরই নির্ভরশীল হয়েছিল, প্রতিটি মুহুর্ত তারা আরও অধিক স্বাধীনতা –আরও অধিক ক্ষমতা লাভের জন্যে সংগ্রামরত ছিল।

 

আর এই সময়ই মানুষ নিজেকে দেবতার স্থানে বসিয়ে দেয়। নিমগ্ন হয় সর্বাত্মক আত্মপূর্জায়। আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণের দিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র করে না।

 

ইতিমধ্যে পুঁজিবাদ এসে ময়দান দখল করে নিল। এই পুঁজিবাদও ব্যক্তিস্বাধীনতার ভিত্তিতে গড়ে উঠল। তাতে রয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণ স্বাধীনতা। প্রত্যেক ব্যক্তিই ধন-সম্পদের নিরংকুশ মালিক হতে পারছে, মালিক হতে পারছে অর্থোৎপার্জনের সকল উপায়-উপকরণের। নিজের সম্পদের পরিমাণ যত ইচ্ছে বৃদ্ধি করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার স্বীকৃত। আর সেই সাথে সে জনশক্তিও বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেল। নিয়োগ করল বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মচারী।

 

পুঁজিপতিরা ব্যক্তি স্বাধীনতার সংরক্ষণে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করল। তারা ব্যক্তি মানুষের অধিকারের পক্ষে অনেক সুন্দর সুন্দর মুখরোচর ও চিত্ত হরণকারী কথা বলতে শুরু করল। সকল প্রকার স্বাধীনতার অভিভাবক হয়ে বসল তারা। জীবনে প্রাপ্তব্য সকল পবিত্রতা ও মহানত্বকেও তারা প্রতিষ্ঠিত করল।

 

সমাজ যেন তার কার্যকলাপের জন্যে কোনোরূপ টু শব্দ করতে না পারে এবং তার কাজের পথে না পারে কোনোরূপ বাধা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে –এই অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, এটা তাদের ঐকান্তিক দাবি।

 

তারা এই শ্লোগান ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল –তাকে কাজ করতে দাও, তাকে চলতে দাও Laissez faire –Laissez passer –এই শ্লোগানের মধ্যেই একত্রীভূত হয়েছিল তাদের সমস্ত দাবি। তার অর্থ ছিল, ব্যক্তিকে সকল প্রকার বাধা –প্রকৃতিবদ্ধকতামুক্ত কাজ করার অধিকার দিতে, সুযোগ দিতে হবে।

 

এ ছিল সকল প্রকারের বাধা-বন্ধন ও বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তিলাভের আহবান।

 

কিন্তু ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তির পবিত্রতা, মাহনত্ব এবং ব্যক্তির অধিকার পর্যায়ে এই যে সুন্দর সুন্দর কথা বলা হচ্ছিল, এগুলো আল্লাহর জন্যে আল্লাহর বিধান মতো তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ছিল না। সবই ছিল শয়তানের জন্যে, শয়তানী উদ্দেশ্যে। সব কিছুরই মূল লক্ষ্য পুঁজিবাদরূপী ‘তাগুত’কে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে, তার মক্তি ও দাপট ক্রমশ সমৃদ্ধ করে তোলার মতলবে। কেননা পুঁজি বাদ কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই যা ইচ্ছা করতে পারছিল না। তা করা সম্ভব ছিল না। তা করা সম্ভব ছিল সকল বাধা-বন্ধনমুক্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার উন্মুক্ত পরিবেশেই মাত্র।

 

পুঁজিবাদী তাগুতের সীমালংঘনমূলক স্বেচ্ছাচারী শক্তি-মর্যাদা অর্জনের পথে এছাড়া আর কোনো বাধা ছিল না। এ কারণে নিরুপায় হয়েই তা এই স্বাধীনতার ধ্বনি তুলেছিল, যেন গোটা সমাজই সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যায়। সমাজের ওপর যেন তা থাকে কোনো ধর্মীয় অনুকরণ, কোনো নৈতিক বা ঐতিহ্যিক প্রতিবন্ধকতা।

 

সমাজের পুরুষ, নারী ও বালক-বালিকা, পরিবার ও জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায় সকলেই যেন এই স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করার অবাধ সুযোগ লাভ করতে পারে। কেননা পুঁজিবাদের সবচাইতে বড় চিন্তার বিষয় ছিল বেশি বেশি ও বড় পরিমাণে মুনাফা লুণ্ঠন করা আর তা সম্ভব ছিল যা ইচ্ছা হয় তাই করার মাধ্যমে। এই পথে বাঁধা-প্রতিবদ্ধকতা থাকলে তাদের অবাধ ও যথেষ্ট মুনাফা লাভের পথ বিঘ্নিত হয়। বরং গোটা সমাজের সর্ব প্রকারের বাধা-বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াটাই তাদের বড় লাভ। কেননা তা হলেই তো জনগণের মধ্যে যৌন লালসাকে উচ্ছ্বসিত করে তোলার জন্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব। আর তা করতে পারলেই দ্বিগুণ-তিনগুণ-চারগুণ বেশি মুনাফা লুঠবার সুযোগ তারা পেতে পারে।

 

এভাবে পুঁজিবাদী মনোবৃত্তি এক নতুন পূর্ণাঙ্গ দর্শন তৈরি করে নিল। সে দর্শনের শিক্ষাদানের জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, গ্রন্থকার, সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠীও গড়ে তোলা হলো। সকলেরই সম্মিলিত আহবান ছিল নিরংকুশ ব্যক্তি স্বাধীনতার দিকে। আর এই পাগলপরা মুক্তি ও স্বাধীনতার সকল বাঁধা-বন্ধনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার দিকে।

 

এই বিভ্রান্ত বিপথগামী দর্শনের ছত্রছায়ায় এক নতুন সমাজ গড়ে উঠল। এ সমাজ অত্যন্ত বিভৎস ও জঘন্য রূপ পরিগ্রহ করলে তখন বলা হল,  সমাজ ব্যক্তির এই স্বাধীনতা হরণ করতে চায়। অতএব ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে তার সর্বশক্তি নিয়ে তার এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো। সমাজকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে তার সাথে শত্রুতার পূর্ণ মাত্রার প্রতিশোধ গ্রহণ করা।

 

এই দার্শনিক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী কোথাও থামল না। থেমে একটু চিন্তা-বিবেচনা করারও প্রয়োজন মনে করল না। একটুও চিন্তা তারা করল না যে, এই যে সমাজটিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়ার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়েছে ব্যক্তি মানুষকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে এই সমাজটি আসলে কি? ….ব্যক্তি-ই বা কি? ব্যক্তি ও সমাজ কি দুই, না ব্যক্তিগণেরই সামষ্টিক রূপ হচ্ছে সমাজ! মানুষ একই সময় একজন ব্যক্তি ও সমাজেরই অংশ নয় কি? ….সমাজের মধ্যে মানুষ নেই? ব্যক্তিদের সমন্বয়েই কি সমাজ গড়ে ওঠেনি? সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা কি ব্যক্তির মানসিক ভাবধারার ঐকান্তিক দাবি নয়? অন্যদেরসাথে মিলিত একত্রিত হয়ে বসবাস করাই কি নয় ব্যক্তির মনে ঐকান্তিক দাবি? মানুষ কি অন্য মানুষের প্রতি কোনো ঝোঁক –কোনো আকর্ষণ বোধ করে না? কোনো প্রয়োজনের জন্যেই এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির প্রতি মুখাপেক্ষী নয়? …তা হলে এই সমাজটিকে যখন ভেঙ্গে ফেলা হবে, তখন ব্যক্তি কোথায় থাকবে? কি অবস্থা হবে তার? …কোন বেষ্টনীর মধ্যে বাস করবে এই ব্যক্তি?

 

আসলে এই দার্শনিক-চিন্তাবিদ-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-লেখক-শিল্পী গোষ্ঠী এক অন্ধ জাহিলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। আল্লাহর পথ তারা চিনতে পারেনি, আল্লাহর নূর থেকে তারা বঞ্চিতই রয়ে গেছে। তারা জানতে পারেনি যে, পুঁজিবাদ আসলেই একটা মহাধ্বংসকারী তাগুত। এই তাগুতেই তাদের মনে এই সব ভিত্তিহীন মতবাদ বদ্ধমূল করে দিচ্ছে। এর ফলে এই সমাজ ও সামাজিক বন্ধন যদি সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়, তাহলে এই ব্যক্তিরা চরমভাবে অসহায় ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে। তখন কার্যত এই তাগুত ব্যক্তিকে পেয়ে বসবে, তাকে সম্পূর্ণ রূপে গ্রাস করবে। অন্যান্য মানুষের প্রতি ঘৃণা পোষণকারী এই একক ব্যক্তিকে দাসানুদাস বানিয়ে নেওয়া তার পক্ষে খুবই সহজসাধ্য ব্যাপার হবে। কেননা সমাজ তো নেই, লোকগুলোর পরস্পরের কোনো সম্পর্ক বা বন্ধন বলতে কিছুই নেই। নেই তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো দয়া, ভালোবাসা, সহানুভূতি। এক্ষণে এই বিচ্ছিন্ন নিঃসম্পর্ক মানুষের পালনে পুঁজিতান্ত্রিক ও পুঁজির স্বার্থ সংরক্ষক এই তাগুতের পক্ষে দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করা কতই না সহজ হবে। তখন পুঁজিবাদের পতাকা উচ্চে তুলে ধরতে বাধ্য হবে এই ব্যক্তিরা। আর তাগুত তাদেরকে পশুপালের রাখালের মতো যে দিকে ইচ্ছা চালিয়ে নিয়ে যাবে লালসা-কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে।

 

একদিকে ব্যক্তিতন্ত্রের প্রতি এই চরম মাত্রায় পৌনপুনিক দাবি। আর অন্যদিকে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সামষ্টিকতার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা। দুই বিপরীতের পারস্পরিক ভয়াবহ সংঘর্ষের ব্যাপার।

 

সামষ্টিকতাবাদী মতবাদ ঘোষণা করছে, ব্যক্তির স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব নেই। স্বতন্ত্রভাবে তার কোনো তাৎপর্য বা মাহাত্মও নেই। সমাজের মধ্যেই ব্যক্তির অস্তিত্ব, সমাজের মধ্যেই সে লালিত-পালিত, তার জীবন যাপন এই সমাজের মধ্যেই সম্ভব। সমাজকে তার নিশ্চিত-অনিবার্য গতিপথ থেকে ফিরিয়ে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, সেজন্যে চেষ্টা করারও কোনো অধিকার নেই তার।

 

এদিকে দরখায়েম মানব জীবনের সামষ্টিক ব্যাখ্যা পেশ করছিল। আর কার্ল মার্কস ইতিহাসের বস্তুগত ব্যাখ্যায় তারই সমর্থন যুগিয়েছিল। এদের বক্তব্য ছিল, অর্থনৈতিক ভিত্তিই সমাজ গড়ে তোলে। আর সমাজই ব্যক্তি সৃষ্টি করে।

 

দরখায়েম বলেছেঃ

 

সামষ্টিক চেতনা থেকে উদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা নিশ্চিতরূপে সেই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর, যা ব্যক্তির চেতনা থেকে বের হয়। বরং ব্যক্তির চেতনা অন্যান্য ব্যক্তি থেকেও স্বতন্ত্র জাতীয়। সামষ্টিক বিবেক-বুদ্ধি ব্যক্তিগত বিবেক-বুদ্ধি থেকে ভিন্নতর, তার জন্যে বিশেষ নিয়ম-কানুন শুধু তারই জন্যে প্রযোজ্য।–[সামষ্টিক বিদ্যার পদ্ধতিগত নিয়মঃ ডঃ মাহমুদ কাসেম অনূদিত। ডাঃ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নদভী দ্রষ্টব্য।]

 

…অপরদিকে সামষ্টিক চিন্তাধারা ও কার্যক্রম বিভিন্ন পথে চলে। তা ব্যক্তিগণের চিন্তার বাইরে প্রাপ্ত সত্য। ব্যক্তিগত প্রতি মুহুর্তে সেই সত্যের সম্মুখে মাথা নত করে থাকতে বাধ্য।–[পূর্ব সূত্র।]

 

সম্মিলিত কাজ থেকেই সামষ্টিক প্রপঞ্চের প্রকাশ ঘটে। তা ব্যক্তির চেতনার বাইরে পূর্ণত্ব পায়। কেননা তা বহু সংখ্যক ব্যক্তির মন-মানসিকতার ফল।–[দরখায়েম এখানে স্বীকার করছে যে, সামষ্টিক প্রপঞ্চ বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত মন-মানসিকতা থেকে উৎসারিত হয়। অথচ একটু পরেই সে এই কথা ভুলে গিয়ে এর বিপরীত মত প্রকাশ করেছে। কোনো ব্যক্তিসত্তাকে অস্বীকার সম্পর্কিত মতবাদের জন্যে সে খ্যাতিমান হয়েছে।] এই সম্মিলিত কাজই কর্ম ও চিন্তার পথ নির্দিষ্ট করে। আর এই পথসমূহ আমাদের অস্তিত্বের বাইরে পাওয়া যায়। তা ব্যক্তির ইচ্ছা দ্বারা কিছুমাত্র প্রভাবিত হয় না।–[পৃষ্ঠা ৫]

 

সামষ্টিক প্রপঞ্চের প্রাণ পর্যায়ের বিশেষত্ব যেহেতু বাইরে থেকে ব্যক্তিগণের মনের ওপর প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই প্রপঞ্চসমূহ ব্যক্তিগণের মনের উৎপন্ন নয়।–[পৃ. ১৬৬]

 

লক্ষণীয়, সামষ্টিক বাহ্যিক প্রপঞ্চ ব্যক্তিগণের আভ্যন্তরীণ চেতনার ওপর কিভাবে প্রভাবশালী হয়ে দাঁড়ায়।–[পৃ. ৬৬]

 

তবে মার্কস, এঙ্গেলস এবং ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা আরও সম্মুখের দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে। তা মানুষের অত্যন্ত জঘন্য কুৎসিত কিমাকার চিত্র অংকন করেছে।

 

বস্তুগত জীবনে উৎপাদন পদ্ধতিই সমস্ত সামষ্টিক র্কাক্রমের, রাজনীতি ও জীবনের আধ্যাত্মিক রূপ গড়ে তোলে। (মার্কস)

 

উৎপাদন ও উৎপন্ন পণ্যাদির পারস্পরিক বিনিময়ই হচ্ছে সমস্ত সামষ্টিক ব্যবস্থার ভিত্তি। (এঙ্গেলস)

 

তাহলে মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে মানুষের নিজস্ব সত্তা বলতে কিছুই নেই। নেই তার নিজস্ব কোনো চিন্তা-চেতনা, না ব্যক্তিগত কর্মের উদ্দীপক বা কারণ।

 

তা হচ্ছে নিছক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রচ্ছায়া, যা মানুষের নিজস্ব সত্তার বাইরে পাওয়া যায়।

 

মানুষ যে সামষ্টিক উৎপাদনে অভ্যস্ত, তারাও পরস্পরে একটা সীমিত পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে, সে সম্পর্ক গড়ে না তুলে তাদের কোনো উপায় নেই। কিন্তু সে সম্পর্ক তাদের ইচ্ছার অধীন নয়, তা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। জনগণের চেতনা তাদের সত্তা নির্ধারণ করে না। তাদের সত্তাই নির্ধারণ করে তাদের স্বরূপ (মার্কস)

 

চূড়ান্ত পর্যায়ের পরিবর্তন কিংবা মৌলিক আবর্তনসমূহ সম্পর্কে চিন্তাধারা ও আলোচনা-পর্যালোচনা করা জনগণের বিবেক-বুদ্ধির ব্যাপার নয়। কিংবা তারা যদি চিরন্তন সত্য ও ন্যায়পরতা সহকারেও চেষ্টা চালায় তবু তা কখনোই সফল হতে পারে না, কেবলমাত্র উৎপাদন উপায়-প্রক্রিয়া ও পণ্য বিনিময়ের পন্থাসমূহে সৃষ্ট পরিবর্তনসমূহ চিন্তা-বিবেচনা করলেই বুঝতে পারা যেতে পারে।

 

কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় মুশকিল হলো, ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা মানুষ সম্পর্কে যখন কথা বলে, তখন ব্যক্তি সম্পর্কে কথা বলে না। তা সামষ্টিক কার্যক্রম নিয়েই ব্যস্ত। তার দৃষ্টিতে ব্যক্তির কোনো অস্তিত্বই স্বীকৃত নয়। আছে শুধু সামষ্টিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে।

 

মোট কথা, মার্কস ও এঙ্গেলস-এর মতে ব্যক্তির কোনো অস্তিত্বই নেই। তাকে অবশ্যই কোনো-না-কোনো শ্রেণীর মধ্যে শামিল ও গণ্য হতে হবে। আর এই শ্রেণীর যা কল্যাণ তাকেই তার নিজের জন্যে কল্যাণরূপে গণ্য করতে হবে। আর এই শ্রেণীর প্রবণতা ও রীতিনীতি অনুযায়ী তার আচার-আচরণ ও চিন্তা-বিশ্বাসও গড়ে নিতে হবে। শ্রেণীর চরিত্র ও ঐতিহ্য, জীবন সম্পর্কে শ্রেণীর দৃষ্টিকোণকেই পরম সত্য ও চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত জীবন চিন্তা করে, তাকে স্বতন্ত্র স্বাধীন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সত্তা বলে মনে করে, আর এই নিয়মে তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিকোণ গড়ে ওঠে, তাহলে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা তা একটি বড় সমস্যা হিসেবে গণ্য হবে।

 

স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সম্পর্কে ইতিহাসের ঘটনাবলী যা কিছু বলে ও প্রচার করে, তা মানুষের গড়া কল্পকাহিনী মাত্র। (কিন্তু কেন?....) বৈজ্ঞানিক অধ্যায় যে প্রকৃত ব্যাপার উপস্থাপিত করে এই ধরনের কোনো ব্যক্তি কখনোই পাওয়া যায়নি। অতীত ইতিহাসের সকল পর্যায়েই ব্যক্তি সব সময়ই শ্রেণীভুক্ত ছিল। অনাগত শ্রেণীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে যার আগমনকে বস্তুগত ও অর্থনৈতিক বিপ্লবসমূহ অবশ্যম্ভাবী করে দিয়েছে –দেখা যাবে, ব্যক্তি একজন মানুষই বটে, যা আসন্ন নিশ্চিত অনিবার্যতার সুসংবাদ দেয়।

 

মনে হচ্ছে, মানুষ অর্থনৈতিক ও বস্তুগত নিশ্চিত অনিবার্য বিপ্লবসমূহের অধীন। এ কারণে ব্যক্তি সমাজের অধীন। আর সামজ এসব বিবর্তন বিপ্লবের অধীন।

 

মানুষ ব্যক্তিতন্ত্র থেকে সমাজতান্ত্রিকতায় এসে এক নতুন খোদা বানিয়ে নিল। আর বস্তুগত অনিবার্যতা ও বাধ্যবাধকতাই তাদের ‘খোদা’ হরো।

 

সমাজতান্ত্রিকতাও একটি জাহিলী বিপর্যয়, তা চরমবাদিতায় পূর্ববর্তী জাহিলিয়াত থেকে কোনো অংশেই কম নয়, যে জাহিলিয়াতে সমাজের তুলনায় ব্যক্তির গুরুত্ব স্বীকৃত।

 

সমাজতান্ত্রিকতা হোক, কি ব্যক্তিতান্ত্রিকতা, উভয়ই পূর্ববর্তী বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়া মাত্র। উভয়ই চরমবাদের দ্বারা আচ্ছন্ন।

 

ব্যক্তি যে সমাজেরই একটা অংশ, তা উভয় জাহিলিয়াতই বুঝতে পারেনি, বুঝতে অক্ষম। আসলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই সত্য। ব্যক্তিগণের সমষ্টিই তো সমাজ। ব্যক্তি না হলে সমাজ হবে কেমন করে?

 

মানব জীবনকে সমাজতান্ত্রিকতার মধ্যে আবদ্ধ করে দিলে একটা বড় বুল ও বিভ্রান্তি এই হয় যে, তাতে জীবনের একটি মাত্র দিকই লক্ষ্যভূত হয়। তা হচ্ছে, ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছা কামনা-বাসনার সম্পূর্ণ বিপরীত সমাজ-আরোপিত নিয়ম-কানুন ও দায়-দায়িত্ব মেনে চলতে বাধ্য হয়।

 

এটা সত্য বটে! কিন্তু এ সত্য কি প্রমাণ করে?

 

দরখায়েম স্বীকার করেছে (যদিও স্বীকার করার পরই আবার তা অস্বীকার করেছে), সামষ্টিক প্রপঞ্চ প্রকাশমানতা বিপুল সংখ্যক ব্যক্তির মন-মানসিকতারই ফলশ্রুতি। অন্য কথায়, ব্যক্তি কোনো-না-কোনোভাবে সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আর তার এই প্রতিনিধিত্ব সমাজের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

 

আর সমাজ যে কিছু ব্যাপার ও বিষয় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেয়, তা যদি স্বীকার করেও নেওয়া হয়, তাহলে তার দুটি দিকঃ

 

হয় বিপুল সংখ্যক সৎ, নেককার ও চরিত্রবান ব্যক্তির মন মিলিত হয়ে কোনো কথা একজন বিপথগামী ব্যক্তির জন্যে বাধ্যতামূলক করে দেয় এবং বলে –দেখো, কখনোই এই সীমালংঘন করতে পারবে না –এর বাইরে যেতে পারবে না।

 

অথবা কিছু সংখ্যক অসৎ, দুষ্কৃতিকারী ব্যক্তির মন একত্রিত হয়ে সৎচরিত্রবান ব্যক্তিদেরকে নিজেদের কথা মানতে বাধ্য করে দেবে এবং বলবে, হয় আমাদের সাথে চলো, না হয় আমরা তোমাদেরকে পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেবো।

 

উভয় অবস্থায়ই তা বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি মানুষের মনের সম্মিলন, একটি মতের ভিত্তিতে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ। এই সম্মিলন ও ঐক্যবদ্ধতার দরুন তার শক্তি বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তা শেষ পর্যন্ত মনুষ্য প্রকৃতি থেকে তো বাইরে চলে যায় না। তাই ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়ই মানুষ। আর এককভাবে ব্যক্তি বা এককভাবে সমাজ সমষ্টির মধ্যেই মানুষ হওয়ার গুণটি সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে না।

 

আর সামষ্টিক ব্যাখ্যা বা বস্তুগত ব্যাখ্যা উভয় দর্শনই বিষয়টিকে এমনবাবে সংমিশ্রিত করে দেয় যে, তাতে ব্যক্তিসত্তার বিশেষত্ব স্বতন্ত্র ও বিশেষত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয় না। কেননা যেমন বলেছি উভয়ই জীবনের একটি মাত্র দিকের ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। আর তা হচ্ছে সকল অবস্থায়ই ব্যক্তি সমষ্টির অধীন হয়ে থাকে।

 

কিন্তু উক্ত দুটি দর্শনই জাহিলিয়াতের অন্ধত্বের মধ্যে পড়ে প্রকৃত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। সেই বাস্তবতাকে, যেখানে ব্যক্তিরা তাদের সমষ্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে থাকে এবং তারা সমাজ-সমষ্টির সাথে যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।

 

যদি বলা হয়, সমাজও তো বিদ্রোহী ব্যক্তিগুলোকে নিষ্পেষিত ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তাহলে আমরা বলব, এটা মূল বিষয়ের কোনো প্রমাণ হলো না। এখানে মূল আলোচ্য বিষয় হল, ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে এতদূর চলে যায় যে, তারা সমাজ-সমষ্টির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়, তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।

 

তাছাড়া সমাজ-সমষ্টি প্রতিবারেই বিদ্রোহী ব্যক্তিদেরকে নিষ্পেষিত করতে পারে –এমন কথাও সত্য নয়। সত্য নয় ভালোর ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি মন্দের ক্ষেত্রেও। আসলে এটা একটা হিংস্র ধর্মীয় ধারণা মাত্র, যা প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে।

 

খারাপ ক্ষেত্রের একটা দৃষ্টান্ত এখানে তুলতে চাই। কেননা তা-ই এই হিংস্র জাহিলী ব্যাখ্যার বাস্তবতার অতীব নিকটবর্তী ব্যাপার।

 

স্ট্যালিনের নির্মমতার ইতিহাস সম্পর্কে কি বলতে চাও?

 

ক্রুশ্চেভ তাকে কিভাবে চিত্রিত করছে?

 

সে কি বলেনি যে, স্ট্যালিন হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ববাদের নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম দৃষ্টান্ত, সে গোটা সমাজকেই একান্তভাবে বাধ্য করেছিল তার দাসত্ব করার জন্যে, একথা কি সত্য নয়?

 

তা কি পরে সম্ভবপর হলো?... ইতিহাসের জাহিলী ব্যাখ্যাদাতারা তার কি ব্যাখ্যা দিতে পারে?

 

বিশ্বস্ত একনিষ্ঠ ক্রুশ্চেভ যেভাবে তাকে চিত্রিত করেছে, তা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আসলে সে সমাজ-সমষ্টির কল্যাণের প্রতিনিধিত্ব করেনি। পরন্তু সে (নীতিগতভাবে) শাসক শ্রেণীর অর্থাৎ প্রোলেটারিয়েট শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বও করেনি।

 

আসলে সে ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভের প্রতিনিধিত্ব করেছে। সে ছিল ‘তাগুত’, সীমালংঘনকারী, কোনোরূপ দয়া-মায়া বলতে কিছুই ছিল না। ইতিহাসের ব্যক্তিত্ববাদী ব্যাখ্যাকে যদি আমরা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করি তাহলে এই ব্যাপারটা কি ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে?

 

আর ভালোর ক্ষেত্রে নবী-রাসূলগণ, পবিত্র আত্মা, দ্বীনের আহবানকারী ও সমাজ সংস্কারক ব্যক্তিবর্গ তারা সমাজের তাগুতী ব্যবস্থার মধ্যে এককভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁরা সমাজের জন্যে সত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আত্মনিয়োগ করেন। তারা সমাজের কল্যাণে, সত্যনীতি ও ন্যায়পরতা-সুবিচার কায়েমের জন্যে চিরন্তন ও শাশ্বত ব্যবস্থা হিসেবেই প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। অতঃপর সে বিজয় হয়ে দাঁড়ায় …ইতিহাসের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাকে বাদ দিলে এসব বাস্তব ঘটনার কি ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে?

 

একথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে, মানবীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা কেবলমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক দেওয়া উচিত নয়। উচিত নয় কেবলমাত্র সমাজ-সমষ্টির ভিত্তিতে। এই উভয়টিই জাহিলী ব্যাখ্যা, মূল বাস্তব ইতিহাসের বিকৃতি মাত্র।

 

মানুষের সত্যিকার ব্যাখ্যা হতে পারে যদি ব্যক্তি ও সমষ্টি –উভয়ের ভিত্তিতে একসাথে অভিভাজ্যভাবে দেওয়া হয়। কেননা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয় পারস্পরিক গভীর সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করে বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে। বিচ্ছিন্ন ও নিছক এককভাবে কারোরই কিছু করার নেই।

 

কখনও ব্যক্তি প্রধান হয়ে দেখা দেয়, কখনও সমাজ প্রভাবশালী হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানে এমন সুস্পষ্ট সত্য বর্তমান যা এই জাহিলী মতবাদগুলোর জ্ঞানের আওতার মধ্যেই আসেনি, সে বিষয়ে তা সম্পূর্ণ অন্ধ। তা হচ্ছে, মানুষের উভয় দিক –ব্যক্তিগত দিক ও সমাজগত দিক –সম্মিলিতভাবে এক সাথে ও পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা সহকারে কাজ করে প্রতি মুহুর্তে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়। কখনোই তার অন্যথা হয় না। ..এ এক অনস্বীকার্য সত্য।

 

ব্যক্তি সমাজ-সমষ্টির মধ্য থেকে …তারই সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কাজ করে। আর সমাজ-সমষ্টি কাজ করে ব্যক্তিগণের বাস্তব অংশীদারিত্ব ও সাহায্য-সহায়তা নিয়ে, একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির কোনো অস্তিত্ব বা ভূমিকা নেই, থাকতে পারে না। তাই ইতিহাসের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা যেমন ভুল, তেমনি জাহিলী সামষ্টিক ব্যাখ্যাও। উভয়ই সমানভাবে চরম ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত।

 

আধুনিক জাহিলিয়াতের অধীন আজকের মানবতার বাস্তব অবস্থা হচ্ছে –খোদাদ্রোহিতা, সীমালংঘন ও নাফরমানীর কোনো-না-কোনো কাজে –ইচ্ছায় হোক-অনিচ্ছায় হোক –জড়িয়ে পড়তে একান্তভাবে বাধ্য হচ্ছে।

 

হয় মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক আল্লাহ দ্রোহিতাকে গ্রহণ করবে আর তার পরিণতিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকবে। আর না হয় মানুষ সমাজ-সমষ্টির আল্লাহ দ্রোহিতার আশ্রয় গ্রহণ করবে, আর তার অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের অধীনতা গ্রহণ করবে। …তাও তখন, যদি কোনো কিছু গ্রহণ করার তার স্বাধীনতা আছে বলে স্বীকার করে নেওয়া হবে। কেননা কোনো জাহিলিয়াতের অধীনেই মানুষ গ্রহণ বা বর্জনের কোনো স্বাধীনতাই পেতে পারে না। তাগুত শক্তিই তাদের শাসক ও পরিচালক হয়ে বসে। সামষ্টিক অবস্থাই তাকে ক্ষমতাসীন করে দেয়।

 

আর মানুষের এই ধ্বংস ও বিপর্যস্ত অবস্থা আল্লাহকে পরিহার করে চলার অনিবার্য পরিণতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সারকথা হচ্ছে, মানুষের প্রকৃতি সত্তাই আজ চরম ধ্বংসের মুখে এসে গেছে।

 

যে ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন, সে তো তার বিরাট অংশ থেকেই বিচ্ছিন্ন। এক্ষণে সে নিতান্তই এককভাবে নিজ সত্তার বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামে লিপ্ত। পরিণতিস্বরূপ তার পাগল হয়ে যাওয়া, আত্মহত্যার উদ্যোগী হওয়ার, ব্লাড প্রেসার বা স্নায়ুবিক অসুস্থতার রোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এ পরিণতি নিতান্তই অযৌক্তিক।

 

পক্ষান্তরে, যে সমাজ তার ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র মর্যাদা বিনষ্ট ও অধিকার হরণ করে, পরিণামে তা নিজেকেই ধ্বংস করে। এ সমাজে জনসংখ্যার আধিক্যেরও কোনো মূল্য হতে পারে না। কেননা এই সমাজের ওপর তাগুতী শক্তিই সর্বাত্মক শাসক হয়ে বসেছে। সে ই হয়ে পড়েছে এই সমাজের একমাত্র চিন্তানায়ক, নিরংকুশ মাধ্যম। তার ক্ষমতা সীমাহীন, পরিণামহীন। সে যখন মরে যায় কিংবা ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখন তাকে বড় অপরাধী ও নির্মম পশুরূপে চিত্রিত করা হয়।

 

এই জাহিলিয়াত উদাত্ত কণ্ঠে নিজের সম্পর্কে দাবি করছে যে, তা বর্তমানে মানবীয় বিবর্তনের উন্নতির চরম উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছে। এখন তার জন্যে আল্লাহর বিধান –আদেশ-উপদেশের কোনো প্রয়োজন নেই।

 

 

নৈতিকতার বিপর্যয়

 

বর্তমান জাহলিয়াতের সবচেয়ে ড় প্রতারণা হচ্ছে, লোকেরা মনে করছে, এই জাহিলিয়াত বুঝি নৈতিকতার বড় ধারক।

 

 কেননা, এই পাশ্চাত্য সুসভ্য ব্যক্তি একজন অতিবড় চরিত্রবান। সে মিথ্যা বলে না, ধোঁকা দেয় না, প্রতারিত করে না কাউকেই। সে যখন কথা বলে, তখন সে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সহকারে বলে। তোমার সাথে আর্থিক লেনদেন করলে তা পূর্ণ আমানতদারী বা বিশ্বস্ততা সহকারেই করে। তার কার্জে-কর্মে সে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। দেশের খেদমতে সে লেগে আছে অত্যন্ত আন্তরিকতা সহকারে। …সব ব্যাপারেই সে একজন আদর্শ ব্যক্তি। ..প্রাচ্যেদেশীয় লোকদের মুখে এই ধরনের কথা বেশ শোনা যায়।

 

….কেউ যৌনতার কথা তুললে চট করে বলা হয়ঃ আরে রাখো তোমার যৌনতা, যৌনতার সাথে যে নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক আছে, এই কথাই ওরা বিশ্বাস করে না, এই দিক দিয়ে ওদের বিচার করা চলে না। …অন্যান্য সবদিক দিয়েই তো ওরা আদর্শ। ….হায়, আমরা যদি ওদের মতো হতে পারতাম; ….ওদের চরিত্রের মতোও যদি হতো আমাদের চরিত্র, তাহলে তো আমরা বর্তে যেতাম!

 

আমরা এ পর্যায়ে আধুনিক জাহিলিয়াতে নৈতিকতার ইতিহাস আলোচনা করব। বিশ্লেষণ করে দেখব, ওরা ক্রমশ উন্নতির দিকে ছুটে চলছে, না ধ্বংসের দিকে হু হু করে নেমে যাচ্ছে। …আমরা প্রকৃত ও বাস্তব ইতিহাসের আলোকে বিচার করে দেখব, পাশ্চাত্য জগতে নৈতিকতা বলতে কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা। এ ক্ষেত্রে আমরা কোনোরূপ কল্পনা, মিথ্যা দোষারূপ বা উড়া কথার প্রশ্রয় নেব না।

 

কিন্তু মূল ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উল্লেখের পূর্বে আমাদের বারবার বলা তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত করা জরুরী মনে করি। তা হচ্ছে এই যে, সম্পূর্ণরূপে নৈতিকতাশূন্য ও চরিত্র বিবর্জিত একটি জাহিলিয়াতও ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেননা, নৈতিকতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা মানবীয় শক্তির সাধ্যায়ত্ত নয়। এমন করাও সম্ভব নয় যে, কোনোরূপ নৈতিকতাই পাওয়া যাবে না। কেননা মানবীয় মনস্তত্ত্ব সামষ্টিকভাবে অন্যায় ও পাপে নিমজ্জিত হতে পারে না। তা যত বিপর্যস্তই হোক না কেন, বিচ্ছিন্নভাবে ও  এখানে-ওখানে চড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু-না কিছু ভালো …কিছু না কিছু কল্যাণ অবশ্যই বর্তমান থাকবে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কল্যাণ –তা যে অবস্থায় বা যে-কোনো ক্ষেত্রেই থাক, জাহিলিয়াতকে মারাত্মক ধরনের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে পারে না।

 

সেই সাথে বিপদগামিতার নিশ্চিত অনিবার্য কুফল থেকেও পারে না তাকে বাঁচাতে। জাহিলিয়াতের আরব সমাজেও নানা ধরনের ভালো ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণ ছিল। তাদের মধ্যে বীরত্ব, সাহসিকতা ও সম্মুখে এগিয়ে যাবার গুণের ধারক ছিল। তারা যে জিনিসের প্রতি বিশ্বাসী হতো যাকে তারা লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করত; তার জন্যে জীবন প্রাণ উৎসর্গ করতেও তারা কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হতো না। তাদের মধ্যে একটা স্বাভাবিক মান-সম্মান ও মর্যাদা বোধ ছিল, ছিল আত্মসম্মান চেতনা ও জুলুমের প্রতি ঘৃণা।

 

কিন্তু এসব গুণ মিলিতভাবে তার জাহিলিয়াত হওয়াকে বন্ধ করতে পারেনি। তার অনিবার্য গুমরাহীর পরিণাম থেকেও তাকে রক্ষা করা যায়নি। কেনান এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য আল্লাহর প্রদর্শিত পথের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না, ছিল না তা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এ কারণে উক্ত গুণাবলী ও সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারেনি।

 

বীরত্ব, সাহসিকতা, অগ্রবর্তিতা ও জীবন-প্রাণ উৎসর্গ করার প্রবণতা রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ ও গুমরাহীর কাজে পরস্পর সাহায্য করায় সীমিত থেকে নিরর্থক ও নিস্ফল হয়ে গেছে। তারা এক অপরের সাহায্যে এগিয়ে গেছে বটে; কিন্তু তা কোনো সত্যের জন্যে করছে না, বাতিলের জন্যে, -ন্যায় পথে না অন্যায় পথে, সে চিন্তা তাদের মনে কখনোই উদিত হয়নি। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলেই তারা রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু তার পরিণামে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প যেমন থাকত না, তেমনি বাতিলকে নির্মূল করার লক্ষ্যও থাকত না। ফলে বাতিল স্তরে স্তরে জমে উঠত, হতো পুঞ্জীভূত। বদান্যতা ও দানশীলতা নিছক অহংকার ও গৌরব প্রকাশের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। পশু যবাই করা হতো ও মেহমানদের জন্যে খাবার তৈরী করা হতো, তার মূলে এই উদ্দেশ্যে নিহিত থাকত মেহমানদের জন্যে খাবার তৈরি করা হতো, তার মূলে এই উদ্দেশ্যে নিহিত থাকত যে, মেহমানরা –পথিকরা যেন তাদের অতিথিপরায়ণতার গল্প দেশে-দেশে ছড়িয়ে দেয়। পরিণামে কোনো মেহমান না-ই আসুক। আর তাদের অতিথি পরায়ণতার গল্প না-ই বলা হোক। যদি আল্লাহর ওয়াস্তে দুর্বল ও বঞ্চিতের সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দিত, তখন তাদের মধ্যে কার্পণ্য প্রবল হয়ে উঠত। তখন এক কানাকড়িও ব্যয় করতে তারা রাজি হতো না। আত্মসম্মানবোধও আত্মগৌরবে পরিণত হতো, সত্য অনুসরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।

 

মোটকথা, সত্য অনুসরণ তাদের এই ধরনের কাজে মূল প্রেরণা –উৎস হতো না। আসলে তা হতো আল্লাহদ্রোহী আত্মগৌরব। যদিও এই আত্মগৌরবী আরবরা খুব ভালো করেই জানত যে, তারা যা কিছু করছে, তা নিতান্ত গুমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

ইউরোপীয় জাহিলিয়াতও ব্যক্তিগত কাজের পর্যায়ে বহু গুণ-বৈশিষ্ট্যের ধারক ছিল। সততা-সত্যবাদিতা, কাজে নিষ্ঠা, একাগ্রতা, দৃঢ়তা, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক কাজে নির্মমতা-পরিচ্ছন্নতা …সবই ছিল। কিন্তু তার কোনো একটিও আল্লাহর দেখানো পথের অনুসারী ছিল না বলে তার সহজ-সরল ঋজু পথ থেকে তা ছিল বিভ্রান্ত। একটু পরেই যেমন দেখব, তা সবই ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের প্রবণতা-নিঃসৃত। তারা উক্ত পর্যায়ের যে কোনো গুণসম্পন্ন কাজ করত, তা করত এই উদ্দেশ্যে যে, তা সামষ্টিকভাবে তাদের জন্যে  বৈষয়িক দিক দিয়ে খুবই সহায়ক ও স্বার্থ আদায়কারী ছিল, জীবনের গাড়ি ধাক্কা না দিয়েই চালানো যেমন অতীব সহজে ওসব নৈতিকতার বৈষয়িক কায়দা পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে পাশ্চাত্যের এই সুসভ্য মানুষ সহসাই এসব নৈতিকতা পরিহার করতে একটুও কুণ্ঠিত হতো না। তখন তাদের দৃষ্টিতে এসব নৈতিকতা একটা অবাস্তব অ-অনুসরণীয় নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না।

 

না, খুব একটা তাড়াহুড়া না করেই এক্ষণে আমরা পাশ্চাত্য নৈতিকতা পর্যায়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর অধ্যায়নে আত্মনিয়োগ করছি…..

 

মৌলিকতার দিক দিয়ে পাশ্চাত্য নৈতিকতার উৎস ধর্ম ছাড়া আর কোথাও কিছু ছিল না। মানুষ সত্যের অনুসারী হয়েও আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে চরম বিপথগামিতার মধ্যে পড়ে যেত। ফলে পরিণামে নৈতিকতায়ও দেখা দিত সেই বিপর্যয় ও বিপথগামিতা। তবে নৈতিকতার ক্ষেত্রে এই বিপথগামিতা খুব দ্রুত দেকা দিত না, দেখা দিত খুব ধীরে ধীরে এবং বেশ বিলম্বেই তা চরস সীমায় উপনীত হতো। এটা একটি শতাব্দী কালের মধ্যেও সংগটিত হতো না, এজন্যে কয়েক শতাব্দী সময়ের প্রয়োজন হতো।

 

এই ক্রমিক ধারায় পাশ্চাত্য নৈতিকতার পতন ঘটার কারণে তার অবশিষ্ট নিদর্শন-দৃষ্টান্তসমূহ জনগণকে এই ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে যে, পাশ্চাত্য জাহিলিয়াতও বুঝি নৈতিকতার বড় ধারক, জাহিলিয়াতের প্রেমিকরাও এই ধোঁকার শিকার হয়েছে। মনে করেছে, বাহ্যত আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দেখা দিলেও নৈতিকতার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ও বিপর্যয় দেখা দেয়নি। পরবর্তীকালে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই কারণে প্রথম পর্যায়ে জনগণ মনে করে নিয়েছে যে, আকীদা-বিশ্বাসের সাথে বোধ হয় নৈতিকতার কোনো নিকট সম্পর্ক নেই এবং আকীদা-বিশ্বাসে বিপর্যয় যতই আসুক না কেন, তা সত্ত্বেও নৈতিক চরিত্র অবম্যই রক্ষা পেতে পারে।

 

কিন্তু আসলে এটা একটা মস্তবড় ধোঁকা ছাড়া আর কিছু নয়। আর তার কারণ হচ্ছে, পতনের দিকে যাওয়ার গতিতে পার্থক্য হওয়া। এই পার্থক্যেরও কারণ হচ্ছে, মানষের মন স্বভাবতঃই এবং ঐতিহ্যগতভাবে তার নৈতিকতার বন্ধনসমূহ শক্ত করে আঁকড়ে থাকে, সহজে তা ছঅড়তে রাজি হয় না। তার আকীদার অংশ ঈমান হারিয়ে ফেললেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার মূল্যবোধটা রক্ষা পেয়ে থাকে। ইউরোপও তার বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েও দীর্ঘকাল তৎলব্ধ মূল্যবোধটা হারায়নি। কেননা তা এমন একটা জিনিস যার কিছু না কিছু অবশ্যই রক্ষা পেয়ে যায়, অবশিষ্ট থাকতেই হয়। কিন্তু তার শেষ পরিণতি অভিন্ন ও তা নিশ্চিত, অনিবার্য। কেনান আকীদার বিপর্যয় অবশ্যই নৈতিকতার বিপর্যয় সৃষ্টি করবেই। আর নৈতিকতা আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে একদিন না একদিন তা নিঃশেষ হয়ে যাবেই।

 

ইউরোপীয় নৈতিকতায় ঠিক এই ব্যাপারই ঘটেছে। ঘটেছে খুব ধীরে ধীরে এবং ক্রমশ আধুনিক জাহিলিয়াতের প্রকৃত নৈতিকতা থেকে বিপর্যস্ত হওয়ার পরও দীর্ঘকাল তার জের চলছিল। তারই ফলে পাশ্চাত্য জাহিলিয়াতকে নৈতিকতার ধারক মনে করে অনেকেই ধোঁকার মধ্যে পড়ে গিয়েছে।

 

একথা অনস্বীকার্য যে, ইউরোপীয় চরিত্রের সবকিছুই একদা একটা বড় সাহায্যকারীর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। তা এমন এক সাহায্যকারী, যার ছাড়া নৈতিকতার সাহায্যকার আর কিছু হতে পারে না; আর তা হচ্ছে তাদের ধর্ম।

 

ইউরোপীয় চরিত্রের দুটি উৎস ছিল। একটি ছিল খ্রিষ্টধর্ম, আর অপরটি ছিল ইসলাম।

 

সকলেই জানা, ইউরোপে খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে গিয়েছিল কনস্ট্যান্টাইন। এই ধর্মমত ইউরোপীয় জীবনধারায় একটা নির্দিষ্ট নৈতিকতার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল এবং তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত জনগণের মনে বদ্ধমূল হয়ে থেকেছেও, যদিও স্বয়ং কনস্ট্যান্টাইনের হাতেই খ্রিষ্টধর্মে নানা প্রকারের বিকৃতি সংঘটিত হয়েছিল।–[অত্র গ্রন্থের ‘ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে’ অধ্যায়ে মার্কিন লেখক ড্রিপারের উক্তি দ্রষ্টব্য।] তা সত্ত্বেও এই ধর্মীয় চরিত্রটা নেতিবাচক রূপ পরিগ্রহ করেছিল, বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো সঙ্গতি ছিল না। হযরত ঈসা (আ) জনগণকে বলতেনঃ যে লোক তোমার ডান গালে একটা  থাপপড় মারল, তার সম্মুখে তোমার বাম গালও পেতে দাও। তাঁর এ কথার আসল উদ্দেশ্য ছিল আভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে লোদকের আত্মিক সংশোধন। তিনি তো আল্লাহর সত্য নবী ছিলেন, তিনি উক্তরূপ কথা বলে নিশ্চয়ই জনগণের মনে যিল্লতী ও আত্মসম্মান হননের চিন্তা জাগাতে চান নি। কিন্তু মধ্যযুগে খ্রিষ্টীয় নৈতিকতার সাধারণ রূপটা এই প্রকৃতিতেই লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তা হযরত ঈসা মসীহর উদ্দেশ্য ছিল না, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তাঁর অনুসারীরা উক্তরূপ ধারণাই পোষণ করছিল তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীণ পরিবেশে। গোটা পরিবেশেই তো তখন বস্তুবাদী ভাবধারাপূর্ণ, বিপর্যস্ত ও জোর-জবরদস্তিতে ভারাক্রান্ত ছিল।

 

অতঃপর খ্রিষ্টান জনগণ ইসলামী জগতের সাথে সংঘর্শে লিপ্ত হয়। শুরু হয়ে যায় ক্রুশযুদ্ধ। এই সুযোগে খ্রিষ্টানরা ক্রুশ ধারণ করে মুসলিম জাহানে প্রবেশ করে এবং কিছু কাল পর্যন্ত তথায় অবস্থান করে। তারা সিরীয় এলাকায় নিজস্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত করে।

 

খ্রিষ্টনারা ইসলামী জীবনধারার সাথে পরিচিতি লাভ করে গ্রন্থাদির মাধ্যমেও এই পরিচিতির ফলে তারা নানাভাবে উপকৃত হয়। তারা লাভ করে জীবনের জন্যে ইতিবাচক মতাদর্শ নৈতিকতার পূর্ণ সংরক্ষণ সহকারে।

 

তারা সেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহে বসবাসকারী মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিল। তারা লক্ষ্য করত, মুয়াযযিনের আযান ধ্বনি শোনামাত্রই তারা তাদের দোকান-অফিস-ঘর সম্পূর্ণ বা প্রায় উন্মুক্ত রেখেই –পাহারাদারীর কোনো ব্যবস্থাই রাখা হতো না। মসজিদের নামাযে হাযির হওয়ার জন্যে তারা বিন্দুমাত্র বিলম্বও সইত না। নামায সমাপ্ত করে তারা নিজ নিজ দোকান-অফিস-ঘরে ফিরে আসত, কিন্তু দেখত, সেখান থেকে কোনো সামান্য জিনিসও চুরি যায়নি। তার কারণ জনগণ ইসলামে ঈমানদার, সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসী।

 

তারা দেখত, মুসলিম জনগণ গোষ্ঠীবদ্ধ, পরস্পর গভীর সম্পর্কে সম্পৃক্ত। তাদের সকলের মনে এক অভিন্ন ‘উম্মত’ হওয়ার চেতনা সক্রিয়। অন্তত বিপদকালে তো বটেই। তখন তারা পরস্পর সহযোগিতায় এগিয়ে যেত। পরস্পরের মধ্যে থাকত বন্ধুত্ব, প্রীতি, সহানুভূতি-সহৃদয়তা, সহম